কৃষ্ণের জন্মের গল্প

কৃষ্ণের জন্মের গল্প

কৃষ্ণ ঠাকুরের জন্মের গল্প প্রায় সবাই জানেন। বছর বছর জন্মাষ্টমী তিথিতে কৃষ্ণ ঠাকুরের হ্যাপি বার্থডে ঘরে ঘরে পালন করা হয়। ঘরে ঘরে কৃষ্ণ ঠাকুর আছেন। বড় মূর্তি হোক, ছোট গোপালের মূর্তি হোক, রাধাকৃষ্ণের বাঁধানো ছবি হোক, ক্যালেন্ডার হোক, আলমারির উপরে চুম্বক দিয়ে লাগিয়ে রাখা পুঁচকি স্টিকার হোক… সাধারণ বাঙালি ঘর মাত্রই কৃষ্ণ ঠাকুরের কোনো না কোনো ছবি বা মূর্তি থাকবেই। আর তার সাথে কৃষ্ণ ঠাকুরের জন্মের গল্পও মোটামুটি সবাই জানে।

‘ফাজিলের মহাভারত’-এ লিখেছিলাম মোটামুটি, আজ একটু নাতিদীর্ঘ আলোচনা করব। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয় কংস আগে থেকে খবর পেয়ে গেছিল যে দেবকীর অষ্টম গর্ভজাত সন্তান তাকে শেষ করবে, তাই কংস “চিকিৎসার থেকে প্রতিরোধ বেশি ভালো” সেই পন্থা ভেবে দেবকীর ছেলেদের ধরে মারতে লাগল। কিন্তু কংসকে ফাঁকি দিয়ে কৃষ্ণ জন্মালো, আর বসুদেব ঝুড়িতে করে তাকে যমুনাবুড়ি পার করে যশোদার কাছে রেখে এল। কংস আবার সেটা জেনে গিয়ে অনেক রাক্ষস খোক্কস লেলিয়ে দিল। কৃষ্ণ সব ব্যাটা রাক্ষসকে পিটিয়ে-পুটিয়ে শেষে এগারো বছর বয়সে মামা কংসকে মেরে ফেলে। মূল গল্প এটা।

কিন্তু গল্পের পিছনেও গল্প থাকে। মহাভারত লেখার সময় অত কৃষ্ণের গল্প লেখা যায়নি, কারণ আসল মহাভারতে দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভার (কথাটা স্বয়ম্বর হয়তো, আমি আড়ম্বর বাদ দিয়ে স্বয়ংবর লিখি। পাত্রী স্বয়ং যখন বর বেছে নিচ্ছে আর সম্ভাবনাময় বরেরা যখন বর্বরের ন্যায় মারপিট করছে, সেই সভাকে স্বয়ংবর বলাই যায়) মাঝে কৃষ্ণের এন্ট্রি। তার আগে কোথাও কৃষ্ণ নেই। আমি ব্যাসদেবের মহাভারত বলছি। দক্ষিণ-উত্তর-ভীল-সরলা-বড়ি দেওয়া আলুপোস্ত ইত্যাদি অনেক মহাভারতে অবশ্য কৃষ্ণের কিছু কিছু কীর্তি ওই স্বয়ংবরের আগেই লেখা আছে। কিছু সিরিয়ালে তো আবার দেখা যায় কৃষ্ণ ছোট থেকেই পাণ্ডবদের সাথে খেলছে। সেসব গঞ্জিকাসম সিরিয়াল দেখলে চোখে শৌচালয়ধৌতকারীক্ষারক দিতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ব্যাসদেব যেহেতু মহাভারতে নিজেই একজন প্রধান চরিত্র, তাই তার লেখাকেই আমি প্রাধান্য দিয়ে প্রামাণ্য এই লেখা লিখছি। ব্যাসদেবেরও মনে হয় মহাভারত লেখার পরে মনে হয়েছিল যে ঐতিহাসিক এই গল্পের (মনে রাখবেন মহাভারত কিন্তু ইতিহাস পুরাণ) সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কৃষ্ণকে এত দেরিতে আনা ঠিক হয়নি। তাই তিনি কৃষ্ণের জীবনী নিয়ে হরিবংশ লিখে ফেললেন।

এবার সেই হরিবংশ অনুযায়ী আমি কৃষ্ণের জন্মের গল্প শোনাব। মোটামুটি গল্পের শুরু হয় একটা যুদ্ধ থেকে। দেবতাদের সাথে দানবদের যুদ্ধ। সনাতন ধর্মের পুরাণ নিয়ে বলছি, সুতরাং সেই যুদ্ধে অবশ্যই দেবতাদের জয় হয় এবং দানবেরা পালিয়ে যায় বা আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে যায়। হেরোদের ব্যাপারে কে অত খোঁজ রাখে? সেই তারকাসুরের নেতৃত্বে যুদ্ধে কালনেমি নামে এক দানবকে হেব্বি আড়ংধোলাই দিয়ে বিষ্ণু মেরে ফেলে। তারপরে যে যার নিজস্ব লোকে ফিরে গেলে, কদিন পরেই দেবতারা ব্রহ্মাকে লিডার বানিয়ে হাত জোড় করে আবার বিষ্ণুর কাছে আসে।

বিষ্ণু জিজ্ঞেস করে, “কী ব্যাপার? একেবারে ব্রিগেড নিয়ে হাজির! কী কেস?”

ব্রহ্মা বলে, “কেস একেবারে সুটকেস। ধরিত্রীতে মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক অগ্রগতিতে বেড়ে হেব্বি জ্যাম করে দিচ্ছে। প্রচুর রাজা আর তাদের প্রচুর প্রচুর সেনাদলে ধরিত্রী ছেয়ে যাচ্ছে। প্রায় দিনই এ ওকে কেলাচ্ছে, ও ওর রাজ্য লুটছে। এরম চলতে থাকলে তো কলিযুগ সময়ের আগেই এসে যাবে…”

মোটামুটি কলিযুগ হল একেবারে এলেবেলে যুগ। যত যা কিছু খারাপ, অন্যায়, অপশাসন, অধর্মের কাজ সব কলিযুগে হয়। বাকি যুগগুলোতে একটু এদিক ওদিক বিগড়ালেই দেবতাদের ঘুম উড়ে যেত। তাই দ্বাপর যুগে ধরিত্রীর উপরে বিশাল চাপ হচ্ছে বলে দেবতারা ছুটে এসেছে। ক্রমে ক্রমে যদি মানুষের সংখ্যা বেড়ে বেড়ে শুধু যুদ্ধই হয় আর যজ্ঞের কাজ পণ্ড হয় তাহলে দেবতারা নিজেদের অস্তিত্বের জন্য যজ্ঞ মারফত রেশন সিস্টেম টিকিয়ে রাখবে কী করে?

তাই বিষ্ণু ধরিত্রীর রাজাদের বিনাশ করে ধরিত্রীকে জনসংখ্যার হাত থেকে রক্ষা করতে রাজি হয়। এই কলিযুগে তাহলে কল্কি অবতার কই? জনসংখ্যা তো দ্বাপরের থেকে কয়েক কোটি গুণ বেড়ে গেছে, মিথ্যে আর মূর্খ রাজাতেও ছেয়ে গেছে, প্রকৃতির সাড়ে তেরোটা বাজিয়ে দিয়েছে সবাই মিলে। দ্বাপরের থেকে এখন অনেক অনেক গুণ বেশি অত্যাচার চলছে ধরিত্রীর উপরে, তাহলে কল্কি অবতার আসতে এত দেরী করছে কেন? কল্কি আসার আগেই ভেলকি দেখছি। আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে এসব কারণ ঢুকবে না, আমি বরং গল্পটাই মন দিয়ে বলি।

বিষ্ণু তো রাজি হয়ে গেল, কিন্তু দ্বাপর যুগে কি বললেই অত সহজে অবতার নেওয়া যায়? সেসব সত্য আর ত্রেতা যুগের ব্যাপার ছিল যে ইচ্ছে করলেই অবতার নিয়ে পাপীকে হেঁসে দাও। কিন্তু দ্বাপরে ধরিত্রী (মানে ভারতবর্ষ) থেকে রাজাদের সংখ্যা কমাতে হবে, সে কি আর এমনি দুড়ুম করে কমিয়ে দিলেই হল? তার জন্য লীলা লাগবে, হিসেব নিকেশ লাগবে, এ জন্মের ও জন্মের পাপ-পুণ্য আর অভিশাপের ব্যালান্স শীট নিয়ে বসে মেলাতে হবে। সে এক মহাযজ্ঞ। তাই সমস্ত দেবতা, দেবী সবাইকে ডেকে বলা হল, “তোমাদের অবতার বা অংশ লাগবে এই বিরাট মহাভারত করতে…”

‘ফাজিলের মহাভারতে’ পঞ্চপাণ্ডব, দ্রৌপদী, ধৃতরাষ্ট্র, কর্ণ, ভীষ্ম, অশ্বত্থামা ইত্যাদি অনেকেরই পূর্বজন্মের আর কে কোন দেবতার অংশ সেটা বলেছিলাম। এখন বলব আরও কিছু চরিত্রদের জন্ম নেওয়ার গল্প। পাণ্ডবদের দাদুর গল্প দিয়েই শুরু করি। সে বহুকাল আগের কথা। ব্রহ্মা একবার পূর্ব সমুদ্রের পশ্চিম পারে নিজের নাতি কাশ্যপ আর অনেক মুনিটুনি নিয়ে বসে গল্পগুজব করছে। গল্প মানে ওই পুরাণের গল্পও শোনাচ্ছে। কাজকর্ম কম ছিল, হাত ফাঁকা, কী আর করবে? বেশ জমিয়ে আড্ডা হচ্ছে। এবার গল্প করতে করতে এমন মজে গেছে, বুঝতে পারেনি কখন জোয়ার চলে এসেছে। সে একেবারে গঙ্গা আর সমুদ্রের জল ছাপিয়ে টাপিয়ে ব্রহ্মা আর মুনিদের গায়ে এসে ঢেউ আছড়ে পড়ে আর কি। জোয়ার থেকে বাঁচার জো আর নেই।

এখানে সন্দেহ হয়, ব্রহ্মা কি তার মানে কাশ্যপ সহ অন্য ঋষিদের নিয়ে গঙ্গা আর পূর্ব সমুদ্র মানে বঙ্গোপসাগরের মিলনক্ষেত্রে বসে আড্ডা মারছিল? তার মানে কি গঙ্গাসাগর? কিন্তু আর্যদের কাছে তখন তো এইসব অঞ্চল পক্ষি মানে বাঙালিদের অঞ্চল বলে ব্রাত্য। এমনকি এদিকে এলে নাকি পাপ হত, প্রায়শ্চিত্ত করতে হত এসবও জানা যায়। তাহলে দুটো উপায় হতে পারে। প্রথম হল এই গল্প, এই ব্রহ্মা আর মুনিদের উপরে গঙ্গা আর সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার গল্প এটা এমন একটা সময়ের গল্প যখন সমুদ্র ভূখণ্ডের আরো ভিতর পর্যন্ত ছিল। মনে রাখবেন, যে মন্দার পাহাড়ের গায়ে সাপ পেঁচিয়ে টানাটানি করে সমুদ্র মন্থন করা হয়েছিল, সেই মন্দার (পর্বত, বোস নয়) কিন্তু বিহারের ভাগলপুরে আছে বলা হয়ে থাকে। সুতরাং ধরতে হবে সমুদ্র মন্থনের সময় বিহার জলের তলায় ছিল। জলবিহারের ব্যবস্থা। মন্দার বাজার একটু কেটে গেলেই বিহারের মন্দার পর্বতে প্রমোদবিহার করে আসতেই পারেন।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা হতে পারে যে, এই হরিবংশ, যেটা এখন আমরা পড়তে পাই সেটা ব্যাসদেবের আসল পাণ্ডুলিপি নয়। ওই পাণ্ডুবর্ণের পাণ্ডুলিপির উপরে অনেক পাণ্ডুই নিজেদের লিপি জুড়ে দিয়েছেন। সেটার সবথেকে বড় প্ৰমাণ হল, হরিবংশ বিষ্ণুর অবতারদের কথা বলতে বলতে হঠাৎ বৌদ্ধ ধর্মীদের নিন্দা শুরু করে এক লাইনে, আর বলে যে যাজ্ঞবাল্ক্য এসে সব বৌদ্ধদের পালটে দিয়ে উদ্ধার করে সালটে দেবেন। কেন? কারণ বৌদ্ধরা যজ্ঞ-আহুতির বিরুদ্ধে। এই একটা লাইনেই এত প্রশ্ন মাথায় আসে যে সেসব লিখতে শুরু করলে হরিবংশ এখন তোলা থাকবে, শুধু সেটা নিয়েই আলোচনা হবে। আমি শুধু কয়েকটা প্রশ্ন রেখে যাই, উত্তর থাকলে আমায় জানবেন।

প্রথম প্রশ্ন, এই যাজ্ঞবাল্ক্যই কি সেই যাজ্ঞবাল্ক্য যে বৈশম্পায়ণের ব্রহ্মহত্যার প্রায়শ্চিত্ত নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে অধীত বেদ বমন করেছিল? তাহলে তার সাথে বৌদ্ধদের কী সম্পর্ক? প্রায় হাজার তিন-চার বছরের হিসেব মিলছে না। আবার যাজ্ঞবাল্ক্যের লেখা ‘শতপথব্রাহ্মণ’ও বটে। অন্যদিকে অদ্বৈতবাদী যাজ্ঞবান্ধ্যের কথা জানতে পারছি খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম থেকে অষ্টম শতাব্দীর সময়ে, যে ‘শতপথব্রাহ্মণ’ লিখেছে। তাহলে কি এই যাজ্ঞবাল্ক্যই সেইজন? তাহলে তার গুরুর গুরু ব্যাসদেব হলে মহাভারত কি মোটামুটি গৌতম বুদ্ধের জন্মের আগে আগেই? তাহলে কি হরিবংশ রচয়িতা বৌদ্ধধর্মের উত্থানের সময়কালে এই রচনা করেছিলেন? কারণ হিসেব করে দেখলে হরিবংশ রচয়িতার রাগ হঠাৎ শুধু বৌদ্ধদের উপরেই পড়ল কেন? দূরদর্শী হয়ে ভবিষ্যৎ দেখে ইসলাম ও খ্রিস্টানদের উপরে কোপ পড়ল না কেন? রচয়িতা বোধহয় কল্পনা করতে পারেনি অদূর ভবিষ্যতে ভারতবর্ষে বৈদেশিক ধর্মের প্রভাব কী ব্যাপক হারে ছড়িয়ে সনাতন ধর্মকে কোণঠাসা করে দেবে। সেই ক্ষমতা থাকলে অবশ্যই লিখে সাবধান করে যেতেন।

প্রশ্ন হাজার, উত্তর, তর্ক ও বিশ্বাস অবিশ্বাসের জালের মতো আবদ্ধ। আমি হরিবংশের গল্পও বলতে গিয়ে এত আলোচনা টেনে আনলাম। মূল গল্পে ফিরি। তো সেই গঙ্গা আর সমুদ্রের সংগমস্থলে ব্রহ্মার আড্ডাখানায় জলের তোড় এসে সব ভাসিয়ে দিতে গেলে ব্রহ্মা দাঁড়িয়ে উঠে বলল, “শান্ত হও…”

সমুদ্র সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে শিষ্ট ভাবে মণিমুক্ত জড়ানো রাজার রূপে এসে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওদিকে গঙ্গাও নিজের ঢেউ-টেউ সামলে এসে দাঁড়িয়েছে। ব্রহ্মা বলল, “হেইয়ো… তোমাদের ব্যাপার কী, শুনি? আমাদের আড্ডাকে গাড্ডায় ভাসানোর মতলব?”

সমুদ্রদেব কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ঢেউয়ের গর্জনে কিছুই শোনা যায় না। ব্রহ্মা রেগে গিয়ে বলল, “তোদের দুটোর খুব বাড় বেড়েছে। বাড়াবাড়ি রাখা যাচ্ছে না। যা তোদের অভিশাপ দিলাম, দুটোতেই মানুষ রূপে জন্মাবি।”

সমুদ্ররাজা তো সেখানেই নোনাজলের অশ্রুধারা বইয়ে দিল, গঙ্গাও পড়েছে বিপদে। সমুদ্র বলল, “ও গঙ্গা তুমি, বইছ কেন?”

ব্রহ্মার মন নরম হয়, এবারে সে বলে, “বেশ সমুদ্রদেব, তুমি যখন রাজার রূপে আমার সামনে এসেছ তখন তুমি মানুষ হয়ে জন্মালে রাজা হবে। আর যেহেতু তোমায় ‘শান্ত হও’ বলাতেই তুমি শান্ত হয়েছে তাই তোমার নাম হবে শান্তনু। আর এই গঙ্গাটা তোমার বউ হবে, আট ছেলের মা হয়ে সাইকো হবে আর সাত ছেলেকে ডুবিয়ে মারবে।”

এই ছিল শান্তনু ও গঙ্গার মনুষ্যজন্ম হওয়ার গল্প। আমার মনে প্রশ্ন জাগে, ব্রহ্মা যদি ‘শান্ত হও’ না বলে ‘ক্ষান্ত হও’ বলত তাহলে কি শান্তনুর নাম ক্ষান্তনু হত? যাকগে যা হওয়ার হয়ে গেছে। এদিকে কাশ্যপ ঋষি আরেক কেলো করেছে। বরুণ দেবের যজ্ঞ চলছিল আর সেখানে অনেক দুধেল গায় আহুতি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু কাশ্যপ ঋষি গোরু ভালোবাসত। ওনার সঙ্গে বর্তমান গোরুপ্রেমী দুপেয়ে রাজনৈতিক গোরুদের কোনো সম্পর্ক আছে কি না জানি না, কিন্তু গোরু উদ্ধার করতে কাশ্যপ ঋষি গোরুগুলো চুরি করে নেয়। বরুণদেব খচে ফায়ার। গরমজল আর কি। যজ্ঞের গোরু হরণ? সোজা ব্রহ্মার অফিসে গিয়ে বরুণদেব দিল নালিশ ঠুকে। কাশ্যপ ওর দুই বউয়ের কথায় নাকি গোরু চুরি করেছে। ওই গোরুগুলো বরুণদেবের ফেভারিট, ওগুলো ছাড়া ক্ষীরসাগরের ক্ষীর বানানোর দুধ পাওয়া যায় না, গোরু বাঁচানো ব্রাহ্মণের প্রধান কর্তব্য… ইত্যাদি ইত্যাদি, মানে গোরুর উপরে থিসিসের রিসার্চ পেপার জমা দিয়ে দিল।

‘এফ আই আর’ লিখিয়ে জেনারেল ডায়রি হয়ে গেছে, ব্রহ্মাকে তো অ্যাকশন নিতেই হবে। ব্রহ্মা দিল কাশ্যপকে অভিশাপ, “তুই যেমন গোরু ভালোবাসিস, তেমনি গোয়ালা হয়েই জন্মাবি… সারাজীবন গোরু নিয়েই থাকবি। আর তোর বউগুলোও তোর সাথেই যাবে…”

সেই অভিশাপের জেরে জেরবার হয়ে কাশ্যপ ঋষি বসুদেব পশুদেব (গোরু তো পশুই) হয়ে জন্ম নেয়। আর তার দুই বউ, অদিতি আর সুরভী, যথাক্রমে দেবকী ও রোহিনী হয়ে জন্মায়।

মোটামুটি সব রেডি, এবার বিষ্ণু কৃষ্ণরূপে জন্মালেই হয়। বিষ্ণু অবতার রূপ নেওয়ার আগে নারদের সাথে সমস্ত হিসেব মিলিয়ে নিল। হিসেব মানে, অবতার রূপে গিয়ে কাকে কাকে নিজের হাতে মারবে। কারণ সেই যে সেই দেবাসুরের যুদ্ধ দিয়ে গল্প শুরু করেছিলাম, সেখানে অনেক দৈত্যই মরে গিয়ে আবার মানুষ, রাক্ষস বা অন্য পশুর রূপ নিয়ে জন্মেছে। যেমন কালনেমি মরে গিয়ে কংস হয়ে জন্মেছে, হয়গ্রীব মরে কংসের ঘোড়ামুখো ভাই কেশী হয়ে জন্মেছে। ওদিকে বলিরাজার ছেলে অরিষ্ঠ, সে কাকুদ্মী হয়ে জন্মে সবকে অতিষ্ঠ করে ছাড়ছে। রিষ্ঠ দানব যুদ্ধে মরে গিয়ে আর মানুষ হয়ে জন্মাতে পারেনি। ডাইরেক্ট কংসের হাতি কুবল্যপীঢ়া হয়ে জন্মেছে (বাপরে বাপ এটা হাতির নাম?)। লম্ব দানব প্রলম্ব হয়েছে (একেবারে নিজের কাজে প্রো মানে প্রফেশনাল হয়েছে), খর দানব ধনুক দানব হয়ে জন্মেছে (খরখরে ধনুক ? কাঁটা গাছের তৈরি নাকি?)। বরাহ আর কিশারা বডিবিল্ডার পালোয়ান চানুক আর মুষ্টিক হয়ে জন্মেছে, আর মায়াসুর আর তারা অসুর প্রাগজ্যোতিষে জন্ম নিয়েছে।

সবই তো হল, কিন্তু কৃষ্ণ-বলরাম জন্ম নেওয়ার আগে যে ছ’জন জন্মাবে আর কংসের হাতে মরবে তাদের কোথায় পাওয়া যাবে? অষ্টবসুর সাতজনকে তো প্রায় একইরকম গেস্ট অ্যাপিয়েরেন্স রোলের জন্য ডেকে নেওয়া হয়েছে। এখন আরও ছয়জন ভলেন্টিয়ার কে হবে? এই প্রশ্ন নিয়ে নারদ এসে বিষ্ণুকে জিজ্ঞেস করে, “এখন ছয়জন পাই কই? যারা জন্মেই কংসের হাতে মার্ডার হবে? কয়েকটা পাপী তাপী আত্মাকে পাঠিয়ে দেব? কিছুক্ষণের জন্য জন্ম নিয়েই তো মরবে…”

বিষ্ণু বলল, “না, ছ’জন আমার আগে জন্মাবে, যা-ই হোক, হবে তো আমার দাদাস্থানীয়! ওদের ওরকম এলেবেলে আত্মা দিলে হবে না। বেশ পাওয়ারফুল কাউকে চাই…”

নারদ বলল, “তাহলে উপায়?”

বিষ্ণু বলল, “আছে আছে… সব উপায় আমার আগেই ক্যালকুলেট করা আছে। শোনো তবে… কালনেমির ছ’টা ছেলে আছে। কালনেমি আমার হাতে মরার পরে ওই ছয়জন দলে থেকে কাজ করতে পারছিল না বলে দলবদল করে ব্রহ্মার তপস্যা শুরু করে। এই ছ’জনকে একসাথে বলে ‘সারগর্ভ দানব’ (দেবকীর গর্ভে সার্ভ করার জন্যই বোধহয় এরকম অদ্ভুত নাম)। তাদের নাম হল হংস, সুবিক্রত, দমন, রিপুনর্দন আর ক্রোধহর্তা (ছ’জন বলে পাঁচজনের নাম দেওয়া আছে হরিবংশে। ষষ্ঠ ভ্রাতার নাম জানলে কেউ জানাবেন)। সেই ছ’জন ব্রহ্মাকে পটিয়ে বর নেয় যে ওদের যেন উরগ, যক্ষ, গন্ধর্ব, সিদ্ধ, করণ, বা দেবতা কেউ যেন মারতে না পারে…”

“যাঃ কেলো, তাহলে মারবে কে?” নারদ জিজ্ঞেস করল, “দানব যখন, মারতে তো হবেই…”

“ওদের বাবা ওদের মারবে,” বিষ্ণু বলে, “সারগর্ভদের বর পাওয়া শুনে ওদের দাদু হিরণ্যকশিপু হেব্বি খচে গিয়ে ওদের অভিশাপ দেয়, “যেমন তোরা পালটি খেয়ে দলবদল করেছিস, তোদের অভিশাপ দিচ্ছি তোরা তোদের বাপের হাতেই মরবি, তাও জন্ম হয়েই…”

নারদ বলে, “বুঝে গেছি স্যার, তার মানে ওই সারগর্ভ ছয় ভাই, দেবকী আর বসুদেবের ছ’টা ছেলে হয়ে জন্মাবে, আর কংস রূপে কালনেমি তাদের মারবে, তাই তো? উফফফ কী বুদ্ধি, কী বুদ্ধি!”

বিষ্ণু হেসে বলল, “ওই ছ’জন সেই থেকে জলের মধ্যে ক্রাইয়োস্লীপে গভীর ঘুমোচ্ছে। ওদের জাগানোর সময় হয়েছে।”

এই বলেই নারায়ণ উড়ে গিয়ে জলের ভিতর থেকে ছ’জন ঘুমন্ত ভাইকে বের করে তাদের থেকে আত্মা টেনে বের করে। সেই আত্মাগুলোকে বছর বছর দেবকীর গর্ভে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। সমস্ত ক্যালকুলেশন সেরে বিষ্ণু ক্ষীর সাগরের পাশে সুমেরু পর্বতে গিয়ে যোগসাধনায় বসল। অবতার নিতে হবে যে, একটা মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে না?

এদিকে মথুরাতে কংসের অত্যাচার শুরু হয়েছে। অত্যাচার সেই অর্থে কোথাও লেখা নেই। পারিবারিক অশান্তি করে নিজের বাবাকে জেলে ভরে রাজা হয়ে বসেছিল, সেটাই অত্যাচার। কিন্তু সেরকম তো ঔরংজেবও ছিল। ইতিহাসে এরকম অগণিত রাজা আছে যারা নিজেদের বাপ-ঠাকুরদা-কাকা-ভাই-ভাইপোকে সাইড করে, গুমখুন করে রাজা হয়েছে। কিন্তু রাজা হিসেবে কংসকে অত্যাচারী, শয়তান, অপদার্থ এসব কখনই শোনা যায়নি। বরং তার রাজত্বকালে গোয়ালাদের ব্যবসার বৃদ্ধি দেখে মনে হয় ব্যবসা ও রাজ্যের সুখের ব্যাপারে কংস যথেষ্ট সচেতন ছিল।

কিন্তু কংস নিজের মৃত্যুর ব্যাপারে বিষ্ণুর কায়দা জেনে গেল। ‘ফাজিলের মহাভারতে’ যে গল্পটা বলেছি, সেটা শ্রীমদ্ভগবত থেকে। সেখানে দেবকী আর বসুদেবের বিয়ের সময়ে কংস নিজে বোন আর জামাইয়ের রথের সারথি হয়ে যাচ্ছিল, আর আকাশবাণী বিবিধভারতীতে ভবিষ্যৎবাণী শুনে সেখানেই বোনকে ফিনিশ করে ম্যাটারের ‘দি এন্ড’ টানতে চেয়েছিল। কিন্তু বসুদেব ঠিক সময়ে ডিপ্লোম্যাটিক গেম খেলে বলে, “দেবকী আর আমাকে মারলে কিন্তু আমার বংশের সবাই এসে তোমাদেরকে কেলিয়ে যাবে।”

বসুদেবের পরিবারের শাখা-প্রশাখার ব্যাপারে আগেই বলেছি। যদি বুঝে না থাকেন, বংশতালিকা দেখুন। যাদবগোষ্ঠীর যথেষ্ট বলশালী ব্যাকআপ ছিল বসুদেবের, তার উপর তার বোন এখন হস্তিনাপুরের রাজার বউ। মানে হিসেব তো তাই বলছে। কৃষ্ণ আর অর্জুন সমবয়সি ছিল। তার মানে বছরে একটা করে বাচ্চার জন্ম ধরলে, দেবকী আর বসুদেবের পঞ্চম বা ষষ্ঠ সন্তানের সমান হল যুধিষ্ঠির। তাহলে মোটামুটি ধরে নেওয়া যেতে পারে যে দেবকীর বিয়ের সময় বা তার কিঞ্চিৎ আগে পরেই কুন্তীর বিয়ে হয়ে গেছে। কংস অনেক ভেবেচিন্তে দুজনকে না মেরে কারাগারে বন্দি করে রাখে। এটাই প্রচলিত গল্প, এটার ভিত্তিতেই যত সিনেমা সিরিয়াল বানানো হয়। এমনকি বর্তমান মথুরায় কংসের কারাগার পর্যন্ত লোকে দেখতে যায়।

কিন্তু হরিবংশ একটু অন্যরকম গল্পও বলছে। সেখানে দেবকী আর বসুদেবের বিয়ে হয়ে গেছে। কংসও দিব্যি নিজের রাজত্ব সামলাচ্ছে। এমন বসন্ত দিনে হঠাৎ কংসের বাগানে নারদ এসে হাজির হয়। দেবতা আর কবিরা মাঝে মাঝেই এরকম আচমকা সারপ্রাইজ অডিটরের মতন এসে যেত। তাও আবার মেইন গেট দিয়ে নয়, কখনও বাগানে, কখনও ছাদে। নারদ এসেছে শুনেই কংস দৌড়ে গিয়ে ওনাকে খাতির করে। কিন্তু নারদ বলে, “দাদা, তোমার জন্য ব্যাড নিউজ আছে। আমি ব্ৰহ্মলোকে গেছিলাম, সেখানে শুনলাম ব্রহ্মা, দেবতারা আর বিষ্ণু সবাই মিলে তোমাকে পটকে দেওয়ার মতলব ভাঁজছে…”

কংস চিন্তিত হয়ে বলে, “যুদ্ধ হবে?”

“না না…” নারদ বলে, “সেসব সরাসরি হলে তো হয়েই যেত। তোমাকে মারার জন্য বিষ্ণু অবতার নিয়ে আসছে…”

“আচ্ছা?” কংস বলে, “তাকে চিনব কী করে? কিছু হিন্ট দাও…”

“হিন্ট? সূত্র?” নারদ ভেবে বলে, “এটুকু সূত্র জানি যে দেবকীর অষ্টম পুত্র তোমায় মার্ডার করবে। এর বেশি বলার পারমিশন নেই আমার…”

“আমার কী করা উচিত?”

“তোমার?” নারদ বলে, “তুমি বাপু ধম্মেকম্মে মন দাও। মরার আগে যেটুকু পারো পুণ্য কামিয়ে নাও। সময় তো হয়েই এল।”

এই বলেই নারদ অদৃশ্য হয়। কীরকম দুমুখো গুপ্তচর! কিন্তু নারদ যেতেই কংস ভাবে, “হুহ, আমাকে ভয় দেখানো? আমি নাকি ভয়ে ধম্মকম্ম করব। এ শর্মা কাউকে ডরায় না। জো ডর গয়া সমঝো মর গয়া, ডরকে আগে জিত হ্যায়…”

কিন্তু জিত কই? হারের ভয় নেকড়ে বাঘের গলায় ফোটা হাড়ের মতন খচখচ করতে থাকে। জিততে তাকে হবেই। ভাগনের হাতে মার খেয়ে মরবে? এ আবার কোনো কাজের কথা? লোকে কী বলবে? ভাগনে এসে ভাগাভাগি করে দিল? আগে থেকে জেনেও কংস নিজের বংশের হাতেই বংশ নেবে?

এইসব ভেবে কংস নিজের মন্ত্রীদের সাথে মিটিং করে গোপন প্ল্যান বানায়।

সেই প্ল্যান অনুযায়ী দেবকীকে সর্বক্ষণ অন্দরমহলে রাখা হবে, আর সেখানে পরিচারিকারা দেবকীর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থা থেকে দিন গুনতে শুরু করবে। যেইমাত্র একেকটা বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হবে, কংস তাদের ধূমিষ্ঠ মানে ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দেবে। কিন্তু এসব প্ল্যান যেন বসুদেব না জানে, তাই বসুদেবকে সুখস্বাচ্ছন্দ্যে ঢেকে রাখা হল। অর্থাৎ শ্রীমদ্ভগবতে যেটা দুঃখের কারাবাস, হরিবংশে সেটাই বিলাসবহুল ছাড়াবাস, কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই কংস হল ঝাড়া বাঁশ।

কিন্তু এখানে বারবার একটা প্রশ্ন আসে যে, কংস যদি জানতই যে দেবকীর অষ্টম সন্তান তাকে মারবে, তাহলে দেবকী আর বসুদেবের মিলন হতে দিত কেন? দুজনকে একেবারে আলাদা আলাদা রাখলেই হত। নয়তো আরো অনেক উপায় ছিল। আমি কংসের জায়গায় থাকলে বসুদেবকে অজ্ঞান করে তার ভ্যাসেকটোমি করে দিতাম। বন্দি করার থেকে নসবন্দি করা ভালো। নাও, ঠ্যালা সামলাও। এমনিতেই প্রচুর রাজা-রাজড়ার পঞ্চাশটা করে বিয়ে করেও ছেলেপুলে হত না, তাদের ভিড়ে বসুদেবের নামও যোগ হত। কিন্তু না, কংস সেসব দিকে গেল না। কারণ?

কারণ কংস বেশ পণ্ডিত মানুষ ছিল, প্রচুর রিসার্চ করে রেখেছিল। সে জানত যে নারায়ণ যখন একবার প্ল্যান করেছে কংসকে মারার তখন যে করেই হোক টুকটুক করে বাই হুক অর ক্রুক অর লুক দিয়ে সেটা করেই ছাড়বে। বুঝলেন না? সেবার মাছ হয়ে হুকে করে নৌকা টেনে নিয়ে গেছিল। তারপর হিরণ্যকশিপুর অসম্ভব বরের মর্যাদা রেখে তাকে মারার জন্য হাইব্রীড নরসিংহ হয়েছিল। সেটা তো একরকমের ‘ক্রুক’ মানে চালাকি। আর রইল বাকি লুক। বামন অবতার সেজে কেমন গোবেচারা লুক দিয়ে ত্রিভুবন জয় করেছিল বিষ্ণু। তাই কংস ভাবল, বিষ্ণু জন্ম নিক আগে। তারপরে তাকে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই অসহায় অবস্থায় মেরে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। একেবারে আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই বেয়ারিং পোস্টে বিষ্ণুলোকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া। নিরীহ শিশুরূপী বিষ্ণুকে যখন হারানো যাবে, তখন খামোখা কেন চালাকি করে বিষ্ণুর মতো পাওয়ারফুল দেবতার প্ল্যানে বাগড়া দেওয়া? আগে জন্মাক, তারপরে ধর তক্তা মার পেরেক।

কিন্তু পেরেক আগেই তক্তার উপরে বক্তা নারায়ণ ঠুকে রেখেছিল, শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল। দেবকী কারাগার বা অন্দরমহলে যেখানেই হোক যখনই সন্তান জন্ম দিতে থাকে, কংস তাদের নিয়ে গিয়ে কিছু একটা করে হাপিশ করতে থাকে। আমি সরাসরি ‘মেরে ফেলে’ বলছি না কারণ সে বড় কঠিন দৃশ্য। অন্যদিকে কংসের সাথে গঙ্গাকে তুলনা যদি করেন, দুজনেই কিন্তু নিজেদের সন্তানদের (পূর্বজন্ম বা বর্তমান জন্মের) না জেনে বা জেনে হত্যা করে। আমি এর পিছনে দৈবিক কারণগুলো যদি সরিয়ে রাখি, তাহলে শুধু এরকম ভাবে ভাবুন যে কংস নিজের অস্তিত্ব ও ক্ষমতা রক্ষার স্বার্থে নিজের ভাগনে-ভাগনিদের জন্মের পরেই মেরে ফেলছে। অন্যদিকে গঙ্গা জেনেশুনে নিজের সাতটি সন্তানকে জলে ডুবিয়ে মারছে। দৈবিক ব্যাপার-স্যাপার সাইডে রেখে বিচার করুন তাহলে কে বেশি পাপী? কংস না গঙ্গা? সদ্যোজাতদের হত্যা করার অপরাধে যদি কংস পাপী হয়ে থাকে তবে সেই একই পাপের ভাগীদার গঙ্গাও বটে।

এইখানেই একটা বড় প্রশ্ন আসে, যে দেবতারা এরকম ভাবে দানব, রাক্ষস ইত্যাদিদের সবসময় চিকেন মাটনের মতো দেখত কেন? মানে ‘এরা তো বধ হবেই’ এরকম একটা মানসিকতা পুরাণে ভরে ভরে আছে। যে গল্প বলছি সেই গল্পেই এই যে ছ’জন সারগর্ভ ভাই, তারা তো কোনো অন্যায় করেনি। বরং উলটে বুঝেছিল যে দানবদের দলে থাকলে দেবতারা, বিশেষ করে বিষ্ণু কখনও না কখনও তাদের মারবেই। সেই চিন্তায় বৈদিক মতে ‘শুভবুদ্ধিসম্পন্ন’ হয়েই তারা ব্রহ্মার কাছে বর প্রার্থনা করে। তারপরে কোনো অত্যাচারও করেনি। জলের তলায় শুয়েছিল। তাদের মারার পিছনে যুক্তিসংগত কারণ কী? এদের মতো বহু নিরপরাধ চরিত্রকে মারা হয়েছে শুধু মাত্র এই বাহানায় যে ‘ও রাক্ষস’, ‘ও দানব’, ‘ও পশু’। আর আর্যরা নিজেরা সবথেকে ভাল। নিজেকে ও নিজের জাতিকে শ্রেষ্ঠ ভাবাটা আর্যদের একটা রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রামচন্দ্রের বালি ও শম্বুক হত্যাই দেখুন না… যতই লজিক দিন, দুজনকেই রামচন্দ্র অন্যায় ভাবেই মেরেছিল।

যাইহোক কংস দেবকীর ছয় পুত্রকে গুম করে দিয়ে সপ্তম সন্তানের অপেক্ষা করছে। ক্যালেন্ডার ডায়রি আর ক্যালকুলেটর নিয়ে সবাই প্রতিদিন হিসেব করছে। কংসের একমাত্র ভয় ছিল, বিষ্ণু কোথা থেকে যে কী হিসেব করে দেবে, সে হয়তো ধরতেই পারবে না। তাই ভীষণ কড়াকড়ি করে হিসেব রাখা হচ্ছিল। কিন্তু কংস এইট পাশের অঙ্ক নিয়ে হিসেব করছিল, ওদিকে বিষ্ণু ক্যালকুলাসের ডেরিভেশন আর ইন্টিগ্রেশন নিয়ে বসেছে। কংস ওই হিসেব বুঝবে কী করে? দেবকীর গর্ভে যখন বলরাম এল, তখন বিষ্ণু নিদ্রাদেবীকে ডেকে সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে বলরামকে গোকুলে রোহিণীর পেটে ট্রান্সফার করে দিল। আর রোহিণীর মৃত সন্তানকে দেবকীর কোলে এনে দিল। লিমিট টেন্ডস টু জিরো, একেবারে ডি বাই ডি এক্স করে বলরাম নামক ফাংশন ট্রান্সফার হয়ে গেল।

এদিকে মৃত বাচ্চা দেখে কংসর অবস্থা শ্রডিঙ্গারের মতো। মানে মৃত শিশুকে সপ্তম ধরব, নাকি ধরব না? শিশুটি যখন মৃত তখন কি আবার গেম রিসেট করার মতো শুরু থেকে গোনা হবে? এই চিন্তায় কংস ও তার বংশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। কিন্তু কংস ভীষণ সাবধানী ও চতুর মানুষ, সে কোনো চান্সই নিল না। দেবকীর গর্ভে যতই সন্তান আসবে সবক’টাকে শেষ করবে সেই প্ল্যান করে। আর তার সাথে এটাও প্ল্যান করে যে অষ্টম গর্ভের সাথে দেশশুদ্ধু যত শিশু জন্মাবে সবাইকে মারব। একেবারে সমূলে বিনাশ, কোনও চান্সই নেবে না। কিন্তু দেশশুদ্ধু মানে শুধু নিজের রাজত্বে, নইলে অর্জুনের কপালে দুঃখ ছিল। অর্জুন আর কৃষ্ণ সমবয়সি ছিল, কত মাসের তফাত সেটা হলফ করে বলা যায় না, কিন্তু কৃষ্ণ বোধহয় কিছুটা বড় ছিল। কিন্তু কংসের যা ক্যালকুলেশন, কৃষ্ণ জন্ম থেকে দেবকীর পরবর্তী পুত্র হওয়া পর্যন্ত সবক’টাকেই মারার চেষ্টা করত। নেহাত অর্জুন নামকরা ফ্যামিলির সন্তান, তাই কংসের হাত থেকে বেঁচে গেছে।

যা-ই হোক, বলরামের একটা হিল্লে হল, কিন্তু এবারে বিষ্ণুর কৃষ্ণরূপে জন্ম নেওয়ার পালা। কিন্তু প্রথাগত ভাবে নবম মাসে জন্ম নিলে কংস তো জানতে পেরে যাবে। তাই বিষ্ণু পুরো একটা চ্যাপ্টার জুড়ে খুব স্তব করে যোগমায়া দেবীকে স্মরণ করে বলল, “দেবী হেল্প…”

দেবী বললেন, “ওকে, হেল্প করছি… আমি যশোদার কোলে জন্মাব। তুমি দেবকীর কোলে। তারপর আমার মায়ায় সব ঘুমিয়ে পড়লে আমাদের পালটাপালটি করে দিলেই হবে।”

কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগে, যে কায়দায় বলরাম জন্মাল, সেই একই কায়দায় কৃষ্ণ জন্মাল না কেন? নাকি একটা কায়দা একবারই প্রয়োগ করা যেত? কারণ জানা নেই, মোটকথা বিষ্ণু আর যোগমায়া দেবী এই পালটাপালটির প্ল্যানটা করে। সেফ সাইডে থাকার জন্য বিষ্ণু নিজের অষ্টম অবতার কৃষ্ণ হয়ে জন্ম নেয়। দেবকীর অষ্টম সন্তান হয়ে, তাও আবার প্রিম্যাচিওরড হয়ে অষ্টম মাসে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টম দিনে। কৃষ্ণ অবতারের সাথে এই ‘আট’ সংখ্যাটি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। কৃষ্ণকে বলা হয় পূর্ণ অবতার কারণ তার মধ্যে অষ্টসিদ্ধির প্রকাশ ছিল। বড় হলে কৃষ্ণের অষ্টভার্যা ছিল, এমনকি শ্রীমদ্ভগবত গীতাতে অষ্টম পর্বের অষ্টম পঙক্তি হল সেই বিখ্যাত ‘পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাং…’। এই আট সংখ্যার সাথে কৃষ্ণের যোগাযোগ বড়ই রহস্যময়।

অষ্টমী তিথির মধ্যরাত্রিতে অভিজিৎ নক্ষত্রে বিজয় মূহুর্তে কৃষ্ণ জন্ম নিল দেবকীর কোলে, আর একই সময়ে যোগমায়া দেবী একটি কন্যা রূপে জন্ম নিলেন যশোদার কোলে। জন্ম নিতেই চারিদিকে ঝড় বৃষ্টি শুরু হল, নদী সমুদ্রের জল ফুলে ফেঁপে উঠল, দেবতারা ওই শব্দের ব্যাকগ্রাউন্ডে পার্টি শুরু করে দিল, অপ্সরারা নাচছে, ঋষিরা ফুল ছেটাচ্ছে। আর কংস ঘুমোচ্ছে। যোগমায়া দেবীর মায়ার দয়ায় অকাতরে ঘুমোচ্ছে সেদিন সবাই। কৃষ্ণ জন্মাতেই বসুদেব দৈবিক নির্দেশ পেল, “যাও, গো টু গোকুল। এই পুত্রকে গোকুলে গিয়ে যশোদার কাছে রেখে তার মেয়েকে তুলে আনো।”

বসুদেব তাই করে। শিশু পাচার। কৃষ্ণকে নিয়ে গিয়ে যশোদার সদ্যোজাত মেয়েকে তুলে আনে। শ্রীমদ্ভগবতে এবং অন্য অনেক বইয়ে এই জায়গাটা, মানে বসুদেবের কৃষ্ণকে নিয়ে গিয়ে এক্সচেঞ্জ করার ঘটানাটা বেশ ভালো বর্ণনা দেওয়া আছে। কোথাও বলেছে যে যমুনা নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছিল, বসুদেব তারমধ্যেই ঝাঁকামুটের মতো মাথায় ঝুড়িতে বেবি কৃষ্ণকে রেখে প্রায় ভুরু পর্যন্ত জলে ডুবে পার করেছিল। এই বসুদেব আর কুন্তী, দুই ভাইয়েরই ঝুড়িতে সদ্যোজাত সন্তানকে রাখার একটা ঝোঁক ছিল বোধহয়। একজন ঝুড়িতে রেখে নদীতে ভাসিয়ে দেয়, আরেকজন ঝুড়িতে নিয়ে নদী পার করে। আর নদী যদি ফুলেফেঁপেই ওঠে তাহলে বসুদেব হেঁটে হেঁটে পার করল কী করে?

মানে ক্যালেন্ডার আর পঞ্জিকার শুরুতে ছবিগুলো দেখলে আমার সেরকম প্রশ্নই মাথায় আসে। সেরকম নদীর তেজ হলে বসুদেবকে নিশ্চয় সাঁতার কাটতে হয়েছে। সাথে আবার শেষনাগ শেষপর্যন্ত কে.সি.পালের ছাতার মতো ঢাকা দিয়ে রেখেছিল কৃষ্ণ সহ বসুদেবকে যাতে বৃষ্টির জল গায়ে না লাগে। বোধহয় সেটা বেবি কৃষ্ণের জন্যই ছিল কারণ বসুদেব তো তখন ভুরু পর্যন্ত ডুবে নয়তো পুরো শরীর জলে চুবে আছে। আদৌ শেষনাগ ছাতা হিসেবে ঢাকা দিচ্ছিল, নাকি জলে ভেসে যাওয়ার সময় বেবি কৃষ্ণ খপ করে নাগকে ধরে খেলছিল সেটা প্রমাণ করা মুশকিল। হয়তো সাপটা তখন কৃষ্ণের হাতের মুঠোতে ফণাচ্যাপ্টা হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল। পুরাণকার বেদব্যাস হয়তো নদীর পাড়ের কাছে ছাতা মাথায় এই ঘটনা দেখার সময় ভাবে, আহা সাপটা ছাতার মতো আশ্রয় দিচ্ছে। নইলে সেই ঘোর ঝড় বৃষ্টির রাতে এই দৃশ্য দেখল-টা কে?

আরেক জায়গায় লেখা পাই যে বসুদেব যমুনার সামনে দাঁড়াতেই সেটা দুইভাগ হয়ে মাঝে পথ করে দেয়। এই যমুনার দুইভাগ হওয়ার আরেকটা গল্প ও আছে গোপিনীদের জন্য যেটা ‘ফাজিলের মহাভারতে’ লিখেছিলাম। প্রশ্ন আসে, এই নদীর দুভাগ হয়ে যাওয়া কনসেপ্ট কিন্তু বাইবেলেও পাই। মোজেসের গল্পে। আবার মোজেসকেও তার মা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল, আর এক মিশরীয় রাজকন্যা কুড়িয়ে পায়। ওরা কি আমাদের পুরাণ থেকে আইডিয়াটা ঝেড়ে দিল? হতেই পারে… কৃষ্ণের সাথে জিশুর বিস্তর মিল। দুজনেই জন্মের সময়ে রাজার প্রকোপে পড়েছিল। কৃষ্ণ কংসের প্রকোপে আর জিশু হেরডের। দুজনেই লুকিয়ে জন্ম নিয়েছিল, একজন কারাগারে, একজন আস্তাবলে। দুজনকেই তাদের জন্মস্থান থেকে দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয়। দুজনের জন্যই ওই একই সময়ে অন্য প্রচুর বাচ্চাকে মৃত্যু কোলে ঢলে পড়তে হয়। দুজনেই মহাপুরুষ হয়ে ওঠেন। দুজনেই শান্তির বাণী দিয়ে গেছেন। দুজনের দলের লোকই দলের মধ্যে ভুলভাল করে দল ভেঙেছে। দুজনের মৃত্যুও অস্বাভাবিক উপায়ে। একজনের পায়ে হাতে পেরেক ঠুকে, আরেকজনের পায়ে তির গেঁথে। দুজনে সত্যিই ছিল কি না, অথবা দুজনের কাহিনি কে কার উপরে প্রভাব ফেলেছে এসব সব দীর্ঘ তর্কের ব্যাপার। আমি গল্পটা বলি।

বসুদেব যশোদার কোল থেকে সদ্যোজাত কন্যা সন্তান তুলে তার এক্সচেঞ্জে কৃষ্ণকে রেখে এল। এখনকার সময়ে করতে গেলে হসপিটালে গিয়ে প্রচুর বাচ্চার মধ্যে ওই বাচ্চার ট্যাগ দেখে, তাকে বের করে আনতে হত। তারপর সিসিটিভি থেকে ‘বাচ্চা পাচার’ কেসে ধরা পড়ত বসুদেব। বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে বসুদেব রিটার্স টু জেল। মিডিয়া, খবরের চ্যানেল, ঘন্টাখানেক ডোরেমন কত কী ঘটে যেত। কংস এই মেয়েটাকেও বাজেয়াপ্ত করল, কিন্তু এটা তো মায়াদেবী। ঢ্যাং করে নিজের ওরিজিনাল রূপে এসে অ্যানাউন্স করল, “তোমাকে মারিবে যে সেই হট অ্যান্ড কুল, ইজ নাউ গ্রোয়িং আপ ইন গোকুল।”

কংস আর ভেবে পাচ্ছে না, ক্যালকুলেশনে কোথায় গণ্ডগোল হল? কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মায়াদেবী কৃষ্ণের লোকেশন জানিয়ে গেলেন কেন? না জানালে, কংস নিশ্চিন্ত থাকত, আর কৃষ্ণও স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারত। কিন্তু সেই গল্পে অ্যাকশন কই? সাথে কিছু রাক্ষস টাক্ষস না মারলে হিরো হিসেবে স্বীকৃতিই বা কোথায়! ডাইরেক্ট যদি সাড়ে এগারো বছর বয়সে গিয়ে কংসকে ধ্বংস করত, তাহলে আর সেই গল্পে মজা কোথায়?

যা-ই হোক, কংস এই আনসার্টেইনিটি নিয়ে কৃষ্ণের খবরটা সত্যি কি না জানার জন্য স্পাই লাগাল। কৃষ্ণ এদিকে ইন দ্য হাউস অফ নন্দ। কোরাসে সব গ্রামবাসী নেচে আনন্দ করতে লাগল। কেন? আনন্দে অবশ্যই। গ্রুপের লীডারের ছেলে হয়েছে তাই।

সিনেমা টিনেমা দেখেন না নাকি? এই দেশে নায়ক-নায়িকা প্রেমে পড়েছে, সেই আনন্দে ডজন চারেক ছেলেমেয়ে নায়কনায়িকার পিছনে ম্যাচিং জামাকাপড় পরে কোরাস করে তালে তালে নাচে। কে যে তাদের জামাকাপড় সাপ্লাই করে কে জানে। তাই গ্রুপের লীডারের ছেলে হয়েছে, গ্রামবাসী নাচবেই তো। কদিন পরে তাদের সবাইকে এই কৃষ্ণ নাচিয়ে ছাড়বে, তাই প্র্যাক্টিসও হয়ে গেল। কৃষ্ণ আর দাদা বলরাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *