অধ্যায় ৫
রান্নাঘর পারি দিয়ে ইথানের দিকে এগিয়ে গেল সে। ইথান তাকে জড়িয়ে ধরল, মুখ গুঁজে দিল তার চুলের ভেতর। এটা সে প্রায়ই করে, তাদের প্রথম দেখার সেই ঘ্রাণটা ফিরে পেতে চায়। ইথানের ভাষায় পারফিউম, কন্ডিশনার আর থেরেসার নিজস্ব একটা ঘ্রাণ, যার সম্মিলিত সুবাস তার বুক কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেদিন। কিন্তু এখন সেটা হয় বদলে গেছে, হারিয়ে গেছে, নয়তো ইথানের ভেতর এমনভাবে মিশে গেছে যে আর আলাদা করে খুঁজে পায় না। তবু এখনও যেদিন সে ঘ্রাণটা পায়, সাথে সাথে ফিরে যায় তাদের সেই প্রথম পরিচয়ের দিনে, যেদিন তার স্ত্রীর ছোট সোনালি চুল আর সবুজ চোখের চেয়েও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছিল সেই ঘ্রাণ। সে থেরেসাকে বুকে টেনে নিল।
ইথান জানে, সে তার স্ত্রীকে যে কষ্ট আর লজ্জা দিয়েছে তার ক্ষত আরও বহুদিন দগদগে থাকবে। সে যা করেছে, থেরেসা যদি তার সঙ্গে এমন কিছু করত, হয়তো বহুদিন আগেই সে তাকে ছেড়ে চলে যেত। থেরেসার ভালোবাসা আর অনুগত্যে অবাক হয় সে। এ যেন তার প্রাপ্যর অনেক ঊর্ধ্বে। আর তাতেই লজ্জাটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
“আমি ছেলেটাকে একটু দেখি গিয়ে,” ইথান ফিসফিস করে বলল।
“আচ্ছা।”
“ফিরে আসার পর, আমি খাওয়ার সময় তুমি কি আমার পাশে বসবে একটু?”
“অবশ্যই।”
সে কোটটা ব্যানিস্টারে ঝুলিয়ে রাখল, কালো জুতো জোড়া ছেড়ে খালি পায়ে উঠতে শুরু করল সিঁড়ি বেয়ে। পঞ্চম ধাপটা এড়িয়ে গেল, যেটা সবসময় কঁকিয়ে ওঠে।
আর কোনো বাজে ফ্লোরবোর্ড নেই বাড়িতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলের শোবার ঘরের দরজায় পৌঁছে গেল সে। আস্তে আস্তে দরজা ফাঁক করল, চৌকাঠ আর পাল্লা ফাঁক করে সরু আলোর রেখা ঢুকে গেল ভেতরে।
বেনের পঞ্চম জন্মদিনে ওর ঘরের দেয়ালে মহাকাশ আঁকিয়েছিল তারা। কালো মহাশূন্যতা, তার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা কিছু তারা। দূরের ছায়াপথের ঘূর্ণি। গ্রহ, স্যাটেলাইট, রকেট। ভাসমান এক মহাকাশচারী।
তার ছেলে কম্বলের মধ্যে জটলা পাকিয়ে ঘুমাচ্ছে, হাতে ধরা এক ছোট্ট ট্রফি—সোনালি, প্লাস্টিকের একটা ছেলে ফুটবলে লাথি মারছে।
ইথান নীরব পায়ে মেঝে পার হলো, এড়িয়ে গেল ছড়িয়ে থাকা লেগোর টুকরো আর হট হুইলস। বিছানার পাশে বসল সে। অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে এসেছে তার চোখ, বেনজামিনের মুখের খুঁটিনাটি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।
শান্ত, কোমল চেহারা। চোখ দুটো এখন বন্ধ। মায়ের মতো সবুজ চোখ পেয়েছে ছেলেটা। আর ঠোঁটটা বাবার মতো।
এই ছোট মানুষটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে থাকতে বুকের ভেতর একটা ব্যথা টনটন করে ওঠে। আজ আবারও পুরো একটা দিন ছেলেটার সঙ্গ মিস করে ফেলেছে সে।
তার ছেলে, এ পৃথিবীতে দেখা সবচেয়ে নিখুঁট আর সুন্দর জিনিস। তবু নির্দয়ভাবে সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। একটা একটা করে হাজারটা মুহূর্ত কেটে যাচ্ছে, ছেলেকে সময় দেয়া হয়ে উঠছে না। শিগগিরই ছেলেটা পুরুষ হয়ে উঠবে, তখন কি সে চাইলেও আর এভাবে সুযোগ থাকবে?
ইথান হাতের উল্টো পাশ দিয়ে বেনের গাল ছুঁয়ে দিল। চুমু খেল মাথায়। চুল সরিয়ে দিল কানের পেছনে।
ফিসফিস করে বলল, “তোকে নিয়ে আমার ভীষণ গর্ব, বেন। তুই কল্পনাও করতে পারবি না কতটা।”
গত বছরের কথা, তার বাবা তখন বৃদ্ধাশ্রমে মৃত্যুশয্যায়। বয়স আর নিউমোনিয়ার ধকলে শরীরটা একদম ভেঙে পড়েছে তার। মৃত্যুর দিন সকালে হঠাৎ কর্কশ কণ্ঠে ইথানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুই কি ছেলের সঙ্গে সময় কাটাস?”
“যতটা পারি,” বলেছিল সে।
কিন্তু চোখ দেখে বাবা মিথ্যে ধরে ফেলেছিলেন।
বলেছিলেন, “এতে তোরই ক্ষতি হচ্ছে, ইথান। একদিন আসবে যখন ও বড় হয়ে যাবে, তখন আর কিছু করার থাকবে না। তুই পুরো রাজত্ব দিয়ে হলেও ওর ছোটবেলার এক ঘণ্টা ফিরে পেতে চাইবি, ওকে বুকে নিতে চাইবি, গল্পের বই পড়ে শোনাতে চাইবি, ওর সাথে বল খেলতে চাইবি। ওর এই বয়সটা এমন এক বয়স, যখন প্রত্যেকটা বাচ্চার চোখে তার বাবা একজন সুপারহিরো। বাবারা ভুল করতেই পারে না। বাবারা ব্যর্থ হতেই পারে না। ও এখন নিখাদ ভালোবাসা নিয়ে তোর দিকে তাকায়, কিন্তু চিরকাল এমন থাকবে না। যতদিন আছে, উপভোগ কর।”
ইথান প্রায়ই ভাবে সেদিনের কথাগুলো। বিশেষ করে যেসব রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে, আর জীবন ছুটে চলেছে আলোর বেগে—সংসারের খরচ, ভবিষ্যৎ ভাবনা, জীবনের ব্যর্থতা আর প্রতিদিনের হারানো মুহূর্তগুলোর ভার বুকের ওপর চেপে বসে পাথরের মতো।
“আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? ইথান?”
মাঝে মাঝে মনে হয় সে নিশ্বাসই নিতে পারছে না।
ভাবনারা এত দ্রুত আসে যে নিখুঁট স্মৃতির খোঁজে তাকে হাতড়াতে হয়। আঁকড়ে ধরতে হয়। যেন এটাই জীবনে টিকে থাকার একমাত্র ভেলা।
“ইথান, আমার কণ্ঠস্বরটা ধরে রাখো। এটাই তোমার চেতনাকে জাগিয়ে তুলবে।”
বারবার স্মৃতিটা চলতে থাকে মনের পর্দায়, যতক্ষণ না দুশ্চিন্তা সরে গিয়ে অবসাদ এসে গ্রাস করে, আর সে তলিয়ে যায় অঘোর ঘুমে।
“আমি জানি তোমার কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।”
কারণ জীবনের একমাত্র স্বস্তির অংশ এখন…
“ইথান।”
স্বপ্ন।
ঝট করে তার চোখ খুলে গেল।
একটা আলো এসে পড়ছে তার মুখে—একটা ছোট্ট, তীব্র নীল রশ্মি। নিঃসন্দেহে পেনলাইট।
চোখ মিটমিট করতেই আলোটা মিলিয়ে গেল। আবার চোখ খোলার পর দেখল, সোনালি ফ্রেমের চশমা পরা এক লোক এক ফুটেরও কম দূরে ঝুঁকে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
কালো, ছোট ছোট চোখ।
মাথা একেবারে কামানো।
হালকা রূপালি দাড়ি বয়সের একমাত্র ইঙ্গিত, নয়তো তার ত্বক মসৃণ আর টানটান।
লোকটা হাসল—ছোট্ট, নিখুঁট সাদা দাঁত।
“এখন তো আমার কথা শুনতে পাচ্ছ, তাই না?”
লোকটার কণ্ঠে এক ধরনের আনুষ্ঠানিক ভদ্রতা আর বিনয়ভাব আছে।
ইথান মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
“তুমি জানো তুমি এখন কোথায় আছ?”
ইথানকে এক মুহূর্ত ভাবতে হল, সে সিয়াটলের স্বপ্ন দেখছিল, থেরেসা আর বেনের।
“চলো অন্য কিছু দিয়ে শুরু করি। তোমার নাম জানো?” লোকটা জিজ্ঞেস করল।
“ইথান বার্ক।”
“খুব ভালো। আবারও বলছি, তুমি কি জানো তুমি কোথায় আছ, ইথান?”
সে জানে উত্তরটা তার মাথায় আছে, কিন্তু ঘোলাটে এক বিভ্রান্তিও আছে সাথে, যেন একসাথে কয়েকটা বাস্তবতা টানাটানি করছে তাকে নিয়ে।
একটা বাস্তবতায় সে সিয়াটলে।
আরেকটায়, সে এক হাসপাতালে।
আবার অন্য একটায়, সে এক মনোরম পাহাড়ি শহরে, নামটা… যেখানে নামটা থাকার কথা সেখানে এক বিশাল শূন্যতা।
“ইথান।”
“হ্যাঁ?”
“আমি যদি বলি তুমি এখন ওয়েওয়ার্ড পাইনস নামে এক শহরের হাসপাতালে আছ, তাহলে কি মনে কিছু জেগে ওঠে?”
শুধু জাগল না, এক ঝটকায় সব মনে পড়ে গেল। লাইন ব্যাকারের আকস্মিক আঘাতের মতো তীব্র এক ধাক্কায় জীবন্ত হয়ে উঠল তার মস্তিষ্কের কোষগুলো। গত চার দিনের স্মৃতি সব মনে পড়ে গেল, ঘটনাগুলো ক্রমানুসারে সাজতে শুরু করল মাথার ভেতর। তার মস্তিষ্ক বলছে এই বাস্তবতাটাই আসল।
“ওকে,” ইথান বলল। “সব মনে পড়ছে এখন।”
“সবকিছু?”
“আশা তো করি।”
“শেষ কী ঘটনা মনে আছে?”
এক মুহূর্ত সময় লাগল তার, তবে নিউরন আর সিনাপসের জটিল নেটওয়ার্ক ঘেঁটে ঠিকই বের করে ফেলল।
“ভয়ঙ্কর মাথাব্যথা হচ্ছিল। আমি মেইন স্ট্রিটের ফুটপাথে বসেছিলাম, তারপর…”
“তুমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে।”
“হ্যাঁ।”
“এখনো কি সেই মাথাব্যথা আছে?”
“না, নেই।”
“আমার নাম ড. জেনকিন্স।”
লোকটা ইথানের হাত ঝাঁকাল, তারপর বসে পড়ল তার বিছানার পাশের চেয়ারে।
“আপনি কী ধরনের ডাক্তার?” ইথান জিজ্ঞেস করল।
“মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। ইথান, আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই, যদি অনুমতি দাও। তোমাকে যখন প্রথম আনা হয়, তুমি ড. মিত্র আর নার্সকে বেশ কিছু অদ্ভুত কথা বলেছিলে। তোমার কি মনে আছে কী বলেছিলে?”
“না।”
“তুমি বলছিলে শহরের এক বাড়িতে একটা লাশ দেখেছো। আর তোমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছো না।”
“আমি ডাক্তার বা নার্সকে কিছু বলেছি বলে মনে পড়ছে না।”
“তুমি ডিলিরিয়াস ছিলে। তোমার কি মানসিক অসুস্থতার কোনো ইতিহাস আছে, ইথান?”
এখন পর্যন্ত ইথান বিছানায় হেলান দিয়ে ছিল। এবার কষ্ট করে উঠে বসল। পর্দার ফাঁক গলে হালকা আলো ঢুকছে। বাইরে দিনের আভাস। বাইরে সূর্য আছে জেনে কেন যেন মনের গভীরে স্বস্তি লাগল।
“এ কেমন প্রশ্ন?” ইথান বলল।
“যে ধরনের প্রশ্নের জন্য আমাকে টাকা দেওয়া হয়। তুমি গত রাতে এখানে এসেছো, তোমার সাথে না ছিল কোনো ওয়ালেট, না ছিল কোনো পরিচয়পত্র—”
“কয়েকদিন আগে একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছিলাম আমি। তারপর হয় শেরিফ, নয়তো ওই ইএমটি-রা তাদের কাজ ঠিকমতো করেনি, আর এখন আমি পড়ে আছি ফোন, টাকা, আইডি ছাড়া। আমি আমার মানিব্যাগ হারাইনি।”
“শান্ত হও, ইথান। কেউ বলছে না তুমি ভুল কিছু করেছো। কিন্তু আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর তোমাকে দিতে হবে। তোমার মানসিক অসুস্থতার কোনো ইতিহাস আছে?”
“না।”
“তোমার পরিবারে মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস আছে?”
“না।”
“পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের ইতিহাস?”
“না।”
“কিন্তু তুমি তো দ্বিতীয় গালফ যুদ্ধে সার্ভ করেছো।”
“আপনি সেটা কীভাবে জানলেন?”
জেনকিন্স তার গলার দিকে ইশারা করল।
ইথান তার বুকের দিকে তাকাল, এক বল চেইনের সাথে তার ডগ ট্যাগ ঝুলছে। অদ্ভুত। এটা তো সবসময় তার বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ারে থাকে। শেষ কবে পরে ছিল মনে নেই। এই ট্রিপে এনেছে বলেও মনে পড়ছে না। ব্যাগ গোছানোর সময় এটা নেয়নি, কিংবা গলায় ঝুলিয়েও আনেনি।
তার নাম, র্যাঙ্ক, সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর, রক্তের গ্রুপ, আর ধর্ম (নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম নেই) এর উপর চোখ বোলাল সে।
চিফ ওয়ারেন্ট অফিসার ইথান বার্ক
“ইথান?”
“কী?”
“তুমি দ্বিতীয় গালফ যুদ্ধে সার্ভ করেছো?”
“হ্যাঁ, আমি ইউএইচ-৬০ চালাতাম।”
“সেটা কী?”
“ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার।”
“তাহলে তুমি কমব্যাট দেখেছো?”
“হ্যাঁ।”
“অনেক বেশি?”
“সেটা বলা যেতে পারে।”
“আহত হয়েছিলে কখনো?”
“আমি বুঝতে পারছি না এসবের সঙ্গে—”
“দয়া করে শুধু প্রশ্নের উত্তর দাও।”
“আমাদের হেলিকপ্টার ফালুজার দ্বিতীয় যুদ্ধে গুলি করে নামানো হয়েছিল। ২০০৪ এর শীতের ঘটনা সেটা। আমাদেরটা মেডেভ্যাক মিশন ছিল। কয়েকজন আহত মেরিনকে তুলে বেজে ফিরছিলাম আমরা।”
“কেউ মারা গিয়েছিল?”
ইথান গভীর শ্বাস নিল।
এরপর ছাড়ল।
হঠাৎ প্রশ্নটার মুখোমুখি হয়ে কথা হারিয়ে ফেলল সে। তার মনের ভেতর এমন সব ছবির স্লাইড শো শুরু হয়ে গেল, যেগুলোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে অসংখ্য থেরাপি সেশনে যেতে হয়েছে তাকে।
পেছনে আরপিজি বিস্ফোরণের শকওয়েভ।
ছিন্নভিন্ন টেল সেকশন আর রোটর নিয়ে দেড়শো ফুট নিচে রাস্তায় পড়ে যাচ্ছে তারা।
হেলিকপ্টার ঘুরপাক খাওয়ার ফলে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া জি-ফোর্স।
অ্যালার্ম পাগলের মতো বেজে যাচ্ছে।
অসম্ভব শক্ত হয়ে গেছে পাওয়ার স্টিক।
আছড়ে পড়ল নিচে। তবে ধাক্কাটা যতটা ভয়াবহ হবে ভেবেছিল ততটা হলো না।
মাত্র আধা মিনিটের জন্য অচেতন হয়ে যাওয়া।
সিটবেল্ট আটকে গেছে, কে-বার ছুরিতে হাত পৌঁছাচ্ছে না।
“ইথান। কেউ মারা গিয়েছিল?”
বিদ্রোহীদের গুলি ছুটে আসছে ধ্বংসস্তূপের অপর পাশ থেকে, একে-৪৭ গর্জাচ্ছে কারো হাতে।
ভাঙা উইন্ডশিল্ড দিয়ে দুজন মেডিক হাঁচড়ে পাঁচড়ে বের হয়ে এলো। শেল-শক্ড ওরা।
“ইথান…”
ঠিক সোজা সামনে চার ব্লেডের রোটরে ঢুকে পড়ল তারা, তখনও যথেষ্ট গতিতে ঘুরছে…
এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল দুজন।
রক্ত ছিটকে পড়ল উইন্ডশিল্ড জুড়ে। আরো গুলি।
বিদ্রোহীরা এগিয়ে আসছে।
“ইথান?”
“আমি বাদে সবাই মারা গিয়েছিল,” ইথান বলল।
“একমাত্র তুমিই বেঁচে ছিলে?”
“হ্যাঁ। আমাকে বন্দি করা হয়েছিল।”
জেনকিন্স তার লেদার-বাঁধাই নোটপ্যাডে কিছু লিখল। তারপর বলল, “আমাকে আরও কিছু প্রশ্ন করতে হবে, ইথান। তুমি যত বেশি সৎ উত্তর দেবে, আমার পক্ষে তোমাকে সাহায্য করা ততটা সহজ হবে। আর আমি সেটাই চাই। তুমি কি মাঝে মাঝেই কোনো কণ্ঠস্বর শুনতে পাও?”
ইথান ভেতরের ঠেলে ওঠা ক্রোধ চাপা দেয়ার চেষ্টা করল।
“আপনি কি ঠাট্টা করছেন আমার সাথে?”
“তুমি শুধু উত্তর দিলেই হবে…”
“না।”
জেনকিন্স আবার তার প্যাডে লিখল।
“তোমার কি কথা বলায় কোনো অসুবিধা হয়েছিল? যেমন ধরো, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা গুলিয়ে ফেলা?”
“না। আমি ডিলিউশনাল না, এবং আমার হ্যালুসিনেশনও হচ্ছে না, বা—”
“কথা হলো, তোমার যদি হ্যালুসিনেশন হয় তুমি নিজে নিশ্চয়ই বুঝবে না, না? তুমি যা দেখছো, শুনছো, সেগুলোই তো তোমার কাছে বাস্তব মনে হবে। ধরো, তুমি যদি এই হাসপাতালের রুম, কিংবা আমাদের এই পুরো কথোপকথন তুমি যদি হ্যালুসিনেট করতে, তা হলেও কোনো পার্থক্য টের পেতে না। মনে হতো সেটাই বাস্তব, ঠিক তো?”
ইথান পা নামিয়ে বিছানার ধারে বসলো, তারপর ধীরে ধীরে নামল মেঝেতে।
“তুমি কী করছো?” জেনকিন্স জিজ্ঞেস করল।
ইথান আলমারির দিকে এগোতে লাগল।
তার পা দুর্বল, একেবারে জোর নেই।
“তোমার অবস্থা বেরোনোর মতো নয়, ইথান। তোমার এমআরআই এখনো অ্যানালাইসিস করা হচ্ছে। ইন্টার্নাল হেড ইনজুরি হয়ে থাকতে পারে তোমার। আমরা এখনো জানি না তোমার আঘাত কতটা মারাত্মক। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে—”
“আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাবো। তবে এখানে না। এই শহরে না।”
ইথান আলমারির দরজা খুলে হ্যাঙ্গার থেকে তার স্যুট নামাল।
“তুমি কি শেরিফের অফিসে শার্ট ছাড়া ঢুকেছিলে, ঠিক?”
ইথান সাদা শার্টে হাত গলাল, যেটা মনে হচ্ছে ধুয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে যেটা থেকে পচা লাশের গন্ধ আসছিল, এখন সেখানে কেবল ডিটারজেন্টের গন্ধ।
“তখন দুর্গন্ধ আসছিল শার্ট থেকে,” ইথান বলল। “পচা লাশের দুর্গন্ধ, যেটা আমি—”
“মানে যে লাশটা তুমি পরিত্যক্ত বাড়িতে খুঁজে পেয়েছ বলে দাবি করছ, সেটার?”
“আমি দাবি করিনি। আমি সত্যিই দেখেছি।”
“আর তুমি ম্যাক আর জেন স্কোজির বাসায় গিয়েছিলে, যাদের তুমি আগে চিনতে না, আর তাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মিস্টার স্কোজিকে মৌখিকভাবে হেনস্থা করেছো। এটা তো সত্যি কথা, নাকি?”
ইথান শার্টের বোতাম লাগাতে শুরু করল, হাত কাঁপছে, উল্টোপাল্টা লাগাচ্ছে, কিন্তু পরোয়া করল না। তার লক্ষ্য একটাই—পোশাক পরো, এখান থেকে বের হও। শুধু এই হাসপাতাল থেকে না, একেবারে এই শহর থেকে। এই অভিশপ্ত শহরে আর এক সেকেন্ডও থাকতে চায় না সে।
“মা মাথায় আঘাত নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়,” জেনকিন্স বলল। সে এবার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে।
“এখানে কিছু একটা গোলমাল আছে,” ইথান বলল।
“আমি জানি, আমিও তো—”
“না। এই শহরে। এখানে যারা আছে। আপনি। সবকিছুতে অস্বাভাবিক কিছু আছে। আর যদি ভেবে থাকেন আমি এখানে বসে বসে আপনাকে আমার মস্তিষ্ক নিয়ে আর এক সেকেন্ডও খেলতে দেবো—”
“ইথান, আমি তোমার মস্তিষ্ক নিয়ে কোনো খেলা খেলছি না। এখানে কেউই খেলছে না। তুমি কি বুঝতে পারছ তোমার কথাগুলো কতটা প্যারানয়েড শোনাচ্ছে? আমি শুধু বোঝার চেষ্টা করছি তুমি কোনো সাইকোটিক এপিসোডের মধ্যে আছো কিনা।”
“না, আমি নেই।”
ইথান প্যান্ট পরে বোতাম লাগাল, তারপর ঝুঁকে হাত বাড়াল জুতোর দিকে।
“দুঃখিত, আমি তোমার মুখের কথায় ভরসা করতে পারছি না। ‘মনের একটি অস্বাভাবিক অবস্থা, যা সাধারণত বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়’—এটাই সাইকোসিসের টেক্সটবুক সংজ্ঞা, ইথান। তোমার গাড়ি দুর্ঘটনার কারণে এটা হয়ে থাকতে পারে। তোমার পার্টনারকে চোখের সামনে মরতে দেখার কারণে, কিংবা কোনো চাপা পড়ে থাকা ট্রমা আবার জেগে ওঠার কারণেও হয়ে থাকতে পারে।”
“বের হয়ে যান আমার রুম থেকে,” ইথান বলল।
“ইথান, তোমার জীবন হুমকির মুখে—”
ইথান তাকাল জেনকিন্সের দিকে। নিশ্চয়ই তার দৃষ্টিতে, শরীরী ভাষায় এমন সহিংসতার আভাস ছিল যে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চোখ বড় বড় হয়ে গেল, আর প্রথমবারের মতো সে চুপ করে গেল।
***
নার্স স্টেশনের ডেস্কের ওপাশ থেকে কাগজপত্রে ডুবে থাকা নার্স প্যাম চোখ তুলল।
“মিস্টার বার্ক, এই অবস্থা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কাপড় পরে বাইরে কী করছেন?”
“চলে যাচ্ছি।”
“চলে যাচ্ছেন?” সে এমনভাবে কথাটা বলল যেন শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে পারছে না। “হাসপাতাল থেকে?”
“ওয়েওয়ার্ড পাইনস থেকে।”
“আপনার তো বিছানা ছেড়ে ওঠার মতো অবস্থাই নেই—”
“আমার জিনিসগুলো আমার দরকার। শেরিফ বলল হয়তো ইএমটিরা গাড়ি থেকে সরিয়েছে।”
“আমি ভেবেছিলাম শেরিফের কাছেই আছে।”
“না।”
“আপনি নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
“আচ্ছা, আপনি চাইলে আমি ন্যান্সি ডু’র মতো—”
“আমার সময় নষ্ট করা বন্ধ করুন। ইএমটিদের কোথায় পাব বলতে পারেন?”
“না।”
ইথান ঘুরে হাঁটা শুরু করল। নার্স প্যাম ডাকল পেছন থেকে। ইথান লিফটের সামনে গিয়ে ডাউন বাটনে চাপ দিল। পেছনে চেকার্ড লিনোলিয়ামের মেঝেতে হাই হিলের টুকটুক শব্দ শোনা যাচ্ছে। ইথান ঘুরে দাঁড়াল, পুরনো ঢঙের নার্স ইউনিফর্ম পরা প্যাম দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে।
ইথানের কয়েক ফুট দূরে এসে থামল সে। ইথান তার চেয়ে লম্বায় চার, পাঁচ ইঞ্চি এবং বয়সে কয়েক বছরের বড় হবে।
“আমরা আপনাকে যেতে দিতে পারি না, ইথান। যতক্ষণ না জানি আপনার আসলে কী হয়েছে,” বলল প্যাম।
পেছনে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে লিফটের দরজা খুলে গেল। ইথান পিছিয়ে ঢুকে পড়ল কেবিনের ভেতর।
“আমার জন্য চিন্তা করেছেন, সাহায্য করতে চেয়েছেন, সেজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ,” ইথান বলল। দ্রুত পরপর তিনবার ‘জি’ বাটন চাপল সে। “কিন্তু আসল সমস্যাটা আমি খুঁজে পেয়েছি।”
“মানে?”
“এই শহরটাই সমস্যা।”
প্যাম হঠাৎ তার পা দরজার ফ্রেমে ঢুকিয়ে দিল, বন্ধ হতে দিল না পাল্লা।
“ইথান, প্লিজ। আপনি পরিষ্কারভাবে ভাবতে পারছেন না।”
“পা সরান।”
“আমি চিন্তিত আপনাকে নিয়ে। এখানকার সবাই চিন্তিত।”
ইথান এতোক্ষণ পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে ছিল। পিঠে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগোল এবার। প্যামের একেবারে সামনে এসে থামল, দরজার চার ইঞ্চি ফাঁকা দিয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
চোখ নামাল ইথান। তার পায়ের কালো জুতোর ডগা দিয়ে প্যামের সাদা জুতোর মাথায় ঠুকল।
দীর্ঘ এক মুহূর্ত নড়ল না প্যাম। ইথান ভাবল হয়তো জোর করেই তাকে সরাতে হবে।
কিন্তু অবশেষে পা সরিয়ে নিল নার্স।
***
হাসপাতালের গেট থেকে বের হয়ে ফুটপাতে দাঁড়াল সে। মাথা ডানে-বামে দুই দিকে দেখল রাস্তার। বিকেল হিসেবে শহরটা অস্বাভাবিক চুপচাপ। কোনো গাড়ির আওয়াজ নেই। সত্যি বলতে কোনো আওয়াজই নেই, শুধু পাখির ডাক আর হাওয়ায় পাইন গাছের পাতা নড়াচড়ার খসখস শব্দ ছাড়া। ফুটপাত ছেড়ে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল সে। দাঁড়িয়ে দেখল, শুনল। রোদের উষ্ণতাটা ভালো লাগছে। বাতাসে আরামদায়ক শীতলতা। আকাশের দিকে তাকাল সে। গাঢ় নীল স্ফটিকের মতো রঙ। মেঘহীন। খুঁতহীন।
জায়গাটা সুন্দর, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই প্রথমবার, চারদিকে পাহাড় ঘেরা শহরটা তার মনে মুগ্ধতা ছাড়া অন্য কিছু ঢুকিয়ে দিল। সে জানে না কেন, কিন্তু প্রচণ্ড আতঙ্কিত লাগছে তার। জানে না এই ভয়ের উৎস কোথায়। শুধু জানে এখান থেকে পালাতে হবে।
কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে ভেতরে। হয়তো আসলেই মাথায় আঘাত পেয়েছে সে। কিংবা হয়তো পায়নি। হয়তো গত পাঁচ দিন ধরে বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার ফল এটা। এই ক’দিনে তার সাথে না ছিল ফোন, না ছিল ইন্টারনেট, না ছিল ফেসবুক।
ভাবতেও কেমন অসম্ভব মনে হচ্ছে যে থেরেসা, বেন, হাসলার, ওয়েওয়ার্ড পাইনসের বাইরের কারো সাথেই যোগাযোগ করতে পারছে না সে।
শেরিফ অফিসের দিকে হাঁটতে শুরু করল সে।
এখান থেকে চলে যাওয়াই ভালো হবে। পাহাড়ি দেয়ালের ওপাশের কোনো স্বাভাবিক শহরে যেতে হবে আগে। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে পরবর্তী কর্তব্য ঠিক করা যাবে।
***
“শেরিফ পোপ আছেন?”
বেলিন্ডা মোরান তার সলিটেয়ার খেলা থেকে মুখ তুলল।
“হ্যালো। কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”
ইথান এবার একটু জোরে বলল, “শেরিফ আছেন?”
“না, একটু বেরিয়েছেন।”
“তাহলে শিগগির ফিরবেন?”
“কখন ফিরবেন জানি না।”
“কিন্তু আপনি তো বললেন, ‘একটু বেরিয়েছেন’। তাই ভাবলাম—”
“ওটা কেবল কথার কথা, যুবক।”
“আমাকে চিনতে পারছেন? সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্ট বার্ক।”
“হ্যাঁ। আজকে শার্ট পরে এসেছেন। অনেক ভালো লাগছে।”
“আমার জন্য কোনো কল এসেছে?”
বেলিন্ডা ভ্রু কুঁচকে মাথা কাত করল। “কেন আসবে?”
“কারণ আমি কয়েকজনকে বলেছিলাম এখানে ফোন করতে।”
মাথা নাড়ল সে। “কেউ ফোন করেনি।”
“আমার স্ত্রী থেরেসা? বা এজেন্ট অ্যাডাম হাসলার?”
“কেউ কল করেনি, মিস্টার বার্ক। ভবিষ্যতে কাউকে এখানে কল করতে বলবেন না।”
“আমার একটু কনফারেন্স রুমের ফোনটা ব্যবহার করা দরকার আবার।”
বেলিন্ডার চেহারায় বিরক্তি নেমে এলো। “আমার মনে হয় না সেটা ঠিক হবে।”
“কেন?”
কোনো উত্তর দিল না। শুধু কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল।
***
“থেরেসা, আমি ইথান। তোমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। আমি আবারও হাসপাতালে ছিলাম। জানি না তুমি শেরিফ অফিসে বা হোটেলে ফোন করেছিলে কিনা, কিন্তু আমি কোনো মেসেজ পাইনি। আমি এখনো ওয়েওয়ার্ড পাইনসে আছি। আমার ফোন আর ওয়ালেটও পাইনি, কিন্তু এখানে আর থাকা সম্ভব না আমার পক্ষে। শেরিফের অফিস থেকে একটা গাড়ি ধার নেব আজ। রাতে বোইজি থেকে ফোন করব তোমাকে। মিস ইউ, লাভ ইউ।”
বাটন চেপে কল কাটতেই নতুন ডায়াল টোন পেল সে। চোখ বন্ধ করে নাম্বারটা খুঁজল মাথার মধ্যে। পেয়েও গেল। ডায়াল করল সে। চারবার রিং হওয়ার পর গতবারের কণ্ঠটাই শোনা গেল ওপাশ থেকে।
“সিক্রেট সার্ভিস।”
“আমি এজেন্ট ইথান বার্ক। অ্যাডাম হাসলারের সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
“তিনি এখন নেই। কোনো বার্তা রাখতে চান?”
“তুমি মার্সি?”
“হ্যাঁ।”
“গতকাল আমাদের কথা হয়েছিল, মনে আছে?”
“দেখুন, স্যার, এখানে প্রতিদিন এত কল আসে, সব মনে রাখা সম্ভব না।”
“তুমি বলেছিলে হাসলারকে আমার মেসেজ পৌঁছে দেবে।”
“কী বিষয় ছিল?”
ইথান চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। এখনই যদি ওকে অপমান করে, কলটা কেটে দেবে। তারচেয়ে যদি সিয়াটল ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে, তাহলে সবার সামনে ওর আচরণ প্রকাশ করে চাকরি শেষ করে দেয়া যাবে।
“মার্সি, ওয়েওয়ার্ড পাইনসে এক মৃত সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট সম্পর্কে বলেছিলাম তোমাকে।”
“হুঁ। আচ্ছা, যদি বলে থাকি যে পৌঁছে দেব, তবে নিশ্চয়ই দিয়েছি।”
“কিন্তু আমি হাসলারের কোনো কল পাইনি। এটা কি অদ্ভুত নয়? যে হাসলারের ফিল্ড অফিসের একজন এজেন্ট—আমি এখানে এসে আরেকজন এজেন্টের লাশ পেয়েছি, যে খুন হয়েছে এবং যাকে খুঁজতে আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছিল। তারপর চব্বিশ ঘণ্টা কেটে গেছে, হাসলার একবারও কলব্যাক করল না?”
একটু বিরতি। তারপর: “আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?”
“হ্যাঁ, আমি এখনই হাসলারের সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
“দুঃখিত, উনি নেই। আমি কি—”
“সে কোথায়?”
“নেই।”
“সে কোথায় আছে?”
“তিনি এখন নেই। তবে আমি নিশ্চিত সময় পেলেই তিনি আপনাকে ফোন করবেন। উনি আসলে খুব ব্যস্ত।”
“তুমি আসলে কে, মার্সি?”
হঠাৎ ফোনটা তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিল কেউ।
শেরিফ পোপ দুম করে ক্র্যাডলে বসিয়ে দিল রিসিভারটা। গনগনে কয়লার মতো চোখ করে ইথানের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
“আপনাকে কে বলেছে আমার ফোন ব্যবহার করা যাবে?”
“কেউ না, আমি শুধু—”
“সেটাই। কেউ না। এবার উঠে দাঁড়ান।”
“এক্সকিউজ মি?”
“বলেছি উঠে দাঁড়ান। নিজে পায়ে হেঁটে বের হবেন, নাকি আমি টেনে হিঁচড়ে বের করব?”
ধীরে ধীরে দাঁড়াল ইথান। শেরিফের চোখে চোখ রাখল।
“আপনি ফেডারেল এজেন্টের সঙ্গে কথা বলছেন, স্যার।”
“বিশ্বাস হচ্ছে না।”
“মানে?”
“আপনি এখানে হাজির হয়েছেন, কোনো আইডি নেই, ফোন নেই, কিছুই নেই—”
“আমি আমার সিচুয়েশন আপনাকে ব্যাখ্যা করেছি। আপনি কি সিক্স জিরো ফোর ফার্স্ট অ্যাভিনিউতে গিয়েছিলেন, লাশ দেখেছেন এজেন্ট ইভান্সের?”
“গিয়েছিলাম।”
“তারপর?”
“ইনভেস্টিগেশন চলছে।”
“ক্রাইম সিন স্পেশালিস্ট ডেকেছেন?”
“সব প্রোপার ওয়েতে হ্যান্ডেল করা হচ্ছে।”
“কীসব যা তা—?”
পোপ শুধু তাকিয়ে রইল। ইথানের মাথায় ঘুরছে, এই লোকটা পাগল। আর এই শহরে তোমার পাশে কেউ নেই। গাড়ি নিয়ে এখান থেকে বের হও। তারপর ফেরার সময় পুরো বাহিনী নিয়ে আসবে। তখন ওর ব্যাজ যাবে, ফেডারেল ইনভেস্টিগেশনে বাঁধা দেওয়ার দায়ে ও ধ্বংস হবে।
“একটা অনুরোধ আছে,” ইথান বলল, নরম গলায়।
“কী?”
“একটা গাড়ি ধার চাই।”
পোপ হেসে উঠল। “কেন?”
“অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকে তো আমার কোনো গাড়ি নেই।”
“এটা গাড়ি ভাড়া নেয়ার দোকান না।”
“আমার একটা ট্রান্সপোর্ট দরকার, আর্নল্ড।”
“অসম্ভব।”
“এটা কি আপনার শেরিফ ডিপার্টমেন্ট না? এখানে আপনি যা বলবেন তাই তো হবে নাকি?”
পোপ চোখ পিটপিট করল। “ধার দেওয়ার মতো গাড়ি নেই।” কনফারেন্স টেবিল ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “চলুন, মিস্টার বার্ক।”
দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল পোপ। অপেক্ষা করতে লাগল ইথানের জন্য। ইথান কাছে আসতেই পোপ তার বাহু ধরে টেনে নিল। শক্ত হাত চেপে ধরল বাইসেপ।
“খুব শিগগিরই হয়তো আপনাকে কিছু প্রশ্ন করা লাগতে পারে,” শেরিফ বলল।
“কী বিষয়ে?”
পোপ মুচকি হাসল। “শহর ছাড়ার কথা ভুলেও ভাববেন না।”
***
শেরিফের অফিস থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইথান একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল। কনফারেন্স রুমের ব্লাইন্ডের ফাঁক দিয়ে পোপ এখনো তাকিয়ে আছে তার দিকে।
সূর্য পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেছে।
শহরটা এখনো অস্বাভাবিক নীরব।
পোপের অফিস থেকে এক ব্লক দূরে গিয়ে থামল সে। বসে পড়ল নির্জন রাস্তায় ফুটপাথের ধারে।
“এসব ঠিক না,” ফিসফিস করে বলল, বলতেই থাকল।
তার শরীর দুর্বল, পেট খালি।
সব কিছু এক সুতোয় গাঁথতে চেষ্টা করল। যতগুলো অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে ওয়েওয়ার্ড পাইনসে আসার পর থেকে, সব এক ছবির ভেতরে ধরতে পারলে হয়তো কোনো সূত্র মিলবে। হয়তো বোঝা যাবে আসলে কী হচ্ছে। কিন্তু যত বেশি চেষ্টা করছে, ততই যেন সে কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ একটা জিনিস উপলব্ধি করল: এখানে বসে থাকলে কিছুই বদলাবে না। উঠে দাঁড়াল সে। হাঁটতে শুরু করল মেইন স্ট্রিটের দিকে।
হোটেলে যাও। হয়তো কোনো মেসেজ এসেছে থেরেসা বা হাসলার থেকে। মিথ্যে আশা। সে জানে সেটা। কোনো মেসেজ পাওয়া যাবে না। কিচ্ছু পাওয়া যাবে না, কেবল লিসার বাজে ব্যবহার ছাড়া।
আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি না।
আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি না।
মন্ত্রের মতো বলতে থাকল নিজেকে—তার নাম, সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার, সিয়াটলের ঠিকানা, থেরেসার বিয়ের আগের শেষ নাম, ছেলের জন্মতারিখ। এগুলো তার পরিচয়ের টুকরো টুকরো তথ্য। এগুলো মিলেই তার পরিচয়।
এই নাম আর সংখ্যাগুলোর মধ্যেই এক ধরনের নির্ভরতা খুঁজে পেল সে। ঠিক তখনই পরের ব্লক থেকে ভেসে আসা ধাতব টুংটাং শব্দ তার মনোযোগ কেড়ে নিল।
রাস্তার ওপারে একটা ফাঁকা জমি। সেখানে কয়েকটা পিকনিক টেবিল, কিছু গ্রিল, একটা হর্সশু পিট। বেশ কিছু পরিবার জড়ো হয়েছে পার্টি করার জন্য। দুটো লাল কুলারের পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছে কয়েকজন মহিলা। দুজন পুরুষ বার্গার আর হটডগ গ্রিল করছে। নীল ধোঁয়া পাক খেয়ে উঠছে শুনশান বিকেলের আকাশে। মাংস রান্নার গন্ধে ইথানের পেট মোচড় দিল। অনুধাবন করল, আসলে সে তার ভাবনার চেয়েও বেশি ক্ষুধার্ত।
তার নতুন লক্ষ্য: আগে কিছু খেতে হবে।
রাস্তা পার হল। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, স্প্রিংকলারের ক্লিক ক্লিক শব্দ। হঠাৎ ভাবল, ওগুলো কি সত্যিই আসল?
বাচ্চারা ঘাসের ওপর দৌড়াচ্ছে, হাসছে, চেঁচাচ্ছে, ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে।
ধাতব টুংটাং শব্দটা আসছে হর্সশু খেলা থেকে। দু’পাশের স্যান্ডপিটে দাঁড়িয়ে আছে দুই দল পুরুষ। অনেকের হাতেই জ্বলন্ত সিগার। বিস্ফোরিত হ্যালোর মতো ধূম্রকুণ্ডলী ঝুলে আছে তাদের মাথার চারপাশে।
ইথান প্রায় ফাঁকা লটে পৌঁছে গেছে। ভাবছে, মহিলাদের কাছে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো হবে। একটু চার্ম দেখালেই হয়তো কথা শুরু করা যাবে। সবাইকে দেখে ভালো-ভদ্র বলেই মনে হচ্ছে, নিখুঁত আমেরিকান স্বপ্নের মুহূর্ত কাটাচ্ছে। ফুটপাত থেকে ঘাসে পা রাখল সে। গায়ের কোটটা টেনে টান টান করল, কলার ঠিক করল, যেন কিছুটা ভদ্র-সভ্য মনে হয়।
পাঁচজন মহিলা। একজন বিশের কোঠায়, তিনজন তিরিশ থেকে চল্লিশ, আর একজন সাদা চুলের, বয়স পঞ্চাশের শেষ দিকে।
লেমনেড ভর্তি স্বচ্ছ কাপ হাতে তারা পাড়া-প্রতিবেশীর গল্পে মশগুল। এখনো কেউ খেয়াল করেনি ইথানকে।
দশ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে যখন কীভাবে নিরুপদ্রবভাবে তাদের আলাপে যোগ দেয়া যায় ভাবছে, তখনই তার বয়সী এক মহিলা তাকিয়ে হাসল। “হ্যালো,” বলল সে।
তার পরনে হাঁটু ঢাকা স্কার্ট, লাল ফ্ল্যাট স্যান্ডেল, আর চেক শার্ট। চুল ছোট করে কাটা, একেবারে যেন পঞ্চাশের দশকের সিটকম থেকে উঠে আসা কোনো চরিত্র।
“হাই,” বলল ইথান।
“আমাদের ছোট্ট ব্লক পার্টিতে বিন-বুলায়ে-মেহমান হতে এসেছেন?”
“স্বীকার করছি, ওখানে আপনাদের গ্রিলে যা রান্না হচ্ছে তার গন্ধই আমাকে টেনে এনেছে।”
“আমি ন্যান্সি।” দলের ভেতর থেকে আলাদা হয়ে হাত বাড়িয়ে দিল সে। ইথান হাত মেলাল।
“ইথান।”
“নতুন এসেছেন এখানে?”
“কয়েক দিন আগেই এসেছি এই শহরে।”
“কেমন লাগছে আমাদের এই ছোট্ট শহরটা?”
“খুব সুন্দর। অতিথিপরায়ণ আর উষ্ণ।”
“আহা, তাহলে তো আপনাকে খাওয়াতেই হয়।” হেসে উঠল ন্যান্সি।
“আপনারা কি এখানেই থাকেন?” ইথান জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, কাছেপিঠেই থাকি সবাই। প্রতিবেশীরা সবাই মিলে চেষ্টা করি সপ্তাহে অন্তত একবার যেন কুকআউট করা যায়।”
“বেশ বন্ধুবৎসল পাড়া আপনাদের।”
“খুব মজাই আছি। আমি যে শেষ কবে ঘুরতে গিয়েছিলাম মনেও পড়ে না।”
“আপনি থাকেন যখন এমন জায়গায়—” ইথান চারপাশের পাহাড়ের দিকে হাত দেখিয়ে বলল, “ঘুরতে যাবেনই বা কোথায়?”
ন্যান্সির গাল লাল হয়ে উঠল। “তো ওয়েওয়ার্ড পাইনসে আপনি কী করতে এসেছেন, ইথান?”
“শুধুই ঘুরতে।”
“এক কাপ লেমনেড চলবে?” ন্যান্সি জিজ্ঞেস করল। “ঘরে বানানো, বেশ মজাদার।”
“অবশ্যই।”
সে ইথানের হাতে আলতো ছুঁয়ে বলল, “এই আসছি। তারপর বাকিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।”
ন্যান্সি কুলারের দিকে যেতেই ইথান অন্য মহিলাদের দিকে তাকাল, কোনোভাবে আলাপ জুড়তে পারা যায় কি না ভেবে।
সবচেয়ে বয়স্ক জন—একেবারে সাদা চুলের এক মহিলা—কোনো কিছু শুনে হাসছে। ইথানের মনে হলো এই হাসি সে আগে শুনেছে। মহিলা তার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল কানের পিছনে সরিয়ে নিল।
চেহারায় আধুলি সাইজের জন্মদাগটা দেখে ইথানের হৃৎস্পন্দন থেমে গেল।
এ হতে পারে না, কিন্তু তবু… উচ্চতা ঠিকই মিলছে। গড়নও।
এখন কথা বলছে সে, তার কণ্ঠস্বরও নিঃসন্দেহে পরিচিত। দলের অন্যদের থেকে সরে গেল সে, সবচেয়ে কনিষ্ঠ জনের দিকে আঙুল তুলে দুষ্টু ভঙ্গিতে হেসে বলল, “ক্রিস্টিন, আমি কিন্তু তোমার কথা মনে রাখব।”
তারপর ঘুরে সবচেয়ে দূরের হর্সশু পিটের দিকে এগিয়ে গেল সে। সেখানে গিয়ে এক লম্বা, প্রশস্ত-কাঁধ, ঢেউ খেলানো রূপালী চুলের পুরুষের হাত ধরল।
“চলো হ্যারল্ড, আমাদের অনুষ্ঠান মিস হয়ে যাবে।”
সে টেনে নিয়ে যেতে চাইল পুরুষটাকে।
“আরেকটা থ্রো, প্লিজ।” আপত্তি করল হ্যারল্ড।
মহিলা হাত ছেড়ে দিল। ইথান নির্বাক হয়ে দেখল হ্যারল্ড বালির গর্ত থেকে একটা হর্সশু তুলে নিল, সাবধানে এইম করল, তারপর ছুঁড়ে দিল। হর্সশু ঘাসের জমিনের উপর দিয়ে ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে ধাতব খুঁটি ঘিরে পড়ল।
উল্লাসে ফেটে পড়ল হ্যারল্ডের দলের লোকজন। নাটকীয় ভঙ্গিতে হ্যারল্ডকে কুর্নিশ করল কয়েকবার। তারপর তুষার শুভ্র চুলের নারী তাকে টেনে নিয়ে গেল পার্টি ছেড়ে।
তাদের বন্ধুরা পিছন থেকে গুডনাইট জানাল।
“ইথান, আপনার লেমনেড।” ন্যান্সি তার দিকে বাড়িয়ে আছে।
“দুঃখিত, আমাকে এখনই যেতে হবে।”
সে ঘুরে রাস্তায় বেরিয়ে গেল।
ন্যান্সি পেছন থেকে ডেকে বলল, “থাকুন না! খেয়ে যান।”
ইথান যতক্ষণে মোড় ঘুরল, বয়স্ক দম্পতি ততক্ষণে এক ব্লক এগিয়ে গেছে। হাঁটার গতি বাড়াল সে। কয়েক ব্লক অনুসরণ করল দু’জনকে। ধীর পায়ে হাঁটছে ওরা। হাত ধরাধরি করে, হাসতে হাসতে। ওদের হাসি আর কথোপকথনের সুর ছড়িয়ে যাচ্ছে পাইনের বনে। দেখে মনে হচ্ছে যেন চিন্তা-ভাবনাহীন দু’জন মানুষ।
সামনে বাঁক ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল তারা। ইথান দৌড়ে গেল পরের মোড়ে। দুই পাশে ছিমছাম ভিক্টোরিয়ান বাড়ির সারি। কিন্তু তাদের আর দেখা নেই। ঠিক তখনই এক বাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ ভেসে এলো। সবুজ রঙের বাড়ি, সাদা ট্রিম। সামনে দোলনা-ঝোলা বারান্দা। বাম দিক থেকে তৃতীয় বাড়ি।
রাস্তা পার হয়ে ফুটপাত ধরে ঠিক সেই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ইথান।
ছোট্ট এক টুকরো জমি। নিখুঁত সবুজ ঘাস। বৃদ্ধ এক পাইনের ছায়ায় ঢাকা সামনের বারান্দা। ডাকবাক্সে লেখা একটা নাম, যেটা সে চিনতে পারল না। কাঠের বেড়ার ওপরে হাত রাখল সে।
সন্ধ্যা নামছে। চারপাশের বাড়িগুলোয় একে একে আলো জ্বলে উঠছে। কোথাও খোলা জানালা দিয়ে ভেসে আসছে টুকরো টুকরো কথোপকথন। উপত্যকাটা নিস্তব্ধ আর শীতল হয়ে উঠছে, চারদিকের পাহাড় চূড়াগুলোয় শেষ রোদের ছোঁয়া পড়ছে।
সে গেটের ল্যাচ খুলে ঠেলে খুলল। পুরনো পাথরের পথে হেঁটে উঠল বারান্দার দিকে। সিঁড়িটা তার ওজনে ক্যাঁচক্যাঁচ করে উঠল। বাড়ির দরজার একেবারে সামনে এসে থামল সে। ভেতর থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। পায়ের শব্দ।
তার ভেতরের একটা অংশ দরজায় কড়া নাড়তে চাইছে না। তবু সে বাইরের দরজার কাচের অংশে আঙুলের গাঁট দিয়ে টোকা দিল, তারপর এক পা পেছনে সরে দাঁড়াল।
এক মিনিট অপেক্ষা করল। কেউ এল না। দ্বিতীয়বার একটু জোরে নক করল।
এবার ভেতর থেকে পায়ের শব্দ এগিয়ে এল। লক ঘোরানোর শব্দ শোনা গেল। খুলে গেল কাঠের দরজাটা। চওড়া কাঁধের লোকটা কাচের ওপাশ থেকে তার দিকে তাকাল।
“সাহায্য করতে পারি কোনো?”
ইথান শুধু তাকে কাছ থেকে দেখতে চায়, এই বারান্দার আলোয়। শুধু নিশ্চিত হতে চায় সে যা ভাবছে তা নয়, সে পাগল হয়ে যাচ্ছে না। তারপর এই শহরের বাকি হাজারটা সমস্যার মতো এটাকেও পেছনে ফেলে যেতে পারবে।
“আমি কেটকে খুঁজছি।”
এক মুহূর্তের জন্য লোকটা শুধু চেয়ে রইল। অবশেষে সে সামান্য ফাঁকা করল কাচের দরজাটা।
“আপনি কে?”
“ইথান।”
“কে বললেন?”
“এক পুরনো বন্ধু।”
লোকটা ঘরের ভেতরে ফিরে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে বলল, “হানি, একটু দরজায় আসবে?”
ভেতর থেকে মহিলাটি কিছু বলল, ইথান শুনতে পেল না। লোকটা বলল, “আমার কোনো ধারণা নেই।”
তারপর সে এল। একটা ছায়া, রান্নাঘরের দিকে যাওয়া করিডোরের শেষ প্রান্তে। ওপরের আলোয় এক মুহূর্ত দেখা গেল তাকে, তারপর খালি পায়ে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে চলে এলো দরজার কাছে।
লোকটা সরে গেল, মহিলাটি তার জায়গা নিল। ইথান তাকিয়ে রইল কাচের ওপাশ দিয়ে। চোখ বন্ধ করল, আবার খুলল। সে এখনো এই বারান্দায়, আর মহিলাটি এখনো ওপাশে দাঁড়িয়ে। অবিশ্বাস্য!
সে বলল, “জি?”
ওই চোখ দুটো। ভুল হবার উপায় নেই।
“কেট?”
“জি?”
“হিউসন?”
“ওটা আমার বিয়ের আগের নাম।”
“হে ঈশ্বর…”
“দুঃখিত… আমি কি আপনাকে চিনি?”
ইথানের চোখ সরছে না সামনের নারীর উপর থেকে।
“আমি… ইথান,” সে বলল। “আমি তোমাকে খুঁজতে এসেছি, কেট।”
“আমার মনে হয় আপনি ভুল করছেন।”
“আমি তোমাকে যেকোনো জায়গায় চিনে নেব, কেট… যেকোনো বয়সে।”
মহিলা ঘাড় ফিরিয়ে পেছন দিকে বলল, “সব ঠিক আছে, হ্যারল্ড। আমি আসছি।”
কেট দরজা খুলে বারান্দায় ওয়েলকাম ম্যাটের ওপর পা রাখল। তার গায়ে ক্রিম রঙের প্যান্ট, ফ্যাকাশে নীল ট্যাঙ্ক টপ। আঙুলে বিয়ের আংটি।
সে এখনো কেটের মতোই ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। কিন্তু… বুড়িয়ে গেছে।
“এখানে কী হচ্ছে?” ইথান জিজ্ঞেস করল।
ইথানের হাত ধরল সে, বারান্দার প্রান্তে দোলনার কাছে নিয়ে গেল। বসল দুজন। পাশাপাশি। বাড়িটা সামান্য উঁচু জায়গায়, ফলে দোলনায় বসে উপত্যকা আর শহরের অনেক দূর পর্যন্ত চোখে পড়ছে। চারপাশে এখন অগণিত বাড়ির আলো, আকাশে ফুটে উঠেছে তিনটা তারা। কাছাকাছি কোথাও একটা ঝিঁঝিঁ ডাকছে… কিংবা হয়তো ঝিঁঝিঁর রেকর্ডিং বাজছে।
“কেট…”
সে ইথানের হাঁটুতে হাত রেখে চেপে ধরল, একদম কানের কাছে নিয়ে এল মুখ।
“ওরা নজর রাখছে।”
“কারা?”
“চুপ।”
সে খুব সাবধানে এক আঙুল তুলে ছাদের দিকে ইশারা করল, ফিসফিসিয়ে বলল, “আর শুনছেও।”
“তোমার কী হয়েছে, কেট?”
“তুমি কি মনে করো, আমি এখনো সুন্দর?” ওই কটাক্ষ, ওই স্বর একমাত্র কেট ছাড়া কারো পক্ষে সম্ভব না। সে এক মিনিট নিজের কোলের দিকে তাকিয়ে রইল। আবার যখন মুখ তুলল আধো-আলোতে চকচক করছে ভেজা চোখ দুটো। “রাতে যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যখন চুল আঁচড়াই, মনে হয় যেন এখনও শরীরে তোমার স্পর্শ পাই। যদিও শরীরটা আর আগের মতো নেই আমার।”
“তোমার বয়স কত এখন, কেট?”
“আমি জানি না। হিসেব রাখা মুশকিল।”
“আমি চার দিন আগে তোমাকে খুঁজতে এসেছি। ওরা তোমার আর ইভান্সের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছিল, তাই আমায় পাঠিয়েছে। ইভান্স মারা গেছে।”
কথাটা তার ওপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলল না।
“তুমি আর বিল এখানে কী করছিলে?”
সে শুধু মাথা নাড়ল।
“এখানে কী হচ্ছে, কেট?”
“আমি জানি না।”
“কিন্তু তুমি তো এখানে থাকো।”
“হ্যাঁ।”
“কতদিন হলো?”
“বহু বছর ধরে।”
“অসম্ভব।” ইথান উঠে দাঁড়াল, মাথার ভেতর চিন্তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
“তোমার কোনো প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই ইথান।”
“আমার একটা ফোন দরকার, একটা গাড়ি… বন্দুক থাকলে সেটাও—”
“আমি পারব না, ইথান।” সে উঠে দাঁড়াল। “তুমি এখনই চলে যাও।”
“কেট—”
“এখনই।”
ইথান তার হাত ধরল। “গতরাতে যখন আমি রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম, ওটা তুমি-ই ছিলে, তাই না?” কেটের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। ঠোঁট, চোখের কোণ আর কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে, তবু এখনো অপূর্ব সুন্দর। “তুমি জানো আমার সঙ্গে কী ঘটছে?”
“থামো।” সে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।
“আমি বিপদে আছি,” ইথান বলল।
“জানি।”
“তাহলে বলো কী—”
“ইথান, এখন কিন্তু তুমি আমার জীবন ঝুঁকিতে ফেলছ। আর হ্যারল্ডেরও…”
“কার কাছ থেকে?”
সে টান দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। ভেতরে ঢুকে যাওয়ার আগে ফিরে তাকাল একবার। আধো-আলোতে তাকে দেখে মুহূর্তের জন্য ইথানের মনে হল, কোনো বয়স্ক নারী নয়—সেই ছত্রিশ বছর বয়সী কেট তাকিয়ে আছে তার দিকে।
“তুমি সুখী হতে পারো, ইথান।”
“কী বলছ তুমি?”
“এখানে কিন্তু দারুণ একটা জীবন পেতে পারো।”
“কেট।”
সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
“কেট।”
“কী?”
“আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?”
“না,” কেট বলল। “একদমই না।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল, তারপর ডেডবোল্ট ঘোরানোর শব্দ ভেসে এলো বাইরে। ইথান এগিয়ে গিয়ে দরজার কাচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো হয়তো ষাট বছরের এক বৃদ্ধকে দেখতে পাবে। কিন্তু না, সে অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।
তার ক্ষুধা কেটে গেছে। ক্লান্তিও নেই। সিঁড়ি বেয়ে নামল, পাথরের পথ ধরে ফুটপাথে চলে এল। বুকের ভেতর একটা টানটান একটা চাপা উত্তেজনা। এই অনুভূতি তার খুব পরিচিত। প্রতিটি মিশনের আগে, যখন হেলিকপ্টারের দিকে হাঁটত আর গ্রাউন্ড-ক্রুরা ফিফটি-ক্যালিবারের গ্যাটলিং গান আর হেলফায়ার মিসাইল লোড করায় ব্যস্ত, তখন ঠিক এমনটাই লাগত।
আদিমতম এই অনুভূতির নাম ভয়।
***
পরবর্তী ব্লক যাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো গাড়ি দেখতে পেল না ইথান। শেষ পর্যন্ত যেটা দেখল সেটাও একটা ১৯৮০ মডেলের বুইক লেসাব্রে। উইন্ডশিল্ড ঢেকে আছে শুকনো পাইন পাতায়, টায়ার চারটাতেই বাতাস কম। দরজাগুলো লক করা।
ইথান পা টিপে টিপে সবচেয়ে কাছের বাড়ির বারান্দায় উঠে গেল। জানালার সামনে ছোট্ট একটা কাউন্টারের উপর একটা পাথরের দেবদূতের মূর্তি সাজিয়ে রাখা। সাবধানে সেটা তুলে নিল সে। জানালার পাতলা পরদা ভেদ করে ওপাশে একটা ছেলেকে দেখা যাচ্ছে। বয়স খুব বেশি হবে না। অপূর্ব সুর বাজাচ্ছে পিয়ানোয় বসে, জানালার নিচে ছয় ইঞ্চি চওড়া ফাঁক দিয়ে বারান্দায় ছড়িয়ে পড়ছে তার বাজনা। এক নারী তার পাশে বসে স্বরলিপির পাতা ওল্টাচ্ছে।
পাথরের দেবদূতটা লম্বায় মাত্র এক ফিট হলেও, জিনিসটা নিরেট কংক্রিটের তৈরি। ফলে ওজন তিরিশ পাউন্ডের বেশি হবে। ইথান সেটাকে দুই হাত দিয়ে ধরে রাস্তায় ফেরত এলো।
কাজটা নিঃশব্দে করা কোনোভাবেই সম্ভব না।
ড্রাইভার সিটের জানালায় ছুড়ে মারল মূর্তিটা। কাচ ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেল দেবদূত। ইথান হাত ঢুকিয়ে দরজা আনলক করে ড্রাইভিং সিটে চড়ে বসল। আঘাতে মূর্তির মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ইথান পাশের সিট থেকে মাথাটা তুলে নিয়ে স্টিয়ারিং কলামের নিচে দুইবার আঘাত করতেই প্লাস্টিক আবরণ ফেটে গেল। বেরিয়ে পড়ল ইগনিশন সিলিন্ডার।
গাড়ির ভেতরে আলো খুব কম। কেবলমাত্র আঙুলের স্পর্শ দিয়ে অনুভব করে পাওয়ার আর স্টার্টার তার খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
বাড়ির ভেতরের পিয়ানো বাজানো থেমে গিয়েছে। সে বারান্দার দিকে চেয়ে দেখল। পরদার পিছনে দুজন মানুষের ছায়া এসে দাঁড়িয়েছে।
ইথান কোটের পকেট হাতড়ে মাল্টিপারপাস নাইফ বের করে বড় ব্লেডটা খুলে ফেলল। দুটো সাদা তার কেটে দিল সে। সম্ভবত এগুলোই গাড়ির পাওয়ার লাইন। কাটা প্রান্ত থেকে প্লাস্টিকের আবরণ ছিঁড়ে তামা উন্মোচন করে দুটো তার একসাথে পেঁচিয়ে দিল।
ড্যাশবোর্ড আলো ছড়াল।
বাড়ির ভেতর থেকে দরজা খোলার শব্দ এলো। একই মুহূর্তে ইথান গাঢ় রঙের স্টার্টার তার খুঁজে পেল। একটা ছেলের কণ্ঠ ভেসে এলো; “গাড়ির জানালায় দেখো।”
ইথান স্টার্টার তারের প্রান্ত ছিঁড়ে ফেলল, চকচকে তামা বেরিয়ে এলো। একটা নারী কণ্ঠ শোনা গেল, “এখানেই থেকো, এলিয়ট।”
প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ… স্টার্ট হ, স্টার্ট হ… ইথান মনে মনে প্রার্থনা করল।
সে স্টার্টার তারের মাথা ছুঁইয়ে দিল পাওয়ার লাইনের সাথে। নীল স্ফুলিঙ্গ ছিটকে উঠল অন্ধকারে। ইঞ্জিন কেশে উঠল। মহিলা ততক্ষণে আঙিনা পেরিয়ে গাড়ির দিকে এগোচ্ছে।
“কামঅন, স্টার্ট হ!” ইথান ফিসফিস করল।
আবার তারগুলো ছুঁইয়ে দিল সে। ইঞ্জিন আবার কেশে থেমে গেল।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
চতুর্থবারে সেটা কাঁপতে কাঁপতে জীবন্ত হয়ে উঠল।
সে আরপিএম বাড়িয়ে গাড়ি ড্রাইভে শিফট করল। মহিলা তখন প্রায় প্যাসেঞ্জার সাইডের দরজায় পৌঁছে গেছে। কাচের ওপার থেকে তার চিৎকার কানে আসছে।
ইথান হেডলাইট অন করে অ্যাক্সিলারেটর চেপে ধরল। গাড়ি ছুটে গেল রাস্তায়।
প্রথম চৌরাস্তায় পৌঁছে বামে মোড় নিয়ে গ্যাস প্যাডেল থেকে চাপ কমাল। গতি কমিয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় নামিয়ে আনল। এমন গতি যা কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করবে না, সন্ধ্যায় ঘুরতে বের হওয়া একটা মানুষ যেমন গতিতে গাড়ি চালাবে ঠিক তেমন।
ফুয়েল গেজে দেখাচ্ছে সিকি ট্যাংক তেল আছে। রিজার্ভ লাইট এখনো জ্বলেনি। সমস্যা নেই। এই পরিমাণ তেলেই ওয়েওয়ার্ড পাইনস থেকে বেরিয়ে যাওয়া যাবে। পাহাড়ের পাসটা পেরোলে প্রায় চল্লিশ মাইল দক্ষিণে একটা ছোট্ট শহর—লোম্যান, আইডাহো। হাইওয়ের ধারে। এই শহরে আসার পথে ওখানেই থেমেছিল ফুয়েল নিতে। ইথানের চোখে এখনো ভাসছে স্টলিংস তার কালো স্যুট পরে পাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে ট্যাংক ভর্তি করছিল। আর সে তখন রাস্তার কিনারে গিয়ে ফাঁকা হাইওয়ের পাশে পরিত্যক্ত বিল্ডিংগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। তারমধ্যে একটা ছিল মোটেল, একটা রোডহাউস আর একটা জেনারেল স্টোর। একটামাত্র ডাইনারই কেবল চলছিল; তাও ধুকেধুকে, ছাদের চিমনি থেকে ধোঁয়ার সঙ্গে ভেসে আসছিল পোড়া তেলের গন্ধ।
ঠিক ওখানটাতে দাঁড়িয়েই সে কল করেছিল থেরেসাকে। একটা মাত্র সিগনাল বার দেখাচ্ছিল মোবাইলে। কী কথা হয়েছিল এখন আর ঠিক মনেও পড়ছে না। তার মন ছিল অন্য কোথাও। ওটাই ছিল শেষবার যখন সে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছিল। সে আশা করল, অন্তত ‘ভালোবাসি’ কথাটা বলেছিল ওকে।
ব্রেক প্যাডেল চাপতেই আর্তনাদের মতো শব্দ উঠল গাড়ি থেকে। ইথান বুইকটা রাস্তার পাশে পুরোপুরি থামাল। বাম দিকের ইন্ডিকেটর টিকটিক করছে। ফুটপাতে অল্প কয়েকজন মানুষ ছাড়া পুরো ডাউনটাউন মৃত, মেইন স্ট্রিট যতদূর চোখ যায় একেবারে ফাঁকা।
ইথান ধীরে ধীরে বাঁয়ে মোড় নিল, গতি বাড়াতে শুরু করল তারপর। দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে সে। একে একে পেরিয়ে গেল পাব, হোটেল, কফিশপ। আরও সাত ব্লক পর হাসপাতাল। তারপর কোনো শহরতলী নেই। হুট করে বিল্ডিং শেষ হয়ে গেছে।
অ্যাক্সিলারেটরে চাপ বাড়াল সে। ওহ গড! কী যে ভালো লাগছে। অবশেষে বেরিয়ে আসা গেছে ওই বিশ্রি শহরটা ছেড়ে। ক্র্যাংক শ্যাফটের প্রতিটা ঘূর্ণনের সাথে তার কাঁধের ভার হালকা হয়ে যাচ্ছে। এই কাজটা তার আরও দুই দিন আগেই করা উচিত ছিল।
এখানে কোনো বসতি নেই। রাস্তা সোজা কেটে চলে গেছে বিশাল পাইন বনের বুক চিড়ে। এমন সব গাছ, যেন পৃথিবীর প্রথম প্রজন্ম থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। কাচহীন জানালা দিয়ে হুঁ হুঁ করে হাওয়া ঢুকছে। ঠাণ্ডা আর তীব্র সুগন্ধে ভরা। বনের মাঝে, আর কোথাও কোথাও রাস্তার ওপর, ভাসছে হালকা কুয়াশা। হেডলাইট কুয়াশা ভেদ করে যাচ্ছে, দৃশ্যমানতা কমে এসেছে।
রিজার্ভ লাইট জ্বলে উঠল।
শিট!
শহর ছেড়ে বের হওয়ার দক্ষিণমুখী এই রাস্তাটা এঁকেবেঁকে কয়েক হাজার ফুট উপরে পাস পর্যন্ত উঠে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই উর্ধ্বগামী ঢাল শুরু হয়ে যাবে। আর উঠতে গিয়ে অবশিষ্ট যে জ্বালানিটুকু আছে সেটাও শেষ হয়ে যাবে। তার এখনই উল্টো ঘোরা উচিত। শহরে ফিরে গিয়ে কিছু তেল জোগাড় করা দরকার, অন্তত লোম্যানে পৌঁছাতে যতটুকু দরকার ততটুকু।
ইথান ব্রেক চেপে ধরল। সামনে একটা দীর্ঘ, তীক্ষ্ণ বাঁক। ঠিক বাঁকটাতেই ভারী কুয়াশা। হেডলাইটের সাদা আলোয় কিছুই দেখা যাচ্ছে না, শুধু রাস্তার মাঝখানের ফিকে হলুদ ডাবল লাইনটাই পথ দেখাচ্ছে। গাড়ি প্রায় হামাগুড়ি গতিতে নিয়ে এলো ইথান।
তারপর রাস্তা হঠাৎ সোজা হলো। কুয়াশা পেরিয়ে, বন পেরিয়ে বেরিয়ে এলো খোলা জায়গায়।
দূরে একটা বিলবোর্ড। এখনও এক-অষ্টমাংশ মাইল দূরে, তবু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চারটে মানুষের ছবি। হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখে সাদা দাঁতের চওড়া হাসি। ছোট এক ছেলে, পরনে হাফ-প্যান্ট আর ডোরা কাটা শার্ট। মা আর মেয়ের পরনে ড্রেস। বাবার পরনে স্যুট, আর মাথার ফেডোরা হ্যাটটা হাতে নিয়ে নাড়ার ভঙ্গিতে উঁচু করে ধরে আছে।
নিখুঁত হাস্যোজ্জ্বল পরিবারের ছবির নিচে গোটা গোটা হরফে লেখা:
ওয়েলকাম টু ওয়েওয়ার্ড পাইনস
হোয়্যার প্যারাডাইস ইজ হোম
ইথান গ্যাসে চাপ বাড়াল, সাইনবোর্ড পেরিয়ে গেল গাড়ি। রাস্তার পাশ ঘেঁষে চলা কাঠের বেড়ার ওপর দিয়ে হেডলাইটের আলো ছুঁয়ে গেল মাঠের ঘাস, আর সেখানে ছড়িয়ে থাকা গরুর পাল। দূরে দেখা যাচ্ছে কিছু আলো। গরুর পাল আর মাঠ পেছনে মিলিয়ে গেল। অল্প পরেই আবার ঘরবাড়ি দেখা মিলল। রাস্তা চওড়া হয়ে গেল, মাঝের ডাবল হলুদ দাগ হারিয়ে গেল। রাস্তাটা ফার্স্ট অ্যাভিনিউতে বদলে গেছে। আবার শহরে ফেরত এসেছে সে। রাস্তার ধারে গাড়ি থামাল ইথান। উইন্ডশিল্ড দিয়ে তাকিয়ে রইল বাইরে। প্রাণপণ চেষ্টা করছে আতঙ্ক সামলানোর। সহজ কোনো ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই আছে। সম্ভবত ঘন কুয়াশায় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওঠার মোড়টা মিস করেছে, সরাসরি সামনে চলে গেছে।
সে দ্রুত ইউ-টার্ন নিল। গ্যাস প্যাডেলে চেপে বসল পা। পশুর পাল যখন পার হচ্ছে গতি ষাটে। আবার কুয়াশা, আবার আকাশছোঁয়া পাইন বন। সতর্ক চোখ রাখল রোডসাইনের খোঁজে। পাহাড়ি রাস্তার কোনো চিহ্ন বা ইঙ্গিত না থেকেই পারে না। কিন্তু কিছুই নেই!
তীক্ষ্ণ বাঁকে পৌঁছে রাস্তার পাশে থামাল গাড়ি। গিয়ার বদলে পার্কে রাখল। ইঞ্জিন চালু রেখে নেমে পড়ল রাতের ঠাণ্ডা বাতাসে। রাস্তা পার হয়ে অপর পারে গিয়ে বনের ধার ঘেঁষে হাঁটতে লাগল। একশ ফুট যেতে না যেতেই কুয়াশা এত ঘন হয়ে গেল যে গাড়িটা আর দেখা যাচ্ছিল না। তবে শব্দ শোনা যাচ্ছে—ইঞ্জিনের মৃদু ঘড়ঘড়—আর প্রতি পদক্ষেপের সাথে শব্দটা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে।
দুইশ গজ হাঁটার পর থামল সে। বাঁকের অন্যপ্রান্তে এসে পড়েছে ইথান। এখান থেকেই রাস্তা আবার সোজা হয়ে শহরের দিকে ফিরে গেছে। গাড়ির শব্দ পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে। বাতাস নেই, গাছগুলো স্থির, নিস্তব্ধ। হালকা কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে, যেন বৈদ্যুতিক চার্জ বহন করছে। কিন্তু ইথান জানে, সে যে আবছা গুঞ্জনটা শুনতে পাচ্ছে, সেটাই বাইরে থেকে নয়, তার ভেতর থেকে আসছে। পূর্ণ নিস্তব্ধতা সহ্য করতে না পেরে মস্তিষ্ক কল্পনা করে নিচ্ছে।
অসম্ভব। রাস্তা এখানে ঘুরে যাওয়ার কথা নয়। এই পাইন বন কেটে অন্তত অর্ধ মাইল সোজা গিয়ে তারপর দক্ষিণের পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করার কথা। সে সাবধানে রাস্তার ধারে নেমে এল, ঢুকে পড়ল বনের ভেতর। মাটিতে শুকনো পাইন পাতার পুরু স্তর, মনে হচ্ছে যেন নরম কুশনের ওপর দিয়ে চলছে সে। হাওয়া স্যাঁতসেঁতে আর ঠাণ্ডা।
এই গাছগুলো… এত উঁচু পাইন গাছ জীবনে দেখেনি সে। গাছের গোড়ায় কোনো ঝোপঝাড় নেই, ফলে বিশাল গাছগুলোর মাঝখান দিয়ে চলাফেরা সহজ। তবে একবার দিক হারালে আর চেনা অসম্ভব। কুয়াশা পেরিয়ে এলো সে। মাথা তুলে উপরে তাকাল, গাছের ফাঁক দিয়ে ঝিলমিল করছে কিছু তারার আলো।
আরও পঞ্চাশ গজ এগিয়ে থামল। ফিরে যাওয়া উচিত এখনই। শহর থেকে বেরোনোর অন্য রাস্তা নিশ্চয়ই আছে। হামাগুড়ি দিয়ে বিভ্রান্তি ফিরে আসছে মাথার ভেতর। সে কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল। আশা করছে পথ চিনে গাড়ির কাছে ফিরতে পারবে, কিন্তু সে নিশ্চিত না। সবকিছু একই রকম—একই গাছ, অন্ধকার, একই নীরবতা।
ঠিক তখনই, বনের বাইরের দিক থেকে ভেসে এলো এক আর্তনাদ। ইথান স্থির হয়ে গেল। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু বুকের ভেতর ধকধক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সে জানে না ওটা কিসের চিৎকার ছিল। কোনো মানুষের প্রচণ্ড আতঙ্কিত চিৎকার হতে পারে, কিংবা হায়েনার ডাক। কিংবা হয়তো উন্মত্ত কয়োটের হাহাকার। কেমন যেন অনেকটা পুরনো আমলের যুদ্ধনাদের মতো। তীক্ষ্ণ, সরু, ভঙ্গুর, ভয়ংকর। মস্তিষ্কের গভীর থেকে অদ্ভুত এক সতর্কবার্তা ভেসে আসছে: এই চিৎকার সে আগেও শুনেছে।
আবার সেই চিৎকার। এবার আরও কাছে।
তার পেটের ভেতরটা ফাঁপা লাগছে। অ্যালার্ম বাজছে মাথার ভেতর: এক্ষুনি এই জায়গা ছেড়ে পালা। কিচ্ছু ভাবিস না। স্রেফ পালা।
ইথান দৌড় শুরু করল বনের ভেতর দিয়ে। বিশ পা যেতেই হাঁফিয়ে উঠল, ভারী কুয়াশায় কিছু দেখা যাচ্ছে না। সামনে জমি হঠাৎ উঁচু হয়ে গেছে। চার হাত-পা ব্যবহার করে সে টেনে তুলল নিজেকে, হোঁচট খেতে খেতে আবার উঠে এলো রাস্তায়। ঠাণ্ডা সত্ত্বেও ঘামছে সে, চোখে ঘামের ফোঁটা পড়ে জ্বালা করছে।
হলুদ ডাবল লাইন ধরে দৌড়াতে লাগল সে। বাঁক পার হতেই দূরে দুটো ছোট আলোর বিন্দু দেখা গেল। তার হেডলাইট। গতি কমাল এবার। হাঁটতে শুরু করল। নিজের হাঁপানোর শব্দ ছাড়িয়েও ইঞ্জিনের মৃদু ঘড়ঘড় কানে আসছে। সে পৌঁছাল, ড্রাইভার সাইডের দরজা খুলে বসে পড়ল স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে। ব্রেকে পা রেখে গিয়ারশিফটের দিকে হাত বাড়াল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে পালাতে চায় সে।
কিন্তু বাঁ চোখের কোণে কিছু একটা নড়াচড়া ধরা পড়ল, সাইড মিররে একটা ছায়া। চোখ গেল ড্যাশবোর্ডের উপরে রিয়ারভিউ মিররে। ব্রেক লাইটের লাল আভায় একটা জিনিস চোখে পড়ল, যেটা এতোক্ষণ দেখেনি। তার রিয়ার বাম্পার থেকে ত্রিশ ফুট দূরে, কুয়াশায় প্রায় অদৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা পুলিশ ক্রুজার।
দৃষ্টি ড্রাইভার সাইড জানালায় ফিরতেই দেখল, একটা শটগানের নল তাকিয়ে আছে তার দিকে, চেহারা থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। সাথে ঝলসে উঠল একটা টর্চলাইট, কর্কশ আলো ছড়িয়ে পড়ল ভেতরে, প্রতিফলিত হতে লাগল ক্রোম আর কাচ থেকে।
“নিশ্চয়ই পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছ।”
শেরিফ পোপ।
তার কর্কশ কণ্ঠের ক্ষোভ কাচ ভেদ করেও বোঝা যাচ্ছে। ইথানের হাত এখনো গিয়ারশিফটে। ভাবছে, গিয়ারস্টিক ড্রাইভে ঠেলে দিয়ে গ্যাস প্যাডেল চেপে ধরবে কিনা। কিন্তু পোপ যদি গুলি ছোড়ে? এই দূরত্বে, বারো-গেজ শটগানের গুলিতে মাথা গায়েব হয়ে যাবে।
“খুব আস্তে আস্তে,” পোপ বলল, “দুই হাত স্টিয়ারিংয়ে, ডান হাত দিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করো।”
ইথান কাচের আড়াল থেকে বলল, “তুমি জানো আমি কে। তোমার জানা উচিত, আমাকে বাধা দেওয়া ঠিক না। আমি এই শহর ছেড়ে যাচ্ছি।”
“তা হবে না।”
“আমি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এজেন্ট, আমার পূর্ণ—”
“না, তুমি এমন এক লোক যার কোনো আইডি নেই, কোনো ব্যাজ নেই, একটা গাড়ি চুরি করেছ, আর সম্ভবত এক ফেডারেল এজেন্টকে খুন করেছ।”
“কী ফালতু কথা বলছ?”
“দ্বিতীয়বার বলব না তোমাকে।”
ইথানের ঘাড়ের পেছনটা শিরশির করে উঠল। ভেতর থেকে একটা কণ্ঠস্বর বলল, এই লোকটাকে ঘাটালে বিপদ হবে। এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
“ঠিক আছে,” ইথান বলল, “একটু সময় দাও। গাড়িটা হটওয়্যার করা, বন্ধ করতে হলে তার আলাদা করতে হবে।”
সে ডোম লাইট জ্বালাল, স্টিয়ারিং কলামের নিচে হাত ঢুকিয়ে সাদা তার দুটো আলাদা করে দিল। লাইট নিভে গেল। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। ফ্ল্যাশলাইটের তীব্র উজ্জ্বলতায় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।
“বের হও!”
ইথান দরজার হাতল ধরে, কাঁধ দিয়ে ঠেলতে হলো ভারী দরজাটা খোলার জন্য। বাইরে পা রাখল সে। আলোক রশ্মির সামনে দিয়ে কুয়াশা ভেসে যাচ্ছে। আলোর ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে পোপ, বন্দুক হাতে এক ক্রুদ্ধ অবয়ব। চোখ ঢাকা পড়েছে স্টেটসনের ছায়ায়। গান অয়েলের গন্ধ পেল ইথান। বুঝতে পারল, বন্দুকের যত্নের ব্যাপারে খুব সচেতন লোকটা।
“মনে আছে আমি কী বলেছিলাম?” পোপ গর্জে উঠল। “শহর ছাড়বে না।” ইথান কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে টর্চলাইটের রশ্মি নিচে মাটির দিকে নেমে গেল, তৎক্ষনাৎ বুঝে ফেলল তার মাথার দিকে যে ছায়াটা প্রবল বেগে এগিয়ে আসছে সেটা শটগানের স্টক।
***
বাম চোখটা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে আঘাতে। গরম হয়ে আছে জায়গাটা। ফুলে উঠেছে অনেকখানি। যন্ত্রণায় তিরতির করে কাঁপছে। ডান চোখ দিয়ে ঘরটা দেখল ইথান। একটা জেরা কক্ষে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। চাপা, দমবন্ধ করা পরিবেশ। সাদা সিন্ডার-ব্লকের দেয়াল আর কংক্রিটের মেঝে।
সামনে একটা খালি কাঠের টেবিল, তার ওপাশে বসে আছে পোপ—স্টেটসন হ্যাট আর জ্যাকেট ছাড়া। গাঢ় সবুজ শার্টের হাতা গোটানো, পেশল বাহুগুলো বের হয়ে আছে।
ইথান তার মুখের পাশ বেয়ে নামা তাজা রক্ত মুছে ফেলল। বাম ভ্রুর ওপরের কাটা জায়গা থেকে ফোঁটা ফোঁটায় গড়িয়ে নামছে রক্ত। মেঝের দিকে চোখ নামাল সে। “একটা তোয়ালে পেতে পারি?”
“না। ওভাবেই বসে থাকো। রক্তপাত হলে হোক, আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।”
ইথান বলল, “পরে, যখন এসব শেষ হয়ে যাবে, আর তুমি জেল থেকে ছাড়া পাবে, আমি অবশ্যই তোমাকে আমার বাসায় ডাকব। তোমার ব্যাজটা দেখানোর জন্য। আমার ফায়ারপ্লেসের ওপরে কাচের ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখব ওটা।”
পোপ হেসে উঠল, চোখে উজ্জ্বল এক তৃপ্তি। “তাই নাকি?”
“তুমি একজন ফেডারেল এজেন্টকে মেরেছো। তোমার ক্যারিয়ার শেষ।”
“এখন বলো, ওই ছয়শ’ চার নাম্বার বাড়িতে লাশের কথা তুমি জানলে কীভাবে? আর ওইসব বারটেন্ডার গায়েব হয়ে যাওয়ার বালছাল কাহিনি শোনাবে না।”
“কী যা তা বলছো?”
“সত্যি জানতে চাই আমি।”
“আমি তো সত্যিই বলেছি।”
“সত্যি? আবারও সেই আষাঢ়ে গল্প? আমি পাব-এ গেছি।” পোপ টেবিলে আঙুল ঠুকল। “ওখানে কোনো মহিলা বারটেন্ডারই নেই, আর চার রাত আগে ওখানকার কেউ তোমাকে দেখেওনি।”
“তাহলে কেউ মিথ্যে বলছে।”
“তো আমার প্রশ্ন হলো… তোমার ওয়েওয়ার্ড পাইনসে আসার আসল কারণটা কী?”
“আমি আগেও বলেছি তোমাকে।”
“তোমার তথাকথিত—” দু’হাতে এয়ার কোট করল, “—‘ইনভেস্টিগেশন’?”
ইথান গভীর শ্বাস নিল। বুকের ভেতর রাগ গমগম করছে। মাথাটা আবার যন্ত্রণায় ফেটে পড়ছে, জানে এর অর্ধেকই পোপের শটগান স্টকের বদন্যতায়, কিন্তু বাকি অর্ধেকটা সেই পুরনো ব্যথা যেটা নদীর ধারে জ্ঞান ফেরার পর থেকেই পিছু ছাড়ছে না, যখন সে জানত না সে কে বা কোথায় আছে।
আর তার সঙ্গে আছে এক অস্বস্তিকর দেজাভু, মনে হচ্ছে এই জেরা যেন আগেও কোথাও হয়েছে।
“এই জায়গাটায় কিছু একটা গোলমাল আছে,” ইথান বলল, বুকের ভেতর জমে ওঠা কালো মেঘের মতো আবেগে কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠেছে, চার দিনের যন্ত্রণা, বিভ্রান্তি আর নিঃসঙ্গতার সব মিলিয়ে। “আজ রাতে আমি আমার পুরনো পার্টনারকে দেখেছি।”
“কে?”
“কেট হিউসন। আমি তোমাকে বলেছিলাম তার কথা। কিন্তু সে এখন বুড়ি হয়ে গেছে। অন্তত কুড়ি বছর বেশি বয়স্ক। এটা কীভাবে সম্ভব? বলো।”
“অসম্ভব।”
“তাহলে কেন আমি বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না? শহর থেকে বেরোনোর রাস্তা নেই কেন? এটা কি কোনো পরীক্ষার অংশ?”
“অবশ্যই রাস্তা আছে। তুমি বুঝতে পারছো তোমার কথাবার্তা এখন কতটা পাগলের মতো শোনাচ্ছে?”
“এই জায়গাটায় কিছু একটা ভয়ানক গোলমাল আছে।”
“না, ভুলটা তোমার ভেতরে। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।”
“কী বুদ্ধি?”
“আমি তোমাকে একটা কাগজ দিচ্ছি। আমাকে যা যা বলতে চাও সব লিখে ফেলো। আশা করি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তোমার হয়ে যাবে, ঠিক না?”
এই অফারে ইথান জমে গেল।
পোপ বলে চলল। “অথবা আমার মাথায় যদি একটা কালো হুড থাকে তাহলে হয়তো তুমি তাড়াতাড়ি জবাব দেবে, না-কি? কিংবা তুমি যদি মনে কর তোমার পায়ের সাথে দড়ি বেঁধে উল্টো করে ঝোলালে সব ঠিক ঠিক মনে পড়বে, তাহলে সেটাও করতে পারি আমরা। শুধু উল্টো করে ঝোলালে হবে, না-কি সাথে কাটাছেঁড়াও করা লাগবে তোমাকে? তোমার কাটাছেঁড়া হতে ভালো লাগে, ইথান?” পোপ পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা জিনিস বের করে টেবিলের ওপার ছুঁড়ে দিল।
ইথান বলল, “এটা তোমার কাছে ছিল?” সে ওয়ালেটটা তুলে খুলল। ক্লিয়ার প্লাস্টিক স্লিভে সিক্রেট সার্ভিসের পরিচয়পত্র, কিন্তু সেটা তার নয়। ব্যাজটা ইস্যু করা হয়েছে উইলিয়াম ভি. ইভান্সের নামে।
“আমারটা কোথায়?” ইথান জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ। কোথায়? উইলিয়াম ইভান্স। স্পেশাল এজেন্ট। সিক্রেট সার্ভিস। বোইজি ফিল্ড অফিস। আবার বলো তো, পরিত্যক্ত বাড়িতে লাশটা যে ওর, সেটা যেন তুমি কীভাবে বুঝলে?”
“আমি তোমাকে বলেছি। আমাকে পাঠানো হয়েছিল ওকে আর কেট হিউসনকে খুঁজতে।”
“ওহ তাই তো। বারবারই ভুলে যাচ্ছি। আর আমি সিয়াটলে ফোন করে তোমার এজেন্ট হাসলারের সাথে কথা বলেছিলাম। সে তোমার নামও শোনেনি জীবনে।”
ইথান আরও রক্ত মুছল মুখ থেকে, চেয়ারে এগিয়ে সামনে ঝুঁকল। “আমি জানি না তুমি কী খেলা—”
“আমার থিওরি হলো এজেন্ট ইভান্স তোমাকে ধাওয়া করছিল এবং শেষ পর্যন্ত ওয়েওয়ার্ড পাইনসে এসে ধরে ফেলে। ফলে তুমি ওকে খুন করো আর ওর পার্টনার, এজেন্ট স্টলিংসকে অপহরণ করে ওদের গাড়ি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করো। কিন্তু এইখানে এসে তুমি ভাগ্যের কাছে মার খেয়ে যাও। তোমার গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়, স্টলিংস মারা যায়; আর তুমি মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পাও। হয়তো তোমার দু-চারটা স্ক্রুও খুলে পড়ে গিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর তুমি নিজেকেই সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট ভাবতে শুরু করো।”
“আমি জানি আমি কে।” ইথান বলল।
“সত্যিই? তোমাকে অদ্ভুত লাগে না যে কেউ তোমার আইডি খুঁজে পাচ্ছে না?”
“হ্যাঁ, কারণ তোমরা সেটা ইচ্ছা করে—”
“ওহ, হ্যাঁ। তাই তো। আমরা সবাই বিশাল ষড়যন্ত্রের অংশ।” পোপ হাসল। “তুমি কি কখনও ভেবেছো যে হয়তো ইথান বার্কের ব্যাজটা কেউ খুঁজে পাচ্ছে না কারণ সেটাই অস্তিত্বেই নেই? কারণ তোমারই অস্তিত্ব নেই?”
“তুমি পাগল।”
“আমার মনেহয় তুমি কল্পনা একটু বেশি করছ, পার্টনার। তুমি এজেন্ট ইভান্সকে মেরে ফেলেছ, তাই না—”
“না।”
“—তুমি একটা অসুস্থ, বদ্ধ-উন্মাদ। ওকে কী দিয়ে পিটিয়ে মেরেছ?”
“জাহান্নামে যাও।”
“মার্ডার ওয়েপন কোথায়, ইথান?”
“মারা খাও।” ইথান রাগে ফুঁসছে, বিস্ফোরিত হবে যেকোনো সময়।
“দেখো,” পোপ বলল, “আমি জানি না তুমি কি দারুণ মিথ্যাবাদী, না-কি ডিল্যুশনাল, হয়তো নিজের মিথ্যাগুলো নিজেই বিশ্বাস করো।”
ইথান উঠে দাঁড়াল। পা টলমল করছে। গা গোলাচ্ছে খুব, যেকোনো সময় বমি হয়ে যেতে পারে। কপালের কাটা থেকে রক্ত ঝরেই যাচ্ছে ক্রমাগত।
“আমি যাচ্ছি,” ইথান বলল, শেরিফের পেছনের দরজা ইঙ্গিত করে। “খোলো ওটা।”
পোপ নড়ল না। বলল, “নিজের বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেলতে না চাইলে চেয়ারে গিয়ে বসে পড়।” তার কণ্ঠে আস্থা ছিল, এমন এক মানুষের আস্থা যে তার হুমকি বাস্তবায়নের ক্ষমতা রাখে। অতীতে বহুবার করেছে এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও করবে।
ইথান টেবিল ঘুরে পোপের পাশ দিয়ে পেছনে চলে গেল। দরজার হাতল ধরে টানল কয়েকবার। তালা মারা।
“তোমার পাছাটা কি চেয়ার থেকে তুলতে বলেছি? আমাদের কথা তো এখনো শুরুই হয়নি।”
“দরজা খুলো।”
পোপ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হলো ইথানের। একেবারে কাছে নিয়ে এল চেহারা, এত কাছে যে তার নিঃশ্বাসে কফির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, দাঁতের দাগগুলোও দেখা যাচ্ছে। পোপের উচ্চতা ইথানের চেয়ে প্রায় চার ইঞ্চি বেশি, আর ওজন অন্তত চল্লিশ পাউন্ড ভারী।
“তোমার কি ধারণা আমি তোমাকে বসাতে পারব না, ইথান? এমন কাজ করা আমার সাধ্যের বাইরে?”
“তুমি বেআইনিভাবে আটকে রেখেছ।”
পোপ হেসে ফেলল। “তুমি ভুল পথে ভাবছ, ছেলে। এই ঘরের মধ্যে আইন বা সরকার বলে কিছু নেই। এখানে শুধু তুমি আর আমি। তোমার ছোট্ট দুনিয়ার একমাত্র কর্তৃত্ব আমার, আর সেই দুনিয়ার সীমানা হলো এই চার দেয়াল। আমি চাইলে এখনই তোমাকে মেরে ফেলতে পারি।”
ইথান কাঁধের পেশীতে ঢিল দিল। দুই হাত ওঠাল, তালু সামনের দিকে। এমন ভঙ্গিতে যেন আত্মসমর্পণ করছে। আশা করল, পোপ ওটা পরাজয়ের বা শ্রদ্ধার ভঙ্গি ভেবে নেবে। সে মাথা সামান্য পেছনে টেনে, থুতনি নামিয়ে বলল, “ঠিক আছে, তুমি ঠিক বলছো। আমাদের কথা চালিয়ে যাওয়া উচি—”
—আর সাথে সাথে এমনভাবে লাফিয়ে উঠল যেন তার পায়ের গোড়ালিতে স্প্রিং লাগানো, কপালের পুরো প্লেটটা সরাসরি মেরে দিল পোপের নাকে।
একটা ভয়াবহ কড়মড় শব্দ—কার্টিলেজ ভাঙার আওয়াজ। রক্ত ছিটকে এল, ইথানের চুল ভিজে গেল পোপের উষ্ণ রক্তে। পোপের সিডার গুঁড়ির মতো উরু দুটো ধরে ফেলল সে, নিজের হাঁটু ভাঁজ করে সজোরে কাঁধ মেরে দিল শেরিফের পেটে। পোপ ইথানের গলা হাতের ভাঁজে চেপে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
পোপের বুটের গোড়ালি পিছলে গেল, মেঝে পিচ্ছিল হয়ে ছিল রক্তে। ক্ষণিকের জন্য পোপের বিশাল দেহ ওজনহীন হয়ে গেল, সজোরে আছড়ে পড়ল কংক্রিটের ওপর। পোপের বুক থেকে হাওয়া বেরিয়ে গেল ফুঁশ করে। ইথান উঠে শেরিফের বুকের ওপর চেপে বসল, ডান হাতটা পিছিয়ে আনল পাম-হিল স্ট্রাইক মারার ভঙ্গিতে।
কিন্তু পোপ নিতম্ব ঘুরিয়ে ইথানকে ছুড়ে দিল নিজের উপর থেকে। ছিটকে গিয়ে কাঠের টেবিলের কোণায় লেগে গাল ফেটে গেল তার। ইথান চোখের সামনে সর্ষে ফুল দেখল যন্ত্রণায়। ধূসর দৃষ্টি নিয়েই উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল সে। ডান পাশ থেকে আসা ঘুষিটা দেখতে পেল ঠিকই, কিন্তু সেকেন্ডের ভগ্নাংশ দেরিতে।
ইথানের মাথা ঝাপসা না থাকলে হয়তো ঘুষিটা প্রতিহত করতে পারত। কিন্তু এখন সে চলছে অর্ধেক গতিতে। ঘুষিটার শক্তি এত তীব্র হলো যে ইথানের মাথা ঝট করে এমনভাবে ঘুরে গেল যে মেরুদণ্ডের নিচে টিক করে আওয়াজ হলো।
এক সেকেন্ড পরেই আবিষ্কার করল, সে কাঠের টেবিলের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে, অর্ধচেতন। এক চোখে দেখতে পাচ্ছে বিকৃত মুখের উন্মাদ শেরিফকে আরেকটা ঘুষি বাগিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তার উপর। থ্যাঁতলানো নাক চেহারার সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে যেন ওটার ভেতরে কোনো বিস্ফোরণ ঘটেছে।
ইথান হাত তুলে মুখ ঢাকার চেষ্টা করল, কিন্তু শেরিফের ঘুষি সহজেই ওর হাত ভেদ করে গেল। সরাসরি আছড়ে পড়ল নাকের উপর। চোখ থেকে পানি গড়াতে শুরু করল, আর মুখ থেকে রক্ত।
“তুই কে?” গর্জে উঠল শেরিফ।
ইথান উত্তর দিতে পারল না। তার চেতনা ফসকে যাচ্ছে। চারপাশ ঘুরছে, আর মাঝে মাঝে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে অন্য এক জায়গার ঝলক, অন্য এক জীবনের টুকরো…
গোলান বস্তির সেই ছোট্ট ঘরটায় ফিরে এসেছে সে। বাদামী দেয়াল, মাটির মেঝে। মাথার ওপরে একটিমাত্র নগ্ন বাল্ব দুলছে, আলোর কাঁপনে দেয়ালে ছায়া নড়ছে ধীরে ধীরে।
আশিফ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মাথায় কালো হুড, মুখের বেশিরভাগ ঢেকে আছে। দেখা যাচ্ছে শুধু অশুভ বাদামি দুই চোখ আর সেই সাথে এক পাটি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, নিখুঁত দাঁতের হাসি। এমন দাঁত দেখে মনে হয় না, লোকটা চতুর্থ বিশ্বের কোনো দেশের বাসিন্দা। অথচ ইথান নিশ্চিত, এই ভয়ংকর মানুষটা জন্মেছে মধ্যপ্রাচ্যেরই কোনো নরকসম দেশে।
ইথানের দুই কব্জি বাঁধা ছাদের সঙ্গে বোল্ট করা চেইনের প্রান্তে। শরীর ঝুলে আছে। পা মাটি ছুঁইছুঁই। রক্ত চলাচল ঠিক রাখতে সে মাঝেমধ্যে আঙুল নামিয়ে হাতের টানটা হালকা করার চেষ্টা করে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের বেশি সম্ভব নয়। পুরো শরীরের ভার আঙুলে নেমে আসে, হাড় যেন ভেঙে যাবে মনে হয়। একবার যদি সত্যি ভেঙে যায়, তাহলে তার হাতের ক্ষত থেকে রক্তপাত থামানোর কোনো উপায়ই থাকবে না।
আশিফ ইথানের মুখ থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। নাকে নাক লেগে যাচ্ছে প্রায়।
“একটা সহজ প্রশ্ন চেষ্টা করি, যার উত্তর দিতে তোমার কোনো সমস্যাই হওয়া উচিত না… তুমি আমেরিকার কোন অংশের লোক, চিফ ওয়ারেন্ট অফিসার ইথান বার্ক?” লোকটা জিজ্ঞেস করল পারফেক্ট ইংরেজিতে, যার মধ্যে চাপা একটা ব্রিটিশ টান আছে।
“ওয়াশিংটন।”
“রাজধানী?”
“না, স্টেট।”
“আহ। তোমার সন্তান আছে?”
“না।”
“তবে বিয়ে হয়েছে।”
“হ্যাঁ।”
“তোমার স্ত্রীর নাম কী?”
ইথান উত্তর দিল না, আরেকটা ঘুষির জন্য প্রস্তুত হলো।
আশিফ হাসল। “আরাম করো। আপাতত আর ঘুষি দেব না। তুমি কি ‘হাজার কাটায় মৃত্যু’ কথাটা শুনেছ?” একটা রেজার উঁচু করে দেখাল সে। চকচক করে উঠল বাল্বের আলোয়। “এটা চীনের একটি মৃত্যুদণ্ড পদ্ধতি। ১৯০৫-এ রহিত করা হয়। এর চীনা নাম লিঙচি, ট্রান্সলেট করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘স্নো স্নাইসিং’ বা ‘দ্য লিঙ্গারিং ডেথ’।”
আশিফ পাশেই খুলে রাখা ব্রিফকেসটা ইঙ্গিত করল, ভেতরে শক্ত কালো ফোমের খাঁজে কিছু ভয়ংকর দর্শন কাটলারি রাখা যেগুলো ইথান গত দুই ঘণ্টা ধরে উপেক্ষা করার চেষ্টা করছে।
পোপ আবার আঘাত করল ইথানকে। সেই আঘাত আর রক্তের গন্ধে ফালুজার টর্চার হাউসের আরও স্মৃতি বের করে আনল।
“তোমাকে এখন একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে, লেখার জন্য একটা কলম আর কাগজ দেয়া হবে। সময় পাবে এক ঘণ্টা। তুমি জানো আমি কী চাই,” আশিফ বলল।
“আমি জানি না।”
আশিফ ইথানের তলপেটে ঘুষি বসাল। পোপ ইথানের মুখে ঘুষি মারল।
“তোমাকে মারতে মারতেও ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। তুমি জানো আমি কী চাই। কীভাবে জানবে না? অন্তত বিশবার তোমাকে বলেছি। শুধু বলো যে তুমি জানো। বলো!” আশিফ গর্জে উঠল।
“কে তুই?” পোপ চেঁচাল।
“আমি জানি।” ইথান খাবি খেল।
“এক ঘণ্টা। এরমধ্যে আমাকে খুশি করার মতো কিছু লিখতে না পারো, আজকে লিঙচির মজা টের পাবে।”
আশিফ তার কালো আলখাল্লার পকেট থেকে একটা পোলারয়েড ছবি বের করল। ইথান চোখ বন্ধ করে ফেলল, কিন্তু পরক্ষণেই মেলতে বাধ্য হলো আশিফের চিৎকারে। “এইটা দেখ, নয়তো তোর চোখের পাতা কেটে নেব।”
এই ঘরেরই ছবি ওটা। একইভাবে কব্জিতে চেইন দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা। আমেরিকান। সম্ভবত একজন সৈনিক, যদিও নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তিন মাস ধরে যুদ্ধে আছে ইথান, কিন্তু ছবির মতো এমন বীভৎস অবস্থা কোনো মানুষের দেখেনি।
“ছবির এই লোক তোমার দেশি ভাই। তখন পর্যন্ত জীবিত ছিল সে,” তার নিপীড়ক বলল, গর্বের একটা আভা কণ্ঠে জড়িয়ে।
ইথান চোখ খুলে পোপকে দেখার চেষ্টা করল। চেতনা হারানোর দ্বারপ্রান্তে সে। সেও চাইছে হারিয়ে যাক। তাহলে বর্তমান যন্ত্রণা আর টর্চার ঘরের আশিফের প্রতিকৃতি থেকে মুক্তি মিলবে।
“এরপর যে মানুষটা এই ঘরের ছাদের থেকে ঝুলবে, সেও তোমার এমন একটা পোলারয়েড দেখতে পাবে,” আশিফ বলল। “আমার কথা বুঝতে পারছ? আমি তোমার নাম জানি। আমার একটি ওয়েবসাইটও আছে। তোমার সাথে যা করব সেসবের ছবি পোস্ট করব যেন সারাবিশ্ব দেখতে পায়। হয়তো তোমার স্ত্রীও দেখবে। অতএব আমি যা জানতে চাই, সব লিখে দাও। পেটের মধ্যে কোনটা থাকা ভালো—গোপন কথা না-কি তোমার নাড়িভুড়ি?”
“কে তুই?” পোপ জিজ্ঞেস করল।
ইথান শিথিল হয়ে শরীরের দুই পাশে ঝুলে পড়ল।
“কে তুই?”
আর নিজেকে রক্ষা করার সব চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছে সে; মনে মনে ভাবছে, ফালুজার সেই ঘর, যে বাসি রক্তের গন্ধ কখনো আমাকে ছেড়ে যায়নি।
ইথান পোপের কাছ থেকে শেষ একটা দয়া কামনা করছে মনে মনে। ক্যুপ ডি গ্রাস আসুক—আরেকটা পূর্ণ শক্তির আঘাত—অচেতন করে দিক তাকে, অতীত স্মৃতিগুলো খুন হয়ে যাক, সাঙ্গ হোক বর্তমান যন্ত্রণা।
দুই সেকেন্ড পর সেটা এলো, চিবুকের উপর ভয়ংকর ঘুষি হয়ে। চোখের সামনে যেন ফ্ল্যাশবাল্ব ঝলসে উঠল, সাদা হয়ে গেল পুরো দুনিয়া। জ্ঞান হারাল সে।
