পাইনস – ৯

অধ্যায় ৯

ইথান স্বপ্ন দেখছে, কেউ একজন বেঁধে রেখেছে তাকে। আর তার পায়ের মাংস কেউ খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে, ছোট ছোট কামড় দিয়ে, কখনো এত জোরে হয়ে যাচ্ছে যে সে ঘুমের মধ্যেই কেঁদে উঠছে।

***

ধড়মড় করে জেগে উঠল সে। গোঙানি বেরিয়ে এল মুখ থেকে। চারদিক অন্ধকার। আর তার বাম উরুর পেছন দিকটা জ্বলছে তীব্র যন্ত্রণায়। সে জানে এই ব্যথা কিসের। কেউ তার মাংস কেটে চলেছে। এক ভয়ানক মুহূর্তের জন্য সে ফিরে গেল সেই পুরনো দুঃস্বপ্নে—কালো হুড পরা আশিফের নির্যাতন কক্ষে, যেখানে সে হাত বাঁধা অবস্থায় ঝুলছিল ছাদ থেকে। পা দুটো ছিল শিকলে আটকানো, পুরো শরীর টানটান, যেন সামান্যতম নড়তে না পারে, যেন কষ্টটা পুরোপুরি সহ্য করতে বাধ্য হয়।

একটা হাত তার কাঁধ ঝাঁকাল। তার নাম ধরে ডাকল একটা নারীর কণ্ঠ। “ইথান, তুমি ঠিক আছো। শেষ হয়ে গেছে।”

সে গোঙাতে গোঙাতে বলল, “দয়া করে থামো, ঈশ্বরের দোহাই, থামো।”

“তুমি নিরাপদে আছো। আমি ওটা বের করে ফেলেছি।”

এক ঝলক আলো চোখে পড়ল তার। সে পলক ফেলল কয়েকবার, অবশেষে দৃষ্টি পরিষ্কার হলো। একটা জ্বলন্ত টর্চ মাটিতে পড়ে আছে। সেই পরোক্ষ আলোয় সে দেখতে পেল পাথরের দেয়াল, দুটি সমাধি, রঙিন কাঁচের জানালা, আর সঙ্গে সঙ্গেই সব স্মৃতি ফিরে এল ঝড়ের মতো।

বেভারলি জিজ্ঞেস করল, “তুমি জানো, এখন কোথায় আছো?”

তার পায়ের ব্যথা এত তীব্র যে মনে হচ্ছিল বমি হয়ে যাবে। খুব কষ্ট করে বলল, “আমার পা… কিছু একটা হয়েছে।”

“আমি জানি,” বেভারলি বলল শান্ত গলায়। “একটা জিনিস কেটে বের করতে হয়েছে।”

ইথানের মাথা পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। হাসপাতাল… শেরিফ… শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা… সব টুকরো টুকরো স্মৃতি জোড়া লাগিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছে আসল ঘটনা কী। এসবের মাঝখানে কেটকেও সম্ভবত দেখেছে সে, কিন্তু নিশ্চিত নয়। ওটা হয়তো কোনো স্বপ্ন ছিল… অথবা দুঃস্বপ্ন।

কিন্তু পায়ের যন্ত্রণা এত প্রবল যে অন্য কিছু ভাবাই কঠিন। সে বলল, “কী বলছো তুমি?”

বেভারলি টর্চটা তুলে ধরল, আলো ফেলল নিজের ডান হাতের ওপর। তার আঙুলের ফাঁকে ছোট একটা বস্তু। দেখতে মাইক্রোচিপের মতো। যার কোণে শুকনো রক্তের ছোপ এখনো লেগে আছে।

ইথান জিজ্ঞেস করল, “ওটা কী?”

“ওগুলো দিয়েই ওরা আমাদের ওপর নজর রাখে।”

“ওটা আমার পায়ের ভেতরে ছিল?”

“হ্যাঁ, সবার মধ্যেই ঢুকিয়ে দেওয়া আছে।”

“আমাকে দাও ওটা,” ইথান বলল।

“কেন?”

“পিষে গুঁড়া করে ফেলব।”

“না, না, সেটা করো না,” বেভারলি তাড়াতাড়ি বলল। “ওরা বুঝে যাবে তুমি চিপটা সরিয়েছো।” সে ইথানের হাতে সেটা তুলে দিল। “আমরা যখন বের হবো, কবরস্থানের কোথাও ফেলে দিও এটা। তাহলেই হবে।”

ইথান বলল, “ওরা কি আমাদের এখানে খুঁজে পাবে না?”

বেভারলি মাথা নাড়ল। “আমি আগেও এখানে লুকিয়েছিলাম চিপসহ। এই মোটা পাথরের দেয়াল সিগন্যাল আটকে দেয়। কিন্তু আমরা বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। সিগন্যাল যেখানে ড্রপ করে, ট্রেস করে তার একশো গজের মধ্যে চলে আসতে পারে ওরা।”

ইথান কষ্টেসৃষ্টে উঠে বসল। কম্বলটা সরাতেই টর্চের আলোয় দেখা গেল পাথরের ওপর চিকচিক করছে খানিকটা রক্ত। উরুর পিছনের কাটা জায়গা থেকে এখনো গাঢ় লাল স্রোত গড়িয়ে নামছে ধীরে ধীরে। সে ভাবল বেভারলিকে কতখানি গভীর করে কেটেছে? তার মাথা ঘুরছে, শরীর জ্বরে কাঁপছে, ত্বক ভেজা আর আঠালো।

“ওই ব্যাগে ক্ষতটা বন্ধ করার মতো কিছু আছে?” সে জিজ্ঞেস করল।

বেভারলি মাথা নাড়ল। “শুধু ডাক্ট টেপ।”

“ওটাই আনো। কিছু না থাকার চেয়ে ভালো।”

বেভারলি ব্যাগটা টেনে নিল কাছে, হাত ঢুকিয়ে খুঁজতে লাগল।

ইথান বলল, “আমি কি স্বপ্নে শুনেছি যে তুমি বলছিলে তুমি এখানে এসেছ উনিশশো পঁচাশি সালে?”

“না, ওটা স্বপ্ন না,” বেভারলি বলল, টেপটা বের করতে করতে। “এখন কী করব? আমার কোনো মেডিকেল ট্রেনিং নেই।”

“টেপটা কয়েকবার আমার পায়ের চারপাশে পেঁচিয়ে দাও।”

বেভারলি টেপের মাথাটা ছিঁড়ে নিয়ে সাবধানে পেঁচাতে শুরু করল ইথানের উরুর চারপাশে। “বেশি টাইট লাগছে?”

“না, ঠিক আছে। রক্তপাত থামাতে হবে।” পাঁচবার পেঁচিয়ে টেপটা ছিঁড়ে শেষ মাথা চেপে দিল।

“আমি একটা কথা বলব,” ইথান বলল, নিঃশ্বাস টেনে। “তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না।”

“বলেই দেখো। করতেও পারি।”

“আমি এখানে এসেছি পাঁচ দিন আগে…”

“ওটা আগেও বলেছো।”

“তারিখটা ছিল ২০১২ সালের চব্বিশে সেপ্টেম্বর।”

বেভারলি কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

ইথান জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি ‘আইফোন’-এর নাম শুনেছো?”

বেভারলি মাথা নাড়ল।

“ইন্টারনেট? ফেসবুক? টুইটার?”

সে আবার মাথা নাড়ল; একবার নয়, বারবার।

ইথান বলল, “তুমি যখন এসেছ তখন প্রেসিডেন্ট কে ছিল?”

“রোনাল্ড রিগান।”

“২০০৮ সালে আমেরিকা প্রথম একজন কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে—বারাক ওবামা। তুমি চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনার কথাও শোনোনি?”

সে দেখল টর্চটা কাঁপছে বেভারলির হাতে।

“না।”

“বার্লিন দেয়াল ভাঙা?”

“না, কিছুই না।”

“দুইটা গালফ ওয়ার? সেপ্টেম্বর ইলেভেন?”

“তুমি কি আমার সঙ্গে কোনো ধরনের মাইন্ড গেম খেলছো?” তার চোখ সরু হয়ে এলো। কিছুটা রাগে, কিছুটা ভয়ে। “হে ঈশ্বর, তুমি নিশ্চয়ই ওদের দলের, তাই না?”

“অবশ্যই না,” ইথান বলল। “তোমার বয়স কত?”

“চৌত্রিশ।”

“জন্মদিন?”

“পহেলা নভেম্বর।”

“কোন বছর?”

“উনিশশো পঞ্চাশ।”

ইথান তাকিয়ে রইল। “তাহলে তোমার বয়স এখন একষট্টি হওয়ার কথা, বেভারলি।”

“আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,” সে বলল।

“আমিও না,” ইথান বলল নিঃশ্বাস ফেলে।

“এই শহরের মানুষজন… কেউ কারও সঙ্গে ওয়েওয়ার্ড পাইনসের বাইরের কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলে না। এটা এখানকার নিয়ম।”

“মানে?”

“ওরা বলে, ‘এই মুহূর্তে বাঁচো’। রাজনীতি নিয়ে কোনো কথা নয়। অতীত জীবন নিয়ে নয়। সিনেমা, বই, গান—কিছু নিয়েও নয়, যদি না সেগুলো এখানে পাওয়া যায়। খেয়াল করেছো, এখানে কোনো নামী ব্র্যান্ডই নেই? টাকাগুলোও অদ্ভুত—সব পুরনো, পঞ্চাশ-ষাটের দশকের নোট। নতুন কিছুই নেই। ক্যালেন্ডার নেই, পত্রিকা নেই। আমি কতদিন ধরে আছি সেটা জানি একটাই কারণে, আমি একটা জার্নাল রাখি।”

“এমন কেন?”

“আমি জানি না, কিন্তু একটু ভুল করলেই শাস্তি ভয়ংকর।”

ইথানের পায়ে টেপ মারা জায়গাটা দপদপ করছে ব্যথায়, কিন্তু রক্তপাতটা অন্তত বন্ধ হয়েছে। আপাতত ওটা ওভাবেই থাকতে দিল সে, যদিও জানে শিগগিরই টেপটা আলগা করতে হবে।

বেভারলি বলল, “আমি যদি জানতে পারি তুমি ওদের দলের—”

“আমি ওদের দলের নই, সেই ওরা যেই হোক না কেন।”

বেভারলির চোখে পানি জমেছিল। পলক ফেলল সে। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুধারা। হাত দিয়ে মুছে ফেলল বেভারলি।

ইথান দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিল। তার শীত লাগছে, ব্যথাও কমার কোনো নাম নেই। ছাদের ওপর এখনো ঝমঝম বৃষ্টির আওয়াজ, কাচের জানালার ওপাশে এখনো রাত। বেভারলি মেঝে থেকে কম্বলটা তুলে ইথানের কাঁধে জড়িয়ে দিল।

“তুমি জ্বরে পুড়ে যাচ্ছো,” সে বলল।

ইথান ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “আমি তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই জায়গাটা আসলে কী… তুমি এখনো ঠিক করে বলোনি।”

“কারণ আমি নিজেই জানি না।”

“আমার চেয়ে অন্তত বেশি জানো।”

“এখানে যত বেশি জানবে, সবকিছু তত বেশি অদ্ভুত মনে হবে। বরং না জানাই ভালো।”

“তুমি এখানে এক বছর ধরে আছো। বেঁচে আছো কীভাবে?”

সে হেসে উঠল—একটা ক্লান্ত, নিরাশ হাসি। “সবাই যেভাবে বেঁচে আছে… মিথ্যাটাকে সত্যি মনে করে।”

“কোন মিথ্যা?”

“যে সব ঠিক আছে। আমরা সবাই নাকি এক নিখুঁত ছোট্ট শহরে থাকি।”

“‘হোয়্যার প্যারাডাইস ইজ হোম’।”

“কী?”

“‘হোয়্যার প্যারাডাইস ইজ হোম’। আমি গত রাতে শহর ছাড়ার চেষ্টা করছিলাম, বাইরে একটা সাইনবোর্ডে এই কথাগুলো দেখেছিলাম।”

বেভারলি চুপচাপ থাকল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “আমি যখন এখানে প্রথম জেগে উঠি, গাড়ি দুর্ঘটনার পর শরীরে এমন যন্ত্রণা, এমন বিভ্রান্তি ছিল যে ওরা যখন বলল আমি এখানেই থাকি, আমি বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম। সারাদিন দিশাহীন হয়ে ঘুরে বেড়ানোর পর শেরিফ পোপ আমাকে খুঁজে পায়। সে আমাকে নিয়ে যায় বিয়ারগার্ডেনে, ওই পাবটা যেখানে তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল। বলল আমি নাকি ওখানকার বারটেন্ডার, যদিও আমি জীবনে কখনও বারে কাজ করিনি। তারপর আমাকে এক ছোট্ট ভিক্টোরিয়ান বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘এই তোমার ঘর’।”

“আর তুমি বিশ্বাস করলে?”

“ও সময় আমার মাথায় নিজের কোনো স্মৃতি ছিল না, শুধু নিজের নামটা মনে ছিল।”

“পরে স্মৃতিগুলো ফিরল?”

“হ্যাঁ। আর তখনই বুঝলাম কিছু ভয়ংকর ভুল আছে। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। আমি জানতাম এ আমার জীবন না। আরেকটা ব্যাপার হলো, পোপ—আমি ঠিক বোঝাতে পারব না—কিন্তু ওর মধ্যে প্রচণ্ড অশুভ একটা ব্যাপার আছে। কিন্তু আমার অবচেতন মন বলছিল, এ ব্যাপারে কাউকে কোনো প্রশ্ন করা ঠিক হবে না।” একটু থেমে আবার শুরু করল সে। “আমার নিজের কোনো গাড়ি ছিল না, তাই হাঁটতে হাঁটতে শহরের প্রান্তে যাওয়া শুরু করলাম। কিন্তু এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটত, যখনই আমি রাস্তার শেষ প্রান্তে পৌঁছাতাম, ঠিক তখনই পোপ হাজির হত। বুঝতে পারলাম সে আসলে কোনো শেরিফ না, ও একজন কারারক্ষী। এই শহরে যারা বাস করে তাদের সবার জন্যই। বুঝলাম, সে কোনোভাবে আমার গতিবিধি ট্র্যাক করছে। তাই পরের দুই মাস আমি মাথা নিচু রাখলাম, কাজে যেতাম, বাড়ি ফিরতাম, কয়েকজন বন্ধুও বানালাম—”

“আর শহরের বাসিন্দারা সবাই? তারাও এই ভাঁওতা বিশ্বাস করে?”

“আমি জানি না,” বেভারলি বলল। “বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সবাই সুখে আছে। এমন ভাব করে যেন সবকিছু একদম স্বাভাবিক। পরে বুঝলাম, ওটা ভয়। সবাই ভয়েই চুপচাপ থাকে। কিন্তু কিসের ভয়, সেটা জানি না। আর কখনো কাউকে জিজ্ঞেসও করিনি।”

ইথান সেই নেইবারহুড পার্টির কথা ভাবল, ঘটনাচক্রে যেটার সামনে পড়ে গিয়েছিল সে। ওহ ঈশ্বর! ওটা গত রাতের ঘটনা ছিল? মনে হচ্ছিল যেন যুগ কেটে গেছে। পার্টির সবকিছু তখন খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছিল ইথানের কাছে। খুব নিরীহ। ওয়েওয়ার্ড পাইনসের সুন্দর ভিক্টোরিয়ান ঘরবাড়ি, সাজানো বাগান, হাসিখুশি পরিবারগুলোর কথা ভাবল সে। ইথান জানে না ওই ঘরগুলোয় কতজন মানুষ—কিংবা বলা ভালো কতজন কয়েদি—বসবাস করে যারা দিনের আলোয় এমন ভাব ধরে থাকে, যেন জীবনটা শান্ত আর পরিপূর্ণ, অথচ রাতে ঘুমহীন চোখে শুয়ে থাকে বিছানায়, বুকের ভেতর ধকধক করে চলে আতঙ্ক, আর মস্তিষ্কের ভেতর ঘোরে একটাই প্রশ্ন, কেন আমরা এই সুন্দর কারাগারে বন্দি? ইথান নিশ্চিত, সংখ্যাটা একেবারে কম হবে না। কিন্তু মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। যেকোনো বৈরী পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে যেতে জানে। পরিস্থিতি যত ভয়াবহই হোক, বেঁচে থাকার জন্য সে নিজের মস্তিষ্ককেই বোঝাতে পারে, ‘সব ঠিক আছে’। এই শহরেরও নিশ্চয়ই অনেকে নিজেদের, এমনকি নিজেদের সন্তানদেরও, বিশ্বাস করিয়ে ফেলেছে যে এখানকার জীবনটাই সত্য, এটাই স্বাভাবিক, আর বাইরের দুনিয়াটা কোনো এক সময়কার বিভ্রম। যা বদলানো যাবে না, তার জন্য নিজের এবং প্রিয়জনদের জীবন হুমকির মুখে কে ফেলতে চায়?

দিন গুনে গুনে বেঁচে থাকা, ‘এই মুহূর্তে’ বেঁচে থাকা; এটাই শহরের নিয়ম। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা কয়েদিরা যেমন মুক্তি পেতে ভয় পায়, আবার কেউ কেউ বেরিয়ে গিয়ে আত্মহত্যা করে, এই শহরটা কি আসলে তারচেয়ে খুব আলাদা?

বেভারলি আবার বলতে শুরু করল, “আমি এখানে আসার কয়েক মাস পর এক রাতে বারে কাজ করছিলাম। এক লোক এসে আমার হাতে একটা নোট গুঁজে দিল। তাতে লেখা ছিল ‘তোমার বাঁ উরুর পেছন দিকটা দেখো।’ সেই রাতে স্নানের সময় প্রথম টের পেলাম চামড়ার নিচে ছোট্ট একটা গাঁট আছে। কিন্তু তখন জানতাম না এর মানে কী। পরের রাতে আবার এল লোকটা। এবার বিলের পেছনে লিখে দিল, ‘ওটা কেটে বের করো, ভালো করে লুকিয়ে রাখো, ওটা দিয়েই ওরা তোমাকে ট্র্যাক করে।’

“প্রথম তিনবার ভয় পেয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলাম। চতুর্থবার সাহস করে করেই ফেললাম। দিনের বেলা সবসময় সঙ্গে রাখতাম চিপটা। অন্য সবার মতো স্বাভাবিক আচরণ করতাম। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কখনো কখনো নিজে বিশ্বাসও করে ফেলতাম যে সবকিছু স্বাভাবিকই আছে। কারো বাড়িতে ডিনারে যাচ্ছি, কিংবা ব্লক পার্টিতে অংশ নিচ্ছি, মনে হতো যেন আমার জীবনটা চিরকাল এমনই ছিল। আগের জীবনটাই আসলে একটা স্বপ্ন। তখনই বুঝতে শুরু করলাম, কীভাবে মানুষ ধীরে ধীরে ওয়েওয়ার্ড পাইনসের এই বন্দিত্বকেও বাস্তব বলে মেনে নেয়।

“রাতে, পাবের কাজ শেষ হলে আমি বাড়ি ফিরতাম, চিপটা বিছানায় রেখে দিতাম, যেন মনে হয় আমি ঘুমাচ্ছি। তারপর বেরিয়ে পড়তাম। প্রতি রাতে ভিন্ন পথে যেতাম। কিন্তু সব পথই গিয়ে শেষ হতো কানা গলিতে। উত্তরে, পূর্বে, পশ্চিমে—চারদিকজুড়ে আকাশছোঁয়া পাহাড়ের দেওয়াল। একশো ফুটের মতো উঠতে পারতাম, তারপরই শেষ। পাথরের ধার এত সরু হয়ে যেত যে হাত রাখার জায়গা থাকত না, কিংবা সাহস হারিয়ে ফেলতাম। অনেকবার কঙ্কালও পেয়েছি নিচে। পুরনো, ভাঙা হাড়গোড়। মানুষ, যারা ওপরে উঠতে গিয়ে পড়ে মারা গেছে।”

বেভারলি থেমে একটু শ্বাস নিল।

“চতুর্থবার গিয়েছিলাম দক্ষিণে, সেই মূল রাস্তা ধরে, যেটা দিয়ে প্রথম ওয়েওয়ার্ড পাইনসে ঢুকেছিলাম। সেখানে তুমি যা পেয়েছ আমিও তাই পেয়েছিলাম। রাস্তাটা ঘুরে ঘুরে আবার শহরেই ফিরে এসেছে, অন্তহীন চক্রের মতো। তবু হাল ছাড়িনি, দক্ষিণের জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। প্রায় আধ মাইল হাঁটার পর অবশেষে পেলাম বেড়াটা।”

“বেড়া?” ইথান বলল। তার পায়ের দপদপানিটা অসহ্য হয়ে উঠেছে, বেভারলির কাটার যন্ত্রণার চেয়েও তীব্র। সে ডাক্ট টেপ ঢিলা করে দিল।

“বিশ ফুট উঁচু, দুই দিকে জঙ্গলের বুক চিরে চলে গেছে যতদূর চোখ যায়। ওপরে কাঁটাতার, আর তাতে একটা গুনগুন আওয়াজ। বিদ্যুতায়িত, বুঝে গিয়েছিলাম। প্রতি পঞ্চাশ ফুট অন্তর একটা বোর্ড লাগানো। তাতে লেখা ছিল, ‘ওয়েওয়ার্ড পাইনসে ফিরে যাও। এই সীমার বাইরে মৃত্যু’।”

ইথান পা আবার পেঁচিয়ে বাঁধল। দপদপভাবটা কিছুটা কমেছে। যন্ত্রণা রয়ে গেছে, কিন্তু আগের চেয়ে অনেকটাই ভোঁতা। “তো, কোনো রাস্তা পেলে বের হওয়ার?”

“না। তখন ভোর হয়ে আসছিল, তাই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঘুরতেই দেখি, সামনে একজন দাঁড়িয়ে। প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, পরে চিনতে পারলাম।”

“যে লোকটা তোমাকে চিপটার কথা বলেছিল?”

“হ্যাঁ। সে বলল, আমি যতবার বাইরে বেরিয়েছি, সে প্রতি রাতে আমাকে অনুসরণ করেছে।”

“লোকটা কে ছিল?” আধো-আলোয় ইথান ঠিক বুঝতে পারল না, কিন্তু মনে হলো বেভারলির মুখে ছায়া নেমে এলো।

“বিল,” সে বলল আস্তে করে।

ইথানের শরীর বেয়ে কাঁপন বয়ে গেল, যেন কারেন্টের শক খেয়েছে।

“বিলের পুরো নাম কী?”

“ইভান্স। বিল ইভান্স।”

ইথান ফিসফিস করল, “জেসাস ক্রাইস্ট…”

“কী হলো?”

“ইভান্সের ডেড বডি ছিল ওই বাড়িতে, যেটার ঠিকানা তুমি আমাকে দিয়েছিলে।”

“হ্যাঁ,” বেভারলি বলল শান্ত গলায়। “চাইছিলাম তুমি শুরুতেই বুঝে যাও, এই জায়গাটা কতটা বিপজ্জনক।”

“বুঝে গেছি,” ইথান বলল। “ইভান্স আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্ট ছিল। আমাকে ওয়েওয়ার্ড পাইনসে পাঠানো হয়েছিল ওকেই খুঁজে বের করার জন্য।”

“আমি জানতাম না বিল সিক্রেট সার্ভিসে ছিল,” বেভারলি ফিসফিস করল। “আমরা আমাদের ‘আগের জীবন’ নিয়ে কোনোদিন কথা বলিনি।”

“সে কীভাবে মারা গেল?”

বেভারলি নিচু হয়ে টর্চটা হাতে নিল। এর আলো ইতিমধ্যেই ক্ষীণ হয়ে এসেছে। সে সুইচটা বন্ধ করল। চারপাশ তৎক্ষণাৎ ডুবে গেল নিখাদ অন্ধকারে। শুধু টুপটাপ বৃষ্টির আওয়াজ, আর কোনো শব্দ নেই।

“যেদিন আমরা পালাতে চেয়েছিলাম, সেই রাতের ঘটনা ছিল ওটা।” বেভারলি ফিসফিস করল। “আমি আজও জানি না ওরা কীভাবে টের পেয়েছিল। আমরা দু’জনেই চিপগুলো বিছানায় রেখে গিয়েছিলাম, অন্যসব দিনের মতোই। ঠিক জায়গায় গিয়ে বিলের সঙ্গে দেখা হলো। খাবার আর সরঞ্জাম সব প্রস্তুত ছিল… কিন্তু আমরা কোনো সুযোগই পেলাম না।”

ইথান শুনতে পাচ্ছিল কষ্টে মেয়েটার গলা ভেঙে আসছে।

“আমাদের আলাদা পথে যেতে হয়েছিল,” সে বলল। “আমি কোনোভাবে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলাম, কিন্তু ওরা ওকে ধরে ফেলে। ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল ওকে।”

“কারা ওকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করেছিল?”

“সবাই।”

“সবাই মানে—?”

“পুরো শহর, ইথান। পুরো ওয়েওয়ার্ড পাইনস।” তার কণ্ঠ কাঁপছে। “আমি আমার বাড়ি থেকে বিলের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না। তখনই বুঝেছিলাম, কী কারণে মানুষ এখানে আটকে থাকে।”

অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না। অন্ধকারের মধ্যে শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।

অবশেষে ইথান বলল, “আমি বেড়ার কাছে পৌঁছাতে পারিনি, কিন্তু দক্ষিণ দিকের সেই বাঁক ঘুরে কিছুটা জঙ্গলের ভেতর গিয়েছিলাম। গতরাতেই ঘটনা সেটা। আমি নিশ্চিত কিছু একটা শুনেছি।”

“কী শুনেছ?”

“একটা আর্তনাদ হয়তো… কিংবা কোনো চিৎকার… ঠিক বোঝাতে পারব না। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মনে হচ্ছিল আগেও এই শব্দ কোথাও শুনেছি—হয়তো কোনো স্বপ্নে, বা আগের জীবনে। ভয় ঢুকে গিয়েছিল আমার মনে, একেবারে আদিম ভয়। যেন নেকড়ের হুঙ্কার শুনছি। দৌড়ে পালানোর কথা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিনি আমি। এখন তোমার কাছে বিদ্যুতায়িত বেড়ার কথা শুনে ভাবছি, ওটা কি আমাদের ভেতরে রাখার জন্য? নাকি বাইরের কিছু ঠেকানোর জন্য?”

প্রথমে ইথান ভেবেছিল শব্দটা তার মাথার ভেতরে হচ্ছে। নার্স প্যামের দেওয়া ওষুধের প্রভাব হয়তো, কিংবা পোপের মারধর আর সাম্প্রতিক সব ঘটনার পরিণতি।

কিন্তু শব্দটা দ্রুত বাড়তে লাগল। কিছু একটা বাজছে। না। অনেকগুলো একসাথে বাজছে। শত শত… হয়তো হাজার।

“ওটা কীসের আওয়াজ?” উঠে দাঁড়াতে বেগ পেতে হলো ইথানের।

বেভারলি ইতিমধ্যেই ছুটে গেছে দরজার কাছে, টেনে খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু ধাতব আওয়াজ তুলে প্রতিবাদ জানাচ্ছে জংধরা কব্জাগুলো। দরজা খুলে যেতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে পড়ল ভেতরে, আর তখনই শব্দটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

ইথান বুঝে গেল। এটা শত শত পুরনো রোটারি টেলিফোন একসঙ্গে বেজে ওঠার শব্দ। জোরালো, ভুতুড়ে ঘণ্টাধ্বনিতে ভরে গেছে পুরো উপত্যকা।

“হে ঈশ্বর,” বেভারলি নিঃশ্বাস ফেলল।

“কী হচ্ছে?”

“বিল যে রাতে মারা গিয়েছিল, সেদিনই ঠিক এভাবেই শুরু হয়েছিল।”

“আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“ওয়েওয়ার্ড পাইনসের প্রতিটি বাড়ির প্রতিটি ফোন এখন বাজছে,” বেভারলি বলল কাঁপা গলায়। “সবাইকে বলা হচ্ছে, তারা যেন তোমাকে খুঁজে বের করে মেরে ফেলে।”

বেভারলির শেষ বাক্যটা ধক করে তার কানে বাজল। ইথান জানে তার ভয় পাওয়া উচিত এবং ভয় হয়তো পাচ্ছেও, কিন্তু সেটা মস্তিষ্কের গভীর কোণে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে। মন তার নাগাল পাচ্ছে না। এখন তার শরীরে বইছে অ্যাড্রেনালিনের জোয়ার। জীবনে যে ক’বার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, প্রতিবারই এমন অনুভব করেছে সে। মৃত্যুকে চোখ রাঙিয়ে ফিরে এসেছে জীবিতদের জগতে। এবারও হয়তো পারবে, যদি নিজের টিকে থাকার ইন্দ্রিয়কে অনুসরণ করতে পারে।

“আমি চিপটা বাইরে ফেলে আসছি। তারপর এখানে লুকিয়ে থাকব যতক্ষণ না ওরা চলে যায়,” ইথান বলল।

“শহরে পাঁচশোর বেশি মানুষ বাস করে, আর তাদের প্রত্যেকেই এখন তোমাকে খুঁজছে,” বেভারলি বলল। “কেউ না কেউ এই দরজা পার হয়ে আসবেই। সেই পর্যন্ত এখানে থাকলে তুমি-আমি দুজনেই মরব।”

ইথান তার হাত থেকে টর্চটা নিল, জ্বালাল, আর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে গেল ডাফল ব্যাগটার দিকে। “এর মধ্যে কী আছে?” সে হাঁটু গেড়ে বসে জিজ্ঞেস করল।

“তোমার জন্য কাপড়। জুতা। তোমার সাইজ আন্দাজ করে নিয়েছি।”

“অস্ত্র?”

“সরি… ম্যানেজ করতে পারিনি।”

ইথান ব্যাগ থেকে একে একে জিনিসগুলো বের করতে লাগল। একটা লম্বা হাতার কালো টি-শার্ট, কালো জিনস, কালো জুতা, দুই ডজন পানির বোতল।

“লাইট বন্ধ করো!” বেভারলি হিসিয়ে উঠল।

ইথান সঙ্গে সঙ্গে টর্চ নিভিয়ে দিল।

বেভারলি বলল, “তোমার এখনই যেতে হবে। ওরা চলে এসেছে।”

“দাঁড়াও, পোশাকগুলো পরে নিই—”

“ওরা কবরস্থানে ঢুকে পড়েছে। ওদের টর্চলাইট দেখতে পাচ্ছি।”

ইথান ব্যাগের সব জিনিস ফেলে রেখে দরজার দিকে দৌড়াল। লোহার দরজার বাইরে তাকিয়ে দেখল, চারটে আলোর বিন্দু ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাধি ফলকগুলোর ফাঁকে ফাঁকে। কয়েকশো ফুট দূরে আছে ওরা। যদিও অবিরাম বৃষ্টির পর্দার মাঝে দূরত্ব বোঝা মুশকিল।

সব ফোন এখন থেমে গেছে।

বেভারলি ইথানের কানে ফিসফিস করে বলল, “শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে একটা নদী আছে। ওই রুট দিয়েই আমি আর বিল পালানোর পরিকল্পনা করেছিলাম। কারণ একমাত্র ওই দিকটাই পুরোপুরি খোঁজা হয়নি আমাদের। বিল কিছুটা গিয়ে ফিরে এসেছিল, ওর কাছে আশাব্যঞ্জক মনে হয়েছিল পথটা।”

“আমাদের আবার দেখা হবে কোথায়?”

“নদীর কাছে যাও, তারপর উজানে যেতে থাকবে। আমি খুঁজে নেব তোমাকে।”

বেভারলি তার পঞ্চোর হুডটা মাথায় টেনে দিল, তারপর সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল বাইরে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটানা বৃষ্টির শব্দে মিলিয়ে গেল তার পায়ের আওয়াজ।

ইথান দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ একবার এগিয়ে আসা আলোর দিকে, আরেকবার ডাফল ব্যাগের দিকে। ভাবছে ওরা চলে আসার আগে পোশাক পরে নেওয়ার জন্য দুই মিনিট সময় পাওয়া যাবে নাকি এখনই বেরিয়ে পড়বে?

চারটে আলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তার দিকে, সঙ্গে ভেসে আসছে তাদের কণ্ঠস্বর।

তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নে, হারামজাদা।

দ্রুত সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। ওরা যদি এসে তোকে ক্রিপ্টের ভেতরে পায়, তুই শেষ। পালাবার পথ পাবি না। তোর কাপড় পরার আগেই ওরা চলে আসবে। ইথান দৌড়াল।

গায়ে শুধু হাসপাতালের পাতলা গাউন। পায়ে জুতা নেই, ভেজা ঘাস আর ঠাণ্ডা কাদায় পা পিছলে যেতে চাইছে। বৃষ্টির ফোটাগুলো যেন নুড়ি পাথরের মতো লাগছে গায়ে। সারা শরীরে ব্যথা। কাঁপছে শীতে। বাঁ পায়ের হ্যামস্ট্রিং যেন প্রতি পদক্ষেপে চিৎকার করছে যন্ত্রণায়। কিন্তু ইথান অনুভব করার ক্ষমতা বন্ধ করে দিল—ভয়, ব্যথা, ঠাণ্ডা—সব। কেবল দৌড়। পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে দৌড়, সমাধিফলকের পাশ কেটে, অন্ধকার চিড়ে। পেছনের চারটে আলোর বিন্দু এখনো ওর পিছু নেয়নি। তারা এখনো সে যে ক্রিপ্টের ভেতরে ছিল সেদিকেই যাচ্ছে।

পূর্ণ অন্ধকারে দিকজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে সে। বুঝতে পারছে না কোন দিক উত্তর আর কোনটা দক্ষিণ, শহরের দিকে যাচ্ছে নাকি দূরে সরে যাচ্ছে। সে শুধু দৌড়াচ্ছে। অবশেষে একটা ভাঙাচোরা দেয়ালের সামনে পৌঁছাল সে। কবরস্থানের সীমানা প্রাচীর।

দেয়ালের ওপর চড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে পেছনে তাকাল। আরও আলো। অন্তত আধ-ডজন নতুন আলো এসে যোগ দিয়েছে আগেরগুলোর সাথে। সংখ্যাটা প্রতি সেকেন্ডে আরও বাড়ছে। যেন অন্ধকারে অসংখ্য জোনাকি জ্বলে উঠেছে একসাথে, সব এগিয়ে আসছে ওর দিকে। ওদের আলো কাঁপছে, টলছে, যার মানে ওরাও দৌড়াচ্ছে।

ইথান মাইক্রোচিপটা ফেলে লাফ দিয়ে নামল দেয়ালের ওপারে। বাঁ পায়ের তীব্র ব্যথায় চেহারা বেঁকে গেল, কিন্তু থামল না সে। সামনে একটা মাঠ, ঘাসগুলো সুন্দর করে ছাঁটা। মাঠের অপর প্রান্তে বাচ্চাদের খেলার জায়গা। দোলনা, স্লাইড, আর ঘূর্ণিগুলো বৃষ্টিতে ভিজে চকচক করছে। মাঠের পরে একটা রাস্তা। সেখানে একটা নিঃসঙ্গ ল্যাম্পপোস্ট থেকে আলো নেমে আসছে, সেই বৃষ্টি যেন তরল রূপার মতো ঝলমল করছে।

তারও ওপাশে ঘন অন্ধকার পাইন বনের আড়ালে দেখা গেল নতুন আলোর বিন্দু, নতুন কণ্ঠস্বর। কবরস্থানের দিক থেকে কেউ চিৎকার করল। বোঝা গেল না কাকে উদ্দেশ্য করে, কিন্তু তাতে ইথানের গতি দ্বিগুণ হয়ে গেল। দোলনা আর স্লাইড পেরোতে পেরোতে হঠাৎ জায়গাটা চিনে ফেলল। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে পানির কলকল ধ্বনি, আর নিজের হৃৎপিণ্ডের ধকধক। যদিও সে দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু সে নিশ্চিত তার বাঁ দিকেই আছে সেই নদীর তীর, যেখানে পাঁচ দিন আগে প্রথম জ্ঞান ফিরে এসেছিল ওয়েওয়ার্ড পাইনসে।

নদীর দিকে যেতে উদ্যত হল সে, কিন্তু তখনই সেখানে জ্বলে উঠল এক টুকরো আলো।

ইথান স্লাইডটা পেরিয়ে ঝোপের ভেতর ঢুকে পড়ল। ভেজা ডালপালায় আটকে পাতলা গাউনটা প্রায় আলগা হয়ে এলো শরীর থেকে। কোনো মতে হোঁচট খেতে খেতে ঝোপ পার হয়ে রাস্তায় উঠে এলো। গাউনটা স্রেফ গলা থেকে ঝুলে আছে, যেন একটা ছেঁড়া আলখাল্লা। ইথান ছুড়ে ফেলল সেটা।

শ্বাস নিতে পারছে না সে, স্থির দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিঃশ্বাস নিলেও যথেষ্ট হবে না। কিন্তু থামার উপায় নেই। এখন কবরস্থান, নদী আর উত্তরের পাইন বনের সব আলো একসাথে মিলেছে—এক বিশাল আলোকধারা ছুটে আসছে ওর দিকে। সেই আলোর ভেতরে মিশে আছে এক উন্মত্ত, মাতাল আনন্দে ভরা চিৎকার। শিকার শুরু হয়ে গেছে। ইথানের রক্তে নতুন করে অ্যাড্রেনালিনের বিস্ফোরণ হলো।

কাদামাখা পায়ে নেমে পড়ল ভেজা রাস্তায়। সম্পূর্ণ নগ্ন সে। দৌড়াচ্ছে রাস্তার মাঝখান দিয়ে, বৃষ্টির ঝাঁপটায় দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সে অনুধাবন করল, তার লক্ষ্য বদলে গেছে। নদীর কাছে পৌঁছোনো এখন অর্থহীন। বেঁচে থাকতে হলে এখনই কোনো জায়গা খুঁজে লুকোতে হবে। এই উন্মাদ শিকার থেমে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

সে জানে না কতজন তার পিছু নিয়েছে, বা কতজন ইতিমধ্যেই তাকে দেখে ফেলেছে। কিন্তু এইভাবে নগ্ন অবস্থায় শহরের রাস্তায় দৌড়াতে থাকলে ওর মৃত্যু শুধু সময়ের ব্যাপার।

একটা ভারী গলার চিৎকার শোনা গেল, “ওখানে!”

ইথান পেছনে তাকাল। বড়সড় একটা ভিক্টোরিয়ান বাড়ি থেকে তিনটে ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এসেছে। সামনের লোকটা দৌড়ে সিঁড়ি, সামনের উঠান পেরিয়ে এক লাফে সাদা কাঠের বেড়া টপকে রাস্তায় পড়ল। অন্য দুজন গেটের হুড়কো খুলে যতক্ষণে রাস্তায় নামল, ততক্ষণে প্রথমজন অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। তার পরনে কালো পোশাক, ভারী বুটের ঠকঠক আওয়াজ তুলে তুমুল গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ইথানের দিকে। মাথায় বাঁধা হেডল্যাম্পের আলোয় চকচক করছে তার হাতের মাচেতের ভেজা ফলাটা। লোকটা দৌড়াচ্ছে, হাঁপাচ্ছে, আর সেই মুহূর্তে ইথানের মাথার ভেতর থেকে একটা ঠাণ্ডা, নির্লিপ্ত কণ্ঠ কথা বলে উঠল—

লোকটা তোর থেকে মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে, ওর হাতে অস্ত্র আছে, আর ও তোকে ধরবেই। এখন তুই কী করবি?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *