গোমস্ত পাহাড় ও শৃগাল বাসুদেব

গোমন্ত পাহাড় ও শৃগাল বাসুদেব

পাহাড়তলে বাহার করে আহার সমেত জরাসন্ধের সেনা বসেছে। একেবারে পাহাড় ঘিরে। সমুদ্রের মতন সেনাবাহিনী। বাহিনী নিয়ে কৃষ্ণ-বলরামের কাহিনি শেষ করতে এসেছে জরাসন্ধ। মাত্র দুজনকেই মারতে এসেছে। এখান থেকেই বোধহয় দক্ষিণ ভারতীয় মারপিটের সিনেমাগুলো উদ্বুদ্ধ হয়েছে। দেখবেন ওখানেও একটা রোগা পটকা পঞ্চাশ কিলোর ওজনের নায়ককে মারতে একটা গোটা রাজ্যের লোককে ট্রাকে চাপিয়ে নিয়ে আসে। হাঁটিয়েও নিয়ে আসতে পারে, কিন্তু খরচ করে ট্রাক ভাড়া করে আনে। হাঁটলে মারপিট করবে কী করে? কিন্তু জরাসন্ধের সেনা হেঁটেই এসেছিল। কিছু সংখ্যক যোদ্ধা আর রাজাগুলো হয়তো রথে বা হাতি, ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল, কিন্তু বেশিরভাগ সেনা অচেনা পথে হেঁটেই এসেছে। আসতে আসতেই সেনাদের নিজেদের মধ্যে চেনাজানা হয়েছে।

কিন্তু এই বিপুল সুইমিং পুলের মতো সেনার ঢেউ হলেও কেউ কিন্তু হেউ শব্দে ঢেকুরও তুলছে না। জরাসন্ধের নির্দেশে সবাই চুপ। বোধহয় অতর্কিতে আক্রমণ করার ইচ্ছে ছিল। জরাসন্ধ বোধহয় কোনোদিন পাহাড়ে চড়েনি। পাহাড়ের উপর থেকে যে নীচের ওই ব্যাপক সেনাবাহিনীর সবই দেখা যাচ্ছে সেটা বোধহয় জরাসন্ধ ভাবেনি। অষ্টাদশতম বার লড়তে এসে জরাসন্ধ প্ল্যান বানিয়ে বলল, “শোনো সবাই, চুপিচুপি আক্রমণ করতে হবে। কাকপক্ষীও যেন টের না পায়। টের পেলেও ঢের হয়েছে, এবারে দুইভাইকে এক সের করে ঘোল না খাওয়ানো পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। কলিঙ্গরাজ মাদ্রা, বহুীকরাজ চেকিতন, কাশ্মীররাজ গোনর্দ, কিমপুরুশের দ্রুম (কোরিয়ান নাকি?), তোমরা কেড়ে নাও সবার ঘুম। তোমরা সব পাহাড়ি লোকজন। তোমরা এই পর্বতের খাড়াই দিক দিয়ে চড়াইপাখির মতন চড়ে লড়াই করবে…”

“আমার উঁচু জায়গা থেকে নীচে তাকালে মাথা ঘোরে যে…” পাৰ্বত্য কোনো এক রাজা বলে, “ভার্টিগো আছে আমার…”

‘ভ্রাতৃ গো, তোমার ভার্টিগো থাকুক আর যা-ই থাকুক, যদি তোমার ডার্টি পাঁজরের হাড়টি ‘গো’ না করতে চাও, তো চুপচাপ পাহাড়ে চড়ো,” জরাসন্ধ বলে, “বাকিরা… পুরুরাজ বেণুধারী (এটা কে?), বিদর্ভ, সোমক, ভোজ, রুক্মী, মালব, সূর্যাক্ষ, পাঞ্চাল রাজ দ্রুপদ (ওই দেখো, তলে তলে ইনিও ছিলেন), বিন্দ, অনুবিন্দ, বিরাট (ইনিও ছিলেন?), কৌশম্বীর রাজা, মালয়ের রাজা, ত্রিগর্তর রাজা ভুরিশ্রব (চেনা নাম, তাই না? কুরুক্ষেত্রে ছিল) তোমরা সব উত্তর দিকে দিয়ে চড়বে। অংশুমানের ছেলেরা, উত্তমৌজ, শাল্ব (যে পরে দ্বারকা আক্রমণ করবে সে, নাকি অম্বার এক্স বয়ফ্রেন্ড? দুজনেই কি এক লোক?), কেরালার রাজা, বিদিশার রাজা, সব্বাই পূর্ব দিকে চড়বে। আর আমি, শিশুপাল আর দরদ পশ্চিমদিকে চড়ব।”

জরাসন্ধের প্ল্যানিং শেষ হল। আমি জানি, আপনারা পাঠকেরা এই রাজাদের নামগুলো এক নজরেই লাফিয়ে চলে গেছেন। অত কে পড়ে? লেখক স্রেফ শব্দ সংখ্যা বাড়াতে এসব লিখে গেছেন, না লিখলেও হত। তাই না? কিন্তু এখানে এবং আগের পর্বে এত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব রাজা আর তাদের রাজত্বের নাম লেখার পিছনে একটা কারণ আছে। এবং কারণটা হল মহাভারত।

মহাভারতে জরাসন্ধকে একটা নির্দ্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। সে যাদব এবং পাণ্ডবদের শত্রু। তার জন্য তাকে রাক্ষস, অত্যাচারী ইত্যাদি বলতেও কোনো কসুর করেনি। কিন্তু সেখানে তখন কৃষ্ণের সাহায্যে পাণ্ডবদের সাথে যাদবদের দহরম মহরম চলছে। প্রায় দিনই কৃষ্ণ পাণ্ডবদের সাথে দেখা করছে, আর প্রায় সবসময় মুশকিল আসান করতে চলে আসছে। একটা সময়ে তো যুধিষ্ঠির সটান কৃষ্ণের উপরেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। অর্জুনও তাই। মহাভারত এবং তার যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী ছিল, কিন্তু সেখানে রাজা কৃষ্ণের ভূমিকা যে না মানে, সে মহাভারত পড়েনি। আপনি মহাভারত থেকে কৃষ্ণকে বাদ দিয়ে দিন, কী পড়ে থাকে? শুধু একটা ফ্যামিলি ড্রামা যার শেষে হয়তো পাণ্ডবরা গুমখুন হত। সেই মহাভারতেই হঠাৎ করে জানা যায় জরাসন্ধ নাকি একশোটা রাজাকে বন্দী করে রেখেছে, তাদেরকে যজ্ঞে বলি দেবে বলে।

বুঝুন… রাজাগুলো কি ছাগল না চালকুমড়ো যে যজ্ঞে বলি দেবে? আসলে এটা জরাসন্ধকে একটা ভিলেন প্রতিপন্ন করার চেষ্টা। এতই অত্যাচারী যে রাজাদের ধরে বলি দিয়ে দিচ্ছে। রাজাগুলোকে বলি দিয়ে হবেটা কী? বিহারের রাজগীরের রাজা জরাসন্ধ কি কাপালিক ছিল নাকি ঘোর বামাতন্ত্র সাধানা করত যে একশোটা মানুষ বলি দেবে? সেরকম তো লেখা নেই। আর এই রাজাদের আহুতি নিয়ে দেবতাগুলোই-বা কী করত? কোন দেবতাকে রাজা উৎসর্গ করা হত? বলিবিধিতে কি কর্ম অনুযায়ী বিধি আছে নাকি? মানে একশোটা চাষা বলি দিয়ে দাও (বর্তমানে ঘটনাসকল সেরকমই বিধি নির্দেশ করে যদিও), অথবা দুশোটা মেথরকে বলি দিয়ে দাও, সাতশোটা টিচার বলি দিয়ে দাও (পড়াশোনা শেষ), দশটা ইঞ্জিনিয়ার বলি দাও। এরকম কোনো বিধান থাকলে জানাবেন।

আমার যেটা মনে হয়, এবং আমি ‘ফাজিলের মহাভারতে’-ও লিখেছি, এবং আগের পর্বের কিছু কথা সমর্থন করে বলছি, জরাসন্ধ আসলে যাদব ও পাণ্ডবদের উত্থানশক্তির পথে একটা বিশাল সুপারপাওয়ারের নেতা হয়ে গেছিল। সেই মিলিত শক্তির মধ্যে এই সমস্ত রাজা আসে যাদের নাম লিখেছি। আপনি আগের পর্বের লিস্ট আর এই একটু আগে লেখা লিস্ট একজোট করে দেখুন, তৎকালীন ভারতবর্ষের অনেকটাই জরাসন্ধের সঙ্গে ছিল। সে ভয়ে হোক বা বন্ধুভাবেই হোক, ছিল। জরাসন্ধের একার নিশ্চয় ক্ষমতা ছিল না সবাইকে নিজের অধীনে রাখার। রাজগীরের রাজার কথা আসামের রাজাও শুনছে, কাশ্মীরের রাজাও শুনছে আবার কেরলের রাজা, উড়িষ্যার রাজাও শুনছে। কেন? কীসের ভয়ে? কী এমন ছিল জরাসন্ধের ক্ষমতা?

আসলে দৈব বা আসুরিক ক্ষমতা, এসব কিছুই ছিল না। এখানে স্পষ্টভাবে মহাভারত জরাসন্ধকে বিকৃত করেছে। জরাসন্ধ ওই মিত্রশক্তির মুখপাত্র ছিল শুধু। এবং যদি আমরা জরাসন্ধের ভালো দিক দেখি তাহলে বলতে হবে তার অধ্যবসায় এতটাই প্রবল ছিল (সে জামাইয়ের মৃত্যুর জন্যই হোক না কেন), যে সতেরোবার হেরেও একজন শত্রুকে আঠেরোতম বার আক্রমণ করতে যায়। শুধুই কি কৃষ্ণ আর বলরামকে মারতে এত উদ্যোগ? নাকি যাদবদের বুঝিয়ে দেওয়া যে তাদের বিরুদ্ধেও কারোর দাঁড়াবার শক্তি আছে? এবং সেটার জন্য জরাসন্ধ সেনাবাহিনী নিয়ে দক্ষিণে গোমন্ততে (বর্তমান গোয়া যতদূর জানতে পারা যায়) আক্রমণ করতেও পিছুপা হয়নি।

কেন? আমার মনে হয় জরাসন্ধ তলে তলে এটা বুঝেছিল যে কৃষ্ণ যাদবদের রাজা না হয়েও, যাদবদের যে বিপুল জনসংখ্যা বিভিন্ন আলাদা শাখা প্রশাখা নামে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে তাদের এক করার প্রচেষ্টায় আছে। আপনি সমগ্র হরিবংশ এবং মহাভারত পড়ুন, এবং কিছুক্ষণের জন্য ভগবান কৃষ্ণকে ভুলে রাজা কৃষ্ণকে ভাবুন। কী পাবেন? এই কাশী যাত্রা, দক্ষিণ ভারত যাত্রা, একে মারা, ওকে হারানো, তাকে পেটানো…। এইসবের উদ্দেশ্য একটাই। যে যে যাদব বংশীয়রা বৃহত্তর ও নবপ্রতিষ্ঠিত যদুবংশের সঙ্গে না জুড়বে, যারা জরাসন্ধ ও বিরোধীশক্তির সাথে সখ্যতা করবে তাদেরই রাক্ষস, ভণ্ড, পাপী, অজ্ঞানী, মূর্খ চিহ্নিত করে মেরে ফেলো। এই উদ্দেশ্যের সাথেই রাজা কৃষ্ণের প্রধান উদ্দেশ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যেটা ‘ফাজিলের মহাভারতে’ লিখেছি।

গল্পে ফিরি। জরাসন্ধ এরকম ভাবে চতুরঙ্গ সেনা নিয়ে রণসজ্জা সাজিয়ে পাহাড় চড়তে লাগল। একদিকে পাহাড়িরা তাদের কায়দায় চড়ছে, সম্ভবত ঝুলে ঝুলে। বাকিদিকে সবাই হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে করতে উঠছে। দুটো তো মানুষ। রয়ে সয়ে গেলেই হয়। কিন্তু এরইমাঝে শিশুপাল বলে ওঠে, “দাদা আর যে পারছি না… ”

“কী পারছিস না?” জরাসন্ধ জিজ্ঞেস করে।

“হাঁটতে… হেঁটে হেঁটে পাহাড়ে চড়তে পা আর হাড় আলাদা হয়ে যাচ্ছে যে…”

“এই নাকি তুই কৃষ্ণের মাসতুতো ভাই?”

“চোরে চোরে মাসতুতো ভাই হয় জানতাম, এরকম পাহাড়ে চড়ে চড়ে মাসতুতো ভাই হয় নাকি?” শিশুপাল বলে।

“চুপ কর,” জরাসন্ধ বলে, “শিশুপাল তোর এই শিশুবল্কলমার্কা কথাবার্তা রাখ। চুপচাপ যুদ্ধে চল!”

“দাদা, একটা কথা বলি?”

“বল…”

“আমরা তো জানি কেষ্ট আর বলরাম পাহাড়ের মাথায় আছে…”

“হ্যাঁ… তো?”

“তাহলে আমরা খামোখা পাহাড়ে চড়ে ওদের আক্রমণ করছি কেন? গোটা পাহাড়টাই জ্বালিয়ে দাও।”

শিশুপালের এই আইডিয়াটা জরাসন্ধের ভারি পছন্দ হয়। কত জঙ্গল জ্বলছে, এই একটা পাহাড়ের জঙ্গল জ্বালিয়ে দিলে কি হবে? একেবারে পাহাড়ের সাথে তার শত্রুরা জ্বলে তন্দুরি হয়ে গেলে ভালোই হয়। নিখরচায় যুদ্ধ জয়। এই ভেবে কয়েক ট্যাংকার কেরোসিন এনে জঙ্গলে চারিদিকে ছিটিয়ে দিল। তারপর পর্বতে আগুন লাগিয়ে শরবত হাতে মজা দেখতে বসল জরাসন্ধ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই গনগনে আগুন আর ধোঁয়া বেরোতে দেখে জরাসন্ধ মনে মনে ভাবল, “দাবাগ্নির অগ্নিতে ভালোই দাবিয়ে দিয়েছি। পুড়ে মরুক ব্যাটারা…”

এমন সময়ে কয়েকজন কালোমুখো লোক এসে বলল, “দাদা, এটা আপনি কী করলেন?”

“তোমরা কারা? এরকম মুখ পুড়িয়ে এলে কোথা থেকে?” জরাসন্ধ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।

“আমরা আপনার দলেরই লোক। ওই পার্বত্য দেশের রাজা আমরা। আমরা খাড়াই চড়ছিলাম…” মুখপোড়া লোকগুলো বলে, “আপনি না জানিয়ে আগুন লাগিয়ে দিলেন। আমরা লড়াই করব বলে খাড়াই ধরে চড়াই উঠছিলাম, কিন্তু আগুন আমাদের ফুটকড়াইয়ের মতন ঝাড়াই করে দিল। এটা কি ঠিক হল?”

জরাসন্ধ জিভ কেটে বলে, “এহে স্যরি মিসটেক হয়ে গেছে, আপনাদের চড়তে বলে ভুলে গেছি। আসুন আসুন বসুন… দেখুন কেমন পাহাড়ে অগ্নি দিয়ে আমার মৃত জামাইয়ের ভগ্নীর ছেলেদের শেষ করি।”

এদিকে পাহাড়শুদ্ধ আগুনের মাঝে বলরাম কৃষ্ণকে বলে, “ওরে ভাই, আগুন লেগেছে বনে বনে…”

কৃষ্ণ বলে, “আরে দাউভাইয়া, এই দাউদাউ করা আগুন দেখেই হাউহাউ করছ?”

“আরে করছি কি সাধে?” বলরাম বলে, “আমরা নাহয় অবতার, বেঁচে যাব, কিন্তু এই এত সুন্দর পাহাড়টা। এত গাছপালা পশু পক্ষী— সব জ্বলে যাবে?”

তাও তো ভালো পাহাড়ের উপরে দেবতাদের ভাটিখানার কথা ভুলে গেছিল। আগুন ওখানে পৌঁছলে একেবারে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরণ হত। কিন্তু এখানেই বোঝা যায় বলরাম প্রকৃতিপ্রেমী ছিল। জঙ্গলের আগুন দেখে তার কষ্ট হয়েছিল। তাই বোধহয় খাণ্ডব দহনের সময় বলরামকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

বলা যায় না, তক্ষকের ফ্যামিলির কষ্ট দেখে কৃষ্ণকে বলল “আগুন নেভা”, আর কৃষ্ণও দাউভাইয়ার কথা মেনে আগুন নেভাত। যুধিষ্ঠিরের বছরখানেকের থাকার বিশাল রাজপ্রাসাদ তৈরি হত কী করে? সেরকমভাবে ভাবলে যবে থেকে পাণ্ডবদের সাথে কৃষ্ণের দেখা হল, মানে সেই দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় ঋষিবেশী পাণ্ডবদের দেখতে পেল, সেই থেকেই কৃষ্ণ আর বলরাম কেমন যেন আলাদা আলাদা থাকা শুরু করল। তার পরবর্তী পাণ্ডব সম্বন্ধীয় প্রায় সমস্ত ঘটনায় কৃষ্ণ একা, বলরাম নেই। তাই বোধহয় বলরাম কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় রাগ করেছিল, “ইহ, আমাকে ভাইটাল ভাইটাল জায়গায় রোল দেয়নি, এখন যুদ্ধ করব কেন? আমি তীর্থে চললাম…”

দাদা বলেছে তাই কৃষ্ণ একটা বিশাল লম্ফ মেরে ল্যান্ড করতেই পায়ের চাপে পাহাড়ে ভূমিকম্প হয়ে মাটি ফেটে চারিদিক থেকে জলের ধারা হু হু করে বেরিয়ে পুরো ফায়ার ব্রিগেডের হোস পাইপের মতো জল ছেটাতে থাকে। পাহাড়ের আগুন লাগা সেগুন গাছগুলো আধপোড়া বেগুনের মতো ঝলসে বেঁচে রইল। এরই মধ্যে বলরাম হাত বাড়িয়েছে আর আকাশ থেকে তার দৈব লাঙল ঝপ করে এসে পড়েছে। তাই নিয়ে বলরাম পাহাড়ের মাথা থেকে “হু হুবা” বলে ঝাঁপ মেরে জরাসন্ধের সেনার উপরে পড়ে ধাঁইধাঁই করে চালাতে লাগল।

জরাসন্ধ বোধহয় এই ব্যাপারটার জন্য তৈরি ছিল না। তন্দুরি বানানোর সময় মানুষ নিশ্চিন্ত থাকে, কিন্তু আগুনের মাঝের শিকার যদি বিকার ঘটিয়ে চিৎকার করে রাঁধুনির ঘাড়ে পড়ে উত্তাল পেটাতে থাকে তাহলে কে আর তৈরি থাকতে পারে? তার মধ্যে কৃষ্ণও আবার সাঁই সাঁই করে নিজের আকার বাড়িয়ে, পাহাড় সমান হয়ে, আকাশ থেকে নিজের অস্ত্রশস্ত্র পেড়ে এনে বাকি সেনাদের মেরে ফাটিয়ে দিতে লাগল।

সে কি যুদ্ধ দিদি, কি বলব? দুই ভাইয়ে ওই কুড়ি অক্ষৌহিনী সেনাকে ক্ষমা ঘেন্না না করে কি মারটাই মারল দুই ভাইয়ে! আঠেরোবার মার খেয়ে রাজাদের বোধহয় একরকম অভ্যেস হয়ে গেছিল। যে বলরাম হয়তো মারতে এসেছে, আর কোনো এক রাজা বলছে, “আস্তে আস্তে দাঁড়ান দাঁড়ান, গতবার এই ডানদিকে মেরেছিলেন, ওখানে এখনও ব্যথা আছে, রোজ রাতে পবনী ঘোষের মলম লাগাই। এইবার আপনাকে বাঁদিকটা দিলাম, এইদিকে মারুন…

মার খাওয়া ছাড়া কিছু করার নেই। ক্ষ্যাপা ষাঁড়, রাগি শিক্ষক, রেজাল্ট বেরোনোর পরে বদমেজাজি বাবা আর যুদ্ধরত অবতারদের সামনে মুখ বুজে পিটুনি খাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আবার বলরাম আর জরাসন্ধের গদাযুদ্ধ। ঠং ঠং ঢনাৎ…

কৃষ্ণ এইসময়ে বলরামকে বলে, “দাউভাইয়া, ওটাকে ছেড়ে দাও। ওর মরণ এখন লেখা নেই…”

“মানে?” জরাসন্ধ জিজ্ঞেস করে কিন্তু কৃষ্ণ সাসপেন্স চেপে রেখে দেয়। এটা মনে হয় একটা যুদ্ধকৌশল। একজনের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া, যে তুমি মরবে, আর কীভাবে মরবে আমি জানি। এই ভয় কংসর মধ্যেও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, হিরণ্যকশিপুর মধ্যেও, রাবণের মধ্যেও, (শোনা যায়) আবার এখন দেখছি জরাসন্ধের মধ্যেও। এরকম হাইলি সাসপিশিয়াস ফিশফাশ শুনলে যে কারোরই টেনশন হবে। মরার আগে রোজ দুবেলা টেনশনেই মরবে। যেদিন মরবে সেদিন শুধু মরবে তার বাহ্যিক শরীরটা, ভিতরের মানুষটা তো ভয়ে ভয়ে কবেই ফুটে গেছে।

এই শুনেই মনখারাপ করে জরাসন্ধ দলবল নিয়ে অ্যাবাউট টার্ন করে ফিরে চলে গেল। যুদ্ধের মাঝে অপমান আর টেনশন নিয়ে কে যুদ্ধ করে? আঠেরোতম বারেও ফিরে গেল। ঠিক এই সময়ে ছেদির রাজা, মানে শিশুপালের বাবা এসে কৃষ্ণকে বলে, “আরে বাছা, জরাসন্ধের সামনে কিছু বলতে পারছিলাম না, মানে হেঁ হেঁ, বুঝতে পেরেছ তো, পলিটিক্স নিজের জায়গায়, আত্মীয়তা নিজের… হেঁ হেঁ…মানে আর কি…”

কৃষ্ণ বলল, “আমিও বুঝেছি পিসেমশাই… হেঁ হেঁ… জরাসন্ধের সামনে দেখাচ্ছিলেন যে আমাকে পিষে দিতে চান, আর জরাসন্ধ চলে যেতেই পিসেমশাই হয়ে গেছেন…”

“আরে আমি জরুকে কত করে বোঝালাম, যাস না, যাস না, তা কে শোনে কার কথা?” ছেদিরাজ বলেন। আগের পর্বতে আগুন লাগানোর ঘটনায় সবজায়গায় ছেদিরাজ লেখা ছিল, সেটা এই পিসেমশাইও হতে পারেন আবার শিশুপালও হতে পারে। শিশুপাল ভাবতে ভালো লাগে, কিন্তু এখনে দেখা যাচ্ছে ওটা তার বাবা ছিল।

যাইহোক কৃষ্ণ ছেদিরাজের ছ্যাঁদা কথা বুঝে যায়। ছেদিরাজ বলে, “চলো তোমাদের করবীপুরে শৃগাল বাসুদেবের কাছে নিয়ে যাই।”

কেন? হঠাৎ শৃগাল বাসুদেবের কাছে কেন যাওয়া? সন্দেহ হয় যে ছেদিরাজ আসলে তলে তলে কৃষ্ণ আর শৃগাল বাসুদেবকে লড়িয়ে দিয়ে কৃষ্ণকে মারতে চেয়েছিল। আর নয়তো শৃগাল বাসুদেবকেই মারতে চেয়েছিল। কিছু স্বার্থ ছিল হয়তো। খোলাখুলি বলা নেই।

চারদিন ধরে রথ চালিয়ে করবীপুরে পৌঁছতেই শৃগাল বাসুদেব ভাবল কৃষ্ণ নিশ্চয় যুদ্ধ করে তার রাজত্ব হরণ করতে এসেছে। আসলে তাইই হয়েছিল। ওই যে বললাম একটু আগেই, কৃষ্ণ যাদবদের একত্রিত করছিল, ওসব দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ, ছেদিরাজ দমঘোষের কথায় করবীপুরে ঘুরতে যাওয়া সব উপলক্ষ মাত্র। আসল উদ্দেশ্য হল দলছুট যাদবদের মেরে ধরে তাদের একটি গোষ্ঠীভূত করা, আর রাজি না হলে একেবারে ভূত করে দেওয়া। বারেবারে বলছি এটা রাজা বা যাদব দলপতি কৃষ্ণ, এটা ভগবান কৃষ্ণ নয়। আমি এটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আঙ্গিকে আলোচনা করছি।

এবার প্রশ্ন আসে এই শৃগাল বাসুদেব কে? বসুদেবই বা কেন? আবার পরশুরাম আগের পর্বে বলে গেছে যে এই শৃগাল বাসুদেব কৃষ্ণের আত্নীয় হয়। সম্পর্কটা কোথায়? অনেক জায়গায় শৃগাল বাসুদেবকে দিব্যি পৌণ্ড্রক বসুদেব বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু দুজনে আলাদা। দায়সারা বা ভক্তি আপ্লুত গবেষণার ফল। দুটোই ভিলেন, তাদের আবার পরিচয় জানার কী দরকার?

কিন্তু খুঁজতে খুঁজতে একটি অদ্ভুত তথ্য আবিষ্কার করলাম। দুইভাবে তথ্যটি পেয়েছি। একটির প্রমাণ আছে, একটির নেই, কারোর কাছে শুনেছিলাম। আগে যেটার প্রমাণ নেই, সেটা বলি। কৃষ্ণের বাবা বসুদেব নাকি দেশভ্রমণকালে দুজন পুত্রিকা-ধর্ম ছেলে লাভ করেছিল। তাদের একজন শৃগাল বাসুদেব, আরেকজন পৌণ্ড্রক বসুদেব। এবার যে লেখার প্রমাণ আছে সেটা বলি। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মাধবাচার্যের লেখা ‘মহাভারত তাৎপর্য নির্ণয়’ গ্রন্থে দ্বাদশ পর্বে স্পষ্ট লেখা আছে কাশ্যপ ঋষি অভিশাপ পেয়ে বসুদেব হয়ে জন্মায় (যেটা অনেক আগে বলেছি), এবং কাশ্যপের বউয়েরা দেবকের কন্যাসকল হয়ে জন্মায়। বিশেষ করে অদিতি দেবকী হয়ে জন্মায়। কিন্তু এই বউসকল ছাড়াও বসুদেব বহুীক রাজার মেয়ে রোহিনীকে বিয়ে করে (বলরামের মা)। রোহিণী নাকি সুরভীর (গাভী) মনুষ্য জন্ম ছিল। দিতি মনুষ্যরূপে কাশীরাজার মেয়ে হয়ে জন্মায়, তাকেও বসুদেব বিয়ে করে। আর দনু (দানবদের মা) করবীপুরের রাজার মেয়ে হয়ে জন্মায়। তাকেও বসুদেব বিয়ে করে। এই শেষজনের ছেলে হল শৃগাল বাসুদেব। তাইজন্য নামের শেষে বসুদেব টাইটেল লাগিয়েছিল।

এই উপরোক্ত দুটো গল্প অনুযায়ী তার মানে শৃগাল বাসুদেব আর পৌণ্ড্রক বসুদেব কৃষ্ণ বলরামের সৎ ভাই ছিল। সেরকম ভাবে একেবারে ভগবানের লীলাকে সাইডে রেখে যদি ভাবি, তাহলে বলরামও তো কৃষ্ণের সৎ ভাই ছিল। তাহলে বলরামের প্রতি কৃষ্ণের এত ভালবাসা, আর শৃগাল আর পৌণ্ড্রকের প্রতি এত ঘৃণা কেন? পৌণ্ড্রকের কথা পরে বলব, শৃগালের দেশে ঢুকতেই যুদ্ধ শুরু কেন? তারমানে শৃগাল বাসুদেব কৃষ্ণদলভুক্ত যাদবদের সঙ্গে দলবদ্ধ হতে চায়নি অথবা জরাসন্ধের সাথে হাত মিলিয়েছিল। এবং মথুরা আর গোমন্ত পাহাড়ের ভয়ংকর মারামারির কথাও নিশ্চয় শুনেছিল। শৃগাল বসুদেবের জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেখুন আর ভাবুন, কৃষ্ণ তার রাজ্যে আসছে, এটা শুনেই তার ভয় পাওয়া এবং যুদ্ধ করাটা কি নেহাতই অমূলক?

কিন্তু সেক্ষেত্রে কৃষ্ণ তো সেখানে গিয়ে যুদ্ধ না করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শৃগাল বাসুদেবকে যাদবদের দিকে টানতে পারত? না, প্রথমেই পরশুরামের জবানীতে সটান পুরাণকার বলে দিয়েছেন, “শৃগাল বাসুদেবটা মহা পাজি, অত্যাচারী।” কী অত্যাচার করেছে? কেন করেছে? কে-ই বা কৃষ্ণকে বলেছিল সেই অত্যাচারের হাত থেকে উদ্ধার করতে? দেশের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কি ছিল? ঠিক কোন জায়গায় শৃগাল বাসুদেব পাপ করেছিল সেসব বিবরণ বা দু-চার লাইনে তার পাপ বুঝিয়ে বলার কোনো ধার ধরা হয়নি। সেই যে বলেছিলাম না স্ট্যাম্প? বসুদেব উপাধি নিয়েছে আবার কৃষ্ণ আসছে শুনেই যুদ্ধ করতে চেয়েছে, ওটাকে সটান ‘পাপী’ বলে দাগিয়ে দাও। আমার মনে হয় খ্রিস্টধর্মে যেরকম ‘জিশুর বউ ছিল’ এই ভাবনাটা (সত্যি না মিথ্যে সেটা তর্কের বিষয়) ধামাচাপা দিতে বহু বহু ঘটনা ঘটানো হয়েছে (ভগবানের আবার স্ত্রী-পুত্র? তাহলে সে ভগবান কীসের? এবং এই ধারণার উপরেই পুরো ড্যান ব্রাউনের ‘Da Vinci Code’ বইটা দাঁড়িয়ে আছে), ঠিক সেরকমভাবে কৃষ্ণের সময়ে এবং পরবর্তীযুগে ‘বাসুদেব’ বলতে যাতে শুধুমাত্র কৃষ্ণকেই বোঝানো হয়, তাই বসুদেবের বাকি বাসুদেব সন্তানদের সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

অতঃপর ক্ষণকাল যুদ্ধ (সেই একই যুদ্ধের বিবরণ দিয়ে লাভ নেই), শৃগাল বাসুদেবের আস্ফালন ও অস্ত্রের বর্ষণের পরিশেষে কৃষ্ণ নিজের ফ্লাইং ডিস্ক চক্র দিয়ে শৃগালের মুণ্ডচ্ছেদন করে যুদ্ধ শেষ হল। এখানে যদি কৃষ্ণ চক্র পেয়ে গিয়ে থাকে তাহলে কি খাণ্ডব দহন ততদিনে হয়ে গেছে? তাহলে খাণ্ডবের বেলায় জঙ্গল পুড়িয়ে শেষ করে দিল, আর গোমন্তর বেলায় জঙ্গল বাঁচানো হল কেন? এ কি পরিবেশবিদ্যার হিসেব? দয়া করে এখানে ওই আর্যদের জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি বাড়ানোর গল্প টানবেন না। মহাভারত আর হরিবংশের কথা হচ্ছে, সেখানে আর্যদের ঝাড়বংশ ও জাতিবিস্তার আলোচ্য বিষয় নয়। মানছি দুটো একই বিষয়ের এপিঠ আর ওপিঠ, কিন্তু এখন ওই দিক আলোচনা করতে ইচ্ছে করছে না।

কিন্তু যতদূর জানি খাণ্ডব দহনের অনেক আগে জতুগৃহ কেস হয়, আর তখনই পাণ্ডবদের শ্রাদ্ধে গিয়ে কৃষ্ণ তড়িঘড়ি সামন্ত্যক মণি আনতে গিয়ে জাম্ববতীকে বিয়ে করেছিল। জাম্ববতী কৃষ্ণের তৃতীয় স্ত্রী ছিল, প্রথম স্ত্রী রুক্মিণী। রুক্মিণীর সাথে বিয়ে এই শৃগাল বাসুদেবের কেসের পরে হবে। তাহলে চক্রটা পেল কোথা থেকে? নাকি এই চক্রটা অন্য চক্র? এত হিসেব করতে গিয়ে আমার মাথা চক্রাকারে ঘুরছে, বাবাগো…

যা-ই হোক, শৃগাল বাসুদেবকে মার্ডার করার পরে কৃষ্ণ কিন্তু তার রাজত্ব ছিনিয়ে নিল না। বরং তার ছেলেকে রাজা বানিয়ে বসিয়ে দিয়ে এলো। রাজ্য জয় করা তো কৃষ্ণের উদ্দেশ্য ছিল না। শৃগাল বাসুদেব দলে জয়েন করেনি বলে ওকে মেরে ছেলেকে রাজ্য দিয়ে এল। ছেলে এবার দলে জয়েন করল। ব্যস্! মোটামুটি দক্ষিণী যাদবদের দলভুক্ত করে দলকে আরো পোক্ত করে কৃষ্ণ আর বলরাম মথুরা ফিরে এল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *