পৃথুর গল্প আর সূর্যের ফ্যামিলির গল্প
বেনের অকস্মাৎ পতন ও ঘাটনের ফলে যে ধনুর্ধারী দিব্য পুরুষ দুর্গাপুজোর লাইটিংয়ের মতো ঝকমক করতে করতে বেরোল, তার নাম ছিল পৃথু। আর পৃথু জন্মের পরই তাকে ঋষি, মুনি, দেবতা সবাই একবাক্যে বলে দিল, “এ হল ভালো লোক, আমাদের ভক্তি শ্রদ্ধা করবে, মানে ধর্মের পথে চলবে… লেটস হ্যাভ পার্টি…”
পৃথুর আগমনে সকলে আনন্দিত হল, অপ্সরাদের ডান্স শুরু, ঋষিরা বেদমন্ত্র পাঠ করতে করতে পৃথুকে সিংহাসনে ধপ করে বসিয়ে দিয়ে বলল, “তুমিই রাজা!”
এবারে পৃথুর ব্যাপারে ভাবা যাক। বেনের ডান হাত মন্থন করে মানে হাতকে নিংড়ে পৃথু বেরোল। কোনো মহিলার অন্তর্ভুক্তি ছাড়াই। মাইটোসিস। পুরাণে এরকম বহু উদাহরণ পাবেন। তাই পৃথুকে বলা হয় অযোনিজ, আর তাই পৃথুর মধ্যে বাসনা ছিল না। বাসনা না থাকলেই সুশাসক হওয়া যায়। কিন্তু অন্যভাবে যদি আজকের বিজ্ঞানের দিক দিয়ে ভেবে দেখি তাহলে পৃথুর জন্ম কী করে সম্ভব হল? এর দুটো ব্যাখা হতে পারে। প্রথম ব্যাখা হল বেন প্রথমে অত্যাচারী ছিল, তারপরে ঋষিদের কথা না শোনায় ঋষিরা মিলে বেনকে তানসেনের তানপুরার মতো ড্যাং ড্যাং করে বাজিয়েছে, মানে উত্তম মধ্যম প্রহার করেছে, আর সেই গণপিটুনিতে বেনের চেতনা উদয় হয়ে সে বাধ্য হয়ে নিজের মত পালটে ‘ভালো ছেলে—ধার্মিক পৃথু’ হয়ে গেছিল। হতে পারে না? আলবাত হতে পারে। একজন ডাকাত যদি নিজের প্রফেশন পালটে বহুদিন উইপোকার ঢিপিতে লুকিয়ে থেকে রূপান্তর ও জীবিকান্তর হয়ে নিজেকে কবি ও ঋষিরূপে আমূল বদলে ফেলতে পারে, তাহলে আমাদের বেনরাজা ঋষিদের মার খেয়ে চরিত্র বদলাতে পারে না কেন?
দ্বিতীয় ব্যাখা হতে পারে যে বেন যেহেতু হেব্বি অত্যাচারী ছিল, দেবতাদের বিরুদ্ধে একরকম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল তাই ঋষিরা বেনের বিরুদ্ধে একটা সংগঠন বানিয়েছিল। এবং বেশিরভাগ শান্তিপূর্ণ সংগঠন যেমন সং-দের দ্বারা গঠিত হয়ে শান্তি থেকে পূর্ণ অশান্তি মোডে চলে যায়, সেইরকমভাবেই হয়তো বেন শান্তিপূর্ণ ঋষিদের সাথে আলোচনায় আলো কম আর চোনা বেশি দেওয়ায় ঋষিরা অশান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু ঋষিরা তো শুধু পুজোআচ্চা নিয়ে থাকত, তারা সবাই মিলে হয়তো গণধোলাই দিয়েছিল কিন্তু তাই বলে মার্ডার? এখানেই মনে হয় যে পৃথু আসলে বেনের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের নেতা ছিল। ওই সৈন্য বা সেনাপতি গোছের, যে তলে তলে বেনের বিরুদ্ধে ঘুঁটি সাজিয়ে সব গুটিয়ে নিয়ে সঠিক সময়ে ঋষিদের ঝামেলায় বেনকে চেনপেটা করেছে। তারপরে ঋষিরাও তাকেই ভূয়সী প্রশংসা করে বসিয়ে দিয়েছে রাজার আসনে। যেখানে ঋষিরা আর দেবতারা পৃথুর প্রশংশায় পঞ্চমুখ সেখানে পৃথুর আসল পিতৃপরিচয় জানতে চাইবে এরকম সাহসী কে ছিল? বেনের ডানহাত থেকে বেরিয়েছে, ব্যস, ওই গল্প বিশ্বাস করতেই হবে। কেউ অবিশ্বাস করলে যদি আবার বেনের মতো নিংড়ে দেয়?
যা-ই হোক, পৃথু মোটামুটি একতরফা ভোট ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চক্রবর্তী রাজা হয়ে বসল, একেবারে চকরবকর করে। সে হল প্রথম রাজা। এরকমই লেখা আছে। তার আগে শাসক ছিল, কিন্তু ক্ষত্রিয় রাজা কেউ ছিল না। কিন্তু তাই বলে ভাববেন না পৃথু একেবারে ত্রিলোকের রাজা হয়ে বসল। অত পাওয়ার দেওয়া হয়নি। কারণ হরিবংশই বলছে ব্রহ্মা নিজের হাতে অনেককেই অনেক ডিপার্টমেন্টের রাজা হওয়ার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়েছিল। চন্দ্র ছিল যজ্ঞ আর ব্রাহ্মণদের রাজা, বরুণ জলের, কুবের রাজাদের রাজা, বিষ্ণু আদিত্যদের রাজা, অগ্নি বসুদের রাজা, দক্ষ প্রজাপতিদের রাজা (এই প্রজাপতি পতঙ্গ নয়), ইন্দ্র মরুৎদের রাজা, প্রহ্লাদ দেবতাদের রাজা, বিপ্রচিতি দানবদের রাজা, যম পিতৃদের রাজা, শিব সাধ্য-রুদ্র-ভূত-গণদের রাজা, চিত্ররথ গন্ধর্বদের রাজা, বাসুকী নাগদের রাজা, তক্ষক সরীসৃপদের রাজা (নাগ আর সরীসৃপ আলাদা?), হিমালয় পর্বতদের রাজা, বায়ু গন্ধের রাজা, উচ্চৈশ্রৈব ঘোড়াদের রাজা (ঘোড়েল ব্যাপার), ঐরাবত হাতিদের রাজা, গোরুড় পক্ষীদের রাজা, বাঘ প্রাণীদের রাজা, আদিশেষ হিংস্র জন্তুদের রাজা, যণ্ড গোরুদের রাজা, প্লাক্ষ মানে ডুমুর গাছ গাছেদের রাজা (কেন?) আর আরও এরকম খানদশেক বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের রাজারা আলাদা আলাদা ছিল।
তাহলে পৃথু হল শুধু পৃথিবীর উপরে মানুষগুলোকে শাসন করার রাজা, তাদের থেকে ট্যাক্স নিয়ে ঋষিদের দিয়ে দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য পৃথু নিযুক্ত হল। ট্যাক্স তো অবশ্যই নিতে হবে। বড় বড় দানবীর রাজাদের গল্প শোনেন, পড়েন… কী মনে করেন ওরা নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি বিলিয়ে বেড়াত? রীতিমতো ট্যাক্স নিয়ে সেই থেকে দানবীর হয়ে নাম করত। রাজা মানেই ক্ষত্রিয়, বলি ক্ষত্রিয় হয়ে উপার্জনের কোনো মাধ্যম কেউ জানত কি? দিনরাত তো শুধু মারপিট করে বেড়াত। হাল চালানো, চাষ করা, উপার্জন করা এসব ধর্তব্যেই আনতনা। খালি মারপিট। একমাত্র যুধিষ্ঠির বাদে বাকি পাণ্ডবদেরই বোধহয় দেখা যায় যে অন্য উপার্জন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জ্ঞান ছিল। বাকি আর কোনো ক্ষত্রিয়তে এই জ্ঞান দেখা যায় না। সুতরাং প্রজাদের থেকে ট্যাক্স আর নয়তো পার্শ্ববর্তী রাজাদের উপরে লুঠতরাজ, এই ছাড়া আর ধনরাশি কোথা থেকে আসতে পারে!
আর বোধহয় ঠিক এই সমস্যাটারই মুখোমুখি হল পৃথু, রাজা হয়েই। বেনের রাজত্বে সব খরচ হয়ে ভাঁড়ে মা ভবানীর হাল। এটা আমার মনে হয়, কারণ হরিবংশ বলছে পৃথু রাজা হয়েই সমুদ্র ও পাহাড়ে অভিযান শুরু করল। তখন সমুদ্র যাত্রা নিষিদ্ধ ছিল না? কী যেন প্রায়শ্চিত্ত করতে হত? ও… দেবতাদের দলের লোক, তাই পৃথুর সমুদ্রযাত্রা পুণ্যের ব্যাপার। যা-ই হোক, মোটকথা যদি পৃথুর রাজত্বে সব ছিল তাহলে সে পাহাড় আর সমুদ্র পেরোল কেন? অন্য দেশ জয় করতে? কিন্তু পৃথু তো পৃথিবীর রাজা ছিল, তাহলে কি শুধু প্রমোদবিহারেই গেছিল? যদ্দূর মনে হয় এগুলো কোনোটাই না, পৃথু একটা উপায় খুঁজছিল যাতে আরও বেশি ফসল, আরও বেশি যজ্ঞ, আরও বেশি সমৃদ্ধি আনা যায়। এরই মধ্যে পৃথু আবার ব্রহ্মার যজ্ঞ করে যজ্ঞ থেকে দুজন পুত্র পেল (কন্যা নয়, কন্যা পাওয়াটা পুণ্যের ব্যাপার ছিল না। পুত্রলাভ মানে হেব্বি পুণ্য)। একজনের নাম সুত আর আরেকজনের নাম মগধ। সন্দেহ হয় এটা আদৌ পৃথুর যজ্ঞে পাওয়া ছেলে নাকি যুদ্ধ করে মগধকে আর্যদের শাসনে নিয়ে আসা বোঝাচ্ছে। যুদ্ধও তো একরকমের যজ্ঞ। নাহ্, এত অবিশ্বাস নিয়ে গল্প বলা উচিত নয়, পদে পদে প্রশ্ন এসে যাচ্ছে। আমি বরং গল্পটাই বলি।
পৃথু এরকম সমৃদ্ধি পাওয়ার আশায় একদিন মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রজারা কমিটি গঠন করে তার কাছে দাবি রেখেছে, তাদের জনসংখ্যা বাড়ছে, কিছু একটা ব্যবস্থা করা হোক যাতে খাদ্য পর্যাপ্ত ভাবে পাওয়া যায়। এই সময়ে পৃথু ঘুরতে ঘুরতে আইডিয়া পায়, কেমন হবে যদি ধরিত্রীকে কাজে লাগিয়ে তার থেকে এই খাদ্য আর সমৃদ্ধি নেওয়া যায়? পৃথুর এই ভাবনা কীভাবে কে জানে টেলিপ্যাথিতে ধরিত্রী জানতে পেরেই একটা গোরুর রূপ নিয়ে দে ছুট। পৃথুও কম যায় না, তির-ধনুক নিয়ে সেই গোরুর পিছনে দৌড়ল। গোরু যেখানে যায় সেখানেই পিছনে পিছনে পৃথু। তখন গো-রক্ষা কমিটিও ছিল না আর গোমূত্র খেয়ে আল-কেশ বকে যাওয়ার মতো লোকও ছিল না। তার মধ্যে পৃথু রাজা, সে-ই আইন। গোরুরূপে ধরিত্রী হাম্বা হাম্বা করে উড়ে চলল। এইখান থেকেই ‘গোরুখোঁজা’ কথার উৎপত্তি বোধহয়।
সেই গোরু ব্রহ্মার কাছে গিয়ে বলল, “বাঁচাও!”
ব্রহ্মা বলল, “পৃথু আমারই বংশধর, ওর হাত থেকে বাঁচাতে পারব না, তুমি অন্য উপায় দেখো।”
গোরুরূপে ধরিত্রী তারপরে পৃথুর তাড়া খেয়ে কোণঠাসা হয়ে গো-ভাষায় পৃথুকে বলল, “থাম, তোর দাবিটা কী?”
পৃথু বোধহয় ততক্ষণে গোরুকে মারার প্ল্যান করেছিল। কিন্তু গোরুর থেকে এরকম প্রশ্ন শুনে সে থমকে দাঁড়ায়। গোরুরূপী ধরিত্রী বলে, “বলি রাজা হয়েছিস, আর একটা গোরুর পিছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছিস? আমি নাহয় গোরুরূপে ধরিত্রী, কিন্তু তুই তো রাজারূপে গোরু…”
পৃথু ভীষণ লজ্জা পায়, গোরু আরও বলে, “আমি একটা উকিল দাবি করছি আমার পক্ষে, যা অন্যায় হচ্ছে সেটার জন্য কেস লড়ব। রাজাকে কেস খাওয়াব… রাজার ধর্ম প্রজাদের পালন করা। সে দু-পেয়ে প্রজা হোক আর চারপেয়ে বা ছ-পেয়ে, সবাই প্রজা।”
পৃথু বলল, “আমার মনুষ্য প্রজাদের জন্য তোমাকে মেরে আমি সব নেব!” গোরু বলল, “ওসব ছাড়, অন্যকিছু নে, যাতে আমি প্রাণে বাঁচি।” পৃথু বলল, “বেশ তাহলে আমাকে তোমার দুধ দাও, আমি সেই দিয়েই প্রজাদের পালন করি।”
গোরুরূপে ধরিত্রী রাজি হলে পৃথু পাহাড় ভেঙে সমতল ভূমি বানাল, যাতে দুধ সব জায়গায় বয়ে যেতে পারে। তারপরে পৃথু মনুকে ধরিত্রীর বাছুর বানিয়ে তার মাধ্যমে দুধ বের করতে শুরু করলে, সব জায়গায় চাষ আবাদ শুরু হয়, ব্যবসা বাণিজ্য শুরু হয়, পশুপালন শুরু হয় ইত্যাদি। পৃথুর কন্যারূপে ধরিত্রী দুধ দিল, তাই ধরিত্রীর নাম হল পৃথিবী।
ভালো গল্প, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থ কী? এর অর্থ হল পৃথু অর্থাৎ রাজাদের একটা গোষ্ঠীকে সামনে রেখে আর্যদের যথেচ্ছ পৃথিবী থেকে চাষ ও খনিজ পদার্থ আমদানি শুরু। পাহাড় কাটা মানেই হল রাস্তা বানানো নয়তো খনি আবিষ্কার করা। এর মাধ্যমেই প্রমাণ হয় যে আর্যরা কিভাবে নিজেদের বিস্তার শুরু করার সাথে সাথে প্রকৃতির উপরে অত্যাচার শুরু করে। পৃথুকে দেখে বাকি অনেক জাতিও এই একইভাবে ‘ধরিত্রী থেকে দুধ নিচ্ছি’, এই লজিকে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে শুরু করে। ঋষি, দেবতা, দানব, অসুর কেউ বাদ গেল না। আগে যে রাজাদের নাম বলেছি সবাই মোটামুটি একবার করে পৃথিবীকে দুইয়ে দুইয়ে চার না করে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করে। এইভাবেই পৃথু পৃথিবীকে দুইয়ে কীভাবে সব শুষে নিতে হয় সেই টেকনোলজি দেখিয়ে বিখ্যাত রাজা ও দেবতাদের প্রিয়পাত্র হয়ে বসল।
পৃথুর গল্প এখানেই শেষ, এবারে আপনাদের শোনাই সূর্যদেবের ফ্যামিলির গল্প। সূর্যদেব, মানে যিনি রোজ সকালে পূর্বদিকে উঠে সমগ্র পৃথিবীর আলোর উৎস হয়ে প্রাণীকুলকে জুৎসইভাবে বেঁচে থাকার শক্তি দেয় তিনিই। কিন্তু এবার আপনি তর্ক করবেন, যে বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা জানি যে সূর্য আসলে মাঝারি মাপের একটা নক্ষত্র যার মধ্যে হাইড্রোজেন পারমাণবিক সংযোজন করে হিলিয়াম হচ্ছে বলে সূর্য গরম হচ্ছে আর আলো ছড়াচ্ছে। যে আজ্ঞে, যেরকম ভাবেন সেরকমভাবে সূর্য মোটেই দাউদাউ করে জ্বলছে না। সূর্যকে একটা বিশাল লোহার বল হিসেবে ভাবুন যেটার ভিতরে দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে গরম হচ্ছে। সেই গরম সূর্যের ঊর্ধ্বপৃষ্ঠে আসতে আসতে ছ-হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামে। সেটাই ওরকম গরম হওয়া লোহার বলের মতো তাপ আর আলো দেয়।
ওই দেখুন, বিজ্ঞানের বিশেষ জ্ঞান দিতে শুরু করেছি। যা-ই হোক, প্রশ্ন ছিল যে সূর্য আসলে একটা উত্তপ্ত ধাতব বলয়, নাকি একটা মানবসুলভ দেবতা?
এ এক বিরাট তর্ক। প্রথম লজিক দিয়ে যদি ভাবেন তাহলে সূর্য যে আসলে একটা নক্ষত্র আর তার চারিদিকে পৃথিবী ঘুরছে, এই ব্যাপারটা প্রমাণ করতে বহু মনীষী প্রাণ দিয়েছেন। সনাতন ধর্মে দিতে হয়নি, আমরা বিজ্ঞানকে সহজেই মেনে নিয়েছি, বৈদেশিক ধর্মে এই নিয়ে রীতিমত প্রাণ হানাহানি হয়েছে। তাহলে কি সনাতন ধর্মের সূর্যদেব, গ্রীকদের রথে করে সূর্য নিয়ে ঘুরে বেড়ানো হিলিয়স, রোমানদের সল, মিশরীয়দের আমুন-আতেন-আতুম, আজটেকদের কি যেন একটা কঠিন নাম (আমার জিভ আর পেন জড়িয়ে যায় ওই নাম বলতে বা লিখতে), মায়াদের আহ কিন— এরা সবাই কি গাঁজাখুরি? নাকি এই সব প্রাচীন সভ্যতা সূর্য উপাসক ছিল বলে, আর সূর্যের থেকে এই জীবজগৎ সমস্ত শক্তি পায় জেনে কল্পনা করে তাকে মানুষের মতো দুটো করে হাত, পা আর একটা মাথা দিয়ে দেবতা বানিয়েছে? অথবা দানিকেন সাহেব আর ঐতিহাসিক চ্যানেল যেরকম বলে সেরকম অন্য গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীরা এসে সূর্য থেকে পারমাণবিক শক্তি আহরণ করে প্রাচীন মানুষদের কাছে নিজেদের দেবতা বলে প্রমাণ করেছে। এই তর্কের কোনো শেষ নেই।
সুতরাং আপাতত এই সমগ্র রচনায় এবং আমার সমস্ত পৌরাণিক লেখায় ধরে নেবেন যে দেবতারা আসলে উচ্চপর্যায়ের শক্তিসমৃদ্ধ জীবসত্ত্বা। ব্যস আলোচনা শেষ, এবার গল্প শুরু। সূর্যদেবের সাথে ত্বষ্টার মেয়ে সংজ্ঞার বিয়ে হয়। সংজ্ঞা মানে ‘মানে’। মানে মানে-মানে কেটে পড়তে চাইছি না, সংজ্ঞা কথাটার মানেই হল অর্থ। পয়সাকড়ির অর্থ নয়, মানে বোঝানো অর্থ। সংজ্ঞার আরেক নাম সুরেণু বা শরেণ্যু, সে আবার মহিলা সাধু। ত্বষ্টা কে? পুরুষ সুক্ত (শুক্তো নয়) বলছে ত্বষ্টা হল সৃষ্টির সৃজনশীলতার সাক্ষাৎ রূপ, সে আবার বিশ্বকর্মার নাভি থেকে বেরিয়েছিল। মানে বিশ্বকর্মার ক্লোনও হতে পারে, আবার বিশ্বকর্মার অন্য পদও হতে পারে। মানে যখন বিশ্ব বানাচ্ছে তখন বিশ্বকর্মা আর যখন দেবতাদের কিছু বানাচ্ছে তখন ত্বষ্টা।
যা-ই হোক, সূর্যের সাথে সংজ্ঞার বিয়ে তো হয়ে যায়, কিন্তু যে সূর্যদেবকে হট এলিজিবল ব্যাচেলর দেখে ত্বষ্টা হুট করে নিজের মেয়ের বিয়ে দিল সেই সূর্য যে হুট করে এত হট হয়ে যায় সেটা সংজ্ঞার জানা ছিল না। মানে সত্যিই এত গরম, যে সূর্যের ধারে কাছে যাওয়া যায় না। প্রখর গ্রীষ্মের পিচগলা রোদ্দুরে যে গরম টের পান, সেটা পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরে থেকে। তাও আবার গল্পের সময়ের সূর্য এখনকার থেকে বারো গুণ বেশি গরম ছিল। অর্থাৎ সংজ্ঞা যদি সাধারণ মানুষের থেকে বারো গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল নিজ তপোগুণে তাহলে ওকে ওই পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরে থাকতে হত নিজের বরের থেকে। লং ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপের এ এক অনন্য নজির।
– কিন্তু সংজ্ঞারও তো ইচ্ছে হয় মাঝে মাঝে বরের কাছে যায়, কিন্তু বর গরম হয়ে আবহাওয়া সরগরম করে রেখেছে। সেই গরমে সংজ্ঞা মরমে মরমে দুঃখ পেল আর তার রূপ কালো হতে শুরু করল। অতিরিক্ত সূর্যস্নান করলে যা হয় আর কি, তার মধ্যে অতিবেগুনি, লাল নীল কীসব রশ্মি। গোটা সৌরজগতের একত্রিত করা দৈবিক সৌরপর্দা সৌন্দর্যবর্ধক তরল ঔষধও কাজে দেয় না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সূর্যের ক্ষমতায় সংজ্ঞার চারটে ছেলেপুলে হয়ে যায়– বৈবস্বত মনু, শ্রাদ্ধদেব, যম আর যমী (বা যামী বা যমুনা)। কী করে সন্তানাদি হল জিজ্ঞেস করবেন না, এসব দৈব ব্যাপার। শুধু দৃষ্টিতে, পাখির পায়ে বেঁধে ঔরস পাঠিয়ে, কথা বলে, পায়েস খাইয়ে, যজ্ঞের আগুনে ঘি ঢেলে সন্তান পাওয়া যেত। ভাগ্যিস এখনকার মানুষের কাছে সেইসব অদ্ভুত ক্ষমতা নেই। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্ত পুরুষকে জন্মনিয়ন্ত্রণ চশমা বা মুখমণ্ডল আবরক পরে বেড়াতে হত। না দাদা, তেড়ে আসবেন না, এখনকার শতকরা নব্বই শতাংশ পুরুষেরই চরিত্র খারাপ, শুধু ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকে। বাকি দশ শতাংশ এই আমার মতো, কনফিডেন্সের অভাবে ভোগে। আর নয়তো দেখতেন সন্ধেবেলা গ্যাসে রান্না করছেন, আর সেই গ্যাসের ওভেন থেকে লাফ মেরে এক ধেড়ে খোকা বেরিয়ে বলল, “আমি আপনার সন্তান মাতা…”। ব্যস, তারপরে স্বামীর সাথে আপনার গৃহযুদ্ধ, এই ছেলে কার? ছেলের বাবা কে? যে প্রতিবেশীর প্রতি আপনার স্বামীর বরাবর সন্দেহ ছিল তাকে আড়ংধোলাই দেওয়া, পুলিশ কেস, ছেলের ডি এন এ টেস্ট— কত কী ঘটে যেতে পারত। ভাবতে অবাক লাগে, তখনকার মানুষ যদি এতটাই মুক্তমনা ছিল এবং এটা বিশ্বাস করত যে যখন তখন দৈবযোগে সন্তান হতে পারত, তাহলে কোন লজিকে কুন্তী তার বড় সন্তানকে লজ্জার ভয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিল? লজিকের অষ্টোত্তর শিশ্নমস্তক হয়ে যায় এত ভাবলে।
যা-ই হোক, বরের কাছে যেতে পারে না, দূরে দূরে টেলিপ্যাথিতে ওয়ারলেস মাধ্যমে সন্তান পেয়ে সংজ্ঞার মন খারাপ হয়। সংজ্ঞা তাই গোপনে নিজের কালো রূপ থেকে নিজের একটা ক্লোন বানায়। অর্থাৎ যমজ। সংজ্ঞা স্বামীর তাপে ও চাপে এমনিই পুড়ে গেছিল, এই ক্লোনও সেই পোড়া কৃষ্ণাঙ্গী হল। এর নাম ছায়া। ছায়াকে সংজ্ঞা বলল, “শোনো ক্লোন, তুমি এখানে থেকে আমার প্রক্সি দাও। জিনগত ভাবে তুমি আর আমি এক, সুতরাং সূর্যদেব বুঝতে পারবে না। আমি ততদিন একটু বাপের বাড়ি ঘুরে আসি। বাবার সাথে এই সমস্যাটা নিয়ে কনসাল্ট করা দরকার। তুমি আমার ছেলেপুলের দেখাশোনা করো। আর সূর্যদেব যেন জানতে না পারে এই প্রক্সির ব্যাপারটা।”
ছায়া বলে, “ওকে, কিন্তু সূর্যদেব যদি আমার কেশ স্পর্শ করে বা আমাকে অভিশাপ দেয় তবে কিন্তু আমি সব ফাঁস করে দেব!”
সংজ্ঞা বলে, “না না, সূর্যদেবের ওসব গৃহপালিত হিংস্রতা নেই। দেবতাটা দেখতেই ওরকম গরম, ভিতরে একদম নরম, হাইড্রোজেনের মতো হালকা—”
ছায়া বলল, “অন্ধেরা কায়াম রহে… তাই হবে সংজ্ঞা—”
সংজ্ঞা ছায়ার কাছে বাড়ির চাবি আর ছেলেপুলের দায়িত্ব দিয়ে স্যুটকেস গুছিয়ে সুট করে কেটে পড়ে। সংসার করতে করতে যেমন বেশিরভাগ মহিলাদেরই ইচ্ছে হয় কদিনের ছুটিতে নিশ্চিন্তে একা বেরিয়ে পড়তে তেমনি করে সংজ্ঞা বেরিয়ে পড়ল। তারপর ট্রেন, বাস, অটো, ওলা, নৌকা, রিকশা কত কী চড়ে বাপের বাড়ি পৌঁছাল। সবে রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দিচ্ছে সংজ্ঞা এমন সময়ে তার বাবা ত্বষ্টা কুটিরের দরজার থেকেই বলল, “তুই এখানে কেন?”
আপনাকে ব্যাপারটা এখনকার পরিপ্রেক্ষিতে ভাবলে হবে না। এখন যেমন মহিলারা ইচ্ছে করলেই বা ঝগড়া হলে বা বাবা-মাকে দেখতে ইচ্ছে হলেই বাপের বাড়ি যায় এবং সেটা নারীর মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে, তখনকার দিনে কিন্তু সেরকম ছিল না। আরে তখনকার দিন ছাড়ুন আজ থেকে তিরিশ বছর আগেও কোনো মেয়ে হঠাৎ জামাই ছাড়া একা বাপের বাড়ি এলে মেয়ের মায়ের প্রথম চিন্তা হত এই যে, জামাই বাবাজীবন বুঝি আমার মেয়েকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। তিরিশ বছর ছাড়ুন, এখনও কোনো মেয়ে বিয়ের পরে তার বাপের বাড়িতে গিয়ে মাসখানেক থাকলেই আশেপাশের শুভান্যুধায়ী পরকেচ্ছা উপভোগী মেষচর্মে বৃকমনস্ক কারুন্ডীসম প্রতিবেশী এসে জিজ্ঞেস করবেই, “হেঁ হেঁ, মানে আপনার মেয়ে এতদিন ধরে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে এখানে…হেঁ হেঁ হেঁ…”
ভুলেও ভাববেন না এরা আপনাকে কোনো বিপদে সাহায্য করার মানসিকতা নিয়ে এসেছে। এরা হচ্ছে সাংবাদিকের মতো। অপেক্ষা করে কখন আপনি একটা বেফাঁস কথা বলে দেবেন আর সেইটা নিয়ে আপনার মেয়ের কেচ্ছা বা জামাইয়ের পরকীয়া যদি একবার যোগাযোগ করাতে পারে তাহলে পাড়ার বিকেলগুলো জমে ক্ষীর। দু-চারবার মেয়ে জামাইয়ের ফোনের তপ্ত কথা কান পেতে রপ্ত করে নিতে পারলে তো সেই ক্ষীরের উপরে কেশর আর বাদামও দেওয়া হয়ে যায়। সোনায় সোহাগা। পরের ছেলে পরমানন্দ, যত খারাপ হয় তত আনন্দ… এ জিনিস বহুকাল ধরেই ভারতবর্ষে করোনা ভাইরাসের থেকেও বেশি ঢুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
এখনই এই, তাহলে ভাবুন সংজ্ঞার সময়ে কী হয়েছিল? দক্ষ আর সতীকে দেখে বোঝেননি? তোমার বাপু শিবের উপরে রাগ, তাই বলে সতীমাতা কী দোষ করেছিল? না, মেয়ে চয়েস ভুল করেছে, বেজাতের ছেলেকে বিয়ে করেছে, তাই দুটোকেই ত্যাজ্য। সতী জ্বলে গেছিল, আর একই কারণে এখনও নিজের সম্মান রক্ষা করতে সমগ্র ভারতে কত কোটি মেয়ে আর জামাইকে যে খুন করা হয় আর জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তার লেখাজোখা খবরের কাগজে বিশাল বিজ্ঞাপনের পাশে এক কোণে একটা ছোট্ট খবর হয়ে হারিয়ে যায়। এই দেশে চিরকালই বাবা-মায়ের পছন্দ করা পাত্র (পাত্রী) কে প্রাধান্য দেওয়া হয়, প্রেম-ভালোবাসা বাংলার বাইরে একটা গর্হিত কাজ হয়ে থেকে যায় (কতদিন আর থাকতে পারবে সন্দেহ হয়), আর জামাই যেমনই হোক “সোনার আংটি ব্যাকা হয় না” বলে চালানো হয়। জামাই সবসময় সঠিক, সে মারধোর করুক, মদ খাক, চরিত্রহীন হোক, বামুন হয়ে দশ গাঁয়ে পঞ্চাশটা বিয়ে করুক, শ্বশুরের পয়সায় বাড়ি-ঘর-বাইক কিনে ব্যবসা করুক, যাই করুক না কেন এ দেশের মেয়ের মা-বাবারা চিরকালই জামাইকে তুষ্ট করে করে, নিজের গর্ভজাতা কন্যাকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।
সংজ্ঞার ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হল না। রিকশা থেকে নামতেই ত্বষ্টার ইন্টারভিউ, আর তারপরেই প্রশ্ন “জামাই কই?”
বলি সংজ্ঞার সাথে সূর্যদেব নিজেই যদি ত্বষ্টার বাড়ি আসত তাহলে মোটামুটি আর্যবর্তের পুরোটাই তো জ্বলে খাক হয়ে যেত? ত্বষ্টা কি বোঝেনি যে সূর্যদেবের পক্ষে সংজ্ঞাকে ছাড়তে আসা মুশকিল? সংজ্ঞা নেমে এসে বলল, “আমি কদিনের জন্য ছুটি কাটাতে এসেছি স্বামীকে না জানিয়ে…”
স্বামী মানে জানেন তো? প্রভু। স্ত্রীয়ের জন্য স্বামী হল প্রভু। পুরাণ মতে… আমাকে মারতে আসবেন না। সেই প্রভুকে না জানিয়ে আসা মানে হল মাইনে করা গোলামের ছুটির দরখাস্ত দিয়ে অনুমতি না নিয়ে আসার মতো। ত্বষ্টা রেগে সংজ্ঞাকে হেব্বি বকা দিল, “স্বামীর হামি ছাড়া যামীর মা তুমি নিজেকে বড় বোদ্ধা ভাবো? এক্ষুনি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাও!”
সংজ্ঞা কান্নাকাটি করে ওই রিকশাতেই আবার ফিরতি পথে ফিরে গেল। কেউ ওকে ভালোবাসে না, তাই সংজ্ঞা “লোনলি আই অ্যাম সো লোনলি, আই হ্যাভ নো বডি…” গাইতে গাইতে চলল। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল, “দিদি আপনার তো বডি আছে… নো বডি বলছেন কেন?”
সংজ্ঞা বলল, “মূর্খ, আমার বডি তো ছায়ার কাছে!”
“আপনি নামবেন কোথায়?”
“উত্তরকুরু।”
“পঞ্চাশ টাকা ভাড়া কিন্তু…” বলে রিকশাওয়ালা সংজ্ঞাকে উত্তরকুরুতে ছেড়ে দেয়। সংজ্ঞা মনের দুঃখে সেখানে ঘোড়া হয়ে ঘোরাঘুরি করতে লাগল আর ঘাস খেতে লাগল।
এদিকে কালান্তরে দুর্ধর্ষ দৈত্যরাজ মহিষাসুরের পরাক্রমে দেবতারা…
ধুর অন্যলাইনে অন্য গল্পে চলে গেছিলাম, ক্ষমা করবেন। এই পুরাণের গল্প বলতে বলতে কোনদিকে যে চলে যাই। যা-ই হোক, এদিকে সূর্যের সাথে ছায়ার সংসার জমে ক্ষীর। ছায়া তো অন্ধকার, আর ব্রহ্মাণ্ডে এরকম অন্ধকারের মধ্যে কত কোটি কোটি সূর্য থাকে। তাই সূর্যদেবের তেজে ছায়ার কিছুই হল না। সূর্যদেবও বুঝল না যে এটা তার বউ নয়, বউয়ের ডুপ্লিকেট। কী দরকার বুঝে? ছেলেপুলে হলেই হল। হয়েও গেল। সূর্যদেবের কল্যাণে ছায়ার দুটো ছেলে হল, সাবর্ণি মনু আর বারের ঠাকুর (ছোটবেলায় মা বলেছিল নাম নিতে নেই)। “শুধুই নয় টিউশনি সঙ্গে আছে ছায়া…” বাকিটা আপনারা জানেন।
ছায়া কিন্তু নিজের ছেলেদের প্রতি বেশি যত্নবান হল, সংজ্ঞার ছেলেদের পাত্তা দিত না। তাতে অবশ্য বৈবস্বত মুনির বা শ্রাদ্ধদেবের কিছু মনে হল না। সংসারের বড় সন্তানেরা সবসময় ছোটদের জন্য জায়গা করে দেয়। কিন্তু সমস্যা হল যমকে নিয়ে (যামী তো মেয়ে তার সমস্যা লেখার জায়গা পুরাণ নয়)। যম এতদিন ফ্যামিলির সবথেকে আদরের ছোট ছেলে ছিল। হঠাৎ তার মায়ের এরকম দুটো আরও সন্তান আমদানি হওয়াতে এবং তাদের প্রতিই মায়ের অধিকতর ভালোবাসা দেখে যম নিজেকে বঞ্চিত বোধ করল। বঞ্চিত যম কুঞ্চিত মন ও সঞ্চিত দম নিয়ে তার মা ভেবে মায়ের ডুপ্লিকেট ছায়াকে লাথি মারতে উদ্যত হয়। ভাবুন কেসটা, এই যদি কোনও রাক্ষস করত, দৈত্য করত, তাহলে পুরাণকার তাকে তৎক্ষণাত খারাপের দলে ঠেলে দিতেন। কিন্তু যম তো দেবতা। ঘটনার সময়ে সে মৃত্যুলোকের রাজা হয়নি। যমের রাজা হওয়ার গল্প অন্যদিন বলব।
যমের মত্ত হাতির ন্যায় উদ্যত লাথি দেখে ছায়া সঙ্গে সঙ্গে যমকে অভিশাপ দেয়, “তোর পা পোকায় খাবে!”
যম মাঝপথেই লাথি ফিরিয়ে নেয়। যাহ্, মা অভিশাপ দিয়ে দিল? যম সঙ্গে সঙ্গে বাবার কাছে দৌড়ল, “আ… বাবা দেখো না… মা অভিশাপ দিল আমায়…”
“কেন রে, কী হল?” সূর্যদেব জিজ্ঞেস করে।
“আমি মাকে লাথি মারব বলে পা তুলেছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করো বাবাআআআ… আমি লাথি মারিনি…” যম বিলাপ করতে করতে বলে, “তুমি বলো বাবা, আমি নাহয় খারাপ ছেলে, কুপুত্র যদি বা হয় কুমাতা কখনও নয়, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন রচনাবলিতে প্রথম খণ্ডে। মা হয়ে আমাকে এরকম অভিশাপ দেওয়া কি উচিত? আমার এই অভিশাপের পিছনে ছায়া পোকাশনির অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য। তুমি এক্ষুনি এই অভিশাপ ফিরিয়ে নাও, নইলে আমি যে কাকাবাবু হয়ে যাব—”
সূর্যদেব বলল, “দেখ তোর মা যখন অভিশাপ দিয়েছে তখন আমার কিছু করার নেই। এটা ফলবেই, নইলে প্রোটোকল থাকে না। কিন্তু আমি আশীর্বাদ করছি যে পোকাগুলো তোর পা থেকে মাংস খুবলে খেয়ে পৃথিবীতে গিয়ে পড়বে (পৃথিবী কি আস্তাকুঁড় নাকি ধাপার মাঠ, যে দেবতাদের ফ্যামিলি কেচ্ছার ফলস্বরূপ যত বর্জ্য পদার্থ এখানে এসেই জমবে?) আর তুই হ্যাপি থাকবি।”
এরপরে সূর্যদেব ছায়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি তোমার ছেলে যমকে অভিশাপ দিয়েছ…”
“বেশ করেছি!” মনে মনে সংজ্ঞারূপী ছায়া বলে, কিন্তু মুখে কিছু বলে না । সূর্যদেব বহুবার জিজ্ঞেস করলেও ছায়া একদম চুপ করে থাকে। বয়েই গেছে তার সূর্যদেবকে জবাবদিহি করতে। সূর্যদেব চোখ বুজে ধ্যান করে বুঝল যে তার বউ আসলে তার বউ নয়, বউয়ের জেরক্স কপি। সূর্য তখন ছায়ার চুলের ঘেঁটি ধরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে?”
আহা ঘেঁটিই তো ধরেছে, সূর্যদেব, ও ফ্যামিলিতে একটু আধটু নারী নির্যাতন চলতেই পারে। ছেলে মাকে মারতে যাচ্ছে, বাবা বউকে পেটাতে যাচ্ছে— সবই দেবতাদের লীলা, ওটা পাপ নয়। আশীর্বাদ হিসেবেই দেখুন… (এইভাবেই যুগে যুগে ঠিক এই কুন্তলসম লজিক দিয়ে পুরুষদের শ্রেষ্ঠ ও নারীদের পুরুষের দাসী হিসেবে প্রমাণ করা হয়েছে।)
যা-ই হোক, শর্ত অনুযায়ী ছায়ার কেশ ধরতেই ছায়া গড়গড় করে সূর্যদেবকে সব জানিয়ে দেয়। এটাও জানিয়ে দেয় যে তার আসল বউকে এখন ঘোরা রোগে ধরেছে তাই সে ঘোড়া রূপে ঘুরছে উত্তরকুরুতে। সূর্য সঙ্গে সঙ্গে ত্বষ্টাকে ফোন করে বলল, “এক্ষুনি আসুন, আপনার মেয়ে বাড়াবাড়ি করেছে…”
হট জামাই আরও হট হয়ে গেছে, আর জামাইগুলো চিরকাল এরকমই হয়। বউকে ভালোবাসতে না পারলে, নিজেই বউকে মারধোর করলে, বউয়ের খুঁত ধরে শ্বশুরবাড়ির লোক ডেকে বলবে, “আপনারা মানুষ করতে পারেননি… এইসব পিতৃমুষ্কসম রূপাজীবী বুদ্ধিজীবী জামাইরা এটা বোঝে না যে তার পরিবারে তার নিজেরই শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি। হবেই বা কী করে, অদিতির গর্ভে থাকতেই তো বুধের অভিশাপে সূর্য মরে গেছিল, নেহাত কশ্যপ ওকে পাণ্ডুরূপে বের করে মার্তণ্ড নাম দিয়েছিল তাই, নইলে শ্বশুরকে ডেকে পাঠানো হয়ে গেছিল সূর্যদেবের!
ত্বষ্টা আসতেই সূর্যদেব ঝাঁঝিয়ে উঠল, “তোমার মেয়ে আমাকে ঠকিয়েছে, প্রতিশোধ চাই… তোমাকে আমি জ্বালিয়ে দেব!”
ত্বষ্টা হাত তুলে বলে, “থাম, অনেক বকেছিস। তোর ওই গরম আমাকে দেখাতে আসিস না। এক্ষুনি অভিশাপের একটা ফায়ার এক্সটিংগুইশার ঝাড়ব, চাঁদের মতো কলা নিয়ে বেড়াবি…”
সূর্য ঠান্ডা হয়ে বলে, “চাঁদ আবার কলার ব্যবসা শুরু করল কবে?”
“চন্দ্রকলা শোনোনি? এ কলা সে কলা নয়,” ত্বষ্টা বলে, “ছট পুজোয় কাঁদি কাঁদি কলা খেলে এই হয়, কলার চিন্তায় বিভোর। এদিকে আমার মেয়েটা যে তোমার গরম সহ্য না করতে পেরে পীতবনে ঘাস খাচ্ছে সে খবর রাখো?”
সূর্য দুর্দান্ত লজ্জা পায়। তাই তো, স্বামী হিসেবে সে তার কর্তব্য করেনি, আবার বলতে গেলে একপ্রকার বউয়ের যমজ শ্যালিকার সাথে ইয়ে করে ছেলেপুলেও করে ফেলেছে। সূর্যদেব বলে, “ক্ষমা চাইছি, কী করলে সংজ্ঞা আমার কাছে ফিরে আসবে?”
ত্বষ্টা বলল, “তুমি বাপু ওভারওয়েট, তোমাকে ওজন কমাতে হবে, তবেই তোমার গরম পৃথিবীর পক্ষেও ভালো হবে আর আমার মেয়ের পক্ষেও।”
সূর্য রাজি হয়, ত্বষ্টা তার ছুরি ধার দেওয়ার সাইকেলটা নিয়ে আসে, তারপরে পাথরের উপরে ঘষে ঘষে সূর্যকে বারো ভাগে ভাগ করে দেয়। এরা হল বারোটা আদিত্য— ধাত, আর্যমা, মিত্র, বরুণ, অংশ, ভগ, ইন্দ্ৰ, পুষ, পারজন্য, ত্বষ্টা (এটা কি কেস বুঝলাম না, একই নাম?), বিষ্ণু আর বিবস্বান। এই শেষ জন হল আসল সূর্যদেব যাকে ভেঙে বারো ভাগ করা হল সে। এরা প্রত্যেকে বছরের একেকটা মাসে ওঠে। পুরাণ মতে সব মাসের সূর্য এক নয়, এদের ডিউটি পড়ে একেকমাসে।
সূর্যদেব নিজের মেদ আর তেজ লাইপোসাকশন করিয়ে একদম ফিট আর ছিপছিপে হয়ে সংজ্ঞার খোঁজে চলল। কিন্তু সংজ্ঞা তো ঘোড়া, তাই সূর্যদেবও ঘোড়া রূপ নিয়ে উত্তরকুরু গেল। সেখানে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বিরহিনী সংজ্ঞা চরে বেড়াচ্ছে। ঘোড়ারূপী সূর্যদেব সেখানে দাঁড়িয়ে প্রেমের সাথে গেয়ে উঠল, “তুমি আমার আশা…আমি তোমার ভালোবাসা…”
পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হল, “আশা…আশা… ভালোবাসা…”
সংজ্ঞা নিজের স্বামীকে চিনতে পেরে ছুটে ছুটে আসে, সূর্যদেব তখনও গাইছে, “আমার ফুলের বাগান দিয়ে ছুটে এসো না…”
তারপরে আর কি টিরিং টিরিং, আবার ফট করে ঘোড়ামুখো যমজ সন্তানের জন্ম। এরা হল ঘোড়ামুখো ডাক্তার অশ্বিনীকুমার, নকুল সহদেবের বাবা। বৈবস্বত আর সাবর্ণি মনু নিজেদের নিজেদের মন্বন্তরের মনু হল। না, ভুল বলা হল, সাবর্ণি মনু এখনও মেরু পর্বতের উপরে তপস্যা করছে, তার মন্বন্তর আসতে বাকি আছে। বারের ঠাকুর গ্রহ হল, যমুনা হল নদী, যম হল মৃত্যুলোকের দেবতা। আর সেই সূর্যকে ভাগ করে বারোটা বাজাবার সময় যে চূর্ণ বেরিয়েছিল সেগুলো দিয়ে একত্র করে শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র আর কুবেরের পুষ্পক রথ তৈরি হল।
