বালকৃষ্ণের মারামারি লীলা
ইতিহাস পড়েছেন? নিশ্চয়ই পড়েছেন। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, কখনও না কখনও আপনাকে ইতিহাস পড়তেই হয়েছে। যারা বিজ্ঞানের ছাত্র তারা ঢেঁকিগেলা করে কয়েকটা ইতিহাসের ক্লাস পার করে দিতেন, আর যারা ইতিহাস ছাড়া বাকি আর্টসের বিষয় নিয়ে পড়তেন তারাও ইতিহাসকে রীতিমতো ভয় পেতেন, এই আমার বিশ্বাস। ভয়ের বিষয়ই বটে। কে কবে নিজের বিষয়-আশয় বাড়ানোর জন্য অন্যকে ভয় দেখিয়েছে, মারামারি-কাটাকাটি-ফাটাফাটি করেছে… আর তাদের সেইসব কীর্তির সাল-তারিখ মুখস্থ করে আমাদের পরীক্ষার খাতায় লিখতে হয়। ভয়ানক নয় ব্যাপারটা? মনুষ্য ইতিহাস যে মূলত হিংসের ইতিহাস, এটা বিশ্বাস হয় না? আপনি ইতিহাস ঘেঁটে দেখুন, খালি অশান্তি আর অশান্তি। কোনো এক বিখ্যাত মানুষ বলেছিলেন, “মানুষের ইতিহাস আসলে মানুষের যুদ্ধের ইতিহাসই…”
আলপিনের মতো প্রায় নগণ্য শান্তির ইতিহাস খুঁজতে গেলেও আপনাকে ওই অশান্তির খড়ের গাদাতেই খুঁজতে হবে। শুধু শান্তির ইতিহাস লেখা হয়নি। এমনকি যারা শান্তির প্রচারক, তারাও যতক্ষণ একটা অশান্তির মধ্যে পা না গলিয়েছে ততক্ষণ তাদের শান্তির বাণী এবং তারা নিজেরা বিখ্যাত হননি। আছেন… খুব কম সংখ্যক মহাপুরুষ আছেন ইতিহাসে যারা সারাজীবন শান্তি অনুসরণ করে গেছেন, এবং তাদের মহাপুরুষ হয়ে পরিচয় পেতেও শতাব্দীখানেক লেগে গেছে। আর এই অশান্তি মানে শুধুই ঢাল তলোয়ারবন্দুক নিয়ে যুদ্ধ নয়। এই অশান্তি যিনি ইতিহাসের মুখ্য চরিত্র তার মনের অভ্যন্তরেও আবার তার বাইরে সমাজেরও। প্রত্যেকটা ইতিহাসের ঘটনাই একজন মুখ্য চরিত্রকে ঘিরে লেখা হয়। সময় সময় গল্পের মতো মুখ্য চরিত্র পরিবর্তন হয়ে যায়, আর ইতিহাসও লাফিয়ে লাফিয়ে গল্প বলে যায়। যেমন আমাদের স্কুলপাঠ্যে একটা সিংহভাগ মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে। সেখানে একই বংশের সাত পুরুষকে ঘিরে প্রায় চারশো বছরের ইতিহাস লেখা হয়েছে। রীতিমতো ভাড়া করে লোক রাখা হত যাতে ইতিহাস সেই শাসককেই ঘিরে লেখা হয়। ইতিহাস এও বলছে যে মানুষের বিগত সাড়ে তিন হাজার বছরের ইতিহাসে মাত্র দুশো আটষট্টি বছরই সম্পূর্ণ শান্তি বিরাজ করেছে। মাত্ৰ আট শতাংশ। বাকি বিরানব্বই শতাংশ সময়ে এ ওকে মারছে, ও তাকে ধরছে। খালি ধরপাকড় আর ক্ষমতা প্রদর্শনী।
মহাভারতও তাই। মহাভারত থেকে যুদ্ধ বার করে দিলে কি পড়ে থাকে? যদি যুধিষ্ঠিরসহ পাণ্ডবরা ভাবত, “ধুস, যুদ্ধ করে কী লাভ?”…অথবা দুৰ্যোধন যদি ভাবত, “আমরা একশোটা ভাই, আরও ছজন মিলে নাহয় রাজত্ব চালাব…” অথবা ব্যাসদেব যদি ভাবত “আমার সৎ ভাইদের ছেলেপুলে দেব না…” অথবা ভীষ্ম যদি একটু মাথা ঠান্ডা করে ভাবত, “বাবার বিয়ে দেব না, আমিই অম্বাকে বিয়ে করে রাজত্ব করব…” তাহলে মহাভারত আর ‘মহা’ হত না। কয়েকটা চ্যাপ্টারেই চ্যাপ্টা বই হয়ে যেত। এইটা তো মানতেই হবে যে হিতোপদেশ বা পঞ্চতন্ত্র থেকে ঢেরগুণ কৌতূহলোদ্দীপক ও আকর্ষণপূর্ণ হল রামায়ণ ও মহাভারত, কারণ এই দুইটি মহাকাব্যেরই মূল বিষয় হল একটা যুদ্ধ। রামায়ণের ক্ষেত্রেও যতক্ষণ না হনুমান লাফ মেরে সমুদ্র পার করল ততক্ষণ কীরকম যেন ঈশপের গল্পের মতন লাগে। অল্প সল্প রাক্ষস মারার ঘটনা আছে, কিন্তু রামায়ণে যেইমাত্র হনুমানের ল্যাজে আগুন দেওয়া হল, অমনি যেন পাঠকের অন্তরাত্মা জেগে ওঠে। “এই যুদ্ধ লাগল বলে…” এই আশাতেই মানুষ আরও আকৃষ্ট হয়। যারা ভক্তিভাবে রামায়ণ-মহাভারত পড়েন তাদের সংখ্যা কম। সবাই ওই মাঝের অ্যাকশনটাই চায়।
আপনার চেনাজানার মধ্যে জিজ্ঞেস করে দেখুন, রামায়ণে রাবণবধের পরে কি হয়েছিল? অথবা কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের পরে কী হয়েছিল? নিরানব্বই শতাংশ মানুষ বলবেন রাবণ মারার পর সীতার অগ্নিপরীক্ষা, তারপরে ওই লব কুশের জন্ম দিয়ে সীতার পাতালপ্রবেশ। আর মহাভারতে একেবারে যুদ্ধের পরে “পাণ্ডবগণ বহুদিন সুশাসন করিয়া পৌত্রের হস্তে রাজত্ব সঁপিয়া মহাপ্রস্থানের পথে চলিলেন…” এই গোছের লেখা। সঙ্গে একটা ঢালু পাহাড়ের গায়ে খালি গায়ে পাঁচটি পুরুষ ও একটি নারী (শাড়ি পরে, খালি গায়ে দ্রৌপদী পাহাড় চড়বে কী করতে?) প্রাতঃভ্রমণ করতে বেরিয়েছে এরকম একটা ছবি। একটা কুকুরও আঁকা থাকে। এই পৌরাণিক ছবি নিয়ে পরে কখনও লিখব।
কিন্তু আমি তো হরিবংশের গল্প বলছিলাম, হঠাৎ করে এত ইতিহাস নিয়ে পড়লাম কেন? কোথায় কৃষ্ণ জন্ম নিল, এবারে তার ছোটবেলার গল্প বলব, সেই আশায় পড়তে শুরু করলেন… আর কোথায় আমি ইতিহাস পাতিহাস ছাইপাশ জ্ঞান দেওয়া শুরু করলাম। আমার এতটা গৌরচন্দ্রিকা দেওয়ার কারণ এই যে মহাভারত কিন্তু পুরাণে ‘ইতিহাস’ বলেই লিখিত। এবং হরিবংশ যেহেতু মহাভারতের সঙ্গে ডি এন এর হেলিক্সের মতো ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সুতরাং হরিবংশকেও ইতিহাস বলেই ধরতে হবে। বিজ্ঞান, জীবাশ্মবিজ্ঞান, লৌহ-তাম্র যুগের ইতিহাস সব একদিকে সরিয়ে রেখে আপনাকে আগে এটা মাথায় ঢুকিয়ে ফেলতে হবে যে মহাভারত কোনো এক এমন সময়ের ইতিহাস যখন দেবতারা মানুষের সঙ্গে প্রায়ই যোগাযোগ রাখত। সেটা যদি আপনার রূপকথার গল্প বলে মনে হয় তাহলে এই লেখা আপনার জন্য নয়।
বাকিদের জন্য বলতে পারি যে, যে কথা দিয়ে আমি লেখা শুরু করলাম সেই কথা কৃষ্ণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। “ইতিহাসে মুখ্য চরিত্র একটা অশান্তির সঙ্গে যুক্ত না হলে ইতিহাস লেখাই হয় না।” কৃষ্ণের সঙ্গে, বিশেষ করে কৃষ্ণের বাল্যকালের সঙ্গে এই কথা কীরকমভাবে যুক্ত? বুঝিয়ে বলি। ধরে নিন, কৃষ্ণ জন্মানোর পরে কংস যদি না জানতে পারত যে তার মৃত্যুর কারণ গোকুলে সুপারকুল হয়ে বড় হচ্ছে, তাহলে কৃষ্ণ আর পাঁচটা রাখাল বালকের মতোই বড় হত। জেনেছিল বলেই কংস গাদাগুচ্ছের রাক্ষস খোক্কস পাঠিয়েছিল কৃষ্ণকে মারতে। ওইসব রাক্ষসদের না মারলে কৃষ্ণের বাল্যকালের অদ্ভুত অদ্ভুত কীর্তির অর্ধেকও হত না।
এখানে বলা ভালো যে কৃষ্ণের বাল্যকালকে আমরা তিনভাবে দেখতে পারি। এবং দেখবও। প্রথম শ্রেণিতে আসে কৃষ্ণের বধের লীলা। আমরা একটু পরেই বিস্তারিত ভাবে দেখব কৃষ্ণ কাকে কাকে বধ করেছে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে কৃষ্ণের রাজনৈতিক লীলা। হ্যাঁ, ছোট থেকেই রাজনীতিতে পারদর্শী। আর তৃতীয় শ্রেণিতে কৃষ্ণের প্রেম লীলা। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম আর দ্বিতীয় শ্রেণিকে একে অপরের থেকে আলাদা করা মুশকিল। আর প্রেমলীলা আমরা পরের পর্বে আলোচনা করব। আপাতত এই পর্বে মারপিট-ঝাড়পিটের গল্প।
কৃষ্ণের বাল্যকালের গল্প মোটামুটি আমরা সবাই জানি। একদম ছোটবেলায় কৃষ্ণ বসে বসে মাটি খাচ্ছিল। কৃমি হয়েছিল বোধহয় পেটে। যশোদা মা কৃষ্ণকে বলে, “কী খাচ্ছিস? হাঁ কর দেখি!”
শিশু কৃষ্ণ মুখ হাঁ করে যশোদা মাকে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের মতো ব্ৰহ্মাণ্ড দেখাল। সেখানে গ্যালাক্সি, গ্রহ-তারা সব ঘুরছে, নেবুলা উড়ছে, ধুমকেতু ছুটছে, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ ভেসে যাচ্ছে। যশোদা মা এটা দেখে বড়ই আশ্চর্য হন, এবং তার ছেলে যে অ-সাধারণ কেউ সেটা বুঝতে পারেন।
কিন্তু… এখানে আমার মনে দুটো প্রশ্ন ঘুরে ঘুরে আসে। প্রথম প্রশ্ন, শিশু কৃষ্ণ কেন হাঁ করে ব্রহ্মাণ্ড দেখাল তার মাকে? তার মায়ের কি দেবতায় অবিশ্বাস জন্মেছিল? নাকি এটা কৃষ্ণ ইচ্ছে করেই করেছিল, যাতে তার মা আগামী কাণ্ডকীর্তির জন্য তৈরি থাকে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, যশোদা খগমশাস্ত্ৰ জানত না, খগমবিজ্ঞানের ধারেকাছেও তার জ্ঞান ছিল না, কিন্তু কৃষ্ণের মুখের ভিতর দেখে ঠিক বুঝে গেল ওটা ব্রহ্মাণ্ড। কী করে? কেউ বুঝিয়ে দিয়েছিল? হঠাৎ করে সেই যুগে, যখন টিভি ছিল না, সেরকম সময়ে ব্রহ্মাণ্ড দেখে যশোদা সেটাকে ‘ব্রহ্মাণ্ড’ বলে চিনল কী করে? যাক গে, বুঝেছে তো আমার কি, মোট কথা এই গল্প আমরা জানি। আমরা এও জানি বাল্যকালে কৃষ্ণ ভীষণ দুষ্টু ছিল, বন্ধুদের সঙ্গে ননী চুরি করে খেত।
“ম্যায় নহী মাখন খায়ো…ম্যায়নে হী মাখন খায়ো…”
বিখ্যাত ভজন। গল্পও সবার জানা। এ ছাড়াও আমরা আরও কিছু ঘটনা জানি যেগুলো ‘ফাজিলের মহাভারতে’ আলোচনা করা হয়েছে। সেসব গল্প এখানে বলব না।
এখানে শুরুই করব পুতনাকে দিয়ে। সম্ভবত কৃষ্ণের একেই বধ করে নিজের বধের খাতা খুলেছিল। বদগুলো বধ করে কৃষ্ণ সকলকে বাধিত করল। কিন্তু এই সমস্ত গল্পও বড্ড একপেশে ভাবে লেখা। সবাই শয়তান, সবাই খারাপ, আর শুধু কৃষ্ণ-বলরাম ভালো। আমরা যত এগোব এই বইয়ে তত নিরপেক্ষ ভাবে কৃষ্ণ আর বলরামের কার্যগুলো নিয়ে আলোচনা করব। তার কারণ এই লেখা লেখার সময় আমি ভক্তিরসে লিখছি না। আমি কৃষ্ণকে একজন সুপারহিউম্যান শক্তিধারী অবতার হিসেবে দেখছি ঠিকই, কিন্তু তার সব কার্যই যে যথাযথ ও প্রশ্নাতীত, সেটা মানছি না। এখনও সময় আছে, আপনি যদি মনে করেন যে আপনার মনের ভক্তিরস পূর্ণ পাত্রটি আমার আলোচনার ঘায়ে চলকে যেতে পারে এবং ছ্যাকা খেতে পারেন, তাহলে এই লেখা পড়বেন না। আমি ইতিহাস আলোচনা করছি, ভক্তিমূলক লেখা নয়।
যা-ই হোক, গত পর্বে কৃষ্ণ জন্মালো। সবাই খুশি। এখানে একটা ধন্দ আছে। হরিবংশ বলছে বসুদেব কৃষ্ণকে ট্রান্সফার করার পর বাড়ি ফিরে গুপ্তচর দিয়ে নন্দকে খবর পাঠাল, “যে কৃষ্ণ-বলরামকে ব্ৰজতে নিয়ে গিয়ে মানুষ কর…”। নন্দও সেইমতন পদব্রজে ব্রজে গিয়ে বসবাস শুরু করল। তাহলে কৃষ্ণকে বসুদেব কোথায় রেখে এসেছিল? আমরা চারটে জায়গার উল্লেখ পাই। গোকুল, ব্রজ, নন্দগ্রাম ও আম্বাড়ি। সম্ভবত কাছাকাছি পাশাপাশি গ্রাম ছিল যেটা সময়ের সঙ্গে মিশে এক হয়ে গেছে। মোটকথা কৃষ্ণকে নিয়ে যখন নন্দ ব্ৰজে এল তখন গ্রামবাসীরা হ্যাপি, কারণ দলের নেতা এসেছে তাদের গ্রামে থাকতে। গ্রামবাসীরা আনন্দে পিকনিক করে বেশ সুন্দর নেচেকুঁদে বাড়ি গেল। যে গোপিনীরা নেচেছিল, তারা সেদিন ভুলেও ভাবতে পারেনি যে এই নাচ তাদের আরও প্রায় এগারো বছর নাচতে হবে। এবং যার জন্মানোর খুশিতে তারা আত্মহারা হয়ে ‘হা-রে-রে-রে…’ করে খাস আনন্দ করল, সেই কৃষ্ণই একটু বড় হয়ে জ্বালাতন করে তাদের হা-রে-রে থেকে হাড়ে দূর্বাঘাস গজিয়ে চ্যবনপ্রাশ করে ছাড়বে। আমার ধারণা, কৃষ্ণ জন্মানোর থেকেও নন্দকে দলপতি হিসেবে খুশি করার জন্যই এত উচ্ছাস।
এর কদিন পরেই কংস তৎকালীন জিপিএস ব্যবস্থা অর্থাৎ নিজের নিনজা গুপ্তচরদের মারফত কৃষ্ণের লোকেশন জেনে যায়। কংস তখন মায়াবী পুতনা রাক্ষসীকে সিক্রেট মিশনে পাঠায়। “যাও, গিয়ে বেবি কৃষ্ণর গল্প ওখানেই শেষ করে দাও। সরল পরিকল্পনা। সদ্যোজাত একটা বাচ্চা, তাকে স্তনে বিষ লাগিয়ে গরলযুক্ত স্তন দুম করে খাইয়ে চিরঘুমের দেশে পাঠিয়ে দাও। শত্ৰু-আগুনবাঁশ… এগুলো ছোট অবস্থায় কেটে ফেলাই ভালো।” কংসের পরিকল্পনায় কোনো ফাঁক নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল এই পুতনা আসলে কে?
ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ আর মহাভারতে আদি পর্ব পুতনার পূর্বজন্মের দুটো আলাদা গল্প বলছে। প্রথম গল্পও সেই মহাবলী বলি রাজাকে নিয়ে। সেই যে সেই বামন অবতারের দানবীর অসুর রাজা। সেই বলি রাজার একটি মেয়ে ছিল তার নাম রত্নমালা। ওরকম সরল রাজরত্নের একটি রত্নমালা মেয়ে থাকবে তাতে আশ্চর্য কী? বাবার যজ্ঞে বামন অবতারের আবির্ভাবের পরেই রত্নমালা তাকে দেখেই ভাবে, “আহা এই বামনটার মতো আমার যদি একটা বেবি হত, তাহলে তাকে আমি হেভি দুধ খাওয়াতাম…”
ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, ভগবান নাকি সারাদিনে আপনার মনের একটি ইচ্ছে পূরণ করেন। রত্নমালার মনের ইচ্ছেটা ডাইরেক্ট বামন অবতারের মাধ্যমে বিষ্ণু ঠাকুরের অগ্রাধিকার লিস্টে নথিভুক্ত হয়ে গেল। বিষ্ণু রত্নমালার ইচ্ছে পূরণ করার জন্যই নাকি পরের জন্মে তাকে পুতনা রূপ দিল। বোঝো কাণ্ড। একটা সরল ইচ্ছে হয়েছিল মেয়েটার, তাই বলে তাকে রাক্ষসী বানাবে? তাকে যশোদার রোলটা দিতে পারত, নিদেনপক্ষে একটা দাই মা, নয়তো যশোদার কোনো বান্ধবী। তাহলে দিব্যি দুধ খাওয়ানোর ইচ্ছে পূরণ হত। সেসব নয়, কারণ হাজার হোক বলি রাজার মেয়ে। অসুরের জাত। দাও ওকে খরচের খাতায়। বিষ্ণুর অবতারের হাতে (বা মুখে) মার্ডার হয়ে মোক্ষ লাভ হবে তার।
দ্বিতীয় গল্পটা বলে চারুমতী নামে এক ব্রাহ্মণ কন্যার। চারুমতীকে নিয়ে তার বাবা কলাভীরু (কলা দেখে ভয়?) অথবা কালোভীরু (কালো দেখে ভয়?) একবার দেশ ভ্রমণ করছিল। সেই সময়ে সরস্বতী নদীর পাশে ধ্যানরত ঋষি কক্ষিবনকে দেখতে পেয়ে তার সঙ্গে চারুমতীর বিয়ে দিয়ে দিল। মানে ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় দেখল একজন ঋষি। কলাভীরুর মনে হল এই ঋষিটাই আমার মেয়ের বর হওয়ার যোগ্য, দিয়ে দিল বিয়ে। তখনকার দিনে মেয়েদের লাইফ সত্যিই আরও চাপের ছিল। কখন যে রাজকন্যে থেকে ঋষিপত্নী হয়ে যাবে, কখন যে রাজপ্রাসাদ থেকে তপোবনে শিফট হয়ে যাবে, কোনো গ্যারান্টি ছিল না। কক্ষিবনের জন্মের গল্প ঋগ্বেদে আছে। ঋষি দীর্ঘতামস (কতটা দীর্ঘ জানি না) ও কলিঙ্গের রানির হয়ে প্রক্সি দেওয়া দাসী উসীর ছেলে এই কক্ষিবন। কলাভীরু ঝাড়া হাত-পায়ে আবার দেশভ্রমণে চলে গেল। এদিকে কক্ষিবন কিছুদিন সংসার করেই কী এক ভীমরতিতে চারুমতীকে আশ্রমে রেখে অন্য জায়গায় কাজে গেল। বেশ কিছুদিনের জন্য।
এদিকে একলা ঘরে একলা সুন্দরী নারী দেখে এক শূদ্র (শূদ্রই হবে, কারণ ক্ষত্রিয় হলে ব্যাপারটা জমবে না। ব্রাহ্মণ তো নয়ই) চারুমতীকে পটিয়ে ফেলল। এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার শুরু। সেইযুগেও ছিল। ঝিঙ্গালালা ব্যাপার স্যাপার।এরইমধ্যে একদিন কক্ষিবন হঠাৎ বিনা নোটিশে, বিনা চিঠিতে, বিনা টেলিগ্রামে ঘরে এসে হাজির। ঘরে এসে বউয়ের এই কাণ্ড দেখে কক্ষিবনের অক্ষি বন বন করে ঘুরতে লাগল। বনমানুষের মতো চিৎকার করে কক্ষিবন অভিশাপ দিল চারুমতীকে তার মতিচ্ছন্নের জন্য পরের জন্মে সে রাক্ষসী হয়ে জন্মাবে। ব্যস্, চারুমতী দারুণ গতিতে পুতনা হয়ে জন্ম নিল।
আবার বলা হয়, আগের জন্মে পুতনা কংসের বোন ছিল, আর তার সঙ্গে ঘটোদর (ঘটের ন্যায় উদর, বাঙালি ছিল নাকি?) এর বিয়ে হয়। মোট কথা কংসের সঙ্গে পুতনার সম্পর্ক আগের জন্ম থেকেই। এই জন্মে, মানে কৃষ্ণের সময়ে পুতনা কৈটভী রাক্ষসীর মেয়ে হয়ে জন্মায়, আর কংসের দাই-মা (ধাত্রী) ছিল। তাই সন্তানসম কংস যখন বলল, “ও দাই-মা, দেখো না ওই কৃষ্ণটা আমাকে বড় হয়ে মারবে…” তখন পুতনা “দাঁড়া তো, তবে রে…” বলে উড়ে গিয়ে আম্বাড়ি গ্রামে এসে ল্যান্ড করে। তারপর রূপ পরিবর্তন করে সুন্দর মহিলা সেজে যশোদার কাছে যায়। কিছু জায়গায় অবশ্য বলে গভীর রাতে শিশু কৃষ্ণকে পুতনা চুরি করে।
একরত্তি বাচ্চা, তাকে কিডন্যাপ করা কি এমন কঠিন কাজ? পুতনা বেবি কৃষ্ণকে তার গরল প্রলেপিত স্তনর ঘন দুগ্ধ খাওয়াতেই কৃষ্ণ সেই দুগ্ধ মুগ্ধ ও বাকরুদ্ধ হয়ে ঢুকুস ঢুকুস করে খেতে থাকে। পুতনা গাইতে লাগল, “দুধ না খেলে হবে না ভালো ছেলে…”, কিন্তু পুতনা তখনও বোঝেনি যে তার এই গানের পরেই তার নামের আগে চন্দ্রবিন্দু বসতে চলেছে। বেবি কৃষ্ণ চোক-চোক করে দুধ টানছে। এত টানার ফলে বোধহয় পুতনার উরজ একদম সুরযমুখীর মতো প্রস্ফুটিত হয়ে এবং ফুটিত হয়ে দুধ ছাড়াও শরীরের সব তরল বেরিয়ে এল। কিন্তু সেদিন আবার বেবি কৃষ্ণের জন্মের ক্ষিদে পেয়েছে, কীই বা দুধ কীই বা রক্ত? চো চো করে পুতনার শরীরের সব তরল টানছে ছেলে। তরলের সঙ্গে গরল যে কোথায় হজম হয়ে সরলরেখার সূত্র ধরে বেবি মূত্র হয়ে বেরিয়ে গেছে সে খবর কে রাখে?
এদিকে পুতনার অবস্থা কাহিল। দুধ খাওয়াতে এসে ‘অনিচ্ছায় রক্তদান শিবির’ হওয়ার ফলে সে চিৎকার জুড়েছে। অপারেশন ফ্লাড যে এরকম ব্লাডে চলে যাবে সে কথা পুতনা ভাবেনি। এদিকে বেবি কৃষ্ণ একেবারে জোঁকের মতো রক্ত টেনেই যাচ্ছে। পুতনা বেবি কৃষ্ণকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে, মারধোরও দেয় বোধহয়, কিন্তু কৃষ্ণ কেয়ারই করে না। পুতনার সমস্ত জীবনী শক্তি ভ্যাকিয়ুম ক্লিনারের মতো টেনে জীবন থেকে পুতনাকে ক্লিন মানে পরিষ্কার করে দেয়। তারপরে লোকজন এসে অবাক হয়ে দেখে এই কাণ্ড। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করা, আলোচনা করা এসব তো আছেই। থানা পুলিশ হল না। গ্রামের লোক পুতনার দেহটা নিয়ে পুড়িয়ে দিল। এর থেকে দুটো ব্যাপার পরিষ্কার বোঝা যায়। প্রথম ব্যাপার হল, গ্রামবাসীরা তার মানে মোটামুটি জানত যে রাক্ষস আছে, এবং যে-কোনো সময়ে বাঘ-ভাল্লুকের মতো দু-একটা দেখা দিতেই পারে। রামায়ণের পরে মহাভারতে কিন্তু রাক্ষসের সংখ্যা অত্যন্ত কমে গেছে। যে ক’টা বেঁচে ছিল তাদের ‘বিপন্ন প্রাণী’ ঘোষণা না করে মোটামুটি কৃষ্ণ, বলরাম আর ভীম মিলেই সাবড়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় ব্যাপার হল, গ্রামবাসী ওরকম বিশাল টপলেস রাক্ষসীর উপরে বেবি কৃষ্ণকে দেখে নিশ্চয় বুঝে গেছিল যে, এ সাধারণ বালক নয়। সাধারণ বালক হলে পুতনা ওরকম পালক ছাড়ানো মুরগির মতন মরত না। দিন কেটে যায়। এরপরে একদিন যশোদা মা বেবি কৃষ্ণকে নিয়ে কিছু একটা কাজ করছিল। ওই ননী বের করছিল হয়তো। সঙ্গে একটা দুগ্ধপোষ্য মুগ্ধ শিশুকে নিয়ে ঘরের কাজ করা সমস্যার বইকি। ওই সিরিয়ালগুলো দেখে সিরিয়াসলি ভাববেন না যে যশোদা মা সারাদিন জবড়জং সেজেগুজে, ঠোঁটে লিপস্টিক, চোখে মাস্কারা লাগিয়ে বসে বসে শিশুকৃষ্ণের লীলা দেখত। কী অদ্ভুত আর হাস্যকর লাগে সিরিয়ালে দেখানো এই ব্যাপারটা। নন্দ আর যশোদা সারাদিন ধরে গ্যাঁট হয়ে বসে কৃষ্ণের খেলা দেখছে। আরে, ওরা বৈশ্য গোয়ালা ছিল। সেখানে প্রতিটা পুরুষ যেরকম সারাদিন গোরুর পালের দেখাশোনা করত, তেমনই মহিলারাও দুধ দোয়ানো, দুগ্ধজাত বস্তু বানানোর কাজে ব্যস্ত থাকত। মহাভারতকালীন অর্থনীতিতে দুধ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ছিল। তাই বেশিরভাগ সময়েই যশোদা মা কাজেই ব্যস্ত থাকত।
যশোদা সেদিন অতি সাবধানী মায়ের পরিচয় দিয়ে কৃষ্ণকে একটা গাড়ির তলায় শুয়ে রাখে। গাড়ি মানে কিন্তু অ্যাম্বাসাডর গাড়ি নয়। তখনকার গাড়ি মানে হল দুটো বা চারটে চাকা লাগানো কাঠের গাড়ি, যাকে বলত শকট। সেগুলোকে বলদ বা বলদের বদলে ঘোটকের সঙ্গে জুড়ে চালানো হত। এগুলোকে বলে শকট। প্লাগের সকেট নয়… শকট। সেই শকটের তলায় বেবি কৃষ্ণকে শুয়ে দিল মা যশোদা।
এদিকে শকটের পাশে এক মর্কট প্রকট হল। এর নাম বোধহয় কেউ জানতে পারেনি। রাক্ষস…ব্যস… তার আবার অত নাম জানার কী দরকার? পুরাণকারেরা এর নাম দিয়ে দিল শকটাসুর। ভাগ্যিস তখন শুধু শকট ব্র্যান্ডের একটাই গাড়ির মডেল ছিল, নয়তো এখনকার মতো পরিস্থিতি হলে মারুতাসুর, অডাসুর, অ্যাম্বাসাডরাসুর অথবা ন্যানাসুরও হতে পারত। বড় গাড়ি হলে ট্রাকাসুর, ম্যাটাডোরাসুর, জেসাবাসুর, ট্রলাসুর কত কীই না হত। কিন্তু শকটাসুরের ভাগ্য খারাপ ছিল, শুধু শকটেই তার নাম শক্তভাবে বেঁধে দেওয়া হল। এই শকটাসুরকে নাকি কংস পাঠিয়েছিল বেবি কৃষ্ণকে মারতে।
শকটাসুরকে দেখেই বেবি কৃষ্ণ হেসে উঠল, তারপরে পা দিয়ে গাড়িটা আলতো করে ঠেলে দিতেই গাড়ি হুড়মুড় করে শকটাসুরের ঘাড়ে পড়ল। শকটাসুর ওখানেই গাড়ি চাপা পড়ে শেষ। ছোঃ… এটা একটা রাক্ষস হল? কিছু করার আগেই মরে গেল। তাও আবার একটা পার্কিং করা গাড়ি উলটে তার তলায় চাপা পড়ে মরল। চলন্ত গাড়িতে অ্যাক্সিডেন্ট হলে বুঝতাম নাহয়। ব্যাটা রাক্ষস জাতির নামে কলঙ্ক, কোনো কম্মের নয়। বুঝতাম যদি শকটাসুর শকট মাথার উপর তুলে অথবা গড়িয়ে দিয়ে কৃষ্ণকে চাপা দিত। উনি গেছেন গাড়ির আড়াল থেকে উঁকি মারতে, ব্যস্, হাতের সামনে পেয়েই কৃষ্ণ দিয়েছে ওর ঘাড় মটকে। বেবি কৃষ্ণ পায়ের এক লাথিতেই অতবড় গাড়িকে উলটে দিয়েছে, সেই অর্থে আমরা কি কৃষ্ণকে ফ্লিপকার্টের জনক বলতে পারি? না মানে শকট তো ইংরেজিতে কার্ট, আর তাকে ফ্লিপ করে দিয়েছিল। আহা প্রভুর কী দয়া, সব জায়গায় ওনার ছোঁয়া আছে।
শকটাসুর মরতেই গ্রামের লোক আবার এসে মরা রাক্ষসকে দেখে গেল। বেশ ভালোই ব্যাপার চলছে। দুমদাম একেকটা রাক্ষস মরে পড়ে থাকছে। আর কাছাকাছি শিশু কৃষ্ণকে পাওয়া যাচ্ছে। গোয়ালা তো, তাই দুইয়ে দুইয়ে দুধ বের করা ছাড়াও দুইয়ে দুইয়ে চার হিসেব করতেও বেশি সময় লাগল না। ঝট করে ধরে ফেলল কৃষ্ণই করছে এসব। ব্যস্, কৃষ্ণকে ভগবান হিসেবে দেখা শুরু। তবে আমার মনে হয় কৃষ্ণের সুপারপাওয়ার তো ছিলই কিন্তু ঐ রাক্ষসটা বোধহয় তখন ওই গাড়ির পাশ দিয়ে এমনিই যাচ্ছিল। আর কাকতালীয়ভাবে গাড়িটা ওর ঘাড়ে গিয়েই পড়ে। এবং তাই রাক্ষসটা এতইটাই নামহীন, গোত্রহীন যে ওকে গাড়ির সঙ্গেই নাম দিয়ে শকটাসুর নামকরণ করে দেওয়া হয়।
পরপর দুজন ভাড়া করা রাক্ষস নিজেদের কাজে অসফল হয়ে একেবারে প্রাণের বলিদান দিয়ে আসার পর কংস এবার আরেক ঝোড়ো অসুরকে পাঠায় কৃষ্ণকে মারতে। এর নাম তৃণাবর্ত। তৃণ দ্বারা আবর্ত, মানে উড়ন্ত ঘাস দ্বারা নিজেকে আবর্তিত করে রাখে, অর্থাৎ কিনা এই অসুরের সুপারপাওয়ার ছিল নিজেকে একটা টর্নেডোর মতন ঝড়ে রুপান্তর করে ফেলা। এর এত কঠিন নাম না দিয়ে সরাসরি ঝড়াসুর রাখলেই হয়ে যেত। যা-ই হোক, যারা নামকরণ করেছে এটা তাদের ব্যাপার। এই তৃণাবর্ত বিশাল আম্ফান ঝড়ের মতো ধেয়ে আসে গোকুলের দিকে।
কিন্তু তৃণাবর্তেরও একটা পূর্বজন্মের গল্প আছে। বহুদিন আগে সে নাকি সহস্রাক্ষ বলে এক রাজা ছিল। একবার সেই রাজা নিজের একশোটা রাণীকে নিয়ে জলের মধ্যে জলক্রীড়া করছিল। একশো একজন মিলে জলক্রীড়া? কী খেলছিল? স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক সহ ওয়াটার পোলো? যা-ই খেলুক না কেন, খেলা বেশ জমে উঠেছিল। এতটাই জমে উঠেছিল যে জলাশয়ের পাশ দিয়ে ঋষি দুর্বাসা হেঁটে যাচ্ছে সেটা রাজা খেয়ালই করেনি। দুর্বাসাকেও বলিহারি, কিছু যুবক-যুবতি স্নান করছে, তোমার বাপু ওখান দিয়েই যেতে হবে? মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকা উচিত, কোথায় কখন কী দেখে নিজেকে সেই স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা উচিত।
মূল গল্প থেকে একটু সরে গিয়ে এখানে আমার নিজস্ব একটা অভিজ্ঞতা বলি। আমার পিতাশ্রী হলেন সেইরকম মানুষ যিনি জানেন না স্থান বিশেষে সরে পড়তে হয়। বুঝিয়ে বলি… আমি ধূমপান করি না, কিন্তু আমার মাসতুতো পিসতুতো দাদা আর জামাইবাবুরা ধূমপান করেন। সেটা খারাপ কোনো ব্যাপার না, তাদের পয়সায় সিগারেট কিনে তারা তাদের ফুসফুসে ধোঁয়া ভরছে, সেখানে আমার কিছু বলার থাকে না। কিন্তু তারা গুরুজনদের আড়ালে গিয়ে পান করে। একসঙ্গে বারান্দায় বা ছাদে বা বাগানে যেখানে গুরুজনদের আসার সম্ভাবনা কম, সেখানে। বেশিরভাগ গুরুজন যেতও না, তারা জানত। কিন্তু আমার পিতাশ্রী আত্মভোলা মানুষ। খুঁজে খুঁজে ঠিক সেইরকম সিগারেটের আড্ডার মধ্যেই চলে যেত। বাবাকে দেখে সবাই সিগারেট লুকাত অথবা ফেলে দিত, কিন্তু এই ব্যাপার তো দিনের পর দিন হতে দেওয়া যায় না, তাই একদিন বাধ্য হয়ে আমাকে বলতেই হল যে “এরকম জমায়েত দেখলে সেখানে যেয়ো না। ওরা অস্বস্তি বোধ করে।” তাছাড়া সিগারেটের দামও বেশ ভালো। যারা খান তারা জানবেন একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলে দিতে কতটা গায়ে লাগে। ওটা সিগারেট, ধূপ তো নয় যে জ্বালিয়ে রেখে দেওয়া হবে।
সেইজন্য বলছিলাম মানুষের বোঝা উচিত কিছু কিছু জায়গায় কিছু কিছু সময়বিশেষে তার উপস্থিতি সম্মানীয় হলেও সেটা অভ্যর্থনা হয় না। এবং সেই হিসেবে নিজেকে মাঝে মাঝে সরিয়ে নেওয়া উচিত। কিন্তু সেই রাজা সহস্রাক্ষর রাণীদের সঙ্গে জলকেলির সময় দুর্বাসাকে ওখান দিয়েই যেতে হত, আর অল্পবয়স্ক মানুষদের আনন্দ দেখে খুশি হওয়ার বদলে দুর্বাসার মাথায় প্রথমে এই চিন্তা এল যে রাজা আমাকে প্রণাম করল না। বোঝো ঠ্যালা। রাজা যদি তখন জলের তলায় মেহতি করছিলেন চুপি চুপি (সব পুরুষেরাই করে, জলে নামলেই হল, এটা শাশ্বত সত্য) তাহলে সেই অবস্থায় কি প্রণাম করত? তখন আবার দুর্বাসা বলত, “তুই ভুল কাজ করতে করতে প্রণাম করেছিস।” ঋষির মেজাজ তো নয় যেন বারুদের স্তুপের ওপর হ্যারিকেন। দুর্বাসা সঙ্গে সঙ্গে অভিশাপ ঝেড়ে দিল, “তুই রাক্ষস হয়ে জন্মাবি…”
রাজা বলল, “এ কি বিচার?”
দুর্বাসা বলল, “অভিশাপ দিতে এসেছিলাম, অভিশাপ দিয়েছি, এবার বাড়ি যাই। আমার কাজ শেষ, আমি চললাম।”
রাজা বলে, “আরে দাদা একটা উপায় দিয়ে যান…”
দুর্বাসা বলে, “দ্বাপর যুগে তুই হাপর কাটবি ঝড় হয়ে তখন কৃষ্ণের স্পর্শ পেলে তুই মুক্তি পাবি…”
তাই সেই রাজা সহস্রাক্ষ ঝড়াসুর তৃণাবর্ত রূপে গোকুলের দিকে ধেয়ে এল। এদিকে যশোদা মা কৃষ্ণকে আবার কোলে নিয়ে কোনো কাজে যাচ্ছিল। কৃষ্ণ টের পেয়ে যায়, আরেকটা অসুর আসছে। বেবি কৃষ্ণ নিজের ওজন বাড়াতে থাকে। ঘনত্ব বাড়িয়ে নিজেকে মানুষ থেকে একেবারে সীসার মতন ওজন করে ফেলে। যশোদা মা হঠাৎ খেয়াল করে এই সাত কেজির ছেলে নিয়ে বেড়াচ্ছিল, হঠাৎ করে সত্তর কেজি হয়ে গেল কী করে? যশোদা বোধহয় ভাবে যে তার ব্লাড প্রেশার কমে গেছে, তাই ভারী কৃষ্ণকে উঠোনেই শুইয়ে রেখে ঘরের ভিতরে যায়। কিন্তু কাণ্ডজ্ঞানটা ভাবুন। গোকুলে দুবার রাক্ষস মারা পড়েছে, তাও আবার কৃষ্ণের কাছে, অদ্ভুত ব্যাপার সব ঘটছে। কিন্তু তাও কৃষ্ণকে উঠোনে রেখে দিল। তার মানে এটাই মনে হয় যে তখন গ্রামে বাঘ আসার মতন মাঝে মাঝেই রাক্ষস-খোক্কস দেখা যেত। লোকজনের কাছে রাক্ষস এসে মরে পড়ে থাকাটা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু না।
সেই হিসেবে যশোদা মাকে যথেষ্ট সাহসী বলতে হবে। এই যদি আমাদের বাঙালি মা হত, ওসব রাক্ষস-টাক্ষস ছাড়ুন, সামান্য পাড়ার টমি যদি একবার বাচ্চার দিকে ‘গররর…’ করে ডেকেছে, তাহলে সেই বাচ্চাকে একেবারে অষ্টাদশ বর্ষের জন্মদিনের আগে ঘর থেকে বের করবে না, আর যেভাবে হোক বাচ্চাটার মধ্যে বদ্ধমূল এই ধারণা ঢুকিয়ে দেবে যে পৃথিবীর সব কুকুর খারাপ। সেসব অন্য আলোচনার ব্যাপার, কিন্তু ঘটনা হল, মনে করুন আম্ফানের মতন একটা প্রবল ঝড় ধেয়ে আসছে। আর সে যুগে রেডিও, টিভি, মোবাইল কিছুই ছিল না। এমনকি আবহাওয়া অফিসও ছিল না। তাই কেউই জানে না ঝড় আসছে।
এদিকে সেই ঝড়ের রূপে তৃণাবর্ত একেবারে হুলুস্থুল ঘটিয়ে দিল। হাওয়ার দাপটে গোরু, গোরুর মালিক, গোরুর গোয়াল, গোরুর খাবার সব উড়িয়ে নিল। আহা গোরু কেন ধরলাম শুধু? গোটা গোকুলই তো গোরু নির্ভর। সেই গোরু ও কিছু তরু উড়িয়ে তৃণাবর্ত একটা বড় গর্ত করে টপ করে বেবি কৃষ্ণকে তুলে নিল। ছেলেকে বিনা ডানায় উড়তে দেখে যশোদা “হা বাছা…হা বাছা…” করে দৌড়ে বেরিয়ে এল। ঝড়ের পিছনে গ্রামবাসীরা দৌড়চ্ছে। ঝড় একটা বাচ্চা ছেলেকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে, তাকে উদ্ধারের চেষ্টা হবে না? ঝড়ে উড়ে যাওয়া মানুষকে বাঁচায় কীভাবে? ওখানে তো মই টাঙিয়ে নামিয়েও আনা যায় না।
ওদিকে উড়ন্ত সুপারবেবি কৃষ্ণ ঝড়ের সঙ্গে উঠে গিয়েই নিজের ওজন আরও বাড়াতে শুরু করেছে। বাড়াতে বাড়াতে একেবারে ব্ল্যাকহোলের মতো ভারী হয়ে গেছে। আম্ফানের মতো বড় ঝড় হয়েও তৃণাবর্ত হঠাৎ আবিষ্কার করে যে সে ওই বেবিকে তুলে নিয়ে যেতে পারছে না। বেবি তখন হেভি হয়ে গেছে। তৃণাবর্ত ভাবল, “থাকগে বাচ্চা, আমি পালাই… এমনিও এই উচ্চতা থেকে ফেললে বাচ্চা একেবারে মরে যাবে…”
তৃণাবর্ত বেবি কৃষ্ণকে ঠেলে ফেলে দিল। কিন্তু কৃষ্ণও সেয়ানা, এত সহজে কিডন্যাপারকে ছাড়বে কেন? দাঁত কামড়ে কৃষ্ণ তৃণাবর্তকে আঁকড়ে ধরে থাকল। ঘটনা সম্পূর্ণ উলটো ঘুরে গেছে। এখানে অপহরণকারী পালাতে চাইছে, কিন্তু যাকে অপহরণ করা হচ্ছে সে ছাড়ছে না। কৃষ্ণ নিজের ওজন বাড়িয়েই যাচ্ছে। বাড়াতে বাড়াতে বাড়াবাড়ির পর্যায় পৌঁছলে তৃণাবর্ত আর উড়তে পারে না। আকাশ থেকেই সোজা বঁঅঅঅ… করে পড়তে লাগল।
দূর থেকে গ্রামবাসীরা এই দৃশ্য দেখে অবাক। একজন বলল, “ওটা পাখি…”
আরেকজন বলল, “ওটা বিমান…”
যশোদা বলল, “ওটা সুপারবেবি, আমার কৃষ্ণ…”
তৃণাবর্ত রাক্ষস ততক্ষণে একেবারে পপাত ধরণী চ। মাটিতে পড়েই মৃত্যু। তখন তো পোস্ট মর্টেম ছিল না, তাই মৃত্যুর কারণ আকাশ থেকে পড়ার জন্য নাকি বুকের উপর চাপ পড়ার জন্য সেটা বোঝা যায় না। তবে একসঙ্গে দুটোও হতে পারে। গ্রামবাসীরা এসে দেখে রাক্ষসের বুকের উপরে পা ঠুকে চলেছে কৃষ্ণ। আর কোনো সন্দেহই রইল না যে কৃষ্ণর অতিমানবিক শক্তি রয়েছে। তৃতীয় রাক্ষসকেও সবাই মিলে পুড়িয়ে দিল।
আরেকটু ভেবে দেখলে এরকমও ভাবা যেতে পারে যে অন্য কোনো রাক্ষস হয়তো কৃষ্ণকে টার্গেট করে এগোচ্ছিল, আর তক্ষুনি একটা ঝড় চলে আসে। ঝড়ে কৃষ্ণের সঙ্গে রাক্ষসও ঘুরতে থাকে, এবং পড়ে গিয়ে রাক্ষস মরে যায়। গ্রামবাসী ও পুরাণকাররা অত বোঝে না। ঝড় থেকে কুটো খড়ের মতন রাক্ষস পড়েছে, ব্যস… ওই রাক্ষসই ঝড়।
যা-ই হোক, বছরখানেক পরে কৃষ্ণ আরেকটু বড় হয়ে হামা দিতে শেখে। আপনারা যারা যারা বাচ্চা মানুষ করেছেন তারা সকলেই জানেন, হামা দেওয়া শিশু কতটা চিন্তার কারণ হতে পারে। এটা শিশুদের এমন একটা সময় যখন তারা উপলব্ধি করেছে যে অন্যের কোল ও সাহায্য ছাড়াও সে নিজেই নিজের ইচ্ছে মতো গমন করতে পারে। নিউটনের প্রথম সূত্র বলে, একটি চলমান বস্তু যতক্ষণ না বাধা পাচ্ছে ততক্ষণ সে চলতেই থাকবে। হামা দেওয়া শিশুরা নিউটনের সূত্রকে শুধু প্রমাণ করে তাই নয়, প্রমাণ করে নিউ মানে নতুন থিওরি দেখিয়ে জ্ঞান টনটনিয়ে দেবে। কী সেই জ্ঞান? আপনি একটি হামা দেওয়া শিশুকে ছেড়ে দিন, দেখবেন সে যেখানে গিয়ে বাধা পাচ্ছে সেটার উপর দিয়ে অথবা পাশ কাটিয়ে ঠিক আবার চলবে। হামা দেওয়া শিশুকে আটকায় সে ক্ষমতা স্বয়ং ভগবানেরও নেই। আপনি তুলে নিন, আবার ঘন্টাখানেক পরে ছেড়ে দিন, শিশুটি নিজের পূর্বকল্পিত পথেই আবার হামা দেবে। শিশুরা অদম্য ও অকুতোভয় হয়। যতক্ষণ না হামা দিতে গিয়ে কোথায় উলটাচ্ছে বা ব্যথা বোধ করছে ততক্ষন সে চলতেই থাকবে।
কৃষ্ণ হামা দিতে যশোদা মা এই সমস্যার সম্মুখীন হল। যেখানেই কৃষ্ণকে বসায় সে ঠিক হামা দিয়ে ভাস্কো-দা-গামার মতো দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে পড়ছে। বড়ই সমস্যা। ঘরের কাজ করবে কী করে? তাই মা যশোদা কৃষ্ণকে একটা উদুখলের সঙ্গে বেঁধে রাখে। কিন্তু যে কৃষ্ণ হামার আগেই তিনটে রাক্ষসরাক্ষসীকে ধামাচাপ দিয়েছে, তাকে কি বেঁধে রাখা যায়? সুযোগ এবং ফাঁক পেয়ে উদুখল সমেত কৃষ্ণ হামা দিতে শুরু করল। একেবারে হামা মানে এমন হামা দিল মনে হয় কংস মামার ঘাড়ে গিয়ে পড়বে তক্ষুনি। উদুখল টেনে টেনে হামা দিতে দিতে একেবারে জঙ্গলের কাছে পৌঁছে গেল। তারপরে থামল। কেন? ওই যা বললাম একটু আগে, পথের মাঝে বাধা পেল বেবি কৃষ্ণ, থামল। দুটো গাছ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। কৃষ্ণ মাঝখান দিয়ে গলে গেল, কিন্তু উদুখল গেল আটকে। কৃষ্ণের এদিকে অতিমানবিক হি-ম্যান মার্কা পাওয়ার। ওই উদুখলকে দড়ি দিয়ে এমন টান মারল যে গাছ দুটো ধড়াম করে ভেঙে পড়ে গেল। তবে এখানে কিছু কিছু গ্রন্থে লেখা আছে যে ওই পড়ে যাওয়া গাছ থেকে নড়ে যাওয়া দুই গন্ধর্ব বেরোয়। তারা নাকি কুবেরের ছেলে ধুনি আর চমু অথবা নলকুবের আর মণিগ্রীব (মানে গ্রীবদেশ মণির মতো ঝলমল করত হয়তো)। কোন এককালে তারা স্বমহিমায় নারদের সামনে কদর্য নৃত্য করেছিল। মানে পরিধান ছাড়া নিজেদেরকে পরি ভেবে উড়ছিল। নারদ এদিকে ওদের নেংটুপুটু অবস্থা দেখে অভিশাপ দিয়ে দেয়, “তোরা গাছ হয়ে যা…”। ব্যস্, সেই থেকে দুই ভাই গাছ হয়ে গেল। শুনেছিলাম এঁচোড়কে গাছ-পাঁঠা বলে, কিন্তু এরকম পাঁঠার মতন বুদ্ধি নিয়ে ঋষির সামনে উলঙ্গ নৃত্য করে গাছ হওয়া প্ৰথম শুনলাম। যা-ই হোক, অভিশপ্ত দুই কুবেরপুত্র বেরিয়ে এসে কৃষ্ণকে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলেই সোজা স্বর্গে উঠে যায়। ওহ্, কতদিন পরে রোদ-জল-ক্লোরোফিলের বদলে সোমরস খাবে। একেবারে তিরবেগে বেগবান দুই ভাই ভেগে যায়।
এদিকে গ্রামবাসীরা এসে হাজির। অত পুরোনো অত বড় বড় গাছ পড়ে গেছে। দুটো গুঁড়ির মাঝে হামাগুড়ি দেওয়া গুড়গুড়ি ছোট্ট কৃষ্ণ। সবাই আবার অবাক হয়ে যায়। অত বড় তৃণাবভর্তের আম্ফান এসে চলে গেল, গাছ পড়েনি, আজ বিনা হাওয়ায় গাছ দাওয়ায় পড়ে আছে? সবাই স্বীকার করল এই কাজ কৃষ্ণের। কৃষ্ণের নতুন নাম হয়ে গেল দামোদর। দাম মানে দড়ি। কৃষ্ণের উদরে দড়ি পরিয়ে রাখত বলে দামোদর নাম। তার মানে ভাববেন না থানার দারোগা এসে কাউকে অপরাধের জন্য কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে গেলে তাকে আপনি ‘দামোদর, দামোদর…’ বলে ডাকতে পারবেন। পুলিশ হয়তো আপনাকেও অপরাধী ভেবে তুলে নিয়ে যেতে পারে। যা-ই হোক, কৃষ্ণের এই বৃক্ষ উৎপাটন কার্যাবলির পরে গ্রামের লোকেরা গাছের কাঠ কেটে যে যা ফার্নিচার পারল বানিয়ে নিল।
কিন্তু এখানে আমার একটি প্রশ্ন আছে। মানছি উদুখলটা ভীষণ শক্ত ছিল, দুটো গাছের সঙ্গে আটকে চাড় দিলেই গাছ ছারখার হয়ে পড়ে যাবে। কিন্তু প্রশ্নটা হল দড়ি নিয়ে। এত শক্ত দড়ি ছিল যে এত টানাটানিতেও ছেঁড়েনি? সাংঘাতিক শক্ত জাহাজ বাঁধার দড়ি হলে সেরকমটা সম্ভব হয়তো, কিন্তু সেখানেও আরেকটা প্রশ্ন আসে। যশোদার কাছে কৃষ্ণ তো একটা শিশু ছিল। শিশুকে বেঁধে রাখতে জাহাজ বাঁধার দড়ি দরকার? নাকি কৃষ্ণের পূর্ববর্তী কাণ্ড কীর্তি দেখে যশোদা মায়ের মনে বিশ্বাস হয়েছিল যে, এ ছেলে সাধারণ ছেলে নয়, এর জন্য যা করতে হবে বিশাল বড় মেগা স্কেলে করতে হবে। এই গাছ ফেলার ঘটনার পরে বোধহয় যশোদা কৃষ্ণকে নিজের সঙ্গেই বেঁধে রাখত। মানে ওখানে যে কোনো মা থাকলে তাই করত।
কৃষ্ণ আর বলরাম ক্রমে ক্রমে বড় হতে শুরু করে। একেবারে স্বাস্থ্যবান দুটো হাট্টাগোট্টা বাচ্চা। গোটা গ্রামের লোক যখন পারে ধরে চটকে আদর করে দেয়। না, এটা কোথাও লেখা নেই, কিন্তু সত্যি করে বলুন তো কোনো ক্যালেন্ডারে বা ছবিতে অথবা ঘরের নাড়ুগোপাল দেখলে ইচ্ছে করে না বেশ চটকে চটকে আদর করে দিই? ভগবান তাতে কি হয়েছে, বাচ্চাকে আদর করা যাবে না? আমাদের ঘরে পিতলের নাড়ুগোপালের আমার থেকে বেশি যত্ন হয়। শীতকালে গিজারের জল, এসি আর পাখার হাওয়া, চার ডজন জামাকাপড়, সেগুলোর আবার আলাদা কাচার ব্যবস্থা, সে এলাহি ব্যাপার। সর্বশক্তিমান ভগবানকে নিজের ঘরের ছোট্ট শিশু রূপে আদর করে পুজো করা এবং তাকেও পরিবারের একজন মেনে নেওয়া, এ বোধহয় বাঙালি মায়েরাই পারে। এতে কোনো ক্ষতি নেই, বরং ভগবানকে এতটা আপন আর কে করে নিতে পারে? মীরা দেবীর ভাগ্য খারাপ ছিল তাই রাজস্থানে জন্মেছিলেন। বাংলার বাইরে বেশিরভাগ জায়গাতেই ভগবান এক পরম ভীতির কারণ। হ্যাঁ ভীতিই। ভগবানের নামে এই বললে রাগ করবে, ওই করলে রাগ করবে, অমুক দিনে আমিষ খেলে রাগ করবে, তমুক দিনে কমলা রঙের জামা না পড়লে রাগ করবে। সে হাজারো নিয়ম। আমাদের বাঙালির মতন ভগবানকে আপন করে নিয়ে নিজের ছেলের মতো স্নেহ করা, বা নিজের ঘরের মেয়ে জামাইয়ের মতো আদর করা, এ জিনিস একমাত্র এই বঙ্গদেশেই (ওদিকে কথা বলতে পারছি না) সম্ভব। বঙ্গদেশে মীরা জন্মালে ভগবান প্রেমে নিমজ্জিত আরেক প্রাণ পেতাম আমরা।
কিন্তু বঙ্গেও সবকিছু এত সহজ ছিল না। শাক্ত ও অদ্বৈতবাদের বিরুদ্ধে প্রচুর লড়াই করতে হয়েছে বৈষ্ণবদের। সেই আলোচনা এখানে করার নয়। আমার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির ভগবানকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতার ব্যাপারে বলা। কোথায় ছিলাম আমরা? ও হ্যাঁ, কৃষ্ণ আর বলরাম এদিকে বেশ শক্তপোক্ত বাচ্চা হয়ে উঠেছে। আর যেইমাত্র একটু ভাল করে হাঁটতে শিখেছে অমনি দলবল জুটিয়ে এর ওর ঘরে হানা দিয়ে ননী খাওয়া শুরু। শৈশবের বাৎসল্য অনুযায়ী চুরি। আমরা সবাই করেছি ছোটোবেলায়। যারা করেননি তারা জীবনের একটা ভালো অংশ মিস করে গেছেন। ছোটোবেলার চুরির পিছনে মজা ও আনন্দ ছাড়া কোনো কারণ থাকে না। ঘরে হয়তো আম উপচে পড়ছে, তাও অন্যের গাছের আম চুরি করব, অন্যের পুকুরের মাছ লুকিয়ে ধরব। বেগুনখেতে বেগুন চুরি করব। চুরিটাই আসল, কী চুরি করছি, কেন করছি সেটা কোনো ব্যাপারই না। সেই চুরি করতে গিয়ে কতবার মার খেয়েছি। কিন্তু আবার পরেরদিন চুরি করেছি। কৃষ্ণ-বলরাম ও তাদের দলবলের একই দশা।
কৃষ্ণ গোয়ালাদের নেতা নন্দের ছেলে ছিল। তার ঘরে তো ননীর সমুদ্র বয়ে যাওয়ার কথা। চাও না চাও ডেয়ারি কর্পোরেশনের লোকজন হাতে ননী ধরিয়ে দিয়ে যাবে। কিন্তু তাও চুরি করবেই। হাঁড়ি ফাটাবে, লোককে উত্যক্ত করবে, বাড়ি এসে মার খাবে… এ জিনিসের লজিকও নেই, মজাও বলে বোঝানো যায় না। যারা এই নির্মল আনন্দের রস বোঝেনা তারাই কৃষ্ণকে ‘চোর’ বলে। কিন্তু কৃষ্ণের দলবলের অত্যাচার এতটাই বাড়াবাড়ি হল যে মোটামুটি লুকিয়ে চুরি করা ব্যাপারটা এক সময়ে প্রায় ডাকাতির পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছয়। ভুক্তভোগীরা মুক্তমনে এসে যশোদাকে ট্যাঁকশ ট্যাঁকশ করে কথা শুনিয়ে দিয়ে গেল। যশোদাও আমাদের মায়ের মতনই দিল কৃষ্ণকে বেধড়ক পিটুনি। তারপরে একটা লাঠি আর কম্বল দিয়ে বলল, “কাল থেকে গোরু চরাতে যাবি…”
ব্যস্, কৃষ্ণের প্রোমোশন হয়ে গেল রাখাল ডিপার্টমেন্টে। দলের নেতা রাখাল হয়েছে, তাই দলের বাকি ছেলেরা বল পেয়ে দলবল বেঁধে সবাই রাতারাতি রাখাল হয়ে গেল। সব গেল গোরু চরাতে। গোরু চরাতে গিয়ে বাঁশি শেখা, গোপিনীদের কাপড় চুরি, রাসলীলা এসব গল্প পরের পর্বে বলব। এই পর্বটা শুধু মারামারির। রাখাল হয়েই কৃষ্ণ আর বলরাম একদিন গোরু-বাছুরের ভিড়ের মধ্যে একটা ছদ্মবেশী অসুরকে দেখে চিনতে পারে। ছদ্মবেশ মানে, অসুরটা বাছুরের রূপ নিয়ে এসেছিল। আপনারা ভাবছেন যে অত গোরু বাছুরের পালের মধ্যে একটা বাছুরকে কী করে অসুর বলে চিনতে পারল? আরে ভগবানের ব্যাপার স্যাপার, ঠিক বুঝে নিয়েছে গো-ভিড়ের গভীরে লোভী অসুর ভিড়ে গেছে। আর তাছাড়া আমাদের নেতা মন্ত্রীরা যদি ভরা জনসভায় হঠাৎ একজনকে ‘মাওবাদী’ বলে চিনতে পারে, তাহলে কৃষ্ণ ঠাকুর গোরুদের মধ্যে দাঁও-বাদী (মানে সুযোগ বুঝে যে বড় দাঁও মারতে এসেছে) তাকে চিনবে না কেন?
অতএব সেই বৎসাসুরকে (বৎস অর্থে বাছুর। এবারে জিজ্ঞেস করবেন না তাহলে মৎস্য অর্থে মাছুর কেন হয়না? আমি গল্প বলছি, ব্যাকরণ শোনাচ্ছি না) দুই ভাইয়ে আচমকা ধরে উদ্দাম কেলিয়ে-পুটিয়ে দিল। তারপর বাছুরের লাশটাকে ছুড়ে একটা কাঠবাদামের গাছের উপরে টাঙিয়ে দিল। সেই থেকেই বোধহয় ‘গল্পের গোরু গাছে চড়ে’ প্রবাদটি এসেছে। কিন্তু এখানে কয়েকটা খটকা আসে। প্রথম খটকা হল বৎসাসুরকে বোধহয় কংস পাঠায়নি। ওটা এমনিই একটা দলছুট জংলি অসুর ছিল। তাই অনেক গল্পে কৃষ্ণের বাল্যকালের লীলা বলতে গিয়ে বৎসাসুর সহ আরও কয়েকজন অসুরকে আনাই হয়নি। দ্বিতীয় খটকা হল, বৎসাসুর বোধহয় কৃষ্ণ বলরামকে আক্রমণও করেনি। ও বোধহয় এমনিই বাছুর খেতে এসেছিল অথবা শিকার করতে এসেছিল। এইখানে সন্দেহটা আরও ডালপালা ছড়িয়ে যায়। অসুরজাতি তো ইন্দ্রবিরুদ্ধ বীর জাতি। তারা ওরকম গোরুর বেশে ভেসে যাবে কেন? সম্ভবত সেই জনৈক অসুর নিজের গোরু নিতে এসেছিল, বা চুরি করতে এসেছিল। আর মার খেয়ে মরেছে। এই অসুরেরও আসল নাম জানা যায় না। বাছুরের ভিড়ে ছিল, তাই বৎসাসুর।
এখানে প্রসঙ্গ টেনে বলা যেতে পারে যে আর্যদের প্রাণী জগতের সম্পর্কে ধারণা বড় কম ছিল। এটা আমি বলছি না, রাজশেখর বসু মহাশয়ও বলে গেছেন। মৃগ, ঘোটক, মৎস্য ও বৎস্য মানে গোরুর বাইরে কোনো প্রাণীই তারা সেরকম চিনত না। বিশেষ করে মৃগের প্রতি তাদের হেব্বি টান ছিল। বাঁদর দেখে বলল, ‘ওই দেখ, শাখামৃগ’। মানে গাছের শাখা-প্রশাখায় যে মৃগ চলে বেড়ায়। পুরাণগুলো পড়লে ঋষি-মুনিগুলোকে এত উন্নত মনে হয়, অথচ বাঁদরের সঙ্গে হরিণের মিল পেল কী করে কে জানে? বরং শাখামনুষ্য বললে মানা যেত। একই অবস্থা হাতি নিয়ে। আর্যরা হাতি দেখেনি। রামের বাবার বন্ধু লোমপাদ এই বঙ্গভূমিতে হাতি দেখে অবাক হয়ে গেছিলেন। এক বাঙালি (সম্ভবত) ঋষি তাকে হাতি ট্রেনিং শেখায়। কিন্তু হাতি তো ইন্দ্রের বাহন ছিল, তাহলে হাতি দেখে অবাক হল কেন? সম্ভবত তারপরেই হাতিকে পুরাণে রাখা হয়। কিন্তু হাতির নাম আর্যরা রেখে দিল মহামৃগ। আর্যদের বোধহয় মনে হয়েছিল যে মৃগকে ধরে বেশ ভৃগরাজমার্কা মাল্টি ভিটামিন খাওয়ালে সেটা হাতি হয়ে যেতে পারে। কিছু জায়গায় হাতির নাম হস্তমৃগও শোনা যায়, কারণ ওই শুঁড়ের মাথাটা হাতের মতো কাজ করে কিনা।
এইসব কারণের জন্যই আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় ওই বৎসাসুরটা আসলে কোনো অসুরই ছিল না। ওটা কোনো অদ্ভুত দর্শন জন্তু ছিল যে বাছুর শিকার করতে এসেছিল। মানে সাদা হায়েনা হলেও সেটাকে কতকটা বাছুরের মতোই দেখতে লাগে। যেমন কিছু কুকুরকে দেখলেই মনে হয় মাথায় শিং থাকলেই হরিণ হয়ে যাবে। এ জিনিস স্বয়ং লীলা মজুমদার ম্যাডামের দাদা ফল্গুও বলেছিলেন। মোটকথা গোরু চরাতে গিয়ে একটা অদ্ভুত জীবকে দুই ভাইয়ে মেরে ফেলে।
এরই মাঝে একদিন মায়াসুরের ছেলে ব্যোমাসুর এসে হাজির। বোমাসুর নয়, এটা কি পাতি গুন্ডা পেয়েছেন নাকি যে বোম মারবে? এসব হেব্বি পাওয়ারফুল অসুর। ব্যোম মানে আকাশে ঘুরতে পারে যে অসুর। কিছু জায়গায় এর ছবিতে দেখতে পাই এক অতিকায় বাদুড়। বুঝুন… তখনই ব্যাটমান। উফফ, এইজন্য তো আমি ব্যাটমানকে এত ভালোবাসি। অন্য ট্র্যাকে চলে গেছি। সেই বাদুড়মানুষ বা মানুষ বাদুড় (ম্যান ব্যাট, ডিসিতে একটা ভিলেন বটে) কাঁধে মাদুর ফেলে ছদ্মবেশে রাখাল বালক সেজে কৃষ্ণের দলে ঢুকে পড়ে। তারপর ক্রমে ক্রমে একেকটা নিরীহ রাখালকে পাঁকাল মাছের মতো ধরে ধরে কিডন্যাপ করতে লাগল।
এদিকে কৃষ্ণ বুঝেছে “কুছ তো গড়বড় হ্যায়…”। অত চারপেয়ে বাছুরের মধ্যে অসুর চিনে ফেলল, আর দুপেয়ে বন্ধুস্থানীয় রাখালদের মধ্যে একটা ছদ্মবেশী রাখাল চিনতে পারবে না? তার মানে কত রাখাল ছিল ভাবুন, হিসেবই নেই কোনো। কৃষ্ণ যতক্ষণে বুঝেছে যে একটা রাখাল আমাদের দলের না, অন্য দলের কেউ… ততক্ষণে খান দশেক রাখাল হাওয়া হয়ে গেছে। কেষ্ট সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে সেই অচেনা অজানা রাখালের কলার ধরে বলল, “এই যে বিরোধী পক্ষের গুপ্তচর, এটা বীরদের ভূমি। এখানে এসব পেঁয়াজি চলবে না। এমনি পেঁয়াজের খুব দাম, তার মধ্যে আমিষ। পুরাণ রচনাকার কী বলবে, অ্যাঁ?”
কিন্তু কৃষ্ণকে কলার ধরে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সেই গলার মালিক রাখাল নিজের বিকট রূপে ‘হিহিহাহাহাহা…’ করে হাসতে হাসতে প্রকট হল।
কৃষ্ণ বলল, “ওই হাসছিস কেন?”
“জানি না,” ব্যোমাসুর বলে, “আমাদের আবির্ভাবে এরকম বিকট হাসতে হয়। সিরিয়ালে দেখেছি…”
কিন্তু কৃষ্ণ এই সিরিয়াল রাখাল কিলারকে আর সুযোগ দেয় না। রাক্ষসের পা ধরে ধুমধাম ধুমধাম করে কয়েকটা আছাড় মারতেই রাক্ষসের পেটের আচারের সঙ্গে রাখালরা বেরিয়ে আসে। মনে হয় খেয়েই ফেলেছিল, নইলে কিডন্যাপ করছিল কেন? কিন্তু খেয়ে হজম করতে পারেনি। এইজন্য যে-কোনো খাবার ভালো করে রান্না করে চিবিয়ে খেতে হয়, নয়তো আপনার খাদ্যের বন্ধু এসে আপনাকে পিটিয়ে দিলে আপনারও পেট থেকে সব জ্যান্ত খাবার বেরোবে। আমার ধারণা এই ব্যোমাসুরও বৎসাসুরের মতনই নিজের থেকেই রাখাল খেতে এসেছিল। রাখালের কাজ কীরকম ঝুঁকিপূর্ণ ভাবুন। কথা নেই বার্তা নেই, যখন তখন রাক্ষস খোক্কস এসে গপাগপ গিলে নিতে পারে।
ব্যোমাসুরের মার্ডার হওয়ার পর রাখালরা খুশি। কিন্তু আমার মনে কিছু প্রশ্ন আসে। এই অসুরগুলো মারার পরে তাদের লাশ নিয়ে কী করা হত? ওরকমই জঙ্গলে-মাঠে-ঘাটে ফেলে রাখা হত? লোকে সকালে প্রাতঃকৃত্য করার সময় মাঠে দেখত অসুর মরে পড়ে আছে? নাকি কেউ বা কারা এসে সেই মৃতদেহ তুলে নিয়ে যেত? তারপরে ভাবি, এই যে দুটো তিনটে অসুর এসে বেঘোরে প্রাণ দিল, এদের দলের কেউ এসে কিছু বলত না? অসুরকূলের গ্রামের লোকেরা এসে বিক্ষোভ দেখাত না বা হামলা করত না? কেন? সন্দেহ হয়, ততদিনে রাক্ষস-অসুর সব বোধহয় সংখ্যালঘু উপজাতি হয়ে গেছিল। এনডেঞ্জারড স্পিসিস। আরও প্রশ্ন আসে যে, এই যে ধরুন রাখালদের গোরু চরাতে গিয়ে এরকম রাক্ষসের মুখস্থ ও উদরস্থ হওয়ার অ্যাডভেঞ্চার, এগুলো নিয়ে গ্রামে গল্প হত না? তাদের মা-বাবারা উদ্বিগ্ন বোধ করত না? করলে তো রাজার কাছে, মানে কংসের কাছে নালিশ করার কথা যে, রাক্ষসের উৎপাত বাড়ছে, কিছু অ্যাকশন নিন। গোকুলবাসীও কেমন একটা উদার এই ব্যাপারে। এ তো ঘটতেই পারে, এরকম একটা ব্যাপার। আরে তোদের প্রাণের নিকটের ছেলেদের ধরে ধরে বিকট বিকট রাক্ষস নিয়ে যাচ্ছে, আর তোরা নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছিস? আজব লাগে ভাবলে।
যা-ই হোক, সব ব্যাপারে গোকুলবাসীরা নির্লিপ্ত ছিল না। গোরু সংক্রান্ত যে-কোনো ব্যাপারে তাদের টনটনে হুঁশ জেগে উঠত। আর সেরকমই একদিন তাদের হুঁশ ফিরল। কিন্তু সহজে ফেরেনি, একটু ঘুরিয়ে কৃষ্ণকেই ফেরাতে হল। সেটা হল যখন গোরুদের খাদ্য কমে এল। অর্থাৎ গোকুলে ক্রমশ ঘাসজমি কমে আসতে থাকে। এত লাখ লাখ গোরু নিয়ে রোজ চড়ালে ঘাস আর আস্ত থাকে? দুপেয়ে আর চারপেয়ে গোরুর অত্যাচারে গোকুলে তৃণভূমি দূরে থাকুক, তৃণমূল পর্যন্ত উপড়ে খেয়ে নিয়েছে। ক্ষিদেতে গোরুগুলো আরেকটু হলেই গাছে উঠছিল। নয়তো ডারউইন কাকুর থিওরি মেনে জিরাফের মতো লম্বা গলা হয়ে যেত। তখন গোরুকে হয়তো গরাফ বা গ্রাফ বলতে হত। কিন্তু কৃষ্ণ নিজের সূক্ষ্ম বিচার দিয়ে এই ব্যাপারটা বোঝে। তাই এবার কৃষ্ণ গ্রামবাসীকে বোঝায় যে, “এখানে আর ঘাসজমি নেই, চলো অন্য কোথাও চলে যাই… ”
কিন্তু লোকে রাজি হয় না। এটা মানুষের সাধারণ মানসিকতা, শত অসুবিধেতেও ভিটে মাটি ছেড়ে যেতে চায় না। যারা নদীর পাশে থাকে, সুন্দরবনে থাকে… তারা বছর বছর বন্যায় বা বীভৎস ঝড়ের মুখে পড়ে। কখনও কখনও নদীর পাড় ভেঙে ঘরের সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু তাও তারা আরেকটুখানি সরে গিয়ে নতুন বাসা বানায়। নতুন করে সংসার। তারা কিন্তু ওখান থেকে বহুদূরে চলে যায় না। গোকুলের লোকেও তাই ভাবল, একটু তো ঘাসের অসুবিধে। নাহয় দুটো খড় বিচুলিই কেটে দেব। কিন্তু কৃষ্ণ ব্যাপারটা সুবিধের মনে করে না। গোরু আর দুধ হল তখন প্রধান কমোডিটি। যার হাতে গোরু তার হাতে দুধ, আর যার হাতে দুধ তার হাতে ক্ষমতা। সেদিক দিয়ে নাকি বিরাট রাজ্য এগিয়ে ছিল। মহাভারতে ভীষ্ম শরশয্যায় শুয়ে শুয়ে যুধিষ্ঠিরকে গোটা একটা চ্যাপ্টার শুধু গোরু নিয়ে জ্ঞান দিয়ে গেছে। এমনকি একটু যদি ভেবে দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন যে নন্দর ছত্রছায়ায় গোয়ালা গোষ্ঠী এতটাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে একটা বাচ্চাকে মারতে কংসকে রাক্ষস পাঠাতে হয়। কেন বাপু? তুমি রাজা, তার উপরে জরাসন্ধের জামাই… নিজে গিয়ে শিশু কৃষ্ণকে তুলে এনে বধ করে দাও। এত চুপচাপ ভাড়াটে খুনি লাগানোর মানেই হচ্ছে কংস চাইছিল যাতে সাপও মরে আর লাঠিও না ভাঙে। মানে কৃষ্ণ শেষ হবে আর গোয়ালাদের সঙ্গে রাজা কংসের সম্পর্ক যেন খারাপ না হয়।
সুতরাং যার হাতে গাভী তার হাতেই ক্ষমতার চাবি। কৃষ্ণ তাই ‘গোরু বাঁচাও কমিটি’ গঠন করে নিজেই কাজ শুরু করে। বিশেষ কিছুই না, কৃষ্ণ নিজের হাতের লোমগুলোকে ঝাড়তেই সেগুলো থেকে পালে পালে হিংস্র নেকড়ে বেরিয়ে এসে গোকুলে অ্যাটাক করল। যেমন ভালো কথা শোনেনি, তেমনি ঠ্যালা সামলাও। এবার নেকড়ের কামড় খাও। নেকড়েগুলো ঝাঁপিয়ে কামড়ে হাঁস, মুরগি আর কয়েকটা মানুষ তুলে নিল। লোকে অমনি ত্ৰাহি ত্রাহি করে বলল, “চলো সব গোকুল ছেড়ে…”।
কিন্তু অবাক লাগে এটা ভাবতে যে, যে কৃষ্ণকে গ্রামবাসীরা অতবড় বড় রাক্ষস মারতে দেখল, সেই কৃষ্ণকে কিন্তু নেকড়ে ভাগানোর জন্য কিছু উপায় করতে বলল না। তার মানে কিছু কিছু গ্রামবাসীর তখনও মনে সন্দেহ ছিল যে রাক্ষস মরা আর তাদের কাছাকাছি কৃষ্ণকে পাওয়াটা কাকতালীয় ব্যাপার। অথবা তখন প্রায়শই হয়তো আকাশ থেকে ঝরে পড়া মরা রাক্ষস পাওয়া যেত এখানে ওখানে।
গোকুল ছাড়ার সিদ্ধান্ত তো হল, কিন্তু যাবে কোথায়? কৃষ্ণ বলল, “এখান থেকে পঁচিশ কিলোমিটার নর্থ ইস্টে বৃন্দাবন আছে সেখানে চলো…”
গ্রামবাসী বলল, “কিন্তু সেখানে তো বৃন্দ মানে তুলসী গাছের বন…”
“তো ভালো তো, গোরু ঘাসের সঙ্গে তুলসী গাছ খেয়ে তুলসী ফ্লেভারড দুধ পাওয়া দেবে। ইমিউনিটি আর আয়ুর্বেদের নামে দ্বিগুণ দামে বেচা যাবে…” কৃষ্ণ বলে।
“আর আমাদের সারমেয়গণের কী হবে? ওরা তো ডিহাইড্রেটেড হয়ে যাবে…”
“ওদের ব্যবস্থা আমরা করে দেব,” রাখালরা বলে। অতএব কোনো সমস্যাই রইল না। উপরোক্ত আলোচনা আমার কল্পনা প্রসূত, সুতরাং ভাববেন না সত্যিই লেখা আছে। কিন্তু হ্যাঁ, কৃষ্ণ ওই শিশু বয়সেই গোকুলবাসীদের উপরে একটা নেতাসুলভ কর্তৃত্ব বিস্তার করেছিল। সেটার একটা কারণ হতে পারে যে কৃষ্ণের পালক পিতা নন্দ গোয়ালাদের নেতা ছিল। নেতার ছেলে ওই বয়সেই নেতাসুলভ বুদ্ধির পরিচয় দেবে এতে আর আশ্চর্য কি?
বৃন্দাবন বেশ যমুনা নদীর পাশে পিসফুল জায়গা। কয়েক পিস অসুর রাক্ষস ছিল, তাদেরকে গিয়েই কৃষ্ণ বলরাম মেরে ফেলল। এখনকার যমুনা আর তখনকার যমুনার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত। এখনকার সময়ে ওই তাজমহলের পিছনে বয়ে যাওয়া আর দিল্লির ভিতরে আদিগঙ্গার ছোটভাই যমুনা দেখলে কল্পনা করা মুশকিল যে এক সময়ে কি বিশাল নদী ছিল যমুনা। লোকে একসঙ্গে গঙ্গা-যমুনা বলত। এখনও বলে। তার মানে যমুনাও আগে গঙ্গার মত স্রোতস্বিনী ছিল। এখানে জানিয়ে রাখি, যমুনা কিন্তু আগে অন্যদিকে বইত। পশ্চিম দিকে অনেকটা বয়ে যেত। এখনকার যমুনা তখনকার যমুনার ক্ষুদ্র ছায়ামাত্র। যা-ই হোক, বৃন্দাবন বসবাসের জন্য আদর্শ জায়গা। নদীর পাশে বসতি, জলের সাপ্লাই, গোরু চড়ে বেরাবার জন্য অগাধ ঘাসজমি, বাতাসে সর্বক্ষণ তুলসী গাছের গন্ধ ‘ম’-‘ম’ করছে। আর কী চাই? গোকুলবাসীরা কুল কুল ভাবে কুল কুল করে বয়ে যাওয়া যমুনার পাশে বৃন্দাবনে নতুন গ্রাম প্রতিষ্ঠা করল।
কৃষ্ণ-বলরাম তখন শৈশব থেকে পৌগণ্ডতে উত্তীর্ণ হয়েছে। শৈশব মানে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত। পৌগণ্ড হল ছয় থেকে দশ বছর বয়স। কিন্তু বৃন্দাবনে এসেও তাদের কাজ কমল না। তখনকার দিনে বাচ্চাদেরকে তিন বছর বয়স হলেই কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে প্রি-স্কুলে পাঠানো হত না। এখন এসব হয়েছে। প্রি স্কুল, পোস্ট স্কুল ইত্যাদি। তখন শিশুদের শৈশবটাকে উপভোগ করতে দেওয়া হত। তারপরে কৈশোরের প্রাক্কালে গুরুকুলে পাঠিয়ে শিক্ষিত করা হত। সুতরাং নিয়ম মেনে বৃন্দাবনে এসেও কৃষ্ণ-বলরাম আর তাদের দলবলকে আবার রাখাল হয়ে গোরু চরানোর কাজে পাঠানো হল।
নতুন জায়গায় নতুন জঙ্গলে নতুন নতুন ফল খেয়ে আর নতুন নতুন খেলা খেলে শৈশব ভালই কাটছিল। এরই মধ্যে বন্ধু-বান্ধবগুলো একদিন খবর দিল যে জঙ্গলের শেষে একটা তালবন আছে। সেখানে প্রচুর তালগাছে পাকা পাকা তাল হয়। পড়ে পড়ে নষ্ট হয়ে যায় কিন্তু কেউ খেতে যায় না।
বলরাম জিজ্ঞেস করে, “কেন? তাল নষ্ট করা মোটেই কাজের কথা নয়। কত কষ্টে তিলকে তাল করতে হয় আর এরকম তাল তাল তালফল পড়ে থাকলে সেটা খারাপ দেখায়।”
বন্ধুরা বলে ওই তালবনে ধেনুকাসুর থাকে। ও কাউকে কাছে ঘেঁষতে দেয় না।
ধেনুক অর্থ গর্ধভ। আপনারা একে গর্ধভাসুর বা গাধাসুরও বলতে পারেন। গুপী গাইনের সেই তৃতীয় সুর ও ষষ্ঠ সুরের গাধা। কিন্তু আমি ভেবে পাইনা একটা গাধার রূপে অসুর কি ক্ষতি করতে পারে? বিকট ‘হি-হঁ-হি-হঁ” করে চেঁচিয়ে মস্তিষ্ক ড্যামেজ করে দেবে? নাকি জোড়া পায়ে ধাঁই ধাঁই করে লাথি মারবে? বাস্তবিক গর্দভের থেকে আর অন্য কোনোরকম বিপদ দেখি না। সে যত বড়ই সাইজে হোক না কেন, শেষে তো ওটা একটা গর্দভ। তার উপরে মা শীতলার বাহন। আহা রে!
কিন্তু বলরামের তখন তাল খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। সেই তালে বলরাম হাঁটুর উপরে তাল ঠুকতে ঠুকতে চলল তালবনে। পিছনে কৃষ্ণ সহ বাকি বন্ধুরা। আসলে এইসবই হল গৌরচন্দ্রিকা। কৃষ্ণ এতগুলো অসুর-রাক্ষসকে মারল, বলরাম দু-চারটেকে মারবে না? তাহলে আর কৃষ্ণের দাদা হল কী করে? তালবনে ঢুকেই বলরাম হাত-পা ছড়িয়ে কয়েকটা তালগাছ ভেঙে ফেলল। মানে আমাদেরই এলাকা, আমি যা খুশি করব। সঙ্গে সঙ্গে তালবনের পাহারাদার ধেনুকাসুর তালবন কাঁপিয়ে তেড়ে এসে বলরামের বুকে জোড়া পায়ে ধাঁই করে এক লাথি। বলরাম ধেনুকাসুরের পা ধরে ছুড়ে ফেলে দিল তালগাছের মাথায়। একটু আগে আমরা দেখেছিলাম কীভাবে গোরু গাছে চড়তে পারে, আর এবারে আমরা জানলাম কীভাবে গাধাও গাছে চড়তে পারে। ছোটবেলায় আমি একবার একটা গাছে চড়ে আর নামতে পারছিলাম না, তখন আমার পিতৃদেব আমাকে ‘গর্দভ’ সম্বোধন করে বলেছিলেন, “ধেনুক, নীচে অবতরণ করহ…” (চলিত ভাষায়, এই গাধা নেমে আয়)। আমি এতদিনে বুঝি পিতৃদেব সেই সময়ে আমার মধ্যে ধেনুকাসুরের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন হয়তো।
তালবনে গাধা মরতেই রাখালরা হাঁদার মতো খুব খানিক নেচে নিল। ভালোই জীবন… পড়াশোনা নেই, হোমওয়ার্ক নেই, দিনে পাঁচটা টিউশনি নেই, আঁকার ক্লাস, ব্যায়ামের ক্লাস, সাঁতার ক্লাস কিছুই নেই। দিব্যি ঘোরো আর গোরু চড়াও আর অসুরদের মেরে ফুর্তি করো। কিন্তু আসলে আমার মনে হয়, এই ধেনুকাসুরের গল্পটা অতিরঞ্জিত। গোকুলে গোয়ালাদের যখন ব্যবসা বাড়ছিল আর ফুলে-ফেঁপে উঠছিল, তখন তাদের গোরুর সংখ্যা বাড়ে। এবং তাদেরও নিজেদের গ্রামের পরিধি বাড়াতে হয়। ফলে বৃন্দাবন এলাকায় তাদের বসতি শুরু হয়। অথবা আগেই বৃন্দাবনে একটা ছোট বসতি ছিল, সেখানে গোকুলের লোকেরা থেকে বিশাল গ্রাম করে ফেলে। নিজেরাই ভেবে দেখুন না, বৃন্দাবন অত সুন্দরবাসযোগ্য জায়গা হলে খামোখা ফাঁকা ছিল কেন? এটা হতে পারে? আর বৃন্দাবনে যখন দ্রুত লোকবসতি বাড়ে, তখন তারা গোরুদের বিচরণক্ষেত্র বাড়াতে আশেপাশের জঙ্গলও পরিষ্কার করে ফেলে নিশ্চয়। এইরকমই একজায়গায় হয়তো তালবাগান ছিল। গোরুরা তাল খায় না, কিন্তু তাল থেকে গুড় হয়, আর গুড়ও তখন ভালো একটা পণ্য। অতএব, হয়তো বৃন্দাবনবাসী তালবাগান অধিগ্রহণ করে, আর এই ধেনুকাসুরের গল্পটার অবতারণ করে।
যা-ই হোক, পুরাণে যেমন গল্প লেখা আছে, সেটায় ফিরি। এরই ফাঁকে কংস খবর পেয়ে যায় যে কৃষ্ণ নিজের পোস্টাল অ্যাড্রেস পরিবর্তন করেছে। মাঝে হয়তো দু-একটা রাক্ষস পাঠিয়েছিল, কিন্তু তারা গোকুলে গিয়ে ফাঁকা গ্ৰাম দেখে চলে এসেছে। এবারে ফাঁকা গ্রামের বদলে পাকা খবর পেয়ে কংস অরিষ্টাসুর নামে এক রাক্ষসকে পাঠায়। এউ অরিষ্টাসুর আগের জন্মে বরতন্তু (বড় তন্তু নয়) নামে দেবতাদের গুরু বৃহস্পতির শিষ্য ছিল। একদিন মনের ভুলে বরতন্তু গুরুর দিকে পা করে বসেছিল বলে, গুরু বৃহস্পতি বরতন্তুকে একটা বড় জন্তু মার্কা রাক্ষস হওয়ার অভিশাপ দেয়। তারপরে আবার এও বলে দেয় যে ভগবানের হাতে মরলে ওর অভিশাপ কাটবে। এই বরতন্তুই অরিষ্টাসুর হয়ে জন্ম নেয়, আর অনিষ্ট করতে বিশাল বড় এক ষাঁড়ের রূপ নেয়।
সেই ষণ্ডই একদিন বৃন্দাবনের গোয়ালাদের গ্রামে হানা দিয়ে ছানা আর ননী আলাদা করে দিল। শিংয়ে মানুষ ঢুকিয়ে মানুষের ননী বের করে ফেলল। যেখানে যা পারছে উপড়ে দিচ্ছে, গুঁতোচ্ছে। উফফফ, বৃন্দাবনের লোকেদের জীবন তো নয় যেন অ্যাডভেঞ্চার। একটার পর একটা রাক্ষসের আক্রমণ। কৃষ্ণ তখন এসে ষাঁড়টার সামনে দাঁড়াও। চারিদিকে লোকজন “ওলে…ওলে…” করে চেঁচাচ্ছে। না মানে ষাঁড়ের খেলা তো, আর কৃষ্ণ তো ম্যাটাডোরের মতোই দাঁড়িয়ে ষাঁড়কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। তাহলে বৃন্দাবনবাসীর কিঞ্চিৎ স্প্যানিশ বলতে বাধা কই?
কিন্তু সেই ষাঁড় ছুটে এসে কৃষ্ণকে ঢুঁসিয়ে দিল। কৃষ্ণ শিং ধরে আঠেরো পা পিছিয়ে গেল। তারপর ষাঁড় আবার তেড়ে এলে কৃষ্ণ ষাঁড়ের শিংদুটো ধরে আটকায়। তারপর অতবড় ষাঁড়টাকে পাঁইপাঁই করে কয়েকবার ঘুরিয়ে, দিল শিং ভেঙে। তারপর আবার ছুড়ে ফেলে দিল। বেচারা ষাঁড়টা জীবনে কোনোদিন নাগরদোলায় চাপেনি, সে ওরকম চরকির মতো ঘুরে অবাক তো হবেই। পড়ে গিয়েই ভ্যাক-ভ্যাক করে বমি করে ব্লাড প্রেশার ফল করে অরিষ্টাসুর শেষ। একইভাবে কংসের পাঠানো আরেক অসুর অঘাসুরকে কৃষ্ণ মারে। অঘাসুর হল বিশাল সাপ। মানে লাখখানেক অ্যানাকন্ডাকে এক করে দড়ির মতো পাকিয়ে দিলে যে সাইজের সাপ হবে সেরকম সাপ ছিল অঘাসুর। সে বিশেষ আক্রমণ করতে যায়নি। দুটো পাহাড়ের ফাঁকে পাহাড়েরই সাইজের হাঁ করে বসে ছিল চুপ করে। কৃষ্ণের দলবল একেবারে গোরু বাছুর সমেত ওই হাঁ-কে আরেকটা পাহাড়ের গুহা ভেবে সবাই ঢুকে পড়ে। কী খুঁজতে ঢুকেছিল জানি না, কিন্তু ঢুকেই সাপের বিষের প্রভাবে সবকটা অক্কা পায়।
এদিকে কৃষ্ণ আবার খবর পেয়েছে। ভগবানের অবতার বলে কথা, এক নজরেই বুঝে গেল যে ওটা পাহাড়ের গুহা নয় বরং সাপের হাঁ। কৃষ্ণ সর্পের মুখে বীরদর্পে ঢুকতেই অঘাসুর মুখের শাটার বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ঝাঁপবন্ধ হতেই কৃষ্ণ নিজের শরীর বাড়িয়ে সাপের মুখের ভিতরে চাপ বাড়াতে থাকে। যত বড়ই সাপ হোক, নিজের গ্রাসের থেকে বড় হাঁস গিললে যেমন অস্বস্তিতে পড়ে, অঘাসুরেরও সেই অবস্থা হল। বিশাল কৃষ্ণকে না পারছে গিলতে না পারছে উগড়ে দিতে। অনেকটা উটের কুঁজ খাওয়ার মতো অবস্থা। উটের কুঁজ কখনও খেয়ে দেখেছেন? অথবা পায়রার মাংস? না, আমি সেসব মাংস নিয়মিত খাইনা। চাকরিসূত্রে এসব খাওয়ার সৌভাগ্য (বা দুর্ভাগ্য) হয়েছিল। এই দুই রকমের মাংসের একট অদ্ভুত গুণ আছে। বিশেষ করে উটের কুঁজের মাংস (যেটার কাজ লালমোহনবাবুর দৌলতে আপামর বাঙালি জানে)। এই মাংস যখন মুখের ভিতরে দেবেন, এটি চুপসে ছোট হয়ে যাবে। কিন্তু যেই গিলতে যাবেন অমনি আবার বড় হয়ে যায়। ‘খাচ্ছি কিন্তু গিলছি কই?’ এই লাইনটির আবিষ্কার বোধহয় এইরূপ মাংস খেয়েই ভাবা হয়েছে। বেশিরভাগ সময়ে গিলতে না পেরে ওই মাংস লেহন ও চর্বন করেই ফেলা হয়।
অঘাসুরের সেরকম অবস্থাই হল, তফাত শুধু এই ক্ষেত্রে তার খাদ্য, অর্থাৎ কৃষ্ণ বেড়েই যাচ্ছে, বেড়েই যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান কৃষ্ণ যখন প্রায় বর্ধমান মেলের মতো গতিতে বেড়ে গেল তখন অঘাসুরের মুন্ডু গলা ফাটিয়ে ‘ইয়াহু’ বলে বেরিয়ে গেল। সাপের মাথা শেষ হলেই সব শেষ। কোথাও কোথাও শোনা যায় এই তৃণাবর্ত, শকটাসুর আর পুতনা নাকি ভাইবোন ছিল। অঘাসুরের মৃত্যুর পরে কংস কৃষ্ণকে মারতে একটা ঘোড়ামুখো অসুর বা একটা ঘোড়াসুর পাঠায়। এটার নাম কেশী। কি কুন্তলসম নাম। এই কেশীকে বেশি লড়তে হয়নি। বলরাম একটা গাধা মেরেছে, কৃষ্ণ একটা ঘোড়াকে মারতে পারবে না? কেশীঘোড়ার কেশ ধরে ঘুরিয়ে ঘোড়েল ব্যাপার করে ঘোরতর প্রহার করল কৃষ্ণ। শেষে সেই বিকত দানবাকৃতি মুখ বিকৃতি করে কৃষ্ণকে কামড়াতে এলে কৃষ্ণ স্রেফ নিজের বাঁ কনুইটা ঘোড়ার মুখে গুঁজে দেয়। ঘোড়া কি কামড়ে দেয়? পাগলা ঘোড়া হয়তো কামড়ায়, পরীক্ষা না করাই ভালো। অসুর হোক আর যাই হোক, শেষ পর্যন্ত তো ঘোড়াই। গাজর, মুলোর বদলে আস্ত একটা কনুই পেয়ে চেবাতে গিয়েই মস্ত বিপদে পড়ল। ঝরঝর ঝরনার মতো কেশীর দন্তরাশি ঝরে পড়ল। ফোকলা কেশীর মুখের ভিতরে কৃষ্ণের হাতের পেশি বেশি ফুলে উঠতেই ঘোড়াসুর কেশী সেই ক্লেশেই শেষ হয়ে গেল। এই কেশীকে কেস খাইয়ে কৃষ্ণের নতুন নাম হল কেশব।
আরও দুটো ছোটখাটো রাক্ষসকে কৃষ্ণ বলরাম মেরে ফেলে। একটা বকাসুর। বিশাল সাইজের বক। ওটা বক, না সিন্দবাদের রক পাখি নাকি জটায়ুর দূর সম্পর্কের বখাটে বংশধর নাকি শেষ উড়ন্ত ডাইনোসর সেটা জানা যায় না। সত্যি বলছি, যতবার এই বকাসুরের বিবরণ পড়ি এটাকে বকের থেকে বেশি টেরোডাকটিল মনে হয় আমার। হয়তো মহাভারতের সময় ওই এক পিস বেঁচে ছিল। বিপন্ন প্রাণীর তালিকা তখন তৈরি হয়নি, তার আগেই কৃষ্ণের কাছে পাকামি করতে গিয়ে অসুরের খেতাব নিয়ে প্রাণ দিল বকাসুর। এই বকাসুর কিন্তু সেই একচক্রপুরের বকাসুর নয়, যাকে ভীম মেরেছিল। ওই বকাসুরটার নাম শুধু বকাসুর, দেখতে সাধারণ রাক্ষসের মতন। মানে বিশাল মানুষের মতন। তার সঙ্গে বকের সম্পর্ক নেই। ভীমের বকাসুরের পদবি বোধহয় বক ছিল। কেন হতে পারে না? হাতি, বাগ, পাখি, নাগ ইত্যাদি পদবি হতে পারে আর বক পদবি হতে পারে না?
বকাসুর ছাড়া আরেকটা অসুর যেটাকে কংস পাঠিয়েছিল, সেই প্রলম্বাসুর আবার বলরামের হাতে মার খেয়ে মরল। সে আবার রাখাল সেজে খেলাচ্ছলে বলরামকে কাঁধে বসিয়ে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করেছিল। সেই কিডের হাতেই তার চিরন্যাপ হয়ে গেল। মানে বাচ্চার হাতেই চিরঘুম। এইবার সবকে মেরেধরে কৃষ্ণ বলরাম দশ বছর বয়স হলে তাদের দেখা হয় কালিয়ার সঙ্গে। কালিয়ার গল্প আমি ‘ফাজিলের মহাভারতে’ লিখেছি। সেটাই হুবহু তুলে দিলাম নীচে। একই ঘটনা আমি দুইভাবে কী করে লিখি? এবং সেই কারণেই কংসবধের গল্পও আমি লিখব না। এমনকি কংসবধের অংশটুকুও আমি ‘ফাজিলের মহাভারত’ থেকে তুলে দেব না, কারণ যারা ওখানে পড়েছেন তাদের জন্য কিছু পাতা স্রেফ বরবাদ হবে।
বৃন্দাবনের এক ঝিলে এক জীবের উৎপাতে লোকে নাজেহাল। নেকড়ে থেকে বেঁচে ঝিলের দানবের অত্যাচারে লোকজন ঝিলমিল হয়ে গেছে। পাড়ায় একেকটা ছেলে থাকে দেখবেন সবকিছুর মুশকিল আসান। চাঁদা তুলতে হবে, কারোর বাড়ি আগুন নেভাতে হবে, কাউকে পেটাতে হবে, রক্ত দান, পিকনিক, দুঃস্থ সেবা, ছোটখাটো যন্ত্রপাতি সারানো, পুলিশের সঙ্গে ভালো র্যাপো, এই রকমের একটা ছেলে। কৃষ্ণ ছিল এইরকম ছেলে। সঙ্গে তার গ্যাং। ওই পুঁচকে বয়সেই বেশ পপুলার। সে চলল ঝিলের ঝিল্লিকে দেখতে। উপর থেকে শান্ত জল দেখে কৃষ্ণ জলে ডাইভ দিলও। ভালো আন্ডারওয়াটার সাঁতারু আর ডাইভার ছিল। জলের ভিতরে ঢুকে সেই দানবকে দেখতে পেল। ও হরি, এ তো ভারতবর্ষের শেষ অ্যানাকোন্ডা। কালো কুচকুচে তাই অ্যানাকোন্ডার নাম কালিয়া (শোলের ওই গুলিখোর কালিয়া নয়)।
কৃষ্ণ বলল (জলের তলায় উইথ বুদবুদ), “আরে ও কালিয়া, কিতনে লোগো কো খায়া?”
কালিয়া একটা সাপ, অত কথাবার্তা বোঝে না। সিনেমার অ্যানাকোন্ডা আর ডাইনোসরের মতো ‘মানুষ দেখিলেই খাইব’ মেন্টালিটি নিয়ে কৃষ্ণকে তেড়ে এল। কৃষ্ণ কালিয়াকে এক ঘুসি মারল। তারপর শুরু হল লেকের ভিতর ল্যাকল্যাকে বিশাল স্নেক কালিয়ার সঙ্গে কৃষ্ণর কেলাকেলি। কৃষ্ণ চাইলে কালিয়াকে মেরে মাছের কালিয়ার মতো বানিয়ে ফেলতে পারত, কিন্তু এন্ডেঞ্জারড স্পিসিস, হয়তো স্পিসিসের লাস্ট সাপ এটা, তাই মারতে মন চাইল না। গলা ধরে টিপে দিল। হাসছেন? কেন আমাদের সুপারহিট নায়ক যদি গাছের সঙ্গে অ্যানাকোন্ডাকে বেঁধে তাকে পেটাতে পারে কৃষ্ণ তাহলে গলা টিপতে পারবে না কেন? সাপ শ্বাস নেওয়ার জন্য জলের উপর মাথা তুলতে চাইল।
এদিকে অনেকক্ষণ কেটে গেছে। কৃষ্ণ অক্সিজেন ট্যাংক নিয়েও ডাইভ মারেনি। বন্ধুগুলো ভাবল, “গেল, বেশি ক্যারদানি দেখাতে গিয়ে সাপের ভোগে কেষ্ট কেস খেল।” গ্রামবাসীদের ডেকে আনা হল। যশোদা কেঁদেকেটে একাকার। মায়ের মন তো। আমেরিকা-লন্ডন ঘুরে আসুন, তারপর বাড়ি থেকে বেরোতে যান, আপনার মা বলবে সাবধানে যাস, বাইরে কিছু খাস না। যশোদা যতই জানুক ছেলে সুপারহিরো, সাপটাও যে সুপারভিলেন না, কে জানে?
বলরাম অনেকক্ষণ থেকে এসব দেখছে। এবার বলল, “এই কেষ্টা, অনেক ফুটেজ খেয়েছিস, এবারে শেষ কর, ক্ষিদে পেয়েছে।”
কৃষ্ণ সাপের গলার বাঁধন লুজ করতেই সাপ কৃষ্ণকে পিঠে (সাপের কি পিঠ হয়? ওই মাথার উপরটা আর কি) নিয়ে সাবমেরিনের মতো ভুস করে ভেসে উঠল। কৃষ্ণ ওই মাথার উপর দাঁড়াল, কিন্তু কী পিচ্ছিল! আঁশ তো, কৃষ্ণ স্লিপ খেল, কিন্তু সামলে নিল। আবার স্লিপ খেল, আবার সামলে নিল। এভাবে একটা নতুন নাচের ফর্ম আবিষ্কার করে ফেলল। সাপের মাথায় মুনওয়াক, কোথায় লাগে মাইকেল জ্যাকশন! পাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে সবাই কৃষ্ণের নতুন ব্রেকড্যান্স দেখে মোহিত। আহা ছেলেটা কি না পারে! কালিয়া সমুদ্রে ফেরত গেল।
কৃষ্ণ এবার এগারো বছর বয়সে কংসের নিমন্ত্রণ পেয়ে মথুরায় গিয়ে আপন মাতুলকে সর্বসমক্ষে হত্যা করে দাদু উগ্রসেনকে রাজা করে বসাল। এখানে অনেক কান্নাকাটি আছে। কংসের বিধবা বউরা, মা, এবং উগ্রসেন পর্যন্ত অনেক বিলাপ করে। কিন্তু কৃষ্ণ মিষ্টি ভাষায় সবাইকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বেশ সবার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে। শুধু একজনকে কৃষ্ণ বোধহয় হিসেবে ধরেনি। সে হল কংসের শ্বশুর জরাসন্ধ।
