ইলার গল্প আর রেবতীর গল্প

ইলার গল্প আর রেবতীর গল্প

বৈবস্বত মনুকে আশা করি ভুলে যাননি। সংজ্ঞা আর সূর্যদেবের বড় ছেলে। সেও বেশ নিজস্ব মন্বন্তরের মনু হয়ে জাঁকিয়ে বসেছে। এখনও বসে আছে, কারণ আমরা বর্তমানে ভগবান ছাড়া কাউকে ভয় না করে, আমাদের প্রতিদিনের আনন্দ বাজার খুলে বসেছি শ্বেত বরাহ কল্পে, এই বৈবস্বত মন্বন্তরেই। তাই যেকোনও দিন কেউ যদি এসে বলে আমি বৈবস্বত মনু, তাহলে হাসাহাসি করবেন না, উনি কিন্তু সব দেখছেন।

বৈবস্বত মনুর ন’টি ছেলে হয়, ইক্ষবাকু (এর বংশে রঘু আর রাম জন্মেছিল), নাভগ (না করেছ, এবারে ভোগো), ধুষ্ণু, শর্যতি, নরিশ্যন, প্রাংশ, নভগরিষ্ঠ (কীরকম সংখ্যাগরিষ্ঠর মতো শুনতে লাগল), করুশ, পৃষধরা। কিন্তু এদেরও আগে বৈবস্বত একটা মেয়ের বাবা হয়ে বসে ছিল। একটাই মেয়ে, একেবারে ন-টা ভাইয়ের চম্পা দিদি। তার নাম ইলা। সেই ইলারই গল্প বলব আজ। ন-টা ছেলের বাপ হওয়ার আগে বোধহয় বৈবস্বত কম আত্মবিশ্বাসে ভুগছিল। আর নয়তো দেবতাদের খুশি করে একটা ছেলেপুলে পাওয়ার ইচ্ছে হয়৷ তাই বৈবস্বত মনু মিত্র-বরুণের তপস্যা শুরু করে।

এই মিত্র-বরুণ কে? আগের পর্বেই আমরা জেনেছি ত্বষ্টা সূর্যকে বারো ভাগে ভাগ করার সময়ে, তার মধ্যে এই দুইজন আদিত্য হয়। মিত্র-বরুণের জন্ম নিয়ে আরও অনেক পুরাণে অনেক বিকল্প ও কল্পান্তরের অকল্পিত পরিকল্পিত গল্প আছে। আপাতত হরিবংশ অনুযায়ী তাদের পরিচয় দিলাম। মিত্র-বরুণকে বলা যেতে পারে সেই দেবতারা, যারা বৈদিক যুগের শুরুর দিকে প্রায় প্রধান সৃষ্টির দেবতা ছিল। পরবর্তীকালে যত বেশি বেশি অন্য দেব-দেবী আর তাদের লীলার আগমন ঘটে, তত মিত্র-বরুণের প্রার্থনা কমতে কমতে তারা সকালের আলো, আর জলাশয়ের সামান্য দেবতার পদে অবনত হয়। মিত্র-বরুণ বেদের শুরুর দিকে এতটাই জনপ্রিয় ছিল, যে বৈদিক সভ্যতার ফোটোকপি পারস্যের অগ্নি উপাসক জোরোয়াস্তারদের মধ্যেও এদের ভূমিকা বেশ জোরালো। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়, মিত্র-বরুণকে বলা যেতে পারে বৈদিক ধর্মের প্রথম সমকামী দেবতাদ্বয়।

এ বাবা, চোখে-নাকে হাত দিয়ে জিভ কেটে ফেললেন? ছি ছি, দেবতাদের নিয়ে এসব কী পড়ে ফেললাম? কী সব শব্দ? তবে শুনে রাখুন, সমকামিতা, তৃতীয় লিঙ্গ ও লিঙ্গ পরিবর্তনের গল্পও উদাহরণ পুরাণে ভুরি ভুরি আছে। সুতরাং মিত্র ও বরুণ দুজনে যদিও প্রায় সবসময়েই একসাথে উচ্চারণ করা হয়, তাহলে এদের সমকামী হতে দোষ কোথায়? সমকামিতা যথেষ্ট প্ৰাকৃতিক ব্যাপার। মানুষের যার যার নিজের স্বাধীনতার ব্যাপার, সেখানে আপনি-আমি বলার কে? আর জেনে রাখুন হিন্দিতে ‘মিত্রো’ বলে যে কথাটা, যেটা দিয়ে মহামহামানব নিজের বক্তৃতা শুরু করেন, সেই ‘মিত্রো’ কথাটার আদি কিন্তু এই মিত্র-বরুণের বন্ধুত্ব থেকেই এসেছে। যাক ‘গে’… গল্পে ফিরি।

বৈবস্বত মনু সেই মিত্র-বরুণ, অর্থাৎ তার বাবার বারোভাগের দুইভাগের কাছে, তপস্যা করে একটি বংশধর লাভের জন্য, আর দেবতাদ্বয় দেখা দিয়ে বলেন, “বংশধর চাস? এই নে ধর বংশ…”

না, বংশদণ্ড ধরায়নি, বরং মিত্র-বরুণ বৈবস্বতকে একটি কন্যা দান করেন। বিবাহের ন্যায় কন্যাদান নয়। তাহলে বৈবস্বত শ্বশুর হয়ে যেত। এই কন্যা দান, মানে হল দত্তক দেওয়ার মতন দান। একেবারে যুবতি কন্যা, তাকে ছোট থেকে লালন-পালন করার ব্যাপার নেই। পুরাণে এরকম প্রায়ই আধদামড়া যুবকযুবতিদের হঠাৎ করে কারোর ছেলেপুলে হয়ে যেতে দেখা যেত। কেউ প্রশ্ন করত না। এখনকার দিন হলে বৈবস্বত একটা টিনএজার মেয়েকে ঘরে এনে দেখাক দেখি, বৈবস্বতের বৌ ঝ্যাঁটাপেটা করত আর নয়ত পাড়ার লোকে বলত, “ওই দেখ, বুবুর (বৈবস্বতের ডাকনাম, আমরা বাঙালিরা নাম ছোট করতে ওস্তাদ) অন্য জায়গায় চক্কর ছিল। এত বড় মেয়ের বাপ হয়ে গেছে তলে তলে কেউ জানতেই পারিনি…”

কিন্তু সেটা সৃষ্টির শুরু দিকে, তখন অদ্ভুত অদ্ভুত ভাবে ছেলেপুলে হত, আর সেটায় কেউ আশ্চর্য হত না। সেই কন্যার নাম ইলা। ইলাকে দেখে বৈবস্বত বলল, “চলো বাড়ি…”

ইলা বলল, “না আমি যেতে পারব না, কারণ আমি তৈরি হয়েছি মিত্র আর বরুণের থেকে। ওদের পারমিশন ছাড়া যেতে পারব না…”

বৈবস্বতকে দাঁড় করিয়ে রেখে ইলা গেল মিত্র-বরুণের কাছে পারমিশন নিতে। মিত্র-বরুণ তো অবাক, “উরিত্তারা, এ তো সাংঘাতিক ধার্মিক কন্যা। আমরা, তোমার দুজন বাবা, তোমার আচরণে খুশি, তুমি আমাদের মেয়ে হিসেবে নাম করবে। আর সুদ্যুম্ন নামে বৈবস্বতের বংশ হয়ে, একেবারে বংশের ঝাড়ের মতো বিস্তৃত করবে…”

ইলা পারমিশন পেয়ে নাচতে নাচতে তার নতুন বাবার ঘরের দিকে চলল। বৈবস্বত মনুর তখন ঢের কাজ বাকি ছিল, দেবতাদের থেকে পাওয়া মেয়ে ঠিক ঘরে ফিরে আসবে জেনে সেও বাড়ি চলে গেছে। রামায়ণ, লিঙ্গ পুরাণ আর মহাভারত এখানে আর একটা গল্প বলে। ইলা নাকি তখনই লিঙ্গ পরিবর্তন করে বহ্লীক দেশের রাজা হয়ে গিয়েছিল। বহ্লীক দেশ মানে হিন্দুকুশের উত্তর থেকে আমু দারিয়ার দক্ষিণ পর্যন্ত। রাজা তো হল, তারপরে রাজাদের যা স্বভাব, রাজা হলেই মৃগয়া করতে হবে, আর মৃগয়ায় গেলেই একটা কেলো করতে হবে; সেই একই ধারা বজায় রেখে অথবা সূচনা করা থেকে বহুীকের রাজা ইলাও বাঁচেনি। মৃগয়ার নেশায় সে ঘোড়ায় চড়ে শরবনে ঢুকে পড়ল। শরবনে কি শিকার করতে ঢুকেছিল? মানে শরবনে কয়েকটা হাঁস আর কিছু প্রেমিক-প্রেমিকার যুগল ছাড়া আর কীই বা পেত? বহ্লীকের রাজাকে বোধহয় নলবনের লোকদের ভূতে ধরেছিল। গ্রীলে মাথা ঠেকিয়ে অন্যের প্রেম করা দেখে নলবনের পাশাপাশি কিছু লোক।

এই শরবন ছিল মাতা পার্বতীর, আর সেখানে শিবঠাকুর বাদে যে-কোনও পুরুষ ঢুকলেই তার লিঙ্গ পরিবর্তন হয়ে নারী হয়ে যেত। ম্যাজিকাল শরবন। বহ্লীকের রাজা পুরুষ ইলাও এই বনে ঢুকে মহিলা হয়ে যায়, এমনকি তার ঘোড়াটা পর্যন্ত ঘোড়ী (মহম্মদ ঘোরী নয়, হাতে পরার ঘড়িও না, ঘোড়ার স্ত্রীলিঙ্গ ঘোড়ী, অবাঙালিরা বলে। বাংলায় বলে কি না জানি না) হয়ে গেল। মহিলা হয়েই সে আফসোস শুরু করল, এবার সে রাজা হবে কী করে? সে যুগে তো মেয়ে হয়ে রাজা হওয়া যেত না। রাজ্যের লোকেরাই বা কী বলবে? রাজা শরবনে ঢুকে রানি হয়ে বেরোল ?

ইলা কান্নাকাটি করতে করতে শিব-পার্বতীর কাছে যায়। শিবঠাকুর ইলার অবস্থা দেখে হেসে ফেলে, কিন্তু পার্বতীমাতা বলেন, “আহা রে, বড় কষ্ট পেয়েছে। এক কাজ করি, আমি তোমাকে বর দিচ্ছি যে তুমি একমাস মেয়ে হয়ে থাকবে, আর একমাস ছেলে হয়ে থাকবে। যখন ছেলে হয়ে থাকবে তখন তোমার মেয়ে অবস্থার কথা মনে থাকবে না আর যখন মেয়ে হয়ে থাকবে তখন ভাইস ভারসা…”

ভাইস ভারসার ভরসা পেয়ে মহিলা ইলা সখীদের সাথে এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করে। মেয়ে হয়েছে, সে তো ঘুরবেই খানিক, সরোবরে স্নান করবে, ফুল তুলবে, মালা গাঁথবে, তবেই না পৌরাণিক নায়িকা। সেই ইলা তখন ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ নেত্য করছে আর এদিকে ওই রাস্তায় তখন চাঁদমামার ছেলে বুধ যাচ্ছে। ইলাকে দেখেই ক্যরেকটার ঢিলা বুধের পিলা চমকে গেল।

“উফফফ কি বিউটি…একে বিয়ে করা আমার ডিউটি…” এই ভেবে বুধ গিয়ে ইলাকে প্রপোজ করে বসল।

ইলার তখন তার নিজের ‘পুরুষার্থ এবম উপক্যারণ’-এর কথা মনে নেই। সে ভাবল, একটা হ্যান্ডসাম দেবতা নিজের থেকে আমাকে প্রপোজ করছে, এতে ক্ষতি কী? কিন্তু তাও এত সহজে মেনে নিলে হয়? ইলা বলল, “আমার সখীরা? তাদের কী হবে?”

বুধ তখন ইলার সখীদের ‘কিমপুরুষ’-এ রূপান্তরিত করে দেয়। এই কিমপুরুষ যে কোন প্রজাতির দেবতা নাকি মানুষ, তা জানা যায় না। তবে সংস্কৃত শব্দটার সরাসরি বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘ইনি কি পুরুষ?’। সুতরাং এখানে কিছু একটা ব্যাপার হয়েছে যেখানে অনেক মানুষের একসঙ্গে লিঙ্গ পরিবর্তন ঘটেছে। এটা বুধের কেরামতি নাকি তখনকার কোনো ডাক্তারের মেরামতি জানি না বাপু। বুধ তো গিয়েছিল ইলাকে বিয়ে করতে, এরকম গণ লিঙ্গ পরিবর্তন করার ঠেকা তাকে কে দিয়েছিল? আর কেনই বা করতে গেল? আর করলি তো করলি পরে সেই লোকগুলোর আর কোনো ট্রেসও পাওয়া গেল না। আরে সত্যি… বানিয়ে বলছি না। একমাস পরে ইলা যখন মাতা পার্বতীর আশীর্বাদে আবার লিঙ্গ পরিবর্তিত হয়ে সুদ্যুম্ন হয়ে গেল, তখন সে বুধকে জিজ্ঞেস করে তার সখী (বা সখারা) কই। বুধ তখন বলে সেই সখী (বা সখারা) মারা গেছে। আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ হয়েছিল, তার আঘাতে।

বোঝো ঠ্যালা। না, এখানে আমি কিচ্ছু বলব না। এখানে পড়া বন্ধ করে নিজেরাই একটু চিন্তা করুন। একেবারে গভীরভাবে চিন্তা করুন। আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ? কেন? তার পিছনে লজিক কি? কেনই বা তাদেরকে এই গল্পে মেরে দেওয়া হল? কত গল্পে তো কত শত এক্সট্রা চরিত্র থাকে, তাদের তো মেরে ফেলা হয় না। তাহলে এখানে ইলা পুরুষ হতেই, বুধ হঠাৎ তাকে এরকম পাথর মারার গল্প শুনিয়ে দিল কেন? এর থেকে সন্দেহ হয়, হয়তো ইলার মহিলা অবস্থায় বুধ তাকে জোর করে তুলে এনেছিল, আর আনার সময় তার সখীদের মেরে ফেলেছিল। আর নয়ত সেইসময় বিশ্বকর্মা পাথর বোঝাই লরি নিয়ে যাচ্ছিল আকাশ পথে। অথবা সেই ডাইনোসর বিলুপ্তির উল্কাপাত হয়েছিল। অথবা বর্বর দেশের প্রথার মতো, ওদের লিঙ্গভেদ না থাকার অপরাধে স্রেফ ঢিলিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। অথবা লিঙ্গ পরিবর্তনের পরীক্ষার সবকটা সখী (বা সখা) গিনিপিগ হয়েছিল। মোটকথা আকাশ থেকে পাথর পড়ে সব সখী (বা সখা) শেষ। এইজন্য সঙ্গে সবসময় লোহার ছাতা রাখুন। বলা তো যায় না, কখন আবার পাথর বর্ষণ হয়। সেই বর্ষণে আপনার অঙ্গ ঘর্ষণ হলে মধ্যাকর্ষণের শক্তি টের পাবেন।

গল্পটা বলি, ইলা সুদ্যুম্ন হয়েই বলল, “আমি তো রাজা, আমাকে রাজ্য চালাতে হবে…”

কিন্তু বুধ ওই একমাসেই ইলাকে গর্বের সাথে গর্ভবতী করে ফেলেছে, এবারে ইলা সুদ্যুম্ন হয়ে গর্ভবতা হয়ে গেল। গর্বিত ও গর্ভিত সুদ্যুম্ন বুধকে জিজ্ঞেস করে, কী করা উচিত? বুধ বুদ্ধি দেয়, “তুমি মহাদেবের তপস্যা করো… উনিই তোমাকে ঠিক করে দিতে পারবেন। মানে পুনরায় পুরুষ রূপ দিতে পারবেন।”

সুদ্যুম্ন যে যে মাসে পুরুষ রূপে থাকত সেই সেই মাসে তপস্যা করতে শুরু করল, তাও বুধের কোচিংয়ে। আর যে যে মাসে ইলা হয়ে থাকত সেই সেই মাসে বুধকে কোচিং করাত, সঙ্গিনী হয়ে। বেশ সিস্টেম, বুধও সুযোগ পুরো কাজে লাগাল। এইভাবে ন-মাস চললে ইলা জন্ম দেয় পুরুরাভর। তারপরেই আবার সুদ্যুম্ন রূপে মহাদেবকে সন্তুষ্ট করে পার্মানেন্ট ভাবে পুরুষ হয়ে রইল। পুরুষ হয়ে তার তিনটে ছেলে হল, উৎকল, গয়া আর বিনতাশ্ব। বুঝতেই পারছেন এই গল্পের মাধ্যমে আর্যদের যে ক্রমে পূর্বভারতে আধিপত্য ছড়াচ্ছিল সেটাই বোঝা যায়।

পুরুরাভর গল্পে পরে আসব। আপাতত রৈবতের গল্প বলি। সেই শর্যতির নাম বললাম মনে আছে? মনুর ন’জন ছেলের একজন। তার যমজ সন্তান হয়, একটি মেয়ে ওর একটি ছেলে। মেয়েটির নাম সুকন্যা, যার সাথে চ্যবনপ্রাশের পেটেন্টধারী চ্যবনঋষির বিয়ে হয়। ছেলেটির নাম ছিল অনার্ত, যে কুশস্থলীতে রাজত্ব করে। পাকস্থলী মানে যে থলিতে খাবার গিয়ে পাক মানে হজম হয়, মাঝেমাঝে গুরুপাকও হয়, কড়াপাক হতেই বা বাধা কোথায়? পাকিয়েই ফেলে আর কি… কিন্তু কুশস্থলী মানে কী? যে থলিতে খাবার গিয়ে কুশ মানে ঘাস হয়ে যায়? ছাড়ুন, এইসব উচ্চ পর্যায়ের চিন্তাভাবনা পরে করা যাবে।

আপাতত অনার্তর পরে তার ছেলে রেব রাজত্ব চালায়। এই রেবর ছেলেই রৈবত বা কুকুদ্মী। তার ইন্টারস্টেলার মার্কা গল্পই বলছি। এবার আপনারা বলবেন যে দিব্যি পুরাণের কথা বলতে বলতে আবার হলিউড টানা কেন? তাহলে বলে রাখি রৈবতের গল্পের সাথে নোলানকাকুর নোলান গুড়ের সন্দেশের মত মোহময়ী সিনেমা ‘ইন্টারস্টেলার’-এর এক জায়গায় দুর্দান্ত মিল আছে। বুঝিয়ে বলি।

রৈবতের একশোটা ছেলে ছিল, আর একটাই মেয়ে ছিল। হ্যাঁ, এই রেকর্ড ধৃতরাষ্ট্রেরও ছিল মানছি, কিন্তু রৈবত অন্ধ ছিলনা। বরং দিব্যি ভালোই দেখতে পেত চোখে। আর অত্যন্ত বেশী ভালো দেখত বলেই নিজের কন্যা বিবাহযোগ্যা হলে তার জন্য পাত্র বাছা শুরু হয়। বড় হয়ে গেছে, বিয়ে দিয়ে দাও আবার কি? রাজকন্যা তো কি হয়েছে? মেয়ে মাত্রই বিয়ে দিয়ে দাও। ঘটক কে বলতেই সে ফটক ছাড়ানো পাত্রের লিস্ট প্রস্তুত করল। মেয়েটির নাম রেবতী। কিন্তু কাউকেই জামাই হিসেবে রৈবতের পছন্দ হয়না। তখনকার দিনে শাদী ডট কম বা বেশী কিছুই ছিলনা, আবার পাত্রদের ছবি নিয়ে বেড়ানোও সম্ভব ছিলনা। ইয়া বড় বড় তৈলচিত্র আঁকা হত, কে অত পিঠে করে ছবি নিয়ে বেড়াবে? রৈবত তাই অনেক হিসেব টিসেব করে, গুপ্তচর লাগিয়ে পাত্রদের হাঁড়ির খবর এনে কয়েকজন পাত্রকে চয়েস করে ফেলল।

কিন্তু এদের মধ্যে রেবতীর জন্য সবথেকে ভাল পাত্র কে হবে? রৈবত চিন্তায় পড়ে, তারপরে ভাবে “আমার প্রপ্রপ্রপ্রদাদু ব্রহ্মাদেব তো আছেনই, আর ওনার থেকে ভাল ডিশিসন কেউ নিতে পারবেনা…”। এই ভেবে রৈবত আর তার কন্যা রেবতীর জন্য পাত্রদের লিস্ট নিয়ে ব্রহ্মলোকে চলল। কিছু একটা উড়ন্ত যান বা ঐরকম কিছু একটা নিশ্চয় ব্যবহার করেছিল। ব্ৰহ্মলোকে পৌঁছে রৈবত আর রেবতী দেখে সেখানে তখন পার্টি চলছে। পার্টি মানে বেশ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে গন্ধর্বরা বড় বড় মিউজিক সিস্টেম নিয়ে ঝিনচ্যাক বাজনা বাজাচ্ছে। সঙ্গে লতা-কিশোর কণ্ঠীরা গাইছে। সে একেবারে পুরো নবমীর রাত। কেন? অবাক হচ্ছেন? ব্রহ্মাদেব বলে কি তার মাঝেমাঝে একটু আধটু গান শুনে ফূর্তি করতে ইচ্ছে করেনা?

রৈবত আর রেবতী সেখানে যেতেই ব্রহ্মা ইশারা করেন ওদের বসতে। তারপরে কয়েকমিনিটের মধ্যেই সেই বিচিত্রানুষ্ঠাণ শেষ হয়ে গেল। সেইসব মিটে গেলে তখন ব্রহ্মাদেব ফ্রী হয়ে বলেন— “বলো রৈবত, কিম সংবাদম?”

রৈবত বলে, “সংবাদম হলম রেবতীরম বিবাহম, মানে রেবতীর বিয়ে দেব বলে কয়েকটা পাত্র শর্টলিস্ট করেছি। খুব খেটেও লিস্টটা শর্ট করতে পারিনি, কিঞ্চিৎ লম্বা হয়ে গেছে। আপনার ফিস্ট শেষ হলে আপনি একবার এই লিস্ট দেখে মানসচক্ষে পাত্রদের জিস্ট জেনে নিন, তারপরে যাকে আপনার পছন্দ হবে তার সাথে রেবতীর বিয়ে দিয়ে দেব…”

এই শুনেই ব্ৰহ্মা হো-হো করে হেসে উঠল। সে হাসি থামেই না। রৈবতের সন্দেহ হয়, বুড়োর কি বয়সের ভারে মাথা খারাপ হল নাকি পার্টিতে কিছু নেশাভাং করল? বিয়ের কথা শুনে হাসে কেন? ব্রহ্মার এদিকে হাসি শেষ হলে বলে, “ও রৈবত, তোমার তো দেখছি অঙ্ক একেবারে কাঁচা গো। কাঁচাগোল্লা পেতে বুঝি অঙ্কতে?”

“কেন?” রৈবত জিজ্ঞেস করে।

“বলি তোমরা যতক্ষণ এখানে বসে ছিলে…” ব্রহ্মা বলে, “ততক্ষণে মর্ত্যলোকে সাতাশটা চতুর্যুগ পেরিয়ে গেছে। তুমি কি জানোনা ব্রহ্মলোকে এলে টাইম ডাইলেশন হয়ে যায়?”

ব্রহ্মা টাইম ডাইলেশন কথাটা ব্যবহার করেনা, কিন্তু হিসেব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক থিওরি মিলিয়ে দেখলে এরকমটা হওয়া সম্ভব। পৃথিবীর সময় আর পৃথিবীর বাইরে বেরিয়ে গেলে সেখানের সময়, একভাবে চলেনা। ইন্টারস্টেলার সিনেমায় মনে আছে সেই যখন কুপার আর দুটো বাকিরা বিশাল ঢেউয়ের জগত মিলার গ্রহে অবতরণ করেছিল, তখন সেখানে একেক ঘন্টা পৃথিবীর সাত ঘন্টার সমান ছিল? তাই কুপাররা যখন ফিরে আসে তখন পৃথিবীর হিসেবে সাতাশ বছর কেটে গেছে। রকেটে থাকা লোকটাও বুড়ো হয়ে গেছে আর পৃথিবীতে থাকা কুপারের বাচ্চা মেয়েটাও অনেক বড় হয়ে গেছে।

ঠিক এই জিনিসটাই রৈবতের সাথে হয়েছে। মানুষের চারটে যুগ মানে হচ্ছে ৪৩,২০,০০০ বছর যেটা হিসেব করে দেখা যায় ব্রহ্মার ৪.৩২ সেকেন্ড মাত্র। তার মানে ব্রহ্মলোকে গিয়ে রৈবত আর রেবতীকে ব্রহ্মলোকের হিসেবে মাত্র দুমিনিট অপেক্ষা করতে হয়। টাইম ডাইলেশন, বুঝলেন কিনা?

কিন্তু এখানে স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্ন চলে আসে। আমি তার মধ্যে মাত্র কয়েকটাকেই উপস্থাপনা করছি। প্রথম চিন্তা আসে,পুরাণে এরকম হাই ফাই আপেক্ষিকতার গল্প কিকরে এলো? সত্যিই কি পুরাণকার যা দেখেছে তাই লিখেছে? নাকি এতটাই উন্নত মস্তিষ্ক ছিল যে টাইম ডাইলেশন আর ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’ ভেবে ফেলেছিল? অবশ্য রিলেটিভীতি আমিও অনেক ছোটবেলায় বুঝে গেছিলাম। রিলেটিভ মানে আত্মীয়দের দেখে যে ভীতির সঞ্চার হয় মনে সেটাই আমার থিওরি অফ রিলেটিভীতি। মজা ছেড়ে সিরিয়াস ভাবে যদি ভাবা হয় তাহলে বলতে হয় যে, যে পন্ডিতমন্সক ব্যক্তিরা এই পুরাণ লিখেছিলেন তাদের পক্ষে আরেকটু ভাবনাচিন্তা করে আপেক্ষিকতা লিখে ফেলা আর কি এমন ব্যাপার ছিল? অথবা হতেই পারে সত্যি দেবতারা সত্যিই সমস্ত পৌরাণিক গল্পগুলো ঘটিয়েছিল। হতেই পারে।

আর সেখানেই দ্বিতীয় প্রশ্ন আসে। এই যে সাতাশটা চতুর্যুগ পেরিয়ে গেল, এগুলোতেও তো রাম এসেছে, কৃষ্ণ এসেছে, পান্ডব, কুরু, মহাগুরু, আলেকজান্ডার, হিটলার, মাদার টেরেজা, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মাননীয়া, ছাপান্ন ইঞ্চিধারী সব মহাপুরুষই এসেছেন বারেবারে। আর সেরকমই সমস্ত চতুর্যুগেই ব্রহ্মার গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্সও ভরে ভরে আছে। খান পঞ্চাশেকবার তো শুধু বর দিতেই আসেন। তাহলে কি ব্রহ্মাদেব যতই নাচগান শুনুক, যাই করুক না কেন, সূক্ষ্ম দেহে প্রত্যেক যুগে যখন যখন দরকার তখন তখন প্রকট হয়ে যান। উফফফ, এরকম লীলা আছে, অথচ এই দেবতার পুজো এত কম হয়।

তৃতীয় প্রশ্ন আসে, এই যে রৈবত তার মেয়েক নিয়ে ড্যাং ড্যাং করে অন্যলোকে চল, সেটা কিভাবে গেছিল? উনি কি প্রথমবার গেছিলেন? মানে আগে গেলে তো এই টাইম ডাইলেশনের ব্যাপারটা জানতেন। তার মানে প্রথমবার গেছিলেন আর যারা ওনার আর ওনার মেয়ের যাওয়ার বন্দোবস্ত, ভিজা ইত্যাদী করেছিল তারা কেউ এই সময়ের ব্যাপারটা জানায়নি। তারপরেও ভাবনা আসে, কিভাবে গেছিল? ওই বস্তাপচা সিরিয়াল গুলোর মত নিশ্চয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিছনে গ্রীন স্ক্রীনে উড়ে উড়ে যাননি। মানে যদি উড়েও যায়, তাহলেও সুপারম্যানের মত উপুড় হয়ে যাবে (সুপারম্যান সামনে হাত দুটো ছড়ায় কেন কে জানে?)। আর নয়ত কোনো যানে চেপে গেছিল… মানে এতটা দূরত্ব, রকেটের পকেটে চেপে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। অথবা পোকার গর্ত মানে ওয়ার্মহোল দিয়ে। গভীর ভাবনাচিন্তার ব্যাপা এটা। যিনি এই গল্প লিখেছেন, তিনি শুধু রাজা রৈবত ব্রহ্মলোকে গেলেন বলেই খালাস। আরে কিভাবে গেলেন, তার পিছনে বিজ্ঞানটা কি সেইসব লিখলে মানুষের কত উপকার হত। না বাবা, থাক… ওই বিজ্ঞানের বিশেষ জ্ঞান নিয়ে লাভ নেই। মোবাইল নিয়ে মানুষের যা যা উন্নতি হবে ভাবা হয়েছিল, মানুষ ঠিক তার উলটো কাজগুলো করে অবনতি ও স্পন্ডিলাইসিসের দিকে এগোচ্ছে। ওই বিভিন্ন লোকে যাওয়ার টেকনোলজি সাধারণ মানুষ পেয়ে গেলে দেখবেন পাড়ার বখাটে ছেলে, রাতবিরেতে আপনার বাথরুমে এসে উঁকি দিয়ে যাবে।

যাইহোক ব্ৰহ্মা হাসি থামিয়ে রৈবতকে বলল, “তোমার পছন্দ করা পাত্রগুলো, তাদের পরের চোদ্দপুরুষ পর্যন্ত মরে ভূত হয়ে গেছে। তুমি কার সাথে রেবতীর বিয়ে দেবে?”

রৈবতের মাথায় হাত। মেয়ের দিতে এনে এক ধাক্কায় মেয়ের বয়স তেতাল্লিশ লাখ বছর বাড়িয়ে দিয়েছে। উপরন্তু রাজ্য-রাজত্ব সব গেছে। এখন পাত্র পায় কই? ব্রহ্মাদেবই সলিউশন দিল—“মর্ত্যে এখন দ্বাপর যুগ চলছে, ওখানে বলরাম আছে সবথেকে লম্বা চওড়া আর বীর। ওর সাথেই তোমার মেয়ের হাইট, ওয়েট ম্যাচ করবে। ওর সাথেই বিয়ে দিয়ে দাও।”

রৈবত নাচতে নাচতে মর্ত্যে এসে কৃষ্ণের দাদা বলরামের সাথে রেবতীর বিয়ে দিয়ে দিল। ধুমধাম হল। গল্পও শেষ হল। দৈতাকার রৈবত মেরু পর্বতে তপস্যা করতে চলে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *