অধ্যায় ২
এক মহিলা চোখ নামিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হাসছে সে। ঝকঝকে দাঁতের মুখভর্তি হাসি। তার দাঁতগুলো দেখতে বেশ সুন্দর, ভাবল সে। যদিও ঘোলাটে, দ্বৈত-দৃষ্টির কারণে নিশ্চিতভাবে বোঝা কঠিন। আরেকটু ঝুঁকল মহিলা, তার দুটো মাথা মিলে এক হলো অবশেষে, স্পষ্ট হয়ে উঠল মুখাবয়ব। এবার সে নিশ্চিত হলো মহিলা আসলেই সুন্দরী। তার পরনে হাফ-হাতার সাদা ইউনিফর্ম, হাঁটুর সামান্য উপরে শেষ হয়েছে সেটা। পুরোটাই বোতাম লাগানো।
বারবার তার নাম ধরে ডাকছে সে।
“মিস্টার বার্ক? মিস্টার বার্ক, শুনতে পাচ্ছেন? মিস্টার বার্ক?”
মাথাব্যথাটা উধাও। ধীরে ধীরে, সাবধানে লম্বা নিঃশ্বাস টানল সে। তবে পাঁজরে খোঁচা লাগতেই থেমে গেল। নিশ্চয়ই তার মুখ বিকৃত হয়ে গিয়েছিল, কারণ নার্স বললেন, “আপনি কি এখনো বাঁ-পাশে অস্বস্তি বোধ করছেন?”
“অস্বস্তি?” সে কাতর হেসে বলল, “হ্যাঁ, আমি অস্বস্তি বোধ করছি। এটাকে অস্বস্তি বলা যায় বটে।”
“আপনি চাইলে আমি ব্যথার জন্য আরেকটু কড়া ওষুধ দিতে পারি।”
“থাক, সামলে নেব।”
“ঠিক আছে, তবে সামলে নিতে গিয়ে আবার শহীদ হয়ে যাবেন না, মিস্টার বার্ক। আপনার আরামের জন্য যা দরকার, স্রেফ আমাকে বলবেন। আমি আপনার জন্যই আছি। আমার নাম প্যাম, বাই দ্য ওয়ে।”
“ধন্যবাদ, প্যাম। আমার মনে হয় আমি আগেও আপনাকে এখানে দেখেছি। এমন ক্লাসিক নার্স ইউনিফর্ম ভোলা সম্ভব না। ভেবেছিলাম আজকাল এগুলো উঠেই গেছে।”
প্যাম হেসে উঠল। “আপনার স্মৃতি ফিরতে শুরু করেছে শুনে ভালো লাগল। খুবই ভালো খবর এটা। কিছুক্ষণের মধ্যে ডক্টর মিত্র চলে আসবেন। উনিই দেখছেন আপনাকে। উনি আসার আগে যদি আপনার ব্লাড প্রেসার মেপে নিই, কোনো আপত্তি আছে?”
“আপত্তি কেন হবে। মেপে নিন।”
“চমৎকার।”
নার্স প্যাম বিছানার পায়ের কাছে রাখা ট্রলি থেকে ব্লাড প্রেসার মেশিনটা বের করে তার বাম বাইসেপে কাফ বেঁধে দিল। “আপনি আমাদের কিন্তু বেশ ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন মিস্টার বার্ক,” সে বলল কাফ ফোলাতে ফোলাতে। “ওই অবস্থায় কোথায় চলে গেলেন…”
কিছুক্ষণ নীরবে ডায়ালের কাঁটা নামতে দেখল প্যাম।
“পাস করেছি?” বার্ক জিজ্ঞেস করল।
“এ-প্লাস। সিস্টোলিক একশ বাইশ, ডায়াস্টোলিক পঁচাত্তর।” কাফের ভেলক্রো খুলতে খুলতে বলল সে। “যখন আপনাকে আনা হয়, আপনি পুরো বিকারগ্রস্ত—নিজের নাম-ধাম কিছুই বলতে পারছিলেন না।”
বিছানায় উঠে বসল সে। মাথার কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। একটা প্রাইভেট হাসপাতালের কেবিনে আছে সে। রুমটা চেনা চেনা লাগছে। বিছানার পাশেই জানালা, ব্লাইন্ড টানা। তবে যেটুকু আলো ঢুকছে, তাতে মনে হচ্ছে হয় খুব ভোর, নয়তো এখনই সন্ধ্যা নামবে।
“আপনারা আমাকে কোথায় পেয়েছেন?”
“ম্যাক স্কোজির বাড়ির উঠানে। আপনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। ওখানে কেন গিয়েছিলেন মনে আছে? ম্যাক বলছিল, আপনি বেশ উৎকণ্ঠিত ও বিভ্রান্ত ছিলেন।”
“গতকাল নদীর ধারে জেগে উঠেছিলাম। আমি কে বা কোথায় আছি কিছুই মনে করতে পারছিলেন না।”
“আপনি হাসপাতাল থেকে পালিয়েছিলেন। মনে নেই?”
“না। আমি স্কোজির বাসায় গিয়েছিলাম কারণ ফোনবুকে ও-ই একমাত্র ম্যাক।”
“বুঝলাম না।”
“মানে, ম্যাক নামটা আমাকে খুব টানছিল।”
“কেন?”
“কারণ দুর্ঘটনার আগে আমি শেষ যে শব্দটা পড়েছিলাম, সেটা ছিল ‘ম্যাক’।”
“আচ্ছা তাই তো… একটা ম্যাক ট্রাক আপনার গাড়িটাকে ধাক্কা দিয়েছিল।”
“ঠিক তাই।”
“মস্তিষ্ক বড় অদ্ভুত জিনিস,” নার্স বলল। বিছানা ঘুরে জানালার দিকে এগিয়ে গেল সে। “এর কাজকারবার খুব রহস্যময়। কোত্থেকে যে কী সম্পর্ক খুঁজে বের করে, বোঝা দায়।”
“আমাকে এখানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে কতক্ষণ আগে?”
ব্লাইন্ড তুলল নার্স। “দেড় দিন।”
আলো ঢুকল ভেতরে। আসলে সকাল হয়ে গেছে। পূর্বের পর্বতশ্রেণী ছাড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে সূর্যটা।
“আপনার কিন্তু প্রচণ্ড কনকাশন হয়েছিল,” তিনি বললেন। “মারাও যেতে পারতেন।”
“আমারও মনে হচ্ছিল আমি মরে যাচ্ছি।” সকালে নরম মোহময় আলোয় রুমটা যেন অন্যরকম লাগছে।
“এখন আপনার স্মৃতির কী অবস্থা?” প্যাম জিজ্ঞেস করলেন।
“আশ্চর্য ব্যাপার। দুর্ঘটনার কথা মনে পড়তেই বাকি সব আপনাআপনি ফিরে এলো। মনে হলো যেন কেউ স্মৃতির সুইচটা টিপে দিয়েছে। এজেন্ট স্টলিংস কেমন আছেন?”
“কে?”
“দুর্ঘটনার সময় ফ্রন্ট প্যাসেঞ্জার সিটে ছিল যে।”
“ওহ।”
“ওকে বাঁচানো যায়নি, তাই না?”
নার্স প্যাম আবার বিছানার পাশে ফিরে এলো। আলতো করে হাত রাখল তার কব্জিতে। “দুঃখিত, সম্ভব হয়নি।”
সে তাই অনুমান করেছিল। যুদ্ধের পর আর এমন ভয়াবহ মৃত্যু দেখেনি। তবু অনুমান সত্যি হওয়ায় ভেতরে ধাক্কা খেল সে।
“আপনারা কি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন?” নার্স জিজ্ঞেস করল।
“না। সেদিনই প্রথম পরিচয়।”
“খুব খারাপ হয়েছে। আমি সত্যিই দুঃখিত।”
“আমার ড্যামেজ কতটুকু?”
“মানে?”
“আমার ইনজুরি?”
“ডক্টর মিত্র ভালো বলতে পারবেন। তবে কনকাশন হয়েছিল, সেটা এখন সেরে গেছে। পাঁজরের কয়েকটা হাড়ে চিড় ধরেছে। আর অল্প কিছু কাটাছেঁড়া, কালশিটে দাগ। সব দিক বিবেচনা করলে, আপনার অবস্থা আরও অনেক খারাপ হতে পারত।”
সে ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগোল, কিন্তু হাতল টানার আগে থেমে কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল।
“তো,” বলল সে। “আপনার স্মৃতি ফেরার ব্যাপারটা আমরা নিশ্চিত তো?”
“একদম।”
“আপনার প্রথম নাম কী?”
“ইথান,” সে বলল।
“চমৎকার।”
“একটা উপকার করতে পারবেন?” ইথান জিজ্ঞেস করল।
প্যাম বিশাল, ঝলমলে হাসি দিলো। “বলুন।”
“আমার কয়েকটা কল করা দরকার। আমার স্ত্রী। আমার এসএসি। কেউ কি ওদের সাথে যোগাযোগ করেছে?”
“আমার মনে হয় শেরিফের অফিস থেকে দুর্ঘটনার পরপরই আপনার জরুরি যোগাযোগ নম্বরে খবর পাঠিয়েছে। আপনার কী হয়েছিল এবং বর্তমান অবস্থা জানানো হয়েছে তাদের।”
“দুর্ঘটনার সময় আমার কোটের পকেটে একটা আইফোন ছিল। সেটা কোথায় আছে বলতে পারেন?”
“না, তবে আপনি চাইলে আমি ন্যান্সি ড্র’র মতো গোয়েন্দাগিরি করে দেখতে পারি।”
“কৃতজ্ঞ থাকব।”
“ওখানে রেলিং-এর পাশে ছোট লাল বোতামটা দেখছেন?” ইথান তাকিয়ে দেখল। “আমি শুধু এক ক্লিক দূরে।”
নার্স প্যাম আরও একবার উজ্জ্বল হাসির ঝলকানি দিয়ে বেরিয়ে গেল।
***
ঘরে টেলিভিশন নেই, টেলিফোনও নেই। একমাত্র বিনোদন বলতে দরজার ওপরে ঝোলানো দেয়াল ঘড়িটা। বিছানায় শুয়ে রইল সে, মিনিটের কাঁটার একটানা চক্কর দেখতে দেখতেই সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, তারপর দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
সে নিশ্চিত না, তবে তার রুমটা সম্ভবত তৃতীয় বা চতুর্থ তলায়। নার্স প্যাম জানালার ব্লাইন্ড খোলা রেখে গিয়েছিল, আর ঘড়ি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে একসময় শরীর ঘুরিয়ে ভালো পাশে ভর দিয়ে বাইরে তাকাল ওয়েওয়ার্ড পাইনস শহরটা দেখার জন্য।
তার অবস্থান থেকে সোজা প্রধান সড়কটা দেখতে পাচ্ছে সে, সাথে দুই পাশে কয়েকটা করে ব্লক। এখানে আসার আগে থেকেই সে জানত, এটা ছোট্ট, নিস্তব্ধ শহর। তারপরও অস্বাভাবিক মাত্রার নিশ্চলতা অবাক করল তাকে। পুরো এক ঘণ্টা কেটে গেল, এই সময়ের মধ্যে হাসপাতালের সামনে দিয়ে ডজনখানেক লোক হেঁটে গেছে কেবল, অথচ শহরের ব্যস্ততম রাস্তা দিয়ে একটা গাড়িও যেতে দেখল না। একমাত্র প্রাণচাঞ্চল্য বলতে দুই ব্লক দূরে একদল নির্মাণশ্রমিক একটা বাড়ি তৈরির কাজ করছে।
সিয়াটলে ফেলে আসা স্ত্রী আর ছেলের কথা ভাবল সে। আশা করল, ওরা নিশ্চয়ই এতোক্ষণে রওনা দিয়ে দিয়েছে। হয়তো প্রথম যে ফ্লাইট পেয়েছে সেটাতেই উঠে পড়েছে। ফ্লাইটে বোইজি বা মিসুলা পর্যন্ত আসতে পারবে ওরা। তারপর ভাড়া গাড়িতে ওয়েওয়ার্ড পাইনসের দীর্ঘ পথ।
আবার যখন ঘড়ির দিকে তাকাল, তখন বিকেল পৌনে চারটা। সারাদিন এই বিছানায় পড়ে আছে সে, অথচ ডক্টর মিত্র না কি ঘোড়ার ডিম নাম লোকটার, একবারও এই রুমে আসার প্রয়োজনই মনে করল না। হাসপাতালে কম দিন কাটায়নি সে, তার অভিজ্ঞতা মতে, ডক্টর আর নার্সরা কখনো রোগীদের দশ মিনিটও একা থাকতে দেয় না। সারাক্ষণই কোনো না কোনো নতুন ওষুধ আর পরীক্ষার নামে বিরক্ত করে।
অথচ, এখানে ওরা যেন তার কথা ভুলেই গেছে। এমনকি নার্স প্যামও তার আইফোন আর অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে এলো না। এই নির্জন শহরের হাসপাতাল কতটা ব্যস্ত হতে পারে?
সে রেলিংয়ের সাথে লাগানো কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে হাত বাড়াল। বৃদ্ধাঙ্গুলটা জোরে ঠেসে ধরল নার্স কল বোতামে।
পনেরো মিনিট পর দরজা খুলে নার্স প্যাম ঢুকল ঘরে। “ওহ মাই গড, আমি ভীষণ দুঃখিত! আপনার কলটা একদম এখনই দেখলাম। আমাদের ইন্টারকমে বোধহয় সমস্যা হচ্ছে।” বিছানার পায়ার কাছে দাঁড়িয়ে রেলিংয়ে হাত রেখে বলল, “কীভাবে সাহায্য করতে পারি, ইথান?”
“ডক্টর মিত্র কোথায়?”
সে মুখ কুঁচকাল। “সারাদিন জরুরি অস্ত্রোপচারে ব্যস্ত ছিলেন। পাঁচ ঘণ্টার ভয়ংকর কেস!” একটু হেসে বলল, “তবে আজ সকালে আপনার স্বাস্থ্যের বর্তমান অবস্থা এবং স্মৃতি ফিরে পাওয়ার দারুণ অগ্রগতি সম্পর্কে ওনাকে বলেছি। উনি বলেছেন, আপনার প্রগ্রেস একেবারে ফাটাফাটি।” সে ইথানকে ডাবল থাম্বস আপ দেখাল।
“উনি আমাকে দেখতে আসবেন কখন?”
“ডিনারের পর রাউন্ডে আসবেন সম্ভবত। আর আধ-ঘণ্টার মধ্যেই খাবার চলে আসবে।”
ক্রমশ বেড়ে চলা বিরক্তি চাপতে বেগ পেতে হলো তার। “দুর্ঘটনার আগে আমার সঙ্গে আমার ফোন, ওয়ালেট, আর একটা কালো ব্রিফকেস ছিল। সেগুলো খুঁজে পেয়েছেন?”
নার্স প্যাম তাকে হাফ-স্যালুট দিয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে মার্চ করার ভঙ্গি করল। “কাজ চলছে, ক্যাপ্টেন।”
“তাহলে প্লিজ একটা ল্যান্ডলাইন দিন। আমাকে কয়েকটা কল করতে হবে।”
“অবশ্যই, মার্শাল।”
“মার্শাল?”
“আপনি কি ইউএস মার্শাল নন?”
“না, আমি ইউনাইটেড স্টেটস সিক্রেট সার্ভিসের স্পেশাল এজেন্ট।”
“সত্যি?”
“সত্যি।”
“আমি তো ভেবেছিলাম আপনারা শুধু প্রেসিডেন্টকে প্রোটেকশন দেন।”
“আরও কিছু কাজ সামলাই আমরা।”
“তাহলে আমাদের এই ছোট্ট স্বর্গরাজ্যে কী কারণে এলেন?”
ইথান তাকে শীতল, সূক্ষ্ম একটা হাসি দিল। “ওটা বলা সম্ভব না।” আসলে সে চাইলে বলতে পারে, কিন্তু এখন এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
“এখন তো আপনি আমার কৌতূহল বাড়িয়ে দিলেন।”
“ফোন, প্যাম।”
“জি?”
“আমার সত্যিই একটা ফোন দরকার।”
“ঠিক আছে, এখনই যাচ্ছি।”
***
অবশেষে যখন রাতের খাবার এলো—চকচকে ধাতব ট্রের আলাদা আলাদা খোপে সাজানো সবুজ আর বাদামি রঙের থকথকে কিছু পদার্থ—কিন্তু ফোন এলো না, তখনই ইথান ঠিক করল, এখানে আর নয়।
হ্যাঁ, আগেও সে একবার এখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তখন তার চিন্তাভাবনা পরিষ্কার ছিল না, ভয়াবহ কনকাশনের ধকলে প্রায় অচেতন অবস্থা।
এখন মাথা ঠাণ্ডা।
মাথাব্যথা নেই, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে না, পাঁজরের ব্যথাও অনেক কম। তার অবস্থা নিয়ে যদি সত্যিই ডাক্তারের কোনো চিন্তা থাকত, তাহলে আহাম্মকটা গত দশ ঘণ্টায় নিশ্চয়ই একবার হলেও এসে তাকে দেখে যেত।
ইথান নার্স প্যাম বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল। বের হওয়ার আগে মহিলা একচোট মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, “হাসপাতালের খাবার দেখতে খারাপ হলেও খেতে কিন্তু অনেক ভালো!”
দরজা বন্ধ হওয়া মাত্র ইথান কব্জি থেকে স্যালাইনের সুচ টেনে বের করল, আর রেলিং টপকে নেমে পড়ল মেঝেতে। ঠাণ্ডা লিনোলিয়ামের মেঝে তার নগ্ন পায়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। সে এখনও পুরোপুরি সুস্থ না, তারপরও গত আটচল্লিশ ঘণ্টার তুলনায় অবস্থা অনেকগুণ ভালো।
সে পা টিপে টিপে আলমারির কাছে গিয়ে দরজা টানল। শার্ট, কোট, আর প্যান্ট হ্যাঙ্গারে ঝুলছে, সেগুলোর নিচে আলমারির মেঝেতে পড়ে আছে তার জুতোজোড়া। মোজা নেই। আন্ডারওয়্যারও নেই। আজকে কমান্ডো ছাড়া গতি নেই।
প্যান্ট পরার জন্য ঝুঁকতেই বাঁ পাঁজরে তীক্ষ্ণ খোঁচার মতো ব্যথা অনুভব করল সে। কিন্তু সোজা হয়ে দাঁড়াতেই মিলিয়ে গেল সেটা। নিজের নগ্ন পায়ের দিকে নজর পড়ল তার, সবসময় যেমনটা হয়, কাটা দাগগুলো তাকে বর্তমান থেকে ছিটকে ফেলল আট বছর অতীতে—তাকে নিয়ে গেল একটা বাদামি ঘরে, যেখানকার মৃত্যুর গন্ধ কোনোদিনও তার পিছু ছাড়বে না।
কোটের ভেতর পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখল পকেটনাইফটা এখনও আছে। স্বস্তি পেল। জিনিসটা এখন আর কোনো কাজে লাগানোর যোগ্য নেই, স্রেফ সৌভাগ্যের চিহ্ন হিসেবে সাথে রাখে সে। তার বয়স যখন বিশের কোঠায়, হেলিকপ্টার মেকানিক হিসেবে কাজ করত সে, জিনিসটা সেই সময়কার সঙ্গী। শুধু সাথে আছে জেনেই ভরসা পাওয়া যায়।
বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল সে। টাই বাঁধতে গিয়ে পাঁচবার গুলিয়ে ফেলল। আঙুলগুলো অনভ্যস্ত আর আনাড়ির মতো চলছে, যেন বহু বছর এই কাজ করেনি। শেষ পর্যন্ত কোনো মতে একটা উইন্ডসর নট বেঁধে, এক পা পিছিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখল ভালো করে।
মুখের কালশিটেগুলো কিছুটা হালকা হলেও কোটে এখনও ঘাস আর মাটির দাগ রয়ে গেছে। বাম পকেটের কাছে সামান্য ছেঁড়া। ভেতরে পরা সাদা অক্সফোর্ড শার্টের কলারের কাছে শুকনো রক্তের ছোপ।
গত ক’দিনে কোমরের মাপ কয়েক ইঞ্চি কমেছে। বেল্টের একেবারে শেষ ছিদ্র ব্যবহার করতে হলো, তবুও ঢিলে লাগছে প্যান্ট।
কল খুলে হাত ভিজিয়ে আঙুল চালাল চুলে। সিঁথি ঠিক করে ভদ্রস্থ করার চেষ্টা করল।
গরম পানিতে কুলকুচি করল কয়েকবার, কিন্তু দাঁতে এখনও শ্যাওলার মতো কিছু একটার আস্তর লেগে আছে মনে হলো।
বগল শুঁকে দেখল—দুর্গন্ধ। দাড়িও কামানো দরকার। গত বহু বছরে নিজেকে এতোটা অপরিচ্ছন্ন চেহারায় দেখেনি সে।
জুতো পরে ফিতে বাঁধল, তারপর বাথরুম থেকে বেরিয়ে দরজার দিকে এগোল।
প্রথমে ভাবল চুপিচুপি বেরিয়ে যাবে, কাউকে না জানিয়েই। সে নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে গেল এই ভাবনায়। সে একজন ফেডারেল এজেন্ট, মার্কিন সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব আছে তার হাতে। যার অর্থ ডাক্তার-নার্সসহ সবাই তার নির্দেশ মানতে বাধ্য। তারা চায় না সে চলে যাক? সেটা তাদের সমস্যা। তবুও মনের একটা অংশ ঝামেলা এড়িয়ে যেতে বলছে তাকে। সে জানে, এটা বোকার মতো ভাবনা, তারপরও নার্স প্যামের চোখে পড়তে চাইছে না সে।
ডোরনব ঘোরাল সে, ইঞ্চিখানেক ফাঁকা করল দরজাটা।
যতদূর চোখ চলে, করিডোরে কেউ নেই।
কানে পাতল সে।
দূরে নার্সদের গল্পগুজব, হাঁটাচলা কিচ্ছু নেই।
শুধু নিস্তব্ধতা।
দ্রুত ডানে বাঁয়ে মাথা ঘুরিয়ে নিশ্চিত হলো সে। এই মুহূর্তে জায়গাটা একদম ফাঁকা। এমনকি পঞ্চাশ ফুট দূরের নার্স স্টেশনটাও।
করিডোরে পা রাখল। পেছনে আলতো হাতে দরজা টেনে বন্ধ করে চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা ছাড়ল নিঃশব্দে।
বাইরে একমাত্র শব্দ আসছে মাথার ওপর ফ্লুরোসেন্ট বাতিগুলো থেকে—একটা টানা মৃদু, বৈদ্যুতিক গুঞ্জন।
হঠাৎ অনুধাবন করল শুরুতেই কী করা উচিত ছিল তার। পাঁজরের ব্যথা উপেক্ষা করে নিচু হয়ে জুতোর ফিতা খুলে ফেলল সে। খালি পায়ে করিডোর ধরে এগিয়ে চলল এবার। এই উইং-এর প্রতিটা দরজা বন্ধ, আর নিচের ফাঁক দিয়ে আলোও আসছে না। যার অর্থ, ওর রুম ছাড়া আর কোনো রুমে রোগী নেই।
চারটা উইং-এর সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে নার্স স্টেশনটা। একটা দিয়ে সে এসেছে। বাকি তিনটা দেখতেও অনেকটা একইরকম। সম্ভবত ওদিকে আরও রোগীদের রুম আছে। স্টেশনের পেছনেই একটা ছোট্ট হলওয়ে, যেটার ওমাথায় একটা দুই-পাল্লার দরজা। দরজার ওপর নেমপ্লেটে খোদাই করে লেখা—সার্জিকাল। স্টেশনের ঠিক উলটো দিকেই একটা লিফট। ইথান সেটার সামনে দাঁড়িয়ে নিচে নামার বোতাম চাপল।
দরজার ওপাশে পুলি ঘুরতে শুরু করেছে।
“তাড়াতাড়ি, প্লিজ…”
ইথানের মনে হলো লিফট আসতে বছর লেগে যাচ্ছে। ভাবল, এরচেয়ে সিঁড়ি দিয়ে গেলেই ভালো হতো। বারবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাতে লাগল সে, এই বুঝি কেউ এসে পড়ল। লিফটের গর্জনে আর কোনো শব্দ কানে আসছে না।
অবশেষে বিশ্রী ধাতব ঘ্যাঁসঘ্যাঁস আওয়াজ তুলে দরজাটা খুলে গেল। একপাশে সরে দাঁড়াল সে, যদি লিফটে করে কেউ উপরে এসে থাকে, তার নামার জায়গা করে দেওয়ার জন্য।
কেউ নামল না।
দ্রুত ভেতরে ঢুকে গ্রাউন্ড ফ্লোর বাটন চাপল সে।
দরজার ওপর লাল ম্যাট্রিক্স স্ক্রিনে লেখা ‘৪’। চতুর্থ তলায় আছে সে। ধীরে ধীরে নামতে শুরু করল লিফট। ম্যাট্রিক স্ক্রিনে ‘জি’ আসতে আসতে মিনিট খানেক কেটে গেল। এরমধ্যে জুতো পরে ফিতা বেঁধে নিয়েছে সে। দরজা খুলতেই সে বেরিয়ে পড়ল। সামনে আরেকটা উইং-এর সংযোগস্থলে। এখানে শব্দ আছে। কাছেই কোথাও থেকে কণ্ঠের চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ক্যাচক্যাচ শব্দে স্ট্রেচার ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে কেউ।
সে আওয়াজের উল্টোদিকের করিডোরটা বেছে নিল। তিনটা লম্বা করিডোর পেরিয়ে যখন তার মনে হচ্ছিল সে বোধহয় হারিয়ে গেছে, তখনই চোখে পড়ল ‘এক্সিট সাইন’। দ্রুত অর্ধেক তলা সমান সিঁড়ি বেয়ে নেমে নিচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরোল। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, আকাশ পরিষ্কার, ঢলে যাওয়া সূর্যের আলোয় পাহাড়গুলো গোলাপি আর কমলা রঙে সেজেছে। মেইন রোড থেকে হাসপাতালের দিকে ঢোকা ছোট্ট ওয়াকওয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে সে। মাথা উঁচু করে হাসপাতাল ভবনটা দেখল। লাল ইটের চারতলা একটা বিল্ডিং, যেটা দেখে হাসপাতাল নয়, বরং পাগলাগারদ মনে হয়।
পাঁজরে ব্যথা না নিয়ে যতটুকু লম্বা শ্বাস টানা যায়, টানল। হাসপাতালের কড়া জীবাণুনাশকের দুর্গন্ধের পর পাইনের সুবাস মাখা ঠাণ্ডা বাতাসে শ্বাস নিতে পেরে ভাগ্যবান মনে হলো নিজেকে। মেইন স্ট্রিটে উঠে পড়ল সে। ফুটপাত ধরে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে হাঁটা দিল। বিকেলের চেয়ে এখন লোকজন রাস্তায় বেশি। হাঁটতে হাঁটতে একটা রেস্তোরাঁর পাশে চলে এলো সে। ছোট্ট একটা বাড়ির সজ্জা পরিবর্তন করে রেস্তোরাঁয় রূপান্তর করা হয়েছে। বাড়ির সামনেই একটা বিশাল অ্যাসপেন গাছ। সেটার ডালে ডালে ছোট ছোট সাদা বাতি জ্বলছে। তার নিচে খেতে বসেছে লোকজন। খাবারের গন্ধে পেটটা গর্জে উঠল তার।
মেইন আর ফিফথের মোড়ে রাস্তা পার হয়ে চলে এল সেই ফোনবুথে, যেখানে দুদিন আগে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল। ভেতরে ঢুকে, টেলিফোন ডিরেক্টরির পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। অল্প সময়েই পেয়ে গেল যেটা খুঁজছিল—ওয়েওয়ার্ড পাইনস শেরিফের অফিসের ঠিকানা।
***
কয়েক দিন আগের তুলনায় অনেক ভালো অনুভব করছে আজ। এই মুহূর্তে শহরের পূর্ব দিকে হাঁটছে সে। আলো ম্লান হওয়ার সাথে সাথে তাপমাত্রাও নেমে আসছে ক্রমাগত। একটা বাড়ির উঠোনে বারবিকিউ চলছে। কাঠকয়লার গন্ধ ছড়িয়ে আছে বাতাসে। প্লাস্টিকের কাপ থেকে ভেসে আসছে বিয়ারের টক-মিষ্টি সুবাস। শিশুদের খিলখিল হাসি গুঞ্জরিত হচ্ছে পুরো উপত্যকা জুড়ে। কাছেই কোথাও একঝাঁক ঝিঁঝিঁ পোকার মতো আওয়াজ তুলে পানি ছিটাচ্ছে একটা স্প্রিঙ্কলার।
যেদিকে তাকাচ্ছে, সবকিছুই ছবির মতো সুন্দর। যেন আদর্শ প্লেটোনিক নগর। শহরের জনসংখ্যা চার-পাঁচশ’র বেশি হওয়ার কথা না। ইথান আনমনেই ভাবতে লাগল, তারা এখানে এলো কী করে? তাদের ক’জন ঘটনাচক্রে ওয়েওয়ার্ড পাইনসে এসে জায়গাটার প্রেমে পড়েছে, আর থেকে গেছে? আবার ক’জনই বা জন্মসূত্রে এখানকার, কখনো শহর ছেড়ে যায়নি?
তার নিজের সব সময় বড় শহর পছন্দ হলেও, সে বুঝতে পারছিল কেন কেউ এই জায়গা ছেড়ে যেতে চাইবে না। এমন পরিপূর্ণ, নিখুঁত সৌন্দর্য ছেড়ে কে যাবে? বন আর পাহাড়ের কোলে ছোট্ট আমেরিকান শহর, সব মিলিয়ে যেন এক টুকরো স্বর্গ। সিয়াটল থেকে রওনা হওয়ার আগে সে এই জায়গার কিছু ছবি দেখেছিল। কিন্তু ছবির সঙ্গে বাস্তবের কোনো তুলনাই হয় না। ছবিগুলো ছিল নিছক ছায়া, বাস্তব যেন হাজার গুণ উজ্জ্বল।
তবু, বাস্তবতা হচ্ছে সে এখানে এসেছে। আর ঠিক এই কারণেই জায়গাটা নিখুঁত নয়। তার অভিজ্ঞতা বলে, যেখানেই মানুষ, সেখানেই অন্ধকার। এটাই দুনিয়ার নিয়ম। পরিপূর্ণ শুদ্ধতা স্রেফ একটা বহিরাবরণ। ত্বকের উপরের স্তর। কয়েক স্তর কাটুন, ধূসর ছোপের দেখা মিলবে। আর হাড় পর্যন্ত নামলে—খাঁটি অন্ধকার।
হাঁটতে হাঁটতে পর্বতশ্রেণী থেকে চোখ সরাতে পারছিল না সে। পুবের দেওয়ালটা অন্তত তিন থেকে চার হাজার ফুট উঁচু হবে, উপর দিকে পুরোটাই পাথর আর বরফ। দিনের শেষ আলোয় রঙিন হয়ে সেজেছে তার পেছনের পাহাড়গুলো। থেমে পড়ল ইথান, উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না সূর্যের শেষ আভা মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। আলো নিভে যেতেই পাহাড়গুলো এক লহমায় নীলাভ ইস্পাত বর্ণে পরিণত হলো। দৃশ্যটা এখনো সুন্দর, কিন্তু বদলে গেছে তার প্রকৃতি। সেটা হয়ে উঠেছে আরও দূরবর্তী। আরও উদাসীন।
***
কাচের দুই পাল্লার দরজার ওপরে প্ল্যাকার্ডে লেখা:
অফিস অব দ্য শেরিফ অব ওয়েওয়ার্ড পাইনস
দুই পাশে ছোট ছোট পাইনগাছের সারি, মাঝখান দিয়ে ওয়াকওয়ে চলে গেছে সম্মুখ দরজার দিকে। সেদিকেই যাচ্ছিল ইথান। কিন্তু আবার হতাশার ঢেউ অনুভব করল নিজের ভেতর। কাচের দরজা ভেদ করে সহজেই চোখ চলে যাচ্ছে ভেতরে। শেরিফ অফিসের লবি অন্ধকার, ফাঁকা।
তবু সে দরজার হাতল ধরে ঝাঁকুনি দিল। বন্ধ। অবশ্য অফিস-টাইম পেরিয়ে গেছে। গড ড্যাম ইট!
ইথান দরজা থেকে পিছিয়ে গেল। চোখ বুলালো পুরো একতলা বিল্ডিংটার দিকে। শেষ প্রান্তে একটা জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে ক্ষীণ আলো বেরোচ্ছে বলে মনে হলো। সে আবার এগিয়ে হাত মুঠো পাকিয়ে আঙুলের গাঁট দিয়ে নক করল দরজায়। কোনো সাড়া নেই। আরও জোরে ধাক্কা দিল এবার, এত জোরে যে দরজার ফ্রেম কেঁপে উঠল। ঠায় দাঁড়িয়ে রইল পাঁচ মিনিট। কিন্তু কেউ এলো না।
***
আবার যখন মেইন স্ট্রিটে পৌঁছাল তখন একটা দুটো করে তারা জ্বলে উঠতে শুরু করেছে আকাশে। পনেরো মিনিট আগেও যে শীতল হাওয়াটা ভালো লাগছিল, সেটা এখন হাড়ে গিয়ে বিঁধছে। পাতলা অক্সফোর্ড শার্ট ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছে শীত। মোজাহীন পা ক্রমে ঝিনঝিন করে অবশ হয়ে আসছে। সবচেয়ে খারাপ হলো, ক্ষুধার প্রথম লক্ষণ হিসেবে পেটের গভীরে ফাঁপা যন্ত্রণা, মাথা ঘোরাতে শুরু করেছে।
কয়েক ব্লক হেঁটে ওয়েওয়ার্ড পাইনস হোটেলের সামনে পৌঁছাল। ওপরে উঠল পাথরের সিঁড়ি ভেঙে। দরজার কাচের শার্সি দিয়ে ভেতরে আলো দেখা যাচ্ছে। এক তরুণী বসে আছে রিসেপশনে। ইথান ভেতরে ঢুকতেই আরামদায়ক উষ্ণতা আলিঙ্গন করল তাকে। কোণায় একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো। ঠিক বিপরীতে বিশাল ফায়ারপ্লেসে জ্বলছে অগ্নিকুণ্ড। ইথান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে হাত মেলে ধরল আগুনের দিকে। পাইন রেজিন পোড়ানোর মিষ্টি গন্ধে ম-ম করছে পুরো লবি। ওই সোফায় শুয়ে টানা কয়েকটা দিন ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে পারবে সে।
এক মুহূর্ত পর, নিজেকে টেনে রিসেপশনের সামনে দাঁড় করাল। তাকে দেখে হেসে উঠল তরুণী। বয়স পঁচিশের আশেপাশে। মিষ্টি দেখতে, যদিও একটু মোটাসোটা। কালো চুল ছোট্ট পনিটেইলে বাঁধা। সাদা শার্টের ওপর কালো ভেস্ট পরেছে। বুকের নামফলকে লেখা—লিসা।
ইথান ডেস্কে গিয়ে হাতের কনুই ভর দিয়ে দাঁড়াল। “গুড ইভনিং,” বলল লিসা। “ওয়েওয়ার্ড পাইনস হোটেলে স্বাগতম। কীভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাকে?”
তার অভ্যর্থনাটা ঠিক স্বাভাবিক মনে হল না। কথাগুলো ঠিকঠাক, কিন্তু বলার ভঙ্গিতে যেন অস্বস্তি আছে। মনে হচ্ছে তাকে এমন কিছু একটা বলতে হচ্ছে যা সচরাচর বলতে হয় না।
ইথান জিজ্ঞেস করল, “কোনো রুম খালি আছে?”
“অবশ্যই আছে।” লিসা কীবোর্ডে টাইপ করতে লাগল। “শুধু আজ রাতের জন্য?”
“হ্যাঁ, আপাতত।” ইথান কম্পিউটার মনিটরের দিকে তাকাল—প্রাচীন আমলের দৈত্যাকার একটা জিনিস। আশির দশকের শেষ থেকে তুলে আনা হয়েছে। এরকম প্রাগৈতিহাসিক জিনিস শেষ কবে দেখেছে মনে করতে পারল না সে।
“দ্বিতীয় তলায় একটা নন-স্মোকিং, নন-পেট রুম আছে। কিং সাইজ বেড।”
“চমৎকার, ওটাই চলবে।”
লিসা টাইপ শেষ করে জিজ্ঞেস করল, “পেমেন্ট ক্রেডিট কার্ডে করবেন?”
ইথান হেসে ফেলল। “ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন।”
“তাই? কীভাবে?”
“কয়েকদিন আগে আমি একটা গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম। একটা ট্রাক সোজা এসে আমার গাড়ির পাশে মেরে দিয়েছিল। এখান থেকে এক ব্লক দূরেই অ্যাকচুয়ালি। হয়তো আপনি শুনেছেন?”
লিসা মাথা নাড়ল। “না, শুনিনি আসলে।”
“যাই হোক, আমি মাত্রই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছি। সমস্যাটা হলো… আমার মানিব্যাগ পাচ্ছি না। আসলে আমার ব্যক্তিগত কোনো জিনিসই খুঁজে পাচ্ছি না।”
“ওহ, শুনে খুব দুঃখ লাগছে।” লিসার হাসিটা এক মুহূর্তের জন্য নিস্তেজ হয়ে এলো বলে মনে হলো ইথানের। “তাহলে, আপনি পেমেন্ট করবেন কীভাবে, মিস্টার…?”
“বার্ক। ইথান বার্ক। দেখুন, সেটাই বলতে চাইছি আমি। আগামীকাল আমার মানিব্যাগটা না পাওয়া পর্যন্ত আমি রুম ভাড়া দিতে পারব না। শুনেছি আমার সব জিনিসপত্র নাকি শেরিফের অফিসে। ওখানে কেন রাখা হয়েছে তা জানি না।” ইথান কাঁধ ঝাঁকাল। “তবে… যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।”
“হুম… ব্যাপারটা হলো, কোনো ধরনের নগদ অগ্রিম বা অন্তত ক্রেডিট কার্ড নম্বর ছাড়া আমি বুকিং খুলতে পারি না। এটা হোটেল পলিসি। ধরুন—আমি বলছি না যে এমন হবেই—রুমের যদি কোনো ক্ষতি হয় বা অতিরিক্ত চার্জ আসে, সেজন্যই…”
“আমি জানি,” ইথান তাকে থামাল। “ডিপোজিট কেন লাগে সেটা আমি ভালোই বুঝি। আমি যা বলছি তা হলো, আমি পেমেন্ট কাল সকালে করব।”
“আপনার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই?”
“সবই আমার ওয়ালেটে আছে।”
লিসা নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল। ইথান জানে ওর মনে কী চলছে, মিষ্টি মেয়েটা তাকে প্রত্যাখান করতে চাচ্ছে না, কিন্তু নিয়মের কাছে অসহায় সে।
“স্যার—মিস্টার বার্ক—আমি দুঃখিত, কিন্তু কোনো নগদ, ক্রেডিট কার্ড বা আইডেন্টিফিকেশন ছাড়া আপনাকে রুম দিতে পারব না। আমি সত্যিই দিতে চাই। কিন্তু হোটেলের নিয়ম, আর…”
লিসার কথা থেমে গেল, কারণ ইথান হঠাৎ সামনের দিকে ঝুঁকে এসেছে। “লিসা, আপনি কি জানেন আমি কেন কালো স্যুট পরেছি?”
“না।”
“আমি ইউনাইটেড স্টেটস সিক্রেট সার্ভিসের স্পেশাল এজেন্ট।”
লিসা চোখ বড় বড় করে বলল, “মানে যারা প্রেসিডেন্টকে পাহারা দেয়, তাদের একজন? আপনি—”
“সেটা আমাদের দায়িত্বের একটা অংশ। আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো রক্ষা করা।”
“তার মানে আপনি ওয়েওয়ার্ড পাইনসে কোনো তদন্তে এসেছেন?”
“হ্যাঁ। কিন্তু শহরে পৌঁছানোর পরপরই আমি দুর্ঘটনায় পড়ি।”
“কী ধরনের তদন্ত?”
“কেসের ডিটেইলস তো আমি আলোচনা করতে পারব না।”
“আপনি আমার সাথে মজা করছেন না তো?”
“এই ধরনের ব্যাপার নিয়ে মজা করা ফেডারাল অপরাধ।”
“তাহলে আপনি সত্যিই স্পেশাল এজেন্ট?”
“হ্যাঁ। আর আমি ভীষণ ক্লান্ত। তাই একটুখানি সাহায্য চাইছি। আজ রাতে একটা রুম দরকার। আমি কথা দিচ্ছি—আগামীকাল টাকা দিয়ে দেব।”
“সত্যিই দেবেন তো? কাল সকালেই?”
“কাল সকালেই।”
***
ইথান চাবি হাতে ক্লান্ত ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠে এলো। করিডোরটা লম্বা, নিস্তব্ধ। প্রতি বিশ ফুট পরপর দেয়ালে টাঙানো নকল লণ্ঠন থেকে দুর্বল হলদেটে আলো ছড়িয়ে পড়ছে কার্পেটের ওপর।
তার ঘরটা করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে। নম্বর—দুই-দুই-ছয়।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে লাইট জ্বালাল সে। রুমের সাজসজ্জা লোকজ ঢঙের। দুটো আইকনিক ওয়েস্টার্ন দৃশ্যের অত্যন্ত খারাপ কপি ঝুলছে দেয়ালে। একটা, কাউবয় পিঠে নিয়ে একটা বুনো ঘোড়া লাফাচ্ছে। অন্যটা, ক্যাম্পফায়ার ঘিরে বসে আছে কিছু র্যাঞ্চকর্মী। ঘরটা গুমোট, কোনো টেলিভিশন নেই। বেডসাইড টেবিলে একটা পুরনো দিনের ডায়াল ঘোরানো কালো টেলিফোন।
বিছানাটা অবশ্য বিশাল, আর দেখে মনে হচ্ছে নরমও হবে। ইথান তাতে আরাম করে বসে জুতো খুলে ফেলল। মোজা ছাড়া হাঁটাহাঁটির ফলে পায়ের তলায় ইতোমধ্যে ফোস্কা পড়েছে। একে একে কোট, টাই এবং শার্টের ওপরের তিনটে বোতাম খুলে শরীরটাকে আরেকটু আরাম দেওয়ার চেষ্টা করল সে।
বেডসাইড টেবিল ড্রয়ারে একটা ফোনবুক পাওয়া গেল। ইথান সেটা বের করে বিছানায় রেখে সেকেলে ফোনটা কানে তুলল।
ডায়াল টোন আছে।
থ্যাঙ্ক গড।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বাসার ফোন নাম্বারটা হুট করে মনে পড়ল না। কিছুক্ষণ ভাবতে হলো, কল্পনা করার চেষ্টা করল আইফোনে স্মার্ট ডায়াল করলে নাম্বারটা কীভাবে আসে। সেদিনই তো ফোনবুথে ডায়াল করল। ‘দুই… শূন্য… ছয়’। সিয়াটলের এরিয়া কোড। এটা দিয়েই শুরু। পাঁচবার নাম্বার ঘুরাল রোটারি ফোনে, আর প্রতিবারই ছয়ের পর এসে মাথা ফাঁকা হয়ে গেল।
শেষমেশ ৪১১ ডায়াল করল।
দুই রিঙের পর ওপাশ থেকে একজন অপারেটরের কণ্ঠ ভেসে এলো। “শহর আর নাম?”
“সিয়াটল, ওয়াশিংটন। ইথান বার্ক। বি-ইউ-আর-কে-ই।”
“একটু অপেক্ষা করুন।” টাইপ করার শব্দ শোনা গেল। লম্বা বিরতি। তারপর, “বি-ইউ-আর-কে-ই?”
“জি, ঠিক তাই।”
“দুঃখিত স্যার, এই নামে কোনো লিস্টিং পাওয়া যাচ্ছে না।”
“আপনি নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
অদ্ভুত বটে। তবে তার কাজের যা ধরন, তাতে তার নাম্বার আনলিস্টেড হওয়াটা খুব আশ্চর্যের কিছু নয়। এখন ভাবতে গিয়ে মনে হল সে প্রায় নিশ্চিত যে ব্যাপারটা তাই। প্রায় নিশ্চিত।
“ঠিক আছে, ধন্যবাদ।”
রিসিভার নামিয়ে ফোনবুক খুলল সে। শেরিফ অফিসের নাম্বার বের করে ডায়াল করল।
পাঁচবার বেজে ভয়েস মেইলে চলে গেল তার কল। বিপ শব্দের পর ইথান বলল, “আমি ইউনাইটেড স্টেটস সিক্রেট সার্ভিস, সিয়াটল ফিল্ড অফিসের স্পেশাল এজেন্ট ইথান বার্ক বলছি। আপনারা জানেন, আমি কয়েকদিন আগে মেইন স্ট্রিটে একটা গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ করছি। হাসপাতাল থেকে আমাকে জানানো হয়েছে যে আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র—ওয়ালেট, ফোন, ব্রিফকেস আর আগ্নেয়াস্ত্র এখন আপনাদের কাছে আছে। আমি আগামীকাল সকালে সবার আগে এসে এগুলো সংগ্রহ করব। যদি এর আগে কেউ এই মেসেজ পান, দয়া করে আমাকে ওয়েওয়ার্ড পাইনস হোটেলে ফোন করুন। আমার রুম নাম্বার টু-টু-সিক্স।”
***
ইথান যখন আবার সিঁড়ি বেয়ে হোটেল এন্ট্রেন্সে এলো তখন রাত পুরোপুরি নেমে গেছে। তার পা যেন ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে, আর ক্ষিদেও লেগেছে প্রচণ্ড। হোটেল সংলগ্ন ক্যাফেটা বন্ধ। মাথার উপর আকাশ ভর্তি তারা নিয়ে উত্তর দিকে এগোতে শুরু করল সে। হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে এলো একটা বইয়ের দোকান, গোটা দুয়েক গিফট শপ আর একখানা আইনজীবীর অফিস।
রাত খুব বেশি হয়নি, তবুও মেইন স্ট্রিটের সব দোকানপাট গুটিয়ে গেছে, পথঘাট ফাঁকা। এতোসব যন্ত্রণার পর আজ রাতে খাওয়াও জুটবে না—এই সত্যটা যখন মেনে নিয়ে হাল ছেড়ে দিতে যাচ্ছিল, তখনই একটা ব্লক দূরে ফুটপাথে আলো পড়ে থাকতে দেখল। গরম খাবারের গন্ধ নাকে আসতে হাঁটার গতি আপনাতেই বেড়ে গেল।
দোকানের সামনে পৌঁছে, স্টোরফ্রন্টের কাচ দিয়ে তাকিয়ে দেখল ভেতরে মৃদু আলোকিত ‘বিয়ারগার্ডেন’ নামের এক পাব। আশায় বুক বাঁধল সে—এখনও খোলা আছে। সে ভেতরে ঢুকে পড়ল। মাত্র তিনটে টেবিলে লোক বসা, বাকিটা বলতে গেলে ফাঁকাই। ইথান বারের এক কোণে একটা স্টুল দখল করল। সামনের সুইং-ডোরের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে খোলা গ্রিলে মাংস ভাজার হিসহিস শব্দ।
এই পাবে বসে, ক্ষয়ে যাওয়া বার কাউন্টারে হাত রেখে, গত কয়েকদিন পর এই প্রথম শান্তি অনুভব করল সে। স্টলিংস আর দুর্ঘটনার ভয়াল স্মৃতি আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে, জোর করে ঢুকে পড়তে চাইছে মাথার ভেতরে, কিন্তু ইথান সেটাকে জায়গা দিল না। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বর্তমানেই আটকে রইল সে। পাঁচ মিনিট পর সুইং-দরজা ঠেলে এক লম্বা মহিলা ঢুকল ভেতরে। বাদামি চুলগুলো খোঁপা বেঁধে চপস্টিক গুঁজে রেখেছে। কাউন্টারের কব্জা লাগানো একপাশ তুলে একেবারে ইথানের সামনে চলে এলো। মুখটা হাসি হাসি। খদ্দেরের সামনে একটা কোস্টার ছুড়ে দিয়ে বলল, “কী দেব?”
মহিলার পরনে একটা কালো টি-শার্ট, সামনের দিকে স্ক্রিন-প্রিন্টে পাবের নাম লেখা।
“এক গ্লাস বিয়ার পেলে ভালো হয়।”
সে একটা গ্লাস নিয়ে ট্যাপের দিকে এগোল। “লাইট নাকি ডার্ক?”
“গিনেস আছে?”
“ওর কাছাকাছি কিছু একটা আছে।” মহিলা অলরেডি ট্যাপ টেনে বিয়ার ঢালতে শুরু করেছে, এমন সময় ইথানের মনে পড়ল তার কাছে কোনো টাকা নেই।
মহিলা ইথানের সামনে গ্লাস নামিয়ে রাখল। ফেনা গড়িয়ে পড়ছে গ্লাসের একপাশ থেকে। “শুধুই বিয়ার, নাকি মেনুও দেখবে?”
“খাবার চাই, অবশ্যই,” ইথান বলল। “সমস্যা হলো, তুমি সম্ভবত আমাকে মেরেই ফেলবে।”
হাসল মহিলা। “এতো তাড়াতাড়ি না। এখনও তো চিনলামই না তোমাকে।”
“ব্যাপারটা আসলে, আমার কাছে কোনো টাকা নেই।”
হাসি মিলিয়ে গেল মহিলার। “তাহলে খারাপ বলোনি। আসলেই খুন হয়ে যেতে পারো।”
“আমি ব্যাখ্যা করতে পারি। কয়েকদিন আগে মেইন স্ট্রিটেই একটা গাড়ি দুর্ঘটনা হয়েছিল, দেখেছ?”
“না।”
“তাহলে শুনেছ নিশ্চয়ই?”
“না।”
“বেশ, দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এখান থেকে কয়েক ব্লক দক্ষিণে। আমিই সেই দুর্ঘটনার শিকার। সবে ছাড়া পেয়েছি হাসপাতাল থেকে।”
“তাহলে চেহারার ওই বিউটি স্পটগুলো সেই দুর্ঘটনার ফল?”
“হ্যাঁ।”
“আমি এখনো বুঝতে পারছি না এর সাথে তোমার বিল দিতে না পারার সম্পর্ক কী?”
“আমি একজন ফেডারেল এজেন্ট।”
“তবুও আগের প্রশ্ন বহাল থাকল।”
“আমার ওয়ালেট, ফোন নাকি শেরিফের কাছে। অ্যাকচুয়ালি সবই তার কাছে। এই নিয়ে বিশাল ঝামেলায় আছি।”
“তার মানে, তুমি এফবিআই বা এরকম কিছু?”
“সিক্রেট সার্ভিস।”
মহিলা হাসল, বারের ওপর দিয়ে অনেকটা ঝুঁকে এলো তার দিকে। এতোক্ষণ মৃদু আলোয় বোঝা যাচ্ছিল না, এখন একেবারে কাছ থেকে দেখে ইথান বুঝল, মহিলা অসম্ভব সুন্দরী। বয়সে ইথানের চেয়ে কয়েক বছরের ছোটই হবে, মডেলদের মতো চোয়াল-রেখা, ছোট ধড় আর লম্বা পা। বয়স যখন বিশের কোঠায় ছিল তখন নিশ্চয়ই সে যাকে বলে ‘ড্রপ ডেড গর্জিয়াস’ ছিল। অবশ্য এখন চৌত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর বয়সেও সে যে কম সুন্দরী, তা মোটেই নয়।
“এই যে কালো স্যুট পরে, আত্মবিশ্বাসের ভঙ্গিতে যা যা বলছ, সবই হয়তো গালগল্প। আমি—”
“আমি মিথ্যে বলছি না—”
সে ইথানের ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে থামিয়ে দিল। “আমি জানি না তুমি কোনটা, হয়তো সত্যিই তুমি একজন এজেন্ট, নয়তো দারুণ প্রতারক। তবে গল্পটা ভালো। আর আমি ভালো গল্প পছন্দ করি। সত্যি যেটাই হোক, আজ রাতে এই গল্পের খাতিরেই আমি তোমাকে খাবার খেতে দিচ্ছি।”
“আমি মিথ্যা বলছি না… তোমার নাম কী?”
“বেভারলি।”
“আমি ইথান।”
তারা হাত মেলাল। “পরিচিত হয়ে খুশি হলাম, ইথান।”
“বেভারলি, কাল সকালে আমি আমার ওয়ালেট পাওয়া মাত্র এখানে এসে—”
“দাঁড়াও, অনুমান করি… আমাকে মোটা বকশিশ দেবে।”
ইথান মাথা ঝাঁকাল। “এবার তুমি আমার সাথে ঠাট্টা করছ।”
“সরি।”
“তোমার বিশ্বাস না হলে আমি—”
“পরিচয়ই তো হলো মাত্র,” সে বলল। “যতক্ষণে তোমার ডিনার শেষ হবে, ততক্ষণে আশা করি বুঝে ফেলব তোমার সাথে আর কখনো দেখা হবে কি না।”
“মানে এখনই বলা মুশকিল, তাই তো?” ইথান হেসে উঠল। মনে হলো মহিলাকে একটু হলেও জিততে পেরেছে। বেভারলি মেনু এনে দিল। ইথান অর্ডার করল পটেটো ওয়েজ আর যতটা সম্ভব রেয়ার চিজবার্গার। সে অর্ডার নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলে ইথান বিয়ারে চুমুক দিল।
হুম। কিছু একটা ঠিক নেই। বিয়ারে গ্যাস নেই আর শেষে সামান্য তিতকুটে ভাব ছাড়া পুরোপুরি স্বাদহীন। সে পাইন্ট গ্লাসটা কাউন্টারে নামিয়ে রাখতেই বেভারলি ফিরল।
“ফ্রি খাবার পাচ্ছি, তাই বুঝতে পারছি না অভিযোগ করা ঠিক হবে কিনা,” সে বলল। “তবে এই বিয়ারে কিছু একটা সমস্যা আছে।”
“সত্যি?” গ্লাসের দিকে ইশারা করল বেভারলি। “আপত্তি নেই তো?”
“না, খাও।” সে গ্লাসটা তুলে চুমুক দিল, তারপর ওপরের ঠোঁট থেকে ফেনা মুছে নামিয়ে রাখল ইথানের সামনে। “আমার কাছে তো ঠিকই মনে হলো।”
“সত্যি?”
“হুম।”
“না, মানে, এটা ফ্ল্যাট… কোনো স্বাদই নেই।”
“আজব তো! আমার কাছে একদমই তেমন হলো না। অন্য বিয়ার দেব?”
“না, আমার বোধহয় বিয়ার খাওয়াই ঠিক হচ্ছে না। বরং এক গ্লাস পানি দাও।” বেভারলি একটা নতুন গ্লাস নিয়ে বরফে পানি ঢেলে তার সামনে রাখল।
***
সে গরম ধোঁয়া ওঠা চিজবার্গারটা দুই হাতে তুলে নিল প্লেট থেকে। বেভারলি তখন বারের অপরপ্রান্তে মোছামুছি করছে। ইথান মুখের সামনে বার্গারটা ধরে রেখে তাকে ডাক দিল।
“কী হয়েছে?” বেভারলি জিজ্ঞেস করল।
“এখনো কিছু হয়নি। একটু আসো প্লিজ।” সে এগিয়ে এসে ইথানের সামনে দাঁড়াল। ইথান বলল, “আমার অভিজ্ঞতা হলো, আমি যখন রেয়ার হ্যামবার্গার অর্ডার করি, অন্তত আশি ভাগ সময় সেটা ওরা ওয়েল ডান বানিয়ে দেয়। জানি না কেন বেশির ভাগ শেফ ঠিকভাবে বার্গার বানাতে পারে না, তবে বাস্তবতা এটাই। আর ওরকম ওভারকুকড বার্গার পেলে আমি কী করি জানো?”
“ফেরত পাঠাও?” বেভারলির মুখে বিরক্তির ছাপ।
“ঠিক তাই।”
“তোমাকে সন্তুষ্ট করা বেশ কঠিন, সেটা কি তুমি জানো?”
“জানি,” বলে ইথান কামড় বসাল। সে চিবোল অন্তত দশ সেকেন্ড।
“তো?” বেভারলি জানতে চাইল।
ইথান বার্গারটা প্লেটে নামিয়ে রাখল, ঢোক গিলল, হাত মুছল লিলেন ন্যাপকিনে। বার্গারের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “ইট’স অ্যান অ্যামেজিং মাস্টারপিস।” বেভারলি হেসে চোখ ওল্টাল।
***
ইথান প্লেটের শেষ টুকরোটা মুখে পুরছে তখন রেস্তোরাঁয় খদ্দের বলতে একমাত্র সে-ই আছে। বারকিপ প্লেট সরিয়ে নিয়ে গেল, তারপর ফিরে এসে পানি ভরল তার গ্লাসে।
“আজ রাতে তোমার কোনো সমস্যা হবে না তো, ইথান? থাকার জায়গা পেয়েছ?”
“হ্যাঁ, হোটেলের রিসেপশনিস্টকে একটু মিষ্টি কথা বলে একটা রুম জোগাড় করেছি।”
“সেও তোমার বাজে গল্পে গলে গেছে, তাই না?” বেভারলি মুচকি হাসল।
“তোমার মতোই মিষ্টি মেয়ে, তাই গলাতে পেরেছি,” বলে ইথানও হাসল। “আজ যেহেতু আমার ট্রিট, ডেজার্ট খাবে? আমাদের ‘ডেথ-বাই-চকোলেট’ একদম স্বর্গীয় স্বাদের।”
“ধন্যবাদ, কিন্তু আমার বেরোনো উচিত।”
“আসলে তুমি এখানে কী করছ? মানে, কী ধরনের অফিশিয়াল কাজে এসেছ? অবশ্য যদি বলতে সমস্যা থাকে…”
“মিসিং পার্সন ইনভেস্টিগেশনে এসেছি।”
“কে নিখোঁজ হয়েছে?”
“দুইজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট।”
“ওরা এখান থেকে গায়েব হয়েছে? ওয়েওয়ার্ড পাইনস থেকে?”
“মাসখানেক আগে, এজেন্ট বিল ইভান্স আর এজেন্ট কেট হিউসন একটা ক্লাসিফায়েড ইনভেস্টিগেশনে এখানে এসেছিল। আজ রাত পর্যন্ত দশ দিন হলো ওদের কোনো খবরই নেই। না কোনো ই-মেইল, না কোনো ফোনকল। এমনকি ওদের অফিশিয়াল গাড়ির জিপিএস ট্র্যাকিং চিপও বন্ধ হয়ে গেছে।”
“আর ওদের খুঁজতে তোমাকে পাঠিয়েছে কর্তৃপক্ষ?”
“আমি একসময় কেটের সঙ্গে কাজ করতাম। ও যখন সিয়াটলে থাকত, আমরা পার্টনার ছিলাম।”
“স্রেফ ওটুকুই?”
“এক্সকিউজ মি?”
“শুধুই পার্টনার ছিলে?”
ইথানের ভেতরে দুঃখ, হারানোর যন্ত্রণা আর রাগের একটা ঢেউ দোলা দিয়ে গেল। তবে মুখে প্রকাশ পেতে দিল না। “হ্যাঁ, শুধু পার্টনার। তবে বন্ধু ছিলাম অবশ্যই। যাই হোক, আমি ওদের খুঁজে বের করব। কী ঘটেছে জানব, আর তারপর ওদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাব।”
“তোমার কী ধারণা ওদের সাথে খারাপ কিছু হয়েছে?”
সে কোনো উত্তর দিল না, শুধু তাকিয়ে রইল বেভারলির দিকে, তবে সেই নীরবতাই যেন উত্তর হয়ে গেল।
“আশা করি যা খুঁজছ তা পেয়ে যাবে, ইথান।”
বেভারলি অ্যাপ্রোনের পকেট থেকে একটা বিলের কাগজ বের করে কাউন্টারের ওপর দিয়ে ঠেলে দিল ইথানের দিকে।
“তাহলে এটাই আমার বিল?”
ইথান তাকাল কাগজে। কোনো আইটেমাইজড বিল নয়, বরং বেভারলির হাতে লেখা একটা ঠিকানা।
৬০৪, ফার্স্ট অ্যাভিনিউ
“এটা কী?” ইথান জিজ্ঞেস করল।
“আমার ঠিকানা। যদি কোনো দরকার হয়, যদি বিপদে পড়ো, যাই হোক না কেন…”
“কী, আমার জন্য চিন্তায় পড়ে গেলে মনে হচ্ছে?”
“না, তবে তোমার কাছে টাকা নেই, ফোন নেই, আইডি নেই। তুমি এমনিতেই নাজুক হালে আছ।”
“মানে, তুমি এখন আমাকে বিশ্বাস করছ?” বেভারলি হাত বাড়িয়ে তার হাতের ওপর আলতো করে রাখল।
“আমি প্রথম থেকেই তোমাকে বিশ্বাস করেছি।”
***
পাব থেকে বের হয়ে সে জুতো খুলে ফেলল। খালি পায়ে হাঁটা শুরু করল ফুটপাথ ধরে। কংক্রিট ঠাণ্ডা, কিন্তু অন্তত ব্যথা ছাড়াই হাঁটা যাচ্ছে। হোটেলের দিকে ফেরার বদলে সে মেইন স্ট্রিট থেকে বের হওয়া আরেকটা শাখা রাস্তায় ঢুকে গেল, চলে গেল এক আবাসিক পাড়ায়।
কেটের ভাবনা মাথায় ঘুরছে।
রাস্তার দুই পাশে সারি সারি ভিক্টোরিয়ান বাড়ি। বারান্দার আলোয় প্রতিটা বাড়ি যেন অন্ধকারে মাথা তোলা একেকটা দ্বীপ।
নীরবতাটা বিস্ময়কর। সিয়াটলে এমন রাত পাওয়া যায় না কখনো। সেখানে সর্বদাই দূরে কোথাও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের করুণ ধ্বনি, নয়তো গাড়ির অ্যালার্মের সতর্ক ঘণ্টা, কিংবা বৃষ্টির টুপটাপ। এখানে মৃত নিস্তব্ধতা, যা ভাঙছে কেবল তার খালি পায়ের নরম শব্দে। না, থামো। আরও একটা শব্দ আছে—সামনের একটা ঝোপে একটা নিঃসঙ্গ ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে।
টেনেসির শৈশবের দিনগুলোয় ফিরে গেল সে। সেই মধ্য-অক্টোবরের সন্ধ্যাগুলো, জালে ঘেরা বারান্দায় বসে পাইপ টানতেন বাবা, সোজা তাকিয়ে থাকতেন সয়াবিন ক্ষেতের দিকে, ঝিঁঝিঁ পোকাগুলোও কোরাস ডাকতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে যেত, টিকে রইত কেবল একটা নিঃসঙ্গ ডাক।
কার্ল স্যান্ডবার্গ ঠিক এই বিষয় নিয়েই না একটা কবিতা লিখেছিলেন? লাইনগুলো হুবহু মনে নেই ইথানের, শুধু মনে আছে—ঋতুর প্রথম তুষারের রাতে ভেসে আসা শেষ ঝিঁঝিঁর ডাকের কথা নিয়ে কিছু একটা ছিল। হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কবিতার নাম ‘স্প্লিন্টার’ (Splinter)।
শেষ ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক
প্রথম তুষার পেরিয়ে ভেসে আসে—
এও এক ধরনের বিদায়।
এও একফালি গান।
শেষ লাইনটা তার খুব প্রিয় ছিল। ‘এও একফালি গান’।
ঝোপটার সামনে দাঁড়াল সে। ভেবেছিল শব্দ থেমে যাবে, কিন্তু থামল না। বরং নিখুঁত ছন্দে বেজেই চলল, এতটাই নিখুঁত যে প্রায় যান্ত্রিক মনে হচ্ছিল।
ইথান কোথাও পড়েছিল ঝিঁঝিঁরা ডানায় ডানা ঘষে শব্দ তোলে।
ঝোপটার দিকে তাকাল সে। কোনো এক প্রজাতির জুনিপার। তীব্র, ঝাঁঝালো গন্ধ।
কিছুটা দূরের একটা রাস্তার বাতির আলোয় শাখাগুলো মোটামুটি আলোকিত। সে ঝুঁকে পড়ল অনেকখানি, হয়তো পোকাটাকে দেখা যাবে এই আশায়।
পোকার ডাক বেজেই চলেছে, বিরামহীন। “কোথায় তুমি, ছোট্ট বন্ধু?”
মাথা বাঁকাল সে। কিছু একটা চোখে পড়েছে তার। ডালপালার ফাঁক গলে ছোট্ট একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেটা ঝিঁঝিঁ পোকা নয়। বরং এক বাক্স—আকারে তার আইফোনের সমান।
হাত বাড়িয়ে জিনিসটা ছুঁলো সে। শব্দ ম্লান হয়ে এল। হাত সরাল। আবার জোরালো। এ কী কাণ্ড?
ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আসছে একটা স্পিকার থেকে।
***
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। দরজা খুলে হোটেল রুমে ঢুকল সে। জুতো জোড়া ফেলে দিল। জামাকাপড় ছেড়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। লাইট জ্বালানোর দরকারও মনে করল না। রাতের খাবারের জন্য বেরোনোর আগে জানালাটা একটু ফাঁকা করে রেখেছিল। এখন বুকের ওপর ঠাণ্ডা বাতাসের সূক্ষ্ম ধারা টের পাচ্ছে সে, উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঘরের সারাদিনের গুমোট ভাব। কিন্তু মিনিটের মধ্যেই শীতে কাঁপতে শুরু করল সে। উঠে কম্বলটা গায়ে টেনে শুয়ে পড়ল আবার।
***
বাঁচার জন্য লড়ছে সে। হেরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। গায়ের ওপর চেপে বসা দানবটা তার কণ্ঠনালী ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। তারপরও সে কোনোমতে টিকে আছে, কারণ সেও দুই হাতে দানবটার গলা চেপে ধরে আছে, সর্বশক্তিতে। কিন্তু দানবটার নিখাঁদ শক্তির সামনে সে টিকতে পারছে না। তার আঙুলগুলো দানবটার দুধসাদা স্বচ্ছ চামড়া ভেদ করে বসে যাচ্ছে, তবু থামছে না ওটা। তার হাত ব্যথায় কাঁপছে, ট্রাইসেপে টান পড়ছে, ধীরে ধীরে হাত পেছনে ভাঁজ হয়ে আসছে, আর সেই মুখ, দাঁত, ইঞ্চি ইঞ্চি করে নেমে আসছে আরও কাছে।
***
ইথান লাফিয়ে উঠে বসল বিছানায়, সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে, হাঁপাচ্ছে, বুকের ভেতর ঘোড়াদৌড় চালাচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা। একেবারেই বুঝতে পারছে না সে কোথায় আছে। অবশেষে কাউবয় আর ক্যাম্পফায়ারের ছবি দুটো দেখার পর মনে পড়ল সব।
বেডসাইড টেবিলের অ্যালার্ম ঘড়ির ডিসপ্লে বদলে গেল—৩:১৭। সে বাতি জ্বালিয়ে তাকিয়ে রইল টেলিফোনের দিকে।
দুই… শূন্য… ছয়…
দুই… শূন্য… ছয়…
সে কেন নিজের বাসার ল্যান্ডলাইন নাম্বার মনে করতে পারছে না? এমনকি থেরেসার সেল নাম্বারও না? এটা কীভাবে সম্ভব? বিছানা থেকে নেমে জানালার কাছে গেল। ব্লাইন্ডস সরিয়ে নিচে তাকাল নিস্তব্ধ রাস্তায়। অন্ধকার ভবনগুলো। খালি ফুটপাত।
মনে মনে বলল, আগামীকাল সব ঠিক হয়ে যাবে। ফোন, মানিব্যাগ, বন্দুক, ব্রিফকেস সব ফেরত পাবে। স্ত্রীকে ফোন করবে, ছেলেকে ফোন করবে। সিয়াটলে কল করে এসএসি হাসলারের সাথে কথা বলবে। সেই তদন্তে ফিরবে যা তাকে এখানে টেনে এনেছে।
