কৃষ্ণের ছেলেপুলেদের কাণ্ড: দুই
কৃষ্ণের ছেলেপুলে-নাতিনাতনিদের কথা বলতে গিয়ে দুটো পর্ব করে ফেললাম। তার কারণ আছে। আগের পর্বেই বলেছিলাম, কৃষ্ণের এক লক্ষ আশি হাজার পুত্র থাকা সত্ত্বেও হাতে গোনা (মানে এক হাতেও গোনা যায়) কয়েকজন পুত্রই ওয়ার্ল্ডফেমাস হয়েছিল। তাদের মধ্যে যে সো কলড্ ‘গুড বয়’ সেই প্রদ্যুম্ন আর তার ছেলে ও নাতির কথা বলেছি। এবারে বলব উলটোটা, মানে যাকে পুরাণ ‘খারাপ ছেলে’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে। সে হল কৃষ্ণ ও জাম্ববতীর পুত্র শাম্ব।
কিন্তু আমরা প্রথম থেকে তাকে “খারাপ” বলে ধরব না। আমরা আগে শাম্বর সঙ্গে জড়িত সমস্ত গল্প (পৌরাণিক কথা-উপকথা-প্রচলিত কথা, সবকিছু। একমাত্র সিরিয়ালের গল্প বাদ দেব) আলোচনা করব, এবং একদম শেষে আলোচনা করব শাম্ব সত্যিই সর্বগ্রাসী কুলাঙ্গার খারাপ ছিল, নাকি অন্যভাবে তাকে দেখা যায়?
শাম্বর জন্ম নিয়ে একটা গল্প আছে। প্রদ্যুম্নের জন্মের পরেই হয়তো, জাম্ববতীরও ইচ্ছে হয় একটা পুত্র পাওয়ার। কিন্তু এলেবেলে পুত্র হলে তো হবে। বাকি এক লক্ষ ঊনআশি হাজার নশো আটানব্বইজন পুত্রের থেকে আলাদা হতে হবে তাকে। যেমন প্রদ্যুম্ন আলাদা। একেবারে কামদেবের অবতার, সেই টাইপ। কিন্তু চাইলেই কোনো দেবতাকে জন্ম নিতে বলা যাবে না। শিডিউল করা হয়নি। ফলে একটাই উপায় বাঁচে। কোনো দেবতার থেকে তার অংশকেই পুত্র হিসেবে চাওয়া। যে সে দেবতা নিজের অংশ এরকম দিতে পারবে না। ফলে কৃষ্ণ উপমন্যু ঋষির সঙ্গে অল্প শলা ও অনেকটা পরামর্শ নিয়ে একদম সরাসরি শিবের তপস্যা করতে শুরু করে।
কিছুমাস কঠোর তপস্যা করতেই শিবঠাকুর অর্ধনারীশ্বর রূপে দেখা দিয়ে বলল, “হরে কৃষ্ণ, এ কী কেস? তুমি আমার তপস্যা করছ কেন?”
“ছেলে চাই,” কৃষ্ণ বলে।
“আরে সে তো আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছেই, তুমি চাইলেই চলে আসতাম,” অর্ধনারীশ্বর শিব (ও পার্বতী) বলে, “আচ্ছা বেশ আমি বর দিচ্ছি। তোমার পুত্র হবে, আর সেই পুত্রের নাম আমাদের এই অর্ধনারীশ্বর রূপের নামেই হবে। অর্থাৎ শাম্বশিব রূপ থেকে তার নাম হবে শাম্ব।”
এখানে একটা ব্যাপারে খটকা লাগে। আপনারা জিজ্ঞেস করতেই পারেন যে আগের পর্বেই দেখছিলাম, কৃষ্ণ শিবঠাকুরের সঙ্গে হেব্বি মারপিট করল। তারপরে আবার মা পার্বতীর সঙ্গে দেখা হল। তাহলে তখন পুত্র চাইল না কেন? এর উত্তরে বলতে পারি যে সেই যুদ্ধের ঘটনাটা শাম্বর জন্মের অনেক পরে ঘটেছে। মনে করে দেখুন, বাণাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে সময় ‘বসে অসুর কেলাও’ প্রতিযোগিতায় শাম্বও অংশগ্রহণ করেছিল। তাছাড়া যুদ্ধের মাঝে বা পরে পুত্র চাইলে শিবঠাকুর হয়তো একটা ভূত-প্রেতকেই ধরে দিয়ে দিত। নিজের অংশ তো দিত না। এবারে আপনারা বলবেন, কৃষ্ণ যখন বিষ্ণু হয়েই যেতে পারত যখন-তখন, তখন সরাসরি কৈলাসে গিয়ে শিবকে একটা অংশ চাইলেই পারত। শিবঠাকুর একটা জটা-টটা ছিঁড়ে দিলেই হয়ে যেত।
কিন্তু সেসব না করে কৃষ্ণ তপস্যা করল, তার সম্ভাব্য কিছু কারণগুলো আমি ভেবে বের করেছি। প্রথম কারণ হতে পারে যে, শিবঠাকুরের অংশ অবতাররা তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। মানে বিষ্ণু যেমন নিজের অবতারদের পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে, শিবঠাকুরের সেরকম নয়। বিষ্ণু শুধু সেই একবার নরসিংহ অবতারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছিল। তখন শিবের শরভ অবতার তাকে সামলায়। কিন্তু শিবের অবতার ও অংশেরা সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়। তার মধ্যে আবার অমরও হয়ে যায়। হনুমান ও অশ্বত্থামাকেই দেখুন। আর সবাই এমন ক্ষমতাশালী যে চাইলেই পৃথিবী ধ্বংস করে দিতে পারে।
এই ধ্বংসটাও একটা কারণ কৃষ্ণের তপস্যা করার। ভক্তি ও পৌরাণিক মতে কৃষ্ণ জানত যে যাদববংশ ধ্বংস হবে, এবং তার জন্য এমন কাউকে চাই যে ধ্বংস করবে। ধ্বংসের সূচনা করবে। ধ্বংসের সূচ নিয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোবে। একেবারে বংশকে ফালা ফালা করে দেবে। কিন্তু অন্যদিকে আবার এতটাও ডেঞ্জারাস কাউকে চাই না যে যদুবংশ সহ পৃথিবীও ধ্বংস করে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, ওই একই সময়ে ভারতের বুকে শিবের অংশ অশ্বত্থামা ও হনুমান ছিলই। তার উপরে আরেকজন ওরকম পাওয়ারফুল কেউ এলে চারিদিকে ফুল ধ্বংস শুরু হয়ে যাবে। তাই ঠিক যতটা দরকার ততটুকুই অংশ নিতে কৃষ্ণ তপস্যা করল। আর পুত্র পেয়েও গেল।
বাড়ি ফিরেই বছরখানেকের মধ্যে জাম্ববতী গর্ভবতী হয়ে গর্বের সঙ্গে শাম্বকে জন্ম দিয়ে শাম্ববতী হয়। শাম্ব দেখতে দেখতে বড়ও হয়ে যায়। সুপুরুষও। প্রদ্যুম্ন, শাম্ব আর অনিরুদ্ধকে রূপে কৃষ্ণের সমান বলা হত। তার মধ্যে শাম্ব ও অনিরুদ্ধ কৃষ্ণের মতনই দেখতে ছিল প্রায়। আবার শাম্ব বেশি হ্যান্ডসাম ছিল। তাকে দেখে দ্বারকার নারীরা প্রেমে পড়ে যেত। কৃষ্ণকে দেখে যেমন গোপিনীরা মোহিত হয়ে যেত, তেমনই শাম্বকে দেখেও অনেক মহিলাই প্রেমে পড়ত। তফাত এই যে শাম্বর সঙ্গে মহিলারা একটু বড় বয়সে একটু বেশিই সিরিয়াস সম্পর্ক করতে চাইত। শাম্বও হয়তো একটু বখেই গেছিল। এই প্রসঙ্গটা মনে রাখবেন। আমরা আবার ফিরে আসব এই ব্যাপারে।
তার আগে শাম্বর বিয়ের ব্যাপারের র্যাপারটা গুটিয়ে নিই। এই ঘটনাটা আমি ছোট করে বলেছিলাম বলরামের কান্ড বলার সময়। এখন একটু বিস্তারে বলি, নয়তো আপনার আপনাকে নিস্তার দেবেন না। শাম্ব দুম করে দুর্যোধনের কন্যা লক্ষ্মণার প্রেমে পড়ে। কৃষ্ণের সঙ্গে পাণ্ডব আর কৌরবদের যে হারে প্রায় প্রতিমাসেই দেখা হচ্ছিল, তাতে শুধু শাম্ব কেন? অনেক যাদব ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই অনেক কৌরব ছেলেমেয়েদের প্রেম হওয়াটা স্বাভাবিক। আর প্রেমে পড়লেই যাতায়াত বেড়ে যায়।
আমিও একবার এরকম প্রেমে পড়েছিলাম। আমারই আত্মীয়ের চেনাজানার মধ্যে। খোলাখুলি বললাম না কার, নয়তো দুয়ে দুয়ে দুধ বের করে ফেলবেন আপনারা। তাছাড়া সে এখন দুই বাচ্চার মা। শেষ একবার কানাঘুষো শুনেছিলাম যে তার তৃতীয় সন্তান হতে চলেছে। যা-ই হোক, তো সেই মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম আমি, এবং তার বাড়ি ছিল আমার আত্মীয়ের বাড়ির উলটোদিকে। তাই হঠাৎ করে সেই আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া বেড়ে গেল আমার। সামান্য সামান্য ছুতোয় চারঘণ্টা ট্রেন জার্নি করে যেতাম। যে আত্মীয়ের বাড়ি আমি ১৯৯৯ এর পরে আট বছরে মাত্র দুবার গেছিলাম, সেই আত্মীয়ের বাড়িতেই আমি একবছরে সাতবার গেছিলাম। হাসবেন না, প্রেমে পড়লে মানুষ এই প্রকার অনেক কাজ করে যেগুলো পরে হাস্যকর মনে হয়।
প্রেমটা কেটে যায়। কাটারই ছিল। কাটারি দিয়ে কাটার মতন সে সম্পর্ক কেটে দেয়। সে দেবের ফ্যান ছিল, আর আমি হাজার চেষ্টা করেও দেবের তখনকার (২০০৮ থেকে ২০১১) সিনেমাগুলো পুরোটা দেখে শেষ করতে পারতাম না। তাছাড়া তার আরও দু-জায়গায় ছিপ ফেলা ছিল। সেটা পরে জানতে পারি। কিন্তু ওই যে, প্রেমে পড়লে সবকিছুই ভালো লাগে, আর কোনো সন্দেহই হয় না। তাছাড়া আমাদের প্রেমটা মাইরি আত্মীয়রা কেউ জানতেই পারল না? কেউ এসে বলল না যে ‘ওহো, প্রেম করছিস? বিয়েটা করেই ফেল?’। আত্মীয়গুলো এরকম গাধা কেন? ধরেবেঁধে বিয়ে দিতে পারল না? ‘হম আপ কে হ্যায় কৌন’ সিনেমাটায় ঠিকই দেখিয়েছিল। না, আমি সিনেমার উনিশটা গান বা সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে বউদির মৃত্যুর পর বউদির বোনের সঙ্গে দাদার বিয়ে দেওয়া নিয়ে বলছি না। সিনেমাটায় দেখানো হয়েছিল, বরের ভাই, বউয়ের বোনের সঙ্গে প্রেম করছে, কিন্তু কেউ বুঝতে পারছে না। বাড়িতে গুষ্টির পিন্ডির শ-দেড়েক লোক থাকে, তাদের মধ্যেই দুজনে প্রেম করছে, বৃষ্টিতে ভিজে গান করছে, এ ওকে গুলতি দিয়ে ফুল মারছে, গানে গানে সবাইকে জানাচ্ছে প্রেম করে… তবুও, হ্যাঁ তবুও, বাড়ি ভর্তি লোকে বোঝেনি ও জানতে পারেনি তারা প্রেম করে। একমাত্র চাকর ছাড়া। আমাদের প্রেম কাহিনিও এরকমই হয়েছিল। কেউ জানতেই পারল না?
যা-ই হোক, ভাট বকেছি অনেক, শাম্বর গল্পে এগোই। শাম্ব লক্ষ্মণার প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে একেবারে সটান হস্তিনাপুর চলে যায়। লক্ষ্মণাকে কিডন্যাপ করবে, বা নিয়ে পালিয়ে আসবে, এইরকম একটা ইচ্ছে। মহাভারতে এরকম উদাহরণ প্রচুর। ভীষ্ম অম্বা-অম্বিকা-অম্বালিকাকে নিয়ে চলে এসেছিল, অর্জুন সুভদ্রাকে নিয়ে পালিয়ে গেছিল, কৃষ্ণ নিজে রুক্মিণীকে গিয়ে দুম করে বিয়ে করেছিল। সেই ট্র্যাডিশন সমানে বজায় রেখে শাম্বও চলল লক্ষ্মণাকে বিয়ে বা হরণ করতে।
কিন্তু হস্তিনাপুর তো কৌরবদের রাজধানী। ওখানে গিয়ে হম্বিতম্বি করলে হবে? শাম্ব গিয়ে যেই বলেছে, “আমাকে লক্ষ্মণা দাও,” ওমনি দুর্যোধন বলে, “এহ, মোয়া নাকি? চাইলেই আমার মেয়েকে দিয়ে দেব?”
“আমি কৃষ্ণপুত্র,” শাম্ব গর্জে ওঠে।
দুর্যোধন কান চুলকে বলে, “তো? কৃষ্ণের পালগন্ডা লক্ষ লক্ষ ছেলে আছে। আমার তো একটিই মেয়ে। দুম করে এসে চাইলেই হবে?”
“আমি যুদ্ধ করে লক্ষ্মণাকে নিয়ে যাব!”
“তোর লক্ষণ তো ঠিক দেখছি না,” দুর্যোধন বলে, “এই, কে আছিস, এটাকে আটকে রাখ। বিয়ের ভূত ঘাড় থেকে নামলে দেখা যাবে।”
দুদ্দাড় করে গাদাখানেক সৈন্য এসে শাম্বকে ধরে নিয়ে ফাটকে পুরে দিল। তার মানে শাম্ব একা অতটা বীর ছিল না। এর থেকে তো অনিরুদ্ধ ভালো ছিল। বাণাসুরের সেনাকে ফাইট দিয়ে তারপরে অ্যারেস্ট হয়েছিল। শাম্ব গিয়ে আস্ফালন করেই আঁশফলের মতন গুটিয়ে জেলে ঢুকে গেল।
খবর গেল দ্বারকায়। কৃষ্ণের কাছে খবর যেতেই কৃষ্ণ বলে, “শাম্বটা এরকম না জানিয়ে গেল কেন? দুজুর মেয়েকে পছন্দ তা বলে দিলেই পারত। আমরা গিয়ে কথা বলতাম। বেশি অ্যাডভেঞ্চার করতে গেছে!”
“চলো যুদ্ধে,” প্রদ্যুম্ন বলে।
“না রে, কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করলে হবে না,” কৃষ্ণ বলে, “এখুনি কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে। তাও কুরুক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ হবে না। ব্যাপারটা ডিপ্লোম্যাটিকালি হ্যান্ডেল করতে হবে।”
“তাহলে একগাদা গোরু ঢুকিয়ে দিই হস্তিনাপুরে?” যাদব মন্ত্রী বলে।
“এটা কে রে? লালু প্রসাদ যাদব নাকি?” কৃষ্ণ বলে, “ওরে, কৌরবদের আগেই গোরুর প্রতি নজর। বিরাট রাজ্য আক্রমণ করেছিল পাণ্ডবদের খুঁজতে, কিন্তু সেই সুযোগে গোরু নিয়ে পালাচ্ছিল।”
“তাহলে?”
“তাহলে আপাতত একটাই উপায়,” কৃষ্ণ বলে, “দাউভাইয়া, তুমি দুর্যোধনের কাছে যাও। তুমি বললে ও ছেড়ে দেবে শাম্বকে।”
প্রস্তাবটা সকলেরই মনে ধরে। সেইমতন দাউভাইয়া মানে বলরাম চলল হস্তিনাপুর। সেখানে পৌঁছতেই দুর্যোধন বলরামকে বেড়ে খাতির করে বলে, “বলুন গুরুদেব, আগমনের হেতু?”
“আমার হেতু কৌরব আর যাদবদের মধ্যে সেতু হওয়া,” বলরাম বলে, “শাম্বকে ছেড়ে দাও, আর তার সঙ্গে তোমার মেয়ের বিয়ে দাও!”
দুর্যোধনের মুখ থেকে সুখের ছায়া উড়ে টুক করে লুক বদলে গেল। সে বলল, “আপনি বলে তাই কিছু বলছি না। নয়তো শাম্ব এসে আমার মেয়ের দিকে নজর দেয়? আমি কুরু রাজপুত্র।”
“ভাড়ায়…”
“অ্যাঁ?”
“ভাড়ার রাজার ভাড়ার রাজপুত্র!”
“ওসব কথা থাক। ওই পয়েন্টেই তো পাণ্ডবরা আমাদেরকে বারবার বিঁধছে। ওদের বাপ আমার বাবাকে কেয়ারটেকার করে পটল তুলেছে, এতে আমাদের দোষ কী বলুন? লিগ্যালি তো আমরাই রাজা।”
“সেসব কথা থাক, তুই আমার ফেভারিট ভাগনেকে ছাড়বি কি না?”
“আচ্ছা বেশ, নিয়ে যান শাম্বকে। কিন্তু ওকে যেন হস্তিনাপুরের আশেপাশে না দেখি।”
“লক্ষ্মণাকেও দে। পুত্রবধূ চাই।”
“ওটি হবে না…”
“দে বলছি!”
“দেব না, যা ইচ্ছে করুন।”
“তবে রে, আজ হস্তিনাপুরের সব হস্তিকে ডুবিয়ে যদি বস্তি-না-পুর না করেছি তো আমার নাম বলরাম নয়!”
বলেই বলরাম বেরিয়ে যায় রাজসভা থেকে। ভীষ্ম বোধহয় তখন ছিল না হস্তিনাপুরে, নয়তো কিছু একটা বুদ্ধি দিত দুর্যোধনকে।
বলরাম বেরিয়ে গিয়ে হস্তিনাপুরের কোনায় লাঙল গেঁথে গোটা শহরটাকে টানতে থাকে। টেনে গঙ্গার জলে ফেলে দেবে। বহুযুগ পূর্বে শান্তনু রাজার বউ গঙ্গায় নিজের ছেলেপুলেদের ফেলে দিত। আজ বহুদিন পরে শান্তনুর বংশধরদের ধরে গঙ্গায় ফেলতে বলরাম বদ্ধপরিকর হয়। বদ্ধপাগল হয় সেটাও বলা যায়। শহর টেনে নদীতে ফেলা যায়? না বোধহয়। বরং উলটোটা হয়েছিল হয়তো। গঙ্গা থেকে খাল কেটে গোটা হস্তিনাপুরকেই ভাসিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করেছিল হয়তো বলরাম। ইঞ্জিনিয়ার মানুষ।
জল যখন মাথার উপরে চলে এসেছে তখন দুর্যোধনের টনক নড়ে। না, নদীর জল মাথার উপরে আসেনি। পরিস্থিতি যখন মাথার উপরে এসে পড়ল। মেয়েকে বাঁচাবে নাকি রাজধানী? অনেক চিন্তা করে, দুর্যোধন ভাবল, লক্ষ্মণাকে দিয়েই দিই। যদুবংশ তো খারাপ নয়। কৌরবদেরই অন্য শাখা। তাছাড়া ওই বংশের অনেকেই কৌরববংশে বিয়ে করেছে। অনেকদিন থেকে দুই বংশের মিলনে বংশঝাড় তৈরি হয়েছে। দুর্যোধন অবশেষে রাজি হয়, এবং শাম্বর সঙ্গে লক্ষ্মণার বিয়ে হয়। দ্বারকায় আবার পার্টি। উফফ, দ্বারকায় অন্য লোকজনের বিয়ে-শাদি হবে কী? ঘনঘন কৃষ্ণের পরিবারের লোকেদেরই বিয়ে হচ্ছে খালি খালি।
যা-ই হোক, বিয়ের পরেও শাম্বর প্রতি দ্বারকার মহিলাদের প্রীতি কমে না। বিয়ে হয়েছে তো কী হয়েছে? হ্যান্ডসাম পোলা, আগুনের গোলা। শাম্বর প্রতি মহিলাদের প্রেম এতটাই বাড়াবাড়ি হয়ে যায় যে কৃষ্ণের কিছু স্ত্রীরা শাম্বর প্রেমে পড়ে, এবং নানা অছিলায় তাকে পাওয়ার চেষ্টা করে। অষ্টভার্যার কেউ নয় নিশ্চিতভাবে। এই স্ত্রীগুলো সেইই নরকাসুরের থেকে ছাড়িয়ে আনা কন্যাগুলোই হবে। কারণ তাদেরকে বহু অন্যান্য জাতি থেকে আনা হয়েছিল, এবং দীর্ঘদিন তারা অন্যত্র ছিল। দ্বারকা তাদের কাছে অপেক্ষাকৃতভাবে নতুন জায়গা, আর তারা সুখবিলাসীই ছিল। ফলত সৎ পুত্র হলেও, শাম্বর প্রতি তারা আকৃষ্ট হয়। এটা সত্যিই খারাপ ব্যাপার, এবং সম্ভবত শাম্ব সেরকম কিছু কাজে লিপ্তও হয়েছিল।
ব্যাপারটা কৃষ্ণের কানে যায়, আর কান থেকে মাথায় গিয়ে ঢোকে। কৃষ্ণ শাম্বকে আর সেইসব স্ত্রীদের ডেকে ঝড়াম করে অভিশাপ ঝেড়ে দেয়, “শাম্ব, তোর এই রূপের জন্যই এই পাপ ঘটেছে দ্বারকাতে। তাই তুই তোর রূপ হারাবি। তোর কুষ্ঠ হবে, আর রূপ যৌবন নষ্ট হবে। আর এই মেয়েগুলোকে আমি স্ত্রী বানিয়ে মর্যাদা দিলাম, এরা আমার ভরসা ফরসা করে দিয়েছে, তাই এদেরও অভিশাপ দিচ্ছি, এদের আভীর গোষ্ঠীর দস্যুরা তুলে নিয়ে যাবে!”
এখানে আমরা দুটো জিনিস দেখতে পাই। প্রথম, কৃষ্ণ কিন্তু ঠিক যযাতির মতনই অভিশাপ দিল। যযাতি যেমন নিজের ছেলে যদুকে আর তার বংশকে অভিশাপ দিয়েছিল, ঠিক সেইরকমই কৃষ্ণ শাম্ব আর দোষী স্ত্রীদের অভিশাপ দিয়ে বংশছাড়া করে দিল। দ্বিতীয় জিনিস হল, যযাতির বর কিন্তু ফলল। যযাতি বলেছিল, যদুর বংশে পুত্ররা পিতার কথা মানবে না। সেটাই হল।
দুম করে শাম্বর গায়ে কুষ্ঠ দেখা দিল। চামড়া খসে খসে পড়তে লাগল। শাম্ব বলে, “এ কী কেস? আমার ফেস এরকম শেষ হয়ে যাচ্ছে। ও বাবা, কিছু উপায় দাও। আমি এরকম থাকব নাকি?”
কৃষ্ণ বলে, “যা গিয়ে কট মুনির কাছে যা। ও উপায় বাতলে দেবে…”
অভিশাপ পাওয়া স্ত্রীগুলো বলল, “এই, আমাদেরও কিছু উপায় বাতলাও। আমরা কি দস্যুদের কাছেই থেকে যাব?”
“দস্যুরা তোমাদের ভোগ করার পর তোমাদেরকে দালভ্য ঋষি বাঁচাবে। তার কাছে একটা ব্রত শিখে তবে তোমাদের উদ্ধার হবে।”
“দালভ্য?” প্রদ্যুম্ন বলে, “আরে সেই ঋষিটা না, আরেকটু হলেই হস্তিনাপুরকে যজ্ঞে ভোগে দিয়ে দিচ্ছিল?”
“হ্যাঁ,” কৃষ্ণ বলে, “ধৃতরাষ্ট্র কাকা তাকে যজ্ঞের জন্য ভিক্ষা দেয়নি, তাই যজ্ঞে হস্তিনাপুর চড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ঋষিই এদের বাঁচাবে।”
“ততদিনে দস্যুরা তো ভোগ করবে আমাদের। বেশ ওয়াইল্ড ব্যাপার স্যাপার হবে,” বলে নির্লজ্জ স্ত্রীগুলো হিহি করে নিজেদের মধ্যে হাসতে হাসতে চলে যায়। কৃষ্ণ বলে, “এদের বাঁচিয়েছিলাম, হায় রে…”
বাস্তবিক এই স্ত্রীদের দস্যুদের প্রতি যৌন লালসা, এটা লিখলাম কারণ পরে যখন সবকিছু ধ্বংসের পরে যাদব স্ত্রীদের দস্যুরা হরণ করে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন কিন্তু অনেক স্ত্রীরা নিজেরাই স্বেচ্ছায় চলে গেছিল। যাদের সৎ পুত্রের প্রতি যৌন লালসা থাকতে পারে, তাদের দস্যুদের প্রতিও থাকবে, এতে আশ্চর্য কী? ঘোর কলিযুগ যে ততদিনে ঢুকে পড়েছে সমাজে সেটা আন্দাজ করাই যায়। যুগের প্রভাবে সবই দুষ্টু-আমেরিকা মার্কা সম্পর্ক হতে শুরু করে দেয়। যদিও মাতা ও ভগিনীকে বিবাহের চল মিশরীয়দের মতন উন্নত সভ্যতায় সাধারণ ব্যাপার ছিল। তাহলে কী কৃষ্ণের স্ত্রীদের মধ্যে কিছু নারী মিশরীয় ছিল? তাই হয়তো তাদের কাছে ব্যাপারটা স্বাভাবিক ছিল। নাহ, বেশি ভেবে ফেলছি, গল্পে ফিরি।
শাম্ব তার দলবল ও আরও চর্মরোগীদের নিয়ে কটক ঋষির কাছে যায়। কটক ঋষি তাদের বুদ্ধি দেয়, “সূর্যপুজো করো। চন্দ্রভাগা নদীর তীরে গিয়ে।”
সমরেশ বসু মহাশয় শাম্বকে নিয়ে রীতিমতন রিসার্চ করে তার অমর কীর্তি ‘শাম্ব’ সৃষ্টি করেন। সেখান থেকে আরও কিছু জায়গা থেকে খুঁজে দেখলাম, এই চন্দ্রভাগা নদী, বর্তমান উড়িষ্যায় আছে, আবার চেনাব নদীকেও ‘চন্দের ভাগা’ বলা হত। উড়িষ্যায় চন্দ্রভাগার নিকটবর্তী সূর্যমন্দির হল কোনারক। অনেকে বলে কোনারক মন্দির শাম্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু কোনারক কথাটাই এসেছে ‘কোণ + অর্ক’ থেকে। জায়গাটা আগে থেকেই ‘অর্ক ক্ষেত্র’ বলে পরিচিত ছিল। সুতরাং শাম্বর ‘চন্দ্রভাগা’ নদীর সম্ভবত ওই চেনাব নদীই ছিল।
সেখানে শাম্ব সূর্যদেবের পুজো করে কুষ্ঠরোগ থেকে নিরাময় পায়। শাম্ব আর তার দলবল গোটা ভারতে ঘুরে বিভিন্ন জায়গায় সূর্যক্ষেত্রগুলো প্রদক্ষিণ করে। আসলে সূর্যের সঙ্গে চর্মরোগের একটা সম্পর্ক ছিলই। সূর্যের রশ্মি থেকে যে বিভিন্ন চর্মরোগ হয়, এবং বারো আদিত্য যে আসলে বিভিন্ন চর্মরোগ ও তার নিরাময়ের সঙ্গে যুক্ত, সেটা নিয়ে বিস্তর লেখালিখি হয়েছে।
(এই উপরের দুটো পরিচ্ছেদের জ্ঞানের জন্য আমি সুলেখক ও প্রকাশক শুভব্রত বসুর কাছে ঋণী। তিনিই আমায় শাম্ব চিনিয়ে দিয়েছেন।)
শাম্ব দ্বারকাতে ফিরে আসে। ততদিনে বোধহয় মহাভারতের যুদ্ধ হয়ে গেছে, কারণ যুদ্ধে শাম্ব ছিল না। আবার যুদ্ধের সময় বলরামও তীর্থে গেছিল। এরকমটা হতেই পারে যে বলরাম হয়তো শাম্বর সঙ্গেই তীর্থক্ষেত্রগুলোয় ঘুরছিল। যা-ই হোক, শাম্ব বাড়ি ফিরে আসে, আর বেশ কিছুদিন গুডবয় হয়ে থাকে। কিন্তু স্বভাব যাবে কোথায়? কিছুদিন যেতে না যেতেই শাম্বর মধ্যে আবার অহংকার চেপে বসে। এটা শুধু শাম্বর মধ্যে নয়, সম্ভবত যাদব গোষ্ঠীর মধ্যেও অহংকার এসেছিল। তারা কৃষ্ণের বংশের লোক। আবার কৃষ্ণের দ্বারা সুরক্ষিত। এতবড় যুদ্ধ হয়ে গেল, এত বড় আর্যবর্ত এদিক থেকে ওদিক হয়ে গেল, কিন্তু যাদবদের উপরে একটা কালিপটকাও ফাটল না। ফেসবুকের ‘ভীর’দের মতন তারা রবিবার দুপুরে মাংস-ভাত খেয়ে দূর থেকেই যুদ্ধ দেখল আর সাপোর্ট করল। কৃশণ, সাত্যকি, যুযুধান আর কৃতবর্মাসহ কয়েকজন যাদব ছাড়া বাকি আর কেউই দ্বারকা ছেড়ে নড়েনি। তাই তাদের মধ্যে একটা অহংকার জন্ম নিয়েছিল, যে তারাই সর্বেসর্বা।
আবার ততদিনে অসুরদের মেরেছে। বজ্রনাভ, বাণাসুর, নিকুম্ভ সহ অনেককেই মারার সময় তারা দেখেছে যে স্বয়ং ইন্দ্র তাদের সাপোর্টে। ইন্দ্রের সাপোর্টে ও কৃষ্ণের দাপটে, দ্বারকাতে কাউকে কিছু বলার ক্ষমতা ছিল না কারোর। সে দেবতা, ঋষি, মানুষ, অসুর যেই হোক না কেন। সেই আদরেই একেকটা বাঁদর তৈরি হয়, এরকমটা ভাবাই যায়। এবং ধরাকে সরা জ্ঞান করে সড়াৎ করে একদিন কেস খেল। দ্বারকাতে একদিন এমনিই ঘুরতে আসে বিশ্বামিত্র ঋষি, কণ্বমুনি আর নারদ। বিশ্বামিত্র আর কণ্বমুনির তো বয়সের ডালপালা নেই, কিন্তু নারদ আবার তাদের সঙ্গে ছিল।
এখানে আমার একটা ধারণা আছে। নারদ তো প্রায়ই দ্বারকা যেত। আর এক জায়গায় কেউ বেশি ঘন ঘন গেলে তার সেখানে সম্মান থাকে না। এটা ধ্রুব সত্য। সে মানুষই হোক বা দেবতাই হোক, রোজ রোজ তাকে নিজের বাড়িতে দেখা গেলে কেউই পাত্তা দেয় না। এবং শাম্বরা ছোট থেকেই নারদকে প্রায়ই দ্বারকাতে দেখে দেখে অভ্যস্ত। এরকম অবস্থায় যেটা হয়, সেটাই হয়েছে বলে আমার মনে হয়। শাম্বসহ বাকিরা হয়তো নারদের সঙ্গে একটু আধটু মজা করত। আর সেরকমই তারা বিশ্বামিত্র আর কণ্বের সঙ্গেও করতে যায়।
সরণের বুদ্ধিতে যাদব ছেলেরা মিলে শাম্বকে শাড়ি পরিয়ে দেয়। দিয়ে মেয়ে সাজিয়ে পেটের কাছে কাপড়ের পুঁটলি দিয়ে নকল গর্ভবতী মহিলা করে দেয়। সেইভাবে শাম্বকে তৈরি করে তারা বিশ্বামিত্র, কণ্ব আর নারদের সামনে এসে বলে, “আরে ঠাকুরমশাইরা, নমস্কার ”
“কী ব্যাপার? তোরা আমাদের পথ আটকাস কেন?” বিশ্বামিত্র বলে।
“আজ্ঞে আমাদের কিছু প্রশ্ন ছিল।” জনৈক ফচকে যাদব বলে।
“আমাদের এখন জেবিসি খেলার মুড নেই।” কণ্ব বলে।
“আপনার জন্যও প্রশ্ন আছে কণ্ব স্যার। বলছি শকুন্তলা ঠাকুমাকে যদি আপনি শকুনের ছায়ার তলায় না পেয়ে যদি চড়াই পাখিদের আশ্রয়ে পেতেন তাহলে কি তার নাম চড়ুইতলা হত?”
“অথবা কাকতলা?” আরেক যাদব বলে, “বকতলা, টিয়াতলা, পেঁচাতলা?” কণ্বের মুখ থমথমে হয়ে যায়, কোনোমতে বলে, “আমি যোগবলে জানতে পেরেছিলাম, ওখানে শকুন্তলা আছে।”
“যোগবল হয়, বিয়োগবল হয় না কেন?” আরেক যাদব জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, বিশ্বামিত্র স্যার, শুনেছি আপনি নাকি রাজা ছিলেন?”
“ছিলাম তো,” বিশ্বামিত্র বলে।
“তাহলে স্যার, বশিষ্ঠের সঙ্গে গোরু নিয়ে অত ঝামেলা করলেন কেন? যোগবলেই তো গো-বল বাড়িয়ে নিতে পারতেন। গো-অ্যাজ ইউ লাইক। যেমন খুশি গোরু।”
“আমি গোরু বানাতে পারতাম না হয়তো, কিন্তু কৃষ্ণ দেখছি ভালোই গোরুদের জন্ম দিয়েছে,” বিশ্বামিত্র বলে।
“আহা চটেন কেন? আচ্ছা আপনারা যোগবলে সব জানতে পারেন?”
“তাতে আমাদের অর্জিত ক্ষমতা ক্ষয় হয়।”
“সে একটু হোক আমাদের জন্য, তার পরীক্ষা নেব। তার আগে, বলুন দেখি একে একে কী হয়।”
“দুই।”
“নাহ হল না… একে একে কোথাও লোকেরা ঢোকে। যেখানে একসঙ্গে পাশাপাশি ঢুকতে পারে না। আচ্ছা বলুন দেখি, দুয়ে দুয়ে কত হয়?”
কণ্ব বোঝে ত্যাঁদড় ছেলেগুলো ঘুরিয়ে প্রশ্ন করছে, তাই সে উত্তর দেয়, “দুয়ে দুয়ে দুধ হয়।”
“ধুস, দুয়ে দুয়ে চার হয়, তাও জানেন না?” ফচকে যাদব বলে, “আচ্ছা চারে চারে কী হয়?”
দুই ঋষি গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকে। অন্য যাদব বলে, “বলুন না”
“আট,” বিশ্বামিত্র বলে।
“হয়নি, হয়নি, চারে চারে মাছ আসে। চার ছড়ালে। হিহিহি” যাদব লোকেরা হেসে গড়িয়ে পড়ে।
“আমাদের যেতে হবে,” নারদ বলে, “অনেক হয়েছে, এবারে পথ ছাড়ো।”
“পথ কি ধরে রেখেছি নাকি? পথ কি কুকুর না বেড়াল, যে তাকে ধরে রাখব? এই তো পথ!” আরেকবার হাসির রোল ওঠে।
“আমরা ফিরে যাচ্ছি,” বলে বিশ্বামিত্র আর কণ্ব ঘুরে যায়। তখন সরণ বলে, “আরে দাঁড়ান দাঁড়ান, আপনাদের যোগবলের ভোগ দেখিয়ে যান!”
এই বলে গর্ভবতী নারী সাজা শাম্বকে সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলে, “বলুন দেখি বিশুকাকু আর কনকাকু, এই মেয়েটা পুত্রের জন্ম দেবে না কন্যার?”
বিশ্বামিত্র আর কণ্বের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে ততক্ষণে। দাঁত কিড়মিড় করে কণ্ব বলে, “ওরে ধনীপিতার বখে যাওয়া উদগান্ডু বোকাচোদা চুদেচাটবাবুঘাট হওয়া পুরুষরেন্ডীগুলো, আমরা ঠিকই বুঝেছি ওটা কৃষ্ণের বখাটে ছেলে শাম্ব, আর তার পেটে জাম্বো সাইজের পুঁটলি রেখে ডাম্বোগিরি করছে। এই বিশু, দে তো একটা অভিশাপ ঠুকে!”
বিশ্বামিত্র ততক্ষণে কমণ্ডলু থেকে জল নিয়ে মন্ত্র পড়তে শুরু করেছে। দুম করে জল ছিটিয়ে বলে, “এই নে, অভিশাপ দিলাম, ওই শাম্বই লোহার দণ্ড প্রসব করবে!”
“অ্যাঁ?” শাম্ব লাফিয়ে ওঠে, “বাট হাউ? আমি তো ছেলে”।
“তাতে কী? অভিশাপ ফলবেই,” কণ্ব বলে, “আমি আরও অভিশাপ দিচ্ছি, ওই দণ্ডই তোদের ভণ্ড সাজের সাজা হবে। ওই দণ্ড থেকেই বৃষ্ণি, অন্ধক, ভোজসহ যাদবদের অধিকাংশ ভোজবাজির মতন উবে যাবে!”
“দ্বারকা জলের তলায় চলে যাবে, সেই অভিশাপও দিলাম,” বিশ্বামিত্র বলে।
“আর দ্বারকার নারীদের ডাকাতরা তুলে নিয়ে যাবে।” কণ্ব বলে।
“থামুন থামুন স্যার,” নারদ বলে ওঠে, “এই রেটে অভিশাপ দিতে থাকলে তো যাদবদের ভিটে-মাটি চাঁটি হয়ে যাবে!”
“আর বাকি কী রইল?” শাম্ব বলে, “চলো হে সবাই, বাটি হাতে বসার আগে ঘাঁটি খুঁজি। বাবাকে বলি গিয়ে, তারপরে দেখি কোন পথে হাঁটি।”
ওদের বলার আগেই বিশ্বামিত্র, কণ্ব আর নারদ গিয়ে কৃষ্ণকে সব বলে দেয়।
কৃষ্ণ বলে, “আর কিছু বাকি রাখেননি দেখছি। একেবারেই গেল তাহলে!”
“কিছু উপায় ছিল না, তখন মাথাটা এমন ফট করে গরম হয়ে গেল,” বিশ্বামিত্র বলে।
কৃষ্ণ ঋষিদের কিছু বলতে পারে না। কীই বা বলবে? দোষ তো তার ছেলেপুলেদেরই। আর গান্ধারীর অভিশাপ সহ এত লোকের মৃত্যুর পাপ, তার ফল কোথায় যাবে? কৃষ্ণ সবাইকে ডেকে বলে, “অভিশাপ যখন দিয়েইছে বিশ্বামিত্র আর কণ্ব, তখন সেটা ফলবেই। শুধু দেখি সেটাকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করা যায় নাকি?”
“আমার কী হবে?” শাম্ব বলে “তলপেটে কেমন যেন ভারী ঠেকছে!”
“এই কে আছিস?” কৃষ্ণ বলে, “এক্ষুনি শাম্বকে হাসপাতালে প্রসূতি বিভাগে ভর্তি করে দে। অভিশাপ ফললে, কাল ভোরের দিকেই আমার লোহার দণ্ড নাতি হবে।”
কয়েকজন ওয়ার্ডবয় স্ট্রেচারে করে শাম্বকে নিয়ে চলে যায়। শাম্ব চেঁচাতে থাকে, “কিন্তু বেরোবে কোথা থেকে?”
“সি-সেকশন করে বের করবে হতভাগা,” বভ্রু বলে, “এদিকে বংশ গোল্লায় যেতে বসেছে, ওদিকে উনি চিন্তা করছেন কোথা থেকে রড বের করবে!”
পৃথিবীর ইতিহাসে বোধহয় এরকম প্রথমবার হল যে, কাউকে শরীরের বাইরে থেকে দণ্ড প্রোথিত না করে, অভিশাপের বংশদণ্ড দিয়ে শরীরের ভিতর থেকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। যারা বোঝার তারা ঠিকই বুঝে যাবেন আমি কী বললাম।
তার পরেরদিনই শাম্বর পেট কেটে একটা লোহার দণ্ড বের করা হয়। এটাকে মুষল বলা হয়। মানে মুগুর। তবে পেট থেকে অতবড় মুগুর বেরিয়েছিল কি না সন্দেহ হয়। হয়তো বেরোবার পরে সেটা বড় হয়েছিল। শাম্বর পেট থেকে র্যাম্বোর রডের মতন মুগুর বেরোতেই সবাই ভয় পেয়ে যায়। কেউ কোনোদিন শুনেছে যে পুরুষ গর্ভবতী (এ ক্ষেত্রে গর্ভবান) হয়েছে? শেষবার এরকম প্রেগন্যান্ট হয়েছিল মান্ধাতার বাবা যুবনাশ্ব রাজা। ওই ইক্ষ্বাকু বংশেরই রাজা। তাও সে মান্ধাতার জন্ম দিয়েছিল। আর শাম্ব জন্ম দিল মুগুরের। যেমন কুকুর তেমনি মুগুর। যেমন মুগুর তেমনি হুজুর। আর মজা করতে যাবে পাওয়ারফুল ঋষিদের সঙ্গে, নাও এবার ঢেঁকি গেলো। ঢেঁকি নয়, কিন্তু কাছাকাছি।
সেই লোহার মুগুর নিয়ে ডাক্তাররা কৃষ্ণের কাছে নিয়ে এসে বলে, “বধাই হো, আপনার মুগুর নাতি হয়েছে!”
কৃষ্ণ বলে, “মশকরা করার জায়গা পাওনি?”
প্রদ্যুম্ন বলে, “কী আর করব? ঋষিদের শাপ অনুযায়ী এখন বাপরে বাপ বলে ডাক ছাড়তে ইচ্ছে করছে। মস্তি করল শাম্ব, আর শাস্তি পেলাম আমরা। এখন এই মুগুর নিয়ে কী করি? এটা দিয়েই তো শুনলাম আমাদের বংশ ধ্বংস হবে!”
“আমি তো রাজা নই,” কৃষ্ণ বলে, “রাজা হল উগ্রসেন, তাকে জিজ্ঞেস করো কী করা উচিত।”
সকলে মিলে মিছিল করে রাজা উগ্রসেনের কাছে যায়। সেই উগ্রসেন মানে কংসের বাবা, তখনও বেঁচে ছিল। আন্দাজ তার বয়স তখন দেড়শোর বেশি। তার কাছে গিয়ে প্রদ্যুম্ন সহ বাকিরা বলে, “ও দাদু রাজা… এই মুগুর নিয়ে কী করব?”
“অ্যাঁ? মাগুর? কোথায় পেলি?” বৃদ্ধ কালা রাজা বলে।
“মাগুর নয়, মুগুর… মু-গুর…”
“হাতে কালোমতন কী এনেছিস? আজকাল চোখে দেখি না। ওটাই কি গুড়ের বয়াম?”
“নতুন গুড়?”
“ধ্যাত্তেরি, আমার হাতে কি গুড় দেখতে পাচ্ছ?”
গোটা মুগুরটাই বিরক্ত হয়ে উগ্রসেনের কোলে বসিয়ে দেওয়া হয়। উগ্রসেন হাঁউমাউ করে ওঠে, “ওরে বাবা রে,অ্যাঁ আমার উপরে ডাম্বেল চাপাল কে রে? ডাম্বেলের চোটে আমার বেল ফেটে যাচ্ছে!”
ডাম্বেল তুলে হাম্বেলভাবে এক যাদব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গোটা ঘটনা শোনায়। সব শুনে উগ্রসেন বলে, “বটে? ঋষির কোপের তোপের জোরে মুগুরে বংশলোপ পাবে? কভি নেহি। এই মুগুরকে গুঁড়ো করে জলে ভাসিয়ে দাও। লৌহচূর্ণে নদীপূর্ণ হোক। আমাদের ফাঁসিয়ে দেওয়া? সব ভাসিয়ে দেব…”
কথাটা সকলেরই মনে ধরে। তাই মুগুর গুঁড়ো করা শুরু হয়। ভীষণ উৎসাহে ও তেজে মুগুর ভেজে দেওয়া শুরু হল। আক্ষরিক অর্থেই মুগুর ভাঁজা হল। গ্যাঁগোঁ করে গ্রাইন্ডার চালিয়ে মুগুর গুঁড়ো শুরু হল। কিন্তু সময়সাপেক্ষ কাজ। আর সেরকম যে-কোনও কাজেই উৎসাহ বেশিক্ষণ থাকে না মানুষের। যারা উৎসাহিত হয়েছিল, তারা অন্যের উপর দায়িত্ব দিয়ে বাড়ি গেল। যারা দায়িত্ব পেল, তারা দায়িত্বসহকারে তাদেরও অধঃতন লোকেদের সেই দায়িত্ব দিল। এইভাবে দায়িত্ব আরও কয়েক হাত ঘুরে শেষে কজন ল্যাদখোর লোকের হাতে পড়ল। তারা অত অভিশাপ টভিশাপ জানে না। জানলেও মানে না। মানলেও বোঝে না। তারা অর্ধেক মুগুর গুঁড়ো করে বাকি মুগুরটা জলে ফেলে দিল। কে অত দেখতে যাচ্ছে? বাকি গুঁড়োগুলোও বেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জলাঞ্জলি দেওয়া হল।
আপাতত এখানেই এই পর্বের গল্পে রাশ টানি। কারণ এরপরে যেটুকু গল্প আছে সেটা কৃষ্ণের ছেলেপুলেদের গল্প নয় ঠিক। সেটা হল বংশের ধ্বংস হওয়ার গল্প। সেখানে কিছু আলোচনা আছে। আপাতত শাম্বর এই মুষল-প্রসব নিয়ে আমার একটি প্রশ্ন আছে। সেটি হল, শাম্ব পুরুষ হয়ে কী করে গর্ভধারণ করল? বায়োলজিক্যালি কী করে সম্ভব? আর গর্ভধারণ করলেও পেট থেকে মুগুর বেরোয় কী করে?
এবারে আমরা আবার সেই চিরাচরিত প্রথায় ফিরে যাব। যে প্রথায় আমরা পুরাণের যে-কোনো ঘটনাকে দুটি দৃষ্টিকোণে দেখি। প্রথম হল ভক্তির আলোয়, এবং দ্বিতীয় হল রূপকের আলোয়। রূপক নামের কেউ টর্চবাতি জ্বেলে আলো দেখাবে না। রূপক হল একটা বড় ঘটনাকে কাব্যিক বা ধার্মিকভাবে অন্য গল্প করে দেখানো। ঘটেছিল এক, গল্প হয় আরেক। গল্পের মধ্যে অন্তর্নিহিত হয়ে থাকে আসল ঘটনা।
ভক্তির আলোয় দেখলে সবই সম্ভব। অভিশাপে শাম্ব মুগুর প্রসব করল, আর সেই মুগুরে যদুবংশ ধ্বংস হল। কৃশণের বাল্যকালের লীলা থেকে শুরু করে প্রচুর দৈবিক কার্যকলাপ পড়ে এই মুগুর-প্রসব খুব একটা অবাক করে না। সেখানে সন্দেহ করা যায় না। যে কৃষ্ণ পাহাড় তুলেছিল, তার পুত্র একটা মুগুর পয়দা করতে পারবে না? হতেই পারে।
কিন্তু রূপকের দিক দিয়ে যদি দেখি, তাহলে অনেককিছুই সন্দেহ আসে মনে। যা বলতে যাচ্ছি, সেগুলো একান্তই আমার পাপী মনের সন্দেহ, এবং সেগুলোর কোনও প্রমাণ নেই। আমি শুধু উৎসুক হয়ে এই মুগুর প্রসব নিয়ে ভাবছিলাম, আর তখনই মনে হল- শাম্ব উভয়লিঙ্গ ছিল না তো?
এ প্রশ্ন শুনেই অনেকে হাঁ হাঁ করে তেড়ে আসবেন। কী সাংঘাতিক অ্যালিগেশন শাম্বর মতন চরিত্রের নামে। তাই না? সে পাপী হতে পারে, কুলাঙ্গার হতে পারে, কিন্তু উভয়লিঙ্গ? কভি নেহি। কিন্তু আমি এরকম ভাবলাম যে, তার পিছনে দুটি কারণ আছে। প্রথম কারণ, ওই মুগুর প্রসব করা। প্রসব করতে গেলে বায়োলজিকালি শরীরে মহিলা অংশ থাকতেই হবে। ইউটেরাস না থাকলে শিশু বা মুগুর কোথায় ধারণ করবে? মূত্রথলিতে? যে শারীরিক বস্তুগুলো মহিলাদের মধ্যে ইউটেরাস ও ফ্যালোপিয়ান টিউব তৈরি করে, সেগুলো পুরুষের শরীরে একদম ছোট হয়ে যায়, বা থাকেই না। সুতরাং বায়োলজিক্যালি অসম্ভব। অভিশাপে তাহলে শাম্বকে আগে মহিলা হতে হয়েছে, তারপরে মুগুর ধারণ করতে হয়েছে।
দ্বিতীয় কারণ হল, কৃষ্ণ শাম্বকে শিব-পার্বতীর অর্ধনারীশ্বর রূপের তপস্যা করে পেয়েছিল। অর্ধনারীশ্বরই কেন? এর তাৎপর্য কী? পুরো মহাভারতে শিবঠাকুর অর্ধনারীশ্বর রূপে কাউকে এসে দেখা দেননি। শাম্বকে দান করার সময়েই কেন? এটা কি প্রচ্ছন্নভাবে পুরাণকার একটি হিন্ট দিয়ে গেছেন শাম্বর উভয়লিঙ্গ হওয়ার? হতেই পারে… না-ও হতে পারে। আমি কে বলার? আমি শুধু রাত বারোটার পরে হিস্ট্রি চ্যানেলের মতন সন্দেহ করি। বুঝলেন না? রাত বারোটার পরে হিস্ট্রি চ্যানেল এমন প্রোগ্রাম চালায় যেগুলো দেখলে মনে হবে মানুষের উন্নতি ও বিবর্তনের সমস্ত কারণই হল ভিনগ্রহীরা।
যা-ই হোক, আমার সন্দেহকে আমল না দিলেও হবে। তবে যদি দিয়েছেন, তাহলে আপনারা এবার আমাকে প্রশ্ন করবেন যে শাম্ব যদি উভয়লিঙ্গ ছিল, তাহলে মুগুরই জন্ম দিল কেন? এটার র্যাশনাল ব্যাখা কী? রেশনের চালের মতন জালি লজিক দিয়ে কি সবকিছু হয়? তবুও আমি ব্যাখা দেব এই মুগুরের। তবে যদুবংশের ধ্বংস হওয়ার গল্প বলার পরে। তখন আপনারা মেলাতে পারবেন। এবারে সেই কাহিনি শোনাই।
