পাইনস – ৭

অধ্যায় ৭

“ইথান, শান্ত হও। আমার কথা শুনতে পাচ্ছ তুমি? নড়াচড়া করো না।”

কুয়াশার মধ্যে থেকে আসা কন্ঠ ঠিকই চিনে নিল ইথান, সেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের। চোখ খোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল সে, কিন্তু সামান্য একটুখানি ফাঁক করতে পারল কেবল। জেনকিন্সের চোখে চিকন তারের ফ্রেম চশমা, সোজা তাকিয়ে আছে তার দিকে। ইথান আবার হাত নাড়াতে চাইলো, কিন্তু হয় তার হাত ভেঙে গেছে, নয়তো কোনো কিছুর সাথে বাঁধা।

“তোমার হাত বিছানার রেলিংয়ের সাথে হাতকড়া দিয়ে বাঁধা,” জেনকিন্স বলল। “শেরিফের নির্দেশ। ঘাবড়িও না, কিন্তু তুমি সিভিয়ার ডিসোসিয়েটিভ এপিসোডের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছ।”

ইথান মুখ খুলল, কিন্তু মুখ ও জিহ্বা মরুভূমির মতো শুষ্ক।

“এর মানে কী?” ইথান কোনোমতে জিজ্ঞেস করল।

“মানে তুমি স্মৃতি, চেতনা, এমনকি পরিচয় বিকলতায় ভুগছ। উদ্বেগের ব্যাপার হল যে তোমার এটা ট্রিগার করেছে গাড়ি দুর্ঘটনাটা। আর এসব লক্ষণ দেখা দিয়েছে কারণ তোমার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ চলছে। ওরা তোমাকে সার্জারির জন্য নিয়ে যেতে চায়। তুমি কি বুঝতে পারছ আমার কথা?”

“আমি সম্মত নই,” ইথান বলল।

“এক্সকিউজ মি?”

“আমি সার্জারিতে সম্মত নই। আমাকে বোইজির কোনো হাসপাতালে নিয়ে চলুন।”

“খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় সেটা। তুমি সেখানে পৌঁছানোর আগেই মারা যেতে পারো।”

“আমি এখনই এই শহর ছেড়ে যেতে চাই।”

জেনকিন্স অদৃশ্য হয়ে গেল। ওপর থেকে তীব্র একটা আলো এসে পড়ল তার মুখে। জেনকিন্সের কণ্ঠ শোনা গেল। “নার্স, ওকে শান্ত করো, প্লিজ।”

“এটা?”

“না, ওটা।”

“আমি পাগল নই,” ইথান বলল।

জেনকিন্স তার বাহুতে হালকা চাপড় মারল। “কেউ বলছে না তুমি পাগল। কেবল তোমার চিন্তাভাবনায় গণ্ডগোল লেগে গেছে এবং আমাদের সেটা ঠিক করতে হবে।”

নার্স প্যাম ঝুঁকে ইথানের দৃষ্টিতে চলে এলো। সুন্দর, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। একটা অদ্ভুত কোমলতা আছে তার চেহারায়। হয়তো সেই কোমলতার জন্য, কিংবা নার্স প্যাম তার পরিচিত বলেই ইথান শান্ত হয়ে গেল।

“হায় রে, মিস্টার বার্ক, আপনার অবস্থা তো ভয়াবহ। দেখি, আপনার জন্য আরেকটু আরামের ব্যবস্থা করা যায় কিনা।”

সুঁইটা বিরাট, ইথানের দেখা সবচেয়ে বড়; এর ডগায় ওষুধের একটা বিন্দু রূপার মতো চকচক করছে।

“ওটার ভেতর কী?” ইথান জিজ্ঞেস করল।

“আপনার অস্থির নার্ভগুলোকে স্থির করার জন্য সামান্য একটু ওষুধ।”

“আমি চাই না।”

“স্থির থাকুন।”

ইথানের ডান হাতের নিচের দিকে অ্যান্টিকিউবিটাল ভেইনে টোকা দিল নার্স; ইথান হাত এতো জোরে টান দিল যে হাতকড়ার চাপে আঙুলগুলো অসাড় হয়ে এলো।

“আমি চাই না।”

নার্স প্যাম চোখ তুলে তাকাল, তারপর কাছে ঝুঁকে এলো। একদম কাছে। ইথানের গালে তার গালের স্পর্শ, নাকে তার লিপস্টিকের ঘ্রাণ, তার পান্না সবুজ চোখ দুটোতে অদ্ভুত দৃঢ়তা।

“স্থির থাকো, মিস্টার বার্ক,” সে বলল হাসি দিয়ে, “নয়তো এই উন্মাদ সুঁইটা সোজা তোমার হাড়ে সেঁধিয়ে দেব।”

কথাগুলো তাকে কাঁপিয়ে দিল; ইথান আরও হাত টানাটানি করতে লাগল। হাতকড়ার চেইন ঝনঝন করা ছাড়া আর কোনো লাভ হলো না।

“খবরদার, ছোঁবে না আমাকে,” গর্জন করল সে।

“ওহ, তাহলে তুমি এভাবে খেলতে চাও?” নার্স বলল। “ঠিক আছে।” তার হাসি মলিন হলো না; কিন্তু সুঁই ধরার ভঙ্গি বদলে গেল। এমনভাবে ধরল যেন ওটা ছুরি। ইথান তার মতলব বুঝে ওঠার আগেই সুঁইটা তার গ্লুটিয়াস ম্যাক্সিমাসের পাশে গেঁথে গেল, একেবারে গোড়া অবধি।

নার্স যখন ঘুরে সাইকিয়াট্রিস্টের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, সুঁই গাঁথার জায়গাটা তখনও জ্বালা করে যাচ্ছে।

“ভেইনে দিতে পারলে না?” জেনকিন্স জিজ্ঞেস করল।

দুঃস্বপ্নটা মুছে যাবে? সে কি তার পরিচয়ও হারিয়ে ফেলবে? এমন মানুষ হয়ে উঠবে যার কোনো স্ত্রী আর ছেলের কোনো অস্তিত্বই নেই?

ইথান কষ্টেসৃষ্টে উঠে বসল। মাথা ভার, চোখ ঝাপসা। সম্ভবত শেরিফ পোপের মারধর শরীর এখনো পুরোপুরি সামলাতে পারেনি। হাতের দিকে তাকাল সে। দুই হাত গার্নির দুই পাশের রেলিংয়ের সাথে হ্যান্ডকাফে বাঁধা। টান দিল। চেইন টানটান হয়ে গেল। বেগুনি বর্ণ ধারণ করল হাত। অসহ্য ব্যথা। একটু ঢিলে দিয়ে আবার জোরে টান দিল। কব্জিতে কেটে ঢুকে গেল স্টিলের প্রান্ত। বাম হাতের চামড়া ছিলে রক্ত ঝরতে শুরু করল সাদা চাদরের ওপর। তবে তার পা দুটো মুক্ত।

ডান পা রেলিংয়ের ওপর দিয়ে উঠিয়ে দেয়াল ছোঁয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু শত চেষ্টা করেও তিন ইঞ্চি দূরত্ব রয়েই গেল। অসহায় হয়ে আবার শুয়ে পড়ল গার্নিতে।

প্রথমবারের মতো ইথান স্পষ্ট বুঝল, সে কতখানি গভীর পাঁকে ডুবে আছে। ড্রাগ দেওয়া, হাতকড়ায় বাঁধা, আর পড়ে আছে অচেনা এক অপারেশন রুমের সামনে, যেখানে তার সঙ্গে কী হতে যাচ্ছে তা কেবল ঈশ্বরই জানেন।

এর আগেরবার যখন হাসপাতালে জ্ঞান ফিরেছিল, ড. জেনকিন্সের সঙ্গে কথা হওয়ার পর সত্যিই তার মনে সন্দেহ ঢুকে গিয়েছিল যে হয়তো সত্যিই তার মাথায় কিছু ঘটেছে। হয়তো কোনো স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা মুছে দিয়েছে। কারণ ওয়েওয়ার্ড পাইনসের কিছুই স্বাভাবিক নয়।

কিন্তু গত কয়েক মুহূর্তে নার্স প্যামের সাইকোটিক আচরণ, তার অপারেশনের আপত্তি শুনতে অস্বীকার, সবকিছু মিলিয়ে সে নিশ্চিত হয়েছে যে সমস্যাটা তার নয়, এই শহরের। এই শহরের মানুষগুলোই তাকে ধ্বংস করতে চায়।

ওয়েওয়ার্ড পাইনসে পৌঁছানোর পর থেকে ইতোমধ্যে ভয় পেয়েছে, ঘরে ফেরার আকুতি অনুভব করেছে, অসহায় বোধ করেছে। কিন্তু এবার সে তলিয়ে গেল হতাশার অতল গহ্বরে। তার কেবলই মনে হচ্ছে ওই দুই পাল্লার দরজার ওপারে তার জন্য অপেক্ষা করছে মৃত্যু। থেরেসাকে আর কোনোদিন দেখা হবে না। ছেলেটাকেও না। ভাবতেই তার চোখ ভরে উঠল। জীবনে কোনোদিনই তাদের যথেষ্ট সময় দিতে পারেনি সে—না মানসিকভাবে, না শারীরিকভাবে। এখন আর সুযোগও পাবে না।

এ রকম ভয় আর আফসোস সে জীবনে কেবল একবারই অনুভব করেছিল—গোলানের সেই বস্তিতে, আশিফের নির্যাতনের সময়। লিঙচি।

ভয় এবার পুরোপুরি তাকে গ্রাস করতে শুরু করল। মাথা ভার হয়ে এল, চিন্তাগুলো কুয়াশার মতো ঘোলাটে। সম্ভবত নার্স প্যামের দেওয়া ওষুধ কাজ করতে শুরু করেছে। ইথান মনে মনে প্রার্থনা করল—ঈশ্বর, এখন নয়। অন্তত আরেকটু সময় দাও, নিয়ন্ত্রণে থাকতে দাও।

ঠিক তখনই দশ ফুট পেছনে ক্যাচক্যাচ শব্দে খুলে গেল এলিভেটরের দরজা। তারপর শোনা গেল কারো পায়ের শব্দ, ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। ইথান ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে চাইল কে, কিন্তু তার আগেই গার্নি নড়ে উঠল। পেছন দিকে টেনে নেওয়া হচ্ছে তাকে, এলিভেটরের দিকে।

অবশেষে তাকে টেনে নিয়ে চলা মানুষটাকে দেখতে সক্ষম হলো সে। সুন্দর চেহারা, ধারাল চোয়ালের একটা নারীমুখ। এই মানুষটাকে চেনে সে, কিন্তু তাকে কোথায় দেখেছে সেটা মনে করতে পাঁচ সেকেন্ড লেগে গেল। পাবের সেই বারটেন্ডার।

সে গার্নিটাকে এলিভেটর কেবিনে ঠেলে দিল। পুরোটা ভেতরে সেট করতে কসরত করতে হলো তাকে। তারপর দ্রুত হাতে বাটন চাপল কয়েকবার। তার মুখ ফ্যাকাশে, তীব্র ক্লান্তির ছাপ। পরনের নেভি ব্লু পঞ্চো থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি ঝরছে ফ্লোরে।

“কামঅন, কামঅন,” বিড়বিড় করে বলল সে। আবারও কয়েকবার আঙুল ঠুকল বাটনে।

“আমি তোমাকে চিনি,” ইথান বলল, কিন্তু নামটা মনে পড়ছে না।

“বেভারলি,” সে বলল, নার্ভাস ভঙ্গিতে হেসে। “আমাকে ওই মোটা বকশিশ দেবে বলেছিলে। সেটা কিন্তু আর পাইনি। অবশ্য তোমার নিজেরই অবস্থা ভয়াবহ।” অবশেষে দরজাগুলো বন্ধ হতে শুরু করল, আবারও দীর্ঘ ক্যাচক্যাচে আওয়াজ তুলে।

“আমার সাথে কী হতে যাচ্ছিল?” লিফট নিচে নামতে শুরু করার পর ইথান জিজ্ঞেস করল।

“ওরা তোমার চিন্তাভাবনা, স্মৃতি, সব গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে।”

“কেন?”

বেভারলি পঞ্চো তুলে জিন্সের পিছনের পকেট থেকে একটা হ্যান্ডকাফের চাবি বের করল। তার আঙুল কাঁপছে। তিনবার চেষ্টা করার পর অবশেষে তালায় চাবি ঢোকাতে সক্ষম হলো সে।

“কেন?” ইথান ফের জিজ্ঞেস করল।

“আগে তোমাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাই। তারপর কথা হবে,” সে বলল। ঝট করে হাতকড়া খুলে গেল।

ইথান উঠে বসল, চাবিটা তার হাত থেকে নিয়ে নিজেই অন্য হাতের হাতকড়া খুলতে শুরু করল। লিফটটা শামুকের গতিতে চতুর্থ তলা থেকে তৃতীয় তলায় নেমে এসেছে।

“লিফট যদি থেমে যায় এবং কেউ ওঠার চেষ্টা করে, আমরা লড়ব। বুঝেছ?” বেভারলি বলল।

ইথান মাথা দোলাল।

“যাই হয়ে যাক না কেন, তুমি কোনোভাবেই ওই অপারেটিং রুমে যাবে না।” দ্বিতীয় কড়াটাও খুলে পড়তেই ইথান গার্নি থেকে নেমে দাঁড়াল। পা দুটো বেশ স্থির লাগছে, ওষুধের প্রভাব এখনো দেখা যাচ্ছে না।

“দৌড়াতে পারবে তো?”

“ওরা একটু আগেই ইনজেকশন দিয়েছে। বেশি দূর যেতে পারব না।”

“শিট।”

লিফটের দরজার ওপরের ঘণ্টা বেজে উঠল। তৃতীয় তলা। এখনও নামছে।

“কখন দিয়েছে?” বেভারলি জিজ্ঞেস করল।

“পাঁচ মিনিট আগে। কিন্তু ইনজেকশনটা পেশীতে দিয়েছে, শিরায় দিতে পারেনি।”

“কী ড্রাগ ছিল?”

“জানি না, তবে শুনেছি দশ মিনিটের মধ্যে আমি অচেতন হয়ে যাব। মানে… এখন হয়তো আট-নয় মিনিট বাকি।”

লিফট নিচে নামতে নামতে অবশেষে লবিতে পৌঁছল। বেভারলি বলল, “দরজা খুললেই বাঁ দিকে যাব। পুরো করিডোরটা পেরিয়ে শেষ মাথায় একটা দরজা আছে, ওটা দিয়ে বেরোলেই আমরা রাস্তায়।”

লিফট ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। দীর্ঘ এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো দরজা বোধহয় আর খুলবেই না। ইথান শরীরের ভর পায়ের সামনের অংশে শিফট করল, বাইরে যদি কেউ তাদের অপেক্ষায় থাকে তাদের ধাক্কা দিয়ে ছুটে যেতে প্রস্তুত। অ্যাড্রেনালিনের স্রোত ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ল শরীরে, যেমনটা মিশনে যাওয়ার আগে হেলিকপ্টারের রোটর ঘুরতে শুরু করলে হতো।

দরজা এক ইঞ্চি খুলে থেমে গেল, দশ সেকেন্ড আটকে রইলো সেভাবে, তারপর ধীরে ধীরে ক্যাচক্যাচ করে পুরোটা খুলল।

“অপেক্ষা করো,” বেভারলি ফিসফিস করে বলল। থ্রেশহোল্ড পার হয়ে উঁকি দিল। “পরিষ্কার।”

ইথান তার পেছনে বেরিয়ে এল লম্বা, ফাঁকা এক করিডোরে। চেকার্ড লিনোলিয়াম টাইলস অন্তত দেড়শ ফুট পর্যন্ত চলে গেছে, শুধু শেষ মাথায় কয়েকটা দরজা। সবকিছু ঝকঝকে, নিস্তব্ধ; কড়া ফ্লোরোসেন্ট আলোয় চকচক করছে। দূর থেকে হঠাৎ একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ ওদের থামিয়ে দিল। পায়ের আওয়াজ শোনা গেল, কিন্তু বোঝা গেল না কয়জন আসছে।

“ওরা সিঁড়ি দিয়ে নামছে,” বেভারলি ফিসফিস করল। “চলো।”

সে ঘুরে বিপরীত দিকে দৌড় দিল, ইথান তার পিছু নিল। চেষ্টা করল লিনোলিয়ামের ওপর পায়ের খটখট শব্দ যেন যথাসম্ভব কম রাখা যায়, কিন্তু প্রতি পদক্ষেপের ঝাঁকুনিতে বুকে ব্যথা করছে। সম্ভবত পাঁজরের আঘাতের কোনো উন্নতি হয়নি। তারা একটা ফাঁকা নার্স স্টেশনের কাছে পৌঁছাতেই পেছনে বেশ খানিকটা দূরে ধড়াম শব্দে দরজা খুলে গেল। বেভারলি আরও গতি বাড়াল। সামনেই একটা করিডোরের ইন্টারসেকশন। সেখান থেকে মোড় ঘুরে যাবে। ইথান প্রাণপণে পিছু লেগে থাকল। একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু তার আগেই মোড় ঘুরে যাওয়ার কারণে কিছু দেখতে পেল না।

এই উইংটা পুরোপুরি ফাঁকা এবং লম্বায় আগেরটার অর্ধেক। মাঝামাঝি পৌঁছে বেভারলি বাঁ দিকের একটা দরজা খুলল। ইথানকে ভেতরে ঢোকার জন্য ডাকল, কিন্তু সে মাথা নাড়ল। ঝুঁকে বেভারলির কানে ফিসফিস করে বলল কিছু একটা। বেভারলি মাথা দুলিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। দরজা টেনে বন্ধ করে দিল। আর ইথান ঠিক উল্টোপাশের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হ্যান্ডেল ঘুরাতেই দরজা খুলে গেল। সে চুপিসারে ঢুকে পড়ল ভেতরে।

ঘরটা অন্ধকার, নিঃশব্দ। করিডোর থেকে আসা মৃদু আলোয় দেখা গেল, চতুর্থ তলায় যেখানে তাকে রাখা হয়েছিল, এই ঘরটা প্রায় হুবহু একইরকম। সে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে দরজাটা টেনে বন্ধ করল, তারপর ঢুকল বাথরুমে। অন্ধকারে হাতড়ে সুইচে আঙুল ছোঁয়াল। আলো জ্বলে উঠল। শাওয়ারের পাশে র‍্যাকে একটা হাত মোছার তোয়ালে ঝুলছিল। সেটা টেনে নিয়ে হাতে প্যাঁচালো, তারপর মুখ ঘুরাল আয়নার দিকে। হাত পেছনে টানল।

ত্রিশ সেকেন্ড সময় পাবে, হয়তো তারও কম, নিজেকে বলল মনে মনে। কিন্তু নিজের প্রতিবিম্ব দেখে থমকে গেল।

হে ঈশ্বর! সে জানত, তার অবস্থা খারাপ, কিন্তু এতোটা খারাপ কল্পনাও করতে পারেনি। পোপ তাকে পিটিয়ে একেবারে ছাঁতু বানিয়ে দিয়েছে। ওপরের ঠোঁট ফুলে দ্বিগুণ সাইজ হয়েছে, নাকটা বিশাল আর কালশিটে পড়া—দেখতে পচা স্ট্রবেরির মতো, ডান গালে একটা বিশাল ক্ষত—অন্তত বিশটা সেলাই পড়েছে ওখানে, আর চোখ দুটো তো… সে এখনো দেখতে পাচ্ছে এটাই অলৌকিক ব্যাপার। কালচে বেগুনি হয়ে আছে চোখ দুটো, ফোলা চামড়ার ভাঁজে ডুবে গেছে, যেন ভয়ংকর কোনো অ্যালার্জির রিঅ্যাকশন চলছে।

কিন্তু এখন ওসব দেখে থেমে থাকার সময় নেই। সে মুষ্টিবদ্ধ হাতে আয়নার নিচের ডান কোণে ঘুষি মারল, তারপর তোয়ালে জড়ানো হাতটা চেপে ধরে রাখল ভাঙা কাচের ওপর, যাতে টুকরোগুলো একসাথে না পড়ে যায়। তার ঘুষিটা একদম নিখুঁত হয়েছে, কাচ গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়নি, বরং বড় বড় ফাটল ধরেছে। সে তাড়াতাড়ি অন্য হাত দিয়ে টুকরোগুলো আলগা করে সিঙ্কের ওপর রাখল। সবচেয়ে বড় টুকরোটা বেছে নিল সেখান থেকে। তারপর ডান হাতের তোয়ালেটা খুলে আলো নিভিয়ে দিল, আর অন্ধকারে পথ হাতড়ে ফিরে গেল বেডরুমে।

কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না, শুধু দরজার নিচ দিয়ে আসা সরু আলোক রেখা ছাড়া। সে এগিয়ে গিয়ে কানে চেপে ধরল দরজায়। দূর থেকে ক্ষীণ শব্দ আসছে। কোথাও দরজা খুলছে, বন্ধ হচ্ছে। প্রতিটা ঘর খুঁজছে ওরা, আর শব্দের দিক শুনে মনে হচ্ছে, এখনো ওরা মূল করিডোরেই আছে।

ইথান আশা করল, তার অনুমান ভুল না হয়। সে একবার ভাবল লিফটের দরজা এখনো খোলা কি না। ওরা যদি লিফটের কেবিন এই ফ্লোরে দেখে, তাহলে সহজেই ধরে নেবে সে আর বেভারলি বেসমেন্টে পালিয়েছে। ওদের আসলে লিফটটা চতুর্থ তলায় পাঠিয়ে দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু এখন সেই ভুল শোধরানোর উপায় নেই।

হাত নামিয়ে দরজার নব খুঁজে বের করে চেপে ধরল ইথান। আস্তে ঘুরাল সেটা। চেষ্টা করল যেন শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণে থাকে। হার্টবিট এতো বেড়ে গেছে যে মনে হচ্ছে যেন মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। ল্যাচ ছাড়ার পর দরজাটা হালকা টানল। দরজা দু’ইঞ্চি খুললো, সৌভাগ্যক্রমে কব্জাগুলো কোনো শব্দ করল না। একটা লম্বা ত্রিভুজাকার আলোর রেখা পড়ল লিনোলিয়ামের ওপর, ঠিক তার খালি পায়ের সামনে।

দরজার শব্দগুলো এগিয়ে এসেছে আগের চেয়ে। সে হাতে ধরা আয়নার টুকরোটা ধীরে ধীরে দরজা আর ফ্রেমের মাঝখানে ঢুকিয়ে দিল, মিলিমিটার মিলিমিটার করে ঠেলতে লাগল সামনে, যতক্ষণ না করিডোরের প্রতিবিম্ব চোখে পড়ে। ফাঁকা।

আরেকটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। তারপর আরেকটা। দুই আওয়াজের মাঝখানে শুধু রাবার-সোল জুতোর আওয়াজ। কাছেই একটা ফ্লোরোসেন্ট বাল্ব ঠিকভাবে কাজ করছে না। জ্বলছে, আবার নিভে যাচ্ছে।

প্রথমে দেখা গেল ছায়াটা। নার্স স্টেশনের দিক থেকে লম্বা একটা ছায়া এসে পড়ল সামনের করিডোরে। তারপর এগিয়ে এলো ছায়ার মালিক। নার্স প্যাম, হাঁটছে নির্ভার ভঙ্গিতে। চার করিডোরের সংযোগস্থলে এসে থমকে গেল সে, দাঁড়িয়ে রইলো নিশ্চল। ডান হাতে কিছু একটা ধরা, এই দূরত্ব থেকে বোঝা যাচ্ছে না জিনিসটা কী, তবে ওটার প্রান্তে মাঝে-মধ্যে আলো ঝলসে উঠছে, যেন ধাতব কোনো বস্তু।

ত্রিশ সেকেন্ড কেটে গেল। তারপর সে ঘুরে দাঁড়াল, ধীরে ধীরে এগোতে লাগল ইথানের করিডোরের দিকে। পা ফেলছে সতর্কভাবে, নিয়ন্ত্রিত ছোট ছোট পদক্ষেপে। মুখে এক অস্বাভাবিক প্রশস্ত হাসি, এতটাই প্রশস্ত যে মনে হচ্ছিল মুখের চামড়া ছিঁড়ে যাবে। কয়েক পা এগোনোর পর থামল সে, হাঁটু ভেঙে ঝুঁকে পড়ল মেঝের দিকে, লিনোলিয়ামের মেঝেতে কিছু একটা খুঁটিয়ে দেখছে। ফাঁকা হাতটা মেঝেতে বুলিয়ে নিয়ে আঙুল তুলে ধরল, আর ঠিক তখনই ইথানের বুকের ভেতর উদ্বেগের নতুন ঢেউ ধাক্কা মারল। সে বুঝে ফেলল, প্যাম কী দেখেছে।

বেভারলির রেইনকোটের পানি।

ওই পানির ট্রেইল ধরেই সে সরাসরি গিয়ে হাজির হবে ইথানের রুমের উল্টোদিকের রুমে, যেখানে লুকিয়ে আছে বেভারলি।

নার্স প্যাম ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। মাথা নিচু রেখে হাঁটতে লাগল, দৃষ্টি লিনোলিয়ামের মেঝেতে নিবদ্ধ। এখন ইথান দেখতে পেল, ওর হাতে ধরা বস্তুটা আসলে একটা সূঁচ আর সিরিঞ্জ।

“মিস্টার বার্ক?”

ইথান আশা করেনি নার্স প্যাম কিছু বলবে। তার উচ্ছ্বল, বিষাক্ত কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো ফাঁকা হাসপাতাল করিডোরে। ইথান ভয়ে জমে গেল। “আমি জানি, তুমি কাছেই আছো, আমার কথা শুনতে পাচ্ছো।”

ওর কণ্ঠ যত এগিয়ে আসছে, ইথানের ভয় তত বাড়ছে যে এই বুঝি তার হাতের আয়নার টুকরোটা দেখে ফেলল। ইথান ভেতরে টেনে নিল সেটা, তারপর আগের চেয়েও বেশি সতর্কতার সঙ্গে দরজাটা নিঃশব্দে টেনে বন্ধ করল।

“তুমি যেহেতু আমার সবচেয়ে প্রিয় রোগী,” প্যাম বলল, “তোমার জন্য একটা বিশেষ অফার আছে আমার কাছে।”

ইথান অনুভব করল ঘাড়ের গোড়ায় একটা শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে, ধীরে ধীরে মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যাচ্ছে হাত-পায়ের হাড়ের ভেতর দিয়ে, ছড়িয়ে পড়ছে সব আঙুলের ডগায়। অনুভূতিটা চোখের পেছনেও টের পেল সে। ওষুধটা কাজ শুরু করেছে।

“এবার তাহলে বেরিয়ে এসো ভদ্রলোকের মতো, তাহলেই কেবল উপহার পাবে।”

পায়ের শব্দ থেমে গেছে, কণ্ঠটাও এখন আগের চেয়ে অনেক কাছে।

“উপহারটা কী জানো, মিস্টার বার্ক? তোমার সার্জারির জন্য অ্যানেসথেশিয়া। আশা করি বুঝতে পারছো, আমি দশ মিনিট আগে তোমাকে যে ইনজেকশন দিয়েছি, সেটা এখনো যদি কাজ করা শুরু না করে থাকে, যেকোনো মুহূর্তে করবে। অজ্ঞান হয়ে যাবে তুমি। এখন যদি প্রতিটা রুম খুঁজে খুঁজে তোমাকে বের করতে এক ঘণ্টা লেগে যায়, তাহলে আমি খুব, খুব রেগে যাব। আর নিশ্চয়ই তুমি তা চাও না। কারণ তখন কী হবে জানো? তোমাকে পেলে সঙ্গে সঙ্গে অপারেশন রুমে নিয়ে যাওয়া হবে না। আমরা অপেক্ষা করব যতক্ষণ না তোমার শরীরে থাকা ওষুধের প্রভাব কেটে যায়। তারপর যখন চেতনা ফিরবে, দেখবে তুমি অপারেশন টেবিলে, কোনো হাতকড়া নেই বা বেঁধে রাখার জন্য স্ট্র্যাপ নেই, কিন্তু নড়তে পারছ না। কারণ আমি তোমাকে বিশাল ডোজের স্যাক্সামেথোনিয়াম ইনজেকশন দেব, যেটা একটা শক্তিশালী প্যারালাইটিক ড্রাগ। তোমার কখনো মনে হয়নি অস্ত্রোপচারের সময় আসলে কেমন লাগে? আজ তুমি নিজে উপভোগ করবে মিস্টার বার্ক।”

নার্স প্যামের কণ্ঠ শুনে বোঝা যাচ্ছে করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে, তার ঘরের বাইরে, দরজার ওপাশে চার ফুটেরও কম দূরে। “কেবল চোখের পলক ফেলতে পারবে তখন। এমনকি চিৎকারও করতে পারবে না তুমি। আমরা তোমাকে কাটব, আঙুল দিয়ে ভেতরে ঘাটাঘাটি করব, সেলাই করব। অপারেশন চলবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আর সব অনুভব করবে তুমি—প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা যন্ত্ৰণা।”

ইথান দরজার হাতলে হাত রাখল। মাথা ঝিমঝিম করছে, ড্রাগটা এখন তার মস্তিষ্কের পুরো দখল নিয়ে নিচ্ছে। কান গরম হয়ে যাচ্ছে। জানে না পা লুটিয়ে পড়ার আগে আর কতক্ষণ টিকতে পারবে।

ধীরে, ইথান। খুব, খুব ধীরে।

তার মুঠো শক্ত হলো হাতলে। নার্স প্যাম আবার কিছু বলতে শুরু করা পর্যন্ত অপেক্ষা করল। শুরু করতেই নব ঘোরাতে আরম্ভ করল সে। “আমি জানি তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ, মিস্টার বার্ক। আমি ঠিক তোমার রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। তুমি কি শাওয়ারে লুকিয়েছ? বিছানার নিচে? নাকি ঠিক দরজার পিছনে, আশা করছ আমি অন্ধের মতো হেঁটে চলে যাব?” সে হেসে উঠল। বিশ্রী, গায়ে জ্বালা ধরানো হাসি।

ল্যাচটা খুলে গেল। ইথানের দৃঢ় বিশ্বাস প্যাম ওর দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বেভারলির ঘরের দিকে মুখ করে। কিন্তু যদি তা না হয়?

“তোমার কাছে দশ সেকেন্ড সময় আছে বেরিয়ে আসার জন্য, নয়তো অ্যানেস্থেসিয়ার অফার শেষ।”

“দশ…” ইথান দরজাটা আস্তে খুলল।

“নয়…” তিন ইঞ্চি।

“আট…” ছয় ইঞ্চি।

করিডোর দেখতে পাচ্ছে সে। প্রথমেই চোখে পড়ল নার্স প্যামের লালচে চুল, ছড়িয়ে আছে পিঠের ওপর।

“সাত…” বেভারলির দরজার দিকে মুখ করে আছে।

“ছয়…” সুঁইটা ডান হাতে, ছুরির মতো ধরা।

“পাঁচ…” ইথান দরজাটা আরও একটু খুলল, যেন শব্দ না হয়।

“চার…” তবে ওপাশের দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার আগেই থামাল।

“তিন…” মেঝে দেখে নিল, ছায়া পড়ছে না তো? তবে যদি পড়েও নষ্ট ফ্লোরোসেন্ট বাল্বের দপদপানিতে ঢাকা পড়ে যাবে সেটা।

“দুই… আর এক… এখন আমি রেগে গেছি। খুব, খুব রেগে গেছি।” সে পকেট থেকে কিছু বের করল। ওয়াকি-টকি। বলল, “আমি এখন বেসমেন্টে, পশ্চিম উইংয়ে। মনে হচ্ছে সে এখানেই আছে। তোমরা চলে এসো, ওভার।”

একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো, “কপি দ্যাট, অন আওয়ার ওয়ে।”

ওষুধের প্রভাব মারাত্মকভাবে শুরু হয়ে গেছে, হাঁটু ভেঙে আসছে, চোখে সবকিছু ঘোলাটে আর দুটো দুনিয়া একসাথে দেখা যাচ্ছে। সময় খুব কম। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অন্যরাও চলে আসবে। যা করার এখনই করতে হবে।

নিজেকে মনে মনে বলল—যাও, যাও, যাও। কিন্তু সে নিশ্চিত না তার শরীর বা মনের সেই ক্ষমতা আছে কি না। সে পিছু হটল কয়েক পা, রানওয়েটাকে লম্বা করার জন্য। লম্বা করে নিঃশ্বাস টানল। তারপর ছুট লাগাল।

সাত কদম পার হলো দুই সেকেন্ডে। পুরো শরীরের জোরে ধাক্কা খেল নার্স প্যামের পিঠে। প্যামের মাথা সোজা গিয়ে ঠুকে গেল ওপাশের কংক্রিটের দেয়ালে।

ধাক্কাটা ছিল ভয়ঙ্কর। ইথান ভেবেছিল অপ্রস্তুত অবস্থায় ওকে এমনভাবে আঘাত করবে যেন প্যাম একবারেই কাবু হয়ে যায়। কিন্তু নার্স প্যামের প্রতিক্রিয়া এত দ্রুত আর নিখুঁত হবে, সেটা সে কল্পনাও করেনি। তার ডান হাতটা পেছনে ঘুরে এলো, আর সুঁইটা দিয়ে ছোবল বসাল ইথানের ডান পাশে।

অসহ্য যন্ত্রণায় চোখে অন্ধকার দেখল ইথান। পিছিয়ে গেল সে, পা দুটো টলছে। নার্স ঘুরে দাঁড়াল। চেহারার ডান পাশ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ওপাশটাই কংক্রিট দেয়ালের সাথে ঠুকে গিয়েছিল। কিন্তু তার হাতে সুঁইটা তখনও রয়ে গেছে। সেই হাতটা ওপরে তুলে এবার ছুটে এল তার দিকে।

ইথান প্রতিরোধ করতে পারত যদি চোখে কিছু দেখতে পেত। কিন্তু দৃষ্টি ঝাপসা, সবকিছু যেন টেনে লম্বা হয়ে যাচ্ছে, আলো-ছায়ার নেশার মতো দুলছে চারপাশ। নার্স প্যাম ঝাঁপিয়ে পড়ল। ইথান ঠেকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু দূরত্ব হিসাব করতে গিয়ে ভুল হয়ে গেল তার। সুঁইটা গেঁথে গেল বাঁ কাঁধে। যখন প্যাম সেটা টেনে বের করল, ইথানের পা প্রায় ভেঙে পড়ল ব্যথায়।

এরপর তার তলপেটে এক লাথি, ঠিক সোলার প্লেক্সাসে। ধড়ফড় করে শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল, দম বেরিয়ে গেল বুক থেকে, আর সে সোজা গিয়ে ঠুকে পড়ল পেছনের দেয়ালে। সে জীবনে কখনও কোনো নারীর গায়ে হাত দেয়নি। কিন্তু প্যাম যখন আবার এগিয়ে এলো, মাথার মধ্যে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেলো—এই কুত্তিটার চোয়ালে একবার ঠিকঠাক কনুই বসাতে পারলে কী তৃপ্তিই না লাগবে!

তার চোখ আটকে গেল সুঁইটার দিকে। আর না, ঈশ্বর, আর নয়… সে হাত তুলল মুখ রক্ষার জন্য, কিন্তু হাতগুলো যেন পাথরের মতো ভারী। ধীর গতিতে কাজ করছে।

প্যাম মুচকি হেসে বলল, “এখন নিশ্চয়ই ভাবছো, তখন ভালোয় ভালোয় বেরিয়ে এলেই ভালো হতো, তাই না?”

ইথান আধা-গতিতে এক ঘুষি ছুঁড়ল, সহজেই এড়িয়ে গেল প্যাম। তারপর বিদ্যুতের গতিতে একটা ঘুষি ফিরিয়ে দিল। ইথানের ভাঙা নাকটা আবার ভেঙে গেল।

“আবার সুঁই খেতে চাও?” প্যাম বলল ঠাট্টার ভঙ্গিতে।

ইথান ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল, ভাবল ওকে মাটিতে ফেলে চেপে ধরবে, কিন্তু এখন এত কাছে যাওয়া আত্মহত্যার সমান। ওর হাতে সেই সুঁই, আর নিজের ইন্দ্রিয়গুলো ধোঁয়াটে। প্যাম হেসে উঠল। “দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তুমি জ্ঞান হারাচ্ছ। আমার কিন্তু বেশ মজাই লাগছে!”

ইথান দেয়াল ঘেষে একপাশে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল, পা টেনে টেনে। কিন্তু প্যামও সরে এল, ওর সামনে সামনে রইলো, আবার আঘাত করার প্রস্তুতি নিয়ে। “চলো একটা খেলা খেলি,” বলল সে। “আমি তোমাকে সুঁই দিয়ে গুতো দেব, আর তুমি ঠেকানোর চেষ্টা করবে।”

সে ঝাঁপ দিল, কিন্তু ইথান কোনো ব্যথা পেল না। আসলে গুঁতো দেয়নি এবার, ইথানকে নিয়ে খেলছে প্যাম। “এবার কিন্তু সত্যি সত্যি দেব, মিস্টার বার্ক—”

তার বাক্য শেষ হওয়ার আগেই—ঠাস!

কিছু একটা এসে ধাক্কা খেল তার মাথার পাশে। একটা ধাতব ঠোকাঠুকির শব্দ, আর প্যাম ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। নড়ল না।

বেভারলি দাঁড়িয়ে আছে তার ওপর। হাঁপাচ্ছে, মুখে আতঙ্কের ছাপ। হাতে একটা ধাতব চেয়ার, যেটা দিয়েই সে আঘাত করেছে। চেয়ারের পা দুটো এখনো তার মুঠোয়, চোখ বড় বড়, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না কী করেছে সে।

ইথান কোনোমতে বলল, “আরও লোক আসছে।”

“তুমি হাঁটতে পারবে?”

“দেখা যাক,” ইথান বলল, কণ্ঠে কষ্ট আর ঝিমুনি।

বেভারলি চেয়ারটা ফেলে দিল। চটাং শব্দে লিনোলিয়াম মেঝেতে বাড়ি খেল সেটা। ইথানকে ধরার জন্য বেভারলি এগিয়ে এলো তার দিকে। “পায়ে ব্যালান্স না থাকলে আমায় ধর।”

“ওটা তো অনেকক্ষণ যাবতই নেই।”

ইথান দুই হাত দিয়ে বেভারলির কাঁধে ধরে ঝুলে রইল, আর সে তাকে টেনে নিয়ে চলল করিডোর ধরে। তারা যতক্ষণে নার্স স্টেশনে পৌঁছাল, ইথানের তখন এক পায়ের সামনে আরেক পা ফেলতেও কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। করিডোরের কর্নার ঘোরার আগে ইথান এক ঝলক পেছনে তাকাল, নার্স প্যাম ইতিমধ্যেই উঠে বসার চেষ্টা করছে।

“আরও তাড়াতাড়ি,” বেভারলি বলল।

মূল করিডোরটা এখনো ফাঁকা। ওরা এবার হালকা দৌড় শুরু করল। দু’বার হোঁচট খেল ইথান, কিন্তু প্রতিবারই বেভারলি ধরে ফেলল, দাঁড়া করিয়ে দিল নিজের পায়ে। তার চোখ ভারী হয়ে আসছে, অচেতনতার অনুভূতিটা উষ্ণ ভেজা কম্বলের মতো জড়িয়ে ফেলেছে তাকে। তার এখন একটাই ইচ্ছে—কোনো শান্ত কোণ খুঁজে শুয়ে পড়া, একটু ঘুমিয়ে নেওয়া।

“এখনো আছো আমার সাথে?” বেভারলি জিজ্ঞেস করল।

“কোনো মতে ঝুলে আছি,” ইথান বিড়বিড় করল।

করিডোর শেষের দরজাটা এখনো পঞ্চাশ ফুট দূরে। বেভারলি গতি আরেকটু বাড়াল। “চলো, চলো,” বলল সে। “ওদের সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দ পাচ্ছি।” ইথানও সিঁড়িঘর থেকে আসা শব্দ শুনতে পেল। একদল মানুষের পায়ের আওয়াজ, ফিসফাস, একটার পর একটা দরজার শব্দ, পাশ কাটানো।

শেষ প্রান্তে পৌঁছে বেভারলি হ্যাচকা টানে দরজা খুলে ফেলল, নিজে পার হয়ে ইথানকেও টেনে নিল সাথে। দরজার ওপাশে একটা সরু সিঁড়িঘর, যেখানে ছয়টা ধাপ উঠে গেছে ওপরে। সেখানে একটা দরজা, যার ওপরে জ্বলজ্বল করছে লাল আলোর ‘এক্সিট’ সাইন।

ওরা ভেতরে ঢোকার পর বেভারলি আস্তে করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। অন্য পাশে এখন মানুষের গলা, করিডোর ভরে গেছে আওয়াজে। মনে হচ্ছে যেন পায়ের শব্দগুলো দূরে সরে যাচ্ছে, কিন্তু নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

“ওরা আমাদের দেখেছে?” ইথান ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

“জানি না,” বেভারলি বলল, নিঃশ্বাস চেপে।

সেই শেষ ছয়টা ধাপ ওঠা যেন পাহাড় টপকানোর সমান কষ্ট মনে হচ্ছিল ইথানের। অবশেষে তারা দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো, অন্ধকারে। বাইরে পা রেখেই পায়ের তলায় ভেজা লাগল ইথানের। ঠাণ্ডা বৃষ্টির ফোঁটা ইতোমধ্যে তার পাতলা গাউন ভেদ করে শরীর ভিজিয়ে দিতে শুরু করেছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না সে, তবুও বেভারলি তাকে টেনে নিয়ে চলল ফুটপাথের দিকে।

“আমরা কোথায় যাচ্ছি?” ইথান জিজ্ঞেস করল জড়ানো কণ্ঠে।

“একটাই মাত্র জায়গা আছে,” বেভারলি বলল। “যেখানে ওরা তোমাকে খুঁজে পাবে না।”

ইথান তার পিছু পিছু চলল, অন্ধকার ফুটপাত ধরে। কোনো গাড়ি নেই, কেবল ছিটেফোঁটা স্ট্রিটলাইট আর কিছু বাড়ির আলো। বৃষ্টির পর্দায় সবকিছু ঝাপসা, ম্লান। রাস্তা একদম নির্জন। দুই ব্লক যাওয়ার পর ইথান থেমে গেল, বসে পড়তে চাইল ঘাসের ওপর, কিন্তু বেভারলি তাকে থামতে দিল না।

“এখন না,” সে বলল কঠিন স্বরে।

“আর পারছি না,” ইথান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। “পা দুটো টের পাচ্ছি না।”

“আর একটা ব্লক, ঠিক আছে? তুমি পারবে। বাঁচতে চাইলে এখনই থামা যাবে না। পাঁচ মিনিট পরেই শুয়ে বিশ্রাম নিতে পারবে, আমি কথা দিচ্ছি।”

ইথান সোজা হলো। বেভারলির পিছু পিছু এগিয়ে চলল কাঁপা কাঁপা পায়ে, আরও এক ব্লক। এর পরেই ঘরবাড়ি, স্ট্রিটলাইট, সব শেষ। ওরা ঢুকে পড়ল একটা পুরনো কবরস্থানে। ভাঙাচোরা সমাধিফলক ছড়ানো, মাঝেমধ্যে কিছু পাইন আর ওক গাছ। দেখে মনে হচ্ছে বহু বছর ধরে কেউ এখানে পা রাখেনি। ঘাস আর আগাছা ইথানের কোমর পর্যন্ত উঠে এসেছে, যেন জীবিতদের ভুলে যাওয়া এক নিস্তব্ধ জগৎ।

“তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?” ইথানের গলা ভারী, শব্দগুলো মুখ থেকে কেমন বেখাপ্পা, জড়িয়ে জড়িয়ে বেরোচ্ছে।

“সোজা সামনে।”

ওরা কবর আর স্মৃতিস্তম্ভের ফাঁক গলে হাঁটছে, যেগুলোর বেশিরভাগই এতটা ক্ষয়ে গেছে যে ইথান নামগুলো পড়তেই পারছে না। ইথানের গাউন সম্পূর্ণ ভিজে গেছে, হাড়ে হাড়ে ঠাণ্ডা ঢুকছে, কাদা লেগে আছে পায়ে।

“ওই যে ওখানে।” বেভারলি আঙুল তুলল। দূরে, অ্যাস্পেন গাছের ঝাড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট পাথরের সমাধিগৃহ। শেষ বিশ ফুট পার হতে ইথানের প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছিল, অবশেষে ঢোকার মুখে দু’পাশে ভাঙাচোরা পাথরের টবের মাঝখানে লুটিয়ে পড়ল সে। লোহা দরজাটা খুলতে বেভারলিকে কাঁধ দিয়ে তিনবার ধাক্কা দিতে হলো। কব্জাগুলো এমন চিৎকার জুড়ে দিল যে মনে হল মৃতেরাও জেগে উঠবে।

“ভেতরে ঢোকো,” সে বলল। “চলো, প্রায় পৌঁছে গেছ। আর মাত্র চার ফুট।”

ইথান চোখ খুলল, হামাগুড়ি দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ভেতরে ঢুকল সরু দরজাটা পেরিয়ে। ভেতরে বৃষ্টি নেই, ঠাণ্ডাও কম। বেভারলি দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল, আর সঙ্গে সঙ্গে সমাধির ভেতর নেমে এলো পূর্ণ অন্ধকার। একটা ক্লিক, আর তারপর টর্চের আলো ছুটে গেল অন্ধকার চিড়ে, গিয়ে থামল পিছনের দেয়ালের ছবি আঁকা রঙিন কাঁচের জানালায়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মেঘ ফুঁড়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে একটা নিঃসঙ্গ ফুল ফুটে থাকা গাছের ওপর।

ইথান ঠাণ্ডা পাথরের মেঝেতে বসে পড়ল, কাঁপছে সারা শরীর। বেভারলি অন্ধকার কোণ থেকে একটা ডাফল ব্যাগ টেনে বের করল। ভেতর থেকে একটা কম্বল বের করে মেলে দিল তার গায়ের ওপর।

“তোমার জন্য কিছু পোশাকও আছে,” সে বলল, “যখন ঘুম ভাঙবে, সেগুলো পরে নিও।”

ইথান প্রবল কাঁপুনি সামলাতে সামলাতে চোখ খোলা রাখার চেষ্টা করছে, কারণ কিছু কথা তাকে জানতে হবে এখনই। সে জানে না, ঘুম থেকে উঠে বেভারলিকে আবার পাবে কি না।

“ওয়েওয়ার্ড পাইনসটা আসলে কী?”

বেভারলি তার পাশে বসে পড়ল। “তুমি ঘুম থেকে উঠলে আমি—”

“না, এখন বলো। গত দুই দিনে আমি এমন কিছু দেখেছি যা অসম্ভব। এমন জিনিস, যা দেখে আমার নিজের মানসিক স্থিতি নিয়েই সন্দেহ হচ্ছে।”

“তুমি পাগল নও,” বেভারলি বলল শান্ত গলায়। “ওরা শুধু তোমাকে এমন ভাবাতে চায়।”

“কেন?”

“সেটা আমি জানি না।”

ইথান বুঝতে পারছে না তার কথা বিশ্বাস করবে কি না। মনে মনে ভাবল, সাবধান থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।

“তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ,” সে বলল ধীরে, “ধন্যবাদ সেজন্য। কিন্তু একটা প্রশ্ন না করে পারছি না—কেন, বেভারলি? এই পুরো ওয়েওয়ার্ড পাইনসে একমাত্র তুমিই কেন আমার পাশে দাঁড়ালে?”

বেভারলি হালকা হেসে বলল, “কারণ আমরা দু’জনেই একই জিনিস চাই।”

“কি সেটা?”

“এখান থেকে বেরিয়ে যেতে।”

“এই শহর থেকে বেরোনোর কোনো রাস্তা নেই, তাই না?”

“না।”

“কিন্তু আমি তো গাড়ি চালিয়ে এসেছিলাম এখানে কয়েক দিন আগে। সেটা কীভাবে সম্ভব?”

“ইথান, এখন ওষুধটাকে কাজ করতে দাও। ঘুমাও। ঘুম ভাঙলে আমি যা জানি সব বলব। আর কীভাবে এখান থেকে পালানো যায় সেসব নিয়েও কথা হবে। এখন চোখ বন্ধ করো।”

সে চোখ বন্ধ করতে চায় না, কিন্তু শরীরের নিয়ন্ত্রণ ফসকে যাচ্ছে।

“আমি পাগল নই,” ইথান বিড়বিড় করে বলল, ঘুমের ঘোরে।

“আমি জানি,” বেভারলির কণ্ঠ এল দূর থেকে, শান্ত, আশ্বাসে ভরা। ইথানের কাঁপুনি কমে আসছে, শরীরের উষ্ণতায় গরম হয়ে উঠেছে কম্বলের নিচে।

“একটা কথা বলো,” ইথান বলল কাঁপা গলায়। “তুমি কীভাবে ওয়েওয়ার্ড পাইনসে এলে?”

“আমি আইবিএমের রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলাম,” বেভারলি শুরু করল। “একটা সেলস মিটিংয়ে এসেছিলাম। এখানকার স্কুলের কম্পিউটার ল্যাবে আমাদের ট্যান্ডি ১০০০ সেটআপ বসানোর কথা চলছিল। কিন্তু শহরে ঢোকার পথেই দুর্ঘটনার শিকার হই। একটা ট্রাক হঠাৎ কোথা থেকে এসে আমার গাড়িতে ধাক্কা দিল।” তার গলা ক্রমেই নিচু হয়ে আসছে, যেন দূরে সরে যাচ্ছে, কণ্ঠটা শুনতেও কষ্ট হচ্ছে ইথানের। “ওরা বলেছিল, আমার মাথায় আঘাত লেগেছিল, কিছু স্মৃতিও নষ্ট হয়েছে। তাই এই শহর সম্বন্ধে আমার প্রথম স্মৃতি হলো, এক বিকেলে নদীর ধারে জেগে ওঠা।”

ইথান বলতে চাইল, তার সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু মুখ খুলল না। ওষুধটা তার শরীর জুড়ে বয়ে যাচ্ছে এক উন্মত্ত ঢেউয়ের মতো, পুরো গ্রাস করে নিচ্ছে তাকে। আর এক মিনিটও লাগবে না, বুঝতে পারল সে।

“কবে?” সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, গলা ভাঙা, কর্কশ।

বেভারলি শুনতে পায়নি, তাকে ঝুঁকে আসতে হলো, কানটা তার মুখের কাছে নিয়ে যেতে হলো। ইথান প্রাণপণ চেষ্টা করে শব্দগুলো বের করল মুখ থেকে। “তুমি… কবে… এখানে… এসেছিলে?” ডুবন্ত মানুষ যেভাবে বয়ায় ভর দিয়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করে, ইথানও সেভাবে আঁকড়ে ধরেছে বেভারলির কথাগুলো। ঘুমের ঘোর টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে তাকে, আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের চেতনা বাকি।

বেভারলি বলল, “আমি যেদিন এসেছিলাম, সেই দিনটার কথা কোনোদিন ভুলব না… কারণ কিছু দিক থেকে, ওই দিনটাই আমার মৃত্যুর দিনও বটে। তারপর থেকে কিছুই আর আগের মতো নেই। অসম্ভব সুন্দর এক শরতের সকাল ছিল সেদিন। আকাশ গভীর নীল। অ্যাস্পেনের পাতা সোনালি হয়ে উঠতে শুরু করেছে। দিনটা ছিল ৩ অক্টোবর, ১৯৮৫। আসলে, পরের সপ্তাহেই আমার এক বছর পূর্ণ হবে। দেখতে দেখতে এক বছর কাটিয়ে দিলাম ওয়েওয়ার্ড পাইনসে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *