কৃষ্ণপ্রেম ও কৃষ্ণের প্রেম
বেশি বছর আগের কথা না, ওই এক দশক আগে হবে, একটা গান খুব হিট হয়েছিল। বাংলা গান, সেখানে নায়ক ডিস্কোতে নেচে নেচে বলছিল, “কৃষ্ণ করলে লীলা, আমরা করলে বিলা…”
বিলা বস্তুটা কী, এবং সেটি খায় না মাথায় দেয় আমার জানা নেই। তবে কোনো চলতি হিন্দি কথার বাংলা সংস্করণ হবে হয়তো। আমাদের আলোচনা সেই গান বা তার শব্দগুলো নিয়ে নয়। আমি এই গান দিয়ে এই পর্বের লেখা শুরু করলাম, কারণ কৃষ্ণ ও প্রেম এই দুটি নিয়ে লিখতে বসে একটা অদ্ভুত ঘটনা আমার মনে পড়ে গেছে। ঘটনাটা হল এই গান যখন মুক্তি পায় তখন একটি খবরের চ্যানেলের কোনো এক সাক্ষাৎকারে এক পথচলতি বৃদ্ধা মহিলা অভিযোগ করেন, “আমার কেষ্টকে নিয়ে এরকম গান করলি কেন বাছারা?”
বৃদ্ধা অবশ্যই ধর্মপ্রাণা কৃষ্ণভক্ত ছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, তবে এই সাক্ষাৎকার দেখে আমার এক মাসি মুখ বেঁকিয়ে বলেন, “এহ, বুড়ির আবার কত ঢং। গানটা তো ভালোই, আর দেবশিশুটি গানে নৃত্যও করছে সুন্দর…”
আমার মাসি তখন, মানে সেই দুই হাজার নয় সালে ‘আধুনিকা’ মহিলা ছিলেন। কোনারক ঘুরতে গিয়ে, মন্দিরের গায়ের এক কথায় নিজস্ব থিওরি বলে দিয়েছিলেন, “এসব মূর্তি প্রথম মন্দিরে ছিল না, সব পরে বানিয়েছে ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাকশনের জন্য।”
এসবের সত্য মিথ্যা যুক্তি বা কোথা থেকে এই অদ্ভুত জ্ঞান তিনি লাভ করেছিলেন আমি জানি না, তবে আমার মনে হয়েছিল তিনি তখন সুস্থ ছিলেন, ধনবতী ছিলেন এবং অহং ও গরিমায় কানায় কানায় পূর্ণ ছিলেন। তাই কানাইয়ের প্রতি অবজ্ঞা ছিল। এবং তাই সবকিছুতেই ওঁর একটা ‘শেষ’ কথা ছিল, যেটা আমাদের আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই পরমানন্দে গ্রহণ করতেন। তারপর কলকাতার গঙ্গায় অনেক জল বয়ে যায়, দশটা বছর কেটে যায়। এক দশক পরে একদিন মাসির বাড়ি গিয়ে কোনো একটা কারণে আমি শুধু বলি যে, “কৃষ্ণের কিন্তু পৌণ্ড্রক বাসুদেবকে মারা অন্যায় হয়েছিল…”
আচমকাই এবং একেবারে আমাকে অবাক করে দিয়ে মাসি প্রায় রে-রে করে তেড়ে এসে আমায় ঝেড়ে ফেলে মেরেই দেয়।
“তুই কৃষ্ণের নামে এসব বলছিস? তোর বাবা সারাজীবন কৃষ্ণ ভক্ত, তোর মা গোপালকে না খাইয়ে নিজে জলগ্রহণ করে না। এরকম পাপিষ্ঠ হলি তুই যে কৃষ্ণের কার্যের নিন্দা করিস?”
মাসির এ হেন রূপ দেখে আমি স্তম্ভিত হই? সেই মাসি কই যে দশ বছর আগে এক বৃদ্ধার কৃষ্ণপ্রেমকে ‘ঢং’ আখ্যা দিয়েছিল? তার জায়গায় এক সম্পূর্ণ নতুন মাসির অবতরণ ঘটেছে যে সকাল সন্ধে বালগোপালের পুজোয় ঢং-ঢং করে কাঁসর বাজিয়ে পুজো করছে। আর অবশ্যই সন্ধে থেকে যত রাজ্যের সিরিয়ালগুলোয় কৃষ্ণের লীলা দেখছে। সেখানে অসুরের ছড়াছড়ি… লতাসুর, ভ্যাম্পায়ারাসুর, মাটিসুর, আকাশাসুর… সে এক কাণ্ড হয়। একটা সিরিয়ালে তো দেখি গড্জিলা আর কিংকং। কৃষ্ণ-বলরাম-রাধা যে কবে ব্যোমকেশ-অজিত-সত্যবতীর মতো ত্রিমূর্তি হয়ে সমস্যার সমাধান করেছিল, সে আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানের পরিসরে জানা নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হল, মাসি এরকম কৃষ্ণপ্রেমী হয়ে উঠল কী করে? একেবারে দশ বছরে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল? প্রতি বছর আঠেরো ডিগ্রি করে ঘুরল নাকি একেবারে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরল? সেই ব্যাপারের অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি কিছু তথ্য জানলাম। মাসিদের বাড়ির আর্থিক অবস্থার দোলাচলের সাথে মাসির নিজের শারীরিক অবস্থার ক্রম অবনতি এবং তার সাথে তাঁবেদার আত্মীয়দের সময় ও সুবিধে বুঝে গুছিয়ে কেটে পড়া, এইসব মিলিয়ে ধীরে ধীরে মাসির মনে ভগবানের প্রতি এক অদ্ভুত বিশ্বাস জন্ম দিয়েছে। যদিও ঘরে ভগবানের মূর্তির ছড়াছড়ি, কিন্তু কীভাবে যেন কোন এক সৎসঙ্গের সঙ্গে সৎ সঙ্গ করে মাসির মধ্যে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। মাসি এখন কথায় কথায় গীতার বাক্য শোনায়। শ্লোক মুখস্থ করতে পারেনি, ভাবানুবাদ যা শুনে আসে সেটাই শোনায়।
এই ঘটনা থেকে দুটি জিনিস আমি উপলব্ধি করি। প্রথম হল, মানুষ (বেশিরভাগ মানুষ) যতদিন সুস্থ থাকে, সুখী থাকে, ততদিন সে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। তার উপরে কেউ নেই, সাংঘাতিক আত্মবিশ্বাস। কিন্তু যেইমাত্র সেই বিশ্বাসের উপরে একটু আঘাত আসে অমনি ‘আত্ম’ থেকে বিশ্বাস উড়ে গিয়ে অন্য একটা ভরসা খোঁজে। একটা খুঁটি। সেই খুঁটি হল ভগবান। কারণ চেনা মানুষদের মধ্যে কেউ সেই ভরসা দিতে পারে না। দেখবেন অনেক সময় ডাক্তারবাবুও ক্রিটিকাল কেসে হাত তুলে ভগবানের উপরে সব ছেড়ে দেন। এটা একটা বিরাট ভরসা। অচেনা, অজানা একটা শক্তির প্রতি নিজেকে এবং নিজের বিশ্বাসকে সঁপে দেওয়া। এবং এটাই ভক্তি।
আমার দ্বিতীয় উপলব্ধি হল, ‘ভক্তি’ জিনিসটা কোনো কারণ বা লজিক মানে না। এটা আমি এখন খুলে বলব না। এই চ্যাপ্টারে পুরো লেখাটাই মাঝে মাঝে এই কথাটা প্রমাণ করে দেবে। কিন্তু প্রশ্ন হল ‘ভক্তি’ কী? কৃষ্ণভক্তরা প্রায়ই কৃষ্ণপ্রেম আর ভক্তিকে এক চোখে দেখেন। এটা খুব কম হয়। যে ভগবানকে আপনি ভক্তি করেন, সেই ভগবানকে প্রেম করা সহজ নয়। এক বোধহয় মা সতীই এই কাজ পেরেছিলেন। শিবঠাকুরকে ভক্তির সাথে প্রেম দিয়ে স্বামীরূপে পেয়েছিলেন। কৃষ্ণ ছাড়া অন্য কোনো ভগবানের ক্ষেত্রে ভক্তি এবং প্রেম এতটা সমার্থক বোধহয় হয়ে ওঠে না। অথবা হয়েও ওঠে হয়তো। আমরা আলোচনা মাধ্যমে সেই ব্যাপারে জানার চেষ্টা করব।
তাহলে প্রথম প্রশ্ন আসে, ‘প্রেম’ কী? আমাদের, বিশেষ করে রক্ষণশীল বাঙালি বাড়িতে ‘প্রেম’ কথাটা বড় নেতিবাচক ব্যাপার হিসেবে ধরা হয়। এবাবা ওই বাড়ির খেঁদি ‘প্রেম’ করছে? একটা বিশাল খবর, সাতদিনের পাড়ার মুখরোচক আলোচনার বিষয়। আমার এক বন্ধু প্রেম করে বিয়ে করেছে, কিন্তু বিয়ের আসরে আমাদের বলে, “কাউকে যেন বলিস না, প্রেম করে বিয়ে। আমার আত্মীয়রা জানে দেখাশুনো করে হয়েছে…”
এটা একটা বিরাট ব্যাপার আমাদের কাছে। ট্যাবু। প্রেম করা মানেই খারাপ ব্যাপার। ছি ছি, ছেলেটা-মেয়েটা নিজেরা নিজেদের সাথে মেলামেশা করে বিয়ে করছে? আমরা তো জানতেই পারিনি। তার মানে নিশ্চয়ই বাবা-মা’র মতো ছিল না। ছেলেটা তো বাজে ছেলে, বাবা-মার সাথে থাকে না। মেয়েটা নাকি সিগারেট খায়, দুশ্চরিত্রা, আগে একটা বয়ফ্রেন্ড ছিল। বিয়ের নেমন্তন্নের দিন থেকে একেবারে বউভাতের পরেরদিন বাসি মাংস খেয়ে ঢেকুর তোলা পর্যন্ত এরকম বিভিন্ন মানুষের নানাবিধ স্বরচিত ও শেষের মুৎসুদ্দি জোয়ানের মতো চটকদার খবর বিদেহী আত্মার মতন বিয়ের আড়ালে আবডালে ঘোরাফেরা করে। অতঃপর ছেলের বাড়ির আত্মীয়ের কাছে মেয়েটি এবং মেয়ের বাড়ির আত্মীয়ের কাছে ছেলেটি ভীষণ অপরাধী হয়ে পড়ে। অপরাধ একটাই, প্ৰেম করে বিয়ে, এবং আত্মীয়দের জানানো হয়নি।
কিন্তু এটাও জেনে রাখুন, আত্মীয়দের জানালেই কিন্তু নব্বই শতাংশ সময়ে এই আত্মীয়রাই প্রেমে ভাংচি দেবে। একটি ছেলে মেয়ের প্রেমের সম্পর্কে এরকম বংশদণ্ড প্রোথিত করার তেজোময় শক্তি, বুদ্ধি এবং পরশ্রীকাতরতাচালিত উদেশ্যপ্রবণতা আত্মীয়রা কোথায় পান, সে ঈশ্বরই জানেন। বেশিরভাগ সময়ে দেখা যায় এই আত্মীয়দের ছেলেপুলেরা কিন্তু দিব্যি ছেলেটার আর মেয়েটার প্রেমের ব্যাপারে জানে এবং সাহায্য করে। কিন্তু তারাও নিজেদের মাতাপিতাকে (আজ্ঞে পুরুষরাও এতে কম যায় না) ভরসা করে না এবং জানায় না। কিন্তু সবথেকে বেশি প্রেম করে বিয়ে একমাত্র এই বঙ্গদেশেই হয় মনে হয়। বাংলার বাইরে যতই আপনি ওয়েব সিরিজ বা সিনেমায় লিবেরাল ‘লিভ ইন’ ও প্রেম করে বিয়ের সিনেমা দেখুন না কেন, আসল সত্য হল বাংলার বাইরে যারা প্রেম করে তাদের ভীষণ ভীষণ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমাদের এখানে তো তাও বাবা-মা মেনে নেয়, ভারতবর্ষের কিছু কিছু জায়গায় প্রেমের সম্পর্ক শুনলে বাবা মা এবং আত্মীয়রা সন্তানদের মৃত্যুদণ্ড দান করাও সমীচীন মনে করে। কারণ লোকে কী বলবে? জাতি কী বলবে? সমাজ কী বলবে? অবশ্য এই সবকিছুই চাপা পড়ে যায় যদি ছেলে সরকারি চাকরি করে এবং তার জন্য মেয়ের বাড়ি থেকে রাশি রাশি ধনরাশি যৌতুক দেওয়া হয়।
তাহলে ‘প্রেম’ জিনিসটা খারাপ? এই ধারণাই আসে মনে, তাই না? বাবা-মা, আত্মীয় স্বজন, পাড়া-পড়শি, সমাজ সবার থেকে আমরা বড় হতে হতে শিখলাম যে ‘প্রেম’ জিনিসটা খারাপ। তাহলে কি কৃষ্ণপ্রেম, এবং কৃষ্ণের প্রেমগুলোও খারাপ ছিল? এই প্রশ্ন করলেই মানুষজন আমাকে আমার মাসির মতন তেড়ে আসবেন। তার কারণ দুটো। প্রথম হল গুরুজনের মুখের উপরে কথা বলা। বাবা-মা, আত্মীয়রা কি আমার খারাপ চায়? ভালো চায় বলেই তো, যাকে ভালোবেসে ভালোবাসার মানুষটাকে চেনার চেষ্টা করছি, তার থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে, একেবারে অচেনা একজনকে লোকের কথা শুনে আচমকা আমার জীবনে ধর্মের ষাঁড়ের মতো ভরে দিয়ে বলবে “এর সাথেই মানিয়ে গুছিয়ে নাও।” কারণ গুরুজনেরা সবসময় সবকিছু সঠিক জানে। দ্বিতীয় কারণ কৃষ্ণ ভগবান ছিল এবং আমি ভগবানের অবতারের কার্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি, সেটা ঘোরতর পাপকার্য। কিন্তু আমিও ট্যাটা, আমি আমার জায়গায় অনড় থেকে বারংবার জিজ্ঞেস করব, এ কেমন দ্বিচারিতা? ঘরের ছেলে, পাড়ার মেয়ে প্রেম করলে সেটা অন্যায়, আর ভগবানের অবতার প্রেম করলে সেটা পূজ্য বিষয়? ঘরের প্রেমকে ঢাকা চাপা দেওয়া হোক, আর ভগবানের প্রেমকে ক্যালেন্ডারে এঁকে, মূর্তি বানিয়ে ধূপ-ধুনো জ্বালিয়ে দুই বেলা পুজো করা হবে? কদর্যভাবে হলেও হয়তো যে গানের কথা বলেছিলাম একদম শুরুতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে আমার প্রশ্নটাই হয়তো সেই গানটাই তুলে ধরছে। কৃষ্ণ করলে লীলা, আমরা করলে বিলা?
তাহলে এর উপায় কী? উত্তর কী?
উত্তর খুঁজতে একদম গভীরে যেতে হবে, এবং সেই আদি প্রশ্নটাই উঠে আসে। ‘প্রেম’ কী? আর ‘প্রেম’ যে ঠিক কী সেটার উত্তর দিতে আজ পাঁচহাজার বছর ধরে কোনো লেখক, কবি, ঔপন্যাসিক, টীকাকার, পণ্ডিত, তর্করত্ন, তর্কবাগীশ কেউ কোথাও কোনো কার্পণ্য রাখেননি। পাঁচ হাজার এইজন্য বললাম কারণ তর্ককে সাইডে রেখে আমি মহাভারত ও রামায়ণের রচনা এবং ঘটনাকালকে ইতিহাস হিসেবেই ধরলাম। কিন্তু ‘প্রেম’ কী এটা আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, আমি বলব প্রেম একপ্রকারের সখ্যতা। একলা জীবনে একজন ভরসা, যে আপনাকে বুঝবে, আপনার কথা শুনবে, আপনার সঙ্গে সর্বক্ষণ থাকবে। ঘাড়ে চড়ে নয়, একটা ভরসার মতন থাকবে।
প্রেম দুইপ্রকারের হয়। ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির প্রেম, এবং ব্যক্তির সাথে তার কর্মের প্রেম। আগে দ্বিতীয় প্রকারটা বলি। আপনি বলবেন, এইমাত্র লিখলেন প্রেম মানে সখ্যতা, তাহলে কর্মের সাথে প্রেম মানে কি কর্মের সাথে সখ্যতা? তাই আবার হয় নাকি? কর্ম কি একজন মানুষের জায়গা নিতে পারে? কর্ম একটি ক্রিয়া, প্রেমও অবশ্য তাই, কিন্তু কর্মের ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া ও প্রেমের ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া কি এক?
আমি এখানে একটু শক্ত হয়েই বলব, “হ্যাঁ, এক…”
নিকোলা টেসলার নাম শুনেছেন? হয়তো তিনি স্বল্পখ্যাত, অনেক জাঁদরেল বৈজ্ঞানিকদের রাজনীতিতে তার প্রতিভার ছটা কিঞ্চিৎ ঢাকা পড়ে গেছে, তাই হয়তো শোনেননি। তাহলে আমি বলি আইনস্টাইনের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন? নিউটন? ও বাবা সবাই শুনেছেন…। রামানুজম? তানসেন? স্বামী বিবেকানন্দ? রবীন্দ্রনাথ? কাজী নজরুল ইসলাম? সবার নাম শুনেছেন? এরা সকলেই নিজের কর্মের প্রেমে পড়েছিলেন। মানুষ যেমন মানুষের প্রেমে পড়লে পাগলের মতন ছোটাছুটি করে, এরা সকলেই নিজেদের কর্মের প্রেমে পড়ে তাইই করেছিলেন। নিজের কর্মের প্রেমে না পড়লে টেসলা অকারণে বহু নিন্দে অবজ্ঞা করেও আবিষ্কারের পর আবিষ্কার করে যেতেন না। আইনস্টাইন এক সময়ে নিজেকে স্পেস-টাইমের ব্যাপারে এতটাই ডুবিয়ে দিয়েছিলেন, বহির্জগতের বাকি কথা প্রায় ভুলেই গেছিলেন। নিউটন বিউবনিক প্লেগের সময় করোনাকালের আমার-আপনার মতন গৃহবন্দি ছিলেন, তখনই আলোকের সাথে যুক্ত সূত্র ও বহু অন্য সূত্র আবিষ্কার করেন। সত্য-মিথ্যা জানি না, তবে শোনা যায় তানসেনের গানের সুরে বৃষ্টি পড়ত এবং প্রদীপ জ্বলে উঠত। স্বামী বিবেকানন্দ সারা দেশ ছুটে বেরিয়েছেন শুধুমাত্র একটি প্রশ্নের প্রেমে পড়ে। রামানুজম অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়েও তার বন্ধুর ট্যাক্সির নম্বর নিয়ে এক অদ্ভুত গাণিতিক তথ্য দিতেও পিছপা হননি। রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের সম্বন্ধে আর নতুন করে কী বলব? যে মানুষগুলো নিজেদের প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানদের হারিয়েও তাদের বেদনা ও কষ্টকে ছন্দে ব্যক্ত করতে পারে তাদের কাছে ছন্দের অতিরিক্ত প্রেমের বস্তু যে আর কিছুই হতে পারে না এ তো স্পষ্ট বোঝা যায়। এটাকে প্রেম ছাড়া কী বলবেন আপনি? অধ্যবসায় এক জিনিস হয় আর কর্মের প্রতি সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান উজাড় করে দেওয়া প্রায় সাধনার পর্যায়ে পড়ে, এবং সেই সাধনারই আরেক নাম হল প্রেম।
এবার আসি আমাদের চেনা প্রথম প্রকারের প্রেমে। মানুষে মানুষে প্ৰেম। এই প্রেমেরও আবার অনেক ভাগ হয়। একভাগ হল প্রেমের মধ্যে শারীরিক চাহিদা ও রিপুর আশ্রয়। স্বামী-স্ত্রীর প্রেম এই প্রকারে পড়ে। আদিকালের রাম-সীতা, দ্রৌপদী-অর্জুন, রুক্মিণী-কৃষ্ণ, ঊষা-অনিরুদ্ধ, পুরুরাভ-ঊর্বশী থেকে শুরু করে নিত্য সাংসারিক কষ্ট একসাথে সহ্য করেও হাসিমুখে থাকা চিরকালের এবং আজকের দম্পতিরা সকলেই এই ভাগে পড়েন। আরেক প্রকার হল সখ্যতা।
এটি যে কারোর সাথে যে কারোর হতে পারে। পুরুষের সাথে নারীর, পুরুষের সাথে পুরুষের, নারীর সাথে নারীর। সখ্যতা প্রেম মানেই কিন্তু সেটা শারীরিক না। শরীর সেখানে থাকতেও পারে, না-ও থাকতে পারে। আগের প্রকারের প্রেমেও সখ্যতা একান্ত দরকারি। কিন্তু এই যে সখ্যতা প্রেমের কথা বলছি সেখানে মানসিক প্রেমটাই সব। একজন কথা বলার লোক। সকলের ক্ষেত্রেই হয়। একজন বন্ধুস্থানীয় কেউ, যাকে মানুষ ভিড়ের মধ্যে খোঁজে। হয় না বলুন? তুই না গেলে আমিও যাব না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা, যার সামনে আপনাকে অভিনয় করতে হয় না। প্রতিটা ছেলের একটি করে এরকম মেয়ে বন্ধু থাকে, এবং প্রতিটা মেয়ের এরকম একটি ছেলে বন্ধু থাকে বলে আমার ধারণা। যাকে সে সব বলে, কিন্তু সেটায় দুজনের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক ঢুকে পড়ে না। সেখানে দুটো মানুষ একে অপরের কাছে আশ্রয় পায়। এটাও প্রেম। যেমন কৃষ্ণ-দ্রৌপদী, কৃষ্ণ-অর্জুন। সাহিত্যে এরকম উদাহরণ ভরে ভরে আছে। ব্যোমকেশ-অজিত, শার্লক হোমস-ওয়াটসন। আর তৃতীয় প্রকার হল এই দুইপ্রকারের মাঝে। অর্থাৎ যেখানে সখ্যতা দরকারি এবং শারীরিক ব্যাপারটাও দরকারি। এরা হল প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল যারা আমাদের সময়ে পার্কে বসে বাদামভাজা খেত, এখন দামি শপিং মলে বসে নিজেদের ছবি তোলে। এদের মধ্যে সখ্যতা আছে, আবার শারীরিক চাহিদাও আছে। সেটা উচিত-অনুচিত, বিবাহের আগে পরে, ঘরের ভিতরে না মাঠে-ঘাটে সেসব বিচার করার জায়গা এই লেখা নয়। আমরা প্রেম নিয়ে কথা বলছি, প্রেমের যৌক্তিকতা, বহিপ্রকাশ ও সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে নয়। এই প্রকারের প্রেমের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বোধহয় রাধা ও কৃষ্ণের প্রেম। তার উপরে ও তার কাছাকাছি অন্য কোনো উদাহরণ আমার মাথায় আসছে না।
তাহলে কী জানলাম? প্রেম করতে গেলে একটা কর্ম বা একটা মানুষের দরকার পড়ে। মানুষ নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে নারসিসিস্ট হতে পারে, কিন্তু সেটা একটা সময়ে গিয়ে শেষ হয়ে যায়। হতে বাধ্য। সুতরাং দ্বিতীয় কাউকে দরকার। এটা আমরা বুঝলাম। তাহলে প্রেম করাটাই যদি কর্ম হয় এবং সেই প্রেমকর্মের প্রেমে যদি কেউ পড়ে তাহলে কী হবে? মানে সে যে একজনকে ভালোবাসছে, সেটাই তার কাজ, এবং সেই কাজের প্রতিই তার সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিচ্ছে। তাহলে তাকে কী বলবেন? এই কর্মপ্রেমের আরেক নামই হচ্ছে ‘ভক্তি’।
এবার প্রেম থেকে সরাসরি লাফ মেরে চলে এলাম ‘ভক্তি’তে। ভক্তি জিনিসটা কী? একটু আস্তে আস্তে এগোই। নইলে কি হবে জানেন তো? ধর্মপ্রচারের বইগুলোর মতো সবকিছু ভগবানের কাণ্ড এবং লীলার দোহাই দিয়ে হঠাৎ করে প্রেম আর ভক্তিকে জড়িয়ে একটা জগাখিচুড়ি করে ফেলব। তখন আপনারাই মাঝপথে এই লেখা রেখে দিয়ে বলবেন, “ধ্যার… লোকটা কীসব আলফাল বকছে।”
সবার আগে আমরা বোঝার চেষ্টা করি ‘ভক্তি’ জিনিসটা কী?
আমরা বাংলায় একটা কথা বলি, “ভয়ে ভক্তি নয়তো ভাবে ভক্তি”। এখানে কথাটায় একটু ভুল আছে। ভয়ে কখনো ভক্তি আসে না। যেটা আসে সেটা হল একজন মানুষ বা দেবতার প্রতি ভয়ে তার প্রভুত্ব স্বীকার করে নেওয়া। এবং এই ভয়ে ভক্তি ব্যাপারটা প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়। কোনোভাবে আমাদের মজ্জায় এই ব্যাপারটা ঢুকে গেছে যে ভগবানকে ভক্তি না করলেই শাস্তি দেবে, পাপ দেবে। তাই রাস্তার প্রতিটা মোড়ের ভগবানের মন্দির দেখে প্রণাম করতেই হবে। যত বড় সংকট তত বড় প্রণাম। যদি ভীষণ বিপদে পড়ে থাকেন আপনার প্রণাম সাষ্টাঙ্গ হবে। যদি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছেন, ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন এবং আপনি নিজেও জানেন আপনার প্রস্তুতি নিয়ে আপনার নিজেরই সন্দেহ আছে, তখন আপনার প্রণাম দুই হাত জোড় করে মাথা ও বুক ছোঁবে। যদি শুধুমাত্র ভগবানের কৃপাদৃষ্টি আপনার দিকে রাখতে ভগবানকে তুষ্ট করতে চাইছেন, তাহলে একহাতে ঝট করে কপাল আর বুক ছুঁলেই হবে। আর যদি বিশ্বাসও আছে, ভয়ও আছে, কিন্তু সামাজিক কারণে নিজেকে আধুনিক দেখাতে হবে তাহলে আপনার প্রণাম একটা আঙুল দিয়ে ঠোঁট ও চিবুক ছোঁবে। যেটা আজকালকার তরুণ-তরুণীদের প্রায়ই করতে দেখা যায়। সনাতন ভগবান ও জিশুখ্রিস্ট একসাথে কনফিউজড। এটা যদি প্রণাম হয় তাহলে প্রণামটা করল কাকে? কার খাতায় গেল?
সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি ভক্তি ব্যাপারটা একরকম ভয়ের দিকেই প্রায় চলে গেছে। তার মধ্যে রাজ্যের উদ্ভট সিনেমা-সিরিয়ালগুলো ব্যাপারটা আরও গুলিয়ে দিচ্ছে। খোলাখুলি বলি। খ্রিস্টান ধর্ম ভীষণ ভালো ধর্ম, প্রচুর ভালো ভালো কথা লেখা আছে বাইবেলে। কিন্তু এই বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে বর্তমানে খ্রিস্টান ধর্মের একটি বড় স্তম্ভ হয়ে গেছে মানুষকে ভয় দেখানো। কীভাবে?
ভগবানে বিশ্বাস না করলেই শয়তান তোমাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেবে। বাজে বাজে জঘন্য কাজ। সেটা প্রমাণ করতে সিনেমা ও সিরিয়ালগুলোও অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস দেখায়। কবেকার কে এক শান্তশিষ্ট লোক, তার ঘাড়ে নাকি দানব চেপে তাকে দিয়ে পরিবারের সবাইকে হত্যা করিয়েছে। দানবের প্রভাবে শান্তশিষ্ট মানব সাইকো কিলার হয়ে গেল। বোঝো কাণ্ড। আরেকটা প্রোগ্রাম সেখানে চার-পাঁচজন মুশকো মুশকো যুবক, হাতে নানারকমের রংবেরং বিচ্ছুরণকারী ইলেকট্রনিক মিটার নিয়ে বেড়াল ধরার মতো ভূত ধরছে। ভূতগুলো আবার স্পষ্ট ইংরেজিতে কথা বলে।
সত্য-মিথ্যা জানি না, কিন্তু এই সমস্ত ব্যাপার একটিই কথা সৰ্বক্ষণ প্ৰমাণ করছে। তোমার চারিদিকে ক্ষ্যাপা কুকুরের মতন দানব ও বদ আত্মারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর তারা যখন তখন ঘ্যাক করে কামড়ে দিয়ে তোমাকে বিপথে চালিত করবে। সুতরাং ভগবানের স্মরণে এসো। ফলস্বরুপ ‘ভয়ে ভক্তি’ হতে বাধ্য। সনাতন ধর্মে এই ব্যাপারটা ছিল না কোনোদিন। ইন্দ্রকে ভক্তি না করার জন্য ইন্দ্র বৃষ্টি দিয়ে গোকুলবাসীকে দুকুল ছাপানো বন্যার সাহায্যে ডুবাতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা এখন ইন্দ্রের পুজো কতটা করি? কালে কালে ইন্দ্ৰপুজো কোথায় হারিয়ে গেছে। শুধুমাত্র দিকপাল হিসেবে কিছু পুজোতে ইন্দ্র পুজো পায়। কিন্তু কৃষ্ণ যে ইন্দ্রের বিরুদ্ধে গিয়ে গোবর্ধন পুজো শুরু করেছিল, সেই সাহস এখন দেখা যায় না। অত্যন্ত দ্রুত আমাদের মধ্যেও ‘ভয়ে ভক্তি’ ব্যাপারটা ঢুকে গেছে। দরকার ছাড়া এবং দরকারের জন্যই আমরা ভক্তি করি, বাকি সময়ে নিজেকে সর্বশক্তিমান ভাবি।
প্রবাদের দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে ভাবে ভক্তি। ‘ভাব’ মানে কী? ছোটবেলায় আমরা বন্ধুদের সাথে ভাব আর আড়ি করতাম মনে আছে? ভাব মানে হল সখ্যতা, আবার সেই প্রেম। তুমি আমার বন্ধু হলে। ভাবের আরেক অর্থ হল ভাবনায় আচ্ছন্ন হওয়া। ভাবনা নামে কোনো মহিলার চিন্তায় আচ্ছন্ন হওয়া নয়, ভাবনাচিন্তার ভাবনার কথা বলছি। যদিও সখ্যতার ভাব ও ভাবনার ভাব, এই দুটোর মধ্যে খুব একটা তফাত নেই। কোনো বস্তু, কর্ম, চিন্তা, ব্যক্তি অথবা ভগবানের সাথে যদি আমার সখ্যতা না হয়, যদি আমি তার সাথে একাত্ম বোধ না করি তাহলে তার ভাবনায় আচ্ছন্ন হব কী করে? কর্মক্ষেত্রে এরকম বহু বহু উদাহরণ দেখা যায় যেখানে একজন মানুষ তার কর্ম নিয়ে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে
পড়েছেন যে কর্মের একটি সমস্যার সমাধান স্বপ্ন হয়ে তাকে ধরা দিচ্ছেন। অগস্ট কেকুলে বেঞ্জিনের কেমিকাল গঠন স্বপ্নে সাপের খেলার মাধ্যমে দেখেছিলেন। জেমস ওয়াটসন ডি এন এর গঠনও স্বপ্নে দেখেছিলেন। নিলস বোর অণুর গঠন দেখেছিলেন। সাহিত্যে বহু মানুষ আছেন যারা স্বপ্নে গল্পের প্লট পান। যেমন রবার্ট স্টিভেন্সনের জেকিল অ্যান্ড হাইড, অথবা হার্জ (আমি অ্যার্জে বলতে নারাজ) রোগশয্যায় স্বপ্নে তিব্বতে টিনটিনের গল্প দেখতে পান। আর আমাদের দেশে তো স্বপ্নাদিষ্ট ওষুধ, দেবতার বিগ্রহ পাওয়া ও প্রতিষ্ঠা করার কাহিনি প্রচুর প্রচুর আছে। এখানে কিন্তু আমি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা বলছি না। আমি বলছি ভাবের কথা। ভাবাচ্ছন্ন হলে অনেক কিছুর সমাধান পাওয়া যায়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভগবানেরও সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।
তাই ভাবের মাধ্যমে ভক্তিও উঠে আসে। এবং এই এতটা আলোচনার পরে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ভক্তি আর প্রেমের মধ্যে খুব একটা অন্তর নেই। এই প্রেমে শারীরিক চাহিদা থাকতেও পারে না-ও থাকতে পারে। শারীরিক চাহিদা ভালো না খারাপ, কোন কোন ক্ষেত্রে ভালো, কোন কোন ক্ষেত্রে খারাপ এই নিয়ে তন্ত্র ও বহু বহু সংখ্যক প্রাচীন ও আধুনিক লেখা কাটাছেঁড়া করেছে। আমরা সেদিকে যাচ্ছি না, আমরা শাশ্বত শারীরিক সম্পর্ক বোঝাচ্ছি। পুরাণে গুচ্ছের উদাহরণ আছে যেখানে অনেক ঋষি-মুনিরাজারা দেব-দেবীদের তপস্যা করে প্রচুর চরিত্র সন্তান লাভ করেছে। আমি বায়োলজির দিকে যাচ্ছি না, কারণ সাধারণ উপায়ে সন্তান লাভ করার সুযোগ থাকলে এত নিঃসন্তান রাজা-রানিরা দেবতাদের তপস্যা করত না। এখানে আমি যজ্ঞে পাওয়া পায়েস বা আগুন থেকে লাফিয়ে বেরোনো ধৃষ্টদ্যুম্নের কথাও বলছি না। আমি বলছি দৈব আশীর্বাদে সন্তান লাভ করা, মানে সেই ব্যক্তি নিশ্চয় এতটাই তপস্যায় সমাধিস্থ হয়েছিলেন যে তার ইষ্ট দেবতা অথবা দেবী এসে তাকে সন্তান প্রদান করেন অথবা সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা প্রদান করেন। এটাই ভক্তি। তন্ত্রে, বিশেষ করে বামাতন্ত্রে একাধিক উপায় আছে যেখানে অতিমানবীয় অতীন্দ্রিয় দেবীদের আহ্বান করে ভার্যা, ভগিনী অথবা কন্যা রূপে লাভ করা যায়। দেবতাদের ডাকার অপশন নেই। এটাও একরকমের প্রেম। সেই দেবীর প্রতি প্রেম। হয়তো উদ্দেশ্য অন্য, কিন্তু প্রেমটা খাঁটি না হলে সাধনা খাঁটি হয় না, আর সাধনা খাঁটি না হলে সেই দেবীরা আহ্বানে সাড়া দেন না। প্রেমের শর্টকাট বলা যেতে পারে। ফরমুলা দেওয়া প্রেম। তারানাথ তান্ত্রিক অনেকাংশে সঠিক সাধনার কথাই বলে গেছে। আর যারা আরও উঁচু দেবতাদের সাধনা করেন তাদের আপনি খুঁজে পাবেন না। তারা অদৃশ্য। ক্বচ্চিৎ কদাচিৎ তাদের দেখা পাওয়া যায়। তারা দেবপ্রেমে এবং ভক্তিরসে বিভোর। কতকাল কতযুগ কে জানে?
এই ভক্তিপ্রেম ব্যাপারটা কীরকম হয়? এবং এর উৎস কি কোথাও লেখা আছে? নাকি এটা শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক আখ্যায় যাকে বলে হ্যালুসিনেশন এবং ডিভাইন ম্যাডনেস (থিয়া ম্যানিয়া)? মানসিক রোগ? নিজেকে বিশ্বাস করানো যে এক অদৃশ্য শক্তি আছে, এবং আমি নিজেকে তার কাছে সঁপে দিচ্ছি? এর কি কোনো ভিত্তি নেই? সবকিছুই কি মানসিক ব্যাপার?
আমি বলব মানসিক তো বটেই, কিঞ্চিৎ পাগলামিও, তবে এটা কোনো রোগ নয়। ‘মানসিক’ কথাটা বললাম কারণ ‘মানস’, অর্থাৎ মন ছাড়া এই পুরো বিশ্বসংসারই তো অন্ধ। মানুষের চেতনার বাইরে ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব কোথায়? সেই চেতনাই যখন ব্রহ্মাণ্ডকে বুঝতে শুরু করে তখন ব্যাপারটা মানসিক হয় তো বটেই। আইনস্টাইন যখন রিলেটিভিটি (জেনেরাল এবং স্পেশাল) থিওরি সকলের সামনে প্রকাশ করেছিলেন, সেটা পুরোটাই প্রায় গাণিতিক ও আলোর চলাচলের উপরে নির্ভর করে করা হয়েছিল। আজ একশো বছর ধরে বহু এক্সপেরিমেন্ট সেই থিওরির সত্যতার উপরে সিলমোহর ঠুকে দিচ্ছে। কিন্তু আইনস্টাইনের কাছে পুরোটাই তো মানসিক ধাঁধা ছিল। সুতরাং ‘মানসিক’ অর্থেই রোগ নয়, এবং একটা সমাধান খুঁজে বের করার এই যে উদ্যম, এই যে তনছুটি, সেটাই তো ভক্তি।
তবুও আপনারা বলবেন ভক্তিরসে গা ভাসিয়ে দেওয়া, এই যে ‘কালী কালী’ বা ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ বলে ছুটে যাওয়া, ভাবাচ্ছন্ন হয়ে লুটিয়ে পড়া, এই যে সো-কলড ‘শিষ্টাচার সংরক্ষিত সামাজিক’ মানুষের মাঝে অদ্ভুত আচরণ করা, এগুলো কি ভক্তি? কোথায় লেখা আছে এরকম ভক্তির কথা? যত্তসব… ভণ্ডামি… তাই না?
তাহলে আপনাদের আবার আমি টেনে নিয়ে যাই তন্ত্রের সেই বইটিতে, যেটাকে আমি বারংবার আমার লেখায় টেনে আনি। সেই সপ্তম শতাব্দীতে রচিত ‘বিজ্ঞান ভৈরব তন্ত্র’ নিজের ছত্রে ছত্রে বারবার একটা কথাই বলছে, যে রূপেই (আকার বা নিরাকার) নিজের মুক্তি বা মোক্ষকে কল্পনা করো, সেই রূপের কাছে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করে দাও। একেবারে সারেন্ডার। বিরোধ করলেই মাটি, সব দূরে চলে যাবে। আর বিরোধ করা মানে কী? নিজের লজিক খাটানো, নিজের বুদ্ধিতে বুঝতে চাওয়া, স্বার্থ জড়িয়ে বুঝতে চাওয়া…। এসব করতে গেলেই মাটি। ভক্তি হতে হবে একেবারে লজিকবিহীন। পুরোপুরি ভরসা করা।
সেটা আবার কীরকম? এই ব্যাপারটা অদ্ভুতভাবে খ্রিস্টান ও মুসলমানেরা নিজেদের ধর্মে ওতপ্রোতভাবে আপন করে নিয়েছে। খ্রিস্টানদের প্রায়ই বলতে শুনবেন ‘Leap of Faith’, মুসলমানদের কাছে ‘আল্লাহ ভরসা’। বিশেষ করে মুসলমানদের এই ‘আল্লাহ’র উপরে অন্ধ ভরসা সত্যি ঈর্ষণীয়। সাদা বাংলায় যদি বলতে বলেন, তাহলে বলব সে বিপুল সংখ্যক মুসলমানেরা আল্লাহর উপরে সম্পূর্ণ ভরসা করেন তার তুলনায় আমাদের সনাতন ধর্মে সিকিভাগ মানুষও ‘ভগবান’ (কৃষ্ণ, দুর্গা, শিব বা যে রূপেই হোক) এর উপরে সেই অন্ধভক্তি দেখা যায় না। সেই বিশ্বাসটাই নেই। কিন্তু এবার আপনি বলবেন লজিক ছাড়া পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিলে কি আমাকে প্রহ্লাদের মতন ভগবান বাঁচাবেন? এর উত্তর আমি জানি না, কারণ আমার মনও সন্দেহে ভরা, সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলে আমার মনেও এত প্রশ্ন আসত না। তবে এই প্রশ্নের মধ্যেই সন্দেহ আছে, এবং পরীক্ষা করা নিমিত্তেই এই প্রশ্ন। সেখানে তাহলে অন্ধভক্তি কোথায়? সবার মনেই সন্দেহ… সর্বক্ষণ… আর লজিক।
তাহলে কি মহাপুরুষের সান্নিধ্য ছাড়া এই আত্মকে সমর্পণ করার পদ্ধতি আমাদের মতন সাধারণ মানুষের আওতার বাইরে থাকবে? কোনোভাবে কি জানার উপায় নেই? উপায় আছে, আর সেই উপায় আমাদের ঘরেই আছে। উপায় আপনাকে আর কেউ দেখাবে না, স্বয়ং আপনার কন্যা বা পুত্ৰই এই উপায় দেখাবে। আপনি অজান্তে দেখেওছেন। বুঝিয়ে বলি। একেবারে ছোট যে শিশুরা, যারা খালি খায় আর ঘুমায়, তারা জানে ক্ষিদে পেলে কাঁদতে হবে, আর কেউ না কেউ খাদ্যপানীয় মুখের কাছে ধরবে। যতই গরিব হোক, এই নিয়মের অন্যথা হয় না। ক্ষমতা অনুযায়ী নবজাতকের খাদ্য দেওয়া হবেই। একটু বড় হলে সে যখন মা-বাবা-দাদু-ঠাকুমা-দিদিমা বা বাড়ির লোকেদের চিনতে শুরু করে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঠিকঠাক বসতে না শিখলেও যখন ঘরের মধ্যমণি হয়ে বসে, তখন তার কাছ থেকে এই আত্মসমর্পণের ব্যাপারটা আরও বেশি করে শেখা যায়। সে তখন হামাগুড়ি দিতে শিখেছে হয়তো। ভালো-মন্দবিপদ-আপদ-ব্যথা-ভূত-ভবিষ্যৎ-জুজু কিছুই তার চিন্তায় নেই। সে শুধু এটাই জানে যে, পেট ভরা থাকলে তাকে কলম্বাসের মতন দেশ দুনিয়া আবিষ্কার করতে বেরোতে হবে। দেশ দুনিয়া মানে খাটের বাইরে, সিঁড়ির ওইপারে, বিছানার তলায়। পরিব্রাজকের ন্যায় সে তখন হামা-ব্রাজক হয়ে ওঠে। কিছুতেই ভয় নেই। কেন ভয় নেই সে দীর্ঘ আলোচনা। এই লেখার পরিধিতে সেই বিষয় আসে না।
কিন্তু সেই শিশুটি একটি জিনিস জানে। সে জানে যে তার সবে সবে চেনা লোকগুলোর উপরে পুরোপুরি ভরসা করা যায়। একেবারে অন্ধবিশ্বাস করে সে খাট থেকে আপনার কোলে ঝাঁপ দেয়, যা হোক একটা তুলে মুখে পুরে দেয়। তার বোধশক্তি হয়নি, কিন্তু শুরু থেকেই সে এই বিশ্বাস নিয়ে জন্মেছে যে কাছের মানুষেরা তার ক্ষতি হতে দেবে না। তাই নিজের হাতে নিজেকে কখনও আঘাত করলেও সে আপনার কাছে এসে অভিমানের কান্না কাঁদবে। আপনি হয়তো প্রাণহীন মেঝেটাকে বা বিছানাটাকে বা খেলনাটাকে ‘আপ আপ’ করে দু-চার ঘা মিছিমিছি মেরে শিশুটির মনে এই বিশ্বাস আরও পাকাপোক্ত করে দিলেন যে আপনি থাকতে তার কিছু হবে না। আপনিই তার ভগবান।
মানুষ শুদ্ধ বিশ্বাস নিয়ে জন্মায়, আর সমাজ মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস করার ক্ষমতার জন্ম দেয়। শিশুদের মধ্যে অবিশ্বাস-ভয়-দুঃখ এসব থাকে না। আমরাই সেগুলো ঢোকাই। যত যত আমরা বড় হই তত তত ক্রমাগত কাছের এবং দূরের মানুষদের কাছ থেকে ক্রমাগত এই বিশ্বাসের উপরে আঘাত পাই, এবং একটা সময়ে অজান্তেই মনের মধ্যে সন্দেহ ঢুকে যায়। তখন আপনি আর অন্ধভাবে দৃশ্য বা অদৃশ্য ব্যক্তি বা শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করবেন কী করে? ক্রমে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছি আমরা যে, বন্ধুত্ব বা সখ্যতা একটা অলিখিত চুক্তি হয়ে গেছে। যতক্ষণ দুজনেরই ভালো হচ্ছে সম্পর্কটা থেকে, ততক্ষণ চুক্তি বজায় থাকবে। এবং সখ্যতার এই নরম মাটির উপরেই দাঁড়িয়ে থাকা সম্পর্কের অট্টালিকাগুলোও সেইজন্য ফাটলে ভরে যায়।
এই চুক্তিহীন, স্বার্থহীন, যুক্তিহীন, কারণহীন, নিরঙ্কুশ, নির্মল, নিশ্চিন্ত সমর্পণের আরেক নাম ভক্তি। এবং প্রেম ছাড়া যে ভক্তি হয় না সে কথা এই বিগত তিন হাজার শব্দে বলেছি। এই ভক্তিপ্রেমেই অনেকে মুক্তি বা মোক্ষ লাভ করে। মীরার ভক্তি, চৈতন্যদেবের ভক্তি, সুরদাসের ভক্তি, বামাক্ষ্যাপার ভক্তি, রামকৃষ্ণের ভক্তি এমনকি জিশুর ভক্তি, বুদ্ধের ভক্তিও পর্যন্ত এই শ্রেণিতেই পড়ে। সেখানে বাইরের লোক কী ভাবল, না ভাবল, কী করল, কী খাওয়াল, মারল, না পুজো করল, এসব কোনো ব্যাপারই কোনোভাবেই সেই প্রেমভাবের আচ্ছন্নতাকে কাটাতে পারে না। মীরাকে বিষ পান করতে দেওয়া হয়েছিল, চৈতন্যদেবকে মাথায় কলসির কানা মারা হয়েছিল, পরবর্তীকালে অনেক উপেক্ষাও সহ্য করেছিলেন। রামকৃষ্ণকে তোতাপুরী যখন বৈদান্তিক শিক্ষা দিতে গেছিলেন, তখন তাকে সব ছেড়েছুড়ে দিতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, “এই সব মা, মা কালী সবই মায়া, এসব ছেড়ে দাও।” কিন্তু ভক্তির সাথে মাতৃপ্রেম জুড়ে ছিল। ফলস্বরূপ কী হয়েছিল আমরা বোধহয় সকলেই জানি।
কিন্তু এবারে প্রধান প্রশ্ন আসে যে আমি এই পর্বের নাম ‘কৃষ্ণ এবং কৃষ্ণপ্রেম’ লিখে এই এত্ত এত্ত কথা কেন লিখে যাচ্ছি। একেবারে আইনস্টাইন থেকে তন্ত্র হয়ে রামকৃষ্ণ। কেন? সোজাসুজি বাপু কৃষ্ণের সাথে প্রেমের কথা লিখে দিলেই হয় এত ভনিতা না করে।
আসলে আমি তাইই লিখছি। কৃষ্ণপ্রেম বোঝাতে এই এত্ত কথা লিখলাম। কৃষ্ণের সময় থেকে যত মানুষ কৃষ্ণের ভক্তিপ্রেম করেছে, তাদের ভক্তি বা পাগলামি বোঝানোর জন্যই এত কথা লিখলাম। শুধু কৃষ্ণপ্রেম না, দুর্গাপ্রেম, শিবপ্রেম, বিষ্ণুপ্রেম সবার ক্ষেত্রেই এই একই যুক্তি খাটে। আমরা যেটাকে ভক্তিতে বিলীন হওয়া বলি, ইংরেজরা সেই অবস্থার নাম দিয়েছে ‘trans state’। একেবারে বস্তু জগতের ঊর্ধ্বে চলে গিয়ে সেই ভালোবাসার মোহে বিভোর হয়ে থাকা। সাইকেডেলিক ড্রাগও এই কাজ করে। যারা সাংঘাতিক সাংঘাতিক নেশা করে তারাও সবসময় এই উচ্চতর একটা জগতে থাকার চেষ্টা করে। তখন মন মাথা সব খুলে যায়। তাহলে এত কৃষ্ণপ্রেম না করে শুধু নেশা করলেই হয়। কী বলেন? শর্টকাট? তাই না?
না, তাই নয়। ভক্তিভাবে ট্রান্স পর্যায়ে যাওয়াতে আনন্দ থাকে। সেখানে আপনার গাড়ি আপনিই চালাচ্ছেন। আপনার গন্তব্য নির্দ্দিষ্ট করা আছে। আপনি চান কৃষ্ণের দেখা পেতে, শিবের দেখা পেতে, অথবা মুক্তি পেতে। নেশা করে ওই পর্যায়ে গেলে আপনার গাড়ি অন্য কেউ অন্য কোনো জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছে। তখন হয়তো আপনার গভীরে বাস করা হতাশা, গ্লানি, হিংসা এবং পাশবিক প্রবৃত্তি আপনাকে মনের গভীরে আরও ভয়ংকর কোথাও নিয়ে চলে গেল। কৃষ্ণকে দেখার ইচ্ছেয়, আকণ্ঠ পান করে আপনি সরাসরি যে সব মানুষদের ঠকিয়েছেন, তাদের দেখা পেয়ে গেলেন হয়তো। অবশেষে জেল, নয়তো শ্মশান।
এই কৃষ্ণপ্রেমে বহু বহু মানুষ বহুকাল ধরে নিজেদের নিমজ্জিত করেছেন। নিজেদের মতন কৃষ্ণকে খাইয়েছেন, সাজিয়েছেন, কথা বলেছেন, গল্প করেছেন, ঘুম পাড়িয়েছেন, গান শুনিয়েছেন। সব ঠিক আছে, কিন্তু তারা অধিকাংশই কৃষ্ণের মূর্তি বা ছবি থেকে কল্পনা করে কৃষ্ণকে নিজের মনে মাথায় এবং মানসচক্ষে দর্শন করেছেন। কিন্তু যারা কৃষ্ণকে সামনে থেকে দেখে তার প্রেমে পড়েছিল, তাদেরকে কল্পনা করতে হয়নি। এবং তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে বোধহয় বৃন্দাবনের গোপিনীদের রাখা যায়।
বেদব্যাস বড় কাঠখোট্টা লোক ছিলেন। তার ভাবটাই ছিল- ইতিহাস লিখছি, খালি তথ্য লিখব। যুদ্ধের জন্য যে বেদব্যাস চার-পাঁচ পর্ব গড়গড় করে লিখে গেছেন, সেই বেদব্যাসই হরিবংশে কৃষ্ণের বৃন্দাবনের লীলা ও প্রেমপর্ব কোনমতে ছুঁয়েই বেরিয়ে গেছেন। ভদ্রলোক প্রবল যুদ্ধপ্রিয় ছিলেন, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, নইলে এত তারিয়ে তারিয়ে মহাভারতের যুদ্ধ আর হরিবংশে জরাসন্ধের সাথে কৃষ্ণের ঝামেলা লিখতেন না। তাই কৃষ্ণের বৃন্দাবনে গোপিনীদের প্রেম সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের অন্য বইয়ের সাহায্য নিতে হয়। তার মধ্যে সবার প্রথমে আসে শ্রীমদ্ভগবতম। তারপরে আসে অজস্র বই। এবং অজস্র কাহিনি।
কৃষ্ণের সাথে গোপিনীদের সেইসব কাহিনি শুনে অনেক বিজ্ঞ মানুষকেই আমি বলতে শুনেছি, “হুঁহ, কৃষ্ণ একটা ক্যারেক্টারলেস ছিল। গোপিনীদের সাথে প্রেম করে, কাপড় চুরি করে নগ্ন করে, রাধার সাথে ফষ্টিনষ্টি করে, বিয়ে না করে, ষোলো হাজার বউ নিয়ে দিব্যি আনন্দে ছিল…”
বিশ্বাস করুন, একদম এই ভাষা, এবং এই কথা, এবং যারা এরকম বলেছেন তাদের নাম আমি এখানে বলে দিলে আপনারা অবাক হয়ে আকাশ থেকে পড়বেন। প্রসঙ্গত বলা যায় অনেকেই শুধু এই ব্যাপারটা নিয়ে পড়বে বলেই এই লেখা পড়ছে। মানুষের মন বড়ই বিতর্কিত। এইসব কেচ্ছা-কাহিনির দিকে মানুষ পতঙ্গের ন্যায় আকৃষ্ট হয়। অ্যাই তো, এবারে লেখক বড় বড় বুকনি আর শ্লোক ঝেড়ে প্রমাণ করবে যে কৃষ্ণের প্রেম দৈবিক আর সাধারণ মানুষের প্রেম খেলো। ভাবেননি বলুন? হ্যাঁ আপনাকেই বলছি, একদম এই কথাটাই নিশ্চয় মনে এসেছে এবং পর্বটা পড়া শেষ করেই লেখকের অপদার্থতা নিয়ে রিভিউ লিখতে বসবেন।
আবার উলটোদিকেও বিপদ, আমি যদি দৈব প্রেম ও ভক্তিযোগ না দেখিয়ে একেবারে এলেবেলে করে বলি যে কৃষ্ণ যা করেছে আমাদের পাড়ার পটাও তাই করছে, এবং দৈব ফৈব কিস্যু না, কৃষ্ণ সব হিসেব করে এগিয়েছে, তাহলে তখন হাজার হাজার কৃষ্ণভক্ত পথে নেমে আমার কুশপুত্তলিকা (অথবা আমাকেই) জ্বালিয়ে দেবেন। এ বড় বিপদের লেখা। কোনদিকে যাই? কার পক্ষে বলি?
কারোর পক্ষেই বলব না, আমি শুধু একটাই কথা বলব। কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবন ছেড়ে কংসকে মারে তখন তার বয়স এগারো। সুতরাং বৃন্দাবনের যত কাণ্ড, সব এগারো বছর বয়সের আগেই হয়েছে। ব্যস, দিলাম সবার আশায় জল ঢেলে। এবার বলুন কৃষ্ণের প্রতি গোপিনীদের প্রেম আর গোপিনীদের প্রতি কৃষ্ণের প্রেম ও রাসলীলা, এগুলোকে এবারে আপনি কোন চোখে দেখবেন? আমি ইচ্ছে করেই রাধার নাম আনছি না এখনই, কারণ রাধার ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক উপস্থিতিটাই একটা বিরাট আলোচনার বিষয়। সেটাকে ছোট করে বলছি পরে। আপাতত রাধাকে ধরে নিন গোপিনীদের দলের একজন। কৃষ্ণ যখন এগারো, রাধার বয়স হয়তো পনেরো কী ষোলো। বাকি গোপিনীরা বয়সে অনেক বড় হতেই পারে। কিন্তু এবারে ব্যাপারটা ভেবে দেখুন, কিন্তু একটু অন্য নজরে।
একটা আট-দশ বছরের শিশু (তখনকার শৈশব বোধহয় পঁচিশ পর্যন্ত ছিল), সে খেলাচ্ছলে নদীতে স্নানরতা গোপিনীদের কাপড় চুরি করে, যাতে তারা স্নান করে উঠে আর কিছু পরতে না পারে। এখানে আপনি একটি শিশুর বালখিল্যতা দেখবেন নাকি তার মধ্যে বয়ঃসন্ধির অকালপক্কতা খুঁজবেন? একই কারণ চলে রাসলীলাতেও। ওটা একটা নৃত্য লীলা। আমি আপনি যেমন পার্টিতে গিয়ে একটু বল ড্যান্স করি, নিজেদের মধ্যে নাচের আনন্দ, অথবা ভাসানের নাচ। নাচের মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ। একটা দশ বছরের বাচ্চার সাথে গ্রামের গোপিনীরা নাচছে। কেন নাচছে? কারণ শিশুকৃষ্ণকে দেখে এবং তার রূপে ও চিন্তায় তারা মোহিত হয়ে পড়েছে। শিশুপ্রেম। আপনার বাড়িতে হয়তো কোনো শিশু না-ই থাকতে পারে, কিন্তু ভেবে দেখুন আপনার বাড়ির আশেপাশে হয়তো একটি শিশু থাকে। সে প্রায়ই আপনার বাড়িতে আসে। তার প্রতি কি আপনার মায়া-মমতা-ভালোবাসা জন্মায়না? দু-একদিন তাকে না দেখতে পেলেই তাকে দেখার ইচ্ছে হয় না? গোপিনীদেরও সেরকমই ইচ্ছে হত। সর্বক্ষণ কৃষ্ণকে দেখব। গাল টিপে আদর করে দেব, চটকাব, কোলে করে নিয়ে ঘুরব। এখানে প্রেমটা সম্পূর্ণ একটি শিশুর প্রতি স্নেহের প্রেম। এখানে শারীরিক সম্বন্ধ আসেই না। একমাত্র সরস্বতী দেবীর জন্মরহস্য নামক এক গল্পে রাধা কৃষ্ণের শারীরিক মিলনের কথা জানা যায়, কিন্তু সন্দেহ হয় একটা দশ বছরের শিশুর সন্তান? কলিযুগ যে তখনও শুরু হয়নি।
তবে একটা ব্যাপার সত্যি। কৃষ্ণের মধ্যে কিছু একটা সম্মোহনকারী ব্যাপার ছিলই। যার জন্য শুধু মহিলারা নয়, কৃষ্ণের সখারাও একইভাবে কৃষ্ণের সঙ্গ চাইত। পোস্টার বয়, সব কাজে সে আগে, তার কাছে কোনো অসম্ভব কাজই নেই। এই রাক্ষস মারছে, এই পাহাড় তুলছে, এই সাপের উপরে নেত্য করছে, এই বাঁশি বাজিয়ে সবার মন জয় করছে। এ হেন একটি বাচ্চা ছেলের প্রতি ভালোবাসা ও স্নেহ কার না হবে? আর তার সাথে ভক্তিপ্রেমের ট্রান্স পর্যায় যোগ হলে আর কী করা যাবে? মীরা ও চৈতন্যদেব মনুষ্য কৃষ্ণকে না দেখেই তার ভাবে বিভোর হয়ে গেছিলেন। বৃন্দাবনের গোপিনীরা তো রোজ কৃষ্ণকে দেখতে পেত চোখের সামনে। তাদের সটান ইলেকট্রিক কারেন্টের মতন ভাব এসে আচ্ছন্ন করে ফেলবে এতে আর আশ্চর্য কি?
এবং এই আচ্ছন্নতার প্রভাবেই রাসলীলা ও দোলযাত্রার মতো উৎসবের সূচনা হয়। এবং যেহেতু কৃষ্ণ শিশু ছিল, এবং গোপিনীরা একসাথে তার সাথে রাত-বিরেতে দেখা করতে যেত, এবং আমার বিশ্বাস সেই দেখা এক রাসলীলা ছাড়া অন্য সময়ে ক্ষণস্থায়ী হত। নইলে বৃন্দাবনের লোকেদের, শাশুড়িদের এবং খোদ যশোদা মায়ের কাছে ব্যাপারটা সাংঘাতিক পর্যায়ে দাঁড়াত। ভেবে দেখুন না, বৃন্দাবন এমন জায়গা যেখানে রাক্ষসদের বার্ষিক আক্রমণ ও শীঘ্রপতন ঘটত। এ হেন ডেঞ্জারাস জায়গায় রাতের বেলায় অনেক্ষণ ধরে কৃষ্ণকে কি যশোদা বাইরে থাকতে দিত? গোপিনীদের বাড়ির লোকেরাও কি থাকতে দিত? দিত না। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে মহাভারত ঘটেছে রামায়ণের পরে। রামায়ণে যে লোকজন কানাঘুষোতে নিন্দে ও প্রতিবাদ করে সীতাকে বনবাসে পাঠিয়ে দিতে পারে, তাদেরই পরবর্তী কোনো এক প্রজন্ম, কৃষ্ণের সাথে গভীর রাতে গোপিনীদের এই মেলামেশা কি একেবারেই ক্ষমা করে দিত? সমাজের চেহারাটা চিরকালই এক।
কিন্তু এবার আপনি বলবেন এই ভক্তি, ট্রান্স, মোহাচ্ছন্ন, নৃত্য করা, লুকিয়ে দেখা, একটি বাচ্চা ছেলের প্রেমে পড়া এগুলো কি কোনোরকম অসুস্থতার লক্ষণ? ন্যায্য প্রশ্ন। ঠিক এই প্রশ্নগুলোই শুনতে পাই যখন কাউকে দেখি মন্দিরে পরম ভক্তিতে দীর্ঘক্ষণ ভগবানের দিকে তাকিয়ে আছে তখন। আবার শুনতে পাই যখন দেখি মা দুর্গার মূর্তির দিকে তাকিয়ে কেউ যখন টপটপ করে চোখের জল ফেলছে। নয়তো রাধা-কৃষ্ণের কীর্তন শুনে দুই হাত তুলে নাচছে। আমার দশবছর আগের মাসির মতন অনেকের কাছেই শুনতে পাই, “ঢং, যতসব ন্যাকামি…”। তার মানেই দাঁড়াচ্ছে এগুলো তাদের কাছে একপ্রকারের অসুস্থতা।
কিন্তু সেখানেও আমি একটা প্রশ্ন করব। ‘সুস্থ’ বলতে আপনারা কী বোঝাচ্ছেন? একটা মেকি সমাজে প্রতিনিয়ত সেই সমাজের দ্বারা বেঁধে দেওয়া নিয়মের মধ্যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে চালানোটাই কি সুস্থতা? যেখানে মানুষের সাহায্য করার সময়ে অন্য মানুষ মুখ বেঁকিয়ে চলে যায় সেটা সুস্থতা? যেখানে কেউ একটু ভালোভাবে কথা বললেই মনে প্রশ্ন জাগে ‘আজ কি ধান্দায় এত ভালো কথা বলছে রে বাবা?’, সেটা সুস্থতা? একটা বাচ্চাকে তার নিজের মতন বিকশিত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে প্রতিনিয়ত তার স্বপ্ন, ইচ্ছে, অনুসন্ধিৎসাকে আমাদের এই যন্ত্রচালিত সমাজের পায়ের তলায় পিষে দিয়ে তাকে আমাদের মতনই সেই খাওয়া-ঘুম-চাকরি-বিয়ে-রোজগারের চাকায় কলুর বলদ বানানোটা সুস্থতা? শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি চালিয়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ব্যায়ামাগারে দৌড়নোর যন্ত্রের উপরে পাঁচ কিলোমিটার দৌড়নোটা সুস্থতা? দুরাচারী অত্যাচারী ঘুষখোর নেতা-মন্ত্রীদের সমস্ত কর্মকাণ্ড জেনেও তাদের প্রতি গদগদ হয়ে থেকে নিজের লাভটুকু গুছিয়ে নেওয়াটা কি সুস্থতা ? যারা মনে করেন এগুলো সুস্থতা, যারা মনে করেন ওই ভক্তিভাবে বিভোর থাকা মানুষগুলো অসুস্থ, তাদের আমার কয়েকটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে শুধু। শেষ কবে এবং কোথায় আপনি নিজে নিজের কাছে একান্ত স্বাধীন বোধ করেছেন? শেষ কবে আপনাকে অভিনয় করতে হয়নি?
বেশিরভাগ আমাদের মতন মানুষেরা সারাজীবন অভিনয় করতে করতে একটা বাহ্যিক খোল বানিয়ে ফেলেছি, যেখানে আমরা নিজেরাই নিজেকে চিনি না, জানি না। শেষ কবে আপনি সত্যিই প্রাণ খুলে হেসেছেন? হাসতে হাসতে চোখে জল চলে এসেছে? মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে হেসেছেন? মনে করতে পারবেন না। আমাদের জীবন এতটাই কণ্টকময় ও নাটুকে হয়ে গেছে যে অফিসের পার্টিতে, অথবা প্রতিবেশীর সাথে অথবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে যে কৃত্রিম নকল হাসিটা হাসি আমরা, সেটাই আমাদের আসল হাসি বলে মনে করছি। নিজেদেরকেই নিজেরা ঠকাচ্ছি। ভোরবেলায় পার্কে গিয়ে ফর্মুলা মেনে হাহা করাটা আপনার স্বাভাবিক হাসি নয়। কমেডি শোতে গিয়ে অর্ধেক না বুঝে, মনের মধ্যে হাজার চিন্তা ও রাগ রেখে, সবাই যখন হাসছে তখন তাল মিলিয়ে হেসে ওঠাটা স্বাভাবিক হাসি নয়। বসের জোকস্ শুনে হাসতে হাসতে করমর্দন করাটা স্বাভাবিক হাসি নয়। শেষ কবে শিশুর মতন প্রায় দম আটকে হেসেছেন? মনে করতে পারবেন না, কারণ আপনি-আমি আসলে অসুস্থ। সুস্থ কেউই নই।
আর যেদিন এরকম মাটিতে গড়াতে গড়াতে হাসবেন, সেইদিন ওই যে মানুষটা মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে ভগবানের বা আল্লা বা গডের ভাবে বিভোর হয়ে গেছে তার আবেগটা বুঝতে পারবেন। আপনার হাসি যেমন বাঁধনছাড়া হয়ে বেরিয়ে এসেছে, তার ভাবও সেরকমই বাঁধনছাড়া হয়ে বেরিয়ে এসেছে। হাসির পরে আপনার যেমন কিছুক্ষণ লাগে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে, সেই মানুষটারও সময় লাগে। ওই সামান্য প্রাণ খুলে চোখের জলে নাকের জলে হওয়া হাসির সময়টুকুতে আপনার সমস্ত চিন্তা উধাও হয়ে যায়, শুধু হাসির কারণটা থাকে, আর আপনার গোটা শরীর শুধু আনন্দে ডগমগ করে ওঠে। কেমন হত যদি প্রতিদিন প্রতি মূহুর্তে আপনি ওরকম দমফাটা হাসির অবস্থাটায় থাকতে পারতেন? জীবন থেকে চিন্তা নামক বস্তুটাই চলে যেত। সমস্ত টেনশন গায়েব, খালি অনাবিল আনন্দ আর আনন্দ। ঠিক এই আনন্দের এক অশেষ অসীম মূহুর্তটাই যারা ভক্তিপ্রেমে নিমজ্জিত হয়, তারা অনুভব করে। ঠিক যেমন কর্মপ্রেমে নিমজ্জিত মানুষরাও কর্মের মধ্যে আনন্দ আর আনন্দ খুঁজে পায়। সবই এক, পন্থা আলাদা, নাম আলাদা। যত মত তত পথ। কোনো পথই ভুল নয়, যদি না সেটা অন্যের ক্ষতিকারক হয়। ভক্তি আর ভক্তিপ্রেম আপনাকে বুঝতে হবে না, রোজ ছোট ছোট জিনিসে কৌতুক খুঁজে হাসুন। দেখবেন জীবনটা অনেক সরল হয়ে যাবে।
সেইরকমই ভক্তিপ্রেমে গোয়ালিনীরা ডুবে থাকত। সর্বক্ষণ। এইযে আপনারা মাঝে মাঝে শোনেন যে গোয়ালিনীরা কৃষ্ণকে দেখার জন্যই শুধু যশোদা মাকে এসে নালিশ করত, এটাও সত্যি হতে পারে। দেখাটা উদ্দেশ্য, নালিশটা উপলক্ষ্য। এবং সেই কৃষ্ণপ্রেম বৃন্দাবন ছাড়িয়ে এতটাই দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে যে একবার এক ফলবিক্রেতা মহিলা সেই শুনে কৃষ্ণকে দেখতে বৃন্দাবন চলে আসে। কিন্তু কয়েকদিন চেষ্টা করেও কৃষ্ণের দেখা পায় না। শেষে একদিন কৃষ্ণের বাড়ির সামনে ঠায় বসে থাকে। কৃষ্ণ দৈবযোগে কোনওভাবে জেনে যায় যে একজন তার দর্শনের জন্য অপেক্ষা করছে। পুঁচকে কৃষ্ণ ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মহিলার কাছে যায়।
মহিলা কৃষ্ণকে দেখে ভীষণ আপ্লুত হয়ে পড়ে। কৃষ্ণ সুযোগ বুঝে ফ্রিতে ফল চেয়ে বসে। মহিলা তখন বলে, “আমার কোলে বসে আমাকে মা বলে ডাকবি তবেই ফল দেব…”
সামান্য কাজ, পরিবর্তে ভালো ভালো ফল। মা ফলেষু কদাচন… নয়, বরং ফলেষুর জন্যই ‘মা’ ডাকা। কৃষ্ণ মহিলার কোলে বসে বলে, “মা ফল দাও…” মহিলা সাংঘাতিক আনন্দে ঝুড়ির অনেক ফল কৃষ্ণের ছোট ছোট হাতে দিয়ে দেয়। কৃষ্ণ সেগুলো নিয়ে দৌড়ে যশোদার কাছে গিয়ে বলে, “এই নাও, এই ফলগুলো সবার মধ্যে ভাগ করে দাও…”
যশোদা বেরিয়ে এসে দেখে ফলবিক্রেতা মহিলা চলে গেছেন। যশোদা সমস্ত সখীদের মধ্যে ফল বিতরণ করতে গিয়ে দেখে ফল শেষই হচ্ছে না। আজব ব্যাপার। অন্যদিকে সেই ফল বিক্রেতা মহিলা কৃষ্ণের দেখা পেয়ে বিমোহিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু কিছুটা গিয়েই দেখে তার ঝুড়িতে রাশি রাশি ধনরত্ন ভরা। মহিলা তখন সেই রত্নসহ ঝুড়ি যমুনার জলে ফেলে দিয়ে কৃষ্ণের ভক্তিপ্রেমে বিভোর হয়ে চলে যায়।
এই গল্পটা স্বামী শ্রীপ্রভুপাদ বলেছিলেন, আমি এখানে টুকে দিলাম। যদিও কিছু আশ্রম এই কথা জোরের সাথে প্রচার করে থাকেন যে কৃষ্ণই একমাত্র ভগবান ও অবতার এবং নারায়ণ কৃষ্ণের অংশ (উলটোটাই সত্যি জানি), তবুও আমি সে কথা মানতে নারাজ। কারণ বহু বহু পুরাণ বলছে যে কৃষ্ণ বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। অবতারদের মধ্যে বরাহ, বামন, হয়গ্রীব, মৎস্য এনাদের যা পৃথিবী বাঁচানোর কীর্তি দেখি সেই তুলনায় রামচন্দ্র আর কৃষ্ণকে আমার ভীষণ আঞ্চলিক বলে মনে হয়। আমি তাদের ভক্তি বা অভক্তি করি না, বা তাদের লীলার অসম্মানও করি না। কিন্তু যেখানে অন্যান্য অবতার পৃথিবীকে বিভিন্ন অসুর, রাক্ষস বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচিয়ে মানুষের জাতিটাকে বেঁচে থাকার পথ খুলে দিচ্ছে, সেখানে রামচন্দ্র শুধু রাবণকে মেরে অথবা কৃষ্ণ তৎকালীন রাজনৈতিক পরিকাঠামোতে তুমুল দক্ষতা দেখিয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারে না বলে আমার বিশ্বাস। এটা সম্পূৰ্ণ ব্যক্তিগত মতামত। কিন্তু তাই বলে উপরে যে গল্পটা আমি আওড়ালাম, সেটা কেন বললাম? কারণ গল্পটা থেকে শিক্ষার বিষয় আছে।
কী শিক্ষার বিষয়? দুটি জিনিস। প্রথমত আমরা শিখলাম ভক্তি ও ভক্তিপ্রেমের নিদর্শন। যেটা বলে বলে আমি এতদূর পর্যন্ত লেখা টানলাম। আর দ্বিতীয় জিনিস শিখলাম কৃষ্ণের প্রেমের ব্যাপারে। তফাতটা আপনাকে বুঝতে হবে। এতক্ষণ আমি বলছিলাম কৃষ্ণপ্রেমের কথা, কৃষ্ণের প্রতি অন্যদের প্রেমে কথা। এবারে আমি বলছি কৃষ্ণের প্রেমের কথা। অন্যদের প্রতি কৃষ্ণের প্রেম। কীরকম প্রেম? আমরা শুরুর দিকেই প্রেমের বহু ভাগ দেখেছিলাম, এবার আমরা দেখব যে কৃষ্ণ কীভাবে নিজের জীবনের বিভিন্ন স্তরে সেইসব প্রেমগুলোর পরীক্ষাতে প্রত্যেকটাতেই ‘ফ্লাইং কালারস’এ সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছিল।
প্রথম ছিল কর্মপ্রেম। এই বিষয়ে নতুন করে বলার কিছুই নেই। কৰ্ম যে একটি যোগ, এবং কর্মই যে সবকিছুর মূলে সেটা ভগবত গীতায় কৃষ্ণ সমানে প্রমাণ করেছে। কৃষ্ণ তার কর্মের প্রতি এতটাই নিজেকে উৎসর্গ করেছিল যে নিজের কোনো দুর্বলতা কোনোদিন প্রকাশ করতে দেয়নি। কংসকে মারার পরে সে আর বৃন্দাবন ফেরেনি। কেন? কারণ তার বৃহত্তর কাজ বাকি ছিল। সমগ্র যদুবংশকে একত্রিত করা। যদুবংশের অভিশাপকে খণ্ডিত করে বংশ চালনা করা, এবং বংশের সমস্ত অপভ্রষ্ট আত্মীয়দের শেষ করে বংশের বিশুদ্ধতা বজায় রাখা। মহাভারতের শেষে, কৃষ্ণ প্রায় মৃত্যুমুখে, অর্জুন সহ সকলের শক্তি নিয়ে নেয়। এমনকি যত মায়াবী ও দৈব অস্ত্র ও বস্তু ছিল প্রত্যেকটা খুঁজে খুঁজে নিজের কাছে নিয়ে কোথায় যেন লুকিয়ে রাখে। কেন? কারণ কলিযুগে আমাদের গুলি বন্দুকই যথেষ্ট। ওসব ব্রহ্মাস্ত্র পেলে এতদিনে মানুষ লুপ্ত হয়ে যেত। গোটা মহাভারতটা পড়ে দেখুন। দেখবেন ঠিক জায়গায় ঠিক সময়ে উপস্থিত হয়ে কৃষ্ণ সুপটুভাবে রাজনৈতিক কাজ করছে। কেন? নইলে যুদ্ধ হবে কী করে? যুদ্ধ না হলে এত রাজা মরবে কী করে? ধরিত্রীকে বাঁচাতেই তো কৃষ্ণ অবতারের অবতারণ।
দ্বিতীয় প্রকারের প্রেম বলেছিলাম মানুষে মানুষে প্রেম। তার উপপ্রকার প্রথমে ছিল স্বামী স্ত্রীর প্রেম। কৃষ্ণের যতগুলো স্ত্রীই থাকুক না কেন সবাইকে সে সমান ভাবে মর্যাদা ও সময় দিত। এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে। নারঘুনির মনে একবার সন্দেহ হয় যে এই যে এত এত কৃষ্ণের স্ত্রী, তাদের সবাইকে কৃষ্ণ খুশি রাখে কী করে? নারদ তাই লুকিয়ে লুকিয়ে কৃষ্ণের স্ত্রীদের প্রত্যেকের মহলের ভিতরে উঁকি দিয়ে দিয়ে দেখে। ষোলোহাজার স্ত্রীর প্রত্যেকের বাড়িতে দশ সেকেন্ড করে উঁকি দিলেও চুয়াল্লিশ ঘণ্টা সময় লাগে। নারদ হয়তো চার-পাঁচদিন ধরে টানা দেখেছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সবার ঘরেই নারদ কৃষ্ণকে দেখতে পায়। কোথাও গল্প করছে, কোথাও ঘুমাচ্ছে, কোথাও বউয়ের সাথে খুনসুটি করছে, কোথাও পাশা খেলছে, কোথাও পদসেবা নিচ্ছে, কোথাও সন্তান নিয়ে খেলা করছে। অর্থাৎ কৃষ্ণ সবার সাথেই আছে, সবাইকে সমানভাবে ভালোবাসা ভাগ করে দিচ্ছে। সেই যে রাসলীলায় হয়েছিল, কৃষ্ণ সবার সাথেই নৃত্য করেছিল, প্রত্যেক গোপিনী দেখেছিল কৃষ্ণ তার সাথেই নৃত্য করছে, সেইরকম ব্যাপার। এটা মায়া বলুন, ম্যাজিক বলুন, হ্যালুসিনেশন বলুন… কীভাবে কৃষ্ণ করেছিল সে জানি না। কিন্তু তার স্ত্রীদের প্রতি প্রেমে কোনো বাদ রাখেনি।
দ্বিতীয় উপপ্রকার প্রেম ছিল সখ্যতা। কৃষ্ণের এই সখ্যতার প্রেম আমরা দেখতে পাই অর্জুনের সাথে, দ্রৌপদীর সাথে, সুদামার সাথে, সাত্যকির সাথে এবং আরও কিছু কিছু বিশিষ্টজনের সাথে। এখানে শুধুই সখা। বন্ধুত্ব। শর্ত ছাড়াই। যদিও দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময়ে কৃষ্ণ বাঁচাতে আসতে পারেনি এবং তাই নিয়ে দ্রৌপদীর কাছে পরে বিস্তর কথাও শুনেছিল।
কিন্তু দ্রৌপদীকে দুর্বাসার দুর্নিবার ক্ষিদে ও অভিশাপের হাত থেকে কৃষ্ণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিল। অর্জুনকে তো যুদ্ধের মাঝে মোটিভেশনাল বক্তৃতা দিয়ে কৃষ্ণই তৈরী করেছিল। নইলে ওরকম ‘বিরস বদন নিরস উদ্যম’ নিয়ে যুদ্ধ করতে গেলে প্রথম দিনেই কৌরব পক্ষের তির খেয়ে অর্জুনের শরশয্যা হয়ে যেত। থাকত তখন ভীষ্মের পাশে শুয়ে। তবে কৃষ্ণের সখ্যপ্রেমের সবথেকে বড় নিদর্শন বোধহয় সুদামার গল্প। এই গল্প আপনারা সবাই জানেন। গরিব সুদামাকে কৃষ্ণ আপন করে বুকে টেনে নিয়ে পা ধুইয়ে যোগ্য সম্মান দিয়েছিল। এইখানে কৃষ্ণ সেই কাজ করে দেখায় যেটা দ্রুপদ করতে পারেনি। মানছি ছোটবেলার খেলাচ্ছলে কথার উপরে ভিত্তি করে দ্রোণাচার্যের সটান অর্ধেক রাজ্য চেয়ে বসাটা মূর্খামি ছিল, কিন্তু দ্রুপদ একটু ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে পারত। দ্রোণকে বলতে পারত, “ভাই আমার হেল্প কর, একটা অন্য রাজ্য যুদ্ধ করে জিতে নিই, তারপরে সেটা তুই নিয়ে নিস…”। তাহলেই ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু দ্রোণকে ওই দুচ্ছাই করে তাড়িয়ে দেওয়াটাই কাল হল।
দ্বিতীয় প্রকারের তৃতীয় চতুর্থ উপপ্রকার ছিল সখ্যতার সাথে শারীরিক প্রেম। এইখানে আসে রাধার কথা, যদি আপনারা সরস্বতী ঠাকুরের জন্মের গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। আর যদি না মনে করেন তাহলে আগের দুটো প্রকারের মধ্যে রেখে দিতে পারেন। অর্থাৎ শুধু সখ্যতার প্রেম অথবা মায়া জড়ানো আকুলতার প্রেম।
এইবারে সবথেকে ভাইটাল প্রশ্ন আসে, রাধা কে ছিল?
বেদব্যাস মহাভারতে একেবারেই রাধার কথা লিখে যাননি। সেখানে রাধা নামটা শুধুমাত্র কর্ণের মায়ের নামের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি হরিবংশেও নেই।
কিন্তু রাধার নাম আছে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে লেখা নারদ পঞ্চরাত্রে রাধার বহু নামে স্তুতি রয়েছে। সেখানে রাধা অর্থে কৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ ভক্ত। এরকম কৃষ্ণের ভক্ত হিসেবে অথবা ভগবান রূপে কৃষ্ণের সাথে রাধার উপস্থিতি আমরা পদ্ম পুরাণ, দেবীভগবত পুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, মৎস্য পুরাণ, লিঙ্গ পুরাণ, বরাহ পুরাণ, নারদ পুরাণ, স্কন্দ পুরাণ ও শিব পুরাণে পাই। পরবর্তীকালে দ্বাদশ শতাব্দীতে হঠাৎ করে নিম্বার্কাচার্য এই প্রস্তাব আনেন যে রাধা গোপিনীদের লিডার ছিল, এবং কৃষ্ণের সাথে রাধারই প্রেম ছিল। সেই প্রস্তাবকে আরও দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেন জয়দেব তার গীতগোবিন্দ রচনায়। তিনি বঙ্গদেশীয় ছিলেন, এবং রসগোল্লার সত্ত্বের মতন উড়িষ্যার লোকেরা জয়দেবকেও নিজেদের বলে দাবি করেন।
গীতগোবিন্দম্ প্রথমবারের জন্য কৃষ্ণ ও রাধার প্রেম, এবং প্রেমের ভক্তি বা ভক্তির প্রেম, এই খুঁটিকে শক্ত ভাবে বসিয়ে দেয়। আপনি যদি গীতগোবিন্দ পড়ে থাকেন এবং যদি ‘স্মরগরল খণ্ডনম্, মম শিরসি মণ্ডনম্, দেহি পদপল্লব মুদারম্’, এই লাইনের বাইরেও পড়ে থাকেন, তাহলে জানবেন যে গীতগোবিন্দ শুধু রাধার মাথায় কৃষ্ণের গরলনাশকারী পদ রাখাটাই গীতগোবিন্দের মূল বক্তব্য নয়। যদিও বৈষ্ণব সম্প্রদায় এটাকেই শ্রেষ্ঠ শ্লোক বলেন, এবং আঁতেল বক্তার বক্তৃতা থেকে সিনেমা সিরিয়ালে পর্যন্ত এই একটাই লাইন যেখানে সেখানে গুঁজে প্রেম ভাবনা দেখানো হয়। এমনকি সত্যন্বেষী ব্যোমকেশের একটি সিনেমায় দেখি ব্যোমকেশ ও সত্যবতী এই লাইন নিয়ে প্রেম করছে। হা ঈশ্বর… ফিনাইল দিয়ে চোখ ধুলেও এ জিনিস অদেখা করা যায় না। এই প্ৰেমিক ব্যোমকেশের রচয়িতাকে কেউ ব্যোমকেশ সমগ্র আর গীতগোবিন্দ একসাথে বেঁধে ছুড়ে মারো।
আমি গীতগোবিন্দ থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করব, যা তিনটে বিষয় প্রমাণ করবে। প্রথম বিষয়, কৃষ্ণের কাছে সমস্ত গোপিনীদের থেকে রাধাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া। দ্বিতীয় বিষয় হল, এই উপরে আমি যত বকবক করলাম তার সিকিমাত্র যদি আপনার মস্তিষ্কে প্রবেশ না করে থাকে, এবং আপনি এখনও যদি ‘কৃষ্ণ ক্যারেক্টারলেস’ ভাবেন তাহলে এই লাইনগুলো আপনার নোংরা মানসিকতাকে আরও বেশি করে প্রমাণ করবে। আর তৃতীয় বিষয় হল, উপরের সমস্ত যুক্তিগুলো পড়ে যদি বুঝে থাকেন (আমি ভক্ত হয়ে আকুল হতে বলছি না, লজিক দিয়ে যদি বুঝে থাকেন সেটাই বলছি, কারণ আমার বিশ্বাস উপরে কোথাও আমি ভগবানের নামে কোনো বিষয় চালিয়ে দিইনি), তাহলে কৃষ্ণের প্রেমের ব্যাপারটা আরও সুস্পষ্ট হবে।
আমি ইচ্ছে করেই কঠিন কঠিন সংস্কৃত লাইন লিখে মিথ্যে তাক লাগালাম না। তার চেয়ে শ্রী শরৎচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রী নগেন্দ্রনাথ ঘোষ কর্তৃক উনিশ শতকের শেষের দিকে প্রকাশিত গীতগোবিন্দর বাংলা পদ্যানুবাদ থেকে তুলে দিচ্ছি। প্রথম লাইন আসে গীতগোবিন্দের প্রথম সর্গের শেষ পরিচ্ছেদে।
“বেষ্টিত হইয়া যত গোপিকা-নিকরে;
বিহারেন হৃষিকেশ রাসে রস ভরে
হেন কালে রাধারাণী আসিয়া সেথায়;
প্রাণেশে বেষ্টিত দেখি রমণী মালায়
‘সুন্দর আনন তব’—স্তুতি গান ছলে; কহিয়া চুমিলা তাহার বদন কমলে”
পঞ্চম গান বলছে,
“উল্লাসের হাসি-মাখা অরুণ অধর;
গোপ সীমন্তিনী গণে চম্বে নিরন্তর।
আলিঙ্গনে আমোদিনী নিতম্বিনী দল
তিমিরে অঙ্গের মণি করে ঝলমল।”
পরে রাধা মনে মনে বলছে,
“আমারে নিদয় হয়ে, অন্য নারী-গণ লয়ে,
যদিও খেলিছে আজি এই শ্যামরায়,
তবুও এ পোড়া মন, চিন্তা করে অনুক্ষণ,
গুণ তাঁর, দোষ কিছু ধরিতে না চায়।”
এটাই ভক্তিপ্রেম, যেটা জয়দেব লেখার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন। কিছুক্ষণের জন্য রাধার ঐতিহাসিক উপস্থিতি ভুলে যান। রাধা এখন কৃষ্ণের প্রেমিকা। সে এখানে অন্তরে অন্তরে হিংসেয় জ্বলে যাচ্ছে। তবুও সে কৃষ্ণের দোষ দেখছে না, উলটে সবাই যে তাকে ভালোবাসছে, চুমু খাচ্ছে এটা তার গুণ হিসেবেই মানছে। গীতগোবিন্দ পুরোটাই প্রায় রাধার অভিমান, এবং কৃষ্ণের দ্বারা রাধার মানভঞ্জন এবং দুজনের মধ্যে খুনসুটি এবং ফের সেই প্রেমের প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে লেখা।
তৃতীয় সর্গ বলছে,
“অনুরাগ ভরে হরি করেন বিচার,
রাধার প্রণয় মাত্র প্রণয়ের সার,
প্রেমাধার-রূপা সেই রাধিকারে মনে,
চিন্তিয়া ত্যজেন তিনি অন্য গোপী গণে
মদনে তাড়নে অতি হইয়া কাতর,
প্রিয়া লাগি অনুতাপ করিয়া বিস্তর”
এরকমভাবে তাদের মান-অভিমান চলে। অদ্ভুতভাবে এই ভাব, এই রাগ সবই আমরা এক বহুল প্রচলিত গানে শুনেছি। আপনি এই লাইনগুলো না জানলেও আপনি এর সারাংশ জানেন। সেই গানের মাধ্যমে। সেই গান এক মুসলমান লিপিকার রচনা করেছেন, আরেক মুসলমান গীতিকার সুর দিয়েছেন এবং এক তৃতীয় মুসলমান অভিনেতা তার চিত্রায়িত রূপে নৃত্য করেছেন। কোন গান? ‘লগান’ সিনেমায় ‘মধুবন মে যো কানহাইয়া কিসি গোপী সে মিলে…’। পুরো গানটা শুনুন, তারপর গীতগোবিন্দ পড়ুন, অবাক হয়ে যাবেন। কি অদ্ভুত না? এটাই আমাদের শাশ্বত ভারতবর্ষ, যেখানে রাধাকৃষ্ণের প্রেম জাতি-ধর্ম-বর্ণ সব পেরিয়ে গিয়ে মানুষের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এই রাধার সাথে প্ৰেমভাবটা যদি আপনার নোংরামি মনে হয়, যদি মুখ টিপে হাসতে বাধ্য করে তাহলে দয়া করে একবার ভাবুন, এই প্রেমটা করছে একটা দশ বছরের ছেলে আর পনেরো বছরের মেয়ে। এখনকার মতো অকালপশ্চাদপক্ক সবজান্তা বাচ্চাদের কথা বলছি না। বেশি না, ধরুন ওই আশির দশকে আমরা যারা দশ বছরের আশেপাশে ছিলাম তাদের কথাই ভাবুন। দশ থেকে পনেরো বছর পর্যন্ত আমাদের জীবনে পড়াশোনা, খেলা, কার্টুন, খাওয়া (খাবার এবং মার দুটোই নিত্যদিনের অঙ্গ ছিল) আর ঘুম ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কৃষ্ণ আর রাধাকে তাদের মতোই মনে করুন। হ্যাঁ মানছি জয়দেব কিছু কিছু জায়গায় একটু পিছলে গেছেন এবং কালিদাসের ‘মেঘদূতের’ মেঘের মতো বার্তা পৌঁছনোর বদলে রমণীদের শারীরিক বর্ণনা করে ফেলেছেন, কিন্তু সেটাও কদর্য নয়।
তাহলে কৃষ্ণ যে সবরকম প্রেম ও সবরকম প্রেমিক হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে সে কথায় আর কোনো সন্দেহ নেই। হ্যাঁ কিন্তু বহু প্রশ্ন আসে মনে যেগুলোর সঠিক উত্তর পাওয়া যায় না। যেমন কৃষ্ণ রাধাকে চিরকালের জন্য ছেড়ে এল কেন? বহু আশ্রম ও বহু পুরাণ বহুভাবে এর উত্তর দিতে চাইলেও সঠিক ব্যাখা পাওয়া যায় না। রাধা নাকি বিবাহিতা ছিল, কোত্থেকে জটিল-কুটিলা ও চলে এল। তার সাথে আরও আরও আরও গল্প যোগ হল। সেখানে কৃষ্ণ হামাগুড়ি অবস্থায় দেওয়াল টপকে রাধার সাথে দেখা করতে এল, কখনও বা রাধা আর কৃষ্ণ ময়ূরের মতন নৃত্য করল, কখনও বা কৃষ্ণ জটিলা-কুটিলাকে শিক্ষা দিতে তাদের ঠকিয়ে রাধার স্বামীর রূপে ছদ্মবেশ ধরে এল। এরকম বহু বহু গল্প শুনেছি। কে যেন বলে দিল, রাধার স্বামী নপুংসক ছিল। আরও এক কাঠি গিয়ে আমাদের গ্রামে শুনলাম রাধার স্বামী বৃহন্নলা ছিল। এক অত্যন্ত উন্মাদ্রমণোদ্রেকারীসমুদ্রজল্লব্ধগঞ্জিকাসেবনপ্রভাবিত সিরিয়ালে দেখা যায় রাধা সবকিছুর মূলে। সেখানে রাধা দ্বারকায় আছে, এবং রুক্মিণী, শাম্ব, জাম্ববতী সবাই ভিলেন। রোজ রাধাকে হেনস্থা করার উপায় খুঁজছে। বোঝো কাণ্ড। এগুলো কি মানা যায়? এসবের সোর্স খুঁজতে গিয়ে পাগল হই আর কী!
সত্যি বলতে এগুলোর সত্য-মিথ্যা বা সবসময় ‘এটা কোথায় লেখা আছে?’ জানা হয় না। জয়দেবের পরে গুচ্ছ গুচ্ছ কৃষ্ণপ্রেমিক সন্ন্যাসী-কবিগায়ক-লেখক এসে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমটাকে ভক্তিপ্রেম থেকে একেবারে দৈবপ্রেমে উত্থিত করে ফেলল। এই ভক্তিপ্রেম থেকে যে শিক্ষণীয় ব্যাপারটা আছে, সেটা রইল তলায়, কোথা থেকে রাধাকে একেবারে অবতার বানিয়ে, দেবী বানিয়ে শেষমেশ তাকে কৃষ্ণের ‘হ্লাদিনী শক্তি’ বলে প্রতিষ্ঠা করা হল। হয়তো বা সত্যি, হয়তো বা শুধুমাত্র সনাতন ধর্মের অন্য সমস্ত মতামতকে চেপে রেখে বৈষ্ণবকেই মান্যতা দেওয়ার জন্যই রাধার সাথে কৃষ্ণের এত নাম প্রচার। মনে রাখবেন বঙ্গদেশ চিরকাল মাতৃ উপাসক। সেই পক্ষিমাতৃকা থেকে এখন দশভূজা দুর্গামাতৃকাই হোক, আমরা অনেকটা শক্তিপুজোর দিকেই ঘেঁষা। সেইখানে বৈষ্ণব ধর্মের এত প্রচার ও ভক্ত কিন্তু একদিনে, এক দশকে এমনকি এক শতকে হয়নি। বহু শতকের ফল এটি। সেটা ভালো না খারাপ, উচিত না অনুচিত সেসব বিচার করা আমার কাজ নয়, আমার আলোচনা বা জ্ঞানের মধ্যেও পড়ে না।
আমি শুধু ‘কৃষ্ণ’ ও ‘প্রেম’ এই দুটো শব্দকে এক জায়গায় করার চেষ্টা করছিলাম। আর বাকি রইল কৃষ্ণের সাথে গোপিনীদের বা রাধার গল্প? তার কিছু আপনারা ‘ফাজিলের মহাভারতে’ পেয়ে যাবেন আর বাকিগুলো সবই তো লেখা আছে। লাখ-লাখ বইয়ে, লাখ লাখ কাব্যে, লাখ লাখ গানে, কীর্তনে, সিনেমায়, সিরিয়ালে। এবার আপনার ব্যাপার আপনি কীভাবে দেখবেন? আমার মাসির মতন নাক সিঁটকে সব ভণ্ডামি বলে উড়িয়ে দেবেন, নাকি সেই ঠাকুমার মতো দুঃখ পাবেন, নাকি সবকিছুই আসলে এক বিরাট বিশ্বজনীন প্রেমের ভাব বলে মান্যতা দেবেন সেটা আপনার ব্যাপার। যা-ই করুন না কেন, দয়া করে ঘরে রাধাকৃষ্ণের পুজো করে ঘরের ছেলেমেয়েকে প্রেম করতে বাধা দেবেন না। অবশ্যই বাধা দেবেন, যদি আপনার মনে হয় সে ছেলেটি বা মেয়েটি আপনার সন্তানের যোগ্য নয়। ছেলেটি বা মেয়েটি লম্পট, চরিত্রহীন, মারকুটে হলে অবশ্যই বাধা দিন। সেটা আপনার কর্তব্য। এমনকি নিজের সন্তান সেরকম কুলাঙ্গার হলে, অন্যের সন্তানকে বাঁচান। আপনার সন্তান সেই ছোটবেলায় যেমন আপনার ভরসাতে খাট থেকে ঝাঁপ মারত, এখনও সেইরকম ভরসাতেই ছেলেটা বা মেয়েটাকে পছন্দ করা শুরু করেছে হয়তো। গার্জেন হিসেবে আপনি গর্জন করে ব্যাপারটা মেটাবেন নাকি বুদ্ধির দ্বারা মেটাবেন নাকি আলোচনা করবেন, সেটা আপনারাই ভালো জানেন। শুধু একবার মাত্র পরীক্ষা করে নিন, খোঁজখবর নিন। কিন্তু শুধুমাত্র ‘প্রেম করা খারাপ’ আর ‘লোকে কী বলবে’ এই ভাবনা থাকলে দয়া করে বাড়ির সমস্ত রাধা কৃষ্ণের মূর্তি বা ছবি সত্ত্বর আপনার নিকটবর্তী মন্দিরে দান করে আসুন।
