অধ্যায় ১৭
বালুঘড়ির উপরের প্রকোষ্ঠ থেকে নিচের প্রকোষ্ঠে কালো বালুর শেষ দানাটা পড়ার পর দুই সেকেন্ডও পার হতে পারল না, দরজা খুলে গেল।
আশিফ দাঁড়িয়ে আছে চৌকাঠে, মুখ ভর্তি হাসি।
ইথান এই প্রথমবার ওকে হুড ছাড়া দেখল। মায়াময় একটা চেহারা, দেখে কল্পনাও করা যায় না এই মানুষটাই এমন নৃশংসতা করতে সক্ষম।
মুখ পরিষ্কার করে কামানো, হালকা নীলচে ভাব সেখানে। চুল কালো, কিছুটা লম্বা, তেল মাখা এবং পেছনে টেনে আঁচড়ানো।
“তোমার বাবা-মার মধ্যে শ্বেতাঙ্গ কে ছিল?” ইথান জিজ্ঞেস করে।
“আমার মা-ব্রিটিশ।” আশিফ ঘরের ভেতরে পা রাখল। টেবিলের কাছে এসে তাকিয়ে রইলো কাগজের পৃষ্ঠাটার দিকে। তারপর আঙুল তুলে বলল, “আশা করি ওটার পিছনের দিকটাও অমন ফাঁকা না।” সে কাগজটা ওল্টাল, চেয়ে থাকল কয়েক সেকেন্ড, তারপর মাথা নাড়ল। দৃষ্টি ফেরাল ইথানের দিকে। “এখানে তোমার এমন কিছু লেখার কথা ছিল যা দেখে আমি খুশি হবো। তুমি কি আমার নির্দেশনা বুঝতে পারোনি?”
“তোমার ইংরেজি যথেষ্ট ভালো। আমি একদম ঠিক বুঝতে পেয়েছি।”
“তাহলে হয়তো তুমি বিশ্বাস করোনি যে আমি যা বলেছি তা করব।”
“বিশ্বাসও করেছি।”
“তাহলে? কিছু লিখলে না কেন?”
“লিখেছি তো।”
“অদৃশ্য কালি দিয়ে?”
এবার ইথান হাসল। সর্বগ্রাসী ভয়টা ঢেকে রাখার নিজের সবটুকু শক্তি খাটাতে হচ্ছে তাকে। সে তার বাঁ হাতটা তুলে ধরল।
“এটাই লিখেছি,” সে বলল, তার তালু দেখিয়ে। সেখানে বলপয়েন্ট কলমের মাথা দিয়ে কেটে আঁকা গাঢ় নীল, বেখাপ্পা এক ট্যাটু, জায়গায় জায়গায় রক্ত ঝরছে এখনো। কিন্তু এতো অল্প সময় আর এমন পরিস্থিতিতে এর চেয়ে ভালো কিছু করা সম্ভবও ছিল না। ইথান বলল, “আমি জানি খুব শিগগিরই আমি চিৎকার করব। অসহ্য যন্ত্রণায়। হয়তো কথা বলার অবস্থায় থাকব না, তখন তোমার যদি জানতে ইচ্ছা করে আমার মাথায় কী ঘুরছে, আমার হাতটা দেখে নিও। শুধু দুইটা মাত্র শব্দ। একটা আমেরিকান সেয়িং। আশা করি পুরো মানেটা ধরতে পারছ?”
“তুমি কল্পনাও করতে পারছ না আমি কী করব,” আশিফ ফিসফিস করে বলল। চোখ জ্বলে উঠল তার, আর ইথান প্রথমবারের মতো লোকটাকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে দেখল। ভয় ছাপিয়ে ইথান সন্তুষ্টি বোধ করল যে দানবটার শান্তভাবের মুখোশটা খসিয়ে দিতে পেরেছে। যদিও জানে তাদের নৃশংস মিথষ্ক্রিয়ায় এটাই হয়তো তার একমাত্র জয়।
“আসলে, পারছি,” ইথান বলল। “তুমি আমাকে নির্যাতন করবে, ভেঙে দেবে, শেষপর্যন্ত মেরে ফেলবে। অতএব আমি জানি, আমার কপালে ঠিক কী আছে। শুধু একটা অনুরোধ।” আশিফের ঠোঁটে সূক্ষ্ম একটা হাসি ফুটে উঠল।
“কী?”
“বড় বড় বোলচাল ছাড়, তুই কোনো বীরপুরুষ না, তুই একটা গুয়ের দলা। সাহস থাকলে করে দেখা, নয়তো অফ যা।”
***
এবং সারা দিন আশিফ তাকে করে দেখাল।
***
কয়েক ঘণ্টা পর, হঠাৎ চেতনা ফিরে পেল ইথান।
আশিফ স্মেলিং সল্টের বোতলটা টেবিলে ছুরিগুলোর পাশে নামিয়ে রাখল।
“ওয়েলকাম ব্যাক। দেখা হয়েছে নিজের চোখে?” লোকটা জিজ্ঞেস করল। সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে ইথান। সে জানে না কতক্ষণ ধরে সে এই জানালাহীন, বাদামি দেয়ালের ঘরে আছে, যেখানে বাতাসে মিশে আছে পচা রক্ত আর মৃত্যুর গন্ধ।
“তোমার পা দেখো।” আশিফের মুখ ঘামে ভিজে আছে। “বলছি পায়ের দিকে তাকাও।”
ইথান যখন শুনল না, আশিফ রক্তমাখা হাত মাটির হাঁড়িতে ঢুকিয়ে মুঠো ভর্তি লবণ তুলে নিল। ছুড়ে মারল ইথানের পায়ে।
বল গ্যাগ ভেদ করে বাইরে চিৎকার শোনা গেল। অসহনীয় যন্ত্রণা।
অতঃপর অন্ধকার।
***
“এখন বুঝতে পেরেছো তোমার তকদীরের মালিক আমি? সবসময়ই থাকব? শুনতে পাচ্ছো?”
সত্যি বলছে আশিফ। এরচেয়ে বড় সত্যি আর নেই।
***
ইথান নিজের মনকে সরিয়ে নিয়েছে এই নরকঘর থেকে। এমন স্মৃতি আঁকড়ে ধরতে চাইছে যা তাকে নিয়ে যাবে তার স্ত্রীর কাছে। তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম, হাসপাতালের সেই মুহূর্ত… ওদের সাথে হাসপাতালে থাকতে চায় সে, কিন্তু যন্ত্রণা তাকে বারবার টেনে আনছে বর্তমানের এই গহ্বরে।
***
আশিফ ঝুঁকে পড়ে তার কানে মৃদুস্বরে বলে, “আমি চাইলে এই যন্ত্রণা শেষ করে দিতে পারি। আবার চাইলে তোমাকে বাঁচিয়েও রাখতে পারি কয়েক দিন। যেভাবে ইচ্ছা। জানি তোমার ব্যথা লাগছে। জানি তুমি এমন যন্ত্রণা সহ্য করছ, যা কোনো মানুষের পক্ষে কল্পনাও করা সম্ভব না। ভাবো তো, আমি এখন পর্যন্ত শুধু একটা পা নিয়েই কাজ করছি। আর আমি এই কাজে খুবই দক্ষ। তোমাকে রক্তক্ষরণে মরতে দেব না। তুমি মরবে, শুধু যখন আমার ইচ্ছে হবে।”
***
তাদের দু’জনের মধ্যে এক অনস্বীকার্য ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে।
আশিফ কাটছে।
আর ইথান চিৎকার করছে।
শুরুতে ইথান তাকায়ইনি ওদিকে, কিন্তু এখন যেন চোখ ফেরাতেই পারছে না।
আশিফ তাকে জোর করে পানি খাওয়ায়, মুখে ঈষদুষ্ণ খাবার গুঁজে দেয়, আর পুরো সময়টা একেবারে স্বাভাবিক কথাবার্তা চালিয়ে যায়, যেন সে কোনো নরঘাতক নয়, একজন সাধারণ নাপিত, আর ইথান কেবল চুল কাটাতে এসেছে।
***
পরে একসময়, আশিফ কোণে বসে পানি খেতে খেতে ইথানকে দেখছে। নিজের কাজ দেখে গর্ব আর বিনোদনের মিশ্র অনুভূতি খেলা করছে মনে।
কপালের ঘাম মুছে দাঁড়াল সে। আলখাল্লার কিনারা দিয়ে ইথানের রক্ত চুইয়ে পড়ছে টপটপ করে।
“কাল সকালে সবার আগে আমি তোমাকে খোজা করব, তারপর ব্লো-টর্চ দিয়ে পুড়িয়ে ক্ষতর মুখ বন্ধ করব। তারপর তোমার ঊর্ধ্বাংশে কাজ শুরু করব। সকালে নাশতায় কী খেতে চাও ভেবে রাখ।”
ঘুরে আলো নিভিয়ে বের হয়ে গেল রুম থেকে।
***
সারারাত অন্ধকারে ঝুলে রইলো ইথান।
অপেক্ষায়।
মাঝে মাঝে দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল… কিন্তু দরজা খুলল না একবারও।
ব্যথা পাহাড়সম, তবু এরমধ্যেই কীভাবে যেন পরিষ্কার মাথায় ভাবতে পারছে সে। স্ত্রীকে নিয়ে ভাবছে, আর ভাবছে সেই সন্তানকে নিয়ে যাকে সে কোনোদিন দেখতেই পাবে না।
এই অন্ধকার গহ্বরে সে ফিসফিসিয়ে কথা বলে থেরেসার সাথে, ভাবে ও কি তার কথা শুনতে পাচ্ছে? সে গোঙায়, কাঁদে। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে যে এভাবেই তার শেষ হতে চলেছে। এমনকি বহু বছর পরেও, ঠিক এই মুহূর্তটা—এই অন্ধকার, এই ঝুলে থাকা, এই অসহ্য যন্ত্রণা, এবং পরের দিনের অপেক্ষা—তাকে তাড়া করে ফিরবে।
প্রতিক্ষণে সে আশিফের ফেরার অপেক্ষা করছে।
প্রতিক্ষণে ভাবছে তার ছেলে বা মেয়ে, সে দেখতে কেমন হবে।
তার নাম কী রাখবে থেরেসা।
কেমন করে একা সব সামলাবে তার স্ত্রী।
এমনকি চার মাস পর সিয়াটলের সেই বৃষ্টিভেজা সকালে রান্নাঘরের টেবিলে বসে থেরেসা একসময় তাকে বলবেও, “ইথান, মনে হয় যেন তুমি কোনোদিনই সত্যি সত্যি আমার কাছে ফিরে আসোনি।”
আর ইথান বলবে, “জানি।” ঠিক তখনই বেবি-মনিটরে ভেসে আসবে বাচ্চার কান্না, আর তার মনে হবে আশিফ শুধু আমার শরীর নয়… আরও অনেক কিছুই কেটে নিয়ে গেছে।
***
অবশেষে দরজাটা খুলে গেল। আলোর ক্ষুরধার ফালি স্রোতের মতো ঢুকে পড়ল ভেতরে, ইথানের চেতনা ফিরিয়ে আনল, সাথে আনল অসহ্য যন্ত্রণা।
তার চোখ আলোর হামলা মানিয়ে নিল, সে বুঝতে পারল দরজায় থাকিয়ে থাকা ছায়াটা আশিফ নয়, বরং পূর্ণ গিয়ার পরিহিত এক নেভি সিল, যার হাতে অ্যাডভান্স কমব্যাট অপটিকাল গানসাইট লাগানো একটা এম-ফোর, ব্যারেল থেকে এখনো ধোঁয়া উঠছে।
ইথানের মুখে আলো ফেলল সে। ভারী ওয়েস্ট-টেক্সাস টানে বলল, “জিসাস…”
***
থেরেসা ভাবে ইথানের পায়ের ক্ষতগুলো হেলিকপ্টার ক্র্যাশ থেকে পাওয়া।
***
সিল সৈন্যটা একজন সার্জেন্ট। শেষ নাম ব্রুকস। সে ইথানকে পিঠে তুলে নিয়ে সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো। অন্ধকার বেজমেন্ট থেকে আলোকিত রান্নাঘরে। চুলায় মাংস পুড়ে কালো হয়ে যাচ্ছে।
এখানে হঠাৎ সকালের নাশতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
হলওয়েতে তিন আরবের লাশ ছড়িয়ে আছে। ছোট্ট রান্নাঘরে ভিড় করেছে পাঁচজন সিল সদস্য। তাদের একজন আশিফের পাশে বসে বাঁ পায়ের হাঁটুর ঠিক ওপরে কাপড়ের পট্টি বাঁধছে। গুলি লেগেছে ওখানটায়।
ব্রুকস ইথানকে চেয়ারে বসিয়ে গর্জে উঠল তার মেডিকের উদ্দেশ্যে। “ওর থেকে সরে দাঁড়াও।” তারপর আশিফের দিকে তাকাল। “এই সৈনিকের এমন অবস্থা কে করেছে?”
আশিফ আরবিতে কিছু বলল।
ব্রুকস ঠাণ্ডাভাবে বলে, “মি নো হাবলো—তোর ভাষা আমি বুঝি না।”
“ও-ই করেছে,” ইথান বলল অস্ফুট স্বরে। “সবকিছু ও-ই করেছে।”
কিছুক্ষণের জন্য রান্নাঘরে শুধু পোড়া মাংসের গন্ধ আর বন্দুকযুদ্ধের গানপাউডারের ঝাঁঝ ছাড়া কিছু রইলো না।
ব্রুকস ইথানের দিকে ঝুঁকল। “দুই মিনিটের মধ্যে এয়ার সাপোর্ট চলে আসবে। একমাত্র এই নোংরা শয়তানটাই বেঁচে আছে। তুমি যা করতে চাও, এই রুমের কেউ কিছু বলবে না।”
চুলোর পাশে দাঁড়ানো স্নাইপার রাইফেলধারী সৈনিক বলে উঠল, “কিচ্ছু বলবে না।”
“আমাকে দাঁড় করাতে পারবে?” ইথান জিজ্ঞেস করল।
ব্রুকস ধরে দাঁড় করিয়ে দিল তাকে। ইথান গোঙাতে গোঙাতে এগোল, রান্নাঘরের রক্তমাখা মেঝে পেরিয়ে আশিফের দিকে। একেবারে তার পাশে গিয়ে ব্রুকস তার হোলস্টার থেকে সিগ বের বাড়িয়ে ধরল ইথানের দিকে। ইথান সেটা নিয়ে ম্যাগাজিন চেক করল।
অনেক মাস পরে তার মনে হবে, এটা যদি সিনেমা হতো, তাহলে হয়তো সে কাজটা করত না। নিজেকে ওই দানবের স্তরে নামাত না কোনোভাবেই। কিন্তু কদর্য সত্যিটা হলো কাজটা করতে মুহূর্তের জন্য দ্বিধাবোধ করেনি সে। পরবর্তী জীবনে প্লেন ক্র্যাশ থেকে শুরু করে আশিফের নির্যাতনের প্রতিটি মুহূর্ত বারবার হানা দিয়েছে দুঃস্বপ্ন হয়ে। কিন্তু এই মুহূর্তটা কোনোদিন তাড়া করে ফেরেনি। বরং আফসোস হয় মুহূর্তটা আরও দীর্ঘায়িত হলো না কেন।
ইথানের শরীরে একটা সুতো নেই, ব্রুকসের সাহায্য ছাড়া দাঁড়াতেই পারছে না, তার পা দেখে মনে হচ্ছে যেন কসাইখানার টেবিলে পড়ে থাকা মাংসের টুকরো। কিন্তু সে যখন আশিফের উদ্দেশ্যে মুখ খুলল, তার কণ্ঠে কোনো জড়তা নেই। “আমার দিকে তাকাও।”
দূরে ব্ল্যাক হকের স্বতন্ত্র হুপ-হুপ-হুপ শোনা যাচ্ছে। তার বাইরে সবকিছু নিস্তব্ধ। নির্যাতক আর নির্যাতিত চোখে চোখ রেখে কাটিয়ে দেয় এক মুহূর্ত। আশিফ নিষ্কম্প স্বরে বলল, “তোমার তকদীরের মালিক আমি। এখনো আছি। সবসময়ই থাকব।”
সে হাসতে শুরু করতেই, ইথান তার চেহারায় গুলি করে দিল।
***
পরের বার যখন তার চেতনা ফিরে এলো, সে ব্ল্যাক হকের জানালায় হেলে আছে। প্রায় তিনশো ফুট নিচে ফালুজার রাস্তা। মরফিন ছড়িয়ে পড়েছে শরীর জুড়ে, আর ব্রুকস কানের কাছে চিৎকার করে বলছে যে সে নিরাপদ আছে, সে বাড়ি ফিরছে, আর দু’দিন আগে তার স্ত্রী একটা সুস্থসবল ছেলের জন্ম দিয়েছে।
