নরকাসুর হত্যা ও পারিজাত গাছ
কৃষ্ণের স্ত্রী জাম্ববতীকে কৃষ্ণ কীরকম পর্যায়ে ভালোবাসত, সেটা আগের পর্বে বললাম। ভালোবাসার জন্য জাম্ববতীকে শাম্ব দিতে কোথায় গিয়ে থামব, সেটা না ভেবেই তপস্যা করে ফেলল কৃষ্ণ। এবং শাম্বকে পুত্র হিসেবে এনে দিল। এবারে আসি কৃষ্ণের আরেক স্ত্রী, সেই সত্রাজিতের কন্যা সত্যভামার কথায়। কৃষ্ণ তাকে কীরকম বিশ্বাস করত এবং ভালোবাসত? পরপর দুটো গল্প বলব তাতেই বুঝতে পারবেন কৃষ্ণ সত্যভামাকে যথেষ্ট সমঝে চলত।
প্রথম গল্প হল নরকাসুরকে নিয়ে। নরকাসুর… বেশ ভয়ের নাম। একে নরক নামের জায়গাটাই মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করে, তার উপরে আবার অসুর। মানে ভয়ের ডবল ডোজে বুলডোজার। এর উলটো কোনো স্বর্গাসুর নেই কিন্তু। স্বর্গ শুধু দেবতাদের, সেখানে আবার নামের সাথে অসুর কেন জুড়বে? তাহলে তো সবাই ভাববে অসুররাও বুঝি কখনও স্বর্গ পেয়েছিল। অসুর মাত্রই বাজে (ওই হাতে গোনা কয়েকটা ছাড়া) আর পাপী। তাই নরকাসুর। হেব্বি ভয়ংকর লোক।
এই নরকাসুরের বয়সের ডালপালা ছিল না। পুরাণ বলে যে সেই সত্যযুগে যখন হিরণ্যাক্ষ পৃথিবীকে কিডন্যাপ করে জলে ডুবিয়ে লুকিয়ে রেখেছিল, তখন নাকি এই নরকাসুরের জন্ম। হিরণ্যাক্ষ গোটা পৃথিবী জয় করেনি। সেটা ছোটোখাটো অসুরের ব্যাপার। একেবারে গোটা পৃথিবীটাকেই তুলে জলের তলায় ডুবিয়ে রেখে দিয়েছিল। কোন জল জানি না, বোধহয় পৃথিবীর বাইরে ব্রহ্মাণ্ডকে বিশাল জলাশয় ভাবা হত। অথবা ব্রহ্মাণ্ডের তলায় একটা সমুদ্র আছে এরকম ভাবা হত। অথবা দানিকেনীয় থিওরি ধরলে এরকমও ভাবতে পারি যে হিরণ্যাক্ষ অন্য গ্রহের মানুষ ছিল, সে পৃথিবীকে ধরে জুপিটার সাইজের কোনো গ্রহের সমুদ্রে ডুবিয়ে রেখেছিল। বেশ একটা আন্তঃ গ্যালাকটিক ব্যাপার স্যাপার। আমাদের পৌরাণিক তারাদের যুদ্ধ… কোথায় লাগে ওইসব স্টার ওয়ার্স?
কিন্তু হিরণ্যাক্ষ বরাহ হয়ে নিজের উঁচু দাঁতের মাঝে পৃথিবীকে রেখেছিল। তারপরে বিষ্ণুঠাকুর নিজের তৃতীয় অবতার নেয়। বরাহ অবতার, হাফ মানুষ হাফ বরাহ। না, এটা এখনকার সমাজের প্রচুর মনুষ্যরূপী বরাহনন্দনের অন্তরছায়া নয়, বরং বাহ্যিক ভাবেই বরাহাবতার পুরো শরীরটা মানুষের আর মাথাটা বরাহের ছিল। কেন, সেটা জানি না। পুরোটাই বরাহ হলেও বা কি অশুদ্ধি হত? মৎস্য অবতারের বেলায় তো বেশিরভাগ জায়গায় চুনোপুঁটি থেকে তিমির ছবি দেখা যায়। নৃসিংহ বা নরসিংহ অবতারের নামেই নর আছে, তাই বুঝতে অসুবিধে হয় না যে মনুষ্য অংশ ও পশু অংশ মিশ্রিত অবতার। কিন্তু বরাহাবতারের বেলায় নর-বরাহ বলা হল না কেন। নরবরাহ নামের সরবরাহ করতে কার্পণ্য কেন? নরবরাহ নামতেই রাখতে গিয়েই পুরাণকারের নড়বড়ে হয়ে গেল কেন?
জানি না বাবা, শুধু জানি বরাহ অবতার গিয়ে হিরণ্যাক্ষকে প্রচণ্ড মার মেরে তারপর পৃথিবীকে বাঁচিয়ে জল থেকে তুলে আনেন। পৃথিবী মানে ভূদেবী, প্রাচীন মন্দিরের কারুকার্যে বরাহ অবতারের দাঁতের উপরে বসে থাকা (বা ঝুলে থাকা) এক নারীকেই দেখতে পাবেন। অনেক পরে ওখানে গ্লোব বসিয়ে পৃথিবী বোঝানো হয়েছে। সে যা-ই হোক, মোদ্দা গল্পটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এরই মাঝে হয় হিরণ্যাক্ষের খোঁচায় নয়তো বরাহ অবতারের খোঁচায় ভূদেবী নরকাসুরের জন্ম দেয়। খোঁচা মানে দাঁতের খোঁচা, ওই যে দাঁতের উপরে নিয়ে বেড়াচ্ছিল, সেটায়। দেবতাদের ব্যাপার, দাঁতের খোঁচাতেই ছেলেপুলে হয়ে যায়।
তাই নরকাসুর ভূদেবী মানে পৃথিবীর ছেলে। তাই ভূদেবী বিষ্ণুর কাছে বর চেয়ে নেয়, “আমার ছেলেকে মেরো না।” যদি নরকাসুর হিরণ্যাক্ষের ছেলে হয় তাহলেও প্রশ্ন আসে যে অসুরের ছেলে জন্মেছে বলেই কি তাকে মারতে হবে? ভূদেবী আশঙ্কা করছেন যে এই ছেলেটাকেও বিষ্ণু মারবে, কারণ অসুরের ছেলে। মানে অসুর পেলেই মারো। আমরা পুরাণে এরকম বহু উদাহরণ দেখেছি যেখানে অসুররা কিছু করার আগেই, অথবা দেবতাদের দলে আসলেও তাদের প্রাণ হারাতে হচ্ছে। মুরগির মতন। যতই ঘরে পালন করা হোক, শেষে তো কোনো রবিবারে কড়াইতে চাপবেই। দেবতাদের এরকম মানসিকতা দেখা যায় অসুরদের প্রতি পুরাণে। খুব… খুব কম এই ব্যাপারের ব্যতিক্রম ঘটনা রয়েছে।
আর যদি নরকাসুর বিষ্ণুর বরাহ অবতারের ছেলে হয়, তাহলে তো এই যুক্তিটাই খাটে না। কেন তাহলে ভূদেবী এরকম একটা বর চাইল? বুঝি না। মোটকথা এই বরে বিষ্ণু নরকাসুরকে একটা বৈষ্ণবাস্ত্র দেয় আর বলে, “এটা যতদিন তোমার কাছে থাকবে, আমি ছাড়া কেউ তোমার কিছু উৎপাটিত করতে পারবে না…”
এই বৈষ্ণবাস্ত্রই আমরা পরে নরকাসুরের ছেলে ভাগদত্তকে ব্যবহার করতে দেখি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দ্বাদশতম দিনে। বাবার থেকে পাওয়া অস্ত্র যুদ্ধে প্ৰয়োগ করে দিল। কিন্তু আমরা গল্প বলছি নরকাসুরের যুবা বয়সের। কিছু গল্প বলে যে নরকাসুর নাকি তপস্যা করে বর নিয়েছিল যে তাকে তার মা ভূদেবী ছাড়া কেউ মারতে পারবে না। মোটামুটি নরকাসুর এমন এমন বর পেয়েছিল যে ওর বাবা বা মা দুজন ছাড়া আর কেউ মারতে পারবে না ওকে। আর বাবা-মা কি কখনও সন্তানকে মারতে পারে? অবশ্য ছোটবেলায় আমি এবং আমার মতো অনেকেই আমাদের পিতা-মাতার কাছে যা মার খেয়েছি, তাতে মনে হয় আমরাও নরকাসুরের থেকেও কড়া ও চড়া কিছু বর পেয়েছিলাম। নইলে কোন যুগেই বাবার লাঠি আর মায়ের খুন্তির ঘায়ে শেষ হয়ে যেতাম।
ব্যস… বিষ্ণু একবার বলে দিয়েছে, নরকাসুরের কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। তাই কোনোকিছুর উৎপাটিত চান্স নেই দেখে উৎপাতিত কার্যে নরকাসুর মন দিল। মানে উৎপাত করতে শুরু করল। তার উৎপাতে দেবতা, মানুষ প্রায়ই চিৎপাত হতে শুরু করল। তবে নরকাসুর কিন্তু সেই অর্থে ক্ষমতালোভী ছিল না। ভোগী ছিল, কিন্তু ক্ষমতা পাওয়ার লোভ ছিল না। গল্প বলে নরকাসুর সমস্ত পৃথিবী আর স্বর্গ জয় করেছিল। কিন্তু তার মানে কি সত্য যুগের বরাহ অবতার থেকে দ্বাপর যুগে কৃষ্ণ পর্যন্ত পুরোটাই নরকাসুর সব জয় করে বসেছিল? মানে মাঝে সূর্যবংশ ও চন্দ্রবংশের সব রাজারা নরকাসুরের অধীনে ছিল? স্বয়ং রামচন্দ্র? রামায়ণে নরকাসুরের যে উল্লেখ পাচ্ছি, সেখানে কোথাও লেখা নেই যে নরকাসুর স্বর্গ-মর্ত জয় করে বসে আছে। তাহলে নরকাসুর কি মন্ডুক জয় করেছিল? হিসেব মেলে না। এক্ষেত্রে কালিকা পুরাণই বোধহয় সঠিক হিসেব দিচ্ছে, বাকি পুরাণগুলো বরাহ অবতারের সময়ের অন্য নরকাসুরের সাথে মহাভারতের সময়ের নরকাসুর জুড়ে দিয়েছে। কালিকা পুরাণ বলছে নরকাসুর মিথিলা থেকে আসাম মানে প্রাগজ্যোতিষপুরে গিয়ে দানবরাজা মোটকা অসুর ঘটকাসুরকে ঘটা করে মটকে দিয়ে রাজা হয়েছিল। কামরূপের ইতিহাসও তাই বলছে। যদিও নরকাসুর যে ভূদেবীর সন্তান ছিল সে ব্যাপারটা সব জায়গাতেই একবাক্যে স্বীকৃত।
কিন্তু আমার মনে হয় নরকাসুর যদি সত্যিই তিনটে যুগ ধরে বেঁচে ছিল তাহলে কোনোদিনই স্বর্গ অধিকার করার চেষ্টা করেনি। করলে আগেই মার খেত। ইন্দ্র দিনরাত কান্নাকাটি করে ঠিক বিষ্ণুঠাকুর নইলে শিবঠাকুর নইলে মা দুর্গাকে জাগিয়ে আনত। আসলে আমার মনে হয় নরকাসুর শুধু ওই একটুআধটু জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে ভালোবাসত। একটু সুন্দর জিনিস বা মহিলা দেখলেই তুলে আনত। কালেকটর মানুষ। এটুকুই চরিত্রে দোষ ছিল। তাও মহিলাদের ব্যাপারে নরকাসুরের খুব সংযম ছিল।
বিশ্বাস হচ্ছে না? আপনারা এবার পুরাণ খুলে দেখাবেন যে নরকাসুর সর্বসাকুল্যে ষোড়শসহস্র অর্থাৎ ষোলো হাজার দেব-ঋষি-মনুষ্য-যক্ষডাইনোসর-ইয়েতি-গডজিলা কন্যাকে এনে নিজের দাসী করে রেখেছিল। তারপরেও এই ফাজিল লেখক বলছে যে নরকাসুরের মহিলাদের ব্যাপারে সংযম ছিল? এ কীরকম কথা!
তাহলে একটা হিসেব দিই। ক্যালকুলেটর নিয়ে বসুন। ধরুন নরকাসুর বরাহ অবতারের সময় থেকে কৃষ্ণের সময় পর্যন্ত জীবিত ছিল। একেবারে তিনটে যুগ। হিসেব করলে দেখা যাবে প্রায় তেরো-চোদ্দ লাখ বছর। এবার এমন তো হতে পারে না যে নরকাসুর তেরো লাখ বছর ধরে চরিত্র বজায় রেখে হঠাৎ শেষের দিকে একেবারে মাথা আর চরিত্র দুটোই খারাপ করে ফেলে একসাথে ষোলো হাজার নারীকে তুলে আনল। এটায় কোনো লজিক নেই। তেরো লাখ বছর বেঁচেছে লোকটা, মরার আগে কি জীবনের সমস্ত লুইচ্চামির শখ পূরণ করতে চাইছিল? হতেই পারে না। সুতরাং অতিবৃদ্ধ এই নরকাসুর নিশ্চয়ই সারাজীবন ধরেই মহিলা কিডন্যাপ করেছে। যার চরিত্রে দোষ তার আঠেরোতেও দোষ হবে, আশিতেও হবে, আটশোতেও হবে, আট লাখেও হবে। সুতরাং এবারে তেরো লাখকে যদি ষোলো হাজার দিয়ে ভাগ করেন তাহলে দেখবেন গড়ে ওই আশি-নব্বই বছর পাবেন। এবারে ভাবুন, একটা লোক, যে এতদিন ধরে বেঁচে আছে, সে আশি-নব্বই বছর অন্তর একজন করে নতুন সঙ্গিনী আনছে। যেখানে এখনকার অনেক কামাতুর মানুষ এক সঙ্গিনী থাকতেই বছরখানেকের মধ্যেই একাধিক সঙ্গিনীর খোঁজ করে, সেখানে নরকাসুর আশি-নব্বই বছর অন্তর একজন করে সঙ্গিনী আনলে তাকে তো সংযমীই বলতে হয়। আবার দেখুন, আগের সঙ্গিনীকে তাড়িয়ে দেয়নি। একে একে সবাইকে রেখে দিয়েছিল। কত মহানুভব।
কিন্তু তাহলে আরও প্রশ্নের উপরে প্রশ্ন চলে আসে। পুরাণকার তো লিখেই খালাস, আমাদের মতন পদে পদে প্রশ্নের পদাবলী রাখা মানুষদের হয়েছে বিপদ। নরকাসুর যদি তিনটে যুগ ধরে ষোলো হাজার নারীকে সঙ্গিনী করেছে, তাহলে এই ষোলো হাজার নারীদের মধ্যে বেশিরভাগই নিশ্চয় কৃষ্ণের থেকে বয়সে বড়। একটু আধটু নয়, একেবারে লাখ-লাখ বছর বড়। নরকাসুর নাহয় বর পেয়ে এত বছর বেঁচে ছিল, তাই বলে এই ষোলো হাজার নারী বিবাহযোগ্যা কন্যারূপে ছিল কী করে। বয়সের তো গাছ-পাথর না থাকার কথা। তাহলে তাদের যবনরা যখন তুলে নিয়ে গেল, তারপরেও তো বেঁচে থাকার কথা। এখনও থাকার কথা। এত লক্ষ বছর বেঁচে থাকল, আর পাঁচ হাজার বছর বাঁচেনি?
লজিকের শুধু হত্যা করে খাল করে দিয়েছে, অতএব এতদ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে নরকাসুরের বরাহ সত্য যুগ থেকে দ্বাপর যুগ বেঁচে থাকাটা একটা গল্পকথা। হয় যুগের হিসেবে গোলমাল আছে, আর নয়তো নরকাসুর একাধিক ছিল, অথবা নরকাসুর একটা উপাধি ছিল আর কৃষ্ণের সময়ের নরকাসুরটাই বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল। এই নরকাসুরটাই হয়তো বাণাসুরের পাল্লায় পড়ে গোল্লায় গেছিল। এমনকি কামাখ্যা দেবীকে বিয়ে পর্যন্ত করতে চায়। কিন্তু দেবী শর্ত দেয় যে ভোর হওয়ার আগে নীলাচল পাহাড়ের গায়ে নীচ থেকে উপর পর্যন্ত সিঁড়ি বানাতে হবে। নরকাসুর রাতের বেলা মাথায় মশাল বেঁধে সিঁড়ি কাটতে শুরু করে, এবং অনেকটা করেও ফেলে। দেবী কামাখ্যা দেখেন বিপদের ব্যাপার, নরকাসুর যে ডাকসাইটে রাজমিস্ত্রি, সে খবর তো ছিল না। অতঃপর দেবী একটা মোরগকে ডাকতে বলল। মোরগ “কোঁকর কোঁ” করে ডাকতেই নরকাসুর ভাবল, “যাহ্ ভোর হয়ে গেল, শর্ত হেরে গেলাম…”। এই ভেবে কাজ ছেড়ে দেয়।
এই জন্য ঘড়ির খুব দরকার। মোরগের উপরে ভরসা করলেই অহল্যার বরের মতন আর নয়তো নরকাসুরের মতন কাণ্ড ঘটে যাবে। পরে অবশ্য নরকাসুর সত্যি কথাটা জেনে মোরগটাকে খুঁজে বের করে তার তন্দুরি বানিয়ে খেয়েছিল। সেই জায়গাটা নাকি দারাংয়ে কুকুরকাটা জায়গায় ঘটেছিল। আর নরকাসুরের অসমাপ্ত সিঁড়িটাকে মেখলৌজ সিঁড়ি বলে। এখনও অনেকে ওই রাস্তা দিয়ে কামাখ্যায় ওঠেন।
যা-ই হোক, এই নরকাসুর এবারে একেবারে স্বর্গকে নিজের রাজ্যের বর্গক্ষেত্রের মধ্যে আনার জন্য আক্রমণ করে এবং ইন্দ্রকে তাড়িয়ে ছাড়ে। ভালো ব্যাপার, ইন্দ্র আর বাকি দেবতাদের একপ্রকার স্যুটকেস গোছানোই থাকত, যে কোনোদিন অসুররা আক্রমণ করলেই পালিয়ে যাবে। আমি বুঝি না দেবতাগুলো অমৃত খেয়েও কেন অসুরদের আক্রমণে ভয় পেত? যা-ই হোক, স্বর্গ আক্রমণ করে নরকাসুরের বস্তু সংগ্রহের নেশা চাগাড় দেয়। স্বর্গের জিনিসপত্র তো লুটে নিয়েইছিল, এবারে একেবারে দেবতাদের মা অদিতির কানের ঝকঝকে দুল দুটো দেখে নরকাসুরের চোখ চকচক করে উঠল।
অদিতির কাছে গিয়ে নরকাসুর বলল, “এই যে মাসিমা, কানের দুল দুটো ছাড়ুন দেখি…”
“এ যে আমার বিশেষ কানের দুল,” অদিতি শঙ্কিত হয়। কিন্তু পঙ্কিতমন নরকাসুর হনন করার অভিপ্রায়ে বলে, “কানসমেত দুল একেবারে ফুল তুলে নেব, ভালো লাগবে? তার থেকে নিজেই দিয়ে দিন!”
অদিতি কান হারাবার ভয়ে দুলজোড়া নরকাসুরকে দিয়ে দেয়। শঙ্কায় পড়া দেবতাদের লবডঙ্কা দেখিয়ে নরকাসুর “হুহাহাহাহাহাহাহা…” করে বিকট হাসি হেসে স্বর্গের সিংহাসনে বসে অপ্সরাদের নৃত্য দেখতে থাকে। মানে সিরিয়ালগুলোয় তো তাই দেখায়, কোনোদিন দেখিয়েছে যে অসুরেরা বিরোধীপার্টির ক্ষমতায় আসার মতন গদিতে বসে কাজ করে দেখাচ্ছে? না, বসেই পানপাত্রে ঠান্ডা পানীয় খায় আর অপ্সরাদের ধেই ধেই নৃত্য দেখে। মনে হয় যেন একমাত্র ওই কাজটা করার জন্যই স্বর্গ জয় করেছে।
নরকাসুর স্বর্গ জয় করেই প্রাগজ্যোতিষপুরকে শক্তিশালী ঘাঁটি বানাতে শুরু করল। কেন? নরকাসুর এত ক্ষমতাবান হয়েও এতদিন অপেক্ষা করে হঠাৎ স্বর্গ জয় করল, হঠাৎ ভৌমকে দিয়ে দুর্ভেদ্য কেল্লা বানাতে শুরু করল? কীসের ভয়ে?
আসলে, কারণটা মনে হয় সেই কিছু পর্ব আগে যেটা বলেছিলাম সেটাই। কংসের সাথে জরাসন্ধ, পৌণ্ড্রক বাসুদেব, নরকাসুর ইত্যাদি রাজারা মিলে যাদবদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। এবং জরাসন্ধের বারংবার আক্রমণে কুরুদের উপস্থিতি দেখে মনে হয় কুরুরাও চাইছিল যাদবরা সুপারপাওয়ার না হোক। সুতরাং রাজা কৃষ্ণ একদিকে যেমন খুঁজে খুঁজে সমস্ত যাদব জাতিকে একত্রিত করে বৃহত্তর যাদব গোষ্ঠী তৈরি করে, অন্যদিকে একইসময়ে যাদবদের বিরুদ্ধে যারা মাথা তুলতে পারে তাদের নানা অছিলায় শেষ করে দিতেও ছাড়েনি। পুরাণকার তো তৈরিই ছিল, যারা কৃষ্ণের বিরুদ্ধে সব্বাইকে পাপী-তাপী-অসুর-রাক্ষস-দানব-নাগ, আগের জন্মের পাপ, পাপীর ছেলের ছাপ ইত্যাদি স্ট্যাম্পের খাপ বসিয়ে চাপ দিয়ে দিল। ব্যস, সব্বাই দৈব ঘটনার ঘনঘটায় আসল ইতিহাসটাই দেখতে পেল না।
এবং তাই পাণ্ডবরা যখন নিজেদের পায়ে কুড়ুল মেরে, নিজেদের আত্মীয়দের সাথে ঝগড়া করে মারামারি করে রাজত্ব প্রায় রুপোর থালায় করে যাদবদের হাতে তুলে দিতে তৈরি হচ্ছে, তক্ষুনি নানাদিকে যাদবদের শত্রু নিধন শুরু হল নানা অজুহাতে। একশোটা অপমান করেছে, দাও ভাইয়ের গলা কেটে। আসল কারণ ও ব্যাটা জরাসন্ধদের সমর্থন করে। পৌণ্ড্রক বাসুদেব কৃষ্ণের নকল করে? দাও ওকেও শেষ করে। শৃগাল বাসুদেব ভয় পেয়েছে, ওকেও মেরে দাও। জরাসন্ধ বেশি বাড়াবাড়ি করছে, ভীমের হাতে মেরে ফেলো। নরকাসুর অদিতির কানের দুল নিয়েছে, চলো এক্ষুনি ওকে মারতে হবে।
ধর্ম ও লীলার রোদচশমা পরে এই ঘটনাগুলো দেখলে আমি যে রাজনৈতিক তপ্ত রৌদ্রালোকের কথা বলছি সেটা দেখতে পাবেন না। পুরোটাই খুব ঠান্ডা আর মোহময় লাগবে। কারোর ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করছি না, কিন্তু এই কথাগুলোই কোনো ধর্মপ্রাণ মানুষকে বললে দেখবেন সবই লীলার খাতায় ঢেলে দেবে, এবং আর প্রশ্ন করতে থাকলে মায়ার জগতে টেনে নিয়ে যাবে। ততক্ষণেও যদি আপনি দয়ালু হয়ে মায়ালু অবস্থায় না যান তাহলে একবাক্যে আপনাকে নাস্তিক, পাষণ্ড, অন্য ধর্মের ধ্বজাধারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। তখন দেখবেন অন্য ধর্মের কোন গুরুতে কী করেছিল, সেটা টেনে জিজ্ঞেস করা হবে যে ওখানে কেন আমি প্রশ্ন করছি না? যত প্রশ্ন এই ধর্মেই করতে হবে ?
অথচ এই মানুষেরাই ভুলে যান যে মহাভারত কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়। মহাভারত স্পষ্টভাবে উল্লেখিত ইতিহাস, এবং আমার ধারণা ইতিহাসকে সরাসরি ইতিহাস হিসেবে লেখার জন্য এবং সকলের কীর্তি সর্বসমক্ষে প্রকাশের জন্য ব্যাসদেবকেও যথেষ্ট সমালচনার মুখে পড়তে হয়। এবং তাই পরবর্তীকালে কাঠখোট্টা যুদ্ধবিবরণপ্রিয় ব্যাসদেব হঠাৎ ভক্তিভাবে আপ্লুত হয়ে কেন যে হরিবংশে সবই লীলার খাতায় বহমান হলেন সেটা ভাবতে অবাক লাগে। অপরাধ মার্জনা করবেন, কিন্তু ব্যাসদেব যেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রথম জীবনে মুক্তমনা হয়ে পুরাণচর্চা, এবং পরবর্তী জীবনে ঘোর বৈষ্ণব সমর্থনকারী হয়ে গেলেন। অথবা হতে পারে যে তৎকালীন সময়ে, অর্থাৎ মহাভারতের যুদ্ধের পরে যখন দেখা যাচ্ছে ভারতবর্ষের শাসক পাণ্ডবরা যাদবরাজা কৃষ্ণের কথায় ওঠা-বসা করছে, এবং কৃষ্ণেরই নাতি ও বোনের নাতি ক্রমে সেই শাসনক্ষমতা পাচ্ছে, তখন সেই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লিখে লাভ কি? আমি বিশ্বাস করি যে এত লক্ষ লক্ষ যাদবরা সকলে দ্বারকায় থাকত না। এবং মহাভারতের শেষে শুধু দ্বারকাবাসীদেরই অর্জুন আনতে যায়, যেখানে ব্যর্থ হয়ে অনেক দ্বারকাবাসী মহিলাদের যবনরা তুলে নিয়ে যায়। দ্বারকাবাসী যাদব ছাড়াও প্রচুর যাদব নিশ্চয়ই ভূ-ভারতে ছড়িয়ে ছিল, এবং তারাই পরবর্তীকালে পরীক্ষিৎ (কৃষ্ণের থেকে জীবন পেয়ে পুরো যাদব ধরতে পারি কি?) এবং বজ্রের শাসনে আরও বিস্তার করে। কারণ ততদিনে তো কৃষ্ণ আর পাণ্ডবরা অনেককেই শেষ করে দিয়েছে। খুচরো কয়েকজন আঞ্চলিক রাজাগুলো নিয়ে ভয় নেই, বাকি সব্বাই শেষ। হয়তো সেই ভয়েই এবং ভবিষ্যতের ব্যাপারে সঠিক হিসেব করেই চিত্রাঙ্গদার বাবা অর্জুনকে বলে দিয়েছিল, “বিয়ে করছ ঠিক আছে, কিন্তু তোমাদের কোনো ব্যাপারে আমাদের টানবে না…”। কিন্তু তাও সেই অর্জুন বয়সকালে ঠিক ওখানেই যুদ্ধ করতে গেছিল। আর্যরা পূর্বভারত বিশেষ করে সামুদ্রিক অঞ্চল, নদীভরা বঙ্গদেশ ও পার্বত্য পূর্ব-ভারতে কোনোদিনই ঠিক সুবিধে করে উঠতে পারেনি। সে যতই অর্জুন যাক আর যেই যাক, অতদূর ঢুকতে পারেনি।
যা-ই হোক, সেই হিসেব অনুযায়ী নরকাসুর তার মানে বুঝতে পেরেছিল যে কৃষ্ণ বা পাণ্ডবরা তাকে মারার চেষ্টা করবেই। তাই সে দুর্ভেদ্য কেল্লা বানিয়েছিল। কানের দুল আর স্বর্গর্জয়ের গল্পটা সম্ভবত উপলক্ষ্য হিসেবে লেখা। কারণ তখন পরশুরাম, ভীষ্ম, জাম্বুবান, হনুমান সবাই জীবিত। দেবতারা গিয়ে তাদের ধরল না কেন? নরকাসুরকে নাহয় এরা মারতে পারবে না, মানছি, কিন্তু তাই বলে যুদ্ধ করে ঠ্যাং খোঁড়া করে দিতে পারত তো। পরশুরাম গিয়ে নরকাসুরকে আচ্ছাসে ধোলাই দিয়ে কেল্লা গুঁড়িয়ে দিতে পারত না? ভীষ্মকে দেখুন। কত বছর আগের অম্বা বারংবার বুম্বা হচ্ছে না জুম্বা নেত্য করছে, সব খবর রাখছে, এদিকে নরকাসুর স্বর্গ জয় করে ফেলল সে ব্যাপারে তাপ-উত্তাপ নেই। এই ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা নেওয়ার সময়েই দেবতাগুলো ব্যান্ড-পার্টি তাসা বাজিয়ে আকাশ থেকে পুষ্প বর্ষণ করেছিল। আজ দেবতাদের বিপদে ভীষ্মের শুষ্ক দর্শন ছাড়া কিছুই ছিল না। জাম্বুবান গর্তে ঢুকে আছে আর হনুমান ভাইকে পরীক্ষা করছে। দেবতাগুলো স্বর্গচ্যুত হয়েছে, থাক, কদিন ঘুরে বেড়াক। সবাই লীলার অপেক্ষা করছে।
অতঃপর গল্প অনুযায়ী ইন্দ্র এবং বাকি দেবতারা কৃষ্ণের কাছে এসে বলল, “হেল্প করো…”
বটেই তো। বিষ্ণু যখন অবতার নিয়ে পৃথিবীতে একটা আঞ্চলিক অফিস খুলেই রেখেছে, তখন খামোকা বিষ্ণুলোক, ব্রহ্মলোক, কৈলাসে গিয়ে ত্রাহি ত্রাহি করার কি দরকার? তার উপরে নরকাসুরের বরের পিছনে তো বিষ্ণুরই বর আছে। ইন্দ্ৰ তো একপ্রকার বলেই ফেলেছিল, “তখন বরাহ হয়ে খুব তো এক ফোঁটা ঘাম থেকে পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন, এবারে সেই বরাহ অবতারের নন্দন কাননে গিয়ে বরাহনন্দনের আচরণ করছে। ঝামেলা তুমিই শুরু করেছ, তুমিই শেষ করো…”
কিন্তু ইন্দ্রের এইসব বলার আগেই সত্যভামা এসে কৃষ্ণকে বলে, “জানো কী হয়েছে? অদিতি মাসি এসেছিল, বলল নরকু নাকি মাসির কানের দুল ছিনতাই করেছে…কীরকম অন্যায় কাজ বলো…?”
আমি অদিতিকে সত্যভামার মাসি বললাম কারণ অনেক গ্রন্থে লেখা আছে অদিতির সাথে সত্যভামার আত্মীয়তা ছিল। কিন্তু বহু খুঁজেও সত্যভামার বাবা সত্রাজিতের দিকে কোনোভাবেই আমি দক্ষকন্যা ও কাশ্যপজায়া অদিতির সম্পর্ক খুঁজে পাইনি। তাই একমাত্র সম্ভাবনা হল যে অদিতি সত্যভামার মায়ের দিকের আত্মীয় ছিল।
কৃষ্ণ বলল, “অদিতি মাসির আবার কী হল?”
“ওর কানের দুল নিয়ে নিয়েছে নরকু…” সত্যভামা বড় বড় চোখে বলে। ইন্দ্র অস্ফুট স্বরে বলে, “আমার গোটা স্বর্গ রাজ্যই নিয়ে নিল, তার বেলায় কারোর হেলদোল নেই, আর মায়ের কানের দুল নিয়েছে বলে সত্যদিদি এত চিন্তা করছে…”
কৃষ্ণ বলল, “যাহ্ সর্বনাশ, শেষে অদিতিমাসির কানে হাত? তৈরি হয়ে নাও সত্যভামা, নরকাসুরের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে আসি…”
সত্যভামা সঙ্গে সঙ্গে সুট করে ব্যাটেল স্যুট পরে এলো। যুদ্ধং দেহী। কৃষ্ণ নিজের পার্সোনাল হেলিকপ্টার গরুড় পাখিকে ডেকে নিল। তারপরে কৃষ্ণ আর সত্যভামা উড়ে চলল নরকাসুরের কেল্লার দিকে। হেঁটে গেলে বা রথে গেলে যে অনেকটা রাস্তা। সেই গুজরাটে দ্বারকা থেকে আসাম যাওয়া। চাট্টিখানি কথা? কিন্তু প্রশ্ন হল কৃষ্ণ সঙ্গে করে সত্যভামাকে নিয়ে গেল কেন? তার কারণ হল, সত্যভামা নাকি ভূদেবীর অবতার ছিল। আর সেই বর অনুযায়ী নরকাসুর একমাত্র তার মা ভূদেবীর হাতেই মরতে পারত। তাই ভূদেবীকে নিয়েই ঢুঁ মারতে গেল কৃষ্ণ।
এদিকে নরকাসুরের কেল্লায় একেবারে পাহারার জেল্লা বসেছে। তার চারদিকে চারটে স্তর বানিয়ে চারজন নামজাদা অসুর চরেরা পাহারা দিচ্ছিল। ঘোড়ামুখো হয়গ্রীব, কাসুন্দিখোর নিসুন্দ, পঞ্চনদ (পাঞ্জাবী ছিল নাকি?) এবং মুরা। এই মুরা ছিল সবচেয়ে ওয়ান্টেড রাক্ষস বা অসুর বা দৈত্য। মুরা ছিল ঘটোৎকচের শ্বশুর। তার আবার একহাজারটা ছেলে ছিল। সবার একশোটা, এক হাজারটা ছেলে। তখন কি বীর্যশুক্র একটাও অসফল হত না? হাজারটা, দশহাজারটা ছেলে। খাওয়াত কে? হিসেব কে রাখত? এদের বিয়ে কাদের সাথে হত? মেয়ে কই? হ্যাঁ মুরার একটা মেয়ে ছিল, তার কথা পরে বলছি।
এই মুরা জলের তলায় বসে মুড়ি খাচ্ছিল। দৈত্য-দানবের ব্যাপার। প্রচণ্ড গরম লাগত বলে হয়তো জলের তলায় বসে থাকত। মুরা কি আদৌ রাক্ষস ছিল নাকি গাঙ্গেয় শুশুক? আর্য পুরাণকারগুলো অত বোঝেনি, জলচর কালো কালো জীব দেখেই হয়তো বলে দিয়েছে, “ওই দ্যাখ, ওটা মুরা…”। আরেক কারণ হল, মুরাকে নাগ বলা হচ্ছে। আর্যরা জলের মধ্যে যা জীব থাকত সেগুলোকেই মাছ নয়তো নাগ বলে চালিয়ে দিত।
এদিকে কৃষ্ণ ঠাকুর নিজের জীবন্ত ‘অর্ধ ঈগল-অৰ্দ্ধ মনুষ্য’ হাইব্রীড হেলিকপ্টার থেকেই পাঞ্চজন্য শঙ্খে ফুঁ দিয়ে যুদ্ধের ঘোষণা করল। সেই শঙ্খনাদের জোরেই মুরার জলছাদ উড়ে গিয়ে ব্যাঁকা চাঁদ দৃষ্ট হল। রে রে রে রে করে এগারো অক্ষৌহিণী অসুর তেড়ে এল। রে রে করে তেড়ে আসায় বেশ একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব আছে, নইলে সা সা সা সা গা গা গা গা, মা মা মা মা করে তেড়ে এলে যুদ্ধ হচ্ছে, না নাচের প্রোগ্রাম হচ্ছে সেটা বোঝা যেত না। অবশ্য আজকাল নাচের অনুষ্ঠানগুলোয় নাচের নামে যা লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি আর কান্নাকাটি দেখি, সেটাকে যুদ্ধের থেকে কম কিছু বলা যায় না।
কৃষ্ণ একাই আকাশপথ থেকে ঢ্যারার্যারা-ঢ্যারারারা করে অস্ত্ৰ-শস্ত্ৰ চালিয়ে অসুরদের কচুকাটা করতে লাগল। নিসুন্দ বেশ গাছ পাথর আর শক্তিশেল টেল ছুঁড়ছিল। কিন্তু কৃষ্ণ সুন্দর করে নিসুন্দর মুণ্ডটা কুচ করে কেটে দিল। তারপরে সহজেই হয়গ্রীবের জিভ বের করে দিল আর পঞ্চনদের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটিয়ে দিল। এবারে আসরে আসল মুরা। সঙ্গে তার হাজারটা ছেলে। সুরা পান করে ধরাচূড়া পরে মুরা যুদ্ধে আসতেই কৃষ্ণ কিছুক্ষণেই মুরাকে পাহাড়ের চূড়া ছুড়ে গুঁড়া করে ফেলল। মুরাকে মেরে কৃষ্ণের নাম হল মুরারী। মুরা মরতেই মুরার মেয়ে অহিলাবতী (অন্যমতে মৌরভী) নিজের বাপের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে বলে ঠিক করে। কিন্তু তারপরে অহিলাবতীর সিদ্ধান্ত পালটে যায়। তার একটা কারণ বোধহয় এই যে প্রাগজ্যোতিষপুরে নরকাসুরের সরকার তখন টলমল অবস্থায়। এই সময়ে ‘দলে থেকে কাজ করতে পারছি না’ বলে অন্য দলে চলে যাওয়াই ভালো। অহিলাবতী তাইই করে। কৃষ্ণের কাছে আত্মসমর্পণ করলে কৃষ্ণ আশীর্বাদ করে যে অহিলাবতীর শিগগিরই বিয়ে হবে। এই অহিলাবতীর বিয়ে হয়েছিল ভীমের ছেলে ঘটোৎকচের সাথে। অর্থাৎ অহিলাবতী হল বর্বরিকের মা। বর্বরিকের গল্প আমি ‘ফাজিলের মহাভারতে’ বলেছি।
কৃষ্ণ এদিকে নরকাসুরের দুর্ভেদ্য দুর্গকে ভেদ করে ঢুকে নরকাসুরের সাথে হেব্বি ঝাড়পিট শুরু করে দিয়েছে। যুদ্ধের বিবরণ সেই একই হয়। ঠাস-ঠাস দ্রুম দ্রাম দমাস দমাস, এই বই তো আর কিছু না। অতঃপর হরিবংশ সম্পূর্ণভাবে সত্যভামার কৃতিত্বকে বাদ দিয়ে বলছে যে যুদ্ধশেষে কৃষ্ণই চক্র দিয়ে নরকাসুরকে ভাগ করে কেটে দেয়। অন্য পুরাণে বলে, গরুড়ের পিঠে বসে সত্যভামা একদম ধুমধাড়াক্কা মারপিট করে নরকাসুরকে তির-বল্লম-বেলনা-খুন্তি-রাইফেল কিছু একটা দিয়ে মেরে ফেলে। বর রইল, মায়ের পুনরায় জন্মে পুত্র শেষ। কৃষ্ণ তারপরে নরকাসুরের অন্দরমহলে ঢুকে ষোলো হাজার মহিলাকে খুঁজে পেল। তারা কৃষ্ণকে দেখেই বলল, “বাড়িতে আমাদের আর কেউ মেনে নেবে না। আমরা তাদের কাছে মৃত। ফিরে গেলে সব অনার কিলিং করে জ্বালিয়ে দেবে। তুমি আমাদের বিয়ে করে নাও…”
সেই থেকেই কৃষ্ণের ষোলো হাজার বউ। প্লাস-মাইনাস একশো। কিন্তু নরকাসুরের প্রাসাদে এই বিপুল মহিলা সমিতি ছাড়াও কৃষ্ণ আরও অনেক গচ্ছিত গুপ্তধন পেয়েছিল। অদিতির কানের দুল আর বরুণের ছাতা তো ছিলই। ওই ছাতা দিয়েই নাকি বৃষ্টির জল পড়ে। এ ছাড়াও ছিল প্রচুর প্রচুর ধনরত্ন। কানের দুল আর ছাতা বাদে বাকি সব কৃষ্ণ আপন করে নেয়। বাঃ রে, অতবড় যাদব গোষ্ঠী চালাচ্ছে, প্রায়ই যুদ্ধ করতে হচ্ছে, তার একটা খরচাখরচ নেই? তাছাড়াও কুড়ি হাজার বড় হস্তি, চল্লিশ হাজার হস্তিনী ও আট লক্ষ ঘোড়াও নিয়ে চলে যায়। অদ্ভুত মানসিকতা। নরকাসুর নাহয় পাপী ছিল, তাই তাকে মারা হল। কিন্তু এত এত ধন সম্পত্তি ও পশু সম্পত্তি নিয়ে নেওয়ার কি দরকার ছিল? ওগুলো তো প্রাগজ্যোতিষপুরের সরকারি সম্পত্তি। তাহলে নরকাসুরের স্বর্গ জয় করে সব লুটে নেওয়া আর কৃষ্ণের নরকাসুরকে মেরে সেইসবই চেটেপুটে নিয়ে নেওয়ার মধ্যে তফাতটা কোথায়? জানি না বাবা… সবই লীলা।
মোটকথা কৃষ্ণ একটা বউ নিয়ে গেছিল, আর ফেরার সময় ষোলো হাজার বউ আর প্রচুর ধনসম্পত্তি নিয়ে ফিরে এল। কিন্তু ব্যাপারটা হল, যে আমি আগের পর্বে কৃষ্ণের বউদের কথা বলতে বলতে এবং এই পর্বের শুরুতে কৃষ্ণ সত্যভামাকে কতটা ভালোবাসত সেটা বলতে গিয়ে হঠাৎ বেলাইনে গিয়ে নরকাসুর বধের গল্প শোনালাম কেন? কারণ প্রচলিত গল্প যদি সত্য হয় তাহলে কৃষ্ণকে কিন্তু সত্যভামার উপরেই বিশ্বাস রাখতে হয়েছিল, নরকাসুরকে মারার জন্য। ইতিহাস ও পুরাণ বলে যে রাজা যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে গেছে, সেই রাজা সেই স্ত্রীকে নিজের আত্মার মতন বিশ্বাস করত।
কৃষ্ণের স্ত্রীদের মধ্যে সত্যভামাই একমাত্র লড়াকু মনোভাবের ছিল। বাবার মার্ডার দেখে ঠিক কৃষ্ণকে দিয়ে খুনিকে মারা করিয়েছে। আবার নরকাসুরের মতন অতিবৃদ্ধ অসুরকেও মেরেছে। এবারে আরেকটা গল্প বলব যেটায় সত্যভামাকে যে কৃষ্ণ কতটা বুঝেশুনে চলত সেটাও বুঝবেন আবার প্রথম স্ত্রী রুক্মিণীকেও কতটা ভালোবাসত সেটাও জানবেন।
সেবার কী হয়েছে, রুক্মিণী একটা ব্রত রেখেছে। ব্রতের ব্রতকথার পুঙ্খানুপুঙ্খ হরিবংশে লেখা আছে, ওটা না জানলেও হবে। ওই ব্রতের শেষে পুজো আর উৎসব হত রৈবতক পর্বতের উপরে। তাই কৃষ্ণ, রুক্মিণীসহ নিজের ষোলো হাজার বউকে নিয়ে চলল পাহাড়ে। সাথে ছেলেপুলে, যদু বংশের আত্মীয় লোক-লস্কর সব নিয়ে পর্বতে গেল। পর্বতের উপরে নবমীর রাতের ভিড়। শুধু কৃষ্ণের ঘরের লোকেই ঠেলাঠেলি লেগে গেছে। স্বাভাবিক। একটা পর্বতে অনুষ্ঠান হচ্ছে, আর সেখানে শুধু কৃষ্ণের ফ্যামিলির লাখখানেক লোক গেলে ভিড় হবে না? ভিড়ের কথা পুরাণকার চেপে গেছে। একেবারে কুম্ভ মেলা বসে গেছে।
পর্বতে পৌঁছে কয়েক গ্লাস শরবত খেয়ে কৃষ্ণ নারদ আর অন্য দেবতাদের সাথে কয়েকটা খোশগল্প করছে। ওই দেশের খবর, দশের খবর। এমন সময়ে নারদ ফাঁকে-তালে কোথা থেকে রুক্মিণীর সাথে দেখা করেছে, “কেমন আছ, বউমা?”
রুক্মিণী প্রণাম করতেই নারদ হাতের মুঠো থেকে একটা ফুল বের করে বলে, “এই নাও ফুল…”
ফুল শুঁকেই রুক্মিণী ফুল মোহিত হয়ে গেল। এ কীরকম ফুল? কী সুন্দর গন্ধ! দ্বারকার ফুল সাপ্লায়ার নান্টু কোনোদিন এই ফুল আনেনি তো। রুক্মিণী জিজ্ঞেস করে, “এই বিচিত্র ফুল কীসের? চম্পা-চামেলি-গোলাপ-রজনী সবরকম গন্ধ ছাড়ছে। এটা কি হাইব্রীড?”
“হাইব্রীডই বটে,” নারদ বলে, “অত্যন্ত হাই, মানে উচ্চ স্থানে ব্রীড করা হয়। ওই স্বর্গের পাশের নন্দনকাননে পারিজাত গাছের ফুল এটা। এ ফুল কোনো দিন শুকিয়ে যায় না…”
“কেন? কাগজের ফুল নাকি? প্লাস্টিক?” রুক্মিণী জিজ্ঞেস করে।
“না না, জাদুভরা ফুল এটা,” নারদ বলে, “এক বছর ধরে যে যে ফুলের ঘ্রাণ চাইবে, সেই ঘ্রাণ দেবে এই ফুল…”
“ফুল কী করে জানবে কোন ঘ্রাণ চাইছি? চিপ লাগানো আছে নাকি?” রুক্মিণী জিজ্ঞেস করে, “নোটবদলের পরে সেরকম দু-হাজার টাকার নোটে মাইক্রোচিপ লাগানো হয়েছিল সেরকম?”
“না, এটা নোটবন্দি বা বেকার ফন্দি নয়, এসব দৈব ব্যাপার…” নারদ বলে, “এই ফুল তোমার ফুল মানসিক স্ক্যান করে জানতে পারে তুমি কোন গন্ধ চাইছ।”
“আর কী কী করে এই ফুল?”
“তুমি যা ফুল চাইবে, সেই ফুল দেবে…”
“বেস্পতিবার করে ফুলের খরচ বেঁচে গেল!”
“সৌভাগ্যও দেবে, মনে কু চিন্তা আসতে দেবে না, ফুলের যা রং চাইবে সেই রং হয়ে যাবে, তোমার ইচ্ছেমতন সরু-মোটাও হয়ে যাবে,” নারদ বলে, “ঘরের ডাস্টবিন খালি করতে ভুলে গেলে সেদিন এই ফুল নিজেই গন্ধ বাড়িয়ে নেবে আবার রাতেও আলো দেবে… আবার চাইলে গানও করতে পারে!”
“ফুলে গান করে?”
“হ্যাঁ গো,” নারদ বলে, “কিন্তু একবছর পরে এই ফুল আবার নিজের থেকেই পারিজাত গাছে ফিরে যাবে।”
রুক্মিণী ওই ফুল গ্রহণ করে। পারিজাত ফুলের কত্ত গুণ ছিল ভেবে দেখুন । গন্ধ দেয়, আলো দেয়, রং দেয়, গান শোনায়, একবছর পরে গাছের কাছে ফিরে যায়। পারিজাত ফুল কি আসলে ফুলের আকারে আলেক্সা বা সিরির মতন সর্বার্থসাধক ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট টেকনোলজি নাকি লোকাল ট্রেনে বিক্রি হওয়া সেইসব অদ্ভূত যন্ত্র যেগুলোতে রেডিয়োও বাজে, লাইটও জ্বলে, পাঁচরকম সুগন্ধী কালির পেনও হয়, ছিপি খোলার ছুরিও হয় আবার একটা পুঁচকে কান খোঁচানোর খুশকিও থাকে? কিছু একটা ব্যাপার আছে। ফুল, সে যতই দৈব ফুল হোক, সে যদি ফুলের বৈশিষ্ট্য ছেড়ে ঝিকিমিকি আলো দিয়ে গলা ছেড়ে গান গায় তাহলে সেটাকে আর যা-ই হোক, ফুল বলা চলে না। এই পারিজাত গাছের ফুল তার মানে কোনো এলিয়েন জীব। ফুলে রংবেরঙের আলো ছড়িয়ে গান গাইছে… ভাবা যায়? ফুল না ডিস্কোতে ঝোলানো ঝলমলে গ্লোব?
যা-ই হোক, ওই ফুল রুক্মিণী পেয়ে যারপরনাই আহ্লাদিত হল। কিন্তু খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। ষোলো হাজার পত্নী জেনে গেল এই ফুলের কথা। কিন্তু কেউই হিংসেমি করল না। একমাত্র সত্যভামার হেব্বি গায়ে লাগল। এতটাই লাগল যে রাজবেশ ছেড়ে আলুথালু বেশে অন্দরমহলে পড়ে রইল। কৃষ্ণ আবার কি করতে ওখানেই গেছিল। গিয়ে দেখে সত্যভামার মুখ হাঁড়ি করে আবহাওয়া ভারী করে বিরহিনী নারী হয়ে শুয়ে আছে। কৃষ্ণ দেখে কেস জন্ডিস। বিবাহিত পুরুষ মাত্রই জানে, পৃথিবীর সবথেকে ভীতির ব্যাপার হল, স্ত্রী রাগ। তার উপর স্ত্রী যদি কথা না বলে, বা শুধু বলে যে ‘কিছু হয়নি’, তাহলেই বুঝবেন অনেককিছু হয়ে গেছে। বিবাহিত পুরুষ তখন বিগত দশ বছরে কোথায় কী গণ্ডগোল করেছে সেটা মনে করতে থাকে। স্ত্রী রাগ হয়েছে কেন, এই ধাঁধার রহস্য কেউ সমাধান করতে পারে না। সম্ভবই না। ভবিষ্যতে একদিন ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট, সেভেন ব্রিজেস অফ কনিগসবার্গ, বার্মুডা ট্রায়াঙ্গেল, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, থিওরি অফ এভরিথিংয়ের সমাধান করে ফেলবে। কিন্তু স্ত্রীর রাগের কারণের সমাধান বের করতে পারবে না কেউ।
কৃষ্ণ অবতার মানুষ হয়েই পারেনি। তাই সত্যভামাকে ওরকম লুটিয়ে থাকতে দেখেই গুটিয়ে গিয়ে অনেক অনুনয় বিনয় করে। এই মানভঞ্জনের জায়গাটা নিয়ে সহজেই আরেকটা গীতগোবিন্দম লেখা যায়। অবশেষে অনেক অনুরোধ উপরোধ ও প্রমিস করলে সত্যভামা বলল, “তুমি আমাকে ভালোবাসো না। আগে তুমি আমার জন্য কত কিছু করতে, এখন একটুও ভালোবাসো না…”
আমার বিবাহিত এবং বিবাহ হয়নি এরকম প্রেমিক পাঠকদের জন্য একতি সতর্কবার্তা দিয়ে রাখি। যখনই আপনার স্ত্রী বা প্রেমিকা আপনাকে বলবেন, “তুমি আর আগের মতন আমাকে ভালোবাস না…”, সেই ক্ষণে, সেই মুহূর্তে পারলে সেই জায়গা থেকে পালান। একেবারে পালাতে বলছি না। পালিয়ে গিয়ে নিজের পকেটের পয়সা, অ্যাকাউন্টগুলো দেখে আসুন। সাথে ফোন ও কম্পিউটারে যত কুকীর্তি ও পাপ করেছেন সব মুছে দিয়ে আসুন। তারপরে ঘণ্টাখানেক ধ্যানমগ্ন হয়ে মস্তিষ্কের প্রতিটা কোষকে কাজে লাগিয়ে প্রেমিকা বা স্ত্রীর সাথে প্রথম আলাপ হওয়ার দিন থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত যা কিছু করেছেন সমস্তকিছু হিসেব করে ফেলুন। কারণ প্রেমিকা বা স্ত্রীয়ের এই কথার পরে তিনটে ঘোরতর ব্যাপার ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম সম্ভাবনা আপনার কিছু কুকীর্তি ফাঁস হয়ে গেছে। শেষ কবে স্ত্রী/প্রেমিকার বান্ধবীর ছবিতে লাইক দিয়েছেন, বা কথা বলেছেন সেসব ভেবে নিন। সাথে এটাও ভেবে নিন মোবাইল ও কম্পিউটার খোলা অবস্থায় রেখে গেছিলেন কবে। ঠিক কতটা আর কোন কুকীর্তি দেখে ফেলেছে। যতবড় কীর্তি ততবড় বংশদণ্ড গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকুন। দ্বিতীয় সম্ভাবনা একটু কম বিপজ্জনক, কিন্তু বাঁচার আশা ক্ষীণ। সেটা হল আপনি একটা জরুরি তারিখ ভুলে গেছেন। নিজের আত্মীয়গুলো গুলি মারুন, স্ত্রী/প্রেমিকার মাসতুতো বোনের বয়ফ্রেন্ডের জন্মদিন ভুলে যাননি তো? আপনার জন্মদিনে তারা কিন্তু শুভেচ্ছা দিয়ে আপনারই পয়সায় গিলেছিল। তার জন্মদিনে আপনি শুভেচ্ছা জানাতে ভোলেননি তো? আর যদি বউয়ের জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী ভুলে গিয়ে থাকেন, শিগগিরি স্যুটকেস গুছিয়ে হাওড়া স্টেশন চলে যান, সেখান থেকে মানালির ট্রেন ধরে সটান হিমালয়ে চলে যান। একেবারে পাহাড়ের মাঝে। আপনার বাঁচার আশা শেষ। ঘরে থাকলে যতদিন বেঁচে থাকবেন, প্রতিদিন এই একবার ভুলে যাওয়া নিয়ে খোঁটা শুনতে হবে। আর তৃতীয়, সবচেয়ে কম বিপজ্জনক ঘটনা হল আপনার স্ত্রী/প্রেমিকা কিছু একটা বড়সড় চাইছে। তার জন্যই ওই পয়সাকড়ি দেখে রাখতে হবে। ভেবেছিলেন হাজারখানেক টাকা আছে, মাসের বাকি দিনগুলোয় সিগারেট না খেয়ে ওই দিয়েই চালিয়ে দেবেন, কিন্তু স্ত্রী/ প্রেমিকা একটা ব্যাগ বা শাড়ি-জামার দাবি করে বসল। এক্ষেত্রে আমি বলব, স্ত্রীরা তাও মানিয়ে গুছিয়ে নেয়। পরের মাসে হলেও হবে। কিন্তু প্রেমিকাদের নিয়ে মহা গোলমাল, তাদের সংসার তো আর আপনার পকেটে চলে না। আর প্রেমিকা এখনও স্ত্রী হয়নি, তাই বলা যায় না অন্য কেউ টিকিট কেটে নিলে? প্রেমিকা অবস্থায় তার দাবি রাখতে পারছেন না, স্ত্রী হলে কী করে রাখবেন? এই লজিক দিয়েই ব্রেকআপ, কান্নাকাটি, মদের বন্যা, কবিতা লেখা, খোঁচা খোঁচা দাড়ি। আশা করি আমার পাঠক-পাঠিকারা সকলেই এইসব মজার মোড়কেই নিলেন। সিরিয়াস হয়ে গিয়ে কেউ পরকীয়া বা আত্মহত্যার প্রসঙ্গ টানবেন না। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করার কথা যে ভেবেছে সে ভীষণ আবেগি, তাঁদের সঙ্গে আমার সমবেদনা সবসময় আছে। ওসব ফালতু কথা, যারা বলে যে প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে আত্মহত্যা করা মূর্খামি। বিশ্বাস করুন, পরিস্থিতি মানুষকে অনেক কিছু করিয়ে ফেলে। আবেগের বন্যায় লজিক কাজ করে না তখন। তাই কারোর ব্রেকআপ হলে বেকার জ্ঞান না ঝেড়ে সেই ছেলেটা বা মেয়েটাকে সঙ্গ দিন। তাকে সাধারণ জীবনে ফিরতে সাহায্য করুন। সে আপনার বোন, ভাই, দাদা, বন্ধু, বান্ধবী, পরিচিত এমনকি একা মা, একা বাবা, একা আত্মীয় হলেও তার সঙ্গ দিন। একটা মানুষকে ভোলা অত সহজ নয়।
কী থেকে কীসে চলে গেলাম। এবার আপনারা কাটাছেঁড়া করতে বসবেন, লেখকও কি প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়েছে? অবশ্যই খেয়েছি, এবং সেরেও গেছি। সেসব গল্প পরে হবে। আপাতত সত্যভামা কৃষ্ণকে এই কথা বলতেই কৃষ্ণ জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে প্রিয়ে, দুপুরে ভাত খেয়েছ কী দিয়ে?”
“ওইসবই থাকো নিয়ে, এই করবে বলে করেছ বিয়ে? নারদ রুকিদিকে ওই ফুল দিয়েছে, আমার ওই গাছ চাই…”
এইজন্য একাধিক বিয়ে করতে নেই। ব্রত উৎসবে এসে বিব্রত হয়ে পড়ল কৃষ্ণ। ব্রত চুলোয় গেল, এখন ধুলোয় লুটিয়ে থাকা সত্যভামার ফুলো গালের উপরে কান্না মোছার তুলো আনতে কৃষ্ণ চলল স্বর্গে। স্বর্গে গিয়েই বলল, “এই ইন্দ্র, আমার পারিজাত গাছ চাই, একটা ডাল দাও…”
ইন্দ্ৰ বলল, “ইঁহ ইয়ার্কি নাকি? পারিজাত বললেই দেওয়া যায়? এ কি জবা গাছের ডাল না পাথরকুচি গাছ, যে ডাল নিয়ে গিয়ে নিজের বারান্দায় লাগাবে?”
“দেখ ইন্দ্ৰ,” কৃষ্ণ বলে, “গোবর্ধন তুলে তোমার ইজ্জতে গোবর লেপে দিয়েছিলাম। আবার স্বর্গ থেকে পালিয়ে গিয়ে তো নরকাসুর মারতে আমাকেই ধরেছিলে। এখন একটা ডাল দিতে পারছ না?
“ওসব এখন অতীত… স্বর্গের পারিজাত পুরোটাই আমার,” ইন্দ্র বলে। নারদ আবার মাঝে বোঝাতে গেছিল, কিন্তু বোঝার মতোই ইন্দ্র নারদকে ঝেড়ে ফেলে।
ব্যস, আর যায় কোথায়? ধুমতাড়াক ধুমতাড়াক ধুম… কৃষ্ণ আর ইন্দ্রের যুদ্ধ শুরু। মারমার কাটকাট ব্যাপার। অসুরগুলো বোধহয় পপকর্ন নিয়ে বসে পড়েছিল। কৃষ্ণ যদি একবার ইন্দ্রকে পটকে দেয়, ফ্রিতে স্বর্গলাভ করবে অসুরগুলো। কৃষ্ণ সঙ্গে করে আবার সাত্যকি আর প্রদ্যুম্নকে নিয়ে গেছিল। ওই দুজন দেবতাদের সাথে যখন মারপিট করছে তখন কৃষ্ণ বুলডোজারের মতন হাত দিয়ে শিকড় সমেত পারিজাত গাছ তুলে গরুড়ের পিঠে রেখে বলল, “এগিয়ে চলো…”
কিন্তু তখন আবার ইন্দ্রের ছেলে জয়ন্ত কোথা থেকে এসে গাছ ধরে ঝোলাঝুলি করতে শুরু করে। অথবা সে আগেই হয়তো পারিজাতের ঝুরি ধরে ঝুলছিল, আর সেই অবস্থাতেই গাছকে গরুড়ের উপর বসিয়ে দেওয়া হয়। গরুড় উড়তেও পারছে না। পিঠে গাছ, আর নীচে ‘ডাঙায় তোলা কই মাছে’র মতন জয়ন্ত টানছে। প্রদ্যুম্ন কোথা থেকে এসে আবার জয়ন্তকে পিটতে শুরু করল, “ছাড় বলছি ছাড়, আমার বাবা গাছ নিয়ে যাবে…”
“বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র পারি… ওরে বাবারে…” মার খেয়ে জয়ন্তর কথা শেষ হয় না।
“ব্যাটা বজ্জাত। পারিজাত নিচ্ছি, অন্য কিছু না…”
গরুড় ওড়ার চেষ্টা করে কিন্তু ভারী জাতের পারিজাতের জন্য উড়তে একটু অসুবিধে হয়। সেই ফাঁকে গরুড়ের তলায় হাতি নিয়ে গিয়ে ইন্দ্র তার পেটে বল্লম দিয়ে খোঁচা মারছে। বোধহয় গরুড়ের ডিম নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল। ডিম পাড়লে তো আর উড়তে পারবে না। গরুড় কি ডিম পাড়ত? না মানে, ডিম থেকেই তো গরুড়ের জন্ম, তাহলে গরুড় ডিম পারেনি কেন? ডিম থেকে বেরিয়ে গরুড় স্তন্যপায়ী হয়ে গেছিল? গরুড় কি উড়ন্ত প্ল্যাটিপাস? জানি না বাবা। মোটামুটি গরুড়কে হেব্বি উত্যক্ত করা হয়। গরুড় আবার ঐরাবতকে উলটে আক্রমণ করে। হাতি বনাম পক্ষী মানব।
ঐরাবতেরই সাতটা শুঁড়ে কিছু সুর মানে দেবতাকে পেঁচিয়ে ফেলে গরুড় গেয়ে উঠল, “তোমার শুঁড়ে সুর বেঁধেছি…মনে কিগো পড়ে সেই ডিমের কথা…”
কোন ডিম? মাতঙ্গলীলা বলে গরুড় জন্মানোর পরে যে ডিমের খোলসটা পড়ে ছিল, সেটায় ব্রহ্মা মন্ত্র পড়ে ঐরাবত আর তার পরে সাতজন হাতিকে বের করে। একপ্রকার দেখলে গরুড় আর ঐরাবত ভাই ভাই। মোরা একই ডিমের দুইটি কুসুম, গরুড় ঐরাবত।
এই ফাকে ইন্দ্রের একজন দোস্ত ‘প্রবর’ এসে প্রবল সাহসে যুদ্ধ করতে গিয়ে রামঠ্যাঙানি খেয়ে গোঙানি গাইতে গাইতে ফিরে গেল। যুদ্ধ করতে করতে সন্ধ্যে হয়ে যায়। পর্বতের মাথায় যুদ্ধ হচ্ছিল কিনা। তবুও সারাদিনের চেষ্টায় গরুড় গাছ নিয়ে উড়তে পারল না। অবশেষে সন্ধ্যে হওয়ার কারণে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। তখন ব্রহ্মা দেখল, এ তো মহা বিপদ। এই যুদ্ধ কতদিন ধরে চলবে ঠিক নেই। তার উপর কৃষ্ণ যদি ইন্দ্রকে ধরে মেরেই ফেলে তাহলে আরও গোলমাল হবে। তখন আবার ভোট করো, কে ইন্দ্র হবে?, মাঝে অসুরদের ঠেকাও, মহা ঝামেলা। এতকিছু ভেবে ব্রহ্মা অদিতিকে নিয়ে সন্ধ্যেবেলা রৈবতক পাহাড়ের মাথায় বৈঠক বসাল। কৃষ্ণ অ্যার ইন্দ্র দুজনেই সেখানে উপস্থিত।
অদিতি বলে, “কেষ্ট আর ইন্দ্র, তোরা দুটোতেই আমার ছেলে (বামন অবতার অদিতি ছেলে ছিল), তোরা দুটোতে এরকম মারামারি করলে হয়?”
“দেখো না মা, আমার জিনিস কেষ্ট জোর করে নিতে চাইছে,” ইন্দ্ৰ নালিশ করে।
“একদম মিথ্যে কথা নয়! আমি তো কদিনের জন্য ধার চাইছি,” কৃষ্ণ বলে।
“কেন নেবে?” ইন্দ্র জিজ্ঞেস করে।
“আরে বড় বউ ফুল পেয়েছে বলে মেজো বউ বায়না করেছে গাছ চাই,” কৃষ্ণ বলে।
“বাহ রে বাহ,” ইন্দ্র বলে, “তোমার ষোলো হাজার বউ রোজ একটা করে জিনিস চাইলে আর তুমি ধার নিতে থাকলে স্বর্গে তো হাঁড়ির হাল হবে। সবই তোমার দ্বারকায় চলে যাবে। আমি আর দেবতারা দ্বারকার জ্বালায় ছারখার হয়ে যাব…”
“না, এটাই শেষ,” কৃষ্ণ বলে।
“বেশ তবে,” ইন্দ্র বলে, “লিজের কাগজপত্র সই করে আর ফেরতযোগ্য দ্বারপত্রের ছাড়পত্র নিয়ে, গাছ নিয়ে যাও।”
কৃষ্ণ পেপারওয়ার্ক করে, গরুড়ের পিঠে গোটা পারিজাত গাছ বসিয়ে নিয়ে সোজা উড়ে এসে সত্যভামার প্রাসাদে এসে বাগানে গাছ পুঁতে দিল। তারপর বলল, “নাও, গাছ গাছ করে মাথা খাচ্ছিলে, এবারে পারিজাত গাছ বাড়িজাত করে দিয়েছি… খুশি?”
হরিবংশে এখানেই গল্প শেষ, কিন্তু অন্য কিছু পুরাণ বলে যে কৃষ্ণ এমনভাবে গাছটা পুঁতেছিল যে গাছের গোড়া সত্যভামার প্রাসাদের মধ্যে হলেও, ডাল আর ফুল সব রুক্মিণীর প্রাসাদের দেওয়ালের ভিতরে পড়ত। মানে সত্যভামার আবদারও রইল আবার নারদ যে প্রথমে রুক্মিণীকে ভরসা করে ফুল দিয়েছিল সেই বিশ্বাসটাও রইল। দ্বারকা নগরী জলে ডুবে যাওয়ার পরে বোধহয় পারিজাত স্বর্গে ফিরে গেছিল। যে গাছের ফুল গন্ধ, আলো, রং, গান দিতে পারে সেই গাছ বিপদে পড়লে হেলিকপ্টারের মতো উড়তেও পারে, এ আমার বিশ্বাস।
কিন্তু প্রশ্ন হল এই গল্পের শেষে একটু লেজুড় জুড়ে দিয়ে কিছু পুরাণকার এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে কৃষ্ণ সত্যভামাকে সমঝে চললেও আসলে রুক্মিণীকেই সবথেকে বেশি ভালোবাসত। এই প্রসঙ্গে আরেকটা গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে। এই গল্প হরিবংশে নেই। কোথায় যে লেখা আছে আমার মনে নেই, খুঁজে দেখতে হবে। এই গল্পটা সত্যভামার অহংকারকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার হলেও, প্রচ্ছন্নভাবে রুক্মিণীর প্রতি কৃষ্ণের বেশি ভালোবাসাই প্রমাণ করে।
এই গল্পের শুরু হয় আবার সেই নারদকে দিয়েই। থেকে থেকে ঠেকে ঠেকে মানুষ, দেবতা ও অসুরদের সুস্থ জীবনে ঠেকনা না দিলে নারদের ভাত হজম হয় না। মাঝে মাঝেই বিচর্চিকা রোগে আক্রান্ত হয়ে উঠত নারদ। সে এবারে এসে সত্যভামাকে বলল, “হ্যাঁগো সতু, তুমি শিওর কৃষ্ণ তোমায় ভালোবাসে?”
“হ্যাঁ বাসে তো…” সত্যভামা উত্তর দেয়।
“সেটা বাসে, কিন্তু তোমার কাছে ভালোবাসার জন্য আসে নাকি ভালো বাসার জন্য আসে?” নারদ বলে, “মানে তুমি তো এতবড় রাজার মেয়ে, তোমার প্রাসাদও বড়। তাই হয়তো প্রাসাদের সুখ ভোগ করতেই আসে…”
সত্যভামার মনে সন্দেহ উঁকি দেয়। দেবর্ষি কি ঠিক বলছে? সন্দেহ এমন একটা বীজ যেটা মহীরুহ হয়ে যে কোনো সম্পর্কের প্রস্তরসম অট্টালিকাকেও ভেঙে দিতে পারে। নারদের কাজ ছিল বীজটা বপন করা, সত্যভামার নিজের চিন্তার জালে সেই বীজে গ্যালন গ্যালন সন্দেহের জল ঢেলে দ্রুত সন্দেহবৃক্ষ গড়ে তুলল।
“কিন্তু আমার কাছে তো সব আছে…” সত্যভামা বলল, “রুকু দিদির থেকেও বেশি… যৌবন-রূপের হাসি, ধনরাশি, বাঁশের বাঁশি, ঘণ্টা কাঁসি। আমার কীসের অভাব?”
“এক কাজ করো,” নারদ বলে, “আমি কৃষ্ণকে দাস হিসেবে নিয়ে নিই, তুমি আমার থেকে কিনে নিয়ো। একেবারে আইপিএলের খেলোয়াড় কেনার মতো সিস্টেম। যা পয়সা উঠবে তাই দিয়ে চ্যারিটি করে দিয়ো। ট্যাক্সে ছাড়ও পাবে। গঙ্গার জলে গঙ্গা পুজো। লাভের মধ্যে কৃষ্ণ জানবে তুমি সবথেকে বেশি ওকে ভালোবাসো।”
সত্যভামার মনে কথাটা ধরে। নারদ কৃষ্ণকে দাস হিসেবে নিয়ে নিলামে চড়িয়ে দেয়। এর থেকে কি প্রমাণিত হয়? এই কথাই প্রমাণিত হয় যে তখনকার দিনে দাসপ্রথা সিস্টেম ছিল, এবং দাস কিনে নেওয়া হত। মহাভারত-হরিবংশ যতই দেখাক দেশ বিদেশের সাধারণ মানুষ সুখে ছিল, আসলে তলে তলে দাস কেনাবেচা চলত দিব্যি। নইলে নারদ যখন এই বুদ্ধিটা দিত, তখন চিরকাল রাজসুখে থাকা সত্যভামা নারদকে জিজ্ঞেস করল না কেন, যে দাস বানানো ব্যাপারটা কি আর তাকে কিনে নেওয়ার ব্যাপারটাই বা কি? সত্যভামা রাজকুমারী হয়ে এই দাস কেনার ব্যাপারটা সম্বন্ধে ভালোই ওয়াকিবহাল ছিল, আর দাসের কেসেই আমাদের কাছে সেটা ফাঁস হয়ে গেল।
যা-ই হোক, নিলাম শুরু হল। শর্ত হল একটা রেশন দোকানের কয়লা মাপার দাঁড়িপাল্লার একদিকে কৃষ্ণ বসে থাকবে, আর অন্যদিকে কৃষ্ণের ওজনের সমান সোনা রাখতে হবে। যে ওই সোনার ওজন দিতে পারবে, কৃষ্ণ তারই হবে। সত্যভামার বাবা ইনকাম ট্যাক্সকে ফাঁকি দিয়ে অনেক সোনা গচ্ছিত করেছিল। তাই সত্যভামার টেনশন ছিল না। ওই তো কৃষ্ণ, যদি দশাসই চেহারাও ধরে নিই তাহলেও একশো বা একশো কুড়ি কিলোর বেশি তো হবে না। তাও রাজবেশ, জব্বর জামাকাপড় নিয়ে দেড়শো কিলো ধরা যাক। দেড়শো কিলো সোনা সত্যভামার কাছে নস্যি। সকালে কুলকুচি করে ফেলে দিত। হবে না-ই বা কেন? সত্রাজিতের কাছে সেই সোনাপ্রসবকারী জাদু সাম্যন্তক ছিল, ভুলে গেলেন? দেড়শো-দুশো কিলো সোনা তো কিস্যু না।
কিন্তু এদিকে ম্যাচ গট-আপ ছিল। সত্যভামার অহংকার ভঙ্গ করতেই কৃষ্ণ আর নারদ মিলে সত্যভামাকে ফাঁসিয়েছে। তাই সত্যভামা যেই প্রথম চোটে একশো কিলো সোনা ঢেলে দিল, অমনি সেখানে সিবিআইয়ের লোক এসে সত্যভামাকে অ্যারেস্ট করে সোজা ভুবনেশ্বর নিয়ে চলে গেল।
মজা করলাম, ওরকম কিছু হয়নি। সোনা ঢালতেই কৃষ্ণ দৈব ও মায়াবী উপায়ে নিজের ওজন বাড়িয়ে নিল। এই উপায়কে বলে সিদ্ধি। না… যেটা খেয়ে নেশা করে সেই সিদ্ধি নয়। এই নিজের ওজন বাড়িয়ে নেওয়াটা, অষ্ট সিদ্ধির এক সিদ্ধি। এটাকে বলে গরিমা। এর উলটোটা হল লঘিমা। সেই উপায় দিয়ে কৃষ্ণ নিজেকে একশো কিলো থেকে পাঁচশো কিলো করে দিল। হয় সেই উপায় ছিল আর নইলে দাঁড়িপাল্লার যেদিকে কৃষ্ণ বসেছিল সেইদিকটা চুপটি করে মাটির সাথে নাট-বল্টু দিয়ে আটকানো ছিল।
কিন্তু সত্যভামা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়, উলটে প্রাসাদে লুকিয়ে রাখা সমস্ত সোনা এনে ঢেলে দিল। কৃষ্ণ ওজন পাঁচ টন করে দিল। সত্যভামা ট্রাকে করে বাপের বাড়ি থেকে সোনা এনে ঢেলে দিল। কতবড় দাঁড়িপাল্লা জানি না, কিন্তু মনে করুন একটা বিশাল দাঁড়িপাল্লা, যার একদিকে কৃষ্ণ দোলনায় বসা করে বসেছে, আর একদিকে সোনার পাহাড়। দ্বারকা তো সমুদ্রের পাশেই ছিল, তাই না? মনে হয় এই সময়েই কোনো বিদেশি নাবিক আরব সাগরের উপর দিয়ে যেতে যেতে সোনার পাহাড় দেখে ফেলে আর তার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তারপর নিজেদের দেশে গিয়ে জানায়। ফলত এই সোনার শোনা কথাতেই বিশ্বাস করে পরবর্তীকালে দারিয়ুস, আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে পরে শকেরা ভারতবাসীদের শক দিয়ে যায়। হূনেরা হুনহুন করে লুটতে আসে। তাদের পিছনে কালো রজনীর মতো গজনী আসে। ঘুরি এসে ঘুড়ি ওড়ায়। আগে পরে করে বদের নাতি নাদির শাহ, তৈমুর লং আসে। এবং তাদের পিছনে মোগলরা এসে আরও গোল পাকায়। সবশেষে ইংরেজগুলো এসে ‘যাহা পাই তাহাই চাই’ বলে, সব লুটে নিয়ে গিয়ে নিজেদের মিউজিয়াম ভর্তি করল।
ওদিকে সোনা দিয়ে দিয়েও কৃষ্ণের দিকে পাল্লা ওঠে না। ভাগ্যিস বাঙালির কাছে গরিমার শক্তি নেই। না, বাঙালির লুপ্ত গরিমার কথা বলছি না। বলছি যে এই গরিমা সিদ্ধি নেই। নইলে ব্যবসাদারদের আর বাজারে ব্যবসা করে খেতে হত না। পাঁচশো গ্রামের স্ট্যাম্প করা বাটখারা দিয়ে পাঁচ কেজির ইলিশ নিয়ে চলে আসত বাঙালি। যা-ই হোক, ওদিকে সত্যভামা শেষে হার স্বীকার করল। আর তক্ষুনি রুক্মিণী এসে একটা ময়ূরের পালক (মতান্তে প্রকারান্তে ও গল্পান্তে কানের দুল, গোলাপ ফুল, নাকছাবি, বাড়ির চাবি, হাবিজাবি কিছু একটা মূল্যহীন বস্তু) সোনার পাহাড়ের উপরে রাখতেই কৃষ্ণ কাঠের নাগরদোলার মতো সাঁই করে উপরে উঠে গেল। প্রমাণ হল যে প্রচুর বস্তুর মূল্যের থেকেও সামান্য ভালোবাসার মূল্য বেশি। তাই সমস্ত পাঠক/পাঠিকাদের কাছে আমার নিবেদন, আপনারা ভালোবাসুন। ভালোবাসা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ, তার ধারেকাছে অন্য কোনো সম্পদ তুলনায় আসে না। আর ভালোবাসায় বিলীন হয়ে নিজেদের সোনাদানা, ক্যাশ পয়সা, মহামূল্যবান অলংকার ইত্যাদি যদি ফেলে দিতে চান, আমাকে জানাবেন। আমি ওগুলো নিয়ে ফেলে দেব আপনাদের হয়ে, এই সেবা করতে পারলে আমার ভালোই লাগবে। কজন লেখকের আর এরকম পাঠক/ পাঠিকা সেবার সুযোগ ঘটে?
কিন্তু আপনাদের পাপী মন, ভোগী মন। সোনাদানা আর পয়সাকে হাতের ময়লা মনে করে ফেলে দিতে পারবেন না। হিংসে করে বলবেন লেখক ব্যাটা মহা চালাক আর লোভী। থাক সেসব কথা। সত্যভামার অলংকার নিয়ে অহংকার কৃষ্ণ এইভাবে ভেঙে দিল। রুক্মিনী পেল সুয়োরানির আখ্যা। সরাসরি না হলেও ঘুরিয়ে নাক দেখানো। কিন্তু আরেকটা গল্পও আছে, সেখানে রুক্মিণী যে লক্ষ্মী ঠাকুরের অবতার এবং বিষ্ণুর পশ্চাদ ফলো করে সরাসরি মর্তে নেমে এসেছে সেটা প্রমাণিত হয়।
সেইবার গরুড় আর সুদর্শন চক্রের খুব তর্ক লেগেছে। হ্যাঁ, চক্রটাও একটা মানবীয় শরীরের দৈব আত্মা ছিল। মানবীয় চক্র দানবীয় গরুড়ের সাথে তর্ক করছে। দানবীয় কারণ গরুড়ের শরীর মানুষের, মাথা ইগলের, দুটো ডানাও আছে আবার সাপও খায়। সে দেবতাদের পক্ষে এবং বিষ্ণুর নিজস্ব বাহন। এই পালটি খাওয়া চারপাশের পৃথিবীতে মালটি-পারপাস বিশ্বস্ত স্বয়ংক্রিয় বাহন কোথায় পাওয়া যায়? গাড়ি বলুন গাড়ি, উড়োজাহাজ বলুন উড়োজাহাজ, যুদ্ধের ট্যাঙ্ক বলুন ট্যাঙ্ক, যা বলবেন গরুড় তাইই হয়ে যায়। কোথায় লাগে বাদুড়মানবের ব্যাটমোবিল?
দুজনের মধ্যে তর্কের বিষয়, কে বেশি শক্তিশালী আর কে কৃষ্ণের বেশি বড় ভক্ত। কথাটা কৃষ্ণের কানে পৌঁছয়। অন্যদিকে আবার সত্যভামা সবাইকে দাবি করে বেড়াচ্ছে যে সেই হল প্রধান রানি, আর বাকি সব চাকরানি। এই সত্যভামা একদিকে যেমন ডাকাবুকো মহিলা ছিলেন, অন্যদিকে সবসময় নিজেকে প্রাধান্য দেওয়ার একটা কমপ্লেক্স পার্সোনালিটিতে ভুগতেন। খুব সম্ভবত সত্যভামা সবসময় ভাবত যে তাকে যথেষ্ট পাত্তা দেওয়া হয় না। হবে না? নারদ যদি ওরকম এসে যেচে রুক্মিণীকে ফুল দিয়ে যায়, তাহলে এরকম মনে হওয়াটা বাধ্য। ষোলো হাজার রাণীর কথা ধরছি না, কারণ তারা ছিল বন্দি। একেবারে নরকাসুরের বন্দি থেকে কৃষ্ণের বউ হওয়াটাই ভাগ্যের ব্যাপার। রুক্মিণী, সত্যভামা বাদ দিলে জাম্ববতীই বাকি থাকে। বাকিদের নাম অত আসে না, তারা অত জনপ্রিয় নয়। জাম্ববতী জীবনের অনেকটা অংশ গুহায় কাটিয়েছে। তার অত কিছু যায় আসে না, কে শ্রেষ্ঠ রানি হল। কিন্তু সত্যভামা রাজার মেয়ে। এবং যতদূর মনে হয় যেহেতু সত্রাজিৎ অনেকদিন থেকেই কৃষ্ণের চেনা, তাই রুক্মিণীর থেকে সত্যভামার সাথে কৃষ্ণের চেনাজানাটা বেশিদিনেরই হওয়া উচিত। সত্যভামার ভালোবাসার দাবিতে আমি অন্যায় দেখি না।
কৃষ্ণ এবার ভাবতে বসল। এমন কিছু উপায় করতে হবে যাতে সুদর্শন চক্র, ভীষণদর্শন গরুড় আর রাগবর্ষণকারিনী সত্যভামার একসাথে শিক্ষা হয়। এক তিরে তিন শিকার। কৃষ্ণের বুদ্ধি সাংঘাতিক ছিল। ভেবে ভেবে ঠিক একটা উপায় বের করে ফেলল। সেইমতন গরুড়কে ডেকে বলল, “যাও তো উত্তরে হিমালয়ে হনুমান আছে, তাকে বলো আমি ডেকেছি…”
গরুড় সঙ্গে সঙ্গে উড়ে চলল হনুমানকে খুঁজতে। এইসময়ে কৃষ্ণ সুদর্শন চক্রকে ডেকে বলল, “শোনো, তুমি গিয়ে প্রাসাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকো, যেই আসুক তাকে ঢুকতে দেবে না!”
চক্র গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পাঁই-পাঁই করে ঘুরতে থাকল। কৃষ্ণ এবারে সত্যভামাকে ডেকে বলল, “যাও তো, গিয়ে রুক্মিণীকে ডেকে আনো। বিশেষ অতিথি আসছে, রুক্মিণীকে আমার পাশে বসতে হবে…”
“আ মোলো যা…” সত্যভামা বলে, “আমি থাকতে রুক্মিণী কেন বসবে? আমিই তো তোমার প্রধান রানী!” বলে সত্যভামা সত্যই কৃষ্ণের পাশে বসে পড়ল।
এদিকে গরুড় হিমালয়ে উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে হনুমানকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। হনুমান মানে যে-কোনো হনুমান নয়, সেই রামায়ণের পবনপুত্র বীর হনুমান। স্বীকার করতে দোষ নেই, পুরাণে আমার সবথেকে প্রিয় চরিত্র হনুমান। এত শক্তি তাও আত্মভোলা, বাচ্চা ছেলের মতন। প্রকৃত ধার্মিক ও জ্ঞানী। সেই হনুমানকেই কৃষ্ণ ডেকে পাঠিয়েছে। গরুড় তো ঠান্ডায় প্রায় ডানা-ঠোঁট জমিয়ে শেষে হনুমানকে খুঁজে পেল। হনুমান ওই ঠান্ডায় বরফের পাহাড়ের মাথায় খালি গায়ে বসে ধ্যান করছে।
গরুড় ল্যান্ড করেই বলল, “এই হনুমান!”
“ক্যা রা?” হনুমান এক চোখ খুলে দেখে।
“চল, তোকে মালিক ডাকছে…”
“কোন মালিক?”
“কৃষ্ণ ঠাকুর, আবার কে?”
“যাচ্ছি…”
“যাচ্ছি বললে হবে না, এক্ষুনি যেতে হবে…”
হনুমান বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই এগো আমি আসছি…”
“না হুকুম আছে,” গরুড় বলে, “তোকে সঙ্গে নিয়েই যেতে হবে!
“হুঁহ, ইয়ার্কি?” হনুমান বলে, “তুই এগো… যাবি তো উড়ে। তোর আগে আমি পৌঁছে যাব…”
“কী করে যাবি?” গরুড় বলে, “তুই কি আমার থেকেও দ্রুত উড়তে পারিস?”
“দেখ গরুড়…” হনুমান বলে, “বেশি উড়িস না। চিরকাল তো ড্রাইভারগিরি করে গেলি। এসব সাধনা অষ্ট সিদ্ধি আর নব নিধির ব্যাপার। ভাবলেই ওখানে গিয়ে হাজির হব…
“ওসব ত্রেতা যুগের গল্প দিয়ে লাভ নেই কাকা,” গরুড় বলে, “চলো আমার সাথে…”
“দাঁড়া, আমার একটা মিটিং আছে, সেরে আসছি…”
“কার সাথে মিটিং…”
“জাম্বুবান…”
“কৃষ্ণের থেকেও জরুরি মিটিং?”
“দু মিনিটে মিটিং সেরে তিন মিনিটে গিয়ে হাজির হব…”
“তিন মিনিটে তুই হিমালয় থেকে দ্বারকা যাবি?” গরুড় এবার রেগে যায়, “সব চালাকি বুঝি। চল তোকে তুলে নিয়ে যাব!”
এই বলে গরুড় ডানা ছড়িয়ে হনুমানকে দুই হাত দিয়ে ক্যাঁক করে ধরে ঝ্যাক করে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু হনুমানও তেমনি, একজন জোর করে হনুমানের উপরে জোর খাটাবে আর হনুমান চুপ করে মেনে নেবে? হনুমানও নিজের ওজন বাড়িয়ে নেয়। নে, কত টানবি টান। গরুড় যখন হনুমানকে টেনে টেনে অনুমান করতে পারে তার শক্তি শেষ হয়ে আসছে, তখন হনুমান মাছি তাড়ানোর মতন একবার হাত ঝাড়ে, আর তাতেই গরুড় একেবারে চলন্ত সিলিং ফ্যানে টক্কর লাগা ভীমরুলের মতন উড়ে গিয়ে সটান প্রভাস সমুদ্রে গিয়ে পড়ল। বঙ্গোপসাগরেও পড়তে পারত কিন্তু আর্যরা বঙ্গোপসাগর চিনতনা। কলিঙ্গ ও বঙ্গর পরে যে বিশাল জলরাশি আছে সেটা জানত, কিন্তু একেবারে সে এত বড় সমুদ্র সেটা জানত না। ফলে সমুদ্র মানেই প্রভাস।
হনুমান মিটিং সেরে সঙ্গে সঙ্গেই দ্বারকায় গিয়ে রাজপ্রাসাদের সামনে হাজির হল। সেখানে ঘূর্ণায়মান ধারালো সুদর্শন চক্র বলল, “দাঁড়াও…”
“কে হে তুমি?”
“আমি চক্র… সুদর্শন…”
“সে তুমি সুদর্শন, কুদর্শন হও, ভূদর্শন হও… যেই হও, সরে দাঁড়াও। আমার প্রভু ডেকেছে…”
“পরোয়ানা চাই!” চক্র বলে।
“উঁহ, চক্র নয়, যেন চক্রবর্তী সম্রাট হয়েছেন,” হনুমান বলে, “রাস্তা ছাড়বি? নাকি এক থাবড়ায় চক্র থেকে তোকে চকরবকর করে দেব…?”
ঝামেলা শুরু হয়ে যায়। তারপরেই হনুমানকে কৃষ্ণের সভায় দেখা যায়। এসে বলে, “প্রভু নতুন গেটআপে এসেছেন, বলুন আবার মাতা সীতাকে কেউ চুরি করল নাকি?”
কৃষ্ণ বলল, “এ কি হনুমান, তোমার মুখের ভিতরটা লাল কেন? পান খাচ্ছ নাকি জুবান কেশরী করে এসেছ? কেশরী তো তোমার পিতার নাম, জিহ্বাকে পিতার নামাঙ্কিত করে ফেলেছ নাকি? আজকাল গুটখা-ফুটখা খাচ্ছ নাকি?”
“আজ্ঞে না স্যার…” হনুমান বলে, “ওই আপনার দারোয়ান সুদর্শন চক্রটা আমাকে ঢুকতে দিচ্ছিল না বলে কড়মড় করে খেয়ে ফেলেছি। ফুচকা খেলে যেরকম মুখের তালু ছিলে যায়, সেরকমই একটু ছিলে গিয়ে মুখ লাল হয়ে গেছে। কিন্তু মাতা সীতা কই? এবারে আসেনি? এই অবতারে রেস্ট নাকি? গতবার যা ঝক্কি গেছে। একবার কিডন্যাপ, তারপরে আগুনে তন্দুরি, মাটির ভিতরে চাপা, কত কি কাণ্ড…”
“মাতা সীতাকে দেখলে চিনতে পারবে?” কৃষ্ণ বলে।
“অবশ্যই,” হনুমান বলে, “কিন্তু আপনার পাশে মাতা সীতার বসে থাকার কথা, এই দাসীটা কে বসে আছে?”
দাসী আর কাউকে নয়, সত্যভামাকে ইঙ্গিত করে বলা। এইজন্য হনুমানকে আমার এত ভালো লাগে। স্পষ্টবক্তা, কোনো রাখঢাক নেই, রাজনীতি নেই, মনে যা মুখে তাই। আপাতত মুখে চক্র, মন সাফ। কিন্তু সাফ মনের কথা শুনে সত্যভামার ইজ্জতে কীটনাশক ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে সত্যভামা দৌড়ে অন্দরমহলে গিয়ে রুক্মিণীকে বলল, “যাও, তোমার হনুমুখো ছেলে এসেছে, সামলাও… আমার দ্বারা এসব হবে না…”
এইভাবেই প্রমাণ হয়, কৃষ্ণ বউদের মধ্যে সবাইকেই ভালোবাসত, এবং রুক্মিণীকে বোধহয় একটু বেশি প্রাধান্য দিত।
