কংসের মৃত্যু ও কৃষ্ণের শিক্ষা

কংসের মৃত্যু ও কৃষ্ণের শিক্ষা

কংস মারা গেছে।

না ঠিক মারা যায়নি, মার্ডার করা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ, ‘উঁচু জায়গা থেকে পতন’। কৃষ্ণ কংসকে মথুরার স্টেডিয়ামে কংসের স্পেশাল গ্যালারি থেকে নীচে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলেছে।

না দাদা, পিছনের পর্বগুলো ঘেঁটে লাভ নেই, আমি ইচ্ছে করে ওই পুরো এপিসোডটা এক লাফে পার করেছি। কোনটা? ওই কংসের ভাড়াটে গুন্ডাদের মারার পর, কংস সরাসরি কৃষ্ণকে মারার জন্য মথুরায় আমন্ত্রণ করে, সেই ইনভিটেশন কার্ড নিয়ে গিয়ে অক্রুর একেবারে রথে বগলদাবা করে কৃষ্ণ আর বলরামকে নিয়ে আসে, তারপর মথুরায় ঢুকে কিছু চমৎকারি কার্যকলাপ করে আর একটা হাতি সমেত কিছু পালোয়ানকে দুদিন ধরে চটকে-পটকে শেষে কংসের ঘাড় মটকে দেওয়ার পুরো পর্বটাই আমি বাদ দিলাম।

কেন?

কারণ, এটা আমি ‘ফাজিলের মহাভারতে’ লিখেছি। একই জিনিস দুই জায়গায় দুইভাবে লেখা যায় না, আর ওখান থেকে ফুল কপি করে পেস্ট করলে আপনারাই হাঁ হাঁ করে তেড়ে আসবেন, যে “এ কী, লেখার আয়তন বৃদ্ধি করতে লেখক পুরোনো জিনিস নতুন মোড়কে দিচ্ছেন।”

মোটকথা কংস শেষ, ল্যাঠা চুকে গেছে। মথুরাবাসী হই হই করে উঠল আনন্দে। স্বেচ্ছাচারী রাজার পতন হয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার দেখুন, কংস যদি এতটাই অত্যাচারী ছিল, তাহলে দেশের লোক কিন্তু বিপ্লব ঘোষণা করে তাকে সরানোর চেষ্টা করেনি। তারা অপেক্ষা করছিল কবে ভগবানের অবতার এসে তাকে মারবে। এর একটা কারণ বোধহয় কংসের কাছে প্রভুর ভাড়া করা রাক্ষস আর পালোয়ান ছিল, তাই হয়তো কেউ সাহস করেনি। একেবারে হিন্দি সিনেমার ভিলেনের মতন বা এখনকার নেতাদের মতন গুন্ডা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকত।

যা-ই হোক কংসের মৃত্যুর পর আর লোকজনের আনন্দ করার পর, কৃষ্ণ বোধহয় আসল ব্যাপারটার গভীরতা বুঝতে পারে। লোকজনের আর কি? পরের বাড়ির কেচ্ছা মারামারি দেখলে আনন্দ তো করবেই। ঘটনা তো ঘটল কৃষ্ণের নিজের বংশে আর বাড়িতে। হাজার হোক, হাজার মতো খাজা কংস রাজা আসলে তো কৃষ্ণের নিজের মামা ছিল। সুতরাং মাতুলকে হত্যার দায় অবশ্যই কৃষ্ণের ঘাড়ে চাপল। কংস মরতেই তার রানিরা এসে কান্নাকাটি শুরু করল, এমনকি কংসের মা-বাবা পর্যন্ত এসে কাঁদতে লাগল। সন্তান যতই অত্যাচারী হোক, তার মৃত্যু দেখলে যে-কোনও বাবাই কাঁদবে। এই জায়গাটা নোট করে রাখুন। কংসের মায়ের বেঁচে থাকাকালীন কংসের মার্ডার হয়েছিল। আপনারা গান্ধারীর কথা বলেন? প্রশ্ন জাগে, যেদিন কংস মারা যায় সেদিন কি কংসের মায়ের মন থেকেও কোনো অভিশাপ কৃষ্ণের প্রতি বর্ষণ হয়নি? লীলা, ভগবান এসব বিষয় সরিয়ে রেখে ভাবুন, কংসকে একেবারে প্রাণে মেরে ফেলতে হল কেন? ভুল করে মেরে ফেলেছিল? পঙ্গু করে বন্দি করা যেত না? এর উত্তর পরে অনুসন্ধান করব যখন কৃষ্ণের রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে আলোচনা করব তখন। কিন্তু আমাদের এই প্রশ্ন উগ্রসেন করেছিল।

কংসের বাবা উগ্রসেন বলল, “বাবা কৃষ্ণ, তুই কংসের হাত পা ভেঙে দিতিস ঠিক আছে, একেবারে প্রাণে মেরে ফেললি?”

কৃষ্ণ এখানে গোটা একটা চ্যাপ্টার ধরে উগ্রসেনকে যা যা বোঝায় তার সারমর্ম করে এক লাইনে যদি লেখা হয় তাহলে মানে দাঁড়ায়, “অত্যাচারীর শাস্তি হওয়াই উচিত এবং আমি মামাকে সেই শাস্তি দিয়েছি। এন্ড অফ ডিসকাশন।”

ভাবুন একবার, একজন মানুষ তার সন্তান হারিয়েছে, সেই সন্তান যতই কুলাঙ্গার হোক, অত্যাচারী হোক, তার মৃত্যুর পরে তার বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ার সাথে এটা বলা হচ্ছে যে তোমার ছেলে পাপী ছিল তাই মরেছে। এখানে অনেকগুলো প্রশ্ন চলে আসে। আর প্রশ্ন করা তো আমার স্বভাব। তাই প্রশ্ন আমি করবই।

প্রথম প্রশ্ন আসে, কংস নাহয় দেবকীর ছ’টা সন্তানকে মেরেছিল আর কৃষ্ণকে মারতে গাদাখানেক রাক্ষস পাঠিয়েছিল, কিন্তু সেটা তো পারিবারিক ব্যাপার। মোগলদের ইতিহাস পড়ুন, এরকম সিংহাসনের লোভে গুচ্ছের গুচ্ছের আত্মীয়দের ধরে ধরে মোগলাই পরোটা করে দেওয়ার ঘটনা আকছার পাবেন। কিন্তু মোগল রাজাদের ইতিহাস (ভাড়া করা ঐতিহাসিকদের দ্বারা লিখিত ইতিহাস) সুশাসক হিসেবে মনে রেখেছে। তাহলে প্রশ্ন আসে কংস, একজন শাসক হিসেবে কেমন ছিল?

আপনি যত পারেন পুরাণ আর বই পড়ে ফেলুন, একটাই লাইন পাবেন। কংস অত্যাচারী রাজা ছিল। কেন? কারণ সে তার বাবাকে সরিয়ে নিজে রাজা হয়েছিল। এছাড়া কংসের দোষ কী ছিল? একজন শাসক হিসেবে? পুরাণ বলে কংস অসুর আর রাক্ষসদের সাথে বেশি বন্ধুত্ব করে ফেলেছিল। তার ফলে তাদের রাজত্ব বিস্তার শুরু হয়েছিল।

এবার আমরা পুরাণ থেকে একটু সরে কংসের বন্ধু ও সঙ্গের মানুষগুলোর দিকে দেখি। আমি কোনোভাবেই কংসকে চূড়ান্ত ভদ্রলোক প্রমাণ করার চেষ্টা করব না। আমি শুধু লজিক দিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক চিত্রটা ভাবব। কংস ছিল মথুরার রাজা। এখনকার উত্তর প্রদেশের আগ্রার নিকটবর্তী শহর হল মথুরা। কংস কাদের সাথে বন্ধুত্ব করেছিল? শোণিতপুরের (বর্তমান সময়ের তেজপুর আসামের) রাজা বাণাসুর আর প্রাগজ্যোতিষপুরের (বাকি আসামটা প্রায়) রাজা নরকাসুরের সাথে। আর কংসের শ্বশুর ছিল জরাসন্ধ, মগধের রাজা। এই বন্ধুবৃত্তের সকলের কথাতেই আমি আসব একে একে। কিন্তু ভেবে দেখুন আগ্রার কাছে একটা রাজা পাটনার (মগধ) রাজার মেয়েদের বিয়ে করে একেবারে আসামের রাজাদের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলল। কতটা মিশুকে লোক এবং রাজা হিসেবে সফল ছিল।

আমরা ক্রমে দেখব তৎকালীন পূর্ব ভারতের রাজা পৌণ্ড্রক বাসুদেব, মণিপুরের রাজপরিবার, সুহ্মদেশের রাজাদের কীভাবে কৃষ্ণ নিজে অথবা পাণ্ডবদের দ্বারা আর্য সমাজের অন্তর্বর্তী করে এনেছিল। যদিও খুব কম সময়ের জন্য। কিন্তু শুধু পূর্বদেশের বন্ধুত্বের জন্যই কি কংস পাপী হয়ে গেছিল? কংস নিজের রাজত্ব কীরকম ভাবে চালাত?

এইখানে পুরাণ একদম মুখে আঙুল দিয়ে রেখেছে। স্পিকটি নট। কিন্তু আমি কয়েকটা ঘটনা বলব যাতে আমার মনে হয় যে কংস যতই ‘ঘর জ্বালানী’ হোক, রাজা হিসেবে সে ‘পর ভুলানী’ ছিল। কীরকম? প্রথম প্রশ্ন জাগে যে যখন ইন্দ্র নিজের সাইক্লোন আর আম্ফান দিয়ে বৃন্দাবন ভাসিয়ে দিচ্ছিল, এবং কৃষ্ণ সবাইকে নিয়ে বৃন্দাবনের পশ্চিমে তেরো কিলোমিটার দূরে গোবর্ধন পর্বতকে খেলনার মতন তুলে ছাতার মতন ধরেছিল, তখন বৃন্দাবন থেকে মাত্র আট দশ কিলোমিটার দক্ষিণে মথুরা শহরে কিছুই ঘটেনি? একেবারে শুকনো ছিল? একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটল আর মথুরায় একেবারে সবাই ঝিঙ্গালালা ছিল? তাহলে বলতে হবে ইন্দ্র নিজের কাজে বেশ পারদর্শী ছিল। একেবারে টিপ করে বৃন্দাবনেই স্টকের সমস্ত জল ঢেলে দিয়েছিল।

নাকি মথুরাতেও প্রচুর জল ঢুকেছিল এবং কংস নিজের শহরবাসীদের সুরক্ষা প্রদান করেছিল? এর উত্তর জানা যায় না। পুরাণকার বৃন্দাবনের লোকেদের আর গোরুদের দুঃখ লিখতে লিখতে মথুরার লোকগুলোর কথা লিখতে ভুলে গেছে। অথবা কংসও হয়তো মথুরার লোকেদের নিয়ে ওই পর্বত ছাতার তলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাংসারিক ও পারিবারিক ঝামেলা নিজের জায়গায়, বিপদে পড়লে বাঁচা নিজের জায়গায়। জল যে শুধু বৃন্দাবন আর মথুরায় না ঢুকে পুরাণকারের লেখাতেও ঢুকে গেছে সেটা এখানে প্রমাণিত হয়। অবাক লাগে ভাবতে যে, যে ব্যাসদেব তার বংশের লোকেদের কোনো রেয়াত না করে অকপটে সবার দোষ-ভুল সুচারুভাবে লিখে ইতিহাস রচনা করে গেছে, সেই ব্যাসদেবও হরিবংশ লেখার সময়ে এইসব ভৌগলিক ব্যাপারকে শুধুমাত্র একটা আঙ্গিকে দেখিয়ে ভোগে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

কংসের রাজ্যচালনার ক্ষমতা নিয়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন জাগে যে তার সাথে কুরুরাজের সম্পর্ক কেমন ছিল? কংস যখন দেবকীর ছেলেদের ধরে চালান করছে, তখন হিসেব বলছে ওইদিকে কুন্তী, মাদ্রী আর গান্ধারীর সন্তান পুঞ্জীভূত হচ্ছে। কৃষ্ণ আর অর্জুন সমবয়সি ছিল, তার মানে ভীম, দুর্যোধন আর বলরাম এক বয়সি (অথবা কাছাকাছি বয়সি) ছিল। নেহাৎ বলরামের কুস্তিতে এম বি এ করা ছিল বলে দুজনের গুরু হয়েছিল। তার মানে দেবকীর ষষ্ঠ সন্তান আর যুধিষ্ঠির এক বয়সি। তার মানে ধরে নেওয়া যায় যখন কংস রাজত্ব করছিল তখন কুরুবংশের গদিতে বেশিরভাগ সময়ে ধৃতরাষ্ট্র বসেছিল। তার মানে পিছন থেকে ভীষ্মই রাজত্ব চালাচ্ছিল। কংস যদি সেরকমই অত্যাচারী হত, আর রাক্ষসসম পূর্বদিকের রাজাদের সাথে বন্ধুত্ব করে অপশাসন করছিল, তাহলে লজিক বলে যে কুরুদের হয়ে ভীষ্মই কংসকে পিটিয়ে আসত।

কিন্তু সেরকমটা হয়নি। অর্থাৎ কংস ঠিক সময়ে খাজনা-টাজনা দিয়ে অথবা যে কোনোভাবে হোক কুরুদের সাথে বেশ ভালো একটা সম্পর্ক করে রেখেছিল। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দুইভাবেই। তাহলে কংস কি নাগরিকদের উপরে অত্যাচার করেছিল? বেশি ট্যাক্স? কিন্তু মথুরা আর বৃন্দাবনের লোকেদের জীবনশৈলী দেখলে তো কোনোভাবে মনে হয় না তারা কষ্টে ছিল। দিব্যি নেচে গেয়ে ননী ছড়িয়ে, ফুল ছিটিয়ে আনন্দে থাকত। পুরাণকার কি দু-এক লাইনে তাদের ঘোরতর সংকট লিখে যেতে পারেননি ? লোকে খেতে পেত না, কংসের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই সেনা এসে তাকে মেরেধরে তার ঘর লুটপাট করছে, টোলে আশ্রমে পড়াশোনা বন্ধ, খালি ‘হোক আন্দোলন’ চলছে, মানুষজন রাজার পয়সায় নিষ্কর্মা হয়ে মদিরা পান করে ক্লাবে ক্যারাম খেলছে আর ঘরে বউ পেটাচ্ছে, রাস্তার হাল খারাপ, বিষাক্ত এক রোগের নিরাময়ের নামে মানুষের কাছে ধনরাশি নিয়ে পুরোটাই মেরে দেওয়া ও চুপ করে থাকা… এসব বা এরকম কিছু লিখলেও মানতাম যে হ্যাঁ, কংস হেব্বি অত্যাচারী ছিল।

কিন্তু কিছুই লেখা নেই। পৌরাণিক ঘটনাগুলো যেভাবে লেখা থাকে তাতে বেশ মজা লাগে জানেন। আমার মনে হয় পুরাণ লেখার আগে চরিত্রসকলদের নামে এক একটা কার্ড বানানো হত, আর তার উপরে ঋষি মুনিরা লাল রঙের স্ট্যাম্প দিয়ে দাগিয়ে দিত দুরকমভাবে। ‘অত্যাচারী/খারাপ’ আর ‘ভালো’। ব্যস্, বেশিরভাগ চরিত্রদের এভাবে দাগিয়ে দাও। কেউ প্রশ্ন করতে এলেই দুটো শ্লোক ঝেড়ে দাও। আর আমাকে যদি একদম সরাসরি বলতে বলেন তাহলে আমি বলব, হ্যাঁ, কংস পাপ করেছে। শিশুদের হত্যা করা পাপ, বোন, জামাইবাবু আর বাবাকে বন্দি (কারাগারে বা গৃহে) করা পাপ, অতগুলো রাক্ষস পাঠিয়ে কৃষ্ণকে মারতে চাওয়া পাপ। কিন্তু তার সাথে এটাও বলব যে তাহলে কৃষ্ণও মাসির ছেলে শিশুপালকে মেরে পাপ করেছে, বলরাম রুক্মীকে মেরে পাপ করেছে, সবকিছু জেনেও কৃষ্ণ উপপাণ্ডবদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পাপ করেছে।

আসলে কি জানেন? এইক্ষণ থেকে আমার বাকি লেখাটায় আমি আর কৃষ্ণকে ‘ভগবান কৃষ্ণ’ রূপে লিখব না। সেরকম লিখলে সবাইকে অযথা লজিকছাড়া পাপী ঘোষণা করে কৃষ্ণের হাতে মেরে ফেললেই হবে। আমি যে কৃষ্ণের কথা লিখব সে হল ‘রাজা কৃষ্ণ’, ‘যাদব দলপতি কৃষ্ণ’, ‘রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কৃষ্ণ’। যদি মেনে নিতে পারেন তাহলে বাকি লেখা পড়বেন, না হলে এই বই এখানেই রেখে দিন। ওই কৃষ্ণপ্রেমের ভগবান কৃষ্ণ আমার মাথায় থাকুন, আমি তাকে পুজ্য আসনে বসিয়ে রাখি। কিন্তু এই রাজা কৃষ্ণকে আমি শুধুমাত্র একজন ক্ষুরধারবুদ্ধিসম্পন্ন রাজন্য ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারব না। এবং সেই কারণেই সবকিছুর শেষে আমি জানাব কেন রাজা কৃষ্ণ এরকমভাবে প্রচুর রাজাদের ‘পাপী’, ‘রাক্ষস’ ইত্যাদী আখ্যা দিয়ে হত্যা করেছিল। কী সেই উদ্দেশ্য? পরবর্তী কোনো এক পর্বে এই নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হবে। আপাতত গল্পে ফিরি।

কংসকে মেরে কৃষ্ণ কিন্তু নিজে রাজা হল না। তার সোজাসুজি কারণ হল উগ্রসেন তার মায়ের বাবা ছিল, আর রাজত্ব প্রায় নিরানব্বই শতাংশ সময়ে ছেলের দিকে যেত। যেহেতু উগ্রসেন তখনও বেঁচে (এবং বেশ অনেকদিনই বেঁচে ছিল), তাই কৃষ্ণ লজিকাল কারণ মেনে উগ্রসেনকেই ফের রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠ করে দিল। দ্বিতীয় কারণ হল কৃষ্ণ বলরাম যতই বিচার বুদ্ধি ও শক্তি দেখাক না কেন, আসলে তো দুজনে এগারো বারো বছরের শিশু ছিল। আর সত্যি কথা বলতে দুই ভাইয়ের সেরকম শিক্ষা-দীক্ষাও হয়নি। এতদিন স্রেফ গোরু চরিয়ে আর মাঠে ঘাটে ঘুরে ঘুরে রাক্ষস মেরে কাটিয়েছে।

তাই এবারে কংসের মার্ডার কেস যখন মোটামুটি মথুরা, বৃন্দাবন আর আশেপাশের লোকজন বেশ ভালো চোখেই দেখে আর হল্লাহাটি করেনি, তখন ঠিক হল কৃষ্ণ আর বলরামকে এবার একটু ডিগ্রি শিক্ষা দেওয়া দরকার। তাই দুই ভাইকে ধনুর্বেদ আর অন্যান্য বেদের শিক্ষা নিতে সটান কাশীর অবন্তীতে সন্দীপনি ঋষির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হল। কেন? ঘরের কাছে এত ভালো ‘দ্রোণাচার্য স্কুল অফ ওয়ারফেয়ার’ থাকতে এতদূরে কেন পাঠানো হল? মথুরার রাজা উগ্রসেনের ভালোই নামডাক ছিল নিশ্চয়, পাণ্ডবদের আর কৌরবদের সাথে ওখানেই ভর্তি করে দিলে হত। হয়তো কৃষ্ণ আর বলরাম ওখানে ভর্তি হলে পাণ্ডবদের, বিশেষ করে অর্জুনের অহঙ্কারে কীটনাশক ছড়িয়ে দেওয়া হত, তাই কৃষ্ণ বলরামকে একেবারে কাশীবাসী করিয়ে ছাড়ল। এত তাড়াতাড়ি মহাভারতে এন্ট্রি নেবে কৃষ্ণ? আবার এমনও হতে পারে যে বছরের মাঝে অ্যাডমিশন নিত না দ্রোণাচার্য। ভদ্রলোকের অনেক নখরা ছিল, একে শেখাব না, ওকে ওটা বলব না, ও কেন এটা বলেছিল? সে কেন ওখানে গেল? ভীষণ হিংসুটে লোক। আবার এটাও একটা কারণ হতে পারে যে কৃষ্ণের কাকার ছেলে একলব্যের ওরকম আঙুল কাটা হতে দেখে, যাদবরা আর কেউ সাহস করে দ্রোণের কাছে এগোয়ইনি। বলা যায় না দ্রোণের স্কুলে ভর্তি হয়ে কোনো যাদববংশীয় জানতে পারল যে আসলে তার বাবা তাকে একটা অন্য এবং বন্য জাতির লীডারের ছেলে বলে ঘোষণা করেছে। দ্রোণ এসে সঙ্গে সঙ্গে অর্জুনের কম্পিটিশনকে গোড়া থেকে ছেঁটে ফেলার জন্য ছেলেটির কোন অঙ্গ কেটে ফেলল।

তার থেকে কাশীই ভালো। মোটামুটি সন্দীপনি ঋষির কোচিং ক্লাসে কৃষ্ণ-বলরাম ভর্তি হয়েই চৌষট্টি দিনের মধ্যে ফটাফট সব শিখে ফেলল। একেবারে দশ বছরের কোর্স ক্র্যাশ করে ক্র্যাশ কোর্স করে ফেলল। কী অবাক কাণ্ড! অবশ্য এটা দেখে আমি বিন্দুমাত্র অবাক হচ্ছি না। আপনি পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে যান, এবং প্রত্যেক সেমেস্টারের ছ-মাসের কোর্সগুলো কেটে দু’মাস করে দিন। দেখবেন আমাদের এখানে প্রতিভাবান ছেলেপুলেরা কীরকম নিমেষে প্রত্যেক দু-মাসে স্রেফ জেরক্স আর ম্যাট্রিক্সের সাহায্যে ষোলো মাসে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বেরিয়ে আসে। বিশ্বাস হচ্ছে না? যে-কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছাত্রকে জিজ্ঞেস করুন (র‍্যাঙ্ক করা প্রথম পাঁচজনের মধ্যে থাকা ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করবেন না, ওরা বলতে পারবে না)। প্রতিটা সেমেস্টারের প্রথম একমাস যায় সিলেবাস বুঝতে এবং খুঁজতে। মাঝের দেড়মাস যায় শুধু লাইব্রেরী থেকে বই খুঁজতে আর নোট এক জায়গায় করতে। তারই মাঝে দেড় দু-মাস ফেস্ট, সোশ্যাল, নবীনবরণ, জুনিয়রদের মধ্যে একটি আজন্মকাল টিকে যাওয়া (মানে ছ-মাসের) প্রেমিকা খোঁজা, এবং সিনিয়ারদের মধ্যে একটি (গর্দভ) প্রেমিক খোঁজা এসব করতেই কেটে যায়। বাকি যে দেড় দু-মাস পড়ে থাকে সেটাতেই হয় আসল পড়াশোনা। অর্থাৎ কোনোমতে সবকিছু মুখস্থ, কণ্ঠস্থ, হস্তস্থ (হাতের উপরে ক্ষুদ্র করে লেখা বিপদে সাহায্যকারী নোটস) এবং উদরস্থ করে সবকিছু পরীক্ষার হলে হড়হড় করে বমি করে দিয়ে সেমেস্টার পাশ হয়ে যাওয়া। তার পরের দিন থেকে পুরোনো ম্যাট্রিক্স বই পত্র বেচে দিয়ে আবার পরের সেমেস্টার শুরু। আমি বলছি না এটা খারাপ, আমাদের ঝাঁ চকচকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর ভিতরের কাঠামোগুলো কতটা হতদরিদ্র এবং কী হারে এরা কাঁড়ি কাঁড়ি পয়সা নিয়ে ছাত্রদের হাতে কলেজের স্টিকার মারা একটা করে ল্যাপটপ ধরিয়ে দিনের পর দিন ঠকিয়ে যাচ্ছে, সেটা যারা পড়ছে তাদের থেকে ভালো কেউ জানেনা। আমাদের রাজ্যে একশোটার বেশী কলেজ থাকতেও কেন দশটা কলেজেই সবাই ছুটে যাচ্ছে, সেটা হয় অভিভাবকরা বোঝেননা অথবা শুধুমাত্র ‘আমার ছেলে/ মেয়ে ইঞ্জিনীয়ার’ বলার গৌরব পাওয়ার জন্য তারা ছেলে মেয়েকে এরকম বিষদুগ্ধপয়োমুখমমার্কা কলেজে পড়াচ্ছেন। বড় করুণ অবস্থা।

কিন্তু গল্প থেকে সরে গেছি। কৃষ্ণ আর বলরাম ছিল শ্রুতিধর। না শ্ৰুতি নামে কাউকে ধরতে যায়নি, শ্রুতিধর মানে হল যার একবার কোনো জিনিস শুনলেই মনে থাকে। এবং তাই চৌষট্টি দিনে সব শিখে ফেলল। শিক্ষা শেষ, তাই কৃষ্ণ-বলরাম বলল, “আপনি কি গুরুদক্ষিণা চান বলুন গুরুদেব?”

তখনকার দিনে ওরকম ফিক্সড রেটে মাস্টারমশাই ছিল না, অথবা ‘আগে ফীস ভরো তারপর ক্লাস করো’ এই পন্থাও ছিল না। আগে শিক্ষা দেওয়া হত, তারপর শিক্ষার্থী নিজের ইচ্ছেমতন অথবা গুরুর ইচ্ছেমতন দক্ষিণা দিত। গুরুও ছাত্রের অবস্থা বিবেচনা করে চাইত। এবং আরও একটা ব্যাপার। তখনকার দিনে ছাত্ররা গুরুর আশ্রমে গিয়ে সেখানে থেকে পড়াশোনা করত। তার পরিবর্তে জঙ্গল থেকে কাঠ কাটা, জমিতে চাষ করা, ভিক্ষে করে বা দানের খাদ্য নিয়ে আসা, পশু পালন, আশ্রম পরিষ্কার করা সব শিখত। শুধু চারটে বেদের শ্লোক শিখে হুড়ুমদুড়ুম করে যজ্ঞ করলেই হত না। ভোর থেকে উঠে রীতিমতন মিলিটারি ট্রেনিং চলত। আমার মনে হয় এই সিস্টেম থেকেই স্কুল কলেজে হোস্টেল সিস্টেম শুরু হয়েছে। কিন্তু এখন হোস্টেল থেকে ওটা হোটেল সিস্টেম হয়ে গেছে। যা খুশি করা যায়, স্রেফ কাজ করতে হয় না। মেয়েদের হোস্টেলে তাও বোধহয় এখনও সেই তপোবন বা আশ্রমের মতন সিস্টেম আছে। ন্যূনতমভাবে তারা হোস্টেল, নিজেদের খাট, আলমারি সব সাজিয়ে রাখার চেষ্টা করে। হোস্টেল দেখতে হলে ছেলেদের হোস্টেলে যান। বিশেষ করে সন্ধেবেলার পরে। ওটা হোস্টেল না মদ্যপশালা (বার) বুঝতেই পারবেন না। সস্তা হিন্দি ভূতের সিনেমার মতন ঢুকেই আপনি একগাদা ধোঁয়ার সামনে পড়বেন। সঙ্গে গান। তারপরে চারিদিকে যেখানে সেখানে অর্ধ ও খালি মদিরার বোতল পাবেন। তারই মাঝে একজন ‘না-বালক না-পুরুষকে’ একটি অন্তর্বাস পরে অধরে ধূমায়িত বিড়ি (মাসের শুরুতে সিগারেট) ফুঁকে নৃত্য করতে দেখবেন। ধোঁয়ার মাঝেই আরও গুটিকয় সমবয়সি (বা বয়সে বড় কিন্তু হোস্টেলের মায়া ও কলেজের ছায়া ত্যাগ করতে পারেনি এরকম) পুরুষকে একই পরিধানে আবিষ্কার করবেন। ধোঁয়ার মাঝেই বসে এরা ধূমপান করে। এবং… এটা সবথেকে দরকারি ব্যাপার… ঘরের মধ্যে প্রায় সর্বত্র আপনি ব্যবহৃত জামাকাপড় পাবেন। ছেলেদের মন বড় উদার হয়। এরকম ধূম্রপরিবেষ্টিত মদিরাবাসিত হোস্টেলে বালকেরা জানে না কোনটা কার জামা, কার প্যান্ট, এমনকি কার কতদিনের ব্যবহৃত অন্তর্বাস। যেটা যার ফিট হয় পরে ফেলে। গন্ধ ছাড়লে সুগন্ধী ছড়িয়ে পরে নাও। সুগন্ধী না থাকলে আরশোলা মারার স্প্রে বা রুম ফ্রেশনারও চলে। সব পারমিউটেশন কম্বিনেশন।

কিন্তু হোস্টেলের ভাড়ার কথা বলুন, নোংরাস্য নোংরা শৌচালয় পরিষ্কার রাখার কথা বলুন, নিজেদের একটু পরিষ্কার রাখার কথা বলুন, রোজ রান্নার কথা বলুন (পিকনিক ছাড়া) তখন বেশিরভাগ এইরকম হোস্টেলের বালকেরা একেবারে করুণ হয়ে পড়ে। এইজন্য, এবং শুধুমাত্র এইজন্য পুরোনো তপোবন টাইপ সিস্টেম ফিরে আসা উচিত। থাকুক না আরুণির মতো আল ধরে শুয়ে অথবা উতঙ্কের মতো রাক্ষসের কাছে গিয়ে ল্যাজে-গোবরে হতে, তখন বোঝা যাবে সবার দৌড়।

এদিকে কৃষ্ণ-বলরামের গুরুদক্ষিণা দেওয়ার কথা শুনে সন্দীপনি ঋষি বলল, “আমার একটা ছেলে ছিল। তাকে নিয়ে আমি গরমের ছুটিতে প্রভাস সাগরের তীরে বেড়াতে গেছিলাম। সেখানে আমার ছেলেকে একটা তিমি মাছে খেয়েছে। সেই ছেলেকে ফিরিয়ে এনে দাও…”

তিনটে প্রশ্ন আসে এখানে। তিমি মাছ কি ডাঙায় উঠে মানুষ খায়? সে তো গভীর সমুদ্রে থাকে। তাহলে সন্দীপনি ঋষি ছেলেকে নিয়ে গভীর সমুদ্রে কী করতে গেছিল? জানা যায় না। দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, সন্দীপন ঋষির এই ছেলেই কি পরবর্তীকালে ‘পিনোক্কিও’ নামে বিখ্যাত হয়? না মানে একইরকম গল্প কিনা, দুজনেই তিমি মাছের পেটে গেছিল। তৃতীয় প্রশ্ন হল, তিমি মাছ মানুষ গিলতে পারে না। তাদের গলা দিয়ে মানুষ যাবে না। গোটাগুটি না খেলে সেই ছেলে বেঁচে ছিল কী করে? এটা আরও বড় প্রশ্ন, ঋষিপুত্র অতদিন তিমির পেটে বেঁচে ছিল কী করে? কতদিন আগে গিলেছে? তিমির পৌষ্টিকতন্ত্রে গোলমাল ছিল? এত সব প্রশ্নের দুটোই সম্ভাব্য উত্তর আসে। এক, সন্দীপন ঋষির ছেলেকে কোনো ‘তিমি’ নামক জলদস্যুর গ্যাং ঠ্যাং ধরে কিডন্যাপ করেছিল সমুদ্রে। দুই, ওটা তিমি না, একটা সাবমেরিন ছিল।

যা-ই হোক, গুরুদেব দক্ষিণা চেয়েছেন, কৃষ্ণ আর বলরাম “এই যাচ্ছি আর নিয়ে আসছি” বলে চলল প্রভাস সমুদ্রে। অর্থাৎ দুই ভাইয়ে আগ্রার কাছে মথুরা থেকে কাশীতে পড়াশোনা করে ফের গুজরাটে সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে গিয়ে সমুদ্রে গুরুদেবের বহুদিন আগের তিমিমাছে গেলা ছেলেকে আনতে গেল। কথায় কথায় এরকম ভারতের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত কী করে যেত কে জানে। রথে গেলেও তো তার একটা নির্দিষ্ট গতি আছে। রথ তো আর রাজধানী এক্সপ্রেসের মতন ছোটে না। মোটকথা প্রভাস সমুদ্রে বাহুবলী কৃষ্ণ আর বলরাম পৌঁছেই সী বীচে দাঁড়িয়ে বলল, “আরে ও সমুদ্রদেব, কই গেলে?”

সমুদ্রদেব শুনতে পেয়ে একটু গড়িমসি করে আসছিল, কৃষ্ণ বলল, “আগের বারে তোমায় শুকিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলাম। এবারে কি সত্যিই শুকিয়ে দেব নাকি বলো?”

সমুদ্রদেবের হয়েছে যত জ্বালা। রামচন্দ্র এসে বলে ‘শান্ত হও নয়তো শুকিয়ে দেব’, ব্রহ্মা বলে ‘শান্ত হও’ তারপরে অভিশাপ ঠুকে দেয়, মাঝে আবার অগস্ত্য এসে চো চো করে সমুদ্রদেবকে গিলেই ফেলল, আবার এখন কৃষ্ণ এসে হাঁকডাক করছে। মানে ম্যানেজমেন্টের তলার দিকের দেবতা হলে যা হয়, ঊর্ধ্বতন দেবতা, অবতার, ঋষিরা এসে যখন তখন চাকরি কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।

সমুদ্রদেব ঝট করে কৃষ্ণের সামনে এসে হাতজোড় করে বলল, “এসে গেছি, চাপ নেই। আজকে এদিকে? কী ব্যাপার স্যার?”

কৃষ্ণ বলল, “আমার গুরুর ছেলেকে তোমার মধ্যে থাকা একটা তিমি খেয়েছে। বলো, সে কোথায় এখন?”

আচ্ছা সমুদ্রদেব কি একটা বিশাল খাতায় লিখে রাখত যে তার মধ্যে কে কাকে কোথায় খেয়ে রেখেছে? আর্যদের সমুদ্রের ব্যাপারে আইডিয়া কম ছিল। ওদের যত ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই স্থলভাগে ছিল। সমুদ্র বললেই অবস্থা খারাপ হয়ে যেত। এমনকি প্রথম দিকে রচনা করা বেদে সমুদ্র পার করা পাপ বলে গণ্য হত। সমুদ্র পার করলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হত। এটার কারণ আর কিছুই না, নিজেরা নৌ-চালনায় একেবারেই পারদর্শী ছিল না, তাই নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে এইসব পাপের বিধান দেওয়া। মনে রাখবেন রামচন্দ্রের নিজের কিন্তু ক্ষমতা হয়নি একা সমুদ্র পার করে গিয়ে রাবণকে কেলিয়ে আসার। সেই বাঁদরদের (সম্ভবত দক্ষিণ ভারতীয় উপকূল অধিবাসী ইঞ্জিনিয়ার নল ও নীল) সাহায্য নিয়েই সমুদ্র পেরিয়েছিল। আর আসার সময় উড়ে ফিরেছিল। এই একবার সমুদ্র পারের ঘটনা লিখেই পুরাণকার এবং নিয়ম বানানোর জজসাহেব ব্রাহ্মণরা ফ্যাসাদে পড়ে। এবারে কী হবে? ভগবানের অবতার নিজেই যে সমুদ্র পেরিয়ে বিদেশ-বিভুঁই ঘুরে এল। তখন নিয়ম পালটানো হল আবার। মানে এবারে লেখা হল, সমুদ যাত্রা অতটাও খারাপ জিনিস নয়, কিন্তু খবরদার সমুদ্রের ওইপারে অন্য দেশ আছে ওইসব কথা ভুলে যাও। জম্বুদ্বীপই সব, তার বাইরে সমুদ্র, আর আকাশ। একেবারে ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু।

সমুদ্রদেব নিজের হিসেবের খাতা খুলে পুরোনো এন্ট্রি দেখে বলল, “আজ্ঞে আপনার গুরুর ছেলেকে আসলে তিমি মাছ খায়নি, খেয়েছে পাঞ্চজন্য নামে একটা রাক্ষস। সেই ব্যাটাই তিমির রূপ নিয়েছিল।”

ওই দেখুন, আমি ঠিক ধরেছি। কোথা থেকে রাক্ষস চলে এল। রাক্ষস মানেই রক্ষ জাতি। আর সমুদ্রে আর্যদের অচেনা ‘রাক্ষস’ জাতি মানেই হল জলদস্যু। ব্যাটারা নিশ্চয়

অদ্ভুতদর্শনধারী জাহাজ বা নৌকা নিয়ে এসেছিল। আর্য ঋষি সেটাকে সৈকত থেকে দেখে তিমি মাছ ভেবেছে।

যা-ই হোক, এই রাক্ষসের শুনেই কৃষ্ণ স্কুবা গিয়ার আর অক্সিজেন ট্যাঙ্ক নিয়ে আরব সাগরে ঝাঁপ দিল। সোজা সাঁতরে গিয়ে পাঞ্চজন্য রাক্ষসকে খুঁজে বের করল। রাক্ষসটা কৃষ্ণকে দেখেই নিজের বিশাল শঙ্খের ভিতরে গুলুৎ করে ঢুকে লুকিয়ে পড়ল। তার মানে, গল্প অনুযায়ী, পাঞ্চজন্য একটা অতিকায় সামুদ্রিক শামুক নয়তো হার্মিট কাঁকড়া অথবা অক্টোপাস ছিল। ভারতের এদিকটায় তখন এই জীব দেখা যায়নি, নতুন নতুন বলে ওকে তিমি আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কৃষ্ণ ওই আন্ডারওয়াটারেই আন্ডারটেকারের মতন আন্ডারহ্যান্ড দুটো ঘুসি চালিয়ে শঙ্খের আন্ডার থেকে অণ্ডসমেত পাঞ্চজন্যকে মেরে ফেলল। হুহ… জলের তলায় কালিয়া সাপকে মেরে মাছের কালিয়া বানিয়ে দিয়েছিল, একটা শামুক না অক্টোপাসের কত আর দম থাকবে!

পাঞ্চজন্যকে মেরেধরে কৃষ্ণ তাকে তার শঙ্খ সমেত ডাঙায় তুলে আনে। কিন্তু রাক্ষস তো সেই কোন কালে সন্দীপনের ছেলেকে খেয়েছিল, এতদিন কি পেটের মধ্যে রাখবে? খাদ্য হিসেবেই খেয়েছিল নিশ্চয়, কোন যুগে সেই ছেলে হজম হয়ে গেছে। কৃষ্ণ যে তিমিরে সেই তিমিরেই রইল। তিমি’রে তিমিরে ধরে ঘটনার তিমিরে পৌঁছতে পারল না। রাগের চোটে শঙ্খ থেকে রাক্ষুসে শামুককে আলাদা করে শঙ্খটাই স্যুভেনিয়ার হিসেবে রাখল। ওটাই কৃষ্ণের কপিরাইট করা পাঞ্চজন্য শঙ্খ। কিন্তু রাক্ষসটা যদি তিমি মাছের মতন অতিকায় সাইজের ছিল, তাহলে তার খোল কি সাধারণ শঙ্খের মতন সাইজে হবে? মানে খুব বেশি হলে কত বড় হবে? একটা গামলার সমান? অথবা একটা রান্নাঘরের সমান? যতদূর জানি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৃষ্ণ শঙ্খটাকে সঙ্গে নিয়েই গেছিল। কই সেখানে তো কোথাও অতিকায় শিঙ্গার (শঙ্খ বড় হলে তাকে শিঙ্গা ছাড়া কি বলা যাবে?) কথা লেখা ছিল না। অতবড় শিঙ্গা দেখলে ভীম তাকে শিঙ্গাড়া ভেবে কি একবার খেয়ে দেখত না? একটা তিমি মাছের সাইজে শঙ্খ হলে সেটাই তো কৌরবদের দিকে ছুড়ে মারলে এক অক্ষৌহিনী সেনা ওখানেই শাঁখ চাপা পড়ে আখের মতো নুয়ে যেত। তাহলে গণ্ডগোলটা কোথায় হচ্ছে? রাক্ষসের সাইজ বাড়াবাড়ি করে লিখতে গিয়ে এই কেস? নাকি রাক্ষস মায়াবী ছিল আর নিজেকে ছোট করে শঙ্খের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল? সেটাও হতেই পারে। অথবা কৃষ্ণ ওই তিমিমাছের সাইজের শঙ্খে একবার ফুঁ দিতেই প্রভাস সমুদ্রের প্রবল উচ্ছ্বাস উঠে (হয়তো সেটাতেই অ্যাটলান্টিস ডুবে গেছিল) সব ভাসিয়ে দেওয়াতে শঙ্খকে কেটে আকারে ছোট করে দেয়। হয়তো রাক্ষস একটু প্রতিবাদ করেছিল কিন্তু কৃষ্ণ তাকে “চুপ করো শব্দহীন হও” বলে শঙ্খ ঘষে দিল।

(অত্যন্ত নিম্নমানের এবং যাচ্ছেতাই রকমের মজা করলাম, ক্ষমা করবেন। শঙ্খ ঘোষ স্যারের পদধূলির কণার যোগ্যও নই আমি। এই লাইনে মজা করে আমি একপ্রকার ওনাকেই স্মরণ করলাম। এমনকি পুরো কবিতাটা মনে পড়ছে, এবং সেখানে ওই লাইনটা “ভেঙে পড়ে ঝাউ, বালির উত্থান, ওড়ে ঝড়…” এটাও আমার জঘন্য মস্তিস্কে ওই অতিকায় পাঞ্চজন্যে ফুৎকার দেওয়ার পরবর্তী দৃশ্য বলেই এসেছে। ক্ষমার অযোগ্য আমি….)

যা-ই হোক, পাঞ্চজন্যকে মেরেও সন্দীপনের ছেলেকে না পেয়ে কৃষ্ণ একেবারে সরাসরি যমালয়ে হানা দেয়। গিয়েই যমকে অর্ডার করে বসে, “সন্দীপনের ছেলেকে ছেড়ে দাও!”

“ছেড়ে দেব মানে? আমি কি আটকে রেখেছি নাকি?” যমদেব বলে, “প্রাকৃতিক নিয়মে এখানে এসেছে?”

“কীরকম প্রাকৃতিক নিয়ম?” কৃষ্ণ জিজ্ঞেস করে।

“যেরকমভাবে রবিবারে দোকানের জ্যান্ত মুরগি খাবারের প্লেটে আসার পথে প্রাকৃতিক নিয়মে প্রাণ হারায় সেইভাবে,” যম সপাট বলে।

“আমিই প্রকৃতি,” কৃষ্ণ বলে, “আমি ঠিক করব, কে বাঁচবে কে মরবে।”

“আচ্ছা কনফিউশন তো,” যম বলে, “একবার আপনি এসে বলবেন আপনিই সর্বেসর্বা, একবার মা শক্তি এসে বলবেন তিনিই সব, মাঝে ওঁর হাজব্যান্ড এসেও নিজেকে সবার সেরা বলবেন, আবার কোথা থেকে নচিকেতা বলে একটা ছেলে এসেও বলবে, “আমাকে বাবা তোমার ভোগে পাঠিয়ে দিয়েছে, আমাকে মৃত্যুর পরের অবস্থা শেখাও,” একবার যুধিষ্ঠিরকে সশরীরে নরক দেখাতে হবে, একবার ত্রিশঙ্কুকে যমালয় না দেখিয়েই নিজের স্বর্গ বানিয়ে দেওয়া হবে— বলি, যমালয়ের নিয়ম কি শুধু সাধারণ গরিবগুর্বো মানুষগুলোর জন্যই? আর দেবতা বা দেবতাদের কাছের লোকগুলোর জন্য সবসময় আমাকে নিয়ম ভাঙতে হবে?”

“হ্যাঁ হবে!” কৃষ্ণ রেগে যায়।

“পারব না!” যম সাফ সাফ উত্তর দেয়।

তারপরে আর কী? কৃষ্ণ গিয়ে যমের কর্ণপটাহের তলে কটা ঠাস-ঠাস শব্দ সহকারে চপেটাঘাত করতেই যমের মনে পড়ে যায় দেবতাদের হায়ারার্কি। হায় হায় আর কি? হায়ারার্কি নিয়ে ইয়ার্কি? একটা ডিপার্টমেন্ট হেড হয়ে জেনারেল ম্যানেজারের মুখে মুখে তর্ক করতে গিয়ে জেনারেল ঝাড় শোনার মতন অবস্থা। মার খেয়েই যম বলে, “আরে স্যার, মারপিটের কি দরকার, এই তো সন্দীপনের ছেলে একেবারে সুরক্ষিত ভাবে গচ্ছিত আছে। তার ট্রায়ালও হয়নি। এরকম ভয়াল ছেলে ট্রায়াল কে নেবে? তাকে নরকের দিকে ফিরেও তাকাতে হয়নি, এই দেখুন না, কীরকম দূরবীন দিয়ে দূরে বীণার শব্দে নৃত্যরতা অপ্সরাদের দেখতে পাচ্ছে। নিয়ে যান নিয়ে যান, আহা রে দুধের শিশু…”

কৃষ্ণ সন্দীপনের ছেলের আত্মাকে তার ক্লোন করা শরীরে ভরে একেবারে যেমন রূপে হারিয়েছিল তেমন রূপে তৈরি করে ড্যাং ড্যাং করে গুরুর হাতে এনে দিয়ে বলে,

“ফুল তো হাজার ফোটে শাখায় শাখায় …

তিমির পেটে যাওয়া ছেলে সবাই কি পায়?”

তোমার আশিসে যমকে পেটালাম…

ফাউ হিসেবে একটা শাঁখও পেলাম… এ আমার গুরুদক্ষিণা…”।

এইসব শিক্ষা-দীক্ষা আর রাক্ষস পেটানো হলে, আমার মনে হয় এইসময়েই সেই পাণ্ডুর পোড়া মাংস খাওয়ার কেসটা ঘটে। এটা দক্ষিণী মহাভারতে লেখা আছে। পাণ্ডু যখন মাদ্রীর সাথে ইয়ে করতে গিয়ে মারা যায়, তখন নাকি মারা যাওয়ার আগে তার পঞ্চপুত্রকে বলে গেছিল, “আমার মাংস পুড়িয়ে খেয়ো তোমরা ভাইয়েরা, তবেই আমার মতো জ্ঞান পাবে…”

হ্যাঁ, পাণ্ডুর এত জ্ঞান ছিল যে ছেলেদের ভবিষ্যত আর নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে স্নানরতা মাদ্রীকে দেখে “জো হোগা দেখা জায়েগা” বলে মিলিত হয়ে প্রাণ খুইয়েছিল। ‘হোগা’ আর কি? চিরকাল রোগে ‘ভোগা’ রোগা পাণ্ডু ওখানে ঝান্ডু বাম হয়ে গেল। কিন্তু পাণ্ডুর লাশকে জঙ্গলে পোড়ানোর সময় কোত্থেকে নাকি কৃষ্ণ এসে পোড়া মাংস খেয়ে জ্ঞান লাভ করে। অন্য কোনো পাণ্ডব খেতে রাজি হয় না (স্বাভাবিক কারণেই, বাপের পোড়া মাংস কে খাবে?), কিন্তু সহদেব খেয়ে নেয়, আর তার জন্য কৃষ্ণের কাছে অভিশাপও খায়। সহদেব তাই ত্রিকালজ্ঞ হয়েছিল। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সব জানত। কিন্তু কৃষ্ণ তাকে অভিশাপ দেয় যে, ভবিষ্যতের কথা বললেই তার মাথা ফেটে যাবে।

সেসব অন্য মহাভারতের গল্প। কিন্তু এটা এই সময়ের মনে হল কারণ পাণ্ডু যখন মারা যায় তখন যুধিষ্ঠিরের বয়স আনুমানিক ষোলো, কৃষ্ণ আর অর্জুনের তার মানে ওই চোদ্দর কাছাকাছি।

The Brhad Bhagavatamrta references the Srsti-khanda (48-51) of the Padma Purana describing that after Padmavati’s marriage with Ugrasena she stayed a short time in the house of her father, King Satyaketu. At that time a demonic messenger of Kuvera’s named Drumila (or Gobhila) became attracted to her. He saw Padmavati, as she was bathing. Overcome with lust, he came to her disguised as Ugrasena, and asked for sexual union with her. Thinking that her husband had returned from war, she yielded. That night they became intimate. During coitus, excited Drumila lost his self-control and got into his actual demonic form. However, Padmavati was so attracted to him that she didn’t protest about it. As a result of this illicit love making, Padmavati conceived. She feared that Ugrasen may disown her as she was impregnated by a demon. But Ugrasena accepted her and she gave birth to Drumil’s son Kamsa. Later Padmavati gave birth to four sons of Ugrasena. In fact, Kamsa in his previous birth was a demon called Kalnemi, who was slain by Lord Vishnu.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *