পাইনস – ৪

অধ্যায় ৪

তারা সিয়াটল থেকে বেইনব্রিজ আইল্যান্ড ফেরি ধরে উত্তর দিকে রওনা হয়েছে, পোর্ট অ্যাঞ্জেলসের দিকে। চারটে গাড়ির কাফেলায় আছে বার্ক পরিবারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পনেরো জন বন্ধু-বান্ধব।

থেরেসা ভেবেছিল সুন্দর একটা দিন হবে, কিন্তু আকাশ মেঘলা, ঠাণ্ডা ঝিরিঝিরি বৃষ্টিভেজা। দূরে অলিম্পিক পর্বতমালা মেঘের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছে। তারা যে সরু হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছে সেটার বাইরে খুব বেশি কিছুই দেখা যাচ্ছে না আসলে।

কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। আবহাওয়া যেমনই হোক, আজ তারা যাবেই। আর কেউ না এলে, সে আর বেন একাই পাহাড়ে হাইকিং করবে।

গাড়ি চালাচ্ছে তার বন্ধু ডারলা। থেরেসা বসে আছে পিছনের সিটে, তার সাত বছর বয়সী ছেলের হাত ধরে। বৃষ্টি ভেজা জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। ঘন সবুজ রেইনফরেস্টের উল্টোদিকে ছুটে যাওয়া দেখছে।

শহর থেকে কয়েক মাইল পশ্চিমে হাইওয়ে ১১২ ধরে তারা স্ট্রাইপড পিকের ট্রেইলহেডে পৌঁছাল। আকাশ এখনও মেঘে ঢাকা, তবে বৃষ্টি থেমেছে।

নিঃশব্দে যাত্রা শুরু হলো তাদের। সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটছে, শুধু কাদায় পা ফেলার শব্দ আর ঢেউ ভাঙার গর্জন।

ট্রেইল ধরে যেতে যেতে থেরেসা নিচে খাঁড়ির দিকে তাকালো—পানিটা আগের মতো নীল লাগল না। মেঘলা আকাশের দোষ দিল সে, স্মৃতির নয়।

দলটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুরনো বাঙ্কার পেরিয়ে গেল, ফার্নের ঝোপঝাড় পেরিয়ে ঢুকে পড়ল বনের ভেতর।

চারদিকে শ্যাওলা।

গাছগুলো থেকে এখনও টপটপ করে পানি ঝরছে।

শীতের শুরুতেও সবুজের সমারোহ।

চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছালো তারা।

পুরোটা সময় কেউ একটা কথাও বলেনি।

থেরেসা অনুভব করল তার পায়ে জ্বালা করছে, আর চোখে অশ্রু আসন্ন।

তারা যখন চূড়ায় পৌঁছল, তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে—খুব বেশি নয়, স্রেফ হাওয়ায় ভেসে আসা অল্প কয়েক ফোঁটা।

থেরেসা এগিয়ে গিয়ে খোলা প্রান্তরে দাঁড়াল।

এবার সে কাঁদছে।

পরিষ্কার দিনে এখান থেকে মাইলের পর মাইল দেখা যেত, হাজার ফুট নিচের সমুদ্রসহ।

কিন্তু আজ চূড়া কুয়াশায় ঢাকা।

ভেজা ঘাসে গুটিয়ে বসল সে, মাথা ঢুকিয়ে দিল হাঁটুর ফাঁকে, আর কাঁদতে লাগল।

পঞ্চোর হুডে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।

বেন পাশে বসে পড়ল। থেরেসা এক হাত রাখল ছেলের কাঁধে। “ভালো হাইকিং করেছিস, বাবু। এখন কেমন লাগছে তোর?”

“মোটামুটি। এই জায়গাই?”

“হ্যাঁ, এই জায়গাই। কুয়াশা না থাকলে অনেক দূর দেখা যেত।”

“এখন আমরা কী করব?”

চোখ মুছল সে, লম্বা শ্বাস টানল।

“এখন আমি তোর বাবার কথা বলব। হয়তো অন্যরাও কিছু বলবে।”

“আমাকেও কি কিছু বলতে হবে?”

“তুই যদি চাস, জোরাজুরি নেই।”

“আমি চাই না।”

“ঠিক আছে।”

“তারমানে এই না যে আমি বাবাকে ভালোবাসি না।”

“আমি জানি।”

“বাবা কি চাইত আমি তাকে নিয়ে কিছু বলি?”

“বলতে গিয়ে যদি তোর অস্বস্তি লাগে, তাহলে অবশ্যই চাইত না।” থেরেসা চোখ বন্ধ করল, এক মুহূর্ত সময় নিল নিজেকে সামলাতে। হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল কষ্ট করে।

তার বন্ধুরা ফার্নের ঝোপে ঘোরাঘুরি করছে, উষ্ণ থাকার চেষ্টা করছে হাতে ফুঁ দিয়ে।

পাহাড়ের উপর হাওয়ার বেগ বেশ তীব্র, সবুজ ঢেউ বইয়ে দিচ্ছে ফার্নের বনে, আর এতটা ঠাণ্ডা যে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে নিঃশ্বাসে।

সে ডাকল তাদের। সবাই জড়ো হয়ে দাঁড়াল, বৃষ্টি আর হাওয়ার দিকে পিঠ দিয়ে।

থেরেসা বলতে শুরু করল কীভাবে ইথানের সঙ্গে ডেটিং শুরুর কয়েক মাসের মাথায় তারা একসাথে এই পেনিনসুলায় ঘুরতে এসেছিল। পোর্ট অ্যাঞ্জেলসের ছোট্ট একটা রেস্ট হাউজে উঠেছিল দুজন। এক বিকেলে হঠাৎ করেই স্ট্রাইপড পিকের ট্রেইলের সন্ধান পায় তারা। এক শান্ত, পরিষ্কার সন্ধ্যায় শীর্ষে পৌঁছেছিল। থেরেসা যখন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল কানাডার দক্ষিণ অংশের দিকে, ঠিক তখনই হাঁটু গেড়ে বসে প্রপোজ করেছিল ইথান।

সেদিন সকালেই একটা কনভিনিয়েন্স স্টোরের ভেন্ডিং মেশিন থেকে একটা খেলনা আংটি কিনেছিল সে। বলেছিল, ওর আসলে পরিকল্পনা ছিল না, কিন্তু ঘুরতে এসে উপলব্ধি করেছে যে বাকি জীবনটা সে থেরেসার সাথেই কাটাতে চায়। বলেছিল, এর চেয়ে সুখী মুহূর্ত ওর জীবনে আর আসেনি—ওভাবে পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে, সামনে তার প্রিয় মানুষ, আর নিচে ছড়িয়ে আছে পৃথিবী।

“আমারও কোনো প্রস্তুতি ছিল না,” থেরেসা বলল, “কিন্তু আমি হ্যাঁ বলেছিলাম। আমরা চূড়ায় বসে রইলাম, সূর্য ডুবে গেল সমুদ্রে। ইথান আর আমি সবসময় বলতাম একদিন আবার ফিরে আসব, পুরো একটা উইকেন্ড কাটাব এখানে। কিন্তু জানোই তো, জীবন সবসময় পরিকল্পনা মতো চলে না। যাই হোক, আমাদের জীবনে কিছু সুন্দর মুহূর্ত ছিল…” সে ছেলের মাথায় চুমু খেল। “…আর কিছু কম-সুন্দর ছিল। কিন্তু আমি ইথানকে আর কখনো এতটা সুখী, উদ্বেগহীন, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী দেখিনি, যতটা দেখেছিলাম সেই সূর্যাস্তে, এই পাহাড়চূড়ায়, তেরো বছর আগে। ওর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটা তো তোমরা জানোই…” থেরেসা বুকের ভেতর জমে থাকা ঝড়টা ঠেকাল, যা সবসময় ওত পেতে থাকে। “…আমরা ওর লাশ, বা ছাই কিছুই পাইনি। কিন্তু…” অশ্রুভেজা মুখে একটুকরো হাসি ফুটল। “আমি এটা এনেছি।” পকেট হাতড়ে একটা পুরনো প্লাস্টিকের আংটি বের করল সে। সোনালি রঙ বহু আগেই উঠে গেছে, কিন্তু ভঙ্গুর নখরগুলো এখনো আঁকড়ে ধরে আছে কাঁচের সবুজ প্রিজমটাকে। আশেপাশে দাঁড়ানো কয়েকজনের চোখও এবার ভিজে উঠল। “পরে ইথান আমাকে হীরের আংটিও দিয়েছিল। কিন্তু আজকের দিনে এটাই বেশি মানানসই মনে হয়েছে আমার কাছে।” ভেজা ব্যাকপ্যাক থেকে একটা ছোট বাগান খুন্তি বের করল সে। “আমি ইথানের কোনো একটা জিনিস এখানে রেখে যেতে চাই। এটাই ঠিক লাগছে। বেন, তুই আমাকে সাহায্য করবি?”

থেরেসা হাঁটু গেড়ে বসে ফার্ন সরাতেই মাটি বেরিয়ে এলো। বৃষ্টিতে ভিজে মাটি নরম হয়েছিল, সহজেই ঢুকে গেল খুন্তি। নিজে কয়েক মাটির দলা তুলল সে, তারপর বেনকে করতে দিল।

“তোমাকে ভালোবাসি, ইথান,” ফিসফিস করে বলল থেরেসা, “ভীষণ মিস করি তোমাকে।”

তারপর আংটিটা নামিয়ে রাখল ছোট্ট গর্তে। মাটি ঢেকে দিল ওপর থেকে, খুন্তির উল্টোদিক দিয়ে সমান করে দিল জায়গাটা।

***

সেই রাতেই, তাদের কুইন অ্যানের বাড়িতে ফিরে পার্টি দিল থেরেসা। বন্ধু, পরিচিত, সহকর্মী, অনেকেই এলো। ঘর ভরে গেল মানুষ আর মদের বোতলে।

ইথানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুমহল—যারা এখন ভদ্র আর দায়িত্বশীল পেশাজীবী—তারাই একসময় ছিল দারুণ বেপরোয়া। ফেরার পথে ওরা সবাই শপথ করেছিল আজ ইথানের স্মৃতিতে ভেসে যাবে।

তারা কথা রাখল।

আকণ্ঠ মদ খেল।

ইথানকে নিয়ে গল্প বলল।

হাসল, কাঁদল।

***

রাত দশটা ত্রিশ। পেছনের বারান্দায় রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে থেরেসা। সামনেই তাদের ছোট্ট ব্যাকইয়ার্ড। আকাশ খুব পরিষ্কার থাকলে দক্ষিণে সিয়াটলের স্কাইলাইন আর বরফঢাকা মাউন্ট রেনিয়ারের বিশাল সাদা চূড়াও দেখা যায় এখান থেকে। আজ রাতে অবশ্য শহরের ভবনগুলো কুয়াশায় ঢাকা, শুধু নিয়ন আলোর আভা ছাড়া আর কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

রেলিংয়ে ভর দিল সে। এক হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট—কলেজের পর এই প্রথম সিগারেট হাতে নিল। অন্য হাতে রাতের পঞ্চম গ্লাস জিন অ্যান্ড টনিক। বহুদিন পর এতটা খেল, জানে ভোরে এর মাশুল দিতে হবে। কিন্তু আপাতত সে এই সুন্দর অসাড়তায় ডুবে আছে, যা তাকে রক্ষা করছে বাস্তবতার ধারালো আঘাত থেকে—অমীমাংসিত প্রশ্ন আর অন্তহীন ভয় থেকে। যে ভয় তাকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়।

সে ডারলাকে বলল, “যদি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের টাকা না পাই?”

“কেন পাবি না?”

“ওর মৃত্যুর কোনো প্রমাণ তো নেই।”

“অ্যাবসার্ড কথা বলিস না।”

“আমাকে এই বাড়িটা বিক্রি করে দিতে হবে রে। আমার প্যারা-লিগ্যালের বেতনে মর্টগেজ চালানো সম্ভব না।”

থেরেসা টের পেল ডারলার হাত তার বাহু জড়িয়ে ধরেছে। “এখন এসব ভাবিস না। শুধু মনে রাখিস, তোকে ভালোবাসে এমন অনেক বন্ধু আছে, যারা তোর বা বেনের কোনো ক্ষতি হতে দেবে না।”

থেরেসা ফাঁকা গ্লাসটা রেলিংয়ে নামিয়ে রাখল।

“মানুষ হিসেবে ও নিখুঁত ছিল না।”

“জানি।”

“দোষে গুণে ভরা সাধারণ একজন মানুষ। ও যখন কোনো ভুল করত…এড়িয়ে যেত না, বরং দায়িত্ব নিতে জানত। ওকে ভালোবাসতাম আমি। সবসময় বাসব। এমনকি প্রথম যেদিন জানলাম, সেদিনই বুঝেছিলাম আমি ওকে ক্ষমা করে দেব। ও যদি আবার করত, তবুও আমি ওকে ছেড়ে যেতাম না। কারণ আমি ওরই ছিলাম। তুই কি বুঝতে পারছিস আমি কী বলছি?”

“মানে, ও চলে যাওয়ার আগে তোরা পুরোপুরি মিটমাট করে নিয়েছিলি?”

“হ্যাঁ। মানে, অনুভূতিটা তখনও খুব দগদগে ছিল। ও যা করেছিল…”

“জানি।”

“কিন্তু আমরা সম্পর্কের সবচেয়ে খারাপ সময়টা পার করে এসেছিলাম। কাউন্সেলিংয়ে যাচ্ছিলাম আমরা। আমাদের বিয়েটা টিকে যেত। আর এখন…আমি একজন সিঙ্গেল মাদার, ডারলা।”

“চল, তোকে বিছানায় শুইয়ে দিই। আজ খুব লম্বা একটা দিন গেছে। আজ রাতে আর কিছু গোছগাছ করার চেষ্টা করিস না। আমি কাল সকালে আসব, একসাথে করব দুজন।”

“প্রায় পনেরোটা মাস হয়ে গেল, কিন্তু এখনো প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে বিশ্বাস হয় না যে এসব সত্যি। আমি এখনো অপেক্ষা করি মোবাইলটা বাজবে বলে। ওর মেসেজ আসবে বলে। বেন আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করে, বাবা কবে ফিরবে। উত্তরটা ও নিজেও জানে, তারপরও জিজ্ঞেস করে, ঠিক যে কারণে আমি বারবার ফোনটা চেক করি।”

“কেন রে?”

“কারণ প্রতিবার আশায় থাকি এবার হয়তো দেখব ইথানের মিসকল উঠে আছে। কারণ বেন যখন জিজ্ঞেস করে, একবার হয়তো আমি ভিন্ন উত্তর দেব। হয়তো বলব, আগামী সপ্তাহে বাবা ফিরে আসছে অফিস ট্রিপ থেকে।”

থেরেসার নাম ধরে ডাকল কেউ।

সে ধীরে ধীরে ঘুরল, জিনের প্রভাবে টালমাটাল শরীর সামলে। থেরেসা যে ল-ফার্মে কাজ করে, সেখানকার একজন তরুণ সহযোগী, পার্কার, দাঁড়িয়ে আছে স্লাইডিং দরজার ফ্রেমে।

“একজন তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, থেরেসা।”

“কে?”

“হাসলার নামে এক লোক।”

থেরেসার পেটে হঠাৎ শিরশির করে উঠল।

ডারলা ফিসফিসিয়ে বলল, “সে কে?”

“ইথানের বস। শিট, আমি মাতাল।”

“আমি গিয়ে বলতে পারি যে তুই—”

“না, আমি লোকটার সঙ্গে কথা বলতে চাই।”

থেরেসা পার্কারের পিছু পিছু ঘরে ঢুকল।

সবাই একদম আউট হয়ে গেছে। পার্টি চালানোর মতো শক্তি আর কারো গায়ে নেই।

জেন, তার জুনিয়র ইয়ারের কলেজ রুমমেট, অচেতন হয়ে পড়ে আছে সোফায়। আরও কয়েকজন বান্ধবী রান্নাঘরে জড়ো হয়েছে, সবাই ভয়াবহ মাত্রায় মাতাল। কারও একজনের আইফোন স্পিকারে দিয়ে ক্যাব ডাকতে গিয়ে হেসেই খুন হচ্ছে সবাই।

তার বোন মার্জি, যে কখনো মদ ছোঁয় না এবং সম্ভবত ঘরের একমাত্র নেশামুক্ত, সজাগ প্রাপ্তবয়স্ক, ওর হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, “বেন উপরের তলায় নিজের ঘরে শান্তভাবে ঘুমোচ্ছে।”

সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে হাসলার। পরনে কালো স্যুট, কালো টাই ঢিল দেয়া, চোখের নিচে ক্লান্তির দাগ। দেখে মনে হচ্ছে সরাসরি অফিস থেকেই এসেছে।

“হাই, অ্যাডাম,” থেরেসা বলল।

দ্রুত হালকা আলিঙ্গন, গালে চুমু বিনিময় হলো তাদের।

“আগে আসতে পারিনি বলে দুঃখিত,” হাসলার বলল। “আজকের দিনটা… খুব কঠিন গেছে। কিন্তু এক মিনিটের জন্য হলেও আসতে চেয়েছিলাম।”

“এসেছ সেজন্য অনেক ধন্যবাদ। কোনো ড্রিংকস দেব?”

“বিয়ার হলে ভালো হয়।”

থেরেসা টলতে টলতে ফ্যাট টায়ারের আধাখালি কেগ থেকে প্লাস্টিকের একটা কাপ ভরে নিল।

সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে বসল দুজনে।

“ক্ষমা চাচ্ছি,” সে বলল। “আমি একটু মাতাল। আমরা ইথানকে সেই পুরনো দিনের মতো বিদায় দিতে চেয়েছিলাম।”

হাসলার বিয়ারে চুমুক দিল। বয়সে ইথানের থেকে এক-দুই বছরের বড় হবে। গায়ে হালকা ওল্ড স্পাইসের গন্ধ, মাথায় আগের মতোই ক্রু কাট চুল। সেই বহু বছর আগে ক্রিসমাস পার্টিতে থেরেসা প্রথম যেদিন হাসলারকে দেখেছিল, তখন থেকেই তার এমন চুল দেখছে সে। চোয়ালে একদিনের দাড়ির ছাপ। কোমরের পাশে আগ্নেয়াস্ত্রের উঁচু অংশও থেরেসার নজর এড়াল না।

“ইথানের লাইফ ইন্স্যুরেন্স নিয়ে এখনো সমস্যা হচ্ছে?”

“হ্যাঁ। ওরা টালবাহানা করেই যাচ্ছে। হয়তো মামলা করতে হবে।”

“তুমি চাইলে আমি আগামী সপ্তাহের প্রথম ওয়ার্কিং ডে-তেই ওদের কল দিয়ে চাপ দিতে পারি।”

“ভীষণ উপকার হবে, অ্যাডাম।”

থেরেসা খেয়াল করল সে ধীরে ধীরে খুব সাবধানে কথা বলছে যেন কথা জড়িয়ে না যায়।

“তুমি আমাকে অ্যাডজাস্টারের নাম্বারটা পাঠিয়ে দেবে?”

“হ্যাঁ।”

হাসলার ধীরস্বরে বলল, “জানো, থেরেসা, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার মাথায় প্রথমেই এই জিনিসটা আসে—কী হয়েছিল ইথানের। আমি খুঁজে বের করবই।”

“তোমার কি মনে হয় ও মরে গেছে?”

মাতাল না হলে এই প্রশ্ন সে জীবনেও করত না।

হাসলার চুপ করে গেল কিছুক্ষণের জন্য, তাকিয়ে রইল হলুদাভ-কমলা তরলের দিকে। অবশেষে বলল, “ইথান… দারুণ এজেন্ট ছিল। হয়তো আমার টিমের মধ্যে সেরা। আমি শুধু কথার কথা বলছি না।”

“এবং আমরা এতোদিনে অবশ্যই ওর খোঁজ পেতাম, যদি ও…”

“ঠিক তাই। দুঃখিত।”

“না, মানে…” হাসলার রুমাল এগিয়ে দিল। থেরেসা কেঁদে নিল কিছুক্ষণ, তারপর চোখ মুছল। “না জানা…ভীষণ কঠিন। আগে প্রার্থনা করতাম ও যেন বেঁচে থাকে। এখন শুধু একটা দেহ চাই—যা আমাকে উত্তর দেবে, মুক্তি দেবে। অ্যাডাম, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

“অবশ্যই।”

“তোমার কী মনে হয়, আসলে কী হয়েছিল?”

“এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য এই সময়টা হয়তো…”

“প্লিজ।”

হাসলার কাপের বিয়ার শেষ করল। কেগের কাছে গিয়ে রিফিল করে ফিরে এল আবার।

“আমরা যা জানি, সেখান থেকে শুরু করি, ঠিক আছে? ইথান গত বছরের চব্বিশে সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে আটটার ফ্লাইটে সিয়াটল থেকে বোইজি নামে। সেখান থেকে ডাউনটাউনের ইউ.এস. ব্যাংক বিল্ডিং-এর ফিল্ড অফিসে এজেন্ট স্টলিংস আর তার টিমের সঙ্গে দেখা করে। আড়াই ঘণ্টা মিটিং করে ওরা। এরপর সোয়া এগারোটা নাগাদ ইথান আর স্টলিংস বোইজি ছাড়ে।”

“আর ওরা যাচ্ছিল ওয়েওয়ার্ড পাইনসে…ওদের মিশন ছিল…”

“টুকটাক বেশ কিছু কাজ ছিল, তবে মূল লক্ষ্য ছিল এজেন্ট বিল ইভান্স আর কেট হিউসনের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে খোঁজখবর করা।”

স্রেফ কেটের নামটা শুনেই থেরেসার মনে হল তার পাঁজরে কেউ ছুরি মারছে। হঠাৎ আরও এক পেগ খাওয়ার ইচ্ছে হল তার।

হাসলার বলেই চলেছে, “তোমার সাথে ইথানের শেষবার কথা হয়েছিল দুপুর একটা কুড়ি মিনিটে। ওরা তখন লোম্যান, আইডাহোতে ছিল। ফুয়েল নিতে থেমেছিল ওখানে।”

“পাহাড়ি এলাকা বলে ফোনের সিগনাল খারাপ ছিল।”

“তখন ওরা ওয়েওয়ার্ড পাইনস থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে।”

“ওর শেষ কথাটা ছিল, ‘রাতে হোটেল থেকে ফোন করব, সুইটহার্ট।’ আমি গুডবাই বলতে চেয়েছিলাম, বলতে চেয়েছিলাম যে ভালোবাসি, কিন্তু লাইনটা কেটে গিয়েছিল।”

“এরপর আর তোমার স্বামীর সঙ্গে কারো যোগাযোগ হয়নি। অন্তত যারা বেঁচে আছে তাদের সাথে। বাকিটা তো তুমি জানোই।”

সে আসলেই জানে। আর সত্যি বলতে, আবারও সেই একই ঘটনা শুনতেও চায় না সে।

দুপুর ৩:০৭ মিনিটে, ওয়েওয়ার্ড পাইনস-এর এক মোড়ে ওদের গাড়িটা এক ম্যাক ট্রাকের সামনে চলে আসে। এজেন্ট স্টলিংস ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আর সংঘর্ষের তীব্রতা ও ফ্রন্ট প্যাসেঞ্জার সাইডের ভয়াবহ ক্ষতির কারণে গাড়িটা অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ইথানের লাশ বের করার জন্য। কিন্তু দরজা আর ছাদের বেশ খানিকটা কাটার পর দেখা গেল ভেতরে সিটটা খালি। ইথানের কোনো হদিস নেই।

হাসলার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “আমার এখানে আসার আরেকটা কারণ আছে, থেরেসা। তুমি জানো, এজেন্ট স্টলিংসের লিংকন টাউন কারের ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশনে আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম না।”

“হ্যাঁ।”

“তাই আমি এফবিআই-এর সায়েন্টিফিক অ্যানালিসিস টিম—কোডিস—এর সাহায্য নিয়েছিলাম। ওরা দারুণ কাজ করে, সেরা কাজ। পুরো এক সপ্তাহ ধরে গাড়িটা পরীক্ষা করে শেষ করেছে ওরা।”

“তারপর?”

“তুমি চাইলে আমি আগামীকাল রিপোর্টটা ই-মেইল করে দিতে পারি। তবে সংক্ষেপে বলি—ওরা কিছুই পায়নি।”

“মানে?”

“মানে একেবারেই কিছু না। কোনো ধরনের চামড়ার কোষ, রক্ত বিন্দু, ঘামের সামান্যতম দাগও নেই। এমনকি ওরা যেটাকে ডিগ্রেডেড ডিএনএ বলে, সেটা পর্যন্ত নেই। অথচ ইথান যদি বোইজি থেকে ওয়েওয়ার্ড পাইনসে যাওয়ার পথে তিন ঘণ্টা ওই গাড়িতে বসে থাকত, তাহলে অন্তত ওর কোনো ধরনের মলিকুলার ট্রেস হলেও মিলত।”

থেরেসা হতবাক। “এটা সম্ভব কীভাবে?”

“আমি এখনও জানি না।”

সে রেলিং ধরে উঠে দাঁড়াল। কোনো রকমে এগিয়ে গেল রান্নাঘরের শুকনো সিঙ্কের দিকে। ওটাকেই অস্থায়ী বার বানানো হয়েছে আজ রাতের জন্য। জিন অ্যান্ড টনিক মেশানোর ঝামেলায় গেল না আর। বরফ তুলে গ্লাসে ভরল, তার উপর ঢাললো প্রিমিয়াম ভদকা।

লম্বা একটা চুমুক দিয়ে ফিরে এল সিঁড়ির ধাপে।

“আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে এসব হজম করব, অ্যাডাম,” সে বলল। আর পরের চুমুক দিয়েই টের পেল এই ড্রিংকেই তার সীমা ছাড়িয়ে যাবে।

“আমিও না,” হাসলার বলল। “তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে, আমার কী মনে হয়, আসলে কী হয়েছিল?”

“হ্যাঁ?”

“আমার কাছে এর কোনো উত্তর নেই। অন্তত এখনো নেই। তবে শুধু তোমাকে বলছি, আমরা আবারও এজেন্ট স্টলিংসের ব্যাকগ্রাউন্ড খুব ভালো করে খতিয়ে দেখছি। আমার আগে যারা অ্যাকসিডেন্ট সিনে এসেছিল, তাদের সবাইকে কড়া নজরে রেখেছি আমরা। কিন্তু এখনো কিছু পাওয়া যায়নি। আর বুঝতেই পারছ এসব ঘটনা এক বছরেরও বেশি আগের।”

থেরেসার ঠোঁট থেকে চাপা স্বরে বেরিয়ে এল, “কিছু একটা ঠিক নেই।”

হাসলার তার দিকে তাকিয়ে রইলো, তার পোড় খাওয়া চোখ দুটোয় অস্থিরতা। “সে আর বলতে,” অবশেষে বলল সে।

***

থেরেসা তাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। ভেজা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দেখল টেইল লাইট ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের ওপাশে।

রাস্তাজুড়ে প্রতিবেশীদের সবার ঘরে ক্রিসমাস ট্রির আলো জ্বলছে। কিন্তু তার আর বেনের ঘরে এখনো একটা গাছও ওঠেনি। আর এই বছর সম্ভবত উঠবেও না। কারণ তার অর্থ হবে এই ভয়াবহ সত্যিটা মেনে নেওয়া যে ইথান আর কোনোদিন ফিরছে না।

পরে, সবাই ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরে গেলে, থেরেসা নিচতলার সোফায় শুয়ে রইল। পার্টির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে চারপাশে, আর সে লড়ছে মাথা ঘোরা আর বমিভাবের সাথে।

ঘুম আসছে না। এমনকি অচেতন হয়ে তলিয়েও যেতে পারছে না।

চোখের পাতা তুললেই দৃষ্টি চলে যাচ্ছে দেয়াল ঘড়িটার দিকে। মিনিটের কাঁটাটা ধীরগতিতে দুইটা থেকে এগিয়ে যাচ্ছে তিনটার দিকে।

রাত দুইটা পয়তাল্লিশে, যখন মনে হল মাথা ঘোরা আর বমিভাব এক সেকেন্ডের জন্যেও সহ্য করা সম্ভব না, সে গড়িয়ে নামল সোফা থেকে। নিজের পায়ে খাড়া হলো কোনো মতে। টলতে টলতে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল।

ক্যাবিনেট থেকে অবশিষ্ট অল্প কয়েকটা পরিষ্কার গ্লাস থেকে একটা নামিয়ে কলের নিচে ধরলো। পরপর তিন গ্লাস পানি খেয়ে তৃষ্ণা মিটল অবশেষে।

রান্নাঘরের অবস্থা ভয়াবহ।

সে ট্র্যাক লাইটিং কমিয়ে দিয়ে ডিশওয়াশার ভর্তি করতে শুরু করল। ভেতরটা ধীরে ধীরে পূর্ণ হতে দেখার মধ্যে কেমন অদ্ভুত একটা সন্তুষ্টি আছে। ধোয়ার সাইকেল চালু করে দিল সে। এরপর প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে নিয়ে বাড়িময় ঘুরে ঘুরে কুড়াতে শুরু করল খালি বিয়ারের কাপ, কাগজের প্লেট, আর ছেঁড়া ন্যাপকিন।

রাত চারটে নাগাদ বাড়িটা অনেকটাই গোছালো হয়ে গেল। নেশাভাবটাও কেটে গেছে অনেকখানি, তবে চোখের পেছনে দপদপ শুরু হয়ে গেছে—আসন্ন মাথাব্যথার প্রথম ইঙ্গিত।

তিনটে অ্যাডভিল খেয়ে রান্নাঘরের সিঙ্কের সামনে দাঁড়াল সে। একটু পরেই ভোর হয়ে যাবে। বাইরের ডেকে বৃষ্টির টুপটাপ আওয়াজ ছাড়া চরাচরে যেন আর কোনো শব্দ নেই।

গরম পানি চালু করে সিঙ্ক ভরতে দিল সে। ডিশ সোপের বোতল চেপে ঢেলে দিল বেশ খানিকটা। ফেনায় ভরে উঠতে লাগল সিঙ্ক।

হাত ডুবিয়ে রাখল জলে। যতক্ষণ না উত্তাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে। সেদিন রাতেও ঠিক এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিল সে, যেদিন ইথান অফিস থেকে দেরি করে ফিরেছিল।

সামনের দরজা খোলার শব্দ পায়নি সে। ওর পায়ের আওয়াজও শোনেনি।

একটা ফ্রাইং প্যান ঘষছিল সে, হঠাৎ পেছন থেকে তার কোমর জড়িয়ে ধরেছিল ইথানের হাত। ঘাড়ের পেছনে তার নিঃশ্বাস।

“সরি, টি।”

থেরেসা ঘষতে ঘষতে বলেছিল, “ইথান, সাতটা, আটটা—এগুলোকে দেরি বলে। এখন বাজে সাড়ে দশটা। আমি জানি না এটাকে কী বলে?”

ইথান জিজ্ঞেস করেছিল, “আমাদের ছোট্ট মানুষটা কেমন আছে?”

“ড্রয়িংরুমে ঘুমিয়ে পড়েছে। তোমাকে দেখানোর জন্য ট্রফিটা হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছিল বেচারা।”

থেরেসার নিজের উপরেই মেজাজ খারাপ হলো, ইথান তাকে স্পর্শ করলেই আর রাগ ধরে রাখতে পারে না। প্রথম যেদিন তাদের টাইনি-বিগস বারে দেখা হয়েছিল সেদিন থেকেই ইথানের প্রতি এক অন্ধ আকর্ষণ অনুভব করে সে। এবং ইথানও তার অন্ধ আকর্ষণের অন্যায় সুবিধা নেয়।

ইথান কানে ফিসফিস করে বলেছিল, “কাল ভোরে বোইজি যাওয়ার ফ্লাইট ধরতে হবে।”

“শনিবার ওর জন্মদিন। ওর জীবনে ষষ্ঠতম জন্মদিন একবারই আসবে।”

“জানি আমি। আমার নিজেরও যেতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু যেতেই হবে।”

“তুমি জানো, তুমি না থাকলে ওর ওপর কী প্রভাব পড়বে? কতবার আমাকে জিজ্ঞেস করবে কেন তুমি—”

“থেরেসা, আমি বুঝি, ঠিক আছে? তোমার ধারণা এই কষ্ট তোমার চেয়ে আমার কম?”

সে কোমর থেকে তার হাত সরিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে বলল, “এই নতুন অ্যাসাইনমেন্টের সাথে তার কোনো সম্পর্ক আছে?”

“এই মুহূর্তে আমার পক্ষে এসব করা সম্ভব না, থেরেসা। পাঁচ ঘণ্টা পর ফ্লাইট ধরতে হবে, এখনো ব্যাগও গুছাইনি।”

ইথান রান্নাঘরের অর্ধেকটা পেরিয়ে চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে ঘুরে দাঁড়াল আবার।

কিছুক্ষণ তারা শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের মাঝখানে ব্রেকফাস্ট টেবিল, তার ওপর ঠাণ্ডা খাবারের থালা—যেটাই হবে এই ছাদের নিচে ইথানের শেষ খাবার।

“তুমি জানো,” ইথান বলল, “ওসব শেষ। আমরা মুভ অন করেছি অনেক আগেই। তারপরও তুমি সবসময় এমন আচরণ কর যেন কিছুই—”

“আমি ক্লান্ত, ইথান।”

“কিসে ক্লান্ত?”

“তোমার কাজ নিয়ে, ইথান। সারাক্ষণ শুধু কাজ, কাজ, আর কাজ… তাহলে আমাদের জন্য কী থাকে? তোমার উচ্ছিষ্ট?”

ইথান জবাব দেয় না, তবে থেরেসা স্পষ্ট দেখতে পায় ইথানের চোয়ালের পেশি কাঁপছে।

এই রাতের বেলাতেও, টানা পনেরো ঘণ্টা কাজের পরেও, কালো স্যুটে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে। থেরেসা তার স্বামীকে এই স্যুটে দেখে কোনোদিন ক্লান্ত হবে না।

তার রাগ গলতে শুরু করেছে। তার মনের একটা অংশ ছুটে যেতে চাইছে ইথানের কাছে। থাকতে চাইছে তার সঙ্গে। ওর ভেতরে যেন এক অদ্ভুত জাদু আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *