ইক্ষকুর গল্প আর চন্দ্রদেবের কেচ্ছা
শ্রাদ্ধদেব মনু একদিন হাঁচি দিল…
শ্রাদ্ধদেব মনু আর বৈবস্বত মনু একই লোক। দুম করে ভাববেন না, এই মনুটা আবার কোথা থেকে এল? বিখ্যাত লোক হাঁচি দিলেই কিছু না কিছু দুর্দান্ত ঘটনা ঘটে। যেমন সেবার গোটা ভারতবর্ষের সমস্ত মানুষের ফোনে বিখ্যাত বৃদ্ধ ‘রাগী যুবক’ করোনার বিরুদ্ধে সাবধানবাণী শুনিয়ে নিজেই হাঁচি দিলেন, সেরকমই বিখ্যাত ঘটনা আর কি। হাঁচি কি আর এমনি এমনি বিখ্যাত হয়? পৃথিবীতে কটা হাঁচি বিখ্যাত হয়েছে বলুন তো? ফ্রেড ওটের হাঁচির পরে এমন কোনো হাঁচি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। কিন্তু হরিবংশ স্পষ্ট বলছে মনু হাঁচি দিল, আর সেই হাঁচি থেকে ইক্ষকুর জন্ম হল।
ব্যাপারটা ভাবুন কিছুক্ষণ… এতদিন পুরাণের কল্যাণে যজ্ঞ থেকে, পায়েস থেকে, দৃষ্টি থেকে, ভাসমান উর্জা থেকে, হাঁড়ি থেকে, উড়ন্ত পাখির দুরন্ত পায়ে বাঁধা উর্জা থেকে, মাছের থেকে, ঘামের থেকে, পানীয় জল থেকে… চারিদিক থেকে সন্তান হওয়ার গল্প শুনেছেন। আজকে জানলেন যে হাঁচি থেকেও সন্তান হয়। আমি ঠিক জানি না, তবে হাঁচির সময় পুরো শরীর থেকে সবকিছু পুরো ফোর্সে বেরিয়ে যায়। সঙ্গমকালীন তীব্র হাঁচি দিলে কি শরীরের উর্জাও দুর্বার গতিতে বেরিয়ে পড়ে? তাই হবে হয়তো। আমরা আগেও প্রমাণ পেয়েছি যে বিখ্যাত লোকের উর্দ্ধাস্খলন শীঘ্র (জলে বা মাটিতে) পতন হলে, সেই মহানুভবরা সেটি অপচয় না করে এখানে ওখানে দান করে বা ধারণ করে সন্তানের জন্ম দিতেন। ওই ধরন-ধারণের ধারণা থেকেই বোধহয় মনুর সন্তান ইক্ষকুর জন্ম, হাঁচিটা বাহানা। নাক থেকে সন্তান কী করে বেরোবে? সন্তান নাকি সর্দি? চাইলেই ফ্যাচ করে বেরিয়ে গেল? ভাগ্যিস আজকালকার দিনে এই ব্যবস্থা নেই। প্রতি সিজন চেঞ্জে যে হারে আমার হাঁচি চলে, দিনে রাতে পঞ্চাশটা করে সন্তানের পিতা হয়ে বসে থাকতাম।
যা-ই হোক, এসব বিখ্যাত মানুষদের ব্যাপার। ইক্ষকুর নাম আপনারা অনেক শুনেছেন নিশ্চয়। রামচন্দ্রের ফোরফাদার। ইক্ষকুর আবার একশোটা ছেলে হয়। মেয়েদের জন্ম লেখা নেই, এত এত ছেলেদের জন্ম, তাদের বউগুলো কোথা থেকে আসত? খুব তেজস্বিনী না হলে মেয়েদের কথা পুরাণগুলো ব্রাত্য করে রেখেছে। সেই একশোটা ছেলের মধ্যে সবথেকে বড় ছেলের নাম ভিকুক্ষী। নাম রাখার কী দরকার ছিল? সংখ্যা রেখে দিলেই পারত। এই ভিকুক্ষীকেই একদিন রাজা ইক্ষকু যজ্ঞের সময় বলল, “যাও, গিয়ে হরিণ নিয়ে এসো। যজ্ঞে লাগবে…”
ভিকুক্ষী হরিণ ধরতে চলল, কিন্তু একটাও হরিণ পেল না। এই পৌরাণিক রাজাগুলো হরিণ ধরতে গেলেই হরিণ পেতনা, বা একটা পেয়ে তার পিছনেই ছুটত, অথবা হরিণ ভেবে একে ওকে তির মেরে অভিশাপ নিয়ে ফিরত। কিন্তু ভিকুক্ষী বুদ্ধিমান ছিল। হরিণ না পেয়ে কয়েকটা খরগোশ মেরে আনল। খরগোশ দেখেই ইক্ষকুর রাগ হল, “অ্যাঁ? তোকে হরিণ আনতে বললাম, তুই খরগোশ আনলি? বলি, খরগোশ আর হরিণ এক হল?”
এই সময়ে কুলপুরোহিত বশিষ্ঠ বলল, “রাজা, আপনার এই কাপুরুষ সন্তানের নাম আজ থেকে শশদ করে দিন। তবেই এর যোগ্য শাস্তি হবে!”
রাজা ইক্ষকুও বশিষ্ঠের কথায় নেচে ছেলের নাম এফিডেবিট করে শশদ করে দিল। শশক থেকে শশদ। এরকম শশদ নামাঙ্কন করে যে কী ভসদহত্যা করল রাজা ইক্ষকু, জানি না। কিন্তু আমার দুটো প্রশ্ন আছে। প্রথম প্রশ্ন হল, ইক্ষকু যদি আমার বাড়ির লোক হত, আর বাজারে গিয়ে আমি যদি ভালো মাছ না পেয়ে পুঁটি বা চুনো নিয়ে আসতাম, তাহলে কি আমার নাম পোঁটা বা চোনা হয়ে যেত? কোনো আলোচনার সুযোগ না দিয়েই চোনা করে দিত। কী জ্বালা! অদ্ভুত সিস্টেম। দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, এই বশিষ্ঠ মহাশয় কি হাজার হাজার বছর ধরে ইক্ষ্বাকু বংশের কুলপুরোহিত? মানে ইক্ষকুকেও জ্ঞান দিচ্ছে, রঘুকেও জ্ঞান দিচ্ছে, দিলীপকেও জ্ঞান দিচ্ছে, জনককেও জ্ঞান দিচ্ছে? লোকটা কি অমর? কই, চিরঞ্জীবে এর নাম নেই তো! সপ্তর্ষির বাকিদের যেমন বিশ্বামিত্র, দুর্বাসা এদেরও একই ঘটনা। কিন্তু তারা মুক্ত ঋষি ছিল, ধরে নিলাম কোনোভাবে টাইম ট্রাভেল করতে পারত। কিন্তু বশিষ্ঠ এরকম একটা বেশ পাকাপোক্ত চাকরি কী করে করতে পারে এত এত বছর ধরে? বশিষ্ঠ কি আসলে একটা উপাধি? একটা বংশ? মিত্র-বরুণ-ঊর্বশীর ত্রৈমাত্রিক সংগমের ফল একটা বংশ?
হতেই পারে। অসম্ভব কিছুই না। তার মানে বশিষ্ঠ অমাবসুর সৎ দাদা ছিল। অমাবসু কে ছিল? পুরুরাভর ছেলে। আগামী পর্বে ওর গল্প বলব। পুরুরাভর প্রসঙ্গ উঠলই যখন তখন তার গল্পটা বলেই ফেলি। গল্পের শুরু সেই চাঁদের জন্ম থেকে। গুছিয়ে বলি।
ব্রহ্মাদেবের মানসপুত্র হল অত্রি। সেই অত্রি ঋষি একবার তিন হাজার বছর ধরে মৌনব্রত পালন করে হাত তুলে তপস্যা করা শুরু করে। তিন হাজার বছর… আর এদিকে আমি তিন মিনিটও চুপ করে থাকতে পারি না। সেই তপস্যার জোরে অত্রি ঋষির শরীর থেকে জোরে জোরে জোরালো কিন্তু স্নিগ্ধ আলো বিচ্ছুরণ হতে থাকে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ওরকম হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকলে চূড়ান্ত নিউমোনিয়া হয়ে জ্বর আসতে বাধ্য, আর জ্বর যদি সেরকম চড়ে তাহলে শরীর গরম হতে হতে লাভার মতো আভা দেবে তাতে আর আশ্চর্য কি? কিন্তু সেই আভা অত্রির শরীর থেকে আকাশে দশদিকে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আলোর ভোল্টেজ আরও বাড়লে সেই আলো একটা দৈব রূপ নেওয়ার চেষ্টাতে ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল। মানে বেশ পূর্ণিমা রাতে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি… রোমান্টিক ব্যাপার।
সেই স্নিগ্ধ দৈব আভাকে দশমাতৃকা দশদিকে ধারণ করেন। কার্তিক ঠাকুরের জন্মের মতো। কিন্তু দশজন দেবী মিলেও সেই আলোর ভালো ওজন রাখতে পারল না। শেষে দশজনের সেই সম্মিলিত আলোক ভ্রূণ আকাশ থেকে পৃথিবীর উপরে হুড়মুড় করে পড়তে লাগল। এই ভ্রূণটাই আমাদের বেবি স্টিলবর্ন স্টীলের মতো বর্ন চাঁদমামা। অত্রি বোধহয় তপস্যা করে “চাঁদ কেন আসে না আমার ঘরে…” গাইছিল। চাঁদমামা সেটা পার্সোনালি আক্ষরিক অর্থে ভেবে নেয়।
কিন্তু চাঁদ যদি পৃথিবীর উপরে আছড়ে পড়ে তাহলে তো পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে। তাই পৃথিবীকে বাঁচাতে তড়িঘড়ি নিজের বেদদ্বারা রচিত রথে চেপে অকুস্থলে হাজির ব্রহ্মাদেব। সেই অদ্ভুত রথ আবার ঘোড়ারূপী মন্ত্ররা টানত। সে যে কিরকম বিচিত্র রথ জানি না। ঘোড়ারূপী মন্ত্ররা কী খেত? শব্দ? ওসব ভেবে লাভ নেই। যা-ই হোক, ব্ৰহ্মা এসেই সেই পড়ন্ত চাঁদকে খপ করে ধরে নিজের রথের সাথে বেঁধে ফেলে। অথবা চাঁদকে ব্রহ্মা পৃথিবীর উপর সাবধানে ল্যান্ড করিয়ে নিজের রথে বসায়। এই সময়ে সপ্তর্ষি আর যত বিশেষ বিশেষ দেবতা আছে তারা অনেক স্তব টব করে। বাহ রে, ব্রহ্মা কি আর রোজ রোজ পৃথিবীতে নেমে আসে? মোটকথা সেই রথে করে চাঁদমামা একুশবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে।
এই ঘটনা থেকে অনেকগুলো সমান্তরাল চিন্তা মাথায় আসে। প্রথম কথা এই যে, চন্দ্রদেব জন্মে মাটিতে এসে আবার বাউন্স খেয়ে আকাশে ঘুরে বেড়ায়, এর সাথে কিন্তু আদিম পৃথিবী আর আমাদের উপগ্রহ চাঁদের একটা অদ্ভুত মিল আছে। বিজ্ঞানীরা আন্দাজ করেন যে, রাতের আকাশে যে ঝলমলে উপগ্রহ চাঁদকে আমরা দেখতে পাই, তার জন্ম তিনভাবে হতে পারে। সেই তিনটে সম্ভাবনার মধ্যে একটি ভাবনার ভাব নিয়ে ভাবলেই আমাদের মনোভাবে পৌরাণিক চন্দ্রদেবের জন্মের ভাবনা ভাবোদয় হতে পারে। সেটি হল ‘গ্রেট ইম্প্যাক্ট’ থিওরি, বাংলায় যাকে বলে ‘ব্যাপক আঘাত তত্ত্ব’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন পৃথিবী সবে সবে তৈরি হচ্ছে, তখন মঙ্গলগ্রহের সাইজে একখানা গ্ৰহ যার নাম ‘থেইয়া’, সে এসে নবজন্মা পৃথিবীকে ধড়াম করে মারে। আর সেই মারের চোটে ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেকটা মাটি উড়ে গিয়ে মহাকাশে পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরতে থাকে। শনিগ্রহের মতন। সেগুলোই একত্রিত হয়ে, কয়েকশো কোটি বছরের মধ্যে, আমাদের চাঁদ হয়ে যায়। এবার ভাবুন যে চন্দ্রদেবের ভ্রূণ পৃথিবীর উপরে আছড়ে পড়ছিল, সেটাকে ওই থেইয়া ভাবা যেতেই পারে, আর তার পৃথিবীর সাথে টক্করে চাঁদের জন্ম হওয়াটাও শুধুমাত্র কাকতালীয় হতে পারে না।
আরও অবাক লাগে এটা ভাবতে যে উপগ্রহ চাঁদের মোটামুটি সাতাশ দিন লাগে পৃথিবীর চারিদিকে এক চক্কর খেতে। কিন্তু নবজন্মা চাঁদ তো এখনকার চাঁদের মতো অতদূরে ছিল না, তখন সে ছিল পৃথিবীর আরও কাছে। সুতরাং একুশ দিনে চক্কর খাওয়াটাও অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে। চাঁদ প্রতিবছর আমাদের থেকে চার সেন্টিমিটার সরে যাচ্ছে। চার সেন্টিমিটার নিয়ে সেন্টিমেন্টাল হওয়ার প্রয়োজন বোধ করছেন না? কিন্তু ভাবুন এক কোটি বছরের মধ্যে এই চাঁদ একশো কিলোমিটার দূরে সরে যাবে। দশ কোটি বছরের মধ্যে (যদি ততদিন মানুষের অস্তিত্ব থাকে) এক হাজার কিলোমিটারের বেশি। একটা সময় আসবে, পৃথিবী থেকে চাঁদকে ফুটকুলি তারার মতো দেখতে লাগবে আর রাতের আকাশ জুড়ে অ্যানড্রোমেডা গ্যালাক্সি ছেয়ে থাকবে।
এসব অদ্ভুত ভাবে পুরাণের মিল দেখলে এক এক সময়ে সত্যিই দানিকেনীয় থিওরি সত্যি বলে মনে হয়। কিন্তু তারপরেই আবার মনে হয় ব্রহ্মার রথে চেপে চাঁদ নিজের জ্যোৎস্না আলো ছড়িয়ে ছড়িয়ে আকাশ পরিক্রমা করছিল। (মনে রাখতে হবে তখনও চন্দ্রদেব অভিশাপ খায়নি, তাই রোজ রাতে পূর্ণিমা হত)। সেই রথ বেদ দিয়ে বানানো, আর বেদের রথ থেকে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়া থেকেই কি ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ নামকরণের উৎপত্তি? হতেই পারে। দেবতারা এলিয়েন হলে, আর অত্রি শরীরের চমক বের করে চন্দ্রদেবের জনক হলে, সবকিছুই সম্ভব।
যা-ই হোক, চন্দ্রদেবের জন্ম হওয়াতে সকলেই খুশি। কেন খুশি হল? রাতের বেলায় বেশ মশাল না জ্বালিয়েই চলাফেরা করা যাবে। দরকার পড়লে জ্যোৎস্না রাতে সবাই মাতাল সমীরণে বনে গিয়ে বাঘের খাদ্যও হতে পারে। কিন্তু এত জায়গা থাকতে বন কেন? বিশ্বকবির কবিতা নিয়ে মজা করাটা আমার ধৃষ্টতা, মাপ করবেন। কিন্তু আমার মনে হয় ওই কবিতায় বক্তা চরিত্রটি বুদ্ধিমান। খামোখা জ্যোৎস্না রাতে বনে যেতে যাব কেন? মাতাল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে বনে তো চলে যাব, জ্যোৎস্নালোকে বনের বাঘও তো আমাকে দেখতে পাবে। মাঠে যাব, ছাদে যাব, প্রেমিকার বাড়িতে যাব… বনে যাব কেন? তার থেকে ‘রইনু পড়ে ঘরের মাঝে, এই নিরালায় রব আপন মনে…’ হল বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। এইখানেই আমার লেখার ইতি হবে, কারণ গুরুদেবপ্রেমীরা এবার ধরে আমাকে একপ্রস্থ ঠেঙিয়ে দেবে। কী আর করবে, রবীন্দ্রচেতনা যখন রোদ্দুরে ঝলসে লুপ্ত হয়ে যায়, তখন শিরদাঁড়া আলমারিতে লুকিয়ে, বসন্তোৎসবের নামে নারীর নগ্ন পৃষ্ঠে অমর সৃষ্টির কুরুচি কুকার্য দেখার লালসায় কারোর আর কিছু বলার থাকে না। আর আমার মতো গরীব লেখক জ্যোৎস্না নিয়ে একটা লজিকাল প্রশ্ন করলেই যত দোষ?
কোথা থেকে কোথায় কথা চলে এল। মোটকথা চন্দ্রদেবের জন্মে সবাই খুশি। চন্দ্রদেব জন্মেই এক হাজার পদ্ম বছর তপস্যা করে ফেলল। একশো কোটিতে এক আরব, একশো আরবে এক খারব, একশো খারবে এক নীল, একশো নীলে এক পদ্ম। বিজ্ঞান বলে ব্রহ্মাণ্ডের বয়স চোদ্দ হাজার কোটি বছর। তাহলে কি এটা অন্য প্যারালাল ইউনিভার্সের গল্প? কল্পান্তর?
চন্দ্রদেব তপস্যা সেরে উঠতেই দক্ষরাজ (সতীর সেই অহংকারী বাবা) এসে নিজের সাতাশটা মেয়ের সাথে ওর বিয়ে দিয়ে দিল। সঙ্গে এক কোটি দাসী। কিছুক্ষণ আগেই জিজ্ঞেস করেছিলাম পুরাণে মেয়েরা কোথায়? আমি আমার কথা ফিরিয়ে নিচ্ছি। দক্ষরাজের রাজত্বেই পৌরাণিক বেশিরভাগ দেবী আর দাসী হিসেবে সাধারণ মহিলারা ছিলেন। কিন্তু এই সাতাশজন বউ থাকা সত্ত্বেও চন্দ্রদেব পরকীয়া কেসে ফেঁসে গেল।
হয়েছে কি, তখনকার দিনে যে-কোনও যজ্ঞে নারীর সাথে পুরুষকে থাকতে হত। সমান মর্যাদা, নইলে যজ্ঞ সম্পন্ন হত না। দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি নিজের বউ তারাকে নিয়ে সেইসব যজ্ঞ করত। কিন্তু তারার কোথাও যাওয়ার স্বাধীনতা ছিল না। তারাকে কোথাও একা ছাড়া হত না। এদিকে বৃহস্পতি দিব্যি অফিস ট্যুরের নামে স্বর্গ মর্ত পাতাল ঘুরে বেড়াত। এরকমই একদিন একাকিনী বিরহিনী তারা সন্ধ্যে আকাশের দিকে চেয়ে দেখে, আর ঠিক তখনই চন্দ্রদেবও তারার দিকে তাকায়? ব্যস… আর কি? চন্দ্রদেব “আই তারা…কি বিউটি …” বলে তারার রূপের প্রেমে পড়ল, আরা তারাও চন্দ্রদেবের ঝলকানির প্রেমে আহত হল। চন্দ্ৰাহতও বলা যায়।
দুজনের প্রেম জমে ক্ষীর, বর না থাকার সুযোগে তারার এক্সট্রা ম্যারিটাল ইন্টার প্ল্যানেটারী পরকীয়া শুরু। চন্দ্রদেবের তো সাতাশটা বউ ছিলই, আরও একটা বাড়লে কী যায় আসে? আর বিখ্যাত মানুষদের পরকীয়া হলে সেটা খারাপ ব্যাপার হয় না। খারাপ হয় মধ্যবিত্ত আর গরীবদের পরকীয়া কেস হলে। চন্দ্র-তারার এরকম চলতে চলতে একদিন প্রেম একেবারে তালগাছের মাথায় উঠে গেলে তারা চাঁদের সাথে পালিয়ে গেল। নিন্দুকেরা বলবে, চন্দ্রদেব তারাকে ফুসলিয়ে নিয়ে গেল। আহা, প্রেমই তো করেছে, কাউকে খুন তো করেনি। কিন্তু তারা পালানোর পরেই বৃহস্পতির মাথায় খুন চেপে গেল। প্রকৃত অর্থেই জানালা দিয়ে বউ পালিয়েছে। দেবতা হয়ে চন্দ্রদেব দেবতাদের গুরু-বউকে নিয়ে পালিয়েছে… বৃহস্পতির হেব্বি ইগোতে লাগে। এরপরে আর কেউ তাকে মান্যিগণ্যি করবে? দেবগুরু বলে মানবে কেউ? তার মধ্যে, ব্যাপারটা অসুরদের গুরু শুক্রাচার্য শুনলেই আবার আওয়াজ দেবে।
বৃহস্পতি তাই ইন্দ্রকে ডেকে বলল, “যাও আমার বউকে ফিরিয়ে আনো। নইলে কোনো দেবতা কিছু হোম টোম পাবে না…”। নিজের হোম সামলাতে পারেনি, দেবতাদের হোমের ভয় দেখাল। নিজের রেশন বন্ধ হয়ে যাওয়া আর শক্তি হারানোর ভয়ে ইন্দ্র চলল চন্দ্রদেব আর তারার সাথে দেখা করতে। ইন্দ্রকেই পাঠানো হল, তার কারণ বোধহয় এই যে, ততদিনে ইন্দ্রও প্রচুর কেচ্ছা কাহিনির সাথে জড়িয়ে এসব বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের ব্যাপারে একজন অথরিটি হয়ে উঠেছিল। তাই তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই বৃহস্পতি ইন্দ্ৰকে দূত করে পাঠাল, নইলে যজ্ঞের অংশ না দিয়ে অভিশাপ দিয়ে ভূত করে দেবে। চন্দ্রদেব কারোর কথাই শুনল না। “বেশ করেছি, প্রেম করেছি, করবই তো…” বলে ইন্দ্ৰ সহ সমস্ত দূতকে দুচ্ছাই করে তাড়িয়ে দিল।
এখানে হরিবংশ খুব শর্টে বলে দিয়েছে বৃহস্পতি রেগে গিয়ে চন্দ্রদেবের সাথে যুদ্ধের সূচনা করল। কিন্তু এখানে একটু দেবী ভগবতে ঢুকে যাই। সেখানে এই রেগে যাওয়ার ব্যাপারটা আরেকটু বিস্তারিত ভাবে বলা আছে। সবাই যখন চন্দ্রদেবকে বোঝাতে গিয়ে অপমানের বোঝা নিয়ে ফিরল, তখন বৃহস্পতি নিজেই চন্দ্রদেবের সাথে দেখা করে বলল, “তুমি আমার বউকে চুরি করেছ। বউ দাও…”
চন্দ্রদেব বলল, “ইহ, ইয়ার্কি নাকি? তারা একজন অ্যাডাল্ট মহিলা, তাকে চুরি করব কী করে? সে স্বেচ্ছায় এখানে এসেছে…”
বৃহস্পতি বলল, “তবে রে পাতক, দাঁড়া তবে… দুটোকেই অভিশাপ দিয়ে ঝেড়ে ফেলব…”
চন্দ্রদেব বলল, “গুরুদেব, কুল ডাউন। আপনি বামুন মানুষ, কথায় কথায় এত রাগ করলে হবে? তারা তো কিছু অন্যায় করেনি। আপনিই তো শিখিয়েছিলেন যে ব্রাহ্মণ যদি কোনো পাপ করে তাহলে বৈদিক আচার ও রীতি ফলো করে পাপ থেকে মুক্ত হতে পারে। তেমনই কোনো নারী অপবিত্র হয় না, সে যদি একটু বরকে লুকিয়ে ইন্টুপিন্টুও করে তাহলে একটি ঋতুস্রাবের পরে সে আবার পবিত্র হয়ে যায়। তারা কদিন থাকুক না এখানে, তারপর নাহয় আপনার বাড়ি ফিরে যাবে…”
বৃহস্পতি ভাবে, “তাই তো, সিলেবাসে আর আমার লেখা দৈব-মাধ্যমিক গাইডবুকে এরকমটাই তো লিখেছিলাম।”
বৃহস্পতি বলল, “ঠিক আছে, সঠিক সময়ে তারাকে বলো বাড়ি আসতে।” বলে চলে গেল। কী উচ্চ খোলা মনের মানুষ ভাবুন। আজকের দিনে একটাও এরকম মানুষ পাবেন? বউকে প্রেমিকের কাছে রেখে বলল ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরে যেতে।
কিন্তু বৃহস্পতির ইগোতে রাগ জমে ওঠে বোধহয়। কয়েকদিন পরেই আবার চন্দ্রদেবের বাড়ি যায়, কিন্তু এবারে গেটের দারোয়ানরা বৃহস্পতিকে আটকে দেয়। তখন বৃহস্পতির রাগ চড়ে যায়। গেটের বাইরেই গ্যাঁট হয়ে বসে হেব্বি ত্যান্ডাইম্যান্ডাই শুরু করে, “অ্যাঁ, ব্যাটা চাঁদ, গুরুকে অপমান? বউ চোর কোথাকার… আমার বউ ফিরিয়ে দে। নইলে অভিশাপ দিয়ে তোমার চাঁদবদন বিগড়ে দেব…”
চন্দ্রদেব তখন ঘুমোচ্ছিল, গুরুদেবের এরকম চেঁচামেচি শুনে বেরিয়ে এসে বলে, “এত বোঝালাম সেদিন, আজ আবার এসেছেন?”
“বউ দাও…” বৃহস্পতি বলে।
চন্দ্রদেবেরও এবার রাগ হয়, “দেব না…”
“দিবি না মানে?”
“দেব না, মানে দেব না…” চন্দ্রদেব বলে, “নিজের চেহারা দেখেছেন আয়নায়? ওরকম মারকাটারি সুন্দর বউ চাইছেন? নিজের মতো কুৎসিত কাউকে খুঁজে নিন। বউকে ঘরে রাখতে পারেন না, যত হুজ্জুতি আমার ঘুমের সময়…”
বৃহস্পতি রাগে কাঁপতে কাঁপতে ইন্দ্রের কাছে এসে বলল, “বদলা চাই, বদলা দাও…”
ইন্দ্র আবার একজন দূত পাঠাল যে গিয়ে চন্দ্রদেবকে বলল, “গুরুদেব বউ চাইছে, নয়তো বদলা চাইছে। তুমি বাপু অপ্সরা-টপ্সরা কাউকে ধরো। তারাকে ফিরিয়ে দাও। বদল নাও, বদলা নয়…”
বদলের কথা বলা দূতকে বলদের মতন তাড়িয়ে দেয় চন্দ্রদেব। বৃহস্পতি আর কোনো উপায় না দেখে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বউ তার ফেরত চাইই চাই। বৃহস্পতির পক্ষে দেবতারা দাঁড়াল, আর চন্দ্রদেবের পক্ষে সাহায্যে এল শুক্রাচার্য। একেবারে ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছে। বৃহস্পতি আর শুক্রের চিরকালের খাড়াখাড়ি, এই সুযোগ পাওয়া গেছে, ব্যাটার ফ্যামিলি ম্যাটারকে ব্যাটারের মতো ঘেঁটে দেওয়া। বৃহস্পতির পক্ষে স্বয়ং রুদ্রদেব অজোগভ ধনুক নিয়ে হাজির
তারপরে আর কি? যুদ্ধ শুরু। ইয়া-টিস-ঢাস-আঁই-গেলুম-মলুম-বাপ-হায়-বাপরে ইত্যাদি শব্দে যুদ্ধক্ষেত্র ভরে গেল। দেবতাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু। বউ নিয়ে টানাটানি। এই একজনের বউ আরেকজন চুরি করায় যুদ্ধের ঘটনা নতুন না। সেই মেনেলোসের বউ হেলেনকে প্যারিস যখন চুরি করেছিল সেটাও তো একই গল্প। আবার রামায়ণ দেখুন… সীতাকে কিডন্যাপ না করলে রাবণ দিব্যি বেঁচে ছিল। একই থিম, গল্প আলাদা। সীতাকে অবশ্য ইচ্ছের বিরুদ্ধে অপহরণ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা আর হেলেন একরকম। প্রেমে পড়ে নাচতে নাচতে প্রেমিকের সাথে পালিয়েছিল।
যুদ্ধে অনেক হতাহত হওয়ার পরে শেষে ব্রহ্মাকে নেমে এসে শিব ঠাকুর আর শুক্রাচার্যকে আটকাতে হয়, তারপরে ব্রহ্মা চন্দ্রদেবকে বলল, “দিয়ে দে বাপ, একটা মেয়ের জন্য এত ঝামেলা…”
চন্দ্রদেব আর বাক্যব্যয় না করে তারাকে বৃহস্পতির কাছে ফিরিয়ে দেয়। বৃহস্পতিও নাচতে নাচতে “বউ পেয়েছি, বউ পেয়েছি…” করে বাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু কেলো শুরু হল কিছুদিন পরে। তারার গর্ভে এক সন্তান এল। বৃহস্পতি তো বুঝে গেছে কী কেস। চন্দ্রদেব যে তার বউকে ভালোবেসে শুধু ফুর্তি করেছে তা-ই নয়, বৃহস্পতির বংশে নিজের স্ট্যাম্প দেওয়া সার্টিফিকেটের ব্যবস্থাও করে গেছে। কিন্তু বৃহস্পতি তাকে নিজের ছেলে বলে দাবি করে। চন্দ্রদেব আবার বৃহস্পতির বাড়ি এসে বলে, “এই ছেলে আমার…”
চন্দ্রদেব বলে, “বললেই হল? আমার মতো ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি হয়েছে!”
“মোটেই না…” বৃহস্পতি বলে, “আমার মতো গুরুগম্ভীর হয়েছে…”
“রাখো তোমার কেশসম কথা…” চাঁদ বলে, “নিজে তো গ্যাসের বানানো ইয়া বড় গ্রহ, ভিতরে তো ফাঁপা। এই ছেলে আমার। আভা দেখেই বুঝেছি…”
“তুই তো রাতচরা…” বৃহস্পতি বলে, “দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকিস সূর্যের ভয়ে…”
আবার ঝগড়া, আবার যুদ্ধ হওয়ার উপক্রম। অবশেষে সব দেবতারা এসে তারাকেই জিজ্ঞেস করে এই সন্তানের পিতা কে? তারা লাজুক ভাবে বলে, “চন্দ্রদেব…”। ব্যস তারপরে আর কি? চন্দ্রলোকে পার্টি শুরু। এই ছেলের নাম হল বুধ। আজ্ঞে সেই বুধ, যে অদ্ভুত ইলাকে শরবন থেকে নিয়ে গিয়ে এক বছর কাটিয়েছিল। সেই ইলা যে একমাস পুরুষ হত, একমাস নারী। এখানে আরেকটা গল্প বলাই যায়। এই গল্পের সূত্র হল বেদান্ত দেশিকার লেখা নবগ্রহ স্তব। সেখানে এবং মহাভারতের একটি দক্ষিণী ভার্সনে বলা হচ্ছে, বৃহস্পতি যেইমাত্র জানল যে সেই নবজাতক চন্দ্রদেবের ছেলে, অমনি সেই ছেলেকে অভিশাপ দিল, “তুই না ছেলে হবি না মেয়ে…”
মানে বুধ হল ক্লীব। সেই নিয়ে তার দুঃখের অন্ত ছিল না, কিন্তু তার মা তারা তাকে সমানে সাপোর্ট করতে থাকে। এবং কোনো এক দৈব কারণে বুধের মধ্যেও কখনো পুরুষ কখনো নারী হওয়ার ক্ষমতা প্রকাশ পায়। তাই দক্ষিণ ভারতে নবগ্রহের ছবি বা মূর্তিতে অনেক সময়ে বুধকে দেবতা হিসেবেও দেখানো হয় আবার দেবী হিসেবেও দেখানো হয়। সে এক অদ্ভুত দর্শন ইয়ালি নামক জন্তুর উপরে বসেন। ইয়ালি ওনার বাহন। ইয়ালি আসলে সিংহ, হাতি আর ঘোড়ার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
কিন্তু ভাবার বিষয় এটাই যে বুধ যেহেতু এরকম নিজের জেন্ডার পরিবর্তন করতে পারত, তার মানে কি ইলার সাথে যখন সে একবছর কাটায় তখন যখন ইলা মহিলা রূপে থাকত তখন বুধ পুরুষ রূপে থাকত, আর ভাইস ভার্সা? বা ভাইস ভার্যা বলাও ভুল হবে না। যা-ই হয়ে থাকুক না কেন, সেই যে বুধ আর ইলার গল্প বলেছিলাম তাদেরই সন্তান হল পুরুরাভ।
