পাইনস – ১৮

অধ্যায় ১৮

ইথান চোখ খুলল।

তার মাথা জানালায় ঠেকানো। নিচের পাহাড়ি ভূদৃশ্য ঘণ্টায় দেড়শো মাইল বেগে পিছিয়ে যাচ্ছে। মাটি থেকে অন্তত আড়াই হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়ছে তারা। ইরাক থেকে ফেরার পর, সিক্রেট সার্ভিসে আবেদন করার আগে মাস ছয়েক একটা এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চালিয়েছিল সে। ফলে মাথার উপরে লাইকমিং টারবাইনের গর্জন আর বিকে১১৭-এর এয়ারফ্রেম, দুটোই তার পরিচিত। ‘ফ্লাইট ফর লাইফ’-এর জন্য ঠিক এই মডেলটাই সে চালিয়েছে।

কাচ থেকে মাথা তুলল সে। নাকের পাশে চুলকানোর জন্য হাত তুলতে গিয়ে আবিষ্কার করল হাত দুটো পিছমোড়া করে হাতকড়া পরানো।

প্যাসেঞ্জার কেবিনটা স্ট্যান্ডার্ড কনফিগারেশনে সাজানো। মুখোমুখি দুই সারিতে চারটি আসন, আর ফিউজিলাজের পেছন দিকে একটি কার্গো স্পেস যা পর্দার আড়ালে ঢাকা।

ইথানের উল্টো পাশের দুই সিটে পাশাপাশি বসে আছে জেনকিন্স আর শেরিফ পোপ। আর পোপের নাক এখনো ব্যান্ডেজে মোড়া দেখে অদ্ভুত এক সন্তুষ্টি খেলে গেল ইথানের মনে।

আর তার পাশের সিটে বসে আছে নার্স প্যাম। নার্সের ক্লাসিক সাদা ইউনিফর্ম ছেড়ে আজ পরেছে কালো কার্গো প্যান্ট, লং-স্লিভ কালো টি-শার্ট, পূর্ণ ব্যাটেল ড্রেস ইউনিফর্ম আর হাতে এইচ অ্যান্ড কে ট্যাকটিক্যাল শটগান। তার মাথার এক অংশ কামানো, সেখান থেকে কপাল বেয়ে গাল পর্যন্ত আধখানা চাঁদের মতো সেলাইয়ের দাগ নেমে এসেছে। ওটা অবশ্য বেভারলির অবদান। বেভারলির কথা মনে পড়তেই ক্রোধের স্রোত বয়ে গেল তার শরীর জুড়ে। ওই বেচারি মেয়েটার সাথে যা করা হয়েছে, ইথান তা কখনো ভুলবে না।

হেডসেটের ভেতর জেনকিন্সের গলা খরখর করে উঠল। “এখন কেমন লাগছে, ইথান?”

ঘুমপাড়ানি ওষুধের ঘোর এখনো রয়ে গেছে, তবে মাথাটা পরিষ্কার হতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। তবু সে কোনো উত্তর দিল না। শুধু চেয়ে রইল।

“গতকাল শক দেওয়ার জন্য দুঃখিত,” জেনকিন্স বলল। “বাধ্য হয়ে দিয়েছি। আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইনি। তুমি অলরেডি প্রমাণ করেছ যে নিজের খেয়াল কীভাবে রাখতে হয় সেটা তুমি ভালোই জানো। অতএব আমি চাইনি অকারণে আর কারো প্রাণহানি হোক। তোমার, কিংবা আমার লোকের।”

“প্রাণহানি, তাই নাকি? এখন এসব নিয়ে এত চিন্তা?” ইথানের কণ্ঠে ব্যঙ্গ।

“তোমাকে আমরা রিহাইড্রেট করেছি, খাবার দিয়েছি, নতুন কাপড়… ইনজুরিগুলোর ব্যবস্থা নিয়েছি। বলতেই হচ্ছে তোমাকে এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো লাগছে।”

ইথান জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। নিচে নিরন্তর পাইন বন। উপত্যকা, পাহাড়ের গা বেয়ে এমনভাবে পাইন বন ছড়িয়ে আছে যে পাথুরে জমি চোখেই পড়ছে না প্রায়।

“আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?” ইথান জিজ্ঞেস করল।

“আমি কথা দিলে, কথা রাখি।”

“কার সাথে দেওয়া কথা?”

“তোমার সঙ্গে। বলেছি না তোমাকে সব নিজের চোখে দেখাবো।”

“আমি বুঝতে পারছি না —”

“শিগগিরই পারবে। আর কতক্ষণ লাগবে, রজার?”

পাইলটের গলা ভেসে এল হেডসেটে। “পনেরো মিনিটের মধ্যে আপনাদের নামিয়ে দিচ্ছি।”

***

শ্বাসরুদ্ধকর এক বিস্তীর্ণ নির্জন প্রান্তরের উপর দিয়ে উড়ে চলেছে তারা। যতদূর চোখ যায়, কোনো রাস্তা নেই। কোনো ঘরবাড়ি নেই। শুধু ঘন বনে ছাওয়া পাহাড়ের পর পাহাড়, আর মধ্যে মধ্যে পানির সরু আঁকাবাঁকা দাগ; কোথাও ঝরনা, কোথাও ছোট নদী।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পাইনবনটা পিছনে পড়ে গেল, আর যুগল টারবাইনের সুর বদলাতেই ইথান বুঝে গেল, পাইলট নামতে শুরু করেছে।

***

শুষ্ক চেহারার বাদামী এক পাহাড়ের ওপর দিয়ে যাচ্ছে তারা। আরও প্রায় দশ মাইল যাওয়ার পর পাহাড়ের পাদদেশে আবার বিশাল এক বন দেখা গেল। তবে এবার আর শুধু পাইন বন নয়, শক্ত আর নরম কাঠের বিভিন্ন ধরনের গাছ-গুল্ম দেখা যাচ্ছে। মাটি থেকে দুইশো ফুট উপরে এসে হেলিকপ্টারটা বাঁক নিল, চক্কর কাটতে লাগল প্রায় এক বর্গমাইল এলাকা ঘিরে। পোপ চোখে দূরবীন লাগিয়ে নিচের জমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।

অবশেষে সে মাইকে বলল, “সব ঠিকঠাক লাগছে।”

***

বনের মাঝখানে একটা বড় ফাঁকা জায়গায় ল্যান্ড করল তারা। চারদিকে উঁচু উঁচু ওক গাছ, শরতের রঙ লেগেছে ওদের গায়ে। রোটরের বাতাস ঢেউ তুলেছে লম্বা ঘাসের মাঠে, বৃত্তের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সবদিকে। রোটরের ঘূর্ণন ধীর হয়ে আসছে ক্রমান্বয়ে। ইথান চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে চারপাশ।

জেনকিন্স বলল, “আমার সঙ্গে একটু হেঁটে আসবে নাকি, ইথান?”

প্যাম এগিয়ে এসে তার ল্যাপ বেল্ট আর কাঁধের হারনেস খুলে দিল।

“হাতকড়াও?” প্যাম জিজ্ঞেস করল।

জেনকিন্স ইথানের দিকে তাকাল। “ভদ্র থাকবে তো?”

“অবশ্যই।”

ইথান একটু ঝুঁকে পড়ল, যাতে প্যাম চাবির ছিদ্রে পৌঁছাতে পারে। ধাতব বালা দুটো টুক করে খুলে গেল। সে হাত দুটো ছড়িয়ে কবজি ম্যাসাজ করে নিল।

জেনকিন্স পোপের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়াল। “যেটা বলেছিলাম, এনেছ তো?”

শেরিফ তার হাতে একটি স্টেইনলেস-স্টিল রিভলভার তুলে দিল। জিনিসটা দেখেই বোঝা গেল বেশ ভারী। সম্ভবত .৩৫৭ ম্যাগনাম কার্তুজ ব্যবহারের জন্যই বানানো। জেনকিন্সকে সন্দিহান দেখাল।

“আমি আপনাকে গুলি করতে দেখেছি,” পোপ বলল। “সমস্যা হবে না। হার্টের আশপাশে মারলেই হলো, আর মাথায় লাগলে তো কথাই নেই।”

পোপ তার সিটের পেছন থেকে একটা একে-৪৭ তুলে আনল, যার সঙ্গে লাগানো একশো রাউন্ডের ড্রাম ম্যাগাজিন। ইথান দেখল, সে সেফটি থেকে থ্রি-রাউন্ড বার্স্ট মোডে বদলে নিল।

জেনকিন্স হেডসেট খুলে ফেলল। তারপর প্যাসেঞ্জার কেবিন আর ককপিটের মাঝের পর্দা সরিয়ে পাইলটকে বলল, “আমরা চ্যানেল ফোরে থাকব। আমাদের যদি এখান থেকে দ্রুত বের হতে হয়, তোমাকে জানাব।”

“আমি ইঞ্জিন স্টার্টে আঙুল রাখছি,” পাইলট বলল।

“ঝামেলার ন্যূনতম আভাস পাওয়া মাত্র রেডিও করবে।”

“জি, স্যার।”

“আর্নি তোমাকে একটা বন্দুক দিয়েছে?”

“একটা না, দুটো,” পাইলট বলল।

“বেশিক্ষণ লাগবে না।”

জেনকিন্স কেবিনের দরজা খুলে বাইরে নামল। পোপ আর প্যামের পর ইথানও নামল। প্রথমে স্কিডে পা রাখল, তারপর সেখান থেকে কোমর সমান উঁচু নরম ঘাসে। পা চালিয়ে জেনকিন্সের পাশে চলে এলো সে। চারজনের দলটা দ্রুত এগিয়ে চলল মাঠ পেরিয়ে। পোপ সামনে, অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে, আর প্যাম একেবারে পিছনে।

সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। ঠাণ্ডা, সতেজ বাতাসের সোনালি এক বিকেল। সবাইকে অতিসতর্ক আর নার্ভাস লাগছে, যেন কোনো টহল অভিযানে বেরিয়েছে তারা।

ইথান বলল, “আমি ওয়েওয়ার্ড পাইন্সে পা রাখার পর থেকে আমাকে নিয়ে খেলছেন আপনি। আমরা এই জঙ্গলে কী জন্য এসেছি? এখনই জানতে চাই।”

বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল তারা। ঘন ঝোপঝাড় ঠেলে এগোতে লাগল। পাখিদের ডাক আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

“কিন্তু ইথান,” জেনকিন্স বলল, “এটা কোনো জঙ্গল না।”

ইথান কিছু একটার ঝলক দেখল। গাছপালায় ঢাকা থাকার কারণে প্রথমে চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল সেটা। গতি বাড়াল সে, ঝোপ আর ডালপালা ঠেলে এগোতে লাগল ওটার দিকে। জেনকিন্স তার ঠিক পেছনে। ওটার পাদদেশে পৌঁছে ইথান থামল, মাথা তুলে তাকাল উপরে। এক মুহূর্ত বুঝতেই পারল না, আসলে কী দেখছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর অবশেষে বোধগম্য হলো।

একটা ক্ষয়ে যাওয়া ভবনের কঙ্কালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তারা। নিচের দিকে, জীবিত আর মৃত লতা মুড়িয়ে রেখেছে বিমগুলো। বাদামি আর সবুজ রঙ এমনভাবে কাঠামোটা ঢেকে রেখেছে যে বনভূমির রঙের সঙ্গে একেবারে মিশে গেছে। চোখের কোণ দিয়ে তাকালে আলাদা করে বোঝাই যায় না।

উপরের দিকে অবশ্য স্টিলের বিম বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু এতো বেশি জং ধরেছে যে স্বাভাবিক রঙ আর নেই। প্রায় লালচে হয়ে গেছে। শত শত বছরের অক্সিডেশন। কাঠামোটার ঠিক মাঝখানে গজিয়ে উঠেছে তিনটি ওক গাছ। পাক খেয়ে উঠে গেছে উপরের দিকে। কিছু কিছু ডালপালা এমনকি গার্ডারগুলোর সাপোর্ট হিসেবে কাজ করছে। শুধু নিচের ছয় তলার ফ্রেমটাই কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে। উপরের দিকে কয়েকটা বিম বেঁকে গোল আংটার মতো হয়ে গেছে। নিচ থেকে দেখতে লালচে-বাদামি চুলের রিংলেটের মতো লাগছে অনেকটা। ইস্পাত কাঠামোর বেশির ভাগই ভেঙে পড়ে বিলীন হয়ে গেছে বনের মাটিতে।

ধ্বংসস্তূপের ভেতর পাখির আওয়াজ অসহ্য রকম জোরালো। ঠিক যেন পাখিদের আকাশছোঁয়া অ্যাপার্টমেন্ট। ইথান যেদিকে তাকাচ্ছে, শুধু পাখিদের বাসা আর পাখিদের বাসা।

“মনে আছে, তুমি একবার বলেছিলে বোইজির কোনো হাসপাতালে ট্রান্সফার হতে চাও?” জেনকিন্স জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ।”

“বেশ, আমি তোমাকে বোইজিতেই এনেছি। শহরের একদম মাঝখানে।”

“আপনি কী বলছেন এসব?”

“তুমি যে জিনিসটার দিকে তাকিয়ে আছ, সেটা ইউ.এস. ব্যাংক বিল্ডিং। আইডাহোর সবচেয়ে উঁচু স্কাইস্ক্র্যাপার। সিক্রেট সার্ভিসের বোইজি ফিল্ড অফিস এখানেই, তাই না? সতেরো তলায়?”

“আপনি পুরো পাগল।”

“আমি জানি এখন এটা বনভূমির মতো দেখাচ্ছে, কিন্তু আমরা এই মুহূর্তে ক্যাপিটল বুলেভার্ডের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। স্টেট ক্যাপিটল এখান থেকে মাত্র আধা-কিলোমিটার দূরে, ওই গাছগুলোর ভেতর দিয়ে। যদিও এখন কোনো চিহ্ন পেতে হলে মাটি খুঁড়তে হবে।”

“এসব কী? কোনো ধরনের কৌশল? ধোঁকা?”

“আমি তো বলেছিলাম।”

ইথান জেনকিন্সের কলার চেপে ধরে নিজের দিকে হ্যাচকা টান দিল। “ব্যাখ্যা করো।”

“তোমাকে সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশনে রাখা হয়েছিল। তুমি ইউনিটগুলো দেখেছ—”

“কতদিন?”

“ইথান—”

“কত দিন?”

জেনকিন্স সামান্য থামল। ইথান অনুধাবন করল তার ভেতরে কোথাও একটা অংশ আছে, যেটা চায় না উত্তরটা শুনতে।

“এক হাজার আটশো চৌদ্দ বছর…”

ইথান জেনকিন্সের শার্ট ছেড়ে দিল।

“…পাঁচ মাস…”

সে টলোমলো হয়ে পেছনে সরে গেল।

“…এগারো দিন।”

সে ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকাল। আকাশের দিকে তাকাল।

“তোমার দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হচ্ছে না,” জেনকিন্স বলল। “চলো, বসি।”

ইথান ফার্নে ভরা মাটিতে বসে পড়তেই জেনকিন্স মুখ তুলে পোপ আর প্যামের উদ্দেশ্যে বলল, “আমাদের একটু সময় দাও। তবে খুব দূরে যেও না।” ওরা সরে গেল। জেনকিন্স ইথানের সামনে বসে পড়ল।

“তোমার মাথা এখন স্থির না,” সে বলল। “তবু একটা মিনিট কিছু না ভেবে শুধু আমার কথা শোনার চেষ্টা করবে?”

এখানে কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়েছিল। পরনের বাদামি ফ্যাটিগ ভেদ করে মাটির স্যাঁতসেঁতে ভাব টের পাচ্ছে ইথান।

“আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করি,” জেনকিন্স বলল। “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বলতে তোমার মাথায় কী আসে?”

ইথান কাঁধ ঝাঁকাল।

“আরে, একটু ভেবে বল।”

“মহাকাশ ভ্রমণ, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব—আমি জানি না—”

“না। মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল—মানুষ কীভাবে বিলুপ্ত হবে, সেটা জানা।”

“পুরো মানবজাতি?”

“একদম। ১৯৭১ সালে ডেভিড পিলচার নামে এক তরুণ জেনেটিসিস্ট এক ভয়ংকর আবিষ্কার করে। মনে রেখো, তখন আরএনএ স্প্রাইসিং আসেনি, ডিএনএ পলিমরফিজমও না। সে বুঝতে পেরেছিল, মানব জিনোম, মানে আমাদের উত্তরাধিকারগত সব তথ্যের সমষ্টি, যেটা কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে, সেটা বদলে যাচ্ছে। দূষিত হয়ে পড়ছে।”

“কিসের কারণে?”

“কিসের কারণে?” জেনকিন্স হেসে উঠল। “সব কিছুর কারণে। আমরা পৃথিবীর সঙ্গে ইতোমধ্যে যা করেছি, আর ভবিষ্যতে যা করব সবকিছু মিলিয়ে স্তন্যপায়ীদের বিলুপ্তি। বন উজাড়। মেরুর বরফ গলে যাওয়া। ওজোন স্তরের ক্ষতি। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি। অ্যাসিড বৃষ্টি। সাগরের ডেড জোন। অত্যধিক মাছ ধরা। সমুদ্রের তেল উত্তোলন। যুদ্ধ। একশো কোটিরও বেশি গ্যাসোলিন পোড়ানো গাড়ির উদ্ভব। পারমাণবিক দুর্ঘটনা—ফুকুশিমা, থ্রি মাইল আইল্যান্ড, চেরনোবিল। অস্ত্র পরীক্ষার নামে দুই হাজারেরও বেশি ইচ্ছাকৃত পারমাণবিক বিস্ফোরণ। বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা। এক্সন-ভালডেজ। বিপির গালফ তেল দুর্ঘটনা। প্রতিদিন খাবার আর পানির সঙ্গে আমরা যে সব বিষ শরীরে ঢোকাই।

“শিল্প বিপ্লবের পর থেকে আমরা পৃথিবীটাকে এমন ব্যবহার করেছি যেন এটা কোনো হোটেল রুম, আর আমরা রকস্টার। কিন্তু আমরা রকস্টার না। বিবর্তনের মহাপরিকল্পনায় আমরা কেবল এক দুর্বল, ভঙ্গুর প্রজাতি মাত্র। আমাদের জিনোম নষ্ট করা যায়। আর আমরা এই গ্রহটাকে এতটা নির্দয়ভাবে নিংড়ে নিয়েছি যে শেষমেশ সেই অমূল্য ডিএনএ নকশাটাই বিকৃত হয়ে গেছে, যেটা আমাদের মানুষ বানায়।

“কিন্তু এই মানুষটা—পিলচার—সে আগেই বিপদটা দেখতে পেয়েছিল। হয়তো নির্দিষ্টভাবে না, কিন্তু মোটামুটি আঁচ করতে পেরেছিল। দেখেছিল, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবেশের ওপর আমাদের চাপের কারণে ট্যাকাইটেলিক অ্যানাজেনেসিস ঘটতে পারে। সহজ করে বললে—দ্রুত, বৃহৎ মাত্রার বিবর্তন। আমার কথার অর্থ? তিরিশ প্রজন্মে মানুষ থেকে অন্য কিছুতে রূপান্তরিত হবে। বাইবেলের ভাষায় বললে, পিলচারের বিশ্বাস ছিল, একটা মহাপ্লাবন আসছে, তাই সে নৌকা বানাতে শুরু করেছিল। আমার কথা ধরতে পারছ তুমি?”

“একদমই না।”

“পিলচারের ধারণা ছিল, যদি জিনোম দূষণ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই কিছু সংখ্যক ‘খাঁটি’ মানুষকে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে তারা কার্যত সেই বিবর্তনগত পরিবর্তনগুলো এড়াতে পারবে, যেগুলো মানব সভ্যতা আর আমাদের প্রজাতির ধ্বংস ডেকে আনছে। কিন্তু সেটা করতে হলে দরকার ছিল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন প্রযুক্তি।

“সে একটা ল্যাব গড়ে তোলে, নিজের কোটি কোটি ঢালে গবেষণা ও উন্নয়নের পেছনে। ১৯৭৯ সালের মধ্যেই সে সাফল্য পেল এবং তারপরই শুরু করে দিল এক হাজার সাসপেনশন ইউনিট তৈরির কাজ। একই সময়ে পিলচার এমন একটা ছোট শহর খুঁজছিল, যেখানে সে তার ‘কার্গো’ রাখতে পারবে। আর ওয়েওয়ার্ড পাইনসের সন্ধান পাওয়া মাত্র বুঝে ফেলল এটাই হবে আদর্শ জায়গা। বিচ্ছিন্ন। প্রতিরক্ষাযোগ্য। চারদিক উঁচু পাহাড়ি দেয়ালে ঘেরা। ঢোকা কঠিন। বেরোনো আরও কঠিন। সে এখানকার সব আবাসিক আর বাণিজ্যিক প্রোপার্টি কিনে নিল এবং চারপাশের পাহাড়ের গভীরে একটা বিশাল বাংকার কমপ্লেক্স নির্মাণ শুরু করে দিল। প্রকল্পটা ছিল ভয়ংকর বড়। শেষ করতে লেগে যায় বাইশ বছর।”

“এই সুবিশাল সময় ধরে সরঞ্জামাদি টিকে থাকল কীভাবে?” ইথান জিজ্ঞেস করল। “কাঠ আর খাবার তো প্রায় দুই হাজার বছর টিকে থাকার কথা না।”

“ক্রুদের পুনর্জীবিত করার আগ পর্যন্ত, গুদাম-গুহা, ডরমিটরি আর নজরদারি কেন্দ্র—মানে কমপ্লেক্সের প্রতিটা বর্গইঞ্চি—ভ্যাকুয়ামের ভেতর ছিল। ব্যবস্থাটা পুরোপুরি নিখুঁত হয়তো বলা যাবে না, কিছু জিনিস আমরা হারিয়েছি, কিন্তু যথেষ্টই টিকে গিয়েছিল ওয়েওয়ার্ড পাইনসের অবকাঠামো আবার গড়ার জন্য, যেটা সময় আর প্রকৃতি পুরোপুরি মুছে দিয়েছিল। তাছাড়া, আমরা যে গুহা ব্যবস্থাটা ব্যবহার করেছি, সেখানে বাতাসে আর্দ্রতা ছিল খুবই কম। আর যেহেতু আমরা নিরানব্বই দশমিক নয় শতাংশ ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলতে পেরেছিলাম, ফলাফলটা প্রায় সাসপেনশনের মতোই কার্যকর হয়েছিল।”

“মানে শহরটা পুরোপুরি স্বনির্ভর?”

“হ্যাঁ। এটা আমিশ গ্রাম বা শিল্প-পূর্ব সমাজ ব্যবস্থার মতোই চলে। আর তুমি দেখেছ, আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বিশাল মজুত আছে, যেগুলো আমরা প্যাকেজিং করে ট্রাকে করে শহরে আনি।”

“আমি গরু দেখেছি। গবাদিপশুর জন্যও কি সাসপেনশন চেম্বার বানানো হয়েছিল?”

“না। আমরা শুধু কিছু ভ্রূণকে স্টেসিসে রেখেছিলাম। তারপর কৃত্রিম গর্ভ ব্যবহার করেছি।”

“২০১২ সালে তো এমন কিছু ছিল না।”

“কিন্তু ২০৩০ সালে ছিল।”

“পিলচার এখন কোথায়?”

জেনকিন্স হাসল। ইথান বলল, “আপনি?”

“তোমার সহকর্মী কেট হিউসন আর বিল ইভান্স, ওরা যখন ওয়েওয়ার্ড পাইনসে নিখোঁজ হয়, তখন আসলে আমাকে খুঁজছিল। আমার কিছু ব্যবসায়িক লেনদেন সিক্রেট সার্ভিসের নজরে পড়ে গিয়েছিল। সেই কারণেই তুমি আজ এখানে বসে আছ।”

“আপনি ফেডারাল এজেন্টদের অপহরণ করেছেন? বন্দি করে রেখেছেন?”

“হ্যাঁ।”

“আর আরও অনেককে…”

“এখানকার ক্রু সবাই আমার নিজ হাতে বাছাই করা। মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিকের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে এসেছিলাম এখানে। এই ধরনের প্রজেক্টে স্বেচ্ছাসেবক খুব একটা মিলবে বলে আমার মনে হয়নি।”

“এরপর যারাই ওয়েওয়ার্ড পাইনসে এসেছে, আপনি তাদের অপহরণ করেছেন?”

“কিছু লোক শহরে এসেছিল, আমি তাদের আর ফেরত যেতে দেইনি। অন্যদের আমি নিজেই খুঁজে বের করেছি।”

“কতজন?”

“পঞ্চাশ বছরে ছয়শো পঞ্চাশ জনকে নেওয়া হয়েছে।”

“আপনি একজন সাইকোপ্যাথ।”

পিলচার যেন অভিযোগটা শুনে একটু ভেবে নিল। তার ঠাণ্ডা, তীক্ষ্ণ চোখ দুটোয় গভীর ভাবনার ছাপ পড়েছে। এই প্রথম ইথান সত্যি করে লোকটার মুখের দিকে তাকাল, আর খেয়াল করল তার কামানো মাথা আর ভালো ত্বক দেখে বয়সটা বোঝা যায় না। লোকটার বয়স নিশ্চয়ই ষাটের গোড়ায়। হয়তো তারও বেশি। এতক্ষণ পর্যন্ত ইথান তার নিখুঁত, নিয়ন্ত্রিত কথা বলার ধরনটাকে একরকম ভান হিসেবেই ধরে নিয়েছিল। একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কৌশল। কিন্তু এখন বুঝতে পারল, আসলে সেটা কী—একটা অসামান্য বুদ্ধিমত্তার স্পষ্ট প্রমাণ। হঠাৎ করেই তার মাথায় এলো, এই ওক গাছের ছাউনির নিচে সে যার মুখোমুখি বসে আছে সে তার জীবনে দেখা সবচেয়ে প্রখর মস্তিষ্কের মানুষ। ভাবনাটা একইসঙ্গে রোমাঞ্চকর, আবার ভয়ংকরও।

অবশেষে পিলচার বলল, “আমি বিষয়টা ঠিক সে ভাবে দেখি না।”

“না?” ইথান বলল। “তাহলে কীভাবে দেখেন?”

“বরং… আমাদের প্রজাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে।”

“আপনি মানুষকে তাদের পরিবার থেকে ছিনিয়ে এনেছেন।”

“এখনো বুঝতে পারোনি, তাই না?”

“কী বুঝব?”

“ওয়েওয়ার্ড পাইনস আসলে কী। ইথান… এটা পৃথিবীর শেষ শহর। আমাদের জীবনধারার একটা জীবন্ত টাইম ক্যাপসুল। আমেরিকান ড্রিমের শেষ আশ্রয়। এখানকার বাসিন্দারা, ক্রু, আমি, তুমি—হোমো স্যাপিয়েন্স বলতে শুধু আমরাই আছি।”

“আর আপনি সেটা নিশ্চিত হলেন কীভাবে?”

“বছরের পর বছর ধরে আমি রিকনেসান্স টিম পাঠিয়েছি। যারা ফিরতে পেরেছে, তারা এমন শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশের কথা বলেছে, যা কল্পনাও করা যায় না। ওয়েওয়ার্ড পাইনসের মতো কোনো জায়গার সুরক্ষা আর অবকাঠামো ছাড়া কেউই টিকে থাকতে পারত না। আমার ক্রু যখন চৌদ্দ বছর আগে সাসপেনশন থেকে বের হয়, তখন থেকেই আমরা সব পরিচিত জরুরি ফ্রিকোয়েন্সিতে একটা রেডিও বীকন চালু রেখেছি। নিরবচ্ছিন্ন বিপদ সংকেত। আমাদের বর্ডারের বাইরে এখনো মানুষ থাকতে পারে এই ক্ষীণ আশায় আমি এমনকি পাইনসের কোঅর্ডিনেটও সম্প্রচার করেছি। কেউ আসেনি। কেউ কোনো যোগাযোগ করেনি। আমি বলেছিলাম এটা বোইজি, কিন্তু আসলে তা নয়। বোইজি নেই। আইডাহো নেই। আমেরিকাও নেই। নামের আর কোনো মানে নেই।”

“সবকিছুর শেষটা কীভাবে হলো?”

“আমরা কখনোই জানতে পারব না, তাই না?” পিলচার বলল। “তোমার অল্প কিছুদিন পরই আমি ঘুমিয়ে পড়ি, যাতে সাসপেনশন পরবর্তীকালে ওয়েওয়ার্ড পাইনসে অন্তত পঁচিশ বছর কাটাতে পারি। ২০৩২-এর পর আমরা সবাই পাহাড়ের ভেতর ঘুমোচ্ছিলাম। তবে যদি আন্দাজ করতে বল? আমার হিসেব অনুযায়ী ২৩০০ সালের মধ্যে মানুষের মধ্যে বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে শুরু করে। আর যেহেতু বৈচিত্র্যই বিবর্তনের কাঁচামাল, ২৫০০ সালের মধ্যে হয়তো মানুষ একেবারেই আলাদা কোনো প্রজাতিতে পরিণত হয়। প্রতিটা প্রজন্ম ধীরে ধীরে এমন কিছুর দিকে এগিয়ে যায়, যা এই বিষাক্ত পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারে। ক্রমেই মানুষ কম… অন্য কিছু বেশি হতে থাকে।

“এর ফলে যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসে, সেটা হয়তো তুমি কল্পনা করতে পারছ। মানুষের জন্য এবং মানুষের দ্বারা গড়ে তোলা পুরো একটা সভ্যতা ধসে পড়ে। হয়তো গণহত্যা হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে। হয়তো চল্লিশ বছর লেগেছে, হয়তো হাজার বছর। আবার হতে পারে, সর্বাত্মক পারমাণবিক যুদ্ধে এক মাসের মধ্যেই কোটি কোটি মানুষ মারা গেছে। নিশ্চয়ই তখন অনেকে ভেবেছিল পৃথিবীর ধ্বংসের সময় এসে গেছে। কথা হলো, আমরা কোনোদিনই নিশ্চিতভাবে জানতে পারব না তখন কী হয়েছিল। আমরা শুধু নিশ্চিতভাবে জানি এখন আমাদের বর্ডারের বাইরে কী আছে।”

“কী আছে?” ইথান জিজ্ঞেস করল।

“বিকৃত প্রাণী। অ্যাবারেশনস। আমরা ওদের বলি ‘অ্যাবি’। সেই আধা-স্বচ্ছ চামড়ার প্রাণীগুলো যেগুলো ক্যানিয়নে তোমাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিল। সাসপেনশন থেকে বেরোনোর পর আমি আজসহ মাত্র তিনবার বের হয়েছি আমাদের বর্ডার ছেড়ে। প্রতিবারই হেলিকপ্টারে করে বের হয়েছিলাম, তবু কাজটা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে দূরে গিয়েছিলাম সিয়াটল পর্যন্ত। মানে একসময় যেখানে সিয়াটল ছিল। জ্বালানি বয়ে নিতে হয়েছিল। কোনোমতে ফিরে এসেছি। আমি যা দেখেছি, সেখান থেকে আন্দাজ করলে শুধু এই মহাদেশেই ওই প্রাণী কয়েক কোটি আছে। ওরা শিকারি, এটা নিশ্চিত। আর যদি ওদের সংখ্যা আমার অনুমানের মতোই বিশাল হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো হরিণ বা অন্য জাবরকাটা প্রাণীর সংখ্যাও প্রচুর। এমনও হতে পারে, বাইসনের কোনো বংশধর আবারও বিশাল সংখ্যায় সমতল ভূমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

“আমরা গবেষণা চালানোর জন্য উপত্যকা ছেড়ে যেতে পারি না, ফলে গত দুই হাজার বছরে কোন কোন প্রজাতি তুলনামূলক অক্ষতভাবে টিকে গেছে তা বোঝার জন্য আমাদের স্যাম্পল খুবই ছোট। পাখিরা সম্ভবত বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিছু পোকামাকড়ও অক্ষত আছে। কিন্তু তারপরই বুঝবে কিছু একটা ঠিক নেই। ধরো, ঝিঁঝিঁ পোকা নেই। জোনাকি নেই। আর চৌদ্দ বছরে আমি একটা মৌমাছিও দেখিনি।”

“এই অ্যাবিগুলো আসলে কী?”

“ওদের মিউট্যান্ট বা অ্যাবারেশন বলে ভাবা সহজ, কিন্তু নামটা আসলে ভুল। প্রকৃতি কোনো কিছু ভালো-মন্দের লেন্স দিয়ে দেখে না। সে দক্ষতাকে পুরস্কৃত করে। বিবর্তনের সৌন্দর্য এখানেই। সে সবকিছু সহজ করে দেখে। এমনভাবে নকশায় পরিবর্তন আনে যাতে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সহজ হয়। আর পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছি আমরাই। এখন হোমো স্যাপিয়েন্সের উত্তরসূরি এক প্রজাতি চলে এসেছে, যারা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে মানবসভ্যতার ধ্বংসের মধ্যেও টিকে থাকার মতো করে মানিয়ে নিয়েছে নিজেদের। আমাদের ডিএনএ সিকোয়েন্স পাশাপাশি রাখলে দেখবে মাত্র সাত মিলিয়ন অক্ষরের পার্থক্য। মোটামুটি শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ মাত্র।”

“জিসাস…”

“লজিস্টিকাল স্ট্যান্ডপয়েন্ট থেকে অ্যাবিরা ভীষণ সমস্যাদায়ক। ওরা গরিলা বা শিম্পাঞ্জির চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান, আর বহুগুণ বেশি আগ্রাসী। আমরা কয়েকটাকে ধরতে সমর্থ হয়েছিলাম। ওদের ওপর গবেষণা করেছি। যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছি, কিন্তু সব ব্যর্থ। গতি আর শক্তিতে ওরা গড়পড়তা নিয়ান্ডারথাল মানুষের কাছাকাছি। ষাট পাউন্ড ওজনেই মারাত্মক, আর কিছু কিছু দুইশো পর্যন্ত বড় হয়। তুমি বেঁচে গেছ, এটা তোমার সাত পুরুষের ভাগ্য।”

“এই জন্যই ওয়েওয়ার্ড পাইনসের চারদিকে বেড়া তুলেছেন।”

“তুমি যখন উপলব্ধি করবে আমরা আর খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে নেই, তখন স্বভাবতই অনেক কিছুই নতুন করে ভাবতে হয়। তারপরও মাঝে মধ্যে কোনো অ্যাবি বেড়া টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ে, তাই শহরের সীমানায় মোশন সেন্সর বসানো আছে, আর পুরো উপত্যকা দিন-রাত স্নাইপার নজরদারিতে থাকে।”

“তাহলে আপনি কেন সরাসরি—”

“তোমাকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলাম না?” জেনকিন্স হেসে উঠল। “শুরুতে চেয়েছিলাম শহরের বাসিন্দারাই কাজটা করুক। তুমি যখন ক্যানিয়নে পৌঁছালে, আমরা জানতাম আশপাশে অ্যাবিদের একটা দল আছে। তুমি নিরস্ত্র ছিলে। গুলি নষ্ট করার দরকার কী?”

“কিন্তু শহরের বাসিন্দারা… ওরা এসবের কিছু জানে না?”

“না।”

“তাহলে ওরা কী মনে করে?”

“ওরাও তোমার মতোই অ্যাক্সিডেন্টের পর এখানে জ্ঞান ফিরে পেয়েছে, অবশ্যই, প্রয়োজনমতো জায়গায় ইনজুরিসহ। আমাদের ইন্টিগ্রেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে বুঝে নেয় যে এখান থেকে বেরোনোর কোনো পথ নেই আর নিয়ম-কানুন আর শাস্তির ব্যবস্থা আছে, যাতে ১৯৮৪ সালের কেউ ২০১৫ সালের কারও পাশে থাকলে যে জটিলতা তৈরি হয়, সেটা কমে। বাসিন্দাদের টিকে থাকতে হলে, বংশবিস্তার করতে হলে, তাদের জানতে দেয়া যাবে না যে তারাই পৃথিবীর শেষ মানুষ। তাদের এমনভাবে বাঁচতে হয় যেন বাইরের পৃথিবী এখনও টিকে আছে।”

“কিন্তু সেটা তো নেই। তাহলে এই মিথ্যার মানে কী? সাসপেনশন থেকে বের করেই কেন বলে দিচ্ছেন না, ‘অভিনন্দন, তোমরাই বেঁচে থাকা শেষ মানুষ?”

“আমরা প্রথম দলটার সঙ্গে ঠিক সেটাই করেছিলাম। তখন শহরটা নতুন করে বানানো শেষ। সবাইকে গির্জায় ডেকে এনে বলেছিলাম, ‘শোনো, আসল কথা এটা।’ সব খুলে বলেছিলাম।”

“তারপর?”

“দুই বছরের মধ্যে পঁয়ত্রিশ শতাংশ আত্মহত্যা করল। আর কুড়ি শতাংশ শহর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে মারা পড়ল। কেউ বিয়ে করল না। কেউ গর্ভবতী হলো না। তিরানব্বইজন মানুষ হারালাম, ইথান। আমার পক্ষে—না—মানবজাতির পক্ষে এই মাত্রার ক্ষতি সহ্য করা সম্ভব ছিল না। যখন আমাদের প্রজাতি নেমে এসেছে শেষ আটশো এগারো জনে। বলছি না আমাদের পদ্ধতি নিখুঁত, কিন্তু এত বছর ধরে, প্রায় সবকিছু চেষ্টা করে শেষে এটাকেই জনসংখ্যা বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হিসেবে পেয়েছি।”

“কিন্তু ওরা নিশ্চয়ই সবসময় ভাবে, তাই না? বাইরে কী আছে? এই শহরটা আসলে কী?”

“কেউ কেউ যে ভাবে না সেটা বলব না, কিন্তু প্রজাতি হিসেবে মানুষ খুব অ্যাডাপ্টেবল। এটাই আমাদের বৈশিষ্ট্য। ঠিকভাবে কন্ডিশনিং করা হলে, পরিস্থিতি যদি একেবারে অসহ্য না হয়, মানুষ সাধারণত নিজ পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়।”

“আপনি ওদের বেরোতে দিচ্ছেন না, তারপরও ওরা বিশ্বাস করে যে বাইরের পৃথিবী এখনো আছে? আমার তো মনে হয় না।”

“তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো, ইথান?”

“না।”

“অনেকে করত। কিছু নৈতিক বিধি-বিধান বানিয়ে নিয়েছিল। আর সেই ধর্মের দেবতাদের নামে প্রচুর খুনোখুনিও করেছে, যদিও তাদের কখনো দেখেনি বা শোনেনি। তুমি মহাবিশ্বে বিশ্বাস করো?”

“অবশ্যই।”

“ওহ, তাহলে তুমি মহাকাশে গেছ? দূরের গ্যালাক্সিগুলো নিজের চোখে দেখেছ?”

“আপনার পয়েন্ট বুঝেছি।”

“ওয়েওয়ার্ড পাইনস হলো ছোট হয়ে যাওয়া একটা পৃথিবী। একটা শহর যেটা কালের গর্ভে হারিয়ে যায়নি। অজানাকে ঘিরে ভয় আর না দেখা অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস এখানেও কাজ করে, শুধু পরিসরটা ছোট। তোমার আগের পৃথিবীতে সীমারেখা ছিল মহাকাশ আর ঈশ্বর। পাইনসে সেই সীমারেখা হলো শহরকে ঘিরে রাখা পাহাড়ি দেয়াল, আর পাহাড়ে থাকা রহস্যময় উপস্থিতি, মানে আমি।”

“আপনি আসল মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নন।”

“আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই, কিন্তু শহরে আমি এই ভূমিকাতে আছি। এতে বাসিন্দাদের বিশ্বাস অর্জন করতে সুবিধা হয়। শহরে কী চলছে বোঝা যায়। তাদের লড়াইয়ে, সন্দেহে, দুশ্চিন্তায় পাশে থাকা যায়।”

“আপনি বেভারলিকে খুন হতে দিয়েছেন।”

“হ্যাঁ।”

“আর এজেন্ট ইভান্সকেও।”

“আমাকে বাধ্য করেছিল সে।”

“আপনি আমাকেও ওভাবে মরতে দিয়েছিলেন।”

“কিন্তু তুমি পালিয়ে যেতে পেরেছ। প্রমাণ করেছ যে শুরুতে যতটা ভেবেছিলাম, তুমি তার চেয়েও বেশি দক্ষ।”

“আপনি তো সহিংসতার একটা সংস্কৃতি তৈরি করেছেন।”

“এ আর নতুন কী? দেখো, সহিংসতা যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন মানুষ সেটার সাথেই মানিয়ে নেয়। গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই, খ্রিস্টানদের সিংহের সামনে ছেড়ে দেওয়া, বা বুনো পশ্চিমে প্রকাশ্যে ফাঁসি, সবই একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। খুব একটা খারাপ কিছু নয়।”

“কিন্তু এরা তো আসলে স্বাধীন না।”

“স্বাধীনতা, এটা একেবারেই একবিংশ শতাব্দীর ধারণা। তুমি কি সত্যিই এখানে, এই ধ্বংস্তুপের সামনে, এই জঙ্গলে বসে বলতে চাও যে আমাদের প্রজাতি টিকে থাকার চেয়ে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?”

“সেই সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই নিতে পারত। অন্তত মর্যাদাটা থাকত তাতে। যে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না, যার আত্মমর্যাদা নেই, সে কি আর মানুষ থাকে? “

“ওটা ওদের সিদ্ধান্ত নয়।”

“তাহলে কার, আপনার?”

“মর্যাদা একটা সুন্দর ধারণা, কিন্তু যদি তারা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়? প্রথম দলের মতো? সেই আদর্শ, সেই ধারণা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে যদি প্রজাতির অস্তিত্বই না থাকে, তাহলে সেসবের মানে কী?”

“তাহলে আমাকে কেন মেরে ফেলেননি?”

পিলচার হাসল, যেন ইথান অবশেষে ঠিক প্রশ্নটা করেছে। মাথা কাত করল সে। “শুনতে পাচ্ছ?”

“কী?”

“নীরবতা।”

পাখিরা চুপ করে গেছে।

পিলচার হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ইথানও উঠল। জঙ্গলটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। পিলচার কোমর থেকে বন্দুকটা বের করে হাতে নিল। ওয়াকিটকির ক্লিপ খুলে মুখের কাছে আনল সেটা।

“পোপ, ফিরে আসো, ওভার।”

“আসছি, ওভার।”

“কোথায় আছ, ওভার?”

“দুইশো মিটার উত্তরে। সব ঠিক আছে, ওভার?”

“আমার মনে হচ্ছে পাহাড়ের দিকে দৌড়ানোর সময় হয়ে গেছে, ওভার।”

“কপি দ্যাট। আসছি। ওভার অ্যান্ড আউট।”

পিলচার ফাঁকা জায়গার দিকে হাঁটা ধরল। পেছনে, দূর থেকে শুকনো পাতা আর মরা ডাল ভাঙার মচমচ শব্দ শুনতে পেল ইথান। পোপ আর প্যাম তাদের দিকে ফিরছে।

“ইথান, তোমাকে একশো ত্রিশ মাইল উড়িয়ে বোইজির ধ্বংসাবশেষে নিয়ে আসাটা আমার জন্য ছোট ব্যাপার ছিল না। আশা করি তুমি এর মর্ম বুঝবে। বিগত বছরগুলোতে আমরা কিছু ঝামেলাপূর্ণ বাসিন্দা পেয়েছি, কিন্তু তারা কেউ তোমার মতো ছিল না। আমি সবচেয়ে বেশি মূল্য দিই কিসের জানো?”

“কোনো ধারণা নেই।”

লাল পাতাগুলো উপরের ডাল থেকে অলস ভঙ্গিতে ঝরে পড়ছে নিচে। ওক গাছের ফাঁক দিয়ে ইথান সামনে তৃণভূমিটা দেখতে পাচ্ছে।

“নিয়ন্ত্রণ। পাইনসে একটা গোপন দল আছে, যারা উপরে উপরে আনুগত্যের ভান ধরে থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষমতা দখল করতে চায়। একে… বিদ্রোহ বলতে পারো। হ্যাঁ, বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তারা মুক্ত হতে চায়, পর্দা সরাতে চায়, সবকিছু যেভাবে চলছে তা বদলাতে চায়। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, এর মানে হবে পাইনসের শেষ। আমাদের শেষ।”

জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে এলো ওরা। হেলিকপ্টারটা একশো গজ দূরে দাঁড়িয়ে, শেষ বিকেলের রোদে ওটার ব্রোঞ্জ রঙ চমকাচ্ছে। ইথানের একটা অংশ ভাবল, কি নিখুঁত একটা শরতের দিন।

“আপনি আমার কাছ থেকে কী চান?” ইথান জিজ্ঞেস করল।

“আমি চাই তুমি আমাকে সাহায্য করো। তোমার কিছু বিরল দক্ষতা আছে।”

“কেন যেন মনে হচ্ছে, এখানে আমার না করার কোনো সুযোগ নেই।”

“অবশ্যই আছে।”

একটা হালকা বাতাস ইথানের মুখ ছুঁয়ে গেল, ঘাসগুলো সব ঝুঁকে পড়ল মাটিতে। ওরা হেলিকপ্টারের কাছে পৌঁছে পিলচার দরজা খুলে দিল, আগে উঠতে দিল ইথানকে। দু’জন বসে মুখোমুখি হলে পিলচার বলল, “পাইনসে জেগে ওঠার পর থেকে তুমি শুধু একটা কাজই করতে চেয়েছ, বেরিয়ে যেতে চেয়েছ এখান থেকে। আমি তোমাকে সেই সুযোগটাই দিচ্ছি। এই মুহূর্তে। তার সঙ্গে একটা বোনাসও পাবে। পেছনে তাকাও।”

ইথান সিটের ওপর দিয়ে পেছনে কার্গো হোল্ডের দিকে তাকাল, পর্দা সরিয়ে দিল টান দিয়ে। তার চোখ ভিজে উঠল। সারাক্ষণ ওরা এখানেই ছিল, যে নিষ্ঠুর সত্যটাকে সে এতক্ষণ স্বীকার করে নেয়নি, মেনে নেয়নি যে পিলচার যা বলছে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে সে আর কখনো তার পরিবারকে দেখতে পাবে না। তাদের হাড়গোড়ও বহু যুগ আগে মিশে গেছে মাটির সাথে।

অথচ ওই তো ওরা। তার চোখের সামনে। থেরেসা আর বেন, অচেতন অবস্থায় দুটো স্ট্রেচারে বাঁধা, মাঝখানে একটা কালো ডাফল ব্যাগ। ওর ছেলেটাকে আর বাচ্চার মতো লাগছে না।

“তোমাকে সাসপেনশনে দেওয়ার পর আমি তোমার ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছিলাম, ইথান,” পিলচার বলল। “আমার মনে হয়েছিল, তোমার ভেতরে সত্যিকারের সম্ভাবনা আছে। তাই তোমার পরিবারের সাথেও যোগাযোগ করেছিলাম।”

ইথান চোখ মুছল। “ওরা কতদিন ধরে পাইনসে আছে?”

“পাঁচ বছর।”

“আমার ছেলে… ও তো—”

“ও এখন বারো। দু’জনেই ভালোভাবে মানিয়ে নিয়েছে এখানে। ভেবেছিলাম তোমাকে জাগানোর আগে ওদের এখানে সেটেল করে নিলে ভালো হবে।”

ইথান গলায় জমে থাকা রাগ লুকানোর চেষ্টাও করল না। গর্জে উঠল সে। “এত দেরি করলে কেন?”

“আমি দেরি করিনি। ইথান, এটা তোমার সঙ্গে আমাদের তৃতীয় চেষ্টা।”

“অসম্ভব। কীভাবে?”

“সাসপেনশনের একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো রেট্রোগ্রেড অ্যামনেশিয়া। প্রতিবার তুমি যখন রি-অ্যানিমেট হও, তোমার স্মৃতি প্রথম সাসপেনশনের ঠিক আগের মুহূর্তে রিসেট হয়ে যায়। তোমার ক্ষেত্রে—গাড়ি দুর্ঘটনা। যদিও আমার সন্দেহ, কিছু স্মৃতি রয়ে যায়। হয়তো স্বপ্নে ভেসে ওঠে।”

“আমি আগেও পালানোর চেষ্টা করেছি?”

“প্রথমবার, তুমি নদী পার হয়ে গিয়েছিলে, আরেকটু হলেই মরতে বসেছিলে অ্যাবিদের হাতে। আমরা হস্তক্ষেপ করি, তোমাকে বাঁচাই। দ্বিতীয়বার, আমরা নিশ্চিত করি তুমি যেন তোমার পরিবারকে খুঁজে পাও, ভেবেছিলাম এতে কাজ হবে। কিন্তু তুমি ওদের নিয়েই পালাতে চেয়েছিলে। প্রায় সবাই মারা যাচ্ছিলে তোমরা।”

“তাই এবার আপনি আমার মস্তিষ্কের পেছনে লাগলেন?”

“ভাবলাম, যদি সাইকোসিস তৈরি করা যায়, তাহলে হয়তো একটা সুযোগ থাকবে। তোমাকে বেশ কিছু শক্তিশালী অ্যান্টিসাইকোটিক ড্রাগের শট দিয়েছিলাম।”

“এই কারণেই আমার মাথাব্যথা।”

“এমনকি তোমার নির্যাতনের ইতিহাসও তোমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি।”

“মানে?”

“আমার কাছে তোমার মিলিটারি ফাইল আছে। ফালুজায় তোমার সঙ্গে যা হয়েছিল, তার বিস্তারিত রিপোর্ট। পোপের জেরার সময় আমরা সেই স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম।”

“আপনি… অসুস্থ।”

“আমি কখনো ভাবিনি যে তুমি সত্যিই বাংকারে ঢুকে পড়বে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল তোমাকে অ্যাবিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু যখন তোমাকে সাসপেনশনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, তখন একটা কথা মাথায় এল। তুমি একগুঁয়ে। শেষ পর্যন্ত লড়াই করা মানুষ। ওয়েওয়ার্ড পাইনসের বাস্তবতাকে তুমি কখনোই মেনে নেবে না। তখন বুঝলাম তোমার সঙ্গে লড়াই বন্ধ করতে হবে। কেবল তাহলেই তুমি আমাদের বোঝা নয়, বরং সম্পদ হয়ে উঠতে পারো।”

“আপনি আমাকে সবটা সোজাসুজি বলে দিলেন না কেন?”

“কারণ আমি জানতাম না তোমার প্রতিক্রিয়া কী হবে, ইথান। আত্মহত্যা করবে? নাকি পালিয়ে যাবে? কিংবা হয়তো একা টিকে থাকার চেষ্টা করবে? কিন্তু এখন বুঝতে পারছি তুমি বিরলদের একজন।”

“মানে?”

“শহরের বেশিরভাগ মানুষ বাইরের সত্যটা সহ্য করতে পারে না। কিন্তু তুমি… তুমি মিথ্যেটাকে সহ্য করতে পারো না। অজানাকে ঘৃণা করো। তুমি প্রথম বাসিন্দা, যার সঙ্গে আমি এসব ভাগ করে নিলাম। অবশ্য, তোমার এই অবস্থা দেখতে গিয়ে তোমার পরিবার ভেঙে পড়েছে।”

ইথান ঘুরে পিলচারের দিকে তাকিয়ে রইল। “তাহলে ওদের এখানে এনেছেন কেন?”

“আমি তোমাকে একটা চয়েস দিচ্ছি, ইথান। পাইনসের বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে ওরা কিছুই জানে না। কিন্তু তুমি জানো। শুধু একবার বলো, তোমার পরিবারসহ তোমাকে এই মাঠেই নামিয়ে দিয়ে যাব। ওই ডাফল ব্যাগে কিছু খাবার আর সরঞ্জাম আছে, এমনকি অস্ত্রও আছে কয়েকটা। তুমি এমন একজন মানুষ যে নিজের শর্তে বাঁচতে চায়, আমি সেটাকে সম্মান করি। তোমার কাছে যদি সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে আপত্তি নেই। তুমি এখানে, বাইরের এই নরকে রাজত্ব করতে পারো, কিংবা পাইনসে ফিরে স্বর্গে সেবা করতে পারো। চয়েস তোমার। কিন্তু যদি তুমি পাইনসে ফেরো, যদি তোমার পরিবার আর তোমার নিজের জন্য নিরাপত্তা চাও, সাহায্য চাও; তাহলে সেটা হবে আমার শর্তে। আর আমার শর্ত ভঙ্গের শাস্তি, ইথান, খুব ভয়ংকর। যদি আমার কথা না মানো, যদি বিশ্বাসঘাতকতা করো, তোমার চোখের সামনে তোমার ছেলেকে—”

হঠাৎ বিকট আওয়াজে পিলচারের কথায় বাধা পড়ল। প্রথমে ইথানের মনে হলো জঙ্গলের মাঝে কেউ বুঝি জ্যাকহ্যামার চালু করেছে। তারপরই যেন ভয়টা দু’চোখের মাঝখানে আঘাত করল। শব্দটা আমেরিকান কালাসনিকভের। র‍্যাটা-ট্যাট-ট্যাট।

রেডিওতে প্যামের গলা বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ল। “চপার স্টার্ট করো! ওরা আসছে!”

পিলচার ককপিটের দিকে তাকাল। “আমাদের এখান থেকে বের করো,” সে বলল।

“চেষ্টা করছি, বস।”

ইথান বিকে১১৭ এর টারবাইন চালু হওয়ার শব্দ শুনতে পেল, সাথে প্যামের শটগানের বজ্রধ্বনি। জানালার দিকে ঝুঁকল সে, তাকিয়ে রইল জঙ্গলের দিকে, গুলির শব্দ ক্রমেই জোরাল হচ্ছে। হেলিকপ্টারের ভেতর শব্দ এত বেড়ে গেছে যে কথা বলা অসম্ভব। ইথান হেডসেটটা টেনে নিল, পিলচারকেও ইশারা করল পরতে।

“আপনি আমার কাছে কী চান?” ইথান জিজ্ঞেস করল।

“পাইনস চালাতে আমাকে সাহায্য করো। ভেতর থেকে। কাজটা অসম্ভব কঠিন হবে, কিন্তু আমার মনে হয় তুমি এই কাজের জন্যই তৈরি।”

“পোপ তো সেটাই করছে, তাই না?”

টুইন টারবাইনের চিৎকারে কান পাতা দায়। আরপিএম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেবিনও কাঁপতে শুরু করেছে। পোপ আর প্যাম গাছের সারি থেকে ফাঁকা জায়গায় বেরিয়ে এলো। হেলিকপ্টারের দিকে পিঠ দিয়ে পিছাচ্ছে ওরা। গাছের আড়াল থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এল তিনটে অ্যাবি, আর পোপের ফুল-অটো বার্স্টে কচুকাটা হলো দুটো। আর প্যাম এক জোড়া স্লাগ ঢুকিয়ে দিল তৃতীয়টার বুকে।

ইথান কেবিনের অন্য পাশে ঝাঁপিয়ে গিয়ে জানালা দিয়ে তাকাল। “পিলচার।”

“কী?”

“আপনার বন্দুকটা দিন।”

“কেন?”

ইথান কাচে টোকা দিল, মাঠের ওপাশ থেকে বেরিয়ে আসা অ্যাবিদের একটা দলের দিকে ইশারা করে। কমপক্ষে চারটা। চার হাত-পায়ে নিচু ভঙ্গিতে ছুটছে পোপ আর প্যামের দিকে। অসম্ভব দ্রুত গতিতে।

“আমার শর্তে রাজি আছ, ইথান?”

“ওরা মারা যাবে।”

“আমার শর্তে রাজি আছে কি না বলো?”

ইথান সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা দোলাল। পিলচার .৩৫৭ রিভলভারটা ঠাস করে তার তালুতে ধরিয়ে দিল।

ইথান ঝট করে হেডসেট খুলে ককপিটের দিকে চিৎকার করল, “আর কতক্ষণ?”

“ত্রিশ সেকেন্ড!”

ইথান দরজা খুলে লাফিয়ে নামল ঘাসের ওপর। রোটরের শব্দ আর বাতাস চিৎকার করছে তার কানে। পোপ আর প্যাম তখনও পঞ্চাশ গজ দূরে, গুলি করতে করতে হেলিকপ্টারের দিকে পিছাচ্ছে। ইতিমধ্যে অন্তত ডজনখানেক মেরেছে ওরা—ফ্যাকাশে দেহগুলো ছড়িয়ে ঘাসের ওপর—তবু আরও আসছে। গুনে শেষ করা যাবে না।

ইথান দৌড়াল। হেলিকপ্টার পেরিয়ে বিশ গজ গিয়ে থামল সে। পা দুটো ফাঁকা, শরীর স্থির। হাতে ধরা রিভলভারটার দিকে তাকাল এক ঝলক। ডাবল-অ্যাকশন রুগার, ছয় রাউন্ডের সিলিন্ডার। সে বন্দুক তুলল। নল বরাবর নিশানা করল। পূর্ণ গতিতে ছুটে আসছে পাঁচটা অ্যাবি। রোটরের আওয়াজ ছাপিয়েও শোনা যাচ্ছে মেশিনগান আর টুয়েলভ-গেজের উন্মত্ত গর্জন। বুড়ো আঙুল দিয়ে হ্যামার টানল সে।

অ্যাবিগুলো তখন ত্রিশ ফুট দূরে। ইথান মনে মনে বলল, যত দ্রুত গুলি শুরু করা যায়, তত ভালো। আর ডাবল ট্যাপ করা যাবে না। এক শট, এক মৃত্যু। মাঝখানেরটার ওপর নিশানা স্থির করল সে। জন্তুটা শূন্যে থাকা অবস্থায় টেনে দিল ট্রিগার। তার মাথার ওপরের অংশ উড়িয়ে দিল বুলেট, রক্ত আর মগজের ফোয়ারা ছিটকে গেল চারধারে। বোঝা গেল, হলো পয়েন্ট শুট করছে সে।

কিন্তু বাকি চারটার কোনো বিকার নেই। আগের মতোই পূর্ণ গতিতে এগিয়ে আসছে। আর মাত্র বিশ ফুট। বাঁ দিকের দুটো, একেকটায় এক শট, সরাসরি মুখে। চতুর্থটার গলায়।

শেষ অ্যাবিটা তখন দশ ফুটের ভেতরে। এত কাছে যে গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ইথান গুলি ছুড়ল, অ্যাবিটাও ঝাঁপ দিল। ঠিক একই সময়ে। বুলেট শুধু পা ঘেঁষে গেল ওটার। অ্যাবিটা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ছুটে আসছে তার দিকে, ইথান দ্রুত নিশানা ঠিক করল। হ্যামার টানল, ট্রিগার চাপল। দানবটা একেবারে তার ওপর এসে পড়েছে, দাঁত বের করা, এত কাছ থেকে ওটার চিৎকার রোটরের শব্দকেও ছাপিয়ে গেল। গুলিটা দাঁতের ভেতর দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে গেল, হাড় আর মগজের স্প্রে ছড়িয়ে দিয়ে, আর প্রাণহীন দেহটা আছড়ে পড়ল ইথানের ওপর।

সে নড়তে পারল না।

স্তব্ধ।

মাথা দুলে উঠল তার। যেদিকে তাকাচ্ছে শুধু আলোর বিস্ফোরণ। শব্দ শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু অস্পষ্ট আর ধীর, যেন চারপাশের বিশৃঙ্খলার সিম্ফনির প্রতিটা সুর আলাদা করে শুনতে পাচ্ছে।

শটগানের বিস্ফোরণ।

একে-র গর্জন।

ঘূর্ণায়মান রোটর।

অ্যাবিদের চিৎকার।

নিজেকে চিৎকার করে বলছে, ওঠো। ওঠো। ওঠো।

অ্যাবির ভারী শরীরটা এক ধাক্কায় বুকের ওপর থেকে সরিয়ে উঠে বসল ইথান। মাঠের ওপারে তাকাল সে, কিন্তু দৃষ্টি ঝাপসা, কিছুতেই ফোকাস ধরছে না। সে কয়েকবার জোরে পলক ফেলল, মাথা ঝাঁকাল। ধীরে ধীরে পৃথিবীটা পরিষ্কার হতে লাগল, যেন কেউ দূরবীনের ফোকাস ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

হে ঈশ্বর!

মাঠের ভেতরেই তখন কম করে হলেও পঞ্চাশটা অ্যাবি। প্রতি সেকেন্ডে সংখ্যাটা আরও ডজনখানেক করে বাড়ছে। সবার লক্ষ্য এক, মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা হেলিকপ্টার। ইথান কোনোমতে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু বাঁ পায়ে পুরো ভর দিতে পারছে না মনে হলো। বাম দিকে কাত হয়ে যাচ্ছে সে। শরীর এখনো ভারসাম্য ফিরে পায়নি পুরোপুরি, অথচ নষ্ট করার মতো সময় নেই। টলতে টলতে হেলিকপ্টারের দিকে এগোল সে।

প্যাম ইতিমধ্যেই ভেতরে ঢুকে পড়েছে। পোপ স্কিড থেকে কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে, অ্যাবিদের ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। রাইফেল কাঁধে তুলে এখন নিখুঁত নিশানায় গুলি চালাচ্ছে। ইথান বুঝল, নিশ্চয়ই ম্যাগাজিনের শেষ ক’টা রাউন্ডই বাকি।

ইথান স্কিডে পা দেওয়ার সময় পোপের কাঁধে হাত রেখে তার কানে চিৎকার করল, “চলো!”

পিলচার দরজা খুলে দিল, আর ইথান হুড়মুড় করে উঠে পড়ল কেবিনে।

সিট বেল্ট বেঁধে জানালার দিকে তাকাল সে।

অ্যাবিদের বিশাল বাহিনিতে ছেয়ে গেছে পুরো মাঠ।

সংখ্যায় শত শত।

চপার থেকে দশ সেকেন্ড দূরে, পাগলা কুকুরের ঝাঁকের মতো ধেয়ে আসছে।

হেডসেট পরতেই পিলচার কেবিনের দরজা টেনে বন্ধ করে দিল, লক করে বলল, “চলো, রজার।”

“শেরিফের কী হবে?” ইথান বলল।

“পোপ থাকছে।”

জানালা দিয়ে ইথান দেখল, আর্নল্ড হাতের অস্ত্রটা ফেলে দরজার দিকে ছুটে আসছে। হাতল টানছে দরজা খোলার জন্য, কিন্তু খুলছে না। পোপ কাচের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে রইল পিলচারের দিকে। এক মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্তি ঝলক দিয়ে গেল তার চোখে, তারপরই বুঝে ফেলল সে। এরপর সেখানে দেখা দিল ভয়। পোপ কিছু একটা চিৎকার করল, কিন্তু শব্দটা শোনার কোনো সুযোগই ছিল না।

“কেন?” ইথান বলল।

পিলচার পোপের দিক থেকে চোখ সরাল না। “ও ক্ষমতা দখল করতে চায়।”

পোপ মুষ্টিবদ্ধ হাত কাচে আঘাত করতে লাগল, রক্ত লেগে যাচ্ছে জানালার কাচে। “রজার, তাড়া দিচ্ছি না, কিন্তু তুমি এখনই না তুললে আমরা সবাই মরব,” পিলচার বলল।

ইথান অনুভব করল, স্কিড মাটি ছাড়ছে। সে বলল, “ওকে ফেলে যেতে পারেন না।”

চপারটা মাটি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেরিফ বাম হাত দিয়ে স্কিড জড়িয়ে ধরল, ঝুলে থাকার জন্য মরিয়া চেষ্টা করে যাচ্ছে।

“সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেছে,” পিলচার বলল, “তুমি আমার নতুন শেরিফ। স্বাগতম।”

পোপের নিচে অ্যাবিদের একটা দল জড়ো হয়েছে—লাফাচ্ছে, হাত চালাচ্ছে—কিন্তু পোপ শক্ত করে স্কিড ধরে রেখেছে। তার পা দুটোও ওদের নাগালের বাইরে।

পিলচার বলল, “রজার, অসুবিধা না হলে এক-দুই ফুট নামাও।”

চপারটা অস্বস্তিকরভাবে নামল—ইথান বুঝল, পাইলট বহু বছর উড়ায়নি—পোপকে আবার নামিয়ে দিল জঘন্য উন্মাদনায়। প্রথম অ্যাবিটা যখন পোপের পা আঁকড়ে ধরল, ওজনের চাপে চপারের লেজটা নুয়ে পড়ল মাটির দিকে। এবার আরেকটা তার অন্য পা ধরে ঝুলে পড়ল, আর এক ভয়ংকর মুহূর্তের জন্য ইথানের মনে হলো ওরা চপারটাকেই টেনে নামাবে।

রজার দ্রুত ভুল শুধরে মাটি থেকে বিশ ফুট ওপরে উঠিয়ে নিল চপার। পোপের উন্মত্ত চোখের দিকে তাকাল ইথান। স্কিড থেকে এক হাত ছুটে গেছে তার। কোনোমতে কেবল এক হাতে ধরে আছে সে, চাপের চোটে আঙ্গুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেছে, তিনটে অ্যাবি ঝুলছে তার পা ধরে।

ইথানের চোখে চোখ রাখল পোপ। কিছু একটা বলল চিৎকার করে, কিন্তু রোটরের গর্জনে হারিয়ে গেল তার আওয়াজ।

পোপ হাত ছেড়ে দিল।

আধা সেকেন্ড পড়ল।

তারপর অ্যাবিদের খাবারের উন্মত্ততায় হারিয়ে গেল তার শরীর।

ইথান মুখ ফিরিয়ে নিল।

পিলচার তাকিয়ে রইলো তার দিকে। অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে দেখে নিচ্ছে ভেতরটা।

হেলিকপ্টারটা তীক্ষ্ণ বাঁক নিল, আর উত্তরমুখী হয়ে ছুটে চলল পাহাড়ের দিকে।

***

চপারের ভেতরটা নীরব হয়ে আছে। ইথান একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে, আরেকবার পর্দা সরিয়ে তার ঘুমন্ত পরিবারকে দেখছে। তৃতীয়বার যখন সে ওদের দিকে তাকাল, পিলচার বলল, “ওরা ঠিকই থাকবে, ইথান। আজ রাতেই ওরা জেগে উঠবে। নিরাপদে, উষ্ণ বিছানায়। সেটাই তো আসল কথা, তাই না? এখানে থাকলে তোমরা সবাই নিশ্চিতভাবেই মরতে।”

দিন গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে এগোচ্ছে। ইথান ভয়াবহ ক্লান্ত, কিন্তু প্রতিবার চোখ বন্ধ করা মাত্র হাজারটা চিন্তা ঝড়ের গতিতে ছুটোছুটি শুরু করে দিচ্ছে মাথার ভেতর। তাই বাইরের জগতের দিকে তাকিয়ে রইলো চুপচাপ। তার জানালাটা পশ্চিমমুখী। সূর্য তখন অস্ত গেছে, আর তার অনুপস্থিতিতে সন্ধ্যার আকাশের পটভূমিতে বিকৃত করাতের দাঁতের মতো দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের সারিগুলো। হাজার ফুট নিচে পাইনবনের কোনো চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না। নিচে কোনো আলো নেই। মানব অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই।

***

নিঃসীম অন্ধকারের ভেতর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে তারা।

কেবিনের আলো নেভানো, ককপিটের ইন্সট্রুমেন্ট প্যানেলের মৃদু জ্যোতিটাও পর্দার আড়ালে, ইথানের মনে হচ্ছে যেন অন্ধকারের সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে তারা।

অথবা মহাশূন্যে।

তার পেছনে তার পরিবার আছে, এই ভাবনাটুকুতে কিছুটা সান্ত্বনা আছে বটে, কিন্তু বরফঠাণ্ডা কাচে হেলান দিয়ে ভয়ের এক তীব্র খোঁচাও অনুভব করছে।

আর অনুভব করছে হতাশা।

ওরা একা।

ভীষণ রকম একা।

কথাটা ঠিক বুকের মাঝখানে এসে আঘাত করল।

এই ক’দিন ধরে সে লড়াই করছিল ওয়েওয়ার্ড পাইনসের বাইরে নিজের জীবনে ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই জীবনটা আর নেই।

প্রায় দুই হাজার বছর ধরে নেই।

তার বন্ধুরা।

তার বাড়ি।

তার অফিস।

তার পরিচয়।

একজন মানুষ এমন বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেয়?

এমন কিছু জানার পর মানুষ সামনে এগিয়ে যায়ই বা কীভাবে?

কিসের আশায় সকালে বিছানা থেকে ওঠে?

কোন শক্তিতে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়?

তার পরিবার। পেছনে ঘুমিয়ে থাকা ওই দু’জন মানুষ। ওরাই তার শক্তি।

ইথান চোখ খুলল।

প্রথমে নিজেই বিশ্বাস করতে পারল না, সে কী দেখছে।

নিচে দূরে, সেই অসীম অন্ধকারের মাঝখানে এক আলোর ফোয়ারা জ্বলে আছে।

পাইনস।

বাড়ির আলো, বারান্দার আলো।

রাস্তার আলো, গাড়ির আলো।

সব মিলেমিশে একটা শহরের নরম রাতের আভা।

সভ্যতার আলো।

এখন তারা নামছে, আর ইথান জানে ওই উপত্যকাতেই একটা ভিক্টোরিয়ান বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার স্ত্রী আর তার ছেলে থাকে।

এখন থেকে যেখানে সেও থাকতে পারবে।

একটা উষ্ণ বিছানা আছে, যেখানে সে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়তে পারবে।

একটা রান্নাঘর আছে, যেখানে তাদের রান্না করা খাবারের গন্ধ ছড়িয়ে থাকবে।

একটা বারান্দা আছে, যেখানে দীর্ঘ গ্রীষ্মের সন্ধ্যাগুলোতে সে আর থেরেসা বসে থাকতে পারবে।

একটা উঠোন আছে যেখানে সে তার ছেলের সঙ্গে ক্যাচ খেলতে পারবে।

হয়তো টিনের ছাদও আছে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দের চেয়ে মিষ্টি আওয়াজ আর কী হতে পারে! বিশেষ করে গভীর রাতে, বিছানায় শুয়ে, বাহুতে থাকবে তার স্ত্রী, আর হলের ওপাশের ঘরে তার ঘুমন্ত ছেলে।

ওয়েওয়ার্ড পাইনসের আলো চারপাশের খাড়া পাহাড়ের গায়ে জ্বলজ্বল করছে, আর এই প্রথমবারের মতো মনে হলো ওই উঁচু পাহাড়ি দেয়ালগুলোকে দেখে স্বস্তি লাগল।

বাইরের সব বিভীষিকার বিরুদ্ধে এক সুরক্ষা প্রাচীর।

পৃথিবীর শেষ শহরের জন্য এক আশ্রয়।

এই শহর কি কোনোদিন আপন মনে হবে তার? আর যদি মনে হয়, সেটা কি ভুল কিছু হবে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *