দুষ্মন্ত ও শকুন্তলা
এই গল্পটা না বললেই হত। কিন্তু যে ভরতের নাম থেকে ভারত ও ভারত বংশের ইতিহাস নিয়ে এত্তবড় মহাভারত, তার জন্মের গল্পটা না বললে কি হয় ? এই গল্প জানে না এমন লোক নেই, কিন্তু তবুও আমি বলব। হরিবংশের অনেক গল্পকে সাইড কাটিয়ে আমি এই গল্প বলবই। বাকি অনেক গল্প বীর হনুমানের ন্যায় লম্ফ দিয়ে পার করে দিচ্ছি কারণ ইতিমধ্যে এটা সপ্তম পৰ্ব চলছে। সব গল্প লিখতে গেলে এই লেখা সত্তর পর্বেও শেষ হয় না। কিছু ইন্টেরেস্টিং গল্প নিজেরা একটু খুঁজে পড়ে নেবেন, যেমন সাগর রাজার ষাট হাজার ছেলের গল্প, কেনই বা তার নাম সগর থেকে সাগর হল? ভগীরথের গঙ্গার চ্যানেল খুঁড়ে সমুদ্রে নিয়ে যাওয়ার গল্প, সাত ব্রাহ্মণের সাথে বৃহদত্ত আর পাখির চোখ খুবলে নেওয়ার গল্প, জহ্নুকে গঙ্গার বিয়ের প্রস্তাব এবং জহ্নুর রেগে গিয়ে সেই প্রস্তাব খারিজ করে গঙ্গাকে গিলে নেওয়ার গল্প (যার জন্য গঙ্গার আরেক নাম জাহ্নবী। ও… তার মানে গঙ্গা অনেক পুরুষ ধরেই এই ফ্যামিলিতে বউমা হিসেবে এন্ট্রি নেওয়ার চেষ্টা করছিল, তাই প্রতীপর কোলে এসে বসেছিল পরে)।
আবার কিছু গল্প রামায়ণ ও রঘুবংশের সঙ্গে কমন। যদি কোনোদিন সমাজ এতটা খোলা মনের হয় এবং আমাকে জেড প্লাস মাইনাস ইন্টু ডিভাইড সিকিউরিটি দেওয়া হয় তবে রামায়ণ লিখব আর সেইসব গল্প তখন আলোচনা করব। আপাতত হরিবংশ শুরু করেছি, তাই এই দুষ্মন্ত-শকুন্তলার গল্পটাই বলি। শকুন্তলার গল্প মূলত দুইভাবে বিখ্যাত হয়েছে। ভারতীয়দের মধ্যে হয়েছে কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানম্ শকুন্তলম্’ থেকম, মানে থেকে… আর বাঙালির মধ্যে হয়েছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শকুন্তলা’ থেকে। এটা আমার ক্লাস সেভেন না এইটে সিলেবাসে ছিল। এই গল্পের সাহিত্য ও ধর্মীয় মূল্য আমার মতো
অর্বাচীনের ধারণার মধ্যেই আসে না, কিন্তু নীতিগতভাবে আজও আমি বুঝি না একটা চোদ্দ বছরের ছেলে শকুন্তলার গল্প পড়ে কী শিক্ষাটা পেতে পারে? ওর থেকে আরুণির গল্প, রামচন্দ্রের গল্প নিদেন পক্ষে পবনপুত্র হনুমানের গল্প, নয়তো দত্তাত্রেয়, শিব ঠাকুর, দুর্গা ঠাকুর এমনকি বাংলার ব্রত বা বেহুলালখিন্দরের গল্পতেও একটা শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে। শকুন্তলার গল্প থেকে কী শিখতে পারি আমাকে জানাবেন দয়া করে। আমি শিখতে সবসময়ই রাজি।
কিন্তু শকুন্তলার গল্প থেকে আসলে কী কী ধারণা হয়েছে সেটা লেখার জন্যই আজ এই পর্ব। গল্প শুরু হোক। একবার সেই হাই ভোল্টেজ বিশ্বামিত্র ঋষি তপস্যায় বসেছে। ওরকম পাওয়ারফুল ঋষি তপস্যায় বসতেই ইন্দ্রের টনক নড়ল। আগের পর্বেই দেখেছেন বিশ্বামিত্র চাইলে যে কাউকে সশরীরে স্বর্গে টাঙিয়ে দিতে পারে, আবার ইচ্ছে করলে স্বর্গ থেকে কাউকে নামিয়ে ও আনতে পারে। এরকম ঋষি যখন তপস্যায় বসেছে তখন নিশ্চয় গভীর কোনো মোটিভ আছে। তাই বিশ্বামিত্র তপস্যায় বসতেই ইন্দ্র তার বস্তাপচা ফরমুলা প্রয়োগ করল। সঙ্গে সঙ্গে অপ্সরা মেনকাকে ডেকে বলল, “এক্ষুনি যাও মর্তে, বিশ্বামিত্রকে ধরতে। বিশ্বামিত্রের তপস্যা এখনও গভীর হয়নি। এই প্রদোষকালে গিয়ে বিশ্বামিত্রের সাথে মিত্রতা করে তোমার চন্দ্র মার্কা রূপে ভুলিয়ে একেবারে বিশ্বামিত্র থেকে প্রদোষচন্দ্র মিত্র করে ফেলো।”
মানে সন্ধেবেলায় চাঁদের মতন রূপ দেখিয়ে মিত্রতা করা… ফেলুদা ভক্তরা আমাকে পেটাবেন না। আমিও ফেলুদা বলতে অজ্ঞান, কিন্তু এইটুকু মজা করার সুযোগ ছাড়তে পারলাম না। মেনকা আর কী করে? ইন্দ্রের ভাড়া করা কর্মচারী, ইন্দ্র বলার সঙ্গে সঙ্গে ধ্যানরত বিশ্বামিত্রের সামনে গিয়ে ধ্যাং-ধ্যাং করে খুব নাচল। সাথে গন্ধর্বদের মিউজিক, ইয়া ঢিনচ্যাক ব্যাপার… জঙ্গলে পুরো ভাসানের মিছিল। এত অত্যাচারে কি আর তপস্যা করা যায়? তার মধ্যে চোখের সামনে এক আধবুড়ি চিরযৌবনা অপ্সরা, ঋষিকে পটানোর চেষ্টা করছে। বিশ্বামিত্র ভাবল, “তপস্যা পরে হবে, আগে একটু ফুর্তি করে নিই…”
তারপরে আর কী? ‘ঝিঙ্গালালা হু ঝিঙ্গালালা হু’ করে মেনকার প্রেমে বিশ্বামিত্র ঝাঁপ দিয়ে কিছুকাল ধুমতানানা করল। আর তার ফলেই দুম করে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নিল। সন্তান, তাও আবার কন্যা… তাকে নিয়ে বিশ্বামিত্র বা মেনকা কী করবে? তাও একটা পুত্র হলে তাকে বেশ ঋষিদের কোর্সে সার্টিফাই করে দিত। কিন্তু কন্যা? কন্যাকে সামলানোর মতন সময় বা মেজাজ বিশ্বামিত্র বা মেনকার কারোরই নেই। কন্যা হয়েছে দেখেই বিশ্বামিত্র কেটে পড়ল। আজ্ঞে… ভদ্র ভাষায় ওটাকে কেটে পড়াই বলে। ফুর্তি হয়ে গেছে, আবার কী? মেয়ে জন্মেছে, তার দায়িত্ব নিলে তার আবার বিয়ে দাও, জামাইকে তোয়াজ করো… সে মহা ঝামেলা। মেনকাও নিজের কন্যাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে স্বর্গে চলে গেল।
অতঃপর আমরা এখান থেকে জানতে পারলাম যে প্রাচীনকালে একমাত্র কোনো রাজার কন্যা হলে তার লালন পালন ঘটা করে করা হত। কিন্তু যৌবনের ভুল স্বরূপ কোনো ফুলের মতন মেয়ে জন্ম নিলেই তাকে ফেলে চলে যাওয়ার রীতি তখনও ছিল। আজকের দিনে ভ্রূণ হত্যা, বা অযাচিত শিশুকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার খবর পড়ে শোরগোল তোলেন? এই বিশ্বামিত্র আর মেনকা যে কাণ্ডটি করল, সেটাকে ওই ডাস্টবিনে ফেলার সমানই বলা যায়। সে কালিদাস আর অবন ঠাকুর যতই কাব্যময় করে এই ঘটনা বলার চেষ্টা করুন, আসলে তো দুইজন নারী পুরুষ ক্ষণিকের ফুর্তি করে একটা সদ্যোজাত মেয়েকে জঙ্গলে ফেলে রেখে হাওয়া হয়ে গেছিল। এটাই সত্যি। অস্বীকার করা যায় না, বাংলার বাইরে কন্যাসন্তান জন্মালে এখনও এইরূপ অবজ্ঞা ও ব্রাত্য করা হয় বহু জায়গায়।
যা-ই হোক, কন্যাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে তার বাপ-মা নিজেদের কাজে গেল ঠিকই, কিন্তু মেনকা তো মা, তাই যাওয়ার আগে দয়াবশত কণ্বমুনির তপোবনের কাছে জঙ্গলে মেয়েকে রেখে দিয়ে গেছিল। কেন বাপু? আরেকটু এগিয়ে গিয়ে আশ্রমের ভিতরে রাখতে পারত। আশ্রমের চালায় রেখে দিতে পারত। না… উনি বনের মধ্যে রেখেছেন। যেমন ইন্দ্ৰ, তেমনি তার অপ্সরা। বুদ্ধির বৃহস্পতি। কিন্তু কণ্বমুনি বড় দয়ালু মানুষ। বনের মধ্যে তপোবন, মানে তপস্যার দ্বারা যে বন পাওয়া যায়, সেরকম একটা জায়গা নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে সেখানে অনাথ শিশুদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। অনাথই তো, নয়তো গভীর বনে কটা রাজা তাদের ছেলেপুলেকে শিক্ষা নিতে পাঠাত?
সেই কণ্বমুনি তপোবন থেকে শিশুর কান্না শুনতে পায়। কণ্ব তখন হন্যে হয়ে বন্যে, মানে বনাঞ্চলে শিশুর জন্য খোঁজ করল। বেশি খুঁজতে হয় না, একটু দূরেই সেই সদ্যোজাত কন্যাকে খুঁজে পায় মুনি, কিন্তু কন্যাকে তখন শকুন পাখিরা ঘিরে রেখেছে। শকুন পাখিই কেন? পুরাণের সবথেকে প্ৰিয় ক্রৌঞ্চ পাখি ঘিরে থাকলে ব্যাপারটা আরো রোমান্টিক হত। নিদেনপক্ষে হাঁস, চড়াই, শালিক, কাক, তিতির, মুরগি, ময়ূর, ডাহুক, পেঁচা—কত কী ছিল। সব ছেড়ে শকুন কেন? কারণ আমার মনে হয় অবলা অসহায় শিশুকে দেখে শকুনগুলো অপেক্ষা করছিল কতক্ষণে শিশুটি মরবে এবং তারা পিকনিক করবে। লজিক তাই বলে। কারণ এই একটি ঘটনা ছাড়া শকুন্তলার সারা জীবনে শকুনের সাথে কোনো সম্পর্কই নেই।
হ্যাঁ, ওই শিশুটির নামই শকুন্তলা। শকুনদের তলায় আশ্রয় নিতে দেখেছিল কণ্ব, তাই শিশুটির নাম হয় শকুন্তলা। পূর্বোক্ত পক্ষিসকল আশ্রয় দিলে শকুন্তলার নাম আজ ক্রৌঞ্চতলম্, হাঁসতলা (ভিস্তা), চড়াইতলা, শালিকতলা, কাকতলা, তিতিরতলা, কুক্কুটতলা, ময়ূরতলা, ডাহুকতলা বা পেঁচাতলাও হত। পক্ষী ছাড়া কোনো হিংস্র জন্তু আশ্রয় দিলে সপতলা, ব্যাঘ্রতলা, শৃগালতলাও নাম হতে পারত। এতদিনে আমি নাকতলা জায়গার নামকরণ বুঝতে পারলাম। ওখানে কারোর নাকের ডগায় কোনো বিখ্যাত শিশুকে কেউ রেখে গেছিল নিশ্চয়। নাকতলা-গড়িয়ার অধিবাসীবৃন্দ এই ইতিহাসের ব্যাপারে জানলে জানাবেন।
শকুন্তলা কণ্বতলায় মানে কণ্বের আশ্রয়ে বড় হতে থাকে। তপোবনের অন্যান্য শিশুদের সাথে সেও বড় হয়ে যুবতি হয়। আর এই সময়ে বনে শিকার করতে আসে রাজা দুষ্মন্ত। কীরকম দুশমন মার্কা নাম। এই দুষ্মন্ত সেই যে যযাতি, তার চোদ্দ বা পনেরোতম উত্তরপুরুষ। দুষ্মন্তের বাবার পিসি ছিল মান্ধাতার মা গৌরীদেবী। যে মান্ধাতা বাবার পেট ফুঁড়ে বেরিয়েছিল। মানে যুবনাশ্বের বউ। তার মানে মান্ধাতা আর দুষ্মন্ত কাকা-ভাইপো বলাই যায়। সেই দুষ্মন্ত, ফ্যামিলি ট্রাডিশন বজায় রেখে মৃগয়া করতে এসে জঙ্গলে হারিয়ে গিয়ে ঠিক কণ্ব মুনির আশ্রমে এসে ল্যান্ড করে। আজ পর্যন্ত শুনলাম না কোনো নামি দামি রাজা (এক প্রসেনজিৎ ছাড়া) যে বনে গিয়ে বাঘ ভাল্লুকের শিকার হয়েছে। এরা বনে গেলেই একটা করে ঋষির সাথে দেখা হত আর কিছু না কিছু ভুলভাল কাজ করে ফিরত।
দুষ্মন্ত আশ্রমের বাইরেই শকুন্তলাকে দেখে একেবারে লাট্টু হয়ে গেল। কীরকম লুজ ক্যারেকটার। মুনির আশ্রম, মেয়ে দেখল আর আর মনে ফুল ফুটতে লাগল। শকুন্তলাও প্রথমবার জটাধারী সাত্ত্বিক ঋষি ছাড়া একটা বেশ হ্যান্ডসাম ঝকমকে পরিধান সমেত পুরুষকে দেখে পটে গেল। ব্যাকগ্রাউন্ডে কে যেন গেয়ে উঠল, “পহলা পহলা প্যার হ্যায়… পহলী পহলী বার হ্যায়…”
বার খেয়ে দুজনেই দুজনের প্রেমে পড়ে গেল। আরও বার খাইয়ে বাড়াবাড়ি করাতে শকুন্তলার সখীগুলো সঙ্গ দিল। বনের মধ্যেই বনফায়ার করে বনবন করে বন্য প্রেম শুরু। কণ্ব বোধহয় ডাম্বেল্ডোরের মতন ছিল, আশ্রমের ছাত্রছাত্রীরা কে কী করছে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। কোথায় কোন বিপদে পড়ছে, সেসব দেখার বালাই নেই। অথবা রাজা দুষ্মন্তের ‘অনুপ্রেরণা’ ও বার্ষিক চাঁদাতেই হয়তো কণ্বের আশ্রম চলত। রাজা ওরকম আশ্রমের এক অনাথ মেয়ের রূপে মোহিত হয়ে লাট্টু হলেই ভালো। মোটকথা দুষ্মন্ত আর শকুন্তলার প্রেমে কণ্বের কোনো ট্যা-ফোঁ শোনা গেলনা। সেই প্রেম একেবারে মিলন পর্যন্ত চলে গেল। মানে রাজা দুষ্মন্ত একেবারে তৈরি প্লেবয়। মেয়ে দেখেছি, ভাল লেগেছে, পটিয়ে একেবারে শয্যাসঙ্গিনী করে ফেল, এই তার থিওরি।
শকুন্তলাও যৌবনের উচ্ছ্বাসে হাতে হাত ধরে সর্বনাশের পথে পা বাড়াল। দুজনে মিলে কোনো প্ল্যানিং না করে, কাউকে নেমন্তন্ন না করে, ক্যাটেরার প্যান্ডেল বাসভাড়া এসবের ঝামেলা এড়িয়ে গন্ধর্ব মতে বিয়ে করে ফেলল। গন্ধর্ব বিবাহ কী জানেন তো? ওটা আসলে বিয়েই নয়, দুজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ স্বেচ্ছায় মিলিত হয়ে ধুমতানানা করলেই সেটা গন্ধর্ব বিবাহ। তাই অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি গন্ধর্ব বিবাহকে বিবাহই মনে করে না। ওটা ‘এক রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকা’ সম একটা সম্পর্ক।
মিলনের পরে মিলনতিথির পূর্ণিমা চাঁদ ডুবতেই রাজা দুষ্মন্তের চেতনা জেগে উঠল। সে শকুন্তলাকে বলল, “তুমি কদিন তপোবনে থাকো, আমি এসে নিয়ে যাব…”। বাইরে থেকে রাজা এসে শকুন্তলার সাথে সহবাস করে কেটে পড়ে। একদম স্পষ্ট ভাষায় এটাই বলা হয়। কেন? তক্ষুনি শকুন্তলাকে যথাযথ মর্যাদা সহ পাটরানি করে নিয়ে যেতে দুষ্মন্তের মুষ্কের কোন আঁটিটা উৎপাটন হচ্ছিল? কেন রাজা তাকে রেখে গেল? রাজা কি রাজপ্রাসাদে গিয়ে বড়দের পারমিশন নেবে? যে জঙ্গলে গিয়ে এক ঋষিকন্যার সাথে ইয়ে করে ফেলেছি, এবার সে নিজের দাবি কোলে করে এসে আমাদেরকে দাবিয়ে দিতে পারে? নইলে কোন কেশাগ্রসম লজিকে রাজা শকুন্তলাকে নিয়ে যায় না সঙ্গে করে? কীরকম জ্ঞানরহিত সঙ্গমকারী ধান্ধাবাজ রূপাজীবির ভ্রাতাসম রাজা।
আবার যাওয়ার আগে শকুন্তলাকে একটা আংটি দিয়ে যায়। সার্টিফিকেট… এটা আমার বউ, এই মেয়ের উপরে স্বয়ং রাজার নজর পড়েছে। তারপরেই রাজা ধেই ধেই করে কেটে পড়ল। শকুন্তলা এদিকে অপেক্ষা করল, কবে তার ভালোবাসা এসে তাকে ভালো বাসায় তুলে নিয়ে যাবে। পাগলিকে কে বোঝাবে যে এখনকার কর্পোরেট আর তখনকার রাজারা একই নোংরামি গোত্রীয়? দুজনেরই কথার দাম নেই, আর প্রতিশ্রুতি ইতিউতি উড়ে পালায়। উপরন্তু রাবণের সীতাকে অপহরণ, বা জয়দ্রথের দ্রৌপদীকে অপহরণ, থেকে আমরা জানতে পারি, তখন এরকম ‘বনের মধ্যে সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তুলে নেব বা ভোগ করব’ এই ট্র্যাডিশন চলত।
সেই ‘ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে’। এখনকার কত কর্পোরেটের কত বড় বড় উঁচুতলার মানুষেরা প্রোমোশনের লোভ দেখিয়ে কত নীচুতলার মেয়েদের এবং ছেলেদের যে সর্বনাশ করেছে এবং করছে, ঠিক সেইভাবেই এই দুষ্মন্ত গোত্রীয় রাজারা জঙ্গলে মৃগয়ার নাম করে কত ঋষিকন্যার সর্বনাশটাই না করেছে। ছেলেদের সর্বনাশ বললাম কারণ কর্পোরেটের উঁচুতলার শকুনগুলোর শুধু মাত্র মেয়েদের শরীরের দিকেই নজর থাকে, ছেলেদের শরীর নিয়ে তারা কী করবে? মেয়েদের শরীরলাভের পথে কোনো ছেলে বাধা হয়ে দাঁড়ালেই তাকে ‘আন্ডার পারফর্মার’ তকমা দিয়ে গোলাপি চিরকুট ধরিয়ে দাও। যে মেয়েরা শরীর দিতে রাজি নয়, তাদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। কাজ ধুয়ে কি বসেরা জল খাবে? একশো কুড়ি কোটির দেশে কাজ করার ছেলেমেয়ের সংখ্যা প্রচুর, একটা যাবে আরেকটা আসবে। কম পয়াসাতেও আসবে। কাজ ঠিকই হবে, কিন্তু নিজের লোভ নিবারণের কাজটা না হলে কীসের এত পজিশন? ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু অধিকাংশ কর্পোরেটই এখন তাইই হয়েছে।
শকুন্তলা আসলে সেরকমই একটি ঘটনার জ্বলন্ত উদাহরণ। ফুর্তির পরে রাজার মূর্তি আর দেখা যায়না। এদিকে একাকিনী বিরহিনী শকুন্তলা রাজার অপেক্ষা করছে। কত স্বপ্নই না দেখছে। রাজবাড়ির এতবড় ঘর হলে এখানে ড্রেসিং টেবিল রাখব, ওখানে আলমারি, এদিকে ঝুল বারান্দা…
ঝুল বারান্দার স্বপ্নের মাঝেই ঝুল দাড়িওয়ালা দুর্বাসা আশ্রমে এসে প্রবেশ করে। এসেই বলে, “ভিক্ষাং দেহি…”
কিন্তু শকুন্তলা তখন গভীর চিন্তায় মগ্ন, দেওয়ালে কোন রঙের পোঁচ করাবে? দেওয়ালে কি শকুন প্রিন্ট করানো যায়? তাহলে বেশ শকুনের তলায় শকুন্তলা শুয়ে থাকবে।
“ভিক্ষাং দেহি…” দুর্বাসা আবার বলে। আশ্রমে তখন কেউ নেই। সবাই বোধহয় পিকনিকে গেছিল। দুর্বাসা এদিকে ভিক্ষা চেয়ে চেয়ে শকুন্তলার পাত্তা না পেয়ে রেগে টং। দুর্বাসার ব্যাপারে আগেই বলেছি মহাভারতে। তার মেজাজ আর অভিশাপের স্টক অফুরন্ত। দিনে পঞ্চাশ-ষাটটা অভিশাপ না দিলে তার পেটের ভাত হজম হত না। ওনাকে দেখেই বোধহয় দেবতারা বর-অভিশাপের চলন তুলে দিয়েছে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে দুর্বাসা অভিশাপ দিল, “যার কথা ভাবতে ভাবতে তুই আমাকে অবজ্ঞা করিস সে তোকে ভুলে যাবে…”
ঢ্যাং…
বজ্র বিদ্যুতের মতন অভিশাপের আঘাতে শকুন্তলার ঘোর কাটে। একে তার স্বামী রাজা দুষ্মন্ত সেই যে গেছে তো গেছেই, কতদিন হয়ে গেল ফেরার নাম নেই। তার মধ্যে একেবারে ভুলে যাওয়ার অভিশাপ দিয়ে দিল দুর্বাসা। আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় এই পুরো দুর্বাসার অভিশাপ দেওয়ার ব্যাপারটা আসলে দুষ্মন্তকে ভালো দেখানোর চেষ্টায় লেখা হয়েছে। তার পক্ষেও আমি যুক্তি দিতে পারি। দুষ্মন্ত তো এমনিতেই রাজ্যে ফিরে গিয়ে শকুন্তলাকে ভুলে বসেছিল। নইলে সঙ্গে সঙ্গেই লোক লস্কর পাঠিয়ে শকুন্তলাকে নিয়ে গেল না কেন? আর দ্বিতীয়ত মনে হয়, রাজা দুষ্মন্তের ভুলে যাওয়ার রোগ ছিল, এবং সেটা রাজা নিজেও জানত। আর তাই শকুন্তলাকে আংটি দিয়ে গেছিল, যাতে অঙ্গুরীয় দেখে রাজার ভঙ্গুরীয় সম্পর্ক মানে অতীতের কথা মনে পড়ে যে “হ্যাঁ জঙ্গলে গিয়ে সুন্দরী কন্যার সাথে জঙ্গল মে মঙ্গল কিছু একটা করেছি…”। দুষ্মন্ত যে এরকম আংটি আরও কত ঋষিকন্যাকে দিয়েছিল সেটা অবশ্য সন্দেহের বিষয়। আমি বিশ্বাস করি না যে দুষ্মন্ত সাংঘাতিক চরিত্রবান ছিল। তার কোনো কার্যই তার চরিত্রের সুঠমতার পক্ষে সায় দেয় না। কিন্তু দুষ্মন্ত রাজা, একেবারে ব্রহ্মা থেকে চাঁদ, বুধ হয়ে বড় বড় রাজ-রাজড়া, যযাতি হয়ে সেই বংশের বংশধর। তাকে বদনাম করা যায়? পুরাণকারদের চাকরি থাকত এসব লিখলে? তাই এই দুর্বাসার অভিশাপের কাহিনি লেখা হয়।
শকুন্তলা অভিশাপ পেয়েই দুর্বাসার পায়ে পড়ে খুব খানিক কান্নাকাটি করে রিকোয়েস্ট করে। দুর্বাসা অভিশাপ দিয়েই শান্ত হয়ে গেছে। কী ভুল করেছে সে বুঝতে পারে। তাই এবারে অভিশাপকে এডিট করে শর্ত রাখে, “রাজার দেওয়া কোনোকিছু যদি রাজার কাছে ফেরত যায় তবেই রাজার তোমাকে মনে পড়বে…”
শকুন্তলা একটা সুযোগ পায়। তার কাছে তো রাজার দেওয়া সার্টিফিকেট আংটি রয়েইছে। ওটা নিয়ে গিয়ে ঝপ করে রাজা দুষ্মন্তকে দেখালেই রাজার সব মনেও পড়ে যাবে, আর শকুন্তলা একবার রাজবাড়িতে পৌঁছলে তাকে আর না-ও করতে পারবে না। তখন শকুন্তলা রানী হয়ে যাবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ, শকুন্তলা তার পালিত পিতার সাথে প্ল্যান করে বেরিয়ে পড়ে। কণ্ব অত্যন্ত উদার মনের মানুষ ছিলেন। বাচ্চারা যা করতে চায় তাতেই সায় দেন। রাজা যদি শকুন্তলার কাছে না আসে, তাহলে শকুন্তলাকে রাজার কাছে যেতে কে আটকাচ্ছে? অতঃপর শকুন্তলা বেরিয়ে পড়ল। অনেকটা পথ পার করে একটা নদী পার করতে যায় শকুন্তলা। নৌকায় বসে শকুন্তলা গান ধরে, “ও নদীরে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে… বলো কোথায় তোমার দেশ তোমার নেই কি চলার শেষ…”
এরই মধ্যে শকুন্তলা জলের মধ্যে হাত দিয়ে খুব কায়দা করে গান করতে গেছে, আর সেই আংটি তার আঙুল থেকে খুলে জলে টুপ করে পড়ে গেল। অপদার্থ আর কাকে বলে? ঋষির অভিশাপ খেয়ে এসেছিস, কোথায় আংটিকে পাতায় মুড়ে, বেঁধে বুকের কাছে রাখবে, সেসব নয় উনি গেছেন নদীর জলে হাত খেলাতে। দেশে বিদেশের পুরাণে দেখবেন চরিত্রদের এরকম ক্যাজুয়াল অ্যাটিটিউড ভর্তি ভর্তি। মানে যেটা না করা হবে সেটাই গিয়ে করে বসে সর্বনাশ ডেকে আনবে। শকুন্তলাও তাই করল। কিন্তু তার বোধহয় দুর্বাসার অভিশাপের উপরে বিশেষ বিশ্বাস ছিল না। আংটি ছাড়াই দুষ্মন্তের রাজসভায় গিয়ে সে জানায়, “আমি তোমার ভার্যা, তুমি আমার মনের রাজা…”
কিন্তু রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে চিনতে পারে না, বলে, “কে তুমি? নন্দিনী? আগে তো দেখিনি…”
শকুন্তলা বলে, “ক্যা হুয়া তেরা ওয়াদা? উও কসম উও ইরাদা?”
রাজার ইরাদা নিয়ে আমারও সন্দেহ হয়। কারণ দুষ্মন্ত জঙ্গলে গিয়ে শকুন্তলার রূপের ছটায় প্রেমে পড়েছিল। মেনে নিচ্ছি রাজার স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে, তাহলেও তো রাজার এরকম সুন্দরী কন্যাকে দেখে আবার প্রেমে পড়া উচিত ছিল। রাতারাতি কি দুষ্মন্তের চয়েস, ভয়েস ও চরিত্র পালটে গেল? এইসব ভেবেই সন্দেহ হয় রাজার আসলে সবই মনে ছিল, কিন্তু জঙ্গলের এক রাতের ফুর্তি যে তার সামনে মূর্তিমান আবির্ভাব হবে সেটা ভাবতে পারেনি।
রাজা দুষ্মন্ত বলে, “আমি রাজা, তুমি ঋষিকন্যা… ভাগো এখান থেকে…”
আক্ষরিক ভাবেই শকুন্তলাকে রাজা তাড়িয়ে দেয়। কেন? রাজা হিসেবে তার কর্তব্য ছিল না ব্যাপারটার সত্যাসত্য বিচার করা? দু-চারটে গোয়েন্দা লাগানোর? নিদেনপক্ষে কণ্বমুনিকেই ডেকে আনত, রাজার কাছে ব্রাহ্মণের কথা তো সর্বোপরি সত্য ও শিরোধার্য। রাজা সেসব লাইনে না গিয়ে সরাসরি শকুন্তলাকে তাড়িয়ে দেয়। এর অর্থ রাজা ঠিকই চিনেছিল শকুন্তলাকে, স্রেফ নিজের স্ট্যাটাস বজায় রাখার জন্য সভাপরিষদের সামনে শকুন্তলাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে তাড়িয়ে দেয়।
শকুন্তলা মনের দুঃখে আবার কণ্ব মুনির আশ্রমে ফিরে আসে। কণ্ব মুনির বোধহয় অত শক্তি-ক্ষমতা ছিল না, নইলে কন্যাসম এই বালিকার এরকম অবস্থা দেখে রাজাকে দু-চারটে অভিশাপ দিতে পারল না? অবশ্য করবেই বা কী করে? মহাভারতে অম্বাকে দেখুন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শিকার হয়ে কতই না কাঠখড় পুড়িয়েছিল। কোনো ঋষি বাকি ছিল না, এমনকি পরশুরামকেও ধরেছিল, কিন্তু সব ব্যাটা নেপোটিজমের চামচা-হাতা, রাজবংশের কাছে গিয়েই হেঁ হেঁ করে অম্বাকে কেস খাইয়ে দিল। অম্বা বেচারীকে আরেক জন্ম নিয়ে দু-তিনবার নিজের লিঙ্গ পালটে তবে প্রতিশোধ নিতে হল। শকুন্তলা বেচারী ঋষিকন্যা, তার আসল বাপটা খোঁজও রাখে না, সে থাকলে তাও কাজের কাজ কিছু হত, কিন্তু সেও ফুর্তি করেই কেটে পড়েছে। দুষ্মন্তকে আর কী বলব? বিশ্বামিত্র যদি এরকম দ্বৈতঅণ্ডের অর্ধ শ্বসারমণকারী কুণ্ঠকসংগতিকারী হয় তাহলে আর রাজাকে দোষ দিয়ে কী লাভ? সমগ্র পুরুষজাতিই তখন বোধহয় আত্মঅহংয়ে ভুগছিল। এখনও ভোগে।
জঙ্গলে এসেই এক রাতের মিলনের ফল, একটি শিশু জন্ম নেয় শকুন্তলার গর্ভে। শকুন্তলা ছেলেকে নিয়ে জঙ্গলে আলাদা থাকা শুরু করে। বেচারীর বাবা, মা, স্বামী কেউই সঙ্গ দেয় না। সিঙ্গেল মাদার। আমার মনে হয় এইজন্যই শকুন্তলা পড়া উচিত, প্রত্যেকটা বালকের। পুরুষ জাতির পড়া উচিত। জীবনে কীরকম পুরুষ হওয়া উচিত নয় সেটাই শকুন্তলার ছত্রে ছত্রে গুপ্ত ভাবে লেখা আছে। কীভাবে একজন পিতা হয়ে কন্যার প্রতি যত্নশীল হওয়া উচিত, কীভাবে একজন স্বামী হিসেবে স্ত্রীর যত্ন নেওয়া উচিত, কীভাবে ভবিষ্যৎ চিন্তা করে একজন মেয়ের সর্বনাশ না করা উচিত, সেই শিক্ষাই দেয় শকুন্তলার গল্প। এটা কোনো মতেই প্রেমের গল্প নয়, উলটে এটা বোঝায় যে একজন নারীকে কীভাবে জন্ম থেকেই অবজ্ঞার শিকার হতে হয়, এবং তার নারীত্ব ও সৌন্দর্য শুষে নিতে কত সুদর্শন ও কুমননের মানুষেরা তৈরি থাকে। শকুন্তলা একটি মেয়ের সব হারানোর গল্প।
যা-ই হোক, আমি বাকি গল্পটা বলি। ইতিমধ্যে এক জেলে নদী থেকে একটা মাছ ধরে রাজসভায় নিয়ে আসে। এতে কী প্রমাণ হয়? তখনকার রাজা এবং মানুষেরা দিব্যি মাছ খেত। ভুলভাল এজেন্ডা করে নিরামিষ খাওয়ার প্রচারটা হাল আমলেই শুরু হয়েছে। সেই মাছের পেট কেটে শকুন্তলার সেই আংটি বেরিয়েছে। আসলে নদীতে আংটি পড়ে যাওয়ায় মাছটা ওই আংটি গিলে নিয়েছিল। বেশ বড় সাইজের মাছ বলতে হবে, কিলো চারেক তো হবেই। আর নইলে আংটিটা একেবারে এলেবেলে পুঁচকে সাইজের ছিল। আংটি দেখা মাত্রই দুষ্মন্তের স্মৃতির ঘন্টি ফিরে আসে। তার জঙ্গুলে বউয়ের কথা মনে পড়ে। কি ন্যাকামি আহা… গোটা বউটা চোখের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন চিনতে পারল না, উনি আংটি দেখে বউ চিনতে পারল। এই ভসদরমণকারী লজিক আমরা বৈদেশিক একটি রূপকথার গল্পেও পাই। কেন, সিন্ড্রেলা মনে নেই? রাজকুমার সিন্ড্রেলাকে জড়িয়ে নেচেকুঁদে সন্ধ্যে কাটিয়ে দিল, এদিকে সিন্ড্রেলা পালানোর পর রাজ্যের মেয়েদের চেহারা দেখে তাকে খুঁজে না বের করে, তার ফেলে যাওয়া জুতোর সাইজ দেখে তাকে খুঁজে বের করে। ধুর আমি আর গল্পই বলব না, যান তো… না মানে এগুলো কী? লজিকের অষ্টোত্তর শতনাম হয়ে যায়, ধুস…
মোটকথা রাজা দুষ্মন্তের সব কথা মনে পড়ে যেতেই “হা শকুন্তলা, হা শকুন্তলা…” করে হাঁ করে ছুটে বনে চলে এল। নদীটা পেরোল কী করে? সাঁতরে? এতদিনে যদি দৌড়েই এলো তাহলে অভিশাপের আগে আসোনি কেন বাপু? হয়তো এখন তার প্রধান রানী তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছিল, তাই তার জঙ্গুলে বউয়ের কথা মনে পড়েছিল। কিন্তু কণ্ব মুনির আশ্রমে শকুন্তলা নেই। পাততাড়ি গুটিয়ে ভোটার কার্ড চেঞ্জ করে সে অন্য জায়গায় আরও গভীর বনে চলে গেছে। রাজা দুষ্মন্ত খুঁজতে খুঁজতে গভীর জঙ্গলে গিয়ে দেখে এক জায়গায় একটা বাচ্চা ছেলে সিংহের মুখ হাঁ করিয়ে তার দাঁত গুনছে। বিদ্যাসাগর মাইল ফলক দেখে সংখ্যা শিখেছিলেন, কিন্তু সেই বালক সিংহের দাঁত গুণে সংখ্যা শিখছিল। আশ্চর্য ব্যাপার। হবে না? শকুন্তলার ছেলের ধমনীতে যে চন্দ্ৰ বংশ, বিশ্বামিত্রের বংস আর দুটো অপ্সরার রক্ত বইছে। কিন্তু গভীর জঙ্গলে সিংহ থাকে না, ওটা গাঁজা। বীরত্ব দেখাতে গিয়ে পুরাণকার জঙ্গলে সিংহ ঢুকিয়েছে। জঙ্গলেও থাকে না, হিমালয়েও থাকে না। পাহাড়ী সিংহ হলে অবশ্য আলাদা ব্যাপার। জঙ্গলে বাঘ থাকে।
যা-ই হোক, ছেলেকে দেখে চমৎকৃত হয়ে দুষ্মন্ত শকুন্তলার দেখা পায়। ঘরের সিকিউরিটির জন্য শকুন্তলা বোধহয় সিংহটাকে পুষেছিল। ইচ্ছে ছিল হয়তো কোনদিন আবার স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়া দুষ্মন্ত জঙ্গলে মৃগয়া করতে ফিরলে তার পিছনে সিংহ লেলিয়ে দেওয়ার। দুষ্মন্তকে দেখেই শকুন্তলা গেয়ে উঠল, “কত না ভাগ্যে আমার, এ জীবন পূর্ণ হল… হাতের এই ছোট আংটিতে… সবকিছু বদলে গেল…”
মাইরি বলছি যে কোনো বিয়ের ভিডিয়োতে এই গানটা থাকবেই, আর এই গানটা শুনলেই বাকি ভিডিও দেখতে ইচ্ছে করে না। অন্য গান কেউ আমদানি করুন। মোটকথা রাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার পুনর্মিলন ঘটে এবং সেই বাচ্চা ছেলেটি, তার নাম হয় ভরত। যার থেকে বলা হয় এই দেশের নাম ভারত হয়েছে, এবং মহাভারতে ভরতের বংশের গল্পই বলা হয়েছে।
কিন্তু এখানেও একটা টুইস্ট আছে। ভরতের সব ছেলে তার মায়ের রাগে শেষ হয়ে যায়, তাই যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে গুরু বৃহস্পতির ছেলে ভরদ্বাজ ঋষিকে ভরত দত্তক নেয়। ভরদ্বাজের নাতি ছিল সুহোত্র, আর সুহোত্রের অনেক ছেলেপুলে ছিল। তাদের মধ্যে আমি বলব কশিকা, চ্যবন আর অজমিদের কথা। কশিকার থেকে দিভোদাস ও ইত্যাদী বারাণসী ও কাশীর রাজাদের বংশ হয়। অজমিদের এক ছেলে সুশান্তির বংশে পঞ্চম পুরুষে জন্ম নেয় অহল্যা আর সপ্তম পুরুষে কৃপাচার্য (ও কৃপি)। অজমিদের দ্বিতীয় ছেলে সোমকের বংশে তিনপুরুষ পরেই জন্ম নেয় দ্রুপদ, মানে দ্রৌপদীর বাবা। অজমীদের আরেক সন্তান ছিল ঋক্ষ, তার তিনপুরুষ পরে জন্মায় পরীক্ষিত ও সুহোত্র (দ্বিতীয়)। এই সুহোত্রের ছেলে ছিল চ্যবন। চ্যবনের চ্যবনপ্রাশের কল্যাণে যে মগধীয় বংশ তৈরি হয় সেটায় জন্মেছিল জরাসন্ধ। আর পরীক্ষিতের বংশে সপ্তম পুরুষে জন্ম হয় শান্তনুর, মানে ভীষ্মের বাবার। তার থেকে পুরো কৌরব, পান্ডব ইত্যাদি। শান্তনুর এক ভাই বহুীক থেকে যে বলখ বংশ হয় সেখানেই জন্ম নেয় ভুড়িশ্রব।
তার মানে বুঝতেই পারছেন, মহাভারতের পুরো যে যুদ্ধটা সেখানে সৈন্যসামন্ত বাদ দিয়ে যত রাজা-রাজড়া বীর আছে সবাই কোনো না কোনো ভাবে একই বংশের সাথে যুক্ত। ফ্যামিলি ট্রি বানিয়ে দিয়েছি, মিলিয়ে নিন যতখুশি।
সবার কথাই যদি বলি তাহলে দুজনের কথা অবশ্যই আসে। কর্ণ আর একলব্য… মহাভারতের সবচেয়ে অবহেলিত ও কেস খাওয়া দুই চরিত্র। তারাও কি এই বংশের সঙ্গে যুক্ত? অবশ্যই যুক্ত। কর্ণ কুন্তীর ছেলে ছিল ঠিকই, কিন্তু কর্ণের পালিত পিতা, অধিরথও এই চন্দ্র বংশের সাথে যক্ত ছিল। কীভাবে ? যযাতির এক ছেলে ছিল কাশেয়ু, তার ছেলে মহামান, পরপর ড্যাশ দিয়ে একেক পুরুষ বুঝিয়ে দিচ্ছি। মহামান-অঙ্গ-বৃহন্মান-বিজয়-ধ্রিতি-ধ্রিতাব্রত-সত্যকর্ম-অধিরথ-কৰ্ণ (পালিত)।
এটা নাহয় মেনে নিলেন, তাই বলে একলব্যও চন্দ্র বংশের? এবারে আপনারা হাঁ হাঁ করে উঠবেন। কিন্তু হরিবংশ যে স্পষ্ট বলছে যযাতির ছেলে যদু, তার বংশে জন্মায় ক্রৌস্থু, সেই ক্রৌস্থু দুজনকে বিয়ে করে। গান্ধারী (অন্য গান্ধারী) থেকে সে জন্ম দেয় অনমিত্রকে, যার ছেলে শিনি আর নিঘ্ন। শিনির ছেলে সত্যক, যার ছেলে সাত্যকী। নিঘ্নের ছেলে প্রসেনজিৎ আর সত্রাজিৎ (সেই সামন্তক মণির কেস)। ক্রৌস্থুর দ্বিতীয় বউ মাদ্রী (অন্য মাদ্রী) থেকে জন্ম নেয় যুধাজিৎ আর দেবমিদুষ। যুধাজিতের ছেলে বৃষ্ণির নাতি হল অক্রুর। আর দেবমিসদুষের ছেলে শুরসেন যার দুই ছেলে দুই মেয়ের কথা জানা যায়। প্রথম মেয়ে পৃথা, যে পরে কুন্তী হয়। দ্বিতীয় মেয়ে শ্রুতশ্রবা যার সাথে চেদি রাজার বিয়ে হয়ে শিশুপালের জন্ম হয়। শুরসেনের প্রথম ছেলে বাসুদেব, মানে কৃষ্ণের বাবা। আর দ্বিতীয় ছেলে দেবশ্রব, এই দেবশ্রব জঙ্গলে গিয়ে হারিয়ে গেছিল। তখন এর সন্তানের জন্ম হয়। সেই সন্তানকে দেবশ্রব নিষাদরাজ হিরণ্যধনুকে দিয়ে দেয়। সেই ছেলেই হল একলব্য। তার মানে একলব্য কৃষ্ণের কাকার ছেলে ছিল।
ব্যস, সব চিন্তাভাবনার শেষ, আমি গেলাম বিশ্রাম করতে। আমার এখন দীর্ঘ সময় দরকার প্রচুর চিন্তাভাবনা করার জন্য এবং মহাভারতকে নতুন আঙ্গিকে দেখার জন্য।
