পাইনস – ৩

অধ্যায় ৩

মাথাব্যথা নিয়ে ঘুম থেকে উঠল ইথান। পর্দার ফাঁক গলে রোদের স্রোত ঢুকছে ঘরে। অ্যালার্ম ক্লকের দিকে চোখ ফিরাল সে।

“ওহ, শিট!”

১২:২১।

দুপুর পার করে ফেলেছে ঘুমিয়ে।

ইথান দ্রুত নেমে পড়ল বিছানা ছেড়ে। মেঝেতে গুটি পাকিয়ে পড়ে থাকা প্যান্টটার দিকে হাত বাড়াতেই দরজায় খটখট শুনল। আসলে অনেকক্ষণ ধরেই খটখট চলছে, শুধু এতক্ষণ ধরে সে ভেবেছিল শব্দটা কেবল তার মাথার ভেতরেই বাজছে।

“মিস্টার বার্ক! মিস্টার বার্ক!”

ফ্রন্ট ডেস্কের লিসার চিৎকার।

“এক সেকেন্ড!” ইথান চিৎকার করে জবাব দিল। তাড়াহুড়ো করে প্যান্ট পরল, টলতে টলতে গেল দরজার কাছে। তালা খুলল, চেইন সরাল, দরজা টেনে খুলে দিল।

“হ্যাঁ?”

“চেকআউট এগারোটায়।”

“মাফ করবেন, আমি—”

“সকালেই টাকা দিয়ে দেবেন—বলেছিলেন না?”

“আমি আসলে বুঝতে পারিনি যে—”

“ওয়ালেট আনতে পেরেছেন?”

“না, আমি উঠলামই এখন। আসলেই দুপুর পেরিয়ে গেছে?”

লিসা কোনো জবাব দিল না, শুধু কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

“আমি এখনই শেরিফের অফিসে যাচ্ছি,” ইথান বলল, “ওয়ালেট পেলেই—”

“আপনার রুমটা খালি করতে হবে। চাবি ফেরত দিন।”

“মানে?”

“মানে রুম ছাড়ুন। বের হয়ে যান। কেউ আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করলে একদমই ভালো লাগে না আমার, মিস্টার বার্ক।”

“আমি কাউকে বোকা বানাচ্ছি না।”

“আমি অপেক্ষা করছি।”

ইথান তার চোখের দিকে তাকাল, সামান্য নরমভাব, একটু সহানুভূতির খোঁজে। কিন্তু পেল শুধু পাথরের মতো কঠোরতা।

“আমাকে পোশাক পরতে দিন।” সে দরজা বন্ধ করতে শুরু করল, কিন্তু লিসা পা ঢুকিয়ে দিল ভেতরে।

“ওহ, এখন আমার পোশাক পাল্টানো দেখতে চান? রিয়েলি?” রুমের ভেতরে পিছিয়ে গেল সে। “ঠিক আছে। শো উপভোগ করুন।”

এবং লিসা সত্যিই দেখল। চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল ইথান জুতো বাঁধছে, দাগ লাগা সাদা অক্সফোর্ড শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে, আর টাইয়ের গিট বাঁধতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

অবশেষে ইথান কালো কোটটা গায়ে চাপাল। বেডসাইড টেবিল থেকে রুমের চাবি তুলে নিয়ে লিসার হাতের তালুতে ফেলে দিয়ে বেরোতে বেরোতে বলল, “দুই ঘণ্টার মধ্যে নিজের আচরণের জন্য ভীষণ খারাপ লাগবে আপনার।”

***

মেইন আর সিক্সথ স্ট্রিটের কোণার ফার্মেসিতে, ইথান শেলফ থেকে এক বোতল অ্যাসপিরিন নিয়ে রেজিস্টার কাউন্টারে রাখল।

“আমি এখনই এটার টাকা দিতে পারছি না,” সে বলল, “কিন্তু প্রমিজ করছি, আধাঘণ্টার মধ্যে ওয়ালেট নিয়ে চলে আসব। লম্বা কাহিনি, কিন্তু মাথা ফেটে যাচ্ছে। এখনই একটা ওষুধ দরকার।”

সাদা কোট পরা ফার্মাসিস্ট একটা প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ গোছাচ্ছিল—পিল গুনছিল একটা প্লাস্টিক ট্রেতে। সে থুতনি নামিয়ে তার চারকোনা, রূপালী চশমার উপর দিয়ে তাকাল ইথানের দিকে।

“আপনি ঠিক কী চাইছেন আমার কাছে?”

ফার্মাসিস্টের মাথাটা প্রায় টাক, বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। ফ্যাকাসে গাত্রবর্ণ। কৃশকায় শরীর। মোটা কাচের পেছনে তার বাদামি চোখ যেন আরও বড়ো লাগছে।

“একটু সাহায্য করুন। আমি… সত্যিই কষ্টে আছি।”

“তাহলে হাসপাতালে যান। আমি ফার্মেসি চালাই, দানছত্র খুলে বসিনি।”

হঠাৎ এক সেকেন্ডের জন্য মনে হল সে আবার সবকিছু দুটো করে দেখছে। ভয়ংকর দপদপ করছে মাথার পেছনটা। প্রতিটা স্পন্দনে মেরুদণ্ড বেয়ে নামছে অসহ্য যন্ত্রণা।

ইথান মনে করতে পারল না সে কীভাবে ফার্মেসি থেকে বেরিয়েছে। শুধু আবিষ্কার করল মেইন স্ট্রিটের ফুটপাত ধরে হাঁটছে টলতে টলতে।

মিনিটে মিনিটে খারাপ হচ্ছে তার অবস্থা। মনে হচ্ছে হাসপাতালেই ফিরে যাওয়া উচিত, কিন্তু সেটা মোটেও তার ইচ্ছে নয়। তার শুধু চাই অ্যাডভিল জাতীয় একটা ওষুধ যা ব্যথার তীব্রতা কমাবে যেন সে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে।

পরবর্তী মোড়ে এসে থমকে দাঁড়াল সে। শেরিফের অফিসটা কোন দিকে ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল। সে কোটের ভেতরের পকেট হাতিয়ে কাগজটা বের করল। পড়ল ভাঁজ খুলে।

৬০৪, ফার্স্ট এভিনিউ।

সে একটু দ্বিধায় পড়ল। অপরিচিত কারও দরজায় গিয়ে ওষুধ চাওয়া কি উচিত হবে? আবার অন্যদিকে সে হাসপাতালেও ফিরতে চায় না, কিন্তু এই চেতনা-আচ্ছন্ন করে দেওয়া মাথাব্যথা নিয়ে শেরিফের অফিসে যাওয়াও সম্ভব নয়। তার পরিকল্পনা হলো ওখানে গিয়ে ওদের সবাইকে কঠিন ঝাড়ি দেবে—আর সেটা শুধু তখনই সম্ভব যখন মানুষ বিছানায় কুঁকড়ে পড়ার মতো ব্যথায় নাস্তানাবুদ না থাকে।

কী যেন নাম ছিল মহিলার?

হ্যাঁ, তাই তো—বেভারলি।

গতকাল রাতে সম্ভবত পাব ক্লোজ করার দায়িত্বে ছিল বেভারলি। যার অর্থ, সমূহ সম্ভাবনা হচ্ছে সে এখন বাসায় আছে। তাছাড়া সে তো নিজেই তাকে ডেকেছিল। ইথান যেতেই পারে তার কাছে। সেখানে একটা ওষুধ পেলে, শেরিফের অফিসে যাওয়ার আগে মাথাব্যথাটা কমানো যেত।

ইথান রাস্তা পার হলো, তবে মেইন স্ট্রিট ছাড়ল না। সোজা এগিয়ে চলল। নাইনথ স্ট্রিট গিয়ে মোড় ঘুরল পূর্বদিকে।

স্ট্রিটগুলো মেইন স্ট্রিটকে লম্বালম্বি কেটেছে, আর অ্যাভিনিউগুলো এগিয়েছে সমান্তরালে। হিসাব কষে বুঝল আরও প্রায় সাত ব্লক হাঁটতে হবে।

তৃতীয় ব্লকের পরই টের পেল, পায়ের তলার ফোস্কাগুলো ফেটে জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছে। তবু থামল না। এখন পা আর মাথা দুটোই ব্যথা হওয়ার কারণে মনোযোগ একেকবার একেকটার দিকে যাচ্ছে। সেটাও একদিক থেকে ভালো।

ফিফথ আর ফোর্থ অ্যাভিনিউয়ের মাঝখানে পুরো এক ব্লক জুড়ে একটা স্কুল। তারের জালি বেড়ার পাশ দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোচ্ছে ইথান। বেড়ার ওপাশে স্কুলের খেলার মাঠ।

আট-নয় বছর বয়সী বাচ্চাদের টিফিন টাইম চলছে সম্ভবত। একদল বাচ্চা বরফ-পানি জাতীয় কোনো একটা খেলা খেলছে। একটা স্বর্ণকেশী বেণীওলা মেয়ে তাড়া করছে সবাইকে। পুরো স্কুল কম্পাউন্ড সরগরম ওদের চিৎকারে।

ইথান ওদের খেলা দেখতে দেখতে হাঁটছে। চেষ্টা করছে জুতোর ভেতর জমাট রক্ত আর মাথাব্যথার কথা ভুলে যেতে।

বেণীওলা মেয়েটা একদল বাচ্চার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল হঠাৎ। তাকিয়ে রইলো ইথানের দিকে। অন্য বাচ্চারা আরও কিছুক্ষণ দৌড়ঝাঁপ আর চিৎকার চালিয়ে গেল, তারপর তারা খেয়াল করল তাদের ধাওয়াকারী এখন আর ধাওয়া করছে না। তারপর খেয়াল করল ঠিক কীসে তার মনোযোগ আটকে গিয়েছে।

এক এক করে সব বাচ্চা ঘুরে তাকাল ইথানের দিকে। ফাঁকা মুখভঙ্গি। তারপরও ইথান নিশ্চিত, তাদের অভিব্যক্তিহীন চেহারার আড়ালে কোথায় যেন লুকিয়ে প্রচ্ছন্ন শত্রুতার আভাস।

ইথান ব্যথা চেপে হাসল, হাত নেড়ে বলল, “হ্যালো, বাচ্চারা।”

একজনও হাত নাড়ল না বা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। দাঁড়িয়ে রইল সবাই, মূর্তির মতো স্থির, কেবল মাথাগুলো ঘুরছে, যতক্ষণ না ইথান জিমনেসিয়ামের কোণ ঘুরে অদৃশ্য হলো।

ওদের চিৎকার-হাসির শব্দ আবার ভেসে আসতেই সে বিড়বিড় করে বলল, “শয়তান বাচ্চা-কাচ্চার দল।”

চতুর্থ অ্যাভিনিউ পেরিয়ে সে হাঁটার গতি বাড়াল। যদিও পায়ের যন্ত্রণা বাড়ছে, তবু থামল না। মনে মনে নিজেকে বলল, শুধু পৌঁছা ওখানে। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য কর। আরেকটু পথ, ব্যস।

তৃতীয় অ্যাভিনিউয়ের পর সে হালকা দৌড়াতে লাগল। পাঁজরের ব্যথা ফের চেপে ধরেছে। পাশ কাটিয়ে গেল কয়েকটা ভাঙাচোরা, জীর্ণবাড়ি। ওয়েওয়ার্ড পাইনসের সস্তা এলাকা? এমন একটা শহরেরও কি নোংরা দিক থাকতে পারে?

প্রথম অ্যাভিনিউতে গিয়ে থামল সে।

রাস্তা হঠাৎ কাঁচা হয়ে গেছে। উপরের নুড়িপাথরের স্তরটা ক্ষয়ে গেছে বহু আগেই, এখন শুধু ঢেউ-খেলানো ধুলোমাটির পথ। পাশে কোনো ফুটপাত নেই, এমনকি এই রাস্তার পরে আর কোনো রাস্তাও নেই। ওয়েওয়ার্ড পাইনসের একেবারে পূর্বপ্রান্তে চলে এসেছে সে। রাস্তার দুই পাশে যে কটা বাড়ি আছে, এরপরই হঠাৎ ছেদ পড়েছে সভ্যতায়। খাড়া পাহাড়ি ঢাল উঠে গেছে কয়েকশ ফুট উঁচুতে, আর তার গায়ে পাইন বন। এই সেই বিশাল পাথুরে দেয়াল, যা পুরো শহরটাকে ঘিরে রেখেছে।

ইথান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল শুনশান কাঁচা রাস্তার বুকে।

সামনের জঙ্গল থেকে পাখিদের কিচিরমিচির ভেসে আসছে কেবল, আর কোনো শব্দ নেই। শহরের ভেতরে যৎসামান্য কোলাহল ছিল, এখানে তাও নেই। যেন জগৎসংসার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।

ডাকবাক্সগুলোর নম্বর পাঁচশোর ঘরে ঢুকে গেছে। প্রথমবারের মতো ভেতরে একফোঁটা স্বস্তি জাগল। বেভারলির বাড়ি তো পরের ব্লকেই হবে।

কিন্তু মাথাটা আবার হালকা হয়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। অনুভূতিটা এখনো মৃদু, তবে যেকোনো মুহূর্তে শক্তিশালী হয়ে যেতে পারে।

পরের মোড়টা সম্পূর্ণ ফাঁকা।

একটা মানুষও নেই।

পর্বত থেকে নেমে আসা উষ্ণ বাতাস রাস্তাজুড়ে ধুলো ওড়াচ্ছে, ঘূর্ণি তৈরি করছে ছোট ছোট।

ওই তো—৬০৪, ডান দিকের দ্বিতীয় বাড়ি। ডাকবাক্সের গায়ে লাগানো ছোট্ট একটা স্টিল প্লেটে লেখা নম্বরটা। মরিচা ধরে ছিদ্র ছিদ্র হয়ে গেছে বাক্সটা। একটা হালকা চি চি শব্দ আসছে ভেতর থেকে। প্রথমে ভাবল আবার কোনো লাউডস্পিকার, পরে খেয়াল করল ভেতরে বাসা বাঁধা পাখির একটা ডানা নড়ছে। ইথান চোখ তুলল বাড়িটার দিকে।

একসময় হয়তো সুন্দর ভিক্টোরিয়ান দোতলা বাড়ি ছিল। খাড়া ছাদ, দোলনা ঝোলানো বারান্দা, আর সামনের আঙিনা পেরিয়ে প্রবেশপথে পাথরের সরু পথ।

এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। রঙ বহু আগে খসে গেছে, একটা টুকরোও আর বাকি নেই কোথাও। কাঠের বোর্ডগুলো প্রায় সাদা হয়ে গেছে রোদের তাপে, অধিকাংশই পচনের শেষ পর্যায়ে। জানালার কাচ একটাও আস্ত নেই।

ইথান গত রাতের বিলের কাগজটা পকেট থেকে বের করে আবার মিলিয়ে নিল ঠিকানা। স্পষ্ট লেখা ‘৬০৪, ফার্স্ট এভিনিউ’। বেভারলি হয়তো সংখ্যাগুলো ওলটপালট করে ফেলেছে, অথবা স্ট্রিট লিখতে গিয়ে ভুলে এভিনিউ লিখে ফেলেছে।

কোমরসমান আগাছা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। সামনের আঙিনার ঘাস কত বছর ছাঁটা হয় না কে জানে। ঝোপঝাড়ের ফাঁক গলে পাথুরে পথটা খুব একটা চোখে পড়ে না।

বারান্দায় ওঠার সিঁড়ি দুটো দেখে মোটেই নিরাপদ মনে হচ্ছে না। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। তারপরও প্রথম সিঁড়িতে পা রাখল সে। বিশ্রী ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে চমকে উঠল নিজেই।

“বেভারলি?”

বাড়িটা যেন তার কণ্ঠস্বরটা গিলে নিল।

সতর্ক পায়ে বারান্দা পার হয়ে পাল্লাহীন দরজার ফ্রেম পেরিয়ে আবার ডাকল, “বেভারলি?”

বাতাসের ক্রমাগত ধাক্কায় বাড়ির পুরো কাঠামোটা তিরতির করে কাঁপছে। লিভিং রুমের ভেতর তিন পা এগিয়ে থমকে গেল সে। কিছু জং ধরা স্প্রিং ছড়িয়ে আছে মেঝেতে, পাশেই একটা প্রাচীন সোফার ভগ্ন কাঠামো। একটা কফি টেবিল ঢেকে আছে মাকড়সার জালে, ওগুলোর নিচে কিছু ম্যাগাজিন পড়ে আছে, যেগুলোর পাতা পচে-গলে পাঠ অযোগ্য।

না, বেভারলি এমন জায়গায় আসতে বলবে না—ঠাট্টা হিসেবেও না। হয়তো ভুলে অন্য কিছু…

হঠাৎ একটা গন্ধ ধাক্কা মারল নাকে। থুতনি তুলে শুঁকল গন্ধটা কোথা থেকে আসছে বোঝার জন্য। ফ্লোরবোর্ড থেকে বেরিয়ে থাকা তিনটে পেরেক এড়িয়ে সাবধানে এগোল সে।

আবার শুঁকল বাতাস।

বাতাসের আরেক ঝাপটায় পুরো বাড়ি কেঁপে ওঠার সাথে সাথে গন্ধটাও তার নাক দিয়ে ঢুকে ধাক্কা মারল মস্তিষ্কে। সঙ্গে সঙ্গে মুখ-নাক চেপে ধরল হাত দিয়ে।

আরও ভেতরে এগোল সে, আধভাঙা সিঁড়ি পেরিয়ে সরু করিডোর ধরে, রান্নাঘর আর ডাইনিং রুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। সিলিং ভেঙে পড়ে আছে ডাইনিং টেবিলের ওপরে, আর সেই ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ঢল নেমে এসেছে ভাঙাচোরা আসবাবের ওপর।

পচা তক্তা আর ফাঁকা গর্তে ভরা মাইনফিল্ডের ওপর দিয়ে সাবধানে এগিয়ে চলল সে। একটু ভুল হলেই পড়ে যাবে নিচের ফাঁপা ক্রলস্পেসে।

ফ্রিজ, সিঙ্ক, চুলা—প্রত্যেকটা ধাতব পৃষ্ঠ মরিচায় ছেয়ে গেছে, যেন কোনো ছত্রাকের আস্তর। জায়গাটা তাকে শৈশবের সেই পুরনো পরিত্যক্ত কেবিন আর গোয়ালঘরের কথা মনে করিয়ে দিল। গ্রীষ্মের এক অলস দুপুরে বন্ধুদের নিয়ে তাদের খামারের পেছনের জঙ্গলে ঘুরতে গিয়েছিল ইথান। সেখানেই হঠাৎ ভাগ্যক্রমে কেবিনটা পেয়ে গিয়েছিল তারা। ছাদের অসংখ্য সরু ছিদ্র দিয়ে নেমে আসা সূর্যরশ্মিতে অদ্ভুত রহস্যময় লাগছিল জায়গাটা। একবার একটা পুরনো ডেস্কে সে অর্ধশতাব্দী পুরনো এক সংবাদপত্র পেয়েছিল, যেখানে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের খবর ছাপা ছিল। তার ইচ্ছে ছিল বাড়ি নিয়ে গিয়ে বাবা-মাকে দেখাবে, কিন্তু কাগজটা এত ভঙ্গুর ছিল যে তার হাতেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল।

এক মিনিটের বেশি হয়ে গেছে ইথান নাক দিয়ে নিশ্বাস নেওয়ার সাহস করতে পারছে না। দুর্গন্ধটা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। জিভেও যেন গন্ধের স্বাদ চলে আসছে। এর ঝাঁঝ অ্যামোনিয়ার থেকেও বেশি, তার চোখ দিয়ে পানি গড়াতে শুরু করেছে।

করিডোরের শেষ প্রান্তে অন্ধকার। ছাদ এখনো মোটামুটি অক্ষত আছে ওখানটায়। তবে কয়েকটা স্থান থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছে। সম্ভবত বৃষ্টির পানি জমে আছে ছাদের উপরে, তা সেই বৃষ্টি যবেই হয়ে থাকুক।

করিডোরের শেষ দরজাটা বন্ধ।

ইথান চোখের পানি মুছে হাত বাড়াল, কিন্তু দরজায় কোনো নব নেই। জুতোর ডগা দিয়ে ধাক্কা দিল সে। কব্জাগুলো থেকে আওয়াজ উঠল, দরজাটা ঠক করে গিয়ে লাগল ভেতরের দেয়ালে। ইথান চৌকাঠ পেরিয়ে পা রাখল ভেতরে।

পুরনো সেই কেবিনের মতোই, ওপাশের দেয়ালের গর্ত দিয়ে সূর্যের আলোকবিন্দু ছুটে আসছে। মাকড়সার জাল ভেদ করে সোজা গিয়ে পড়ছে ঘরের একমাত্র আসবাবে।

একটা লোহার খাট।

ধাতব কাঠামোটা এখনো অক্ষত আছে। পচা, গলা ম্যাট্রেসের ভেতর দিয়ে চোখে পড়ছে বেডস্প্রিংগুলো, কুণ্ডলী পাঁকিয়ে আছে সাপের মতো।

এই মুহূর্তের আগ পর্যন্ত, মাছিদের শব্দ খেয়ালই করেনি ইথান। লোকটার মুখের ভেতর জমায়েত হয়ে ছিল সবগুলো—যেন মাছিদের একটা নগরী। দরজা ধাক্কা খাওয়ার শব্দে উড়াল দিল সব। ওগুলোর ডানার সম্মিলিত আওয়াজ একটা ছোট ইঞ্জিন নৌকার মোটরের সমান।

সে যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছে, কিন্তু এমন দুর্গন্ধ জীবনে পায়নি।

জায়গায় জায়গায় মাংস গলে সাদা হাড় বেরিয়ে আছে। হাতে আর পায়ে হ্যান্ডকাফ। হাত বাঁধা হেডবোর্ডের সাথে আর পা রেলিংয়ের সাথে। ডান পায়ের মাংস পচে ঝুলে গেছে। মুখের বাম দিকে কোনো মাংস নেই, কেবল হাড়ের কাঠামো। দাঁতের গোড়াসহ বেরিয়ে আছে। পেটটা ফুলে গেছে অস্বাভাবিকভাবে, ছেঁড়া স্যুটের ভেতর থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তার কোটটা ছিল কালো, সিঙ্গেল ব্রেস্টেড।

ঠিক তার নিজেরটার মতোই। চেহারা নষ্ট হয়ে গেলেও, চুলের দৈর্ঘ্য আর রঙ মিলে যায়। উচ্চতাও ঠিক আছে। ইথান টলতে টলতে পিছিয়ে গেল, হেলান দিল দরজার ফ্রেমে। জেসাস ফাকিং ক্রাইস্ট! এটা এজেন্ট ইভান্স।

***

পরিত্যক্ত বাড়িটার সামনের বারান্দায় ফিরে এসে ঝুঁকে পড়ল ইথান, হাঁটুর ওপর হাত ঠেকিয়ে গভীর শ্বাস নিতে লাগল নাক দিয়ে। ঝেড়ে ফেলতে চাইছে গন্ধটা। মৃত্যুর পচা-দুর্গন্ধটা যেন তার সাইনাস ক্যাভিটিতে গেঁথে বসেছে। থেকে থেকে একটা তেতো স্বাদ পাচ্ছে গলার ভেতর।

সে কোট খুলল, শার্টের বোতাম খুলে সেটাও আলাদা করে ফেলল শরীর থেকে। কাপড়ের তন্তুগুলোতেও এখন গন্ধ ঢুকে গেছে।

শার্টবিহীন অবস্থায়, জঙ্গুলে উঠান পেরিয়ে কাঁচা রাস্তায় পৌঁছাল সে। পায়ের তলার ক্ষত আর মাথার দপদপানিটা এখনও টের পাচ্ছে, তবে ব্যথাটা ভোতা হয়ে গেছে অ্যাড্রেনালিনের প্রভাবে।

রাস্তার মাঝ দিয়ে দ্রুত পা ফেলে এগোতে লাগল। মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে চিন্তা। ওয়ালেট বা আইডির খোঁজে লাশের পকেট ঘেটে দেখবে কিনা ভেবেছিল একবার। কিন্তু কোনো কিছু স্পর্শ করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হতো না। ল্যাটেক্স গ্লাভস, মাস্ক, আর আধুনিক ফরেনসিক টুল নিয়ে যাদের আসার কথা, তাদের জন্য ঘরটা অক্ষত রাখা জরুরি।

এখনো ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না সে।

এই স্বর্গসম ছোট্ট শহরে এক ফেডারেল এজেন্টকে খুন করা হয়েছে।

সে ডাক্তার নয়, কিন্তু পরিষ্কার বুঝতে পারছিল যে ইভান্সের মুখটা শুধু পচে যায়নি। খুলি ভেঙে চুরমার করা হয়েছে। দাঁত ভাঙা। একটা চোখ নেই। তাকে নির্যাতনও করা হয়েছিল।

ছয়টা ব্লক যেন উড়াল দিয়ে পাড়ি দিলো সে। বাইরের বেঞ্চে শার্ট আর কোট ছুড়ে ফেলে দৌড়ে উঠল শেরিফ অফিসের সিঁড়ি দিয়ে। দুই পাল্লার দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল ভেতরে। রিসেপশন রুমটা কাঠের প্যানেল করা, বাদামি কার্পেট, দেয়ালে দেয়ালে ঝুলছে হরেক রকম প্রাণীর শিকার করা মাথা।

ফ্রন্ট ডেস্কে ষাটোর্ধ্ব এক নারী বসে আছে। লম্বা রুপালি চুল। এক প্যাকেট আসল তাস নিয়ে সলিটেয়ার খেলছে একমনে। ডেস্কের ওপরে রাখা নামফলকে লেখা: ‘বেলিন্ডা মোরান।’

ইথান তার টেবিলের কিনারায় এসে দাঁড়াল। মহিলা চারটে তাস নামিয়ে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও খেলা থেকে মুখ তুলে তাকাল।

“কীভাবে সাহায্য—” চোখ বিস্ফারিত হলো। ইথানকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখল কয়েকবার, নাক কুঁচকে উঠল। স্পষ্টতই ইথানের শরীর থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। “আপনার গায়ে শার্ট নেই,” বলল সে।

“ইউনাইটেড স্টেটস সিক্রেট সার্ভিস, স্পেশাল এজেন্ট ইথান বার্ক। শেরিফের সাথে দেখা করতে চাই। নাম কী তার?”

“কে?”

“শেরিফ।”

“ওহ। পোপ। শেরিফ আর্নল্ড পোপ।”

“উনি আছেন, বেলিন্ডা?”

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে রোটারি ফোনটা তুলে তিন অঙ্কের একটা এক্সটেনশন ঘুরাল। “হাই, আর্নি, তোমার সাথে দেখার করতে চায় একজন। সে সিক্রেট এজেন্ট না কি যেন…”

“স্পেশাল এজেন্ট, ইউনাইটেড—”

একটা আঙুল তুলে ইশারায় চুপ থাকতে বলল সে। “জানি না, আর্নি। লোকটার গায়ে কোনো শার্টও নেই, আর তার…” চেয়ার ঘুরিয়ে ইথানের উল্টোদিকে ফিরল সে, ফিসফিসিয়ে বলল, “… গায়ে বাজে গন্ধ করছে। ভীষণ ভীষণ বাজে… আচ্ছা, আচ্ছা, বলে দিচ্ছি।”

ফোন রেখে তার দিকে ঘুরল।

“শেরিফ পোপ কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা করবেন আপনার সাথে।”

“আমার এখনই ওনার সাথে কথা বলা দরকার।”

“আমি বুঝতে পারছি। আপনি ওখানে গিয়ে বসুন প্লিজ।” কাছেই এক কর্নারে কয়েকটা চেয়ারের দিকে আঙুল তুলে দেখাল সে।

ইথান ইতস্তত করল কিছুক্ষণ, অবশেষে ঘুরে ওয়েটিং এরিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। প্রথম সাক্ষাৎটা ভদ্রভাবে সামলানোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তার অভিজ্ঞতা বলে, ফেডারেল এজেন্টরা প্রথমেই ক্ষমতার জোর দেখালে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহজেই রক্ষণাত্মক হয়ে ওঠে, এমনকি শত্রুভাবাপন্নও হয়। তার উপর পরিত্যক্ত বাড়িতে যা পেয়েছে, তাতে এই লোকের সাথে অনেকদিন কাজ করতে হবে বলেই মনে হচ্ছে। তাই শুরুটা মধ্যাঙ্গুলির চেয়ে করমর্দন দিয়ে হওয়াই ভালো।

ওয়েটিং এরিয়ার চারটে নকশাদার চেয়ারের একটায় নিজেকে সঁপে দিল সে।

দৌড়ে আসার কারণে তার শরীর ঘামে ভিজে ছিল, কিন্তু এখন হার্টবিট স্বাভাবিক হয়ে আসায় এবং সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনের একটা ভেন্ট একেবারে তার মাথার উপরে হওয়ায় বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। সামনের ছোট টেবিলে নতুন কোনো ম্যাগাজিন নেই—কেবল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আর পপুলার সায়েন্স-এর কিছু পুরনো সংখ্যা।

চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজল সে।

মাথার ব্যথাটা আবার ফিরে আসছে। বাড়ছে মিনিটে মিনিটে। শেরিফের অফিসটা সম্পূর্ণ নীরব। মাঝে মাঝে শুধু তাস ওল্টানোর আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সেই নিস্তব্ধতায় নিজের মাথাব্যথার ধকধকানিটা যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে।

“ইয়েস!” বেলিন্ডার উল্লসিত কণ্ঠ শোনা গেল।

ইথান চোখ খুলে দেখল বেলিন্ডা জিতে গেছে। সব কার্ড গুছিয়ে শাফল করে আবার নতুন গেম শুরু করল সে।

পাঁচ মিনিট কেটে গেল।

তারপর আরও দশ মিনিট।

বেলিন্ডা আবার জিতে নতুন করে কার্ড শাফল করছে। আর তখনই ইথান বিরক্তির প্রথম ধাক্কাটা টের পেল—বাম চোখের পাতা কাঁপতে শুরু করেছে তার। মাথাব্যথা তখনো বাড়ছে, তার হিসাব অনুযায়ী অন্তত পনেরো মিনিট ধরে সে অপেক্ষা করছে। এই সময়ের মধ্যে একবারও ফোন বাজেনি, আর একটা জনপ্রাণী বিল্ডিংয়ে ঢোকেনি।

চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। আঙুল দিয়ে কপালের দু’পাশ মেসেজ করতে করতে উল্টো গোনা শুরু করল ষাট থেকে। যখন চোখ খুলল তখনো সে শার্টহীন এবং ঠাণ্ডায় কাঁপছে, তখনো বেলিন্ডা তাস ওল্টাচ্ছে, আর তখনও শেরিফের রুম থেকে ডাক আসেনি।

ইথান উঠে দাঁড়াল, দশ সেকেন্ডের মতো মাথা ঘোরার সঙ্গে লড়াই করে ভারসাম্য ফিরে পেল অবশেষে। রিসেপশন টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, অপেক্ষা করতে লাগল বেলিন্ডার দৃষ্টি তোলার জন্য।

টানা পাঁচবার কার্ড ওল্টানোর পর দয়া হলো তার। “হ্যাঁ?”

“বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত, কিন্তু আমি প্রায় বিশ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছি।”

“শেরিফ আজ ভীষণ ব্যস্ত।”

“আমি নিশ্চিত, তাই। কিন্তু আমার এখনই ওনার সঙ্গে কথা দরকার। হয় আপনি এখনই তাকে ফোনে জানাবেন, নয়তো আমি নিজেই ভেতরে চলে যাব, আর—”

ঠিক তখনই বেলিন্ডার ডেস্ক ফোনটা বেজে উঠল।

“জি?… আচ্ছা, অবশ্যই করব।” ফোন রেখে চোখ তুলল সে, হাসল মিষ্টি করে। “আপনি ভেতরে যেতে পারেন। সোজা এই হলওয়ে দিয়ে যান। একেবারে শেষের দরজাটাই ওনার অফিস।”

***

নামফলকের নিচে নক করল ইথান।

ভারী কণ্ঠ শোনা গেল ভেতর থেকে। “হ্যাঁ!” সে নব ঘুরিয়ে কপাট খুলে পা রাখল ভেতরে।

অফিসের মেঝে কালচে, অসংখ্য দাগে ভরা পুরনো কাঠের। তার বামদিকের দেয়ালে বিশাল এক এল্কের মাথা ঝোলানো, আর সেটার উল্টোদিকে একটা বড়সড় আদিম চেহারার ডেস্ক। ডেস্কের পেছনে তিনটা পুরনো গান-ক্যাবিনেট ভর্তি রাইফেল, শটগান, হ্যান্ডগান আর গুলির বাক্স। ইথানের আন্দাজ, এই পরিমাণ গোলাবারুদে চাইলে পুরো শহরের লোকজনকে অন্তত তিনবার মেরে ফেলা যাবে।

চামড়ার চেয়ারে হেলান দিয়ে যে লোকটা বসে আছে সে তার চেয়ে অন্তত দশ বছরের বড় হবে। কাউবয়-জুতো পরা পা দুটো ডেস্কের ওপর তোলা। মাথা ভর্তি ঢেউ খেলানো সোনালি চুল, যা হয়তো আর এক দশকের মধ্যে একেবারে সাদা হয়ে যাবে। কয়েক দিনের শেভ না হওয়া দাড়ির ছোপ চোয়ালে।

গাঢ় বাদামি ক্যানভাস প্যান্ট। হান্টার-গ্রিন ফুলহাতা শার্ট। বুকে ঝলমল করছে শেরিফের তারকা দেখে মনে হচ্ছে মজবুত পিতলের তৈরি, সূক্ষ্ম নকশা খোদাই করা, মাঝখানে কালো অক্ষরে লেখা ডাব্লিউপি।

ডেস্কের দিকে এগোনোর সময়, ইথানের নজর এড়াল না যে শেরিফের ঠোঁটে ক্ষণিকের জন্য বাঁকা হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেছে।

“ইথান বার্ক। সিক্রেট সার্ভিস।”

ডেস্কের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল সে। শেরিফ ইতস্তত করল, যেন তার ভেতরে দ্বন্দ্ব চলছে হাত বাড়াবে কি না। অবশেষে ডেস্ক থেকে বুট নামিয়ে ঝুঁকল সামনের দিকে।

“আর্নল্ড পোপ।” হাত মেলালেন দু’জন। “বসুন, ইথান।”

কাঠের সোজা-চেয়ারে বসল ইথান।

“কেমন লাগছে এখন?” পোপ জিজ্ঞেস করল।

“অতীতে এরচেয়ে ভালো ছিলাম।”

“তা তো অবশ্যই। বাজি ধরতে পারি, আপনার গন্ধও আরো ভালো ছিল আগে।” শেরিফ দাঁত দেখিয়ে হাসল। “কঠিন দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন আপনি, দুঃখজনক।”

“হ্যাঁ, আমি আসলে এই ব্যাপারে একটু বিস্তারিত জানতে চাইছিলাম। আমাদের মারল কে?”

“প্রত্যক্ষ সাক্ষী বলছে, একটা টো-ট্রাক।”

“ড্রাইভার গ্রেপ্তার হয়েছে? চার্জ আনা হয়েছে?”

“সবই হবে, যখন তাকে খুঁজে পাব।”

“মানে এটা হিট-অ্যান্ড-রান?”

পোপ মাথা নাড়ল। “আপনাদের গাড়ি টি-বোন করেই শহর ছেড়ে পালিয়েছে। আমি সিনে পৌঁছানোর অনেক আগেই হারামজাদা পগারপার।”

“কেউ নম্বরপ্লেট দেখেনি?”

শেরিফ মাথা নেড়ে ডেস্ক থেকে কিছু একটা তুলে নিল—একটা স্নোগ্লোব, বেইজটা সোনালি। পোপ দু’হাতে ঝাঁকি দিল সেটা। কাঁচের গম্বুজের নিচে ছোট ছোট বিল্ডিংগুলো আটকা পড়ে গেল তুষারের ঝড়ে।

“ট্রাকটা খুঁজতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?” ইথান জিজ্ঞেস করল।

“ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।”

“ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে?”

“নিঃসন্দেহে।”

“আমি এজেন্ট স্টলিংসকে দেখতে চাই।”

“তার লাশ মর্গে আছে।”

“আর সেই মর্গটা কোথায়?”

“হাসপাতালের বেইজমেন্টে।”

অকস্মাৎ একটা জিনিস মনে পড়ে গেল তার, যেন কেউ কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গেছে।

“একটা কাগজ-কলম পেতে পারি?” ইথান প্রশ্ন করল।

পোপ ড্রয়ার খুলে ব্লক থেকে একটা পোস্ট-ইট নোট আর কলম বাড়িয়ে দিল তার দিকে। ইথান চেয়ারটা ডেস্কের কাছে টেনে আনল, তারপর পোস্ট নোটে লিখে ফেলল নম্বরটা।

“শুনলাম আমার জিনিসপত্রগুলো আপনার কাছে?” পোস্ট-ইটটা পকেটে গুঁজে প্রশ্ন করল সে।

“কোন জিনিসপত্র?” পোপ ভুরু কুঁচকাল।

“আমার ফোন, বন্দুক, ওয়ালেট, ব্যাজ, ব্রিফকেস…”

“কে বলল এগুলো আমার কাছে?”

“হাসপাতালের এক নার্স।”

“তার মাথায় এই ধারণা কোথা থেকে এলো আমার জানা নেই।”

“তারমানে আপনার কাছে নেই?”

“না।”

ডেস্কের ওপারে পোপের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইথান। “তাহলে কি আমার জিনিসপত্র সব গাড়িতেই রয়ে গেছে?”

“কোন গাড়ি?”

কণ্ঠ সামলাতে বেগ পেতে হলো ইথানের। “যেটায় আমি ছিলাম, যেটাকে টো-ট্রাক ধাক্কা দিয়েছিল।”

“হতে পারে। তবে আমি মোটামুটি নিশ্চিত ইএমটি-রা আপনার জিনিসপত্র নিয়ে গেছে।”

“জেসাস।”

“কী হলো?”

“কিছু না। আমি কি বেরোনোর আগে কয়েকটা ফোন কল করতে পারি? অনেকদিন হলো আমার স্ত্রীর সাথে কথা হয়নি।”

“আমি কথা বলেছি ওনার সাথে।”

“কবে?”

“দুর্ঘটনার দিন।”

“ও কি আসছে?”

“জানি না। আমি শুধু ওনাকে ঘটনা জানিয়েছি।”

“আমার এসএসি-কেও জানানো দরকার—”

“সেটা আবার কে?”

“অ্যাডাম হাসলার।”

“সে-ই আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে?”

“হ্যাঁ।”

“তা এখানে আসার আগে আমার সাথে যোগাযোগ করতে নিষেধটাও কি সে-ই করেছিল? নাকি ওটা পুরোপুরি আপনার কাণ্ড?”

“আপনি কি ভাবছেন এটা আমার দায়িত্ব যে—”

“ভদ্রতা, ইথান। ভদ্রতা। যদিও আপনি ফেড, এবং ফেডদের অভিধানেই ওই শব্দটা সম্ভবত নেই—”

“আমি আপনার সাথে অবশ্যই যোগাযোগ করতাম, মিস্টার পোপ। আপনাকে লুপ থেকে বাদ দেয়ার কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না।”

“ওহ, তাই নাকি। তাহলে তো ঠিক আছে।”

ইথান এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। প্রয়োজনের বেশি তথ্য শেয়ার করতে চায় না সে, কিন্তু মাথাটা ভীষণ ধরেছে। ডাবল ভিশনে মনে হচ্ছে শেরিফ যেন দু’জন হয়ে গেছে।

“আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছে দুইজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টের খোঁজে।”

পোপের ভুরু উঁচু হয়ে গেল। “ওরা নিখোঁজ?”

“এগারো দিন হলো।”

“ওরা ওয়েওয়ার্ড পাইনসে কী করছিল?”

“আমাকে বিস্তারিত ব্রিফ দেওয়া হয়নি। তবে জানি, ব্যাপারটার সাথে ডেভিড পিলচার জড়িত।”

“নামটা চেনা চেনা লাগছে। লোকটা কে?”

“দুনিয়ার সেরা ধনীদের তালিকায় সব সময় এই লোকের নাম দেখা যায়। একজন নিভৃতচারী বিলিয়নেয়ার। প্রেসের সাথে কোনোদিন কথা বলে না। একগাদা বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির মালিক।”

“তার সাথে ওয়েওয়ার্ড পাইনসের যোগসূত্র?”

“ওটা জানি না। তবে সিক্রেট সার্ভিস যেহেতু এসেছে, ধরে নিতে পারেন কোনো ধরনের ফিনান্সিয়াল ক্রাইমের তদন্ত চলছিল। এতটুকুই জানি।”

পোপ হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। ডেস্কের ওপাশে বসা অবস্থায়ও ইথান বুঝতে পেরেছিল সে বড়সড় মানুষ, কিন্তু এখন বুট পরা অবস্থায় দাঁড়ানো দেখে বোঝা গেল সে লম্বা প্রায় সাড়ে ছ’ফুটের কাছাকাছি।

“আপনি কনফারেন্স রুমের ফোন ব্যবহার করতে পারেন, এজেন্ট বার্ক।”

ইথান চেয়ার ছাড়ল না। “আমি কিন্তু শেষ করিনি, শেরিফ।”

“কনফারেন্স রুম এই পথে।” ডেস্ক ঘুরে দরজার দিকে এগোল পোপ। “আর হ্যাঁ, একটা সাজেশন দিই, পরেরবার একটা শার্ট পরে আসবেন।”

ইথানের মাথাব্যথার সাথে এবার ক্ষোভও মিশে গেল।

“আপনি জানতে চান না আমি কেন শার্ট পরে আসিনি, শেরিফ?”

“খুব একটা আগ্রহ পাচ্ছি না।”

“কারণ আমি যে দুজন এজেন্টকে খুঁজতে এসেছি, তাদের একজন এখান থেকে ছয় ব্লক দূরের এক বাড়িতে পঁচছে।”

পোপ দরজার কাছে থেমে গেল, তার পিঠ ইথানের দিকে ফেরানো।

“আপনার অফিসে আসার একটু আগেই ওকে খুঁজে পেয়েছি,” ইথান বলল।

পোপ ঘুরে তাকাল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল ইথানের দিকে।

“‘খুঁজে পেয়েছি’ কথাটা ব্যাখ্যা করুন।”

“গত রাতে বিয়ারগার্ডেনের এক বারটেন্ডার আমাকে নিজের ঠিকানা দিয়েছিল, যদি কোনো কিছুর দরকার হয় ভেবে। সকালে ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে। টাকা নেই। হোটেল রুম থেকেও বের করে দিয়েছে। আমি ওর বাসায় গিয়েছিলাম কিছু ওষুধ নেওয়ার জন্য, কিন্তু ঠিকানাটা হয় ভুল ছিল, নয়তো অন্য কিছু।”

“কী ঠিকানা?”

“সিক্স-ও-ফোর, ফার্স্ট অ্যাভিনিউ। জায়গাটা আসলে একটা পুরনো, পরিত্যক্ত বাড়ি। একেবারে ধ্বংসস্তূপ। সেখানকার এক ঘরে শেকল দিয়ে খাটে বাঁধা ছিল এজেন্ট ইভান্স।”

“আপনি নিশ্চিত, এই লোককেই খুঁজতে এসেছিলেন?”

“আশি শতাংশ নিশ্চিত। দেহটা অনেকটা পচে গিয়েছিল আর মুখটা প্রচণ্ড আঘাতে থেঁতলে গিয়েছিল।”

ইথান শেরিফের রুমে ঢোকার পর থেকে লোকটা কপাল কুঁচকে ছিল। এখন হঠাৎ ভ্রুকুটি মিলিয়ে গেল, গলাটাও নরম হয়ে এলো অনেকখানি। এগিয়ে এসে বসল ইথানের পাশের খালি চেয়ারটায়।

“দুঃখিত, এজেন্ট বার্ক। আপনাকে রিসেপশনে বসিয়ে রেখেছিলাম। আপনি আগে ফোন করেননি বলে আমি বিরক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু আপনার কথা ঠিক—আমাকে জানানোর বাধ্যবাধকতা আপনার ছিল না। আমি আসলে খুব রগচটা—আমার অনেক বাজে অভ্যাসের মধ্যে এটাও একটা। আচরণও গ্রহণযোগ্য ছিল না।”

“মাফ করা হলো।”

“গত ক’দিন আপনার কঠিন কেটেছে।”

“হ্যাঁ।”

“আপনি আগে ফোন করে নিন, পরে আবার কথা হবে।”

***

কনফারেন্স রুমের প্রায় পুরোটা দখল করে আছে লম্বা একটা টেবিল। দেয়াল আর চেয়ারের মাঝখানের অল্প জায়গা দিয়ে ওপ্রান্তের পুরনো রোটারি ফোনের কাছে যেতে বেগ পেতে হলো ইথানের।

পকেট থেকে পোস্ট-ইট বের করে রিসিভার তুলল সে।

ডায়াল টোন আছে।

নম্বর ঘুরাল সে।

রিং হচ্ছে ওপাশে।

বিকেলের রোদ ভেনিশিয়ান ব্লাইন্ডের ফাঁক দিয়ে টেবিলে এসে পড়েছে, ঝলমলে আলোর স্ট্রাইপ তৈরি করেছে পালিশ করা কাঠের ওপর।

তৃতীয় রিংয়ের পর ইথান ফিসফিস করে বলল, “প্লিজ, থেরেসা, ধরো।”

পঞ্চম রিং শেষে মেশিন অ্যানসার করল।

থেরেসার কণ্ঠস্বর: “হাই, আপনি বার্ক পরিবারে ফোন করেছেন। দুঃখিত, রিসিভ করতে পারিনি… তবে আপনি যদি টেলিমার্কেটার হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার ফোনটা ধরতে না পেরে আমরা উল্টো খুশিই হয়েছি। সত্যি বলতে আমরা হয়তো আপনার ফোন এড়িয়ে যাচ্ছি এবং এই ফোন নম্বর ভুলে যাওয়ার জন্য আপনাকে উৎসাহ দিচ্ছি। নয়তো বিপের পর মেসেজ রাখুন।”

“থেরেসা, আমি ইথান। ওহ ঈশ্বর! মনে হচ্ছে যুগ যুগ ধরে তোমার কণ্ঠ শুনিনি। তুমি সম্ভবত শুনেছ যে আমার গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। আমার ফোন এখনো কেউ খুঁজে পায়নি। তাই যদি আমাকে কল করার চেষ্টা করে থাকো, দুঃখিত যে ধরতে পারিনি। ওয়েওয়ার্ড পাইনস হোটেলে আছি, রুম টু টুয়েন্টি-সিক্স। চাইলে শেরিফের অফিসেও ফোন করতে পারো। তুমি আর বেন ভালো আছো আশা করি। আমি ঠিক আছি, একটু ব্যথা রয়ে গেছে। আজ রাতে আমাকে হোটেলে ফোন করো। আমিও আবার চেষ্টা করব। ভালোবাসি, থেরেসা। অনেক বেশি।”

ফোন রেখে স্ত্রীর সেল নম্বর মনে করার চেষ্টা করল কিছুক্ষণ। প্রথম সাত ডিজিট পর্যন্ত এলো, অন্ধকারে ঢাকা রহস্য হিসেবে রয়ে গেল শেষ তিনটা ডিজিট। কিন্তু সিয়াটল ফিল্ড অফিসের নম্বরটা অবশ্য মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল। ডায়াল করল সে। তিন রিং পর এক অপরিচিত কণ্ঠের এক মহিলা ধরল ওপাশে।

“সিক্রেট সার্ভিস।”

“আমি ইথান বার্ক। অ্যাডাম হাসলারের সাথে কথা বলতে চাই।”

“তিনি এই মুহূর্তে নেই। আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?”

“না, আমাকে তার সাথেই কথা বলতে হবে। তিনি কি আজ অফিসে নেই?”

“তিনি এই মুহূর্তে নেই। আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?”

“তাহলে আমি তার সেল নাম্বারে ট্রাই করলে কেমন হয়? তার সেল নম্বর পেতে পারি, প্লিজ?”

“দুঃখিত, এই তথ্য দেওয়ার অনুমতি নেই।”

“তুমি কি বুঝতে পারছ আমি কে? স্পেশাল এজেন্ট ইথান বার্ক।”

“আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?”

“তোমার নাম কী?”

“মার্সি।”

“নতুন এসেছো, তাই না?”

“আজ আমার তৃতীয় দিন।”

“শোনো, আমি ওয়েওয়ার্ড পাইনস, আইডাহোতে আছি। ভীষণ জটিল পরিস্থিতি। হাসলারকে এখনই লাইনে দাও। মিটিংয়ে থাকুক, বাথরুমে থাকুক, জাহান্নামের চৌরাস্তায় থাকুক, কিছু যায় আসে না। এখনই ফোনে আনো।”

“ওহ, দুঃখিত।”

“কী?”

“এই ভঙ্গিতে কথা বললে আমি আর আলাপ চালিয়ে যেতে পারব না।”

“মার্সি?”

“জি?”

“সরি, আমি চিৎকার করেছি। কিন্তু হাসলারের সাথে কথা বলা খুব জরুরি।”

“আপনি চাইলে আমি মেসেজ দিয়ে দিতে পারি।”

ইথান চোখ বন্ধ করে ফেলল। দাঁতে দাঁত পিষতে লাগল যেন ফোনের মধ্যে চিৎকার না করে ফেলে।

“তাকে বলো, এজেন্ট ইথান বার্ককে যেন কল করে। হয় ওয়েওয়ার্ড পাইনস শেরিফের অফিসে, নতুবা ওয়েওয়ার্ড পাইনস হোটেলে, রুম টু টুয়েন্টি-সিক্সে। যত দ্রুত সম্ভব আমাকে ফোন করবে। এজেন্ট ইভান্স মারা গেছে। বুঝেছো?”

“আমি মেসেজ পৌঁছে দেবো!” উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেই ফোন কেটে দিল মার্সি।

ইথান রিসিভারটা কান থেকে নামিয়ে টেবিলে আছাড় মারল—একবার নয়, পাঁচবার।

হ্যান্ডসেট নামাতে গিয়ে টের পেল দরজার ফাঁক দিয়ে পোপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে।

“সব ঠিক আছে, ইথান?”

“হ্যাঁ… আমার এসএসি’র সাথে যোগাযোগ করতে একটু ঝামেলা হচ্ছে।”

ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল পোপ। টেবিলের অন্য প্রান্তে বসে পড়ল।

“বলেছিলেন দুইজন এজেন্ট নিখোঁজ?”

“হ্যাঁ।”

“অন্যজন সম্পর্কে বলুন।”

“তার নাম কেট হিউসন। বোইজি ফিল্ড অফিসে ছিল, তার আগে সিয়াটল।”

“সেখানে ওকে চিনতেন আপনি?”

“আমরা পার্টনার ছিলাম।”

“তারপর সে ট্রান্সফার হয়ে গেলো?”

“হ্যাঁ।”

“কেট এখানে এসেছিল যার সাথে, এজেন্ট…”

“বিল ইভান্স।”

“এই টপ-সিক্রেট তদন্তে এসেছিল তারা।”

“ঠিক।”

“আমি সাহায্য করতে চাই। আপনি কি আমার সাহায্য চান?”

“অবশ্যই, আর্নল্ড।”

“তাহলে বেসিক থেকে শুরু করি। কেট দেখতে কেমন?”

চেয়ারে হেলান দিল ইথান।

কেট।

গত এক বছরে ওর কথা মনে না করার জন্য নিজেকে এতো ট্রেনিং দিয়েছে যে সেই ব্যারিয়ার ভেঙে ওর মুখটা মনে টেনে আনতে এক মুহূর্ত লেগে গেল। এ যেন শুকাতে শুরু করা ক্ষতর মুখটা নতুন করে খুলে দেওয়া।

“ওর উচ্চতা পাঁচ-দুই, পাঁচ-তিনের মতো। ওজন একশো-পাঁচ পাউন্ড।”

“ছোটখাটো মেয়ে, তাই না?”

“আমার দেখা সবচেয়ে ভালো ল-ম্যান। ওর বাদামি চুল, শেষবার যখন দেখেছি ছোট ছিল। এতোদিনে হয়তো বড়ো হয়েছে। নীল চোখ। অস্বাভাবিক সুন্দর।” ঈশ্বর, ওর স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।

“কোনো আইডেন্টিফিকেশন মার্ক?”

“হ্যাঁ। ওর গালে হালকা একটা জন্মদাগ আছে, কফির-দাগের মতো, আকারে একটা আধুলির সমান।”

“আমি আমার ডেপুটিদের জানাবো, চাইলে একটা স্কেচও আঁকিয়ে শহরে ঘুরিয়ে দেখাতে পারি।”

“অনেক উপকার হবে তাতে।”

“কেট সিয়াটল থেকে ট্রান্সফারের কারণটা যেন কী বললেন?”

“কারণটা আমি বলিনি।”

“বেশ, কারণটা কি আপনি জানেন?”

“কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ রদবদল।”

“আমি গাড়িটা দেখতে চাই।”

“কোন গাড়ি?”

“কালো লিংকন টাউন কার, যেটাতে আমি ছিলাম যখন অ্যাক্সিডেন্ট হলো।”

“ওহ, অবশ্যই।”

“কোথায় আছে সেটা?”

“শহরের বাইরে একটা স্যালভেজ ইয়ার্ডে।”

পোপ দাঁড়িয়ে গেল।

“ঠিকানাটা আবার একটু বলুন।”

“সিক্স-ও-ফোর, ফার্স্ট অ্যাভিনিউ। আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি। চলুন।”

“প্রয়োজন নেই।”

“আমি যেতে চাই।”

“আমি চাই না আপনি যান।”

“কেন?”

“আপনার কি আর কিছু লাগবে?”

“আমি আপনাদের তদন্তের ফলাফল জানতে চাই।”

“কাল লাঞ্চের পর আসুন। তখন দেখা যাবে কতদূর এগোনো গেছে।”

“আর আপনি আমাকে গাড়িটাও দেখাতে নিয়ে যাবেন?”

“আশা করি সেটা করা যাবে। কিন্তু এখন চলুন, আমি আপনাকে বাইরে পর্যন্ত নিয়ে যাই।”

***

শেরিফের অফিস থেকে বেরিয়ে ইথান যখন শার্ট আর কোট গায়ে চড়াল, মনে হল গন্ধটা আগের চেয়ে একটু কমেছে। গন্ধ এখনো যথেষ্ট আছে, তবু সে ভাবল খালি গায়ে একটা মানুষ রাস্তায় হাঁটার চেয়ে দুর্গন্ধ হয়তো কম মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

যতটা দ্রুত সম্ভব হাঁটার চেষ্টা করছে সে, কিন্তু অন্ধকারের ঢেউ বারবার আছড়ে পড়ছে তার চেতনার তীরে। কৃষ্ণগহ্বর গ্রাস করে নিতে চাইছে তাকে। প্রতি পদক্ষেপে যন্ত্রণার নতুন ধাক্কা ছড়িয়ে পড়ছে মাথার ভেতরে।

বিয়ারগার্ডেন খোলা পাওয়া গেল। কোনো খদ্দের নেই। বিরক্ত চেহারার এক বারটেন্ডার বসে আছে কেবল। বার কাউন্টারের পেছনে স্টুলে হেলান দিয়ে বসে একটা পেপারব্যাক উপন্যাস পড়ছে—এফ. পল উইলসনের প্রথম দিককার কোনো বই।

বারে পৌঁছে ইথান জিজ্ঞেস করল, “বেভারলি কি আজ রাতে আসবে?”

লোকটা এক আঙুল তুলে ইশারা করল।

দশ সেকেন্ড কেটে গেল তার পড়া শেষ হতে হতে। অবশেষে বইটা বন্ধ করে পুরো মনোযোগ দিল ইথানের দিকে।

“আপনাকে কী ড্রিঙ্ক দিতে পারি?”

“কিছু না। গতকাল রাতে এখানে বারটেন্ডিংয়ের কাজ করছিল যে মহিলা, আমি তাকে খুঁজছি। নাম বেভারলি। সুন্দরী, কালো চুল, বয়স মধ্য ত্রিশে, লম্বাটে গড়ন।”

বারটেন্ডার ধীরে ধীরে স্টুল থেকে নামল, বইটা রাখল কাউন্টারে। তার লম্বা, পাঁক ধরা, কাদা গোলা পানির মতো রঙের চুলগুলো পেছনে টেনে পনিটেল করল। “আপনি এখানে এসেছিলেন? এই রেস্টুরেন্টে? গতকাল রাতে?”

“হ্যাঁ।”

“আর একজন লম্বা কালো চুলের মহিলা বারটেন্ডিংয়ের কাজ করছিল?”

“ঠিক তাই। বেভারলি।”

লোকটা মাথা ঝাঁকাল, তার হাসিতে বিদ্রূপের আভাস খেয়াল করল ইথান।

“এখানে কেবল দু’জন বেতনভুক্ত বারটেন্ডার আছে—স্টিভ নামে এক লোক, আর আমি।”

“না। গতরাতে এক মহিলা আমাকে সার্ভ করেছে। আমি বার্গার খেয়েছি, ওই কোণের স্টুলে বসে।” ইথান আঙুল তুলে জায়গাটা দেখাল।

“রাগ করবেন না ভাই, কিন্তু গতরাতে কয় পেগ খেয়েছিলেন?”

“এক ফোঁটাও না। আর আমি আপনার ভাইও নই। আমি ফেডারেল এজেন্ট। আমি জানি আমি এখানে ছিলাম, আর জানি কে আমাকে সার্ভ করেছে।”

“দুঃখিত, জনাব। আমি জানি না আপনাকে কী বলব। আমার মনে হয় আপনি অন্য কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন।”

“না, আমি…”

হঠাৎ ইথানের চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

আঙুল চেপে ধরল কপালে। টেম্পোরাল ধমনী ধকধক করছে—শৈশবে আইসক্রিম বা পপসিকল তাড়াহুড়ো করে খেলে যে ভয়ানক শিরশিরে মাথাব্যথা উঠত, সেই ব্যথার মতো।

“স্যার? স্যার, আপনি ঠিক আছেন?”

বার কাউন্টার থেকে টলতে টলতে সরে এল ইথান। কেবল বলতে পারল, “সে এখানে ছিল… আমি জানি… আমি বুঝতে পারছি না আপনি কেন…”

তারপর আবিষ্কার করল সে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। দু’হাত হাঁটুর ওপর ঠেকানো। সামনের ফুটপাথে বমি ছড়িয়ে আছে—নিজেরই বমি, বুঝতে দেরি হলো না। গলায় এখনো পিত্তের তীব্র জ্বালাপোড়া রয়ে গেছে।

সোজা হয়ে দাঁড়াল ইথান, মুখ মুছল কোটের হাতায়। সূর্য ইতিমধ্যেই পর্বতচূড়ার আড়ালে নেমে গেছে। সন্ধ্যার শীতলতা ভর করছে শহরে।

এখনো অনেক কিছু করার বাকি—বেভারলিকে খুঁজে বের করতে হবে, ইএমটি-দের খুঁজে বের করে নিজের জিনিসপত্র উদ্ধার করতে হবে। অথচ তার সমস্ত দেহ-মনে এখন শুধু একটাই তৃষ্ণা—অন্ধকার কোনো ঘরে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়া। ব্যথাটাকে ভুলে ঘুমিয়ে থাকা। বিভ্রান্তি ভুলে থাকা। ব্যথার আড়ালে যেই আদিম অনুভূতির স্রোত বইছে, সেটাকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ভয়।

অবচেতন থেকে উঠে আসছে ভয়াবহ উপলব্ধি যে কিছু একটা খুব, খুবই ভুল হচ্ছে।

***

ইথান টলতে টলতে পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে উঠল। হোটেলের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে।

ফায়ারপ্লেসের আরামদায়ক উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে পুরো লবি জুড়ে।

আগুনের কাছাকাছি একটা লাভসিটে বসে আছে এক জোড়া তরুণ দম্পতি। হাতে শ্যাম্পেনের গ্লাস। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে। রোমান্টিক ছুটি কাটাতে এসেছে নিঃসন্দেহে। ওয়েওয়ার্ড পাইনসের একেবারেই ভিন্ন একটা দিক উপভোগ করছে ওরা।

টাক্সেডো পরা এক লোক বসে আছে গ্র্যান্ড পিয়ানোয়, বাজাচ্ছে ‘অলওয়েজ লুক অন দ্য ব্রাইট সাইড অব লাইফ।’

ফ্রন্ট ডেস্কে গিয়ে ইথান যন্ত্রণার সত্ত্বেও জোর করে এক টুকরো হাসি ফুটাল ঠোঁটে।

সকালবেলা যে মেয়েটা তাকে রুম থেকে বের করে দিয়েছিল সে-ই বসে আছে রিসেপশনে। মুখ না তুলেই কথা শুরু করল।

“ওয়েওয়ার্ড পাইনস হোটেলে স্বাগতম। কীভাবে আপনাকে—”

কথা আটকে গেল ইথানকে দেখে।

“হাই, লিসা।”

“আমি ইমপ্রেসড,” সে বলল।

“ইমপ্রেসড?”

“আপনি ফিরেছেন টাকা দিতে। আপনি বলেছিলেন দেবেন, কিন্তু আমি সত্যি ভাবিনি আর কখনো আপনাকে দেখব। আমি দুঃখিত—”

“না, শুনুন, আমি আজও আমার ওয়ালেট খুঁজে পাইনি।”

“মানে, গতরাতের রুমের ভাড়া দিতে আসেননি? যদিও বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন?”

ইথান চোখ বন্ধ করল, তীব্র ব্যথার মধ্য দিয়ে শ্বাস টেনে নিল। “লিসা, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না আমার আজকের দিনটা কেমন গেছে। আমি শুধু কয়েক ঘণ্টার জন্য শুতে চাই। পুরো রাতের জন্যও রুম লাগবে না আমার। শুধু একটু ঘুমিয়ে মাথা পরিষ্কার করার জন্য একটা জায়গা চাই। আমার পুরো শরীরে ব্যথা।”

“এক মিনিট।” চেয়ার থেকে উঠে এসে কাউন্টারের ওপর ঝুঁকল সে। “মানে, আপনি এখনো টাকা দিতে পারছেন না, আবার নতুন করে রুম চাইছেন?”

“আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।”

“আপনি আমাকে মিথ্যে বলেছিলেন।”

“সরি। সত্যিই ভেবেছিলাম—”

“আপনি বুঝতে পারছেন আমি আপনার জন্য কতটা ঝুঁকি নিয়েছিলাম? আমার চাকরি চলে যেতে পারত।”

“সরি, আমার এমন কোনো ইচ্ছা—”

“বেরিয়ে যান।”

“কী?”

“শোনেননি?”

“আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, লিসা। আমার ফোন নেই। টাকা নেই। গতরাতের পর আর কিছু খাইনি, আর—”

“সেটা আপনার সমস্যা, আমার না।”

“আমি শুধু কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে চাই। ভিক্ষা চাইছি আপনার কাছে।”

“দেখুন, আমি যতটা সম্ভব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছি। আপনি যান।”

ইথান নড়ল না। শুধু তাকিয়ে থাকল তার দিকে, আশা করছে মেয়েটা হয়তো তার চোখে কষ্ট দেখতে পাবে, মনটা নরম হবে।

“এখনই,” বলল লিসা।

ইথান হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে পিছু হটল।

দরজায় পৌঁছে পেছন থেকে শুনল, “আর কোনোদিন যেন আপনাকে এখানে না দেখি।”

সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে সে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। ফুটপাতে যখন পা রাখল তখন মাথা প্রচণ্ড ঘুরছে। রাস্তার বাতি আর গাড়ির হেডলাইটগুলো ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে মেরি-গো-রাউন্ডের মতো। পায়ের সব শক্তি যেন শুষে নিয়েছে কেউ।

তবু হাঁটতে শুরু করল সে। আট ব্লক দূরে লাল ইটের বিল্ডিংটা দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। এখনো ওটার প্রতি তার ভয় আছে, কিন্তু তার এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হাসপাতাল। বিছানা, ঘুম, ওষুধ। এই ব্যথা থামানোর জন্য যা দরকার সব করতে রাজি সে।

হয় সে হাসপাতালে যাবে, নয়তো রাস্তাতেই রাত কাটাতে হবে। কোনো গলিতে, বা পার্কে, খোলা আকাশের নিচে।

কিন্তু আট ব্লক পাড়ি দিতে হবে তাকে। অনেক দূর। এখন প্রতিটি পদক্ষেপ মানে বিশাল শক্তি খরচ। তার দৃষ্টি যেন ক্যামেরার লং-এক্সপোজারে তোলা রাতের শহর। গাড়ির হেডলাইটগুলো যেন লেজ গজিয়ে ছুটছে, রাস্তার ল্যাম্পগুলো ফুঁসে উঠেছে ব্লোটর্চের মতো।

একজনের সাথে ধাক্কা খেল সে।

লোকটা তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল, “গাড়িও কি এভাবে চালাও?”

পরের মোড়ে পৌঁছে থেমে গেল ইথান, রাস্তা পার হতে পারবে কিনা সন্দিহান। পিছিয়ে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল ফুটপাথে, মাথা ঠেকাল একটা ভবনের গায়ে। রাস্তায় কি ভিড় বেড়ে গেছে? কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না সে। শুধু কংক্রিটের উপর পায়ের শব্দ আর টুকরো টুকরো কথোপকথন ভেসে আসছে।

সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলল সে।

হয়তো চেতনাও হারিয়ে ফেলেছিল।

তারপর টের পেল ঠাণ্ডা কংক্রিটের মেঝেতে কাত হয়ে শুয়ে আছে সে। কারো একজনের গরম নিঃশ্বাস অনুভব করল, চেহারার খুব কাছ থেকে ভেসে আসছে তার কণ্ঠস্বর। শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু জোড়া লাগাতে পারছে না। চোখের পাতা তুলল।

রাত নেমে গেছে।

ঠাণ্ডায় কাঁপছে সে।

একজন নারী হাঁটু গেড়ে বসে আছে তার পাশে। মহিলার হাত তার কাঁধে। ঝাঁকি দিচ্ছে তাকে।

“স্যার, আপনি ঠিক আছেন? শুনতে পাচ্ছেন? আমার দিকে তাকান, বলুন। কী হয়েছে?”

“ও মাতাল।” পুরুষ কণ্ঠ।

“না, হ্যারল্ড। সে অসুস্থ।”

ইথান তার চেহারা ফোকাসে আনার চেষ্টা করল, কিন্তু সব অন্ধকার আর ঝাপসা। শুধু রাস্তার লাইটগুলো দূরে ছোট ছোট সূর্যের মতো জ্বলছে, মাঝেমধ্যে গাড়ির হেডলাইট ছুটে যাচ্ছে সাদা রেখার মতো।

“আমার মাথায় খুব যন্ত্রণা,” ইথান বলল। কণ্ঠে এমন দুর্বলতা, ভয়ের ছাপ যে তার নিজের বলেই মনে হল না। “আমার সাহায্য দরকার।”

সে ইথানের হাতটা শক্ত করে ধরল, বলল “চিন্তা করবেন না, ভয় পাবেন না, সাহায্য আসছে।”

যদিও যে হাতটা তার হাত ধরে আছে, সেটা মোটেই কোনো তরুণীর হাত নয়—ত্বক অতিরিক্ত টানটান আর পাতলা, পুরনো কাগজের মতো—তবু কণ্ঠে এমন এক অদ্ভুত পরিচিত সুর ছিল যা মুহূর্তেই তার বুক ভেঙে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *