জরাসন্ধের সাথে ঝামেলা শুরু

জরাসন্ধের সাথে ঝামেলা শুরু

কংস জরাসন্ধের জামাই ছিল। জরাসন্ধের দুটি মেয়ে, দুজনের সাথেই কংসের বিয়ে হয়েছিল। আস্তি এবং প্রাপ্তি। কিন্তু কংসের যে এরকম ভাগনের হস্তে গঙ্গাপ্রাপ্তি হবে তা কে জানত? জামাইয়ের কামাই হওয়ার খবর পেয়েই জরাসন্ধ নিজের সেনা আর মিত্রপক্ষদের নিয়ে যাদবদের চিত্রে মালা টাঙাবার উদ্দেশ্যে মথুরার দিকে ধাবিত হল।

একদিক দিয়ে দেখলে এটা যেমন মনে হয় যে জরাসন্ধ জামাইয়ের মার্ডার আর কন্যাদের বিধবা হওয়ার প্রতিশোধের জন্য আক্রমণ করল, অন্যদিক দিয়ে দেখলে আরও বড় একটা ছবি সামনে আসে। কোনোভাবে তলে তলে এবং ছলে বলে আর্যদের নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার জন্য মারামারি শুরু হয়েছিল। এবং সেই মারামারিতে জরাসন্ধ আর কংসের মতন কিছু আর্য রাজারা, ভারতবর্ষের পূর্ব দিকের অনার্য বা সবে কনভার্ট হওয়া আর্যদের বশ্যতা স্বীকার করা রাজাদের নিজেদের দলে টেনেছিল। মহাভারতের আগে দেখবেন আমাদের এই পূর্বদিকের অঞ্চলগুলো কীরকম হেয় চোখে দেখা হয়েছে। এদিকটায় নাকি সর্প, নাগ, পক্ষি, রাক্ষস, এদের বাস। আর্যরা যেখানেই ঢুকতে গিয়ে লোকাল লোকদের ভোকাল তাড়া খেয়েছে, বা অধিবাসীদের যুদ্ধের হিসেব নিকেশ বুঝতে পারেনি সেখানকার লোকগুলো নিজেদের থেকে নিম্নস্থানীয় বলে স্ট্যাম্প মেরে দিয়েছে। বঙ্গ ও সুহ্মদেশের লোকেদের পক্ষি বলা হত, কারণ আমরা তখনকার বাঙালিরা পক্ষিমাতৃকার উপাসনা করতাম।

কিন্তু সেই নিয়মের ব্যতিক্রমে মহাভারতের কিছু লোকেদের দেখা যায় যে পূর্বদেশের লোকেদের সাথে দিব্যি বন্ধুত্ব পাতিয়েছে। যেমন কংস আর জরাসন্ধ। কিন্তু পুরাণকার হল কুরু আর যাদবদের দলের লোক। কুরু আর যাদবরা বসে থাকে কেন? সুতরাং হঠাৎ কোথা থেকে লেখা হল, পাণ্ডু রাজা নাকি সুহ্মদেশ জয় করেছিল। ভালো কথা, কিন্তু ওদিকে শত্রুপক্ষ, মানে কংস আর জরাসন্ধের সাথে আসাম আর তৎকালীন বৃহত্তর বঙ্গের রাজাদের জমিয়ে বন্ধুত্ব হচ্ছে। ওরা যদি এগোতে পারে, কুরুরা এগোতে পারবে না কেন? সুতরাং হঠাৎ অর্জুন একেবারে মণিপুরে ল্যান্ড করে একটা শ্বশুরবাড়ি পাতিয়ে ফেলল। বাকি আসাম বা বঙ্গের রাজারা কোন দূর দেশের এক রাজপুত্রকে পাত্তাই দিল না। এদিক দিয়ে আমাদের বঙ্গদেশ চিরকাল উলটো। গোটা দেশ যাকে সাপোর্ট করবে, বঙ্গদেশ তাকে লেঙ্গি মারবে। হয়তো ভালোর জন্যই। অর্জুন শ্বশুরবাড়ি পাতিয়েও বিশেষ কিছু সুবিধে করতে পারল না কারণ মণিপুরের রাজা সাফ বলে দিল, তোমাদের ফ্যামিলি ডিসপিউটে আমরা থাকব না।

তাহলে উপায় কি রইল? উপায় রইল এই যে পূর্বদেশের অচেনা অজানা প্রতিপত্তিশালী রাজাগুলো আছে তাদের পিটিয়ে নিজেদের অধীনে করতে হবে। আর তার জন্য আগে কুরু ও যাদবদের দলে যারা ওদের বন্ধু তাদের সরাতে হবে। কংস সাফ হয়ে গেছে, কংসের বংশও সাফ হয়ে গেছে। কংসের ছেলেপুলে ছিল বলে জানি না, থাকলেও তার নাম ইতিহাস থেকে নিমেষে মুছে দেওয়া হয়। কিন্তু জরাসন্ধ কংসের মতন দুর্বল ছিল না। জরাসন্ধের সাথে অনেক রাজাদের সম্পর্ক ভালো ছিল, এবং একটু পরেই আমরা দেখব জরাসন্ধের সাথে যাদবদের কারা কারা সখ্যতা করেছিল। জরাসন্ধও বোধহয় এই পরিবর্তনের ক্ষমতাকে হাতে রাখার জন্য এবং যাদব নামক গোষ্ঠীর উত্থান রুখতে আগেভাগে যুদ্ধে এসেছিল। যেহেতু যাদব গোষ্ঠীর নায়ক কৃষ্ণ কুরুদের আত্মীয় হয়, এবং সেই আত্মীয়র সাথে পাণ্ডুর নামাঙ্কিত দেবতাদের ছেলেরা এক হয়ে গিয়ে বাকি সবাইকে নিজেদের অধীনে করে ফেলবে (যেটা হয়েছিল শেষপর্যন্ত) এই আশঙ্কা করেই আচমকা জরাসন্ধ মথুরা আক্রমণ করে।

কৃষ্ণও এদিকে ততদিনে উগ্রসেনকে রাজা বানিয়ে ভোজ (খাবার নয় জাতি), বৃষ্ণি আর অন্ধক যাদবদের একত্রিত করে ফেলেছে। এবারে আমরা দেখি জরাসন্ধের পক্ষে কারা কারা লড়তে এসেছিল। আমি একেবারে হরিবংশ থেকে টুকে দিচ্ছি। করুষের রাজা দন্তবক্র (জন্মানোর পরেই এই নাম হয়েছিল নাকি দাঁত বেরোবার পরে?), ছেদিরাজ (সম্ভবত শিশুপাল, বর্তমান মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড), কলিঙ্গরাজ (উড়িষ্যা), পৌণ্ড্ররাজ (পৌণ্ড্রক বাসুদেব?), কেশিকার রাজা সংকৃতী, বিদর্ভরাজ ভীষ্মক আর তার ছেলে রুক্মী (উত্তর পূর্ব মহারাষ্ট্র), অঙ্গ ও বঙ্গের রাজা বেণুধারী, শ্রুতব, ক্রথ, অংশুমান (এইটা বোধহয় বাঙালি ছিল)। এছাড়াও ছিল কোশল, কাশী, দশর্না, সুমঃ, বিধা, মাদ্রা, ত্রিগর্ত ও শাল্বর রাজা। সাথে ছিল ভগদত্ত (হাতি এক্সপার্ট, সম্ভবত বর্তমান ডুয়ার্স এলাকার রাজা, এবং তাই একে যবনদের রাজা দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে), শৌবিরের রাজা শৈব, পান্ড্য রাজ্য, গান্ধারের রাজা সুবল (শকুনীর কেউ?), মহাবল, নগ্নজীত, গোনর্দ। কাশ্মীরের রাজা, দরদের রাজা (দরদ দেশ, দরদের রাজা এ কি নাটক হচ্ছে নাকি?), এবং দুর্যোধন সহ ধৃতরাষ্ট্রের অন্য ছেলেরা (অ্যাঁ? আগেই তার মানে কেলাকেলি শুরু করে দিয়েছিল?)।

তারপরে আর কি?

ঢিস-ঢাস—দুড়ুম-ধুড়ুম—দমাস-ধাঁই—বাপরে মারে—পালাপালা পালা—ওরে মেরে ফেললে রে—এই কোথায় যাচ্ছিস ইদিকে আয়—ও মা গো—ওয়াঁফস—ধড়াম—ঢিসক্যাউ—চ্যাকাচ্যাকাচ্যাকাচ্যাকা—গুড়ুম…

ফুল মোডে যুদ্ধের ফুল ফুটে উঠল। এরই মাঝে কৃষ্ণর জন্য দৈবভাবে বিষ্ণুর শ্রাঙ্গধনু আর কৌমুদকী গদা চলে আসে। বলরামের জন্য আসে সম্বাতক লাঙল (ওটাও অস্ত্র, কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই লাঙল চলে যায় তার উপর দিয়ে) আর সৌনন্দ গদা। এটা কিন্তু চিটিং, তোমরা দেবতা হয়ে মানুষের অবতার হয়ে এসেছে, মানুষের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করো। কেন তুমি তোমার দৈব রূপের জৈবাস্ত্রগুলোকে লইবে? কিন্তু কে কার কথা শোনে? ওই অস্ত্র দিয়েই কৃষ্ণ-বলরাম সবাইকে পেটাতে লাগল। বলরাম বিশেষ অস্ত্র-টস্ত্রের ধার ধারল না। স্রেফ রথ আর হাতিগুলোকে তুলে তুলে শূন্যে ছুড়ে দিতে লাগল। সেগুলো বোধহয় মহাকাশে গিয়ে পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরতে লাগল। হস্তি নিয়ে মস্তি। এইবার বুঝেছি, ভীম কোথা থেকে ওরকম যুদ্ধকলা শিখেছিল? এ তো যুদ্ধকলা নয়, বরং যুদ্ধে শত্রুকে মেরে কলার মতন চটকে দেওয়া।

বলরামের এইরকম রূপ দেখে জরাসন্ধের টিমের অনেকে ভয়ে পিছিয়ে এল, কিন্তু জরাসন্ধ সেখানে মোটামুটি একটা মোটিভেশনাল স্পিচ দিয়ে সবাইকে আবেগে ভাসিয়ে দেয়। সবাই আবেগে উদ্‌বুদ্ধ হয়ে বেগে যুদ্ধে গিয়ে ফের উদ্দুম মার খায়। যুদ্ধ নিয়ে বেশি কিছু না বলাই ভালো। বন্দুক গুলি ছাড়া সামনাসামনি মারামারি সেইই একঘেয়ে ব্যাপার। ধুমধাম করে একজন আরেকজনকে কাটছে, কেউ তির দিয়ে কারোর তীরে এসে তরি ডুবাচ্ছে, তিরের আঘাতে তিরতির করে কেউ মরছে, কেউ গদা দিয়ে কাউকে গদিচ্যুত করছে, কেউ গদি নিয়ে কাউকে গদাচ্যুত করছে… এইসবই হয় যুদ্ধে। হরিবংশ বলছে জরাসন্ধ নাকি কুড়ি অক্ষৌহিনী সেনা নিয়ে যুদ্ধ করতে এসেছিল। বাপরে বাপ, কুড়ি অক্ষৌহিনী সেনা মানে বুঝতে পারছেন? কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আঠেরো অক্ষৌহিনী লড়েছিল (কৌরবদের এগারো, পাণ্ডবদের সাত)। তার থেকেও বেশি লোক এনে মথুরা জয় করতে এসেছিল জরাসন্ধ?

ভাবার বিষয়। এত লোক, এত সেনাবাহিনী থাকলে দেশের জনসংখ্যা কত ছিল? এই পুরাণে লিখিত সংখ্যাগুলো নিয়ে আমার বরাবরই সন্দেহ হয়। কারোর একটু বেশি ছেলেপুলে হলেই আরামসে লিখে দিত একশোটা ছেলে, হাজারটা ছেলে, দশ হাজার ছেলে। হাজার হাজার ছেলেপুলের বাপগুলো ছেলেদের নাম কী করে মনে রাখত? আরে নাম ছাড়ুন, ছেলেদের হিসেব রাখত কী করে? এক হাজার পুত্র হলে মোটামুটি সেই রাজা তার জীবিতকালে যেখানেই যেত একটা করে ছেলে দেখতে পেত। মানে কোনও অনুষ্ঠানে গিয়ে হয়তো দেখা গেল ছেলে নিজেই এসে বাবাকে বলছে, “বলো তো আমি কে?” বাবা ভ্যাবাচ্যাকা, ছেলে বলল, “আরে আমি তো তোমার আটশো সাতাত্তরতম পুত্র খ্যাঁদা।”

দূরত্বের ক্ষেত্রেও তাই। কেউ কিছু একটা ছুড়ল আর সেটা একেবারে একশো বা হাজার যোজন দূরে গিয়ে পড়ল। আর শুধু দূরত্ব বা ছেলেপুলের সংখ্যা নয়, সেনাবাহিনীতে সেনার সংখ্যা বলতে গিয়েও এমন অতিরঞ্জিত করে ফেলত। না মানে আপনিই হিসেব করে দেখুন না, কুড়ি অক্ষৌহিনীতে ক-টা মানুষ থাকে। আচ্ছা, মানুষের হিসেব বাদ দিন, মানুষ না-হয় গিনিপিগের মতো বিপুল সংখ্যক হয়ে গেছিল মেনে নিলাম, কিন্তু একবার অক্ষৌহিনীতে হাতির সংখ্যা ভাবুন। এক অক্ষৌহিনীতে ২১,৮৭০টি হাতি থাকত। ট্রেনিংপ্রাপ্ত হাতি। তাহলে কুড়ি অক্ষৌহিনীতে থাকার কথা ৪,৩৭,৪০০টি হাতি থাকার কথা। এত হাতি ট্রেনিং দিত কে? এত হাতি আসত কোথা থেকে? হাতি কি আফ্রিকা থেকেও আমদানি করা হত? তা ছাড়া একটা জায়গায় যদি আনুমানিক সাড়ে চার লাখ হাতি, তেরো লাখ ঘোড়া, সাড়ে চার লাখ রথ আর একুশ লাখ লোক মারপিট করে (তাও এটা শুধু জরাসন্ধের দিকের হিসেব) তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রটা কত বড় ছিল? এ কি একটা গোটা জেলা নিয়ে যুদ্ধ হচ্ছিল নাকি? জেলাতেও এই বিপুল সংখ্যক হাতি-ঘোড়া আর রথ আঁটবে কি না সন্দেহ আছে।

মোটকথা একটা বিপুল আর্মি নিয়েও কুল সামলাতে পারল না জরাসন্ধ। সাতাশ দিন ধরে সেই যুদ্ধ চলল। কোথায় লাগে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ? হঠাৎ করে কৃষ্ণ আর বলরাম জরাসন্ধের সামনে এসে তাকে যুদ্ধের মাঝেই রাম ঠ্যাঙানি দিতে শুরু করে। এখানে হঠাৎ করে বলা হল যে রুক্মিণীর কথা ভেবে কৃষ্ণ রুক্মীকে বেশি মারধোর করল না। এই প্রথম রুক্মিণীর কথা এল। হঠাৎ? নারায়ণ ও লক্ষ্মীর অবতার প্রসঙ্গে আলোচনা করলে বোঝা যায় যে কৃষ্ণ আর রুক্মিণীর পরস্পর পরস্পরের অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ জানত। কিন্তু এরকম হঠাৎ রুক্মিণীর প্রসঙ্গ আসাতে একটু অবাক লাগে বইকি। বিশেষ করে যে রুক্মিণীর কথা ভেবে কৃষ্ণ তার ভাই রুক্মীকে তেমন মারধোর করল না, অদ্ভুতভাবে এই ঘটনার অনেক পরে, সামান্য এক বচসাতে এই রুক্মীকেই এক চড়ে সাবড়ে দিতে বলরাম দ্বিতীয়বার ভাবেনি। তবে সেই গল্প অনেক পরে বলব। অপেক্ষা করুন।

এরপর বলরাম আর জরাসন্ধের মধ্যে ঘোরতর গদাযুদ্ধ শুরু হয়। গদামগদাম শব্দে গদার বাড়ি পড়তে থাকে। মাঝে মাঝে কমার্শিয়াল ব্রেক নিয়ে আবার একে অপরের হাড় ব্রেক করার জন্য ব্রেকড্যান্সের মতো করে যুদ্ধ চলতে থাকে। তারপর একটা সময়ে জরাসন্ধের হাত থেকে গদা পড়ে যায়। কিন্তু বলরাম জরাসন্ধকে মারতে পারে না। কেন? কারণ নিরস্ত্রকে আঘাত করবে না।

তাছাড়াও আরেকটা লজিক কাজ করে। এখানে প্রথমেই কৃষ্ণ বলরামকে বলেছে যে এই যুদ্ধে অনেকেরই এখনও মরার সময় ঘনিয়ে আসেনি, তাই অনেক ভাইটাল লোকেদের মেরে ঠ্যাং খোঁড়া করে দিলেও কিন্তু প্রাণে মারা হয়নি। তাছাড়া আরেকটা কারণ হল, যদি আপনাদের জরাসন্ধের ব্যাপারে মনে থাকে, তাহলে জানবেন যে জরাসন্ধ আসলে তো একটা রোবটের মতো মানুষ ছিল। হয় রোবট নয়তো সায়ামিজ টুইনস্-এর মতো কিছু একটা ব্যাপার ছিল যেটা জরা নামে রাক্ষসী (তৎকালীন প্রযুক্তির থেকে কয়েক আলোকবর্ষ এগিয়ে থাকা প্রযুক্তিসম্পন্ন কোনো এক মানবী) জুড়ে দিয়েছিল। আমার তো শুনে অ্যান্ড্রয়েড টার্মিনেটর মার্কা রোবটই মনে হয়। জরাসন্ধকে কাতলা মাছের মতো দুইভাগে কেটে ছিঁড়ে দিলেও দিব্যি চড়চড় করে জুড়ে যেত। এ সব অ্যাডভান্সড্ রোবোটিক্স, আমাদের না বুঝলেও হবে।

জরাসন্ধ হার মেনে বাড়ি গেল। তার সাথে তাকে সাপোর্ট করা লোকজনও নিজেদের বাড়ি গেল। তার মানে দুর্যোধন সহ বাকি ধার্তরাষ্ট্র রাজপুত্রেরাও গো-হারা হেরে বাড়ি গেছে। আমার মনে হয় এখানেই একশো ভাইয়ের মধ্যে কুড়ি-তিরিশটা মিসিং হয়েছে। কে আর অত হিসেব রাখছে? ভাবার বিষয় যে পরবর্তীকালে দুর্যোধন বলরামের শিষ্য হয়েছিল, এবং প্রিয় শিষ্য ছিল। এই যুদ্ধে বলরামের মারপিটের স্টাইল দেখে দুর্যোধন বলরামকেই গুরু হিসেবে চাঁই ভেবে নিয়েছিল? হতেই পারে।

কিন্তু জরাসন্ধ হার মানেনি। সে আবার ফিরে এসেছিল। বারে বারে। জিতবে না জেনেও সে পাকিস্তানের মতন অশান্তি করতে কিছু কসুর ছাড়েনি। সতেরোবার এসেছিল মথুরাকে অ্যাটাক করতে। মানে এটা একটা অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল বলতে গেলে। হয়তো ব্যাপারটা এরকম হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে তিন চারবার আক্রমণ করে এবং মার খেয়ে বাড়ি ফিরে ব্যাপারটা এতটাই সাধারণ হয়ে গিয়েছিল যে একটা দৃশ্য কল্পনা করাই যায়। ভেবে নিন জরাসন্ধ নবম বারের জন্য সেনা নিয়ে মথুরার দিকে আসছে।

এমন সময়ে তাকে মাঝপথে কয়েকজন যাদব আটকাল। জরাসন্ধ বলল, “মারো এদের, কেটে ফেলো, ইয়ালালা!”

যাদব প্রহরীরা বলল, “থামুন মশাই, আগে এই ফর্মটা ফিলাপ করুন।”

“কীসের ফর্ম?” জরাসন্ধ বলে।

“এই যে বারেবারে মথুরা আক্রমণ করতে আসছেন, এটার একটা খরচাখরচ নেই? আগে ট্যাক্স দিন তাপ্পর যুদ্ধ করতে আসবেন…”

“ট্যাক্স? কীসের ট্যাক্স?”

“বাহ্ রে, এন্টারটেনমেন্ট ট্যাক্স, এই যে যুদ্ধ করছেন, এতদিন ধরে গা গরম করে বলরাম আর কৃষ্ণের হাতে মার খেয়ে যাচ্ছেন, এর একটা দাম নেই?”

“তার সঙ্গে তলায় এই এত ‘জি এস টি’ ধার্য করা হয়েছে কেন?”

“জেনারেল সৈন্য ট্যাক্স। এই যে এত এত সাধারণ লোক আপনাদের জন্য এসে প্রাণ দিচ্ছে, এদের লাইফের ভ্যালু নেই? তাই দুইপক্ষের সাধারণ লোকেরা মিলে ইউনিয়ন করে এই ট্যাক্স নিচ্ছে। প্রতি সৈন্য দশ কড়ি। ফেলো কড়ি মাখো তেল…”

“কেন তেল মাখব কেন?”

“সেই তো দাদা গিয়ে বলরামের কাছে দলাইমালাই খাবেন, তেল মেখেই যান না-হয়।”

“আমি ট্যাক্স দেব না।”

“ইহ্, দেব না বললেই হল। এটা ‘অল ইন্ডিয়া সাধারণ লড়ে মরা মানুষের ইউনিয়ন’, আপনি ট্যাক্স না দিয়ে গিয়ে দেখুন না। ওই গোটাকয়েক রাজা নিয়ে কী লড়বেন? বাকি সব সৈন্য মাঠে দাঁড়িয়ে থাকবে। পারবেন যুদ্ধ করতে?”

জরাসন্ধ হয়তো বিনা বাক্যব্যয়ে দিয়ে দেয়। ঝামেলার কী দরকার? ওমা, তারপরে আবার দেখা যায় ওই রক্ষীরা প্রতি রথ থেকে পয়সা নিচ্ছে।

“এটা কী হচ্ছে?” জরাসন্ধ রেগেমেগে জিজ্ঞেস করে।

“অন্য রুটের রথ এই রুটে চলবে, তাই পার্টির জন্য চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।”

“পার্টি? কোন দল?”

“আরে, দলের পার্টি না। এটা আপনারা মার খেয়ে চলে গেলে রাতে আমাদের পার্টি হবে। অবশ্য রাজনৈতিক পার্টি আর আমাদের এই রথ বলুন, অটো বলুন, তাদের থেকে চাঁদা নেওয়ার উদ্দেশ্য একই। রাতে পার্টি!”

“কত করে?”

“পাঁচকড়ি…”

“এই পাঁচকড়ি মুখুজ্যেকে ফেলে দে রথ থেকে…”

“ধুর মশাই, ওই লোক দিয়ে কী হবে? আমাদের যাদবদেরই পপুলেশন অনেক। পাঁচটা কড়ি হল চাঁদা।”

এটা পুরোই আমার কল্পনা, কিন্তু ভেবে দেখুন, সতেরোবার আক্রমণ করে কেউ প্রতিবার হেরে গেলে ব্যাপারটা এরকম হওয়াই স্বাভাবিক। তাই না? মানে যুদ্ধের মাঝেই হয়তো এরকম কথাবার্তা শোনা যেত, “আরে ও দাদা, কেমন আছেন? চুনু-মুনু ভালো?”

“ভাই, গতবার সতেরো টাকা চার আনা ধার দিয়েছিলিস, এবারে তো দে, নইলে গদা বসিয়ে দেব মাথায়…”

“আপনার না গতবার ডানহাতটা কাটা গেল? তারপরেও যুদ্ধে এলেন?”

“ও কাকু, যুদ্ধটা হলেই এবার তোমার বাড়িতে মেয়েটার জন্য পাকা কথা বলতে যাব…”

অসম্ভব কিছুই না। কারোর এলাকায় চারবার গেলেই একজন যেখানে চেনা হয়ে যায়, সেখানে সতেরোবার এলে তার নাড়ি-নক্ষত্র জেনে যাওয়ার কথা। কিন্তু জরাসন্ধ সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়, বাকি রাজাদের হাল খারাপ হয়ে গেলেও তার এত সৈন্য ছিল যে, হালফিলে আঠেরোতমবার আক্রমণের ইচ্ছেতে হালে পানি পায় জরাসন্ধ। কিন্তু আগের যুদ্ধগুলোয় অনেক ক্ষতি হয়েছে, তাই বোধহয় জরাসন্ধ এইবারে একটু বেশিই সময় নিচ্ছিল। এইসময়ে বিকাদ্রু বলে এক জ্ঞানী যাদব কৃষ্ণকে বলে, “ভাই জরাসন্ধ কিন্তু এই নিয়ে আঠেরোবার আক্রমণ করছে?”

কৃষ্ণ বলে, “বলো কি কাকা? মারামারি করতে করতে খেয়ালই করিনি যে আঠেরোবার হতে চলল। এতদিনেও ওর গায়ে ব্যথা হয়নি?”

বিকাদ্রু বলে, “না, ও ব্যাটা ঢিট বদমাশ, সহজে মানবে না, তুমি বাপু অন্য উপায় ভাবো।”

এই বলে বিকাদ্রু কৃষ্ণকে হর্যক্ষর গল্প শোনায়।

(দাঁড়ান আগে উচ্চারণ করে নিই, তারপরে বাকি গল্পটা শোনাচ্ছি। এই হর্যক্ষ উচারণ করতে গিয়ে এমন গলা থেকে হড়-হড়-ঘর-ঘর শব্দ করলাম যে মা ভাবল আমি গলা খাঁকরে শ্লেষ্মা বের করছি)

হর্যক্ষর ছেলে যদু থেকেই নাকি যদুবংশ হয়েছে, আর সেই যদুবংশ এখন মারপিট করে করে লুপ্ত হওয়ার পথে প্রায়। এক মিনিট, এই যদু কোথা থেকে এল? আমি তো এতদিন ভাবতাম যযাতির ছেলে যদু থেকে যাদব বংশ হয়েছে। যাঃ বাবা, এ কি শোনাল বিকাদ্রু? আমার এবার সব গুলিয়ে যাচ্ছে।

এই নিয়ে আপনাদের মতামত জানাবেন, আমরা গল্প এগোই। বিকাদ্রুর সাবধানবাণীকে কৃষ্ণ মানহানি না করেই একপ্রকার পাশ কাটিয়ে বলরামের সঙ্গে ড্যাংড্যাং করে দক্ষিণ ভারত ভ্রমণে চলে গেল। সহ্যদেশে (সেখানে সবার বোধহয় সহ্যশক্তি সাংঘাতিক ছিল) গিয়ে সেখানে করবীরা (ফুলের নামও হয়) শহরের পাশ কাটিয়ে জঙ্গলের মধ্যে বেণ নদীর পাশে একটা ডুমুরগাছের তলায় পরশুরামকে দেখতে পায়। এইবার বুঝলাম সহ্যদেশ কেন? পরশুরাম যেখানে বসে বসে ক্ষত্রিয় রাজার রাজত্ব সহ্য করছে, সেই দেশের নাম সহ্যদেশ হবে না তো কি?

কৃষ্ণ-বলরামকে দেখেই পরশুরাম বলল, “আইস, আমি এখন আইসের মতো ঠান্ডা ঠান্ডা। শুনলাম তোমরা কংসকে মেরেছ।”

“যথার্থ শুনেছেন,” কৃষ্ণ বলে।

“বেশ করেছ, যত ক্ষত্রিয় সবকে মেরে ফেলাই ভালো।”

“আজ্ঞে আমরাও ক্ষত্রিয় কিনা,” কৃষ্ণ বলে।

“আরে তোমরা গোয়ালা ক্ষত্রিয়। গোরু চরিয়ে ক্ষত্রিয় হয়েছ। আমি বলছি গোরু ক্ষত্রিয়দের কথা, যেগুলোর মাথায় বুদ্ধি নেই। গোরু চুরি করে,” পরশুরাম বলে, “সেসব ছাড়ো, কাজের কথায় আসি। ব্রেকফাস্ট করে এসেছ তো? বেশ বেশ, শোনো আমি জানতাম তোমরা আসবে। ওই দৈব ব্যাপার-ট্যাপার আর কি। তাই তো এঁটুলির মতো লেগে থাকা শিষ্যগুলো ঝেড়ে ফেলে এই নিরালায় বসে আছি।”

“আদেশ করুন গুরুদেব,” কৃষ্ণ বলে।

“দেখো বাপু, আমি সব জানি,” পরশুরাম বলে, “এই যে তুমিও অবতার, এই বলরাম… আরে আরে, ওখানে লাঙল দিয়ে খুঁড়ো না, এদিকে এসো এদিকে এসো… হ্যাঁ কি বলছিলাম, বলরামও অবতার। সব জানি। কিন্তু আপাতত তোমার পূর্বপুরুষের বানানো এই করবীপুর অত্যাচারে ভরে যাচ্ছে।”

“কে অত্যাচার করছে?”

“এখানকার রাজা শৃগাল বসুদেব। ব্যাটা বড় নচ্ছার, তেমনি ইগো,” পরশুরাম বলে, “এখন ওই জতুকা থাকুক, ওর সময় আসবে। আপাতত আমার প্ল্যান শোনো। জরাসন্ধ খোঁজখবর করে জেনেছে তোমরা মথুরায় নেই। তোমরা না থাকলে ও আর মথুরা জয় করে কোন চিকুর উৎপাটিত করবে? তোমরাই তো ওর জামাইকে কামাই করে দিয়েছ। তাই ও তোমাদের চন্দ্রাহত শূনকের ন্যায় খুঁজছে। চলো আমরা ততদিনে ট্রেকিং করে বেণ নদী পেরিয়ে, সহ্য পৰ্বতশীলায় যজ্ঞগিরি পাহাড়ে রাত কাটিয়ে, সেখানে পিকনিক করে, পরেরদিন খটঙ্গী নদী পেরিয়ে ক্রৌঞ্চ শহরে যাই। সেখানেও তোমাদের বংশেরই মহাকপি (ফুলকপি ও বলা যায়, অথবা বিশাল বাঁধাকপি) রাজত্ব করছে। কিন্তু ও ব্যাটাকেও বিশ্বাস নেই, তাই চুপচাপ অন্ধকারে রাত কাটিয়ে পরেরদিন গোমন্ত পর্বতে যাব। ওইখানে জরাসন্ধ যত বড় সেনাই নিয়ে আসুক না কেন, তোমরা পাহাড়ের উপর থেকে সহজেই ফেনার মতো সেনাদের ফুটিয়ে দিতে পারবে। শিক্ষামূলক ভ্রমণও হবে। এক্সকারশনের মাঝেই তোমাদের অনেক এক্স… মানে কুড়ুল… বুঝলে কিনা, আমার নামেই তো কুড়ুল… তাই সেই শিক্ষাও দিয়ে দেব।”

যেমন ভাবা তেমন কাজ, তিনজনে হেঁটেই মেরে দিল চারদিন। গোটা ভারত ঘুরতে পারছে আর এইটুকু তো কোনো ব্যাপারই না। গোমন্ত পর্বতে পৌঁছেই পরশুরাম বলল, “অনেক শিক্ষা দিয়েছি, তোমরা এখানে থাকো আর লড়ো। পাহাড়চূড়ায় আতঙ্ক হয়ে থাকো। জরাসন্ধ এলে ওকে ভরাগন্ধ ঘরে বন্ধ করে রেখো। আমি চললাম সুরপরকা শহরে। টাটা!”

ব্যস পরশুরাম চলে গেল। গোমন্ত পর্বত পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এসেছিল, পৌঁছনো হয়ে গেছে, চলে গেল। কৃষ্ণ বলরাম পর্বতের উপরে জরাসন্ধের অপেক্ষা করতে লাগল। পর্বতের বিবরণ দিতে গিয়ে পুরাণকার যা লিখেছেন, তাতে মনে হয় হেন কোনো ফলের গাছ বা অন্য গাছ নেই যা ওই পাহাড়ে ছিল না। রামচন্দ্র বনবাসে আর কোথাও না গিয়ে শুধু গোমন্ত পর্বতে মাথায় বসে থাকলে চৌদ্দ বছর এমনিই কেটে যেত। এত কিছু ছিল ওই পাহাড়ে। পাহাড় নাকি আলাদা একটা জেলা, বোঝা মুশকিল।

পাহাড়ের মাথায় জরাসন্ধের অপেক্ষায় বসে আছে কৃষ্ণ বলরাম, কিন্তু কাঁহাতক এরকম পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকা যায়। তাই মাঝে-মাঝেই এদিক ওদিক ঘুরু ঘুরু করত দুই ভাই। আলাদা আলাদা। সবসময় কি ওই ক্যালেন্ডারের ছবির মতো দুই ভাইয়ে একসাথে থাকবে নাকি? নিজেদের নিজেদের পার্সোনাল প্রাইভেট জীবনও ছিল। তাই প্রাইভেসির জন্য, বলরাম বিশেষ করে প্রায়ই বেশি ঘোরাঘুরি করত। সেরকমই একদিন ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়চূড়ায় চূড়ামণি হয়ে, বলরাম ঘাসের উপরেই শুয়ে পড়ল।

ঘুমের মধ্যেই নাকে বেশ সুন্দর মদিরার গন্ধ এল। এখানে বলে রাখা ভালো, বলরাম অত্যন্ত মদ্যপ ছিল। হ্যাঁ, এটা একশো শতাংশ সত্যি। সে হরিবংশ, শ্রীমদ্ভগবত বা বিষ্ণু পুরাণ যতই ব্যাপারটাকে দৈব দেখাতে চাক, এটা মানতে ক্ষতি নেই যে বলরাম মদ্যপ ছিল। এবং সেই কারণেই ঘুমের মধ্যেও হাওয়ায় মদিরার গন্ধ পেয়েই সে উঠে বসে।

“আহা, কতদিন মদিরা খাইনি,” ভেবেই বলরাম গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে একটা গুহা পেয়ে গেল। কীরকম ঘ্রাণশক্তি ভাবুন। অবশ্য যারা নিয়মিত মদ্যপান করেন এবং জীবনের ওই একটিই উদ্দেশ্য জানেন তারা এক মাইল দূরে ছিপি খোলা হলেও ঠিক জানতে পেরে যান। এই প্রসঙ্গে আমার ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে যায়। আগেকার দিনে চিঠিতে বা নিমন্ত্রণ পত্রে লেখা হত ‘মদীয় বাসভবনে উপস্থিত থাকিয়া বাধিত করবেন’। আমি তখন পশ্চাদপক্ক না-বালক, সুতরাং আমি লাইনের ব্যাখা করলাম, ‘মদের বাসভবনে উপস্থিত থেকে আমাকে বেঁধে দেবেন’। হতেই পারে, মদের জন্য কারোর বাসভবনে গিয়েই তাকেই বেঁধে রাখা হল। কত কীই তো হয়। কিন্তু ভদ্রলোক নিজেই নিজের বাড়িতে মদের জন্য নিজেকে বেঁধে রাখতে বলছেন কেন, সেটাও আবার নিমন্ত্রণপত্রে লিখে আহ্বান করে কেন, সেটা আমার মাথায় ঢোকেনি।

যা-ই হোক, বলরাম ওই ‘মদীয়’ বাসভবনের খোঁজে সুবাস ভবন পেয়ে গেল। একটা গুহা, তার ভিতরে কুলকুল করে ঠান্ডা মদিরা পাহাড়ি ঝরনার মতো বয়ে যাচ্ছে। আহা দাঁড়ান দাঁড়ান, চললেন কোথায়? ঝরনার মধ্যে ফ্রি মদ বয়ে যাচ্ছে শুনেই ব্যাগপত্র গুছোতে শুরু করলেন? আরে, এসব গল্প দ্বাপর যুগের, এখন সেই পাহাড় আর গুহা পাবেন কই? গুহা পেলেও মদ পাবেন নাকি? সে মদ কবে শুকিয়ে গেছে! বসুন বসুন, গল্পটা শুনে যান।

বলরাম মদের ঝরনা দেখেই তাতে ঝাঁপ দিয়ে গলগল করে যতটা খাওয়া যায় খেতে থাকল। ঝরনা তো, যা খাচ্ছে আবার বের করে দিলে আবার পেট ফাঁকা। বলরাম এত খেল যে চোখ গোল্লা গোল্লা করে ওখানেই কাঁপতে কাঁপতে লুটিয়ে পড়ল। ওই গুহার মদপ্রপাত আসলে বরুণদবের মেয়ে বারুণী। কদম গাছের তলায় গুহাতে বয়ে যাচ্ছিল বলে তার আরেক নাম কাদম্বরী। মদের কাদায় কাদাম্বরীও বলা যেতে পারত। মনে রাখবেন বরুণদেবের কাছে দেবতাদের মদিরার লাইসেন্স ছিল। ওঁর সাথে কান্তিদেবী ও শ্রীদেবীও এসে বলরামকে দেখা দেন।

এটাকে ঠিক দেখা দেওয়া বলে না, কারণ স্পষ্ট লেখা বলরাম তখন ঘোরের চোটে বেঘোরে চোখ উলটোচ্ছে আর দেবীরা এসে আশীর্বাদ করে বলরামের অনেক প্রশংসা করছে। কেন? কারণ বলরাম শেষনাগের অবতার। কিন্তু নাগের অবতারের এরকম শেষ দশা দেখে দেবীরা তাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে মদের সুইমিং পুল থেকে তুলে মুকুট আর জামাকাপড় পরিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।

এখান থেকে দুটো জিনিস প্রমাণিত হয়। গোমন্ত পর্বতের উপরেই কোথাও দেবতাদের মদিরা বানানোর ডিস্টিলারি কারখানা ছিল। এবং যেরকম লুকিয়ে চুরিয়ে গুহার মধ্যে পাতনক্রিয়া চলছিল, তাতে মনে হয় ওটা বোধহয় গোপনে কান্ট্রি লিকার বানানো হচ্ছিল। কিন্তু পাতনক্রিয়ার মাঝেই বলরামের শীঘ্রপতন ও দীর্ঘ সেবন দেখে মনে হয়, সে এই গোপন ব্যাপারটা জেনে গেছিল। তাই দেবীরা বলরামকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সাজিয়ে-গুছিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। বলরামের হুঁশ ফেরার পরে বোধহয় ব্যাপারটা ভুলেও যায়, কারণ আর কোনোদিন বলরাম ওইমুখো হয়েছে বলে শোনা যায়নি। নইলে বলরাম যে হারে মদ্যপ ছিল, রোজ ওই গুহা ঝরনায় গিয়ে ডুবত আর গাইত, ‘মদিরার এই ঝরনাধারায় ধুইয়ে দাও…’।

এদিকে কৃষ্ণ যখন পার্বত্য যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছে তখন আচমকা কোথা থেকে গরুড় এসে আকাশের উঁচু থেকে টপ করে কৃষ্ণের মাথায় বিষ্ণুর মুকুটটা ফেলে দিল। সেটা একেবারে উড়ে এসে খাপে খাপ কৃষ্ণের মাথায় পারফেক্ট ফিটিং হয়ে বসেও গেল। উলটো হয়ে পড়লে চাঁদি ফুটো হয়ে যেত, কিন্তু দৈব ব্যাপার স্যাপার। দৈব হেলমেট। এবার আপনি জিজ্ঞেস করবেন এই বিষ্ণুর মুকুটটা কোথা থেকে এল। এই মুকুটটা বিষ্ণু যখন ঘুমোচ্ছিল তখন দৈত্য বিরোচণের ছেলে চুরি করে, আর তাই মুকুট নিতে গরুড় দৈত্যদের রামঠ্যাঙানি দেয়। কিন্তু মুকুট নিয়ে ফিরে এসে দেখে বিষ্ণু নেই। তখন গরুড় অনেক খুঁজে খুঁজে শেষে এই গোমন্ত পাহাড়ের মাথায় কৃষ্ণরূপে বিষ্ণুকে দেখে মুকুটটা ফেলে দেয়। টিপ করে ফেলার কী দরকার ছিল বাপু? কৃষ্ণ দিব্যি জানত সে বিষ্ণু, আর গরুড় দিব্যি কথা বলতে পারত।

কিন্তু প্রশ্ন হল, যখন গোটা সৃষ্টির দেবতা, মানুষ, যক্ষ মায় কংস পর্যন্ত বিষ্ণুর কৃষ্ণরূপে আসার খবর পেয়ে গেল, তখন বিষ্ণুর প্রাইভেট বাহন সে খবর জানল না? আর জানল না তো এমন জানল না যে কৃষ্ণ এত বড় হয়ে গেল তখনও খুঁজে বেড়াচ্ছে? কেন বাপু? ব্রহ্মাকে বা ইন্দ্রকে ধরলেই তো জানা যেত। তাহলে বেশ ছোটোবেলাতেই মুকুট ডেলিভারি হয়ে যেত। অবশ্য তখন ছোট কৃষ্ণের মাথায় ওটা ফিট করত না হয়তো, তাই গরুড় অপেক্ষা করছিল কবে কৃষ্ণ যথেষ্ট বড় হবে।

মোট কথা দুই ভাইয়ে এরকম ভাবে দৈবিক জামাকাপড় আর মুকুট পেয়ে জরাসন্ধের অপেক্ষা করতে শুরু করল। ওদিকে জরাসন্ধও খবর পেয়ে ঠিক পাহাড়ের তলায় সৈন্যসামন্ত নিয়ে হাজির হয়েছে।

পাহাড়ের টঙ্গে গিয়ে কিংকং

যদু—হারাস্বের ছেলে—কৃষ্ণের পূর্বপুরুষ— ২৫০

Jarasandha had twenty Akshouhinis of soldiers

Kamsa was kalnemi reborn

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *