অধ্যায় ১৪
গতকাল সে একদমই রুম ছেড়ে বেরোয়নি থেরেসা। এমনকি বিছানা থেকেও নামেনি।
ইথানের মৃত্যুর জন্য নিজেকে তৈরি করে নিয়েছিল সে।
জানত, এটা ঘটবেই।
তবু ইথানহীন পৃথিবীতে ভোরের আলো ফুটতে দেখে মরে যেতে ইচ্ছে করছিল তার। আলোটা যেন চোখে আঙুল দিয়ে তাকে সত্যিটা বুঝিয়ে দিল। মানুষজন সকালবেলা হাঁটতে বেরিয়েছে। পাশের উঠোনের বার্ডফিডারে কিচিরমিচির করে ভিড় জমিয়েছে চড়ুইয়ের দল। জগতের সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলছে, যেন কিছুই বদলে যায়নি। আর এটাই তার ভাঙা হৃদয়টাকে হাজার টুকরোয় চূর্ণ করে দিয়েছে। পৃথিবীর চাকা ঘুরে চলেছে, অথচ ওর অনুপস্থিতি তার হৃদয়ে যে কৃষ্ণগহ্বরের জন্ম দিয়েছে তা বয়ে বেড়ানোর শক্তি থেরেসার নেই।
আজ সে বাইরে পা রেখেছে। বাড়ির পেছনের উঠোনে বসে আছে সে, ঘাসের ওপর এক টুকরো রোদ গায়ে মেখে, নিথর হয়ে। নিনিমেষ চোখে চেয়ে আছে শহর ঘিরে রাখা পাহাড়ি দেয়ালগুলোর দিকে। বলতেও পারবে না ক’ঘণ্টা ধরে এভাবে বসে আছে। ভোরের প্রথম আলো পড়েছিল ওদের চূড়ায়। তারপর আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো উপত্যকা জুড়ে। থেরেসা চেষ্টা করছে কিছু না ভেবে থাকতে।
পায়ের আওয়াজ তার ধ্যান ভেঙে দিল।
পেছনে তাকাল সে।
পিলচার এগিয়ে আসছে তার দিকে।
ওয়েওয়ার্ড পাইনসে আসার পর থেকে, লোকটাকে বহুবার দেখেছে সে, কিন্তু কখনো বাক্য বিনিময় হয়নি। শুরুর দিকেই তাকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল যেন কথা না বলে। পাঁচ বছর আগে, সিয়াটলের সেই বৃষ্টির রাতে তার দরজায় এসে পিলচার যে অবিশ্বাস্য প্রস্তাব দিয়েছিল, তার পর থেকে তাদের মধ্যে আর কোনো কথা হয়নি। পিলচার এসে তার পাশে বসে পড়ল। চশমা খুলে পায়ের ওপর রেখে বলল, “শুনলাম তুমি নাকি কো-অপের হার্ভেস্ট ডে-তে যাওনি?”
“গত দু’দিন ঘর ছেড়েই বেরোইনি।”
“তো, ঘরে থেকে কী অর্জন হলো?” সে জিজ্ঞেস করল।
“জানি না। কিন্তু বের হলে মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে থাকত, যেটা সহ্য করা সম্ভব হতো না। অবশ্যই, কেউ ওর ব্যাপারে কথা বলতে আসত না, কিন্তু চোখে করুণা তো থাকত। অথবা আরও খারাপ, সবাই হয়তো এমনভাব করত যেন কিছুই হয়নি, যেন ওর কখনো অস্তিত্বই ছিল না। আমি এখনো আমার ছেলেকে বলতে পারিনি যে ওর বাবা আর নেই। কোথা থেকে শুরু করব… সেটাই বুঝতে পারছি না।”
সন্ধ্যা নামবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। আকাশে এক ফোঁটা মেঘ নেই। উঠোনের সীমানায় অ্যাসপেন গাছগুলো সোনালি আলো গায়ে মেখে দুলছে আস্তে আস্তে। বাতাসে মৃদু খসখস শব্দ করছে পাতাগুলো। বারান্দা থেকে ভেসে আসছে উইন্ড চাইমের মিষ্টি সুরেলা আওয়াজ। সবকিছু ছবির মতো সুন্দর। তবু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ কদর্য বাস্তবতা। থেরেসার খুব ভয় হয়, একদিন হয়তো সে সত্যি সত্যি উন্মাদ হয়ে যাবে।
“তুমি এখানে দারুণ করছ,” পিলচার বলল। “ইথানকে নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল অমন কিছু আমি কখনোই চাইনি। আশা করি তুমি সেটা বিশ্বাস করো।”
থেরেসা পিলচারের দিকে তাকাল, সোজা তার কালো চোখের গভীরে।
“আমি এখন আর বুঝি না আমার কী বিশ্বাস করা উচিত, আর কী উচিত না,” সে বলল।
“তোমার ছেলে ভেতরে আছে?”
“হ্যাঁ… কেন?”
“ভেতরে গিয়ে ওকে ডেকে নিয়ে এসো। বাইরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি।”
“আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?” পিলচার মাথা নেড়ে ইঙ্গিত করল, বলবে না।
“বেনজামিনের কোনো ক্ষতি করবে না তো?”
পিলচার উঠে দাঁড়াল। চোখ নামিয়ে তাকাল থেরেসার দিকে।
“তোমাদের ক্ষতি করাই যদি আমার উদ্দেশ্য হতো, থেরেসা, তাহলে রাতের অন্ধকারে তোমাকে আর তোমার ছেলেকে নিয়ে যেতাম। কেউ কোনোদিন খবরও পেত না। তুমি সেটা অলরেডি জানো, জানো না? এখন যাও, ভেতরে গিয়ে ছেলেকে নিয়ে এসো। দু’মিনিটের মধ্যে দেখা হচ্ছে বাড়ির সামনে।”
