পুরুরাভ ও ঊর্বশীর প্রেম কাহিনি
কথা হচ্ছিল যে বশিষ্ঠ অমাবসুর সৎ ভাই হয়। সেই গল্প বলার জন্য চাঁদের গল্প পেড়ে আনলাম। একেবারে চন্দ্রাভিযান সেরে বুধগ্রহ ঘুরে এলাম। কারণ বুধ আর ইলার সন্তান হল পুরুরাভ, যে ঊর্বশীর প্রেমে পড়েছিল। পুরুরাভর থেকে ঊর্বশীর সন্তান হয় অমাবসু। অমাবস্যা নয়। মানছি কিছু কিছু অপ্সরা সুন্দরী কন্যার পাল্লায় পড়ে অনেক গোরুর ন্যায় বেচারা পুরুষদের জীবন একেবারে অমাবস্যা হয়ে যায়, কিন্তু এটা সেই গল্প না। এটা হল পুরুরাভ আর ঊর্বশীর মধ্যে এক অমর প্রেম কাহিনি। সেখানে কোথায় লাগে ক্যাস-ইবন-আল-মুলাওয়াহ আর লয়লা-আল-আমিরিয়ার প্রেম, যাকে আপনারা জানেন লয়লা-মজনু। অথবা কোথায় লাগে দুজন অকালপক্কের তিনদিনের আত্মঘাতী প্রেম যাকে আপনারা রোমিও-জুলিয়েট বলেন। ওরকম প্রেম আমাদের পাড়ায় পাড়ায় হয়, খালি অত মার্ডার-সুইসাইড হয় না। প্রেমে জীবন দেওয়া, এ আবার কীরকম প্রেম? ওসব গল্পেই পড়তে ভালো লাগে। বাস্তবে প্রেমে একজন সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে ঠকে, আরেকজন সেই বিশ্বাসের পায়ুমন্থন করে ঠকায়। এখনকার দিনে প্রেম কই? সব খালি দেওয়া নেওয়ার সম্পর্ক। প্রেম হয়েছিল অপ্সরা ঊর্বশী আর রাজা পুরুরাভর।
প্রসঙ্গ যখন উঠলই তখন আগে বলি, ঊর্বশী কে? একবাক্যে সবাই জানেন ঊর্বশী হল অপ্সরা। ইন্দ্রের সভায় (আর মাঝে মাঝে অসুরেরা স্বর্গ অধিকার করলে তাদের সভায়) ধেই ধেই করে ড্যান্স-স্বর্গ-ড্যান্সের পারফরমার হল এই অপ্সররা। তারা চিরযুবতি, মারকাটারি সুন্দরী, ব্যাপক নৃত্য করতে পারে আর মোটামুটি ইন্দ্রকেই রিপোর্ট করে। ইন্দ্রের পারমিশন ছাড়া অপ্সরাদের এদিক ওদিক যাওয়া চলে না। অপ্সরার সংখ্যা বা তাদের সবার নাম নিয়ে বহু বহু তর্ক আছে, কিন্তু পুরাণের দৌলতে কয়েকজন অপ্সরা বেশ নাম টান করেছিল। কয়েকজন তো ঋষিদের কাছে কেস খেয়ে মানুষ, গাছ, মাছ, মোষ ইত্যাদি হয়ে জন্মেছিল। দশরথের মা, ইন্দুমতী, যার মাথায় নারদের মালা পড়ে আর সেখানেই স্পট ডেড হয়ে যায়… সেই ইন্দুমতীও অপ্সরা ছিলেন। আবার সত্যবতীর মেছো মা অদ্রিকাও এক শাপপ্রাপ্ত অপ্সরা ছিলেন। শোনা যায় মীনাক্ষী মানে নাককাটা শূর্পনখাও নাকি নয়নতারা বলে অপ্সরা ছিল। ভাগ্যিস মাথাগরম লক্ষণকে প্রপোজ করার সময় সীতার পোষা ছাগল কাছে ছিল না, নইলে ছাগলে নয়নতারা গাছের পাতা পরমানন্দে চেবায় এ আমি স্পষ্ট দেখেছি। মোটামুটি একবার করে কেস না খেলে, বা বিখ্যাত কিছু না করলে অপ্সরাদের নাম পুরাণে উঠত না।
আর এই পুরাণের লিস্টে সবথেকে বেশীবার এসে যে অপ্সরাদের নাম আমরা মুখে মুখে জানি তাদের মধ্যে রম্ভা, মেনকা আর উর্বশী। ঊর্বশীর জন্মের একটা গল্প আছে, এই বেলা বলে রাখি। হয়েছে কি, সেই মহাভারতে বলেছিলাম মনে আছে, নর-নারায়ণের তপস্যা করা, সেই সহস্রকবচকে মারার জন্য? মানে কৃষ্ণ-অর্জুনের পূর্বজন্ম কর্ণের বধ হেতু। জানি না কোন উর্বর মস্তিষ্কে এই আইডিয়া এসেছিল যে কর্ণ সহস্ৰকবচ বলে একটা রাক্ষস ছিল, কিন্তু গল্পটা ভালোই ছিল। যা-ই হোক, সেই নর-নারায়ণ বদ্রীনাথের কাছে গুহায় বসে তপস্যা করছে, আর এদিকে তাই দেখে ইন্দ্রের ব্লাড প্রেশার স্বর্গের ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কেউ তপস্যা করলেই হল, ইন্দ্র ভাবত তার সিংহাসন কেড়ে নিতেই সেই তপস্যা। রাজার চিন্তা গদি নিয়ে, সেই আমল থেকেই। তাই গদি সংরক্ষণ করতে সংরক্ষিত অপ্সরাদের মধ্যে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হল গিয়ে নরনারায়ণের ধ্যান ভাঙতে।
এই জন্যই ইন্দ্র অপ্সরাদের নিজের হাতে রাখত। ঋষি মুনি অসুর যক্ষ দেবতা মানুষ যারাই তপস্যা করত প্রায় সকলেই পুরুষ। মহিলারা তপস্যা করলে ইন্দ্র অত টেনশন নিত না। কিন্তু পুরুষ তপস্বী হলেই তার তপস্যায় বুরুশ ঘষে দিতে ইন্দ্রের জুড়ি মেলা ভার। প্রথমে অপ্সরা পাঠাত, তাতে সেই পুরুষ অপ্সরার রূপের মোহতে পড়ে তপস্বী তপস্যায় বিদ্রোহ করে লাট্টু হয়ে যেত। আরে, বয়স অনেক পড়ে আছে, তপস্যা গেলে তপস্যা আবার করা যাবে, কিন্তু অপ্সরা গেলে কী আর অপ্সরা পাওয়া যাবে? কিছু গল্প পড়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ হয় যে কিছু ঋষি শুধু অপ্সরাদের পাওয়ার জন্যই দুষ্টামি করে তপস্যা করত হয়তো। অপ্সরা কদিন সংসার করে, ঋষির তেজে ফলদায়িনী বৃক্ষের মতো দুচারটে তেজস্বী ও তেজশ্রী তেজপাতা… ইয়ে মানে সন্তান দিয়ে আবার স্বর্গে চলে যেত। ঋষি নিজের এনার্জি খুইয়ে আবার রোজকার কাজে ফিরত। এটা তো স্বীকার করতেই হবে যে, অধিকাংশ পুরুষমানুষের একই অবস্থা হয়। তার স্ত্রী যতই অপ্সরা সুন্দরী হোক না কেন, সংসার করার কিছুদিন পরেই তার মনে হতে বাধ্য, “ইশশশ ঊর্বশীকে পেলাম, এর মধ্যে সেই ব্যাপারটা নেই যেটা রম্ভার মধ্যে আছে…।” পুরো কোর্স খেয়েও মেনু কার্ড দেখার এই স্বভাব পুরুষের মধ্যে সেই আদিমকাল থেকেই রয়েছে।
যা-ই হোক নরনারায়ণের তপস্যা ভাঙাতে ইন্দ্র অপ্সরাদের পাঠাল, তারা সেখানে গিয়ে খুব খানিক ডিস্কো দিওয়ানে নাচল। আজকালকার নাচের প্রোগ্রামে নাচের নামে লাফঝাপ আর জিমন্যাস্টিক মার্কা নাচ নয়, প্রাচীন ভারতের আদি নৃত্যশৈলী পরিবেশন করা হল। নর-নারায়ণ দৃঢ় চরিত্রের ছিলেন, কিন্তু তারা আর্টের সমঝদার। নৃত্য দেখে বেজায় খুশি হলে তারা ইন্দ্রকে ডেকে বলল, “এই বাচ্চা মেয়েগুলোকে এবার রেস্ট দাও… তুমি চিন্তা কোরো না, আমরা তোমার স্বর্গ অধিকার করতে তপস্যা করছি না। আর তোমার যখন এতই অপ্সরাদের নেত্য দেখার শখ, তখন শক দেওয়ার মতন সুন্দরী এই অপ্সরা নিয়ে যাও…”
নারায়ণ নিজের উরু মানে থাইল্যান্ড ঘষতেই সেখান থেকে এক অপ্সরা বেরিয়ে এল। উরু না আলাদিনের প্রদীপ? উরু থেকে বেরোল বলে অপ্সরার নাম হল ঊর্বশী। দেবতা উরু ঘষলে অপ্সরা বেরোয়, আর আমাদের নিরীহ দুর্যোধন একটু ঊরু ঘষেছিল বলে অভিশাপ, গালমন্দ, ভিলেন… কতই না নিন্দে জুটল। আচ্ছা, ঊরু কি খুব উর্বর জায়গা? তাই কি নাম ঊর্বরশী থেকে ছোট করে ঊর্বশী হল? কোথায় যেন পড়েছিলাম ‘ঊর’ মানে হৃদয়। অবশ্য হৃদয় যেভাবে প্রায় উড়ু-উড়ু করে, তাতে তাকে ঊর বললে কিছু ক্ষতি নেই। সেই ঊর মানে হৃদয়কে যে বশ করে তার নাম ‘ঊর্বশী’। আর সেই উর্বশীকে দেখেই পুরুরাভ ফস করে বশ হয়ে গেল।
শুধু পুরুরাভ না, ওরকম হ্যান্ডসাম রাজাকে দেখে ঊর্বশীও ফিদা। আসলে ঊর্বশীকে ব্রহ্মা বা মিত্র-বরুণ অভিশাপ দিয়েছিল যে তার মানুষের সাথে প্রেম হবে। উফফ, পুরো কিলোদরে অভিশাপ, যে যাকে যখন যেখানে যেভাবে পেরেছে খালি অভিশাপ ঝেড়েছে। মোটকথা পুরুরাভ আর ঊর্বশী পরস্পরের প্রেমে পড়ে একসঙ্গে থাকতে শুরু করল। কিন্তু উর্বশী সেই লিভইন রিলেশনে আসার আগে শর্ত দিল পুরুরাভকে, “দেখো, আমি তোমার সাথে থাকতে রাজি, কিন্তু দুটো শর্তে। প্রথম শর্ত, এই যে আমি তোমাকে কখনোই উদোম অবস্থায় দেখব না। আর দ্বিতীয় শর্ত হল, আমার সঙ্গে সর্বক্ষণ এই ভেড়ার ছানা দুটো থাকবে। এই দুটো শর্তের একটাও মিস হলে আমি তোমার সাথে থাকব না…”
“সবসময়?” পুরুরাভ জিজ্ঞেস করে।
“একদম… সবসময়…” ঊর্বশী বলে।
“ইয়ে, মানে… ইয়ের সময়েও?” পুরুরাভ জিজ্ঞেস করে।
“ইয়ের সময়েই বেশি করে…” ঊর্বশী বলে, “আর শোনো, আজ থেকে তুমি খালি অল্প অল্প মাখন খেয়ে থাকবে…”
ঊর্বশীর এই অদ্ভুত শর্তগুলোর কারণ, লজিক, বিশ্লেষণ ইত্যাদি আমায় জিজ্ঞেস করবেন না। এগুলোকে এই মুহূর্তে জানালার বাইরে ফেলে দিন। আমি গল্প বলছি, শুনে যান শুধু।
পুরুরাভ ভাবল, “এমন কিছু তো শর্ত নয়…”
শর্তের গর্ত এমন কিছু গভীর নয় দেখে মর্তের নৃপতি অমর্ত্য নর্তকীর শর্তে রাজি হয়ে আনন্দে ভঙ্গুর নৃত্য করতে করতে বলল, “ঊর্বশী… ঊর্বশী… টেক ইট ইজি ঊর্বশী… আমি তোমার শর্তে রাজি…”
তারপরে তাদের মধুচন্দ্রিমা শুরু হল। চন্দ্রমা তো আবার পুরুরাভ রাজার দাদু হয়। দাদুর নামের উপর মধু ঢেলে শুরু হল তাদের মিলন পর্ব। রাজা আর অপ্সরার মধুচন্দ্রিমা বলে কথা, সে কি আর যেমন তেমন ব্যাপার? প্রথমে তারা চৈত্ররথ বাগানে দশবছর ধরে মিলন করল। একেবারে ‘সেদিন চৈত্র মাস…’ মার্কা ব্যাপার। তারপরে মন্দাকিনী নদীর পাশে ‘নদিয়াঁ সে দরিয়া…’ গাইতে গাইতে আরও পাঁচ বছর কাটাল। এরপরে তারা অলকানগরীতে অলংকরণ করে ফেলল। তারপর কি ইচ্ছে হল, বদরীবনে চলে গেল। সেখানে বনে ছয় বছর বন্য প্রেম করে বেরিয়েই নন্দনকাননে চলে গেল। নন্দনকাননে কাননদেবীর গান শুনতে শুনতে বুধনন্দন অপ্সরা নন্দিনীর প্রেমে সাত বছর কাটিয়ে দিল। তারপরে চলে গেল উত্তরকুরু, যেখানে একসময় সূর্যের বউ ঘোড়া হয়ে চড়ে ঘোরাঘুরি করেছিল। সেখানেও তারা আট বছর কাটায়। এরপর তারা যায় গন্ধমাদনে, যেটা সত্য যুগে হনুমান তুলে এনেছিল। গন্ধমাদন পর্বতের পাদদেশে রাজা ও অপ্সরা দশ বছর কাটায়। গন্ধমাদনের ‘পাদ দেশ’ বলা যায় কি? মানে গন্ধ ছড়ালে তবেই তো পাদ-দেশ নামের সার্থকতা। দেশসুদ্ধু লোকের পৈটিক বাষ্প নিষ্ক্রমণ হলে গন্ধে মাদন হয়ে যাবে বই কি।
এই সুযোগ পেয়েছি, একটু জ্ঞান ঝেড়ে দিই। মাদন কথাটার অর্থ জানেন কি? এই ‘মাদন’ কথাটার সাথে ছোটবেলায় পড়া ‘পাঁচে পঞ্চবাণ’ কথাটার যোগাযোগ আছে। এতদিন তো পড়েছেন, পড়িয়েছেন… বলুন তো, ‘পাঁচে পঞ্চবাণ’ কী কী? এক জায়গা থেকে সরাসরি টুকে বলছি, শরবিজ্ঞানে মদনদেবের শুক্র নিয়ন্ত্রণ কৌশলকে বাণ বলে। মদনদেবের শুক্র নিয়ন্ত্রণের পাঁচটা কৌশলকে পঞ্চবাণ বলে। মোহন, মাদন, তাপন, শোষণ আর স্তম্ভন। তীব্র কামবাসনায় উদ্বেলিত হয়ে মাথা পাগলা হয়ে যাওয়াকে মোহন বলে (শরবিজ্ঞানে, দয়া করে কৃষ্ণের মোহনরূপের মানে এখানে টানবেন না)। তাপন হল শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শোষণ হল পার্টনারের তাপমাত্রা শুষে নেওয়া, স্তম্ভন হল ছুটে আসা ট্রেনকে লাল বাতি দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। আর ‘মাদন’ মানে হল উন্মাদ হওয়া তাড়না। মানে একেবারে ‘ম্যায় দুনিয়া সে অব না ডরু…’ টাইপ। ভালোবাসায় পাগল যাকে বলে, ক্ষিদে-ঘুম ভুলে সবসময় খালি ‘কী করে পাব? কী করে পাব?’ চিন্তা। বাকি ডিটেইলস্ খুঁজে পড়ে নিন, আমি সামান্য বাতেলাবাজ লেখক, বাৎস্যায়ন নই।
তাই গন্ধে যেখানে পাগল পাগল অবস্থা হয় সেটাই গন্ধমাদন। আমার মনে হয়, রামায়ণে হনুমান যখন গন্ধমাদনে ল্যান্ড করেছিল, তখন এই গন্ধেই উনি বিশল্যকরণী খুঁজে পাননি। যা-ই হোক গন্ধমাদনের গন্ধে মাদন হয়ে মাদকীয় প্রেমে নিমজ্জিত হয়ে পুরুরাভ ও ঊর্বশী উত্তর সুমেরুর চূড়ায় গিয়ে আরও আট বছর কাটাল। মানে শরীরের তাপ এত বেড়ে গেছিল, যে পাহাড়ের মাথায় উঠতে হয়েছে। যা মাথায় উঠেছিল, তা অন্য কোনো উপায়ে নামছিলই না। এইভাবে পুরুরাভ ও ঊর্বশী ঊনষাট বছর ধরে প্রেমকার্যে লিপ্ত হয়ে ছিল। আমি এখন লেখা থামাই, আপনারা একটু ভেবে নিন। ঊনষাট বছর… না, আমি স্ট্যামিনা বা কদর্য কিছু বলব না এই নিয়ে। আমার মতে এই যুগের দম্পতি ও প্রেমিক প্রেমিকাদের পুরুরাভ ও ঊর্বশীর একখানা করে ছবি বাড়িতে টাঙিয়ে রাখা উচিত। এই ভঙ্গুর সময়ে চাহিদা, লোভ, মিথ্যে অহং, দেখনদারী ও ধৈর্যের অভাবে যখন অনেক দম্পতি (বিবাহিত হোক বা না হোক) ঊনষাট দিনেই পরস্পরের প্রতি হাঁপিয়ে ওঠে, তখন পুরুরাভ ও উর্বশী অমর ভালোবাসার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হতে পারে বই কি।
কিন্তু হবে কেন? পুরুরাভ আর ঊর্বশীর ভালোবাসার কাহিনি তো ‘টু ওল্ড ফ্যাশন্ড…’, তাই এখনকার যুগে রোমিও-জুলিয়েট, লয়লা মজনু চলে বেশি। তার একটা কারণ বর্তমান যুগে, মানে এই শেষ ত্রিশ-চল্লিশ বছরের মধ্যে মানুষের মধ্যে প্রথমেই এই ধারণা ঢুকে যায় যে ভালোবাসা খারাপ জিনিস, ভালোবাসার পরিণতি খারাপ, হয় ব্রেক-আপ নয়তো সুইসাইড নয়তো ডিভোর্স। মানুষ এখন দুঃখবিলাসী, মানুষ এখন সবসময় আশা করে তার প্রেমিক বা প্রেমিকা তাকে ঠকাবে, মানুষ এখন অন্ধভাবে ভালোবাসতে পারে না, কারণ ভালোবাসার সাথে স্বার্থ ভীষণভাবে জড়িয়ে গেছে, আর যে সম্পর্কে স্বার্থ সবার আগে থাকে সেটা আর যা-ই হোক, ভালোবাসার সম্পর্ক হয় না। তাই মানুষ করুণ পরিণতির ভালোবাসার গল্প শুনতে, পড়তে বা দেখতে ভালোবাসে। রোমিও-জুলিয়েট না-হয় অনেক পুরনো, নতুন হালফিলের সিনেমা বা বইগুলোই দেখুন। নায়কনায়িকা মরলেই সিনেমা হিট। ‘পি এস আই লাভ ইউ’, ‘দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস’ থেকে শুরু করে ‘স্টার ওয়ার্স’ (অ্যানাকিন আর হান সোলোর মৃত্যু), অ্যাভেঞ্জারে আয়রন ম্যান আর ভিশনের মৃত্যু, এমনকি আমাদের ‘শোলে’, ‘কয়ামত সে কয়ামত তক সব হিট’।
তাই মানুষ কোথাও একটা দুঃখ পেতে ভালোবাসে। খুব যত্নে সেটার নিজের মধ্যেই নিজের থেকে লুকিয়ে লালন-পালন করে রাখে, যেটা আস্তে আস্তে তাকে তার জীবনে গ্রাস করে। সাম্প্রতিক একটি বহুলবিক্রিত ও বিকৃত ইংরেজি ভালোবাসার বইয়েও নায়িকা খতম। আগে বা পরে হোক, ভালোবাসার মধ্যে ছেদ পড়লেই মানুষ খুশি, ‘আহা কি লিখেছে’। প্রেমের সফল পরিণতির গল্প কারোর ভালো লাগে না। ওখানে মশলা কই? মন খারাপ কই? একটা সাধারণ সিনেমা, সাধারণ প্রেমের গল্প দেখান তো যেখানে দুজন প্রেমে পড়ে দীর্ঘদিন একে অপরের সাথে থেকে বৃদ্ধ হয়ে জীবনযাত্রা শেষ করছে? সেগুলো বেকার গল্প, দরকার পড়লে সেখানে কিছু সমস্যা, দুটো লুইচ্চা ভিলেন ঢুকিয়ে দেখাতে হবে ভালোবাসায় কত বাধা। কিন্তু বাধা পেয়েও এবং বাধা ছাড়া কি ভালোবাসা পরিণতি পায় না? পায় তো, আমাদের মা-বাবাদের দেখুন। সাংসারিক কত বাধা, কত বিপত্তি পেরিয়ে চিরকাল একসাথে আছেন। তাদের গল্প তো কেউ বলে না। তাদের গল্প শুনলে পড়লে বোধহয় সমাজ অনেক বেশি শিক্ষা পাবে কী করে ভালোবাসতে হয়। কী করে নিজের ছোট ছোট ইচ্ছে বা বড় অহংকে একটু মানিয়ে নিতে পারলেই সব সমস্যা কাটিয়ে জীবননদী সুখে একসাথে পার যায়, সেটা শেখা যায়।
সংসারে সমস্যা আসেই। পুরুরাভ আর ঊর্বশীর সংসারেও সেরকম সংসার ভাঙা সমস্যা নেমে এল। আর এই কাজের জন্য ভিলেন হয়ে গন্ধর্বরা এল। আসলে গন্ধর্বগুলো অপ্সরাদের নিয়ে খুব পজেসিভ ছিল। এলেবেলে অপ্সরা হলেও হত, একেবারে ঊর্বশী এসে এতদিন ধরে মর্তে মানুষের সাথে আছে। ঊর্বশীকে পরস্ত্রী হতে দেখে পরশ্রীকাতর হয়ে গন্ধর্বরা একটা প্ল্যান ছকে। এক গন্ধর্ব, তার নাম বিশ্ববসু (বিশ্ববদ হলেও হত), সে বলল, “ঊর্বশী যখন রাজাকে শর্ত দিচ্ছিল আমি তখন লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছি। ওই শর্ত ভঙ্গ করতে পারলেই ঊর্বশী আবার আমাদের দলে চলে আসবে…”
কীরকম কুটকুটে মার্কা বুদ্ধি ভাবুন, এই বিশ্ববসুর মত লোকগুলোই অন্য মানুষের সুখের সম্পর্কে বিষ ঢালে। একেবারে ভিলেন যাকে বলে। ভিলেন বিশ্ববসুর সাথে অন্য চামচাগুলোও হাতা গুটিয়ে নামল। ঊর্বশীকে দলে ফেরাও এজেন্ডার ঝান্ডা নিয়ে। শর্ত ভাঙতে শর্তের মধ্যে গর্ত করার পণ করল তারা। রাজা পুরুরাভ আর উর্বশী তখন নিজেদের রাজধানী প্রতিষ্ঠান নগরে এসে প্রতিষ্ঠিত ও উপবিষ্ট হয়েছিল। সেখানেই এক রাতে রাজা ও অপ্সরার অন্ধকারে আবেগঘন, সবেগ ও ঘন লেপের তলায় প্রেমালাপের মাঝে বিশ্ববসু চুপিচুপি বেডরুমে ঢুকে পড়ে। কীরকম লুইচ্চা গন্ধর্ব মাইরি, লজ্জাশরম নাই? এই জন্য নীলচিত্রের অত্যন্ত প্রয়োজনীয়তা আছে আমি মনে করি। কম করে কামতাড়নায় অন্যের বেডরুমে ঢুকে প্রাইভেসির বারোটা তো বাজায় না। উপরন্তু এ কীরকম অসভ্যতা? কিন্তু বিশ্ববসু ঢুকল, আর ঢুকেই একটা ছাগল চুরি করে নিল। এবার বুঝেছি, পিকনিকে মটন করার প্ল্যান হয়েছিল, তাই উৰ্বশী ছাগল দুটোকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
ঊর্বশী রাজাকে বলল, “আমার ছাগল কে যেন চুরি করল…”
রাজা বলল, “আহ উর্বশী এরকম পাগল মুডে ছাগলের কথা বলে ডাউন কোরো না…”
বিশ্ববসু দেখল একটা ছাগল চুরি করে রাজা আর উর্বশীকে আলাদা করা গেল না। তাই বিশ্ববসু দ্বিতীয় ছাগলও চুরি করল। উর্বশী তখন চটে গিয়ে রাজাকে বলল, “আপনার মুডের চোটে আমার গোটগুলো কে যেন নোটবন্দির নোটের মতো নিয়ে চলে গেল, যাও, আমার ছাগল খোঁজো। শর্ত মনে আছে তো?”
ছাগলের উপস্থিতি থাকার শর্ত মনে করে রাজা পুরুরাভ ঠান্ডা না হয়েই নিজের পৌরুষত্বের বিজয় ঝান্ডা উঁচিয়ে গোট খুঁজতে গটগট করে অন্ধকারে চলল, আর গন্ধর্বগুলো এত পাজি, ঠিক সেইসময়ে তীব্র বিদ্যুৎ চমকে দিল। ব্যস্, বিদ্যুতের আলোতে ঊর্বশী বলল, “এ বাবা দেখে ফেলেছি… শর্ত ভঙ্গ… টাটা…”
ঊর্বশী অন্তর্ধান হল। রাজা ছাগল খুঁজে পেল, কিন্তু বেডরুমে এসে দেখে বউও হাওয়া। রাজা পুরুরাভ ভীষণ মুষড়ে পড়ল। সারা দেশ ঘুরে ঘুরে গাইতে লাগল, “ও মাইয়া রে মাইয়া রে তুই অপরাধী রে, আমার যত্নে গড়া ভালোবাসা দে ফিরাইয়া দে… আমার অনুভূতির সাথে খেলার অধিকার দিল কে? মাইয়া তুই বড় অপরাধী তোর ক্ষমা নাই রে…”
রাজ্যপাট কে চালাত সেটা পরের প্রশ্ন, কিন্তু পুরুরাভ রাজা এরকম স্যাড এবং ম্যাড হয়ে বউ খুঁজছে। দীর্ঘদিন ধরে বহুজায়গায় অনেক খুঁজে খুঁজে অবশেষে কুরুক্ষেত্রের কাছে (তখনও তো কুরু জন্মায়নি, তাহলে কুরুক্ষেত্র নাম হল কী করে?) প্লাক্ষর মন্দিরে হৈমবতী চৌবাচ্চাতে পাঁচজন অপ্সরাদের সাথে ঊর্বশীকে রাজা পুরুরাভ খুঁজে পেল।
ঊর্বশীকে দেখেই রাজা গেয়ে উঠল, “কোথা কোথা খুঁজেছি তোমায় … তুমি জানো না…খুঁজেছি, খুঁজেছি, কোথায় তোমায় …”
ঊর্বশীর মনেও বোধহয় রাজার জন্য পার্মানেন্ট একটা প্রেম রয়ে গেছিল, সেও বলল, “হম বেওয়াফা হরগিজ না থে, পর হম ওয়াফা কর না সকে…”
রাজা বলল, “তুমি আসবে বলেই আকাশ মেঘলা, বৃষ্টি এখনও হয়নি, তুমি আসবে বলেই আমার সন্তান এখনও জন্ম নেয়নি…”
ঊর্বশী বলল, “যেতে দাও আমায় ডেকো না, কবে কী আমি করেছি, মনে রেখো না…”
রাজা এবার কেঁদেই ফেলল, “আর কত রাত একা থাকব, চোখে মেলে দেখব না তোমাকে, স্বপ্নের রঙে ছবি আঁকব…”
ঊর্বশী তাও কিছুতেই মানে না। অপ্সরা হয়ে গিয়েই সে আর সাধারণ মানুষের গৃহিণী হতে পারবে না। ইন্দ্র এখন অপ্সরাদের লিজে দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
রাজা পুরুরাভ ধরনায় নেমে বলল, “ঊর্বশী… ধুর বসি, বসেই থাকব, যতক্ষণ না একটা উপায় দাও।”
ঊর্বশী অনেক ভেবে দয়াপরবশ হয়ে বলল, “এক বছর পরে এক রাতের জন্য আমি আসব। এর মধ্যে তোমার ছেলেপুলে হয়ে যাবে। তুমি গন্ধর্বদের খুশি করো, ওরা আমার সাথে তোমার থাকার পার্মানেন্ট ব্যবস্থা করে দেবে….”
রাজা এই শুনে নাচতে নাচতে ফিরে এল। এক বছরের তো ব্যাপার। বেশ যজ্ঞ-টজ্ঞ করে গন্ধর্বদের খুশি করল। এর মধ্যে রাজার ছেলেও হয়ে গেল। তারপর ঊর্বশী এসে এক রাত কাটানোর পরে রাজার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে গন্ধর্বরা একটা থলিতে করে আগুন দিয়ে বলল, “এটা দিয়ে যজ্ঞ কর। রাজাও কাছেপিঠে একটা ডুমুর গাছে সেই ত্রেতাগ্নি জ্বালিয়ে গন্ধর্বলোকে গন্ধর্বদের সাথে মিশে গিয়ে থাকতে শুরু করল।”
গল্প শেষ, কিন্তু আমার শুধু একটাই প্রশ্ন আছে। এই উর্বশীই যখন পুরুরাভর বংশোদ্ভূত অর্জুনকে অদ্ভুত প্রপোজাল দেয়, তখন গন্ধর্ব পুরুররাভ কি সেটা আটকাতে পারেনি? নাকি ততদিনে ঊর্বশীর সাথে হাঁপিয়ে গেছিল? নাকি গন্ধর্ব হয়েই নিজের মনুষ্য জীবন ও বংশের কথা ভুল মেরে মহানন্দে ছিল? উত্তর মেলে না। মোটকথা, এই পুরুরাভর ঘটনাটা অৰ্জুন জানত, তাই বহু যুগ আগের ঠাকুমার সাথে মিলিত হতে চায়নি, আর তাই অভিশাপও খেয়েছিল।
