ধুন্ধুমার, ত্রিশঙ্কু আর সাত ব্রাহ্মণ

ধুন্ধুমার, ত্রিশঙ্কু আর সাত ব্রাহ্মণ

না, এদের তিনজনের গল্প একসাথে জড়িত নয়, তিনটে আলাদা গল্প৷ সেই তিনটে নিয়েই এই পর্ব। চতুর্থ পর্বে ইক্ষাকুর ছেলের খরগোশ আনায় তার নাম শশদ হয় মনে আছে তো? সেই ভীকুক্ষীর নামের ভসদহত্যা করে শশদ রাখার পর, ইক্ষাকুর পরে সেই শশদই সমস্ত রসদ নিয়ে রাজা হিসেবে বসত করে। তার ছেলের নাম কাকুস্থ। মুখস্থ মানে মুখে যা লেগে আছে, কণ্ঠস্থ মানে কণ্ঠে যা লেগে আছে… তাহলে কাকুস্থ মানে কি কাকুর সাথে লেগে আছে? হবে হয়তো, শশদের কোনো ভাইয়ের সাথে কাকুস্থ হয়তো চিটেগুড়ের মত সঙ্গে লেগে থাকত।

কাকুস্থের ছেলের নাম আনেনা (কিছুই আনেনা…)। নাম আনেনি তা নয়, নামটাই ‘আনেনা’। তার ছেলে পৃথু (এ অন্য পৃথু), তার ছেলে আদ্রা (জংশন নয়), তার ছেলে যুবনাশ্ব, তার ছেলে শ্রব, তার ছেলে বৃহদাশ্ব (বৃহৎ অশ্বের মত দেখতে ছিল হয়তো) আর তার ছেলে ছিল কুবলাশ্ব। এই কুবলাশ্বের সময়ে ধুন্ধু নামে এক দৈত্যের হেব্বি অত্যাচার শুরু হয়।

ধুন্ধু ছিল মধু কৈটভের পুত্র। মধু কৈটভ কে মনে পড়ছে? সেই যে বিষ্ণুর লম্বা ঘুমের সময় তার কর্ণমলজাত, মানে কানের ময়লা থেকে দুটো অসুরের জন্ম হয়েছিল, যারা জন্মে কিছু না দেখতে পেয়ে ব্রহ্মাকে দেখে পেটাতে গেছিল। সেই মধু কৈটভ। তাদেরকে বেশ কায়দা করে, মা মহামায়ার হেল্প নিয়ে বিষ্ণু কোলে বসিয়ে মেরেছিল। কিন্তু তাদের একটা ছেলেও হয়ে যায়। খুব সম্ভবত এটা ওদের শরীরের অংশ থেকে তৈরি, ধুন্ধুর তার মানে কোনো মা ছিল না। দুই ভাইয়ের ধন্দ কাটিয়েই ধুন্ধুর জন্ম। যা-ই হোক, এই ধুন্ধু বাবাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে সেই ব্রহ্মারই তপস্যা করা শুরু করল।

আর ভক্তর কাতর ডাক শুনে ব্রহ্মাও দিব্যি বর দিতে হাজির। ধুন্ধুর বাবারা ব্রহ্মাকে আরেকটু হলেই ফেঁসে দিয়েছিল, সেই ধুন্ধুকেই ব্রহ্মা বর দিতে এল। বলিহারি বুদ্ধি। এখানে কিছু একটা বুদ্ধি টুদ্ধি খাটিয়ে ধুন্ধুর তপস্যা ভেস্তে দে, সেসব নয় উদার দিলদার হয়ে ব্রহ্মা বর দিতে চলে এলো। ধুন্ধুও রেডি ছিল, বর শুনেই বলল, “আমাকে যেন দেব, দানব, অসুর, গন্ধর্ব, রাক্ষস, যক্ষ, কোবরা, ডাইনোসর, ড্রাগন, জন্তু-জানোয়ার, তিমি মাছ কেউ যেন মারতে না পারে…”

ধুন্ধু মানুষকে পাত্তা দিত না। মানুষ নিম্নমানের জীব, ধুন্ধুর মত শক্তিশালী দৈত্যকে মারতে পারে এরকম ক্ষমতা তাদের নেই। ব্রহ্মাও ‘তথাস্তু’ বলে হাওয়া। ধুন্ধু তারপরে উজ্জলক মরুভূমিতে গিয়ে দেবতাদের কবজা করার প্ল্যান ছকতে শুরু করল। আবার কি? বর পেয়ে গেছে, এবার বাড়াবাড়ি করতে হবে। এদিকে রাজা কুবলাশ্ব তার একশোটা ছেলে (অন্য পুরাণে একুশ হাজার ছেলে লেখা। এত ছেলে? ছেলে বানানোর কারখানা ছিল নাকি?) রেখে রিটায়ার করে বনে যাওয়ার প্ল্যান করছিল, এমন সময়ে সেখানে উত্তঙ্ক বলে এক মুনি এসে রাজাকে বলতে শুরু করল, “তুমি কীরকম রাজা হে, তোমার প্রজারা কষ্টে আছে। সেদিকে তোমার মন নেই, তুমি নিজের স্বার্থ ভেবে রাজগদি ছেলেকে দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে জঙ্গলে ছুটি কাটাতে যাচ্ছ। দায়িত্বজ্ঞান কি একেবারেই বিসর্জন দিয়েছ, প্রজাদের ভালো মন্দ কি কিছুই ভাববে না?”

রাজা কুবলাশ্ব বলল, “কেন, আমি তো প্রজাদের সুখেই রেখেছি, তাদের তো কোনো কমপ্লেইন নেই….”

“কমপ্লেইন আমার আছে…” উত্তঙ্ক বলে, “আমি কি তোমার প্রজা নই? প্রজার পতি হয়ে প্রজাকে রক্ষা না করে তুমি প্রজাপতির মতো বনে ঘুরতে চললে…”

“ও আচ্ছা আপনিই সেই অসন্তুষ্ট প্রজা?” রাজা বলে, “বলুন, আপনার দাবিটা কী?”

“আমার আশ্রম উত্তলক (বা উত্তনক) এর কাছেই…” উত্তঙ্ক বলে, “সেখানে ধুন্ধু বলে এক ব্যাটা দৈত্য খুব জ্বালাতন করে। একটা মরুভূমির মতো জায়গায় আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে থাকে, আর থেকে থেকে এমন হুংকার দেয় যে ভূমিকম্প হয়ে, ধুলো ধোঁয়া উঠে আকাশ বাতাস ঢেকে যায়, পাহাড় গাছ পাথর সব ধ্বংস হয়ে যায়…”

“বলেন কি! মাটির তলায় ক্ষতি করার জন্য পারমাণবিক পরীক্ষা করছে নাকি?” রাজা চমকে ওঠে, “ধুন্ধু আমেরিকান, নাকি রাশিয়ান?”

“সেসব জানি না বাপু…” উত্তঙ্ক বলল, “এটাকে মারো। নইলে কাল এই ধুন্ধু এসে তোমার আর দেবতাদের উপরে চড়াও হবে…”

“কিন্তু এরকম দেবতাকে মারব কী করে?” রাজা জিজ্ঞেস করে।

“ওসব তোমায় ভাবতে হবে না…” উত্তঙ্ক বলে, “আমিও এই ফাঁকে তপস্যা করে নারায়ণকে ডেকে উপায় জেনে নিয়েছি। তুমি যুদ্ধে গেলেই তিনি তোমার শরীরে ঢুকে পড়বেন। তোমার ঠিকানা তো তিনিই দিলেন…”

“নারায়ণ ভর করবেন?” রাজা কুবলাশ্ব বলেম “ভর বাড়াবে আমার?”

“হ্যাঁ”

ব্রাহ্মণের রিকোয়েস্ট, রাজাকে রিটায়ার হওয়ার আগে দৈত্যকে মারতেই হবে। সে নারায়ণ আসুক না আসুক, উত্তঙ্কের কথায় অত্যন্ত উজ্জীবিত হয়ে কুবলাশ্ব নিজের ছেলেপুলে নিয়ে গান গাইতে গাইতে চলল মরুভূমিতে দৈত্য মারতে, “দিল ধুন্ধু-তা হ্যায়, ফির ওয়াহি, ফুরসত কে, রাত দিন…”

সেখানে অকুস্থলে পৌঁছে কুবলাশ্ব তার ছেলেদের অর্ডার করল, “নে বালি খোঁড়!”

সঙ্গে বোধহয় শ-খানেক ট্রাকও ইয়ে গেছিল। সেই থেকেই হয়তো অবৈধ ভাবে বালি পাচারের ঘটনা শুরু। বালির লরি যত বোঝাই হতে লাগল বালির সাথে ততই লড়তে লাগল ছেলেরা। সাধারণত মেরে বালিচাপা দেওয়াটা গুপ্তখুনের নিয়ম, কিন্তু গুপ্ত জায়গা থেকে খুনের জন্য তুলে আনার হেতুতে চাপা বালি সরানো, এটা ইতিহাসে এই প্রথম হচ্ছিল। বালি সরাতেই কোন নগর থেকে সেই বিরাট বিকট দানবের আভাস পাওয়া গেল। কুবলাশ্ব চেঁচাল, “বালি হল্ট…”। সেখানেই বোধহয় বালি হল্ট স্টেশন করার কথা ছিল, পরে সেটাকে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসা হয়।

এদিকে ধুন্ধু নামে সেই অতিকায় ছুঁচো (মাটির তলায় থাকত, ছুঁচো হওয়াই স্বাভাবিক) জুরাসিক পার্কের ডাইনোসরের মতো “অ্যাঅ্যাঅ্যা…” করে চেঁচিয়ে বেরিয়ে এল। তারপরে শুরু হল ব্যাপক লড়াই। রাজার মধ্যে নারায়ণ ঢুকে ধুন্ধুকে যত প্রহার করল তত ধুন্ধু রাজার ছেলেদের ধরে আহার করতে লাগল। ভূগর্ভস্থ দানবের একেবারে মুখস্থ হয়ে উদরস্থ হতে লাগল রাজকুমারেরা।

রাজার এদিকে হুঁশ নেই, ছেলে গেলে ছেলে পাব, দৈত্য গেলে দৈত্য পাব না, এই মানসিকতা নিয়ে প্রচণ্ড যুদ্ধ করল। তারপরে রাজা কুবলাশ্ব ধুন্ধুকে মেরে ফেলল। দেবতারা তাসা ফাসা ব্যান্ড পার্টি এনে ঝিনচ্যাক ঝিনচ্যাক করে খুব খানিক বাজিয়ে রাজাকে মোটামুটি দেবতার স্ট্যাটাস দিয়ে রাজার নতুন নাম দিল ‘ধুন্ধুমার’। সেই থেকেই ‘ধুন্ধুমার কান্ড’ কথাটার মানে দাঁড়াল এমন যুদ্ধ, যেখানে স্বজনের কথা না ভেবে বালি ছেটাছেটি করে মরুঝড় বানিয়ে মারপিট করা।

কিন্তু ব্যাপারটা হল ধুন্ধু কিছু না করেই কেস খেল। কেন? সে তো তখনও দেবতাদের বিরুদ্ধে কিছু করেনি, এক উত্তঙ্কের আশ্রম ছাড়া আর কোথাও কিছু অত্যাচারও করেনি। এমনকি উত্তঙ্কের আশ্রমকেও বছরে একবার একটু গা ঝাড়া দিয়ে বিরক্ত করত, উত্তঙ্ক বাপু অন্য জায়গায় নিজের আশ্রম তুলে নিয়ে গেলেই পারত। এরকম একটা নিরীহ, গোরুর (বা ছুঁচোর) ন্যায় গোবেচারা দৈত্যকে এরকম ছেলেপুলে এনে কেলাবার কি খুব দরকার পড়েছিল? আমার মনে হয় না, এটা আর্যদের ওই মরুভূমির তলায় জলের খোঁজে এক্সপিডিশন করার গল্পকেই এভাবে বলা হয়েছে। আদৌ ধুন্ধু নামে রাক্ষস ছিলই না হয়তো, ওটা উষ্ণ প্রসবণ ছিল হয়তো, থেকে থেকে জলের গীজার ভুসস করে বেরোত, আর মাটির নীচে কোনো সুপ্ত নদী আগ্নেয়গিরিতে পড়ে জায়গাটাকে মাঝে মাঝে কাঁপিয়ে দিত।

রাজা বোধহয় ছেলেপুলে নিয়ে খুঁড়তে গিয়ে ধ্বসে গিয়ে অনেক ছেলেপুলেকে ওই ভূগর্ভস্থ ফোকরে হারিয়েছিল, কিন্তু সেটা তো বলা যায় না। সেখানে রাজার বীরত্ব কোথায়? তাই এই দৈত্যর গল্প ফাঁদা। আর যদি সত্যিই বিনা প্ররোচনায় ধুন্ধুকে রাজা মেরে থাকে তাহলে মানতেই হবে এ বড় অন্যায় কাজ হয়েছে। আরে আগে তাকে স্বর্গ-টর্গ জয় করতে দাও, একটু দেবতাদের তাড়াবে, একটু পাতাল লোক নাড়াবে, একটু যজ্ঞ-টজ্ঞ ভন্ডুল করবে, তবেই না সে অত্যাচারী হবে। সে বেচারা বেসমেন্টে লুকিয়ে নিজের রিসার্চ আর প্ল্যানিং করছিল, কোত্থেকে ওই উত্তাল পাগলাটে বুড়ো উত্তঙ্ক গিয়ে রাজাকে গ্যাস খাইয়ে তাকে বধ করিয়ে দিল। সত্যি লজিকের ভসদমর্দন করে রেখে দিয়েছে।

এবারে ত্রিশঙ্কুর গল্প বলি। যারা জানেন না তারা অবাক হবেন জেনে যে ত্রিশঙ্কু নামে সত্যিই এক পৌরাণিক চরিত্র ছিল। ত্রিশঙ্কু মানে দুটো ব্যাপারের মাঝে র‍্যাপার জড়িয়ে উলটো হয়ে ব্যাটমানের মতো ঝুলে থাকা। ব্যাটমান যদিও ঝুলে থাকে না, কিন্তু কোনো মানুষ যদি বাদুড়ের মতো উলটো হয়ে ঝুলে থাকে তাহলে তাকে বাদুড়-মানুষ বলাই যায়। যারা ত্রিশঙ্কুর ব্যাপারে জানেন তারা ভালোই বুঝবেন কেন আমি বাদুড়ের প্রসঙ্গ টেনে আনলাম। সেই ত্রিশঙ্কুর গল্পই বলব এবার। মোটামুটি ইক্ষাকু, ধুন্ধুমার, ত্রিশঙ্কু ইত্যাদি রামের পূর্বপুরুষ। এরা সূর্যবংশ। কিন্তু হরিবংশ বলতে গিয়ে বেদব্যাস একেবারে ব্রহ্মা থেকে শুরু করে সবার নাম ধাম, কে কার ছেলে, নাতিপুতি, সরাসরি বউ, এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার, কেচ্ছা কাহিনি সব খুলে বলতে শুরু করেছিল। তাই প্রসঙ্গের সুতো ধরে এর গল্প আসছে। আগামী পর্ব থেকে আমি চেষ্টা করব চন্দ্রবংশ ধরে এগোনোর। মানে ওই চাঁদের ছেলে বুধ, তার ছেলে পুরুরাভ, তার ছেলে, তাদের নাতি পুতি গুতি ইত্যাদি। আপাতত ত্রিশঙ্কুর গল্প। এই গল্পটা বাল্মীকি রামায়ণে ভীষণ সাদামাটা ভাবে বলা আছে। কিন্তু আমি বলব হরিবংশে লেখা গল্পটা।

ধুন্ধুমার মানে কুবলাশ্বর তিনটে ছেলে বেঁচে ছিল, বাকি বংশের সব ব্রাঞ্চ ধুন্ধু রাক্ষসের লাঞ্চে পরিণত হয়েছিল। সেই তিনটে ছেলে ছিল দ্রিধাশ্ব, চন্দ্ৰাশ্ব আর কপিলাশ্ব। দ্রিধাশ্বর ছেলে হরয়াশ্ব, তার ছেলে নিকুম্ভু (এটার নামে অশ্ব বাদ গেল কেন?), তার ছেলে সঙ্ঘতাশ্ব (এই তো আবার অশ্বের লাইনে ফিরেছে), তার ছেলে প্রসেনজিৎ (বুম্বাদা নয়)। প্রসেনজিতের বউয়ের নাম ছিল গৌরী যে অভিশাপ খেয়ে নদী হয়ে গেছিল। যাক, শান্তনুরাজা একা এমন চরিত্র ছিল না, যার বউ নদী হয়ে গেছিল। এই প্রসেনজিতের ছেলের নাম ছিল যুবনাশ্ব। যুবনাশ্বকে নিয়ে একটা ঘটনা এইবেলা বলে রাখি।

যুবনাশ্বের একশোটা রানী ছিল, কিন্তু কোনো সন্তান ছিল না। এটা আগেকার দিনে প্রায়ই ঘটত। রাজা একশোটা কেন, পাঁচশোটা বিয়ে করে সন্তানের জন্ম না দিতে পারলে সব দোষ ওই রানীদের। রাজা ইম্পোটেন্ট হবে? হতেই পারে না। কিন্তু রাজার কোনো ছেলেপুলে নেই, তাই রাজা রানীদের নিয়ে জঙ্গলে একটা যজ্ঞ করতে গেল। ইম্পোটেন্ট রাজা ইম্পর্টেন্ট যজ্ঞ করতে জঙ্গলে টেন্ট খাটাল। একশোটা রানীকেও নিয়ে গেল কেন? আহা, যত পুত্র তত লাভ, নিজেদের মধ্যে মারামারি করে যে বাঁচবে সে-ই রাজা হবে। এখনকার সময় নাকি ? আপনার আমার মতো একটি সন্তান নিয়ে ছোট পরিবার সুখী পরিবার হবে? এসব রাজা-রাজড়ার ব্যাপার, ছোট পরিবার নয় তারা ছোটাও পরিবার, মানে পরিবারের সদস্য সংখ্যা গাড়ির মতন ছোটানোতে বিশ্বাসী ছিল। সেই বিশ্বাসেই যজ্ঞ। পুত্রেষ্টি না কি বেশ। কন্যেষ্টি নয় কিন্তু, কন্যার দরকার নেই, রাজ্য আর বংশ চালাতে পুত্রেরই দরকার, সে দেবতা, আগুন, ঋষি, যক্ষ যার থেকেই হোক না কেন, একটা পুত্র পেতেই হবে।

যজ্ঞ শুরু হল, দেবতাদের টনক নাড়াতে কয়েক টন গব্য ঘৃত আগুনে ঢেলে প্রচণ্ড আগুন আর প্রচণ্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি করা হল। ঘিয়ের বাষ্প জঙ্গলের পাতাগুলো পর্যন্ত ঘি চপচপে করে দিল। কি অসহ্য গরম, রাজার প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেল। কিন্তু এখন ঋত্বিক আর ঋষিকে যদি বলে ‘জল খাব’, তাহলেই আবার যজ্ঞে ছেদ পড়বে। ঋত্বিকরা তখন রোষিত হয়ে রাগের রোশনাই দেখিয়ে ঋত্বিক রোশন হয়ে যাবে। তাই রাজা কাউকে কিছু না বলে যজ্ঞস্থলের এদিক ওদিক তাকাই, যদি একটু জলপাই। বেদির পাশেই একটা ঝকঝকে মগে জল দেখে রাজা সেটা তুলে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল।

এদিকে ঋষি আর ঋত্বিকেরা হাঁ, ওদিকে রাজা জল খেয়ে তৃপ্ত হয়ে ঢেঁকুর তুলে বলল, “বাবাহ্ শান্তি পেলাম…”

“শান্তি কেন? এবারে অশান্তির শুরু…” জনৈক ঋষি জানায়। “কেন? কেন?” রাজা জিজ্ঞেস করে, “মগের জল খেলাম, তাতে কী অপরাধ?”

ঋষিরা বলে, “যজ্ঞস্থল কি আপনার মগের মুলুক পেয়েছেন নাকি যে যে কোনও মগে জল দেখলেন আর খেয়ে ফেললেন? ওই মগেই আমরা পুত্র হওয়ার জন্য সিরাম মানে ম্যাজিক তরল তুলে রাখছিলাম। ওটা জল না, ছেলের দল হওয়ার যজ্ঞের ফল ছিল…”

“এবার কী হবে?” রাজা চিন্তিত হয়।

“আর কি?” ঋষি বলে, “মোবাইলে সিম ঢুকে গেছে, এবারে দেবতাদের কলের অপেক্ষা…”

জল খেয়ে কী করে সন্তান হয় আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না। এসব অ্যাডভান্সড সায়েন্স, আমি প্রক্রিয়া বলতে পারব না, কিন্তু সন্ধ্যে হতেই রাজার পেটে ক্রিয়া শুরু হয়। কখনও এদিকে দুমদাম, কখনও ওদিকে ভুটভাট। না, রাজা যুবনাশ্বের পেটে গ্যাস হয়নি, রাজার ছিন্নমতিতে গেলা দৈবিক জলের কেরামতিতে একরত্তি এক ছেলে রাজার পেটে জন্ম নিয়েছে। কিন্তু হাজার হোক রাজা তো পুরুষ, তার সন্তান বেরোবে কোন পথে? তাই ঋষিরা এবারে রাজাকে নিয়ে জঙ্গুলে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকিয়ে রাজার পেটের ডানদিক কেটে একটি পুত্রসন্তান বের করল। একেবারে সি-সেকশন। প্রকৃত অর্থেই ‘বাপ কা বেটা’। সেই ছেলের নাম হল মান্ধাতা। পরিবারে অশ্ব নামের ঘোড়দৌড় ওখানেই শেষ হল।

শুরু হল মান্ধাতার আমল। মান্ধাতার ছেলে পুরুকুৎস, তার ছেলে এসাদাস্যু, তার ছেলে সম্ভূত, তার ছেলে সুধন্ব, তার ছেলে ত্রিধন্ব, তার ছেলে ত্র্যয়রুণ।

আপনারা ভাবছেন এত ছেলেপুলের নাম বলছি কেন? এটা একটা ট্রেলার দিয়ে রাখলাম, কখনো যদি এই ফাজিলের বইকে দুচ্ছাই করে ফেলে দিয়ে পরিষ্কার মনে হরিবংশ পড়তে বসেন তাহলে পাতায় পাতায় এরকম নামের পর নাম, আর ছেলের পর ছেলের নাম পাবেন। সেই সবকিছু আমি বাদ দিচ্ছি, লিস্ট দেখে নেবেন। যা-ই হোক এই ত্র্যয়রুণর ছেলে সত্যব্রত, সে ব্যাটা মহা ফচকে আর বাৎসল্যপূর্ণ। কোথায় কী করতে হবে, কী বলতে হবে, কিচ্ছু জানে না। রাজার ব্যাটা, নিজের মর্জির নিজেই দর্জি। অর্ধেক কথা শোনে, অর্ধেক শোনে না, যা ইচ্ছে তাই, মানে যাচ্ছেতাই করে বেড়ায়। ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা…’ এরকম মানসিকতা।

এদিকে সত্যব্রতর বাবা এক যজ্ঞের আয়োজন করেছে। রাজা মানুষ, যাগযজ্ঞ করে ট্যাক্সের পয়সা ওড়ানো ছাড়া আর কি কাজ আছে? আপনারা আমাকে পাপী, অধর্মী বলতেই পারেন, কিন্তু এই সত্যিটা মানতেই হবে যে পুরাণে কোথাও ক্ষত্রিয়রা গতরে খেটে রোজগার করেছে সেটা লেখা নেই। ব্রাহ্মণবর্গ যজ্ঞের আগুনে সব ঢেলে দিত, কিন্তু যজ্ঞ থেকে কিছু আমদানী করে দেশ চালিয়েছে সে উদাহরণ বিরল। রাজা আর ব্রাহ্মণ মিলে সর্বস্ব আগুনে ঢেলে দেবতাদের তুষ্ট করে রাখত, দেবতারা সঠিক সময়ে আকাশের জল আলো বাতাস সাপ্লাই দিত, তাতে প্রজারা আরও ফসল, গবাদি পশু বাড়াত, আর রাজা আবার সেগুলো নিয়ে একই চক্রে ঘুরত। সুতরাং সমাজের দুটো শ্রেণি সমস্ত কিছুর জোগান দিত, আর দুটো শ্রেণি আক্ষরিক অর্থেই ভস্ম করত।

সত্যব্রতর বাবা ত্র্যয়রুণও এরকম যজ্ঞ করাচ্ছিল বশিষ্ঠকে দিয়ে। এই বশিষ্ঠকে দেখবেন, সূর্য বংশের রাজাদের সেই কস্মিনকাল থেকে শুরু করে লব কুশের নাতিপুতি পর্যন্ত রাজপুরোহিতের অফিস নিয়ে বসে আছে। এইই একমাত্র চিরঞ্জীবী ঋষি যে নিজের একটা স্থায়ী চাকরির পদ বহুদিন ধরে রেখেছিল। হয়তো একই মানুষ, হয়তো-বা একটা পরিবারের নাম। যা-ই হোক, এই যজ্ঞের সময়ে সত্যব্রত অন্য একজনের বউকে হরণ করে বিয়ের আসরে নিয়ে আসে। খবর চলে যায় ত্র্যয়রুণর কাছে, সে বশিষ্ঠকে নিয়ে বিয়েবাড়িতে এসে বলে, “এ বিয়ে হবে না…”

ততক্ষণে সাতপাক ঘোরা প্রায় শেষ। কিন্তু বশিষ্ঠ কিছু বলে না, রাজাকে বা সত্যব্রতকে আটকায় না। রাজা ত্র্যয়রুণ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে, “তুই এরকম অন্যের বউ এনে বিয়ে করছিস, যা আজ থেকে চন্ডালদের সাথে থাক। এই পরিবারের সাথে তোর কোনো সম্পর্ক নেই।”

পিতৃআজ্ঞা, কী আর করা যাবে? সত্যব্রত বনে গিয়ে চন্ডালদের সাথে বসবাস শুরু করে। বউকে সাথে নিয়ে গেছিল কি না জানা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, বশিষ্ঠ রাজা ত্র্যয়রুণ বা সত্যব্রত কাউকেই আটকাল না কেন? কারণ বশিষ্ঠ দেখেছিল যে ততক্ষণে বিয়ের সাতপাক প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বিয়ে বাধা দিলে পরিবারে অভিশাপ নেমে আসবে, আবার অন্যের বউকে বিয়ে করেও সত্যব্রত পরিবার ও রাজ্যের উপরে অভিশাপ নিয়ে আসল। তাই একদিকে ত্র্যয়রুণ ছেলেকে বনে পাঠিয়েয়েছে ভালোই হয়েছে, ওখানে প্রায়শ্চিত্ত করে ফিরে আসলে রাজা হবে’খন, অভিশাপও কাটবে। ইন্দ্র সেই অভিশাপের চোটে রাজ্যে বারো বছর বৃষ্টি দিল না। বোঝো ঠ্যালা। রাজার বাড়িতে রাজার ফ্যামিলির অভ্যন্তরীণ ঝামেলা, তার জন্য ইন্দ্র জল ঢালল না। কেন? নাকি রাজার বংশ পাপ করেছে। আরে, দেশের বাকি মানুষগুলো কী অপরাধ করেছিল ? ইন্দ্ৰ যেন নিজে ধোয়া তুলসীপাতা। ঠিক করেছিল, কৃষ্ণ ঠাকুর ইন্দ্রের থেকে পুজো কেড়ে গোবর্ধনকে দিয়েছিল। অত্যাচারী দেবতার উচিত শিক্ষা হয়েছিল।

কিন্তু সত্যব্ৰত এত কিছু বুঝল না, সে খালি বুঝল বশিষ্ঠের ক্ষমতা ছিল আমাদেরকে আটকানোর কিন্তু আটকাল না। ব্যাটা ভীলেন। এ্যয়রুণও এরপরে বশিষ্ঠকে রাজ্যপাটের কেয়ারটেকার করে ‘টেক কেয়ার’ বলে ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাবে বাণপ্রস্থে চলে গেল। এদিকে সত্যব্রত চন্ডালদের সাথে থাকতে থাকতে একদিন দেখে এক ঋষিপত্নী পয়সার অভাবে নিজের বড় ছেলেকে গলায় দড়ি বেঁধে ক্রীতদাস হিসেবে বেচতে যাচ্ছে। একটা সন্তান বেচে দিলে সেই পয়সায় অন্যগুলোকে বাঁচানো যাবে। নোট করে রাখুন, সূর্যবংশ আর সত্যযুগ চলছে তখন, এবং এতই ভালো সিস্টেম ছিল যে অভাবের তাড়নায় মাকে ছেলে বেচে দিতে হচ্ছে। এই পুরাণগুলো আসলে রাজাদের তোষামোদকারী ভরপেট খাওয়া ব্রাহ্মণগুলো লিখত তো, তাই রাজার প্রশংসায় সবসময়ই একটা দারুণ সুখের রাজত্ব বর্ণনা করত। কিন্তু এইরকম ছেলে বেচার ঘটনা, বা গরীব ব্রাহ্মণ, একলব্যের অন্যায়, ইত্যাদি দু-চারটে ‘বিক্ষিপ্ত’ ঘটনায় ভিতরের ব্যবস্থার উলঙ্গ কঙ্কালটা বেরিয়ে পড়ে। সব যুগেই এক ছিল, এখনও যা তখনও তাই। স্রেফ মানুষকে নীতি দেখিয়ে যুগের ঘাড়ে সব দোষ ফেলে দেওয়া।

সত্যব্রতর এই মহিলাকে দেখে খুব করুণা হয়। সে এগিয়ে এসে এই নারী ও তার সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়। আরে বনে থাকুক আর চন্ডালদের সাথেই থাকুক, সত্যব্রত তো রাজার ছেলে, পকেটে স্বর্ণমুদ্রার দু-চারটে থলি রাখত নিশ্চয়ই। প্রসঙ্গত এটা এখানে বলা যায় যে এই সত্যব্রতর ছেলেই ছিল ওয়ার্ল্ড ফেমাস রাজা হরিশচন্দ্র, যারা আবার চন্ডালদের সঙ্গে থাকার একটা সম্পর্ক হয়। তার মানে চন্ডালের সাথে এদের যোগাযোগ দুই জেনারেশনের। যা-ই হোক, মহিলা এবং বাচ্চাদের উদ্ধার করার পর জানা যায় তারা ঋষি বিশ্বামিত্রের স্ত্রী ও সন্তান। ওই গলায় দড়ি বাঁধা ছেলেটাই পরে ঋষি গলভ হয়। কোমরে দড়ি পরলে হয়তো কোলভ নাম হত।

সত্যব্রত নিষ্ঠা ভরে বিশ্বামিত্রের ফ্যামিলির সেবা করতে শুরু করে। প্রতিদিন শিকার-টিকার করে এনে বাড়ির সামনে রেখে দেয়। এটাও একরকমের তপস্যা, বিশ্বামিত্রকে গুরু মেনে তার পরিবারের সেবা করা। বিশ্বামিত্রও এই ফাঁকে এসব জেনে হেব্বি খুশি। এরকমই ভালো দিন যাচ্ছিল, কিন্তু একদিন সত্যব্রত কোনো শিকার পেল না। বিশ্বামিত্রের ঘরের পালগণ্ডা ছেলেরা আগের সব জমানো খাবার খেয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। প্রচণ্ড ক্ষিদেয় আর গুরুর পরিবারকে খাওয়ানোর ঠেকা নিয়ে সত্যব্রত আর কিছু না পেয়ে ভাবে, “আরে বশিষ্ঠের অনেক গোরু আছে না? ওগুলোর থেকেই একটাকে তুলে আনি…”

যেমন ভাবা তেমনি কাজ, বশিষ্ঠের সাধের একটি গোরুকে চুরি করে নিয়ে এসে তাকে কেটেকুটে সত্যব্রত নিজে আর বিশ্বামিত্রের পরিবারকে খাইয়ে সবার পেট ভরায়। এবারে আপনারা বইখাতা খুলে বসবেন, অ্যা…অ্যাই তো পাওয়া গেছে। পুরাণে রামের পূর্বপুরুষ, স্বয়ং হরিশচন্দ্রের বাবা বিফ খেয়েছে। তার সাথে বিশ্বামিত্রের ফ্যামিলিও। তাই তো? কিন্তু এটা দিয়ে প্ৰমাণ হয় না যে তখনকার দিনে গোরু খাওয়াটা আকছার হত। চাপে পড়ে ক্ষিদের জ্বালায় সত্যব্ৰত এটা খেয়েছিল। রোজ শখ করে খেত না। আর এটা পড়েই যদি কেউ ভেবে নেয় প্রাচীন ভারতে গোরু খাওয়ার চল বেশ বলবৎ ছিল, তাহলে সেটা ভুল। কারণ ব্যাপারটা এরকম হবে যে আজ থেকে কয়েক হাজার বছর পরের মানুষ যখন জানতে পারবে যে আর এল স্টিভেনশন কোকেন নিতেন, অথবা বিখ্যাত অনেক মনীষীর দুই বা তার অধিক বিবাহ আছে তখন তারা যদি ভেবে বসে আমি আপনি সবাই ড্রাগস নিই বা প্রচুর বিয়ে করি সেইরকম ব্যাপার। কে কবে কী খেয়েছে বলে এত বড় দেশের সবার খাদ্যাভাস বিচার করাটা আমাদের জন্মগত রোগ। “বাঙালি হয়ে মাছ খাও না?”, “বাঙালরা এমন মাছ খায় এদেশে নামই জানে না”, “চিনেরা আরশোলা খায়”, “দক্ষিণ ভারতীয়রা আবার খেতে জানে নাকি?”, “গুজরাটিরা মিষ্টি খায়”–এ হেন খাদ্য নিয়ে এক-একটা জাতিকে স্ট্যাম্প করে দেওয়া মন্তব্য আমাদের দেশেই শুনতে পাওয়া যায়। তবে দক্ষিণ ভারতে ওরা সত্যিই সবেতে টক খায়, এটা না মেনে পারছি না।

যা-ই হোক, বশিষ্ঠ অতিষ্ঠ হয়ে আর শিষ্ঠ না থাকতে পেরে রেগে ফায়ার। সত্যব্রতকে যা নয় তাই শুনিয়ে বলল, “তুই তিনটে অপরাধ করেছিস, এই পাপগুলো তোকে ত্রিশূলের মতন বিঁধবে। প্রথম পাপ অন্যের বউ বিয়ে করে বাবার অভিশাপ পাওয়া, দ্বিতীয় গোহত্যা আর তৃতীয় নিষিদ্ধ মাংস ভক্ষণ করা…”।

নির্ঘাত বশিষ্ঠ কোনো বিশিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতা ছিল, নইলে গোরু গোরু করে? আর সুকৌশলে রাজাকে আর রাজার ছেলেকে বনে পাঠিয়ে বারো বছর নিজে রাজত্ব করে। হ্যাঁ সিংহাসনে বসেনি, কিন্তু রাজ্য তো চালিয়েছে। কার সাথে যেন অদ্ভুত মিল পাচ্ছি একটা।

গল্পে এগোই, এই তিনটে অভিশাপের ছুঁচলো ডগায় বিদ্ধ হওয়ার জন্য সত্যব্রতর নাম হল ত্রিশঙ্কু। ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু নয়, শুধুই ত্রিশঙ্কু। এইবার এতদিন পরে বিশ্বামিত্র বেশ তপস্যা-টপস্যা সেরে লাগেজ নিয়ে বাড়ি ফিরেই যোগবলে ইন্টারনেট মারফত সব জেনে গেল। তার একনিষ্ঠ ভক্ত ত্রিশঙ্কুকে নিয়ে সে মহা খুশি। একপ্রকার বশিষ্ঠর মুখে ঝামা ঘষে দেওয়ার জন্যই, খুব ঘটা করে তাকে পাপমুক্ত করিয়ে তাকে রাজার সিংহাসনে বসাল। বশিষ্ঠ আবার ত্রিশঙ্কুকে তখন খুব খাতির করল। ইন্দ্রও বৃষ্টি ঢালল। সব পাপ শেষ। রাজা হিসেবে ত্রিশঙ্কু বেশ রাজত্ব-টাজত্ব করে বয়সকালে তার ছেলে হরিশচন্দ্রকে পরবর্তী রাজা বানিয়ে বিদায় নেবে ঠিক করল।

তখন বিশ্বামিত্র ত্রিশঙ্কুকে বলল, “বৎস তোমার গুরুভক্তিতে আমি প্রীত, তুমি বর চাও…”

ত্রিশঙ্কু অনেক ভেবে বলল, “আমাকে সশরীরে স্বর্গে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন, আমার মরতে বড় ভয়…”

এরকম বেয়াড়া বরেও বিশ্বামিত্র ‘তথাস্তু’ বলে দিল। তারপরে পরেরদিন মাঠের মধ্যে যজ্ঞ বিশাল করে যজ্ঞ শুরু করল বশিষ্ঠ। অন্যান্য ঋষিদের সাথে মন্ত্র-টন্ত্র পড়ে, ত্রিশঙ্কুকে বলল, “নাও, এতে ঝাঁপ দাও!”

ত্রিশঙ্কু বলে, “সশরীরে স্বর্গে যেতে চেয়েছিলাম, জহর হতে চেয়েছি নাকি?”

“এর মাধ্যমেই সশরীরে যাবে,” বিশ্বামিত্র বলে।

“হ্যাঁ, আগুনে ঝাঁপ দিলে শরীরটাই জ্বলে খাক হয়ে যাবে, তখন কি পোড়া কাঠ হয়ে স্বর্গে যাব? অপ্সরারা পাত্তা দেবে আদৌ?”

“আহ, কিছু হবে না, এই আগুনে ঢুকলেই তুমি বুঝবে কী করে স্বর্গে যাবে।” বিশ্বামিত্রের কথায় কিছুটা আশ্বস্ত ও ত্রস্ত হয়ে ত্রিশঙ্কু আগুনে প্রবেশ করে, আর করতেই সেখানে একটা দুড়ুম করে শব্দ হয়। বিস্ফোরণে ত্রিশঙ্কু উড়ে যায়। বোমা বিস্ফোরণের মতন উড়ে যাওয়া নয়, বরং রকেটের মতন উড়ে যাওয়া।

বিশ্বামিত্র ত্রিশঙ্কুকে উড়িয়ে দিয়েই তার নেভিগেশন কন্ট্রোল করে স্বর্গের দিকে ফুলস্পিডে সাঁইসাঁই করে পাঠাতে লাগল। মানে রকেটের মতো রাজা ত্রিশঙ্কু উড়ছে। কোমরে রকেট বেঁধেছিল, না জুতোর তলায় ংমুং লাগিয়েছিল সে খবর পাওয়া যায় না। মোট কথা, ত্রিশঙ্কু মধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে স্বর্গাকর্ষণে স্বর্গের দিকে সুপারম্যানের মতো উড়ে যাচ্ছে।

এদিকে স্বর্গের দেবতারা এই দৃশ্য দেখে অবাক। একটা মানুষ স্বর্গের দিকে উড়ে আসছে, এ যে ঘোরতর অন্যায়। সশরীরে কেউ স্বর্গে আসে নাকি? মানে যদি না যুধিষ্ঠিরের মতন সলিড নেপোটিজমের জোর থাকে, সেখানে অন্য ব্যাপার। একটা সাধারণ রাজা কী করে উড়ে স্বর্গে ঢুকতে পারে? দেবতারাও তাই একত্রে মিলিত হয়ে উড়ে এসে জুড়ে বসা ত্রিশঙ্কুকে ক্যাত করে পদাঘাত করে আবার পৃথিবীর দিকে পাঠিয়ে দেয়। বিশ্বামিত্র দেখল, এই খেয়েছে, রাজাকে তোলার নেশায় প্যারাস্যুট দিতে ভুলে গেছি। এদিকে বর দিয়ে দিয়েছে, না-ও করতে পারবে না। বিশ্বামিত্র নীচ থেকে যোগবলে রাজাকে ভোগের বলের মতন আবার উপরের দিকে ঠেলতে থাকে। দেবতারাও ওদিকে দৈববলে রাজাকে নীচে ঠেলতে থাকে। ত্রিশঙ্কু দুদিকের ঠেলা খেয়ে মাঝে ঝুলছে, না স্বর্গে উঠতে পারছে, না পৃথিবীতে ফিরতে পারছে। সমানে চেঁচাচ্ছে, “মে ডে, মে ডে…”

বশিষ্ঠ নীচ থেকে চেঁচাচ্ছে, “হতভাগা এখনও মেয়ে দে মেয়ে দে করে চেঁচাচ্ছে, মরবে তবুও চরিত্র শুধরোবে না…”

এরকমই ‘ঠেলার নাম বাবাজি’ হয়ে উপগ্রহের মতন গলগ্রহ হয়ে মাঝ আকাশে উলটো হয়ে ত্রিশঙ্কু লটকাচ্ছে, এই সময়ে ইন্দ্র আর বিশিষ্ট কয়েকজন দেবতা এসে বিশ্বামিত্রকে বলে, “আরে ও বিশুদা, কী করছটা কি?”

বিশ্বামিত্র বলে, “আমি বর দিয়েছি, ওকে সশরীরে স্বর্গে পাঠিয়েই ছাড়ব…”

“কিন্তু…” ইন্দ্ৰ বলে, “ব্রহ্মার লেখা এই রুলবুকে ক্লজ নম্বর ৭২০ সাবক্লজ ২-এর ‘ড’ নম্বরে বলা আছে, কোনো মানুষ সাংঘাতিক পুণ্য বা তার বাবার দেবতাদের সাথে সলিড র‍্যাপো না থাকলে সশরীরে স্বর্গে ঢুকতে পারবে না…”

বিশ্বামিত্র দেখে, “তাই তো, প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাই কী করে?” তারপর অনেক ভেবে বলল, “ঠিক আছে উপায় করছি…”

এই বলে বিশ্বামিত্র দক্ষিণ আকাশে আরেকটা স্বর্গ বানাল। ত্রিশঙ্কুকে শরীর সমেত স্বর্গে পাঠাবে বলেছিল, কিন্তু কোন স্বর্গ সেটা তো বলেনি। ইন্দ্রের আসল স্বৰ্গতেই পাঠাবে সেটা তো বলেনি। ইন্দ্র আবার এসে বলল, “ইয়ে… মানে বিশুদা, বলছি কি, ওর স্বর্গ করছ করো কিন্তু পাওয়ার যেন আমার থেকে কম হয়, আর ওর স্বর্গে যেন কেউ না যায়।”

বিশ্বামিত্র রাজি হয়ে ত্রিশঙ্কুর স্বর্গটাকে উলটে দিল। সেই থেকে ত্রিশঙ্কু নিজের স্বর্গে একাই থাকে, উলটো হয়ে ঝুলে, না পৃথিবীতে না আসল স্বর্গে। আর এই থেকেই প্রবাদ এসেছে ‘ত্রিশঙ্কুর স্বর্গ’, যারা সব পেয়েও আসলে কিছু না পেয়ে মাঝামাঝি অবস্থায় ঝুলে থাকে। ঝুলন্ত রাজার উড়ন্ত দুরন্ত কাহিনি এখানেই শেষ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *