কৃষ্ণ: একটি জীবনের ছবি
কৃষ্ণ…
শব্দ বা নামটা লিখে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। এই শেষ পর্বটা কীভাবে লিখব বুঝতে পারছিলাম না। কীভাবে সাজিয়ে তুলব সেটাও মাথায় আসছিল না। বইয়ের শুরুটা যেভাবে করেছিলাম, বা কৃষ্ণের কীর্তি বলার সময় যেভাবে কৌতুক মিশিয়ে লেখা এগোচ্ছিলাম, সেই গতিতে যতি পড়ে গেল এই শেষ পর্বে এসে।
না, আমি দুঃখ পাচ্ছি না, বা আবেগপ্রবণ হয়ে এরকম লিখলাম, সেটা না। আসলে মনে ও মাথায় প্রচুর বিষয় ও প্রশ্ন চলে আসছে। কীভাবে সেই এলোমেলো ভাবনাগুলো কেলো না করে গুছিয়ে বলব সেটাই ভাবছিলাম।
থাক, অত ভাবনার দরকার নেই। কবি বলেছেন, “সখী, ভাবনা কাহারে বলে।” তার মানে, ভাবনা ইজ ইক্যুয়াল টু ‘কাহারে’। কাহারে অর্থ কাকে। ভাবনার অর্থে ‘কাকে’। কাকে কান নিয়ে গেছে, তাই কাকের পিছনে ছুটছে, এইরকম একটি প্রবাদ আছে। এখানে ‘কাকে’ কথাটি তার মানে ‘ভাবনা’ দিয়ে রিপ্লেস করলে প্রবাদটি দাঁড়ায়, ভাবনা কান নিয়ে গেছে, তাই ভাবনার পিছনে ছুটছে। ভাবনা কান নিয়ে যাওয়ার অর্থ এইপ্রকার হতে পারে যে, প্ৰচণ্ড চিন্তা করার সময় মানুষ কিছু শোনে না। তবে তার জন্য ভাবনার পিছনেই ছোটা, এর মানে হল, আপাত বধির হয়ে চিন্তার পিছনে ছুটে বেড়ানো।
ভাবছেন, লেখকের মাথাটাই শেষপর্যন্ত গেল? কী সব আজেবাজে বকছে, ধুর।
দাঁড়ান, দাঁড়ান, আমার কথাটা শুনে যান। আমার মাথায় যে ভাবনাগুলো চলছে, সেগুলো শুনলে আপনারও মাথা বনবন করে ঘুরবে, আর আপনিও এরকম চন্দ্রবিন্দুর ‘চ’ এর সঙ্গে বেড়ালের তালব্য শয়ের যোগাযোগ খুঁজে বেড়াবেন।
কৃষ্ণের শেষ সময়টা দিয়েই আলোচনা শুরু করি। এই বিষয়ে সবথেকে ভালো বই হয়তো শ্রী সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের লেখা ‘শ্রী কৃষ্ণের শেষ কটা দিন’। যদিও সেই লেখা শুধু ‘শেষ কটা দিন’ নিয়ে নয়, বরং কৃষ্ণের কর্ম বিশ্লেষণ নিয়ে বেশি লেখা, তবুও লেখার গুণে সে এক অমূল্য সম্পদ। আমি বরং ওই শেষের সময়টা নিয়ে একটু বলি, এবং তার সঙ্গে যে কয়েকটা কথা-উপকথা জুড়ে আছে, সেগুলো আলোচনা করি আগে। সঙ্গে যে প্রশ্নগুলো নিয়ে আমি কনফিউশনে কনফুশিয়াস হয়ে বসে আছি, সেগুলোও বলব।
জরা ব্যাধের তিরে কৃষ্ণের তীরে এসে তরী ডোবে, সে কথা বলেছি, কিন্তু জরার জোরদার তির কী করে এল সেটা বলিনি। সেই যে সেই মুগুর গুঁড়ো করার কথা বলেছিলাম, তখন যারা গুঁড়ো করছিল, তারা মুগুরের অনেকটা গুঁড়ো করে বাকি কিছুটা অংশ জলে ফেলে দেয়। সেটা একটা মাছ খেয়ে ফেলে। মহাভারত ও তার আগের সময় মাছে প্রায়ই অনেককিছু খেয়ে ফেলত। মানুষ থেকে শুরু করে বীর্য, লোহা, আংটি সবই খেয়ে ফেলত। একেবারে গিলে ফেলত। শিবরাম স্যারের যেমন বলেছিলেন, সেই কথা ধার করে যদি বলি, তাহলে ওই মাছগুলো প্রথমভাগের গোপালের মতন ‘যাহা পায় তাহাই খায়’ মুডে থাকত। এবং তাদের পেটে হজম হত না। হজম না হলে খাওয়ার কী দরকার বাপু? আর যে মাছ ছেলেপুলে গিলে নেয়, তাদের আবার জেলেরা ধরত। মানে অতবড় মাছ ধরার মতন জেলে ছিল যখন, তখন নৌকাও ছিল আর সামুদ্রিক বাণিজ্যও ছিল। কিন্তু মহাভারত সেসব পাত্তা দেয় না।
গোটা রামায়ণ আর মহাভারত জুড়ে কোথাও নৌ-সেনা নেই। কেন? কারণটা হয়তো এই যে, পুরাণকারেরা সমুদ্র ব্যাপারটা সম্বন্ধে সেরকম অবগত ছিলেন না। তারা শুধু জানতেন সমুদ্রের তলায় মাছ থাকে, দানব থাকে আর দামী দামী মণিমুক্তো থাকে। তাই তো সমুদ্র পেরোতে তারা নৌকো বা জাহাজের বদলে সেতু আর ব্রীজ বানানো নিয়ে লিখতেন। যা-ইহোক, সেইসব পেল্লায় মাছেদের পেট কেটে প্রায়ই পেট কাটা মূর্ধন্য ষ-য়ের মতন সবকিছু বেরিয়ে আসত। আমার ধারণা মাছের পেট কেটে প্রদ্যুম্নকে পাওয়ার যে গল্পটা আছে, সেটাকেই ঝেঁপে দিয়ে পরে বাইবেলে জোনাহর চরিত্রটা লেখা হয়। সে তিমি মাছের পেটে ছিল কিছুদিন। পরে আবার তার থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে (সম্ভবত) পিনোক্কিও চরিত্রটিও তিমির পেটে থাকে। যা-ই হোক, গল্পে ফিরি।
তো সেইরকম পেল্লায় মাছের জেল্লাদার পেট কেটে জরা লোহার টুকরো পায়, আর সেটা দিয়েই তিরের ফলা বানায়। কৃষ্ণকে হরিণ ভেবে জরা সেই তিরই চালায় এবং সেটি এসে কৃষ্ণের পায়ে লাগে। জরা এসে অশ্রুভরা নয়নে বহু ক্ষমা-টমা চায়, আর কৃষ্ণ তাকে ক্ষমা করেও দেয়। কিছু কিছু সংস্করণ বলে, জরা হল বালির পুনর্জন্ম। বালি-সিমেন্ট নয়। বালি স্টেশন বা বিদেশের জায়গাও না। ওগুলো জন্ম নেবে কী করে? বালি মানে সুগ্রীবের দাদা। সেই রামায়ণে যাকে রামচন্দ্র আড়াল থেকে তির মেরে মার্ডার করেছিল। আমি ‘বধ’ বলব না। বালি এমন কিছু অন্যায় করেনি যে তাকে বধ করতে হবে। ওটা সুগ্রীবকে সিংহাসনে স্থাপন এবং কিষ্কিন্ধ্যাকে অযোধ্যা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার একটি রাজনৈতিক চাল ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
রামায়ণে বালি মৃত্যুপূর্বে প্রচুর প্রশ্ন করেছিল রামকে, এবং এটাও জিজ্ঞেস করেছিল, কেন তাকে এরকমভাবে মারা হল। তাতে রাম প্রচুর হেজিয়েছিল ধর্ম-টর্ম বলে, কিন্তু কোনো উত্তরই ওই অন্যায়কে জাস্টিফাই করতে পারেনি। সম্ভবত এই একটি ঘটনা পুরাণকারদেরও গলায় কাঁটার মতন বিধত। রামের শম্বুক হত্যা নিয়ে তারা অত চিন্তিত ছিল না। নীচু জাতির লোকের মার্ডার যে কালে কালে লোকে ভুলে যাবে সেটা পুরাণকারেরা জানত। কিন্তু বালির মার্ডার ? বালি তো ক্ষত্রিয় ছিল, ইন্দ্রপুত্র ছিল, শক্তিধর ছিল, সমুদ্র মন্থনে দেবতাদের সাহায্য করেছিল, আবার রাবণের সঙ্গে ভালোই বোঝাপড়া ছিল। তাকে রামের এরকম ভাবে খুন করাটা পুরাণকারেরাও ভালোভাবে নিতে পারেনি। আরে, সবকিছু কি ধর্মের লেবেল সেঁটে চালানো যায় নাকি? তাই কৃষ্ণের মৃত্যুর হেতু হিসেবে জরার আবির্ভাব, এবং জরাকে বালির পুনর্জন্ম বলে দেওয়া। সন্দেহ হয় এখানেই যে, যেখানে মহাভারত-গীতা ও বেদে এত আত্মার কর্মফল নিয়ে কথা হয়েছে, সেখানে বালি এত পুণ্যাত্মা হয়েও কেন সাধারণ ব্যাধ হয়ে জন্মাল? শুধুই কি কৃষ্ণকে মারতে? ব্যাধ, অর্থাৎ তৎকালীন সমাজের নীচুজাতির মানুষ । তাকে জীবনধারণ করা জন্য জীবের শিকার করতে হত। তার প্রমাণ মাছ ও হরিণ ধরার কথা। বালি, যে এত দেবতাদের সঙ্গে মিশল, এত কাণ্ড করল, ইন্দ্রের ছেলে ছিল, সে কিনা পরের জন্মে একটি নীচুজাতির সাধারণ ব্যাধ হল?
তাহলে কর্মফলের অর্থ কী? আমাদের তো তাহলে চান্সই নেই। পরের জন্মে মশা, মাছি, আরশোলা, টিকটিকি হয়ে জন্মাব।
জরাকে নিয়ে একটু বেশিই জড়াজড়ি করে আলোচনা করলাম, কিন্তু এটা তো মানতেই হবে যে জরার জোরালো তিরে কৃষ্ণের প্রাণ বেরিয়েছিল। প্রশ্ন আসে, কৃষ্ণ, যে কিনা মহাভারত আর হরিবংশে প্রায় সুপারহিউম্যান গোত্রের ছিল, সে ওরকম প্যাঁক করে তির খেয়ে, ঘ্যাঁক করে মরে গেল? অত বড় বীর, অমন উন্নত শির নিয়ে সামান্য একটা তিরের ঘায়ে মরে গেল? এটাও বোধকরি পুরাণকারদের মনে সন্দেহ জাগায়। রামের মতন যদি কৃষ্ণ স্বেচ্ছায় জলসমাধি গ্রহণ করত, তাহলেও নাহয় মানা যেত যে, সে নিজ ইচ্ছেয় সে মৃত্যুবরণ করেছে, কিন্তু এইভাবে একটা তির লেগে, (তাও আবার পায়ে) মারা গেল?
পুরাণকারেরা তাই মহাভারতের অনুশাসন পর্ব ঘেঁটে এর কারণ বের করলেন। সেই ঘটনাটা বলি। কৃষ্ণ আর রুক্মিণীর বিবাহনুষ্ঠানে সমস্ত মান্যগণ্য (ও জঘন্য) মানুষের নেমন্তন্ন ছিল। তাদের মধ্যে ঋষি দুর্বাসার নেমন্তন্নও ছিল, কিন্তু সেদিন সে যেতে পারেনি। অন্য কোনো বিয়ে বাড়ির নেমন্তন্ন ছিল হয়তো। তাই বিয়ের পরে একদিন কৃষ্ণ-রুক্মিণী দুর্বাসার কাছে গিয়ে বলে, “আপনি তো স্যার বিয়েতে আসেননি, খাওয়াদাওয়া তো চরম হয়েছিল। কিন্তু আপনার কপালে জুটলনা। আপনি আমাদের ওখানে গিয়ে কদিন থাকবেন চলুন।”
দুর্বাসা তো তেমনি পাগলাটে লোক ছিল। কখন যে কী তার মাথায় খেয়াল আসে, ভগবানই জানেন। সে দুম করে বলে বসে, “আমি তো এমনি এমনি যাব না!”
“তাহলে কেমনি যাবেন?” কৃষ্ণ বলে।
“আমি রথে যাব,” দুর্বাসা বলে।
“এই আমার সংগ্রহের দশরকম লেটেস্ট মডেলের রথ আছে। আপনার যেটায় ইচ্ছে চড়ে বসুন,” কৃষ্ণ বলে।
“ইঁহ, আমি কী এলেবেলে কেউ নাকি যে খেলেখেলে রথে চেপে যাব?” দুর্বাসা বলে- “আমি ঘোড়ায় টানা রথে চাপব না।”
“কীসে টানা রথে চাপবেন?” কৃষ্ণ বলে, “হাতি, উট, গন্ডার, জিরাফ, বুনিপ, ডাইনোসর টানা রথে চাপবেন? নাকি কলিকাল থেকে ডিজেল-পেট্রোল-ব্যাটারি ইঞ্জিন এনে চালাব?”
“আমি মানুষে টানা রথে চাপব,” গোঁ ধরে গোঁ-গোঁ করে বলে দুর্বাসা। বোধহয় তার নেমন্তন্ন বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। এসব উলটোপালটা আবদার করে কাটাতে চাইছিল।
কিন্তু কৃষ্ণ বলে, “বেশ তো, আমার এত দাস, সবাই মিলে দাস-অটো চালিয়ে নিয়ে যাবে।”
“যে কেউ চালালে হবে না। তোমার বউকে সেই রথ টানতে হবে,” দুর্বাসা বলে।
“অ্যাঁ? নেমন্তন্ন করতে এসে বউ রথ টানবে?” কৃষ্ণ বলে।
“কেন? আপত্তি আছে?” দুর্বাসা বলে।
কৃষ্ণ ভাবে, এই বুঝি একটা অভিশাপ ঝেড়ে দিল ঋষি। তাই সোনামুখে রুক্মিণীকে বলে, “যাও, রথ টেনে দুর্বাসাকে নিয়ে এসো।”
রুক্মিণী আকাশ থেকে পড়ে। কেউ কোনোদিন শুনেছে, সদ্য বিয়ে হওয়া বউ, তারই বিয়ের নেমন্তন্ন করতে এসে, অতিথিকে রথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? এরকম কাজ তো অত্যাচারী শাশুড়িও করে না। দুর্বাসা অবশ্য এরকমটা প্রথমবার করেনি। আঠেরো পুরাণ জুড়ে মাঝেমাঝেই তার এরকম খামখেয়ালিপনা দেখতে পাওয়া যায়। কেন বাপু? তুমি নাহয় ঋষি। তোমায় নেমন্তন্ন করতে এসেছে, তাই বলে তুমি এরকম নিজের ফ্যান্টাসি চরিতার্থ করবে?
কিন্তু মনে রাখতে হবে, ওটা দ্বাপরযুগ ছিল। কৃষ্ণ আর রুক্মিণী মুখ বুজে দুর্বাসার শর্ত মেনে নেয়, আর রুক্মিণী রথ টানতে শুরু করে। দুর্বাসা আবার রথের উপর দাঁড়িয়ে রুক্মিণীকে চাবুক মারতে মারতে ভিলেনের মতন হাহাহাহা করে হাসে। কোন জন্মের কী প্রতিশোধ নিচ্ছিল সেই জানে। রুক্মিণীই বা রথ টানল কী করে? সে যুগে মানুষ যতই লম্বাচওড়া হোক, রুক্মিণী তো ঘোড়া নয় রে বাবা। একটা আন্দাজ আশি-নব্বই কিলোর ঋষি সহ একটা দেড় টনের রথ টানা কী সহজ? হয়তো কৃষ্ণ কিছু একটা সাহায্য করেছিল, যার জন্য রুক্মিণী রথ টানতে পেরেছিল।
কিন্তু এরইমধ্যে রুক্মিণীর জলতেষ্টা পায়, আর কৃষ্ণ সেটা বুঝে মাটিতে আঙুল ভরে জলের ফোয়ারা বের করে দেয়। রুক্মিণী সেই আনফিল্টার্ড, মেঠো, স্যালমোনেলা ভর্তি জল খেয়ে ফেলে। তখনকার দিনে জলস্তর বোধহয় মাটির কয়েক আঙুল নীচেই ছিল। তাই যখন তখন আঙুল ভরলে, খুঁড়লে বা তির মারলেই জলের ধারা ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসত। সেই ধারাতেই হৃদয় ধুচ্ছিল রুক্মিণী, কিন্তু দুর্বাসা রেগে ফায়ার।
তার পারমিশন ছাড়া রুক্মিণী জল খায় কী করে? কীরকম পাজি আর কুটকুটে বুদ্ধি যুক্ত লোক ছিল এই দুর্বাসা, ভাবুন। দুম করে দুর্বাসা অভিশাপ দিয়ে দেয়, “তুই আর কৃষ্ণ বারো বছর আলাদা থাকবি!”
বোঝো ঠ্যালা। এরপরে কাউকে নেমন্তন্ন করতে যাওয়ার আগে দশবার ভাবব। নতুন বর-বউ নেমন্তন্ন করতে গিয়ে বিচ্ছেদের সম্মুখীন হল। কেন? কেউ জানে না। শুধু দুর্বাসার ক্ষ্যাপামি, আর কোনো কারণ নেই। যা-ই হোক, এসব অকাজ করতে করতেই দুর্বাসা দ্বারকা এসে পৌঁছায়, আর কৃষ্ণ এর মাঝে কোনোরকম প্রতিবাদ করে না। উলটে দুর্বাসার আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি রাখে না। দুর্বাসা গান্ডেপিন্ডে খেয়ে শেষে বলে, “আমি পায়েস খাব।”
কৃষ্ণ হাততালি দিতে বাটিতে বাটিতে করে পায়েস এসে হাজির হয়। দুর্বাসা ভুরু কুঁচকে বলে, “এতে আমার কী হবে? এইটুকু পায়েস তো আমার দাঁতেও ঠেকবে না। গামলাখানেক নিয়ে এসো।”
কৃষ্ণের ইশারায় এক বাথটব পায়েস নিয়ে আসা হয়। দুর্বাসা তার থেকে কয়েক বাটি খেয়ে বলে, “আর খাব না।”
“যাহ, এতটা এঁটো করলেন?”
“পায়েসটা দেখে খুব লোভ লেগেছিল,” দুর্বাসা বলে, “ভেবেছিলাম খেয়েও ফেলব। কিন্তু আগের মতন হজম শক্তি নাই আর। তাই কম কম খাই। দেখলে না বিশ-কিলো ময়দার লুচি, দুটো পাঁঠা আর চার হাঁড়ি দৈ আর সামান্য ছত্রিশটা রাজভোগ খেলাম শুধু?”
“বটেই তো বটেই তো, খাওয়া কমে গেছে আপনার ভীষণ,” কৃষ্ণ বলে।
“কিন্তু এই পায়েস নষ্ট হবে না,” দুর্বাসা বলে, “এটাকে আমি মন্ত্রপূত করে দিয়েছি। তুমি এতে জুতো খুলে ডুব দাও। দিয়ে গায়ে মাখো।”
কৃষ্ণ সবার সব কথা গায়ে মাখত না ঠিকই, কিন্তু দুর্বাসার মন্ত্র পড়া পায়েস গায়ে মাখল। একদম কাপড়জামা ছেড়ে, ইয়াহু বলে বাথটবের পায়েসে দিল ডুব, শুধু একটা পা বাইরে বেরিয়ে রইল।
দুর্বাসা খুশি হয়ে বর দেয়, “তোমার শরীরে যেখানে যেখান পায়েস লেগেছে, সেখানে সেখানে তুমি অপ্রতিরোধ্য, অবধ্য। ওই সব জায়গায় কোনো অস্ত্র তোমায় কোনো আঘাত করতে পারবে না।”
যাক, বউকে দিয়ে রথ টানিয়ে একটা বরদান দানে পাওয়া গেল। বিয়ের গিফট। কিন্তু ওই একটা পা, যেটায় পায়েস মাখা হয়নি, সেটা দুর্বল হয়ে রয়ে গেল। আর সেই পায়েই, সেই জায়গা দিয়েই যখন জরার তির এসে ঢুকল, সেটাই কৃষ্ণের মৃত্যুর কারণ হল।
এই পায়েস মাখার গল্পটাও কিন্তু একেবারে আনকোরা নতুন নয়। আমরা প্রায় একইরকম গল্প আরও দুটো জায়গাতে দেখতে পাই। প্রথমটা মহাভারতেই আর দ্বিতীয়টা গ্রিক পুরাণে। গ্রিক পুরাণের সঙ্গে মিলটা আগে বলি। ট্রয়ের যুদ্ধের অন্যতম নায়ক ছিল অ্যাকিলিস। সে ছিল মানব রাজা পেলিয়াস ও সামুদ্রিক অপ্সরা-দেবী (নিম্ফের বাংলা করা কঠিন) থেটিসের পুত্র। এই থেটিসের নামেই থেটিস সাগর হয়েছে। অ্যাকিলিস জন্মানোর পর তার মা, তার ঠ্যাং ধরে স্টিক্স নদীতে চোবায়। ওখানে চোবালে মানব শরীর শক্ত হয়ে দেবতার শরীর হয়ে যায়। তখন তাকে কেউ বা কোনোকিছুই কাটিতে পারে না, মারিতে পারে না, জ্বালাইতে পারে না।
অ্যাকিলিস সেই বলে বলীয়ান হয়ে, বনিয়ান (মানে গেঞ্জি) আর টিউনিক জাতীয় যুদ্ধের ড্রেস পরে সবাইকে ঠেস দিয়ে বেড়াত। কিন্তু ওই যে, ঠ্যাং ধরে চোবানোর সময় অ্যাকিলিসের একটা পায়ে গোড়ালি থেকে বাকি পায়ের পাতা চোবানো হয়নি। অ্যাকিলিস ট্রয়ের যুদ্ধে গিয়ে ভয়ের তোয়াক্কা না করে হেক্টরকে মারে। পরিবর্তে বহু যুদ্ধের পর, হেক্টরের ভাই প্যারিস (যার নামে শহর, এবং যে হেলেনের সঙ্গে প্রেম করার ফলে ট্রয়ের যুদ্ধ হয়) অ্যাকিলিসের গোড়ালিতে তির মেরে তাকে প্লাস্টার অফ প্যারিসের মতন জমিয়ে দেয়। অ্যাকিলিসও কৃষ্ণের মতন পায়ের তলার দিকে তির খেয়ে মরে।
দ্বিতীয় মিল মহাভারতেই দেখুন। দুর্যোধনকে অজেয় তৈরি করতে গান্ধারী ডেকে পাঠিয়েছিল। নির্দেশ অনুযায়ী দুর্যোধন একদম নেংটুপুটু হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু পথে কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। কৃষ্ণ তখন পাণ্ডবদের শিবির ছেড়ে ওইখানে কী করছিল কে জানে? দুর্যোধনকে উদোম আলুর গুদোম মার্কা অবস্থায় দেখে কৃষ্ণ জিভ কেটে বলে, “এ বাবা, দেখে ফেলেছি!”
দুজনে বেয়াই হয়, আবার দূরসম্পর্কের ভাইও বটে। কৃষ্ণের এরকম টিটকিরি শুনে দুর্যোধন নিজের ফিটকিরি ঘষা গাল চুলকে শিবিরে ফেরত যায়, আর একটা কৌপিন পরে আসে। গান্ধারী এদিকে তার তপোলব্ধ পাওয়ারে বজ্রশক্তি দুর্যোধনের বডিতে স্তব্ধ করার প্ল্যানে ছিল। কিন্তু চোখ খুলেই দেখে, হায় কৌপিন ছেলের গায়ে। ঠিক গায়ে নয়, কটিদেশে, আর ওই আবৃত কটি দেশেই বজ্রশক্তি পৌঁছয় না। ফলে দুর্যোধনের উরু দুর্বল থাকে, এবং ওই উরুতেই ভীমগুরুর আঘাতে কুরু বংশের ওই শাখার প্রদীপ দুরুদুরু চিত্তে শেষ হয়ে যায়।
দুর্যোধনের এই কাহিনির সঙ্গে কৃষ্ণের পায়েস মাখার কাহিনির কী অদ্ভুত মিল দেখুন। দুজনেই সারা শরীরে শক্তি পায়, একমাত্র একটা করে জায়গা ছাড়া। আর সেই জায়গাগুলোতেই আঘাত পেয়ে দুজনের মৃত্যু হয়। আবার, দুজনেই মৃত্যুর সময় পাশে কাউকে পায়নি। প্রায় একাকী ও আহত অবস্থায় গাছের তলায় শুয়ে মারা যায়। ভাবতে অবাক লাগে, দুর্যোধন ও কৃষ্ণ, দুজনেই দুটি ক্ষমতাবান ও প্রতিপত্তিশালী রাজ্যের রাজকুমার ও নায়ক ছিল। দুজনেই শক্তিতে অন্য অনেককে জিতেছে। কিন্তু দুজনেই সামান্য কারণে আঘাত পেয়েছে।
অবাক লাগে একটা জিনিস ভাবতে যে, দুর্যোধন আঘাত পেয়ে যখন পড়েছিল তখন তাকে প্রাসাদে নিয়ে আসা হয়নি কেন? নাহয় ফিমার হাড় ভেঙেছিল, কিন্তু মহাভারত বলে দুর্যোধন তারপরেও কম করে একটা গোটা দিন বেঁচে ছিল। সেইসময়ে তার সেবা-শুশ্রুষা করা হয়নি কেন? পান্ডুর ছেলেগুলো এতটা গা… ইয়ে মানে, গাড়োলের মতন কাজ করল কেন? দুর্যোধন তো মরেই যাচ্ছে, তাকে শেষবেলায় একটু সেবা দিয়ে সুখ দিলে হত না? কেন তাকে গাছতলায় ফেলে রাখা হল? তাও আবার সারারাত? ওইভাবে কেন মরতে দেওয়া হল? যুধিষ্ঠিরের ‘ধর্ম’ তখন কোথায় ছিল? কেন পুত্রের এরকম অবস্থা জেনেও, ধৃতরাষ্ট্র বা গান্ধারী লোক পাঠিয়ে তাকে উদ্ধার করেনি? নাকি তাদের করতে দেওয়া হয়নি? ধর্মপুত্র ও দেবপুত্রেরা মিলে এতটাই ঘেন্না করেছিল দুর্যোধনকে যে নীচু মানসিকতার প্রতিযোগিতায় দুর্যোধনকেও ছাপিয়ে গেছিল তারা।
কৃষ্ণও সেখানে কিছু বলেনি। ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস দেখুন, কৃষ্ণের মৃত্যুর সময় তার সঙ্গে কারোর থাকার উপায়ও ছিল না। যাদবরা সবাই মরে গেছে। যে-কজন বেঁচে ছিল তারা দ্বারকা রক্ষা করছিল। গান্ধারীর অভিশাপে কৃষ্ণের ওই অবস্থা হয়েছিল। আমার ধারণা শুধু গান্ধারীর অভিশাপে নয়, সেই রাতে দুর্যোধনও ওরকম চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়েছিল যখন তখন সেও কৃষ্ণকে মন থেকেই অভিশাপ দিয়েছিল।
শুধু দুর্যোধনও নয়। কৃষ্ণ সম্ভবত সারাজীবন ধরেই বহু মানুষের নীরব অভিশাপ পেয়েছিল। যেদিন কৃষ্ণ কংসকে মারে, সেদিন কি উগ্রসেনের মন থেকে কোনো অভিশাপ বেরোয়নি কৃষ্ণের প্রতি? কংসের দুই স্ত্রীয়ের মনে কোনো অভিশাপ উগড়ে ওঠেনি? যেদিন কৃষ্ণ, পৌণ্ড্রক বাসুদেব, শৃগাল বাসুদেব ও শিশুপালকে মারে, সেদিন কী তাদের পরিবারের মানুষেরা কৃষ্ণের প্রতি কোনো অভিশাপ বর্ষণ করেনি? যেদিন কৃষ্ণ বাণাসুরের মায়ের সামনেই তার ছেলেকে জব্দ করে হাত কেটে নিয়েছিল, সেদিন কি সেই মায়ের মন থেকে কোনো অভিশাপ বেরোয়নি? আঠেরোদিনের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যতবার কৃষ্ণের বুদ্ধিতে পাণ্ডবরা অন্যায় করেছে, ততবার সেই অন্যায়ের শিকার হওয়া মানুষদের কাছের লোকেরা কি অভিশাপ দেয়নি? দ্রোণ, ভুরিশ্রবা, বরিক, ঘটোৎকচ যখন রণনীতির মাঝে কূটনীতি বুঝতে না পেরে মরেছিল, তখন তাদের স্ত্রী-পুত্র কী মন থেকে অভিশাপ দেয়নি? যুদ্ধে যত মানুষ মারা গেছে, তাদের পরিবারের মানুষেরা কি গান্ধারীর মতন ভাবেনি যে, কৃষ্ণ চাইলেই যুদ্ধ থামাতে পারত? তাদের অভিশাপ ছিল না?
আসলে মহাভারতে ও হরিবংশে লিখিতভাবে কৃষ্ণ হয়তো হাতে গোনা কয়েকটা অভিশাপই পেয়েছে, কিন্তু আর্যবর্ত জুড়ে যত মানুষের অলিখিত ও অব্যক্ত অভিশাপগুলো ছিল, সেগুলোও কি কৃষ্ণের ঘাড়ে এসে পড়েনি? পড়েছে, আর কৃষ্ণ সবই জানত। এত অভিশাপ জমেছিল, যে সেগুলো তাকে ছাড়িয়ে বৃষ্ণি বংশের সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এবং সেটা কৃষ্ণ জানত। পিতার কর্মের ফল পুত্রকে ভোগ করতে হয়, এবং রাজার কর্মের ফল রাজ্যবাসীকে ভোগ করতে হয়। এই নীতিবাক্য কৃষ্ণ জানতই। তাহলে কৃষ্ণ এরকম করল কেন? কী দরকার ছিল? ইচ্ছে করলেই কৃষ্ণ পাণ্ডবদের ঝামেলা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারত। নির্লিপ্ত থাকতে পারত। ক্ষমতার লোভ? রাজ্য বাড়ানোর লোভ? পাণ্ডব-কৌরব ও জরাসন্ধের জোট ভেঙে যদুদের শ্রেষ্ঠ করার স্বপ্ন? এইসবই বিস্তারিত আলোচনা করেছি ‘ফাজিলের মহাভারত’ বইতে, তাই এখানে আর সেই একই কথা পুনরাবৃত্তি করলাম না।
কৃষ্ণের মৃত্যুর পরে দুটি গল্প শুনতে পাওয়া যায় লোককথায় এবং কিছু আঞ্চলিক মহাভারতে। প্রথম গল্পে কৃষ্ণকে শেষ সময়ে দেখতে আসে পাণ্ডবেরা, এবং সহদেবের নিষেধ সত্ত্বেও অর্জুন শুধু তির দিয়ে কৃষ্ণকে স্পর্শ করে। সেই তিরের মাধ্যমেই কৃষ্ণ পাণ্ডবদের সমস্ত শক্তি শুষে নেয়। কৃষ্ণ শেষ বয়সের আগে সমস্ত দৈবাস্ত্র ও ক্ষমতা নিয়ে নিচ্ছিল। দ্বিতীয় গল্প বলে। কৃষ্ণের মৃত্যুর পরে অর্জুন তার শরীর দাহ করে, কিন্তু কিছুতেই হৃদয় দাহ করতে পারেনা। সেটা নাকি ধুকপুক করতেই থাকে। কৃষ্ণ কি তাহলে কোমায় চলে গেছিল? অর্জুন সেই অদাহ্য হৃদয়কে সমুদ্রে ফেলে দেয়, এবং সেটাই নাকি সেই পশ্চিম আরব সাগর থেকে সাঁতরে ঘুরে এসে পূর্বদিকে পুরীতে এসে ওঠে। সেটাই নাকি জগন্নাথদেবের মূর্তিতে স্থাপন করা হয় ‘প্রাণবস্তু’ হিসেবে। ওটাই নাকি সেই রহস্যময় বস্তু সেটার সত্যতা কারোর জানতে নেই। পুরীর মন্দিরের পুরোহিতরা নাকি চোখ বেঁধে সেই বস্তুকে পুরোনো মূর্তি থেকে বের করে নতুন মূর্তিতে স্তাপন করেন। বড়ই রহস্যময় ব্যাপার। এই গল্প সত্যি হলে বলতে হয়, ওই হৃদয় ভেসে আসেনি, বরং কেউ নিয়ে এসেছিল।
কিন্তু এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয় কৃষ্ণের মরণোত্তর দেহাবশেষ নয়। আমাদের আলোচনা হচ্ছে কৃষ্ণ মানুষ বা ভগবানকে নিয়ে। মহাভারতের শেষের দিকে অদ্ভুতভাবে কৃষ্ণকে আমরা অন্যভাবে দেখতে পাই। কৃষ্ণ সবকিছু ধ্বংস হবে জেনেও সমস্ত দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিচ্ছে। সবার অভিশাপ নিয়ে নিচ্ছে। তার হেতু কী? এটা ভেবেও আমার মাথা ঘেঁটে গেল। অনেক ভেবে দুটি আলাদা সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম। সেগুলো বুঝিয়ে বলি।
প্রথম যেটা মনে হল, সেটা হল, কৃষ্ণ সত্যিই দলপতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। দলপতির কাজই হল, নিজের দলকে রক্ষা করা এবং টিকিয়ে রাখা। যে-কোনও দলবদ্ধ জীবের দলপতির দিকে তাকিয়ে দেখলে আপনি দেখবেন তারা একটি মজার জিনিস অনুসরণ ও প্র্যাকটিস করেন। এটা ম্যানেজমেন্টে পড়ানো হয়, এবং ম্যানেজমেন্টের ডিগ্রি না থাকা প্রায় সমস্ত ম্যানেজারই এই জিনিসটা জানেন। এটাকে বলে SWOT analysis।
S= Strength = ক্ষমতা
W= Weakness = দুর্বলতা
O= Opportunity = সুযোগ
T= Threat = বিপদ
যে-কোনও পরিস্থিতি ও ঘটনাকেই এই SWOT analysis-এ ফেলা যায়, এবং বর্তমানে কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা হিসেব করা যায়। যারা সত্যিই ভালো ম্যানেজার (পা-চাটা তেল দেওয়া ম্যানেজারগুলো না) তারা সর্বক্ষণ সমস্ত সমস্যাকে এই অ্যানালিসিসের মাপকাঠিতে ফেলে মেপে নেয়। কৃষ্ণ অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ ম্যানেজার ছিল, এবং তার জীবনের প্রায় সমস্ত কাজেই তাকে এই SWOT analysis করতে দেখা যায়। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। ধরুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হবে, এবং কৃষ্ণ পাণ্ডবদের পক্ষে। কৃষ্ণ এই SWOT analysis অ্যাপ্লাই করে ফেলল পাণ্ডবদের দলের প্রতি। কী কী বেরোল?
পাণ্ডবদের দলের Strength মানে ক্ষমতা কী কী? প্রথমেই আপনারা ঝাঁপিয়ে বলবেন, কৃষ্ণ নিজে। কিন্তু ভালো ম্যানেজার নিজেকে দলের হাতিয়ার হিসেবে দেখে না। বরং পাণ্ডবদের ক্ষমতা ছিল ভীমের শক্তি, অর্জুনের স্কিল, ঘটোৎকচ ও দানবেরা, পাণ্ডবদের প্রতি দুর্বল ভীষ্মসহ বহু কৌরব প্রৌঢ়, প্রচুর দৈবাস্ত্র ইত্যাদি। এবার পাণ্ডবদের দলের সুযোগ (Opportunity) কী কী ছিল? যুধিষ্ঠির আশীর্বাদে কৌরব প্রৌঢ়দের থেকে জেনে নিল কাকে কীভাবে হারানো যায়। দুর্যোধনের কাছে পাওয়া পেন্ডিং বরকে সঠিক সময়ে কজে লাগিয়ে নেওয়া। শল্যকে বিভীষণ হিসেবে কাজে লাগানো, আর তারপরে তাকেই পটকে দেওয়া। দুটো সূর্যগ্রহণকে কাজে লাগিয়ে কৌরবদের জব্দ করা।
এবারে আসি পাণ্ডবদের দলের দুর্বলতা ও বিপদের কথায়। ভালো ম্যানেজার দলের দুর্বলতাকে পালটে দলের ক্ষমতায় রূপান্তর করে, ও বিপদকে পালটে সুযোগ বানিয়ে ফেলে। কথাটা শুনতে অসম্ভব লাগলেও আসলে সেটা সম্ভব। কী করে? পাণ্ডবদের দলের দুর্বলতা (Weakness) কী কী ছিল? অর্জুনের ইমোশনাল ব্রেকডাউন। কৃষ্ণ তার জন্য এমন মারাত্মক মোটিভেশনাল ভাষণ দেয়, যে সেটা গীতা নামে এখনও মানুষকে জীবনে উদ্বুদ্ধ করে। তারপরেও যখন অর্জুন যুদ্ধে ন্যাকামি করছিল, তখন অভিমন্যু চক্রব্যূহে ঢুকে মারা যায়। সেটা অর্জুনের মাথা খারাপ করে দেয়, এবং দুর্বলতা থেকেই ক্ষমতায় ফিরে আসে।
দ্বিতীয় দুর্বলতা ছিল যুধিষ্ঠিরের নিজের যুদ্ধ না করার একটা প্রবণতা। তার জন্য কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে রাগিয়ে দিয়েছিল। যুধিষ্ঠির যুদ্ধ না করে যাবে কোথায় ? তৃতীয় দুর্বলতা ছিল পাণ্ডবদের সেনাবাহিনীর ক্ষমতায়। কৌরবদের এগারো অক্ষৌহিণী সেনার বদলে পাণ্ডবদের ছিল মাত্র সাত অক্ষৌহিণী সেনা। পাণ্ডবদের থেকে দেড় গুণেরও বেশি সেনা ছিল কৌরবদের। সেইজন্য কৃষ্ণ বহু ছলের আশ্রয় নেয়। সেনাবাহিনী যতই বড় থাকুক, প্রকৃত লড়াই করে সেনাপ্রধান। তাই সেনাপ্রধানদের প্রধান প্রধান দুর্বলতা জেনে সেই দিয়েই তাদেরকে কুপোকাত করা হয়। ভীষ্মকে শিখণ্ডী দিয়ে, দ্রোণকে অশ্বত্থামার খবর দিয়ে, কর্ণকে রথ বসিয়ে, পাঁচটা সোনার তির নিয়ে নেওয়া ইত্যাদি।
শেষে আসে বিপদ বা Threat। পাণ্ডবদের দলের জন্য কী কী বিপদ ছিল যুদ্ধে। প্রথম বিপদ যুধিষ্ঠিরের সত্যবাদী হওয়া। হাই চান্স ছিল যে কেউ এসে যুধিষ্ঠিরের কাছে ক্ষমা চাইলে যুধিষ্ঠির তাকে ছেড়ে দিত। কিন্তু কৌরবদের ইগো বিশাল ছিল। ওসব ক্ষমা চাওয়ার মতন ভুল কেউই করত না। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের এই সত্যবাদী হওয়াটা একটা বড় বিপদ ছিল বইকি। কৃষ্ণ এটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। দ্রোণকে মারার জন্য। যুধিষ্ঠির মিথ্যে বলেনি, কিন্তু সত্যটা ফিশফিশ করে বলেছিল। দ্বিতীয় বিপদ ছিল কর্ণের কাছে থাকা বাসবাস্ত্র, যেটা দিয়ে সে অর্জুনের ফিউজ উড়িয়ে দেওয়ার প্ল্যান করেছিল। এটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায় কৃষ্ণ, আর ঘটোৎকচকে পুরো পাওয়ারে অত্যাচার করতে বলে। কর্ণ পড়ল দোটানায়। কর্ণ যদি তখনও ঘটোৎকচের প্রতি বাসবাস্ত্র না চালাত, তাহলে ঘটোৎকচ একাই সেদিন হয়তো হাফ কৌরব সেনা সাবাড় করে ফেলত। আর চালিয়ে দেওয়ার পরে অর্জুন বেঁচে গেল। তাই কৃষ্ণ যুদ্ধের মাঠে নৃত্য করেছিল। আরেকটা দুর্বলতা ছিল বর্বরিক। সে চাইলে যুদ্ধ কয়েকঘণ্টায় শেষ করে দিতে পারত। তাকেও কৃষ্ণ ধাঁধার চালে কিস্তিমাত করে দেয়।
এটা সামান্য কিছু উদাহরণ ছিল, কৃষ্ণের SWOT analysis নিয়ে। পুরো কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধটা এই অ্যানালিসিসের ছাঁকনিতে ফেললে আরও প্রচুর প্রচুর তথ্য বেরিয়ে আসবে। কৌরবদের ক্ষমতা পাণ্ডবদের দুর্বলতা ও বিপদ ছিল। সেইভাবে দুইদলের বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ একটা বই লেখা যায়। কিন্তু সেটা আমাদের এই বইয়ের পরিধিতে আনার বিষয় নয়। আমি শুধু দেখালাম কৃষ্ণ কীভাবে সুচারুভাবে SWOT analysis ব্যবহার করত। তাই বলে আবার ভাববেন না যে, শুধু এই একটি ম্যানেজমেন্টের পাঁয়তারা ব্যবহার করেছিল কৃষ্ণ। আর বহু বহু রকমের ম্যানেজমেন্ট টুলস ব্যবহার করেছিল।
আমি SWOT analysis-টা বললাম, কারণ ওটা দিয়েই কৃষ্ণ যদুবংশকে কীভাবে ঢেলে সাজিয়েছিল ও বাঁচিয়েছিল সেটা বোঝা যায়। আমরা এবার সেইটা বিশ্লেষণ করে দেখি। বংশ বাঁচাতে এই অ্যানালিসিসটা কৃষ্ণ বহুদিন ধরেই করেছিল। সম্ভবত সেই এগারো বছর বয়সে কংসকে মারা থেকে শুরু করে, এবং নিজের মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত চালিয়ে যায়। কীভাবে?
প্রথমেই দেখা যাক, কৃষ্ণের জন্মের সময় ও পরে পরেই যদুবংশের (বা বৃষ্ণি বংশের) দুর্বলতা ও বিপদ কী কী ছিল? যদুদের প্রধান ব্যবসা ছিল দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য। আমিও আগেও ফাজিলের মহাভারতে লিখেছি, মহাভারতের সময়কালে গোরু ও দুধের ব্যবসা একটি অন্যতম ব্যবসা ছিল। অর্থনীতির একটি সিংহভাগ জুড়ে ছিল গোরু। যার যত গো-ধন সে তত সমৃদ্ধ। কিন্তু যদুদের এই ব্যবসার মূল অংশ ছিল মথুরা ও মথুরার আশেপাশে। তাদের ব্যবসা এতটাই বৃহৎ ছিল যে, আমরা বিরাট রাজ্যের গো-ধনের কথা শুরুর দিকে প্রায় জানতেই পারি না। সেই যখন বিরাট রাজ্য আক্রমণ করে দুর্যোধন আর তার দলবল গোরু চুরি করতে গেল, তখনই জানা গেল ওই রাজ্যে বিরাট গোরুর কালেকশন আছে। কিন্তু প্রথম থেকেই আমরা দেখি যে যদুদের গোরু বেশি।
কিন্তু এই গোরু ও দুধের ব্যবসা চলত কংসের রাজ্যে। কংস সুচারুভাবে যদুদের ব্যবসা নিজের করে নিয়েছিল। সে নিজেও যদুবংশীয়ই ছিল। কিন্তু পুরো ব্যবসাটা নিজের কবজায় এনে ফেলাটা সত্যিই কংসের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। কিন্তু কংস আবার জরাসন্ধের জামাই ছিল। জরাসন্ধ সেইসময়ে কংস, পৌণ্ড্রক বাসুদেব, শৃগাল বাসুদেব এবং আরও অনেক রাজাদের নিয়ে একটি বড় রাজ্যের শক্তি গঠন করছিল। তাতে মাঝে মাঝে কৌরবদের সায়ও পাওয়া যায়। যদুদের কাছে এইটা ছিল প্রধান দুর্বলতা ও বিপদ। ব্যবসা করেও, তাদের হাতে ব্যবসার কন্ট্রোল ছিল না। সবই কংস এবং বৃহত্তরভাবে জরাসন্ধের হাতে। কংস এতটাই চালাকি করে যদুদের সন্তুষ্ট করে রাখত যে কৃষ্ণকে নিজে কোনোদিন মারতে যায়নি। যাদের পাঠাত, তারা কেউ ধরা পড়লেও হয়তো কংসের নাম নিত না। ভাবটা এমন যেন উড়ন্ত রাক্ষসরা গোকুল আর বৃন্দাবনে দমাদম চলে আসছে।
কৃষ্ণ প্রথমেই এই বিপদটা বোঝে। সে বুঝতে পারে, কংস থাকলে যাদবদের আলাদা একটি রাজ্য বা গোষ্ঠীশক্তি হিসেবে পরিচিত হওয়া সম্ভব না। কংস যতদিন ছিল, ততদিন যাদবরা জরাসন্ধের অর্থাৎ কাশী রাজ্যের অধীনে ছিল। সরাসরি নয়, ওই মিত্রশক্তির মাধ্যমে। তাই কংসকে প্রথমে শেষ করে পথ থেকে সরিয়ে ফেলল কৃষ্ণ। এরপরের বিপদ হল জরাসন্ধের মিত্রশক্তিযুক্ত জোটসরকার। জরাসন্ধ বহুদিন যাদবদের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যখন যাদবরা কৃষ্ণের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে উত্থান করছে, তখন জরাসন্ধ বারেবারে তাদের আক্রমণ করে বিপর্যস্ত করে তুলছে। জরাসন্ধও বুঝেছিল, কৃষ্ণকে সরিয়ে ফেলতে পারলে যাদবদের কবজা করা সোজা হবে। সেই কারণে কৃষ্ণের পিছন পিছন সে সেনা নিয়ে সুদূর গোমন্ত পর্যন্ত ছুটে যায়।
কৃষ্ণও ভালোই বুঝেছিল যে জরাসন্ধকে ছেঁটে ফেলা সহজ নয়। তাই সে দুটো কাজ করে। এক, যাদবদের বাসস্থান তুলে এনে সুদূর পশ্চিম উপকূলে বসানো। এতে সুবিধে ছিল যে, দ্বারকা আসতে আসতেই জরাসন্ধের সেনা হাঁপিয়ে যেত। দ্বিতীয়ত দ্বারকার দক্ষিণে সমুদ্র, পশ্চিমে দস্যুদের দেশ, উত্তরে কুরু রাজ্য ও মরুভূমি, বাকি রইল পশ্চিম। টেকনিক্যালি সেদিক দিয়ে আক্রমণ করা এক প্রকারের অসম্ভব। যদিও দ্বারকার এই সুবিধেটাই অসুবিধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল পরে। ওই সুরক্ষা দেওয়া সমুদ্রের জল ঢুকে পড়ে নগরে, আর পশ্চিমের দস্যুরা অনেকবার উত্যক্ত করে শেষে সব লুটে নিয়ে যায়। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময়টা মনে করে দেখুন। কৃষ্ণ কিন্তু তখন পশ্চিমের যবনদের সঙ্গে লড়াই করতে ব্যস্ত।
যা-ই হোক, জরাসন্ধকে জব্দ করতে কৃষ্ণ দ্বিতীয় চাল চালে, আর সেটা হল পাণ্ডবদের হাত করে জরাসন্ধকে সরানো। পাণ্ডবদের মাথাতে বুদ্ধিটা আসেইনি যে জরাসন্ধকে সরালে, তার পক্ষের একশোটা রাজার সাপোর্ট তারা পেয়ে যাবে। আজ্ঞে, ওসব জরাসন্ধের রাজাদের বলি-টলি দেওয়ার কথাটা পৌরাণিক রটনাই ছিল সম্ভবত। বলি দিয়ে জরাসন্ধ কি উৎপাটন করে নিত? আসলে ওই যজ্ঞটাই করছিল যাতে একশোজন রাজা তার অধীনে আসে। ওই অশ্বমেধ যজ্ঞ জাতীয় কিছু ছিল। সেখানে জরাসন্ধকে মেরে, ওই একশোজন রাজার সাপোর্ট পাওয়ার বুদ্ধিটা পান্ডবেরকে কৃষ্ণই দেয়।
কিন্তু কৃষ্ণ নিজে জরাসন্ধকে মারল না কেন? সম্ভবত কৃষ্ণ কংসকে মেরে শিক্ষা নিয়েছিল। জরাসন্ধকে যদি কৃষ্ণ মারত, তাহলে জরাসন্ধের সাপোর্টের সমস্ত রাজারা যাদবদের বিরুদ্ধে তখনই যুদ্ধ ঘোষণা করত। কী দরকার? তখন কৃষ্ণ যাদবদের শক্তি বাড়াচ্ছে, খামোকা যুদ্ধ করে নষ্ট করবে কেন? তার থেকে পাণ্ডবদের দিয়ে জরাসন্ধকে কাত করা গেল। বাকি রাজারা পাণ্ডবদের উপর রেগে গেল। তারা অনেকেই দুর্যোধনের পক্ষ নিয়ে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করল। পাণ্ডবদের লস হোক বা কৌরবদের লস হোক, তাতে যাদবদের তো কিছু যায় আসেনি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সবথেকে কম ক্ষতি হয়েছিল যাদবদের। বাকি মোটামুটি সব গোষ্ঠীরই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়।
জরাসন্ধ ফিনিশ, কংস ফিনিশ, যাদবদের পোয়া বারো। মানে বারো পোয়া করে দুধ বেশি বিক্রি হল হয়তো। কিন্তু তখনও বিপদ শেষ হয়নি। শেষ যে দুটো বিপদ ছিল যাদববংশের জন্য, সেগুলোকে তুলে রাখল কৃষ্ণ। তারপরে হাত দিল, যাদববংশের দুর্বলতা কোথায় কোথায়, সেটা বের করে তার সমাধান করার জন্য। প্রথম দুর্বলতা হল, যাদবদের নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। এগুলো বেশিরভাগই হত কয়েকজন যাদব রাজার জন্য। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কৃষ্ণের উত্থান সহ্য করতে পারত না, আবার কেউ কেউ জরাসন্ধের দলে আগে থেকে নাম লিখিয়েছিল। যারা সহ্য করতে পারত না, তাদের মধ্যে ছিল শিশুপাল, সত্রাজিৎ ও শতধন্ব। প্রথমজন স্রেফ কিছু সত্যি কথা মুখের উপরে টাস-টাস করে বলার অপরাধে যজ্ঞ উৎসবের মাঝে ভোগে চলে যায় কৃষ্ণের হাতে। পরের দুজন স্যমন্তক মণির কেসে মরে।
এদের ছাড়াও যারা জরাসন্ধের দলে নাম লিখিয়েছিল, এবং জরাসন্ধের মৃত্যুর পরে পোটেনশিয়াল থ্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাদের কৃষ্ণ খুঁজে খুঁজে মারে। প্রথমজন নরকাসুর। ভাই, সে যদি অতই ক্ষমতাবান হয়ে স্বর্গ জয় করবে ভেবেছিল, তাহলে দেবতারা কী করছিল? এমন একটা যুদ্ধ হয়, যেখানে ব্যাপারটা কৃষ্ণ পার্সোনালি নিয়ে, বউকে সঙ্গে করে নিয়ে, সেই দ্বারকা থেকে উড়ে আসামে এসে নরকাসুরকে মারে। কিন্তু নরকাসুরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে পাণ্ডব বা কুরুদের কোনো হেলদোল দেখি না। যদি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে নরকাসুর মার্ডার হয়ে থাকে, তাহলে সেই যুদ্ধে পাণ্ডব-কৌরব কই? পরশুরাম কই? নরকাসুরের এই টপ ক্লাস থ্রেটের বিরুদ্ধে ধর্মপুত্তুরেরা, দেবপুত্রেরা, ভীষ্ম, দ্রোণ, পরশুরাম নেই কেন? অর্জুন দিব্যি স্বর্গে গিয়ে ঘুরে আসছে, এদিকে স্বর্গ বাঁচানোর সময় তার টিকি দেখা যায় না। আজব কাণ্ড কিন্তু।
এতে একটাই জিনিস প্রমাণ হয় যে, নরকাসুরকে মারাটা কৃষ্ণের ব্যক্তিগত এজেন্ডার মধ্যে ছিল। তাই মেরেছে। ওসব আগের জন্মের গল্প, ভূদেবী, সত্যভামার গল্প সব ধামাচাপা দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছিল। অনেক পুরাণে তো সত্যভামা নেইই। কৃষ্ণের হাতেই নরকাসুর মরেছে। তারপরেও কৃষ্ণের হাতে খামোকা মারা পড়ে পৌণ্ড্রক বাসুদেব আর শৃগাল বাসুদেব। পৌণ্ড্রক তো সেই অর্থে কোনো দোষই করেনি। শৃগাল তাও একটু বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু ওই যে, দুজনেই পরে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াত। দুজনেই যাদবদের দুটো অংশকে মূল অংশের থেকে আলাদা করে রাখত, এবং ভবিষ্যতে হয়তো ক্ষমতার জন্য লড়াইও করতে পারত। তাই সমস্যা ছোট থাকাকালীনই সেগুলো ছেঁটে ফেলে কৃষ্ণ।
এরপরে আর দুটো বিপদই থেকে যায় যাদবদের উত্থানের ও টিকে থাকার পথে। প্রথম বিপদ হল কুরুবংশ ও কুরুরাজ্য। তখনকার সময়ে কৌরব-পাণ্ডব মিলিয়ে কুরুবংশ যথেষ্ট বড় ছিল, এবং সম্ভবত সবথেকে বড় ছিল। কৌরব পাণ্ডব এক হয়ে গেলে যাদবরা টিকতে পারত না। কিন্তু পিসতুতো-খুড়তুতো ভাইদের মধ্যে ঝামেলা হলই। কৃষ্ণ শুধু এক পক্ষকে সাপোর্ট করে অন্য পক্ষকে ধ্বংস করল। সেই সুযোগে আরও অনেক রাজ্যকে দুর্বলও করে দিল। ভারতবর্ষের মানচিত্রে সুপার পাওয়ার রয়ে গেল যাদবরা।
কিন্তু এখানেই যাদব বংশের সবথেকে বড় বিপদের জিনিস বাকি থেকে গেল। সেটা হল যদুর বংশের প্রতি যযাতির অভিশাপ ও কৃষ্ণের বংশের প্রতি গান্ধারী ও পূর্বোক্ত বহু মানুষের অভিশাপ। সেটা কাটিয়ে বংশ রক্ষা হবে কী করে? এখানেই কৃষ্ণ হয় নিজেই একটা মারাত্নক চাল চালে, আর নয়তো ভাগ্য তার সহায় হয়। শম্বরাসুর প্রদ্যুম্নকে কিডন্যাপ করে ফেলে। মনে রাখবেন, শম্বরাসুর কিন্তু ভবিষ্যতবাণী শুনে প্রদ্যুম্নকে কিডন্যাপ করেছিল। কৃষ্ণের সঙ্গে দেবতাদের যা দহরম মহরম ছিল, তাতে ওরকম এক-দু পিস আকাশবাণী বা ভবিষ্যতবাণী করানোটা কোনো ব্যাপারই ছিল না।
কোনো এক অজ্ঞাত বা তখনকার নিয়মে, প্রদ্যুম্ন বংশবহির্ভূত হয়ে যায়, এবং তার বংশধররা অভিশাপের হাত থেকে বেঁচে যায়। কাহিনি অনুযায়ী তাইই। বাস্তবে ধরতে গেলে বলতে হয়, অত বড় যে যাদব বংশ, আর সেখানে অত অত লোকের অত অত ছেলেপুলে, সবাই কি হজম হয়ে গেল? না, বাস্তবে সেটা হয়নি। অনেকেই বেঁচে গেছিল এবং ছড়িয়ে গেছিল। তবুও কৃষ্ণের নিজের সন্তানের বংশধর একজন রাখতে চেয়েছিল, তাই সে প্রদ্যুম্নকে বংশের বাইরে করেছিল। পরবর্তীকালে যাদবদের ধ্বংস আসন্ন দেখে, প্রদ্যুম্নের নাতি বজ্ৰকেও দ্বারকা থেকে দূরে রেখেছিল এবং যাদবদের ধ্বংসযজ্ঞে যাতে না থাকে, সেটা নিশ্চিত করেছিল।
এইভাবে কৃষ্ণ নিজের ম্যানেজমেন্ট বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে প্রথমে সমগ্র ভারতে যদুবংশকে সবথেকে বেশি শক্তিশালী করে তোলে, এবং পরবর্তীকালে সেই বংশ ধ্বংস করে, নিজের রক্ত হতে জন্ম নেওয়া একটি ধারাকে বাঁচিয়ে রাখে। লীলা ছাড়া অন্যভাবে ভাবলে মনে হয়, সামগ্রিকভাবে ভারতের প্রচুর রাজ্যের প্রচুর রাজাদের নিজেদের মধ্যে কলহ ও অতিরিক্ত জনসংখ্যা হ্রাস করতেই কৃষ্ণের এত কাণ্ড। আর সেটা না হলে, কৃষ্ণ একটি সাধারণ মানুষ ও রাজা হিসেবেই রয়ে যায়, যে সারাজীবন সবকিছু ঠিক করতে চায়, কিন্তু শেষে কিছুই হাতে রাখতে পারে না।
এখানেই আমার সেই ঘিলুরমণকারী চিন্তাধারা অন্যদিকে অন্য প্রশ্নে ঘুরে যায়। কৃষ্ণ কি সত্যিই একজন মনুষ্যরূপী দেবতা ছিল মধ্যে নাকি একজন সাধারণ মানুষ ছিল যে দেবতাদের শক্তি পেয়েছিল? এই প্রশ্ন শুধু আমার না। কালে কালে যুগে যুগে এই প্রশ্ন বহু মানুষে বহুভাবে করেছে। আস্তিক-নাস্তিক সকলেই। কৃষ্ণ ভক্তির সুর থেকে শুরু করে যে বৈষ্ণব ভক্তিধারা ক্রমে সারা দেশেই ছেয়ে গেছে প্রায়, তার উত্থানের আগে কিন্তু আমার করা ওই প্রশ্নটা নিয়মিত করা হত।
এই প্রশ্নের কারণ আছে। গুছিয়ে আলোচনা করি। প্রথমে দেখি, কেন কৃষ্ণকে আমি মানুষ বললাম। তার জন্য আমাদের প্রথমে জানতে হবে, কৃষ্ণের গল্প, বা কৃষ্ণকথার উৎপত্তি কোথায়? আমাদের (মূলত বিদেশিদের দ্বারা) লিপিবদ্ধ করা যেটুকু ইতিহাস আছে, সেখানে দেখি কৃষ্ণ কিন্তু ভগবান নয়। উপাসনা হত বিষ্ণুর। কৃষ্ণ শুধু বিষ্ণুর অবতারদের মধ্যে একজন ছিল। কৃষ্ণের নাম ও খোদাই করা চিত্র প্রথম পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে ব্যাক্ট্রিয়ার রাজা অ্যাগাথোক্লিসের মুদ্রিত মুদ্রায়। সেখানে ‘বাসুদেব কৃষ্ণ’কে বৃষ্ণি বংশের একজন যোদ্ধাবীর হিসেবে বলা হয়েছে। কৃষ্ণের ভগবানত্ব তখনও আসেনি। প্রায় একই সময়কালের আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায় কৃষ্ণের ব্যাপারে। পাকিস্তানের গিলগিট-বাল্টিস্তানের কাছে একটি জায়গায় খনন করে বোল্ডার পাথরের উপরে বহু প্রাচীন চিত্র দেখতে পাওয়া যায় (পেট্রোগ্লিফ)। তার মধ্যে একটি ছবিতে দুটি মনুষ্যের চিত্র বোঝা যায়। একজন লাঙ্গলধারী, অপরজন অস্ত্রধারী, এবং খরোষ্ঠী ভাষায় লেখা ‘রাম-কৃষ্ণ’। বলরামকে মহাভারতে বহু জায়গায় শুধু ‘রাম’ বলে অভিবাদন করা হয়েছে।
এখানেই চলে আসে মহাভারতের কথা। কৃষ্ণের ব্যাপারে আমরা যা কিছু জানি সবকিছুরই শুরু মহাভারত ও হরিবংশ থেকেই। কিন্তু আমরা অনেকেই (প্রায় ১১.১১%) ভাবি মহাভারত (যেটা জানি) লেখা হয়েছে পাঁচ হাজার (বা সাতহাজার বা কয়েক লক্ষ) বছর আগে। আর সেটা একদম একরকমভাবে টিকে গেছে। কিন্তু এটা ভুল। মহাভারতের প্রথম লিখিত চিহ্ন পাওয়া যায় স্পিতজার ম্যানুস্ক্রিপ্টে (Spitzer manuscript) যেটা রচনা করা হয়েছিল আন্দাজ দ্বিতীয় খ্রিস্টপূর্ব সময়কালে। তাতে কৃষ্ণ নেই। বেদেও কৃষ্ণ নেই। ছন্দোগ্য উপনিষদে কৃষ্ণের নাম দেবকীপুত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে শুধু।
আরও আলোচনা করলে বলা যায়, আমরা যে মহাভারত-রামায়ণ জানি, তা রচনা হয়েছে সংস্কৃতে। এবং সংস্কৃত ব্যাকরণ শুদ্ধ করেন খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে মহান পণ্ডিত পাণিনি। বৈদিক সংস্কৃত ছিল প্রায় খ্রিস্টপূর্ব অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম বা সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত। তারপরে আসে ক্লাসিকাল সংস্কৃত, যা পাণিনির হাত ধরে ব্যাকরণে শুদ্ধ হয়। আমাদের জানা প্রায় সমস্ত সংস্কৃত পুরাণই ক্লাসিকালে লেখা এখন। বৈদিক সংস্কৃতে লেখা চারটি বেদ ছাড়া প্রায় আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। মহাভারত তো নেইই। কিন্তু সময়কাল ধরে চললে মহাভারত রচনা করা হয়েছিল বৈদিক সংস্কৃত ভাষাতে, অথবা তারও পূর্বে যে ভাষা ছিল সেটায়। সেই আদি মহাভারত রচনার নাম ছিল জয়া। ‘মহাভারত’ বহু পরে এসেছে।
তাহলে মহাভারতের ঘটনার প্রমাণ কী? পুরোটাই কী পাণিনির সময়ের পরে বানানো হয়েছে? জয়া নামক ছোট রচনাকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বিশাল করা হয়েছে? তাহলে কি কৃষ্ণ বলে শুধু একজন বীর ছিল? লিখিত প্ৰমাণ কই?
এখানে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হলে, প্রসঙ্গটা সাইডে রেখে একটু অন্য ব্যাপার আলোচনা করতে হবে। ছোট করেই বলি, নয়তো যেটা বলতে চাইছি সেটা নিয়ে গোটা বই লেখা যায়। ব্যাপারটা হল যে কোনো কাহিনির সত্যাসত্য আমরা কীভাবে যাচাই করতে পারি? শ্রদ্ধেয় বঙ্কিমচন্দ্র স্যার লিখে গেছিলেন, বিদেশিরা পাখি মারতে গেলেও সেটা লিপিবদ্ধ করে। তাই তাদের প্রাচীন ইতিহাস পাওয়া যায়। আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা হয়নি, তাই আমাদের ইতিহাস কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। উনি যা লিখেছেন, তার সারমর্ম লিখলাম শুধু। উদ্ধৃত করলাম না। কিন্তু শুধু বঙ্গের ইতিহাস নয়, সমগ্র ভারতের ইতিহাসের প্রতিই এই কথার ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সবকিছু লিখে গেলেন। বিশেষ করে অশোকের মতন সম্রাট ও রাজারা পাহাড় ও পাথরের গায়ে খোদাই করে দিলেন। এই দেশে বিদেশিরা শাসন করতে এসে, সেসব লেখা দেখে নিদান দিলেন, ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তন হওয়ার পরেই ভারতীয়রা একটা সমাজ গড়েছিল। তারপরে বিদেশীরা এসে ‘অসভ্য’ ভারতীয়দের আদব কায়দা শিখিয়ে ‘সভ্য’ করেছে। এখানে বিদেশির অর্থ মুসলমান ও ইংরেজ সকলেই। তাদের সেই নিদানে এই দেশের শুদ্ধ দেশীয় তাঁবেদাররা ‘হ্যাঁ জাহাপনা, হ্যাঁ স্যার…আপনারাই ঠিক বলেছেন’ বলে সায় দেয়।
সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলতে থাকে, এবং এখনও বহু মানুষ সেটা বিশ্বাস করে। কিন্তু বঙ্কিম স্যারের সময়ের পরে, গঙ্গা-যমুনায় বহু জল বয়ে গেছে। ইংরেজরাও চলে গেছে, ভারতের শাসন ক্ষমতা ইংরেজ ব্যবসায়ীদের হাত থেকে দেশীয় ব্যবসায়ীদের হাতে এসে গেছে। ভারতীয়রা চাঁদে-মঙ্গলে যান পাঠিয়ে দিয়েছে। আবার হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সহ বহু জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিকরা খনন করেছে। প্রচুর জায়গায় পুকুর বা বাড়ির জন্য খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে প্রচুর দেবমূর্তি উদ্ধার হয়েছে, কোনারক সহ বহু মন্দির নতুন করে রূপ ফেরানো হয়েছে। ভারতের অজানা বা লুপ্ত ইতিহাসের অনেক প্রমাণ উঠে এসেছে। বঙ্কিম স্যার এটা দেখে যাননি। দেখে গেলে বলতেন যে ইতিহাস শুধু লিপিবদ্ধ অবস্থাতেই লেখা হয় না, পাথরেও লেখা হয়।
কিন্তু এবারে আপনারা বলবেন, একটু আগেই আমি বলেছি যে কৃষ্ণের প্রাচীনতম চিত্র প্রমাণ তো খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে বানানো হয়েছিল। তাহলে কৃষ্ণর ঐতিহাসিক প্রমাণ কই? সহজেই বলা যায়, কৃষ্ণ হয়তো গৌতম বুদ্ধের পরবর্তী সময়কালের এক গোষ্ঠীর নায়ক ছিল, যার নামে বাড়িয়ে-বাড়িয়ে গল্প বানিয়ে পরে ‘জয়া’ (মহাভারত) এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।
এই সম্ভাবনা অহেতুক ও অমূলক নয়। বিশেষ করে আজকের দিনে যেরকম সিরিয়াল ও সিনেমাগুলো গল্প বানিয়ে লোককে পরিবেশন করে, তাতে নব্বই শতাংশ লোক ভাবে সত্যিই সেগুলো পুরাণে লেখা আছে। তার সঙ্গে সঙ্গ দেয় কিছু স্বঘোষিত ঢপের মঠ। তারা কৃষ্ণের জীবনের নতুন নতুন গল্প নিয়ে আসে। রাধার বর আয়ান, আয়ান নাকি নপুংসক ছিল, জটিলা-কুটিলা বলে রাধার ভিলেন ভ্যাম্পমার্কা ননদ ছিল, কৃষ্ণ নাকি দোলের দিন রূপ বদলে রাধার বাড়ির দেওয়াল টপকে এসেছিল… এই প্রকারের বহু বিচিত্র বিচিত্ৰ স্বপ্নপ্রদত্ত গল্প নিত্যনতুনভাবে আমদানি করা হয়। সুতরাং বিগত কয়েক হাজার বছর ধরে কৃষ্ণের গল্পে যে অনেকটাই রং চড়ানো হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। এবং রংয়ের চোটে আসল যা ঘটেছিল তার থেকে অনেকটাই যে সরে এসেছে সেটাও সত্যি।
তাহলে কী ভাবছেন, আমি এখানে প্রমাণ করে দিলাম যে, কৃষ্ণ আসলেই একটি মানুষ ছিল, এবং কালে কালে তাকে ভগবান করা হয়েছে কাল্পনিক সব গল্পের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে? আজ্ঞে না, আমি কিন্তু সেটা বলিনি। আমি বলেছি, গল্পে রং দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ‘কাল্পনিক’ কথাটা বলিনি। কেন? কারণ কল্পনার গল্পের একটা নিয়ম আছে। সেই গল্প বেশিদূর এগোয় না। সেটা প্রথম থেকেই আনকোরা মৌলিক, তাতে রং চড়ে তখনই যখন কল্পনাতে লোকে বিশ্বাস করে। একটা কল্পনার চরিত্রে বহু মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বাস করবে আর নতুন নতুন গল্প জুড়বে এটা হয় না। যার জন্য ড্রাগনের রূপ কালে কালে বদলায়নি। মধ্যযুগের রাজারা যেরকম ড্রাগনের রূপ বলত এখনও সেরকমই আছে। কিন্তু একটি চরিত্র? সে চরিত্র সত্যি না হলে, তাকে নিয়ে গল্প, এবং গল্পের উপরে গল্প এগোয় না।
প্রশ্ন হল, এই রং চড়ানো গল্পগুলোর উৎস কোথায়? এইখানে আসে ইতিহাসের অন্য সোর্সের কথা। সেটা হল জনশ্রুতি ও লোককথা। বহু গল্প ও ঘটনা লোককথার মাধ্যমেই বেঁচে থাকে। একটি ছোট উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। কদিন আগেই সোশাল মিডিয়ায় দেখছিলাম, পটুয়াশিল্পীরা একটি সাম্প্রতিক বীরত্বের কাহিনি নিয়ে পটের গান বেঁধেছেন। সঙ্গে তাদের পটের ছবি। ঘটনাটি সম্ভবত সেনাবাহিনীর বীরত্ব নিয়ে ছিল।
এই চিত্রটি না থাকলেও শুধু যদি গল্পটি থেকে যায়, এবং বহুদিন ধরে সেটি লোকমুখে প্রচার হয়, তখন গল্পটি অমর হয়ে যায়। তাতে সেনাপ্রধানের কীর্তি হয়তো বাড়িয়ে চারিয়ে বলা হবে, তাকে দৈব ক্ষমতাধরও বলা হতে পারে, কিন্তু গল্পের মূলটা রয়ে যায়। এক সেনাপ্রধান বা সৈনিক তার দেশের জন্য একটি অসাধারণ বীরত্বের কাজ করেছিলেন। এই হল মূল সুর। এটা থেকেই যাবে। কালে কালে হয়তো শত্রুরা রাক্ষস বা দানব হতে পারে। সৈনিকের কর্তব্য ধার্মিক দৃষ্টি দিয়ে বলা হতে পারে। আগ্নেয়াস্ত্র হয়তো রকেট লঞ্চার হতে পারে, কিন্তু মূল গল্প হারিয়ে যায় না। সেটা বরং পরম যত্নে রংয়ের খোলসের ভিতরে সুরক্ষিত থাকে।
এই রংগুলোও কিন্তু গল্পের উপরে ইচ্ছে করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয় না। এগুলোও আসে লোককথার উপাদান থেকেই। যা রটে তার কিছু বটে। এমনটা হতেই পারে (এবং আমি নিশ্চিত যে হয়েওছে) যে কৃষ্ণের মৃত্যুর পরে যাদববংশের প্রতাপশালী কিছু যোগ্য রাজা ‘কৃষ্ণ’ উপাধি নিয়ে রাজত্ব করেছিল। এবং তাদেরই শাসনকালে কিছু কিছু ঘটনা ঘটে। পরবর্তীকালে সবই সেই একজন কৃষ্ণের নামেই সেটা রেজিস্টার করে দেওয়া হয়।
এমনটাও হতে পারে যে, কৃষ্ণের সময়কালের পরে পরেই কিছু ঘটনা ঘটেছে বা ঘটিয়েছে বীরপুরুষেরা, এবং সেগুলোকে কৃষ্ণের সঙ্গেই জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আবার এমনটাও হতে পারে যে, কৃষ্ণই সব করেছিল। এটা মানতে আমাদের কষ্ট হয় যে একটা মানুষ, একটা জীবনে এতকিছু করতে পারে, এটাই আমাদের বিশ্বাস হয় না। অথচ ভেবে দেখলে কিন্তু কিছুই অসম্ভব মনে হয় না। দৈবিক জিনিস ও ব্যাপার-স্যাপার যেমন অস্ত্র, চক্র, গরুড়, অভিশাপ এসব বাদ দিয়ে মূল ঘটনাগুলো দেখলে কী অসম্ভব মনে হয়? হয় না। কৃষ্ণকে একজন পলিম্যাথ ভাবাই যায়। আমাদের জ্ঞানত ও লিখিত ইতিহাসে এরকম পলিম্যাথ মানুষ আমরা বহু দেখেছি। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, নিউটন, চাণক্য সহ বহু এমন পলিম্যাথ মানুষ এই ধরাধামে এসেছেন যারা এক জীবনে বহু বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন কাজ করে গেছেন। তাহলে কৃষ্ণের পলিম্যাথ হতে অসুবিধে কোথায়? বিশেষ করে তার জীবনটা যখন পরপর জানা যাচ্ছে। তা সে লোককথা থেকে জানা গল্পই হোক না কেন, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় সব বয়সেই কৃষ্ণের কথা তো জানতে পারছি।
সুতরাং কৃষ্ণ যে ছিল, সে কথা মানাই যায়। মানুষ কৃষ্ণ। সে কথা বলতে গিয়েই এতকথা বললাম। কিন্তু এবারে সব লোককথা, উপকথা ছেড়ে যদি মহাভারতই ধরি (বিভিন্ন মূল সংস্করণগুলো) তাহলে সেখানে কৃষ্ণকে কী মানুষ হিসেবে দেখতে পাই আমরা? অবশ্যই পাই। তাঁর জীবনের বিভিন্ন ধাপে আমরা তারমধ্যে মানুষের দোষ-গুণ-চরিত্র কী কী দেখতে পাই?
একদম শৈশবকাল থেকেই দেখা যাক। কৃষ্ণ, এক রাখাল বালক। মায়ের হাতে মার খাচ্ছে। কী দোষে? ননী চুরি করছে। পাড়ায় আর গ্রামে লোকের পিছনে লেগে জ্বালাতন করছে। লোকে এসে তার বাড়িতে নালিশ করছে। লীলাখেলার মোড়ক ছাড়িয়ে ভিতরে উঁকি দিলে দেখা যায়, একটা চরম দুষ্টু বাচ্চা, সমবয়সি বাচ্চাকাচ্চাদের সঙ্গে গ্রামের লোকেদের হাড় জ্বালিয়ে মারছে। একেবারে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জ্বালিয়েছে। এটা মনুষ্য গুণ। ভগবান বলে যতই লীলা বলা হোক না কেন, আসলে দুষ্টুমি বুদ্ধি ভরা একটা মনুষ্য শিশু।
আবার দেখুন, সেই ছোটবেলা থেকেই কৃষ্ণকে তারই কাছের মানুষেরা বারংবার ‘চোর’ বলে ভাবছে। ননী চুরি তো ঠিক আছে, সেটা শিশুসুলভ আচরণ। কিন্তু মনে করে দেখুন, স্যমন্তক মণি যখন খোয়া যায় তখন কিন্তু কৃষ্ণকেই অনেকে চোর ভেবেছিল। একপ্রকার সেই বদনাম ঘোচাতেই কৃষ্ণ পাকা গোয়েন্দার মতন ইনভেস্টিগেশনে নামে, এবং জাম্বুবানের সঙ্গে কুস্তি করে মণি ও একটি বউ নিয়ে আসে। তারপরেও যখন অক্রূর মণি নিয়ে পালাল, তখন কিন্তু বলরামও কৃষ্ণকেই চোর ভেবেছিল। ভেবেছিল মণিটা কৃষ্ণ নিজের কাছে রেখে দিয়েছে, আর বলরামকে জানাচ্ছে না।
এতটা অবিশ্বাস কেন? কৃষ্ণ যদি শিশুকাল থেকে বহু লীলার মাধ্যমে নিজের ভগবানত্ব প্রমাণ করে থাকে, তাহলে তাকে এরকম দুবার কেন চোর ভাবা হল? তর্ক যদি এগিয়ে নিয়ে যাই, তাহলে মনে হয় যে কৃষ্ণকে তার কাছের লোকেরা বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবেই চিনত। ভগবান হিসেবে না। ভগবান হলে, তার নামে চোর অপবাদ দেবে কেন? বিশেষ করে মণিটা যখন সূর্যদেবেরই দেওয়া। তাহলে ভগবান হতে ভগবান মণি ট্রান্সফার হলে ক্ষতিটা কী? ক্ষতি হল প্রসেনজিতের মার্ডারটা। সেটার জন্যও কৃষ্ণকেই সন্দেহ করা হয়।
শুধু চোর না, প্রতারক হিসেবেও কৃষ্ণকে চিহ্নিত করে শিশুপাল। একদম লোকভর্তি যজ্ঞ সভায়। শিশুপাল কি জানত না কৃষ্ণের ক্ষমতা? বা তার ভগবানের সমান লীলাগুলো? জানলে ওরকম মূর্খের মতন কৃষ্ণের অপমান কেন করতে গেছিল? মরার জন্য? জানা যায় না। তবে এই অপবাদ ও সন্দেহগুলো কিন্তু কৃষ্ণকে ভগবানের থেকে বেশি মানুষ হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করে।
কৃষ্ণই বা শিশুপালকে দড়াম করে মারতে গেল কেন? একশোটা ভুল ক্ষমা করাটা ঠিক বিশ্বাস হয় না। শিশুপালের জন্য কি কৃষ্ণ একটা আলাদা লেজার বুক রাখত? পূর্বে আলোচনা করা হেতু ছাড়া শিশুপালকে মারার কোনো কারণ আমি দেখি না। আবার এই যে একজন অপমান করছে, আর দুম করে কৃষ্ণ তাকে মেরে ফেলল, এতে কী কৃষ্ণের মনুষ্য রিপুর পরিচয় পাওয়া যায় না? সে যদি ভগবানই হবে, তাহলে পরম করুণাময় হবে। শিশুপাল কী বলল, না বলল, তাতে কী আসে যায়? কৃষ্ণ যদি শিশুপালকে মার্ডার না করত তাহলে ভীম বা অর্জুনই হয়তো ওকে শাসন করে বা দু-ঘা দিয়ে ঠান্ডা করে দিত। কিন্তু সেসব না। সরাসরি মার্ডার।
একই জিনিস আমরা বলরামের ক্ষেত্রেও দেখি। খেলতে বসে চিটিং, তাতে মাথা গরম, তাতে রুক্মীকে মার্ডার। দেখে মনে হয়, দুই ভাইই মানুষকে মেরে ফেলতে কোনো বাধা মানত না। কৃষ্ণ মারত কম্পিটিশন বা অপমানকারীকে সরাতে, আর বলরাম মারত মাথা গরম করে। এগুলো তো মানুষের চরিত্র। কী দরকার ছিল পৌণ্ড্রক বাসুদেবকে মারার? কৃষ্ণ থাকত সুদূর পশ্চিমে, আর পৌণ্ড্রক থাকত পূর্বে। সে কৃষ্ণের নকল করে নিজের নাম ছড়াচ্ছে বলেই তাকে মার্ডার করতে হবে? ভারি আশ্চর্য। ধৈর্য না থাকলে ভগবান কীসের? ভগবান যে, সে সকলের ভালো চাইবে। শিশুপাল-পৌণ্ড্রক যদি বিপথে চলেও যায়, তাহলে তাদের শাসন করবে। মারার কী দরকার?
আমরা কৃষ্ণকে বারংবার এরকম ধৈর্য হারিয়ে রেগে যেতে দেখি। লোককে তেড়ে মারতে যেতে দেখি। যুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলবে না, সেই প্রতিজ্ঞা করেও ভীষ্মের দিকে দুবার তেড়ে যেতে দেখি। কেন সে তার প্রতিজ্ঞা ভুলে যাচ্ছে বারংবার? কেনই বা এতটাই পক্ষপাতিত্ব করছে যে পাণ্ডবরা যুদ্ধে একটু দুর্বল হলেই সে রেগে যাচ্ছে। অর্জুন যুদ্ধ করতে চাইছে না, তবুও তাকে উদ্বুদ্ধ করছে। কেন? কী স্বার্থে? রাজনৈতিক ও বৃহত্তর স্বার্থ আগেও আলোচনা করেছি, এই বইয়ে ও ফাজিলের মহাভারত বইয়ে। তবুও রাজনৈতিক স্বার্থে কৃষ্ণের এরকম ফ্রাস্ট্রেটেড হওয়াটা কী মানুষ হওয়ার পরিচয় দেয় না?
কৃষ্ণকে বিষ্ণুর অবতার বলা হয়। শ্রেষ্ঠ এবং পূর্ণ অবতার। সে কেন একটি ফ্যামিলির একটি শাখা, যেখানে দেবতা (বিশেষ করে ইন্দ্রের) পুত্রেরা আছে, সেদিকে পুরো সাপোর্ট করছে? এটা কী, একজন রাজা, একজন রাজনীতিবিদ, একজন স্বার্থসিদ্ধিকারী মানুষের সমান নয়?
কৃষ্ণর নিজের কার্যসিদ্ধির পথে যা করতে হয় করেছে। আপনজনদের ছেড়ে দিতেও দুবার ভাবেনি। রাধার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে কৃষ্ণ রাধাকে এমন ভালোবাসল, যে বৃন্দাবন ছাড়ার পর আর দ্বিতীয়বার ফিরল না। (ওই ঢপের সিরিয়াল দেখে জ্ঞান দিতে আসবেন না প্লিজ)। শুধু রাধা না, কৃষ্ণ দ্রৌপদীকেও সাহায্য করতে পারেনি। এমন একটা মুহূর্তে যখন তার সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, কিন্তু কৃষ্ণ সেখানে মিসিং। জানতেই পারেনি দ্রৌপদীর এতবড় কেস হচ্ছে। ওই শাড়ির গোডাউন কৃষ্ণ সাপ্লাই করেনি, একথা বহুবার প্রমাণিত, এবং বহুবার বলেছি। কৃষ্ণ ভগবান হলে দ্রৌপদীর দরকারের সময় আসল না কেন? কেন তার সখীর বিপদ সে টেলিপ্যাথিতে জানতে পারল না?
আপনারা বলবেন, এসবই লীলা, পূর্ব নির্ধারিত। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ না হলে যুদ্ধ হত না। কিন্তু ভেবে দেখুন, মহাভারতে যে মুহূর্তে পাণ্ডব-কৌরবরা বড় হয়েছে, এবং দুর্যোধন পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে, তখন থেকেই কিন্তু পুরো হস্তিনাপুর এবং তৎকালীন ভারতবর্ষ একটা বারুদের স্তূপের উপরে বসেছিল। দরকার ছিল শুধু একটা স্ফুলিঙ্গের। আমার মনে হয় না দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ নিয়ে এক ভীম ছাড়া আর বাকি পাণ্ডবদের খুব একটা গায়ে লেগেছে। যুধিষ্ঠির তো যুদ্ধই করতে চাইছিল না। বেঁকে বসেছিল (সম্ভবত পশ্চাতে ফোড়া হয়েছিল)। বস্ত্রহরণটা যুদ্ধ ও ধ্বংসের বহু কারণের মধ্যে একটি। ওটা না হলে দুঃশাসনের ওপেন হার্ট সার্জারি করত না ভীম। বাকি যুদ্ধে আর খুব একটা এফেক্ট ফেলেনি। কেউই যুদ্ধে দ্রৌপদীর অপমানটা তুলে কাউকে শাসায়নি। ভাবটা অনেকটা এরকম যেন, ফ্যামিলির ভাইরা একটু বউয়ের শাড়ি ধরে টানাটানি করেছে, ওতে অত ভাবার কিছু নেই। যুধিষ্ঠিরের তো মান-অপমান বোধটাই বোধহয় লুপ্ত হয়েছিল। কিন্তু কৃষ্ণ, সে কিন্তু আসল সময়ে ছিল না। তাহলে সে ভগবান কেন?
কৃষ্ণের মধ্যে বহুবার এরকম মানুষের অনুভূতি দেখা যায়। মানুষের অনুভূতির সঙ্গে ভগবানের অনুভূতির তফাত কী? মানুষ একেক সময় (হয়তো বেশিরভাগ সময়েই) কী করণীয় সেটা বুঝতে পারে না। ভগবান নিজের কাজ জানেন, তাকে সিদ্ধান্ত নিয়ে দোনামনা করতে হবে কেন? সে তো জানে কী ঘটতে চলেছে, তাহলে তার ব্যস্ত হওয়ার কারণ কী? অথচ আমরা কৃষ্ণকে বহুবার দেখতে পাই, একটা তনছুটি কাজ করছে তার মধ্যে। একটা ব্যস্ততা। কখনও কখনও কী করবে ভেবে পাচ্ছে না।
মুষল পর্বেই দেখুন, কৃষ্ণ যদি জানতই যে তার সাধের দ্বারকা ডুবে যাবে, দস্যুরা সব লুটে নেবে, তাহলে সবাইকে নিয়ে তীর্থে গেল কেন? আর সেখানে যখন মারামারি শুরু হল, কৃষ্ণ প্রথমে বাধা দিল না, কিন্তু যখন সেটা হাতের বাইরে চলে গেল, তখন কৃষ্ণ বুঝতে পারছে না কী করবে? সেও অনেককে মারতে শুরু করে। নিজের জ্ঞাতিগুষ্টিদের মেরেই ফেলে। তার পুত্র-পৌত্রাদিকে চোখের সামনে মরতে দেখে হয়তো এই কার্য করেছিল, কিন্তু সে যদি ভগবানই হয়, সে যদি সবই জানে, তাহলে কেন এই হত্যালীলায় অংশগ্রহণ করল?
তারপরেও কৃষ্ণ একজনকে হস্তিনাপুর পাঠাচ্ছে, একজনকে দ্বারকায়। আর নিজে বলরামকে খুঁজতে যাচ্ছে। বভ্রু দুম করে মরে গেলে কৃষ্ণ নিজেই দ্বারকায় যাচ্ছে খবর দিতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে দ্বারকা রক্ষা করছে না। সে কী পারত না দ্বারকাকে ডিফেন্ড করতে? তার এক ইশারাতেই দেবতারা হাজির হয়ে যেতে পারত। দ্বারকার সকলকে উদ্ধার করা কী এমন কাজ ছিল? কিন্তু কৃষ্ণ দ্বারকাতে ওয়ার্নিং দিয়ে ফের বলরামকে খুঁজতে প্রভাস তীর্থের কাছেই যায়। কেন? বলরাম যেখানেই যাক না কেন, গোটা দ্বারকার সুরক্ষা ছেড়ে তাকে খোঁজার কী দরকার ছিল?
বলরামকে দেহত্যাগ (সাপের রূপে দেহকে ত্যাগ করলে তো দেহত্যাগই হয়) করতে দেখে কৃষ্ণ পাগলের মতন আশেপাশের বনে বনে ঘুরে বেড়ায়। সে কিন্তু দ্বারকা ফেরত যায় না। হয় কৃষ্ণ যাদবদের নিয়ে ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে গেছিল, আর নয়তো মনোক্ষুণ্ণ হয়ে নিজের সারাজীবনের কর্মকে ভেঙে যেতে দেখে ডিপ্রেসড হয়ে গেছিল। আর নয়তো (যেটা আমার মনে হয়) কৃষ্ণ ওই যাদবদের মারামারিতে যথেষ্ট আঘাত পেয়েছিল। মানসিক ভাবে এবং শারীরিক ভাবে। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কৃষ্ণের অস্ত্রগুলোও আর থাকে না। সে এখানে শুধু একজন সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের মতনই দুঃখ পায়, ফ্রাস্ট্রেটেড হয়, ডিপ্রেশনে যায়। আর আঘাতের উপরে আঘাত পেয়ে মারা যায়।
এটা আমার মনে হয় যে কৃষ্ণ যাদবদের গোষ্ঠীকলহের যুদ্ধে এত আঘাত পেয়েছিল যে তার মধ্যে আর শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। জরার একটি বাণে তার সহ্যক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়, এবং প্রাণ ত্যাগ করে সে। নয়তো পায়ের পাতায় একটা বাণ লাগলে, সেটায় কেউ ঝট করে মরে যায় কী করে? কৃষ্ণ এতকিছু জানত, আর একটা তির বিঁধলে সেটার উপশম কী করে করতে হবে, সেটা জানত না? বিশেষ করে শরীরের এমন একটা জায়গায় বিঁধেছিল, যেটা ভাইটাল অর্গান না। যদি তির বুকে বিঁধত, মাথায় বিঁধত, পেটে বিঁধত, তাহলেও মানা যেত। কিন্তু পায়ের পাতায় বিঁধেছে। সেটাকে বের করে ফেললেই হত। আর এই ছাড়াও হয়তো আরেকটা জিনিস ঘটেছিল। জরা নিজের তিরের ডগায় বিষ মাখিয়ে রেখেছিল। বড় জন্তু ধরার জন্য গেছিল তো, তাই। জীবের দেহে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মতন বিষ। ওই বিষাক্ত ব্যাঙ থেকে বানায়, ওইরকম। তার ফলে কৃষ্ণের শরীর বিষ প্রবেশ করে, এবং কৃষ্ণ উপশম করার আগেই তার মৃত্যু ঘটে। সুতরাং ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত করে কৃষ্ণ হয় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিল, অথবা তিরের বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু হয়েছিল। মানুষের মতন। ভগবানের উপরে বিষ কাজ করে?
সুতরাং আমরা নাতিদীর্ঘ এই আলোচনার বাতি জ্বেলে, কৃষ্ণ ‘মানুষ’ ছিল কিনা তার পক্ষে অনেকটা আলো এবং অল্প কিছু চোনা ফেললাম। জানি না এই উপরের অংশটা প্রকাশক রাখবেন কিনা। এইটুকুই যথেষ্ট, আমাকে এবং প্রকাশকে নরাধম-পিশাচ-ধর্মভ্রষ্ট হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার জয়, এবং এই বই ব্যান করার জন্য। কিন্তু মনে রাখবেন আমাদের আলোচনার দুটো অংশ ছিল। প্রথম অংশ, কৃষ্ণের মনুষ্য পরিচয় নিয়ে আলোচনার। এবারে আসি দ্বিতীয় অংশে, কেন কৃষ্ণকে ভগবান বলা হয়?
ঘাবড়াবেন না, এতক্ষণ ধরে আমি কৃষ্ণকে মানুষ হিসেবে প্রমাণ করার সময় যখন তার লীলাগুলোকে সাইড করে রেখেছি, তখন আবার সেই লীলাগুলোকে টেনে এনে তাকে ভগবান বলব না। বরং আমরা খোঁজার চেষ্টা করি মহাভারত ও রামায়ণে আমরা কৃষ্ণের ভগবানোচিত কাজকর্ম কী কী দেখতে পাই?
মনুষ্য বোঝাতে যেমন চুরি দিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম, তেমনই এই ক্ষেত্রেও আমরা সেই চুরির প্রসঙ্গই টেনে আনব। ননী চুরি… গ্রামের সব বাচ্চারা মিলে করছে। কিন্তু কৃষ্ণ ধরা পড়ে গিয়ে কাউকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে না। অন্য কারোর নামে দোষ দিচ্ছে না। বল পাস করছে না। সে বলছে, “হ্যাঁ, আমিই চুরি করেছি, আমিই দোষী… ম্যায়নে হি মাখন খায়ো… আমিই মাখন খেয়েছি।”
যা দোষ সেটা সহজে মেনে নেওয়াটা কৃষ্ণের অনেকগুলো গুণের মধ্যে সত্যি একটা ভালো গুণ ছিল। শিশুপালের মা যখন বলছে, শিশুপালকে ক্ষমা করে দিস, তখন কিন্তু কৃষ্ণ একবারও বলছে না, বেশ আমি ওকে মারব না। সে জানে একদিন শিশুপালকে দরকার পড়লে মারতে হবেই। তাই সে শিশুপালের মাকে বলছে, তার একশোটা ভুল ক্ষমা করে দেবে। চাইলে মিথ্যে আশা দিয়ে পরে কথা ঘুরিয়ে দিত। সাধারণ মানুষের মতন। আমরা সাধারণ মানুষরা যেমন, ‘দেখছি…’ বলে আর দেখি না, সেরকমটা কৃষ্ণ নয়। সে দোষ আর অভিশাপ নিয়ে নিচ্ছে।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আঠেরো অক্ষৌহিণী মানুষ লড়ল, কিন্তু গান্ধারী কৃষ্ণকেই দোষি সাব্যস্ত করল। কৃষ্ণ চাইলে বলে দিতেই পারত যে, নিজের সন্তানদের ঠিকঠাক মানুষ করেননি, সময় থাকতে শাসন করেননি, আর এখন আমাকে দোষ দিচ্ছেন কেন? বিশ্বামিত্র আর কণ্ব যখন বৃষ্ণি বংশের সর্বনাশের অভিশাপ দিল, তখনও কৃষ্ণ সেটা মেনে নিল। সে চাইলে দুই ঋষিকে ডেকে শিবঠাকুরের সামনে নিয়ে গিয়ে কমপ্লেন করতেই পারত।
কিন্তু কৃষ্ণ সেসব বলেনি। এক সর্বহারা মায়ের মন থেকে যত রাগ, ক্ষোভ আর নালিশ অভিশাপ হয়ে বেরিয়েছিল, সেই সমস্তটা কৃষ্ণ একাই মাথা পেতে নিয়েছিল। ভগবান না হলে এত দোষ কেউ নিতে পারে? যখন তাকে মণি চুরির জন্য অপবাদ দেওয়া হচ্ছে, চোর বলা হচ্ছে, তখনও কিন্তু সে হাত পা ছুড়ে বা দুতিনজনকে ঘায়েল করে নিজের নির্দোষ হওয়ার প্রমাণ দিচ্ছেনা। কৃষ্ণ যদি মারপিট করত, কে বাধা দিত? কিন্তু কৃষ্ণ সেখানে চুপ। সে মণি খুঁজে এনে প্ৰমাণ করল সে চোর নয়। এই ভগবানসমান ধৈর্য দেখেই আরও বেশি করে বিশ্বাস জাগে যে, কৃষ্ণ যাদের মেরেছে, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই হত্যা করেছিল।
এই অন্যের দোষ নিজের উপর নিয়ে নেওয়া, অন্যের দোষের ফল নিজের ঘাড়ে নিয়ে নেওয়া, অন্যের জন্য নিজে শাস্তি পাওয়া, এ জিনিস ভগবান ছাড়া আর কে পারে? গোটা খ্রিস্টান ধর্মটাই জিশুখ্রিস্টের উপরে এই ‘অন্যের দোষের শাস্তি নিজের উপর নিয়ে নেওয়া’ থিওরিতেই দাঁড়িয়ে আছে। কৃষ্ণ সেখানে ব্যাপারটা ক্যাজুয়ালি নিয়েছে। আমরা কৃষ্ণকে সবরকম রূপেই পুজো করি, কিন্তু ঠিক এই রূপটায় (মানের অন্যের শাস্তি নিজে বহন করার রূপ) পুজো করিনা। খ্রিস্টানরা এই কনসেপ্টটা নিয়ে নিয়েছে।
এছাড়াও কৃষ্ণ নিজের ভগবান হওয়ার প্রমাণ বারংবার দিয়েছে। লীলাগুলো বাদ দিয়ে শুধু ঘটনাগুলো ধরলেও তাকে ভগবান না মেনে উপায় নেই। এগারো বছর বয়সে মথুরায় গিয়ে মুশকো মুশকো পালোয়ান পিটিয়ে ভরা স্টেডিয়ামে কংসরাজাকেই মেরে দিয়েছে। এটা ভগবান বা ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা না থাকলে হয় না। একইভাবে আমরা কৃষ্ণ আর বলরামকে দেখি গোমন্ত পর্বতে যুদ্ধ করতে। দুজনে মিলে অতবড় সেনাকে পিটিয়ে ছাতু করে দিচ্ছে, ভগবান না হলে এ কী করে সম্ভব? গুরুর পুত্রকে খুঁজতে সমুদ্রে চলে যাচ্ছে, যমুনার জলে ডুবে কালিয়াকে পেটাচ্ছে, এই অসুর-সেই অসুরকে গিয়ে মারছে… এইসব কাণ্ড ভগবান না হলে সম্ভব নয়। যতই বাড়িয়ে-চারিয়ে লেখা হোক, কিছু তো ঘটেছিল। পঁচিশ বছরের জোয়ান ছেলেকে তো আর এগারো বছর বলে চালানো যায় না। তাহলে পুরাণকারেরা অনেক হিসেবই ভুল করতেন।
সেসবও নাহয় গল্পকথা বলে বাদ দিলেন, কিন্তু কৃষ্ণের যে চূড়ান্ত রাজনৈতিক ও ম্যানিপুলেটিভ বুদ্ধি, আর সেই অনুযায়ী যঠিক জায়গায় সঠিক কাজটা করা, এটা কী একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব? কৃষ্ণের অনুপস্থিতির ফলে যে ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে যায়, সেটাও তার উদ্দেশ্যের সপক্ষেই কাজ করে। কিন্তু আবার প্রশ্ন আসে, কৃষ্ণ ভগবান হলে কেন যুদ্ধ থামাল না? কেন এত মানুষের প্রাণহানি হতে দিল?
এর উত্তরও ফাজিলের মহাভারতে দিয়েছি। ছোট করে বললে বলতে হয়, যুদ্ধ একটা হতই। কোনোভাবে কোনো অলৌকিক উপায়ে যদি দুর্যোধন সব মেনে নিত, অথবা পাণ্ডবরা সব রাজ্যের লোভ ছেড়েছুড়ে যদি বনে চলে যেত, তাহলেও পরবর্তীকালে তাদের ছেলেপুলেরা একইরকম যুদ্ধ করত। তখন পাণ্ডব সন্তানদের সঙ্গে কৌরব সন্তানরা লড়ত। থার্ড ল অফ থার্মোডাইনামিক্স মেনে হয়তো একশো কৌরবের একশো (বা অধিক) সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে সিংহাসনের জন্য লড়ত। একশোর বেশি কুরুক্ষেত্র, অথবা সবসময়ই একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। যুদ্ধ হলে সবথেকে বেশি ক্ষতি হয় দেশের সাধারণ মানুষের একবার যুদ্ধ হয়ে গেল, যা ক্ষয় ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেল, সেই ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন সমাজের জন্ম দেওয়া যায়, কারণ পুরোনো যা ছিল তা শেষ হয়েছে। কিন্তু দেশে যদি সর্বক্ষণ যুদ্ধ চলতে থাকে, তাহলে কোনোদিনই তার উন্নতি হয় না তারা সবসময়ই ধ্বংসের কারবার করছে। তাই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ হওয়ার দরকার ছিল। একশো যুদ্ধ আটকাতে যদি একটা যুদ্ধের দরকার হয়, তাহলে সেই যুদ্ধ হওয়াই উচিৎ। হয়েছেও তাই।
এইখানে সেই বিখ্যাত গল্প মনে করে দেখুন। গল্পটি উপনিষদ, বা ঈশপ, বা পঞ্চতন্ত্র বা চাঁদমামা…কোথায় পড়েছিলাম মনে নেই। ছোট করে বলি। একবার এক সাধক বহু ডাকাডাকি করে ভগবানের দেখা পেয়েছে। ভগবান তাকে বলেছে, কী চাও তুমি? সে বলে আমি আপনার সঙ্গে থাকতে চাই। ভগবান বলে, থাকতেই পারো কিন্তু আমি যা যা করব, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করা চলবে না। প্রশ্ন করলেই আমার সঙ্গে তোমার থাকার ভ্যালিডিটি শেষ হয়ে যাবে। ভক্ত রাজি হয়ে যায়।
ভগবান আর ভক্ত দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে। একজায়গায় রাত হলে তারা এক গরিব চাষির বাড়িতে আশ্রয় নেয়। চাষির নিজস্ব জমিজমা নেই। থাকার মধ্যে আছে এক গোরু, আর স্ত্রী-পুত্র। পুত্রের ভীষণ জ্বর। সেই অবস্থাতেও ভগবান আর ভক্তের জন্য রাতে ভাত, শাক, মাছের ব্যবস্থা করে যথাসম্ভব আপ্যায়ন করে চাষি। ভক্ত ভাবল, ভগবানকে সেবা করছে এরা, তার মানে সকালে ভগবান এদের দুঃখ দূর করবে। কিন্তু সকালে উঠতেই দেখা যায় গোরুটা মরে গেছে। চাষি আর তার বউ কান্নাকাটি করে ঠিকই, কিন্তু ভগবান নির্লিপ্তভাবে তাদের ছেড়ে এগিয়ে যায়।
সেদিনটাও সারাদিন হাঁটাহাঁটি করে রাতে তারা এক ধনী ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় চায়। ধনী ছিল দেমাকি। তবুও অতিথিদের ফেরাতে নেই বলে ভগবান আর ভক্তকে আস্তাবলের পাশে দুর্বল নোংরা একটা ঘরে থাকতে দেয়। খাবারে বাসি কিছু বেঁচে যাওয়া খাদ্য দেয়। কোনোমতে রাত কাটে ভক্তের আর ভগবানের। ভক্ত ভাবল ভগবান একে শাস্তি দেবে নিশ্চয়, কিন্তু সকালে উঠে ভগবান লোক ডাকিয়ে গোটা ঘরটা সারিয়ে দেয়। একেবারে মজবুত করে দেওয়াল বাঁধিয়ে ঘরটা সুন্দর করে দেয়। দেমাকি মালিক হেব্বি খুশি।
তারপরে আবার রাস্তায় নামে দুজন। ভক্ত আর থাকতে না পেরে ভগবানকে জিজ্ঞেস করে, এ আপনার কেমন ধারা বিচার? যে আশ্রয় দিল, সাধ্যমতন আদরযত্ন করল, তার একমাত্র গোরুকে দিলেন মেরে। আর এই হাড়বজ্জাত কিপটের ঝাড় আপনাকে বাসি খাইয়ে নোংরা ঘরে শুতে দিল, তার ঘর রিপেয়ার করে দিলেন? এ কেমন বিচার?
ভগবান বলে, ব্যস প্রশ্ন করেছ, তোমার ভ্যালিডিটি শেষ। আর আমার সঙ্গে থাকতে পারবে না। তবে জানে সে পহলে, উত্তর জেনে যাও। ওই চাষির বাড়িতে সেদিন কারো না কারো মৃত্যু লেখা ছিলই। গোরুটা না মরলে চাষির ছেলে মরত। গোরুটা এমনিতেই বুড়ি হয়ে গেছিল। তাই গোরুকে মারলাম, ছেলেকে বাঁচালাম। ওই ছেলেই বড় হয়ে চাষি আর তার বউকে সুখে রাখবে। অন্যদিকে ওই ধনী লোকটা আমাদের যে ঘরে থাকতে দিয়েছিল, সেটা ভাঙাচোরা অবস্থায় ছিল। কিন্তু তার পশ্চিমদিকের দেওয়ালের তলায় বিপুল গুপ্তধন রেখে গেছে তার পূর্বপুরুষ। ওই রাতে থাকার পরেরদিনই ঘরটা ভাঙার কথা ছিল। ভাঙলেই ওই গুপ্তধন পেয়ে যেত লোকটা। আমি তাই মজবুত করে ঘরটা এমন বানিয়ে দিলাম যে, আর ভাঙতে হবে না। লোকটা গুপ্তধন পাবে না। ওর বংশের কেউ, পরে পুণ্য করলে ওই গুপ্তধন পাবে।
ভগবানের অন্তর্ধানের সঙ্গে এই গল্প শেষ হয়। কিন্তু শিক্ষণীয় ব্যাপার হল যে, ভগবানের কাজকর্ম আমরা সবসময় বুঝতে পারিনা। কিন্তু লংটার্মে দেখা যায়, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধটাও ভালোর জন্যই হয়েছে। আর সেই সামগ্রিক ভালোটা করার জন্যই কৃষ্ণ মাঠে নেমেছিল। তার এই দূরদর্শীতাকেও ভগবানসম বলতেই হয়।
তবুও কৃষ্ণ চেষ্টা করেছে। দুর্যোধনকে সাবধান করার চেষ্টা করেছে। তাকে বিশ্বরূপ দেখিয়ে বুঝিয়েওছে যে, যা ইচ্ছে করতে পারো, শেষ দান আমার হাতে। নানানরকমভাবে যুদ্ধের আগেই কৌরবদের বুঝিয়ে দিয়েছে তারা হেরেই আছে। ভীষ্ম, দ্রোণ সহ সকলকেই একপ্রকার জানিয়ে রেখেছে দলবদল করো, যুদ্ধ অ্যাভয়েড করো। কর্ণকেও বলেছিল। কিন্তু সবার মাথায় তখন যুদ্ধের ভূত চেপেছিল। মারামারি কাটাকাটি না করলে তারা শান্তি পাচ্ছিলনা। অতঃপর যুদ্ধ হলই, এবং দায় চাপল কৃষ্ণের ঘাড়ে। সেটাও সে হাসিমুখেই মেনে নিল। ভগবান নয়তো কী ?
তবে কৃষ্ণের সবথেকে ভগবানসম ক্ষমতা বোধহয় ‘ধৈর্য’। দুটো ব্যাপার থেকে সেটা বঝা যায়। এক, তার মৃত্যুর সময়। তার পায়ে তির মেরেছে যে, তাকে কৃষ্ণ ক্ষমা করে দিচ্ছে। চাইলে ওখানে দু-ডজন অভিশাপ দিয়ে জরার চোদ্দগুষ্টির ষষ্ঠীপুজো করে দিতে পারত কৃষ্ণ। কিন্তু ক্ষমা করে দিল।
দ্বিতীয় ধৈর্য দেখা যায় যুদ্ধের প্রাক্কালে। গীতার জ্ঞান দেওয়ার সময়। এখানে দুটো প্রশ্ন আসে। এক, গীতা আনলাম কেন? তার কারণ হল, গীতাকে অনেক বিদ্বজন মানুষও মহাভারতের প্রক্ষিপ্ত অংশ হিসেবে ধরেন। গীতার ছন্দ ও শৈলী মহাভারতের সঙ্গে নাকি মেলে না। সে না মিলুক, কিন্তু গীতা যে মহাভারতের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ সেটা মানতেই হবে। উপরন্তু, গীতা, মানে কুরুক্ষেত্রে বলা গীতা কিন্তু একমাত্র গীতা নয়। রাম গীতা, উদ্ভব গীতা, ব্যাধ গীতা, গণেশ গীতা, দেবী গীতা ইত্যাদিও আছে। একটি মত অনুযায়ী, প্রায় খান আটত্রিশ গীতা আছে। তাই গীতা যে মহাভারতে একেবারে আনকোরা নতুন জিনিস আমদানি করা হয়েছিল তা নয়। গীতার জ্ঞান আগে ছিলই। কৃষ্ণ শুধু অর্জুনকে সিলেবাস রিভিশন দেওয়া করিয়েছিল। গীতাতেই কৃষ্ণ নিজে বলছে,
ইমম বিবস্বতে যোগম্ প্রোক্তবান অহম্ অব্যয়ম্।
বিবস্বান মনবে প্রাহ মনুঃ ইক্ষাকবে অব্রবীত্॥
এবম্ পরম্পরা প্রাপ্তম্ ইমম্ রাজর্ষ্য বিদুঃ।
সঃ কালেন ইহ মহতা যোগঃ নষ্টঃ পরন্তপ॥
অর্থাৎ, অমি পূর্বকালে সূর্যদেবকে এই নিষ্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞান যোগ বলে ছিলাম। সূর্য তা মানবজাতির জনক মনুকে বলেন এবং মনু তা ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলেন। এই ভাবে পরম্পরা মেনে তাদের মাধ্যমে এই পরম বিজ্ঞান রাজর্ষিরা লাভ করেছিল কিন্তু কালের প্রভাবে পরম্পরা ছিন্ন হয়েছিল এবং সেই যোগ নষ্টপ্রায় হয়েছে।
তারপর দ্বিতীয় প্রশ্ন আসে। কেন আমি কৃষ্ণের ধৈর্যর কথা বলতে গিয়ে গীতার কথা বললাম। বাহ রে, যুদ্ধের আগে, একজন ডিমোটিভেটেড সুপারস্টার যোদ্ধাকে অতবড় গীতা বুঝিয়ে যুদ্ধের জন্য রাজি করানোটা কী চাট্টিখানি কথা ? অর্জুন তো আত্মীয়স্বজন দেখে হাল ছেড়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বসেছিল। তাকে বিস্তর জ্ঞান দিয়ে যুদ্ধে নামানোর জন্য ধৈর্য তো দরকার বটেই। আর সেই বিপুল ধৈর্যের অধিকারী ছিল কৃষ্ণ।
এসব মনুষ্যবাচক উদাহরণে কৃষ্ণকে ভগবান হিসেবে প্রমাণ তো করাই যায়, কিন্তু সেটা ছাড়াও পুরাণকারেরা কৃষ্ণের মধ্যে ভগবান হওয়ার চৌষট্টি লক্ষণ দেখিয়ে গেছেন। সেগুলো আলোচনা করেই এই বইয়ের ইতি টানব।
চৌষট্টি কলার বিভিন্নপ্রকারের নাম পাবেন বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন বইয়ে। তার মধ্যে কিছু মথ একটি কলা বলে যে কৃষ্ণই নাকি বাকি সমস্ত অবতারের উৎস। এ কথা আধুনিক কালেই আবিষ্কার করা হয়েছে, একটি বিশিষ্ট মঠের অনুগ্রহে। নয়তো এই তথ্যের পক্ষে না তো কোনো পুরাণ আছে, না কোনো মন্দিরের খোদাই আছে। পুরোনো খোদাইয়ে প্রায় সর্বত্রই কৃষ্ণকে বিষ্ণুর দশ মহাবতারের একজন হিসেবে দেখানো হয়েছে। আরেকটি কলা বলা হয়েছে, হত শত্রুদের সুগতি দাতা। অর্থাৎ যাদের কৃষ্ণ মার্ডার (বা বধ) করেছে, তাদের সুগতি দান করেছে। মানে তারা মোক্ষ পেয়েছে। এটা তর্কের বিষয়, কিন্তু যুক্তির দিক দিয়ে দেখলে সেখানে তর্ক চলে না। ভক্তি ছাড়া তর্ক আগেই আলোচনা করেছি।
যাকগে, আমরা চৌষট্টি কলার কথা বলছিলাম। দুটি কলা বলে দিলাম। কলা অর্থে গুণ। কদলী না। কৃষ্ণের সঙ্গে চৌষট্টি রকমের কদলীর সম্পর্ক হবে কী করে? অদ্ভুত বুদ্ধি আপনাদের।
কলাগুলোর মধ্যে প্রায় এগারোটি কলা হল কৃষ্ণের দেহর বর্ণনা। কৃষ্ণের অঙ্গসকল সুরম্য, তার দেহ সৎ লক্ষণযুক্ত, সুন্দর দেহ, মহাতেজোময়বপু, অত্যন্ত বলশালী, নব কিশোর, সচ্চিদানঘন আকার, অবিচিন্ত্য শক্তিত্ব, অসমোর্ধ শ্রীরূপ মণ্ডিত বা ত্রিভঙ্গসুন্দর, সকল নারীর কাছে খুবই আকর্ষণীয়।
এরপর ছত্রিশকলা হল কৃষ্ণের গুণের বর্ণনা। কৃষ্ণ বিবিধ ভাষাজ্ঞ, সত্যবাক, প্রিয়বাক, বাকপটু, পণ্ডিতবর, বুদ্ধিমান, প্রতিভাবান, বিদগ্ধ, চতুর, দক্ষ, দেশ-কাল-পাত্রজ্ঞ, শাস্ত্রচক্ষু, শুচি, স্থির, দমনশীল, ক্ষমাশীল, গম্ভীর, ধৃতিমান, সমচিত্ত, বদান্য, ধার্মিক, শূর, করুণ, সম্মান প্রদানকারী, সক্ষম, বিনয়ী, লাজুক, সুধী, প্রতাপী, কীর্তিমান, সমৃদ্ধিমান, সর্বৈশ্বর্যময়, সর্বজ্ঞ, নিত্য নতুন বা নবনবায়মান, অখিল সিদ্ধি বশকারী ও সর্বসিদ্ধ, ত্রিজগৎ মোহিতকারী বেণুবাদক বা বংশীধারী।
এখানে আবার কিছু আলোচনা চলে আসে। কৃষ্ণ সত্যিই অনেক ভাষা জানত। তাকে আমরা ভারতবর্ষের এইপার থেকে ওইপার ছুটে বেড়াতে দেখি, সেখানে ভাষার সমস্যা থাকলে তার এত কীর্তি হত না। কৃষ্ণ যাকে বলে পলিগ্লোট বা বহুভাষি ছিল। দ্বিতীয় ব্যাপার হল, কৃষ্ণ নিজে কিন্তু সত্যবাদী ছিল। গোটা মহাভারত-হরিবংশ খুঁড়ে ফেলুন, একটাও জায়গা পাবেন না যেখানে কৃষ্ণ কোনো মিথ্যে কথা বলেছে। দরকারেও বলেনি, অদরকারেও বলেনি। যুধিষ্ঠিরকে দিয়ে বলিয়েছে, কিন্তু সেটা যুধিষ্ঠিরের চয়েস ছিল। কৃষ্ণ বহু ছলচাতুরি করেছে, কিন্তু মিথ্যে কথা বলেনি। যুধিষ্টির আসলে সত্যবাদী হিসেবে পোস্টার বয় হয়ে গেছিল। তাই দ্রোণাচার্য তাকে জিজ্ঞেস করেছিল। কৃষ্ণকেই জিজ্ঞেস করলে কিন্তু খেলা অন্যরকম হয়ে যেত।
যা-ই হোক, বাকি পনেরোটা কলা হল— কৃষ্ণের কৃতজ্ঞতা, সুদৃঢ় ব্ৰত পালন করা, সর্বশুভঙ্কর (যদিও যুদ্ধের পর শুভ হয় কী করে জানি না), ভক্ত বশীভূত, শরণাগত পালক, ভক্তসুহৃৎ, প্রেমবশ্য, লোকানুরক্ত, সর্বারাধ্য, ভক্ত মনোহারী, ভক্ত বৎসল সর্বারাধ্য, সর্বদা স্বরূপ সংপ্রাপ্ত, কোটি কোটি ব্ৰহ্মাণ্ড ধারণ ও পালন ক্ষমতা, ভক্তবৃন্দ পরিবেষ্টিত, অদ্ভুত রাসলীলা প্রদর্শনে পটু।
এইগুলো মূলত ভগবান কৃষ্ণের সঙ্গে ভক্তদের সম্পর্কের কলা। ভগবান হিসেবে কৃষ্ণ ভক্তের কাছে বন্দি। সাক্ষীগোপালের গল্পটা মনে নেই? ভক্ত ডাকলেই কৃষ্ণকে যেতে হবে। গজেন্দ্র মোক্ষর গল্পও পড়ে দেখতে পারেন। কৃষ্ণের কাছে যারা শরণ নিয়েছে, কৃষ্ণ তাদেরই রক্ষা করেছে। এ কথা আপনার আমার মতন নাস্তিকরা বুঝবেনা। কিন্তু ভেবে দেখুন, কৃষ্ণনাম নিয়ে চৈতন্যদেব বিভোর হয়ে বাংলা থেকে পুরী চলে গেলেন। মীরাদেবী বিভোর হয়ে বিষপান করলেন। আরও কত কত ভক্ত সংসার-স্বার্থ ছেড়ে শুধু কৃষ্ণনামেই জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছেন। তাদেডাকা ভক্তি, অথবা ভয়ে ভক্তিতে হয় না। এটা প্রেম-ভক্তি। কিছু চাওয়ার নেই, কিছু পাওয়ার নেই, শুধু কৃষ্ণ নামেই তাদের জীবন অতিবাহিত হয়ে যায়। এবং ভালো ভাবেই হয়। নিজেদের সবটুকু বিশ্বাস তারা সঁপে দিয়েছে কৃষ্ণের নামে। সেখানে কৃষ্ণ শরণাগতকে দেখবে না তাই হয়? ভক্তের জন্য সুহৃদ হবে না তাই হয়?
কৃষ্ণ, সে কাল্পনিক হোক, পৌরাণিক হোক, ঐতিহাসিক হোক বা ঐশ্বরিক হোক, তার তো কিছু পাওয়ার নেই। তার নাম করে যারা সুখে আছে, তাদের পাওয়ার আছে। তার নাম না করে যারা সুখে আছে, তাদেরও পাওয়ার আছে। এক অদ্ভুত নাস্তিকতার প্রশান্তি পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে। কিন্তু তাতে কৃষ্ণের কী ? তাকে না ডাকলেই বা কার ক্ষতি কী? তবুও কালে কালে যুগে যুগে কৃষ্ণ নাম রয়ে গেছে। বয়ে চলেছে, উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে তার নাম জপ। কেন? কারণ মানুষ শান্তি পাচ্ছে সেই নামে। দিনের শেষে আমরা সবাই শান্তি চাই। সুখ চাই, কিন্তু সুখ বড় মায়ার জিনিস। শান্তিটাই আসল। মিনিবাসের পিছনে একটা খুব দামি কথা লেখা থাকে— ‘সুখ স্বপনে শান্তি শ্মশানে’।
কিন্তু শ্মশানে মৃত হয়ে গিয়ে শান্তি পাওয়া কোনো কাজের কথা নয়। মানুষ যদি কৃষ্ণ নাম করে, কালী নাম করে, দুর্গা নাম করে, জিশু নাম করে, শিব নাম করে শান্তি পায় তাহলে ক্ষতি কী?
আর ঠিক এখানেই কৃষ্ণের ভগবান হিসেবে সার্থকতা। ঐতিহাসিক চরিত্র কৃষ্ণ নেই এখানে। এখানে ভগবান কৃষ্ণ চলে এসেছে, সময়-কালের গণ্ডি পার করে, সে তার ভক্তদের ইচ্ছে পূরণ করছে, শান্তি দিচ্ছে। মহাভারতের কালে কৃষ্ণ যতটা না ভগবান হয়ে উঠেছিল, তার থেকে বিগত দু-হাজার বছরে সে বেশি করে ভগবান হয়ে উঠেছে। তার কাছে মানুষ নিজেকে সমর্পণ করে শান্তি পেয়েছে, সমস্ত ক্লেশ ঘুচে যাচ্ছে। আর ভগবানের থেকে কী চাই? তাই সেই মহান শ্লোক দিয়েই লেখা শেষ হোক… সকলের ভালো হোক… সুবুদ্ধি হোক…
ওঁ কৃষ্ণায় বাসুদেবায় হরয়ে পরমাত্মনে,
প্রণত ক্লেশ নাশায় গোবিন্দায় নমো নমঃ
***
