বলরামের কাণ্ড ও কালযবন

বলরামের কাণ্ড ও কালযবন

আঠেরোবার জরাসন্ধকে হারিয়ে আর কথায় কথায় যুদ্ধ করে কৃষ্ণ-বলরাম বোর হয়ে গেছিল। একই লোকগুলোর সাথে কতবার আর যুদ্ধ করা যায়? একটু দক্ষিণ ভারতে ট্যুরে গেল দুজনে, সেখানেও ঘুরে ঘুরে পিছন পিছন চলে এসেছে। ভালো লাগে? এটা শত্রুপক্ষ না প্রেমে আঘাত খাওয়া পুরোনো প্রেমিক ? পিছু ছাড়েই না! এত সৈন্য-সামন্ত নিয়ে কৃষ্ণ-বলরামের পিছনে আঠেরোবার না দৌড়ে যদি অন্য জায়গা জয় করতে শুরু করত তাহলে এই গোমন্তকের ঘটনা হতে হতে জরাসন্ধ হয়তো চিন, রাশিয়া আর ইওরোপের দেশগুলোও জয় করতে পারত। কুড়ি অক্ষৌহিণী সেনাকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে একশো অক্ষৌহিণী করতে পারত। কিন্তু মাথা এতই মোটা ছিল যে, যে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়েছে সেই দেওয়ালেই বারবার মাথা ঠুকতে গেছে। আজব লোক।

এদিকে মথুরায় ফিরে বলরাম বলল, “বড় গা ম্যাজ ম্যাজ করছে, যাই, কদিন বৃন্দাবনে ঘুরে আসি…”

কৃষ্ণ বলল, “হ্যাঁ যাও না, কে বারণ করেছে? এদিকে কিছু হলে আমি সামলে নেব…”

বলরাম স্যুটকেস গুছিয়ে (গুছানোর দরকার হয়নি, সবে তো গোমন্তক পর্বত থেকে ফিরেছে, লাগেজ খোলার দরকার কী?) বৃন্দাবনের দিকে চলল। বেশি তো নয়, ওই পঁচিশ কিলোমিটার রাস্তা। দুটো লাফ মেরেই পৌঁছে যেত বোধহয়। বৃন্দাবনে পৌঁছতেই গোপিনীদের সাথে দেখা হয়। বলরাম যেমন বড় হয়ে গেছে, গোপিনীরাও নিশ্চয়ই ততদিনে মধ্যবয়স্কা কাকিমা সকল হয়ে গেছিল। বলরামকে দেখেই সবার কত প্রশ্ন, “কী রে কেমন আছিস?” “বিয়ে করেছিস?” “কেষ্ট ভালো আছে?” “ওখানে গিয়ে তো আমাদের ভুলেই গেছিস?” “আমার ছেলে জানিস তো কুরুরাজসভায় অ্যাকাউন্টস্-এ চাকরি পেয়েছে? তুই কী করছিস আজকাল?” “ওমা, তোর মা যে বলল তোরা নাকি কংসকে সরিয়ে রাজা হয়েছিস? রাজা হোসনি?”

না, গোপিনীরা এসব বলেনি। এগুলো আমাদের পাড়ার কাকিমাগুলো নিজের ছেলের সমবয়সি পাড়ার পুরোনো বাসিন্দা কাউকে দেখেই এরকম প্রশ্নগুলো করেন, যাতে নিজের ছেলের উন্নতিটাকে (বা অবনতিটাকে) সেই ভিজিটিং ছেলেটার জীবনের সাথে মাপতে পারেন। যদি নিজের ছেলে সিকিভাগও একটু বেশি উন্নতি করে ফেলেছে তাহলে সেটা ফলাও করে দেখাবে। ঘুরতে আসা ছেলেটাকে হুল ফোটানো মিষ্টি কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেবে যে, দেখ কী করলি তুই? আর যদি কোনোক্রমে ঘুরতে আসা ছেলেটা বেশি উন্নতি করে ফেলেছে, তাহলে ওখানেই আলোচনা শেষ। হঠাৎ কিছু কাজ মনে পড়ে যাবে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই টেনশন নেই, যদি না পুরোনো পাড়ায় ঘুরতে আসা মেয়েটা তার দামি স্বামীকে নিয়ে না আসে। তখন কাকিমারা নিজের জামাইয়ের সাথে সেই ঘুরন্ত মেয়ের স্বামীকে তুল্যমূল্য শুরু করবে। খারাপ শুনতে লাগলেও এটাই সত্যি যে একটা মেয়ে নিজের জীবনে জীবিকা বা অন্য কোনোভাবে যতই উন্নতি করুক, আজকের দিনেও পাড়ার কাকিমারা নিজেদের মেয়েকে বলবে না “দেখ ও কেমন উন্নতি করছে, তুই চেষ্টা করছিস না কেন?”। এটা একচেটিয়া ছেলেদের জগৎ হয়ে রয়েছে। আত্মীয়দের মধ্যে সেরা ছেলেটি বা পাড়ার মধ্যে সেরা ছেলেটিকে দেখিয়ে সবসময় ঘরের অন্য ছেলেদের শুনতেই হবে “ওর মত হতে হবে তোকে…”। এবং অতি অবশ্যই এই ধারা একমাত্র পড়াশোনায়, বাকি কোনোকিছুতে সেরা হলে সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয় না।

কৃষ্ণ-বলরামের সময় মানুষের এত সময় ছিল না অন্যের ব্যাপারে জানার এবং এত পরশ্রীকাতরতাও ছিল না। পরস্ত্রীকাতরতা ছিল, মানে পরস্ত্রীয়ের জন্য কাতরাচ্ছে লোকজন, এরকম অনেকবার দেখা গেছে মহাভারতে, কিন্তু পরশ্রীকাতরতা ওই দ্রোণাচার্য, দুর্যোধন ও কর্ণের মধ্যেই দেখা গেছিল। তাই বলরাম যখন বৃন্দাবনে পৌঁছল সকলেই ওকে ওয়েলকাম করে নানাবিধ খবরাখবর আদান-প্রদান করল। পুরাণকার এখানে বলরামের সাথে তার মা বা যশোদার সাথে দেখা হওয়া, এসব ইত্যাদি কথা একেবারে লম্ফ দিয়ে পেরিয়ে গেছেন।

কেন? এখানে কেনর সাথে আরেকটা বহু পুরোনো প্রশ্ন আসে। কৃষ্ণ যে সেই কংসকে মারতে বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরা গেল তারপরে কি আর বৃন্দাবনে এসেছিল? এখানে প্রচলিত কাহিনি বলে কৃষ্ণ আর কোনোদিনই বৃন্দাবন ফিরে আসেনি, আর যশোদার সাথে দেখাও করেনি। কারণ? কারণ নিয়ে বড় ধোঁয়াশা। জোর গলায় যারা বলে কৃষ্ণ বৃন্দাবনে ফিরে আসেনি, তাদের গলার জোর আর শোনা যায় না কারণ জিজ্ঞেস করলে। দু-একটা উড়ো গল্প পাওয়া যায়। রাধাকে নাকি শ্রীদাম অভিশাপ দিয়েছিল একশো বছর কৃষ্ণের সাথে দেখা হবে না। শ্রীদামের কথার কী দাম বাপ রে! কিন্তু যদি মেনেও নিই এই কাহিনি সত্য তাহলে রাধা আর বৃন্দাবন তো এক নয়? রাধার সাথে দেখা হওয়ার সম্ভব ছিল না, কিন্তু যশোদার সাথে দেখা করায় বাধা কোথায়? অদ্ভুত লজিক। আরও এরকম কয়েকটা কানাঘুষো গল্প ছাড়া কোনো শক্ত প্রমাণ নেই যে কৃষ্ণ বৃন্দাবনে যেত না।

আমার ধারণা যে, কৃষ্ণ দিব্যি বৃন্দাবনে যেত। এবং তার প্রমাণও দিতে পারি। প্রথম প্রমাণ হল গর্গ সংহিতা, উনিশতম চ্যাপ্টারে পাঁচ নম্বর ক্যান্টো। স্পষ্ট সেখানে বলছে কংসকে মারার পরে কৃষ্ণ নিজের প্রতিজ্ঞা মনে রেখে বৃন্দাবনে ফিরে গিয়ে সবার সাথে দেখা করে এসেছিল। বিংশতম চ্যাপ্টারে রাধার সাথে কৃষ্ণের দেখা করার কথাও লেখা আছে। আচ্ছা ঠিক আছে, মেনে নিলাম গর্গ সংহিতা অতটা জনপ্রিয় নয়। তাহলে একবার ভাগবত পুরাণ খুলে দেখুন। ১.১১.৯ এ লেখা আছে—

यर्ह्यम्बुजाक्षापससार भो भवान्

कुरून् मधून् वाथ सुहृद्दिदृक्षया।

तत्राब्दकोटिप्रतिमः क्षणो भवेद्

रविं विनाक्ष्णोरिव नस्तवाच्युत॥

যার অর্থ করতে গিয়ে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর লিখেছেন যে দ্বারকাবাসীরা বলছে কৃষ্ণকে যে “যখন তুমি হস্তিনাপুর বা ব্রজ (বৃন্দাবনে) যাও তখন এক এক মুহূর্ত যেন কোটি কোটি বছর মনে হয়।”

আবার পদ্মপুরাণে চলে যান। সেখানে ৬.২৫২.১৯-২৮ এ লেখা আছে যে শাল্ব আর দন্তবক্রকে মেরে কৃষ্ণ বৃন্দাবন ঘুরে এসেছিল। শাল্বকে যখন মেরেছিল তখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ চলছিল। কারণ দ্রৌপদী যখন কৃষ্ণকে কথা শোনায় যে আমার বস্ত্রহরণের সময় তুমি আসোনি, তখন কৃষ্ণ জানায় যে আমি তখন শাল্বকে পেটাতে ব্যস্ত ছিলাম।

সুতরাং এতদ্বারা এই প্রমাণিত হল যে কৃষ্ণের দিব্যি বৃন্দাবনে যাতায়াত ছিল। এবং আমার মনে হয় যেহেতু এরপরে বৃন্দাবনে গিয়ে কৃষ্ণ সেরকম কিছু আর কীর্তি করেনি, তাই শুধু গিয়ে ‘হাই-হ্যালো’ বলে থেকে আসাটা পুরাণকার লেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। কর্মসূত্রে আপনি একটা শহরে থাকেন, আর ছুটিছাটাতে বাড়িতে যান। সেটা কি আপনার জীবনী লেখার সময় কখনও লেখা হবে? তার মানে কি এই যে আপনি কর্মের জায়গাতেই সারাজীবন থেকে গেলেন, আর আপনার বাড়িতে কারোর সাথেই দেখা হল না। কৃষ্ণর বৃন্দাবন ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারটা আমার মনে শুধুমাত্র একটু রহস্যের মধ্যে রাখার কারণেই প্রচার করা হয়েছিল। লজিকে ব্যাপারটা আসে না।

যা-ই হোক আমরা বলরামের প্রসঙ্গে ছিলাম। বলরাম সবার সাথে দেখা টেখা করে, সময় বুঝে টুক করে মদিরার বোতল নিয়ে খেতে খেতে বৃন্দাবনের বনে-বাদাড়ে ঘুরতে লাগল। আগেই বলেছি বলরাম পাঁড়-মাতাল ছিল। মাতালকে যতই সুন্দর বাহারি শব্দ দিয়ে বিবরণ দেওয়া হোক, এবং অবতারের লীলা বলে দেখানো হোক, গল্পের শেষে সে একজন মাতালই, এবং মাতালকে মাতালই বলব। মাতাল তিন প্রকার হয়। প্রথম প্রকার চুপচাপ মদ খায়, তারপরে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। অথবা ফাঁকায় বসে ঝিমোয়। এই প্রকারের মাতাল পার্টি বা ক্লাবের কোণায় কোণায় দেখতে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় প্রকার মাতালের শরীরের সব জল শুষ্ক হয়ে যাওয়ায় সে শুধু খালি জল খুঁজে বেড়ায়। এই প্রকার মাতালদের আপনি কলতলায় নয়তো নালার মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে দেখবেন। তৃতীয় প্রকার মাতালরা অল্প খেয়েই চেঁচামেচি শুরু করে। বোধহয় চেঁচামেচি করবে বলেই খায়। এদের একটা বিশেষ ডায়লগ হয়, “কারোর বাপের পয়সায় খাই না, নিজের পয়সায় খাই…”, এবং তারপরেই অ্যাকশনে নেমে পড়ে। একে মারবে, ওকে পিটবে, শক্তিমানের মতো পাঁই পাঁই ঘুরবে, নিজেরা মার খাবে, নয়তো জেনরেটরের শব্দে ডিস্কো নাচবে তারপরে সকালে সব ভুলে যাবে।

বলরাম এই দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রকারের মিশ্রিত মদ্যপ ছিল। খেয়াল করে দেখবেন বলরামের মদ্যপ অবস্থায় যতবারই গল্প আছে, সেগুলো জলাশয়ের কাছে ঘটছে, অথবা কেউ একটা মার খাচ্ছে। এবারেও বৃন্দাবনে গিয়ে মদ খেয়ে যমুনার নদীর পাশে গিয়ে বলল, “এই যে যমুনা… হিক… আমি তোমায় বিয়ে করতে চাই… হিক… তোমার মধ্যে স্নান করে… তুমি উঠে এসো…”

যমুনা নদী বয়ে চলেছে। বলরাম গান ধরল, “এই যে নদী… হিক… যায় সাগরে, কত কথা, শুধাই তারে… হিক… এত ডাকি তবু নদী বিয়ে করে না… হিক… বিয়ে করে না… কেন করে না?”

তাও যমুনা নদীর মানুষ রূপ নেওয়ার কোনো হেলদোল নেই। এর আগে শেষবার যখন একটা নদী মানুষ রূপ ধরেছিল, তখন সেটা কুরু বংশের রাজাকে বিয়ে করার জন্য। আর এবার তো বলরাম একেবারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। বোঝো ঠ্যালা। যমুনাকে মহিলারূপে উঠতে না দেখে বলরাম খচে গেল। কাঁধে লাঙল নিয়েই ঘুরত। এবার লাঙল দিয়ে যমুনা থেকে একটা খাল কেটে ফেলল। সে যে সে খাল নয়, একেবারে অববাহিকা মার্কা খাল, একদম বৃন্দাবনের জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে। বৃন্দা (তুলসী) মিশে গেল নদীর জলে। পুরো বৃন্দা ফ্লেভারড্ যমুনার জল। এখান থেকেই বোধহয় ধোয়া তুলসীপাতা কথাটা এসেছে। পেট ঠান্ডা শরীর চাঙ্গা। গোপিনীদের সুবিধে হল। দূরে যমুনায় না গিয়ে বাড়ির পাশেই কর্পোরেশনের কল বসার মতন নদী চলে এল। সে খাল এতই বড় খাল যে খাল কেটে কুমির, মাছ সব বৃন্দাবনের জঙ্গলের ভিতরে ভরে গেল। নদীর জল দক্ষিণ দিকে বইতে বইতে ঝট করে রুট বদলে উত্তরের দিকে খালের ধারায় চলে যেতে লাগল। এককথায় একে অপহরণ বলা যায়। অপ মানে জল, অপ-হরণ অর্থে জলচুরি। অনেক গ্রাম ও পশুদের বঞ্চিত করে জল চুরি করে বৃন্দাবনের লোকের সুবিধার্থে আনয়নকে জল চুরি বা অপহরণ বলাই যায়।

এবার যমুনা নারীরূপে উঠে এসে হাঁউমাউ করে বলল, “ও বলরামদা, তোমায় না আমি দাদার মতন দেখি। এবারের মতন আমায় ক্ষমা করে দাও।”

মাতাল অবস্থায় মানুষ প্রচণ্ড ইমোশনাল হয়ে যায়, যমুনা এসে তার উপর কান্নাকাটি করছে। আহা রে। তার উপর বোন পাতাচ্ছে। বলরাম বলল, “তাহলে এই বৃন্দাবনের মধ্যে দিয়েই যাও তুমি। একেবারে সার্টিফায়েড তীর্থক্ষেত্র হয়ে যাক।”

সেই যমুনার এখন পচা খালের সমান দশা হয়েছে দিল্লি আর আগ্রাতে। জায়গায় জায়গায় প্রায় হাপিশ হয়ে গেছে, আর বৃন্দাবনে যেটা আছে সেটা অনেক অন্য ধারার জল এসে মিশেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল বলরামের মদ্যপ অবস্থায় এই কাজ একরকমের নারীনিগ্রহই বলা যায়। নদীমাতৃকা দেশে নদীকে কেটে কেটে খাল, বাঁধ বানানো মানুষের প্রয়োজনের জন্য। কিন্তু নদীকে যদি নারীর রূপ দিয়ে দেওয়া হয়, এবং বলরাম তাকে বলপূর্বক বিয়ে করতে চায়, এবং বলদ ধুতে বৃন্দাবনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যায়, সেখানে কি দেবী হিসেবে, একজন নারী হিসেবে যমুনার অপমান হল না? আর বলরাম অবতার বলে ঘটনাটা “আহা কি লীলা, তুমি কি করিলা?” করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এই কাজ, এই যমুনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া এবং রাজি না হওয়ায় খালকাটা যদি কোনো রাক্ষস, অসুর, দৈত্য করত তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে একটা ‘পাপী’ ‘দুরাচারী’ সিলমোহর লাগিয়ে দেওয়া হত। তখন তাকে বদ আখ্যা দিয়ে বধ করিয়ে দেওয়া হত কারোর হাতে। আর যদি সেরকম নেপোটিজমের জোর ছাড়া ব্রাহ্মণ, ঋষি, মুনি, রাজা-গজা কেউ এই কাজ করত তাহলে সঙ্গে সঙ্গে পুরাণকার তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে সেই ব্যক্তির জন্মপঞ্জি বের করে আনতেন, এবং খুঁজতেন ব্যক্তিটির বংশে কোথায় বিশুদ্ধ রক্ত রাক্ষস-অসুরদের সাথে মিশে অশুদ্ধ হয়েছে। যদি ব্যক্তির মাতৃকূলে পায় তাহলে তো পুরাণকারের পোয়া বারো। আর যদি পিতার দিকে হয় তাহলে সমস্যা। দুটো ক্ষেত্রেই ব্যক্তির আগের সাতজন্মের পাপ ঘেঁটে ঘোল বানিয়ে কোনো একটা যুক্তিতে তাকে পাপী ঠাউরাবেই। নয়তো ব্যাকআপ হিসেবে গতজন্ম তো আছেই। কিন্তু বলরাম শেষনাগের অবতার, তার জন্য এসব করলে হয় নাকি? যা করেছে বেশ করেছে।

বলরাম শুধু এই একবারই খাল কেটে নদীর ধারা পালটে দিয়েছে তা নয় কিন্তু। আরেকবারও এই কাণ্ড করেছিল। ভদ্রলোক বোধহয় ড্যাম ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। যেখানে সেখানে মেজাজ গরম হলেই “ড্যাম ইট” বলে ড্যাম মানে বাঁধ করে ফেলতেন। তার আগে খাল কাটা তো দরকার। তাই খালও কাটতেন।

একবার কি হয়েছিল, কৃষ্ণ আর জাম্ববতীর অকালকুষ্মাণ্ড ছেলে শাম্ব (এটার জন্যই বংশটা শেষ হয়েছে, কৃষ্ণের ছেলেপুলের গল্প বলার সময় এর কীর্তি বলব), দুর্যোধনের মেয়ে লক্ষ্মণাকে নিয়ে পালিয়েছে। সেলিব্রিটি বাবার দুরাচারী ছেলে। ওই যে বললাম, এদের কোনো পাপ দেখা হবে না, এরা ভুল করলেও সেটা লীলা। কিন্তু শাম্ব পালাতে পারে না। একটু দূরে যেতেই তার শ্বশুর দুর্যোধন, লোকলস্কর নিয়ে এসে খপ করে কন্যাতস্কর শাম্বকে ধরে। এমনিই কৃষ্ণের সাথে একটু মনোমালিন্য ছিলই দুর্যোধনের, ওই পাণ্ডবদের প্রতি একচোখামির জন্য, তায় আবার তার ছেলে দুর্যোধনের মেয়েকে অপহরণ করার চেষ্টা করে? শাম্বকে জাম্বোসাইজের কারাগারে বন্দি করে রাখা হল।

এদিকে বলরামের কানে গেছে কথাটা। “এত বড় সাহস?” বলে হুংকার দিয়ে বলরাম হস্তিনাপুরে এসে হাজির। তার ফেভারিট ছাত্র কিনা তার মেয়েকে তার ভাইয়ের ছেলের সাথে বিয়ে দিচ্ছে না? বলরাম হস্তিনাপুরে একটাও হস্তি না পেয়ে বস্তিতে দুর্যোধনের খোঁজে গেল। কিন্তু দুর্যোধনকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না (সম্ভবত শৌচালয়ে গেছিল)। বলরাম আবার হুংকার দিয়ে বলে, “কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না, এই শহর আমি ডুবিয়ে দেব। ইয়াহু…”

কাঁধ থেকে লাঙল বের করে বলে উঠল, “বাই দ্য পাওয়ার অফ সনাতন দেবতাস…”

চারিদিকে বিদ্যুৎ চমকে মেঘের আওয়াজ দ্রুমিত হল। সাথে দেবতাদের কোরাস, “সে পুরুষ… (হি ম্যান)”

“আই হ্যাভ দ্য পাওয়ার…”

“সে পুরুষ…”

বলরাম সেই পাওয়া পাওয়ারান্বিত লাঙল নিয়ে হস্তিনাপুরকে টানতে শুরু করল। আজ্ঞে হ্যাঁ, যে জিনিস শুধু কমিক্স আর কার্টুনে দেখতে পাওয়া যায় তাই হল। বলরাম হস্তিনাপুর শহরকে গোল-গোল করে ঘুরিয়ে গঙ্গার দিকে টানতে লাগল। এবার প্রশ্ন আসে যে একটা শহরকে কী করে টানা যায়? একেবারে মাটি খুঁড়ে চাঙড়ের উপরে ঘর-বাড়ি রাজপ্রাসাদ সব তোলা যায়, কিন্তু সেটা তো লেখা নেই। শুধু লেখা আছে, লাঙল দিয়ে শহর টানছে বলরাম। এ যে সেই মনুমেন্ট ঠেলার গল্প। জানেন না বুঝি? একবার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দুই বন্ধু কলকাতায় ভ্রমণ করতে করতে মনুমেন্ট দেখে ভাবে, ‘এটাকে গ্রামে নিয়ে যাব’। যেমন ভাবা তেমন কাজ, দুজনে মনুমেন্ট ঠেলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরে ঘেমে নেয়ে একশা। তখন দুজনে নিজেদের জামা খুলে পিছনে রেখে দিল। তারপরে আবার ঠেলা মারছে। ইতিমধ্যে এক তস্কর এসে পরিধানদ্বয় চুরি করে হাওয়া। দুই বন্ধু খানিক পরে পিছন ফিরে দেখে জামা নেই। তখন এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলে, “আমরা মনে হয় অনেকদূর চলে এসেছি, আমাদের জামাগুলোও দেখা যাচ্ছে না।”

আমার মনে হয় বলরামের এই ঘটনায় আসলে কেসটা উলটো হয়েছিল। বলরাম আসলে গঙ্গা থেকে একটা বড়সড় খাল কেটে হস্তিনাপুরের দিকে জল নিয়ে আসছিল। সেটা দিয়েও হস্তিনাপুর ভাসিয়ে দেওয়া যেত। একই ফল, পরিপ্রেক্ষিত আলাদা। কিন্তু গল্পে যা বলা আছে আমরা সেরকমভাবেই শুনব। বলরাম মস্তিতে হস্তিনাপুরকে টেনে স্বস্তি পেতে লাগল।

এদিকে দুর্যোধন তখন বেরিয়ে এসেছে। ভূমিকম্প হচ্ছে তো। কবিগুরু সব কিছু নিয়েই তো কবিতা লিখেছেন, আমার মনে হয় পুরাণে এই দৃশ্য কল্পনা করেই তিনি কলকাতার নামে চাপিয়ে লিখেছিলেন, “চেয়ে দেখি ঠোকাঠুকি বরগা কড়িতে; কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে…”

হস্তিনাপুর চলেছে নড়তে নড়তে। দুর্যোধন সঙ্গে সঙ্গে রথে করে শহরের বাইরে এসে বলরামের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলে, “আরে স্যার, আপনি কখন এলেন, জানতেই পারিনি। এহে, বড় খাটনি গেছে আপনার। আমাকে বললে পারতেন শহর আমিই ডুবিয়ে দিতাম। এমনিই বংশ ডোবানোর কন্ট্রাক্ট আমরা একশো ছয় ভাই নিয়েই রেখেছি, একটা শহর ডুবলে কী আর যায় আসে? আসুন আসুন, আমিই হাত লাগাচ্ছি…”

“আমি হস্তিনাপুর ডোবাতে আসিনি,” বলরাম বলে, “আমার ভাইপোর সাথে তোর মেয়ের বিয়ে দিয়ে দে, আর দুজনকেই ছেড়ে দে।”

“ছেড়ে তো দিয়েছি কবেই স্যার, তাই তো লায়েক হয়ে গেছে,” দুর্যোধন বলে, “আজকালকার ছেলেপুলে, বোঝেনই তো। আর শাম্বকে তো আমি একটু পরীক্ষা করছিলাম, ঠিক আছে আমি ছেড়ে দিচ্ছি।”

ধুমধাম ও দুমদাম শব্দে বিবাহ সম্পন্ন হয়। কিন্তু হস্তিনাপুর সেই থেকে গঙ্গার উপরে টাল খেয়ে আছে। আমার ঘোরতরভাবে মনে হয় এই গল্পটা হস্তিনাপুরের নাম দিয়ে লেখা হলেও আসলে ওটা বেহালা ছিল। বেহালাই একমাত্র জায়গা কিনা যেখানে বৃষ্টি না হলেও জল জমে থাকে। বৃষ্টি হলে তো পুরো ওয়াটার পোলো খেলার মতন অবস্থা। জলের উপরে বাড়ির মাথাগুলো দেখা যায়। আপনি যে কোনো বেহালাবাসীকে জিজ্ঞেস করুন, তাদের বাড়ি দোতলা বা তার থেকে বেশি উঁচু হবেই। বৃষ্টি পড়লেই উপরতলায় চলে যেতে হয়। নীচতলায় তো তখন মাছ, কুমির, হাঙর, অটো, বাইক এইসব চলে। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, একদম সত্যি কথা বলছি, আমার নিজের কানে দেখা চোখে শোনা, ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সম্ভবত, চৌরাস্তা থেকে এক বিশাল পাইপ বসানো হয় শকুন্তলা পার্কের দিকে। সেই উলটো পাইপ বসিয়ে কি হয়রানি, সেটা অন্য গল্প। কিন্তু তখন অটো করে যখন মহেশতলা যেতাম, সেই অটো যে কার উঠোন, কার বেডরুম দিয়ে নিয়ে যেত সে চালকরাই জানেন। একবার তো এমন হল অটো থেকে দেখতে পাচ্ছি দুদিকে লোকজন খাচ্ছে আর টিভি দেখছে। মানে একদিকে লোকে ডাইনিং টেবিল বসে খাচ্ছে, আর অন্যদিকে টিভি চলছে। কার বাড়িতে দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের সময় থালা বাটির মাঝখান দিয়ে অটো করে চলে গেলাম কে জানে? সুতরাং এই গল্পটা হস্তিনাপুরের হতেই পারে না, এ আমাদের বেহালারই গল্প।

এইসবের মধ্যেই রুক্মীর বোন রুক্মিণীর আবার বিয়ে ঠিক হল। বিয়ে মানে স্বয়ম্বর। স্বয়ং নিজের বর বেছে নেওয়া। তাই বলে আগে থেকে বেছে প্রেম করে তারপরে বিয়ে করা হবে না কিন্তু। সে গুড়ে বালি। সেই কেস দেবী সতী করেছিল বলে তার বাবা দক্ষ তাঁকে প্রায় ত্যাজ্যপুত্রী করেছিল। আরেক ছিল অম্বা, যেখানে অম্বার বাবাও রাজি ছিল, কিন্তু মাঝখানে ভীষ্ম এসে তম্বিতম্বা করে অম্বাকে তুলে নিয়ে যায়। সেই থেকে বোধহয় লাভ ম্যারেজ বন্ধ। চোখের সামনে বর বেছে নাও। যদিও স্বয়ম্বর সভা প্রায়ই কেলাকেলি ও আগত রাজাদের বর হওয়ার লোভে বর্বরোচিত কার্যকলাপের দমাধ্যমে শেষ হত। হয়তো পাত্রী গিয়ে একজনকে পছন্দ করে তার গলায় মালা দিল, অমনি বাকিরা “আমি কম কীসে?” বলে দম নিয়ে জমিয়ে সেই মাল্যগলিত রাজাকে ধরে দে মার। মালা তো পরানোই আছে, মোটামুতি খাট, ধূপ আর কীর্তনপার্টি এনে রাজাকে শ্মশানে পৌঁছাবার ব্যবস্থা করে দিত। তারপরে নিজেরা মারপিট করত। যে জিতত সেই পাত্রীকে বিয়ে করতে পেত। একমাত্র কিছু হাই ভোল্টেজ রাজার কন্যাদের স্বয়ম্বর সভায় কিছু ঘটত না কারণ কন্যার বাবা নিজে বেশ সেনা মজুত করে রাখত। বেশি ট্যাঁ ফো দেখলেই ঠুকে দিত। কিন্তু বেশিরভাগ রাজার তো আর অত জোর ছিল না, তাই ওই পাত্ররা নিজেদের মধ্যে মারপিট করে যে জিতবে সেইই জামাই হবে, এই সিস্টেম মেনে নিত। অর্থাৎ নামেই কন্যার চয়েসে বিয়ে, আসল ব্যাপার হল যার ভয়েস ও যুদ্ধবয়স বেশি তার কাছেই কন্যা যাবে। স্বয়ম্বর সভার নাম পালটে নাম দেওয়া উচিত ছিল, “আন্তঃরাজ্য বসে কুস্তি করো প্রতিযোগিতা”। প্রথম পুরস্কারে পাত্রী। দ্বিতীয় তৃতীয় পুরস্কারে পাত্রীর ভগিনীসকল থাকলে একেবারেই বিদেয় করে দেওয়া হত। একই প্যান্ডেলে একই ক্যাটেরিংয়ে চারজনের বিয়ে। যেমন সীতার সাথে রামের বিয়েতে, ঊর্মিলাকে তো বিয়ে দেওয়া হলই, সাথে একই খরচে জনকের ভাই কুশধ্বজ নিজের মেয়ে মান্ডবী আর শ্রুতকীর্তিরও বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল। তাও আবার চারজনেরই বরযাত্রীও এক। ইতিহাসে কুশধ্বজের মতো লাভবান পিতা বোধহয় আর কেউ হননি।

মোটামুটি রাজাদের তিনটেই কাজ ছিল। মৃগয়া করা, যুদ্ধ করা আর বিয়ে করা। আর এর মাঝে সময় পেলে রাজত্ব চালানো। কৃষ্ণের কাছে ঠ্যাঙানি খেয়ে এসেই রুক্মী বোনের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সেই স্বয়ম্বর সভার জন্য বিভিন্ন রাজ্যের রাজারা এসে ভিড় করেছে। শহরের বাইরে বিশাল বিশাল মাঠে তাঁবু পড়েছে। হিসেব যা বলছে, তাতে মনে হয় জরাসন্ধ আর জরাসন্ধের সঙ্গে যে পল্টন গোমন্ত গিয়েছিল, তারা সবাই এসে হাজির হয়েছিল। রুক্মীও তো সেই দলেই ছিল, হয়তো গোমন্ততে মারধোর খাওয়ার আগে পরে করে জরাসন্ধ সহ সবাইকে বলেছে, “আমার বোনের স্বয়ম্বর সভা আছে, বুঝলেন কিনা? যাওয়ার সময় বেঁচে থাকলে একবার আসবেন ওদিকে। আপনাদেরও ভাগ্য যাচাই হবে। দরকার পড়লে আমার বোনের জন্য আপনারাও একটু মারামারি করে নেবেন।”

সেইসব রাজাদের বাড়ির লোকেদের বা অন্য স্ত্রীদের কথা ভাবি আমি শুধু। দিব্যি হয়তো রাজত্ব করছে, নিজেদের প্রজাদের সমস্যা শুনে সমাধান করছে, হঠাৎ জরাসন্ধ অ্যান্ড অ্যাসোশিয়েশনের চিঠি এল।

“পত্রপাঠ চলিয়া আইস। মগধে না আসিলেও হইবে, সরাসরি মথুরা (অথবা গোমন্তে) গিয়া উপস্থিত হউ। আমরা যাদবদের বিরুদ্ধে বার্ষিক কলহের উপক্রম করিয়াছি…”

সেই রাজা সঙ্গে সঙ্গে নিজের সৈন্যসামন্ত নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তারপরে গোমন্ত পর্বতে গিয়ে খুব খানিক কেলানি খেয়ে হাড়গোড় ভাঙল। তারপর ঠিক হতে হতে আর বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতেই আবার স্বয়ম্বর সভা। কোনো মিত্র রাজা হয়তো বাষ্পসেবন করিয়ে দিয়ে বলল, “চলো স্বয়ম্বরে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করে আসবে…”

আমাদের নিরীহ রাজা বলল, “না থাক, বাড়িতে যে ছটা রাণী আছে তাদেরকেই সময় দিতে পারিনা। মাঝে কিছুদিন সন্দেহ হয় মেজোরানির দাসীটাকেও আমি কোথাও থেকে বিয়ে করেছিলাম কিনা! পরে জানতে পারি ওটা আসলে আমার ন’রানি, তারপরেও একটা ফুল আছে…”

“আরে বিয়ে করার জন্য কোন আবুত্ত স্বয়ম্বরে যায়?” মিত্র রাজা বলে, “এই তালে যে মারামারি লাগবে সেখানে তুমি তোমার অপছন্দের রাজাদের ঝেড়ে ফেলতে পারবে। ব্যস!”

অতঃপর নিরীহ রাজা স্বয়ম্বরে যায় এবং গণমারপিটে নিজের জীবন খুইয়ে বসে। একে আপনি কী বলবেন? যুদ্ধে প্রাণ গেলে বীর বলা যেত। বিয়ে করতে গিয়ে প্রাণ দেওয়াটা কোথাকার বীরত্ব? কিন্তু স্বয়ম্বর সভায় আসলেই তাই হত। পাত্রী রইল একপাশে, এরা নিজেদের ইগো আর জোরের লড়াই চালাচ্ছে।

রুক্মিণীর বিয়ের খবর কৃষ্ণের কাছে গিয়ে পৌঁছয়। ভক্তগণ বলবেন রুক্মিণী মা লক্ষ্মীর অবতার, তাই কৃষ্ণ জেনেশুনেই গেছিল। কিন্তু অন্যভাবে ভাবলে এটাও ভাবা যায় যে কৃষ্ণ আসলে জরাসন্ধের শক্তিকে দুর্বল করে দিতে চাইছিল। তাই যারা তাকে জরাসন্ধের নেতৃত্বে আক্রমণ করেছিল, তাদের সবাইকে একে একে হয় বধ করেছে, নয়তো আত্মীয়তা পাতিয়ে নিয়েছে। কৃষ্ণ তাই খবর পেয়েই বেরিয়ে পড়ল। উগ্রসেন বলল, “কিছু সেনা নিয়ে যা…”

কৃষ্ণ বলল, “না আমি একাই যাচ্ছি, সেনা এখানে রাখো। আমি না থাকাকালীন কেউ আক্রমণ করলে কাজে লাগবে…”

এই বলে কৃষ্ণ একাই ড্রাইভ করে বিদর্ভ নগরে চলে এল। এসেই আগে ক্রথ বলে একজন রাজাকে হারিয়ে দিল। ক্রথের সঙ্গে একটা অণু যুদ্ধ করতে করতেই ক্রথ আকাশবাণীতে শুনতে পায়, “কৃষ্ণকে সব দিয়ে দাও!”

এরকম ব্যাপক দৈব উপরোধ হলে সেটাকে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ক্রথ নিজের অংশটা দিয়ে দিল। এমনকি সিংহাসনটা পর্যন্ত ঝেড়েপুঁছে কৃষ্ণকে বলল, “আপনি এখানে বসুন স্যার।” কিন্তু সেটা বিদর্ভ নগরের একটা পুঁচকে অংশ। বেশিরভাগটা ছিল রুক্মী আর রুক্মিণীর বাবা ভীষ্মকের কাছে, আর কিছুটা ছিল ক্রথের ভাই কৈশিকের কাছে।

কৃষ্ণ তারপরে পাহাড়ে উঠে জরাসন্ধ আর রুক্মিণীর পাণিগ্রাহীদের ভিড় দেখতে লাগল। সে কুম্ভমেলার মতন ভিড়। এত কোটি কোটি রাজারা কি বিয়ে করতে এসেছিল? না… রাজাগুলো নিজেদের সৈন্যসামন্ত নিয়ে এসেছিল। মারপিট হলে কি ওয়ান টু ওয়ান হবে নাকি? রাজ্যে রাজ্যে যুদ্ধ হবে। তাই সেনাবাহিনী। ভাগ্যিস আজকের দিনে এই সিস্টেম উঠে গেছে। নইলে আমি যদি জানতে পারতাম যে আমার দেওয়া খাজনার পয়সায় রাজা নিজের বিয়ের জন্য সেনাবাহিনীকে ভোগে পাঠাচ্ছে, তাহলে আমি নিজে ওই রাজাকে মেরে ফাঁসি যেতাম। অবশ্য এটা বলা সোজা। এখনকার দিনেও নেতারা আমাদের ট্যাক্সের টাকা নিষ্ঠাভরে দিস্তা দিস্তা পকেটে ঢুকিয়ে তিস্তা-ভিস্টা বানাচ্ছে, আর ফষ্টিনষ্টি করছে। কিছুই তো করতে পারি না।

যা-ই হোক, কৃষ্ণ এই বিপুল সেনা দেখে ভাবল, “এদের সবাইকে আড়ংধোলাই তো দিয়েইছি আগে, তাই এদের মনে ভয় আছে। কিন্তু রুক্মিণীকে বিয়ে করতে গেলে একটা জমকালো এন্ট্রি চাই। মানে এমনভাবে যেতে হবে যে সবাই ঠাকুর ঠাকুর বলে পায়ে লুটিয়ে যায়। তবেই না এন্ট্রি…”

কৃষ্ণ তখন টেলিপ্যাথিতে নিজের পার্সোনাল বাহনকে যোগাযোগ করে, “হ্যালো, গরুড়… কোথায় আছ?”

“এই তো স্যার, কয়েকটা সাপ দিয়ে টিফিন করছি,” উত্তর আসে গরুড়ের।

“তুমি যে বলেছিলে আর সাপ খাবে না…”

“এগুলো মরা স্যার, দোকান থেকে কিনেছি। ফ্রেশলি প্যাক করা, আমি মারিনি…”

“ঠিক আছে, জলদি এসো,” কৃষ্ণ বলে। আর তার একটু পরেই বিশাল ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে গরুড় পাখি এসে হাজির হয়। কৃষ্ণ গরুড়ের পিঠে চড়ে উড়ে গিয়ে কৈশিকির রাজপ্রাসাদে যায়। ওখানেই নাকি স্বয়ম্বর সভা হবে। কৈশিকি কৃষ্ণকে ওয়েলকাম করে আদরযত্ন করে তার বাড়িতে রেখে দিল। অতিথি দেবঃ ভবো, আর এখানে তো সবাই জানে কৃষ্ণ অবতার। কৈশিকি কদিন পরে বিগলিত চিত্তে আপ্লুত হয়ে (এবং সম্ভবত ভবিষ্যৎ রাজনীতির কথা ভেবে) নিজের রাজ্যপাট তার দাদার মতো সব কৃষ্ণের হাতে তুলে দিল। একেবারে জমিজায়গার কাগজপত্রে সই করে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়ে দিল। কৃষ্ণ বিদর্ভের রাজা হওয়ার পথে পা বাড়াল। এমনকি একটা অভিষেক পর্যন্ত হয়ে গেল। ভাইপো না, রাজ্যাভিষেক।

কিন্তু আবার সেখানেই জরাসন্ধ আর অন্য রাজাদের ভীষ্মকের সাথে মিটিং হচ্ছিল। ওই সাধারণ আলোচনা আর কি। মেয়ের গায়ের রং কেমন? চুল কেমন? রান্না পারে কি না, গান জানে কি না, চাকরিবাকরি করে কি না, বিয়ের পরে চাকরি ছেড়ে ঘরের চাকরানির কাজ করতে পারবে কি না, বাকি বউদের সাথে মানিয়ে নিয়ে চলতে পারবে কি না। ইত্যাদি ইত্যাদি পুরুষালি কথা।

এমন সময়ে গরুড়ের পিঠে চেপে কৃষ্ণ হাজির। একেবারে গ্র্যান্ড এন্ট্রি। ওই সিনেমায় দেখায় না, নায়কের এন্ট্রি হচ্ছে, একেবারে বিশাল হেলিকপ্টারে করে এসে সাতাত্তরতলা বাড়ির ছাদে বন্ধ কোট খুলতে খুলতে অতি ধীরভাবে নামে। গাড়িতে আসতে পারত, বাসে আসতে পারত, অটোতে আসতে পারত… না নায়ক একটা দামড়া হেলিকপ্টার নয়তো নৌকায় আসবে। সেরকমভাবেই নিজের প্রাধাণ্য বোঝাতে কৃষ্ণ একেবারে বিশাল গরুড় পাখির পিঠে অস্ত্রশস্ত্র সাজিয়ে নিয়ে প্রাইভেট জেটের মতন চালিয়ে উড়ে এসে ল্যান্ড করল। সবাই অবাক হয়ে দেখছে। যাদের মনে সন্দেহ ছিল যে কৃষ্ণ বিষ্ণুর অবতার কি না তারা কৃষ্ণকে বিষ্ণুর পার্সোনাল জেট ফাইটার গরুড় ব্যবহার করতে দেখে মেনে নিল যে কৃষ্ণই বিষ্ণু।

কৃষ্ণ কিন্তু বেশ ভালোমানুষটির মতন নেমে ভীষ্মককে গিয়ে বলল, “কাকু, আমি এসে গেছি। আবার কাকু কেন বলা? আমি তো আপনার জামাই হতে এসেছি। এখন থেকে আমি শ্বশুরমশাই বলে ডাকব…”

ভীষ্মক কিন্তু ভীষণ শক পেয়েছে, কৃষ্ণকে দেখে। কৃষ্ণ ভীষ্মকের ছেলে আর ছেলের বন্ধুদের ব্যাপক মারধোর করে আবার ভীষ্মকের মেয়েকেই বিয়ে করতে এসেছে। অবাক হওয়ারই ব্যাপার। তার মধ্যে খবর পেয়েছে যে ক্রথ আর কৈশিকি আদর করে লেবেনচুসের মতন কৃষ্ণের হাতে তুলে দিয়েছে। এবার ভীষ্মককে শ্বশুর বানালেই পুরো বিদর্ভরাজ্য কৃষ্ণের মারফত যদুদের। কৃষ্ণ যেই বিদর্ভরাজ্য পাবে অমনি হুড়হুড় করে প্রচুর চারপেয়ে আর দুপেয়ে গোরু ঢুকিয়ে দেবে রাজ্যে। কিন্তু ভীষ্মকের বেশি চিন্তা হয় এই নিয়ে যে স্বয়ম্বর সভা তো মারপিট দিয়ে শেষ হয়, আর কৃষ্ণ যা মারকুটে বলে শোনা গেছে, হয়তো বিয়ের যজ্ঞের আগুনে সবকটাকে ফেলে দিল। তার ছেলেকেও, কারণ রুক্মী যুদ্ধকৌশল জানলেও মাথাটা যে স্রেফ ভুসি দিয়ে ভরা ছিল, সেটা যেমন পাণ্ডব আর কৌরবরা বুঝেছিল তেমনি রুক্মীর বাবাও যথেষ্ট জানত। তাই হেড গরম ছেলেকে নিয়ে চিন্তাও ছিল।

এইসময়ে একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। কৃষ্ণকে দেখে হঠাৎ জরাসন্ধ উঠে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণের প্রশংসা করতে লাগল। কী কেস বুঝতে পারছে না কেউ।

জরাসন্ধ হেব্বি প্রশংসা-ট্রশংসা করে বলল, “কৃষ্ণ খালি হাতেই আমাদের যা পেঁদিয়েছে, এখনও গা-হাত-পায়ে সাড় খুঁজে পাচ্ছি না। তার উপরে ওই জীবন্ত উড়োজাহাজ অৰ্দ্ধমনুষ্য-অর্ধপক্ষি কিন্তুতকে নিয়ে এসেছে। আমার মনে হয় এখানে কৃষ্ণই সবচেয়ে ক্ষমতাবান, আর কৃষ্ণ যখন এসেছে তখন ওর মনে ফুল বিয়ে করার ইচ্ছে আছে। আর ওর যদি বিয়ে করার ইচ্ছে হয়, তাহলে খামোখা ওকে বাধা দিয়ে আমাদের মার খেয়ে বা গরুড়ের খাদ্য হয়ে লাভ নেই। আমরা তাহলে এখানে একটা চুক্তি করতে পারি যে রুক্মিণী যাকে বেছে নেবে, সেই ওর স্বামী হবে, আর সবাই সেটাই মেনে নেবে। তাহলেই মনে হয় শান্তি থাকবে। নয়তো কৃষ্ণের হাতে মার অবধারিত…”

তাই দেখে দন্তবক্রও নিজে ব্যাঁকাপানা দাঁতগুলো নিয়েও খুব খানিক “ওব বোব…বৌ…ঔ” করে কি সব বলল, সব কথা বোঝা গেল না। দাঁতের ফাঁক গলে সব কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেত যে। কিন্তু মোটামুটি বোঝা গেল দন্তবক্ৰ সানাইয়ের পোঁয়ের মতন জরাসন্ধের কথাই সমর্থন করল। পুরাণকার জরাসন্ধের কথাটাই দন্তবক্রের মুখে আরেকবার বসিয়ে লিখে ফেললেন।

কিন্তু শাল্বরাজ বেঁকে বসল। মার খেয়ে পিছনে ব্যথা ছিল হয়তো, তাই সোজা হয়ে বসতে পারছিল না। ওভাবে বেঁকে বসেই সে জরাসন্ধের প্রস্তাবে বেঁকে বসল। এই শাল্ব সেই অম্বার বয়ফ্রেন্ড নয় মনে হয়। সে তো অনেক বছর আগের ঘটনা। এটা বোধহয় ওর ছেলে। বাপ কা বেটা, স্বয়ম্বরে গিয়ে মার খাওয়া স্বভাব। না, এই শাল্বরাজ আগেই কৃষ্ণ-বলরামের হাতে মার খেয়ে এসেছে। এই সভায় খেল না। কিন্তু কথা শোনাতেও ছাড়ল না। তেড়েফুঁড়ে বলল, “ইঁহ, কৃষ্ণ যদি বিষ্ণু হত তাহলে বিষ্ণুর রূপে আসত এখানে। কৃষ্ণ শুধু মানুষ হয়েই এসেছে, ওকে আমি ডরাই না। কিন্তু আমিও এই প্রস্তাবে রাজি যে রুক্মিণী যাকে পছন্দ করবে বাকিরা সেটাই মেনে নেবে।”

মানে প্রাণে ভয় আছে, কিন্তু মুখে মারিতং জগৎ। কৃষ্ণ কিছুই বলে না, রাজি হয়ে যায়। ভীষ্মক কৃষ্ণকে একান্তে ডেকে বলল, “শোনো বাবা, আর যা-ই করো আমার ছেলেটাকে মেরো না। ওটা গবেটের বটগাছ আমি জানি, কিন্তু বেশি কিছু করতে যেয়ো না।”

কৃষ্ণ বলে, “কাকু, চাপ নিয়ো না, সব পারফেক্ট আছে। যখন যা করার ঠিক করে দেব।”

এর মধ্যে কৃষ্ণের সেই রাজ্যাভিষেকটা চলে। কিন্তু এদিকে জরাসন্ধ, দন্তবক্র কৃষ্ণের সামনে যতই তেলিয়ে তেলিয়ে প্রশংসা করুক, ভিতরে ভিতরে তো সবকটার হিংসেতে জ্বলছে আর ফাটছে। ফেটে একেবারে প্রখর গ্রীষ্মের জল না পাওয়া মাটির মতো চৌচির হয়ে গেছে। তাও হিংসে তো করতে হবে। তাই এবারে সব রাজারা কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে নিজেরা গোল টেবিল বৈঠক করে আলোচনা শুরু করল, কীভাবে কৃষ্ণকে কায়দা করে মেরে ফায়দা তোলা যায়। অনেক প্ল্যান হলেও শেষপর্যন্ত বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা কে বাঁধবে? এইসব বুদ্ধি ঝরে ঝরে মস্তিষ্কঝড় চলছে, এমন সময়ে শল্য (এটা নকুল-সহদেবের মামা না?) বলল, “রোসো, উপায় আছে। সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। আমরা কালযবনকে কৃষ্ণের পিছনে লেলিয়ে দেব!”

“কালযবন?” জরাসন্ধ জিজ্ঞেস করে, “কাল যবন হবে? তো আজ কী করছে?”

“আরে গর্গমুনির ছেলে…”

“গর্গের ছেলে গড়বড় করবে না তো?”

“আরে না,” শল্য বলে, “গর্গ মুনি বারো বছর শুধু লৌহচূর্ণ খেয়ে খেয়ে শিবের তপস্যা করে এই ছেলেকে পেয়েছে।”

“লৌহচূর্ণ খেয়েছে কেন? ও জিনিস হজম হয় নাকি?”

“শরীরে আয়রন কম ছিল হয়তো, তাই,” শল্য বলে, “অথবা লৌহমানব মানে আয়রনম্যান হতে চেয়েছিল। সেসব না হয়ে, যবনকে জন্ম দিয়েছে। কালযবনের বর আছে…”

“বর আছে? বউ নেই? কালযবন কি মেয়ে? নাকি এখুনি এই যুগেই?”

“এই যুগে অনেক কিছুই হচ্ছে, শুধু জানতে পারছ না কাকা,” শল্য বলে, “আমার কাছে সব খবর থাকে। কিন্তু কালযবন বর পেয়েছিল, মানে বরদান পেয়েছিল শিব ঠাকুরের কাছে। এখনকার কোনো রাজা-গজা-প্রজা ওকে মারতে পারবে না… তাই সেই অনুযায়ী কৃষ্ণও মারতে পারবে না।”

“বাহ্ বাহ্,” জরাসন্ধ বলে, “কালযবনকে ডেকে পাঠাও। সত্ত্বর সে যেন তরতর করে চলে আসে।”

কালযবন যবনদের রাজা ছিল। মুনির ছেলে যে কী করে যবনদের রাজা হল কে জানে। এবার প্রশ্ন হল যবন কারা? মহাভারতে প্রায়ই দেখা যায় যবনদের সাথে আর্যদের যুদ্ধ হচ্ছে। যা বোঝা যায়, প্রথম যাদের যবন বলা হয়েছিল তারা প্রাচীন গ্রিকদের আইওনিয়া উপজাতি। তারা মাঝে মাঝেই এদিকে একটু-আধটু ঝামেলা করতে আসত। পরবর্তীকালে ইউরোপ ও পশ্চিমদিক থেকে যারাই আসত, যেমন মধ্যপ্রাচ্যবাসী, হয়তো মিশর, গ্রিক বা ইরাক-ইরান থেকে… এরাও যবন নামেই চিহ্নিত হয়। কালে কালে যখন পুরাণের মধ্যে বর্তমান সময়ের ছায়া দেখা যায় তখন কিছু কিছু পুরাণে স্পষ্ট মুসলমান রাজাদের ও কখনও কখনও বৌদ্ধদেরও ইঙ্গিত করে যবন বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। সব মিলেমিশে পৌরাণিক ‘যবন’ ঘেঁটেঘুঁটে চ্যবনপ্রাশ হয়ে যায়। যবনপ্রাশও বলা যায়। মোট কথা আর্য বাদে পশ্চিমের সবাই যবন। আর পূর্বদিকে তো পক্ষী, নাগ, যক্ষ, পাতাল… একেবারে চিড়িয়াখানা।

সেই যবনদের রাজাকে ডাকতে চলল শল্য। এবার ছবিতে ও টিভিতে কালযবনকে যতটা সম্ভব বিকট করে দেখানো হয়। একেকটা ছবিতে তো ওটা কালযবন না সোয়াহিলি রাজা না বিরাকোচার মূর্তি না জারোয়া তাই বোঝা যায় না। সব মিশিয়ে যতটা বিকট করা যায়। একই ছবিতে কৃষ্ণকে নীল দেখিয়ে কালযবনকে একেবারে রাক্ষসের মতো কুৎসিত আর কালো করে দেখায়। সিরিয়ালগুলোর তো কথাই নেই। দুম করে একদিন একটা সিরিয়ালে কালযবনকে দেখে মনে হল ‘আবার যখের ধন’ গল্পের আফ্রিকান সর্দার। মাথায় আবার সাদা সাদা প্লাস্টিকের পালক, পরনে কৌপিন। যবনরা আর্যদের চোখে অ-সভ্য ছিল জানতাম কিন্তু এরকম অসভ্য ছিল জানা ছিল না।

যা-ই হোক, শল্য গিয়ে কালযবনকে সুপারি দেয় কৃষ্ণকে মারার জন্য, কিন্তু কালযবন বলে, “অনেকেই আমাকে রিকোয়েস্ট করেছে কৃষ্ণকে মারতে। আপনি ওই দান পেটিতে দান করে দিন, আপনার কাজ হয়ে যাবে…”

শল্য একটা মোটা ডোনেশন করতেই কালযবন রাজি হয়ে গেল। তক্ষুনি রথে চড়ে কালযবন মথুরার দিকে ছুটল কৃষ্ণকে মারতে। এদিকে বিয়ের দেরী আছে দেখে বাকি রাজাদের মতন কৃষ্ণও মথুরায় চলে এসেছে। এসেই উগ্রসেন আর বাকি যাদবতুতো আত্মীয়দের এক জায়গায় করে বলল, “লেডিজ অ্যান্ড জেন্টেলম্যান, আমরা আঠেরোবার জরাসন্ধকে হারিয়েছি, কিন্তু ও ব্যাটা মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের আক্রমণ করেই যাবে। বারবার কি আর এটা ভালোলাগে? আর ওকে মারাও যাবেনা, শিবের বর আছে। আমাদের কি আর কাজ নেই? ছেলেপুলের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে, আমাদের ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। বছর বছর উৎসবের মতন যুদ্ধ চলছে। তার থেকে ভালো, চলো আমরা সবাই চলে যাই মথুরা ছেড়ে।”

“কোথায়?”

“কোথায়?”

“কোথায়?”

সবাই জিজ্ঞেস করে।

“একেবারে পশ্চিমে,” কৃষ্ণ বলে, “আমি একটা সি-সাইড লোকেশন দেখে এসেছি। দারুণ জায়গা। গোরুদেরও থাকতে প্রবলেম হবে না, তোমরাও যথেচ্ছ সৈকত-মোচ্ছব করতে পারবে।”

সবাই বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ চলো, খালি যুদ্ধের থেকে ভালো যে আমরা সমুদ্রে মজা করব!”

“তোমরা শুধু যেটুকু নয় সেটুকু রেখে যাও, বাকি সব নিয়ে চলো,” কৃষ্ণ বলে, “আর এখানে এক কোটি যাদবরা থাকবে (সম্ভবত যারা সমুদ্র ভালোবাসে না, শুধু পাহাড় ভালোবাসে)। তারা পাহারা দেবে…”

ব্যস্, ঘরে ঘরে বাঁধাছাদা শুরু হয়ে গেল। শুধু মথুরা নগরী না, মথুরা রাজ্যও। যতদূর মনে হয় তার মানে বৃন্দাবনের লোকেরাও এই লিস্টে ছিল।

দিব্যি এক এক ব্যাচ করে মথুরাবাসীকে বাসে করে দ্বারকা পাঠানো হচ্ছিল, এমন সময়ে মথুরায় রে রে করে কালযবন তেড়ে এল। কী জ্বালাতন! এসেই মথুরার পেয়াদাদের প্যাঁদাতে শুরু করল আর হুংকার দিতে লাগল, “কই কৃষ্ণ? ডাক তাকে, আজকে কৃষ্ণবধ পালা হবে!”

কৃষ্ণ ওদিকে কালযবনকে দেখেই খিড়কি দিয়ে পালিয়েছে। কিন্তু কালযবন দেখে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের মাঝে কৃষ্ণের পিছনে দৌড়। কৃষ্ণ রণক্ষেত্র ছেড়ে পালাচ্ছে, তাই কৃষ্ণের এক নাম হয়ে গেল রণছোড়।

পিছন পিছন কালযবন দৌড়চ্ছে, “এই কেষ্ট… থাম… থাম বলছি… চুপচাপ এসে মার খা… আরে! এত দৌড়চ্ছিস কেন? তোকে তো আমি ধরবই…”

কিন্তু প্রশ্ন হল, এত লাখ লাখ সৈন্য পিটিয়ে, এত বীর পালোয়ানদের কুপোকাত করে, সামান্য কালযবনের ভয়ে কৃষ্ণ পালাচ্ছিল কেন? কারণ সেই যে শিব ঠাকুরের বর আছে কালযবনের সাথে। মথুরার কেউ কালযবনের কিছু করতে পারবে না। কিন্তু কৃষ্ণ তো ওকে মেরে হাত-পা ভেঙে প্রতিবন্ধী করে দিতে পারত। পালাল কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর নেই। কিন্তু আমি একটা উত্তর ভেবে বের করেছি।

যবনরা তখনকার দিনে প্রায়ই আক্রমণ করত। থেকে থেকেই তাদের আক্রমণের কথা শোনা গেছে মহাভারতে। এমনকি কৃষ্ণের মৃত্যুর পরে, যবনরাই আক্রমণ করে দ্বারকাবাসীদের লুটে নেয়। সুতরাং ধরে নিতে হবে, যবনরা দুর্ধর্ষ দস্যুজাতি ছিল। এবং দ্বারকা, মানে আজকের গুজরাটের থেকে পশ্চিমেই যবনদের ঘাঁটি ছিল। ওদিক দিয়েই তারা আসত। কৃষ্ণ বোধহয় চায়নি সরাসরি তাদের রাজাকে মারতে। তাহলে সমগ্র যবন জাতিই কৃষ্ণের বিরুদ্ধে খচে যেত, আর দ্বারকাতে বসবাস করার আগেই ঝামেলা শুরু করে দিত। কিন্তু কালযবনকে তো মারতেই হবে। নয়তো ব্যাটা বারবার জ্বালাবে।

কৃষ্ণ ছিল ধুরন্ধর প্ল্যানার, ঠিক খুঁজে খুঁজে হিসেব করেছিল কে কোনদিক থেকে কীভাবে বিপদ হয়ে আসতে পারে। আর আসলে কার জন্য কী করতে হবে সেটাও প্ল্যানিং করেই রেখেছিল। আর সেইমতন কালযবনের আক্রমণ দেখেই জানলা দিয়ে ঝাঁপ মেরে কালযবনকে শায়েস্তা করার উপায়ের দিকে ছুটছিল।

ছুটতে ছুটতে পাহাড় জঙ্গলে ঢুকে পড়ে কৃষ্ণ। পিছন পিছন কালযবন। কিন্তু জঙ্গলে ঢুকে গাছপালার ফাঁকে কৃষ্ণকে ফলো করতে একটু অসুবিধে হয়। কৃষ্ণ সেই সুযোগ নিয়ে পাহাড়ে একটা গুহার ভিতরে ঢুকে পড়ে।

এই গুহায় ঘুমোচ্ছিল মুচুকুন্দ রাজা। কে এই মুচুকুন্দ? বংশতালিকা দেখলে বুঝতে পারবেন, মুচুকুন্দ ছিল মান্ধাতার ছেলে। হ্যাঁ মান্ধাতার আমলের লোকই ছিল মুচুকুন্দ। অম্বরীশের ভাই। সূর্যবংশীয়। রামের পূর্বপুরুষদের একজন। একবার স্বর্গে দেবাসুরের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। যেমনটা প্রায়ই হয়ে থাকত, এতে কোনো বিশেষত্ব বা নতুনত্ব নেই।

কিন্তু এইবারে অসুরেরা দেবতাদের ঠেঙিয়ে স্বর্গ থেকে বের করে দেয়। কোনো বিশেষ বরদান পাওয়া অসুর তো নয়, নিতান্ত সাধারণ অসুরদের কাছেই দেবতারা মার খেয়েছে। এবং সম্ভবত অসুরদের স্রেফ লোকসংখ্যার বেশি ছিল বলে দেবলোকের দৈব লোকেরা লোক ছেড়ে ভূলোকে চলে আসে। বড়সড় অসুর হলে ব্রহ্মার কাছে যেত। কিন্তু লোকবল চাইতে মর্তে এসে তখনকার বর্তমান ও মর্তমান রাজা মুচুকুন্দের কাছে এসে বলে, “হেল্প!”

দেবতাদের সাহায্য করে তাদের গুডবুকে নাম রাখার এরকম সুযোগ কেউ ছাড়ে নাকি? মুচুকুন্দ এক পায়ে রাজি হয়ে দু পায়ে হেঁটে স্বর্গের দিকে চলল। সঙ্গে বিশাল সেনা। তখনও কার্তিক জন্মায়নি সম্ভবত, তাই মুচুকুন্দ সেনাপতি হয়ে দেবতাদের সেনাকে চালিত করে। এক বছর ধরে সেই যুদ্ধ হয়, এবং অবশেষে মুচুকুন্দের জন্য অসুরদের মুণ্ডপাত হয়। দেবতারা ‘জিতে গেছি’ বলে চেঁচিয়ে স্বর্গ মাত করে।

মুচুকুন্দ বলল, “এবার আমি যাই?”

ইন্দ্ৰ বলল, “যাবেন মানে? কোথায় যাবেন?”

মুচুকুন্দ বলল, “কেন মর্তে?”

“আরে ক্ষেপেছেন নাকি মশাই?” ইন্দ্র বলে, “এখানে এক বছর কেটে গেছে…”

“মানে?” মুচুকুন্দ জিজ্ঞেস করে।

“মানে হল এখানে এক বছর কেটেছে। তার সমান মর্তের সময় হিসেব করলে প্রায় এক লাখ তেত্রিশ হাজার দুশো পঁচিশ বছর আর কিছু মাস কেটে গেছে। ইন্টারস্টেলারে ব্যাপার, টাইম ডাইলেশন…। বুঝলেন কিনা!” ইন্দ্ৰ বলে, “আপনার পরিবার বংশ সব কোথায় মিলিয়ে গেছে। আপনি বরং আমাদের থেকে একটা বর চান। কিন্তু মোক্ষ চাইবেন না প্লিজ, ওসব আমাদের অ্যাপ্রুভাল নেই…”

মুচুকুন্দ ভাবল, “যাহ কেলো, সব্বাই হাপিশ হয়ে গেছে? তাহলে আর আমি কী করি?”

মুচুকুন্দ তখন অনেক ভেবে বলল, “আমি ঘুমাতে চাই…”

এই দ্বারা প্রমাণিত হল মুচুকুন্দ বাঙালি ছিলেন, এবং বেশিরভাগ বাঙালির শিরায় ওঁরই রক্ত বইছে। বরদানে যে মানুষ অনেকদিনের ঘুম চাইতে পারে, সে বাঙালি ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না। যা-ই বলুন আর তাই বলুন, ঘুম, জিনিসটা সত্যি বরদান। আমার তো ঘুম থেকে উঠেও ঘুম পায়। মুচুকুন্দ বেচারা একবছর যুদ্ধ করতে করতে এক ফোঁটা ঘুমায়নি। সেই মানুষটা ঘুম চাইবে না তো কি? সুযোগ পেয়েছে, ব্যস!

ইন্দ্ৰ বলল, “ঠিক আছে, ঘুমাও। যতদিন ইচ্ছে ঘুমাও। আর তোমায় যে জাগাবে, তার দিকে তুমি তাকালেই সে ছাই হয়ে যাবে…”

মুচুকুন্দ মর্তে ফিরে এসে উত্তর প্রদেশের দেওঘরে একটা পাহাড়ের গুহায় ঘুমিয়ে পড়ে। একেবারে কালঘুম। নিদ্রাসমাধির মতন ব্যাপার স্যাপার।

কৃষ্ণ ছুটে এসে ওই গুহাতেই ঢুকেছিল। তারপরে চুপটি করে গিয়ে ঘুমন্ত মুচুকুন্দের উপরে নিজের হলুদ ওড়না রেখে গুহার একটা কোণায় লুকিয়ে পড়ল। পিছন পিছন এসে ঢোকে কালযবন। একে গুহা তায় আবার অন্ধকার। অন্ধকারে অন্ধের মতো কালযবন হাতড়ে হাতড়ে এদিক-ওদিক খুঁজে বেড়াচ্ছে। ভাগ্যিস বুনিপের দেখা পায়নি, অবশ্য বুনিপের দেখা পেলে ভালোই হত। প্রাণে বাঁচার চান্স ছিল।

অন্ধকারে কালযবন খুঁজে খুঁজে এক জায়গায় কৃষ্ণের ওড়না দেখতে পেল, তার তলায় কে যেন শুয়ে আছে। অন্ধকারে কী করে হলুদ ওড়না দেখল কে জানে? মশাল হাতে তো যায়নি। বোধহয় শরীরে প্রচুর ভিটামিন এ ছিল, নয়তো একটা চোখে প্যাঁচার চোখ বসানো ছিল।

“তবে রে? ব্যাটা ভোর না হতে ওড়না জড়িয়ে ‘ঘোর না থাকা’ ঘুম দিয়েছে?” কালযবন ভাবল। তারপরে মাথার জোর না খাটিয়ে ওড়না খাটানো শুয়ে থাকা মানুষটার গায়ে কষিয়ে ক্যাঁত করে এক পদাঘাত।

ঘাবড়াবেন না, লাথি মেরে ঘুম ভাঙানোটা এমন কিছু খারাপ ব্যাপার না। এটা আমাদের বাঙালি বাড়ির বাবাদের প্রতিদিন সকালের মনের ইচ্ছে যে ঘুমন্ত অকর্মণ্য অপদার্থ কয়লামুখো লাঙ্গুলবিহীন শাখামৃগ সদৃশ্য নিশাচর পুত্রসন্তানটিকে এরকম কালযবনের স্টাইলে পদাঘাত করে ঘুম থেকে তোলে। ইচ্ছেপূরণ হয় না মায়েদের জন্য।

কালযবনের লাথি খেয়েই মুচুকুন্দের কালঘুম ভেঙে যায়। উঠেই বলে, “কে র‍্যা, আমার কাঁচাঘুমকে খাঁচাছাড়া করলি?”

আর তারপরেই মুচুকুন্দ ‘দেখো রে নয়ন মেলে’ স্টাইলে চোখে খুলতেই চোখ থেকে লেজার লাইট বেরিয়ে কালযবনকে ভস্ম করে যমের ভবনে পাঠিয়েদিল। গুহার ভিতরে কালযবন শেষ, মুচুকুন্দ সম্ভবত আবার ঘুমিয়ে পড়ে। কৃষ্ণ গুহা থেকে বেরিয়ে বাড়ি যায়। জরাসন্ধের এই প্ল্যানটাও মাঠে… না না গুহায় মারা গেল। আক্ষরিক অর্থেই মরে গেল।

এই গল্পটাই আবার আরেক জায়গায় কারণটা অন্যরকম বলা আছে। সেখানে কালযবন একেবারে সুভদ্রাকে কিডন্যাপ করে ফেলেছে। মাঝে অর্জুন বাধা দিতে গেলে অর্জুনকেও আড়ংধোলাই দিয়েছে। কিন্তু অর্জুনও ছাড়ার পাত্র নয়। দুজনে চুলোচুলি করছে। এমন সময়ে কালযবন একদম পাক্কা ভিলেনের মতন সুভদ্রাকে ধরে সমুদ্রে ফেলে দেয়। মনে রাখতে হবে এই মারপিটটা দ্বারকায় হচ্ছিল। সম্ভবত সমুদ্র সৈকতে। সুভদ্রাকে বাঁচাতে অর্জুন জলে ঝাঁপ দেয়, কিন্তু ওই যে বলেছিলাম আর্যদের সাথে সমুদ্রযাত্রা বা সমুদ্রসন্তরণ আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্কের মতন। সুভদ্রা আর অর্জুন জলে ডুবে যেতে থাকে। ডুবে ডুবে দুজনে জল খাচ্ছিল আর কি? কদিন পরেই বিয়ে হবে।

কৃষ্ণ সেখানে দাঁড়িয়ে সমুদ্রে পা দিতেই সমুদ্র দুইভাগ হয়ে যায়। আর তলায় খটখটে ডাঙা ধরে সুভদ্রা আর অর্জুন উঠে আসে। মাঝে যত কোটি কোটি মাছ, তিমি, জেলিফিশ, মরল সেগুলোকে ধরতে হবে না। অর্জুন বেঁচে গেছে তো, ব্যস্! এরপরে কালযবনকে শায়েস্তা করতে কৃষ্ণ তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে পালায়। বাকি গল্পটা অবিকল এক। লাথি মেরে কাঠি করায় কালযবনের প্রাণপাখি উড়ে যাওয়ার কাহিনিটা একই। এই সমুদ্র ভাগ হওয়া, ও মথুরাবাসীদের সবাইকে নিয়ে দ্বারকায় চলে যাওয়ার গল্পের সাথে অদ্ভুতভাবে মোজেসের সমুদ্রভাগ করা ও ইজরায়েলিদের নতুন দেশে নিয়ে যাওয়ার মিল আছে। খুব সম্ভবত কৃষ্ণের গল্প থেকেই মোজেসের ওই গল্প অনুপ্রেরণা পেয়েছিল। ভেবে দেখার মতন বিষয়।

ভীষ্ণ শক—ভীষ্মক

দুরাচারী—দূরের আচার খেয়ে নেয় যে

শাম্ব-থাম্ব-জাম্বো—নামব-আনব-টানব

কেসটা কেষ্টা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *