পাইনস – ১

অধ্যায় ১

ধীরে ধীরে চেতনা ফিরে আসছে তার। চিত হয়ে শুয়ে আছে সে। রোদ পড়ছে মুখে। কলকল আওয়াজ হচ্ছে কোথায় যেন। পানি বয়ে যাওয়ার মতো। খুব দূরে নয়। কিন্তু চোখ মেলতে পারছে না সে। চোখের স্নায়ুতে তীব্র ব্যথা। খুলির পেছনটা প্রচণ্ড দপদপ করছে—মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। গড়িয়ে পাশ ফিরল সে, উঠে বসল অনেক কষ্টে। কিন্তু মাথা সোজা করতে পারল না, গুঁজে দিল দুই হাঁটুর মাঝে। চোখ না খুলেও টের পেল দুনিয়াটা দুলছে, যেন ছুটে গেছে নিজ অক্ষ থেকে। লম্বা শ্বাস নিতে গিয়ে মনে হলো যেন কেউ বাঁ পাঁজরে ইস্পাতের গোঁজ ঠুকে দিচ্ছে। গুঙিয়ে উঠল প্রচণ্ড যন্ত্রণায়, চোখ মেলল জোর করে। বাঁ চোখটা নিশ্চয়ই খুব বাজে ভাবে ফুলে গেছে, মনে হচ্ছে যেন সে কোনো সরু ফাঁকের মধ্যে দিয়ে তাকাচ্ছে।

জীবনে এতোটা সবুজ ঘাস দেখেনি সে। লম্বা, নরম ডগার ঘাস। পুরো নদীর তীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। স্বচ্ছ, টলমলে পানি ছুটছে বোল্ডারের ফাঁক গলে। ওপারে আকাশছোঁয়া খাড়া পাহাড়, মাঝেমধ্যে গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাইন গাছ। বাতাস ভরে আছে তাদের তীব্র গন্ধে আর বয়ে চলা পানির মিষ্টি সুবাসে।

তার গায়ে কালো প্যান্ট, কালো কোট, আর ভেতরে সাদা অক্সফোর্ড শার্ট—যেটার সুতি কাপড়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। একটা কালো টাই ঝুলছে কলার থেকে, গিঁটটা একেবারেই আলগা।

ওঠার চেষ্টা করল সে, কিন্তু দুর্বল হাঁটু ভর নিতে পারল না। এতো জোরে ধপ করে বসে পড়ল যে যন্ত্রণার ঢেউ পাঁজর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। দ্বিতীয় চেষ্টায় সফল হলো বটে, তবে আবিষ্কার করল তার পুরো শরীর দুলছে, যেন ঢেউ খেলছে মাটির নিচে। ধীরে ধীরে পা ঘষটে ঘুরে দাঁড়াল, ভারসাম্য রাখতে পা দুটো ফাঁক করে দিল অনেকটা।

এবার নদীটা পেছনে, সামনে ফাঁকা প্রান্তর। দূরে দুপুরের খর রোদে ঝিলমিল করছে একটা দোলনা আর স্লাইডের ধাতব কাঠামো। আর কোনো জনমনিষ্যির চিহ্নটুকু নেই।

পার্কের ওপারে কয়েকটা ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের বাড়ি, তারও ওপারে মূল সড়কের দালানগুলো। গোটা শহরটা চওড়ায় বড়জোর এক মাইল হবে, চারপাশে হাজার ফুট উঁচু লালচে পাথরের পাহাড়ি দেয়াল। যেন প্রাকৃতিক পাথুরে অ্যাম্ফিথিয়েটারের মাঝখানে অলস বসে আছে শহরটা। উঁচু ছায়া ঢাকা গিরিখাতে বরফ জমে আছে এখনো, কিন্তু নিচের উপত্যকায় গরম পড়েছে। মাথার ওপর আকাশ গাঢ় নীল, এক ফোঁটা মেঘ নেই।

সে প্যান্টের পকেট চেক করল, তারপর সিঙ্গেল ব্রেস্টেড কোটের পকেট। কোনো মানিব্যাগ নেই। টাকা রাখার ক্লিপ, পরিচয়পত্র, চাবি, ফোন কিছুই নেই। শুধু ভেতরে একটা পকেটে ছোট্ট সুইস আর্মি নাইফ পাওয়া গেছে।

***

সে যতক্ষণে পার্কের ওপারে পৌঁছাল, ততক্ষণে তার সতর্কতা বেড়েছে, সাথে বেড়েছে বিভ্রান্তিও। মাথার পেছনে যে দপদপানিটা চলছিল, সেটা আর মোটেও ব্যথাহীন নেই।

ছয়টা বিষয় জানে সে।

বর্তমান প্রেসিডেন্টের নাম।

তার মায়ের চেহারাটা কেমন ছিল, যদিও মায়ের নামটা মনে নেই, এমনকি কণ্ঠস্বরও নয়।

সে পিয়ানো বাজাতে পারে।

হেলিকপ্টার ওড়াতে পারে।

তার বয়স সাইত্রিশ।

আর তাকে এখনই কোনো হাসপাতালে যেতে হবে।

এই কটা তথ্য বাদে আর কিছু জানে না সে। এই দুনিয়া আর দুনিয়াতে তার অবস্থান যেন ভিনদেশি ভাষায় ছাপা এক বই। পুরোটাই তার বোধগম্যতার বাইরে। সত্যিটা তার চেতনার সীমানায় ঘুরপাক খাচ্ছে, কিন্তু ধরা দিচ্ছে না।

নিস্তব্ধ এক আবাসিক এলাকার রাস্তা দিয়ে হাঁটছে সে। পাশে পার্ক করা প্রতিটা গাড়ি দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। এর কোনোটা কি তার হতে পারে?

দুই পাশের বাড়িগুলো ঝকঝকে পরিষ্কার, যেন মাত্রই রঙ করা হয়েছে। প্রতিটা বাড়ির সামনে পরিপাটি করে ছাঁটা সবুজ ঘাসের উঠান। আর গেটের সাথে গোটা গোটা সাদা হরফে পরিবারের নাম লেখা কালো ডাকবাক্স।

প্রায় প্রতিটা বাড়ির পিছনের বাগান রঙে ফেটে পড়ছে—শুধু ফুল নয়, সবজি আর ফলও আছে। রঙগুলো অসম্ভব উজ্জ্বল আর জীবন্ত।

দ্বিতীয় ব্লকের মাঝামাঝি এসে হাঁপ ধরে গেল তার। লম্বা করে শ্বাস টানতেই বাঁ পাশটা খচখচ করে উঠল। ব্যথায় দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলো সে। কোট খুলে হাতে নিল, তারপর শার্টের ইন বের করে বোতামগুলো খুলে ফেলল। নিজের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল। এতোটা বাজে অবস্থা আশা করেনি সে। পুরো বাঁ দিকজুড়ে গাঢ় বেগুনি কালশিটে, মাঝখানে হলদেটে রঙের বড় দাগ।

কিছু একটা আঘাত করেছে তাকে। প্রচণ্ড জোরে।

সে মাথায় হাত বুলিয়ে দেখল। মাথাব্যথা এখন স্পষ্ট, মিনিটে মিনিটে তীব্র হচ্ছে। তবে শুধু বাঁ পাশে থ্যাতলানো জায়গাটুকু ছাড়া শরীরের আর কোথাও মারাত্মক চোটের কোনো চিহ্ন নেই। শার্টের বোতাম লাগিয়ে, আবার গুটিয়ে প্যান্টে ঢুকিয়ে নিল। তারপর হাঁটতে থাকল।

যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত একটাই, কোনো দুর্ঘটনায় পড়েছিল সে। হয়তো গাড়ি দুর্ঘটনা। হয়তোবা কোথাও থেকে পড়ে গিয়েছিল। আবার হতে পারে তাকে আক্রমণ করা হয়েছিল। তাহলে মানিব্যাগ না থাকার ব্যাখ্যাও মেলে। তার আগে পুলিশের কাছে যাওয়া উচিত। কিন্তু…

যদি সে-ই কিছু ভুল করে থাকে? কোনো অপরাধে জড়িয়ে থাকে? এটা কী সম্ভব? তাহলে কি অপেক্ষা করা উচিত? হয়তো ধীরে ধীরে কিছু মনে পড়বে।

যদিও এই শহরের সবকিছুই তার অচেনা, তবু রাস্তায় হোঁচট খেয়ে সে আবিষ্কার করল, সে এতোক্ষণ ধরে প্রতিটা ডাকবাক্সের নাম পড়ছিল। অজান্তে, অবচেতনে। তার অবচেতন মন কেন তাকে দিয়ে এই কাজ করাচ্ছিল? সে কি সিগনাল পাঠাচ্ছে যে এমনই কোনো একটার গায়ে তার নাম লেখা আছে? আর একবার সেটা চোখে পড়লেই বাকি সব গড়গড় করে মনে পড়ে যাবে?

আর কয়েক ব্লক সামনেই শহরের প্রাণকেন্দ্র, ওখানকার ভবনগুলো পাইন গাছ ছাড়িয়ে মাথা তুলে রেখেছে ওপরে। প্রথমবারের মতো ব্যস্ততার আওয়াজ পেতে লাগল সে। গাড়ির শব্দ, মানুষের গলা, ভেন্টিলেশনের মৃদু গুঞ্জন।

হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে থমকে দাঁড়াল সে। মাথা হালকা কাত হয়ে গেল অজান্তেই। একটা লাল আর সবুজ দুই তলা ভিক্টোরিয়ান বাড়ির ডাকবাক্সের ওপর চোখ স্থির হয়ে আছে তার। ওটার গায়ে লেখা নামটার দিকে তাকিয়ে আছে সে।

ম্যাকেনজি

“ম্যাকেনজি।”

নামটার তার কাছে কোনো মানেই নেই।

“ম্যাক…”

কিন্তু প্রথম সিলেবলটা, এটা যেন ভেতরে কিছু একটা নাড়া দিল।

“ম্যাক। ম্যাক।”

সে কি ম্যাক? এটাই কি তার নাম?

“আমার নাম ম্যাক। হ্যালো, আমি ম্যাক, আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগল।”

না।

শব্দটা তার জিভ থেকে যেভাবে বেরিয়ে এলো সেটা স্বাভাবিক না। একদম অচেনা, অস্বস্তিকর। একেবারেই নিজের মনে হলো না। বরং সত্যি বলতে, শব্দটার প্রতি ঘৃণা তৈরি হলো। কারণ শব্দটা তার ভেতরে যে জিনিসটা ঢুকিয়ে দিয়েছে সেটা হলো…

ভয়।

অদ্ভুত ব্যাপার। শব্দটা তার মনে ভয় ধরিয়ে দিল। তাহলে কি ম্যাক নামের কেউ তাকে আঘাত করেছে?

সে হেঁটে চলল। আর তিন ব্লক হেঁটে মেইন আর সিক্সথ স্ট্রিটের মোড়ে পৌঁছল সে। ছায়াঘেরা এক বেঞ্চ দেখে বসে পড়ল সেখানে। সাবধানে গভীর এক শ্বাস টানল। রাস্তার এক মাথা থেকে অন্য মাথা নজর বোলাল, তার চোখ মরিয়া হয়ে পরিচিত কিছু খুঁজছে। কোথাও কোনো চেইন স্টোর নেই।

সে যেখানে বসেছে তার কোনাকোনি একটা ফার্মেসি আছে। সেটার পাশেই একটা ক্যাফে। ক্যাফের পাশে তিন তলা বিল্ডিং, সামনের সিড়ির উপর সাইনবোর্ড ঝুলছে:

ওয়েওয়ার্ড পাইনস হোটেল

তাজা কফির গন্ধ তাকে টেনে তুলল বেঞ্চ থেকে। মাথা ঘুরিয়ে দেখল, রাস্তার মাঝামাঝি ‘দ্য স্টিমিং বিন’ নামে একটা জায়গা। নিশ্চিত ওখান থেকেই গন্ধ আসছে।

হুম।

বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনায় এটা হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নয়, তবে এটা স্পষ্ট যে সে ভালো কফি পছন্দ করে। শুধু পছন্দ না, ভীষণ পছন্দ করে। তার বিস্তৃত পরিচয়ের আরেকটা ক্ষুদ্র অংশ এই তথ্য।

সে হেঁটে কফিশপের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা টেনে ঢুকে পড়ল ভেতরে। জায়গাটা ছোট আর অদ্ভুত সুন্দর। শুধু গন্ধেই বোঝা যাচ্ছিল, ওরা দুর্দান্ত কফি বানায়। ডানপাশে লম্বা কাউন্টারের ওপাশে সারি সারি এসপ্রেসো মেশিন, গ্রাইন্ডার, ব্লেন্ডার, সিরাপের বোতল। তিনটা স্টুল দখল হয়ে আছে। বিপরীত দেয়ালে সাজানো কিছু সোফা আর চেয়ার। পাশে পুরনো পেপারব্যাক ভরা বুকশেলফ। দুই বৃদ্ধ দাবার বোর্ডে লড়াই করছে, গুটি অমিল হলেও জমে উঠেছে খেলা। দেয়ালে ঝুলছে স্থানীয় শিল্পীদের ছবি—এক মধ্যবয়সী মহিলার সাদা-কালো সেলফ পোর্ট্রেটের সিরিজ। প্রতিটা ছবিতে তার অভিব্যক্তি এক, শুধু ক্যামেরার ফোকাস আলাদা। সে এগিয়ে গেল ক্যাশ রেজিস্টারের দিকে।

রেজিস্টারের ওপাশে ড্রেডলকস বাঁধা এক স্বর্ণকেশী দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার বয়স বিশের ঘরে। চোখ নামিয়ে কাজ করছে এই মুহূর্তে। তার আওয়াজ শুনে মুখ তুলতেই ক্ষণিকের জন্য আতঙ্ক খেলে গেল তার সুন্দর চোখ জোড়ায়।

মেয়েটা কি আমাকে চেনে?

রেজিস্টারের পেছনের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে চোখ পড়তেই বুঝে গেল মেয়েটা কেন এমন চাহনি দিয়েছিল। তার চেহারার পুরো বাঁ পাশে রক্ত জমাট দাগ, চোখটা ফুলে প্রায় বন্ধ হয়ে আছে।

মাই গড। কেউ আমাকে ভয়ংকরভাবে পিটিয়েছে।

তবে ওই বীভৎস দাগটা বাদ দিলে, দেখতে মোটেই খারাপ নয় সে। আনুমানিক ছ’ফুট লম্বা। ছোট কালো চুল, মুখের নিচের অংশে দুই দিনের না কামানো দাড়ি। শার্টের বুকের কাছটা টানটান হয়ে আছে, তার নিচে মেদহীন পেট। গায়ের কোটটাও দারুণভাবে বসে আছে শরীরের সাথে। শক্তপোক্ত, মজবুত গড়নের মানুষ সে। দেখে বিজ্ঞাপনের মডেল বা মার্কেটিং এক্সিকিউটিভের মতো লাগছে। কোনো সন্দেহ নেই, শেভ করে পরিষ্কার কাপড়চোপড় পরলে তাকে যথেষ্ট আকর্ষণীয়ই দেখাবে।

“আপনাকে কী দিতে পারি?” বারিস্তা জিজ্ঞেস করল।

এক কাপ কফির জন্য সে জান দিতেও রাজি, কিন্তু পকেটে ফুটো পয়সাও নেই।

“আপনাদের কফিটা কি ভালো?”

প্রশ্নটা শুনে মেয়েটি যেন হতভম্ব হয়ে গেল। “মমম… হ্যাঁ।”

“শহরের সেরা?”

“শহরের এটিই একমাত্র কফিশপ। তবে হ্যাঁ, আমাদের কফি একদম দুর্দান্ত।”

লোকটা কাউন্টারের উপর ঝুঁকে পড়ল। “আপনি কি আমাকে চেনেন?” জিজ্ঞেস করল ফিসফিসিয়ে।

“মাফ করবেন?”

“আমার চেহারা কি চেনা চেনা লাগছে? আমি কি আগে কখনো এখানে এসেছি?”

“আপনি নিজে জানেন না এখানে আগে কখনো এসেছেন কিনা?”

সে মাথা নাড়ল।

মেয়েটি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে, যেন বোঝার চেষ্টা করল মুখে আঘাতের চিহ্নওয়ালা মানুষটা কি পাগল নাকি তার সাথে মজা করছে? শেষে বলল, “আপনাকে আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না।”

“নিশ্চিত?”

“দেখুন, এটা নিউ ইয়র্ক না।”

“ঠিক আছে। আপনি কি অনেক দিন ধরে এখানে কাজ করছেন?”

“এক বছরের কিছু বেশি হবে।”

“আর আমি নিয়মিত কাস্টমার নই?”

“নিশ্চিতভাবেই নন।”

“আরেকটা প্রশ্ন করতে পারি?”

“করুন।”

“আপনি জানেন না আপনি কোথায় আছেন?”

“এটা কোন জায়গা?” সে ইতস্তত করল, এমন সম্পূর্ণ অসহায়ত্ব স্বীকার করতে মন চাইছে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাথা নাড়ল। বারিস্তার কপাল কুঁচকে গেল, অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট।

“আমি মজা করছি না,” লোকটা বলল।

“এটা ওয়েওয়ার্ড পাইনস, আইডাহো। আপনার মুখ… কী হয়েছে আপনার?”

“আমি—আমি এখনো ঠিক জানি না। শহরে কি কোনো হাসপাতাল আছে?” প্রশ্ন করতেই বুকের ভেতর এক অশুভ স্রোত বয়ে গেল।

এটা কি অশনি সংকেত?

নাকি মস্তিষ্কের গভীরে চাপা পড়ে থাকা কোনো অন্ধকার স্মৃতি বরফশীতল আঙুল বুলিয়ে গেল মেরুদণ্ড বেয়ে?

“হ্যাঁ, এখান থেকে দক্ষিণে সাত ব্লক দূরে। আপনার এখনই ইমার্জেন্সি রুমে যাওয়া উচিত। চাইলে আমি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে দিতে পারি।”

“না, তার দরকার নেই।” কাউন্টার থেকে সরে গেল সে। “ধন্যবাদ… আপনার নাম কী জানতে পারি?”

“মিরান্ডা।”

“ধন্যবাদ, মিরান্ডা।”

বাইরে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই রোদে চোখ ঝলসে গেল। ভারসাম্য টলে উঠল তার। মাথাব্যথাটা বাড়তে বাড়তে অসহ্য পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। রাস্তা ফাঁকা ছিল, তাই জেব্রা ক্রসিংয়ের তোয়াক্কা না করে সোজা পার হয়ে গেল ফিফথ স্ট্রিটের দিকে। পাশ দিয়ে এক তরুণী মা আর তার ছোট্ট ছেলে যাচ্ছিল। ছেলেটি ফিসফিস করে তার মাকে কিছু একটা বলল, যা শুনতেই অনেকটাই মনে হল, “মা, উনি কি সেই লোক?”

মহিলা তাড়াতাড়ি ছেলেকে চুপ করাল, তার দিকে ক্ষমাপ্রার্থীর ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলল, “দুঃখিত, ও ইচ্ছে করে বলেনি।”

ফিফথ আর মেইনের মোড়ে গিয়ে দাঁড়াল সে। সামনে একটা দুই তলা ব্রাউনস্টোন বিল্ডিং, কাঁচের ডাবল দরজায় বড় হরফে লেখা ‘ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাংক অব ওয়েওয়ার্ড পাইনস’। বিল্ডিংয়ের পাশে, গলির মুখে একটা ফোনবুথ দেখা যাচ্ছে। যতটা সম্ভব দ্রুত পা টেনে টেনে সেদিকে এগোল সে। দরজা টেনে দিল ভেতরে ঢুকে।

ফোনবুক হাতে নিয়ে পাতা ওলটাতে লাগল। তার জীবনে দেখা সবচেয়ে পাতলা ফোনবুক। মোটে আট পৃষ্ঠা, কয়েকশো নাম। কিন্তু এই শহরের বাকি সবকিছুর মতোই, নামগুলোও তার কাছে অর্থহীন।

ফোনবুকটা হাত থেকে খসে পড়ল। ঝুলে রইলো ধাতব কর্ডের সাথে। ঠাণ্ডা কাচে কপাল ঠেকাল সে।

কীপ্যাডে নজর আটকে গেল তার। মৃদু হাসি ফুটল ঠোঁটে।

আমি আমার বাড়ির ফোন নাম্বার জানি।

রিসিভার তোলার আগে সে কয়েকবার নম্বরটা চাপল, শুধু নিশ্চিত হওয়ার জন্য। আঙুলগুলো নিজে থেকেই নাম্বার টিপে চলল, যেন এই নাম্বার শুধু তার মুখস্থ নয়, একেবারে মাসল মেমোরিতে বসে গেছে।

রিভার্স চার্জ কল করবে সে। বাসায় কেউ একজন থাকলেই হলো। অবশ্য সে জানে না তার বাসায় আদৌ কেউ থাকার কথা কিনা। যদি কেউ থেকেও থাকে, সে তাকে নাম ধরে ডাকতে পারবে না, এমনকি নিজের নামটাও বলতে পারবে না। কিন্তু হয়তো ওপাশে যে রিসিভ করবে সে তার কণ্ঠস্বর চিনে নেবে।

সে এক হাত দিয়ে রিসিভার তুলে কানে ধরল। অন্য হাত বাড়াল জিরো বোতামের দিকে।

কোনো ডায়াল টোন নেই। বারবার হুক চাপল সে, কিচ্ছু হলো না।

রাগটা এতো দ্রুত চড়ল যে সে নিজেও অবাক হয়ে গেল। ফোনের গায়ে সজোরে বাড়ি মারল রিসিভারটা। ভেতরে ভয় আর রাগের যে মিশ্রণটা এতোক্ষণ ধরে ফুসছিল, সেটা এবার অগ্ন্যুৎপাত হয়ে বেরোল। ডান হাত মুঠো পাকিয়ে পেছনে টেনে আনল। ভেঙে ফেলবে কাচের দেয়াল, আঙুলের যা হয় হোক। কিন্তু ভাঙা পাঁজরের যন্ত্রণাটা বজ্রপাতের মতো বিঁধছে বুকে। ব্যথায় কুঁকড়ে পড়ে গেল ফোনবুথের মেঝেতে।

খুলির গোড়ার দপদপানিটা তার চেতনা ডুবিয়ে দিতে চাইছে জলোচ্ছ্বাসের মতো। চোখে সবকিছু দুটো করে দেখতে লাগল, তারপর ঝাপসা… আর শেষে সব অন্ধকার।

***

সে আবার যখন চোখ মেলল, বুথের ভেতর ছায়া নেমেছে। টেলিফোন ডিরেক্টরির ধাতব তারটা আঁকড়ে ধরে নিজেকে টেনে দাঁড় করাল। ময়লা কাচের ভেতর দিয়ে দেখতে পেল, শহরের পশ্চিম প্রান্ত ঘিরে থাকা পর্বত সারির পেছনে নেমে যাচ্ছে টকটকে লাল সূর্যটা। সূর্যটা আড়াল হতেই, তাপমাত্রা যেন দশ ডিগ্রি নেমে গেল।

ফোন নাম্বারটা এখনো মনে আছে তার। নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিপ্যাডে কয়েকবার চেপে অনুশীলন করে নিল। আবারও রিসিভার ছোঁয়াল কানে। ডায়াল টোন নেই। তবে খুব ক্ষীণ একটা খসখস আওয়াজ আসছে, যেটা আগেরবার শুনেছে বলে মনে পড়ছে না।

“হ্যালো? হ্যালো?”

রিসিভার নামিয়ে রেখে আবার ফোনবুক তুলল। আগের বার সে শেষ নাম ধরে খুঁজেছিল। আশা করেছিল কোনো পরিচিত শব্দ হয়তো স্মৃতি উসকে দেবে বা ভেতরে কোনো অনুভূতি জাগাবে। এবার সে চোখ বোলাল প্রথম নাম ধরে। পাতা বেয়ে আঙুল নামছে তার। খুলির গোড়ার ব্যথাটা উপেক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু নাছোড়বান্দা ব্যথাটা ফিরে আসতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে।

প্রথম পৃষ্ঠা—কিছু নেই।

দ্বিতীয়—কিছু নেই।

তৃতীয়—কিছু নেই।

ষষ্ঠ পাতার নিচের দিকে গিয়ে আঙুল থেমে গেল।

স্কোজি ম্যাক আর জেন

৪০৩ ই ৩য় স্ট্রিট, ওয়েস্ট পাইনস ৮৩২৭৮…….৫৫৯-০১৯৬

শেষ দুই পৃষ্ঠায় দ্রুত চোখ বোলাল। ওয়েওয়ার্ড পাইনসের ফোনবুকে স্কোজিই একমাত্র ‘ম্যাক’।

কাচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরোল সে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সূর্য পর্বতশ্রেণীর ওপাশে নেমে যাওয়ার কারণে দ্রুত আলো হারাচ্ছে আকাশ, তাপমাত্রাও পড়ে যাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে।

আজ রাতে আমি ঘুমাব কোথায়?

সে টলতে টলতে ফুটপাত ধরে হাঁটতে লাগল। ভেতরের এক অংশ বারবার চিৎকার করে তাকে হাসপাতালে যেতে বলছে। সে অসুস্থ। শরীর পানিশূন্য। ক্ষুধার্ত। বিভ্রান্ত। পকেটে কোনো টাকা নেই। মাথা থেকে পা পর্যন্ত যন্ত্রণা। প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় ফুসফুস ফুলে পাঁজর স্পর্শ করামাত্র তার মনে হচ্ছে যেন ব্যথায় বুকটা ফেটে যাবে।

তবুও হাসপাতালে যাওয়ার ব্যাপারে মন থেকে সায় পাচ্ছে না। ম্যাক স্কোজির বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ কারণটা ধরে ফেলল সে। বুঝে ফেলল কী তাকে আটকে রাখছে। আবারও… ভয়। সে জানে না কেন। কোনো যুক্তিই নেই, তবু সে কোনোভাবেই ওই হাসপাতালের ভেতরে পা রাখতে চাইছে না। না এখন, না কখনো।

এ এক অদ্ভুত ধরনের ভয়। ব্যাখ্যাহীন, সংজ্ঞাহীন। অনেকটা গভীর রাতে জঙ্গলের পথ ধরে একা হেঁটে চলার মতো, আপনি জানেন না আসলে কীসে আপনার ভয় পাওয়া উচিত, আর এই না-জানাটাই আপনার ভয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

উত্তর দিকে দুই ব্লক হেঁটে সে থার্ড স্ট্রিটে পৌঁছাল। সেখান থেকে মোড় নিল পূর্ব দিকে। ফুটপাত ধরে হাঁটছে সে। বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে আসছে চাপা উত্তেজনায়। প্রথম যে ডাকবাক্সটা পার হলো সেটার গায়ে লেখা ২০১। হিসেব মতে স্কোজির বাসা আর দুই ব্লকের বেশি দূরে হওয়ার কথা না।

সামনেই একটা বাড়ির লনে কয়েকটা বাচ্চা খেলছে। পালা করে ছুটোছুটি করছে স্প্রিঙ্কলারের পানির মধ্য দিয়ে। যতটা সম্ভব সোজা হয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করল সে। কিন্তু পাঁজরের ব্যথার কারণে শরীরটা অজান্তেই হেলে পড়ছে ডানদিকে।

সে কাছাকাছি আসতেই বাচ্চাগুলো খেলা থামিয়ে দিল। চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। ওদের কৌতূহল আর অবিশ্বাস মিশ্রিত দৃষ্টির সামনে পড়ে অস্বস্তি লাগল তার।

রাস্তার পাশে তিনটা বিশাল পাইন গাছ। অনেকখানি জায়গা জুড়ে ডালপালা ছড়িয়ে রেখেছে ওরা। সেগুলোর নিচ দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে আরও একটা রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে চলল পরের ব্লকের দিকে।

এই ব্লকের রঙবেরঙের ভিক্টোরিয়ান বাড়ির নাম্বার শুরু হয়েছে তিন দিয়ে।

মানে পরেরটাই স্কোজিদের ব্লক।

তার হাতের তালু ঘেমে যাচ্ছে। মাথার বিশ্রী দপদপানিটা বাড়তে বাড়তে এখন মনে হচ্ছে যেন কেউ মাথার ভেতর বেসড্রাম বাজাচ্ছে সদর্পে।

হঠাৎ দু’সেকেন্ডের জন্য মনে হলো সবকিছু দুটো করে দেখছে সে। চোখ বন্ধ করে ফেলল শক্ত করে। আবার যখন খুলল, সব ঠিকঠাক।

পরের মোড়ে এসে থমকে গেল সে। গলা আগেই শুকনো ছিল, এখন একদম তুলোর মতো শুষ্ক হয়ে গেছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে, বমি উঠে আসতে চাইছে গলা বেয়ে।

ওর চেহারাটা দেখলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। হতেই হবে।

আবার অনিশ্চিত পদক্ষেপে আগে বাড়ল সে। সন্ধ্যা নেমে গেছে। ঠাণ্ডা পাহাড়ি হাওয়া শীত নামিয়ে এনেছে উপত্যকায়। তুষারশোভিত পাহাড় চূড়োয় গোলাপি আভা, আকাশের শেষ আলোয় মিশে গিয়ে অদ্ভুত এক সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। উপভোগ করার চেষ্টা করল সে, কিন্তু প্রচণ্ড যন্ত্রণা তাকে কোনো সৌন্দর্য ছুঁতে দিল না।

এক বয়স্ক দম্পতি হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছিল, তাকে দেখে তাড়াতাড়ি সরে গেল। রাস্তার বাকি অংশ শুনশান। শহরের কোলাহল যেন অনেক দূরে মিলিয়ে গেছে। মসৃণ অ্যাসফল্টের রাস্তা পার হয়ে উল্টোদিকের ফুটপাতে উঠে পড়ল সে। সামনেরটাই ৪০১ নাম্বার ডাকবাক্স। এরপরেই ৪০৩।

দৃষ্টি ফোকাসে রাখতে গিয়ে চোখ কুঁচকে রাখতে হচ্ছে তাকে। মাইগ্রেনের তীব্র যন্ত্রণা ছুরি চালাচ্ছে ভেতরে। কষ্টেসৃষ্টে আরও পনেরো পা এগিয়ে কালো রঙের ৪০৩ নাম্বার ডাকবাক্সটার পাশে দাঁড়াল সে।

স্কোজি

বাঁশের বেড়ার ধারালো মাথাগুলো আঁকড়ে ধরে ভারসাম্য সামলে নিল সে।

হাত বাড়িয়ে হুড়কো তুলল, তারপর জীর্ণ, কালো জুতার ডগা দিয়ে ধাক্কা দিল গেটে। কব্জাগুলো ক্যাচক্যাচ আওয়াজ তুলে খুলে গেল সেটা।

গেট থেকে পুরনো ইটের একটা পথ চলে গেছে ভেতরে। বাসার সামনের বারান্দার সিড়িতে গিয়ে শেষ হয়েছে সেটা। সেখানে দুটো রকিং চেয়ার, মাঝখানে রট-আয়রনের ছোট্ট একটা টেবিল। বাড়িটা গাঢ় বেগুনি, আর মাঝে মাঝে সবুজ বর্ডার। জানালায় পাতলা পর্দা ঝুলছে, যার ওপাশে কোনো আলো নেই।

এগোও। তোমাকে জানতেই হবে।

হোঁচট খেয়ে এগোল বাড়ির দিকে।

চোখের সামনে পুরো দুনিয়াটা দুলছে। বমি ঠেকাতে রীতিমতো যুঝতে হচ্ছে তাকে। টলতে টলতে বারান্দায় পা রাখল সে। মনে হচ্ছে এখনই হুঁশ হারিয়ে ফেলবে। কোনোমতে সামলে নিয়ে দরজার ফ্রেমে ভর দিয়ে দাঁড়াল। কাঁপা কাঁপা হাতে পিতলে কড়াটা ধরে উপরে তুলল। নিজেকে আর ভাবার সুযোগ দিল না সে।

দ্রুত, পরপর চারবার কড়াটা আঘাত করল পিতলের বেজ প্লেটে।

মনে হচ্ছে যেন প্রতি চার সেকেন্ড অন্তর কেউ একজন মাথার পেছনে ঘুষি মারছে, আর চোখের দুপাশ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে কৃষ্ণগহ্বরের মতো অন্ধকার।

দরজার ওপাশে কাঠের মেঝের আর্তনাদ শুনতে পেল সে। ভারি পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে কেউ। তার হাঁটু যেন হঠাৎ সব জোর হারিয়ে ফেলল। বারান্দার একটা খুঁটি আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল সে। কাঠের দরজা খুলে গেল। জালি-দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তার বাবার বয়সী। লোকটা লম্বা, পাতলা, মাথার চুলে পাক ধরেছে, থুতনিতে এক মুঠো সাদা দাড়ি, আর গালে অসংখ্য সূক্ষ্ম লালচে শিরার জটলা, যা এক জীবনের মদ্যপানের ছাপ বহন করছে।

“কে?” লোকটা জিজ্ঞেস করল।

নিজেকে সোজা করল সে। চোখ পিটপিট করে ঝাপসা দৃষ্টিতে ফোকাস আনার চেষ্টা করল। মাইগ্রেন সামলে কোনো সাপোর্ট ছাড়া দাঁড়াতে শরীর আর মনের সমস্ত জোর ব্যয় করতে হলো তাকে।

“আপনি কি ম্যাক?” নিজের কণ্ঠে ভয় শুনতে পেল সে। বুঝল এই মানুষটাও সেটা শুনেছে। নিজের উপরে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল এজন্য।

বয়স্ক লোকটা সামনের দিকে ঝুঁকে জালির ভেতর থেকে তাকে ভালো করে দেখল। “কী চাই আপনার?”

“আপনি কি ম্যাক?”

“হ্যাঁ।”

আরও কাছে এগোল সে। এবার বয়স্ক লোকটা পুরোপুরি তার ফোকাসে এলো। তার নিশ্বাসে রেড ওয়াইনের টক-মিষ্টি গন্ধ।

“আপনি কি আমাকে চেনেন?”

“মাফ করবেন?”

এবার ভয় ক্রোধে রূপ নিল। “আপনি… কি… আমাকে… চেনেন? আমার এই হাল কি আপনি করেছেন?”

বয়স্ক লোকটা বলল, “আমার জীবনে কোনোদিন আপনাকে দেখিনি আমি।”

“তাই?” নিজের অজান্তেই তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। “এই শহরে কি আর কোনো ম্যাক আছে?”

“আমার জানামতে নেই।” ম্যাক জালির দরজা খুলে এক পা বাইরে এলো। “আপনার চেহারার অবস্থা তো একদম ভালো না।”

“আমি নিজেও ভালো বোধ করছি না।”

“কী হয়েছে আপনার?”

“সেটা তো আপনার বলার কথা, ম্যাক।”

ভেতর থেকে এক নারীকণ্ঠ শোনা গেল, “হানি? সব ঠিক আছে?”

“হ্যাঁ জেন, সব ঠিক আছে!” ম্যাক তার দিকে তাকিয়ে বলল, “চলুন, আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। আপনি আহত। আপনার ইমার্জেন্সি মেডিকেল—”

“আপনার সঙ্গে কোথাও যাচ্ছি না আমি।”

“ঠিক আছে, কিন্তু—”

“তাহলে আমার বাড়িতে এসেছেন কেন?” ম্যাকের গলা কর্কশ হয়ে উঠল। “আমি তো শুধু সাহায্য করতেই চাইলাম। যদি সেটা না চান—”

ম্যাক তখনো কথা বলছে, কিন্তু শব্দগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। পেটের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত গমগম আওয়াজ আসছে, যেন একটা মালবাহী ট্রেন গর্জন তুলে ছুটে আসছে তার দিকে। দুনিয়া ঘুরপাক খেতে শুরু করল, আবারও চোখের সামনে হাজির হয়েছে কৃষ্ণগহ্বর। এবার আগের চেয়েও বড় হয়ে। মাথাটা মনে হচ্ছে এখনই ফেটে যাবে। আর পাঁচ সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না তার পক্ষে।

সে ম্যাকের দিকে তাকাল। লোকটার মুখ এখনো নড়ছে। ভয়ংকর প্রতিহিংসা নিয়ে হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে আসছে ট্রেনটা, ছন্দময় ঝমঝম শব্দ একেবারে কানের ভেতরে বাজছে। সে চোখ সরাতে পারছে না ম্যাকের মুখ থেকে—আরও নির্দিষ্ট করে বললে দাঁত থেকে। তার মস্তিষ্কের চাকাগুলো প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে চাইছে, স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে কাজে নেমে পড়তে চাইছে, মরিয়া হয়ে জুড়ে দিতে চাইছে কোনো হারানো সংযোগ। কিন্তু হে ঈশ্বর! এই শব্দ, গর্জন, দপদপ—

সে টেরও পেল না কখন তার হাঁটু জোড়া হাল ছেড়ে দিয়েছে।

পেছন দিয়ে পড়ে যাওয়ায় টের পেল না।

এক মুহূর্তে সে বারান্দায় ছিল।

পর মুহূর্তেই ঘাসের ওপর।

মাথা ঠুকে গেছে শক্ত মাটিতে। চিৎ হয়ে পড়ে আছে সে। দুনিয়া ঘুরছে।

ম্যাক কাছে চলে এসেছে, তাকিয়ে আছে তার দিকে, হাঁটুতে হাত রেখে ঝুঁকে আছে তার ওপর। তার কথাগুলো অসহায়ের মতো হারিয়ে যাচ্ছে মাথার ভেতর ছুটে চলা ট্রেনের গর্জনে।

চেতনাটা ফসকে যাচ্ছে। টের পাচ্ছে সে, আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড। সে চাইছেও তাই। সে চায় ব্যথাটা থেমে যাক। কিন্তু-

উত্তরগুলো।

এখানেই আছে।

এত কাছে।

সে জানে না কী, কিন্তু ম্যাকের দাঁতের মাঝে কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। চোখ সরাতে পারছে না ওর দাঁত থেকে। কোনো অজানা কারণে বারবার মনে হচ্ছে এখানেই সব আছে।

একটা ব্যাখ্যা।

সব প্রশ্নের উত্তর।

তারপরই মাথায় খেলে গেল—লড়াই বন্ধ করো।

এতো করে চাওয়া বন্ধ করো।

ভাবনা বন্ধ করো।

শুধু আসতে দাও।

দাঁত দাঁত দাঁত দাঁত দাঁত…

ওগুলো দাঁত নয়।

ওগুলো উজ্জ্বল চকচকে গ্রিল। সামনে খোদাই করা চারটা অক্ষর—

M A C K

তার পাশের ফ্রন্ট প্যাসেঞ্জার সিটে বসা লোকটা, যার নাম স্টলিংস, কিছুই টের পায়নি।

বোইজি থেকে উত্তরে তিন ঘণ্টার ড্রাইভে একটাই জিনিস স্পষ্ট হয়েছে, স্টলিংস নিজের কণ্ঠস্বর খুব ভালোবাসে। সে শুরু থেকে একটা কাজই করেছে, এবং এখনো করে যাচ্ছে—কথা বলা। আরও এক ঘণ্টা আগেই তার কথা শোনা বন্ধ করেছে সে। শুধু প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর একবার করে বললেই হচ্ছে, “হুম, ইন্টারেস্টিং” কিংবা “এভাবে তো ভেবে দেখিনি”।

ঠিক এমনই একটা উত্তর দেওয়ার জন্য সে মুখ ফেরাতেই দেখল স্টলিংসের ওপাশের জানালায় লেখা— ম্যাক।

শব্দটা মাত্রই পড়েছে সে, প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগও পায়নি, তখনই স্টলিংসের মাথার পাশের জানালাটা হাজার কাচের নুড়িতে বিস্ফোরিত হলো। স্টিয়ারিং কলাম থেকে এয়ারব্যাগ বেরোল, কিন্তু মিলিসেকেন্ড দেরি হয়ে গেছে। মাথাটা রক্ষা পেল না। প্রচণ্ড ধাক্কায় জানালা ভেদ করে বেরিয়ে গেল ওপাশে।

লিঙ্কন টাউন কারের ডানপাশটা গুঁড়িয়ে দিল ট্রাকটা। ভেতরে কাঁচ ভাঙা, লোহা মোচড়ানোর ধ্বংসযজ্ঞ। স্টলিংসের মাথায় সরাসরি আঘাত হানল ট্রাকের গ্রিল।

ট্রাকটা এতো কাছে চলে আসছে যে ইঞ্জিনের তীব্র তাপ এসে লাগছে তার মুখে। পোড়া ব্রেক ফ্লুইড আর গ্যাসোলিনের গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা।

চারপাশ রক্তে ভেসে যাচ্ছে—ফাটল ধরা উইন্ডশিল্ডের ভেতর পাশ বেয়ে পড়ছে, ড্যাশবোর্ডে ছিটকে পড়েছে, চোখে ঢুকেছে, স্টলিংসের মাথার যতটুকু অবশিষ্ট আছে সেখান থেকে এখনো ঝরছে অবিরত।

টাউন কারটা আড়াআড়িভাবে পিছলে একটা ইন্টারসেকশন পারি দিচ্ছে। ট্রাকটা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে তাদের, সোজা ওপাশের ব্রাউনস্টোনের দেয়ালের দিকে, যেটার পাশে একটা সরু গলি এবং গলির মুখে নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ফোন বুথ।

ঠিক তখনই সে চেতনা হারাল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *