কৃষ্ণের বউদের কথা
কালযবনের ব্যাপারটা মিটে যেতেই কৃষ্ণ দ্বারকা নির্মাণে মন দিল। আর দেবতা বা অবতারদের কিছু বানাতে হলে একজনেরই ডাক পড়ে। সেই বিশ্বকর্মা। ভদ্রলোককে যে যেমন পারে খাটিয়ে নেয়। ইঞ্জিনীয়ার হয়েছে বলে যে যার বাড়ির যা খুশি করিয়ে নেয়। যেমন ধরুন বাঙালি বাড়ির ছেলেরা। হয়তো পড়েছে বায়োটেকনোলজি নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, কিন্তু বর্ষার দিনে বাড়িতে ফিউস আর মহালয়ার আগেরদিন মোবাইল বা রেডিও যদি না সারাতে পারে, তাহলে যত বড়ই ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী থাকুক না কেন, বাড়ির লোকের চোখে সে একটা অপদার্থ হয়ে যায়। ইঞ্জিনিয়ার মানে তাকে কারেন্ট আর কলের পাইপ সারানো জানতেই হবে।
বিশ্বকর্মার হয়েছে সেই দশা। কৃষ্ণ বিশ্বকর্মাকে মথুরায় ডেকে নিজের রথে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একেবারে উত্তরপ্রদেশ থেকে গুজরাট।
যেতে যেতেই কৃষ্ণ বলল, “এই যে বিশুদা, যা একখানা জমি পেয়েছি না, একদম কম দামে… এখানে একখান প্রাসাদ আর দুর্গ বানিয়ে দাও। এমন দুর্গ বানাও যেন দুর্গের উপর থেকে দূর দূরান্তের গো-সেনাকে যেন দেখতে পাই। দুর্গের নাম ‘দূর-গো’ রাখব কিনা ভাবছি…”
“জায়গাটা কী দূর গো… মথুরা থেকে…” বিশ্বকর্মা বলে।
“দূর তো হবেই, নইলে গোবুদ্ধিসম্পন্ন জরাসন্ধ যে আবার বারবার তেড়ে আসবে…” কৃষ্ণ বলে, “মথুরার দুর্গতদের জন্যই দুর্গ। জরসন্ধের রাগ ক্রমাগত নির্গত হয়ে এই দুর্গতদের উপরেই পড়ে। দুর্গ দিয়ে দুর্গতদের দুঃখ দূরে গত করব…”
“যেতে যেতে আমিই না গত হয়ে যাই…” বিশ্বকর্মা বলে।
“এই তো চলেই এসেছি, আর ডজনখানেক যোজন…” কৃষ্ণ বলে।
“যোজনের চক্করে আমার ভোজনের কথা মনে পড়ছে,” বিশ্বকর্মা বলে।
“এই পৌঁছে গেছি…” কৃষ্ণ সমুদ্রপাড়ের উচ্চ জমি দেখিয়ে বলে, “দেখো কীরকম স্পট…”
“এই খেয়েছে, এ যে নরম মাটি…” বিশ্বকর্মা বলে, “কৃষ্ণ তোমার তো ভালোই সিভিল জ্ঞান আছে, এখানে বসতি করলে শহরের বহর সমুদ্রের লহরে ভেসে গহ্বরে চলে যাবে। একশো বছরও টিকবে না…”
কৃষ্ণ অস্ফুটস্বরে বলে, “সেটাই তো চাই…”, তারপরে সাধারণভাবে বলে, “হ্যাঁ, এখানেই হবে। আমি আছি তো, কিস্যু হবে না…”
“তোমার পরে?”
“গভীরে যাও, আরও গভীরে যাও…”
“বুঝলাম, সবই তোমার লীলার গভীরতা…”
“ধুর আমি বলছিলাম গো-ভিড়ে যাও, মানে গোরুর ভিড়ে যাও,” কৃষ্ণ বলে, “গোরুর পাল দেখেছ তো? রাখাল যেমন চালাবে তেমনি চলবে, রাখাল না থাকলে যেদিকে যা খুশি করে বেড়াবে… আমি শুধু আমার পছন্দের ও আশেপাশের মানুষদের পথ দেখাতে পারি, বাকি কী করতে হবে না হবে সেটা তাদের ব্যাপার…”
“বুঝেছি, তুমি আবার এখানে এক প্রস্থ গীতা বলার উপক্রম করছ…” বিশ্বকর্মা বলে, “পরে ওই অর্জুন-টর্জুনকে শুনিও বাপু, আমার অত সময় নেই। কোথায় শহর বানাতে হবে? এইখানে তো? ঠিক আছে আমি প্ল্যান করে ফটাফট বানিয়ে দিচ্ছি…”
দ্বারকা নগরী ঝটপট তৈরি হয়ে গেল, কৃষ্ণ সেখানে মথুরাবাসীদের এনে বসিয়েও দিল। হেব্বি ব্যাপার। নাচ-গান আনন্দে ভরে উঠল। কয়েকটা গোরু চরতে চরতে সমুদ্রে হারিয়েও গেল। জায়গায় জায়গায় মন্দির তৈরি হল। আর মন্দিরের চত্বরের চারদিকে চারটে গেট বানানো হল, শূদ্রাক্ষ, ঐন্দ্র, ভুলত আর পুষ্পদন্তক। মন্দিরের বাইরে পান্ডারাও ফটাফট ব্যবসা শুরু দিল। ছোট ছোট মন্দিরের বাইরে রিকশা স্ট্যান্ড, প্রণামীর থালা, শনিবার করে পুজো। একেবারে জমজমাট শহর বসে পড়ল সমুদ্রপাড়ে। কয়েকজন যাদব ‘সি ভিউ’ হোটেলও খুলে ফেলল। আহা কুরুরা, গান্ধাররা, ভোজরা, মগধীরা আসবে না?
মোটামুটি দ্বারকা এমন এক শহর হল যা দেখে দেবতারাও হিংসে করতে পারত। গভীর রাতেও হ্যালোজেনের মতো জ্বলত দ্বারকা, কারণ ইট-কাঠ পাথরের জায়গায় মণিমুক্তো দিয়ে দরজা জানালা বানানো ছিল। ব্যাপক ব্যাপারস্যাপার। কৃষ্ণ এবার চলল রুক্মিণীকে বিয়ে করতে।
এদিকে কালযবন টসকে যেতেই জরাসন্ধের প্ল্যান ফসকে গেছে। জরাসন্ধ এবার ভদ্রতার মুখোশ ছেড়ে বলল, “অনেক হয়েছে, এবারে রুক্মিণীর সাথে কেষ্টার বিয়ে চেষ্টা আমাদের আটকাতেই হবে…”
সকলেই বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আটকাতে হবে…”
“কৃষ্ণ আসার আগেই অন্য কারোর সাথে বিয়ে দেওয়া হোক,” জরাসন্ধ বলে।
“কার সাথে? কার সাথে?” অন্য রাজারা আশায় আশায় প্রশ্ন ভাসায়।
“শিশুপাল…” জরাসন্ধ হুংকার দিয়ে বলে।
সভা একদম নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কেন? সবার মনে কনফিউশন। রুক্মী জিজ্ঞেস করেই ফেলল, “আমার বোনকে এক পাল শিশুর সাথে বিয়ে দেবেন? এ কি বিচার আপনার? তাছাড়া বাল্যবিবাহ দেওয়া আইনত দণ্ডনীয়। শুনেছি পূর্বদেশে রূপবান কন্যা বলে এক রমণীর সাথে এক দ্বাদশ দিবসীয় শিশুর বয়ে হয়েছে। কিন্তু ওসব এখানে চলবে না…
“ধুর ব্যাং, আমি কৃষ্ণের কাজিন বেরাদর শিশুপালের কথা বলছি,” জরাসন্ধ বলে, “এমনিতেই ওদের মধ্যে ঝগড়া। চোরে চোরে মাসতুতো ভাই হয়, এখানে দুজনে লড়ে লড়ে মাসতুতো ভাই হয়েছে। এর মধ্যে কৃষ্ণের ব্যথা আছে রুক্মিণীর প্রতি, সেই ব্যথাকে শিশুপালের মাথাব্যথা করে দিলে ব্যথা হারানোর ব্যথায় ব্যথিত হবে কৃষ্ণ। রুক্মিণী ব্যতীত ও ব্যথিত কৃষ্ণকে টপ করে আমরা কবজা করে ফেলব। আর কৃষ্ণও পুরো বিদর্ভরাজত্ব পাবে না।”
খাসা প্ল্যান।
এখানে হরিবংশ কৃষ্ণের দ্বারা রুক্মীণীর হরণের ঘটনাকে খুব কম শব্দে সেরে ফেলেছে। কিন্তু আমাদের তো গল্পে একটু নাটকীয়তা চাই। তাই এই ঘটনাটার জন্য আমরা ভাগবত পুরাণের দিকে দেখব।
জরাসন্ধ আর বাকি রাজারা তো প্ল্যান করে আনন্দে হাত কচলাচ্ছে, এদিকে রুক্মিণী কৃষ্ণের বীরত্বপূর্ণ কাহিনি শুনে ফিদা হয়ে গেছে। আহা যে রাজারা রুক্মিণীকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে আসছে, সেই রাজাগুলো যার হাতে ভাজা ভাজা হয়েছে তার প্রতি প্রেমে পড়বে না? আবার কানাঘুষো শোনা গেছে কৃষ্ণও রুক্মিণীকে ভালোবাসে। রুক্মিণী তাই একখানা পত্র লিখল।
“প্রিয়তমেষু গড়ুরারুঢ় যাদবকূলনয়নমণিশ্রেষ্ঠ প্রাণাধীশ্বর প্রাণনাথ (নাম নেই কারণ স্বামীর নাম তখন স্ত্রীরা মুখে আনত না। হবু হলেও),
আমার হৃদয়, তোমার আপন হাতের ডোরে। দোলাও, ভোলাও, ঝোলাও— যাহা ইচ্ছে করিতে পারো। তদাপি জ্ঞাত হইও তোমার শত্রুগণ সম্মুখে তোমার প্রশংসা করিয়া, তোমার আড়ালে তোমারই কাজিন বেরাদর শিশুপালের সহিত আমার বিবাহ দিতে উদ্যত হইয়াছে। শিশুপালের সহিত বিবাহ হইলে ভবিষ্যতে সমস্যা হইবে। আমাদের শিশু সন্তানের পিতার নামে কী লিখিব? শিশুর পিতা শিশু? শিশু পিতার সন্তান, এইপ্রকার বিদেশী কবি লিখিয়াছেন বটে, কিন্তু আক্ষরিকভাবেই আমার শিশুর পিতৃপরিচয়ও শিশু হইবে–এ আমি মানিতে পারিনা। উহার সহিত বিবাহ হইবার পূর্বে আমি মৃত্যুবরণ করিব। তথাপি তুমি আসিয়া আমাকে লইয়া যাও, নচেত আমি আর বাঁচিতে চাহিনা
ইতি—
তোমার বৃহদট্টালিকাসম হৃদয়ের কোণেভালোবাসার প্রদীপের ন্যায়
রুকমিণী”
তারপর একজন বিশ্বস্ত ব্রাহ্মণকে ডেকে রুক্মিণী বলল, “যাও, এই পত্ৰ শীঘ্র কৃষ্ণের হাতে দিয়ে এসো। রেজিস্টার্ড চিঠি, খবরদার অন্য কারোর হাতে দেবে না।”
এত চর-গুপ্তচর-সখী থাকতে বামুনের হাতে কেন? কারণ আপনাকে বুঝতে হবে যে এটা শ্রী লক্ষ্মীদেবীর অবতার রুক্মিণীর চিঠি বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের কাছে যাচ্ছে। ব্যাপারটা পবিত্র। কত জন্মের কত পুণ্যের ফলে সেই বামুন চিঠি নিয়ে যাচ্ছে। এই কাজের জন্যই হয়তো বামুনঠাকুরের স্বর্গে একটা দু-হাজার স্কোয়ারফুটের ফ্ল্যাট বুক হয়ে গেল। এখানে যদি লিখত রুক্মিণী এক সাধারণ বিশ্বস্ত সৈন্যর হাতে চিঠি পাঠাল ব্যাপারটা ঠিক ঠাকুর-ঠাকুর অনুভব হত না। এই সৈন্য, বন্ধুবান্ধব, পায়রা, কুকুর এসব তো ম্লেচ্ছরা প্রেম করার সময় ব্যবহার করে চিঠি পাঠাতে। ভগবানের নামে চিঠি, ব্রাহ্মণ ছাড়া হয় নাকি? কৃষ্ণভক্ত আশ্রমসকল হয়তো সেই রানার বামুনের একটা গল্প লিখে ফেলে বলবে, এই দেখো, বামুন তার চোদ্দ জন্ম আগে থেকে এই এই কাজ করেছিল বলে আজ সে চিঠি নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছে। আর বামুনই কারণ তৎকালীন সমাজে বামুনের উপরে কেউ ছিল না। বামুন সৎ, নিষ্ঠাবান, ধর্মপরায়ণ এবং তাই বিশ্বস্ত। পুরাণের ছত্রে ছত্রে এরকম লুক্কায়িতভাবে বর্ণ প্রতিষ্ঠার উদাহরণ বহু আছে। এই যদি বামুনটা চিঠি হারিয়ে দিত, বা মাঝপথে পড়ে নিয়ে পালটি খেয়ে জরাসন্ধের হাতে দিয়ে দিত, তাহলে সে হয়ে যেত শূদ্র। কর্মের দ্বারাই বর্ণের পরিচয়, সেটাও ঠিক। বাজে কর্ম করলে বামুনও শূদ্র হয়, আর ভালো কাজে শূদ্র বামুন।
সেই রানার বামুন পত্র নিয়ে দৌড়ল। গিয়েই সোজা কৃষ্ণের হাতে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কৃষ্ণ তো চিঠি দেখেই বুঝে গেছে। খাম খুলে চিঠি বের করতে করতে গুনগুন করে গাইতে লাগল, “আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম…”
কিন্তু চিঠি পড়েই সুর বদলে গেয়ে উঠল, “দেরি করার ফলে বোধহয় আমি কেস খেলাম…”
সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণ দাউভাইয়াকে লাউয়ের মতো বগলদাবা করে রথে বসিয়ে নিয়ে চলল রুক্মিণীর কাছে। সঙ্গে বোধহয় বামুনটাকেও তুলেছিল। ঘোড়া ছুটল টগবগ করে। এদিকে বিদর্ভের রাজধানী কুন্ডিনা-তে শিশুপাল এসে হাজির। সঙ্গে বরযাত্রীতে জরাসন্ধ আর বাকি সব রাজারা। ফটাফট বিয়ে করে নিতে হবে।
রুক্মিণী দেখছে সব আশা শেষ, দুঃখে গাইতে লাগল, “আশা ছিল, ভালোবাসা ছিল… আর আশা নেই…”
ধড়াম করে জানালায় আওয়াজ হয়। চমকে উঠে রুক্মিণী তাকিয়ে দেখে জানালার অর্ধেক ভেঙে সেই বামুনঠাকুর লটকাচ্ছে আর সমানে চেঁচাচ্ছে, “আশা আছে, আশা-লতা-কিশোর-রফি সবার গান শুনিয়ে দেবে শিশুপালকে। তোমার জন্য কৃষ্ণ আসছে।”
আসলে এরকম ভাবে লিখলাম কারণ হরিবংশে বলা আছে, কৃষ্ণরা আসার আগে বা পরে সেই বামুন এসে রুক্মিণীকে খবর দেয়। কিন্তু কৃষ্ণ যদি এই ‘জোর করে বিয়ে’ দেওয়ার আসরে আসত, তাহলে আগে যে রাজারা ভয়ে বানিয়ে বানিয়ে ভালো ভালো কথা বলছিল তারা ভয় পেল না কেন? কৃষ্ণ আসতেই তো ওদের সটকে পড়ার কথা। সাথে আবার বলরাম ছিল।
তাই আমার মনে হয় কৃষ্ণের পৌঁছাবার অনেক আগেই পত্রবাহক ব্রাহ্মণ এসে পৌঁছেছে। তার মানে কি ব্রাহ্মণ রথের থেকেও তীব্র গতিতে ছুটেছে? এটা সাধারণ ব্রাহ্মণ না কি মিলারেপা যে হাওয়ায় ভর করে ছুটবে? নাকি ভূতে ভর করেছিল? তাই আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, যে কৃষ্ণ বলরাম যখন কুন্ডিনার দিকে রথ ছোটাচ্ছিল, তখন রুক্মিণীকে শীঘ্র খবর পৌঁছতে বলরাম চলমান রথ থেকেই হয়তো বামুনকে জ্যাভেলিনের মতো ছুড়ে দিয়েছিল। যে মানুষ লাঙল দিয়ে নদীর ধারা ঘুরিয়ে দিতে পারে সে মানুষ অন্য কোনো সাধারণ মানুষকে তুলে ছুড়ে দিলে সে পৃথিবীর গুরুত্বাকর্ষণ ছাড়িয়ে উপগ্রহের ন্যায় পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরতে বাধ্য। ওই কয়েকশো কিলোমিটার তো কোন নস্যি। সেই উড়ন্ত বামুনই রুক্মিণীর গবাক্ষে অর্ধবক্ষ হয়ে দক্ষভাবে সূক্ষ্মসংবাদ দিয়ে মান রক্ষা করে।
যদি আপনার ক্রাশও আপনাকেই পছন্দ করে তাহলে তার থেকে আর আনন্দের কিছু হয় না। সাময়িক হলেও সেটা হেব্বি আনন্দের ব্যাপার। রুক্মিণী আনন্দে খুব খানিক নেচে নিল। প্ল্যানমতো পরেরদিন রুক্মিণী গেল মন্দিরে। মা অম্বিকার পুজো দিতে। মতান্তরে শচীদেবীর পুজো দিতে। কাকে পুজো দিচ্ছে সেটা দরকারি না, এরপরে কী ঘটল সেটি দরকারি। রুক্মিণী গেছে পুজো দিতে আর তাকে ভিভিআইপি সুরক্ষার ঘেরাটোপে রেখেছে সবাই। সবাই মানে জরাসন্ধের দল, শিশুপালের দল, রুক্মীর দল আর বাকি রাজারা। পুজো হলেই ধরেবেঁধে বিয়ে দিতে হবে। এই বিয়ে হতেই হবে।
পুজো দিয়ে রুক্মিণী মন্দিরের বাইরে বেরোল, আর নীচে যেই নেমেছে, অমনি কোথা থেকে প্রায় রথ উড়িয়ে কৃষ্ণ সেখানে এসেই রুক্মিণীকে রথে তুলে নিল। রাজারা সব “রেরেরেরে…” করে তেড়ে এল।
বলরাম রথ থেকে নেমে এসে পাঁইপাঁই করে গদা ঘোরাচ্ছে আর বলছে, “কই শিশুপাল? কোথায় তার বা…”
“দাউভাইয়া…” কৃষ্ণ চেঁচাল, “সেন্সর প্রয়োগ করো…”
“ধুত্তেরি! আমি বলছিলাম কোথায় তার বাড়ি… ব্যাটা বদের ধাড়ি…” বলরাম কয়েক ডজন রাজাকে গদার বাড়িতে যমের বাড়ি পাঠিয়ে বলল, “হতভাগাকে ভাই বলে ডাকতাম, আজকে ভাইকে ছাই না করে দিয়েছি তো আমার নাম পালটে দিস…”
জরাসন্ধ হুংকার দিয়ে উঠল, “মেরে ফেলব সবাইকে… অ্যাটাক…” হুড়হুড় করে জরাসন্ধের সেনা আর সমস্ত রাজাদের সেনা ঝাঁপিয়ে পড়ল কৃষ্ণ-বলরামের উপরে। কিন্তু তখনই বরযাত্রীর বাস এসে পৌঁছল। বাহ রে কৃষ্ণ আর বলরাম নাহয় আগেভাগে চলে এসেছিল, তাই বলে যাদবরা বরযাত্রী আসবে না? বাস থামতেই কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, “আরিব্বাস…”
বাস থেকে যুযুধান, অক্রুর, বিপ্রিথু, গদা, কৃতবর্মা, চক্রদেব, সুদেব, শরণ, নিভৃতশত্রু (নিভৃতে শত্রু কে হয়?), ভঙ্গক্ৰ (কি ভঙ্গ করবে সেই জানে), বিদুরথ, কঙ্ক, শতদ্যুম্ন, রাজাধিদেব, মৃদর, প্রসেন (এটা কি সেই প্রসেনজিৎ?), চিত্রক (বোধহয় বিয়ের ছবি আর ফটো আঁকার জন্য চিত্রকর), অতিদন্ত (বত্রিশের বেশি দাঁত ছিল হয়তো), বৃহদদুর্গ, শ্বফলক, সত্যক, পৃথু সহ আরো অনেকে নামল। এরা নামতে না নামতেই আরও তিন চারটে বাসে করে অন্য যাদবরা হাজির।
বাস থেকে নেমেই বাঁশ পেটানো শুরু। দুর্দান্ত বিয়েবাড়ি। একদম মারামারি করে জমে ক্ষীর। বেশ ধূমধাম করেই বিয়ে হচ্ছে। চারিদিকে শুধু ধূম আর ধাম করে আওয়াজ। কে যেন মার খেতে খেতে চেঁচাচ্ছে, “ওগো ছেড়ে দাও গো, আর কোনোদিন স্বয়ম্বরে আসব না। কোনো মেয়েকে বউয়ের নজরে দেখব না, বাড়িতে গিয়ে বউকেও কাকিমা বলে ডাকব…।”
আবার একজন উড়ে যেতে যেতে বলছে, “কী মরতে এখানে বিয়ে খেতে এসেছিলাম, খাবার তো জুটলই না, উলটে উড়ে উড়ে বাড়ি ফিরছি…”
বলরাম জরাসন্ধের চুলের ঘেঁটি ধরে নাড়াতে নাড়াতে বলছে, “আমার ভাইয়ের বিয়ে পণ্ড করা? ভণ্ড ষণ্ড কোথাকার…”
এসবের ফাঁকে কৃষ্ণ রুক্মিণীকে নিয়ে পালিয়েছে। প্রথম বরযাত্রী, কনেযাত্রী আর দ্বিতীয় বরযাত্রীরা মারামারি করুক, কৃষ্ণ ঠিক কায়দা করে পালিয়েছে। কিন্তু রুক্মী ঠিক খেয়াল করেছে তার বোনকে কৃষ্ণ নিয়ে পালাচ্ছে। রুক্মী কৃষ্ণের পিছু নিল। অনেকটা পথ আসার পরে রুক্মী চেঁচিয়ে উঠল, “কৃষ্ণ, ভালো চাস তো আমার বোনকে ফেরত দিয়ে দে… নইলে…”
কৃষ্ণ রথের ব্রেক কষে। সঙ্গে সঙ্গে রুক্মীও দাঁড়িয়ে পড়ে। কৃষ্ণ রুক্মীর কাছে এসে, “নইলে কী?”
“নইলে আমি তোকে শেষ করে দেব!”
“নে, সামনে দাঁড়িয়ে আছি, কী করবি কর…
রুক্মী কৃষ্ণের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিন্তু কৃষ্ণ রুক্মীর মাথায় আলতো করে একটা চাঁটি মারতেই ব্যাটা মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে।
“নে, কী করবি বলছিস?” কৃষ্ণ বলে।
রুক্মী দ্বিগুণ তেজে ছুটে আসে, কিন্তু কৃষ্ণ রুক্মীর চুলের মুঠি ধরে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় মেরে বলল, “শ্যালক আছিস, শ্যালকের মতন থাক। আমি তোর জামাইবাবু। কত রাক্ষস খোক্কস পেটালাম, তুই তো কোন ছাড়…”
রুক্মিণী একসময়ে বলে, “আহা দাদাকে ছেড়ে দাও, বিয়ের আগেই তোমার হাতে আমার দাদা মরুক সেটা আমি মোটেও চাইনা…”
কৃষ্ণ রুক্মীকে ওখানেই ফেলে রুক্মিণীকে নিয়ে দ্বারকা ফিরল। তারপরে আর কি? মারপিট করে বরযাত্রী ফিরে এসে দ্বারকাতে আবার পার্টি শুরু। সমুদ্রতীরে দ্বারকা সেজে উঠল, আনন্দ আর ফুর্তির বন্যা বয়ে গেল।
কৃষ্ণের বিয়ের কথা যখন বলছিই তখন কী করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিয়ে হয় সেটাও বলি এইবেলা। এই দুটো বিয়ের পিছনে একটাই গল্প আছে। সেই গল্প একটা মণি নিয়ে। স্যমন্তক মণি। এবার সেই গল্পটা বলি।
ক্রৌসু নামক যাদব রাজার দুই রানি ছিল। সুয়োরানি আর দুয়োরানি। গান্ধারী আর মাদ্রী। এরা কুরু বংশের বউমাগণ নন। এই মাদ্রী দিব্যি জীবিত ছিল, এবং এই গান্ধারী বড় বড় চোখে সব দেখতে পেত। গান্ধারীর ছেলে ছিল অনামিত্র, আর মাদ্রীর ছেলেরা ছিল যুধাযিৎ আর দেবমিদুষ। অনামিত্রর ছেলে ছিল নিম্ন। নিম্নের সুখী ঘরে বিঘ্ন ঘটাতে দুই ছেলের জন্ম হল, সত্রাজিৎ আর প্রসেনজিৎ। এই প্রসেনজিৎ একবার জঙ্গলে শুটিং করতে গেছিল। আরে শুটিং মানে শিকার করতে গেছিল। আপনারা বুঝি নাম পড়েই ভাবছেন এই এবার নায়ককে নিয়ে টানাটানি করবে। না বাবা, আমি ভীষণ সাবধানী, বিখ্যাত মানুষদের উত্যক্ত করি না।
এই প্রসেনজিৎ শুটিং করতে করতে জঙ্গলে রাতে হারিয়ে যায়। এ আর নতুন কথা কি? পুরাণে যে রাজা শিকারে গেছে, সে রাস্তা হারাবেই। মাঝে মাঝে মনে হয় এই রাজ্য আর গাদাখানেক রানিদের কচকচানি শুনে শুনে রাজা স্রেফ একা একা সময় কাটাতেই বোধহয় জঙ্গলে ইচ্ছে করে হারিয়ে যেত। ‘একবার ত্যজি সোনার ও গদি, রাজা মাঠে নেমে যদি হাওয়া খায়, তবে রাজা শান্তি পায়…’ স্যার বলে গেছেন, সর্বাঙ্গসুন্দর কথাটি ধ্রুব সত্য।
এইরকমই ঘুরতে ঘুরতে আর “এই একলা জঙ্গল আমার দেশ আমার একলা থাকার অভ্যেস” গাইতে গাইতে প্রসেনজিৎ ঘুরছে। হঠাৎ দেখে সামনে সমুদ্র। প্রসেনজিৎ কি সুন্দরবনে শিকারে এসেছিল? নইলে জঙ্গলের পরেই সমুদ্র পেল কোথায়? হয়তো তখন ছিল। গোয়া-টোয়ার দিকেও হতে পারে। রাতের বেলায় একেবারে সমুদ্র দেখেই প্রসেনজিৎ জামা-কাপড় ছেড়ে ডাইভ দিয়ে স্নান করতে লাগল। নাহ্ এটা সুন্দরবন নয়, তাহলে প্রসেনজিৎ এই নৈশসন্তরণকালে অকালে এতক্ষণে বাঘের নইলে কুমিরের নৈশভোজনে পরিণত হত।
সাঁতার কেটে প্রসেনজিতের মনে পড়ল একবার সূর্যদেবের পুজো করা উচিত। সমুদ্রে এসেছে একটু আহ্নিক-টাহ্নিক সেরে নিক। প্রসেনজিৎ আঁজলাতে জল তুলে খুব মন দিয়ে সুয্যিমামার পুজো করে। ওই মধ্যরাতের অন্ধকারেই। সূর্যদেব তখন সবে খাওয়াদাওয়া সেরে অ্যালার্ম ঘড়িতে দম দিয়ে শুতে যাচ্ছেন। আবার কাল সেই কাকভোরে উঠে ‘অন্ধজনে দেহ আলো’ করতে হবে। সূর্য ছাড়া তো সব অন্ধ। সবে শুয়েছে এমন সময় শোনে কে যেন তাকে জোরে জোরে পুজো করে ডাকছে আর ছপাত ছপাত করে সমুদ্রের জলেই আঁজলা করে জল ঢালছে। সূর্যদেব কিছুক্ষণ কানে বালিশ-তোষক চাপা দিয়ে না শোনার চেষ্টা করে। কিন্তু ওঁর একাগ্র ভক্ত অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে ডেকেই যাচ্ছে। সূর্যদেব ঘড়ি দেখেন, রাত এগারোটা। হাতে আর পাঁচ ঘণ্টা সময় আছে।
সূর্যদেব শিগগিরি উঠে কোনোমতে ঝলমলে জামা পরে পাজামার দড়ি বাঁধতে বাঁধতেই প্রসেনজিতের সামনে হাজির। এসেই বলে, “বৎস, আমাকে ডাকায় আমি খুশি, বলো কী চাও…”
“আমি তো কিছু চাই না,” প্রসেনজিৎ বলে।
“তাহলে ডাকাডাকি করছিস কেন?” সূর্যদেব তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে, “আমার অফিস টাইমে ডাকবি, এরকম মাঝরাতে পাঁজরাতে কি বিচর্চিকা উত্থিত হয়েছিল? এখন এসেছি যখন কিছু একটা চাইতেই হবে… নইলে ব্রহ্মদেব আমার নম্বর কেটে নেবে…’’
সূর্যের আলোয় তখন মধ্যরাতে দ্বিপ্রহর হয়ে গেছে সমুদ্র সৈকত। গরমে সমুদ্রের জল ফুটছে, তার সাথে বিনা তেলে স্রেফ গরম জলে মাছভাজা হয়ে যাচ্ছে। প্রসেনজিৎ দেখল ডেকেই বিপদ। তখন প্রসেনজিৎ দেখল সূর্যদেবের গলায় একটা মণি ঝুলছে। তার জোরেই এত আলো এত উত্তাপ। ওটা দিয়েই কি সূর্যদেব গোটা পৃথিবীকে আলো দেয়?
“আমার ওই মণিটা চাই,” প্রসেনজিৎ বলে।
“এটা নিয়ে কী করবে?”
“আমি আপনার মতো আলো দেব…”
“ধুর…” সূর্যদেব বলে, “দিনের আলো দেওয়ার সিস্টেম তো আমার রথে রয়েছে। একেবারে ‘হাইড্রোজেন ফিউশন রিয়াক্টর জেনেরেটর’। হেব্বি ব্যাপার কাকা… গলার এটা আমার রাতের টর্চবাতি… আর এর থেকে রোজ আটভরি সোনা পাবি।”
“ওটাই দিন…” প্রসেনজিৎ বলে।
সূর্যদেব নিজের বেডরুমে ফিরে গিয়ে মণিটা টুপ করে ছুড়ে দিল। নইলে অন্ধকারে বাড়ি ফেরত যাবে কী করে? প্রসেনজিৎ ওটাকে লুফে নিয়ে নাচতে নাচতে বাড়ির দিকে চলল আর সাথে গুনগুন করে গান, “চিরদিনই মণি যে আমার, যুগে যুগে আমি মণিরই…”
নগরে ফিরে আসতেই লোকে অবাক হয়ে প্রসেনজিতের দিকে তাকায়। ওটা কে? মানুষ না চলমান আলো? সূর্যের মতন ঝলকানি দিয়ে প্রসেনজিৎ আসছিল। ভিড় উপচে পড়ল আলো-মানবকে দেখতে। দেদার রোদচশমা বিক্রি হয়ে গেল এই তালে। কেউ কেউ আবার সূর্যগ্রহণ দেখার চশমা নিয়ে এল। কয়েকজন এক্স রে প্লেটকে ভাঁজ করে প্রসেনজিতকে দেখতে শুরু করল। ওই তো প্রসেনজিৎ হাতে একটা হাজার পাওয়ারে লাইট ধরে এগোচ্ছে।
প্রসেনজিৎ সটান রাজা ও দাদা সত্রাজিতের কাছে আসে। সত্রাজিৎ জিজ্ঞেস করল, “এই মণি কোথায় পেলি?”
“বিশ্বাস করো দাদা, আআআআমি চুরি করিনি…” প্রসেনজিৎ বলে।
“ধুত্তেরি, চুরি করেছিস কে বলল? আমাদের রাজত্ব, সবই আমাদের, তুই এটা পেলি কী করে বল?” সত্রাজিৎ জিজ্ঞেস করে।
প্রসেনজিৎ তখন সমস্ত ঘটনা বলে, কিভাবে মধ্যরাতে সূর্যদেবকে ডেকে সে মণি পেয়েছে।
“বেশ বেশ, তুই এটা নিয়ে কী করতে চাস?” সত্রাজিৎ জিজ্ঞেস করে।
“আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি,” প্রসেনজিৎ বলে।
“সে তো বুঝলাম, কিন্তু এই মণির গুণ কী?”
“এই মণি প্রতিদিন আট ভরি করে সোনা দেয়,” প্রসেনজিৎ বলে। আট ভরি সোনা, মানে প্রায় বিরানব্বই গ্রাম সোনা, অর্থাৎ প্রায় আজকের দিনে সাড়ে চার লাখ টাকার সোনা রোজ। উফফফ ভাবতেই পারছি না। এগারো দিনে প্রায় এক কিলো সোনা, মাসে প্রায় আড়াই কিলো, বছরে তিরিশ কিলো। ভাগ্যিস সে যুগে সিবিআই বা বর্তমান নেতারা অথবা আমেরিকা ছিলনা। দেখতেন হয়তো দ্বারকাবাসীর সুরক্ষার অজুহাত দিয়ে সোনা নিতে চলে এলো আমেরিকান সৈন্যরা।
কিন্তু এবার একটু আলোচনা করা যাক। সহজ কথায় যেটা স্যমন্তক মণি, সেটা আসলে কি ছিল? ওটা কি কোনো পরশপাথর ছিল? হয়তো বিশেষ কোনো সহজলভ্য ধাতুতে ছোঁয়ালেই সোনা হয়ে যেত। পৃথিবীতে প্রায় সমস্ত দেশেই পরশপাথরের গল্প আছে। ভারতের বাইরে অ্যালকেমি নিয়ে রীতিমতন হইচই হয়েছে। হতেই পারে সেরকমই কিছু একটা জিনিস দেবতাদের মাধ্যমে প্রসেনজিৎ পেয়েছিল। কিন্তু আরেকটু গভীরে গিয়ে ভাবলে ভাবতে হচ্ছে যে মণিটা রোজ সোনা দিত। মানে সোনা প্রসব বা প্রস্বাব করত। এবার যদি বিজ্ঞানের দিক দিয়ে ভাবি, তাহলে বলুন তো সোনা উৎপন্ন হয় কী করে? নদীর চরে বলবেন না, ওটা খনি থেকে নদীর জল বয়ে নিয়ে আসে। সোনা উৎপন্ন হয় বিস্ফোরণ হওয়া তারার গভীরে, যখন হালকা উপাদানগুলোকে আর ফিউশন করা যায় না তখন ভারী উপাদানকে ফিউশন করে সোনা রুপো ইত্যাদি ভারী ধাতু তৈরি হয়। তাহলে যদি আমি একেবারে ভাবনার বাঁধন ছেড়ে দিয়ে ভাবি যে ওই স্যমন্তক মণি আসলে একটা ছোট্ট নক্ষত্র ছিল? মানে এতটাই ছোট যে তার উত্তাপ মানুষের পক্ষে আরামদায়ক আর আলোও দিচ্ছে প্রচুর। আবার প্রতিদিন সোনাও দিচ্ছে। হতেই পারে…হতে না-ও পারে। ভেবে ভালো লাগল। ভাবতে তো আর ট্যাক্স লাগে না।
মোটামুটি এরকমই কিছু একটা ছিল প্রসেনজিতের কাছে। প্রসেনজিৎ সেই সোনাহাগা মণি নিয়ে সোনায় সোহাগা হয়ে দিব্যি আছে। দেশে হেব্বি সুখ। কিন্তু ওই মণির প্রতি কৃষ্ণেরও নজর পড়েছিল। এখানে একটা ব্যাপার জানিয়ে রাখা ভালো, কৃষ্ণের এটা একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। যার কাছে যা কিছু দৈব, অদ্ভুত, মায়াবী সেটাই কৃষ্ণ নিয়ে নিত অথবা নেওয়ার চেষ্টায় থাকত। কোন এক রাজার মায়াবী ঘোড়া নিয়ে নিয়েছিল, অশ্বত্থামার মাথার মণি, যত মন্ত্রপূত অস্ত্রশস্ত্র, এর রথ, ওর মুকুট ইত্যাদি নিয়ে নিত। এই লিস্টে স্যমন্তক মণিও ছিল। আপাতভাবে এই জোর খাটিয়ে বা খুঁজে খুঁজে বুদ্ধি করে মায়াবী বস্তুগুলো নিয়ে নেওয়াটা একজন রাজার লোভ বা হবির মতোই দেখায় প্রায়। কিন্তু এর ভিতরে একটা গুপ্ত কারণ আছে।
কারণটা হল কৃষ্ণ এমন একটা সময়ে জন্মেছিল যখন দ্বাপর শেষের মুখে প্রায় আর কলিযুগ শুরুর মুখে। কলিযুগ যে ঘোর পাপীদের রাজত্বের যুগ সেটা তো আমরা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু দ্বাপর পর্যন্ত প্রচুর দৈব জিনিসপত্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিল। দ্বাপরের শেষের দিকে এমন অবস্থা এসে পৌঁছেছিল যেটাকে ইংলিশে বলে ‘ট্রানজিশন পিরিয়ড’। দেবতারা ভাসা ভাসা শুনতে পাচ্ছে যে, যে কোনোদিন থেকে বর দেওয়ার সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু হেড অফিস থেকে বরদান দেওয়া বা অভিশাপ দেওয়া বন্ধ হওয়ার কোনো নোটিশ আসেনি। অগত্যা এই সূর্যদেবের মতন দেবতারা ফাঁপরে পড়েছে। কেউ ডাকলে তাকে বরদানের জিনিসপত্র দিয়ে দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু সেইসব শক্তিশালী জিনিস কলিকালে থাকার প্রবল সম্ভাবনাও বাড়ছে। এইখানে আসে কৃষ্ণের কাজ। নোটিশ যখন আসেনি তখন তোমরা দিতে থাকো, আর কৃষ্ণও সেগুলো কায়দা করে জোগাড় করতে থাকুক। তারপরে কৃষ্ণের ইহজগতের লীলা সাঙ্গ হলে ওঁর সাথেই এসব জিনিস কোথায় যেন হারিয়ে গেল। একেবারে ভ্যানিশ। হয়তো মনুষ্য কৃষ্ণ সেগুলো নষ্ট করে দিয়েছিল, বা গভীর কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। অথবা ভগবান কৃষ্ণ সেই সমস্ত দৈব বস্তুকে ট্রাকে করে ভরে উচ্চতর লোকে নিয়ে গেছে। ভাবতেও ভয় লাগে যে স্যমন্তকের মতন একটা মণি আজকের দিনে থাকলে কি হত? গোটা পৃথিবীর নেতারা সোনার লোভে মারপিট করে সব শেষ করে দিত। ভালোই হয়েছে বাবা ওসব নেই। সোনা লাগলে দোকানে যাও নয়তো স্মাগলার হয়ে যাও।
যা-ই হোক, প্রসেনজিৎ মণি নিয়েই একদিন জঙ্গলে শিকার করতে গেল। রাজ্যে কাজকর্ম নেই বোধহয়, তাই রাজা খালি খালি শিকার করতে যাচ্ছে। প্রসেনজিৎ আরামসে গঞ্জিকা পান করতে করতে যাচ্ছে আর গাইছে, “পারি না সইতে, না পারি কইতে, তুমি কি কুয়াশা, ধোঁয়া ধোঁয়া ধোঁয়া…”
আমার মতে গঞ্জিকাসেবনকারীদের জন্য এর থেকে উপযুক্ত গান আর হতে পারে না। জঙ্গলের ভিতরে অনেকটা যাওয়ার পরেই প্রসেনজিতের সামনে পড়ে এক সিংহ। এটা একেবারে মিথ্যে। জঙ্গলে সিংহ থাকেই না। যেখানে সেখানে বীরত্ব বোঝাতে সিংহ আনলে তো হবে না। হয়তো প্রসেনজিতের গঞ্জিকা সেবনের ফল এই সিংহ দর্শন। অথবা গভীর জঙ্গলে যায়ইনি। ওই দ্বারকা থেকে গিরের দিকে গিয়ে বীর হতে গেছিল। ব্যস্, সিংহের সামনে পড়েছে। সিংহটা আবার মণির দিকেই দেখছে। আচ্ছা মণি যদি সূর্যের মতোই ঝকমক করে তাহলে সিংহের চোখ ধাঁধিয়ে গেল না কেন? সিংহের তো মণি দেখেই কেটে পড়া উচিত ছিল। হয়তো দিনটা মেঘলা ছিল। আর হয়তো মণিতে চার্জ দিতে ভুলে গেছিল প্রসেনজিৎ।
প্রসেনজিৎ থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “এ তুমি কেমন তুমি, কেশর ফুলিয়ে ঝগড়া করো? এ কেমন সিংহ তুমি একলা পেয়ে আমায় ধরো?”
সিংহ হুংকার দিয়ে উঠল, “বুম্বাআআআআআ…”
প্রসেনজিৎ একলাফ দিয়ে পাঁইপাঁই করে দে ছুট। সিংহ ভাবছে, “যাহ্ ব্যাটাকে বেশি ভয় দেখিয়ে দিয়েছি…’’
পিছন পিছন দৌড়তে দৌড়তে সিংহ বলতে লাগল, “ও দাদা, আরে শুনুন শুনুন, পালাচ্ছেন কেন? ঝকঝকে জিনিসটা একটু দেখব খালি…’’
কিন্তু সিংহ তো বাংলা পারে না, সংস্কৃতও পারে না সমানে ‘হুম-হাম’ করে গর্জন বেরোল। প্রসেনজিৎ ধুতি পরে জঙ্গলের মাঝে দৌড়তে গিয়ে একটা মোক্ষম হোঁচট খেয়ে একেবারে কাঁটাগাছের ডাল লেগে শরীর কেটেকুটে একাকার।
সিংহ এসে বলল, “দিন দেখি, চকমকিটা…”
প্রসেনজিৎ বলল, “যদি কেড়ে নিতে বলো আলো দেওয়া মণি, জেনো আমি কাড়তে দেব না। যদি ছেড়ে যেতে বলো আমার সোনার খনি, জেনো আমি ছাড়তে দেব না… আর আমি আমি…”
“জানি জানি,” সিংহ বলে, “জোড়াতালি কতখানি… দিয়েছি গল্পে রোজ…”
কিন্তু সিংহের গর্জন শুনেই প্রসেনজিৎ ওখানেই চিত হয়ে বাতচিত বন্ধ করে দেয়। সিংহ প্রসেনজিতকে একটু নেড়ে চেড়ে দেখ-যাহ ব্যাটা মরেই গেছে। সিংহের এদিকে পেট ভরা, তার মধ্যে এইসব রাজা-গজাদের খাওয়ার খুব ঝামেলা। পেঁয়াজের খোসার মতো জোব্বা আর জামাকাপড় খুলতে খুলতেই সময় লেগে যায়। এর থেকে হরিণ-খরগোশ ভালো। কাপড় ছাড়াই দৌড়ও, ধরো, মারো আর খাও। ছালের উপরে আরও চারটে স্তর কাপড় সরানোর দরকার নেই। সিংহ তাই অনেক বিচার করে প্রসেনজিতের গলা থেকে শুধু মণিটাকে নিয়ে নিজের গলায় পড়ে কেটে পড়ল।
এই সিংহটা তারপরে মণি নিয়ে জন্তুদের সাথে অনেক কিছু ঘটনা ঘটায় হয়তো। কোন ফাঁক থেকে সেটা কোন ঋষি মুনি দেখে ফেলে পঞ্চতন্ত্রে গল্পগুলো লিখে ফেলে। খুঁজে দেখতে হবে। কোথাও না কোথাও তো একটা সিংহ আর একটা মণির গল্প পড়েছি। এরকম রাজাগুলো জঙ্গলে গিয়ে নিজেরাই বন্য বা অন্য জন্তুর শিকার হত, তারপরে জন্তুগুলো মণি নিলেই গল্প ছড়িয়ে যেত যে সাপের মাথায় মণি থাকে, হাতির মাথায় গজমুক্তা হয়, সিংহের গলায় মুক্তো ঝোলে। কত নিরীহ বন্যপ্রাণীকে মারা হয়েছে রাজা গজমুক্তার হার পড়বে বলে। সেগুলো আবার বড়াই করে লেখা হয়েছে। নির্লজ্জতায় মানুষকে কেউ হারাতে পারবে না।
সিংহমামা সেই স্যমন্তক মণি গলায় ঝুলিয়ে টর্চলাইটের মতন ব্যবহার করে দিব্যি রাত বিরেতে শিকার করছে। এমন সময়ে একটা পাহাড়ের কাছে একটা ইয়াবড় ইয়েতির খপ্পরে পড়ে সিংহ। আমাদের সিংহপ্রবর নেকড়ে দেখেছে, মানুষ দেখেছে, ভাল্লুকও দেখেছে কিন্তু ইয়েতি দেখেনি কোনোদিন। ইয়েতি বা গোরিলা কিছু একটা। কারণ গোরিলা ভারতবর্ষে পাওয়া যায় না।
ইয়েতিকে নেপালীরা বলে মিগু। টিনটিনে পড়েছিলাম। মিগুকে দেখেই “মাগো…” বলে সিংহ ল্যাজ গুটিয়ে দৌড়। আর এর মধ্যে মণিটাকে ফেলে চলে গেছে। মিগু, বিগফুট, ইয়েতি, গোরিলা, মোকেলে মোবেম্বে, বুনিপ যা-ই বলুন, সেই জীবটা আসলে জাম্বুবান ছিল। সেই রামায়নের জাম্বুবান। সুগ্রীবের মন্ত্রী-টন্ত্রী ছিল। ভালো ভালো কথা বলত। সাংঘাতিক বয়স্ক ছিল। রামায়ণের সময়েই প্রায় ছয় মন্বন্তর বয়স, কৃষ্ণের সময়ে আরও কিছু হাজারখানেক (বা লাখ) বছর বয়স বেশি।
সিরিয়াল বা ছবিতে জাম্বুবানকে একটা ভাল্লুক দেখানো হয়, কিন্তু জাম্বুবান আসলে যে কি সেটা কেউই জানে না। আর্যরা ভাল্লুক চিনত ব্যাস, জাম্বুবানকে ভাল্লুক বলে দিয়েছে। আমার তো জাম্বুবানকেই ইয়েতি মনে হয়। মানুষ দেখে দেখে ঘেন্নায় এখন হিমালয়ের বরফে থাকে হয়তো। এই জাম্বুবান স্যমন্তক মণি নিয়ে নিজের গুহায় ফিরে গেল।
এদিকে প্রসেনজিত ফিরছেনা দেখে বৃষ্ণি আর অন্ধক যাদবগোষ্ঠীরা এককথায় কৃষ্ণকে সন্দেহ করতে লাগল, যে নিশ্চয়ই কৃষ্ণ ওই মণির লোভে প্রসেনজিতকে কিছু একটা ভালোমন্দ করেছে। ওওও… তার মানে কৃষ্ণকে যতই যাদবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দেখিয়ে সকলের দ্বারা সম্মানিত দেখানো হত, আসলে ততটা ব্যাপার ছিল না। ভিতরে ভিতরে অনেক গোষ্ঠীই তার মানে কৃষ্ণের কর্মগুলো অন্যায় হিসেবে দেখত। এমনকি সন্দেহও করত। কৃষ্ণ নিশ্চয়ই ওই মণির জন্য প্রসেনজিতের সাথে মাঝে মাঝে ঝগড়াঝাটি করেছে আর হুমকি টুমকি দিয়েছিল। নইলে লোকে কী করে জানল যে মণির প্রতি কৃষ্ণের নজর আছে? আর সে নজর এমন নজর যে প্রসেনজিতের খারাপ পরিণতি ভাবতেই লোকে কৃষ্ণকে সন্দেহ করছে। ওই মাঝের হুমকিগুলো পুরাণকার বাদ দিয়ে দিয়েছে। আরও মনে হয়, ওসব সিংহ-টিংহ বাজে কথা। ওই যাদবদের অনেকেরই নজর ছিল মণির প্রতি, আর মণির জন্যই শনির দৃষ্টি পড়েছিল প্রসেনজিতের উপরে। জঙ্গলে শিকারের সময়ে কেউ বা কারা প্রসেনজিতকে তাড়া করে মার্ডার করে। তখনকার দিনে তো ফরেনসিক তদন্ত ছিল না। তারপরে কোনোভাবে মণিটা জাম্বুবানের হাতে যায়। কারণ বারবার মনে একটাই প্রশ্ন আসে, মণি নিয়ে সিংহ কি করছিল?
কিন্তু মানুষের মধ্যে সন্দেহ উঠেছে এবং অনেকে কৃষ্ণকে খুনি বলছে। কিছু সূত্র বলে কৃষ্ণ এইসময়ে পাণ্ডবদের লাশ দেখতে গেছিল। মানে ওই জতুগৃহে বার্নিং কেসটা। কিন্তু খবর ঠিক পৌঁছে যায়, দেশের লোকে কৃষ্ণকে সন্দেহ করছে। এই শুনে কৃষ্ণ ভাবল তাকে অ্যাকশন নিতে হবে। নইলে তার নিজের নাম যেভাবে কালিমালিপ্ত হচ্ছে, তাতে পৃথিবীসুদ্ধ ডিটারজেন্টেও সেই কালি উঠবে না। কৃষ্ণ তাই সঙ্গে সঙ্গে বলরাম আর নিজের পাত্র-মিত্রদের নিয়ে গোয়েন্দাগিরিতে নামল। প্রসেনজিৎ কোথায়? সেই রহস্য। মণি রহস্য…
জঙ্গলে ঢুকেই প্রসেনজিতের চিহ্ন পেতে দেরি হল না। কৃষ্ণ একজায়গা দেখিয়ে বলল, “এখান থেকে নেমে প্রসেনজিৎ পালিয়েছে। ওকে সিংহ তাড়া করেছিল…”
“কী করে বুঝলে?” বলরাম জিজ্ঞেস করে।
“এলিমেন্টারি… মাই ডিয়ার দাউভাইয়া…” কৃষ্ণ বলে, “এই দেখো এখানের পরে রথের চাকার দাগ আর এগোয়নি, তার মানে রথ এগোয়নি…”
“আ মোলো যা…” বলরাম বলে, “চাকার দাগ দেখব কেন? ডানদিকে তাকিয়ে দেখ, রথটা দাঁড়িয়ে আছে জঙ্গলের মাঝে। ঘোড়া দুটো বোধহয় জন্তুদের পেটে গেছে…”
কৃষ্ণ দেখে বলে, “আচ্ছা হ্যাঁ, কিন্তু দেখো এদিক দিয়ে প্রসেনজিৎ পালিয়েছে সিংহের তাড়া খেয়ে… ওই দেখো তার যাওয়ার পথে পথের দাবি করে ধুতির টুকরো আর ভাঁড়ার ঘরের চাবি ঝোপে লটকাচ্ছে…”
সকলে সেই পথে গিয়ে পথের শেষে দেখে ক্ষতবিক্ষত হয়ে প্রসেনজিৎ চোখ উলটে মরে পড়ে আছে। কৃষ্ণ দেখে বলে, “দেখে তো মনে হচ্ছে সিংহ একে ছুঁয়েও দেখেনি। ভয়ে হার্ট অ্যাটাক করেছে…”
“আচ্ছা কেষ্টা কেসটা কী বল তো?” বলরাম বলে, “তখন থেকে ‘সিংহ’ ‘সিংহ’ করছিস কেন? বাঘ, শেয়াল, হায়েনা, চায়না কত কী হতে পারে। সিংহই এসেছিল নিশ্চিন্ত হচ্ছিস কী করে ?”
“কারণ দাউভাইয়া… সেই রথের জায়গা থেকে ঝোপের পিছন থেকে একটা সিংহ লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের দেখছে। তোমার পিছনে ঝোপের মধ্যেই আছে…”
“কই, সে সিংহ?” বলে বলরাম আস্ফালন করে, আর সঙ্গে সঙ্গে সিংহটা “ওরে বাবারে” বলে উলটোমুখে ছুট দেয়। সিংহ দৌড়চ্ছে, পিছনে কৃষ্ণ দৌড়চ্ছে, তার পিছনে বলরাম সহ বাকি লোকলস্কর।
কৃষ্ণ বলছে, “এই থাম…”
সিংহ বলছে, “পাগলা নাকি আমি যে থামব? থামলেই তোমরা বহুত মারবে…”
“না থামলে আরও মারব…” কৃষ্ণ হুমকি দেয়। কিন্তু সিংহ ততক্ষণে লাফিয়ে একটা গুহায় ঢুকে পড়েছে। কৃষ্ণ সিংহের পিছনে ঢুকতেই সিংহ গুহার জানালা দিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে গেল। কৃষ্ণ দেখে গুহার ভিতরে অনেকদূরে ঝিকিমিকি আলো। কৃষ্ণ বুঝতে পারে গুহার গভীরে মণি আছে। এখানে হরিবংশ বলে যে গুহায় ঢুকে কৃষ্ণ এক নারীকে দেখতে পায়, যে একটা বাচ্চা ছেলেকে ঘুম পাড়াচ্ছিল। সেই মহিলা জানায় যে বাচ্চাটা জাম্বুবানের ছেলে। তাহলে কি মহিলা জাম্বুবানের বউ? হতেই পারে। কৃষ্ণ বুঝতে পারে সে আসলে জাম্বুবান নামক আধা ইয়েতি-আধা ভাল্লুকের ড্রয়িং রুমে এসে পড়েছে, আর গুহার অনেক ভিতরে স্টোর রুমে মণিটা আছে।
ততক্ষণে বলরাম আর দলবল এসে পড়েছে। কৃষ্ণ বলরামকে বলল, “দাউভাইয়া এখানে দাঁড়াও, আমি মণি নিয়ে আসছি…”
সবাই গুহার মুখে অপেক্ষা করে। কৃষ্ণ গুহার মধ্যে কয়েক কিলোমিটার গিয়ে দেখে স্যমন্তক মণিটাকে ছাদের থেকে ঝুলিয়ে ডিস্কো লাইট বানিয়ে জাম্বুবান নাচছে। হঠাৎ কৃষ্ণের আগমনে নাচ থামিয়ে জাম্বুবান বলে, “তুই কে?”
“আমি কৃষ্ণ বাসুদেব যাদবকুলশ্রেষ্ঠ…”
“ঠিক আছে ঠিক আছে, বায়োডাটা লাগবে না, এখানে কী কাজে এসেছিস?”
“ওইটা চাই…” কৃষ্ণ মণি দেখিয়ে বলে।
“ইহ ‘চাই’ বললেই হল? ওটা কি চাঁদনি বাজারের চৈনিক লাইট নাকি যে চাইলেই দিয়ে দেব? আমি সিংহ মেরে পেয়েছি… এটা চাইলে পাথরের চাঁই দিয়ে তোমার ‘চাই চাই’ বের করে দেব!”
“খালি ঢপ…” কৃষ্ণ বলে, “সেই সিংহই আমাকে একপ্রকার রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে এসেছে এখানে। এবার ভালোয় ভালোয় আলো দাও…”
“দেব না…” জাম্বুবান গর্জে ওঠে, “আলো আমার, আলো ওগো, আলোয় গুহা ভরা…”
ঠাস করে কৃষ্ণের এক চপেটাঘাত এসে পড়ে জাম্বুবানের জাম্বো সাইজের গালে। জাম্বুবান ঝাঁপিয়ে পড়ল কৃষ্ণের উপরে। কৃষ্ণ ততক্ষণে একটা বাঁশ তুলে নিয়েছে, আজ
ইয়েতিকে বাঁশপেটা করবে। একদিকে জাম্বুবান একদিকে বাম্বুম্যান কৃষ্ণ। মণির জন্য মারপিট শুরু। একেবারে হুড়ুম-হাড়ুম-দুড়ুম ফট করে আওয়াজ।
সেই কুস্তি চলছে তো চলছেই। দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে, মারপিট আর শেষ হয় না। এদিকে গুহার বাইরে বলরাম আর বাকিরা বসে বসে আশেপাশের সমস্ত জীবজন্তু মেরে খেয়ে নিয়েছে। বোধহয় জাম্বুবানের বউটাকেও ভাল্লুক ভেবে সাবড়ে দিয়েছে। কিন্তু গুহায় ঢুকে আর দেখতে যায় না কী ঘটল। বুনিপ জাম্বুবানের হাতে কৃষ্ণের কী হল কেউ জানতে পারছে না। প্রায় দিন পনেরো পরে বলরাম গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বলল, “এই চলো চলো, কেষ্ট নিশ্চয় এই ব্লু- জন গহ্বরের বিভীষিকার কাছে ফিকা হয়ে গেছে। কেষ্ট মরে গেছে, চলো বাড়ি যাই, ঢের কাজ বাকি…”
সবাই তাই ভেবে বাড়ি চলে এল। কী আশ্চর্য ব্যাপার, তাই না? এখানে দুটো ব্যাপার ভেবে আশ্চর্য লাগে। প্রথম বিষয়, এই যে বলরাম এত শক্তিশালী, কত রাক্ষস-দানব পেটাল, জরাসন্ধের সেনাকে পেটাল, সেই বলরাম গুহার ভিতরে ঢুকে তার প্রিয় ভাইয়ের খবর না নিয়ে স্রেফ বাইরে বসে ধরে নিল ‘ভাই শেষ?’। নাকি এটাও লীলা? লীলাই যদি হয় আর বলরাম যদি জানত যে কৃষ্ণ জাম্বুবানকে পরীক্ষা করছে, তাহলে তো গুহার বাইরে দলবল নিয়ে বসে থাকত। সেসব না করে পিকনিক পার্টির মতন সবাইকে নিয়ে ড্যাং ড্যাং করে বাড়ি চলে আসার পিছনে যুক্তিটা কি?
আর দ্বিতীয় ব্যাপার হল, এই এক কেস সুগ্রীবও করেছিল। বালির সাথে। বালিকে বালি চাপা, মানে গুহার মুখে পাথর চাপা দিয়ে সুগ্রীব শহরে এসে বলেছিল ‘দাদা ফিনিশ’। কিন্তু বালি ফিরে এসে সুগ্রীবকে পিটিয়ে দেশছাড়া করে দেয়। তাহলে কি সুগ্রীব আর বলরামের মধ্যে খুব একটা বুদ্ধিগত তফাত ছিল না? এই ঘটনা কী ত্রেতীয় রামায়ণের ওই ঘটনার দ্বাপরীয় সংস্করন? পুরাণকার হয়তো খানিক খিক খিক করে হেসে ভেবেছিলেন যে রামায়ণের ঘটনাটা এখানে কায়দা করে ঢুকিয়ে মজা দেখা যাক। একই ঘটনা… কিন্তু যাকে মৃত্যুর মুখে ছেড়ে দিয়ে আসা হয়েছিল তাদের পুনরাগমনের পর রিঅ্যাকশন আলাদা। কৃষ্ণ যখন ফিরে এসেছিল, তখন বলরামকে কিছুই বলেনি। আরও একটা সন্দেহ মনে আসছে। মণি আনতে কৃষ্ণ দৌড়ল, কিন্তু ভাইকে খুঁজতে সত্রাজিতের কোনো মাথাব্যথা দেখি না কেন? তার মানে কি সত্ৰাজিতই মণি পেতে ভাইকে সরিয়ে দিয়েছিল? হতেই পারে, অসম্ভব কিছুই না। বিশেষ করে যাদবদের শেষ পরিণতি দেখলে মনে হয় তারা মদিরা পান ও একে অপরের প্রাণহানি করার তীব্র সুপ্ত ইচ্ছে মনের গভীরে পালন করত। অতগুলো গোরু পালন করত, এইটুকু ইচ্ছে পালন করতে পারবে না?
ওদিকে জাম্বুবানকে মেরে ধরে সিধে করে দিয়েছে কৃষ্ণ। জাম্বুবান গুহার মেঝেতে শুয়ে চোখ কপালে তুলে গোঁ-গোঁ করছে, “দেখো আলোয় আলো আকাশ, দেখো আকাশ আলোয় ভরা…”
“এই জাম্বো…” কৃষ্ণ ডাকে, “ওঠ ওঠ, মরে গেলি নাকি?”
“মরি নাই…” জাম্বুবান বলে, “তুমি কে হে? এরকম অমানুষের মতন কেউ পেটায়? এরকম পেটাত ত্রেতার লোকজন, এখনকার দিনের মানুষদের ক্ষমতা আছে এরকম মার মারে?”
“আরে আমি রে জাম্বো…” কৃষ্ণ বলে, “সেই জন্মে রাম ছিলাম, এই জন্মে কৃষ্ণ…”
“রামকৃষ্ণ… প্রভু…” বলে জাম্বুবান কৃষ্ণের পায়ে লুটিয়ে পড়ে, “আপনাকে চিনতে পারিনি। সেই যে সেবার সরযূর জলে দলবল নিয়ে ডুব দিলেন, আর তো উঠলেন না। আপনার বা বাকিদের ডেডবডিও পেলাম না, কারোর সৎকারও করা হল না। কতদিন ধরে আমি আর অযোধ্যার লোকেরা আপনাদের ভূতের ভয়ে কাটালাম। তারপরে অযোধ্যাই ছেড়ে দিলাম। এখন নতুন বডি নিয়ে ফেরত এসে আড়ংধোলাই দিলে চিনব কী করে? স্যার, একটা প্রশ্ন আছে…”
“বল জাম্বো…” কৃষ্ণ অনুমতি দেয়।
“বলছি স্যার, আপনি কি ত্রেতা যুগে সাঁতার জানতেন না? ওরকম টুপ করে ডুবে গেলেন কেন ? ”
“ওসব কথা থাক, যথাদেশে যদাচার, যথা অবতারে যথা অত্যাচার…” কৃষ্ণ বলে, “প্রত্যেক অবতারে আমার ক্ষমতার লিমিট আছে…”
“এবারে বুঝি লিমিট আর রাখেননি? এমন মার মারলেন?”
“আমি তো ফিরে আসব বলেছিলাম জাম্বো… তুমি তো চিনতে পারোনি… কৃষ্ণ হেসে বলে।
“ফিরে আসবেন বলেছিলেন, এসে ফ্রিতে তুলোধোনা করবেন বলেছিলেন?” জাম্বুবান বলে, “আর আপনি এসেই যদি পরিচয় দিতেন, তাহলে এত মার খেতে হত না আমায়। আপনি আসবেন বলেছিলেন, আর সেই ভেবে যদি আমি যদু-মধু সবাইকে গুহায় আসতে দিতাম তাহলেই চিত্তির হত। আমিও তো ফ্যামিলিম্যান, বুঝলেন কিনা?”
“দাও দাও মণিখানা দাও…” কৃষ্ণ এবারে চাইতেই জাম্বুবান উপর থেকে টুপ করে পেড়ে মণিটা দিয়ে দেয় আর বলে, “বলছিলাম কি স্যার, একটু গায়ে আঁচড়ে-কামড়ে দিয়েছি, কিছু মনে করবেন না প্লিজ। এই নিন, ফাইন হিসেবে আপনার জন্য ফাইন একখানা বউ দিচ্ছি। আমার মেয়ে জাম্ববতী। জাম্বো বঁটিও বলতে পারেন, যেমন ভাল্লুকের মতো উগ্র তেমনি বঁটির মতন ধারালো স্বভাব। আপনার সাথে মানাবে ভালো…”
গুহার মধ্যেই গুহ্যবিবাহ হয়ে গেল। কনেপক্ষে শুধু কনের ফ্যামিলি, আর বরপক্ষে তো সব বাড়ি চলে গেছে। কৃষ্ণ মণি আর বউ নিয়ে গুহা থেকে একুশ দিন পরে বেরিয়ে আসে। মণির সাথে বউ ফ্রি। এই গুহাটা নাকি এখনও আছে। যদি কখনও জম্মু শহরে যান এবং বৈষ্ণোমাতার দর্শনের পরে শহর ঘুরতে বেরোন তাহলে ‘পীর-খো’ গুহাতে যাবেন। ওটাই নাকি জাম্বুবানের সেই গুহা যেখানে কৃষ্ণ এসে মারপিট করেছিল। গুহার ভিতরে একটা সুড়ঙ্গের মুখ দেখিয়ে বলা হয় সেই সুড়ঙ্গ নাকি সোজা অমরনাথ পর্যন্ত গেছে। জাম্বুবান খুঁড়েছিল। অমর মানুষ, অগাধ সময় ছিল, খুঁড়তেই পারে। আবার অন্যদিকে গুজরাটে পোরবন্দরের কাছেও আরেকটা গুহা আছে, সেটাও নাকি জাম্বুবানের গুহা, আবার বলা হয় সেখানেই নাকি মারপিটটা হয়েছিল। লজিক দিয়ে ভাবলে মনে হয় গুজরাটের গুহাটাই আসল হতে পারে। কারণ একে নাম পোড়া বান্দর (পোরবন্দর), তাতে আবার দ্বারকার কাছে। যদি ধরে নিই গিরের বীর সিংহরা তখন সংখ্যায় প্রচুর ছিল আর গোটা গুজরাটে ছড়িয়ে থাকত তাহলেও সেটাই যুক্তিসম্মত মনে হয়। জম্মুতে সিংহটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য যদি মা দুর্গাকে হিমালয়দেব সিংহ দিতে পারে, তাহলে হতেই পারে। কিন্তু বাকি লজিকগুলো জম্মুর গুহার ক্ষেত্রে খাটছে না। এমনটা হতে পারে যে মণি এবং নয়নের মণি কন্যাকে বিদায় দিয়ে জাম্বুবান জম্মুতে শিফট করে। জম্মু-কাশ্মীর তখনও শান্তিপূর্ণ এলাকা ছিল। ইংরেজগুলো যাওয়ার সময় অশান্তি ঢুকিয়ে গেছে।
গল্পে ফিরি। কৃষ্ণ বউ আর মণি নিয়ে শহরে ফিরতেই বলরাম আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলে, “বউমণি… বউ সাথে মণি নিয়ে ফিরলি ?”
কৃষ্ণ সোজা গিয়ে সত্রাজিতের হাতে মণিটা দিয়ে বলে, “এই নাও বাপু, তোমার ভ্রাতৃর ধন। সবাই মিলে তো আমাকে খুনী বানাচ্ছিলে, এবারে মণি নিয়ে যা খুশি করো…”
“এদিকে লোকে আর এই উজবুক লেখকটাও আমাকে সন্দেহ করছে যে…” সত্রাজিত বলে (হ্যাঁ, আমাকেই ইঙ্গিত করে বলছে) “কৃষ্ণ, তুমি বাপু তোমার বদনাম ঘোচাতে যা খাটনি গেছে তার বদলে আমার তিনটে মেয়ে দিচ্ছি, বিয়ে করে উদ্ধার করো বাপু!” এই বলে সত্রাজিৎ নিজের তিন মেয়ে সত্যভামা, ব্রতীনি আর প্রস্বপীনির বিয়ে দিয়ে দিল কৃষ্ণের। একটা অ্যাডভেঞ্চারে চার-চারটে বউ পেয়ে গেল কৃষ্ণ।
কিন্তু মণির গল্প এখানেই শেষ নয়। কিছুদিন পরেই, কৃষ্ণ একবার তার দলবল নিয়ে তখন হস্তিনাপুর গেছে, ওই পাণ্ডবদের শ্রাদ্ধে। এমন সময়ে শতধন্বার হেব্বি বুকে বেদনা শুরু হয়। কিছু কিছু লেখা অনুযায়ী সত্যভামার প্রতি শতধন্বা, তার দাদা অক্রুর আর কৃতবর্মার ব্যথা ছিল। সেই ব্যথাকে কৃষ্ণ বিয়ে করতেই হৃদয়ভগ্ন শতধন্বা ভাবল,
“চলে গেছে তাতে কি? মণিটা পেতে পারি, মণি দিয়েই জোড়াবো জ্বালা… সত্রার হাতে মণি, আমার হাতে ফণী, দেখব আটকায় কোন শা…”
“সত্রাজিৎ একলা ঘরে ঘুমোচ্ছে,” দূত এসে খবর দেয়, আর সঙ্গে সঙ্গেই শতধন্বা সত্রাজিতের বেডরুমে ঢুকে আস্তে করে কাস্তে চালিয়ে তাকে চিরঘুমের দেশে পাঠিয়ে দেয়। তারপর মণিটা নিয়ে দৌড়ে বাড়ি চলে আসে। কিন্তু যতটা অকুতোভয় হয়ে খুনখারাপি করে মণি লুটেছিল, বাড়িতে আসতেই সেটা বেলুনের মতো ফুস হয়ে উড়ে গেল। তখন তার মাথায় চিন্তা এল, “এই রে, এবার তো কৃষ্ণ আমাকে মেরে পাট করে দেবে…”
এই ভেবেই দাদা অক্রুরের কাছে গিয়ে শতধন্বা গিয়ে বলল, “দাদা বাঁচা, এই কান্ড করেছি…”
অক্রুর বলল, “ব্যস, কেস খেয়ে গেছিস, আর কিছু করার নেই। এবার পালা…”
এদিকে সত্যভামা তার বাবার মার্ডার কেস আড়াল থেকে দেখে নিয়েছে। কিন্তু বাধা দিল না কেন? নরকাসুর বধের সময় দেখব যে এই সত্যভামা যোদ্ধার জামা পরে কি লড়াইটাই না করবে। অথচ বাবার মার্ডারের সময় শুধু লুকিয়ে লুকিয়ে দেখল? শতধন্বাকে ধরে দু চারটে চড়-থাপ্পড় মারলেই ওখানেই শত ধন ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু সত্যভামা মার্ডার হতে দিল, তারপরে আবার নিজেই রথ চালিয়ে হস্তিনাপুরে গিয়ে দেখে সেখানে মস্তি না করে কৃষ্ণ শ্রাদ্ধের আসরে জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া করছে। কৃষ্ণ তো জানে পাণ্ডবরা মরেনি। তাহলে জমিয়ে খেতে অসুবিধে কোথায়? কদিন পরেই দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় দেখা হবে।
সত্যভামা গিয়ে কৃষ্ণকে তার বাবার মার্ডারের কথা বলতেই, কৃষ্ণ শেষপাতে চাটনি না খেয়ে বলরামের ধুতিতে হাত মুছেই রথ আর সত্যভামাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল শতধন্বাকে খুঁজতে। বলরাম হাত ধুয়ে টুয়ে পিছু নিল। বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হলনা, শতধন্বা একটা বেতো ঘোড়া চড়ে পালাচ্ছিল। ঘোড়াটার আবার সুন্দর নাম ছিল, বিঘ্নতাহৃদয়। হৃদয়ে বিঘ্ন, কিন্তু বয়স হয়ে গেছে। কৃষ্ণ দূর থেকে একটা গদা ঘ্যাক করে ছুড়তেই সেটা শতধন্বার ঘাড়ে ক্যাক করে পড়ল, আর ঘোড়া সমেত শতধন্বা ফ্যাক করে মাটির উপরে মুখ থুবড়ে পড়ল। সামনের দুটো দাঁতও ভেঙে গেল। কৃষ্ণ গিয়ে শতধন্বার কলার ধরে তুলে বলল, “বল কোথায় রেখেছিস মণি…”
“আমি জানি না…”
কৃষ্ণ দুটো চপেটাঘাত করতেই সেই আঘাতে এবং সত্যভামার সামনে মার খাওয়ার লজ্জায় ও ভয়ে ওখানেই স্ট্রোক করে প্রাণত্যাগ করল। কৃষ্ণ বলল, “যাহ্, ব্যাটা মরেই গেল?”
কৃষ্ণ টেলিপ্যাথিতে পুরাণকারকে জানিয়ে দিল, “এই জায়গাটা বেশ যুদ্ধটুদ্ধ লিখবে। অক্রুর এসেছিল, হেব্বি মারপিট হয়েছিল, শতধন্বার ঘোড়াটাকে দশটা ডার্বি রেসের ঘোড়ার সমান শক্তি করে দাও…”
এই সময়ে বলরাম এসে হাজির হয়, “ভাই, মণিটা পেলি?”
“না দাউভাইয়া, পাইনি…”
“মিথ্যে বলছিস তুই, তুই জামার ভিতরে লুকিয়ে রেখেছিস
“না গো, আমার কাছে নেই…”
বলরাম বলে, “ছিঃ ছিঃ তুই মিথ্যে কথা বলিস? লজ্জাজনক ব্যাপার। আমি চললাম তোদের পলিটিক্স ছেড়ে। মর তোরা সব মারপিট করে। বৃষ্ণি বা দ্বারকা এখন থেকে আমার কাছে ইতিহাস। আর আমি ফিরব না…”
এখানে একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যায়। চিরকাল যে কৃষ্ণের প্রায় ছায়াসঙ্গী হয়েছিল বলরাম, সে হঠাৎ এই মণি না পাওয়ার ব্যাপারে রেগেমেগে কৃষ্ণকে ছেড়ে একলাই চলে গেল। এবারে প্রশ্ন আসে এটা কি শুধুই মণির জন্য? আমার মনে হয় সেটা না। মণিটা উপলক্ষ, কফিনের উপরে শেষ পেরেক। বলরাম আসলে ভিতরে ভিতরে অনেকদিন থেকেই কৃষ্ণের এই দৈবভাব থেকে রাজনৈতিক ভাবে পরিবর্তনটা লক্ষ্য করছিল। কংসকে মারাটা দৈবিক ব্যাপার ছিল, সেখানে ব্যক্তিগত কারণ ছিল। কিন্তু এটা ওটা অজুহাত দিয়ে নিজেদেরই আত্মীয় শাসকদের মেরে-ধরে, উগ্রসেনকে রাজা বানিয়ে যাদবরাজ্য সম্প্রসারণ ও ঐক্যকরণ তো কৃষ্ণই করছিল। বলরাম স্পষ্ট বুঝেছিল যে আজ নইলে কাল কুরুদের সাথে ঝামেলা লাগবেই। পাণ্ডবরা যদি কৃষ্ণের পক্ষে আসে ভালো, নইলে এটা সবাই জানে সে আজ নয়তো কাল পাণ্ডবদের সাথে কৌরবদের একটা এসপার ওসপার হবেই। তারপরে যে বেঁচে থাকবে তাকে হয় দলে টানতে হবে, নয়তো যাদবদের হাতে বধ হতে হবে। রাস্তা পরিষ্কার। ভারতবর্ষের একমাত্র সুপারপাওয়ার যাদবরা।
তাই হয়তো সেই গোমন্তক পর্বত থেকে বলরামকে কেমন যেন একটু খাপছাড়া খাপছাড়া লাগে। ভদ্রলোক সবাইকে নিয়ে চলতে চাইতেন, কিন্তু কৃষ্ণ জানত ক্ষমতার খেলায় আত্মীয়-স্বজন কোনো ব্যাপারই না। উদ্দেশ্যটাই আসল।
‘কর্মণ্যে বাধিকারাস্তে মা ফলেষু কদাচন’
এবং তাই জন্যই এরপরে বলরামকে দেখবেন হাতে গোনা কয়েকটা জায়গায় স্রেফ উপস্থিত থাকতে। প্রায় গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স। দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে গেছিল, কিন্তু কৃষ্ণের সাথে পাণ্ডবদের খুঁজতে যায়নি। রুক্মীর নাতনির বিয়েতে ছিল, সে গল্প ঠিক সময়ে বলব, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে এবং দুর্যোধনের উরু ভঙ্গের সময় ছিল, তারপরে একেবারে বলরামকে দেখতে পাই মৌশল পর্বে আত্মীয়গুলোকে পেটাতে এবং তারপর দেহত্যাগ করতে। কিন্তু কোনো জায়গাতেই সরাসরি কোনো কাজে আর লিপ্ত হয়না। উদাসীন ভাব এসে গেছিল। কৃষ্ণকে দেবতা হিসেবে ধরলে কোটি কোটি কারণ আছে তার প্রতিটা কাজের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার। কিন্তু মানুষ হিসেবে ধরলে তার প্রাণাধিক প্রিয় ভাইটাকে এরকম ক্ষমতালোভী হতে দেখে সংসারের প্রতি ঘেন্না ধরে গেছিল বোধহয় বলরামের। তাই শেষ সময়ে যখন প্রাণত্যাগ করছে তখনও কৃষ্ণকে বলেও যায়নি। কৃষ্ণ তার সারথি দারুকাকে নিয়ে যতক্ষণে পৌঁছেছিল ততক্ষণে বলরামের মুখ থেকে সাপ বেরিয়ে চলে যাচ্ছে।
অদ্ভুত লাগে এই ভ্রাতৃপ্রেম। রামায়নেও এবং মহাভারতেও। যে লক্ষ্মণ সারাটা জীবন উৎসর্গ করে দিল দাদার জন্য, সেই দাদার মাত্র একটা কথার জন্য লক্ষ্মণকে প্রাণত্যাগ করতে হল। বারবার বলছি আমি এখানে দৈবযোগ আনছি না। আমরা পাপী-তাপী মানুষ, মানুষের নজরেই দেখছি। একইভাবে মহাভারতে যে বলরাম কৃষ্ণের সাথে এতদিন একসাথে থাকল সে কেমন যেন আলাদা হয়ে চলে গেল। এবং কোথাও দেখি না কৃষ্ণ বলরামকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। পূর্বে এক জায়গায় বলেছিলাম বাল গোপাল, প্রেমিক গোপাল, যুবক কৃষ্ণ, পরিণত কৃষ্ণ, রাজা কৃষ্ণ, ভগবান কৃষ্ণ, কূটনীতিবিদ কৃষ্ণ সবাই যেন আলাদা আলাদা মানুষ। একই অঙ্গে এত রূপ। এই নিয়ে পরে আলোচনা করব। যাইহোক, গল্পে এগোই। স্যমন্তক মণি সত্যিই শতধন্বার কাছে ছিল না। সেই মণি তারপরে বহুদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রায় ষাট বছর পরে অঙ্কুরের উন্নতি দেখে কৃষ্ণের সন্দেহ হয় যে মণি অক্রুরের কাছে আছে। অক্রুর স্বীকার করে আর কৃষ্ণ মণিটা অক্রুরকেই রাখতে দেয়। কিন্তু তারপরে মণির কী হল কোথায় গেল সেই নিয়ে কোত্থাও কিছু লেখাজোখা নেই। ময়ূর সিংহাসন, বত্ৰিশ সিংহাসনের মতো স্যমন্তক মণিও হারিয়ে গেছে।
কিন্তু আমাদের এই পর্বে গল্প হচ্ছিল কৃষ্ণের বউদের নিয়ে। প্রধান তিন বউয়ের সাথে আলাপ হয়ে গেল আমাদের। রুক্মিণী, জাম্ববতী আর সত্যভামা। এদের ব্যাপারে পরে আসছি আবার। আপাতত কৃষ্ণের অন্য বউদের পরিচয় জেনে নিই।
এবার আপনারা নড়েচড়ে বসেছেন কারণ আপনারা তো অপেক্ষা করছিলেন কতক্ষণে আমি সেই ষোলো হাজার পত্নীর কথা বলব। হ্যাঁ কৃষ্ণের ষোলো হাজার (প্লাস মাইনাস একশো) পত্নী ছিল, এবং তাদের প্রত্যেকের জন্য একটি করে নির্দিষ্ট মহল ছিল। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগে যে ষোলো হাজার মহল যদি শুধু কৃষ্ণের বউদের জন্যই থাকে তাহলে দ্বারকা কত বড় ছিল? তাদের আবার ছেলেপুলেও ছিল। গোটা কলকাতার সাইজের জায়গা নিয়ে তাহলে কৃষ্ণ বলত, “এটা আমার বউ আর সন্তানের থাকার জায়গা। ষোলো হাজারটা বোধহয় বাড়াবাড়ি। আমি ওইদিকে যাচ্ছি না যে ষোলো হাজার বউকে সামলাত কী করে? এটা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ বাড়িতে একটা বউ সামলাতেই হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি, ষোলো হাজার বউ সামলানো তো সত্যিই ভগবানের কাজ। কিন্তু ষোলো হাজার বাড়াবাড়ি বলছি এই কারণে যে এই বিপুল পরিমাণ মহিলা সমিতির নেত্রী রোহিণী ছাড়া আর কারোর ব্যাপারেই সেরকম ও কোনোরকম কিছু জানা যায় না। ষোলো হাজার? আমি ষোলোজন মহিলার নাম মনে রাখতে পারি না। এত বউয়ের নাম মনে রাখত কী করে? নম্বর দিয়ে রাখত বোধহয়। কৃষ্ণ হয়তো এগারো হাজার সাতশো সাঁইত্রিশ নবর স্ত্রীয়ের কাছে গিয়ে বলল, “হ্যাঁ গো ১১৭৩৭, তুমি যে রবিবারে সিনেমা যাবে বলছিলে সেটা হবে না গো, ১৩৫৪৩ এর ছেলের ভ্যাক্সিন আছে ওইদিন। পরের রবিবার নিয়ে যাব…”
এটা মজা করলাম, কৃষ্ণ যে-প্রকারে রাসলীলার রাতে সমস্ত গোপিনীদের সাথে মায়া বিস্তার করে নেচেছিল এবং সবাই ভেবেছিল কৃষ্ণ তার সাথেই নাচছে, সেরকমভাবেই প্রতিদিন কৃষ্ণ এই ষোলো হাজার স্ত্রীয়ের কাছে মায়াদ্বারা রচিত নিজের ক্লোন দিয়ে সময় দিতেন। আমার পাঠকদের বলছি, কিছু শিখুন। রাজ্যের এত কাজ, এত রাক্ষস খোক্কস মেরে, এত রাজনীতি করেও কৃষ্ণ বউদের সময় দিত, আর বউদি একটু শপিং যাব বলেছেন শনিবারে সেইজন্য আপনি অফিসে ছুটি নিতে পারছেন না? তবে আমার মনে হয় আগেও যেমন বলেছি, যে পুরাণকার সবকিছুতেই বেশী বেশী দেখাতে যেরকম একশো, হাজার, লক্ষ, কোটির যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন সেরকম ভাবেই হয়তো এখানেও ষোলো বা একশো ষাটের পিছনে শূণ্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ষোলোহাজারে গিয়ে থেমেছেন। হতেই পারে। এটা আমার মতামত।
যা-ই হোক, এই ষোলো হাজার বউদের নেত্রী ছিল রোহিণী। একেও কৃষ্ণ নরকাসুরের হাত থেকে উদ্ধার করেছিল। সেই গল্প পরে বলব। কিন্তু কৃষ্ণের এই ষোলো হাজার পত্নী ছাড়াও আটজন মুখ্য স্ত্রী ছিল, একসাথে এদের বলে অষ্টভার্যা। কৃষ্ণ যখন বিষ্ণুর অবতার তখন তার প্রধান স্ত্রীরাও একে একে দেবীদের অবতারই হবেন এতে আশ্চর্য কি? এই অষ্টভার্যার মধ্যে তিনজন ভার্যার নাম বলেছি আগে, রুক্মিণী, সত্যভামা আর জাম্ববতী। চতুর্থ স্ত্রী হলেন ভদ্রা। ভদ্রা নামেও ভদ্রা, কাজেও ভদ্রা। এনাকে নিয়ে কৃষ্ণকে খুব একটা উৎপাত সহ্য করতে হয়নি। ভদ্রা আবার ছিল কৃষ্ণের পিসির মেয়ে। কুন্তি আর বসুদেবের বোন শ্রুতকীর্তি, তার মেয়ে ভদ্রা। পিসেমশাই কাম শ্বশুরের নাম ধৃষ্টকেতু।
পঞ্চম স্ত্রী ছিল লক্ষ্মণা। সুলক্ষ্মণা হলে নামটা ভালো হত। মাদ্রা দেশের রাজকুমারী, অর্থাৎ মাদ্রী ও নকুল-সহদেবের মামারবাড়ির সাথে যোগাযোগ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। একে কৃষ্ণ হয় স্বয়ংবর সভা থেকে তুলে এনেছিল, অথবা অর্জুনের মতো ধনুকের কিছু একটা কায়দা দেখিয়ে জিতে এনেছিল। এবং মজার ব্যাপার সেই ধনুর্কীর্তিতে জরাসন্ধ আর দুর্যোধন হেরে গেছিল। অর্জুন বোধহয় তখন বনবাস বা বনের বাঁশ খুঁজে বেড়াচ্ছিল। কিছু গল্প আবার বলে কৃষ্ণ যাতে লক্ষ্মণাকে বিয়ে করতে পারে তাই অর্জুন নিশানা ইচ্ছে করে ভুল করেছিল। বন্ধুত্ব এরকমই হওয়া উচিত, বন্ধুর জন্য সম্ভাব্য বউ ছেড়ে দিল। ছেড়ে দেওয়া হোক বা ঝেড়ে দেওয়া হোক, লক্ষ্মণাকে কৃষ্ণ বিয়ে করে শেষপর্যন্ত।
ষষ্ঠ স্ত্রী ছিল কালিন্দী। ইনি যমুনা নদীর অবতার ছিলেন। ও, তাই জন্য বলরাম অত ডাকাডাকি করা সত্ত্বেও উঠে আসেনি। এই কালিন্দী দেবী অনেক তপস্যা-টপস্যা করে কৃষ্ণকে স্বামী হিসেবে পায়। সপ্তম স্ত্রী ছিল কোশল দেশের রাজা নগ্নজিতের কন্যা নগ্নজিতী। নগ্নজিতীকে জিততে তার বাবা এমন শর্ত রেখেছিল, যে পাত্রদের প্রায় নগ্ন হয়ে বাড়ি যেতে হত। সামান্য শর্ত, কিছুই না, রাজার সাতটা মুশকো মুশকো ষণ্ডকে সামলাতে হবে। বলাই বাহুল্য, কৃষ্ণ ছোট থেকে এত এত গোরু আর ষাঁড় চড়িয়ে অভ্যস্ত যেখানে সেখানে সাতটা ষাঁড় তো নস্যি। কৃষ্ণ গিয়েই ষণ্ডগুলোর মুণ্ডপাত করে মণ্ড পাকিয়ে নগ্নজিতীকে জিতে নিয়ে বিয়ে করে চলে এল।
অষ্টভার্যার শেষজন ছিল মিত্রবিন্দা। অবন্তী দেশের রাজকুমারী। এর স্বয়ম্বরে নেমন্তন্ন না পেয়েও কৃষ্ণ আর বলরাম জোর করে গিয়ে মিত্রবিন্দার ভাইগুলো পিটিয়ে চিত্র-জিন্দা (মানে জ্যান্ত ছবির মতন স্থির করে দিয়ে) অবস্থা করে বিয়ে করে আনে। এই ছিল অষ্টভার্যা, এবং যুগে যুগে পণ্ডিতগণ নিজেদের লেখায় প্রমাণ করেছেন যে, যাদের কৃষ্ণ মোটামুটি যুদ্ধ করে অন্যদের পিটিয়ে-পুটিয়ে বা কম্পিটিশন করে জয় করে এনেছিল তারা সবাই আগে থেকেই কৃষ্ণকে ভালোবাসত এবং তাদের সম্মতি নিয়েই কৃষ্ণ তাদের অপহরণ ও বিবাহ করে। কিন্তু আমার মনে হয় ব্যাপারটা উলটো। যেহেতু তাদের কৃষ্ণের সাথে বিয়ে হয়েই গেছে তাই এই পূর্বভক্তি ও ভালোবাসার গল্পের উপস্থাপন। নইলে আপনারাই বলুন না এই মিত্রবিন্দা, নগ্নজিতী, সুলক্ষ্মণা এরাও তো রুক্মিণীর মতো ব্রাহ্মণদূত পাঠিয়ে ফুট করে কেটে পড়তে পারত। হয়তো সাহসের অভাব ছিল, অথবা লীলার প্রভাব। আমি কে বিচার করার?
কৃষ্ণের স্ত্রীদের লিস্ট তো জানা গেল, কিন্তু এবার প্রশ্ন হল কৃষ্ণ এদের মধ্যে একটু উনিশ-বিশ হলেও কাকে বেশি ভালোবাসত? কাকে বেশি পাত্তা দিত? মানত?
জানি জানি, আপনারা এক্ষুনি তেড়েফুঁড়ে বলবেন রুক্মিণী, তারপরে সেই গল্পগুলো শোনাবেন। সেই গল্পগুলো যারা জানেন না তাদেরকে শোনাব। কিন্তু তার আগে আরো দুটো গল্প শোনাব। প্রথম গল্পটা হল জাম্ববতীর ছেলে শাম্বর জন্ম নিয়ে। কৃষ্ণের ছেলেপুলেদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব পরের পর্বে। কিন্তু শাম্বর জন্মের কথা এখানে বলার একটা বিশেষ উদ্দেশ্য আছে।
জাম্বুবানের মেয়ে জাম্ববতীর ছেলে শাম্ব। গাম্বো, র্যাম্বো দিলেই হত। হাম্ব দিলেও হত কারণ গোরুর মতোই বুদ্ধি ছিল শাম্বর। এই শাম্বর জন্ম নিয়ে মহাভারত (কোন মহাভারত জিজ্ঞেস করবেন না প্লীজ) আর দেবী ভগবৎ পুরাণ একটা গল্প বলে। হয়েছে কী, সব রানীর ছেলেপুলে হয়ে যাচ্ছে হুড়মুড় করে, কিন্তু জাম্ববতীর আর ছেলে হয় না। মেয়ে হলে হবে না, ছেলেই হতে হবে, মনে রাখবেন। তাই জাম্ববতী গিয়ে কৃষ্ণকে ধরল, “অ্যাঁ… আমাকে একটা ছেলে দাও না। রুকি আর সতুকে তো কত কত ছেলেপিলে দিলে। আমাকে একটা দাও…”
কৃষ্ণ বলল, “আহ্, ছেলেপিলে কি লেবঞ্চুস নাকি যে দোকানে গিয়ে বলব এক কিলো ছেলে দাও, আর দোকানি থলেতে ভরে দিয়ে দেবে? ছেলে পেতে গেলে অনেক সাধনা করতে হয়…”
এটা বলেনি, কিন্তু বৈদিক ও মহাভরত মতে প্রচুর পুণ্য-টুণ্য করলে তবেই পুত্র সন্তান লাভ হত, নয়তো কন্যা। আর কন্যা মানেই যে এক্সট্রা লাগেজের মতো অযাচিত ভার বহন করা সেটা তো পুরাণের ছত্রে ছত্রে প্রমাণিত।
জাম্ববতী তাও বলে, “আমার ছেলে চাইই চাই… রুকির ছেলে প্রদ্যুম্নের মতো হ্যান্ডসাম…”
“বেশ তাহলে চেষ্টা করে দেখি…” কৃষ্ণ বলে, “ছেলেপিলের সন্ধানে এমন ছেলে নিয়ে আসব যে সবার পিলে চমকে দেবে…”
এই বলে কৃষ্ণ হিমালয় চলে গেল। না, বউয়ের অত্যাচারে নয়, বউয়ের ইচ্ছেপূরণ করতে। যদিও আমাদের অনেকেরই ইচ্ছে হয় মাঝেমাঝে বউয়ের হাত থেকে বেরিয়ে হিমালয় চলে যাই, কিন্তু হয়ে ওঠে না। কৃষ্ণ গেল জাম্ববতীর জন্য সন্তানের ব্যবস্থা করতে। একেবারে উপমন্যুর আশ্রমে গিয়ে সেখান থেকে আরেকতু উঁচুতে গিয়ে শিবঠাকুরের নাম করে কঠিন তপস্যা শুরু করে। সন্তান লাভের জন্য। কিন্তু কেন? কৃষ্ণ তো দৈব শক্তির অধিকারী ছিল। চাইলে কি জাম্ববতীকে সন্তান দিতে পারত না? আমার মনে হয় এখানে দুটো কারণ আছে। প্রথম কারণ হল জাম্ববান যেহেতু একজন ভাল্লুক বা বিগফুট বা ইয়েতি বা বুনিপ কিছু একটা ছিল তখন তার মেয়ে হয়তো একদম মানুষের মতো ছিল না। জাম্ববতী হয়তো লোমশ গোরিলা, বা ভাল্লুকের মতন ছিল। লজিক তাই বলে। এবং তাই জাম্ববতীর একজন সুন্দর সুপুরুষ সন্তানলাভ করার ইচ্ছে হয়।
আরেকটা কারণ হতে পারে যে শিবঠাকুর হলেন ধ্বংসের দেবতা। সবকিছুর শেষ করতে ওনাকে দরকার। যেমন পাণ্ডবদের সবকিছু শেষ করতে অশ্বত্থামা শিবের শরণাপন্ন হয়, তেমনই হয়তো কৃষ্ণ দৈবভাবে বুঝেছিল যে এই যদুবংশ কালে কালে বড্ড বাড় বাড়বে, এবং আজ নইলে কাল পাণ্ডব-কৌরবদের মতো নিজেদের মধ্যে মারামারি করে মরবে। সুতরাং একটা হেতু তো চাই। সেই কেতুর মতন সর্বগ্রাসী হেতুর সূচনা শাম্ব ছিল, এবং সেই হেতুকেই সেতুর মতো আনতে শিবঠাকুরের তপস্যা করে কৃষ্ণ। যদিও কিছুদিন পরেই এই শিবঠাকুরের সঙ্গেই কৃষ্ণ মারপিট করবে, কিন্তু আপাতত সন্তানলাভের আশায় তপস্যা শুরু করে।
সে বড় কঠিন তপস্যা। হাতে খুলি নিয়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে কিছু না খেয়ে না পান করে কয়েকমাস তপস্যা করতেই শিবঠাকুর অর্ধনারীশ্বর শাম্ব রূপে দেখা দিয়ে বলল, “আরে কৃষ্ণ, এতদিন ধরে ডাকাডাকি করছ কেন? হটলাইনে ডেকে নিতে, সটান চলে আসতাম। এহে বড্ড কষ্ট গেছে। কী চাও বলো…?”
“একটা ছেলে দাও তো…” কৃষ্ণ বলে।
“আমি কি পাড়ার গুন্ডা না কারখানা লেবার ইউনিয়নের লীডার যে ছেলে চাইছ?” অর্ধনারীশ্বর শাম্ব বলেন।
“আরে একটা সন্তান দাও…” কৃষ্ণ বলে, “জাম্ববতীর গর্ভে। গর্ভবতী হয়ে গর্ববতী হতে চাইছে।”
অর্ধনারীশ্বর শাম্ব সঙ্গে সঙ্গে একজন সন্তান দিয়ে দেয়। সেই সন্তানের নাম অর্ধনারীশ্বর শাম্বের নামেই শাম্ব রাখা হয়। এবং আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে যে শাম্ব আসলে উভয়লিঙ্গ মানুষ ছিল। সে আলোচনায় পরে আসব।
এবার আসি দ্বিতীয় গল্পে।
