অধ্যায় ১১
ইথান ঝড়ের বেগে পরের মোড়টা পেরিয়ে গেল, পেছনে প্রতি মুহূর্তে আলোর সংখ্যা বাড়ছে। তবে তার আসল ভয় ঠিক পেছনের লোকটাকে। বদমাশটা ভয়ানক দৌড়বাজ। সঙ্গিদের ফেলে অনেকখানি এগিয়ে এসেছে সে। তার টাক মাথা, বড় রুপালি ফ্রেমের চশমা দেখে মনে হচ্ছে লোকটাকে আগেও কোথাও দেখেছে ইথান। সে তিরিশ ফুটের মধ্যে চলে আসতেই ঝট করে তাকে চিনে ফেলল সে। এই লোকটা তো সেই অভদ্র ফার্মাসিস্ট, যার দোকানে সে দুই দিন আগে অ্যাসপিরিন কিনতে গিয়ে পেয়েছিল!
সামনে আর এক ব্লক পরেই প্রধান সড়ক। মানুষ জড়ো হওয়ার ভয়ঙ্কর এক গর্জনটা ওখান থেকেই আসছে। নগ্ন অবস্থায় কোনোভাবেই প্রধান সড়কে ঢুকবে না সে।
কিন্তু যে গতিতে সে দৌড়াচ্ছে, দিক না বদলালে বিশ সেকেন্ডের মধ্যে ঠিক সেটাই ঘটবে।
প্রধান সড়ক আর তার মাঝে আর কেবল একটা রাস্তা বাকি—ঠিক রাস্তাও না ওটা—বরং প্রধান সড়কের ভবনগুলোর পেছনে এক লেনের একটা সরু গলি। সে মোড় ঘুরে ওই গলিতে ঢুকে যদি একজনেরও মুখোমুখি হয়, যে-কোনো একজন, তার সব আশা শেষ।
মাচেতে হাতে একটা ফার্মাসিস্টের হাতে খুন হওয়া, কী চমৎকার মৃত্যু! রাস্তার পাশে একতলা একটা গ্যারেজ। সে যদি ওটার পাশ দিয়ে মোড় ঘোরে, তাহলে সে অন্তত দুই সেকেন্ডের জন্য ফার্মাসিস্টের দৃষ্টির বাইরে থাকবে।
আর যদি গলিটা ফাঁকা থাকে, তাহলে হয়তো ওইটুকুই যথেষ্ট।
এতক্ষণ সে রাস্তার মাঝ বরাবর দৌড়াচ্ছিল, এবার সময় হলো চাল বদলানোর। ডানে ঘুরল সে, বৃষ্টি ভেজা রাস্তা পার হলো ছুটে।
পিছলে পড়া যাবে না কোনোভাবেই।
এক ফালি ঘাস, তারপর ফুটপাত, এরপর আবার ঘাস পেরিয়ে পৌঁছে গেল গলির মুখে। হঠাৎ করে তার মনে হলো গলিতে ঢোকার পর কী করবে কোনো ধারণা নেই তার।
এখন পরিকল্পনার সময় নেই, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেব।
পেছনে পায়ের শব্দ শুনে আন্দাজ করা গেল লোকটা হয়তো তার চেয়ে ছয় কদম দূরে।
ইথান ঢুকে পড়ল গলি তে।
কংক্রিট থেকে মাটির রাস্তায়। এখানে গাঢ় অন্ধকার।
ভিজে আবর্জনার গন্ধে ভারি হয়ে আছে বাতাস।
চারপাশে কেউ নেই, শুধু দূরে কয়েকশো ফুট দূরে দুটো টর্চলাইট কাঁপছে, চলে যাচ্ছে অন্যদিকে।
ইথান হঠাৎ নিজের পা দুটো আড়াআড়ি ঘুরিয়ে দিল, যেন স্কিতে ব্রেক মারছে। এত দ্রুত থেমে গেল যে মনে হলো ভরবেগের কারণে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবে। নিজেকে সামলে নিয়ে রকেটের বেগে ছুটে গেল যেদিক থেকে এসেছিল সেই পথে।
ওখানে থাকিস… ওখানে থাকিস… ওখানে থাকিস…
ধাক্কাটা হলো ভয়ঙ্কর। ইথানের কপাল সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল ফার্মাসিস্টের চোয়ালের নিচে। প্রচণ্ড এক হাড়ভাঙা সংঘর্ষে আধ সেকেন্ডের জন্য ইথানের পা শূন্যে ভেসে রইলো।
ঝটকা দিয়ে অচেতনভাব কাটতেই সে বুঝল, রক্ত ঝরছে তার মুখ বেয়ে।
ওদিকে ফার্মাসিস্ট বসে পড়েছে রাস্তায়, হতভম্ব, আর মুখ থেকে কয়েকটা দাঁত খুলে ছিটকে পড়েছে আশেপাশে।
মস্তিস্ক নাড়িয়ে দেয়া আঘাতের পর, ইথানের দুই সেকেন্ড লেগে গেল এটা বুঝতে যে রাস্তার ওপর পড়ে থাকা লম্বা ধাতব বস্তুটা ওই লোকটার মাচেতে।
সে নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল। ফার্মাসিস্ট তখন তার দিকে তাকিয়ে আছে, জমে গেছে আতঙ্কে, বুঝে গেছে এবার কী আসছে। আর সেই ভয়টাই তাকে পুরো চেতনায় ফিরিয়ে আনল, এক বালতি স্মেলিং সল্ট নাকের সামনে ধরলেও হয়তো এতো দ্রুত যা ফিরত না।
ইথান মাচেতের হাতল শক্ত করে চেপে ধরল। বৃষ্টিতে যেন হাত পিছলে না যায় সেজন্য ডাক্ট টেপ পেঁচানো হয়েছে ওটার বাটে।
লোকটা হাত তুলল মাথার উপর, যেন হাত দিয়ে মাচেতের আঘাত ঠেকানো যাবে।
ইথান আঘাতের ভান করে হাত নামাল, একই সাথে সজোরে লাথি বসাল লোকটার মুখে। গোড়ালি একেবারে বসে গেল তার বিধ্বস্ত নাকে, মাথাটা ছিটকে গেল পেছন দিকে। খুলি ফাটার মতো শব্দ করে আছড়ে পড়ল রাস্তায়।
একটা হালকা গোঙানি ছাড়ল ফার্মাসিস্ট, তারপর আর নড়ল না। কিন্তু তার দুই সঙ্গী তখনও দৌড়ে আসছে। সর্বোচ্চ আর দশ সেকেন্ড, এরমধ্যেই পৌঁছে যাবে ওরা। আর তাদের পেছনে এক ব্লক দূরে ছুটে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে টর্চলাইট। তাদের অসংখ্য পায়ের শব্দ ঝড়ের মতো গর্জন তুলেছে ভেজা রাস্তায়।
ইথান আবার দৌড়ে ঢুকে পড়ল গলিতে, স্বস্তি নিয়ে দেখল যে আগের দেখা আলো দুটোও মিলিয়ে গেছে। এটাই তার সুযোগ। এই সামান্য ক’টা সেকেন্ডই তার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।
কুড়ি পা এগোতেই একটা ডাম্পস্টারের কাছে পৌঁছাল সে। এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে বসে পড়ল সেটার পাশে, ধাতব বাক্স আর দেয়ালের মাঝের সরু জায়গাটায় শুয়ে পড়ল উপুড় হয়ে।
তার বুকের ধকধক আর হাঁপানোর শব্দ ছাড়া আর কিছু কানে আসছে না। রক্ত আর ঘামে ভিজে গেছে মুখ, চোখে ঢুকে জ্বালা ধরাচ্ছে। ঠাণ্ডায় শরীর জমে আসছে, পেশিগুলো জ্বলছে যেন এইমাত্র বিশাল এক ম্যারাথন শেষ করেছে।
ডাম্পস্টারের অন্য পাশ দিয়ে দৌড়ে গেল কয়েক জোড়া পা। ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে শব্দ, একসময় মিলিয়ে গেল বৃষ্টির আওয়াজে।
ইথান হাঁফ ছেড়ে মুখ নামাল মাটিতে। ঘাস আর ভেজা নুড়ির ছোঁয়া লাগল গালে। পিঠের ওপর টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে, চারপাশে জমা পানি কাঁপছে প্রতিটা নতুন ফোঁটার আগমনে।
ইথান এমনভাবেই পড়ে থাকতে পারে সারারাত, এমনকি পরের দিন সকাল পর্যন্তও।
কিন্তু মাথার ভেতর একটা কঠিন গলা ফিসফিস করে উঠল—শরীর তোল গর্দভ, এখন বিশ্রাম নিলে চিরদিনের মতো বিশ্রামে চলে যাবি।
ভেজা নুড়িতে ভর দিয়ে শরীর উঁচু করল সে। বেরিয়ে এলো ডাম্পস্টার আর দেয়ালের ফাঁক থেকে। হাঁটু গেড়ে বসে রইলো কয়েক সেকেন্ড, কান পেতে শুনল চারপাশ।
দুরে কোথাও মানুষের গলা, পায়ের শব্দ, আর প্রধান সড়কের দিক থেকে ভেসে আসছে বিশৃঙ্খলার গুঞ্জন। কিন্তু আশেপাশে তেমন কোনো বিপজ্জনক আওয়াজ নেই।
সে উঠে দাঁড়িয়ে গলির মুখের দিকে তাকাল। লোকজন দুলকি চালে এগিয়ে যাচ্ছে প্রধান সড়কের দিকে।
ইথান দেয়াল ঘেঁষে বিপরীত দিকে এগোল, মিলিয়ে যেতে লাগল গলির কুয়াশা আর অন্ধকারে।
প্রায় ত্রিশ ফুট এগিয়ে দেখল খানিকটা জায়গায় ইটের দেয়ালে ইট নেই। একটা কাঠের দরজা।
পেছনে তাকাতেই দেখল, ডাম্পস্টারের দিকে কেউ আসছে। একটা টর্চলাইটের আলো দুলছে এদিক-ওদিক, আর তার সঙ্গে নুড়ি মাড়ানোর খচখচ শব্দ।
ইথান তাড়াতাড়ি দরজাটা টেনে খুলল। ভেতর থেকে আলো এসে পড়ল গলিতে, কুয়াশার সাথে মিশে একরকম ম্লান হলুদ আভা তৈরি হলো দরজার সামনে।
সে ভিতরে ঢুকে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল, ডেডবোল্ট ঘুরিয়ে আটকে দিতে চাইল দরজা। কিন্তু তালার সিলিন্ডার ড্রিল করে তাতে শক্ত ধাতু ঢেলে দেওয়া। দরজা বন্ধ করার উপায়ই নেই।
ইথান দৌড়ে উঠতে লাগল সরু সিঁড়ি বেয়ে। প্রতিটা ধাপে তার বাঁ পায়ের পেছনের পেশিতে শিরশির করে ব্যথা উঠছে, তবু থামল না। দ্বিতীয় তলার ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছাতেই গলির দরজাটা শব্দ করে খুলে গেল।
ইথান এক ঝলক তাকাল নিচে। বিশালদেহী এক লোক দাঁড়িয়ে আছে দরজায়, গায়ে বৃষ্টিতে ভেজা হলুদ পঞ্চো। এক হাতে টর্চলাইট, অন্য হাতে বড় ছুরি, সম্ভবত নিজের বাড়ির কিচেন নাইফ সেট থেকে তুলে এনেছে। লোকটার মুখ হুডের ছায়ায় ঢাকা, কিন্তু থুতনিটা শক্ত, দৃঢ়। ছুরি ধরা হাতও একদম স্থির, নার্ভাসনেসের কোনো চিহ্ন নেই।
ইথান দ্রুত দৌড়ে পেরিয়ে গেল ল্যান্ডিং, আরও উপরে উঠল। সিঁড়িতে বুটের ভারী শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে বাজতে লাগল পুরো সিঁড়িঘরে।
তৃতীয় তলায় পৌঁছে ইথান একটা দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল। একটা মৃদু আলোকিত, নিস্তব্ধ, ফাঁকা করিডোরে এসে দাঁড়িয়েছে সে। প্রতি বিশ ফুট পরপর দেওয়ালে লণ্ঠনের মতো দেয়াল-লাইট লাগানো। প্রতিটি দরজার মাঝ বরাবর পিতলের নম্বর ঝুলছে।
এটা কোনো অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং?
পেছনে, সিঁড়ি থেকে এখনো লোকটার পায়ের আওয়াজ আসছে।
ইথান ছুটতে শুরু করল করিডোর ধরে, একের পর এক দরজার নব ঘুরিয়ে দেখছে।
আটকানো।
আটকানো।
আটকানো।
আটকানো।
যেকোনো মুহূর্তে সিঁড়িঘরের দরজা খুলে লোকটা চলে আসবে।
আটকানো।
আটকানো।
সপ্তম দরজা—নম্বর উনিশ—নব ঘোরাতেই খুলে গেল।
ইথান মাচেতের হাতল শক্ত করে ধরল, ভেতরে কেউ থাকলে সহজে ছেড়ে দেবে না। পায়ের আঙুল দিয়ে দরজাটা আলতো ঠেলে দিল।
একটা ছোট, অন্ধকার অ্যাপার্টমেন্ট।
সে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল, ঠিক সেই মুহূর্তেই সিঁড়িঘরের দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল।
মনে হচ্ছে ফাঁকা।
ইথান চেইন টেনে দিল তাড়াতাড়ি। দরজায় কান পেতে শুনতে লাগল ওপাশে কী হচ্ছে। বাইরের দরজাটা বন্ধ হলো। পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। এবার আর তাড়াহুড়ো করে নয়। কাঠের মেঝেতে ধপ্… ধপ্… ধপ্… যেন শিকারি ঠিক জানে, শিকার লুকিয়ে আছে খুব কাছেই।
ইথান যেন প্রায় দেখতে পাচ্ছে হলুদ পঞ্চো পরা লোকটা ধীর কিন্তু দৃঢ় পায়ে এগিয়ে আসছে করিডোর ধরে। সে নিশ্চিতভাবেই জানে ইথান এই অ্যাপার্টমেন্টগুলোর একটায় আছে, কিন্তু কোনটায়, তা জানার উপায় নেই।
পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে—
এবং এখন যেহেতু এই দরজাটাও বন্ধ…
দরজার ঠিক অপর পাশে শব্দ থেমে গেল, দরজার নিচ দিয়ে আসা আলো ছেদ পড়েছে দুই জায়গায়। লোকটার দুই পা।
লোকটা কীভাবে বুঝল কোথায় থামতে হবে?
শিট! কাদামাখা পায়ের ছাপ।
একটা পায়ের ছায়া হঠাৎ হারিয়ে গেল, আর করিডোরের কাঠের মেঝে কঁকিয়ে উঠল পায়ের চাপে। ইথান পিছিয়ে এল, ডান দিক ঘুরে ঢুকে গেল ছোট্ট একটা রান্নাঘরে। তারপর কাঠ ফাটার শব্দ।
চেইন ছিঁড়ে গেল। করিডোরের আলো ছড়িয়ে পড়ল অন্ধকার ঘরে। হলুদ পঞ্চো লোকটা লাথি মেরে দরজা ভেঙে ফেলেছে।
ফ্রিজের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল ইথান। লোকটার ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে কার্পেটের ওপর। শান্ত পায়ে দ্বোরগোড়া ছেড়ে ছোট্ট হলওয়ে পেরিয়ে এগিয়ে আসছে লিভিং এরিয়ার দিকে।
রান্নাঘরের কয়েক ফুট বাকি থাকতেই থেমে গেল সে। তার পঞ্চো থেকে টপটপ করে জল পড়ছে, ভারী শ্বাস টানছে সে। আর নিজের নিশ্বাসের আওয়াজ যথাসাধ্য চেপে রাখার চেষ্টা করছে ইথান।
একটা মৃদু ক্লিক, তারপর একটা আলোক রশ্মি ঝলসে উঠল লিভিং এরিয়ায়। ঘরের দেয়াল বেয়ে চলল ধীরে ধীরে। বুকশেলফ, পর্দা টানা দুটো বিশাল জানালা…
বাইরে মেইন রোডের আওয়াজ ক্রমাগত বাড়ছে।
আলোটা চলে গেল এক সেট চামড়ার সোফায়, সেখান থেকে কফি টেবিলের ওপর। সেখানে একটা মগ রাখা, নিচে কোস্টার। ধোঁয়া উঠছে মগ থেকে… ঘরজুড়ে ছড়িয়ে গেছে ক্যামোমাইল চায়ের মিষ্টি ঘ্রাণ।
আলো এবার গিয়ে পড়ল একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবিতে। শরতের রঙে জ্বলজ্বল করা অ্যাসপেন বনের ছবি, পেছনে তুষার ঢাকা পাহাড়, আর মাথার ওপর নীল অক্টোবরের আকাশ।
টর্চের আলো এবার রান্নাঘরে চলে এল। চুলা, আলমারি, কফিমেকার পেরিয়ে চকচক করা সিঙ্কে ঝলকে উঠল আলো। ক্রমেই ইথানের দিকে এগিয়ে আসছে আলোটা। সে মাথা নিচু করে হামাগুড়ি দিল লিনোলিয়ামের মেঝেতে, গিয়ে বসল সিঙ্ক আর কিচেন আইল্যান্ডের মাঝের অন্ধকারে।
লোকটা এবার এগিয়ে এল, আলো গিয়ে পড়ল ফ্রিজের গায়ে, যেখানে পাঁচ সেকেন্ড আগেই দাঁড়িয়ে ছিল ইথান। পায়ের শব্দ পেরিয়ে গেল তাকে।
স্টোভের ওপরে মাইক্রোওভেনের চকচকে দরজায় প্রতিফলিত হলো হলুদ পঞ্চো পরা লোকটার ছায়া। সে এখন লিভিং রুমে, তাকিয়ে আছে উত্তরের দেয়ালের দরজার দিকে। একটা বেডরুমের দরজা ওটা। এই মুহূর্তে খোলা।
ইথান আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল, বাইরে জনতার আওয়াজ ঢেকে দিল তার হাঁটুর কটমট শব্দ। লোকটা এখন তার দিকে পিঠ দিয়ে আছে, সতর্ক পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে বেডরুমের দরজার দিকে।
ইথান নিঃশব্দে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো, কফি টেবিল পর্যন্ত পৌঁছে থামল। হলুদ পঞ্চো এখন বেডরুমের দরজায়। ইথানের বারো ফুট দূরে, টর্চের আলো ফেলছে ঘরের ভেতর।
মাচেতের ডাক্টটেপ মোড়া হাতল শক্ত করে চেপে ধরল ইথান, তারপর বুড়ো আঙুল দিয়ে ধারালো ফলা স্পর্শ করল। আরও ধারালো হতে পারত, আরও অনেক অনেক ধারালো। এখন তাকে গায়ের জোরে চালাতে হবে।
যা। ঝাঁপিয়ে পড়। এখনই, যতক্ষণ পর্যন্ত এলিমেন্ট অব সারপ্রাইজ তোর ফেভারে আছে।
কিন্তু সে থেমে গেল। ইথান জানে মৃত্যু কী, কষ্ট কী। কিন্তু সেসবের বেশিরভাগই দেখেছে ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের ককপিটে বসে। লেজার গাইডেড হেলফায়ার ছুড়ে দুই মাইল দূরের টার্গেটকে উড়িয়ে দেয়া আর এভাবে মাচেতে হাতে একজন সিভিলিয়ানকে হত্যা করা পুরোপুরি ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
একটা স্রেফ ভিডিও গেমের চেয়ে কয়েক ধাপ বেশি। আর অন্যটা—
লোকটা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল, মুখোমুখি হলো ইথানের। দু’জনেরই নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল।
“তুমি এটা কেন করছ?” ইথান জিজ্ঞেস করল।
কোনো উত্তর নেই। লোকটার চেহারা এখন মোটেই দেখা যাচ্ছে না, শুধু ছায়া। ডান হাতে ধরা ছুরির আভাস, আর টর্চটা মেঝের দিকে নামানো।
ইথান আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনই আলোটা হঠাৎ তার মুখের দিকে উঠল। চোখ ঝলসে গেল তার। তারপর একটা ধাতব শব্দ—কিছু একটা মেঝেতে পড়ল—আর ঘরটা আবার ডুবে গেল অন্ধকারে।
রেটিনায় আলোর ঝলকের কারণে কিছু দেখতে পাচ্ছে না ইথান। চোখ ঝাপসা, অন্ধের মতো দাঁড়িয়ে আছে ধূসর অন্ধকারে। ভারী পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে, কার্পেটের নিচে কাঠ ক্যাঁচক্যাঁচ করে উঠছে, সাথে যোগ হয়েছে তার জিন্সের ঘর্ষণের আওয়াজ।
ইথান পিছিয়ে গেল, ধীরে হলেও দৃষ্টি ফিরে আসছে। আবছা আবছা দেখতে পেল, হলুদ পঞ্চো আর মাত্র তিন ফুট দূরে, হাতের কসাই ছুরিটা উপরে তুলে ধরেছে, এখনই নামিয়ে আনবে ইথানের উপর।
ইথান আড়াআড়ি মাচেতে চালাল—বিদ্যুতের মতো তীব্র এক আঘাত। কিন্তু তার ফলা কিছুতে আটকাল না। ঘূর্ণিতে নিজের ভারসাম্য হারাল সে। মিস করেছি! আমি শেষ।
লোকটা তাকে পেরিয়ে গেল। টলতে টলতে রান্নাঘরের আইল্যান্ডে গিয়ে ঠেকল।
ইথান ভারসাম্য ফিরে পেল, আবার শক্ত করে ধরল মাচেতের হাতল। তারপর তাকিয়ে দেখল ফলার মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। রান্নাঘরের দিকে ফিরে তাকাল সে।
ছুরি ফেলে দিয়েছে লোকটা, মুখ ইথানের দিকে ফেরানো, হেলান দিয়ে আছে কিচেন আইল্যান্ডে। দুই হাত দিয়ে গলার বাঁ পাশ চেপে ধরেছে, হিসহিস শব্দ বেরোচ্ছে সেখান থেকে, যেন টায়ারের হাওয়া বেরোচ্ছে।
ইথান পেছাতে পেছাতে শোবার ঘরের দরজায় চলে গেল, বসে টর্চটা তুলল মেঝে থেকে। হলুদ পঞ্চোর উপর আলো ফেলল সে। রক্তের পরিমাণ হতভম্ব করে দিল তাকে। প্লাস্টিকের জ্যাকেটে লাল জালের মতো ছিটকে পড়েছে রক্ত। প্রতি মিনিটে সেই জাল বড় হচ্ছে, যেন কোনো ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেহজুড়ে।
মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত, তার চারপাশে জমে গেছে অনেকখানি। কাঁধ আর ঘাড়ের সংযোগস্থল থেকে রক্ত আসছে, প্রায় ছয় ইঞ্চি লম্বা একটা কাটা। ক্ষতর এক প্রান্ত থেকে খুব সূক্ষ্ম স্প্রেতে ছিটকে বেরোচ্ছে, অন্য প্রান্তে হৃৎস্পন্দনের সাথে লাল ধারা গড়িয়ে নামছে। ক্রমাগত দুর্বল হয়ে আসছে স্পন্দন, হৃৎপিণ্ড থেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
লোকটার মুখ কাগজের মতো ফ্যাকাশে, চোখ স্থির, ভাবলেশহীন, শুধু নিস্তেজ পলক ফেলছে, যেন হারিয়ে গেছে কোনো দিবাস্বপ্নে। অবশেষে পিছলে পড়ল সে। আইল্যান্ড থেকে পাশের বার স্টুলের ওপর, তারপর মেঝেতে।
***
শোবার ঘরের আলমারি থেকে একটা জিন্স, লম্বা হাতার টি-শার্ট আর কালো হুডি নিয়ে গায়ে চড়াল ইথান। টি-শার্ট আর জিন্স দুটোই গায়ে ছোট হলো, কিন্তু মানিয়ে নেওয়া গেল কোনোভাবে।
ইথান এক জোড়া টেনিস শু পেল ক্লজেটে। মাপের চেয়ে ছোট কাপড় পরা এক কথা, জুতো পরা পুরো ভিন্ন কথা। জুতো জোড়া পায়ে ঢোকানো গেল বটে, এমনকি ফিতাও বাধা গেল, কিন্তু এই জিনিস পরে হাঁটা মানেই যন্ত্রণা, কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফোসকা পড়বে নিশ্চিত।
মৃত লোকটার বুট জোড়া দেখে ইথানের চোখ চকচক করে উঠল। খুলে নিয়ে নিজের পায়ে দিল সে। সাইজে বড় হলো। কয়েক পরত মোজা চড়িয়ে আবার পায়ে দিল সেটা। এবার বেশ ফিট হলো।
অনেকদিন পর কাপড় পরার অনুভূতিটা ভালো লাগল তার। তার চেয়েও ভালো লাগল ঠাণ্ডা বৃষ্টির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে। ঘরের ভেতরটা বেশ উষ্ণ। এখানে আরও আধা-ঘণ্টা কাটিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে তার। ক্ষতগুলোর যত্ন নেয়া দরকার, যতটুকু সম্ভব। কিন্তু সময় নেই। কোনো বড় দল এসে যদি এই ফ্লোর খুঁজতে শুরু করে, পালানোর পথ থাকবে না আর।
ইথান টর্চটা হাতে নিল, মাচেতেটাও। তারপর সিঙ্কের কাছে গিয়ে মুখ লাগিয়ে দিল কলের নিচে। পুরো এক মিনিট ধরে পানি খেল। তৃষ্ণায় পাগল হয়ে যাচ্ছিল সে, তবু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল যাতে অতিরিক্ত না হয়।
ফ্রিজটা খুলতেই থমকে গেল। ভেতরে কাঁচের বোতলে দুধ, টাটকা সবজি, ডিমের কার্টন, আর কসাইয়ের কাগজে মোড়ানো মাংস। কিন্তু একটাও প্যাকেটজাত খাবার নেই।
অদ্ভুত।
সে একটা গাজরের ব্যাগ আর ছোট একটা পাউরুটির প্যাকেট বের করে জিন্সের সাইড পকেটে গুঁজে নিল। ঠিক তখনই হই-হুল্লোড়ের আওয়াজ পেয়ে থমকে গেল ইথান। দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু আওয়াজ বাইরে থেকে আসছে। সম্ভবত অনেক লোক জমা হয়েছে মেইন রোডে।
ইথান দৌড়ে জানালার কাছে চলে গেল, পর্দার এক কোণা সামান্য সরিয়ে তাকাল বাইরে। মাত্র বিশ ফুট নিচে রাস্তা। ভয়াবহ উন্মাদনা চলছে সেখানে।
বৃষ্টি সত্ত্বেও রাস্তার মাঝখানে জ্বালানো হয়েছে এক বিশাল আগুন। পাইনের ডাল, জ্বালানি কাঠের টুকরো পেয়ে আগুন উঁচু হচ্ছে ক্রমেই। আগুনের লালচে আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশের ভবনগুলো গাঁয়ে। দুই লোক মিলে একটা কাঠের বেঞ্চ বয়ে এনে ছুঁড়ে দিল আগুনে। আর সেটা দেখেই ভেজা জনতা আরেক দফা উল্লাসে চিৎকার করে উঠল।
যত বড় আগুন, তত ঘন জনসমাগম।
এই মুহূর্তের আগ পর্যন্ত শহরে যত মানুষ সে দেখেছিল, এদের চেহারা, অঙ্গভঙ্গি কিংবা আচরণ একদমই তাদের মতো না। প্রায় সবার পরনে অদ্ভুত কস্টিউম। মহিলাদের হাত আর গলায় নকল, জাঁকাল গয়না। পুঁতির মালা, মুক্তোর হার, এমনকি টিয়ারা পর্যন্ত। চেহারায় ঝিলমিল গ্লিটার, ভারি মেকআপ, চোখে মোটা আইলাইনার। বৃষ্টির মধ্যেও তারা যেভাবে অল্প পোশাকে উন্মত্ত উল্লাসে মাতোয়ারা, তাতে মনে হচ্ছে যেন রূপোপজীবিনীদের উৎসব চলছে রাস্তায়।
পুরুষরাও কম নয়।
একজনের গায়ে ব্লেজার, কিন্তু প্যান্ট নেই।
আরেকজনের পরনে কালো ট্রাউজার, লাল সাসপেন্ডার, কিন্তু শার্ট নেই, আর মাথায় সান্তা ক্লজের টুপি। সে একটা বেসবল ব্যাট তাক করে রেখেছে আকাশের দিকে। অস্ত্রটা ধবধবে সাদা, আর সেটার গায়ে কীসব দৈত্য-দানোর আঁকিবুকি। ইথান অবশ্য তার জায়গা থেকে খুব একটা ভালো বুঝতে পারছে না ওগুলো কীসের ছবি।
রাস্তার আইল্যান্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশালদেহী লোক। তার কাঁধ, মাথা অন্য সবার চেয়ে উঁচুতে বলে ইথানে দৃষ্টি চলে গেল সেদিকে। বাদামী ভালুকের লোম দিয়ে বানানো পোশাক গায়ে, তাতেই পিন দিয়ে আটকে রেখেছে তামার ব্যাজটা। মাথায় ধাতব হেলমেট, তাতে হরিণের মতো দুটো শিং। মুখে উৎকট যুদ্ধরঙ, এক কাঁধে ঝুলছে শটগান, আরেক কাঁধে খাপবন্দি তলোয়ার।
পোপ।
ভয়াল লোকটা জনতাকে এমনভাবে দেখছে যেন ওরা তার প্রজা। আগুনের প্রতিফলনে চোখদুটো যেন ইটের ভাঁটার মতো জ্বলছে। সে যদি হঠাৎ উপরে তাকায়, এই আগুনের আলোয় জানালার ফাঁকে ইথানকে না দেখার কোনো কারণ নেই। ইথান জানে তার সরে যাওয়া উচিত, কিন্তু সে নড়তে পারছে না, চোখ সরাতে পারছে না।
ইথানের দৃষ্টিসীমার বাইরে, জনতার একটা অংশ হইহই করে উঠল। সেদিকে মুখ ফেরাল পোপ। একটা প্রশস্ত, বিকৃত হাসি ছড়িয়ে গেল তার মুখে। ভালুকের চামড়ার কোটের ভেতরের পকেট থেকে সে একটা স্বচ্ছ, লেবেলহীন বোতল বের করল, তাতে বাদামি তরল। সেটা মাথার ওপরে তুলে কিছু একটা বলল সে, আর সঙ্গে সঙ্গে জনতা উন্মাদনার চূড়ায় উঠল। শুরু হলো উপরের দিকে হাত তুলে গগনবিদারী চিৎকার।
পোপ চুমুক দিল বোতলে, আর জনতা দুই পাশে সরে করিডোর তৈরি করে দিল মাঝখানে। সবাই গলা বাড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে, দেখতে চাইছে এখন কী হবে।
তিনজন মানুষ এগিয়ে আসছে করিডোর ধরে। তাদের দুইপাশে দুজন পুরুষ। পরনে গাঢ় পোশাকে, কাঁধে স্ট্র্যাপ থেকে ঝুলছে মাচেতে। মাঝখানে ধরে রেখেছে আরেকজনকে।
বেভারলি।
ইথানের ভেতরে কিছু একটা ভেঙে পড়ল। বুকের ভেতর বিস্ফোরিত হলো ক্রোধের আগ্নেয়গিরি।
বেভারলির দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও নেই। রাস্তায় পা ফেলতে পারছে না ঠিকভাবে, দুই পাশের দুজন ধরে টেনে আনছে তাকে। এক চোখ বন্ধ, ফোলা ও রক্তাক্ত। বোধহয় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে। মুখমণ্ডল জুড়ে রক্তের দাগ। কিন্তু জ্ঞান আছে এখনো।
জ্ঞান আছে এবং প্রচণ্ড ভীত। চোখ নিচের দিকে নামানো, যেন মাথা তুলে পৃথিবী দেখার সাহস হারিয়ে ফেলেছে।
আগুন থেকে দশ গজ দূরে এনে ছেড়ে দিল বেভারলিকে। ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দিল সামনে। পোপ কিছু একটা বলল চিৎকার করে, আর বেভারলি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
তার চারপাশের মানুষ পেছনে সরে গেল সাথে সাথে। বিশ ফুট ব্যাসের বৃত্তাকার একটা জায়গা খালি হয়ে গেল। ইথান জানালা থেকেও বেভারলির কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। আহত প্রাণীর মতো কণ্ঠ। করুণ আর মরিয়া।
ভিড়ের ভেতর ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গেল। সবাই বৃত্তের পরিধিতে পৌঁছাতে চায়, দেখতে চায় আরও কাছ থেকে। পোপ বোতলটা কোটের ভেতরে গুঁজে রেখে শটগানটা ধরল। এক ঝটকায় পাম্প করে তাক করল আকাশের দিকে। গুলি ছুড়ল।
কাচ। রাস্তার বিল্ডিংগুলোর গায়ে প্রতিধ্বনিত হলো শব্দ, কাঁপিয়ে দিল সব জানালা। জনতা একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ নড়ল না। শুধু বৃষ্টির শব্দ।
বেভারলি হাঁচড়েপাঁচড়ে উঠে দাঁড়াল, রক্ত মুছল মুখের। এমনকি তৃতীয় তলার জানালা থেকেও ইথান বুঝতে পারছে যে আতঙ্কে বেভারলির পুরো শরীর কাঁপছে। কারণ মেয়েটা সম্ভবত জানে তার ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে। বৃষ্টিতে ভিজছে সে। শরীরের ভরের বেশিরভাগ অংশ বাম পায়ে। ডান পা ফেলতে পারছে না পুরোপুরি। তাকে ঘিরে থাকা চেহারাগুলো দেখছে ধীরে ধীরে। কিছু একটা বলছে সে। ইথান শব্দগুলো বুঝতে পারছে না, তবে কাতর অনুনয়ের সুরটা ঠিকই বুঝতে পারছে।
জীবন ভিক্ষা চাইছে সে। বৃষ্টি, অশ্রু, রক্ত, সব একসঙ্গে মিশে গেছে তার মুখে।
একটা পূর্ণ মিনিট কেটে গেল।
কেউ একজন ভিড় ভেদ করে বৃত্তের প্রান্তে চলে এলো। উন্মাদ চিৎকার উঠল জনতার মধ্যে। সাথে তুমুল হাততালি। সেই শার্টহীন, লাল সাসপেন্ডার, আর সান্তা টুপি পরা লোকটা। প্রথমে বৃত্তের কিনারে দাঁড়াল সে, যেন রিং-এর কর্নারে দাঁড়িয়ে থাকা এক বক্সার, ঘণ্টা পড়ার আগ মুহূর্তে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ একজন একটা বোতল ধরিয়ে দিল তাকে। পেছন হেলে পড়ে দীর্ঘ এক চুমুক দিল বুভুক্ষের মতো। তারপর ব্যাটটা শক্ত করে ধরল, পা টেনে ঢুকে পড়ল বৃত্তের মধ্যে।
বেভারলির দিকে। চক্কর কাটল তাকে ঘিরে।
বেভারলি পিছিয়ে গেল, ভিড়ের কিনারে চলে এলো প্রায়। কেউ একজন তাকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দিল সামনে, লোকটার দিকে। সরাসরি।
ব্যাটওয়ালা ইথান দেখতে পেল না। বেভারলিও না। খুব দ্রুত ঘটে গেল, যেন লোকটা শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যাট চালাল সে। নিখুঁত গতি আর ভঙ্গিতে।
খুলির সাথে ম্যাপল ব্যাটের সংঘর্ষের আওয়াজে আপনাতেই চোখ বন্ধ হয়ে গেল ইথানের। জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ল।
আবার যখন চোখ খুলল, বেভারলি রাস্তায় পড়ে আছে। চার হাত-পায়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে লোকটার নাগাল থেকে। ইথান টের পেল তার ভেতর থেকে বমি উঠে আসতে চাইছে।
মানুষটা ব্যাটটা ফেলে ফিরে গেল ভিড়ের মধ্যে। ব্যাটটা রাস্তায় গড়িয়ে গেল বেভারলির দিকে। বেভারলি হাত বাড়াল, মাত্র কয়েক ইঞ্চি ব্যবধান। এক নারী ঢুকল বৃত্তের মধ্যে। পরনে কালো বিকিনি, কালো হিলস, কালো মুকুট, আর পেছনে কালো পরির ডানা। গর্বিত ভঙ্গিতে দুই হাত উঁচু করে কোমর সামান্য দোলাল সে। জনতা আরও একবার ফেটে পড়ল উল্লসিত হুংকারে।
বেভারলির পাশে গিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে বসল সে। দেঁতো হাসি দিয়ে অস্ত্রটা তুলে নিল। দুই হাত দিয়ে ধরে মাথার উপর তুলল যেন ওটা কোনো রাক্ষসী রাণীর যুদ্ধ কুঠার।
না, না, না।
দেহের সমস্ত রাগ আর বিদ্বেষ দিয়ে সেটা নামিয়ে আনল বেভারলির পিঠের ঠিক মাঝখানে। রাস্তা ভরে গেল আনন্দঘন চিৎকারে। ওদিকে বেভারলি তখন যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
ইথানের মনে হল সে যদি এখন মাটি থেকে দুইশ ফিট উপরে ব্ল্যাক হক নিয়ে উড়তে পারত, তাহলে প্রতি মিনিটে দুই হাজার রাউন্ড উদগিরণ করা জিএইউ-১৯ গ্যাটলিং গান দিয়ে নিচের সব মাদারচোতকে টুকরো টুকরো করে দিত।
ইথান জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। কফি টেবিলটা দু’হাতে ধরে ছুড়ে মারল দেয়াল বরাবর। কাঠ ভাঙল, কাচ চুরমার হলো, কিন্তু তাতে তার রাগ শুধু বাড়লই। মাথার ভেতর একটা কণ্ঠ চিৎকার করে যাচ্ছে, ‘খুন করে ফেল সব হারামজাদাকে’। ইচ্ছে করছে এখনই নিচে গিয়ে মাচেতে হাতে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হ্যাঁ, এতো লোকের সাথে ও একা পারবে না, কিন্তু মরার আগে অনেকগুলোকে মেরে তো মরতে পারবে।
কিন্তু তারপর তুই মরবি।
আর কোনোদিন তোর পরিবারকে দেখতে পাবি না।
কোনোদিন জানতে পারবি না এখানে আসলে কী হচ্ছে।
ইথান জানালার কাছে ফিরে গেল।
বেভারলি নিশ্চল পড়ে আছে রাস্তায়। রক্তের পুকুর জমে গেছে মাথার চারপাশে।
চক্রটা ভেঙে তাকে ঘিরে ফেলল সবাই। তারপর হঠাৎ করেই একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর।
ইথানের মনে হলো এখন চলে যাওয়া মানে বেভারলির সাথে প্রতারণা করা, অথচ জানালা থেকে ওর এই অবস্থা সচক্ষে দেখাও সম্ভব না। কিন্তু আর কী-ই বা করতে পারে সে; পাঁচশো মানুষের বিরুদ্ধে সে একা।
ওর জন্য আর কিছুই করতে পারবি না তুই। ও শেষ। এখন তুই নিজে শেষ হওয়ার আগে পালা।
ইথান দরজার দিকে ছুটল, বেভারলি তখন রাস্তায় চিৎকার করছে, যন্ত্রণা, একাকীত্ব আর অসহায়ত্বের চিৎকার। ইথানের চোখে জল চলে এলো।
শান্ত হ।
এই দরজার বাইরে কেউ তোর অপেক্ষায় থাকতে পারে।
সতর্ক থাকতে হবে।
ইথান করিডোরে বেরিয়ে এল।
ফাঁকা।
সে অ্যাপার্টমেন্টের দরজা বন্ধ করল। মেইন রোডের কোলাহল চাপা পড়ে গেল দরজার ক্যাঁচক্যাঁচে।
চোখ মুছে যে পথে এসেছিল সেই পথে ফিরে চলল। করিডোর ধরে এগিয়ে দরজা খুলে সিঁড়িতে চলে এলো। তৃতীয় তলার ল্যান্ডিংয়ে এসে ইতস্তত করল সে। কান পাতল, রেলিঙের ওপর দিয়ে উঁকি দিল নিচে।
কোনো শব্দ নেই। কোনো নড়াচড়া নেই। অস্বস্তিকর নীরবতা।
সে নামতে শুরু করল। নিচ তলায় নেমে, দরজাটা সামান্য ফাঁকা করল যেন কোনোমতে বের হওয়া যায়। ভেতরের এক চিলতে আলো ছড়িয়ে পড়ল অন্ধকার গলিতে। ভেজা রাস্তায় পা রাখল সে। দরজা টেনে বন্ধ করে দিল নিঃশব্দে। বৃষ্টি বেড়েছে আগের চেয়ে। ত্রিশ সেকেন্ড অপেক্ষা করে চোখকে অন্ধকারে অভ্যস্ত হতে দিল। তারপর মাথায় হুড টেনে হাঁটতে শুরু করল দক্ষিণ দিকে। দূরে একটা স্ট্রিটল্যাম্পের আলো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু গলির ভেতর এতো অন্ধকার যে ইথান নিজের পা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে না।
মেইন রোড থেকে বিশাল চিৎকার ভেসে এলো। এটাই বোধহয় সবচেয়ে জোরে ছিল। বেভারলির কথা ভেবে আপনাতেই গতি শ্লথ হয়ে এলো তার। দাঁত চেপে বসল দাঁতে, মাচেতের হাতলে আরও শক্ত হলো মুঠি। জোর করে মেয়েটার ভাবনা মাথা থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করল সে, নয়তো এগোতে পারবে না।
হঠাৎ পায়ের শব্দে থমকে দিল তাকে। সামনে থেকে আসছে। মেইন রোডের ত্রিশ ফুট আগে দাঁড়িয়ে রইলো ইথান, ছায়ায় গা ঢাকা দিয়ে। এখানে হুট করে কেউ দেখতে পাবে না তাকে। মেইন রোড থেকে গলির দিকে ঘুরল একটা লোক। গায়ে গাঢ় রঙের রেইনকোট; পশ্চিমে মেইন রোডের দিকে যাচ্ছে। স্ট্রিটলাইটের নিচে থামল সে। তাকিয়ে রইল গলির ভেতর। তার এক হাতে একটা ছোট কুঠার আর অন্য হাতে একটা টর্চলাইট। ইথান তার রেইনকোটে বৃষ্টির টিপটিপ শব্দ শুনতে পাচ্ছে। লোকটা ঢুকে পড়ল গলিতে। টর্চ জ্বেলে ইথানের মুখে আলো ফেলল সে।
“কে ওখানে?”
ঠাণ্ডায় ইথানের মুখ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে।
“আমি,” ইথান বলল, এগোতে শুরু করল লোকটার দিকে। “দেখেছ ওকে?”
“আমি কে?”
আলোটা তখনো ইথানের মুখে, এবং সে আশা করছে লোকটা তার হাসি দেখতে পাচ্ছে, বুঝতে পাচ্ছে কী ভয়ংকর উন্মাদনা এগিয়ে আসছে তার দিকে। ইথান আরও এগিয়ে গেল। ইথানের চেহারায় ক্ষত, কাটাছেঁড়া, আর সেলাই দেখে মাত্র তার চোখ বিস্ফোরিত হলো। কুঠার উঁচু করল সে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া দেখাতে আধা সেকেন্ড দেরি করে ফেলেছে।
ইথান এক হাতে আড়াআড়ি মাচেতে চালাল, এতো জোরে যে বুক বরাবর অনেকখানি ফাঁক হয়ে গেল। তার পা ভাঁজ হয়ে গেল, হাঁটু লেগে গেল মাটিতে, আরও তিনটা বিধ্বংসী কোপে ইথান তাকে শেষ করে দিল।
রক্তে অ্যাড্রেনালিনের প্রবল জোয়ার নিয়ে দৌড়াতে শুরু করল সে। ইথান গলি থেকে বের হয়ে সেভেন্থ স্ট্রিট পার হল। ডানে, দুই ব্লক দূরে আধডজন আলোর বিন্দু, এগিয়ে যাচ্ছে শহরের কেন্দ্রের দিকে। বামে, মেইন রোডের গোটা পঞ্চাশেক মানুষের টর্চ দেখা যাচ্ছে।
ইথান গতি বাড়িয়ে পরের গলিতে ঢুকে পড়ল। সামনে কোনো আলো নেই, কিন্তু নিজের হাঁপানোর আওয়াজ ছাড়িয়ে পেছন থেকে মানুষের পায়ের আওয়াজ আসছে। পেছনে তাকাল সে। অনেকগুলো আলো ঢুকে পড়েছে গলির ভেতর, সাথে যোগ হয়েছে চিৎকার।
সামনে এইটথ স্ট্রিট দ্রুত এগিয়ে আসছে। দিক বদলানোর প্রয়োজন, সে সম্ভাব্য পথগুলো হিসাব করতে শুরু করে দিয়েছে, কিন্তু সামনে কী আছে না দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। ইথান এইটথ স্ট্রিটে চলে এলো।
বামে, কেউ নেই। ডানে, দুই ব্লক দূরে মাত্র একটা আলো।
ইথান ডানদিকে বাঁক নিল, তীব্র গতিতে রাস্তা পার হয়ে অপর পাশে চলে গেল। লাফ দিয়ে উঠে পড়ল ফুটপাতে। কংক্রিটের একটা উঁচু অংশে পা আটকে আরেকটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল সে। কোনো মতে ভারসাম্য ধরে রাখল। আরও বিশ গজ পার করে পরের ব্লকে পৌঁছাল ইথান। মোড় নেওয়ার আগে দুই সেকেন্ড পেছন ফিরে দেখল, ধাওয়াকারী দলটা তখনও গলির মুখ থেকে বের হয়নি। ভাগ্য ভালো হলে তাকে দেখতে পায়নি ওরা। সে কর্নার ঘুরে ছুটল।
সামনে আশীর্বাদময় অন্ধকার। ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলল সে, পাইনগাছের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে। পরের রাস্তাও ফাঁকা পাওয়া গেল, এক ঝলক পেছনে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো শুধু অল্প কয়েকটা আলো আছে। এখনও অন্তত বিশ সেকেন্ড পিছিয়ে ওরা। ইথান আরও এক ব্লক পশ্চিমে এগোল, তারপর ছুটল দক্ষিণে।
রাস্তা শেষ। শহরের প্রান্তে এসে পড়েছে সে। রাস্তার মাঝখানে থমকে দাঁড়াল সে, ঝুঁকে হাঁফাতে লাগল হাঁটুতে হাত রেখে। মানুষ আসছে। পেছন থেকে, আবার পশ্চিম থেকেও। সে চাইলে দুই ব্লক ঘুরে মেইন রোডে ফিরে যেতে পারে, কিন্তু সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
দাঁড়িয়ে থাকিস না, গাধা। দূরত্বের সুবিধাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সামনে একটা ভিক্টোরিয়ান ম্যানশন, যার পেছনেই ঘন বনজঙ্গল। হ্যাঁ, ওতেই কাজ হবে। পায়ের ক্লান্তি উপেক্ষা করে ছুটল সে। রাস্তা পেরিয়ে, বাড়িটার পাশ দিয়ে। পাইনের সারিতে ঢোকার মাত্র তিন পা বাকি, হঠাৎ একটা শিশু কণ্ঠ চিৎকার করে উঠল, “ও বনে ঢুকছে!”
ইথান পেছনে তাকাল। বিশ বা ত্রিশজন লোক ম্যানশনের কোণ ঘুরে বেরিয়ে আসছে, টর্চের আলো ঝলমল করছে, সবাই একসঙ্গে দৌড়াচ্ছে তার দিকে। এক মুহূর্তের জন্য ইথানের মনে হল ওদের শরীরের অনুপাত স্বাভাবিক নয়। পা খুব ছোট, মাথা বড়, টর্চগুলোও মাটির কাছাকাছি ধরা।
বাচ্চা। ওরা সবাই বাচ্চা।
ইথান বনে ঢুকে গেল, ভেজা পাইনের তিক্ত-মিষ্টি বাতাস টানল বুক ভরে। শহরের ভেতরেই অন্ধকার ছিল, বনের ভেতরে তো একেবারেই কিছু দেখা যাচ্ছে না। সে বাধ্য হয়ে টর্চ জ্বালাল, কাঁপা কাঁপা আলোতে ওক গাছের ফাঁক দিয়ে আর পচা গুঁড়ি পেরিয়ে এগিয়ে চলল। নিচু ডালাপালা আর পাতা একটু পরপর এসে লাগছে মুখে।
বাচ্চাগুলো এখনো লেগে আছে পেছনে। ভেজা পাতার খসখস আর পায়ের চাপে শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ ফাঁস করে দিচ্ছে ওদের অবস্থান। ইথানের মোটামুটি ধারণা আছে কোনদিকে নদী থাকার কথা। ডান দিক ধরে এগোতে থাকলে নদী পেয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে দিকভ্রান্ত মনে হতে লাগল তার, মস্তিষ্কের দিক বোঝার ক্ষমতা যেন হারিয়ে গেছে।
এক মেয়ে চিৎকার করল, “আমি ওকে দেখতে পাচ্ছি!”
ইথান শুধু একবার মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল, কিন্তু টাইমিংটা হলো ভয়ানক খারাপ। শুকনো ডাল আর শেকড়ে পা আটকে ছিটকে পড়ল মাটিতে। টর্চ আর মাচেতে দুটোই হাতছাড়া হয়ে গেল।
চারপাশে পায়ের শব্দ। এগিয়ে আসছে সব দিক থেকে। ইথান উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করল, কিন্তু একটা লতা তার ডান পা জড়িয়ে ধরেছে, সেটা ছাড়াতে পাঁচ সেকেন্ড লেগে গেল। পড়ার সময় টর্চটা নিভে গেছে, এখন সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। না টর্চ, না মাচেতে, না অন্য কিছু। আশেপাশে হাত চালিয়ে খুঁজল জিনিস দুটো, কিন্তু শুধু ভেজা শেকড় আর জটপাকানো লতাপাতা ঠেকল হাতে।
উঠে দাঁড়াল সে, অন্ধকারে হোঁচট খেতে খেতে ডাল-পাতা ভেদ করে এগিয়ে চলল। চারপাশের আলো আর কণ্ঠগুলো ক্রমশ তার দিকে এগিয়ে আসছে। টর্চ ছাড়া সে প্রায় অন্ধ আর অসহায়। ইথান হাত দুটো সামনে মেলে আস্তে আস্তে দৌড়াতে শুরু করল, গাছের সাথে ধাক্কা না খাওয়ার একমাত্র উপায় এটাই। মাঝেমধ্যেই টর্চের আলো ছুটে যাচ্ছে এদিক-ওদিক, ক্ষণিকের জন্য দেখা যাচ্ছে সামনের দৃশ্য—ভয়ানক ঘন এক পাইন বন, আর পথ রোধ করে রাখা ঝোপঝাড়।
বাচ্চাদের—নিষ্পাপ অথচ পাগলাটে, উচ্ছ্বসিত অথচ শয়তানি মেশানো—হাসি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বনজুড়ে, যেন তার শৈশবের কোনো দুঃস্বপ্ন বাস্তব হয়ে তাড়া করছে তাকে।
ইথান হোঁচট খেয়ে একটা খোলা জায়গায় এসে পড়ল। সম্ভবত মাঠ বা তৃণভূমি জাতীয় কিছু হবে, যদিও কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু বৃষ্টির ফোঁটা এখন আগের চেয়ে অনেক জোরে আঘাত করছে শরীরে, যেন ঘন বনের ছাউনি থেকে বেরিয়ে খোলা আকাশের নিচে চলে এসেছে সে। সামনে কোথাও নদীর আওয়াজ শোনা গেল মনে হয়, কিন্তু পিছনের কারো হাঁপানোর শব্দে সেটা হারিয়ে গেল মুহূর্তেই।
হঠাৎ পিঠে একটা আঘাত লাগল। খুব জোরে নয়, কিন্তু ভারসাম্য নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
তারপর আরেকটা আঘাত।
আরেকটা…
আরেকটা…
আরেকটা…
তারপর আরেকটা। ইথান হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল, কাদায় ডুবে গেল মুখ, বাচ্চাদের উন্মাদ হাসিতে চাপা পড়ে গেল বাকি সব শব্দ। চারদিক থেকে হামলে পড়েছে ওরা। ঘুষির বৃষ্টি হচ্ছে তার শরীরে, ব্যথা খুব একটা লাগছে না, কিন্তু সংখ্যায় এত বেশি যে নিঃশ্বাস নেওয়াই কঠিন। মাঝে মধ্যে কেটে যাচ্ছে এখানে সেখানে, আবার কখনো ভারি কোনো ভোঁতা বস্তুর আঘাত লাগছে মাথায়। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে যেন সে এক ঝাঁক পিরানহার মাঝে পড়ে গেছে।
কিছু একটা ঢুকে গেল তার পাশে। চিৎকার করে উঠল ইথান। ওরা হেসে উঠল, ব্যঙ্গ করল। আরেকটা খোঁচা। জলোচ্ছ্বাসের মতো ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল সারা শরীরে। রাগে মুখ গরম হয়ে গেল তার। ঝটকা মেরে বাম হাত ছাড়িয়ে নিল কারো মুঠি থেকে, তারপর ডান হাত। দুই তালু মাটিতে রাখল। চাপ দিল উঠে দাঁড়ানোর জন্য। কিছু একটা—সম্ভবত পাথর বা গাছের গুঁড়ি—জোরে আঘাত করল তার মাথার পেছনে, চোয়ালের ভেতর যেন দাঁতের ফিলিং পর্যন্ত কেঁপে উঠল। শক্তি হারাল হাতদুটো, আবার মুখ থুবড়ে পড়ল কাদায়।
আরও হাসি। কেউ একজন চিৎকার করল, “ওর মাথায় মারো!”
কিন্তু এবার সে আবার উঠল, চিৎকার করতে করতে, এমন জোরে যে বাচ্চারা মুহূর্তের জন্য থেমে গেল, এবং সেই এক সেকেন্ডই যথেষ্ট হলো। ইথান নিজের পায়ে ভর রেখে উঠে দাঁড়াল, সামনের প্রথম যে মুখটা দেখতে পেল সেটার দিকেই ঘুষি চালাল। বারো-তেরো বছরের একটা ছেলে। এক আঘাতেই ছেলেটা লুটিয়ে পড়ল।
“পিছিয়ে যাও,” গর্জে উঠল ইথান।
টর্চের আলোয় এবার প্রথমবারের মতো সে স্পষ্ট দেখল তার চারপাশে কী আছে। সাত থেকে পনেরো বছর বয়সী অন্তত দুই ডজন বাচ্চা ঘিরে রেখেছে তাকে, কারো হাতে টর্চ, কারো হাতে লাঠি, পাথর, ছুরি, এমনকি একজনের হাতে একটা ভাঙা মপের দণ্ড, যার মাথার কাঠটা ভেঙে বেরিয়ে আছে ধারালো বর্শার মতো। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন সবাই হ্যালোউইনের পার্টিতে এসেছে। বাবা-মায়ের পুরনো জামাকাপড় জোড়া লাগিয়ে বানানো একদল বেহাল কস্টিউমধারী ছোট্ট পিশাচের দল।
ইথান মনে মনে প্রায় কৃতজ্ঞই বোধ করল যে তার মাচেতেটা হারিয়ে গেছে, না হলে হয়তো সে এই ছোট্ট দানবগুলোকেই টুকরো টুকরোই করে ফেলত। ওদের বৃত্তের বাঁ দিকের এক জায়গায় ঘেরটা একটু দুর্বল। দুইটা বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে ওখানে, যাদের উচ্চতা ইথানের কোমরের সমানও নয়। চাইলেই হয়তো সে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বেরিয়ে যেতে পারত।
কিন্তু তারপর? ওরা ধাওয়া দেবে এবং আহত হরিণের মতো তাকে ক্লান্ত করে মেরে ফেলবে এই বনে। ধীরে ধীরে ঘুরে সে সবচেয়ে বিপজ্জনক দেখতে ছেলেটির চোখে চোখ রাখল। সদ্য কৈশোর পেরোনো এক স্বর্ণকেশী কিশোর, হাতে একটা মোটা টিউব-মোজা, যার ভেতর কিছু ভারি বস্তু—সম্ভবত একটা বেসবল, বা হয়তো শক্ত কাচের বল। ছেলেটার পরনে একটা স্যুট, অন্তত কয়েক সাইজ বড়, হাতার কিনারা ঝুলে পড়েছে আঙুলের ডগা পর্যন্ত চলে এসেছে। নিশ্চয়ই বাবার স্যুট পরে চলে এসেছে বদমাশটা।
ইথান গর্জে উঠল, ডান হাত তুলে ছেলেটার দিকে এগোল, প্রায় আঘাত করেই ফেলত, কিন্তু ছেলেটা পিছিয়ে গেল, পড়ে গেল হোঁচট খেয়ে। তারপর উঠেই ছুট লাগাল বনের দিকে, চিৎকার করে উঠল, “পেয়েছি! এখানে!”
দলনেতাকে পালাতে দেখে অর্ধেক বাচ্চা তার পিছু পিছু পালাল। যেমন নেতা, তেমন অনুসারী। যারা পালাল না, তাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল ইথান, যেন সে একটা রাগী এল্ক, ছত্রভঙ্গ করে দিতে চাচ্ছে ক্ষুধার্ত কায়োটির দলকে। শেষ পর্যন্ত সবাইকে পালাতে দিল সে, শুধু একজন ছাড়া।
যে ছেলেটা পালাতে পারল না, বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল, স্থির চোখে তাকিয়ে রইল ইথানের দিকে। দলের মধ্যে ওর বয়সই বোধহয় সবচেয়ে কম ছিল। সাত-আটের বেশি কোনোভাবেই হবে না। কাউবয়ের সাজ নিয়েছে—লাল-সাদা হ্যাট, বুট, স্ট্রিং টাই, আর ওয়েস্টার্ন ধাঁচের বোতামওয়ালা শার্ট। এক হাতে টর্চ, অন্য হাতে একটা পাথর। ফাঁকা মুখভঙ্গী।
ইথান জিজ্ঞেস করল, “আমাকে ভয় লাগছে না তোমার?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল। বৃষ্টির ফোঁটা ঝরল হ্যাটের কিনারা থেকে। মুখ তুলে ইথানের দিকে তাকাল সে। টর্চের আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট হল। ইথান বুঝল, সে মিথ্যে বলছে। ছেলেটা ভয় পেয়েছে। মারাত্মক ভয় পেয়েছে। নিচের ঠোঁট কাঁপছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। তবু যতটা সাহস দেখানো সম্ভব, সেটাই দেখাচ্ছে সে। আর ইথানের অজান্তেই মনে একটুখানি শ্রদ্ধা জেগে উঠল এই ছোট্ট ছেলেটির প্রতি। কী এমন কারণ, যার জন্য সে এখনো স্থির দাঁড়িয়ে আছে?
ছেলেটা বলল, “আপনার পালানোর চেষ্টা বন্ধ করা উচিত, মিস্টার বার্ক।”
ইথান থমকে গেল। “তুমি আমার নাম জানলে কেমন করে?”
ছেলেটার চোখ শান্ত, গলায় অদ্ভুত নিশ্চয়তা। “আপনার এখানে একটা সুন্দর জীবন হতে পারত, কিন্তু আপনি সেটা দেখার চেষ্টাই করছেন না।”
ইথান ফিসফিস করে বলল, “এটা কী জায়গা?”
“শুধু একটা শহর,” উত্তর দিল ছেলেটা সহজভাবে।
দূর থেকে প্রাপ্তবয়স্কদের গলার আওয়াজ ভেসে এল। পাইনগাছের ফাঁক দিয়ে একঝাঁক টর্চের আলো উঁকি দিল, অন্ধকার আকাশে জ্বলে ওঠা নতুন তারার মতো।
ইথান আবার জিজ্ঞেস করল, “তোমার বাড়ি কোথায়?”
ছেলেটা কপাল কুঁচকাল, বিভ্রান্ত হয়ে। “মানে?”
“ওয়েওয়ার্ড পাইনসের আগে তুমি কোথায় থাকতে?”
ছেলেটা বলল শান্ত গলায়, “আমি তো সবসময় এখানেই থেকেছি।”
“তুমি কখনো এই শহর ছাড়োনি?” ইথান জিজ্ঞেস করল।
“ছাড়া যায় না,” ছেলেটা বলল।
“কেন?”
“যায় না মানে যায় না।”
“আমি সেটা মানি না।”
“এজন্যই আপনাকে মরতে হবে।” হঠাৎ ছেলেটা চিৎকার করে উঠল, “এখানে! তাড়াতাড়ি!”
পাইন গাছের ভেতর থেকে হঠাৎ আরও আলো বেরিয়ে এল, ছড়িয়ে পড়ল মাঠজুড়ে।
ইথান দৌড়াল, ঢুকে পড়ল সামনের জঙ্গলে। মুখ বাঁচানোর চেষ্টা করল না, পিছনেও তাকাল না। শুধু অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলল। সময় আর দিকজ্ঞান গুলিয়ে গেল সব। আতঙ্ক চাপা রাখতে পারছে না কোনোমতেই। মস্তিষ্কের ভেতর একটা কণ্ঠ ক্রমাগত ফিসফিস করে যাচ্ছে। তাকে থেমে যেতে বলছে, ভ্রূণের মতো করে শুয়ে পড়তে বলছে, ভেঙে দিতে চাইছে তার অবশিষ্ট মানসিক শক্তিটুকু। এই ভয়, এই ব্যথা সহ্য হচ্ছে না তার। তাকে ঘিরে যে উন্মাদনা চলছে তার কোনো মানেই খুঁজে পাচ্ছে না সে।
গতি কমাল ইথান, তবে নদীর শব্দে নয়। হঠাৎ বাতাসের সাথে ভেসে আসা একটা মিষ্টি গন্ধে। সামনের জমি হঠাৎ নেমে গেছে ঢালু হয়ে। কাদামাখা ঢাল বেয়ে পিছলে নেমে গেল সে। বরফঠাণ্ডা, তীব্র স্রোতে পা পড়ল তার। নদীর পানি যেন তরল ইস্পাত। ঢুকে যাচ্ছে বুটের ভেতরে।
তবু থামল না। দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে চলল। তীর থেকে দূরে, আরও গভীরে। পানি কোমর পর্যন্ত পৌঁছাল, ইথান খাবি খাচ্ছে, ঠাণ্ডা যেন অন্তরাত্মা পর্যন্ত জমিয়ে দিচ্ছে। প্রবল স্রোত টেনে নিয়ে যেতে চাইছে তাকে। সে খুব ধীরে, সাবধানে পা ফেলছে। তলদেশের নুড়িপাথর গড়িয়ে সরে যাচ্ছে পায়ের নিচ থেকে। প্রতিবার পা ফেলার আগে নিজেকে সামলে নিচ্ছে সে, শরীর হেলিয়ে দিচ্ছে জোয়ারের বিরুদ্ধে।
নদীর মাঝখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পানি বুক পর্যন্ত উঠে এল। স্রোত ভাসিয়ে নিল তাকে। অন্ধকারে কিছু দেখতে পাচ্ছে না সে। জানে না সামনে কোনো ধারাল পাথর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কি না। শুধু জানে অমন কোনো পাথরের সাথে একটা ধাক্কা তাকে মেরে ফেলতে পারে। স্রোত কেটে উল্টোদিকের পাড়ে পৌঁছানোর জন্য জোরে সাঁতার কাটতে লাগল সে। হাত ঠিকই চলছে, কিন্তু ভেজা, ভারি বুটের কারণে পা একদমই চলছে না। ওগুলোর ওজন তাকে ডুবিয়ে দিতে চাইছে বারবার। উন্মাদের মতো হাত-পা চালানোর মিনিট খানেক পর তার মাংসপেশি যখন বিদ্রোহের পথে—টের পেল বুটের তলা নদীর তল স্পর্শ করছে।
দাঁড়িয়ে পড়ল সে। স্রোতের বিপরীতে শরীর হেলিয়ে এগিয়ে চলল এক পা এক পা করে। শীঘ্রই পানি নেমে এলো কোমর পর্যন্ত। আরো ডজন খানেক পায়ের পর সেটা চলে এল হাঁটু পর্যন্ত। বাকিটুকু দৌড়ে পার হল। তারপর ঢলে পড়ল তীরে। চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। হাঁফাচ্ছে সে, ঠাণ্ডায় কাঁপছে, শরীর একদম নিঃশেষ।
নদীর ওপারে তাকাল সে। ঝাঁকে ঝাঁকে টর্চলাইট ছুটোছুটি করছে, সাথে আছে অসংখ্য কণ্ঠের চিৎকার। ইথানের মনে হল কেউ কেউ হয়তো ওর নাম ধরেই ডাকছে, কিন্তু এই দূরত্বে ফেনায়িত স্রোতের বিকট শব্দে কিছুই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। কিন্তু ইথান নড়তে চাইছে, সে জানে তার এখান থেকে সরে যাওয়া দরকার, উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও আর পাচ্ছে না। শুধু আর একটা মিনিট শুয়ে নিঃশ্বাস নেয়া দরকার।
এখন নদীর ওপারে এত আলো জ্বলে উঠেছে যে গুনে শেষ করা যাবে না। সবচেয়ে বেশি আলো জমেছে সে যেখান থেকে নদীতে নেমেছে সেখানটায়। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে আরও টর্চের আলো ছড়িয়ে পড়ছে উত্তরে আর দক্ষিণে, যেসব দিকে সে গিয়ে থাকতে পারে। অন্তত ডজনখানেক স্পটে নদীর স্রোত জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে টর্চের আলো।
ইথান গড়িয়ে উপুড় হলো। বসল হাঁটুতে ভর দিয়ে। হাত দুটো এমন কাঁপছে যেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত। হামাগুড়ি দিতে শুরু করল ভেজা বালু খামচে ধরে। ভেজা শরীরে স্রেফ এক-দুই মিনিট পড়ে ছিল, তাতেই শক্ত হয়ে গেছে জয়েন্টগুলো। একটা বড় পাথরের কাছে পৌঁছে হাত বাড়িয়ে ধরল সেটা, টেনে দাঁড় করাল নিজেকে।
বুটজোড়া পানি ভর্তি হয়ে প্যাচপ্যাচ করছে। নদীর ওপারে শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে ইতোমধ্যে, প্রতি সেকেন্ডে আরও নতুন নতুন আলো এসে যোগ দিচ্ছে তাদের সাথে। বেশি ভাগ আলো মাঝনদী পর্যন্ত আসতে পারছে, তবে কয়েকটা আলো মুষলধারে বৃষ্টি ভেদ করে এপার পর্যন্ত চলে আসছে। ইথান এগোতে শুরু করল। পানি আর আলো থেকে যতটা সম্ভব দূরে সরে যাওয়া দরকার। কিন্তু দশ ফুট যেতেই সামনে পড়ল খাড়া পাথুরে দেয়াল। সে দেয়ালের ধার ঘেঁষে এগিয়ে চলল। কয়েক শ’ মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠের আওয়াজে ঢাকা পড়ে গেছে নদীর গর্জন।
একটা আলো এসে পড়ল তার দশ ফুট সামনের দেওয়ালে। দ্রুত এক বোল্ডারের আড়ালে বসে পড়ল সে। একপাশ থেকে মাথা বের করে উঁকি দিল। আলোটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে সামনের দিকে। নদীর ওপার থেকে অসংখ্য আলো এখন স্রোতের মধ্যে খোঁজ করছে। অতি উৎসাহী কয়েকজন হাঁটু পানিতে নেমেও পড়েছে, তবে এরচেয়ে বেশি এগোনোর চেষ্টা করছে না কেউ।
সে বোল্ডারের আড়াল থেকে বেরোতে যাচ্ছিল, এমন সময় ওপার থেকে মেগাফোনে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
“ইথান, ফিরে এসো। সব ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”
এই গলা সে যেকোনো জায়গায়, যেকোনো পরিস্থিতিতে চিনে নিতে পারবে। গভীর, গমগমে আওয়াজ পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বন জুড়ে। এই গলা শেরিফ পোপের।
“তুমি জানো না তুমি কী করছ।”
আসলে, আমি খুব ভালো করে জানি আমি কী করছি।
কাছাকাছি কোনো আলোক রশ্মি নেই দেখে উঠে দাঁড়াল ইথান। টলতে টলতে দক্ষিণ দিকে এগোল, ক্লিফের ধার ঘেঁষে।
“তুমি ফিরে এলে আমরা তোমাকে আঘাত করব না।”
হ্যাঁ, ওই স্বপ্নই দেখো।
“আমি কথা দিচ্ছি।”
ইথানের মনে হল তারও যদি একটা মেগাফোন থাকত, তাহলে ইচ্ছে মতো গালিগালাজ করতে পারত। ওপারের আরও কিছু কণ্ঠ চিৎকার করে তার নাম ধরে ডাকছে।
“ইথান, প্লিজ!”
“তুমি বুঝতে পারছ না তুমি কী করছ!”
“ফিরে এসো!”
পোপও চিৎকার করে ডাকছে তাকে, কিন্তু ইথান এগিয়ে চলল; ঘন, পিচকালো বৃষ্টির ভেতর। সে ওদের থেকে যত দূরে সরে যাচ্ছে, দৃষ্টিশক্তি ততই শূন্যের দিকে নামছে। পা টেনে-টেনে হাঁটছে সে, কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না চোখে। দিক নির্দেশের একমাত্র ভরসা বাম পাশের নদীর গর্জন।
পেছনে, কণ্ঠস্বর আর আলোর বিন্দুগুলো ফিকে হয়ে আসছে। শেষ অ্যাড্রেনালিনটুকুও খরচ করে ফেলেছে তার শরীর। এখন যে কোনো মুহূর্তে ধস নামবে, পুরো সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাবে ক্লান্তিতে।
কিন্তু থামা চলবে না। এখনই নয়।
ইচ্ছে করছে এখানেই নদীর ধারে বালুর ওপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়তে। তবে ওপারের লোকগুলো কখন নদী পার হয়ে চলে আসে বলা যায় না।
ওদের হাতে আলো আছে, অস্ত্র আছে, লোকবল আছে।
ইথানের কিছুই নেই।
ঝুঁকি নেওয়ার মতো অবস্থায় সে নেই।
তাই, রিজার্ভ ট্যাঙ্কে যতটুকু জ্বালানি বাকি আছে, সেটা নিয়েই সে এগিয়ে চলল।
