কৃষ্ণের ছেলেপুলেদের কাণ্ড: এক
গল্পে গল্পে আমরা কৃষ্ণের বাল্যকাল থেকে যৌবনকাল ও নানা কেলো হয়ে তার সাংসারিক জীবনে ঢুকে পড়েছিলাম। সংসার বলে সংসার? একেবারে অর্ধেক দ্বারকাই কৃষ্ণের নিজের সংসার হয়ে গেছিল। ভক্তিতত্ত্ব অনুযায়ী এটা ঠিক যে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডই কৃষ্ণের সংসার, কিন্তু মানব অবতার রূপে কৃষ্ণের স্ত্রী-পুত্র সহ সংসার, সত্যিই দ্বারকার পপুলেশনের একটি ভালো অংশ দখল করে রেখেছিল। কৃষ্ণের প্রধান আটটি স্ত্রী ছিল। অষ্টভার্যা। তাদের প্রত্যেকের থেকে কৃষ্ণ দশটি করে সন্তান পেয়েছিল। অর্থাৎ আশিটি পুত্র। অষ্টভার্যার পুত্রের থেকেই অষ্ট ভাজা ভাজা হওয়ার মতন অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কৃষ্ণ সেই ষোলো হাজার কন্যাকেও স্ত্রী হিসেবে দত্তক নিয়েছিল। তাদেরও ছেলেপুলে হয়েছিল নিশ্চয়। আবার সব পুত্র-পুত্ৰী থেকে নাতি-পুতিও হয়েছিল। সব মিলিয়ে কৃষ্ণের এক লক্ষ আশি হাজার সন্তান হয়েছিল সেটা লেখা হয়েছে, কিন্তু সন্ততি যে কত লক্ষ হয়েছিল তা আর ব্যাসদেব লিখে যাননি। সেটা হয়তো হরিবংশের আসল পাণ্ডুলিপির সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু কালের গর্ভে কৃষ্ণভার্যাদের গর্ভজাতরা হারিয়ে গেছে।
রয়ে গেছে শুধু সেই আশিজনের নাম। অষ্টভার্যার আশিটি পুত্রের নাম। সেগুলো বংশতালিকায় জুড়ে দিলাম। তাদের মধ্যে আবার বেশিরভাগের শুধু নামগুলোই লেখা আছে, তাদের কাম নিয়ে একটা কথাও খরচ করা করা হয়নি। কাম অর্থে কার্য। তাদের কামবাসনা নিয়ে আমাদের কাম কী? আপনারা না বড্ড ইয়ে…
আসলে ইতিহাসের মতন পুরাণেও শুধু তাদেরই নামের সাথে আরও দুএকটা কথা লেখা থাকে, যারা কিছু একটা কীর্তি করে যায়। সে কুকীর্তি হোক বা ভালো কীর্তি। বলার মতন কিছু থাকতে হবে। একটা উদাহরণ দিই। ধরুন তিনটে মানুষ আছে। একজন বিজ্ঞানী আজ কৃত্রিম মনুষ্যঅঙ্গ কৃত্রিমভাবে বানানোর উপায় আবিষ্কার করছে। আরেকজন নেতা কিছু একটা কেলেঙ্কারি করে কোটি কোটি টাকা লুটে জেলে গেল। আর তৃতীয় ব্যক্তি সে সারাদিন চাকরি-বাকরি করে, দিনের শেষে চায়ের দোকানে গুলতানি করে রাতে মুলতানি মেখে সুন্দর হওয়া বউয়ের সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। তার সারাটা জীবন এভাবেই চালিয়ে দিল।
এই তিনটে মানুষের মধ্যে ইতিহাস কিন্তু প্রথম দুজনকেই মনে রাখবে। তাদের নিয়েই লেখালেখি হবে। প্রথমজন অর্থাৎ বিজ্ঞানী বিশেষ জ্ঞান প্রয়োগ করে সুকাজ করেছেন। দ্বিতীয়জন নেতা, সেও তার বিশেষ (চুরির) জ্ঞান প্রয়োগ করে কুকার্য করেছেন। কিন্তু তৃতীয়জন কোনো জ্ঞানই কাজে লাগাননি, এবং কোনো উল্লেখযোগ্য কাজই করেননি। চাকরি করাটা বা জীবিকা নির্বাহ করাটা একটা বেসিক ব্যাপার। ওটা উল্লেখ করতে হলে, প্রতিটা মানুষের ব্যাপারেই ইতিহাসে লিখে যেতে হয়। যদিও প্রতিটা মানুষেরই জীবন নিয়ে একটা গল্প আছে, কিন্তু লিপিবদ্ধ ‘ইতিহাস’ সাধারণ ব্যাপার পাত্তাই দেয় না। একটা বেশ মশালাদার কিছু না হলে, চরিত্রদের স্রেফ বছর কুড়ির মধ্যে ভুলিয়ে দেয় ইতিহাস।
সেইভাবেই কৃষ্ণের আশিটি পুত্রের মধ্যে কয়েকজন ছাড়া বাকি সবারই শুধু নাম রয়ে গেছে। কীর্তি নাই। কৃষ্ণের পুত্র হওয়াটাই তাদের কীর্তি। একদিক দিয়ে ভাবলে সেটা সাংঘাতিক জিনিস বটে, কারণ কৃষ্ণের জিন (Gene) বহন করেছে তারা। তাদের দু-একজনের বংশের উত্তরপুরুষের মধ্যে সেই জিন এখনও যে নেই, কে বলতে পারে। দুম করে একদিন কেউ কড়ে আঙুলে পাহাড় তুলে ফেললে, অথবা হাতি নিয়ে লোফালুফি করতে শুরু করলে অবাক হবেন না। জানবেন কৃষ্ণের সেই জিন এতদিনে উঁকি দিয়েছে বংশে।
যা-ই হোক, এই আশিটি পুত্রের মধ্যে দুজনই বেশ ভালো রকমের কীর্তি রেখে গেছে, এবং তাদেরই গল্প বলব এবারে। একজন প্রদ্যুম্ন আর একজন শাম্ব। শাম্বর গল্প পরে বলব, কারণ সেই গল্পের মধ্যে দিয়েই যদুবংশের ধ্বংসের কাহিনি ও কৃষ্ণের দেহত্যাগের গল্প বলব। তাই আগে প্রদ্যুম্নের গল্প বলি। অবতারের কীর্তিমান পুত্র হলে তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা গল্প থাকতে হয়। কৃষ্ণের ছেলে বলে কথা, তাও আবার এমন ছেলে যে একটা কাণ্ড ঘটাবে। সেখানে কি এলেবেলে কোনো আত্মা বা দেবতা জন্ম নিলে হয়? প্রদ্যুম্নের ক্ষেত্রেও তাই একটা গল্প আছে। সেটা বলি।
সেবার সতীমাতা শিবঠাকুরের বারণ না শুনে বাবার যজ্ঞানুষ্ঠানে চলে গেছিলেন। দক্ষযজ্ঞ তখনও আক্ষরিক অর্থে দক্ষযজ্ঞ হয়নি। দক্ষই দক্ষতার সাথে যজ্ঞ করছিল, কিন্তু যজ্ঞে শিবের যোগ্যতা নিয়ে দক্ষের রাগ ছিল। এই রাগের পিছনে আলাদা কারণ ছিল। সেই চন্দ্রদেবের সাথে দক্ষের ঝামেলায় শিবঠাকুর মধ্যস্থতা করেছিল সেই থেকে। তার উপরে দক্ষের আদরের মেয়ে সতীকে শিবঠাকুর বিয়ে করে নিল। দক্ষের তাই রাগ ছিল শিবঠাকুরের উপর, আর তাই যজ্ঞে শিব-সতীকে নেমন্তন্ন করেনি।
কিন্তু সতীমাতা একাই সেই যজ্ঞে গিয়ে দেখেন যজ্ঞে শিবঠাকুরকে তো ডাকা হয়ইনি, উপরন্তু সমস্ত দেবতা এসে বেশ পার্টি করছে। শিবঠাকুরের উদ্দেশ্যে যজ্ঞে অর্ঘ্যও দেওয়া হচ্ছে না। এই নিয়ে কথা কাটাকাটি হতে হতে সতীমাতা এমন রেগে গেলেন যে যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ডেই প্রবেশ করে দেহত্যাগ করলেন। এই খবর টেলিপ্যাথিতে চলে যায় শিবঠাকুরের কাছে। ব্যস আর যায় কোথায় ? শিবঠাকুর নিজের একটা জটা ছিঁড়ে ফেলে দিলেন মাটিতে, আর তার থেকে বীরভদ্র আর ভদ্রকালী জেগে ওঠে। দুজনেই ধ্বংসের স্বরূপ।
আমার সন্দেহ, সতীদেবী নিজেই বোধহয় ভদ্রকালী রূপ নিয়েছিলেন। কালীরূপে শক্তি নিজের পূর্বরূপ ও সকল সম্পর্ক ভুলে যায়। আর পূর্বরূপে ফেরাও চাপের হয়। তাই শিবঠাকুর হয়তো সেভাবেই সতীমাতাকে হারিয়েছিল আর তাই বীরভদ্রকে পাঠায়। যা-ই হোক বীরভদ্র আর ভদ্রকালী দেবী মিলে সবাইকে পিটিয়েপুটিয়ে দক্ষের যজ্ঞ আর যজ্ঞের দক্ষ এক করে দেয়। যজ্ঞের পার্টি এক ধাক্কায় পার্লামেন্টের পার্টি হয়ে যায়। মানে চারিদিকে সবাই বাপ বাপ করে পালাচ্ছে। বীরভদ্র আর ভদ্রকালী দেবী সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। দেবতা আর ঋষিগুলোও ছাড় পায়নি। তাদেরও যথেষ্ট চড়-চাপড় মারা হয়। ঋষিদের দাড়ি উপড়ে ফেলা হয়। কয়েকজন বেধড়ক মার খায়, আর বীরভদ্র একেবারে দক্ষের মুণ্ডুটাই উপড়ে ফেলে।
শিবঠাকুর বেচারা এরমধ্যে সতীমাতার প্রাণহীন দেহ নিয়ে বম-বম করে নৃত্য শুরু করে। পুরাণ বলে সেই নৃত্য চলে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে, কিন্তু আমার মনে হয় বৃহত্তর ভারতের মধ্যেই সেটা হয়েছিল, এবং বেশিরভাগটাই আমাদের পূর্ব ভারতে হয়েছিল। কারণটা বলছি। শিবঠাকুরের সেই নৃত্যের চোটে প্রলয় আগেভাগেই চলে আসছে দেখে, নারায়ণ সুদর্শন চক্র দিয়ে সেই সতীমাতার দেহকে একান্নটা খণ্ড করে ফেলে, যেগুলো জায়গায় জায়গায় পড়ে সতীপীঠ ও শক্তিপীঠ তৈরি হয়। এই একান্নটা শক্তিপীঠ এখন বেড়ে বেড়ে একশো একান্ন হয়ে গেছে যদিও, তবুও আদি লিস্ট ধরে দেখলে দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ শক্তিপীঠ আমাদের পূর্ব ভারতেই। আরে, আমাদের বীরভূমেই ছটা শক্তিপীঠ আছে। তারাপীঠ, ফুল্লরা, কংকালীতলা, নলহাটি, লাভপুর আর বক্রেশ্বর। বিভিন্ন মতামত আছে অবশ্য এই একান্নপীঠ নিয়ে, কিন্তু মোটামুটি এভাবেই একান্ন পীঠ গড়ে ওঠে।
শিবঠাকুর খুব খানিক নৃত্য করে দেখে হাত ফাঁকা। সতীদেবী আর নেই। তারপরে যোগীবরের মেজাজ ঠান্ডা হয়। নারায়ণ আর ব্রহ্মার সাথে গিয়ে শিবঠাকুর দক্ষের কাটা মাথার জায়গায় একটা ছাগলের মাথা বসিয়ে দেয়। দক্ষ বেঁচে ওঠে। তারপর শিবঠাকুর যোগসাধনার জন্য ধ্যানে বসে পড়ে। সেইভাবে থাকে বহু বছর।
এদিকে কালের নিয়মে মা শক্তি জন্ম নেয় হিমালয় কন্যা পার্বতীরূপে। এই পার্বতীর সাথেই শিবঠাকুরের বিয়ে হবে, তবে কার্তিক-গণেশের জন্ম হবে, তবে অনেক ঘটনা এগোবে। পার্বতী মাতা ছোট থেকেই শিবঠাকুরকে পতি হিসেবে পাওয়ার জন্য তপস্যা করছেন, ডাকাডাকি করছেন। কিন্তু শিবঠাকুর তো ধ্যানে মগ্ন। ব্রহ্মা আর নারায়ণ তখন এমার্জেন্সি মিটিংয়ে বসে।
ব্রহ্মা বলে, “হ্যাঁগো নারায়ণ, কী হবে গো? মহাদেব না জাগলে যে সর্বনাশ…”
নারায়ণ বলে, “সর্বনাশ বলে সর্বনাশ? একেবারে সর্বই নাশ হয়ে যাবে যে। কার্তিক না এলে সেনা সামলাবে কে? সেনাপতি ছাড়া সেনা শুনেছে কেউ?”
ব্রহ্মা বলে, “গণেশ না আসলে আমাদের পুজোও শুরু হবে না। আর কত কত রাক্ষস, অসুর মারতে হবে… কত কীই না ঘটতে বাকি। এই দেখো না, আমার ক্যালেন্ডার শিডিউলে সব লেখা আছে। কত কোটি বছরে কবে কোন ঘটনা ঘটাতে হবে, কাকে কী বর দিতে হবে… সব!”
“কিস্যুই হবে না, যদি মহাদেব ওরকম ধ্যানমগ্ন থাকেন,” নারায়ণ বলে, “রোসো, ওঁর ধ্যান ভাঙাতে হবে।”
“অতই সোজা নাকি?” ব্ৰহ্মা বলে, “ও কি যে সে ধ্যান? একেবারে কোন ডাইমেনশনে এখন ওঁর চেতনা ঘুরছে কে জানে!”
“চেতনা চৈতন্য করে দে মা চৈতন্যময়ী,” নারায়ণ বলে, “কিন্তু চৈতন্যময়ী পার্বতীমাতাই তো ডেকে ডেকে পাচ্ছে না মহাদেবকে। তাই তো ধ্যান ভাঙাতে হবে!”
“ধ্যান ভাঙলেই যে পার্বতীমাতার প্রতি মহাদেব আকর্ষিত হবে তার কী গ্যারান্টি?” ব্রহ্মা বলে, “চোখ খুলে যদি গঙ্গাকে বা তোমার মোহিনী রূপকে পছন্দ হয়ে যায়?”
“তাও বটে,” নারায়ণ বলে, “তাহলে এমন উপায় করতে হবে যে শিব ধ্যান থেকে উঠেই যেন পার্বতী মায়ের ডাক শুনতে পায় আর প্রেমে পড়ে যায়।”
“অ্যাহ্, প্রেমে পড়ে যায়… এ যেন হাতের মোয়া,” ব্রহ্মা বলে, “ওরকমভাবে কেউ দুম করে প্রেমে পড়ে নাকি?”
“পড়ে পড়ে,” নারায়ণ বলে, “কামের তাড়না জাগলে দিব্যি পড়ে!”
“তার মানে মহাদেবের মধ্যে কামনা জাগাতে হবে,” ব্ৰহ্মা বলে।
“ঠিক কথা,” নারায়ণ বলে, “আর সেই কাজ করতে পারবে, কামদেব!”
নারায়ণ সঙ্গে সঙ্গে কামদেবকে টেলিপ্যাথিতে ডাকে। কামদেব সেখানে এসে উপস্থিত হতেই নারায়ণ বলে, “সমূহ বিপদ। কামনাকে জাগাতে হবে।”
“কোথায় ঘুমাচ্ছে বলুন? এক্ষুনি জাগিয়ে দিচ্ছি!” কামদেব বলে।
“ধ্যার ব্যাং, এই নাকি তুমি কামদেব?” নারায়ণ বলে, “সাধে তোমার নাম মদন হয়েছে? মদনা টিউবলাইট একটা। আরে কামনা-বাসনা জাগাতে হবে একজনের মনে…”
“ওহ্ এই ব্যাপার? এ তো আমার ডানহাতের খেল, কার মনে কামনা জাগাতে হবে?” কামদেব বলে।
“মহাদেবের…”
“ওরে বাবা… আমি চললাম,” বলেই কামদেব উলটোমুখে ঘুরে যায়। কিন্তু নারায়ণ বোঝায়, “আহা, পালাও কেন?”
“আমার তিরগুলো মহাদেবের উপরে আদৌ কাজ করবে?”
“আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, দিব্যি কাজ করবে। তোমার পঞ্চবাণ—সম্মোহন, উন্মাদন, শোষণ, তাপন আর স্তম্ভন সব একসাথে চালিয়ে দাও। মহাদেবের মনে কামনা-বাসনা সব জেগে না উঠে যাবে কোথায়?”
কামদেব এইভাবে নারায়ণের কাছে ভরসা পেয়ে তার আখের ধনুক নিয়ে আসল। তাতে মৌমাছি দিয়ে গঠিত ছিলাতে তার পাঁচটা তির লাগিয়ে বিড়বিড় করে বলে, “মৌমাছির ছিলা… ছিলাকি জওয়ানি… দেখাও তোমার ক্যারদানি…”
একবারে সাঁই সাঁই করে পাঁচটা তির চালিয়ে দিল ধ্যানস্থ মহাদেবের উপর। কামদেবের তির কাম ঠিকই করে, আর মহাদেবের মনে কামভাবনা ও কামনা উৎপন্ন করে। কিন্তু শিবঠাকুর তো ধ্যান করছিল, তার মধ্যে তখন যোগবল প্রবল বেগে ছিল। তার মধ্যে এই কামনা-বাসনা গিয়ে এমন ঘেঁটে দিল, যে যোগের তেজ লেলিহান আগুন হয়ে তৃতীয় নয়ন খুলে বেরিয়ে এল। আর সামনেই ছিল কামদেব। সেই আগুনে একেবারে দুম করে জ্বলে সে ভস্মীভূত হয়ে গেল। কামনা জাগানোর ভরসা দিয়ে ফরসা হয়ে গেল। প্রেমের আগুন জ্বালাতে গিয়ে নিজেই ভস্ম হয়ে গেল। ব্রহ্মা-নারায়ণের খাঁই পূরণ করতে গিয়ে নিজেই ছাই হয়ে গেল।
এরপরের ঘটনা বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্নভাবে লেখা আছে, কিন্তু আমি বলব স্কন্দ পুরাণে যে ঘটনা লেখা আছে সেটা। সেখানে কামদেব এরকম জ্বলে তন্দুরি হয়ে যাওয়ার পর, তার স্ত্রী রতিদেবী ভীষণ দুঃখ পায়, আর বিলাপ করে। অতি কামের প্রভাবে কামদেবের জীবনে যতি পড়ে, রতির ক্ষতি হয়ে গেছে। এর মধ্যেই শিবঠাকুর আর পার্বতীর বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু পার্বতী চিন্তায় পড়ে যে, কামদেবের অস্তিত্বই নেই যেখানে সেখানে বিয়ে করে কী হবে? হর-গৌরীর মধ্যে কামনা জাগবে কেমন করে? সেটা না জাগলে কার্তিকের জন্ম হবে কী করে?
তখন কাম-পত্নী রতি তপস্যায় বসে। তপস্যা করে শিবঠাকুরকে দিয়ে কামদেবকে আবার বাঁচিয়ে তুলবে। দিব্যি তপসা করছিল। এমন সময়ে নারদ এসে রতির তপস্যা নিয়ে ফুট কাটে যে, “এই মহিলা কার বউ রে? এখানে বসে বসে তপস্যা করছে? খেয়ে দেয়ে ঘর-সংসারের কাজ নাই?”
রতি রেগে গিয়ে বলে, “আপনার খেয়েদেয়ে কাজ নেই, কে কোথায় তপস্যা করে বেড়াচ্ছে দেখে বেড়াচ্ছেন? নিজে তপস্যা করলে পারেন তো!”
নারদ বলে, “আহা তপস্যা তো পুরুষেরাই বেশি করে। তুমি তো নারী। তুমি তপস্যা করছ, এটা আশ্চর্যের বিষয়।”
“নারী দেখে বেড়াচ্ছেন?”
“নারায়ণ নারায়ণ, এ কী বললে?”
“নয়তো কী? তপস্যার নামে আপনি মেয়ে দেখে বেড়াচ্ছেন!” রতির কথায় নারদ খচে ব্যোম হয়ে যায়। দেবর্ষিকে অপমান? নারদ গজগজ করতে করতে চলে যায়। রতি ফের তপস্যায় বসে।
একসময় তপস্যা শেষ হতে মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে বলে, “আমি জানি তুমি কী চাও। কামদেবের বডি ছাই হয়ে গেলেও আত্মাটা বেঁচে আছে। সেই আত্মাকে অন্য কোনো শরীরে দিলেই তুমি কামদেবকে ফেরত পাবে। আমাদের এখানে অনেক বেওয়ারিশ বডি পড়ে আছে। তুমি বলো কোনটায় তোমার পতিকে চাও।”
“ইসস… এগুলোতে না। আমার পতিকে একটা বেশ ভালো বডি দিন। রাজপুত্র টাইপ… বিষ্ণুর অবতারের মতন,” রতি বলে।
“এই রে… দাঁড়াও দেখি”— শিবঠাকুর বলে ব্রহ্মার থেকে ক্যাটালগ নিয়ে দেখে বলতে থাকে, “সব ঘটনার সবার জন্যই তো দেখছি একেকজন আত্মা অ্যালট করা হয়ে গেছে। এ… এই তো পেয়েছি! দ্বাপর যুগে কৃষ্ণের এক পুত্রের জন্য আত্মার পজিশন এখনও ফাঁকা আছে। ওখানে কামদেবের আত্মাকে দিয়ে দিচ্ছি। মনুষ্য হিসেবে কাটাবে, তারপরে সেই শরীরের রূপ নিয়েই স্বর্গে চলে আসবে।”
“হ্যাঁ, এইটা ভালো হবে,” রতি বলে। মহাদেব বর দিয়ে সেই ব্যবস্থা করে দেয়।
এদিকে নারদ অপমান ভোলেনি। সে মর্ত্যে গিয়ে শম্বরাসুর নামে এক অসুরকে সুপারি দেয় রতিকে কিডন্যাপ করার জন্য। শম্বর অর্থে হরিণও হয় আবার মাছও হয়। এই শম্বরাসুর বোধহয় হরিণ বা মাছমুখো ছিল। কেন? ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির মাথায় যদি হরিণের মতন শিং থাকতে পারে, তাহলে শম্বরাসুরের মুখটা হরিণের মতন হতে পারে না কেন?
যা-ই হোক, এই শম্বরাসুর নারদের কন্ট্রাক্ট নিয়ে রতিকে কিডন্যাপ করে। কিন্তু রতি শম্বরাসুরকে শাসিয়ে রাখে, “অতি বাড়াবাড়ি করে আমাকে স্পর্শ করলেই তোকে ভস্ম করব!”
শম্বরাসুর বোধহয় বাংলা সিনেমার ভিলেনের মতন লোক লাগিয়ে রতিকে কিডন্যাপ করে। কারণ রাবণের মতন নিজের হাতে ব্যাপারটা তুলে নিলে কামদেবের মতন ভস্ম হয়ে যেত। শম্বরাসুরের বউ তো আর রতির মতন তপস্যা করবেনা তাকে বাঁচাতে। তাই হরণ করার পর রতিকে তার রান্নাঘরের দায়িত্বে কাজে লাগিয়ে দেয়। এটা ভালো ব্যাপার। এতে বোঝা যায় শম্বরাসুর আর যা-ই হোক চরিত্রহীন ছিল না। সে রতিকে কিডন্যাপ করলেও, তার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। রতি দেবী থেকে একদম রান্নাঘরের মাসির পোস্টে অবনত হলেও, বিধবা মানুষটার একটা হিল্লে তো হল। ও কাজের মাসি বলা যাবে না। সুশীল সভ্য সমাজে ওটা শুনতে খারাপ লাগে। হাউসমেইড বলতে হয়। ইংলিশে বললে মান থাকে, বাংলায় বললে সবার কানে লাগে।
নিখিল ভারতীয় হাউসমেডদের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে রতি সেই শম্বরাসুরের রান্নাঘরে সত্যযুগের শুরু থেকে একেবারে দ্বাপর যুগের শেষ পর্যন্ত কাজ করে। অর্থাৎ প্রায় আটত্রিশ লক্ষ অষ্ট আশি হাজার বছর। হিসেব তো তাইই বলছে। সত্যযুগের শুরুতে দক্ষযজ্ঞ হয়, শিব-পার্বতীর বিয়ে হয়, আর মহাভারত শেষ হয় দ্বাপরের শেষে। কলিযুগ তখন ঢুকে পড়েছে। সত্যযুগ ১৭.২৮ লক্ষ বছর দীর্ঘ হয়, ত্রেতাযুগ ১২.৯৬ লক্ষ বছর আর দ্বাপর ৮৬৪ লক্ষ বছর। মজার ব্যাপার, এই দীর্ঘ আটত্রিশ লক্ষ বছরে শম্বরাসুর কিছু অকাজ করেনি। করলে তাকে রাম-লক্ষণ বা কোন অবতার, নিদেনপক্ষে ভীম ওকে অসুর বলে ঠিক পটকে দিত। যা-ই হোক, রতিদেবী সেখানে মায়াবতী নাম নিয়ে থেকে যায়। আজকের দিনে যে কাজের দিদি ও মাসিরা এক-দেড় বছর কাজ করে, পুজোর বোনাস আর শাড়ি নিয়েই কেটে পড়ে, তাদের মায়াবতী দেবীকে দেখে শেখা উচিত। অবশ্য শম্বরাসুরও নিশ্চয় বেশ খেয়াল রাখত।
সব ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু দ্বাপরের শেষে কোনওভাবে শম্বরাসুরকে কেউ বলে দেয় যে তার মৃত্যু কৃষ্ণের পুত্র প্রদ্যুম্নের হাতে লেখা আছে। সম্ভবত নারদ। তারই কাজ ছিল এরকম দুমদাম খবর রটানো ও ঘটানো। আটত্রিশ লক্ষ বছর বয়সী বৃদ্ধ শম্বরাসুরের মনে মৃত্যুভয় দেখা দেয়। না মানে, আর কত বাঁচবি ভাই? তিনটে যুগ তো বেঁচেছিস। তারপরেও বাঁচার শখ? বর ছাড়াই অমর হওয়ার ইচ্ছে ছিল হয়তো। কিংবা কোনো বর-টর পেয়েছিল হয়তো, পুরাণকারেরা লিখতে ভুলে গেছে। মাইনর চরিত্রের প্রতি এত মেজর দৃষ্টি দেননি তারা।
শম্বরাসুর এই ভবিষ্যৎবাণী শুনেই ভাবে, তাকে অ্যাকশন নিতে হবে। তাই দুম করে সে মহিলারূপ ধরে দ্বারকা চলে যায়। সেখানে তখন কৃষ্ণ আর রুক্মিণীর প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে, নাম তার প্রদ্যুম্ন। এই প্রদ্যুম্ন হল কামদেবের পুনর্জন্ম। যখন প্রদ্যুম্নের দশদিন বয়স, তখন ছোট রাজকুমারকে বোধহয় দ্বারকাবাসীকে দেখানোর জন্য ডিসপ্লে করে রাখা হয়েছিল। লোকজন এসে রাজপুত্রকে দেখে উপঢৌকন দিচ্ছিল হয়তো। এরইমধ্যে মহিলারূপী শম্বরাসুর গিয়ে প্রদ্যুম্নকে কিডন্যাপ করে তার জায়গায় কিছু একটা রেখে চলে আসে। প্রদ্যুম্ন দশদিন বয়সে কিডন্যাপিত হল। আক্ষরিক অর্থেই কিড-ন্যাপ। ন্যাপিতে থাকে কিডকে তুলে নেওয়া হল। তুলে নিয়ে শম্বরাসুর বেবি প্রদ্যুম্নকে সমুদ্রে ফেলে দেয়। সেখানে একটা মাছ তাকে গিলে ফেলে। ভায়োলেন্ট ব্যাপার-স্যাপার। সেবার কৃষ্ণের গুরুসন্দিপনী মুনির পুত্রকেও মাছে গিলেছিল (পরে জানা যায় রাক্ষস বা লক নেসের দানব গোত্রের কিছু), এবারে কৃষ্ণের নিজের পুত্র মাছের পেটে। এখান থেকেই বোধহয় বিখ্যাত কবিতার সেই লাইন অনুপ্রাণিত হয়েছিল—
“হারাধনের তিনটি ছেলে ধরতে গেল রুই,
একটি খেল বোয়াল মাছে, রইল বাকি দুই…”
এখানে আমার কিছু প্রশ্ন আসে। প্রথম প্রশ্ন, দ্বারকার সুরক্ষাব্যবস্থা এতটাই জঘন্য ছিল কেন? মানে কৃষ্ণের পুত্র, তার তো জেড প্লাস প্লাস সিকিউরিটি থাকার কথা। তাকে অমন টপ করে কিডন্যাপ করে ফেলল কোথাকার কোন অসুর? অবশ্য এর একটা সম্ভাব্য উত্তরও আছে। পুরাণ বলে শম্বরাসুর মায়াবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। ম্যাজিশিয়ান বা ঐন্দ্রজালিক গোছের কেউ। সে ম্যাজিক করে গিলি-গিলি-গে করে প্রদ্যুম্নকে কিডন্যাপ করে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন শম্বরাসুর যখন জানতই যে প্রদ্যুম্ন তাকে বড় হয়ে পটকে দেবে, তখন তাকে কিডন্যাপ করে সরাসরি মেরে ফেলল না কেন? নৃশংস ব্যাপার হলেও একটা তরোয়ালের খোঁচা দিলেই হত। কিন্তু না, সে হিন্দি সিনেমার ভিলেনের মতন প্রদ্যুম্নকে সমুদ্রে মাছের কাছে ফেলে দিল। কোনো মানে হয়? অপদার্থ একটা। আমার মনে হয় সেসব কিছু না, শম্বর অসুর, বা শবর গোত্রের অসুরেরা ওই দস্যু টাইপের কোনো জাতি ছিল, যাদের কিডন্যাপিংয়ে দক্ষ ছিল। রতিকে যেমন কিডন্যাপ করল, তেমনই প্রদ্যুম্নকে কিডন্যাপ করে কৃষ্ণের থেকে বেশ ভালো মুক্তিপণ আদায় করার ধান্দায় ছিল। মাঝখান থেকে থলে থেকে গলে গিয়ে প্রদ্যুম্ন জলে পড়ে যায়। পুরাণকারেরা হয়তো দেখল কৃষ্ণের ছেলেকে কোনো সাধারণ দস্যুগোষ্ঠী কিডন্যাপ করবে? দাও তাকে মায়াবী অসুর বানিয়ে। তবেই না বেশ একটা ইয়ে ব্যাপার হবে। এটা আমার ধারণা, আমায় কেউ মেরো না।
তৃতীয় এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, এই কিডন্যাপ আটকাতে কৃষ্ণ কিছু করল না কেন? ভক্তিবাদীরা বলেন কৃষ্ণ সব জানত, এবং বিধির বিধান মেনে নিয়েছিল। মানে সে জানত প্রদ্যুম্ন বড় হয়ে শম্বরাসুরকে মারবে, এবং তাই নিজেই সিকিউরিটি সিস্টেম শিথিল করে কিডন্যাপের ঘটনাটা হতে দেয়। এর পিছনে আরেকটা যুক্তিও আছে। কৃষ্ণ সত্যিই জানত ভবিষ্যতে কী আসছে, এবং কীভাবে যদুবংশ ধ্বংস হবে। যদুর বংশের উপরে অভিশাপ যাবে কোথায়? বংশের তাই বংশের একটি বংশদণ্ড, মানে ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে সে এটা করিয়েছিল। কেন? কারণ কারোর কোনো পুত্র হরণ হলে, বা অন্যভাবে বংশের বাইরে বড় হলে, তার উপরে বংশের শাপ খাটবে না। বিশেষ করে পুত্র কোনো এক অজ্ঞাত নিয়ম অনুযায়ী বংশের কোনো পুত্র মাছের পেটে গেলে তার বংশ আলাদা হয়ে যেত। দশরাজের পুত্র যেমন মাছের পেট থেকে বেরিয়ে মৎস্য রাজ্য ও বংশ প্রতিষ্ঠা করে। কুরু বংশের শাখা হয়েও কোনোদিন কুরুবংশের পরিচয় পায়নি মৎস্য বংশ।
আবার ভক্তিভাব ছাড়া অন্যভাবে ভাবলে মনে হয়, কৃষ্ণের যে এই আশিটি পুত্র ছিল, সকলের প্রতি সে নজর দিতে পারত না। প্রদ্যুম্নর জন্ম হয়তো একটি সাধারণ ঘটনা ছিল, এবং কৃষ্ণ বুঝতেও পারেনি, কখন সে কিডন্যাপ হয়ে গেছে। তবে এই থিওরিটা ঠিক খাটে না, কারণ কৃষ্ণ যেখানে মহাভারতের প্রায় সব চরিত্রের হাঁড়ির খবর রাখত, সেখানে নিজের ছেলে কিডন্যাপ হয়ে গেল, আর সে কিছু করবে না, এটা বিশ্বাস হয় না। মহাভারতে দুজন চরিত্র সবার ব্যাপারে খবর রাখত। ইনফরমেশন ইজ নলেজ। ভীষ্ম আর কৃষ্ণ। কৃষ্ণ ভীষ্মের থেকেও বেশি খবর রাখত। শম্বরাসুরকে গিয়ে পটকে দিতে কতক্ষণ? কিন্তু এই প্রদ্যুম্নর কিডন্যাপিং আর দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, এই দুটো সময়েই কৃষ্ণের ব্যর্থতা দেখা যায়।
যা-ই হয়ে থাকুক, মোটামুটি শম্বরাসুর নিজেই গিয়ে নিজের মৃত্যুর হেতুর সূচনা করে আসে। নিজেই নিজের শুধুবপঙ্কারীবংশ ধার দিয়ে ছুঁচালো করে আসে। অনেকসময় মানুষ একটা ভবিতব্য আটকানোর জন্য যে কাজ করে, সেই কাজেই সেই ভবিষ্যতের ঘটনার সূচনা হয়। শম্বরাসুরের এই প্রদ্যুম্নকে কিডন্যাপ ও মাছকে খাওয়ানো সেইরকমই একটি ঘটনা। শম্বরাসুর মোটামুটি এইসব কাজকর্ম করে নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি চলে আসে। কিন্তু বিধি বাম (পন্থী নয়)। সেই মাছকেই জেলেরা ধরে এনে শম্বরাসুরকে বেচে দেয়। পেল্লায় মাছকে কম দামে পেয়ে শম্বরাসুর খুশি। বাঙালি ছিল বোধহয়।
সেই মাছের পেট কাটতেই বেবি প্রদ্যুম্ন বেরিয়ে আসে। শম্বরাসুরের মাথায় হাত। এত খেটেখুটে সেই প্রদ্যুম্ন এসে তার বাড়িতেই ঢুকল? শম্বরাসুর কিন্তু এখানেও দ্বিতীয় সুযোগ পেল, প্রদ্যুম্নকে শিশু অবস্থায় মেরে ফেলার। কিন্তু ব্যাটার দয়ার শরীর ছিল হয়তো। এবারেও প্রদ্যুম্নকে মারে না। উলটে মায়াবতীকে দিয়ে দেয় প্রদ্যুম্নকে মানুষ করার জন্য। প্রদ্যুম্ন তার আগের জন্মের বউয়ের কাছে বড় হতে থাকে।
প্রদ্যুম্নর লালনপালনে শম্বরাসুর কোনো খামতি রাখেনি। এটা বলার কারণ হল, আমরা পরবর্তীকালে দেখি প্রদ্যুম্ন বিচক্ষণ রাজপুরুষ হয়েছিল। সুতরাং তার শিক্ষা-দীক্ষা ও কৃষ্টি নিশ্চয় যথাযথ হয়েছিল। শম্বরাসুর হয়তো তাকে দত্তক নিয়ে নিজের পুত্র করে ফেলার ধান্দায় ছিল, কিন্তু মাঝে বাদ সাধে আটত্রিশ লক্ষ বছর বয়সি চিরযুবতি মায়াদেবী। সে মনের মধ্যে রাগ পুষে রেখেছিল, আর প্রদ্যুম্নকে সেসব শিক্ষা দেয়।
প্রদ্যুম্ন বড় হতে হতে জেনে যায় সে কামদেবের পুনর্জন্ম, আর মায়াবতী তার বউ। দাইমা থেকে বউ। মাত্র আটত্রিশ লক্ষ বছরের বড় বউ। বউ না ফসিল? সে যাই হোক, মায়াদেবী প্রদ্যুম্নকে প্রচুর মায়াবিদ্যা শিখিয়ে দেয়। কামদেবের থেকে শিখেছিল হয়তো, আবার এই এত লক্ষবছর মে বী অসুরের পরিচারিকা হয়ে কাটানোর জন্যও শিখে গেছিল।
প্রদ্যুম্ন সেসব শিখে শিখে বড় হতে হতে মায়াদেবীর প্রেমে পড়ে যায়। আহা আগের জন্মের বউ, হবে না? আমাদের মানুষদেরই সাতজন্মের স্বামী-স্ত্রী হয়, সেখানে দেব-দেবীদের নিশ্চয় কয়েক কল্পের বন্ধন হয় তাছাড়া মানুষের হিসেবে আটত্রিশ লক্ষ বছর আসলে দেবতাদের হিসেবে দশহাজার বছর, আর ব্রহ্মার হিসেবে কয়েক ঘণ্টা। অত হিসেব করে মাথা ঘুলানোর দরকার নেই, আমরা গল্পে ফিরি। প্রদ্যুম্ন ওইভাবেই শিক্ষা পেয়ে যুবক হয়েই শম্বরাসুরকে চ্যালেঞ্জ করে যুদ্ধে।
শম্বরাসুর বেচারা আকাশ থেকে পড়ে। মানে অবাক হয়ে। আকাশে সে কী করবে? প্রদ্যুম্নর চ্যালেঞ্জে সাড়া দিয়ে সে যুদ্ধে যায়। সেখানে একদিকে প্রদ্যুম্ন একা দাঁড়িয়ে, অন্যদিকে শম্বরাসুর সেনা নিয়ে। শম্বরাসুর একটা মাইক নিয়ে বলে, “হ্যালো হ্যালো… প্রদ্যুম্ন শুনতে পাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ পাচ্ছি,” প্রদ্যুম্ন বলে।
“চিব্যি খেয়ে পড়ে ছিলিস, দড়াম করে যুদ্ধ ডাকলি কেন?” শম্বরাসুর জিজ্ঞেস করে।
প্রদ্যুম্ন মাথা উঁচিয়ে বলে, “তুমি পাপী…”
শম্বরাসুর একটু মাথা চুলকে বলে, “লেহ… সে কী কথা? কী পাপ করলাম?”
“তুমি আমায় কিডন্যাপ করে মারতে চেয়েছিলে।”
“সে চেয়েছিলাম, কিন্তু মারতে চাইলে কী আর এখন বেঁচে থাকতিস? তোকে খাইয়ে পড়িয়ে বড় করলাম এই দিন দেখার জন্য?”
“আমার বংশ থেকে তো আলাদা করেছ।”
“তোর বংশ তোর খোঁজও করে না। অতবড় বংশে কোথায় হারিয়ে যেতিস, তার চেয়ে এখানে ভালো আছিস।”
“না, আমার বংশ উচ্চ বংশ…”
“হ্যাং ইওর উচ্চ বংশ। বংশের মধ্যে দিনরাত গোষ্ঠীদ্বন্দ লেগেই আছে। কোনোমতে তোর বাবা সামলে রেখেছে। তোর বাবা না থাকলে পুরো বংশই বয়ে যাবে!”
“তুমি কী ভাবো তাতে আমার বয়েই গেছে। আমার বংশ আমার পরিচয়। তুমি পাপী, তোমার শাস্তি…”
“ধ্যাত্তেরি… কী তখন থেকে পাপী-পাপী বলছিস? তোকে বড় করাটাই আমার ভুল হয়েছে। তোর মধ্যে আর্যদের স্বভাব ঢুকে আছে। যে তোদের কথা মানবে না সেই পাপী। আরে বাবা, পাপী হলে তুই বেঁচে থাকতিস? এত বড় বড় কথা বলার অবস্থায় থাকতিস?”
“ওসব বললে হবে না কাকু। আমি এখন সব জানি। তাছাড়া তুমি রতিদেবীকে কিডন্যাপ করেও পাপ করেছ।”
“কে রতিদেবী?”
“ভুলেও গেলে?”
“কিডন্যাপ তো অনেককেই করেছি, সবার নামধাম মনে রেখেছি নাকি?” “আরে রতিদেবী… কামদেবের স্ত্রী…”
“দাঁড়া লেজার দেখি… আজকাল কেমন ভুলে ভুলে যাই… এই কে আছিস… কিডন্যাপের রেকর্ডে ‘র’ দিয়ে শুরু খাতাটা আন দেখি। দ্বিতীয় খণ্ড…”
একটা দামড়া সাইজের খাতা এনে রাখার পর, শম্বরাসুর চোখে চশমা এঁটে রেকর্ড দেখে বলে, “ওরে বাবা, এ তো সেই কোন যুগে নারদমুনির কথায় রতিদেবীকে কিডন্যাপ করেছিলাম। সে এখন কোথায়? ছেড়ে দিয়েছি বোধহয়…”
“সে এখন মায়াবতী নামে তোমার রান্নাঘরের দায়িত্বে আছে।
“মায়াবতী? তাই বলি খাবার দাবারগুলো অমন বিহারের মতন হয়ে যাচ্ছে কেন? রাজ্যের লঙ্কা, সকালে বিকেলে ছাতু আর সব কিছুতেই গাদা ঘি আর দুধ। খাবারে টেস্ট নেই। একদিন তো খৈনিও পেয়েছিলাম…”
“ওসব বললে হবে না কাকু। তুমি অত্যাচারী…। জবাব দাও, কেন এরকম করেছ? নয়তো যুদ্ধ করো!”
“সবই মায়া,” শম্বরাসুর বলে।
“সে মায়ার খেলা বুঝতেই পারছি। মায়াই সবাইকে ফাঁসিয়ে রেখেছে।”
“মুখ সামলে কথা বলো প্রদ্যুম্ন,” শম্বরাসুর রেগে যায়, “আমি তোমার কাকিমার কথা বলছি। তার নামও মায়া। তার জন্য আর সংসারের জন্যই আমি কিডন্যাপিং ব্যবসা করি।”
“আচ্ছা স্যরি, কিন্তু মায়াবতীকে কিডন্যাপ করে ঠিক করোনি।’’
“সে তো তোর থেকে কত বড়। বুড়ির প্রেমে পড়েছিস?”
“মুখ সামলে কাকু, ও আমার গতজন্মের বউ!”
শম্বরাসুর খুব খানিক মাথা চুলকে, এর ওর সাথে আলোচনা করে, তারপর মাইক হাতে নিজের দলকে বলে, “ভাইসব, আমারই ভুল হয়েছে। এই ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। লজিকের কিস্যু নেই। এক বৃদ্ধার প্রেমে পড়ে আঁটভাট বকছে। একে এর মতন অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলো।”
“আমি যুদ্ধ করব!” প্রদ্যুম্ন হুংকার দেয়।
“তো কর,” শম্বরাসুর বলে, “যুদ্ধ করতে এসেছিস তো যুদ্ধ কর, আর কথা বাড়াস না। কেন করছিস, কী উদ্দেশ্য কিছু জানতে চাই না ভাই, ঘাট হয়েছে। যুদ্ধ কর, বাড়ি চল, ঢের কাজ বাকি।”
অতঃপর যুদ্ধ শুরু হয়, আর কিছুক্ষণেই শেষ হয়ে যায়। কারণ শম্বরাসুরও বুড়ো হয়েছিল। কতক্ষণ যুদ্ধ করতে পারে? কিছুক্ষণ ঢন-ঢনাৎ করে যুদ্ধ করেই চারহাত জিভ বের করে যুদ্ধের মাঠে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে মরে গেল। বাকি সবাই বাড়ি চলে গেল। রাজ্যের লোকজন জানতই বুড়ো রাজা কদিনের মধ্যেই মরে যাবে। কেউ আশ্চর্য হল না। ফাঁকা যুদ্ধক্ষেত্রে হাঁপানিতে প্রাণবায়ু ত্যাগ করা শম্বরাসুরের লাশের পাশে তরোয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রদ্যুম্ন নিজের মনেই বলে, “এটা কী হল? এত প্রস্তুতি নিয়ে, ওকে একটা তরোয়ালের খোঁচাও মারলাম না, এমনি মরে গেল?”
শম্বরাসুরের মন্ত্রীরা একটা ব্যাপক রথ নিয়ে এসে বলে, “একে এরকমই ছেড়ে দিন। আমরা কাউকে বলব না, চাপ নেই। ব্যাসদেবকে আমরা এখানকার ঘটনা বাড়িয়ে চাড়িয়ে লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তিনি লিখে দেবেন, ভয়ংকর যুদ্ধ হয়েছিল। আপনি মশাই আমাদের ম্যাটারে আর থাকবেন না। আমরা আপনাকে কিডন্যাপ করিনি। আপনি আর আপনার বাবা আমাদের থেকে যতদূরে থাকেন ততই আমাদের মঙ্গল। দয়া করে আমেরিকার মতন এখানে শান্তি স্থাপন করতে আসবেন না। আমরা এমনিই শান্তিতে আছি। এই রথ নিন, আর এই আপনার বুড়ি চিরযৌবনা বউ নিন, আর নিশ্চিন্তে বাড়ি যান। ফিরে এলে কিন্তু সব সত্যি কথা জানিয়ে দেব, যে যুদ্ধই হয়নি!”
প্রদ্যুম্ন রথে করে মায়াদেবীকে নিয়ে দ্বারকার দিকে রওনা দেয়। আর উপরোক্ত ঘটনা ও কথোপকথন আমার মস্তিষ্কপ্রসূত। পুরাণে লেখা শম্বরাসুরের সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধ করেছিল প্রদ্যুম্ন, এবং বিজয়ী হয়ে সেই দেশে শান্তি ফিরিয়ে, মায়াবতীকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ করে দ্বারকা ফিরে আসে সে।
দ্বারকায় তারা আসতেই সকলেই আনন্দিত হয়। প্রদ্যুম্নকে কৃষ্ণের মতনই দেখতে। লোকে আরও খুশি। হারিয়ে যাওয়া ছেলের ডি এন এ টেস্টের দরকার পড়ে না। কৃষ্ণ আর রুক্মিণী বিশেষ করে খুশি হয়। কারণ হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে জোয়ান হিসেবে পেয়েছে। তার উপরে বউ পেয়েছে। তার উপরে, ছেলে বংশের হয়েও বংশের অভিশাপের বাইরে। দ্বারকায় গ্র্যান্ড পার্টি শুরু।
ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে ফিরে পেয়ে রুক্মিণীর ভীষণ আহ্লাদ হয়। তাই তার ভাই রুক্মীর মেয়ে রুক্মাবতীর সাথে প্রদ্যুম্নর বিয়ে দেয়। অর্থাৎ প্রদ্যুম্ন নিজের মামার মেয়েকে বিয়ে করল। এসব তো দক্ষিণ ভারত ও অন্য ধর্মে হয় জানতাম। তার মানে মহাভারতের সময় এই নিয়ম চালু ছিল। হতেই পারে। যা-ই হোক, প্রদ্যুম্ন মায়াবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠল। যে-কোনও যুদ্ধেই সে ইন্দ্রজিতের মতন মায়াজাল বিস্তার করে শত্রুপক্ষকে হেব্বি চমকাত।
এরই মধ্যে অসুরদের সাথে যাদবদের দুটো ঝামেলা ঘটে যায়। প্ৰথম ঝামেলা হয় বজ্রনাভ বলে এক অসুরের সাথে। মহভারত ও হরিবংশ পড়লে একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আর্যদের ক্রমবিস্তারে অসুর ও রাক্ষস নামক জাতিরা লুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আর্যদের প্রভুত্ব বা দাসত্ব গ্রহণ করে বেঁচেছিল, আবার কেউ কেউ লুকিয়ে বেঁচে ছিল। বাকিদের আর্যরা দুষ্ট-পাপী বলে নিকেশ করেছিল। বজ্রনাভ ও এর পরের গল্পের নিকুম্ভ ওই দ্বিতীয় গোত্রের ছিল। তারা নিজেদের এলাকা বা রাজ্য প্রাণপণে আর্যশক্তি থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
বজ্রনাভ অসুর সুমেরু পর্বতে কসরত করে হেব্বি তপস্যা করে। তপস্যায় তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা এসে বলে, “বল, কী বর চাইছিস?”
“দুটো বর দিন স্যার,” বজ্রনাভ বলে।
“ও বাবা, সিঙ্গেল তপস্যায় ডবল বর? তা বাপু সাধারণ বর হলে দুটো দিতেই পারি, আপত্তি নেই।”
“থ্যাঙ্কু ব্রহ্মা স্যার, আমার চাহিদা সামান্যই,” বজ্রনাভ বলে, “আমার প্রথম বর চাই, যেন কোনও দেবতা আমাকে না মারতে পারে।”
“আমরা তিনজন, মানে ত্রিদেবও না?”
“না… কোনও লেভেলের কোনও দেবতাই আমাকে মারতে পারবে না!”
“বেশ দিলাম। দ্বিতীয় বর?”
“দ্বিতীয় বরে আমাকে মায়াবী বজ্র শহরটা দিন।”
“বজ্র শহর?” ব্রহ্মা বলে, “সে তো মায়াবী লুক্কায়িত শহর। সে যে কোথায় আছে..”
“ব্রহ্মা জানেন গোপন শহরটি,” বজ্রনাভ বলে, “আমাদের গুরু শুক্রাচার্য বলে দিয়েছে, আপনি জানেন। বরে ওটা দিন না…। এরকম করেন কেন?”
“আচ্ছা, নাও তাহলে,” ব্রহ্মা বলে, “ওই শহর এতটাই লুক্কায়িত যে হাওয়াও তোমাকে না জানিয়ে ঢুকতে পারবে না।”
“জানি জানি, আমি বজ্র শহরের ব্যাপারে সব জানি। ওখানে যা চাওয়া হয় তাই পাওয়া যায়। দোকান বাজার, অর্থনীতির দরকারই নেই। ‘যাহা চাই তাহাই পাই’য়ের দেশ।”
ব্রহ্মা বজ্র শহর বজ্রনাভর নামে লিখে দিয়ে চলে যায়। বজ্রনাভ নিজের রাজ্যের সমস্ত অসুরকদের নিয়ে লুক্কায়িত শহরে বসবাস করে। কিন্তু দেবতা হোক, বা মানুষ হোক বা অসুর… সুখে শান্তিতে বেশিদিন কেউই থাকতে পারে না। প্রচণ্ড সুখে থাকলে বিচর্চিকা রোগে ভোগে। তখন অকারণে চুলকে চুলকে নিজেদেরই ঘা বানিয়ে, সেই ঘায়ে সেপটিক বাঁধিয়ে ধনুষ্টংকার রোগ বাঁধিয়ে বসে। বজ্রনাভকেও সেই রোগেই ধরল।
সুখে থাকতে সেই ভূতের কিল খেয়ে একদিন দুম করে ভাবল, “এই তো, এই শহরে চাইলেই সব পাচ্ছি। তাহলে এখান থেকেই সমস্ত অস্ত্র শস্ত্র আর সেনা নিয়ে দেবতাদের বারোটা বাজিয়ে ত্রিলোকের অধীশ্বর হতেই পারি। দেবতারা তো আমাকে মারতে পারবে না!”
এই ভেবে বজ্রনাভ সটান স্বর্গে গিয়ে হাজির। ইন্দ্র তাকে দেখে বলে, “আরে মাসতুতো কাম সৎ ভাই, ওয়েলকাম। বলো এখানে কী কাম?”
বজ্রনাভ বলে, “ইন্দ্র, আমরা দুজনেই কশ্যপের পুত্র, তাহলে তুমি স্বৰ্গ পেয়েছ কেন? আমিও তো পেতে পারি!”
ইন্দ্ৰ মনে মনে ভাবল, আবার সেই পুরনো কেস। আবার এক অসুর এসে স্বর্গ চাইছে। কিন্তু ডাইরেক্ট যুদ্ধ করে নয়। বজ্রনাভ এসে লিগ্যালি ব্যাপারটা মেটাতে চাইছে। একে তাড়িয়ে দিলে খচে আবার যুদ্ধ করবে। তার থেকে মাথা ঠান্ডা রেখে আইনি প্যাঁচেই জব্দ করতে হবে।
ইন্দ্র বলে, “বজ্রনাভ, কথাটা ঠিকই বলেছ। এই সম্পত্তির ভাগ করে দিয়েছিল আমাদের বাবা। কিন্তু বাবা এখন তপস্যা করছে, এখন তো তাঁকে জিজ্ঞেস করা যাবে না। তপস্যা শেষ হোক, তারপরে যদি বাবা বলে, তখন স্বর্গ নাহয় তোমাকে দিয়ে দেব।”
কথাটা বজ্রনাভর মনে ধরে। কিন্তু কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? কশ্যপের তপস্যা মানে তো কয়েক হাজার বা লক্ষ বছরও হতে পারে। বজ্রনাভর স্বর্গলাভের আশা, হাওয়ায় ভাসা ঘুড়ির মতন লটকাতে থাকে। বজ্রনাভ চান্স না নিয়ে তপস্যারত বাবার সামনে গিয়ে বসে পড়ে। আরে বাবা, তপস্যা করত মানে সর্বক্ষণ জড়বস্তুর মতন বসে থাকত সেটা নয়। মাঝেমাঝে নিত্যকর্ম ও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ধ্যান থেকে উঠত। সেরকমই যেই কশ্যপ একটু উঠেছে, অমনি বজ্রনাভ ডেকেছে, “ড্যাডি…”
“কোন বদের হাড্ডি আমায় ড্যাডি বলে?” কশ্যপ বলে, “কে তুমি?”
“আজ্ঞে আমি আপনার পুত্র।”
“কোনদিকে?”
“আমার মায়ের নাম দিতি।”
“আচ্ছা, তা হবে, অত হিসেব থাকে? কী চাও?”
“স্বর্গ।”
“সে তো ইন্দ্রের কাছে।”
“আপনি আমার বাবা, আবার ইন্দ্রেরও বাবা। আপনি আমাকে বাদ দিয়ে ইন্দ্রকে স্বর্গ দিলেন ক্যামনে? স্বর্গের উপরে আমাদের সকলের সমান অধিকার।”
কশ্যপ মনে মনে ঠিক সেই কথাগুলোই ভাবে, যেগুলো ইন্দ্ৰ ভেবেছিল। অর্থাৎ বজ্রনাভ আইনত ঠিক কথাই বলছে। এখন কশ্যপের হাতে তিনটে উপায় আছে। প্রথম উপায়, ঝড়াম করে বজ্রনাভকে একটা অভিশাপ ঠুসে দেওয়া। কিছু একটা বাহানা দিয়ে। কিন্তু হাজার হোক বজ্রনাভ তারই পুত্র। দ্বিতীয় উপায়, অন্য কোনও ঋষিকে খচিয়ে দিয়ে তাকে দিয়ে একটা অভিশাপ দিয়ে দেওয়া। কিন্তু সেখানে রিস্ক আছে। দুর্বাসার মতন ঋষির খপ্পরে পড়লে, হয়তো এমন অভিশাপ দিল যে বজ্রনাভর শাপে বর হল। অথবা হাতি-ঘোড়া-সাপ-বেবুন-বুনিপ কিছু একটা বানিয়ে দেবে, তারপরে সেই দ্বাপর বা কলি যুগে গিয়ে তাকে উদ্ধার করতে হবে। তৃতীয় উপায় হল, ঘটনাটা ডিপ্লোম্যাটিক ভাবে হ্যান্ডেল করা। ব্যাপারটা নিশ্চয় ইন্দ্রের কানে গেছে। সে যখন তখনও কুমির-মাছি-অপ্সরা-ব্রাহ্মণ কাউকেই কাজে লাগিয়ে ছলনা করেনি, তখন নিশ্চয় অন্য ব্যবস্থা করছে। দুই সৎ ছেলে সৎ-অসৎভাবে লড়ুক। কশ্যপের এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।
সেইমতন কশ্যপ বলে, “আমার এখন তপস্যা চলছে, এসব বৈষয়িক ব্যাপার নিয়ে ভাবতে পারছি না। আমার তপস্যা শেষ হোক, তুমি ততদিন তোমার বজ্র শহরে গিয়ে থাকো। তপস্যা শেষ হতে বেশিদিন নেই।”
পিতার আশ্বাসকে বিশ্বাস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বজ্রনাভ বজ্র শহরে ফিরে আসে। কিন্তু ওদিকে ইন্দ্রের টেনশন শুরু হয়ে গেছে। একজন অসুর এসে ভদ্রভাবে আইন দেখিয়ে স্বর্গ চাইছে, এতে টেনশন হবে না? ব্যাটার তারমানে সলিড ব্যাকআপ আছে। ইন্দ্ৰ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, বজ্রনাভ বর পেয়েছে, তাকে কোনো দেবতা মারতে পারবে না। অর্থাৎ সব দেবতারাই তার কাছে মার খেতে পারে। অসুররা সেমসাইডে গোল করে মারবে না। উলটে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে তারা বজ্রনাভকেই মুখপাত্র করে স্বর্গ আক্রমণ করে মেরে দেবতাদের মুখগুলোকে দুখ-পাত্র করে দেবে। তাহলে ওরকম অসুরকে কে মারবে?
ইন্দ্র ঝট করে ভাবে, আরে বিষ্ণুঠাকুর তো নিজেই মনুষ্য অবতার নিয়ে মর্ত্যে লীলা করে বেড়াচ্ছে। তাকে ধরলেই তো হয়। মানুষ হিসেবে কৃষ্ণই বজ্রনাভকে পটকে দিতে পারে।
সেইমতন ইন্দ্র কৃষ্ণের সাথে দেখা করে বলে, “বাঁচাও… বজ্ৰনাভকে মারতে হবে!”
“কেন?” কৃষ্ণ বলে, “সে তো কোনো অন্যায় করেনি এখনও। এমনকি আমাদের যাদবগোষ্ঠীকেও থ্রেট দেয়নি।”
“কিন্তু আমাকে তো দিয়েছে,” ইন্দ্র বলে, “কাল বাদ পরশু, বাবা যদি ধ্যান ভেঙে স্বর্গ ওকে দিয়ে দেয়, অথবা ও যদি অসুরদের নিয়ে আমাদের অ্যাটাক করে, তখন তো সবার জন্যই থ্রেট হয়ে যাবে!”
“তা বটে,” কৃষ্ণ বলে, “কিন্তু দুটো সমস্যা আছে। প্রথম সমস্যা, বজ্ৰনাভ বজ্র শহরে থাকে। সেটা গোপনীয় শহর। ওর পারমিশন ছাড়া ওখানে হাওয়াও ঢুকতে পারে না। মানে হাওয়া কিছু ফিল্টারের মধ্যে দিয়ে যায়, তাই হাওয়ার সাথে বাইরের কিছু ঢুকতে পারে না। আর দ্বিতীয় সমস্যা হল, একটা সমস্যা তৈরি করতে হবে, যাতে ওর সাথে যাদবদের ঝামেলা লাগে।”
“সে আমি লাগিয়ে দিচ্ছি,” ইন্দ্র বলে, “আমি খোঁজখবর নিয়ে নিয়েছি, কারা বিনা পারমিশনে ওই শহরে যেতে পারে। আর বজ্রনাভর একটি কন্যা আছে, প্রভাবতী। তাকে যদি তোমার পুত্রবধূ বানিয়ে দিই?”
“আইডিয়া মন্দ নয়। প্রদ্যুম্নর সাথে বিয়ে দেওয়াই যায়।”
“প্রদ্যুম্নই কেন? আরও তো আপনার এক লক্ষ ঊনসত্তর হাজার নশো নিরানব্বইটা পুত্র আছে!”
“ওদের বংশ টিকবে না। কোনদিন হতভাগাগুলো নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করে মরবে। প্রদ্যুম্নর বংশই টিকবে, তাই ওর যতগুলো বউ হয় তত ভালো। বংশের সারভাইভালো হওয়ার চান্স বেশি।”
“বেশ, প্রদ্যুম্ন তো দেখতে শুনতে ভালোই। আমি ওর খবর পাঠাচ্ছি প্রভাবতীর কাছে,” ইন্দ্র বলে, “কিন্তু তারপরে প্রদ্যুম্ন বজ্র শহরে ঢুকবে কী করে?”
“শুধু প্রদ্যুম্ন নয়, অনেক যাদবই ঢুকবে,” কৃষ্ণ বলে, “সে ব্যবস্থা করছি আমি।”
“কীভাবে?” ইন্দ্র প্রশ্ন করে।
কৃষ্ণ বলে, “অপেক্ষা করো, একজনকে ডেকেছি।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন মানুষ এসে হাজির হয়।
“এই ভদ্রলোক কে?”—ইন্দ্র জিজ্ঞেস করে।
“ইনি ভদ্র।” কৃষ্ণ বলে।
“আহা, আমি তো ওনাকে অভদ্র বলিনি!” ইন্দ্ৰ বলে।
“আহ, বড় কম বোঝো… এর নামই ভদ্র,” কৃষ্ণ বলে, “এ একজন অভিনেতা।”
“সিনেমা, সিরিয়াল, সিরিজ, থিয়েটার, যাত্রা—কীসে অভিনয় করে?” ইন্দ্র বলে, “নাকি রিয়েলিটি শোতে গিয়ে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদেকেটে অভিনয় করে? তারা অবশ্য নিকৃষ্টতম অভিনেতা। বাকিরা তাও আর্টের সাথে যুক্ত।”
“ভদ্রবাবু থিয়েটার ও যাত্রার সাথেই যুক্ত,” কৃষ্ণ বলে, “একটু অভিনয় করে দেখান তো!”
ভদ্র তখনই রূপ বদলে অহল্যার রূপ নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অভিনয় করে,
“হায় হায়… পড়েছি কী যাতনায়…
ইন্দ্র এসে করে রতি, ধরি আমার স্বামীর বেশ
ইন্দ্ৰ যে পাপী… নয় অনুতাপী…
তার জন্য খেলাম আমি ঝাড়া কেস…”
আবার রূপ বদলে ভদ্র তখন ইন্দ্ৰ সেজে বলে,
“তুমি তবু ভালো… অভিশাপের আলোয়
হইয়াছ শুধুমাত্র এক খণ্ড প্রস্তর
মোর গায়ে যোনী… যোনীর যেন খনি …
কেস আমিও খেয়েছি বিস্তর…”
আবার ভদ্র রূপ বদলে গৌতম ঋষি হয়ে বলে,
“ইন্দ্র দুরাচারী… মারো খালি ঝাড়ি
যত কন্যা আছে হেতা হোথা
এই হয়েছে ভালো… মুখমণ্ডল কালো
দেখি মুখ দেখাও কোথা?”
দুম করে ভদ্র রূপ বদলে নারায়ণ হয়ে আকাশে ভেসে বলে,
“এ তো বিধির বিধান… এ সবই তার নিদান
লাভ নেই কিছু করে ডান বাম
ইন্দ্ৰ ভুগে শিখবে… ইতিহাসে সব লিখবে
অহল্যাকে বাঁচাব হয়ে শ্রী রাম”
“আহা আহা কী অভিনয়,” ইন্দ্ৰ কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, “এমন অভিনয় দেখে নিজেকেই পাপী মনে হচ্ছে। আহ খুব ভুগেছিলাম আমি আর অহল্যা। কিন্তু ভদ্রবাবু এরকম রূপ পরিবর্তন করছেন কী করে? আব্র আকাশে উড়ছেন, উধাও হচ্ছেন…”
“আমি অভিনয় দেখিয়ে ব্রহ্মাদেবের কাছে বর পেয়েছি,” ভদ্র বলে, “আমি সর্বত্র যেতে পারি, সব রূপ ধরতে পারি।”
“বাহ বাহ, এতেই হবে,” ইন্দ্র বলে, “আমি প্রভাবতীকে খবর পাঠানোর সময় তোমাদের থিয়েটার গ্রুপের খবরও দিয়ে দেব বজ্রনাভকে।”
“একজ্যাক্টলি। ওভাবেই প্রদ্যুম্ন আর বাকিরা ঢুকবে। যাও, ব্যবস্থা করো,” কৃষ্ণ বলে।
ইন্দ্ৰ প্ল্যান গুছিয়ে স্বর্গে ধার্তরাষ্ট্র রাজহংসদের ডেকে পাঠায়। এদের নাম শুনে ভাববেন না যে এদের সাথে ধৃতরাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক আছে। ধার্তরাষ্ট্র হল রাজহংসের এক প্রজাতির নাম। এদের শরীরের কিছু মাংসকে (মাংসবর্গ)
আয়ুর্বেদে প্রভূতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তো সেই রাজহংসদের ডেকে ইন্দ্ৰ বলল, “এই যে কিছু কাজকর্ম করা হচ্ছে, নাকি শুধুই উড়ে বেড়ানো হচ্ছে ?”
“আজ্ঞে ওড়াটাই আমাদের কাজ, আর ওতেই আমরা সব খবর রাখি,” রাজহংসদের নেত্রী সূচীমুখী বলে, “সর্বত্র আমাদের যাতায়াত!”
“বটে বটে? বজ্র শহরে যাওয়া হয়?”
“যাই তো প্রায়ই। আমাদের পারমিট আছে। বজ্রনাভ পাখিদের বিশ্বাস করে ঠিকই, কিন্তু প্রত্যেকের আইডি কার্ড করে দিয়েছে। আমরা রাজহংস… রাজবংশের মতন আমাদের পরিচয়। আমাদের কেউ আটকাতে পারে না।”
“বেশ, শোনো তবে, তোমাদের দুটো কাজ করতে হবে। প্রথম কাজ হল কৃষ্ণের ছেলের হয়ে ঘটকালি করতে হবে। প্রদ্যুম্নের ব্যাপারে প্রভাবতীর কানে মধু ঢালতে হবে।”
“মধুর খরচ আপনার, আমরা মধু আনতে পারব না!”
“ধ্যাত্তেরি, মধু ঢালার মানে হল ভালো ভালো কথা বলতে হবে। এমনবভাবে বলতে হবে যেন মনে হয় প্রদ্যুম্নের থেকে বেশি সুপুরুষ আর বড় বীর কেউ নেই!”
“হয়ে যাবে কাজ। আর দ্বিতীয় কাজ?”
“বজ্রনাভর কাছে ভদ্রের থিয়েটার গ্রুপের খুব প্রশংসা করতে হবে। যাতে বজ্রনাভ খুশি হয়ে তাদের ডেকে নেয় বজ্র শহরে।”
রাজহংসরা রাজি হয়। আর সেইমতন বজ্র শহরে উড়ে যায়। সেখানে রাজকুমারী প্রভাবতীর বারান্দায় ল্যান্ড করেই রাজহংসেরা “ক্যা-কোঁ” করে ডাকতে শুরু করে।
যা-ই বলুন, রাজহংস দেখতে যতটা সুন্দর হয়, তাদের গলার স্বর ততটাই উৎকট হয়। তার উপরে কী মেজাজ, বাপরে বাপ! একবার তো তেড়ে এসে আমাকে কামড়ে দিয়েছিল। কোথায় আর কেন, সে অন্যদিন বলব নাহয়। এখন গল্পে ফিরি। রাজহংসদের ওরকম বাজখাঁই শব্দ শুনে প্রভাবতীর সখীরা তো তাদের তাড়িয়েই দিচ্ছিল, কিন্তু প্রভাবতী রাজহংসদের ভাষা জানত। স্কুলে আর কলেজে থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল হয়তো। ওই ল্যাঙ্গুয়েজের জোরেই প্রভাবতী ল্যাং খেল। মানে রাজহংসরা তার কাছে প্রদ্যুম্নের এমন প্রশংসা করলে, যে প্রভাবতী প্রদ্যুম্নের প্রেমে পড়ে গেল। মানে তখনকার মহিলাদের কোনও চয়েস বলেও কিছু ছিল না। একটা মানুষকে দেখল না, চিনল না, জানল না… স্রেফ রাজহংসের কথায় প্রেমে পড়ে গেল। মানে একটা লিমিট থাকে। শেষে পাখিদের কথা শুনে প্রেমে পড়তে হল প্রভাবতীকে? কীরকম ফ্রাস্ট্রেটেড ছিল সে? হয়তো বজ্রনাভ মেয়েকে কোনো পুরুষের সাথে মিশতে দিত না। প্রভাবতীর তাই অবস্থা এমন হয়েছিল হয়তো যে, রাজ্যের যে কোনও পুরুষ প্ৰেম প্ৰস্তাব দিলেই ‘হ্যাঁ’ করে দিত। দেয়নি বলে রাজহংসের মুখের কথায় প্রেমে পড়ে গেল। রাজহংসগুলোকেও বলিহারি, ঘটকালি করতে যাচ্ছিস, একটা ছবি-টবি নিয়ে যা। না, সে গিয়ে ওখানে কাব্য আউড়াচ্ছে। বিয়ের পরে যদি কাব্যের সাথে সাক্ষাৎ প্রদ্যুম্নের চেহারা-চরিত্র না মিলত, তখন প্রভাবতী কী করত?
এসব প্রশ্ন করা বারণ। কারণ প্রদ্যুম্ন কৃষ্ণপুত্র, আর সেটাই যথেষ্ট। পুরাণকারেরা এরকমভাবেই স্ট্যাম্প মেরে ভালো ও খারাপ দাগিয়ে দিয়েছেন। এখানে প্রশ্ন করা যাবে না, এবং করলেই আপনি পাপী। আর বেশি যদি যুক্তি ব্যক্ত করেছেন, তো সবই লীলা। যা-ই হোক, প্রভাবতীর উপরে প্রভাব খাটিয়ে রাজহংসগুলো সোজা চলে যায় বজ্রনাভর কাছে। সেখানে গিয়েও সেই একই “ঘ্যা-ঘোঁ” করে ভদ্র থিয়েটারের নামে প্রশংসা করে। বজ্রনাভও সেই ভাষা বুঝত। রাজহংসদের নেতা সূচীমুখী বলে, “কাকা, আপনি জানেন না, ভদ্র থিয়েটার কোম্পানি কী মারাত্মক লেভেলের অ্যাক্টিং করে। কোথায় লাগে থ্রিডি সিনেমা? চোখের সামনে ঝিঙ্গালালা চলবে পুরো। যেন নাটকের সাথে ম্যাজিক!”
“বুঝেছি বুঝেছি,” বজ্রনাভ বলে, “ওরা উত্তরজুরু, ভদ্রাশ্ব, কেতুমল আর কলাম্রতে আমাদের যে দানবরাজ্যগুলো আছে, সেখানেও পারফর্ম ‘ক’ এসেছে। ওদের খুব নামডাক শুনেছি। এখানেও ওদের ডাকা হোক। নাটক ভালো লাগলে সোনা-দানা-হীরে-জহরতে মুড়ে দেব।”
যাদবদের সোনা-দানা দরকার ছিলনা। তাদের দরকার ছিল বজ্র শহরে এন্ট্রি পাওয়ার। সেটা পেয়ে গেল। ভদ্রের থিয়েটার কোম্পানির অভিনেতা সেজে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। অসুররা তাদের চিনতে না পেরে বেশ আদর-যত্ন করে থাকতে দিল। তারা নাটকও করল সাংঘাতিক। স্টেজের উপরে, আবার স্টেজের বাইরেও। একে ভদ্রর সেই রূপ পরিবর্তন আর আকাশ বাতাসে চলার বর, তার উপরে প্রদ্যুম্নের মায়া।
অসাধারণ নাটক দেখানো শুরু হয়ে যায়। একেকদিন একেকটা। অসুররা এরকম নাটক জন্মে দেখেনি। কী তার ডায়লগ, কী তার স্পেশাল এফেক্ট।
এইখানে একদিন রামায়ণ অভিনয় করে দেখানো হয়। এবং এখানেই আপনি পাবেন রামায়ণের উল্লেখ। রামায়ণ যে মহাভারতের সময়ের অনেক আগের ঘটনা, সেটা এখানেই প্রমাণ হয়, কারণ এই সময়ে রামায়ণের ঘটনাকে নাটক রূপে মঞ্চস্থ করা হয়েছে। এখানে ভাবলে আরও একটা কথা মনে হয়। যদি তখনকার দিনে শুধু শ্রুতিই ছিল, তাহলে এই নাটক কি মুখে মুখে প্রচার হল? না, সেটা হতে পারে না, নিশ্চয় রামায়ণ ও আরও যা নাটকের উল্লেখ রয়েছে, সেগুলো লেখা হয়েছিল। প্রশ্ন হল, কোন ভাষায় লেখা হয়েছিল? সংস্কৃত তো পাণিনি শুদ্ধ করেছিলেন, তাহলে মহাভারতের সময়ে কোন লিপি প্রচলিত ছিল? সেই লিপি নিশ্চয় এতটাই উন্নত ছিল যে, নাটক রচনা করা যেত। নাটকের জন্য ছন্দ-তাল-মিটার-গল্প-ঘটনার প্রবাহ সমস্ত কিছু লাগে। একবার নাট্যশাস্ত্রের ইতিহাসটা দেখতে হবে। মোদ্দা কথা, সেই লিপি হারিয়ে গেছে।
লিপি নিয়ে জ্ঞান দিতে গিয়ে গল্প অন্যদিকে চলে গেছে। গল্পে ফিরি। নাটকের ফাঁকে ফাঁকেই প্রদ্যুম্ন মায়া বিস্তার করে প্রভাবতীর উপরে নিজের প্রেমের প্রভাব খাটিয়ে ফেলেছে। লোকে দেখত প্ৰদ্যুম্ন স্টেজে নাটক করছে, বাকি অভিনেতাদের সাথে থাকছে, কিন্তু আসলে সে প্রভাবতীর সাথে থাকতে শুরু করে। থাকতে থাকতে একদিন দুম করে গান্ধর্ব মতে বিয়েও করে ফেলে, আর তারপরে ইয়েও করে ফেলে। আরে বিয়ের পরে ইয়ে। সেটা আবার প্রভাবতীর দুই সখী চন্দ্রাবতী আর গুণবতী দেখে ফেলে। তাদের আবার গদা (অস্ত্র না, কৃষ্ণের এক ভাই) আর শাম্ব (কৃষ্ণের আরেক বিখ্যাত ছেলে) বিয়ে করে ফেলে। গদা বিয়ে করে চন্দ্রাবতীকে আর শাম্ব বিয়ে করে গুণবতীকে।
একসাথেই তিন সখী সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ে এবং সন্তানদের জন্মও দিয়ে দেয়। গদা আর চন্দ্রাবতীর ছেলের নাম চন্দ্রপ্রভ। শাম্ব আর গুণবতীর ছেলের নাম গুণবান। আর প্রদ্যুম্ন ও প্রভাবতীর এক পুত্রসন্তান হয় লেখা আছে ঠিকই, কিন্তু তার নাম যে কী সেটা স্পষ্ট নয়। অনেকে বলে এই পুত্রই হল অনিরুদ্ধ। কিন্তু আবার অনিরুদ্ধকে বেশিরভাগ জায়গাতেই বলা হয়েছে প্রদ্যুম্ন ও রুক্মাবতীর সন্তান। মোট কথা অনিরুদ্ধ প্রদ্যুম্নের পুত্র ঠিকই, কিন্তু তার মা যে কোনটা সেটা নিয়ে একটু ধোঁয়াশা আছে।
যা-ই হোক, এসবে বজ্রনাভর মাথাব্যথা নেই। বড়ই লিবেরাল বাবা। কন্যা ও তার সখীরা শত্রুদের দ্বারা প্রেগন্যান্ট হয়ে যাচ্ছে, আর তাদের ঘরেই পড়ে থাকছে, কিন্তু বজ্রনাভর সেসব দিকে খেয়াল নেই। সে নাটক-টাটক দেখে ব্যস্ত হয়েছে, কবে তার বাবার তপস্যা শেষ হবে। সেই অর্থে একখান যজ্ঞ সেরে ফেলল। যজ্ঞে আবার সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় আবার যাদবেরা নাটক করল। উফফ, চারিদিকে নাটক। আমার মনে হয় এই গল্পটাকেই একটু অন্যভাবে বানিয়ে ট্রয়ের কাঠের ঘোড়ার গল্প বানানো হয়েছে। সেখানেও তো উপহার পেয়ে উৎসব করে শত্রুদের শহরে প্রবেশ করানো হয়েছিল। তারা প্রবেশ করে সব ছারখার করে দেয়। যাদবেরাও বজ্রনাভর বজ্র শহর ছারখার করার প্ল্যান কষে ফেলল।
অতঃপর যজ্ঞ শেষে যেই বজ্রনাভ স্বর্গ আক্রমণ করবে বলে সেনা সাজাতে লাগল, অমনি প্রদ্যুম্ন, গদা, শাম্ব সহ বাকি নাটক কোম্পানির যাদবেরা উলটো যুদ্ধ ঘোষণা করে দিল। আমি ভাবি, মাইরি বজ্রনাভ কীরকম হুব্বাটাই না হয়েছিল। স্বর্গলাভ করবে বলে সেনা সাজাচ্ছিল, তার ফাঁকে কিঞ্চিৎ আনন্দ অনুষ্ঠান করাচ্ছিল, সেই অনুষ্ঠানের কলাকুশলী শিল্পীরাই কলা দেখিয়ে যুদ্ধশিল্পী হয়ে গেল? এই কলাকুশলী হিসেবে প্রবেশ করে ভিলেনকে মাত করে দেওয়া, এই ঘটনা বহু-বহুবার চলচ্চিত্রে দেখেছি আমরা। বিশেষ করে আশির দশকের সিনেমায় তো প্রায়ই নায়ক-নায়িকারা বানজারা বা ড্যান্স পার্টি সেজে ভিলেনের ডেরায় ঢুকে তাকে ঘেরাও করত। সে ‘শান’ সিনেমায় ‘ইয়াম্মা-ইয়াম্মা’ গান হোক, বা ‘ডন’ সিনেমায় ‘আরে দিওয়ানো’ হোক বা ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’য় ‘হাওয়া হাওয়াই’ হোক। এই ফর্মুলা প্রচুর ব্যবহার হয়েছে। একটা সময়ে তো হিন্দি সিনেমায় ক্লাইম্যাক্সের ঝাড়পিটের আগে একটা নাচ-গান রাখার নিয়ম হয়ে গেছিল প্রায়। এমন একটা গান যেখানে হিরো/হিরোইন ভিলেনকে ঠেস দিয়ে দিয়ে গাইছে, কিন্তু ভিলেন বুঝছে না। অবশ্য শাকাল বুঝে গেছিল। কোনোদিন ফাজিলের ফিল্মচর্চা লিখলে এসব বিস্তারিত লিখব।
যা-ই হোক যুদ্ধ শুরু, আর শুরু হতেই কৃষ্ণের কাছে খবর চলে গেল। যাদবরা বজ্রনাভর বিরুদ্ধে যুদ্ধের একটা ছুতো পেয়েছে, সকলে রে-রে করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সরগমে আরও ছ-টা সুর থাকতে শুধু ‘রে-রে’ করেই সবাই তেড়ে আসে কেন বুঝি না। হয়তো ‘সা-সা’, ‘গা-গা, ‘নি-নি’ করে তেড়ে গেলে সেই আবেগটা হত না। ‘মামা’, ‘পাপা” বললে অবশ্য সম্পর্কের ডাক হয়ে যেত, আর ধা-ধা গাইলে ধাঁধায় পড়ে যেত। যুদ্ধ নাকি দাদাগিরি ?
কী ফালতু বকছি মাইরি, মাথাটা গেছে আমার। ওদিকে যুদ্ধ শুরু। কৃষ্ণ নিজের রথ গদাকে দিয়ে দিল, ইন্দ্র ঐরাবতকে দিয়ে দিল প্রদ্যুম্নকে। সাথে আবার নিজের ছেলে (অর্জুন না) জয়ন্তকে প্রদ্যুম্নের সাহায্যে পাঠিয়ে দিল। বজ্র শহরের ভিতরে প্রদ্যুম্ন সহ বাকিরা দানবদের কেলাচ্ছে, আবার শহরের বাইরে কৃষ্ণ সহ বাকিরা পেটাচ্ছে। বেচারা বজ্রনাভ বুঝে উঠতেই পারে না, তার দোষ কী? যাচ্ছিল স্বর্গ জয় করতে, নাহয় ইন্দ্রের থেকে মার খেত, মাঝখান থেকে যাদবরা এসে তুলোধোনা করছে কেন? লজিকে মাতৃ-মাতৃস্বসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মারপিট শুরু করে দিল। আগে যুদ্ধ করি, পরে ভাবা যাবে কেন যুদ্ধ হচ্ছে। ভাবটা এরকম। আর সেই ব্যাপক কিন্তু ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যেই প্রদ্যুম্ন তার বাবার সুদর্শন চক্র নিয়ে বজ্রনাভকে ঝ্যাক করে ফাঁক করে দিল। বজ্রনাভ শেষ, ইন্দ্ৰ নিশ্চিন্ত, প্রদ্যুম্ন তৃতীয় বউ পেল। কশ্যপের বয়েই গেল। কত ছেলেপুলে আছে তার।
প্রদ্যুম্নের এই প্রকারে তিনটে বিবাহ হয়। এবং তার সন্তান হয় অনিরুদ্ধ। এই অনিরুদ্ধ আবার পুরো তার দাদুর গুণ আর রূপ পেয়েছিল। লোকে তাকে কৃষ্ণ বলেই ভুল করত প্রায়ই। অনিরুদ্ধকে বিষ্ণুর জ্ঞান অবতার বলা হয়। একসাথে কৃষ্ণ, বলরাম, প্রদ্যুম্ন ও অনিরুদ্ধকে বিষ্ণুর চতুর্বহ রূপ বলা হয়। মানে কৃষ্ণ পূর্ণ অবতার, আর বাকি তিনজন অংশ অবতার। একইসাথে একইসময়ে ধরাধামে এসেছিল। এসব ভক্তির ব্যাপার। আমাদের অত ভিতরে না ঢুকলেও হবে। আমরা অনিরুদ্ধর সঙ্গে জড়িত কিছু ঘটনা জেনে রাখি এইবেলা।
অনিরুদ্ধ বড় হতে তার সাথে রুক্মীর নাতনি রোচনার বিয়ের কথা হয়। এখানে ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লাগে। কৃষ্ণ রুক্মিণীকে বিয়ে করে, রুক্মী তাহলে কৃষ্ণের শ্যালক। কৃষ্ণ আর রুক্মিণী তাদের ছেলে প্রদ্যুম্নের বিয়ে দেয় রুক্মীর মেয়ের সাথে। অর্থাৎ প্রদ্যুম্ন তার মামার মেয়েকে বিয়ে করে। আবার প্রদ্যুম্ন আর রুক্মাবতীর পুত্র অনিরুদ্ধের সাথে রুক্মীর এক নাতনি রোচনার বিয়ে হয়। কী অদ্ভুত সম্পর্ক রে বাবা! ফার্স্ট কাজিন, থার্ড কাজিন সব গুলিয়ে গেছে। যা-ই হোক, বিয়ের কথা যখন উঠেছেই, তখন বিয়ের আয়োজনও শুরু হয়ে গেল।
ধুমধাম করে দ্বারকায় বিবাহ অনুষ্ঠান চলছে। রাজা-রাজড়া-পাণ্ডব-কৌরব সবাই এসে হাজির। কৃষ্ণের নাতির বিয়ে বলে কথা। গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন হবে না? প্রচণ্ড হইহল্লা আর উৎসব চলছে। আর এরই মধ্যে টাইমপাস করার জন্য চলছে নানারকম খেলা। তখনকার বিয়ে-টিয়ে এরকম চারদিনের প্রোগ্রাম হত না।
রাজার ছেলে বা নাতির বিয়ে চলত মাসখানেক ধরে। অতিথিদের জন্য আলাদা আলাদা তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা করা হত। তাও আবার রাজকীয়ভাবে। দেশদেশান্তর থেকে দামি দামি জিনিস আর উপহার আনা হত। এলাহি ব্যাপারস্যাপার। আর এই যে এতদিন ফুর্তি করবে, তার মাঝে একটু বিনোদন হবে না ? নাটক দেখা, খেলাধূলা সবই চলত।
সেরকমভাবেই পাশাখেলার আয়োজন হয়েছে। রুক্মীর সাথে বলরাম খেলছে। বাকিরা তাল দিচ্ছে। মানে পাশ থেকে বলছে, “ওই ঘুঁটিটা দে… এহে পুট পড়ল… ইসস এভাবে যদি খেলতিস!”
তারই মধ্যে রুক্মী ফুট কাটে, “এহ, বলরাম তুই আবার পাশা খেলার কী বুঝিস?”
“মানে?” বলরাম বলে, “আমি পাশা খেলতে জানি না?”
“না… চিরকাল তো গোরু চরিয়ে আর কুস্তি করেই কাটিয়ে দিলি,” রুক্মী বলে, “এসব রাজ-রাজড়াদের খেলা। তুই আদৌ নিয়ম-টিয়ম জানিস?”
“আয়, তবে একহাত খেলে দেখা,” বলরাম বলে।
রুক্মী চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে, আর তারপর বাজেভাবে বলরামের কাছে হেরে যায়। হেরে গিয়ে রুক্মী বলে, “এটা কী হল ?”
“কেন? নিয়ম মেনেই খেলা হল,” বলরাম বলে।
“তুই নিশ্চয় কিছু চিটিং করেছিস,” রুক্মী বলে।
রুক্মীর তাঁবেদার করা মোসায়েবরা তাল মেলায়, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বলরাম নিশ্চয় কিছু চিটিং করেছে।”
বলরাম দাঁত কিড়মিড় করে। সঙ্গে সঙ্গে আকাশবাণীতে ঘোষণা হয়, “বলরাম চিটিং করেনি।”
“অ্যাই কে রে?” রুক্মী আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “হতভাগা থার্ড আম্পায়ার কোথা থেকে এল ?”
সব চুপচাপ। রুক্মী বলরামকে বলে, “এবারে আমার খেল দ্যাখ… এই দিলাম ঘুঁটি!”
দান পড়ে, রুক্মী ঘুঁটি এগিয়ে দিয়েই বলে, “জিতে গেছি…”
বলরাম বলে, “ওমা… ও কী? ও কী? তোর এক ছক্কা পুট পড়ল, আটঘর দিলি যে? সাতঘর হবে তো…” তুই
“কই সাতঘর?” রুক্মী ফট করে ছক্কা পালটে দুই করে দিয়ে বলে, “এই তো দুই।”
“চিটিং করেছিস,” বলরাম রেগে যায়।
আবার আকাশবাণী হয়, “হ্যাঁ, রুক্মী চিটিং করেছে।”
“আচ্ছা মুশকিল তো,” রুক্মী আকাশের দিকে ঘুসি পাকিয়ে বলে, “হতভাগা কোন দেবতা এখানে খেলা দেখে বলরামের পক্ষে জাজমেন্ট দিচ্ছে রে? কাজ নেই? এরা দুই ভাইয়ে যখন চিটিং করে তখন কোথায় থাকিস?”
“আমরা কীসের চিটিং করেছি?”
“ওসব চিটিংবাজি তুই আর তোর ভাই করে।”
“রুক্মী মুখ সামলে,” বলরাম বলে।
“যাঃ যাঃ…তোরা যেভাবে জরাসন্ধ, শিশুপাল, শৃগাল বাসুদেব আর পৌণ্ড্রককে মেরেছিস, সেগুলো চিটিং ছাড়া কী?”
“ওসব দরকার ছিল, তোর বোধগম্য নয়…”
“ঠগবাজদের আবার বড় বড় কথা,” রুক্মী বলে, “চাষাভুষো রাখাল, ফাঁকতালে রাজা হয়ে গেছে, আমাদের খেলা শেখাচ্ছে…”
“বটেই তো বটেই তো, কোথাকার চাষাভুষো রাখাল, ফাঁকতালে রাজা হয়ে গেছে, আমাদের খেলা শেখাচ্ছে!” তাঁবেদাররা তাল মেলায়।
বলরাম রেগে গিয়ে আর থাকতে না পেরে চেঁচিয়ে ওঠে, “গদা নিয়ে আয়!”
“কী আনব?” সেই কৃষ্ণের ভাই গদা বলে।
“আহ, তোকে ডাকিনি… আমার গদাটা কই?” বলরাম বলে।
“ওই তো… তোর পাশেই। ঠকাতে ঠকাতে এখন গদাও চিনতে পারছিস না?” রুক্মী বলে।
বলরাম দুম করে গদা তুলে রুক্মীর মাথায় ধাঁই করে বসিয়ে দেয়। রুক্মী ওখানেই কোঁক করে শব্দ করে ঢোক গিলে মরে গেল। বলরাম বলল, “আর কার কার মনে হচ্ছিল, আমি চিটিং করেছি?”
“কী অন্যায় … বলরাম কি চিটিং করতে পারে?” তাঁবেদাররা সমবেতভাবে বলে, “রুক্মীটা পাজি ছিল। বলরামকে নাকি সন্দেহ করে?”
খেলা সেখানেই সমাপ্ত হয়। পাশা খেলাও, আর রুক্মীর খেলাও। তবে আশ্চর্য লাগে, বিয়েবাড়িতে একটা লোক মার্ডার হয়ে গেল, আর তাই নিয়ে কারোর কোনো হেলদোল হল না? আবার যে সে লোক নয়, পাত্রীর দাদুকে পাত্রের কাকাদাদু মেরে দিল। কিন্তু কারোর কিছু উৎপাটিত হল না। বিয়ে আর অনুষ্ঠান একইভাবে চলল। কারোর ফুর্তি কমল না। আমার অবশ্য মনে হয় রুক্মীকে নিয়ে সকলেই কমবেশি বিরক্ত ছিল। মহাভারতের যুদ্ধ মনে করে দেখুন, রুক্মীর অহং দেখে পাণ্ডব বা কৌরব কেউই তাকে নিজেদের দলে নিতে চায়নি। ব্যাটা ছিলই ওরকম অহংকারী আর যেখানে সেখানে যা ইচ্ছে তাই বলত। তাই বলরাম ওকে মেরে দেওয়াতেও কারোর কিছু গেল-এল না। তার উপর বয়সও হয়েছিল নিশ্চয়। বুড়ো অবস্থায় মরে গেছে গদার ঘা খেয়ে। ব্যস।
অন্যদিক দিয়ে ভাবলে এটাও বোঝা যায় যে কৃষ্ণ-বলরামের অধীনে যাদববংশ এতটাই শক্তিশালী হয়েছিল যে, কৃষ্ণ বা বলরামের কাজ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে সেখানেই শেষ করে দেওয়া হত। শিশুপালও একই ভুল করেছিল, কিন্তু কেউ কৃষ্ণকে দোষী বলেনি। পরবর্তীকালে সমস্তকিছু ভক্তির চশমা দিয়ে দেখিয়ে লীলা বলা হয়েছে, কিন্তু যদি সত্যিই ইতিহাস হিসেবে দেখেন, তাহলে কিন্তু সত্যিই ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে।
গল্পে ফিরি। অনিরুদ্ধর প্রথম বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু সেই যে বললাম, এই প্রদ্যুম্নের বংশের উপরেই কৃষ্ণের ভরসা ছিল, যে বংশ এই ধারাতেই বেঁচে যাবে, তাই অনিরুদ্ধর দ্বিতীয় একটি বিয়ের উপক্রম করা হয়। তবে সেটা সোজা হয়নি। ঘটনাটা বলি। ঘটনা শুরু হয় বলির ছেলে বাণাসুরকে দিয়ে। বলি দেওয়া ছেলে না। বলিরাজার ছেলে। প্রহ্লাদের নাতি বলিরাজা, যার থেকে তিনপদভূমি নিতে গিয়ে বিষ্ণুর বামন অবতার সবই নিয়ে নিয়েছিল। বিখ্যাত বংশ।
সেই বাণাসুর একদিন কার্তিক ঠাকুরের সাথে খেলছিল। পাশা না হাডুডু, কী খেলছিল সেটা লেখা নেই, কিন্তু কার্তিককে পার্বতী মা ডেকে নেয়। তাই দেখে বাণাসুরের খুব মনে হয়, “আহা, মা পার্বতী যদি আমারও মা হতেন…”
এই ভাবনায় কোনো পাপ নেই। সত্যিই খুব মিষ্টি ভাবনা। সেই ভাবনা থেকেই শিবঠাকুরের সাধনায় বসে গেল বাণাসুর, আর কিছুদিন পরেই আশুতোষ শিবঠাকুর এসে বলল, “বল, কী চাস?”
“আজ্ঞে আমি পার্বতীমায়ের সন্তান হতে চাই,” বাণাসুর বলে।
“তাহলে তো তোকে একবার মরতে হবে… বল কীভাবে মরতে চাস?”
“না না, মরিতে চাহি না এই সুন্দর ভুবনে,” বাণাসুর বলে।
“না মরলে ছেলে হয়ে জন্মাবি কী করে?” শিবঠাকুর বলে।
“আহা আমাকে দত্তক নিয়ে নিন। ওটাই বর!”
শিবঠাকুর পার্বতী মাকে ডেকে বলে, “ওহে, বলি যে এই বলির ছেলেটা তোমার ছেলে হতে চাইছে। তুমি রাজি?”
“পৃথিবীর সকলেই তো আমার সন্তান,” পার্বতী মা বলে, “নতুন করে আর কী সন্তান হবে?”
“না ঠিক সেরকমও না,” বাণাসুর বলে, “ত্রিভুবনে সকলে জানবে আমি আপনাদের সন্তান, আর আপনারা আমাকে সন্তানের মতনই আগলে রাখবেন।”
“বেশ, এটা এমন কিছু বর নয়,” শিবঠাকুর বলে, “তোর হাজারটা হাত হবে, আর তুই শোণিতপুরে গিয়ে রাজত্ব করবি। তোর বিপদে আমি আসব।”
গুডবয় বাণাসুর শোণিতপুরে এসে রাজা হয়ে বসে। কিন্তু শিবের বর পেয়েই ব্যাটা বর্বর হয়ে যায়। শিবের ব্যাটা হয়ে সে অন্যদের হ্যাটা করা শুরু করে। তাকে কেউ কিছু বললেই ঝ্যাঁটা হাতে দৌড়ে আসে। দেবতা-যক্ষ-গন্ধর্ব সবাই তার জ্বালায় অতিষ্ঠ। কেউ যুদ্ধ ঘোষণা করলেই বাণাসুর শিবঠাকুরকে ডাকত, আর শিবঠাকুর এলেই বাকিরা ভয়ে পালাত। শিব যাকে রক্ষা করছে তার ক্ষতি করে কার সাধ্য? সাধ্য নেই বলেই অন্যদের শ্রাদ্ধ করতে থাকে বাণাসুর।
ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে দেখে শিবঠাকুর একদিন বাণাসুরকে হালকা করে ওয়ার্নিং দেয়, “এরকম উড়িস না, কোনদিন ঝরে পড়বি!”
“পড়লে আপনি রক্ষা করবেন পিতা,” বাণাসুর বলে।
“আমি রক্ষা করব ঠিকই, কিন্তু কোনোদিন কেউ আমাকে হারিয়ে দিলে, তোরও সর্বনাশ হবে,” শিবঠাকুর বলে।
“আমি তাহলে নিজে যুদ্ধে যাব না। সবাই তো আমার ভয়ে তটস্থ!”
“তোর শহরে ময়ূরধ্বজ যেদিন ভেঙে পড়বে, সেদিন জানবি তোকে যুদ্ধে যেতে হবে।”
শিবঠাকুরের কথা শুনে বাণাসুর হেব্বি খুশি হয়। শোণিতপুরে এসেই বাণাসুরের ডানা গজায়। ধ্বজা না ভাঙলে তাকেও কেউ ভাঙতে পারবেনা। ধ্বজাকে ভালোভাবে সিমেন্ট বালি দিয়ে বাঁধিয়ে আরও মজবুত করে দিল। ভাবখানা এমন, যেন দেখি কে ভাঙে আর যুদ্ধে ডাকে। এইরকমভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে সে সকলের উপরে জোর খাটাতে থাকে।
এদিকে সেসব জোরের জোরদার খবর ইন্দ্রের কাছে পৌঁছয়। ইন্দ্র দেখে কেস করেছে, আবার একজন পোটেনশিয়াল অসুর, এসেনশিয়াল বর পেয়ে শিয়ালের মতন তার সিংহাসনের দিকে পা বাড়াচ্ছে গুটি গুটি। এ আবার তপস্যাও করছে না। উলটে নিজের রাজধানীতে বসে আছে। কী করা যায়? ইন্দ্র যায় কৃষ্ণের সাথে পরামর্শ করতে। ভাই, হরিবংশ লিখছি, এখানে সবকিছুর সলিউশন কৃষ্ণের কাছেই থাকতে হবে। অন্য কোনও দেবতার পুরাণ লিখলে হয়তো তার কাছে সলিউশন চাইতে যেত ইন্দ্র। তবে বাণাসুরের গডফাদার যেখানে শিবঠাকুর সেখানে বিষ্ণু বা তার অবতার কৃষ্ণ ছাড়া কেউ সলিউশন দিত বলে মনে হয় না। দিলে হয়তো কামদেবের মতন তন্দুরী হয়ে যেত।
যা-ই হোক, ইন্দ্রের সমস্যা শুনে কৃষ্ণ বলে, “আবার সেই বজ্রনাভ মার্কা কেস নিয়ে এসেছ। এই বাণাসুর তো তোমার এখনও কিছু ক্ষতি করেইনি। আমাদের যাদবদেরও করেনি। অপেক্ষা করো, যতদিন না একটা ঝামেলা পাকাচ্ছে।”
ইন্দ্ৰ হাত কচলে বলে, “আজ্ঞে, সে আপনিই পাকিয়ে দিন না!”
“রোসো,” কৃষ্ণ বলে, “ঝামেলা একটা হতে চলেছে”
উপরোক্ত কথোপকথন পুরাণে লেখা নেই, কিন্তু আমি শিওর এরকম আলোচনা হয়েছিল। যা-ই হোক, ঝামেলা সেই হলই, কিন্তু অন্যদিক থেকে। বাণাসুরের কন্যা ঊষার দিক থেকে। ঊষা একদিন ভোরবেলায় ঝিলে স্নান করতে গিয়ে ঝিল কে উসপার শিব-পার্বতীর জলকেলি দেখে ফেলে। এটা এমন এক দৃশ্য যা দেবতাদেরও দেখা বারণ। সেই সেবার, শরবনে পার্বতী মায়ের সাথে শিবকে দেখে ফেলে ইলা অভিশাপ পেয়েছিল। এইবারে আবার ঊষা দেখে ফেলেছে।
কিন্তু ঊষা অভিশাপ পায় না, কারণ হয়তো সে শিব পার্বতীর নাতনি হয়। আহা বাণাসুর যদি পুত্র হয় তাহলে ঊষা তো নাতনিই হবে। তাই এই স্বৰ্গীয় দৃশ্য দেখার জন্য ঊষা বর পায়। পার্বতী মা বলে, “বল কী বর চাস?”
ঊষা বলে, “আমিও এমন বর চাই যে আমাকে এমন ভালোবাসবে, যেমন শিবঠাকুর আপনাকে ভালোবাসে। আর দেখতেও টল-ডার্ক-হ্যান্ডসাম চাই!”
পার্বতী মা বর দিয়ে দেয়। ঊষা বরে বরই পায়। বররুচি না হলেও বর-রুচি তার ঠিকই ছিল। ঊষা বাড়ি এসে বাড়াবাড়ি ভাবে বর ও বরের কথা বলে। তার এক বান্ধবী বলে, “তোর বরকে দেখতে কেমন হবে?”
ঊষা বলে, “কে জানে? তবে হ্যান্ডসাম তো হবেই। দেবীমায়ের বর কি ফেলনা যাবে?”
“আচ্ছা, কেমন বর চাই বললে জানাস, আমি ছবি এঁকে দেব,” চিত্ররূপা বলে। এই চিত্ররূপার ক্ষমতা ছিল, অন্যের চিন্তা থেকে চিন্তন হওয়া মানুষকে বুঝে তার ছবি এঁকে ফেলা। চিত্রে রূপ দিতে পারত সে। এখানে সন্দেহ হয়, সত্যিই সে সখীর নাম চিত্ররূপা ছিল নাকি তার কর্ম অনুযায়ী তার নামকরণ করেছিলেন পুরাণকারেরা? ভাবার বিষয়।
সেই রাতে বরের চিন্তায় বড়ই নিমজ্জিত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ঊষা। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখে। ঘরের কোণে একটা মায়াবী আলো দেখতে পায়। সেই কোণে দেখা কনে-দেখা আলোতে সে এক পুরুষকে দেখতে পায়। তার রূপ কৃষ্ণের মতন, যেমন লম্বা চওড়া তেমনই হ্যান্ডসাম। ঊষা দেখেই বুঝে যায় ওই পুরুষই তার বর হবে। তাহলে কি সেটা কনে-দেখা আলো বলা যায়? বর-দেখা আলো বললে ভালো হয়।
সকালে উঠেই ঊষা সেই পুরুষের কথা বলে চিত্ররূপাকে। চিত্ররূপা নিজের মায়াপ্যাথি (মায়ার টেলিপ্যাথি) দ্বারা সেই পুরুষের রূপ এঁকে ফেলে। ঊষা সেই ছবি দেখে বলে, “আরিব্বাস, একদম পারফেক্ট হয়েছে। নাকটা একটু বোঁচা, কপালটা একটু চওড়া আর বাঁ চোখটা বুজে গেছে, কিন্তু মোটামুটি এই মানুষটাকেই দেখেছি!”
চিত্ররূপা বলে, “ও মায়াপ্যাথির সিগন্যালে একটু সমস্যা হয়েছে, তাই ট্যারাব্যাকা ছবি ডাউনলোড হয়েছে। কিন্তু এই লোকটাকে আমি চিনি। এটা কৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধ।”
“হ্যাঁ, তাহলে এই অনিরুদ্ধকেই আমার চাই,” ঊষা বলে, “তুমি আমার বিবাহ প্রস্তাব নিয়ে অনিরুদ্ধর কাছে যাও!”
“কিন্তু তোমার বাবা শুনলে থাবা মেরে হাবা করে দেবে।”
“ওসব জানি না, আমার অনিরুদ্ধকেই চাই। ওকে গিয়ে বলো, আমাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করুক!”
চিত্ররূপা বোঝে তার বান্ধবীর বিয়ে পেয়েছে। আজ্ঞে, এটা কোনো নতুন শব্দ নয়। মানুষের যেমন ক্ষিদে পায়, প্রকৃতির ডাক পায়, ঘুম পায়, বমি পায়, তেমনই বিয়েও পায়। বিয়েপাগলা লোকেদের তখন বিয়ে করার জন্য তনছুটি লাগে। বাড়ি বা বন্ধু কারোর কথা শোনে না। নিজের সর্বনাশ হইবে জানিয়াও যেইরূপ অগ্নির প্রতি পতঙ্গ ছুটিয়া যায়, সেইরূপ বিবাহিত জীবনের বিপদ জানিয়াও সেই বিবাহোন্মাদ ব্যক্তিরা বিবাহ করিবার নিমিত্তে দৌড়াইতে থাকে। উপরের লাইনটা গুরুচণ্ডালি করলাম না। ওটাকে সাধুভাষায় না লিখলে সেই ইয়ে ব্যাপারটা আসত না, যে ইয়েটা সমস্ত বিবাহিত পুরুষরা বোঝে।
সেই ইয়েটা চিত্ররূপা বুঝে তার সেই ছবিকে বগলদাবা করে চলল দ্বারকার দিকে। পুরাণে সম্ভবত প্রথমবার পাত্রী নিজে পাত্রের কাছে তার দূত পাঠাচ্ছে। যেখানে পাত্রী নিজেই শিওর না পাত্র তাকে গ্রহণ করবে কি না। ঊষার কনফিডেন্স আছে বলতে হবে। অসুরকন্যা তো তাই। আর্যকন্যা হলে এত সাহস হত না হয়তো। অবশ্য কুন্তী, অম্বা আর শূর্পনখাও পুরুষদের অ্যাপ্রোচ করেছিল। কিন্তু… থাক সেসব কথা।
দ্বারকায় পৌঁছেই চিত্ররূপার পুরো বোমচ্যাক লেগে যায়। মাইরি এতবড় নগর, সেখানের শাসকের পুত্রকে সে পাবে কী করে? তার সাথে দেখা হওয়াই তো চাপের। চিত্ররূপা ভাবনায় পড়ে। ঘুরতে ঘুরতে একটা সরোবরের পাশে দেখে নারদমুনি বসে আছে। এই নারদমুনিকে প্রায়ই দ্বারকায় আসতে দেখা যেত। মানে মহাভারত আর হরিবংশ দুটোকে একসাথে পাশাপাশি রেখে পড়লে মনে হয় দেবর্ষি নারদ মোটামুটি ওই সময়ে দ্বারকাতেই আস্তানা গেড়েছিল।
নারদকে দেখেই চিত্ররূপা তাঁকে প্রণাম করে বলে, “ও দেবর্ষি দাদু, একটু অনিরুদ্ধর সাথে দেখা করিয়ে দাও না!”
নারদ বলে, “কেন? ওকে কী দরকার?”
চিত্ররূপা সব খুলে বলে। মানে সব কথা খুলে বলে। আপনারাও না, যাতা একটা। আমার মতন সরল মনের মানুষ হুহু করে গল্প বলে যাচ্ছে, সেখানে অত শব্দ ধরলে হয় না। চিত্ররূপা ছবিটাও খুলে দেখায়। ছবি দেখে নারদ বলে, “অনিরুদ্ধর মতনই লাগছে বটে, খালি ডান কানটা গোরুর মতন হয়েছে, থুতনিটা গোল হয়ে গেছে, আর ভুরুগুলো বেশি মোটা হয়ে গেছে।”
“চেনা তো যাচ্ছে? ব্যস… আমার সাথে অনিরুদ্ধের দেখা করিয়ে দিন।”
নারদ চিত্রলেখাকে নিয়ে যায় অনিরুদ্ধর প্রাসাদে। ব্যাপার স্যাপারই আলাদা, সবার একটা করে প্রাসাদ। সেখানে অনিরুদ্ধ সিংহাসনে বসে আছে। তার চারিদিকে প্রচুর খাবার-দাবার, তোষণকারী, সেবাদাসী। সামনে নর্তকীরা ড্যান্স-দ্বারকা-ড্যান্সের নৃত্য পরিবেশন করছে। একজন বুড়ো মন্ত্রী সমানে “ক্যাবাত… ক্যাবাত…” করছে, আর মাঝেমাঝেই একটা মোটা বাচ্চা ছেলেকে চিমটি কাটছে। তাই দেখে বাকি সভাসদ হেসে এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে।
চিত্রলেখা সভায় ঢুকে বলে, “বাবাহ্, এ তো পুরো ছিঃ-বাংলা চ্যানেল খুলে বসেছে। কিন্তু অনিরুদ্ধর ওরকম মুখ ঝুলে আছে কেন?”
নারদ সরাসরি চিত্রলেখাকে অনিরুদ্ধর সামনে নিয়ে গিয়ে বলে, “এই যে কেষ্টর নাতি, মুখখানা বাংলার পাঁচ করে রেখেছ কেন?”
“মন খারাপ দাদু,” অনিরুদ্ধ বলে।
“কেন?” নারদ বলে।
“আমি স্বপ্নে এক কন্যাকে দেখেছি। তার প্রেমে পড়ে গেছি,” অনিরুদ্ধ বলে।
চিত্ররূপা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, “আমি কারোর ভাবনা থেকে দেখে অন্যের ছবি আঁকতে পারি।”
“বাহ বাহ, জীবন্ত চ্যাট জিপিটি যে!” অনিরুদ্ধ বলে।
“কীসব চ্যাটচ্যাটে ব্যাপার বললে?” নারদ বলে।
“ও আপনি বুঝবেন না নারদ দাদু,” অনিরুদ্ধ বলে, “চ্যাট জিপিটি হল এআই। যা বলবেন, বর্ণনা দিলেই ছবি এঁকে দেখিয়ে দেবে।”
“আমাকে বলতেও হয় না,” চিত্ররূপা বলে।
“ইয়ে, মানে তুমি কী তাহলে আমার মাথায় যাদের যাদের চিত্র আছে, সবই বুঝতে পারো?” অনিরুদ্ধ বলে, “বড়ই বিপদের কথা!”
“না না, যেটা আপনি পারমিশন দেবেন সেটাই।”
“আঁকো তাহলে,” অনিরুদ্ধ বলে।
চিত্ররূপা একটা খাতা আর পেন্সিল নিয়ে খসখস করে ছবি এঁকে ফেলে। তারপরে ছবি দেখে নিজেই হেসে ফেলে। অনিরুদ্ধ বলে, “এই মেয়ে হাসছ কেন? দেখি ছবিটা…”
অনিরুদ্ধ ছবিটা দেখে বলে, “মোটামুটি ঠিকই এঁকেছ, শুধু চোখটা কুতকুতে হয়েছে, একদিকে গাল ঝুলে গেছে আর গলাটা লম্বা হয়েছে। কিন্তু তুমি হাসছিলে কেন?”
“কারণ আমি এই মেয়েটার থেকে বিবাহ প্রস্তাব নিয়ে আপনার কাছে এসেছি,” চিত্ররূপা বলে, “এর নাম ঊষা।”
“উত্থুপ?” অনিরুদ্ধ বলে, “ঊষা উথুপ আমার বাবার ভক্ত।”
“ঊষা উত্থুপ কৃষ্ণ ভক্ত? জানা ছিল না তো?” নারদ বলে।
“ওমা, ওনার গাওয়া ‘হরি ওম হরি…উউউউউউ’ গান শোনেননি?” অনিরুদ্ধ বলে।
“না, এই মেয়ে ঊষা উত্থুপ না,” চিত্ররূপা বলে।
“তাহলে কি পি টি ঊষা?” অনিরুদ্ধ বলে, “দৌড়োবে?”
“পিটিয়ে তোমার ঊষার অন্য নাম খোঁজা বের করে দেব,” নারদ বলে, “চিত্ররূপা বলছে মেয়েটার নাম শুধু ঊষা, আর তুমি এসব বিখ্যাত লোকেদের টানছ?”
“আচ্ছা, আমি ঊষার প্রেমে পড়েছি। ঊষার ফ্যান হয়ে গেছি,” অনিরুদ্ধ বলে।
“ঊষার ফ্যান দোকানেই কিনতে পাওয়া যায়। আপনি প্রেমিক ও বর হলে ভালো হবে,” চিত্ররূপা বলে, “ঊষাও আপনার প্রেমে পাগল হয়ে আছে। এই দেখুন ওর চিন্তা থেকে আমি আপনার ছবি এঁকেছি।”
চিত্ররূপা সেই বগলদাবা ছবি দেখায় অনিরুদ্ধকে। অনিরুদ্ধ বলে, “হুমম… ভালোই হয়েছে, শুধু আমাকে ঘাড়ে-গর্দানে করে দিয়েছ, আর দাঁতগুলো মুলোর মতন হয়ে গেছে।”
“ধ্যাত্তেরি, আঁকাই ছেড়ে দেব,” চিত্ররূপা রেগেমেগে বলে, “আমি কি কালাচাঁদ নাকি যে আমার ছবি নিয়ে সবার মতামত একেকরকম চলছে?”
“আহা রাগ কোরো না,” অনিরুদ্ধ বলে, “তুমি আমাকে বলো, আমি ঊষাকে কীভাবে পেতে পারি?”
“আপনি শোণিতপুরে গিয়ে অসুররাজ বাণাসুরের সেনাকে হারিয়ে, ঊষাকে কিডন্যাপ করে আনুন।”
“ইয়ে, মানে ভালোভাবে গিয়ে কথাবার্তা বলে বিয়ে ফিক্স করলে হবে না?” অনিরুদ্ধ বলে।
“বাণাসুর দেবেই না! বড় বজ্জাত ও। তার উপরে শিব ঠাকুরের পুত্র। আপনি ঊষাকে ভালোবাসলে তাকে হরণ করে আনুন!”
অনিরুদ্ধ খুব উদ্বুদ্ধ হয়ে হরণ করার জন্য হর্ন লাগানো রথে চেপে বসে, সঙ্গে সঙ্গে শোণিতপুরের দিকে ধাবমান হল। একাই। প্রেমে পড়লে মানুষের বুদ্ধি-শুদ্ধি যে হারিয়ে যায় সেটার চূড়ান্ত প্রমাণ। অনিরুদ্ধ শোণিতপুরের কেল্লার বাইরে গিয়ে চেঁচায়, “কোথায় বাণাসুর? ডাকো তাকে…”
সেপাইরা কেল্লার উপর থেকে বলে, “এই ছোঁড়া, কেল্লার সামনে জেল্লা মারছ? বেরোও এখান থেকে!”
“আমি কাউকে ভয় পাই না,” ক্রুদ্ধ হয়ে অনিরুদ্ধ বলে, “বাণাসুরকে ডাকো, আমি তাকে যুদ্ধে হারাতে চাই।”
অনিরুদ্ধ চেঁচাতেই থাকে। কথাটা বাণাসুরের কানে যায়। বাণাসুর কেল্লার উপরে দাঁড়িয়ে বলে, “আরে, তোমাকে চেনা চেনা লাগছে। কে তুমি?”
অনিরুদ্ধ উলটে জিজ্ঞেস করে, “আরে তুমি কে? খালি তো একগাদা হাত দেখতে পাচ্ছি!”
বাস্তবিক, কোনো মনুষ্যের যদি হাজারটা হাত থাকে। আর ধরে নিই যদি হাতগুলো কাঁধ ছাড়িয়ে পিঠ দিয়েও বেরিয়েছিল, তাহলেও অত হাতের ভিড়ে পেট-পিঠ-গলা-মুখ-চুল কিছুই দেখা যাবে না। তাছাড়া শরীরের উপর ভাগে একহাজারটা হাতের ভার থাকলে সে মানুষ হাঁটতই বা কী করে? পা তাহলে হাতির পায়ের চারগুণ সাইজে হতে হত। যা-ই হোক, বাণাসুর নিজের হাজার হাতের ফাঁক থেকে মুণ্ডু বাড়িয়ে উঁকি মেরে বলে, “এই তো আমি!”
“কা তব কান্তা? কস্তে পুত্রঃ?”
“সংসারোহয়মতীববিচিত্রঃ… সংসার বড়ই বিচিত্র হে। কিন্তু এ তো আজব ছেলে,” বাণাসুর বলে, “আমার পরিচয় না জিজ্ঞেস করে সরাসরি আমার বউ-ছেলের কথা জিজ্ঞেস করছে? জনগণনার প্রতিনিধি নাকি? এই ছেলে, আমি গ্রেট বাণাসুর, আমি প্রহ্লাদের বংশধর!”
“বংশ ধরবে না ফেলে দেবে, সে তোমার ব্যাপার,” অনিরুদ্ধ বলে, “এখন আইস যুদ্ধ করহ!”
“আরে খামোকা যুদ্ধ করব কেন? আমি তোর কোন বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি?”
“আমার প্রেমিকাকে তোমার প্রাসাদে আটকে রেখেছ!”
“অ্যাঁ? আমার প্রাসাদে তো আমার বউ আর মেয়ে থাকে। বউয়ের তো এই বয়সে প্রেম করার কথা নয়। তাহলে কি ঊষা? এই কে আছিস, ঊষাকে ডেকে আন!” বাণাসুর হুকুম দেয়। সঙ্গে সঙ্গে কিছু পেয়াদা গিয়ে পালকিতে করে ঊষাকে নিয়ে আসে। বাণাসুর অনিরুদ্ধকে দেখিয়ে বলে, “ঊষা, তুই এই রাস্কেল ছেলেটার সাথে প্রেম করছিস?”
“সাবধান বাণাসুর!” অনিরুদ্ধ হুমকি দেয়, “আমাকে রাস্কেল বলা?”
“আরে তুই থাম তো। বাপ-বেটির কথা হচ্ছে,” বাণাসুর বলে, “বল ঊষা!”
“অনিরুদ্ধ আমার প্রাণ, আমার অন্তরের টান… ও আমার দিনের শান্তি, রাতের ঘুম। ও আমার ফুলগাছে বসন্তের ধুম। অনিইইইই… আমার হানিইইই…”
“তোমার কোনো হানি হতে দেব না আমি,” অনিরুদ্ধ বলে, “তার আগেই হানাহানি করে দেব। বাণাসুর, আমি কৃষ্ণের নাতি…”
“নাতি না হাতি,” বাণাসুর মুখ ভেংচে বলে, “কোথাকার কোন ছেলে এসে নিজেকে কৃষ্ণের নাতি বলে। আর কৃষ্ণের এক লক্ষ আশি হাজারটা ছেলে আছে। তুই কোন শাখার প্রশাখা থেকে বিশাখা কী করে জানব? যদিও চেহারায় কৃষ্ণের সাথে মিল আছে…”
“আমি প্রদ্যুম্ন পুত্র,” অনিরুদ্ধ বলে।
“চিনি চিনি… ম্যাজিশিয়ান প্ৰদ্যুম্ন… গিলি গিলি গে… তবুও এই বিয়েতে আমি রাজি নই,” বাণাসুর বলে, “প্রেম করে বিয়ে? ছি ছি, লোকে কী বলবে? আর এত টাইট সিকিউরিটির মধ্যেও তোরা প্রেমটা করলি কী করে?”
“আমরা স্বপ্নে একে অপরকে দেখেছি বাবা,” ঊষা বলে।
“হ্যাঁ, ঊষা আমার স্বপ্নচারিণী প্রেয়সী,” অনিরুদ্ধ বলে।
বাণাসুর নিজের হাজারটা হাত দিয়ে বিস্তর মাথা চুলকে নিজের মন্ত্রীদের দিকে খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে তারপরে বলে, “স্বপ্নে? স্বপ্নে লোকে দোষ পায় জানতাম, তাকে বলে স্বপ্নদোষ। স্বপ্নে ওষুধও পায়। দেবদেবীর দেখাও পায়। কিন্তু স্বপ্নে প্রেম পাওয়া? এ কেউ শুনেছে কোনোদিন?”
“চুপচাপ আমার সাথে ঊষার বিয়ে দিয়ে দাও। নয়তো আমি অনিরুদ্ধ, সবাইকে পিটিয়ে করব শুদ্ধ।”
“দ্বাররক্ষী করো দ্বার রুদ্ধ”
“তবে রে… এই দেখ… কেমন কায়দা পারি আমি… তোমাদের এই কেল্লা, দরজা, সৈন্য… সবার অবস্থা করে দেব দৈন্য,” এই বলেই সকলকে সাফ করার উদ্দেশ্যে অনিরুদ্ধ এক বিশাল লাফ দেয়। লাফ দিয়েই কেল্লার উপর উঠে পড়ার ইচ্ছে ছিল হয়তো, কিন্তু লাফটা কিঞ্চিৎ কম হয়ে যাওয়াতে কেল্লার দেওয়ালের গায়ে ঘুঁটের মতন ছ্যাপাত করে গোটা শরীর থেবড়ে, ঝপাত করে পড়ে যায় সে।
“গেল গেল গেল… আহ্ আজকালকার ছেলেপুলে,” বাণাসুর ব্যস্ত হয়।
“ওর কিছু হলে আমি বাঁচব না বাবা,” ঊষা বলে।
“আরে, এতে আমার দোষ কোথায়? ও ব্যাটাকে ওরকম লাফ দিতে কে বলেছিল? এখন শরীরে দুশো সাতটা হাড় ভেঙেছে বোধহয়। কে আছিস? সাবধানে তুলে আন ওকে।”
অচৈতন্য অনিরুদ্ধকে তুলে অন্দরমহলে নিয়ে আসা হয়। বাণাসুর অনিরুদ্ধ আর ঊষা দুজনকেই গৃহবন্দি করে। কী হবে আর দুজনকে আলাদা রেখে? আর অনিরুদ্ধর এই অবস্থায় সে ঊষার প্রতি কিছু করতেও পারবে না।
পুরাণে অবশ্য লেখা, অনিরুদ্ধ বহু অসুর সেনাকে হতাহত করার পরে তাকে বন্দি করা হয়, কিন্তু কী লজিকে তাকে ঊষার সাথে বন্দি করে রাখা হয় সেটা লেখা নেই। অনিরুদ্ধ আর ঊষা বন্দি অবস্থায় থাকে। সেখানে তারা মা কৌশিকীর আরাধনা করে, আর সেই ডাকে দেবী তুষ্ট হয়ে অনিরুদ্ধকে মুক্ত করে দিয়ে বলে, “বেকার একা বাওয়াল করতে যাস না, এখানে অপেক্ষা কর, তোর দাদু আসছে।”
মুক্ত হয়েও অনিরুদ্ধ কারাগারে থাকে। আহা, প্রেমিকা আছে পাশে, ফাঁকা কারাগার। কোন বোকায় মুক্ত হতে চায়?
এদিকে দ্বারকায় খোঁজ-খোঁজ রব পড়ে গেছে। সম্ভবত নারদের তখন অন্য কোনো কাজ পড়েছে, আর চিত্ররূপাও নেই। পুরাণে চিত্ররূপাই রাস্তা চিনিয়ে অনিরুদ্ধকে শোণিতপুরে নিয়ে যায়। অনিরুদ্ধ কোথায় উধাও হয়ে গেল? তাই নিয়ে হুলস্থুল পড়ে গেল। দিকে দিকে দূত আর গুপ্তচর ছুটল। কৃষ্ণের নাতি নিরুদ্দেশ? কৃষ্ণের বংশকে যে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেই উধাও? খোঁজ-খোঁজখোঁজ। তারই মধ্যে কেউ বলল, “আমি পরশু রাতে স্পষ্ট চোখে দেখেছি, একটা দৈত্য এসে অনিরুদ্ধকে নিয়ে গেছে…”
আরেকজন বলে, “অনিরুদ্ধ কী এক গোপন প্রক্রিয়া করতে গিয়ে মিস্টার ইন্ডিয়া হয়ে গেছে!”
আরেকজন বলে, “এসব পলিটিক্সের ব্যাপার, ওকে গুমখুন করা হয়েছে!”
অন্য লোকে বলে, “অনিরুদ্ধ? আরে ও তো গৌতম বুদ্ধের মতন সন্ন্যাস নিয়ে চলে গেছে। ও বড়লোকদের ওরকম হয়।”
এরইমাঝে একজন বলে, “আমি অনিরুদ্ধকে দেখেছি রথ ছুটিয়ে পথে চলে যেতে।”
এইপ্রকার নানান জল্পনা ও কল্পনাতে যখন মোটামুটি অনিরুদ্ধর নিরুদ্দেশের গল্পের সাথে যখন একটা কেচ্ছার গল্প হবে হবে করছে, সেইসময় দুম করে নারদ এসে কৃষ্ণকে বলে, “আরে, অনিরুদ্ধ ফেরত আসেনি? ও তো সেই ঊষা নামের মেয়েটার প্রেমে পাগল হয়ে তাকে বিয়ে করতে ছুটেছিল!”
কৃষ্ণ বলে, “ঊষা? বাণাসুরের মেয়ে? ভূ-ভারতে আর কারোর মেয়ে পেল না? আমার নাতিটারে নিশ্চয় বাণাসুর কিডন্যাপ করেছে!”
ইন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে প্রকট হয়ে বলে, “এই তো বাহানা পেয়ে গেছেন, এবারে চলুন বাণাসুরের ডানা ছেঁটে দিয়ে আসবেন!”
“বটেই তো,” কৃষ্ণ বলে, “বাণাসুরের এত আস্পর্ধা যে আমার নাতিকে কিডন্যাপ করে? আজই চলো যুদ্ধে!”
যাদবরা এক পায়ে খাড়া। যুদ্ধের জন্য। অনিরুদ্ধর জন্য যুদ্ধ। দ্বারকা চলেছে যুদ্ধে…। কৃষ্ণ একেবারে ছটা হাত গজিয়ে, গদা-চক্র-শঙ্খ নিয়ে গরুড়ের পিঠে চেপে বসল। পুরো বিষ্ণু মোডে। এর কারণ আছে, পরে বলছি।
কিন্তু ওদিকে বাণাসুরকেও তো যুদ্ধে ডাকতে হবে। নইলে ধর্মযুদ্ধ হবে কী করে? ইন্দ্র তাই আচমকা গদাম করে বাজ ফেলে সেইই ধ্বজাটাকে দিল ভেঙে। বাণাসুর বাইরে বেরিয়ে ধ্বজাভাঙা দেখে বলল, “চলো হে, যুদ্ধ হবে। যাই গিয়ে মহাদেবকে খবর দিই।”
যাদবরা হই হই করে শোণিতপুরের দিকে তেড়ে গেল। বাণাসুর এদিকে আগেই তৈরি ছিল। কেল্লার চারিদিকে মায়া আগুন করে দিল। নে, কাছে আসবি? আয়? যাদবরা হাতে বালতি নিয়ে আগুন নেভাতে যায়, কিন্তু আগুনের পিছনেই কার্তিক তার দৈবসেনা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হ্যাঁ, ইতিমধ্যে বাণাসুর শিবঠাকুর আর কার্তিককে খবর দিয়ে দিয়েছে। বাণাসুর তার ভ্রাতৃসম, তাই পিতার কথা রাখতে কার্তিক দেবসেনা নিয়ে চলে এসেছে। ইন্দ্রের মাথায় হাত। তারই সৈন্য, তারই শত্রুর হয়ে লড়ছে। লেহ্…
এদিকে যুদ্ধ চলছে। বারো না চোদ্দ অক্ষৌহিণী যাদবসেনা, তাদের বিরুদ্ধে দেবসেনা আর অসুরসেনা। যে যাকে পারছে মারছে। দেবসেনারা ভুল করে অসুরদের পেটাতে শুরু করে দিয়েছে। অসুরগুলো বলে, “এই, এখন আমরা সেম সাইডে, যাদবদের পেটা।”
“ওহ, অনেক পুরোনো অভ্যেস কিনা, অসুর দেখলেই পেটানোর, দেবসেনারা বলে। সেই সুযোগে যাদবরা ধাঁইধপাদপ অসুর-দেব দুজনকেই পেটাতে থাকে। চারিদিকে কনফিউশন। তার মধ্যে আবার প্রদ্যুম্ন মায়া বিস্তার করে যাদবদের অসুর বানিয়ে দিচ্ছে। অসুররা অসুরদেরকেই যাদব ভেবে মারছে। অসুররূপী যাদবরা অসুরদের মারছে। দেবসেনারা এখন চারিদিক অসুর দেখতে পেয়ে এবং যাদবদের মায়ার খবর শুনে পুনরায় অসুর পেটানোতে মন দিয়েছে। মোদ্দা কথা তিনটে আলাদা দল লড়লেও, বিস্তর মার খেল অসুররাই।
ওদিকে কৃষ্ণ এসবে পাত্তা না দিয়ে গরুড়কে উড়িয়ে সরাসরি বাণাসুরের কেল্লায় ঢুকে গেছে। দুইপাশে অ্যাসিস্ট্যান্ট রইল সুপর্ণ আর প্রদ্যুম্ন। ঢুকেই অসুরদের মারতে লাগল তিনজনে। তারইমধ্যে আবার বলরাম দুদ্দাড় করে গেট ভেঙে কেল্লার মধ্যে ধুকে পড়েছে। তার সামনে পড়ছে জরা নামের অসুর। সে শিবের অংশ। সেই সতীমায়ের দেহত্যাগের সময় শিবঠাকুরের তৃতীয় নয়ন থেকে এক ফোঁটা ঘাম পড়েছিল। সেই থেকেই জরাসুর (বা জরাসুর) এর জন্ম। সমস্ত প্রাণীর ক্লান্তি ও বার্ধক্যের জন্য দায়ী সে।
সেও কম যায় না, বলরামকে একপ্রকার নাস্তানাবুদ করে দিয়েছে জরা, এমন সময় কৃষ্ণ বলরামকে বাঁচাতে চলে আসে। জরা কৃষ্ণকেও দমাদম কয়েকটা ঘুসি মারে। কৃষ্ণও উলটে কুস্তির প্যাঁচ দেয়। জরাসুর বিভিন্ন কায়দায় কৃষ্ণকে প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা করে। কৃষ্ণ বারংবার সেগুলো আটকে জরাসুরকে প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু দুজনেই দুজনকে কায়দা করতে পারে না।
ব্যাপারটা কিছুক্ষণের মধ্যে এমন দাঁড়িয়ে গেল, যেন শীতের সন্ধেতে পাড়ার ব্যাডমিন্টন খেলা। সেখানে দুজন খেলোয়াড় কেউ জিততে চায় না, শুধু খেলা জমে গেলেই হল। কে কতক্ষণ কার প্যাঁচ টিকিয়ে রাখতে পারে। একটা সময়ের পরে কৃষ্ণ নিজেই গাইড করতে লাগল, “আহ, এভাবে প্যাঁচ দিয়ো না… ওইভাবে করো… ওহ, ফুটিঙ্গটা একটু ঠিক হলেই…”
জরাসুরও বলে, “আহ্ আমার এই প্যাচিওটা ধরে ফেললে? তবে তোমার ওই প্যাঁচটা কিন্তু হেব্বি, আরেকবার করে দেখাও!”
যুদ্ধ চলল সাইডে, কৃষ্ণ আর জরা যেন দুই মল্লবন্ধু হয়ে গেল। কিন্তু জরার তো গুপ্ত থাকবেই। সে এসবের মধ্যেই নিজের গুপ্ত ক্ষমতা কাজে লাগায়। জরার নাম জরা কারণ সে অন্যকে জ্বর ও ক্লান্তি দিতে পারত। মল্লযুদ্ধ করতে করতে কৃষ্ণের বড়ই ক্লান্তি লাগল। দু-চোখে যেন ঘুম নেমে আসছে। যেমনটা অফিসে বা পড়তে বসলে আমাদের হয় আর কী। কৃষ্ণ দেখল, বড় বিপদ, এখন যুদ্ধের মধ্যে ঘুমোলেই শেষ।
কৃষ্ণ তাই একটু সাইডে সরে এসে, নিজের মধ্যের ক্লান্তিকে একটা অসুর রূপ দিয়ে বের করে আনল। তার নামও জরা। এই জরাকে ওই জরার সাথে ভিড়িয়ে দিল কৃষ্ণ। জরা ভার্সেস জরা, দুজনেই জড়াজড়ি করে খুব খানিক লড়ল। শেষে কৃষ্ণের জরা, অসুর জরাকে চিৎপটাং করে ফেলে দিতেই অসুর জরা হার মেনে নিল।
কৃষ্ণ বলল, “বেড়ে লড়েছ তুমি, বর চাও!”
জরা বলে, “আমাকে বর দিন, আমিই যেন একমাত্র জরা হই!”
“ঠিক আছে,” কৃষ্ণ বলে, “তুমিই একমাত্র জরা হবে। তোমার থেকেই সবকিছুর জরাজীর্ণ অবস্থা হবে, সবাই জরাগ্রস্ত হবে আর জরা-ব্যধিতে ভুগবে” সেই থেকে জরাসুর (বা জরাদেব) পূজিত হন। এখনকার দিনে মা শীতলার পুজো হলে, তার পাশেই জরাদেবকে দেখা যায়। তারানাথ তান্ত্রিকের গল্পের ‘জরাসুর’ও আসলে এই জরাদেব।
গল্পে এগোই, কৃষ্ণ এবারে আর সময় নষ্ট না করে সরাসরি বাণাসুরের দিকে তেড়ে যায়। তারইমধ্যে সুদর্শন চক্রকে অটোমেটিক মোডে ছেড়ে দিয়েছে। সে মনের আনন্দে অসুরদের কাটছে চ্যাকাচাক। অসুররা দিশেহারা। তারা যাদবদের আটকাবে না চক্রকে। চক্র কিন্তু দেবসেনাকে কাটছে না, ভারি সেয়ানা।
এত গোলমালের মধ্যে বাণাসুর ফাঁপরে পড়ে মহাদেবকে ডাকতে বাধ্য হয়। এবং সেই ডাকে সাড়া দিয়ে অবশেষে মহাদেব যুদ্ধে এসে হাজির হয়।
ওহ, কী সীন মাইরি… কৃষ্ণ আর মহাদেব মুখোমুখি যুদ্ধে। এই কারণেই কৃষ্ণ ওরকম ফুল বিষ্ণুমোডে যুদ্ধে এসেছিল।
মহাদেব বলে, “হরি…হরি…”
কৃষ্ণ বলে, “হর…হর…”
মহাদেব বলে, “দেখো কৃষ্ণ, আমাদের পুরোনো বন্ধুত্বের খাতিরে বলছি, বাণাসুরকে ছেড়ে দাও। আমার ভক্ত হয়। নইলে কিন্তু…”
“নইলে কী?” কৃষ্ণ বলে, “ও আমার নাতি, যে কিনা আমারই অংশ অবতার তাকে বন্দি করে রেখেছে!”
“তাতে কী? নাতিকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাও!”
“নাতি আমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বাণাসুরের মেয়ের সাথে প্রেম করে বাণাসুরকেই থ্রেট দিয়েছে। ফিউচার শ্বশুরকে রাগিয়ে দিয়েছে,” কৃষ্ণ বলে, “এমনিতেই ভূ-ভারতে কোনোদিন কোনো শ্বশুর তার জামাইকে পছন্দ করে না, তার মধ্যে অনিরুদ্ধ আবার বিয়ের আগেই শ্বশুরকে খচিয়ে বসে আছে। আমি বাণাসুরকে শিক্ষা না দিলে, অনিরুদ্ধ কোনোদিন শ্বশুরবাড়িতে সম্মান পাবে? বাণাসুর ওকে জামাইষষ্ঠীতেও ডাকবে না। আমার নাতিটা ওরকম ত্যাজ্যজামাই হয়ে কামাই করবে? ও আমি হতে দেব না!”
“তাহলে বাণাসুরকে মারতে গেলে তোমায় আমাকে হারাতে হবে,” মহাদেব বলে।
“ওকে… কামেন ফাইট… কামেন ফাইট,” কৃষ্ণ বলে।
ব্যস, কৃষ্ণ আর মহাদেবের যুদ্ধ লেগে গেল। মহাদেব চোখ-টোখ লাল করে নিজের একগাদা ভূত-প্রেতের সেনা ছেড়ে দিল মাঠে। তারা হাতের সামনে যাদব-মাধব-অসুর-দেবসেনা যাকে পারল, পেটাতে শুরু করল। প্রদ্যুম্ন আবার মায়া দিয়ে যাদবদের আর দেবসেনাদের ভূত বানিয়ে দিল। মানে মেরে ফেলল না, রূপ বদলে দিল। ভূতগুলোর সামনে এখন শুধুই অসুররা। অসুররা এবার ভূতেদের হাতেও মার খেতে লাগল। কয়েকজন অসুর চেঁচিয়ে উঠল, “ধ্যার মেট্র, সবাই এসে আমাদেরই পেটাচ্ছে কেন? আমরা কি পাবলিক মন্দিরের ঘণ্টা নাকি, যে পারছে এসে বাজাচ্ছে?”
ওদিকে হরি-হরের যুদ্ধ লেগেছে চরম। কোথায় লাগে মানুষের আর দেবাসুরের যুদ্ধ? প্রথম রাউন্ডে সাঁই-সাঁই করে কিছু দৈব তির চালায় দুজনেই দুজনের প্রতি। সেই রাউন্ড কেটে গেলে কৃষ্ণ ইন্দ্রাস্ত্র ঝেড়ে দেয় শিবের উপর। শিব কৃষ্ণের দিকে ত্রিশূল ছুড়ে মারে। কিন্তু দুজনেই সেসব কাটিয়ে ফেলে। কৃষ্ণ নারায়ণাস্ত্র চালিয়ে দেয় শিবের উপর। শিব সেটা সহজেই পাশ কাটিয়ে ফেলল।
কিন্তু উড়ন্ত তিরগুলো সেই অসুরদের উপরেই পড়ল। অসুররা চেঁচাল, “হ্যাঁ, আমাদেরই মার… বাণের জলে ভেসে এসেছি কিনা!”
শিব উলটে আগ্নেয়াস্ত্র চালিয়ে দেয়। চারিদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কৃষ্ণের গায়ে কিছু ফোস্কাও পড়ে। কিন্তু ছড়ানো আগুনে অসুররা জ্বলে যায়। বাধ্য হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে তারা জলে ডুবে বসে থাকে। আগুন থেকে বাঁচতে কৃষ্ণ বরুণাস্ত্র চালিয়ে দেয়। নিমেষে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ে জলোচ্ছ্বাস হয়ে অসুররা ভেসে যায়। কয়েকজন মাথা চাপড়ে বলে, “আমাদের উপরেই ফেলতে হল?”
শিব রেগে গিয়ে একসাথে পৈশাচ, রাক্ষস, রৌদ্র আর অঙ্গিরস অস্ত্র চালিয়ে দেয়। এগুলো অস্ত্র কিনা আমার সন্দেহ হয়। আমার মনে হয় হাতের সামনে এই চরিত্রগুলো পেয়েছিল শিবঠাকুর, তাদেরই তিরে বসিয়ে ছুড়ে দিয়েছে। প্রত্যুত্তরে কৃষ্ণও চারটে অস্ত্র চালিয়ে দেয় যথা বায়ব্য, সাবিত্র, বাসব আর মোহন। দুজনেই দুজনের অস্ত্র কেটে ফেলে। সিরিয়ালে যেমন দেখায় সেরকম না। এই অস্ত্রগুলো কী করে কাটা হত, সেটা ‘টেক পুরাণের ঠেক’ এর কোনো একটা খণ্ডে লিখব।
অবশেষে এইভাবে যুদ্ধ চলতে চলতে একসময় দুজনেই দুজনের দিকে ব্রহ্মাস্ত্র চালিয়ে দিল। ডবল ব্রহ্মাস্ত্রে আকাশে বিস্ফোরণ হল, কিন্তু কৃষ্ণ বা শিবের কিছুই হল না। তারপরে কৃষ্ণ দুম করে জম্ভণাস্ত্র চালিয়ে দিল। এই অস্ত্রের কথা আপনারা প্রফেসর শঙ্কুর একটি গল্পে পড়েছেন। জম্ভণাস্ত্র যার দিকে চালানো হয়, তার ঘুম পায় এবং ঘন ঘন হাই ওঠে। শিবঠাকুরকে যখন শক্তিশালী অস্ত্র দিয়ে কায়দা করা যাচ্ছেই না, তখন এই হাই তোলা অস্ত্র দিয়েই বাগিয়ে ফেলল কৃষ্ণ। শিব ঘন ঘন হাই তুলতে তুলতে যুদ্ধ থেকে বিরতি নিল।
সেই ফাঁকে কৃষ্ণ বাণাসুরের দিকে তেড়ে যায়। বাণাসুর প্রথমটায় খুব খানিক যুদ্ধ করল বটে, কিন্তু অবস্থা বেগতিক বুঝেই তার মাকে সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। কৃষ্ণের রথের সামনে দাঁড়িয়েই বাণাসুরের মা নিরবস্ত্র হয়ে যায়, আর সেটা দেখেই চোখ বন্ধ করে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় কৃষ্ণ। বাণাসুর সেই সুযোগে আকাশপথে কেটে পড়ে। কী স্ট্র্যাটেজি, আহা।
কিন্তু কৃষ্ণও ছাড়ার পাত্র নয়। ঠিক খুঁজে খুঁজে বাণাসুরের পিছনে ধাওয়া করে। ব্যাটা পালাবে কোথায়। বাণাসুর এদিকে নিজের হাজারটা হাত সামলাবে, নাকি পালাবে বুঝতে পারে না। ঘোরতর গোলমালে দুম করে কৃষ্ণের হাতে ধরা পড়ে যায়।
তখন আবার শিব ঠাকুর আর মা পার্বতী এসে কৃষ্ণকে বলে, “বাণাসুরকে প্রাণে মেরো না। ও আমাদের সন্তানসম হয়…”
“ধুর, আমিই বা ওকে মারতে পারব নাকি?” কৃষ্ণ বলে, “প্রহ্লাদকে যে কথা দিয়েছিলাম, ওর বংশধর কাউকে আমি মারব না। তাই এই বাণাসুরকেও মারতে পারব না। শুধু এর হাতগুলো কেটে ফেলি। এতেই ওর ক্ষমতা চলে যাবে।” এই বলে বাণাসুরের চারটে হাত রেখে বাকি নশো ছিয়ানব্বইটা হাত কেটে ফেলল কৃষ্ণ। বাণাসুর বলে, “বাহ, এতদিনে নিজেকে বেশ হালকা লাগছে।”
তারপরে আর কী? অনিরুদ্ধর সাথে ঊষার ধুমধাম করে বিয়ে। যাদবরা যুদ্ধ করতে গেছিল, একেবারে বরযাত্রীর খাওয়া খেয়ে এল। আর ঊষা হল অনিরুদ্ধর দ্বিতীয় স্ত্রী। অনিরুদ্ধর দুটি সন্তান হয়। বজ্র ও মৃগকেতন। কার মা রোচনা আর কার মা ঊষা সেটা লিখিত নেই, কিন্তু এই বজ্রকেই পরবর্তীকালে যুধিষ্ঠির ইন্দ্রপ্রস্থের রাজা করে দিয়ে বাণপ্রস্থে যায়। বজ্রর মাধ্যমেই যদুবংশের একটি ধারা বেঁচে যায়। বাকি সমস্ত যদুরা মরে যায়। কীভাবে, সেই গল্প এবারে বলব, শাম্বর গল্পের মাধ্যমে।
