বেনের গল্প

বেনের গল্প

বেন নামে এক শাসক ছিল। বেন টেন না। টেনেটুনে বিখ্যাত এক শাসক ছিল বেন। সে আবার বিখ্যাত বংশে জন্মে বংশের নামে বংশদণ্ড প্রোত্থিত করে, বংশীবাদক হয়ে নিজবংশী বাজিয়ে নিজেই নিজের জন্য বংশদণ্ড আহ্বান করে নিয়েছিল।

বুঝিয়ে বলি। সে অনেকদিন আগের কথা। দিনের হিসেবে প্রাগৈতিহাসিক সময়ের আগে, মানে যখন ডাইনোসরেরা সবে লুপ্ত হয়েছে, তখনই বোধহয় গুপ্তভাবে বেনের পূর্বপুরুষরা দেবতাদের থেকে ধরায় সুপ্তধারায় নেমেছিল। বেনের দাদুর দাদুর দাদুর দাদুর বাবা ছিল স্বয়ম্ভু মনু, আর তার বাবা হল ব্ৰহ্মা। তাই বেন হল ব্রহ্মার সরাসরি বংশধর। বিশ্বাস হল না বুঝি? কেন জিশুখ্রিস্ট আর মহম্মদ যদি লতায় পাতায় মোজেস আর আব্রাহামের বংশধর হতে পারে, তাহলে আমাদের বেন কেন ব্রহ্মার বংশধর হবে না? গল্প বলছি, চুপচাপ শুনে যান।

হরিবংশ বলছে, বেনের বাবা ছিল অঙ্গ (কার অঙ্গ, কোন অঙ্গ জানি না), অঙ্গের বাবা ঊরু (ঊরুর ছেলে ঠিক কোন অঙ্গ হতে পারে, এবার সেটা স্পষ্ট আন্দাজ করা যাচ্ছে), ঊরুর বাবা মুনি (মুনিটাই নাম), মুনির বাবা চাক্ষুস (এবারে চোখে উঠেছে), তার বাবা শিথি, শিথির বাবা ধ্রুব (হয়তো সেই তারাটা যে খালি হেমন্ত স্যারকে প্রশ্ন করত), তার বাবা উত্তনপদ (এর বৌ আবার ধর্মের কন্যা ছিল, অশ্বমেধ যজ্ঞ থেকে বেরিয়েছিল), উত্তনপদের বাবা বীর (এমনিই বীর, নামেই বীর), বীরের বাবা স্বয়ম্ভূ মনু (যার সাথে বশিষ্ঠের থেকে মাইটোসিস হওয়া শতরূপার বিয়ে হয়েছিল), আর এই স্বয়ম্ভূ মনুর বাবা হল ব্রহ্মা।

মহাভারত আবার এটাকে ছোট করে দিয়ে বলছে অত কিছু না, বিষ্ণুঠাকুর একটা মানুষ বানিয়েছিল তার নাম বীরযশ। একে দায়িত্ব দেওয়া হয় মানুষের মধ্যে বীরত্ব ফলিয়ে যশ লাভ করতে। বীরযশের ছেলে ছিল কৃত্তিমাত (একেবারে মাত করে দিয়েছিল), কৃত্তিমাতের ছেলে ছিল কর্দম (কর্দম মানে কাদা। হরদম সে কি কর্দম মেখে থাকত?), কর্দমের ছেলে অনঙ্গ, তার ছেলে অতিবলা বা অঙ্গ, আর অঙ্গের ছেলে বেন।

এবার খটকা লাগে অন্য জায়গায়। হরিবংশ তো আসলে মহাভারতের মানেবই, মানে বইয়ের মাধ্যমে মহাভারতে যে কৃষ্ণের বংশের ফুটেজ কম লেখা হয়েছিল, সেটাই তুলে ধরার জন্য হরিবংশ। মহাভারত যদি কুরুদের কাহিনি হয়, তাহলে হরিবংশ হল, কীভাবে নারায়ণের সাথে কৃষ্ণ সরাসরি বংশে যুক্ত, সেটা দেখানো। সেখানে হরিবংশ কর্দমকে মনুর ছেলে আর বীরের শ্বশুর বানিয়ে দেয় সেখানে মহাভারত এতগুলো মাঝের লোকজন বাদ দিয়ে কর্দমের নাতির ছেলে অঙ্গ কী করে করে দিল বুঝি না।

যাইহোক মোদ্দা কথা, ব্রহ্মার মাধ্যমেই হোক আর কর্দমের মাধ্যমেই হোক, বিষ্ণুর বংশধর হল অঙ্গ। এবার আপনি বলবেন মশাই ব্রহ্মার সাথে বিষ্ণুর কী কানেকশন হল? তাহলে বলে রাখি হরিবংশ শুরুই হচ্ছে এমন জায়গায়, যেখানে বিষ্ণুই সব। ‘নরাঃ’ অর্থে জল, আর জলে জন্ম জলজ দেবতা তাই তার নাম নারায়ণ। ছোটবেলায় পড়া “নরঃ-নরৌ-নরাঃ” কথাতে কিন্তু নরাঃ মানে বহুবচনের মানুষ বোঝাচ্ছে। মানে একটা লোককে আপনি পেটালে বলবেন ‘একটি নরকে আমি পেটাচ্ছি’ (নর-কে পেটাচ্ছেন, নরকে গিয়ে পেটাচ্ছেন না। আপনি যমদূত হতেই পারেন, কিন্তু যখন তখন যাকে তাকে নরকে নিয়ে যেতে পারেন না)। আবার অনেক মানুষের কাছে গণধোলাই খেলে বলবেন, “নরাঃর দ্বারা আমি পিটুনি খাইলাম” (আরও বেশি করে যমদূত মনে করুন নিজেকে, এরকমই পাবলিকের মার জুটবে)। সনাতন ধর্মের প্রত্যেক পুরাণের একটি অলিখিত নিয়ম হল যে দেবতার নামে পুরাণ পড়বেন, তাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে ধরা হবে প্রথমে, আর তার থেকেই সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে সেটা দেখানো হবে। যেমন, শিব পুরাণে শিব হল সবকিছুর শুরু আর শেষ, দেবী ভগবতে আবার মা শক্তিই সব, ব্রহ্মা পুরাণে যেহেতু ব্রহ্মা নারায়ণের আম্বিলিকাল কর্ডের সাথে যুক্ত তাই একটুর জন্য ওই পজিশন ফসকে গেছে।

যা-ই হোক, এই অঙ্গরাজা গোটা পৃথিবীতে শাসন করত। মানে তখনকার সময়ে যতটা ভারতবর্ষের ম্যাপ জানা ছিল আর কি। এই অঙ্গরাজা মৃত্যুর কন্যা সুনীতাকে বিয়ে করে, আর তাদের ছেলে হয় বেন। বেন জন্মানোর আগে পর্যন্ত পৃথিবীতে ধর্মের জয়ধ্বজা উড়ত। ধর্ম অর্থে দেবতাদের পক্ষে কাজকর্ম। ধর্ম কথাটা ভীষণ কঠিন শব্দ। আমরা এখন ধর্ম বলতে বুঝি কোনো এক অদৃশ্য শক্তির প্রতি বিশ্বাস, সে সাকার হোক বা নিরাকার, ওই বিশ্বাসটাই হল আমার ধর্ম। কিন্তু মহাভারতের সময়ে ধর্ম কী বস্তু, সেটা বোঝাতে কৃষ্ণ যুদ্ধের মাঠে দাঁড়িয়ে অর্জুনকে বিস্তর ট্রেনিং দিয়েছিল। যদিও সেই ‘শ্রীমদ্ভগবদ গীতা’ মানুষের কর্ম নিয়ে জ্ঞান, কিন্তু সেই জ্ঞানের পিছনে পুরো শিরদাঁড়াটাই ছিল ধর্মের। তাই তখন ধর্ম মানুষের কর্মের সাথে জড়িত ছিল। এখনকার মতো মাইক বাজিয়ে তারস্বরে ভগবানকে ডেকে, বা রিকশা স্ট্যান্ডে ভগবান দেখে প্রণাম করে অথবা ঝান্ডা নিয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে নিজের পছন্দের ভগবানের রূপটাই শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার মারামারি অথবা জোর করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে আর বইমেলায় মানুষকে অখাদ্য অনুবাদ করা পবিত্র বইয়ের কপি জোর করে গেলানোটা ধর্মের পর্যায়ে পড়ত না। ধর্ম অর্থাৎ মানুষের কর্ম।

এটাও বুঝিয়ে বলি। আমরা কথায় কথায় বলি “চোরের ধর্ম চুরি করা”। মানে কী? চোর চুরি করবেই। সে চোর। একান্ত ক্লেপ্টোম্যানিয়াক অর্থাৎ চৌর্যোন্মাদগ্রস্ত না হলে, অভাবে বা স্বভাবেই চোর চুরির লাইনে নামে। তখন তার কাছে চুরি করাই ধর্ম। চোরের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ভাবুন, তার কাছে এটা একটা জীবিকা। কম মূল্যের বস্তু বা ধন চুরি করলে সেটাকে ‘চুরি’ বলা হয়। প্ৰচণ্ড মূল্যের ধন চুরি করে বিদেশে পালিয়ে গেলে সেটাকে ‘তছরূপ’, ‘ব্যাঙ্কের ঋণ মকুব’ ও ‘জনগণের উপরে ট্যাক্স বৃদ্ধি’ বলা হয়। চোরের মা জিরাফ। তাই মানুষ বলে, “ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি”।

কিন্তু এবার বলবেন ধর্মের কথা বলতে তস্করের ভূমিকা টেনে আনলাম কেন? তাহলে আরেকটা উদাহরণ দিই। একবার আমি অফিসের একটি কাজে একটি নামি-দামি রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে অনেকরকমের পদের সাথে মনের কি এক ইচ্ছেতে আলুপোস্ত অর্ডার করি। বারোশো টাকায় এক প্লেট আলুপোস্ত যে বাটিটায় আনা হল, বিশ্বাস করুন ওই সাইজের বাটিতে দুটো দশ টাকার রসগোল্লাও আঁটে না। যদি আমি ধরি একদম অসাধারণ জায়গা থেকে পোস্ত আনা হয়েছে তাতেও মোটামুটি বারোশো টাকা প্রতি কিলো দরে আনা হয়। ওই বাটিতে কোনোমতেই এক কিলো পোস্ত দূরের কথা, একশোগ্রাম পোস্তও আঁটেনি। এবার আপনি বলবেন দামি রেস্তোরাঁর সার্ভিস চার্জ, অ্যাপ্যায়নের চার্জ, এসি, লাইট, টুংটাং মিউজিক-এর চার্জ তো থাকেই, তাতেও বারোশো টাকায় ওইটুকু পোস্ত হয়? এরপরে তো দেখব কোনদিন ফাঁকা বাটি এনে বলবে এটাকেই পোস্ত মনে করে খেয়ে ফেলুন, টাকাটা এই রেস্তোরাঁয় কিছুক্ষণ বসে যে দুশোটা সেলফি তুলে ইন্সটাগ্রামের সস্তা হিরোর মতো ছবি দিচ্ছেন তার চার্জ। হ্যাঁ আমি মানতাম বারোশো টাকার ওইটুকু পোস্তের ডিশের দাম, যদি সে পোস্ত মঙ্গলগ্রহে চাষ করে বিশুদ্ধভাবে আনা হত, অথবা তাতে পারিজাত সেবন করা মৃগনাভি হরিণের গায়ের তেল ঢেলে রান্না করা হয়েছে। কিন্তু সে যা অখাদ্য খেতে, আমাদের ঘরে শত চেষ্টাতেও ওরম অখাদ্য পোস্ত আমার মা বানাতে পারবে না।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? বিশাল নাম, মার্কেটিং গিমিক, ঝকঝকে তকতকে সার্ভিস ও আনুষাঙ্গিক প্রচুর কলাকুশলী ও কাঁচকলাকুশলী দেখিয়ে (ওই পোস্তয় যদি কাঁচকলা দিত তাও বুঝতাম, ছিল তো দুটো ডুমো আলু), যাকে পাতি বাংলায় বলে মাথায় হাত বুলিয়ে টাকাটা নিয়ে নেওয়া হল। এটাও একরকমের চৌর্যবৃত্তি। এবং এইরকম চৌর্যবৃত্তিতে সব জায়গায় ভরে যাচ্ছে। সমাজের নীচ থেকে উপরে সর্বত্র এই চৌর্যবৃত্তি চলছে। আপনি ব্র্যান্ডেড কাপড় ছাড়া পরেন না? মলের তীব্র আলোয় দশটা জামা-কাপড় পছন্দ করে, ট্রায়াল রুমে ন-টা পরে সেলফি তুলে আগামী দু-মাসের সামাজিক মিডিয়ার রসদ জোগাড় করে, দুটো জামা পছন্দ করে কেনেন? তাহলে আপনি জানবেন যে এমন অনেক জামা আছে যেগুলো ওই সুন্দর আলোয় দেখতে অসাধারণ লাগলেও বাড়িতে এনে ওটাকে সাধারণ মনে হয়। আবার একইরকমের জামা দুই জায়গায় দু-রকমের দামে বিক্রি হয়।

একটি কোম্পানিতে চাকরি করার সুবাদে মাসে আমি একটা টাকা পেতাম। সেই টাকাটা কোম্পানি এই শর্তে দিত যে ওই কোম্পানিরই কিছু জিনিস কিনতে হবে, তবেই সেই বিল দেখিয়ে আমি পয়সা পাব। গঙ্গার জলে গঙ্গা পুজো, পুরোহিতের লাভ। সেই কোম্পানির দুটি কাপড়ের ব্র্যান্ড ছিল, একটি দেশী ও একটি বিদেশি। দেশীটার বিদেশি নাম কিন্তু দাম দেশীয়, আর বিদেশিটার নেশা লাগানো জীবনী নাম কিন্তু দাম বিদেশিদের মতো। এ যেন বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ঢোকার সময় বিদেশি বলে দশগুণ টিকিটের দাম আদায় করার মতো ব্যাপার। আমরা সেই জায়গায় জামা কিনতে যেতাম, তারপরে একদিন আর্কিমিডিসের মতো (ট্রায়াল রুমে অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায়) আবিষ্কার করি যে আসলে দেশী বিদেশি দুই জায়গায় একই কাপড় ও একই জামা পাওয়া যায়, খালি ব্র্যান্ডের তফাত, তাই দামের বিশাল তফাত। ভালো আবিষ্কার সবসময় মানব কল্যাণে প্রয়োগ করা উচিত, তাই সঙ্গে সঙ্গে আমার সহকর্মীদ্বয় মানব ও কল্যাণকে ব্যাপারটা জানালাম। তারপর থেকে আমরা বিদেশি দোকানে ভালো ভালো জামা ট্রায়াল দিয়ে এসে দেশী দোকানে কিনতাম। ক্রমে সেই আবিষ্কারের নেশা এতটাই পেয়ে বসে যে খুঁজে খুঁজে খিদিরপুরে ও মহেশতলায় সেই জামা বানানোর হস্তশিল্প কারখানা আবিষ্কার করে লেবেল না লাগানো একই জামা প্রায় অর্ধেকের থেকেও কম দামে কেনা শুরু করি। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, কিন্তু এইসব নামি-দামি মলের ঝাঁ চকচকে ব্র্যান্ডেড দোকানে (সে কাপড়ের হোক বা অন্য কিছুর), বেশিরভাগ সময়ে এরা শুধুমাত্র ওই লেবেল, ওই নাম লেখা বেল্ট গোঁজার খাঁজ, ওই প্রিন্ট করা বোতামগুলোরই দাম নিয়ে নেয়। এগুলো ছাড়াও আপনি একই কাপড় পেতে পারেন, একটু খোঁজখবর করে। কারণ এরা যে দামে কেনে তার তিনগুণ দামে বিক্রি করে।

সেই ব্যক্তিগত আলোচনা পরে কোনোদিন করব। এতকিছু বলার উদ্দেশ্য হল যে ‘চোর’ কথাটার অর্থ শুধুমাত্র গভীররাতে যারা অন্যের ঘরে চুরি করতে আসে তারা নয়, সমাজে তারাও চোর যারা আপনার চোখে মোহ ও লোভের ঝলকানি ও দ্বিগুণ দাম করে ষাট শতাংশ ছাড়ের চমকানি দিয়ে আপনার পকেট সাফ করে দেয়। আর এই সমস্ত চোরের ধর্ম একটাই, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে নিজ বিদ্যা কাজে লাগিয়ে চুরি করা। যেমন সাপের ধর্ম ছোবল মারা, নিন্দুকের ধর্ম খুঁত খোঁজা, ডাক্তারের ধর্ম রোগ খোঁজা, ল্যাদখোরের ধর্ম নলপত করা, অপদার্থদের ধর্ম অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো, রাজনৈতিক নেতাদের ধর্ম মানুষকে ভুল বুঝিয়ে লুটে নেওয়া, ফাঁকিবাজের ধর্ম হাতের তালুতে আণুবীক্ষণিক সাইজে গোটা বই লেখা আর আমার ধর্ম যা মাথায় আসে তাই ভুলভাল বকা, তেমনই ধর্ম এক ও একমাত্র কর্মের সাথে যুক্ত। যে কর্মে আপনি সিদ্ধহস্ত, যে কর্ম আপনার জীবনের উদ্দেশ্য, সেটিই আপনার ধর্ম। সেটা সারাদিন খাওয়াও হতে পারে আবার ঘুমানোও হতে পারে। কিন্তু ‘ধর্ম’ কোনোমতেই “আমার ভগবান শ্রেষ্ঠ, তোমার ভগবান শয়তান” এটা বলা নয়, ওটা পাতি ব্যবসা।

তাই অঙ্গ যখন শাসন করত তখন পৃথিবীতে ধর্ম শান্তিপূর্ণ ভাবে বিরাজ করছিল, অর্থাৎ তখন যার যা কাজ তাই করত। আমি বারবার শাসক বলছি, রাজা বলছি না। তার কারণ পরে বলব। শাসকের কাজ “দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন” (এখন দুষ্টরাই শাসন করে তাই উলটপুরাণ চলছে)। তাই অঙ্গ শাসক হিসেবে সুশাসন করত। ঋষিরা দিনরাত আগুনে চাল, ডাল, মুলো, কলা, ডাইনোসরের ডিম, ইয়েতির ক্রিম, ম্যামথের ঠ্যাং, সাপ, ব্যাং, বুনিপের লেজ, ড্রাগনের তেজ ইত্যাদি ঢেলে দেবতাদের সবরকম প্রোটিন সাপ্লাই করত, আর দেবতারাও নিজেদের নিজেদের কাজে ব্যস্ত ছিল। যখনকার কথা বলছি তখন সৃষ্টি শুরু হয়েছে বেশিদিন হয়নি, তাই মোটামুটি সকলেই নিজের নিজের অফিস সবে গুছিয়ে বসতে শুরু করেছে। আর এই সময়েই জন্ম নেয় বেন।

এই বেন হল ইতিহাসে প্রথম বিদ্রোহী। এবং ইতিহাসে কোনোদিন দেখবেন না, কোনো পরাজিত বিদ্রোহীকে নায়ক বানানো হয়েছে। বিদ্রোহী যদি জিতে যায় তাহলে সে নায়ক, আর হেরে গেলেই ভিলেন। সেটাই পৃথিবীর নিয়ম। বেন বড় হয়েই ‘ধার্মিক’ কার্যের বিরোধিতা শুরু করল। তার স্পষ্ট কথা, “দেবতাদের কিছু দেব না, ব্যস…”। এই স্পষ্ট কথায় অনেক কষ্ট পেলেও বেনকে সঙ্গে সঙ্গে দেবতা ও দেবতাদের তোষক ঋষিরা ‘নষ্ট’ ও ‘ভ্রষ্ট’ আখ্যা দিয়ে দিল। হতেই হবে। একটা সিস্টেম দিব্যি চলছিল, সেটাতে কাঠি করলে তো মন্দ কথা ও গালমন্দ শুনতেই হবে। ইতিহাসে কমপক্ষে দুটো এরকম জ্বলন্ত উদাহরণ আছে যেখানে দু-দুজন বিখ্যাত মানুষ একটা ব্যাপক প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে মার্ডার হয়ে ভগবান হয়েছেন। বেন তো কোন ছার!

সঙ্গে সঙ্গে মুনি-ঋষিরা বেনের এরকম ‘অধার্মিক পাপিষ্ঠ’ হওয়ার পিছনে তার মাতৃকূলের নষ্ট জিন স্পষ্ট করে দিল। পাজি বামুনরা তার মানে তখনও ছিল। বাহ রে বাহ, যেই ছেলে নষ্ট হল অমনি মায়ের বাড়ির দোষ, আজ যদি বেন দেবতাদের তেল মেরে চলত তাহলে তখন তার মায়ের বাড়ির কথা মনেও পড়ত না। তখন বাবার দিকে বিষ্ণু আর ব্রহ্মার জিন ম্যাপিং করে তাকে নায়ক বানানো হত। বেশিদূর যেতে হবে না, বেনের বাবা অঙ্গ তো ধার্মিক ছিল, তার মা আগ্নেয়ীকে নিয়ে কোনো প্রশংসা দেখি না কেন? একই প্রশ্ন নাদ্বলা, বৃহতি, সূচয়াকে নিয়েও। তাদের কোনো পিতৃপরিচয়ই নেই। যেহেতু বেন ‘খারাপ ছেলে’ তাই তার মায়ের বাবা অর্থাৎ দাদু ‘মৃত্যু’ বলে দিয়ে দাও ওর নামে লেবেল সেঁটে। চিরকালই তাই হয়েছে, এখনও হয়।

যা-ই হোক, বেন বলল, “দেবতাদের যজ্ঞ করে জিনিস দেওয়ার দরকার কী? আমিই শাসক, আমি প্রতিপালক, আমিই ভগবান… সব পুজো আর যজ্ঞ বন্ধ করে শুধু আমার পুজো করো…”

এ জিনিস এখনকার দিনে প্রায়শই দেখা যায়। শাসন করার ক্ষমতা পেলেই “আমিই শ্রেষ্ঠ, আমারই মূর্তি হবে, আমার থেকে কেউ জ্ঞানী নেই, আমি একুশটা ভাষা জানি, আমি যা বলি সেটাই ধর্ম, সেটাই ন্যায়…”, এই দেখে দেখে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু সেইযুগে মানে সৃষ্টিতে প্রথমবার কাউকে এরকম বিদ্রোহ করতে দেখে সকলেই অবাক হল, এবং ভয় পেল। বেন ঠিক ছিল কি ভুল সেটা আলোচনায় যাচ্ছি না। কারণ পুরাণে যখন একতরফা ভাবে দেবতারাই সবসময় ঠিক, দেবতারা যা করে সেটাই ধর্ম, দেবতাদের পাপগুলোকেও লীলা বা দৈব ঘটনা হিসেবে দেখানো উচিত বোধ হয়েছে, তখন সেই স্বপ্রতিষ্ঠিত ও স্ব-ডঙ্কা ঘোষিত লবডঙ্কা ধর্মের বিরুদ্ধে যে যাবে সেই তো পাপী, সেই তো ভুল। যদি পাপীদের দৃষ্টিকোণ দিয়ে পুরাণগুলো দেখতে শুরু করেন তাহলে সবকিছুই ঘুরে গিয়ে আপনি নাস্তিক ও সনাতন ধর্মে দেবতাদের উপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে পারেন। আমরা সেদিকে যাব না, আমরা যেমন লেখা আছে সেরকম‍ই গল্প শুনব, বলব, পড়ব। কিন্তু বেনের এই কথায় সকলে ভয় কেন পেল?

কারণ মানুষ পরিবর্তন ভয় করে। এটা আলাদা ব্যাপার যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনের জোয়ার আগে এসেছে এবং সেই জোয়ারের পরবর্তীকালে ভয় এসেছে, কিন্তু সাধারণত মানুষ যে কোনও পরিবর্তনকেই ভয় পায়। বেশিরভাগ মানুষ স্বভাবে বড্ড জাড্য। “এই তো এই বেশ আছি”, “মাইনে কম কিন্তু এই চাকরিটাই ঠিক আছে, বাড়িতে থেকে করতে তো পারছি…”, “ছাদ থেকে জল পড়ছে, কিন্তু শুধু তো বর্ষাকাল, এই ঘরটাই ঠিক আছে…”, “রোজ কুকথা শোনায় আমার বয়ফ্রেন্ড, একদিন গায়ে হাত তুলেছিল, কিন্তু ওর মনটা ভালো, এই ঠিক আছি…” এরকম কতশত পরিস্থিতিতে মানুষ মানিয়ে নেয় নিজেকে রোজ। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এই কারণে মানুষ মানিয়ে নেয় কারণ মানুষ ‘পরিবর্তন’ জিনিসটাকে ভয় পায়। নতুন চাকরিতে ঢুকে আবার নতুন ভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত করতে হবে? যদি এই চাকরির মতো আরাম না পাই? যদি ট্রান্সফার করে দেয়? এই রিলেশনশিপ থেকে বেরিয়ে আবার নতুন করে একজনকে বিশ্বাস করতে হবে? যদি সেও ঠকায়? যদি সেও পেটায়? এই বাড়িটা চেঞ্জ করে ফ্ল্যাট নেব? নতুন পাড়ায় কাউকেই তো চিনি না!

মানুষ নিরানব্বই শতাংশ সময়ে পরিবর্তনের ভয় পায়। একটা ছাত্র যে পড়া জানে কিন্তু ক্লাসে হাত তুলে পড়া বলতে পারে না, সেও কিন্তু পরিবর্তনের ভয় পায়। সে পড়া বলে দিলে তার বন্ধুরা তাকে অন্য নজরে দেখবে, শিক্ষকের আশা বেড়ে যাবে, এত অ্যাটেনশন সে সামলাবে কী করে? আর এটা শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বড় বড় শিল্পপতিও এই পরিবর্তনের ভয়টা পায়। আগের প্রোডাক্টকে নতুন করে বানিয়ে ফেলব, বাজারদর পড়ে গেলে? নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ করব, মানুষ উলটো ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিলে? এই পরিবর্তনের ভয়টা সনাতন, চিরকালীন… ছিল, আছে, থাকবে। বেনের ক্ষেত্রেও ঋষিরা এই ভয়টাই পেল। যাহ্, সব পরিবর্তন করে যদি বেন নিজেকেই শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করে ফেলে তাহলে তো দেবতাদের ছেড়ে বেনকে পুজো করতে হবে! তখন দেবতারা খচে গিয়ে উচ্চতর ত্রিদেবকে যদি নালিশ করে তাহলে এই সবে শুরু হওয়া সৃষ্টি ধুয়ে মুছে আবার নতুন করে বেনহীন আরেক সৃষ্টি শুরু করতে ত্রিদেবের কিচ্ছু যাবে আসবে না। তখন ঋষিগুলো কোথায় যাবে? আগেভাগে কল্পকে শাটডাউন করে দিলে ঋষিরাও অস্তিত্ব থেকে ভ্যানিশ হয়ে যাবে। ভারী বিপদ।

ঋষিরা তখন নিজেদের ইউনিয়ন বানিয়ে কাঁধে ঝান্ডা নিয়ে “অত্যাচারী ও ব্যাভিচারী বেনের হাত টেনে চেনে বেঁধে ট্রেনের লাইনে ফেলে ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও…” এই শ্লোগান দিতে দিতে বেনের কাছে এসে উপস্থিত হয়। ইউনিয়ন লিডার মারিচী। তাদের ন-বেন-ন্ন অভিযানে বেন বিস্তর রং মেশানো জল ছোড়ে, কিন্তু ঋষিরা তো জঙ্গলে থাকে, তাদের আর কি? ওই জলেই স্নান করে নিল। তারপরে রঙিন হয়ে বেনের সামনে এসে বলল, “আমরা বারো দফার দাবি নিয়ে এসেছি…”

বেন সেই বারোদফা লিখিত দাবি নিয়ে ঋষিদের সামনেই তার দফারফা করে দিয়ে বলল, “ওসব কিচ্ছু হবে না। এই ইউনিয়ন বেআইনি…”

“আমাদের আইন দেখিও না…” ঋষিরা চটে যায়।

চটানো ঋষিদের চেটে দিয়ে বেন বলল, “আরে আইন আমি নিজেই, আবার দেখানোর কি আছে। এই নাও দেখো—”

“শোনো বেন, আমরা এখন যজ্ঞ করব,” ঋষিরা বলে।

“কার নামে হবে? কাকে ডেডিকেট করে হবে, সব এই ফর্মে লিখুন,” বেন বলে। ফর্মে শুধু বেনের নাম। ঋষিরা বলে, “দেবতাদের নাম কই? কই?”

“কই জলে,” বেন বলে, “আমিই একমাত্র সব, যা যাগযজ্ঞ হবে সব আমার জন্য করতে হবে, ব্যস। নইলে সরকারি খরচ থেকে এক পয়সা দেওয়া হবে না!”

“কিন্তু তুমি যে শেষ বাজেট অধিবেশনে বলেছিলে যজ্ঞের ট্যাক্স মুকুব করা হবে, আর কুড়ি হাজার কোটি টাকা যজ্ঞের জন্য খরচ করা হবে…”

“আপনি ক্রোনোলজি বুঝুন,” বেন বলে, “আমাকে এখন আমার একটা বিশাল মূর্তি বানাতে হবে, নিজের একটা মন্দির বানাতে হবে, ভিস্টা রাজপ্রাসাদের নামে দিস্তা দিস্তা টাকা লাগবে, সেটাই তো যজ্ঞ। আপনাদের যজ্ঞের জন্য পয়সা দেব কোথায় বলেছি? আমাকে সন্তুষ্ট করে যজ্ঞ করুন তবেই পয়সা দেব!”

ঋষিরা রেগে আগুন, ওই আগুনেই যজ্ঞ হয়ে যেত। তারা বলে উঠল, “হে নরাধম পাপিষ্ঠ পক্ষীবিষ্ঠ-”

“ল্যাজবিশিষ্ট… হা হা হা…” বেন হেসে ওঠে। আর ওই হাসিতেই ঋষিরা ডিসি জেনেরেটরের মতো গমগম করে বিকট হুংকার দিল। সেই হুংকারেই বেন ঘাবড়ে গিয়ে পড়ে গিয়ে একেবারে হার্ট অ্যাটাক। ব্যাটার হার্ট দুর্বল ছিল বোধহয়।

ঋষিরা বলল, “যাহ্ বাবা, বেন মরেই গেল?”

মারিচী বলল, “দুর্বাল… মানে দুর্বল, ওর হার্ট দুর্বল… এসো ওকে আমরা মন্থন করে অন্যদের বের করি…”

এখানে অনেক অনেক প্রশ্ন আসে, যেগুলোর উত্তর খোঁজা বৃথা। বেনের পতনের পরে ওর বডিটা মন্থন করার কী দরকার ছিল? মন্থন মানে নিংড়ানো। বেন কি স্পঞ্জ ছিল নাকি গামছা? নাকি সেই সমুদ্র ঘাঁটা থেকে ঘাঁটাঘাঁটি করাটা দেবতা-ঋষিদের একটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছিল? আবার এরকমও হতে পারে হঠাৎ বেনের এইভাবে পড়ে যাওয়ায় ঋষিরা ভয়ে সিপিআর দিচ্ছিল। ওই হাত পা ঘষে টষে। পুরাণ এই ব্যাপারটা বেশি ঘাঁটায় না, কিন্তু ঋষিরা বেনের বাম ঊরু ধরে ডলতে লাগে। দৃশ্যটা ভাবুন, ঊরু মর্দন চলছে। প্রচুর প্রশ্ন আসছে, লিখতে পারব না, আপনার ভাবতে থাকুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন। যা-ই হোক, সেই ঊরু ঘাঁটায় সেখান থেকে লাফ মেরে “ঊরু বাবা!” বলে এক খর্বকায় কালো মানুষ বেরিয়ে এল। ঋষিরা তাকে দেখেই বলল, “নিষিদ…”। সেই থেকে ওই জাতির লোকেদের নাম নিষাদ হয়ে গেল।

এখানে আসুন, ব্যপারটা একটু অনুধাবন করি। যেহেতু কালো, খর্ব তাই সেই লোক খারাপ। বাহ্ রে বাহ্, কালো ও খারাপ রূপ দেখে যেখানে একটা মানুষ ও এক সমগ্র জাতির চরিত্র বিচার করে তাদেরকে সমাজের নিকৃষ্টতম জাতি বলে লেবেল সাঁটিয়ে দেওয়া হয়, সেই দেশে রমরম করে ফেয়ারনেস ক্রিম আর বিয়ের আগে মেয়েদের ত্বক ঘষে কালো কি না পরীক্ষা হবে এ আর আশ্চর্য কি? মানে ব্যাপারটা বুঝুন, পুরাণ-টুরাণ এখন ভুলে যান, নিষাদ অর্থে ভারতের আদি অধিবাসীরা যাদেরকে আর্যরা হেয় ও উচ্ছিষ্ট জ্ঞান করত। তাদের সৃষ্টির একটা গল্প জুড়ে দিল অত্যাচারী রাজার ঊরুর সাথে। মানে ঋষিরা ঊরু মন্থন করে বেনের যে খারাপ সত্তাটা বের করল সেটাই হল নিষাদ গোষ্ঠী। মানে ওরা চিরকাল পাপী, আর্যদের খরচের খাতায়। তাই বোধকরি একলব্যের আঙুল কাটা ও পাণ্ডবদের প্রক্সি দেওয়ায় ছ’টা ক্ষুধার্ত নিষাদ মানুষকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়াতেও কোনো দোষ হয় না। কারণ ওদের পূর্বপুরুষ বেনের জাং থেকে জংবাহাদুর হয়ে বেরিয়েছিল। আমার চিন্তাভাবনা এখানে উলটোপালটা হয়ে যাচ্ছে, তাই এই প্রসঙ্গ থাকুক।

কিন্তু আরেকটা কথা না বললেই নয়। নারায়ণের ঊরু ঘষলে অপ্সরা বেরোয় আর বেনের ঊরু ঘষলে শিডিউলড ট্রাইব? অদ্ভুত বিচার। যা-ই হোক গল্পটা এগিয়ে নিয়ে যাই। বেনের আরও অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে আরও আর্যদের চোখে যারা নিকৃষ্ট জাতি, তারা বেরিয়ে আসে। যেমন বিন্ধ্যতে বসবাসকারী তুখর, তুমুর ইত্যাদি। এরপরে ঋষিরা বেনের ডান হস্ত নিয়ে সেই হস্তকে মৈথুন… ইয়ে মানে ভুল লেখা হল… মন্থন, হস্তমন্থন করতে শুরু করে। একটা লাশকে নিংড়েই যাচ্ছে। আর্জিকর, মানে, আর্জি না করেই এসব চলছে। কি অদ্ভুত মানসিকতা আর এবার সেই হস্তমন্থন থেকে আগুনের মতো দীপ্ত, অজোগভ নামে ধনুকধারী, একেবারে ফুল ব্যাটেল স্যুট পরে এক দিব্য পুরুষ বেরিয়ে এল। সে বেরোতেই সবাই আনন্দে উল্লাস করে উঠল, সৃষ্টি নেচে উঠল, দেবতারা ফুল ঢালল। কেন? কারণ সে কালো নয়, উজ্জ্বল ফরসা, তাকে ভালো হতেই হবে। তার আগমন হতেই সবাই বুঝে গেল, এই হবে পরবর্তী শাসক এবং সেই হল প্রথম ক্ষত্রিয় ও ‘রাজা’। এর নাম হল পৃথু।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *