অধ্যায় ১৩
ইথানের ডান গোড়ালি মাটিতে বসানো লোহার আইবোল্টের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা।
একটা জরাজীর্ণ ডেস্কে বসে আছে, যার উপরে মাত্র তিনটে জিনিস রাখা…
ফাঁকা এ-ফোর কাগজ।
কালো বলপেন।
আর একটা বালুঘড়ি, যেটার উপরের বাল্ব থেকে কালো বালুকণা ঝরে পড়ছে নিচের বাল্বে।
আশিফ তাকে বলে গেছে, এই বালু শেষ হলে সে ফিরে আসবে। আর তখন কাগজে যা লেখা থাকবে, সেটা তার পছন্দ না হলে ইথানকে লিঙচি করে মারা হবে। কিন্তু ইথান জানে, তার কাছে যদি বড় কোনো সামরিক আক্রমণের একেবারে সর্বোচ্চ গোপন সব তথ্যও থাকত—তারিখ, জায়গা, টার্গেট, ল্যান্ড স্ট্রাইক থেকে এয়ার-সাপোর্ট পর্যন্ত—সব খুঁটিনাটি লিখে দিলেও আশিফ খুশি হবে না। হবে না, কারণ কিছুই তাকে খুশি করার জন্য যথেষ্ট নয়। তার কপালে মৃত্যুই আছে। ভয়াবহ যন্ত্রণা পেয়ে মৃত্যু।
আশিফের শুধু দুইটা জিনিস তার পরিচিত; ওর কণ্ঠ, আর ওর সেই বাদামি, অশুভ চোখ জোড়া, যে চোখে কোনো তথ্য জানার আগ্রহ নেই, আছে শুধু মানুষকে যন্ত্রণা দিয়ে মারার তীব্র ক্ষুধা। জিজ্ঞাসাবাদ? ওটা তো কেবল ভূমিকা, আসল খেলার আগে গা গরম করার মতো। একটু উত্তেজনা, একটু লোভ, একটু রক্তগরম করার আনন্দ। ও একটা স্যাডিস্ট, সম্ভবত আল-কায়েদা।
তাকে যখন কব্জি বেঁধে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল, তখন যেন পুরো সত্যিটা মনের মধ্যে জাঁকিয়ে বসতে দেয়নি ইথান। কিন্তু এখন—এই নীরব ঘরে, এই ডেস্কের সামনে একা বসে—সত্যের প্রকৃত রূপ যেন তাকে পুরো শক্তি নিয়ে আঘাত করল। সে যাই লিখুক না কেন, আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তার জীবনে নরকে নেমে আসবে। ঘরে একটাই মাত্র জানালা, মোটা কাঠের তক্তা দিয়ে সেটা আটকে রাখা। তবু ফাঁকফোকর দিয়ে ইরাকি সূর্যের তীব্র আলো তীরের মতো ঢুকে পড়ছে ঘরে। প্রচণ্ড গরমে ত্বক পুড়ে যাচ্ছে, শরীরের প্রতিটি রন্ধ্র দিয়ে ফোয়ারার মতো ঘাম বেরোচ্ছে।
মুহূর্তটা এত বাস্তব যে ইথানের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। সে যেন ইন্দ্রিয়-ঝড়ের ভেতর ডুবে যাচ্ছে।
– বাইরে কোথাও কুকুরের ডাক।
– দূর থেকে ভেসে আসা বাচ্চাদের হাসি।
– বহু মাইল দূরে উচ্চিংড়ের ডাকের মতো বন্দুকযুদ্ধের টুকটুক শব্দ।
– বাম কানের কাছে মাছি ঘুরে বেড়ানোর বিরক্তিকর আওয়াজ।
– কাছেই কোথাও মাসগুফ গ্রিল করার লোভনীয় সুঘ্রাণ।
– আর এই কম্পাউন্ডের ভেতরে কোথাও, চিৎকার করছে একজন মানুষ।
কেউ জানে না আমি এখানে আছি। অন্তত, আমাকে সাহায্য করতে পারে এমন কেউ না।
তার চিন্তা থেরেসার দিকে ঘুরে যায়। বাড়িতে আছে ও, গর্ভবতী এখন। একটু পর যা হয় হবে, কিন্তু এই আবেগের ঝড় আর ঘর ছেড়ে আসার হাহাকার সহ্য করার মতো নয়। থেরেসার সাথে শেষবার কথা হয়েছিল এমডব্লিউআর-এর ভিওআইপি বুথে। সেই কথোপকথন ইথান মনে করতে চায় না। মনে করলেই সে ভেঙে পড়বে।
না, এখন ভাবব না। হয়তো একেবারে শেষ মুহূর্তে।
ইথান কলমটা তুলে নিল। মন অন্যদিকে ঘোরানো দরকার। এখানে বসে বসে দুশ্চিন্তা করলে চলবে না। কারণ আশিফ এটাই চায়।
আমি আতঙ্কিত হয়ে ভেঙে পড়ি।
***
যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন থেকে ছিটকে বের হলো সে। পুরো এক মিনিট ধরে বুঝতেই পারল না কোথায় আছে। ভয়ে শরীর কাঁপছে। জ্বরে পুড়ছে।
ইথান উঠে বসল, হাত বাড়িয়ে হাতড়াল চারপাশ। আঙুল গুহার পাথুরে দেয়াল স্পর্শ করতেই মস্তিষ্কের জিপিএস আপডেট হলো, গত কয়দিনের ভয়াবহ বাস্তবতা ফিরে এল হুড়মুড় করে। ঘুমের ঘোরে গায়ের কাপড় ছুড়ে ফেলেছিল সব। আশেপাশে পাথরের উপর ছড়িয়ে আছে সেগুলো। ঠাণ্ডা, ভেজা। ওগুলো ছড়িয়ে দিল, যেন শুকোবার সুযোগ পায়। তারপর এগিয়ে গুহামুখের কিনারায় বসল। বৃষ্টি থেমে গেছে।
রাতের বুক চিড়ে জেগে উঠেছে অসংখ্য তারা। তার কখনো জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ ছিল না, কিন্তু এখন মনের অজান্তেই পরিচিত নক্ষত্রমণ্ডল খুঁজতে শুরু করে দিল চোখ। ভাবল, তারাগুলো কি যে যার জায়গা মতো আছে? এ কি সেই আকাশ, যা সারাজীবন দেখেছি?
পঞ্চাশ ফুট নিচে গান গাইছে নদী। নদীর দিকে নেমে যাওয়া পাহাড়ি ঢালের দিকে তাকাল সে, আর সেটা দেখা মাত্র তার রক্ত বরফ হয়ে গেল। ইথানের প্রথম প্রবৃত্তি হলো দ্রুত পেছনে সরে যাওয়া দরকার। কিন্তু নিজেকে আটকাল সে। হঠাৎ নড়াচড়া করলে ওরা টের পাবে।
শুয়োরের বাচ্চারা, আমাকে ফলো করে এখান পর্যন্ত চলে এসেছে। ভেবেছিলাম নদী পেরোবে না, সেটাও পেরিয়েছে।
বিশাল পাইনগাছের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। ছায়ায় এমনভাবে মিশে আছে যে সংখ্যা অনুমান করা গেল না। ইঞ্চি ইঞ্চি করে, স্লথের মতো ধীর গতিতে ইথান গুহার ভেতরে পিছু হটল। বরফ ঠাণ্ডা মেঝেতে বুক রেখে কেবল চোখখানি বের করে তাকাল নিচের দিকে।
ওরা আবার ছায়ায় মিলিয়ে গেছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো শুধু নিচের ওই নদীটা ছাড়া বাকি পুরো চরাচর থেমে আছে। ইথান ভাবতে শুরু করল, সে কি সত্যিই কিছু দেখেছে? নাকি শুধুই বিভ্রম? গত পাঁচ দিনের অভিজ্ঞতা বিচার করলে, ভ্রম দেখাটাই বরং সুস্থতার লক্ষণ। ত্রিশ সেকেন্ড পর, ছায়া থেকে বেরিয়ে এলো ওরা, ঢালের গোড়ায় নুড়ি পাথরের ওপর।
হোয়াট দ্য হেল!
মাত্র একজনই। যদিও ওটার আকৃতি মানুষের মতো, কিন্তু নড়াচড়া মানুষের মতো না। তার চার হাত-পায়ে ভর এগোচ্ছে। গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে, মাথা চুলহীন। এরপর যে জিনিসটা খেয়াল করল, ওটার শরীরের অনুপাতই অস্বাভাবিক। হাতদুটো স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় দ্বিগুণ লম্বা। ইথানের মুখে ধাতব স্বাদ জমল। ভয়ের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ওটা মাথা তুলল, আর এই দূরত্ব থেকেও ইথান স্পষ্ট দেখতে পেল যে জিনিসটা ওর অতিরিক্ত বড় নাকটা আকাশের দিকে তুলে রেখেছে। গন্ধ শুকছে।
ইথান পিছিয়ে এলো। যতটা ভেতরে সম্ভব। হাঁটু ভাঁজ করে গুটিয়ে নিল শরীর। কাঁপছে সে। শীতে নাকি ভয়ে জানে না। কান খাড়া করল, পায়ের শব্দ বা পাথর নড়ার আওয়াজ শোনার আশায়। কিন্তু নদীর গুনগুন ছাড়া কিছু নেই। পরের বার সে যখন উঁকি দিল—সে যা দেখেছিল, কিংবা দেখেছে বলে ভেবেছিল—সেটা গায়েব হয়ে গেছে।
***
ভোর হতে এখনো কয়েক ঘণ্টা বাকি আছে, কিন্তু ঘুম আর এলো না তার। শরীরটা অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় কাঁপছে। ব্যথায় ছটফট করছে। আর সর্বোপরি ভয় পাচ্ছে যে গত ক’দিনে তার সাথে যা যা ঘটেছে সেগুলো স্বপ্নেও ফিরে আসবে। পাথরের ওপর শুয়ে রইলো সে। মন জুড়ে, মস্তিষ্ক জুড়ে একটাই আকুলতা। একটাই চাওয়া—থেরেসা।
বাড়িতে থাকা কালে প্রায়ই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখত থেরেসার হাত তার বুকের ওপর, শরীর লেপ্টে আছে তার শরীরের সঙ্গে। এমনকি সবচেয়ে কঠিন রাতগুলোতেও—যেসব রাতে সে দেরি করে ফিরত, যেসব রাতে তাদের ঝগড়া হতো, যেসব রাতে সে থেরেসাকে কষ্ট দিয়েছে—থেরেসা সবসময় তার পাশে থেকেছে। ওদের সম্পর্কে ইথানের চেয়ে থেরেসার অবদান অনেক বেশি। ওর ভালোবাসা প্রবাহিত হয় আলোর গতিতে। সেখানে কোনো দ্বিধা নেই। আফসোস নেই। শর্ত নেই। কোনো রাখঢাক নেই।
আর ইথান? সে ভালোবেসেছে হিসেবের নিক্তিতে মেপে। সে যখন কিপ্টের মতো নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে, থেরেসা তখন ভালোবেসেছে নিজেকে উজাড় করে। মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন হঠাৎ করেই সে তার প্রিয়জনের প্রকৃত রূপটা দেখতে পায়। সব অতীত, অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝি ভুলে গিয়ে নতুন চোখে দেখে তাকে, যেভাবে একজন অপরিচিত দেখবে। প্রথম প্রেমের অনুভূতিটা ফিরে আসে আবার, সব কান্নাকাটি আর ঠোকাঠুকির আগে যেমন ছিল। যখন চোখ ভরা স্বপ্ন আর মন ভরা আশা ছিল।
ইথান কখনো তার স্ত্রীকে এতো স্পষ্টভাবে দেখেনি, এত গভীরভাবে ভালোবাসেনি—এমনকি শুরুর দিনগুলোতেও না—যতটা তাকে এই মুহূর্তে ভালোবাসছে। এই বরফঠাণ্ডা, অন্ধকার গহ্বরে বসে মনের কল্পনায় স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরল সে।
তারাগুলো মুছে গেল একে একে। পূব আকাশে আলো ফুটে উঠল। সূর্য পর্বতচূড়া ছাড়িয়ে দেখা দিতেই আরামদায়ক উষ্ণতায় ভরে গেল গুহার ভেতরটা। পাথরগুলো গরম হতে শুরু করল। আর ইথানও যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য নতুন করে বাঁচার স্বাদ পেল। নতুন আলোয় অবশেষে দেখতে পেল শহর ছেড়ে পালাতে গিয়ে তার শরীর কতটা ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। হাত-পা জুড়ে ছড়িয়ে আছে নীলচে-কালো ফোলা দাগ আর জমাট রক্তের কালচে ছোপ ছোপ। নার্স প্যামের সূঁচ ফোটানোর দাগ দেখা যাচ্ছে দুই বাহুতেই।
বাম উরুতে জড়ানো ডাক্ট টেপ খুলে ফেলল সে। বেভারলি যেখানে কেটে মাইক্রোচিপ বের করে দিয়েছিল সেই জায়গাটা উন্মোচিত হয়ে পড়ল। পেঁচিয়ে রাখার ফলে রক্তপাত বন্ধ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কাটার চারপাশ ফুলে লাল হয়ে আছে। অ্যান্টিবায়োটিক আর ভালোভাবে সেলাই ছাড়া এটার ইনফেকশন থামানো যাবে না।
মুখে হাত বোলাল সে। চেহারারটা নিজের বলে মনে হল না। চামড়া ফুলে গেছে, জায়গায় জায়গায় ফাটা, আর গত চব্বিশ ঘণ্টায় দু’বার ভাঙার কারণে নাকটা স্পর্শ করতেই অসহ্য ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল। দুই গালে অগণিত আঁচড়ের দাগ। বনের মধ্যে দিয়ে দৌড়ানোর ফল। আর মাথার পেছনে একটা বড়সড় আলু গজিয়েছে, ওই পাথরধারী ছেলেগুলোর সৌজন্যে।
তবু পায়ের ব্যথার তুলনায় এসব কিছুই না। পালানোর সময় বেদম খাটিয়েছে পা দুটোকে। তার এখন হাঁটার শক্তিটুকু অবশিষ্ট আছে কি না এটাও সে নিশ্চিত না।
***
মধ্য সকাল নাগাদ কাপড়-চোপড় শুকিয়ে গেল মোটামুটি। সেগুলো পরে নিয়ে আধভেজা বুটের ফিতা টেনে বাঁধল, তারপর গুহার কার্নিশ ধরে ঝুলে পড়ল নিচের দিকে। আস্তে আস্তে নেমে এল পাহাড়ের গোড়ায়। নদীর দিকে নামার সময়ই বুঝে গেল আজকের দিনটা কী নিষ্ঠুর হতে যাচ্ছে তার জন্য। যতক্ষণে তীরে পৌঁছাল, শরীরের প্রতিটি পেশি চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বিশ্রাম না নিয়ে উপায় রইলো না। চোখ বন্ধ করল সে। উষ্ণ প্রস্রবণের মতো সূর্যালোক ধুইয়ে দিচ্ছে তার মুখ। এই উচ্চতায় সূর্যের আলোটা যেন আরো মিষ্টি, আরো প্রাণবন্ত।
শুকনো পাইনপাতার গন্ধ। বরফঠাণ্ডা মিষ্টি পানি। ক্যানিয়নের ভেতর নেমে আসা নদীর উচ্ছ্বল গর্জন। স্রোতের টানে নুড়ি পাথরের টুংটাং শব্দ। আকাশের গাঢ় নীল রঙ। উষ্ণ রোদ আর ঠাণ্ডা বাতাস তার মনোবল বাড়িয়ে দিল। বুনো প্রকৃতি উপভোগ করার চেষ্টা করল পুরো শরীর দিয়ে। কিছু একটা জেগে উঠল মনের ভেতর। গত রাতে সে এতটাই ক্লান্ত ছিল যে পাথরের ওপর নিথর হয়ে পড়ে থাকা ছাড়া কিছু করার শক্তি তার ছিল না। এখন ক্ষুধা ফিরে এসেছে। সে পকেট থেকে গাজর আর চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া রুটিটা বের করল।
***
কিছুটা শক্তি ফেরার পর আবার দাঁড়াল সে। কাছের পাইন ঝোপ থেকে একটা মজবুত লাঠি খুঁজে নিয়ে একমাথা ভেঙে নিল হাঁটার লাঠি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। তারপর কয়েক মিনিট ধরে শরীর স্ট্রেচ করল, যদি শক্ত হয়ে থাকা পেশীগুলো একটু শিথিল হয়। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। অবশেষে ক্যানিয়ন বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল, এমন গতিতে যেন বেশিক্ষণ হাঁটা যায়। কিন্তু মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই গতকালের অমানুষিক ধকল তাকে গতি কমাতে বাধ্য করল। আধ-মাইল পথ যেন পাঁচ মাইলের সমান লাগছে। প্রতি পদক্ষেপে লাঠিটার ওপরে ভরসা বাড়ছে—মনে হচ্ছে যেন ওটাই তার জীবনরেখা, একমাত্র ভালো পা।
***
বিকেল নাগাদ ক্যানিয়নের চেহারা বদলে যেতে শুরু করল। নদীটা সরু হতে হতে ঝরনায় পরিণত হলো একসময়। পাইন গাছও সংখ্যায় কমে গেল অনেক। আর যেকটার দেখা মিলল, সেগুলিও খর্বাকৃতির। আর ত্যাড়াব্যাঁকা। কঠিন শীতের নির্মমতায় ঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারেনি। বারবার থামতে বাধ্য হচ্ছিল সে। হাঁটার চেয়ে বিশ্রামই নিতে হচ্ছে বেশি। হাঁপাচ্ছে ক্রমাগত। যত উপরে উঠছে বাতাস পাতলা হয়ে আসছে। অক্সিজেনের অভাবে জ্বালা ধরে যাচ্ছে ফুসফুসে।
***
গোধূলির একটু আগে, শ্যাওলা মোড়া এক পাথরের ওপর লুটিয়ে পড়ল সে। পাশেই নদী। অবশ্য নদী বলতে এখন যা বাকি সেটা স্রেফ ছয় ফুট চওড়া একটা ঝরনা ধারা, স্রোত যদিও খুব বেশি, আর তলায় হরেক রঙের রঙিন পাথর।
সে গুহা ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর থেকে চার-পাঁচ ঘণ্টা কেটে গেছে। সূর্য ইতিমধ্যেই উল্টো দিকের পর্বতসারির আড়ালে নামতে শুরু করেছে। সূর্য মুখ লুকাতেই তাপমাত্রা ঝুপ করে নেমে গেল।
সেখানেই পড়ে রইল সে। আকাশের রং ফিকে হয়ে এল ধীরে ধীরে। আগত ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে শরীর গুটিয়ে নিল। কঠিন একটা সত্য ঠাঁই করে নিল মাথায়, আজ আর সে এখান থেকে উঠতে পারবে না।
পাশ ফিরল সে। হুডটা টেনে দিল মুখের ওপর। চোখ বন্ধ হয়ে এল আপনাতেই।
ঠাণ্ডা লাগছে। সৌভাগ্যক্রমে, সারাদিনের হাঁটাহাঁটির ফলে পরনের কাপড়গুলো শুকিয়ে গেছে। মাথার ভেতর চিন্তার ঝড় বইছে, মনের ভেতর অশান্ত অনুভূতির উত্তাল ঢেউ। আর চরম ক্লান্তি তাকে বিভ্রান্তির কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে।
হঠাৎ অনুভব করল রোদ লাগছে মুখে। চোখ খুলল সে, উঠে বসল।
এখনো ঝরনার ধারে সেই পাথরের ওপরেই আছে সে। তবে সকাল হয়ে গেছে। পূব দিকের ক্যানিয়ন দেয়ালের ওপর মাথা তুলেছে সূর্য। পুরো রাত ঘুমিয়েছি!
কোনো মতে শরীরটা টেনে ঝরনার ধারে গিয়ে বসল সে, আঁজলা ভরে তুলে পান করল খানিকটা। পানি এত ঠাণ্ডা যে মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেল তার।
একটা গাজর আর দু-তিন কামড় রুটি খেল। তারপর উঠে প্রস্রাব সেরে নিল একপাশে গিয়ে। শরীরটা গতকালের চেয়ে অনেকটাই ভালো লাগছিল। পায়ের ব্যথাটা আজও আছে, তবে আগের মতো সর্বগ্রাসী নয়। কিছুটা সহ্য করার মতো।
হাঁটার লাঠিটা তুলে নিল সে।
***
দুই পাশের ক্যানিয়ন দেয়াল ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে এল। স্রোতধারাটাও সরু হতে হতে যে ঝরনা থেকে জন্ম নিয়েছিল, সেখানে মিলিয়ে গেল। পানির শব্দ থেমে যেতেই পূর্ণ নীরবতা নেমে এল গিরিখাতে। শুধু তার বুটের নিচে পাথর চাপা পড়ার মটমট শব্দ। মাঝে-সাঝে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একাকী কোনো পাখির কর্কশ ডাক। আর নিজের হাঁপ ধরা শ্বাস।
দুই পাশের দেয়াল ক্রমাগত খাড়া হয়ে উঠছে, আর আশেপাশে আর কোনো গাছ নেই, এমনকি গুল্মও না। শুধু ভাঙাচোরা পাথর, শ্যাওলা, আর মাথার ওপর অনন্ত আকাশ।
***
দুপুর নাগাদ হাঁটার লাঠিটা ফেলে দিতে বাধ্য হলো ইথান। এখানে আর দাঁড়িয়ে হাঁটার অবস্থা নেই। ঢাল এতো খাড়া হয়ে গেছে যে এগোনোর জন্য চার হাত-পা ব্যবহার করতে হচ্ছে তাকে। ক্যানিয়নের এক বাঁকে এসে অদ্ভুত একটা শব্দ কানে এল। পাথর গড়ানোর একঘেয়ে আওয়াজ নয়, নতুন ধরনের একটা আওয়াজ। ছোটখাটো একটা গাড়ির সমান একটি বোল্ডারের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল সে। নিজের হাঁপ ধরা শ্বাসের আওয়াজ ছাড়িয়ে সেই শব্দটা শোনার জন্য কান পাতল।
ওই তো শোনা যাচ্ছে। মানুষ্য সৃষ্ট। একটানা। হালকা, কম-ডেসিবেলের গুঞ্জন।
কৌতূহল তাকে সামনে টেনে নিয়ে গেল। ইথান বাঁক ঘুরে উঠতেই গুঞ্জনটা আরও পরিষ্কার, আরও জোরালো হতে লাগল। প্রতিটি ধাপেই তীব্র হয়ে উঠছে প্রত্যাশা। অবশেষে যখন জিনিসটা চোখে পড়ল, এক ঝটকায় শরীর জুড়ে উত্তেজনার ঢেউ ছুটে গেল।
ক্যানিয়নটা আরও প্রায় এক-দুই মাইলের মতো খাড়া উঠে গেছে। চোখা পাথর বেরিয়ে আছে মধ্যে মধ্যে। পুরো দৃশ্যটার ভেতর এক অপার্থিব ধূসরতা আর নিষ্ঠুরতা ছড়িয়ে আছে।
শব্দের উৎসটা ইথানের থেকে প্রায় পঞ্চাশ ফুট ওপরে। বিশ ফুট উঁচু একটা বেড়া, যার উপর কুণ্ডলী পাঁকানো রেজর-ওয়্যার। চওড়ায় আনুমানিক ষাট ফুট হবে। দুই মাথা ক্যানিয়নের দুইপাশের দেয়ালের সাথে লাগানো। বেড়ার গায়ে মোটা অক্ষরে সতর্কবার্তা:
হাই ভোল্টেজ
মৃত্যুর ঝুঁকি আছে
নিচে আরেকটা বোর্ডে লেখা:
ওয়েওয়ার্ড পাইন্সে ফিরে যাও
আর এগোলে মরবে
ইথান বেড়ার পাঁচ ফুট দূরে এসে থামল। ভালোমতো খতিয়ে দেখল সেটা। চার ইঞ্চি স্কয়ার প্যানেল দিয়ে বানানো বেড়াটা। স্কয়ারের প্রতিটা বাহুর দৈর্ঘ্য চার ইঞ্চি। কাছ থেকে বৈদ্যুতিক গুঞ্জনটা আরও বেশি অশুভ লাগছে। না চাইতেও, ‘স্পর্শ করলেই মৃত্যু’ জাতীয় অনুভূতি এসে যাচ্ছে মনের মধ্যে।
বাতাসে পচা গন্ধ ভেসে এল। উৎসটা খুঁজে পেতে তার বেশি সময় লাগল না। একটা ধাড়ি ইঁদুর—সম্ভবত মারমট জাতের—মাটির কাছাকাছি একটা ফাঁক দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করেছিল। দেখে মনে হচ্ছে যেন ওটাকে আট ঘণ্টা ধরে মাইক্রোওয়েভ করা হয়েছে। পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে একেবারে। আর কোনো এক দুর্ভাগা পাখি সেটাকে ঝামেলাহীন রেডিমেড খাবার মনে করেছিল। তারও একই পরিণতি হয়েছে।
ইথান চোখ তুলে ক্যানিয়নের দেয়ালের দিকে তাকাল। দেয়াল খাড়া, কিন্তু হাত দিয়ে ধরার মতো বেশ কিছু খাঁজ আর ফাটল আছে। বিশেষ করে ডান দিকের দেয়ালটায়। যদি কারো ভেতরে যথেষ্ট সাহস থাকে, আর সে যদি নিজের জান বাঁচাতে মরিয়া হয়, তাহলে হয়তো তার পক্ষে বেয়ে ওঠা সম্ভব।
ইথান দেয়ালের দিকে এগিয়ে গিয়ে উঠতে শুরু করল। পাথরটার উপরে যে খুব ভরসা করা যায়, ব্যাপারটা এমন না। কিছু খাঁজ মুঠোর মধ্যে নড়বড়ে লাগছে, তবু হাত-পা রাখার জায়গা এতো বেশি আছে যে কোনোটার উপরেই কয়েক সেকেন্ডের বেশি ভর দিতে হচ্ছে না।
অল্প সময়ের মধ্যেই পঁচিশ ফুট উঠে গেল সে। কেমন একটা শূন্যতার অনুভূতি হচ্ছে পেটের ভেতর, শিরশির করছে। বুটের সোলের কয়েক ফুট নিচেই গুঞ্জন করছে বিদ্যুতায়িত রেজর-ওয়্যার। একটা শক্ত পাথরের কার্নিশ ধরে সে পাশ বরাবর সরতে লাগল, ইঞ্চি ইঞ্চি করে চলে গেল বেড়ার নিষিদ্ধ দিকটায়। উচ্চতার কারণে দমবন্ধ লাগছে তার, তবে তারচেয়েও বেশি নার্ভাস লাগছে এই ভেবে যে সে মাত্রই একটা নিষিদ্ধ সীমানা অতিক্রম করল। মনের গভীর কোণে একটা অস্বস্তিকর কণ্ঠ ফিসফিস করে বলেই যাচ্ছে, এইমাত্র নিজেকে ভয়ানক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে সে।
***
ইথান নিরাপদে ক্যানিয়নের তলায় নেমে এল। এগোতে থাকল সোজা পথে ধরে। প্রতি পদক্ষেপের সাথে মৃদু থেকে মৃদুতর হচ্ছে বিদ্যুতায়িত বেড়ার গুঞ্জন। তবে তার শরীর চলে গেছে এক অস্বস্তিকর অতি-সতর্ক, অতি-উত্তেজিত অবস্থায়। ইরাকেও অনেকবার এমন হয়েছে। যেকোনো মিশনে গণ্ডগোল হওয়ার আগেই তার ইন্দ্রিয়গুলো টের পেয়ে যেত। হাতের তালুতে ঘাম, পালস বেড়ে যাওয়াসহ, প্রতিটা ইন্দ্রিয়—শ্রবণ, দৃষ্টি, স্পর্শ, স্বাদ, গন্ধ—অতি-ক্রিয়াশীল হয়ে পড়ত। সে কখনো কাউকে বলেনি, কিন্তু ফালুজাতে ব্ল্যাক হক হারানোর সময়ও, আরপিজি আঘাত হানার পাঁচ সেকেন্ড আগেই সেটা অনুভব করেছিল।
বেড়ার এপাশটা খুব নির্জন। পাথরগুলো সব ভাঙা আর বজ্রপাতে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাওয়া।
আকাশটা শূন্য। মেঘহীন আকাশ নিঃসঙ্গতার অনুভূতি আরও প্রবল করে তুলছে।
গত কয়েকটা দিন ওয়েওয়ার্ড পাইনসে কাটানোর পর এখানে, এই পাহাড়ে, মানুষজন আর সভ্যতা থেকে এতো দূরে, সবকিছু কেমন অবাস্তব লাগছে। তবে সেসব ছাপিয়েও নতুন উৎকণ্ঠা জন্ম নিচ্ছে তার মনে। ক্যানিয়নটা আরও হাজার ফুট উঠে গেছে। যদি শক্তি ধরে রাখতে পারে, হয়তো সন্ধ্যার আগেই শৈলশিরায় পৌঁছে যেতে পারবে। নিঃসন্দেহে পর্বত চূড়ায় প্রবল ঠাণ্ডা বাতাসের আক্রমণ আছে। সেখানে ভাঙা পাথরের উপর এক দীর্ঘ, হিমশীতল রাত কাটানো মানে আবারও এক বিশাল যুদ্ধ। যদি কাটাতেও পারে, তারপর কী হবে? শীঘ্রই খাবার ফুরিয়ে যাবে। ঝরনাটা গায়েব হয়ে যাওয়ার আগে পেট পুরে পানি খেয়েছিল সে। সেই পানি এখনো পেটে টলটল করছে ঠিকই, কিন্তু শরীরের ওপর যে জুলুম করছে, তাতে আবার খুব শিগগিরই পিপাসা লেগে যাবে।
তবুও ক্ষুধা-তৃষ্ণার চেয়েও বেশি ভয় ধরাচ্ছে শৈলশিরার ওপারে কী অপেক্ষা করছে সেই ভাবনাটা। মাইলের পর মাইল বুনো প্রান্তর থাকবে, এটা মোটামুটি অনুমিতই। আর্মিতে থাকাকালে শেখা বুনো প্রান্তরে টিকে থাকার অনেক কৌশল এখনো মনে আছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবতা হলো সে এখন ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। সভ্যতার মুখ দেখতে হলে হেঁটে এই পর্বতশ্রেণি পার হতে হবে ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসছে।
কিন্তু তার আর কীই বা করার আছে? ওয়েওয়ার্ড পাইনসে ফিরে যাবে? না। প্রয়োজনে এই পাহাড়ে ঠাণ্ডায় জমে মরে যাবে, তবু ওই শহরে আবার পা রাখবে না।
বিশাল বিশাল বোল্ডারে ঠাসা ক্যানিয়নের একটা অংশে চলে এল সে। খুব সাবধানে পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে পার হতে শুরু করল জায়গাটা। নিচে কোথাও থেকে আবার জলের শব্দ আসছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। পাথরের স্তূপের নিচে কোনো অন্ধকার গহ্বরে লুকোনো সেটা।
ক্যানিয়নের বাম দেয়ালে, অনেক উঁচুতে একটা তীব্র ঝিলিক দেখা গেল। কিছু একটায় লেগে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। ইথান থামল, চোখের উপর হাত রেখে তাকাল সেদিকে। আলোর ঝলকানিতে চোখ কুঁচকে গেল তার। একটা বর্গাকার ধাতব তল। বেশ ওপরে। জিনিসটার নিখুঁত মাপ, আকৃতি দেখেই বোঝা যাচ্ছে ওটা মানুষের তৈরি না হয়েই যায় না।
পরের বোল্ডারে লাফ দিল সে। এগোনোর গতি আর তীব্রতা বেড়ে গেল। বারবার তাকাতে লাগল উপরের দিকে, কিন্তু জিনিসটা কী বোঝা যাচ্ছে না কিছুতেই। সামনে ক্যানিয়নটা দেখে তুলনামূলক সহজ লাগছে। বোল্ডারগুলো ছোট ছোট, পাড়ি দিতে হয়তো খুব বেশি কষ্ট হবে না। ধাতব জিনিসটার কাছে পৌঁছানো সম্ভব কি না ভাবতে শুরু করে দিয়েছে সে, এমন সময় পাথর খসে পড়ার একটা আওয়াজ তার চিন্তায় ছুরি চালাল।
আতঙ্কিত হয়ে এক মুহূর্তের জন্য ভাবল ভূমিধ্বস ধেয়ে আসছে তার দিকে, চাপা পড়বে টনকে টন পাথরের তলায়। কিন্তু শব্দটা এসেছে পেছন থেকে, ওপর থেকে নয়। ইথান পেছনে তাকাল এক ঝলক। একটু আগে যে পাথরটার উপর থেকে লাফ দিয়েছে, হয়তো সেটাই নড়ে উঠেছে। কিন্তু এই নীরব, জনমানবহীন ক্যানিয়নে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়া আর যেকোনো শব্দই অস্বাভাবিক ঠেকবে। এই জায়গার কবরস্থানসম নীরবতায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে।
পেছন ফিরতেই তার দৃষ্টি চলে গেল সিকি মাইল দূরে বিদ্যুতায়িত বেড়ার দিকে। কিন্তু তারপর খেয়াল করল, নড়াচড়াটা অত দূরে নয়, বরং বেশ কাছাকাছিই হচ্ছে। শ’খানেক গজের মধ্যে।
প্রথমে সে ভেবেছিল কোনো মারমট হবে। কিন্তু জিনিসটা অস্বাভাবিক দ্রুততায় পাথর থেকে পাথরে ছুটছে, একেবারে বিড়ালের মতো, ওজনহীন চপলতায়। আর চোখ কুঁচকে ফোকাস করতেই দেখল, ওটার শরীরে কোনো লোম নেই। দেখতে অনেক শ্বেতী রোগীর মতো; শরীর ফ্যাকাশে, দুধ সাদা চামড়া।
প্রবল ধাক্কা খেল ইথান। ওটার আকার হিসেব করতে গিয়ে ভুল করে ফেলেছে সে। প্রবৃত্তি বশে পিছিয়ে গেল দুই পা। প্রাণীটা মোটেও ছোট পাথরের উপর দিয়ে ছুটে আসছে না। সে একটু আগে যে বিশাল বিশাল বোল্ডারের মাঠ পার হয়ে এসেছে, জন্তুটা এই মুহূর্তে সেখানে। অর্থাৎ আকারে ওটা মানুষের সমান, আর যে গতিতে ছুটে আসছে, তা ভয়াবহ। এমনকি দুই লাফের মাঝখানেও থামছে না।
একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল ইথান, সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল লাফ দিয়ে। তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসছে। জন্তুটা অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। ইথান স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে ওটার শ্বাস, হাঁফানো, পাথরের সাথে নখের ঘষা খাওয়ার খসখস শব্দ। প্রতিটা লাফে ইথানের সাথে দূরত্ব কমছে। আর মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে ওটা। ইথানের পেটে কিছু একটা মোচড় দিয়ে উঠল।
আগের রাতে নদীর ধারে গুহায় বসে এই জিনিসটাই দেখেছিল সে। এই জন্তুটাই দেখেছিল স্বপ্নে। কিন্তু এটা কী? এমন একটা জিনিসের অস্তিত্ব কীভাবে থাকতে পারে?
ক্যানিয়নের ঢাল বেয়ে যতটা দ্রুত সম্ভব ছুট লাগাল ইথান। প্রতি দুই কদমে একবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে সে। জানোয়ারটা শেষ বড় বোল্ডার থেকে এক লাফে নেমে এল, ব্যালেরিনার মতো সাবলীল ভঙ্গিতে। চার হাত-পায়ে ছুটছে ওটা, জংলি শূকরের মতো নিচু হয়ে। ওটার হাঁপানোর কর্কশ শব্দ তীব্র হচ্ছে। বিপজ্জনক গতিতে দূরত্ব কমে আসছে ওদের মাঝে। ইথান দ্রুত সিদ্ধান্তে এল, এই গতিতে এলে ওটাকে দৌড়ে হারানোর কোনো সুযোগ নেই।
ইথান থেমে ওটার মুখোমুখি হলো। সে জানে না এসব কী হচ্ছে, সে জানে না জন্তুটাকে কীভাবে সামলাবে, শুধু জানে তাকে টিকে থাকতে হবে। আর মাত্র কুড়ি গজ দূরে। যত কাছে আসছে, ততই জানোয়ারটা ইথানের অপছন্দ হচ্ছে। ধড় ছোট। হাত-পা লম্বা লম্বা। প্রতিটা আঙুলের ডগায় কালো, ধারালো নখর। ওজন হবে একশ দশ পাউন্ড, বড়জোড় একশ কুড়ি হতে পারে। শুকনো, পাকানো পেশী। আর সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হলো জিনিসটা দেখতে অনেকটাই মানুষের মতো। চামড়া বাচ্চাদের মতো পাতলা। রোদর কারণে এতো দূর থেকেও চামড়ার নিচের নীল শিরা, বেগুনি ধমনি, আর বুকের ডানদিকে ধকধক করতে থাকা গোলাপি হৃদপিণ্ডও দেখা যাচ্ছে।
দশ গজ। ইথান দাঁত চেপে প্রস্তুত হলো। জন্তুটা মাথা নিচু করে ফেলেছে, এখনই ঝাঁপ দেবে। ঠোঁটহীন মুখের কোণা থেকে রক্তাক্ত লালা ঝরে পড়ছে। হিমশীতল চোখ দুটোর ফোকাস তার ওপর। ধাক্কা লাগার দুই সেকেন্ড আগে ইথান ওটার গন্ধ পেল; পচা মাংস, আর বিষাক্ত রক্তের দুর্গন্ধ।
ঠিক ঝাঁপ দেওয়ার মুহূর্তে চিৎকার করল ওটা। আশ্চর্যজনকভাবে মানুষের মতো কণ্ঠ। ইথান শেষ মুহূর্তে একপাশে সরে যেতে চাইল, কিন্তু জন্তুটা যেন আগেই আন্দাজ করেছিল। চার ফুট লম্বা হাতের একটা বাড়িয়ে দিল ইথানের কোমর বরাবর, জড়িয়ে ধরল তাকে। ধারালো নখরগুলো সহজেই হুডির মোটা কাপড় ভেদ করে মাংসে বসে গেল।
তীব্র ব্যথার একটা ঝলক খেলে গেল শরীরে, আর জন্তুটার সম্মুখ ভরবেগে শূন্যে উঠে গেল তার পা। দড়াম করে আছড়ে পড়ল পাথরে। ঝাঁকুনিতে বুকের সব বাতাস বেরিয়ে গেল একসাথে। ইথান অক্সিজেনের জন্য খাবি খাচ্ছে, কিন্তু জানোয়ারটা হামলে পড়ল তার উপর। পিটবুলের হিংস্রতা নিয়ে। বজ্রগতিতে। পাশবিক শক্তিতে। বুনো উন্মাদনায় হাত চালাচ্ছে জন্তুটা। ইথান দু’হাত তুলে মুখ বাঁচানোর চেষ্টা করল, কিন্তু জন্তুটার থাবা শিকারি পাখির নখরের মতো ধারালো। জামা কেটে মুহূর্তেই চামড়া ছিঁড়ে দিচ্ছে।
সেকেন্ডের মধ্যেই ওটা ইথানের বুকের ওপর চড়ে বসল, পায়ের নখরগুলো ইথানের পায়ের পেশিতে এমনভাবে গেঁথে গেছে যেন ওগুলো লোহার পেরেক। এই তাণ্ডবের ফাঁকে ইথান ওটার চেহারার দিকে তাকাল। বড় গহ্বরের মতো নাসারন্ধ্র। ছোট, ঘোলাটে চোখ। চুলহীন খুলি, আর চামড়া এত টানটান ও পাতলা যে খুলির জোড়াগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ওপর থেকে। মুখ ভর্তি দুই সারি ক্ষুদ্র, ক্ষুরধার দাঁত।
ইথানের মনে হচ্ছে যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে এই প্রাণীটার সাথে লড়াই করছে, ধীর হয়ে গেছে সময়। যদিও আসলে কেটেছে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তার সৈনিক জীবনের কম্ব্যাট ট্রেনিং জেগে উঠতে শুরু করেছে। ভয়, বিভ্রান্তি আর ঘোর আতঙ্ক সরিয়ে ঠাণ্ডা হয়ে আসছে মস্তিষ্ক। পরিস্থিতি যত বিপজ্জনক আর বিশৃঙ্খল হবে, বেঁচে থাকতে চাইলে আপনাকে মাথা তত ঠাণ্ডা রাখতে হবে, যে কাজটা ইথান এতোক্ষণ পারেনি। শক্তি ফুরিয়ে আসছে, আর ষাট সেকেন্ড এভাবে চললে, লড়াই করার মতো শারীরিক বা মানসিক কোনো শক্তিই থাকবে না।
হঠাৎ জন্তুটা ইথানের পেটে ভয়ানক আঘাত করল। জামা, চামড়া, পাতলা চর্বির স্তর কেটে মাংস পর্যন্ত পৌঁছে গেল সেই আঘাত। তারপর মাথা নামিয়ে দিল ইথানের পেটের কাছে। জন্তুটার দাঁত হুডি কেটে ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে। প্রচণ্ড আতঙ্ক নিয়ে ইথান বুঝে ফেলল পশুটা কী করতে চাইছে। মুখের ছুরিগুলো দিয়ে তার নাড়িভুড়ি বের করে এখানেই ভোজ শুরু করে দেবে, আর সেটা করতে পারলে পড়ে পড়ে রক্তক্ষরণে মরা ছাড়া কিছু করার থাকবে না ইথানের।
ইথান হাত তুলে ওটার মাথার পাশে ঘুষি মারল, কোণ ঠিক না হলেও আঘাতটা হলো জোরালো। জন্তুটা ইথানের পেট থেকে মাথা তুলল। রাগে ভরা বিকট এক গর্জন ছাড়ল প্রবল আক্রোশে। তারপর ডান হাতের নখর উঁচিয়ে ইথানের গলা বরাবর চালাল। ইথান বাঁ হাত তুলে আঘাতটা ঠেকাল, আর মরিয়া হয়ে ডান হাত দিয়ে মাটিতে হাতড়াতে লাগল। যেকোনো অস্ত্র, আঘাত করার মতো কিছু একটা চাই তার।
জন্তুটার চোখ তখন উন্মাদ রাগে জ্বলছে। ইথানের পেটে ধাক্কা মেরে উঠে এল ওটা। দাঁত বের করা বীভৎস মুখটা সরাসরি ধাবিত হচ্ছে তার গলার দিকে। কিছু করতে না পারলে এক্ষুনি আমার গলাটা ছিঁড়ে ফেলবে ওটা।
ইথানের হাত একটা পাথরের ওপর পড়ল। প্রথম চেষ্টায় আঙুলগুলো শক্তভাবে বসল না সেটার গায়ে। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় আর ব্যর্থ হলো না। শরীরে সব শক্তি ঢেলে ঘুরিয়ে মারল পাথরটা। জীবনে কোনোদিন কোনোকিছু এতো জোরে মারেনি সে। পেপারওয়েট সাইজের পাথরটা ভোঁতা একটা আওয়াজ করে দানবটার মাথার পাশে লাগল। ইথানের মনে হলো খুলির হাড় ভেঙে বুঝি বসে গেল সেটা। থমকে গেল জন্তুটা, দুধ-সাদা চোখে কয়লা-কালো মণি দুটো বড় হয়ে উঠল, চোয়াল ঝুলে পড়ল, যেন অবিশ্বাসে স্তব্ধ হয়ে গেছে।
ইথান এক মুহূর্ত নষ্ট করল না। ঝট করে উঠে বসল। সজোরে পাথরটা বসিয়ে দিল ওটার মুখে। কয়েকটা দাঁত ভেঙে ছিটকে গেল আশেপাশে। জন্তুটা পিছিয়ে গেল, কিন্তু ইথান এগিয়ে আবার মারল। এবারেরটা নাকের ওপর।
জন্তুটা আছড়ে পড়ল মাটিতে। নাক-মুখ দিয়ে গাঢ় লাল রক্ত গড়াচ্ছে। রাগ আর অবিশ্বাসের তীব্র চিৎকার ওটার কণ্ঠে। দুর্বল ভঙ্গিতে নখর চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই আঘাত এতো শক্তিহীন যে ইথানের চামড়াও স্পর্শ করতে পারছে না।
ইথান ওটার বুকের ওপর চড়ে বসল। এক হাতে ধরল শ্বাসনালী, আরেক হাতে রক্তমাখা পাথরটা। সাতটা খুলি-ভাঙা প্রচণ্ড আঘাতের পর অবশেষে ওটার নড়াচড়া থামল। রক্তাক্ত পাথরটা ছুঁড়ে ফেলল সে। নিজেও এক কাত হয়ে পড়ে গেল একপাশে। শ্বাস নিচ্ছে লম্বা লম্বা। রক্ত আর কুঁচি হাড়ের ছিটায় ভরে গেছে তার চেহারা। কষ্ট করে উঠে বসল সে। শার্টটা টেনে তুলল উপরে। হায় ঈশ্বর…
দেখে মনে হচ্ছে কারো সাথে ছুরি-লড়াই করেছে সে। শরীরের অসংখ্য জায়গা থেকে রক্ত ঝরছে। সব ওটার নখরের আঁচড়। সবচেয়ে বাজে আঘাতটা লেগেছে একেবারে পাকস্থলীর উপরে। চওড়ায় ছয় ইঞ্চি, কিন্তু বেশ গভীর। আরেক ইঞ্চি গভীর হলেই পৃথিবীর বুকে আর নিঃশ্বাস নেওয়া লাগত না তার।
জন্তুটার লাশের দিকে তাকাল সে। এটা কী প্রাণী, কোত্থেকে এল, কিছুই বুঝতে পারছে না। অ্যাড্রেনালিনের প্রভাবে হাত-পা এখনো কাঁপছে থরথর করে। উঠে দাঁড়াল সে। ক্যানিয়ন আবার আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
চোখ তুলে কাছের দেয়ালের দিকে তাকাল। সেই রহস্যময় ধাতব জিনিসটা এখনো সূর্যের আলোয় ঝিলিক দিচ্ছে। ইথান নিশ্চিত না, কিন্তু সে যেখানে আছে সেখান থেকে সম্ভবত আশি-নব্বই ফুট উঁচুতে হবে জিনিসটা। সে জানে না কেন, কিন্তু অবচেতন মন বারবার তাগাদা দিচ্ছে, এখান থেকে দ্রুত সরে যাওয়া দরকার।
সোয়েটশার্টের হাতায় মুখটা মুছে নিল। তারপর দেয়াল থেকে পিছিয়ে গেল জিনিসটা ভালো করে দেখার জন্য। কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে দেখে উপরে ওঠার একটা রুট ঠিক করে ফেলল সে। বেশ কয়েকটা সংকীর্ণ খাঁজ বেয়ে ওপরে উঠে গেলে একটা প্রশস্ত ফাটলের কাছে পৌঁছানো যাবে, সেখান থেকে ওই রহস্যময় ধাতব বস্তু পর্যন্ত পৌঁছাতে ঝামেলা হবে না আশা করা যায়।
দেয়ালের কাছে হেঁটে গেল সে। লড়াইয়ের উত্তাপে শরীর যেন এখনো বিদ্যুতায়িত হয়ে আছে। এই শক্তি কাজে লাগিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ওপরে উঠে যাওয়া দরকার। প্রথম খাঁজটার দিকে হাত বাড়াল সে, তারপর পা রাখার একটা কিনারা পেয়ে দেহটা টেনে তুলল।
পেটের পেশিতে টান লাগতেই জ্বলে উঠল ব্যথায়। পাহাড় বেয়ে উঠতে গেলে টান লাগবেই। কিচ্ছু করার নেই। অতএব ব্যথাটা উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল সে। বিশ ফুট ওঠার পর সে সরু ধাপ পেল যেখানে দাঁড়িয়ে একটু দম নেওয়া যায়। সেখানে পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল সে। শেষ কবে পাহাড় বেয়েছিল মনে নেই, কিন্তু প্রথম বিশ ফুটেই বোঝা হয়ে গেছে তার শরীর এই কাজে কতটা অনভ্যস্ত। সে উঠছে হাতের জোরে, পায়ের শক্তি ব্যবহার না করায় শরীরের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। ইতোমধ্যে গা ভিজে গেছে ঘামে, আর সেই নোনা জল গড়িয়ে গিয়ে লাগছে প্রতিটি কাটা, খোঁচা, ফাটা জায়গায়।
সে ঘুরে পাথরের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। এই ধাপটা ছায়ায়, আর পাথর বরফের মতো ঠাণ্ডা। নিচ থেকে দেখে পরবর্তী অংশটা খুব সহজ মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল হাত-পা রাখার মতো প্রচুর খাঁজ আর ধাপ আছে। কিন্তু এখন, ক্যানিয়নের মাটি থেকে বিশ ফুট ওপরে দাঁড়িয়ে প্রায় খাড়া দেয়ালটা দেখে খুব একটা ভরসা পাওয়া যাচ্ছে না। আর পরবর্তী প্রশস্ত ধাপ—যেখানে গিয়ে একটু বিশ্রাম পাওয়া যাবে—সেটা অন্তত তিরিশ ফুট ওপরে।
ইথান চোখ বন্ধ করে দু’বার গভীর শ্বাস নিল, যদি তাতে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হয়। আমি পারব। আমাকে পারতেই হবে।
তার মাথার এক ফুট ওপরে, ছোট্ট একটা খাঁজে আঙুল ঢুকিয়ে দিল সে। আর পা রাখল হালকা ঢালু একটা ধাপে। ধাপটা এতো সরু যে কয়েক সেকেন্ডের বেশি দাঁড়ানো সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে পরবর্তী ধাপে উঠে এল সে, কিন্তু সেখানে উঠে ভয়ের মাত্রা আরও কয়েক দাগ বাড়ল। মস্তিষ্কের গভীরে কাঁটার মতো বিঁধে থাকা নিঃশব্দ কণ্ঠটাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করেও লাভ হচ্ছে না, ক্রমাগত ফিসফিস করে বলেই যাচ্ছে, পড়ে গিয়ে পা-কোমর ভাঙার উচ্চতা পার হয়ে এসেছে সে। এখন পড়লে সরাসরি মৃত্যু।
হাত-পা রাখার খাঁজ বা ধারগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে, ঝুঁকি বাড়ছে। শুরুতে সে দ্বিধা করছিল, প্রতিবার হাত-পা রাখার আগে বারবার পরীক্ষা করে দেখছিল। এখন আর সেই সুযোগ নেই। মাঝে মাঝেই পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যাচ্ছে; খিল লাগার পূর্বলক্ষণ। আর দেয়াল বাওয়ার সময় যদি খিল ধরে, তাহলে সব শেষ। তাই এখন যতটা দ্রুত সম্ভব উপরে চড়ছে। উপরে উঠছে আর নিজেকে বোঝাচ্ছে, ‘যদি পড়েই যাই, তাহলে সরাসরি মৃত্যুই ভালো, কারণ এই বিরাণভূমিতে পা-কোমর ভাঙা মানে আরও ভয়াবহ। মৃত্যু হবে ধীর, যন্ত্রণাদায়ক।’
কিন্তু যত ওপরে উঠছে, ভয় ততই শক্ত করে ধরছে তাকে। সে চেষ্টা করছে নিচে না তাকাতে, কিন্তু নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি মানব মনে চিরন্তন কৌতূহলের কারণে নিজেকে আটকাতেও পারছে না। অবশেষে তার ডান হাত তৃতীয় ধাপের কিনারা স্পর্শ করল। কষ্টেসৃষ্টে টেনে তুলল শরীর, বাঁ হাঁটুটা ঠেসে ধরল ধাপের কিনারায়। আর তারপরই বুঝতে পারল বাঁ হাতে ধরার মতো কোনো ঠিকঠাক খাঁজ নেই। কিন্তু তখন আর ফেরার সুযোগ নেই।
ইথানের মনে হলো সে অন্তহীন সময় ধরে ঝুলছে। এক হাঁটু ধাপের ওপর, কিন্তু অভিকর্ষের টান বাড়ছে। তাকে গিলে নেওয়ার জন্য হাঁ করে আছে ভয়ংকর শূন্যতা। মরিয়া হয়ে বাঁ হাত উঠিয়ে দিল সামনে। পাগলের মতো হাত চালাতে লাগল পাথরের খোঁজে। বুক-সমান উচ্চতায় একটা খুব ছোট খাঁজে আঙুল সেঁধিয়ে গেল। সেকেন্ড কয়েক সে বুঝতেই পারল না এই খাঁজে হাত রেখে অভিকর্ষের টান এড়াতে পারব কি না। আঙুলের ডগায় ঘষা লেগে চামড়া ছড়ে যাচ্ছে, গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেছে প্রচণ্ড টানে।
হঠাৎ মনে হলো তার উপর অভিকর্ষের টান কমছে। আঙুলের ডগায় ভর দিয়ে আস্তে আস্তে টেনে তুলতে লাগল শরীর। কপাল গিয়ে সামনের দেয়ালে ঠেকে গেল। ডান পা ধাপের ওপর তুলে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে সর্বশক্তি লেগে গেল। এই ধাপ আগেরটার অর্ধেক চওড়া, পায়ের অর্ধেকই বেরিয়ে আছে শূন্যে। এখানে বসা তো দূরের কথা, কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাও অসম্ভব।
সেই চকচকে ধাতব বস্তুটা এখনো বেশ খানিকটা উঁচুতে। তবে আশার কথা হলো, পাহাড়ের গায়ে যে ফাটল পথটা ওই পর্যন্ত গেছে সেটার মুখ ইথানের মাথার সামান্য একটু উপরে। ওই পর্যন্ত উঠে যেতে পারলে ফাটলের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে সমস্যা হবে না। অন্তত এখান থেকে দেখে তো যথেষ্ট চওড়াই মনে হচ্ছে ইথানের কাছে। কিন্তু এখনই ওখানে ওঠার মতো শক্তি তার নেই। এক মুহূর্ত আগেই সে প্রায় মরতে বসেছিল, এখনও তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাঁপছে।
হঠাৎ এক বিকট চিৎকার তাকে ভয় থেকে টেনে বের করল। হতচকিত হয়ে পঞ্চাশ ফুট নিচে ক্যানিয়নের মেঝের দিকে তাকাল সে। জন্তুটার পুরো খুলি থেঁতলে দিয়েছিল সে। তাহলে কী করে…?
না, ওটা তো নড়ছে না। এমনকি ওটার মুখই নেই, চিৎকার করবে কোত্থেকে? এমন সময় দ্বিতীয় চিৎকারটা উঠল—সুরটা আগের থেকে একটু ভারী—আর প্রতিধ্বনি পুরো ক্যানিয়ন জুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, দেয়াল থেকে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে।
ইথান দৃষ্টি দূরে প্রসারিত করল, বিদ্যুতায়িত বেড়ার দিকে। হে ঈশ্বর! পাঁচটা! পাঁচটা ওই জন্তু—অনেকটা স্কোয়াড ফরমেশনে বড় বড় বোল্ডারগুলোর ওপর দিয়ে ছুটে আসছে দ্রুত। একেক লাফে একেকটা করে বোল্ডার পার হচ্ছে ওরা। ইথান দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে স্থির করার চেষ্টা করল নিজেকে।
দলের নেতাটা বোল্ডারের মাঠ থেকে পূর্ণ গতিতে ছুটে বেরিয়ে এল, শিকারি কুকুরের মতো। ইথান যেখানে ওই জন্তুটাকে মেরেছিল সেখানে এসে পিছলে থমকে গেল, মাথা নিচু করে জ্ঞাতিভাইয়ের থেঁতলে যাওয়া মাথাটা শুঁকল কয়েক সেকেন্ড। দলের বাকিরাও কাছাকাছি চলে এসেছে ততক্ষণে। আকাশের দিকে মাথা তুলল ওটা, দীর্ঘ এক আর্তনাদের সুর বেরিয়ে এল ওটার গলা চিরে। নেকড়ের ডাকের মতো করুণ, বুক-ফাটা সেই সুর। দশ সেকেন্ডের মধ্যে বাকি চারটা কণ্ঠও যোগ দিল সেই আর্তনাদে। পাঁচটা কণ্ঠের সম্মিলিত শোকাহত চিৎকার। আতঙ্কে ইথানের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে তার। মুখে লেগে থাকা রক্ত শুকিয়ে ছোট ছোট মামড়ির মতো হয়ে টানটান হয়ে যাচ্ছে।
সে বোঝার চেষ্টা করল এরা কী দেখছে আর কী শুনছে? কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা নেই। এমন কিছু তার অভিজ্ঞতায় তো দূরে থাক, কল্পনারও বাইরে। ওদের আর্তনাদ থামল। একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করল এবার। এমন এক ভাষায় কথা বলতে লাগল যা ইথান কখনও শোনেনি। রক্ত হিম করে দেওয়ার মতো তীক্ষ্ণ, ভীতিকর কিচিরমিচির আওয়াজের মতো সেই ভাষা।
ইথান পাথরটা আরও শক্ত করে ধরল। মাথা ঝিমঝিম করছে, মাথা ঘুরে পৃথিবী কাত হয়ে যাচ্ছে একদিকে। ওরা পাঁচজনই এখন মৃতটার আশেপাশে শুঁকছে, নিতম্ব উঁচু করে দিয়ে মুখ গুঁজে দিচ্ছে পাথরের ফাঁকে। ইথান আতঙ্ক চেপে রাখতে চাইল, কিন্তু দানবগুলোর উপরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করেই তীব্র এক সত্যি অনুধাবন করল সে। নিচ থেকে ওরা চলে গেলেও তার পক্ষে আর নামা সম্ভব না। এমনকি সে যেই ছোট্ট ধাপটায় আছে এখান থেকে নিচের ধাপেও না। মুক্তির একমাত্র পথ এখন উপরে।
হঠাৎ ওদের একটা চিৎকার করে উঠল। কানের পর্দা কাঁপিয়ে দেওয়া তীক্ষ্ণ, ধারালো চিৎকার। বাকিরা দৌড়ে এসে ওটার পাশে ভিড় করল। খ্যাক খ্যাক জাতীয় শব্দ করতে লাগল অধীর উত্তেজনায়। তারপর ওদের মধ্যে সবচেয়ে বড়টা—ইথান যেটাকে মেরেছিল সেটার দ্বিগুণ তো হবেই—দল পেছনে ফেলে ছুটে বেরিয়ে গেল সামনে, ওটার নাক এখনো মাটির খুব কাছে।
ওটা ক্যানিয়ন দেয়ালের গোড়ায় পৌঁছানোর পরই কেবল ইথান বুঝতে পারল ওরা কী করছে। আমার ট্রেইল। পশুটা পাথরে নাক চেপে গন্ধ শুঁকল, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল কয়েক পা… আর ওপরে তাকাল, সোজা ইথানের দিকে।
ওরা আমার ট্রেইল অনুসরণ করছে। ক্যানিয়ন নিস্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তেই। পাঁচ জোড়া দুধ-সাদা চোখ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইথানের দিকে, যাচাই করছে তাকে। তার হৃৎপিণ্ডটা এতো জোরে ধকধক করছে যে মনে হচ্ছে যেন বুকের খাঁচা ভেঙে বের হয়ে আসবে। একটা ভাবনাই অন্তহীন লুপে ঘুরে ঘুরে আসছে তার মাথায়… ওরা কি দেয়াল বেয়ে উঠতে পারে?
যেন ওর প্রশ্নের উত্তর দিতেই, ওদের মধ্যে বড়টা—যেটা প্রথমে তার গন্ধ পেয়েছিল—পেছনের পা দুটো সামান্য বাঁকিয়ে সোজা লাফ দিল উপরে। পাঁচ ফুট মতো উঠে গেল এক লাফে। দেয়ালের সাথে এমনভাবে আটকে রইল যেন ওটা গোটা শরীর ভেলক্রো দিয়ে প্যাঁচানো। তীক্ষ্ণ নখরগুলো এমনভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফাটলে ঢুকিয়ে দিয়েছে যেটা ইথানের পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব না। ওটা মাথা তুলে তাকাল তার দিকে। ততক্ষণে বাকিরাও লাফিয়ে দেয়ালে উঠে পড়তে শুরু করেছে।
ইথান উপরের দিকে তাকাল, সেই সরু ফাটলটার দিকে। হাত দিয়ে ধরার মতো জায়গা খুঁজতে লাগল মরিয়া হয়ে। পেয়েও গেল, কিন্তু সেটা তার নাগালের ঠিক বাইরে। লাফ দিল সে। হাত গিয়ে পড়ল ধারালো, কালো স্ফটিকের কিনারায়। নিচ থেকে নখরের খচখচ শব্দ উঠে আসছে তার দিকে। সে দেয়ালের সাথে ঘষে টেনে তুলতে লাগল শরীর। অন্য হাতটাও তুলে ঢুকিয়ে দিল ফাটলের ভেতরে। দুই হাতের টানে খুব দ্রুতই শরীরের বাকি অংশ চলে এল উপরে।
ফাটলটা চওড়ায় তিন ফুটও নয়। ইথান জুতোর তলা দুই দেয়ালে ঠেকিয়ে এমনভাবে চাপ তৈরি করল, যাতে নিজেকে মাঝখানে ঝুলিয়ে রাখতে পারে। নিচে তাকাল সে। বড়টা এরই মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছে গেছে, উঠে আসছে দ্রুত। ভয় বা ক্লান্তির লেশমাত্র নেই। বাকি চারটাও ওটার ঠিক পেছনে। ইথান মাথা তুলে উপরের দিকে তাকাল—তিন পাশ ঘেরা একটা সরু পথ। হাত-পা রাখার মতো খুব বেশি জায়গা নেই, কিন্তু সে আন্দাজ করল—হাত পায়ে ঠেস দিয়ে চিমনির মতো বেয়ে উঠতে পারবে।
সে আবার ওপরে উঠতে শুরু করল। তিনপাশের পাথরের দেয়ালের কারণে এক ধরনের মিথ্যা নিরাপত্তাবোধ পাচ্ছে সে, যদিও সেটা শুধুই প্রতারণাময় সান্ত্বনা। প্রতি কয়েক ফুট পরপর ইথান পায়ের ফাঁক দিয়ে নিচে তাকাচ্ছে। ঘিরে থাকা পাথরের কারণে খুব বেশি কিছু দেখতে পাচ্ছে না, তবে তরতর করে উঠে আসা ওই জন্তুটাকে ঠিকই দেখতে পাচ্ছে। এখন দ্বিতীয় আর তৃতীয় ধাপের মাঝখানে ওটা, যেখান থেকে উঠতে গিয়ে সে নিজে আধমরা হয়ে গিয়েছিল।
ফাটল বেয়ে কুড়ি ফুট উঠে গেছে সে, ক্যানিয়নের তলা থেকে প্রায় সত্তর ফুট উঁচুতে। উরুর পেশিতে যেন আগুন ধরে গেছে তার। যে ধাতব ঝলমলে ধাতব জিনিসটা দেখার লোভে সে এই ঝামেলায় জড়িয়েছে সেটা এখনো কত দূরে বুঝতে পারছে না। কিন্তু অন্যদিকে, ওই প্রাণীগুলো যখন হাজির হয়েছে, তখন যদি সে ক্যানিয়নের নিচে দাঁড়িয়ে থাকত, তাহলে এতোক্ষণে ওরা তাকে ছিঁড়ে খেত। সেদিক দিয়ে ভাবলে ওই ধাতব জিনিসটা তার আয়ু অন্তত কয়েক মিনিট বাড়িয়ে দিয়েছে, যদি পুরোপুরি তাকে নাও বাঁচিয়ে থাকে।
পশুটা তৃতীয় ধাপে পৌঁছে গেল। এক সেকেন্ডও বিশ্রাম না নিয়ে, কিংবা পরের পদক্ষেপ নিয়ে না ভেবে, সরু ধাপ থেকে লাফ দিল উপরের দিকে। বাঁ হাতের একটামাত্র নখর দিয়ে ফাটলের ভেতরের এক বর্গ মিলিমিটার জায়গা ধরে ফেলল। এক হাতের পাশবিক শক্তিতে নিজেকে টেনে তুলল ওপরে, আর শরীরটাকে ঠেসে ঢুকিয়ে দিল ভেতরে। দানবটার সঙ্গে চোখাচোখি হলো ইথানের। ওটা এমন ক্ষুদ্র খাঁজে হাত-পা রেখে উঠতে লাগল যেগুলো ইথান ধর্তব্যের মধ্যেই রাখেনি, আর ওটা উঠছেও তার দ্বিগুণ গতিতে।
ওপরে ওঠা ছাড়া কিছু করার নেই তার। কষ্টেসৃষ্টে আরও পাঁচ ফুট উঠল সে। তারপর আরও দশ ফুট। দানবটা আর মাত্র পঁচিশ ফুট দূরে। এতটাই কাছে যে ওটার অর্ধস্বচ্ছ বুকের চামড়া ভেদ করে গোলাপি হৃৎপিণ্ডের ধকধক দেখতে পাচ্ছে। আর মাত্র দশ ফুট ওপরে ফাটলটা শেষ হয়ে গেছে। তারপর সমান, ভয়ংকর খাড়া দেয়াল। অবশ্য এই দশ ফুটের হাত-পা রাখার খাঁজগুলো বেশ ভালোই মনে হচ্ছে, কিন্তু ইথান বুঝে গেল সে যদি চার হাত-পায়ে ঠেস দিয়ে এই পদ্ধতিতে উঠতে থাকে, ফাটলের শেষ পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই দানবটা তাকে ধরে ফেলবে।
পদ্ধতি বদলাল সে। হাত-পা দিয়ে দেয়াল বাইতে শুরু করল। ঠিক ওপরে পৌঁছানোর আগে, একটা হাতল আলগা হয়ে এল পাথরসহ। প্রায় পড়ে যাচ্ছিল ইথান। কোনোমতে সামলে নিল নিজেকে। ফাটলের মুখে পৌঁছে গেছে সে। চেহারায় বাতাসের তীব্র টান স্পষ্ট অনুভব করছে এখন। সূর্যের আলোয় কিছু একটা চকচক করছে উপরে।
নিচে তাকাল সে। চট করে একটা আইডিয়া খেলে গেল মাথায়। আরেকটু হলেই নিজেকে বাঁচানোর একমাত্র সুযোগটা হেলায় নষ্ট করে ফেলেছিল প্রায়। দানবটা আর মাত্র পনেরো ফুট নিচে, ওটার ঠিক পেছনেই আরও দুটো, একই ফাটলের ভিতরে ঠিক সারিবদ্ধভাবে উঠছে। ইথান নিচে হাত বাড়াল আলগা পাথরটার দিকে, যেটা ধরতে গিয়ে একটু আগেই মরতে বসেছিল প্রায়। হ্যাঁচকা টানে পাথরটা খুলে আনল পাহাড়ের গাঁ থেকে। মাথার ওপর তুলল সেটা। জিনিসটা তার ভাবনার চেয়েও ভারী। অন্তত দু’পাউন্ড হবে, কোয়ার্টজ-মেশানো গ্রানাইট। দুই পাশের দেয়ালে পা দিয়ে ঠেস দিয়ে স্থির করল নিজেকে, নিশানা নিল, তারপর গায়ের জোরে ছুড়ে দিল নিচে। দানবটার একেবারে চেহারার মাঝখানে গিয়ে আঘাত করল সেটা, ঠিক যে মুহূর্তে ওটা নতুন খাঁজের দিকে হাত বাড়াচ্ছিল।
গ্রিপ ফসকে গেল ওটার। ফাটলের ভিতর দিয়ে সোজা পড়তে শুরু করল নিচে। নখরগুলো দিয়ে এলোপাথাড়ি হাত চালিয়ে আশেপাশের পাথর ধরতে চেষ্টা করল ওটা। পাথরের সাথে নখরের ঘষায় স্ফুলিঙ্গ উড়ে গেল, কিন্তু নিজেকে আটকানোর পক্ষে ওটার গতি খুব বেশি। দ্বিতীয় দানবটার ওপর প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল প্রথমটা, সেটারও হাত ফসকে গেল। দু’জন এক সঙ্গে গিয়ে পড়ল তৃতীয়টার গায়ে। দীর্ঘ দু’সেকেন্ড ধরে ফাটল বেয়ে ভেসে এল তিনটে পাশবিক কণ্ঠের ভয়ার্ত আর্তচিৎকার। জট পাকানো দেহগুলো তৃতীয় ধাপে একবার বাউন্স করে আবার ছুটল নিচের দিকে। শেষ পর্যন্ত পাথুরে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। ধ্যাচ!
তিনটে জন্তুর ধড়, মাথা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আর রক্ত এমনভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল যে ইথানের পক্ষে উপর থেকে বোঝার উপায় রইল না কোনটা কার।
ইথান অবশেষে বেরিয়ে এল ফাটল থেকে। চকচকে জিনিসটা তার মাথা থেকে মাত্র কয়েক ফুট উপরে। ওটার দিকে তাকাতে গেলে প্রতিফলিত আলোয় চোখ কুঁচকে যাচ্ছে তার। ক্যানিয়নের মেঝে থেকে অন্তত একশো ফুট ওপরে সে এখন। নিচের দিকে তাকিয়ে পেটে ভয়ানক মোচড় দিয়ে উঠল। তার উল্টো দিকের ক্যানিয়ন দেয়ালটা আরও অন্তত পাঁচ-ছয়শো ফুট উঠে গেছে সোজা। এপাশের দেয়ালটাও যদি অতো উঁচু হয়ে থাকে, তাহলে বরং এখনই লাফ দিয়ে নিজেকে শেষ করে দেওয়া ভালো। এই অবস্থায় তার পক্ষে আর একশো ফুটও ওঠা সম্ভব না, পাঁচ-ছয়শো ফুট তো অনেক দূরের কথা।
নিচের জীবিত দানব দুটো তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। ওরা বাকিদের মতো ফাটল দিয়ে ওঠেনি, দু’জন দু’পাশ দিয়ে উঠছে। গতি কম, কিন্তু ওরা এখনো বেঁচে আছে, ইথানের চেয়ে আর মাত্র ত্রিশ ফুট নিচে। ইথান হাত বাড়িয়ে ঝকঝকে ধাতব জিনিসটার নিচের ধাপ ধরল। দুটি কনুই তুলে নিজেকে টেনে তুলল চওড়া একটা ধাপে। এর আগে যে তিনটা ধাপ পার হয়ে এসেছে, তার তুলনায় এটা বেশ চওড়া।
চকচকে জিনিসটা একটা ইস্পাতের ভেন্ট। পাথর থেকে কয়েক ইঞ্চির মতো বাইরে বের হয়ে আছে। জিনিসটা চৌকো, প্রত্যেক পাশ আনুমানিক চব্বিশ ইঞ্চি হবে। ভেতরে একটা ফ্যান ঘুরছে, ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে। আর তার ওপাশে একটা ডাক্ট। নিচ থেকে নখরের খচখচ শব্দ ভেসে আসছে। ইথান ভেন্টের দুই পাশ শক্ত করে ধরে টান দিল। একটুও নড়ল না। মজবুতভাবে ঝালাই করা। সে দাঁড়িয়ে হাত বোলাতে লাগল পাথরের দেয়ালে। অল্প সময়ের মধ্যেই একটা জিনিস পেয়ে গেল কাজে লাগানোর মতো। একটা বড়সড়, বিশ পাউন্ড ওজনের একটা শক্ত গ্রানাইট পাথর। এমন ভঙ্গিতে দেয়ালে আটকে আছে যে যেকোনো মুহূর্তে পড়ে যেতে পারে। ইথান দু’হাতে তুলে নিল সেটা। আর ভেন্টটা যেখানে ডাক্টের সঙ্গে যুক্ত, ঠিক সেই জায়গায় আছাড় মারল সেটা।
ধাতব অ্যালয়টা তুবড়ে গেল, ভেন্টের উপরের বাম দিকের কোণা আলগা হয়ে এল দেয়াল থেকে। জন্তুটা এখন আর মাত্র দশ ফুট নিচে। এত কাছে যে ওটার গা থেকে পচা গন্ধ পাচ্ছে সে। ইথান আবার পাথর তুলল, এবার মারল ডান কোণে। খটাস করে ভেন্টটা পুরোটা খুলে গেল। পাথরের গায়ে বাড়ি খেয়ে নিচের দিকে ছুটল সেটা। যাওয়ার পথে একটা জন্তুর গা ঘেঁষে গেল প্রায়। এখন ইথানকে আর অন্ধকার ভেন্টিলেশন শ্যাফটে ঢোকার পথে আটকে আছে শুধু ঘূর্ণায়মান ব্লেড।
ইথান পাথরটা সোজা ব্লেডের মাঝখানে ঢুকিয়ে দিল। থেমে গেল ঘূর্ণন। আরও তিনটা শক্ত আঘাতে পুরো ইউনিটটাই আলাদা হয়ে গেল মাউন্ট থেকে। ব্লেড ধরে ইউনিটটা টেনে বের করল সে। ছুড়ে দিল খাদের দিকে। তারপর পাথরটা মাথার ওপর তুলে জন্তুটার ওপর ছেড়ে দিল, ঠিক যখন ওটার নখরগুলো ইথান যে ধাপে আছে সেটা ধরতে যাচ্ছিল। আর্তচিৎকার ছেড়ে পড়ে যেতে শুরু করল ওটা।
শেষ জন্তুটা সঙ্গীর পতন দেখল, তারপর মাথা ঘুরিয়ে তাকাল ইথানের দিকে।
ইথান ঠোঁটে একটুকরো হাসি টেনে বলল, “এবার তুই।”
জানোয়ারটা তাকিয়ে রইল তার দিকে, ঘাড় সামান্য কাত করা, যেন বুঝতে পারছে ইথান কী বলছে বা অন্তত বুঝতে চাইছে। পাথুরে ধাপটা থেকে একটু নিচেই শক্ত করে আটকে রেখেছে শরীর। ইথান অপেক্ষা করল, এই বুঝি তেড়ে উঠবে ওটা, কিন্তু জন্তুটা স্থির হয়ে রইল। ইথান ভাবল সে দেয়াল বেয়ে উঠে নতুন পাথর খুঁজবে কি না? বাজে আইডিয়া। পাথর খুঁজে পেলেও সেটা নিয়ে আবার নামা কঠিন হয়ে যাবে।
ইথান ঝুঁকে বাম বুটের ফিতা আলগা করল। তারপর পা থেকে খুলে ফেলল জুতো। ডান পায়েরটাও খুলে ফেলল একইভাবে। জুতোর ওজন হয়তো পাথরের মতো নয়, তবু কাজ হতে পারে। জুতোর গোড়ালি ধরে নাটকীয় ভঙ্গিতে উঁচু করল সে যেন এখনই ছুড়ে মারবে, জন্তুটার দুধ-সাদা ঘোলাটে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই বুঝতে পারছিস তোর দিকে কী আসছে, পারছিস না?” ইথান ছুড়ে মারার ভান করল, কিন্তু তার আশা অনুযায়ী কিছুই ঘটল না। আগের মতোই দেয়াল আঁকড়ে ধরে রইল, এমনকি চোখের পলক পর্যন্ত ফেলল না।
পরের বার আর ভান নয়। ইথান প্রচণ্ড জোরে ছুঁড়ল জুতোটা, কিন্তু সেটা জন্তুটার মাথা ঘেঁষে চলে গেল নিচের দিকে। অন্য বুটটা তুলে নিশানা করল সে। তারপর ছুড়ে মারল জোরে। এবার সোজা মুখে লাগল। জুতোটা বাউন্স করে অন্য দিকে ছিটকে গেল, আর জন্তুটা আগের মতোই দেয়াল আঁকড়ে ঝুলে রইল। শুধু ইথানের দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে হিসিয়ে উঠল একবার। ওটার আচরণেই বোঝা যাচ্ছে সুযোগ পাওয়া মাত্র ইথানকে ছিঁড়ে ফেলবে ও।
“আর কতক্ষণ ঝুলে থাকবি রে বোকা?” ইথান জিজ্ঞেস করল। “ক্লান্ত হয়ে যাবি তো।” সাহায্যের ভান করে হাত বাড়িয়ে দিল সে। “আয়, হাত দে। আমি টেনে তুলব। ভরসা রাখ আমার উপর।”
জন্তুটা যেভাবে তাকিয়ে রইল সেটা যথেষ্ট অস্বস্তিকর। ওটার চোখে বুদ্ধির ঝিলিক। ভয়ানক বিষয় হলো, ওর বুদ্ধির গভীরতা কতদূর, তা সে জানে না।
ইথান পাথরের ওপর বসে পড়ল।
“আমি এখানেই থাকছি,” সে বলল। “যতক্ষণ না তুই পড়ে যাস।”
ওটার বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ড ধকধক করছে, মাঝে মাঝে পলক ফেলছে।
“ইউ আর ওয়ান আগলি মাদারফাকার।” ইথান হেসে ফেলল। “সরি, না বলে পারলাম না। একটা মুভির ডায়লগ। প্রিডেটর মুভিতে আর্নল্ড বলেছিল প্রিডেটরের উদ্দেশ্যে। সত্যি করে বল তো, তুই আসলে কী জিনিস?”
পনের মিনিট কেটে গেল। বিকেল গড়িয়ে এসেছে। সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিমাকাশে, ক্যানিয়নের তলা আরও আগেই ডুবে গেছে অন্ধকারে। পাহাড়ের উপর বেশ ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। মাঝে মধ্যে দুয়েকটা মেঘ ভেসে আসছে, আবার হারিয়েও যাচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে। নিচে জন্তুটার বাঁ হাতের নখরগুলো কাঁপতে শুরু করেছে। ছোট্ট পাথরটার সাথে ঘষা খেয়ে শব্দ হচ্ছে খসখস। আর ওর চোখে কিছু একটা বদলে গেছে। রাগ তো অনেক আছেই, কিন্তু সাথে আরও কিছু একটা মিশেছে—ভয়? ওটা মাথা ঘুরিয়ে দেখল নাগালের মধ্যে ধরার মতো আর কোনো পাথর আছে কি না।
ইথান আগেই সব দেখেছে এবং তার সিদ্ধান্তও একই। “হ্যাঁ বন্ধু, এটাই। এই ধাপ… আমার ধাপ। বাঁচতে হলে এখানে আসতে হবে। আর কোনো রাস্তা নেই।” হঠাৎ ওটার ডান পা নড়ে উঠল। ইথান মাত্রই মুখ খুলেছিল, বলতে চেয়েছিল, ‘ছেড়ে দে, পড়ে যা।’ এমন সময় প্রাণীটা তিন ফুট লাফিয়ে উঠল, আর একইসঙ্গে ডান হাত চালাল সামনে। ইথানের মুখ চিরে যেত, যদি না সে ঝট করে মাথা নিচু করে ফেলত। নখরগুলো চুল ছুঁয়ে গেল তার। হাত মাথার ওপর দিয়ে ঘুরে যেতেই সোজা হলো সে, ওটাকে লাথি মেরে ফেলে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু দরকার হলো না।
ওই দুর্বল শরীরে ওর পক্ষে এমনিতেও ধাপে উঠে আসা সম্ভব ছিল না, সেই চেষ্টাও ও করেনি। শুধু নিজের শেষ যাত্রায় ইথানকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। ব্যস, এইটুকুই ছিল উদ্দেশ্য। জন্তুটা যখন পড়তে শুরু করল, ওর চোখে কোনো বিস্ময় দেখা গেল না, কোনো চিৎকার করল না, হাত-পা ছুড়ে কিছু ধরার চেষ্টাও করল না। শুধু তাকিয়ে রইল ওপরের দিকে, সোজা ইথানের চোখে। নিচের অন্ধকার ক্যানিয়নের দিকে পড়ছে ওটা, হাই ডাইভারের ভঙ্গিতে নেমে যাচ্ছে ওর শরীর, একেবারে স্থির। নিজের ভাগ্যটা মেনে নিয়েছে, হয়তো শাস্তিও পেয়েছে এই শেষ মুহূর্তে এসে।
