মৌষলের কৌশল
মহাভারতের মৌষল পর্বের গল্প আপনারা সকলেই জানেন। পুরাণ পড়ুন বা না পড়ুন, যদুবংশের ধ্বংসের কথা ঠিকই জানেন। সিরিয়াল, বই, কমিক্স, অমর চিত্রকথা, যেখান থেকে হোক জানেন। সিরিয়ালে অবশ্য দেখায় না। কৃষ্ণের বংশের ওরকম ধ্বংস কেউ দেখাবে নাকি? তাহলে কৃষ্ণ ভগবান হল কী করে ? সাধারণ মানুষ আর কৃষ্ণের মধ্যে তফাত কী রইল? তাই বেশিরভাগ চিত্রকথা ও সিরিয়ালে দেখানো হয় দ্বারকা নগরীতে সমুদ্রের জল ঢুকে গেল ভসভস করে আর অ্যাটলান্টিসের মতন সেটা গবগব করে ডুবে গেল। তাহলে কি দ্বারকাই অ্যাটলান্টিস ছিল? টেকনোলজির উন্নতি আর জলে ডুবে যাওয়া দেখলে তাইই মনে হয়, কিন্তু সে আলোচনা অন্য।
কথা হচ্ছিল মৌষল পর্বকে কীভাবে মানুষকে দেখানো হয়েছে চিত্ৰ বা চলচিত্রের মাধ্যমে? সে যে কী চিত্র-বিচিত্র তা বোঝাই। যেমন ধরুন, একটি ছবির উদাহরণ দিচ্ছি। একটি বিখ্যাত মঠের দ্বারা প্রকাশিত কৃষ্ণ সম্বন্ধীয় সচিত্র বইয়ে এই মৌষল পর্বের গোষ্ঠীকোন্দল মারপিটের ছবি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে যারা মারপিট করছে তাদের চেহারায় রাগ বা হিংসে নেই। যাদবগণের চেহারাগুলো শান্ত সৌম্য, অথচ হাতে লাঠি নিয়ে একে অপরকে মারতে উদ্যত। আপনি যদি যাদবদের গোষ্ঠীদ্বন্দের মারপিটের গল্প না জানেন, এবং দুম করে ওই ছবি যদি দেখানো হয়, তাহলে আপনার মনে হবে লাঠি নিয়ে চরিত্রগুলো রাস খেলছে। ওই গুজরাটিদের লাঠি নিয়ে ‘ঢোলনা ঢোলনা’ বলে ঢোল বাজিয়ে লাঠি ঠোকাঠুকি নৃত্যের মতন। যাকে বলে গারবা। এখন দেখি বহু বাঙালি ছেলেপুলে দুর্গাপুজোকে স্টাইল করে ‘নবরাত্রি’ বলে এসি অডিটোরিয়ামে ওই গারবা নাচতে যায়। মরণদশা, তোদের কি দুর্গাপুজোয় আনন্দ হয় না রে হতভাগাগুলো যে ওই সময়ে লাঠি নিয়ে লাঠালাঠি করতে যাস?
যা-ই হোক, প্রশ্ন হল, কেন এই ছবিগুলোয় এরকম শান্ত চেহারায় কলহ দেখানো হয়? আরে ভাই, প্রভাস সমুদ্রের পাড়ে, যাদবরা এ ওর ঘাড়ে লাফিয়ে ঝাড়ের দাঁড়ে নিজেদের হাড়ের টুকরো করেছিল। যথেষ্ট ভায়োলেন্ট হয়েছিল সেই মারপিট। গলা কাটাকাটি, রক্তারক্তি কেস ঘটেছিল। কয়েকজন বাদে কেউই বেঁচে ছিল না। সেই ছবিকে ওরকম শান্ত দেখানোর অপচেষ্টা একটাই কারণে হতে পারে। সেটা হল সবকিছুই লীলার খাতায় ফেলে দেওয়া। মানে যাদবরা মদ্যপান করে মাতাল হয়ে নিজেদের মধ্যে রীতিমতন ঝগড়া করে, অকথা-কুকথা শুনিয়ে একে অপরকে কেটে ফেলল, কিন্তু তবুও ভক্তিবাদীরা সেই নৃশংস ঘটনা থেকে লীলাখেলা বের করবে।
কে জানে? ওইজন্য হয়তো আমার ভক্তি কম। পাপীতাপী মানুষ আমি। যা-ই হোক, যারা একান্তই মৌষল পর্বের গল্পটা জানেন না, তাদেরকে ছোট করে বলি গল্পটা। কেন ছোট করে? কারণ আমি আমার মতন করে পুরাণের বাইরে একটা কাল্পনিক গল্প বলব। সেটা আমারই কল্পনা, তবে কেন সেই গল্প বললাম, সেটা নিয়ে আলোচনাও করব। আগে আসল ঘটনাটা ছোট করে বলি।
শাম্বর পেট থেকে বের করা মুগুরকে গুঁড়ো করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয় । সাথে যেটুকু গুঁড়ো করা হয়নি সেটুকুও। তারপর কৃষ্ণের আদেশে দ্বারকা নগরী ও রাজ্যে মদ্য প্রস্তুত করা ও পান করা নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এরইমধ্যে রাজ্যে নানানরকম অশনি সংকেত দেখা যায়। নদীর জল উলটো বইছে (এর থেকেই বাইবেল ঝেড়েছে মনে হয়), পাখিরা গোল গোল ঘুরছে, শকুনপাখি বেশি দেখা যায়, বিনা মেঘে বজ্রপাত হয় (তাতে কয়েকজনের টিভি আর ফ্রিজ খারাপ হয়ে যায়), রাতে ইঁদুর এসে চুল-নখ খেয়ে পালায়, অসময়ে প্যাঁচা ডাকে (কাকে ডাকে কেউ জানে না), কুকুর বেড়ালের জন্ম দিচ্ছে (অন্য কেউ জন্ম দিচ্ছে না, বরং কুকুরেরা বেড়ালদের জন্ম দিচ্ছে)। তার উপরে আবার একটা টেকোমতন কালো বামনকে দ্বারকার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। সে মাঝেমাঝেই এর ওর ঘরে উঁকি মারছে। ব্যাটা দুশ্চরিত্র কেউ বোধহয়। কিন্তু ধরতে গেলেই হারিয়ে যাচ্ছে।
এসব উলটোপালটা কাণ্ডকারখানা দেখে সবাই কৃষ্ণের কাছে এসে বলে, “এসব কী হচ্ছে?”
কৃষ্ণ বলে, “ওই বেঁটে কালো টেকো বামনটা আসলে মৃত্যু। ও দ্বারকায় সবার বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করছে। আর খারাপ সময় আসছে।”
“বড় উপকার হল জেনে,” একজন যাদব বলে, “এটা তো আমরা এমনিই বুঝতেই পেরেছি। আপনি বলুন এর থেকে বাঁচার উপায় কী?”
“বাঁচার জন্য খাঁচা ছেড়ে বেরোতে হবে,” কৃষ্ণ বলে, “সবাইকে তীর্থে যেতে হবে, তাতে যদি পাপস্খলন হয়, তাহলে এই যাত্রা সবাই বেঁচে যাবে।”
সেইমতন কয়েকজন ছাড়া বাকি সমস্ত পুরুষ যাদব তাদের স্ত্রীদের নিয়ে তীর্থ করতে প্রভাস সাগরের পাড়ে গেল। মানে বর্তমান প্রভাস ক্ষেত্র সোমনাথ মন্দিরে। এবারে যা হয়, তীর্থ করতে গিয়ে পিকনিক শুরু হয়ে গেল। যথেচ্ছ মদ-মাংস খাওয়া আর ফুর্তি শুরু হয়ে গেল। এসব দেখে কেলো হতে চলেছে বুঝে উদ্ধব কেটে পড়ল। দ্বারকায় মদ নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু আউটস্টেশনে সেই মদ পেয়ে বলরাম হেব্বি পান করতে লাগল। তাই দেখে বাকিরাও পান করে মাতাল হল। বেশিরভাগ কোম্পানির সেলস মিট-এ যেরকম হয় আর কী।
এই মাতাল অবস্থায় সবাই সবাইকে ‘ভাই রে ভাই রে’ করে খুব আত্মীয় পাতাচ্ছিল। এরইমধ্যে যুযুধান বলে ওঠে, “এই আবুত্ত, আমাদের মধ্যে এক কাপ্রুস আছে!”
“কে কাপুরুস?” গদা বলে “পুরুস শুনেছি, কা-পুরুস মানে কী?”
“মানে ভীতু,” যুযুধান বলে, “হেঁই যে কৃতবর্মা, ও আবুত্ত কাওয়ার্ড…”
“আমায় কাওয়ার্ড বললি, কোন বাপের ব্যাটা? সামনে আয়!” টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায় কৃতবর্মা।
“তোর সামনেই আছি রে (লম্বা গালি),” যুযুধান বলে, “চক্ষু কি শৃধুতে প্রোত্থিত করেছিস?”
“চোপ আবুত্ত… আমাকে কাওয়ার্ড কেন বললি?” কৃতবর্মা বলে।
“তুই কাওয়ার্ড, তোর চোদ্দপুরুষ কাওয়ার্ড… তোর ফ্যামিলি কাওয়ার্ডের অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে!”
“চোপ ব্যাটা জুজু… তোর ফ্যামিলি কী করেছে?”
“কিস্যু করেনি, কিন্তু তোর মতন উন্মাদ্রেতস্কারী হয়ে ঘুমন্ত মানুষকে মারেনি,” যুযুধান বলে।
“ক্যা বাত…ক্যা বাত…” প্রদ্যুম্ন মদ্যপান করতে করতে বলে।
“কী? আমাকে এরকম অ্যালিগেশন দেওয়া?” কৃতবর্মা বলে, “আমি সেই রাতে ধর্ম পালন করছিলাম…। যেমন করে গোরু পালন করে… হিক”
“তুই নিজেই তো গোরু, পালন করবি কী?” যুযুধান বলে, “আর তুই… তুই সেই রাতেই শুধু নয়, তারও আগে, সেই আরেক রাতে অক্রুর কাকার সাথে মিলে শতধন্বের ঘিলুরমণ করেছিলিস। তাতেই তো ও সত্রাজিতকে মার্ডার করেছিল”
“ক্যা বাত… ক্যা বাত… ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত,” মাতাল প্রদ্যুম্ন বলে।
“মুখ সামলে…” অক্রুর দূরে গড়াগড়ি দিতে দিতে বলে, “উঠেই তোকে পেটাব জুজু!”
“আরে কাকা, আগে উঠুন, তারপরে তো…”
“ক্যা বাত, ক্যাবাত…”
“ধ্যাত্তেরি তোর ক্যাবাত!” কৃতবর্মা বলে, “আমি একাই পাপী নাকি? এই যে সাত্যকি, এও তো ধ্যানে বসা ভুরিশ্রবাকে ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে মেরেছিল। ও পাপী না?”
“লেহ মেঢ্র, তোকে যুযুধান খচাল, তো তুই আমাকে কেন টানছিস?” সাত্যকি বলে।
“তুই মেঢ্র পাপী… এখানে সবাই পাপী…” কৃতবর্মা বলে।
“সবথেকে বড় পাপী তুই, আগে তোকে সাফ করি,” বলে সাত্যকি তরোয়াল হাতে টলতে টলতে দৌড়ে গিয়ে কোপ চালিয়ে দেয়। কিন্তু মাতালের কি আর অত খেয়াল থাকে? কৃতবর্মাকে ডাইনে রেখে সোজা বাঁয়ে গিয়ে অক্রুরের উপরেই চালিয়ে দিল। অক্রুর দুখানা হয়ে বলল, “ধ্যার মেঢ্র, আমাকে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান করে দিলি?”
“ওরে সামলা সামলা!” কৃষ্ণ চেঁচায়। কিন্তু কে কাকে সামলাবে? কৃতবর্মা মাথার উপর তরোয়াল নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, “আজ সাত্যকির সাধ্য কি আমায় আটকায়! ওকে দেখে নেব আমি…”
কিন্তু মাতালের কারবার, তরোয়াল ঘোরাতে গিয়ে নিজের তরোয়ালেই নিজের মুণ্ডু ঘচাং ফু। কারা যেন রটিয়ে দিল, সাত্যকি কৃতবর্মাকে মেরেছে। কেউ কিছু না বুঝে যুযুধানকে পিটিয়ে দিল। যুযুধানের পক্ষের লোকেরা তাদের পিটিয়ে দিল। আন্তঃযাদব মারামারি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল।
এরই মধ্যে কে যেন মোটা এরকা ঘাস হাতে তুলে নিয়েছে। আর তুলতেই সেটা মুগুর হয়ে গেছে। আসলে সেই যে শাম্বর পেত থেকে বেরনো মুগুরের চূর্ণ, সেটা ভাসতে ভাসতে এসে প্রভাস ক্ষেত্রেই জমা হচ্ছিল। সেখানে এরকা ঘাসগুলো পুষ্টি পেয়ে প্রভাসের বাহুবলী হয়ে গেছিল। তাই ঘাস তুলতেই মুগুর হয়ে যায়।
এখানে একটা ছোট তথ্য দিয়ে রাখি। এই এরকা ঘাসের বৈজ্ঞানিক নাম হল, Typha eliphantina। এলিফ্যান্টের অ্যান্টেনা বলা যায়। এগুলো দেখতে মোটা মুগুরের মতনই। এবং এরকা সহ বহু ঘাস, জমি থেকে লোহা টেনে নেয়। এরকা ঘাসের মুগুর নিয়ে দ্বারকার লোকেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে প্রভাস তীর্থে ভাসিয়ে দেয়। কেলাকেলি করে সবাই মরে যায়। শুধু বেঁচে থাকে কৃষ্ণ, বভ্রু আর দারুক।
কৃষ্ণ দারুককে বলে, “শিগগিরি হস্তিনাপুর গিয়ে খবর দাও। অর্জুনকে আসতে বলো দ্বারকায়, আর সবাইকে নিয়ে যেতে বলো।”
দারুক রথ ছুটিয়ে চলে যায়। কৃষ্ণ বভ্রুকে বলে, “তুমি শিগগিরি দ্বারকা গিয়ে মহিলাদের বাঁচাও। আমি বলরামকে খুঁজে দেখি, কোথায় গেল?”
বক্র রথে চড়ে, হ্যাররর হ্যাট হ্যাট করে যেই কিছুটা গেছে, অমনি তার রথের চাকায় একটা মুগুর ছিটকে গিয়ে সামনের গাছে লেগে বাউন্স করে বভ্রুর মাথাতেই গদাম করে পড়ে। রথ ছুটে চলে যায়, বভ্রু ওখানেই অক্কা পায়। কৃষ্ণ বলে, “যাহ, এটাও গেল? নাহ, আমাকেই গিয়ে খবর দিতে হবে।”
কৃষ্ণ এবার নিজের রথ নিয়ে মুগুর-টুগুর সামলে সোজা দ্বারকায় এসে পৌঁছয়। এসেই সবাইকে জানিয়ে দেয় যে যাদব পুরুষেরা নিজেদের মধ্যে বুরুষ ঘষাঘষি করে পরলোকগমন করেছে। যদিও এরকম ভাবে বলা উচিত না, কারণ তার মধ্যে কৃষ্ণের নিজের পুত্র আর নাতিও ছিল। সম্ভবত বেশিরভাগ পুত্রই ওইভাবেই মারা গেছিল। যা-ই হোক, কৃষ্ণ তার বাবাকে বলে, “এখানে আপাতত সামলাও। অর্জুন আসছে। আমি বলরামদাকে খুঁজে ফিরব!”
কিন্তু কৃষ্ণের সেই যাওয়াই শেষ যাওয়া হয়। দ্বারকায় আর ফেরা হয় না। বলরামকে খুঁজতে গিয়ে কৃষ্ণ দেখে, বলরাম সমুদ্রের পাশে একটা গাছের তলায় ধ্যান করছে, আর তার মুখ থেকে একটা বড় বহুফণাধারী শুভ্রসর্প বেরিয় সমুদ্রে চলে যাচ্ছে। কৃষ্ণ বোঝে তারও সময় শেষ হয়ে এসেছে। তাই জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে একজায়গায় গিয়ে বসে পড়ে। সেখানে আসে জরা নামে এক ব্যাধ। সেই জরা কৃষ্ণকে হরিণ ভেবে প্যাঁক করে তির মারে। কৃষ্ণের পায়ের তলায় তির লাগায় কৃষ্ণ সেখানেই বসে বসে মারা যায়। বা দেহত্যাগ করে।
তারপরে দ্বারকায় হুড়মুড় করে সুমদ্রের জল ঢুকে পড়ে, আর দ্বারকা ভেসে যায়। অর্জুন ততক্ষনে এসে পৌঁছয়। সে গিয়ে কৃষ্ণের আর বাকি সব যাদবদের মৃতদেহের সৎকার করে। তারপরে দ্বারকার যে বহু মহিলা ও কিছু পুরুষেরা বেঁচে ছিল, তাদের নিয়ে হস্তিনাপুরের দিকে রওনা দেয়। কিন্তু পথে আক্রমণ করে আভীর জাতের দস্যুরা। বীরবিক্রমে যুদ্ধে নেমে অর্জুন গাণ্ডীবে ছিলাই পরাতে পারে না। দৈবাস্ত্রগুলোর মন্ত্রও ভুলে যায়। দস্যুরা ইচ্ছেমতন যাদব নারীদের তুলে নিয়ে যায়। বহুসংখ্যক নারী স্বেচ্ছায় দস্যুদের সাথে চলে যায়। ওই যারা বেশী ওয়াইল্ড ব্যাপার-স্যাপারে বিশ্বাসী ছিল। অথবা সুযোগসন্ধানী ও ভোগী ছিল। দ্বারকা আর দ্বারকার পুরুষেরা তো চলেই গেছে। হস্তিনাপুরে গিয়ে বিধবা জীবন কাটাবে? তার থেকে দস্যুর দাসী হওয়া ভালো। কম করে মদ-মাংস খাওয়া যাবে, ইচ্ছেমতন রতি করা যাবে।
অর্জুন ক্ষমতাহীন অবস্থায়, কোনওমতে কিছু মহিলা আর পুরুষদের বাঁচিয়ে হস্তিনাপুর নিয়ে আসে। সম্ভবত ততদিনে বজ্র হস্তিনাপুরেই থাকত, কারণ যুধিষ্ঠিরকে কৃষ্ণ বলেছিল বজ্রকে রাজা বানাতে। সেই বজ্রের কাছেই বাকি যাদবেরা গিয়ে ওঠে। এইভাবে যদুবংশ ধ্বংস হয়, এবং সেই গল্পই ছোট করে শোনালাম আপনাদের।
সংক্ষেপে যে গল্প বললাম, সেটায় কোথাও জল মেশাইনি। শ্রদ্ধেয় কিশোরী মোহন গাঙ্গুলি মহাশয়ের অনুবাদিত মহাভারতে যেমনটা লেখা আছে, একদম সেরকমটাই শোনালাম। অল্প মজা করেছি কথোপকথনে, কিন্তু সেটা ব্যতীত আর কিছু বে-লাইনে বলিনি।
কিন্তু এইবারে আমি বেলাইনে বলব। নিজের মতন করে যদুবংশের ধ্বংসের গল্প বিনির্মাণ করব। কোথাও কোথাও নিজস্ব কল্পনা মেশাব, কোথাও বা যুক্তি দেব। পছন্দ না হলে নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন, কিন্তু আমার স্বভাবই হল প্রশ্ন করা ও আলোচনা করা। তাহলে গল্প শুরু করি।
আগের পর্বের শেষেই আমরা একটা উত্তাল কল্পনা করে ফেলেছি যে, শাম্ব হয়তো উভয়লিঙ্গ ছিল। ও, আপনারা কল্পনা করেননি? আপনারা এটা মানতে পারছেন না? বেশ, আপনারা তাহলে বাকিটা পড়বেন না। আমি বরং তাদের নিয়ে আলোচনায় এগিয়ে চলি, যারা এটাকে একটা ‘হতেও পারে’ বলে ধরে নিয়েছেন। ধরে নিন শাম্ব একজন উভয়লিঙ্গ এবং সে মুগুর প্রসব করেছিল।
এবারে লোহার মুগুর জিনিসটা কেমন দেখতে হয়? একদিকে ভারী, একদিকে অপেক্ষাকৃত সরু, ভারী এবং কালো। আমার ধারণা এটি কোনো শিশু ছিল। আমি আর ভেঙে বললাম না, আপনারা বুদ্ধিমান। আন্দাজ করতেই পারছেন, আমি কী বলতে চাইছি। এবং আমাকে মারধোর করার আগে, যুক্তিটা শুনে নিন দয়া করে।
বাংলায় মুষল/মুশল কথাটা লেখা হলেও সংস্কৃতে তার বানান হয় মুসল। পর্বের নামও মৌসল পর্ব। এবারে মুসল কথাটার অর্থ জানতে গিয়ে দেখি সেটা মুগুরও বোঝায়, ঘণ্টার তাড়ণিও বোঝায় আবার মুসল নামের এক নক্ষত্রমণ্ডলও বোঝায়। ব্রহ্ম পুরাণে ভারতবর্ষের বাউন্ডারি বোঝাতে এই কন্সটেলেসনের কথা বলা হয়েছে। পুরাণে এমন বহু চরিত্রের উদাহরণ আছে, যাদের নামে নক্ষত্রমণ্ডল আছে। এটা বলা মুশকিল যে সেই চরিত্রের নামেই পরবর্তীকালের খগমশাস্ত্রীরা কন্সটেলেশনের নামকরণ করেছিলেন, নাকি নক্ষত্রের আকাশে অবস্থাঙ্কালে সেই চরিত্রের জন্ম হওয়ার ফলে তার নাম কনস্টেলেশনের নামে রাখা হয়েছিল? দ্বিতীয়টা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, কারণ অরুন্ধতী বা রোহিনী নামগুলো পরে এসেছে। আবার উলটোদিকে কোনো ঘটনাকে চিরকাল মানুষের স্মৃতিতে রেখে দেওয়ার জন্য, সেই সময়ে আকাশে যে কনস্টেলেশন দেখা গেছে, সেটাকে ঘটনার সাথে মিলিয়ে নামাঙ্কিত করা হয়েছে। যেমন আমাদের কালপুরুষ হল গ্রীকদের ওরাইওন। কোনটা আগে, কোনটা পরে, সে আর জানার উপায় নেই। কল্পনা করলে অনেক কিছুই বের করা যায়। সবকিছুই তর্কসাপেক্ষ।
এত কথা বলার কারণ এই যে, শাম্বর ওই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ অসবর্ণ পুত্র হয়তো (হয়তো কিন্তু) যখন জন্মেছিল তখন মুসল কনস্টেলেশন আকাশে ছিল। এবং তাকে জন্মের পরেই গোষ্ঠী থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। কারণ? বিজাতীয় শিশু। অন্য জাতের। আমরা পুরাণে বহুবার দেখেছি, ত্বকের রংয়ের জন্য কীভাবে নীচু অনার্য জাতিদেরকে বারংবার হেয় করেছেন পুরাণকারেরা। এটা তখনকার সিস্টেমেই ছিল। সেই বেণ রাজার গল্প বলেছিলাম, সেখানেও তার উরু ঘষে কালো রংয়ের নিষাদ বেরিয়েছিল। পরে দেখুন, হরিশ্চন্দ্র ও ত্রিশঙ্কু যখন অভিশাপ পেয়ে চণ্ডাল হয়ে যায়, তখনও তাদের গাত্রবর্ণ ধূসর কালো হয়ে যায়। আর পুরাণকারেরা সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যাম্প লাগিয়ে দিল, এরা পাপী, শাপিত, এবং পতিত। কৃষ্ণ বা দ্রৌপদী এই ক্যাটেগরিতে পড়েনি কারণ তারা রাজবংশে জন্মেছিল। এই বর্ণবৈষম্যের আলোকেই আমি কল্পনা করলাম শাম্বপুত্র মুসল নিম্নবর্ণের ছিল। রূপকের আড়ালে আসলে কী ঘটেছিল জানা যাবে না।
যা-ই হোক শাম্বর সম্ভাব্য পুত্র নিয়ে এই কল্পনার রাশ এখানেই টানলাম। তবে এবারে আলোচনা করব, আসলে কীভাবে যদুবংশ ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে? ও মুসল এবং কালো বর্ণের লোকের দ্বারকার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করা থেকে একটা সন্দেহ জাগে যে, দ্বারকার কাছাকাছির দস্যুর ও শত্রুরা দ্বারকার উপরে নজর রাখছিল। দ্বারকাবাসীদের চরিত্র ও শক্তি যে ক্রমে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে আসছিল, তার প্রমাণ তো লেখাই আছে। দুর্বল জাতির উপরে শত্রুরা নজর রাখবেই।
অন্যদিক দিয়ে ভাবলে একটা কথা পরিষ্কার বোঝা যায়। দ্বারকাতে বসবাস করা বিভিন্ন যাদব গোষ্টীদের নিজেদের মধ্যে মিল ছিল না। যাদবরা এতটাই ছড়িয়ে গিয়েছিল যে কৃষ্ণ প্রায় সারাটাজীবন সকল গোষ্ঠীকে একত্র করার চেষ্টাতেই কাটিয়ে দেয়। যেখানে দরকার সেখানে শাসন ও বধ করে গোষ্ঠীসকলকে এক ছাতার তলায় এনেছিল কৃষ্ণ, কিন্তু মানুষের মন পালটাবে কী করে? ভিতরে ভিতরে গোষ্ঠীদের মধ্যে হিংসে ছিলই। এবং সেটারই সুযোগ নেয় ওই বাইরের শত্রুরা। ভগবান না ভেবে, কৃষ্ণকে যদি অসাধারণ এক মানুষ ভাবি, তাহলে কৃষ্ণও বয়সের সাথে যে দুর্বল হয়ে পড়ছিল, সে চিহ্নও স্পষ্ট। যাদবদের এই মারামারি সে থামাতে পারেনি। কাউকেই শাসন করতে পারেনি। তার চোখের সামনেই যাদবরা নিজেদের মধ্যে মারামারি হানাহানি করে শেষ হয়। যে কৃষ্ণ শিবের সাথে লড়েছিল, সেই কৃষ্ণ চুপ করে থাকল কেন?
কেনই বা যুযুধান, সাত্যকি বা কৃতবর্মাকে শাসন করল না? শুধু রাগতভাবে তাকিয়েছিল, সেটা লেখা আছে, কিন্তু শাসন করে থামায়নি কে? কারণ ওই একটাই, কৃষ্ণের বয়স হয়েছিল, নিজের ক্ষমতা হারিয়েছিল এবং যাদবরা তার কথা আর শুনত না।
মুষলের ঘাস নিয়ে আমার ধারণা, ওই মুষলের গুঁড়ো ভাসিয়ে দেওয়া এবং সেটা প্রভাস তীরে ঘাসে মিশে ম্যাজিক লাথি হয়ে যাওয়াটা রূপক। যাদবদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-ঝামেলা থাকলেও তারা একত্রে থাকলে বাইরের শক্তির পক্ষে তাদের সাথে যুদ্ধ করা অসম্ভব ছিল। তাই তারা যাদবদের ঝগড়ায় ইন্ধন দিতে থাকে। তারা দ্বারকা থেকে এগিয়ে আসতেই তাদের কাছে মদ ও মাংস দিতে থাকে। সাথে যাদব বীরেদের একে অপরের প্রতি উস্কে দিতে থাকে। নয়ত যুযুধান, যে কিনা একটি নগণ্য চরিত্র, সে হঠাৎ কৃতবর্মাকে ঠেস দিয়ে দিয়ে কথা বলতে শুরু করে কেন? তাতে আবার প্রদ্যুম্ন সায় দিচ্ছিল। সাত্যকিই বা হঠাৎ কৃতবর্মাকে মারল কেন? পুরনো শত্রুতা? এরা কয়েকজন নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করলে তার মধ্যে সব যাদব জুড়ে গেল কেন? দাবানলের মতন এই হিংসে ছড়িয়ে পড়ল কেন?
আসলে যাদবরা বারুদের স্তূপের উপরেই বসেছিল। দরকার ছিল শুধু একটি স্ফুলিঙ্গের। সেটাই ওই বাইরের শত্রুরা দিয়েছিল। সাথে দিয়েছিল অস্ত্র। যেইমাত্র যাদবদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, তখনই ঘাসজমিতে অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিল সেই শত্রুরা। কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলেছিল তারা। এর সবথেকে বড় প্রমাণ হল বভ্রুর মৃত্যু। বভ্রুকে যখন কৃষ্ণ পাঠায়, আর বভ্রু দ্বারকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, তখন বাকি যাদবরা মৃত। তবুও কোথা থেকে একটি মুষল এসে তার উপরে পড়ে, ও তার মৃত্যু ঘটে। এটা ওই শত্রুদেরই অস্ত্র হতে পারে।
এবং সেটা বুঝেই কৃষ্ণ ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল দ্বারকা বাঁচাতে, কারণ সেইসময়েই কৃষ্ণ বুঝতে পেরেছিল যে এই শত্রুরা পুরুষদের মেরে দ্বারকার নারীদের দিকে হাত বাড়াবে। তাই কৃষ্ণের অত তনছুটি লেগেছিল। যদি আগে থেকেই কৃষ্ণ জানত, তাহলে অর্ধেক পুরুষদের দ্বারকায় রেখে আসত। তাহলে যাদবরাও নিজেদের মধ্যে মারপিট করে শেষ হত না, আর দ্বারকায় সুরক্ষিত থাকে।
এইখানেই কৃষ্ণকে অদ্ভূতভাবে ভীষণ একটা ‘মানুষ’ বলে মনে হয়। শত্রুর আগমনের আন্দাজ লাগাতে পারেনি সে। নিজের জাতির মধ্যে ঝগড়া ঝামেলা থামাতে পারেনি সে। নিজের স্ত্রীদের সহ দ্বারকার নারীদের উপযুক্ত সুরক্ষা দিয়ে যেতে পারেনি। তার কিছু স্ত্রী তার চিতায় সহমরণে যায়, এবং কিছু স্ত্রী সন্ন্যাসিনী হয়ে জঙ্গলে যায়। বাকিদের দস্যুরা নিয়ে যায়। যে কৃষ্ণকে আমরা পুরো মহাভারত আর হরিবংশে এত দাপটের সাথে সমস্ত কিছু ম্যানেজ করতে দেখি, সেই কৃষ্ণ এইখানে কই?
বড়ই সন্দেহের ব্যাপার, এবং এই সন্দেহ থেকেই আমার ভীষণভাবে মনে হয় যে যদুবংশ আসলে ওরকম একটা মারামারি প্রতিযোগিতায় শেষ হয়নি। কৃষ্ণর মৃত্যুর পরে ওরকম একদিনে জল ঢুকে দ্বারকায় ডুবেও যায়নি। সম্ভবত কৃষ্ণ যদুবংশের বিভিন্ন গোষ্ঠী সামলাতে পারছিল না, এবং গোষ্ঠীদের সম্পর্কে চিড় ধরে। সেটাই বাড়তে বাড়তে এক সময় বাড়াবাড়ি হয়, এবং তখন কৃষ্ণের মৃত্যু হয়। তার পরে গোষ্ঠীদের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে প্রায়শই একে অপরের সাথে মারপিট যুদ্ধ চলতে থাকে।
ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী ছড়িয়ে যেতে দ্বারকা ক্রমে একটি বাণিজ্য নগরীতে রূপান্তরিত হয়। এবং ক্রম জলস্তর বাড়তে বাড়তে একসময় সেই নগরীর বেশিরভাগটা জলের তলায় চলে যায়। তবে সম্পূর্ণ দ্বারকা ধ্বংস হয়নি। তার প্রমাণ হল Archaeological Survey of India (ASI), CSIR – National Institute of Oceanography (NIO) NOAA National Centers for Environmental Information (NCEI) দ্বারা সমুদ্রের নীচে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান।
এখানে প্রথমেই জানিয়ে রাখি, ইন্টারনেটে জলমগ্ন দ্বারকার যে ছবিগুলো দেখেন, সেগুলো নিরানব্বই শতাংশই জালি। একমাত্র উপরোক্ত তিনটি সংস্থার দ্বারা প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওই হল আসল প্রমাণ। তবে কোনো মন্দির, সিংহের মূর্তি, কৃষ্ণমূর্তি পাওয়া যায়নি জলের তলায়। পাওয়া গেছে বড় বড় পাথর সুন্দর করে কেটে বানানো রাস্তা, বাড়ির ভিত্তিস্থাপনের চিহ্ন, এবং বন্দরের চিহ্ন। সুতরাং দ্বারকা, বা তখনকার ভেট দ্বারকা একটি বন্দর ছিল।
কিন্তু মহাভারতে তো সামুদ্রিক বাণিজ্যের কথা নেই। তার উপর এটাও প্রমাণিত এখন যে, সমুদ্রের তলায় থাকা নোঙর ও রাস্তা সহ দ্বারকা বন্দর খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে চালু ছিল। বর্তমান দ্বারকাধীস মন্দিরের তলাতেও পোড়ামাটির বস্তু পাওয়া গেছে। এই সমস্ত প্রমাণের ভিত্তিতে এটাই বলা যায় যে দ্বারকা একদিনে ডুবে যায়নি। বরং যুগের নিয়মে দ্বারকা অনেকটা বড় বন্দর নগরী হয়, এবং আস্তে আস্তে তার বন্দর জলের তলায় চলে যায়। যা রয়ে যায় সেটা দ্বারকার নগরী, যা সমুদ্র থেকে পিছিয়ে আসে। দ্বারকা যদি সত্যিই এক রাতে জলমগ্ন হয়ে থাকে, তাহলে তার প্রমাণ এতদিনে পাওয়া যেতই। একটা গোটা নগরী সমুদ্রের তলায় ডুবে গেলেও তার চিহ্ন থাকতই। আর থাকত প্রচুর ধনরত্ন।
কিন্তু সেসব কিছুই পাওয়া যায়নি। এই ব্যাপারটাই অনেক রকম সম্ভাবনার জন্ম দেয়। এক, দ্বারকার এক রাতে ডুবে যাওয়ার কাহিনি কাল্পনিক ও অতিরঞ্জিত। দুই, অ্যাটলান্টিস থেকে প্রভাবিত হয়ে দ্বারকার গল্প লেখা হয়েছে। তিন, ওখানে দ্বারকা ছিলই না। চার, দস্যুরা সব লুটে নিয়ে গেছিল। একদিনে নয়, অনেকটা সময় ধরে, এবং খেপে খেপে দ্বারকাবাসীদের ক্ষেপিয়ে দিয়েছিল।
সময়কাল ধরে হিসেব করলেও তাইই দাঁড়ায়। কৃষ্ণ দারুককে পাঠায় অর্জুনকে খবর দিতে। হিসেব অনুযায়ী প্রভাস তীর্থ থেকে হস্তিনাপুর (বর্তমান মীরট) প্রায় দেড়হাজার কিলমিটার। একটি ঘোড়ায় টানা রথ আন্দাজ খুব বেশী হলে ষোলো কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় ছোটে। সেই হিসেবে, যদি দারুক মাঝে কোত্থাও না থেমে থাকে, তাহলেও আন্দাজ নব্বই ঘণ্টা লেগেছে তার হস্তিনাপুর যেতে। গিয়ে খবর দিতেই অর্জুন যদি বেরিয়ে থাকে এবং দ্বারকায় যায় তাহলে সেও দেড় হাজার কিলোমিটার রথে করেই আসে। তাতেও তার নব্বই ঘণ্টা আরো লাগে। সুতরাং কৃষ্ণের খবর পাঠানো থেকে অর্জুনের দ্বারকায় আগমনের মধ্যে কম করে একশো আশি ঘণ্টার তফাত ছিল। মানে সাড়ে সাত দিন। এক সপ্তাহই ধরুন।
যাদব পুরুষদের মৃত্যু আর দ্বারকার নারীদের উদ্ধারের মধ্যে সাতদিনের তফাত ছিল কম করে। তারমধ্যে দস্যুরা আক্রমণ করেনি? করলেও কে বাঁচিয়েছিল? সব বীর যাদবরা তো মরে গেছে ততক্ষণে। তাই আমার শেষ ধারণা হল, সমুদ্রের জল ঢুকে যাওয়াটা দ্বৈত রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম অর্থ, দ্বারকার কালে কালে জলমগ্ন হয়ে ডুবে যাওয়া। দ্বিতীয় অর্থ, দ্বারকাতে দস্যুদল বাণের জলের মতন ঢুকে সব লুটে নেওয়া। কাব্যের মধ্যে সুপ্ত সূত্র।
যা-ই হয়ে থাকুক, মোট কথা যাদবরা অনেক সংখ্যায় মরে, এবং বাকিরা ছড়িয়ে পড়ে। এতটাই দূরে দূরে ছড়ায় যে গুজরাট থেকে তারা সুদূর উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং সাম্প্রতিককালে আমাদের বাংলাতেও এসে গেছে। যাদব পদবির লোকেরা এখন সর্বত্র। যদিও, তাদের মধ্যে যাদবীয় বীরত্বের ছিটেফোঁটা দেখা যায় না। একমাত্র গোরু প্রতিপালন করার অভ্যেসটা রয়ে গেছে। এক বিখ্যাত যাদব মন্ত্রী তো গোরুর খাদ্যের দু-নম্বরি করে বিখ্যাত হয়ে গেলেন।
এখানেই এই পর্ব শেষ করছি। এবং কৃষ্ণের মৃত্যুর কথা যখন বলতে শুরু করেছি তখন সেটা দিয়ে এবং আলোচনা দিয়ে এই বই শেষ করব।
