পাইনস – ১২

অধ্যায় ১২

ইথানের কোনো ধারণা নেই অন্ধকারে কতক্ষণ ধরে একা একা হাঁটছে।

এক ঘণ্টা?

বা তারচেয়ে কম।

সে এত ধীরগতিতে হাঁটছে যে এক মাইলের বেশি সে পাড়ি দিতে পারেনি। কিছুক্ষণ পরপর থেমে পেছন দিকে তাকাচ্ছে কোনো আলো আসছে কি না, কারো পায়ের আওয়াজ শোনা যায় কি না। হয়তো দুই।

কিন্তু প্রতিবারই ফল একই; ঘুটঘুটে অন্ধকার। কেউ যদি পিছু নিয়েও থাকে, নদীর গর্জন সব শব্দ ডুবিয়ে দিচ্ছে।

***

বৃষ্টির বেগ কমে এলো। প্রথমে ঝিরিঝিরি, তারপর ফোঁটা-ফোঁটা, শেষে থেমে গেল পুরোপুরি।

ইথান তারপরও হেঁটে চলল। শুধু অনুভূতির ওপর ভরসা করে হাত দিয়ে পাথর ছুঁয়ে ছুঁয়ে। একেবারে ছোট ছোট পা ফেলছে, যেন হঠাৎ পাথরে হোঁচট খেয়ে লুটিয়ে না পড়ে।

***

এবং তারপরই দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে এলো। এক মুহূর্ত আগেও অন্ধকার ছিল। পরমুহূর্তেই মেঘ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো ভরাট একটা চাঁদ। আলোয় ভেজা পাথরগুলো এমন চকচক করে উঠল যেন ওগুলো বার্নিশ করা হয়েছে।

ইথান একটা সমতল পাথরের ওপর ধপ করে বসে পড়ল। পা কাঁপছে তার, হাঁপাচ্ছে রীতিমতো, ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে শরীর। নদী চওড়ায় এখানে প্রায় অর্ধেক হয়ে এসেছে, কিন্তু স্রোত হয়েছে আরও ভয়ানক। চোখা পাথরভরা খাদ বেয়ে দুধ সাদা ফেনা ছিটিয়ে গর্জে নামছে পানি।

নদীর বিশাল সব পাইন গাছ। একেকটা সত্তর বা আশি ফুট উঁচু। হঠাৎ টের পেল তার কতটা তেষ্টা পেয়েছে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল নদীর ধারে, মুখ ডুবিয়ে দিল পানিতে। পানির স্বাদ নিখাদ ঠাণ্ডা, মিষ্টি। একেবারে প্রাণ জুড়ানো, কিন্তু বরফের মতো শীতল। প্রতি চুমুকের ফাঁকে ভাটির দিকে তাকাচ্ছে সে। উত্তাল স্রোত ছাড়া, দুই পাড়ের কোথাও কিছু নড়ছে না।

ইথানের চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসছে, এখানে শুয়ে পড়লে ঘুমিয়ে যেতে সেকেন্ডও লাগবে না, কিন্তু সে জানে কাজটা হবে ভয়ংকর ভুল। আশ্রয় খুঁজতে হবে, চাঁদের আলো নিভে যাওয়ার আগেই, হাঁটাচলার শক্তি হারিয়ে ফেলার আগেই। ইতোমধ্যে মেঘ আবার ঘনিয়ে আসছে চাঁদের সামনে।

মনের উপর জোর খাটিয়ে নিজেকে দাঁড় করাল সে। এখান থেকে নদী পার হওয়া—বিশেষ করে শরীরের এই অবস্থায়—মানে নিশ্চিত মৃত্যু। তাই আশ্রয় খুঁজতে হবে নদীর এই পাশেই। কিন্তু সেটা সহজ হবে না। ওপারে পুরনো পাইনগাছের ঘন বন, যা কয়েক হাজার ফুট উঁচু পাহাড় বেয়ে উঠে গেছে ঘূর্ণায়মান কালোমেঘের ভেতরে। ওইরকম বনে এক রাতের জন্য লুকিয়ে থাকার জায়গা নিশ্চয়ই পাওয়া যেত, আর কিছু না হোক, ডাল-লতাপাতা জড়ো করে শরীরটা ঢেকে যেত। যথেষ্ট ডাল-পাতা গায়ে চাপাতে পারলে বৃষ্টির হাত থেকে তো রক্ষা পাওয়া যেতই, এমনকি শরীরের উষ্ণতাও হয়তো ধরে রাখা যেত।

কিন্তু সেসব কিছুই এখন সম্ভব নয়। ইথানের দিকের নদীতীর প্রায় চল্লিশ ফুট উঠে গেছে টানা, তারপর প্রথম খাঁজটা দেখা যাচ্ছে। আর তার ওপরে একটার পর একটা খাঁজ উঠতে উঠতে মিলিয়ে গেছে অন্ধকারে। এই লাল পাথরের পাহাড়টাই পুরো ওয়েওয়ার্ড পাইনসেকে ঘিরে রেখেছে চারদিক থেকে। কিন্তু এই অবস্থায় তার পাহাড় বাওয়ার মতো শক্তি তার নেই।

ইথান টলতে টলতে এগিয়ে চলল। পেটে পানি ঢলঢল করছে। জুতোর মধ্যে পা দুটো ফুলে ধুকপুক করছে ব্যথায়। সে জানে আরও ঘণ্টা খানেক আগেই, জুতো খুলে পানি বের করে ফেলা উচিত ছিল তার। কিন্তু ভয় ছিল, একবার বসে পড়লে আবার জুতো বাঁধার শক্তিটুকুও থাকবে না। সেখানেই পড়ে থাকতে বাধ্য হবে। এ পাশের পথ আরও কঠিন। সমতল মাটি প্রায় নেই বললেই চলে, সবটাই পাথুরে আর খাড়া ঢাল।

আকাশচুম্বী পাইনগাছের এক বনে ঢুকে পড়ল সে। পাথুরে মাটি বদলে গেল। পায়ের তলায় এখন ভেজা, মরা পাইনপাতার স্তর। ইথান ভাবল, শেষমেশ যদি আর হাঁটতে না পারে, তাহলে এখানে ঘুমিয়েই পড়বে। হয়তো আদর্শ জায়গা নয় যেহেতু নদীর খুব কাছাকাছি। শরীর ঢাকার জন্য ডালপালাও নেই। আর কেউ যদি তাকে খুঁজতে আসে, সহজেই পেয়ে যাবে। তবে প্রাচীন পাইনের ছায়ায় কিছুটা আশ্রয় অন্তত মিলবে।

চারদিকে শেষবারের মতো তাকাল। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আগ্রহজনক কিছু না দেখলে আজকের রাতটা এখানেই কাটাবে। ঢালের দিকে চোখ যেতেই কিছু একটা নজরে পড়ল। পাথুরে ঢালের গোড়ায়, এক টুকরো অস্বাভাবিক কালো অন্ধকার। এক মুহূর্তও ভাবল না। কোনো যুক্তিতর্কে গেল না। শুধু সিদ্ধান্ত নিল ওখানে উঠতে হবে।

পাইন বন পেরিয়ে পাহাড়ি ঢালের দিকে এগিয়ে গেল সে। আবার হাঁপাতে শুরু করেছে সে। টপটপ করে ঘাম পড়ছে মুখ বেয়ে, চোখে ঢুকে জ্বালা ধরাচ্ছে। পাহাড়ের গোড়ার মাটি ছোট ছোট, আলগা পাথরে ভর্তি। পা ফেললেই পিছলে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন বালির ঢিপি বেয়ে উঠছে সে।

অবশেষে সে পাহাড়ের গায়ে গিয়ে দাঁড়াল। অন্ধকার আবার ঘনিয়ে এসেছে, মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে এক ফালি চাঁদ। বৃষ্টি ফিরে আসার গন্ধে ভারি হয়ে আসছে বাতাস। ওই তো দেখা যাচ্ছে ওটা, নদীর ধার থেকে যে কালো অংশটা দেখেছিল। পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট একটা খাঁজ। পাঁচ-ছয় ফুটের মতো ভেতরে ঢুকে গেছে, ভেতরের দেয়াল মসৃণ, শুকনো। ঝড়বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার মতো জায়গা।

ইথান উঠে গেল খাঁজ পর্যন্ত, হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। পেছনের দেয়ালটা প্রাকৃতিকভাবেই সামান্য ঢালু। সেখানে হেলান দিয়ে বসল সে। তার সামনে ছায়া-ছায়া দুনিয়াটা যেন একটা ছোট জানালার মধ্যে বন্দি। বসার জায়গা থেকে নদীটা দেখা যাচ্ছে না, এমনকি গর্জনটাও শুনে মনে হচ্ছে যেন দূরাগত ফিসফিস।

চাঁদের আলো পুরো নিভে গেল, নদীর ওপারের পাইনবন আর আকাশও মিলিয়ে গেল দৃষ্টিসীমা থেকে। ইথানকে ফের ডুবিয়ে দিল গাঢ় অন্ধকারে। তারপর শুরু হলো বৃষ্টি।

উঠে বসল সে। কাঁপা কাঁপা হাতে জুতোর ফিতা আলগা করতে শুরু করল। ফিতাগুলো এতটাই শক্ত করে বেঁধেছিল যে খুলতে কয়েক মিনিট লেগে গেল। শেষে জুতোর ভেতর থেকে প্রায় এক পাইন্টের মতো পানি ফেলল। তারপর মোজাগুলো খুলে চিপে চিপে পানি বার করে শুকাতে রেখে দিল পাথরের ওপরে।

তার গায়ে যা ছিল সবই ভিজে একাকার। হুডি, টি-শার্ট, জিন্স, এমনকি অন্তর্বাস পর্যন্ত খুলে ফেলল। প্রায় দশ মিনিট চিপে পানি বের করল পোশাকগুলো থেকে। হুডিটা বুকের উপর দিল, ফুল-হাতার টি-শার্টটা পায়ের ওপর। আর জিন্সটা গুটিয়ে বালিশ বানিয়ে গুহার পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে কাত হয়ে চোখ বন্ধ করল।

জীবনে কখনো এত ঠাণ্ডা লাগেনি তার।

শুরুতে মনে হচ্ছিল ঠাণ্ডায় সে ঘুমাতেই পারবে না। পুরো শরীর এমন কাঁপছে যে মনে হল হুডিটাও কাঁপতে কাঁপতে শরীর থেকে পড়ে যাবে, তাই হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল সেটা।

কিন্তু যত ঠাণ্ডাই লাগুক সে ছিল তারচেয়েও বেশি ক্লান্ত।

পাঁচ মিনিটও লাগল না, ঘুম জিতে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *