পাইনস – ১৬

অধ্যায় ১৬

ইথান দম চেপে ধরে শরীর নামিয়ে দিল ভেন্ট থেকে, যতক্ষণ না তার নগ্ন পা সাদা-কালো চেকার্ড টাইলসের মেঝে স্পর্শ করে। একটা লম্বা, ফাঁকা করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে। ফ্লুরোসেন্ট লাইটের মৃদু গুঞ্জন আর মাথার ওপরে ডাক্টের ভেতর দিয়ে বাতাস যাতায়াতের নরম শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।

খালি পায়ের আলতো শব্দ তুলে হাঁটতে শুরু করল সে। প্রতি বিশ ফুট পরপর দরজা। প্রতিটা দরজায় নম্বর দেওয়া। সামনে ডানদিকের একটা দরজা সামান্য ফাঁকা হয়ে আছে, ভেতরের একটুখানি আলো এসে পড়ছে করিডোরে।

সে ওটার সামনে গিয়ে থামল। দরজার গায়ে লেখা নম্বর ৩৭। দরজার হাতলে হাত রাখল সে। চুপচাপ শুনল। কোনো কণ্ঠ নেই। কোনো নড়াচড়া নেই। এমন কিচ্ছু নেই যা তাকে ফিরে যেতে বাধ্য করতে পারে।

ঠেলা দিয়ে আরও এক ইঞ্চি খুলে ভেতরে উঁকি দিল সে। ওপাশের দেয়ালে ধাতব ফ্রেমের ওপর একটা সিঙ্গেল খাট। টানটান বিছানা করা। সেটার পাশেই একটা ডেস্ক, যার উপর ফ্রেমে বাঁধাই করা কয়েকটা ছবি আর একটা ফুলদানি ভরা টিউলিপ। তার চোখ একে একে ফ্লোর-টু-সিলিং বুকশেলফ, একটা মাতিস প্রিন্ট, একটা ইজেলের উপর ঘুরে এল।

দরজার পাশের দেয়ালে হুক থেকে ঝুলছে একটা টেরিক্লথ রোব, নিচে এক জোড়া পিঙ্ক-বানি স্লিপার।

ইথান এগিয়ে চলল নীরব করিডোর ধরে।

দরজা কোনোটাই তালাবন্ধ নয়। ঝুঁকি নিয়ে প্রত্যেকটাই খুলে ভেতরে উঁকি দিল সে। একইরকম মিনিমালিস্ট ঘর, তবে প্রতিটায় কিছু স্বতন্ত্রতা আছে।

অনেক দূর যাওয়ার পর একটা সিঁড়িঘরে গিয়ে শেষ হলো করিডোর। ঝুঁকে নিচে তাকাল সে। চারতলা সমান সিড়ি দেখা যাচ্ছে। দেয়ালে একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘লেভেল ফোর’। আস্তে আস্তে পরের ল্যান্ডিংয়ে নেমে এল ইথান। এখানে আরেকটা করিডোর, অবিকল একই রকম।

হঠাৎ জোরে হাসির শব্দ প্রতিধ্বনি করিডোর জুড়ে।

ইথান তড়াক করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল খানিকটা, দৌড়ে পালানোর জন্য প্রস্তুত। একবার ভাবল লেভেল ৪-এ ফিরে গিয়ে, কোনো অ্যাপার্টমেন্ট থেকে একটা চেয়ারের সাহায্যে আবার ভেন্টে উঠে যাবে কি না। কিন্তু হাসিটা মিলিয়ে গেল, পুরো এক মিনিট অপেক্ষা করল সে। করিডোর ফাঁকাই রইল।

সে পা টিপে টিপে তিরিশ ফুট এগিয়ে একটা দুই পাল্লার সুইং দরজার সামনে গিয়ে থামল। প্রতিটা পাল্লার চোখ উচ্চতায় কাঁচের জানালা বসানো।

ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখল সাধারণ একটা ক্যাফেটেরিয়া; ডজনখানেক টেবিল, তার একটায় তিনজন পুরুষ আর দুইজন মহিলা বসে খাচ্ছে। গরম খাবারের গন্ধে তার পেট গুরগুর করে উঠল।

মহিলাদের একজন বলল, “কথাটা যে সত্যি না সেটা তুমি নিজেও জানো, ক্লে।” একটা পুরুষের দিকে হাতের কাঁটাচামচটা ইশারা করে বলেছে কথাটা। কাঁটাচামচে যে খাবারের দলাটা দেখা যাচ্ছে সেটা সম্ভবত ম্যাশড পটেটো।

ইথান এগিয়ে চলল করিডোর ধরে।

একটা লন্ড্রি পার হলো সে।

একটা রিক্রিয়েশন রুম।

একটা লাইব্রেরি।

একটা ফাঁকা জিমনেসিয়াম।

পুরুষ আর নারীদের লকার রুম।

আর একটা এক্সারসাইজ রুম, যেখানে দুই মহিলা দৌড়াচ্ছে পাশাপাশি ট্রেডমিলে, আর একজন পুরুষ ফ্রি ওয়েট ব্যায়াম করছে। করিডোরের শেষ মাথায় গিয়ে আবার একটা সিঁড়িঘর পেল ইথান। এক তলা নেমে লেভেল টু করিডোরে চলে এল সে।

প্রথম দরজাটার কাছে এসে সে থামল, গোলাকার ছোট জানালা দিয়ে উঁকি দিল ভেতরে।

ঘরের মাঝখানে একটি গার্নি, চারপাশে সার্জিক্যাল লাইট, অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি ভর্তি কার্ট, হার্ট মনিটর, আইভি-স্ট্যান্ড, কটারী আর সাকশন ইউনিট, একটা ফ্লুরোস্কপি টেবিল, সবকিছু ঝকঝকে পরিষ্কার, মৃদু আলোয় চমকাচ্ছে।

পরের তিনটি দরজা জানালাবিহীন। শুধু নেমপ্লেটে লেখা: ল্যাব এ, ল্যাব বি, ল্যাব সি।

করিডোরের শেষ মাথায় একটা জানালায় আলো জ্বলছে। ইথান নিঃশব্দে জানালার পাশে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল।

কাঁচের ওপাশে ঠুকঠুক শব্দ আর নিচু স্বরে কথাবার্তার গুঞ্জন।

জানালায় চোখ রাখল সে।

ঘরটা প্রায় অন্ধকার। আলো আসছে মনিটরের সারি থেকে। পাঁচটা সারি, প্রতি সারিতে পাঁচটা করে মোট পঁচিশ মনিটর। সবগুলো দেয়ালে টাঙানো। নিচে বিশাল কনসোল, দেখে মনে হচ্ছে যেন রকেট উৎক্ষেপণের কন্ট্রোল রুম।

ইথান যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে দশ ফুট দূরে একজন লোক বসে মনিটরগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। কীবোর্ডের ওপর বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছে তার আঙুলগুলো, আর স্ক্রিনে ছবি বদলে যাচ্ছে একের পর এক। তার কানে হেডসেট। কিছু একটা বলছে সে। ইথান তার গলা শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু কথাগুলো পরিষ্কার নয়।

ইথান একটা স্ক্রিনের স্লাইড শো-তে ইথান মনোযোগ দিল।

একটা ভিক্টোরিয়ান বাড়ির সম্মুখ ভাগ।

আরেক বাড়ির বারান্দা।

একটা গলি।

একটা বেডরুম।

একটা খালি বাথটাব।

এক বাথরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে এক নারী।

একজন পুরুষ কিচেন টেবিলে বসে এক বাটি সিরিয়াল খাচ্ছে।

একটা বাচ্চা টয়লেটে বসে বই পড়ছে।

ওয়েওয়ার্ড পাইনসের মেইন স্ট্রিট।

পার্কের প্লেগ্রাউন্ড।

কবরস্থান।

নদী।

কফিশপের ভেতর।

হাসপাতালের লবি।

শেরিফ পোপ, ডেস্কের উপর পা তুলে ফোনে কথা বলছে।

ইথান জানালা দিয়ে রুমের ভেতরে পুরোটা দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু বামদিকেও যে একইরকম আরও অনেকগুলো মনিটর এবং অপারেটর আছে সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। তাদের টাইপ করার শব্দ আর আবছা কণ্ঠও শোনা যাচ্ছে বাইরে থেকে।

তার ভেতরে ক্রোধের আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হলো।

দরজার হাতলে হাত রাখল সে। ঘোরাতে শুরু করে দিয়েছে। তার ইচ্ছে করছে, চুপিচুপি রুমে ঢুকে ওই লোকটার ঘাড় মটকে দেয়, এভাবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে নজর রাখার মজা টের পাবে তাহলে।

কিন্তু নিজেকে থামাল সে।

এখনই না।

ইথান সার্ভেইল্যান্স সেন্টার থেকে পিছু হটল। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল নিচতলার করিডোরে। প্লাকার্ডে লেখা—লেভেল ১।

দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, তবে করিডোরটা সম্ভবত অপর প্রান্তের সিঁড়িঘরের ওপাশে আরও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। ইথান হাঁটার গতি বাড়াল। প্রতি দশ ফুট পরপর সে একটা করে দরজা পেরোচ্ছে যেগুলোর গায়ে কোনো হাতল বা ভেতরে ঢোকার কোনো দৃশ্যমান উপায় নেই, শুধু একটা কী-কার্ড স্লট ছাড়া।

বাঁ পাশের তৃতীয় দরজার কাছে এসে সে থামল। ছোট জানালা দিয়ে উঁকি দিল ভেতরে। অন্ধকার। খালি ঘর। দশ নম্বর দরজার কাছে গিয়ে আবার থামল। উঁকি দিল জানালা দিয়ে। হাত দিয়ে চোখের চারপাশ ঢেকে নিল যেন অন্ধকারে একটু ভালো দেখা যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে কাঁচের ওপাশে একটা মুখ এসে হাজির হলো। পাতলা চামড়া, চুলহীন খুলি, বড় নাসারন্ধ্র, ঠোঁটহীন মুখ, আর ছোট ঘোলাটে চোখ। হুবহু ক্যানিয়নের সেই জন্তুগুলোর মতো। দাঁত বের করা, সাথে হিংস্র হিসহিস।

ইথান চমকে গেল। ছিটকে সরে গিয়ে ধাক্কা খেল পেছনের দেয়ালে। শরীর কাঁপতে লাগল ভয় আর অ্যাড্রেনালিনে, আর ওই জিনিসটা চিৎকার করে যাচ্ছে জানালার ওপাশে, সৌভাগ্যক্রমে কাঁচ পুরু বলে এপাশে শব্দ খুব বেশি আসছে না। ইথান এইমাত্র নেমে আসা সিঁড়ি থেকে পদধ্বনি ভেসে এল।

ইথান ছুটল করিডোর ধরে যতটা দ্রুত সম্ভব—দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে ফ্লুরোসেন্ট লাইটের কৃত্রিম আলোর স্রোত। অপর প্রান্তের সিঁড়ির কাছে পৌঁছে পেছনে তাকাল এক ঝলক। প্রায় একশো গজ দূরে, কালো পোশাক পরা দুটো অবয়ব নেমে এসেছে সিঁড়ি বেয়ে। তাদের একজন ইথানের দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে কিছু একটা বলল, তারপর দু’জনই দৌড় লাগাল তার উদ্দেশ্যে।

ইথান সিঁড়িঘর পেরিয়ে গেল। সামনে, দুটি অটোমেটিক কাঁচের দরজা বন্ধ হয়ে আসছে। সে কোনোমতে পাশ ফিরে বেরিয়ে গেল ফাঁক গলে। সে পার হতেই বন্ধ হয়ে গেল পাল্লা দুটো। কিন্তু পরবর্তী দৃশ্য তাকে হতবাক করে দিল, রুমের বিশালত্ব তাকে থামিয়ে দিল একেবারে। সে এখন আর টাইলসের মেঝেতে নয়, ঠাণ্ডা পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এক বিশাল গুহার কিনারায়। এটা যেন দশটা গুদামঘর মিলিয়ে একটা জায়গা। কমপক্ষে দশ লক্ষ বর্গফুট, আর কোথাও কোথাও সিলিংয়ের উচ্চতা ষাট ফুট। সারা জীবনে সে এর চেয়ে চমকপ্রদ জায়গা কেবল একবারই দেখেছে। এভারেট, ওয়াশিংটনের বোয়িং প্ল্যান্ট।

গুহার পাথুরে ছাদ থেকে বিশাল বিশাল গোলাকার লাইট ঝুলছে। প্রতিটা আলোকিত করছে অন্তত হাজার বর্গফুট জায়গা। শত শত এমন লাইটের সারি। তার পেছনে কাঁচের দরজাগুলো আবার খুলতে শুরু করেছে। কালো পোশাক পরা লোক দুজনের জুতোর শব্দ শোনা যাচ্ছে, ইতিমধ্যেই করিডোরের অর্ধেক পথ পেরিয়ে এসেছে ওরা। ইথান গুহার ভেতর ঢুকে পড়ল, দৌড়ে চলল একটা সরু প্যাসেজওয়ে ধরে। দুই পাশে বিশাল সব তাক, নানান মাপের কাঠে বোঝাই সেগুলো। তাকগুলো চল্লিশ ফুট উঁচু, দুই পাশে তিন সারি করে সাজানো, আর লম্বায় প্রায় একটা ফুটবল মাঠের সমান। ইথানের ধারণা এই কাঠ দিয়ে চাইলে পুরো ওয়েওয়ার্ড পাইনস পাঁচবার গড়ে ফেলা যাবে।

গুহাজুড়ে অসংখ্য কণ্ঠের প্রতিধ্বনি ওঠানামা করছে। ইথান কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল এক ঝলক। দূরে একজনকে দেখা গেল। আনুমানিক দুইশো ফুট ছুাটে আসছে তার দিকে। তাকের সরু ক্যানিয়ন থেকে বের হয়ে এল ইথান। সোজা সামনে এক বিশাল খোলা জায়গাজুড়ে শত শত সিলিন্ড্রিক্যাল রিজার্ভয়ার। প্রতিটিই ত্রিশ ফুট লম্বা ও ত্রিশ ফুট চওড়া আর বহু হাজার কিউবিক ফুট জিনিস ধারণ করতে সক্ষম। প্রতিটির গায়ে বিশাল ব্লক হরফে লেখা লেবেল লাগানো:

চাল

ময়দা

চিনি

শস্য

আয়োডিনযুক্ত লবণ

ভুট্টা

ভিটামিন সি

সয়াবিন

গুঁড়া দুধ

মন্ট

বার্লি

ইস্ট

ইথান কন্টেইনারের গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ল। দৌড়ের শব্দ, খুব কাছেই। কিন্তু চারদিকে এত প্রতিধ্বনি যে ঠিক কোথা থেকে আসছে বোঝার উপায় নেই। একটু থেমে একটা রিজার্ভয়ারের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল, বাহুর ভাঁজে শার্টে মুখ গুঁজে হাঁপানোর শব্দটাও লুকানোর চেষ্টা করল প্রাণপণ। কালো পোশাক পরা একজন দৌড়ে গেল তার রিজার্ভয়ারের পেছন দিয়ে। এক হাতে ওয়াকি-টকি, আরেক হাতে গরু তাড়ানোর বৈদ্যুতিক দণ্ডের মতো কিছু একটা।

দশ সেকেন্ড অপেক্ষা করে ইথান দিক বদল করল। আরও একশো গজ এগিয়ে গিয়ে সে পৌঁছে গেল এক বিশাল পার্কিং লটে। সব ধরনের গাড়ি দেখা যাচ্ছে সেখানে। আশির দশকের পুরনো মডেল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় হয়ে এমন কিছু ফিউচারিস্টিক মডেল আছে যা মনে হচ্ছে যেন সোজা সায়েন্স ফিকশন মুভি থেকে নেমে এসেছে। প্রত্যেকটা গাড়িতে ক্রোম পেইন্ট ঝকঝক করছে, কোথাও সামান্যতম দাগ পর্যন্ত নেই। সিলিংয়ের গোল লাইটের আলোয় মনে হচ্ছে যেন সবগুলোই মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড আগে অ্যাসেম্বলি লাইন থেকে নামানো হয়েছে।

পার্কিং লটের ওপাশে, কয়েকজন লোক একসাথে দৌড়ে এল দৃশ্যপটে। ইথান দুটো লাল জিপ চেরোকির মাঝখানে ঝুঁকে পড়ল। সে নিশ্চিত নয় ওরা তাকে দেখেছে কি না, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে ওদের হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র আছে। হামাগুড়ি দিয়ে কয়েকটা গাড়ি অতিক্রম করল সে। একটা শেভ্রোলে ইমপালার পাশে এসে থামল ইথান। আশির দশকের মডেল এটা। ড্রাইভার দরজার পাশে উঠে দাঁড়াল নিঃশব্দে। উইন্ডশিল্ড দিয়ে ওদের দেখা যাচ্ছে। তার ধারণার চেয়ে অনেক কাছে চলে এসেছে ওরা। মাত্র ত্রিশ ফুট দূরে। প্রত্যেকের হাতে সাবমেশিন গান। দু’জন প্রতিটি গাড়ির ভেতরে টর্চের আলো ফেলে খুঁজছে, আর তৃতীয়জন চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে গাড়ির নিচে আলো মেরে দেখছে।

ইথান বিপরীত দিকে ছুটল। এবার আর হামাগুড়ির ধার ধারল না। শুধু কুঁজো হয়ে থাকল যেন কোনো গাড়ির জানালা দিয়ে ওর মাথা দেখা না যায়। পার্কিং লটের প্রায় কিনারায় পৌঁছে হোঁচট খেয়ে এক ক্রাউন ভিকের পাশে থেমে পড়ল সে। পেছনের উভয় প্যাসেঞ্জার দরজায় গাঢ় টিন্টেড কাঁচ লাগানো। এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে হ্যান্ডেল ধরে টান দিল। দরজায় লক নেই। খুলে গেল সেটা। কোনো শব্দ হলো না। ডোম লাইটের তীব্র আলোয় আলোকিত হয়ে গেল ভেতরটা। ইথান ঝটপট ঢুকে পড়ল, দরজাটা আস্তে চাপতে চেয়েও একটু জোরে লেগে গেল। গাড়ির ভেতর থেকেও সে শুনতে পেল, পুরো গুহা জুড়ে দরজা আটকানোর প্রতিধ্বনি ছুটে বেড়াচ্ছে।

ড্রাইভারের সিটের পেছনে ছায়ায় কুঁকড়ে বসে, ইথান হেডরেস্টের উপর দিয়ে উইন্ডশিল্ড ভেদ করে সামনে তাকাল। ওরা তিনজনই এখন থেমে দাঁড়িয়ে আছে, ধীরে ধীরে ঘুরছে চারদিকে, নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে শব্দের উৎস কোথায়। শেষ পর্যন্ত ওরা ভাগ হয়ে গেল। দু’জন উল্টো দিকে, আর একজন সোজা ইথানের গাড়ির দিকেই। লোকটা এগিয়ে আসতেই, ইথান সিটের পেছনে শরীরটা ছোট্ট বলের মতো গুটিয়ে ফেলল। পায়ের শব্দ ক্রমে কাছে আসছে। মাথা হাঁটুর মাঝে গুঁজে ফেলল সে। বাইরের কিছুই দেখতে পাচ্ছে না এখন আর। পায়ের শব্দ তার মাথার পাশে চলে এল, দরজার ঠিক ওপাশে, মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। আরও এগোল না। থেমে গেল। মাথা তুলে উঁকি দিতে ইচ্ছা করছে ইথানের। জানতে ইচ্ছে করছে লোকটা কী করছে এখন। ক্রাউন ভিকের টিন্টেড জানালা দিয়ে ভেতরে আলো কতটা ঢুকতে পারে? ভেতরটা পরিষ্কার না দেখতে পারলে কি লোকটা দরজা খুলবে?

হঠাৎ পায়ের শব্দ আবার শুরু হলো। কিন্তু ইথান নড়ল না, অন্তত পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করল, যতক্ষণ না শব্দ পুরোপুরি মিলিয়ে যায়। অবশেষে মাথা তুলে উইন্ডশিল্ড দিয়ে তাকাল। লোকগুলো নেই। একজনও দেখা যাচ্ছে না।

ইথান আস্তে দরজা খুলে হামাগুড়ি দিয়ে পাথুরে মেঝেতে নেমে পড়ল। কান পাতলে খুব আবছা কিছু কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে, কিন্তু সেটা বেশ দূরে। আরও একশো ফুট হামাগুড়ি দিয়ে ইথান পার্কিং লটের প্রান্তে পৌঁছাল। সোজা সামনে গুহার দেয়াল, আর একটা টানেলের মুখ যেখান থেকে দুটো গাড়ি পাশাপাশি চলতে পারবে।

ইথান উঠে টানেলে ঢুকে পড়ল। ভেতরটা ফাঁকা, উজ্জ্বল আলোয় ভরা, আর অনুভূমিকের সাথে দশ থেকে বারো শতাংশ হারে সামনের দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। নিচে মসৃণ মেঝে। ঠিক যেন টানেলের খিলানের ওপরে সবুজ বোর্ডে কিছু সাদা অক্ষর দেখা যাচ্ছে, আমেরিকান ইন্টারস্টেট হাইওয়ের সাইনবোর্ড। তবে সেগুলোয় অনেকগুলো গন্তব্যের কথা লেখা থাকলেও এখানে কিন্তু গন্তব্য একটাই।

ওয়েওয়ার্ড পাইনস ৩.৫

ইথান পেছন ফিরে গাড়িগুলোর দিকে তাকাল। ভাবল, পুরনো মডেলগুলোর একটা নেবে কি না, ওগুলো হটওয়্যার করা অনেক সহজ হবে।

হঠাৎ কিছু ধরা পড়ল তার চোখে, পঞ্চাশ গজ দূরে পাথরে বসানো কাঁচের দরজায় একটা শীতল নীলচে আলো জ্বলছে। পায়ের শব্দ আর মানুষের গলা আবার শোনা যেতে লাগল, তবে এখনও বেশ দূরে, গাড়িগুলোর ওপাশে কোথাও। ইথান ভাবল হয়তো কোনো ফ্ল্যাশ লাইটের আলো রিজার্ভয়ারের গায়ে পড়ছে, যদিও নিশ্চিত হতে পারল না।

সে গুহার দেয়ালের পাশ ঘেঁষে হাঁটতে থাকল। দেয়ালটা হালকা বাঁক নিয়েছে সামনে, আর ইথান দুলকি চালে ছুটে চলল কাঁচের দরজার দিকে। পাঁচ ফুট দূরে এসে থামল সে। দরজা স্লাইড করে খুলে গেল। কাঁচের ওপর বড় করে লেখা মাত্র একটি শব্দ:

সাসপেনশন

ইথান ভেতরে পা রাখল।

সাঁ করে দরজা বন্ধ হয়ে গেল তার পেছনে।

ভেতরটা অনেক ঠাণ্ডা—হিমাঙ্কের সামান্য ওপরে—আর নিঃশ্বাস ফেলতেই সাদা ধোঁয়া বেরোচ্ছে মুখ থেকে। আলোটা হিমশীতল-নীল, যেন সমুদ্রের বরফ ভেদ করে রোদ এসে পড়ছে। মাথার দশ ফুট ওপরে পাতলা সাদা গ্যাস জমে আছে, এতো ঘন যে ছাদটাই ঢেকে গেছে, যেন মেঘ নেমে এসেছে ঘরের ভেতর। তবু ভেতরটা খুব পরিষ্কার, তুষারঝড়ের পর রাত যেমন হয়—গন্ধহীন, ধুলোহীন, টাটকা, বিশুদ্ধ।

গ্যাস বের হওয়ার হিসহিস আর মৃদু বিপ-বিপ আওয়াজ নীরবতা ভেঙে দিল।

আয়তনে একটা মুদি দোকানের মতো হবে, আর রুম ভর্তি সারি সারি কয়লা রঙা ইউনিট। শত শত। প্রতিটার সাইজ ড্রিঙ্ক মেশিনের মতো, আর ওপর দিয়ে সাদা ধোঁয়া বেরোচ্ছে, যেন একেকটা ছোট চিমনি। ইথান প্রথম সারির একটা মেশিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মাঝ বরাবর দুই ইঞ্চি চওড়া কাঁচের একটা প্যানেল, কিন্তু ভেতরে কিছুই দেখা যায় না। কাঁচের বাম পাশে একটা কীপ্যাড, আর সেটার চারপাশে বেশ কিছু গেজ আর ডিজিটাল রিডআউট, সবগুলোই শূন্যে স্থির।

কাঁচের ডান পাশে একটা ডিজিটাল নেমপ্লেট:

জ্যানেট ক্যাথরিন পালমার

টোপিকা, কেএস

সাসপেনশন তারিখ : ২.৩.৮২

রেসিডেন্ট : ১১ বছর, ৫ মাস, ৯ দিন

ইথান টের পেল দরজাটা আবার স্লাইড করে খুলে যাচ্ছে। পেছনে তাকাল সে, কিন্তু জমে থাকা গ্যাসের ধোঁয়া দৃষ্টি আটকে দিল। সে দ্রুত এগিয়ে গেল, ধোঁয়াশার আর গভীরে। প্রতিটা মেশিনের নেমপ্লেট দেখতে দেখতে এগোচ্ছে সে। আশির দশক ধরে সাসপেনশনের তারিখগুলো এগোচ্ছে। এক জায়গায় গিয়ে একেবারে থমকে দাঁড়াল সে। মনে হলো যেন গ্যাস আর বিপের ফাঁকে মানুষের গলাও শুনতে পেয়েছে।

মাঝখানে কাঁচের শার্সির ভেতর দেখে মনে হচ্ছে মেশিনের ভেতরটা যেন কালো বালুর মতো কিছু দিয়ে ভর্তি। আর সেই বালুর ফাঁক গলে কিছু একটা জিনিসের খুব সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছে। একটা সাদা আঙুল। স্থির। একদম নড়ছে না। কাঁচের গায়ে একটা টানা দাগ, তার নিচে স্থির হয়ে আছে আঙুলের ডগাটা। গেজগুলোতে ফ্ল্যাটলাইন হার্ট মনিটর দেখাচ্ছে। আর টেম্পারেচার রিডিং—২১.১১১১° সেলসিয়াস।

নেমপ্লেটে লেখা :

ব্রায়ান লেইনি রজার্স

মিসুলা, মন্টানা

সাসপেনশন তারিখ: ৫.৫.৮৪

ইন্টিগ্রেশন অ্যাটেম্পটস: ২

পরের মেশিনটা খালি। কিন্তু নামের প্রথম অংশ দেখে ইথানের বুক ধক করে উঠল, ভাবল এটা ওরই নাম কি না।

বেভারলি লিন শর্ট

বোইজি, আইডাহো

সাসপেনশন তারিখ: ১০.৩.৮৫

ইন্টিগ্রেশন অ্যাটেম্পটস: ৩ টার্মিনেটেড

কেউ একজন দ্রুত পায়ে আসছে তার দিকে। ইথান কোনো রকমে বেভারলির ইউনিটের সামনে থেকে নিজেকে সরাল। দৌড়ে ঢুকে পড়ল পরের আইলে। মাথা ঝিমঝিম করছে তার।

এসবের মানে কী?

রুমে এখন অন্তত আধডজন মানুষ ঢুকে পড়েছে। সবাই তাড়া করছে তাকে। কিন্তু ইথান আর কোনোকিছুর পরোয়া করছে না। আর মাত্র একটা জিনিস দেখতে চায় সে।

দেখতেই হবে।

চতুর্থ সারির মাঝামাঝি এসে থমকে দাঁড়াল সে। চারদিক থেকে কণ্ঠস্বর এগিয়ে আসছে। সামনে শূন্য একটা মেশিন। তার নিজের মেশিন।

জন ইথান বার্ক

সিয়াটল, ওয়াশিংটন

সাসপেনশন তারিখ: ২৪.৯.২০১২

ইন্টিগ্রেশন অ্যাটেম্পটস: ৩

টার্মিনেশন ইন প্রোগ্রেস

নিজের নাম দেখেও বিশ্বাস হলো না তার, বরং সবকিছু আরও অবাস্তব লাগল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে, জানে না এখন কী করা উচিত। টুকরো টুকরো তথ্য জোড়া দিয়ে সম্পূর্ণ ছবি তৈরি করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুই মিলছে না।

গত কয়েকদিনের ঝড়ঝাপটার পর এই প্রথমবারের মতো, আর পালাতে ইচ্ছা করছে না তার।

“ইথান!”

এই গলাটা সে চেনে, তবে কণ্ঠের মালিক কে সেটা মনে পড়তে সময় লেগে গেল এক মুহূর্ত। চেহারাটাও মনে পড়ে গেল সাথে সাথে।

“আমাদের কথা বলা দরকার, ইথান!”

হ্যাঁ, দরকার। খুব দরকার।

জেনকিনসের কণ্ঠ এটা, সেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

ইথান হাঁটতে শুরু করল।

গত কয়েকদিন ধরে নাটাইয়ের সুতো শুধু ছাড়া হচ্ছে আর ইথানও এদিক-সেদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে, কিন্তু তার মন বলছে সুতো শেষ সীমায় চলে এসেছে। একেবারে শেষ হয়ে গেলে কী হবে সে জানে না।

“ইথান, প্লিজ!”

সে এখন আর নাম পড়ার গরজ বোধ করছে না। কোন ইউনিট খালি আর কোনটা ভরা সেটাও দেখছে না। শুধুমাত্র একটা জিনিসই ঘুরছে তার মাথায়, একটা ভয়াবহ সন্দেহ দানা বেঁধেছে মনে।

“আমরা তোমাকে আঘাত করতে চাই না! কেউ ওকে ছুঁবে না!”

মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তার। শুধু পা দুটো চলছে যন্ত্রের মতো। রুমের শেষ প্রান্তের শেষ সারির শেষ মেশিনটার দিকে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। লোকগুলো এখন তার পেছনে। ধোঁয়াশার মধ্যেও তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। পালানোর আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু আদৌ কি তার দরকার আছে? শেষ মেশিনটার সামনে পৌঁছাল সে। কাঁচের শার্সিতে হাত রেখে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল নিজেকে।

কালো বালুর মাঝে এক পুরুষের মুখ দেখা যাচ্ছে। মাঝখানের সরু কাঁচের জানালায় ঠেস দিয়ে আছে চেহারাটা। চোখ খোলা। পলক ফেলছে না। কাঁচে এক ফোঁটা নিঃশ্বাসের কুয়াশা নেই। ইথান নেমপ্লেট পড়ল। সাসপেনশন বছর: ২০৩২। ঘুরে দাঁড়াল সে। কুয়াশা ভেদ করে বেরিয়ে এল ড. জেনকিন্স। ছোটখাটো, বৈশিষ্ট্যহীন চেহারার একটা লোক, যার দুই পাশে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। তাদের পূর্ণ রায়ট গিয়ার।

জেনকিন্স বলল, “আমরা তোমাকে আঘাত করতে চাই না। আমাদের বাধ্য করো না, প্লিজ।”

ইথান দ্রুত শেষ আইলের দিকে তাকাল, আরও দুইজন দাঁড়িয়ে আছে কুয়াশার আড়ালে।

কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সে। জিজ্ঞেস করল, “এসব কী?”

জেনকিন্স শান্ত গলায় বলল, “আমি বুঝতে পারছি তোমার মনে অনেক প্রশ্ন আছে।”

“বুঝতে পারছেন আদৌ?” মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এক মুহূর্ত তাকে পর্যবেক্ষণ করল।

“তোমার অবস্থা খুব খারাপ মনে হচ্ছে, ইথান।”

“তো আমাকে কী করেছিলেন… জমিয়ে রেখেছিলেন বরফে?”

“কেমিক্যালি সাসপেন্ডেড রাখা হয়েছিল।”

“তার মানে আবার কী?”

“সহজ করে বললে, আমরা হাইড্রোজেন সালফাইড ব্যবহার করে হাইপোথার্মিয়া ইনডিউস করি। শরীরের কোর টেম্পারেচার যখন অ্যামবিয়েন্ট টেম্পারেচারে নেমে আসে, তখন শরীর ভলকানিক বালুর ভেতর প্যাক করি, আর সালফারের গ্যাস এমন মাত্রায় বাড়িয়ে দিই যেন সেটা সব অ্যারোবিক ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে। তারপর ধ্বংস করি অ্যানারোবিকগুলো। মোট কথা কোষের বার্ধক্য প্রক্রিয়া চালায় এমন সব থামিয়ে দিই। এতে শরীর একটা হাইলি এফিশিয়েন্ট সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশনে ঢুকে যায়।”

“তার মানে আপনি বলছেন কিছুদিনের জন্য আমি আসলে… মরে গিয়েছিলাম?”

“না। বাই ডেফিনিশন, ‘মারা যাওয়া’ মানে এমন অবস্থায় চলে যাওয়া যেখান থেকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। আমরা বরং একে ‘অফ’ করে রাখা বলি, এমনভাবে অফ করি যাতে চাইলে পুনরায় চালুও করা যায়। মানে রিবুট। মনে রেখো, আমি তোমাকে অত্যন্ত জটিল একটা প্রক্রিয়া লেম্যান’স টার্মে বোঝাচ্ছি। এটা নিখুঁত করতে আমাদের দশকের পর দশক লেগেছে।”

জেনকিন্স এমন সাবধানে এগিয়ে এল যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কোনো হিংস্র, উন্মত্ত জন্তু। তার পান্ডারাও এগিয়ে আসছে তার সাথে, ইঞ্চি ইঞ্চি করে। জেনকিন্স তাদের থামিয়ে দিল। একাই চলে এল ইথানের কাছে। তার দুই ফুট দূরে এসে থামল, তারপর ধীরে ধীরে হাত রাখল ইথানের কাঁধে।

“আমি জানি, এসব হঠাৎ হজম করা কঠিন। সেটা আমিও বুঝি। তুমি পাগল নও, ইথান।”

“আমি জানি। সবসময়ই জানতাম। তাহলে এসব কী কারণে? অর্থ কী সবকিছুর?”

“নিজের চোখে দেখতে চাও?”

“আপনার কী মনে হয়?”

“আচ্ছা, ইথান। ঠিক আছে। তবে একটা কথা, বিনিময়ে আমিও তোমার কাছ থেকে কিছু চাইব।”

“কী?”

জেনকিন্স কোনো উত্তর দিল না। শুধু হালকা হাসল, আর কিছু একটা ঠেকাল ইথানের কোমরের পাশে। ইথান একটা ক্লিক শব্দ শুনল, আর যখন বুঝল কী হতে যাচ্ছে, ততক্ষণে আধ সেকেন্ড দেরি হয়ে গেছে। মনে হলো যেন বরফঠাণ্ডা পানিতে ছুড়ে ফেলা হয়েছে, শরীরের সব পেশি শক্ত হয়ে গেল একসাথে, হাঁটু লক হয়ে গেল, আর যেখানটায় স্পর্শ করেছে সেখানে জ্বলন্ত ফার্নেসের মতো তীব্র দহন। মাটিতে পড়ে গেল সে, সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। জেনকিন্স তার পিঠের উপর হাঁটু রেখে মেঝেতে ঠেসে ধরল। ইলেকট্রো-মাসকুলার শকের মধ্যেই গলায় সুঁচের খোঁচা অনুভব করল সে। জেনকিন্স নিশ্চয় সরাসরি শিরায় ফুটিয়েছে, কারণ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টেজারের যন্ত্রণাটা গলে গেল। তারপর সব ব্যথাই গলে গেল। উচ্ছ্বাসের বন্যা ধেয়ে এল, ভাসিয়ে নিল তাকে। ইথান আনন্দের কুয়াশার মধ্যেও ভয়টাকে ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে গেল। কিন্তু মাদকটা ছিল…খুব সুন্দর। আর খুব ভারী। আর তাকে টেনে নিয়ে গেল এক উদাসীন গভীর অন্ধকারে, যেখানে ব্যথা বলে কিছু নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *