অধ্যায় ৬
কিছুক্ষণ আগেই থেরেসা ডিশওয়াশারে সব থালা-বাসন ভরে চালু করে দিয়েছে। ঘরঘর শব্দে ওয়াশিং সাইকেল চলছে এখন। নিয়মিত একঘেয়ে ঘরঘর শব্দ।
সে দাঁড়িয়ে আছে সিঙ্কের সামনে, হাঁটু ভেঙে আসছে ক্লান্তিতে, চোখের পাতা ভারী। শেষ সার্ভিং ডিশটা ধীরে ধীরে মুছে কেবিনেটে তুলে রাখল। তোয়ালেটা ফ্রিজের দরজায় ঝুলিয়ে রাখল, তারপর সুইচ টিপে নিভিয়ে দিল লাইট।
অন্ধকারে ঘরটা যেন হঠাৎ খুব লম্বা হয়ে উঠল। লিভিংরুম পেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে গিয়ে থেরেসার বুকের ভেতর আবার সেই পুরনো অনুভূতি ঢেউ উঠল। একটা ভার, যা কোনোদিন নামেনি ইথান হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে। ধীরে এক সর্বগ্রাসী শূন্যতা। যা প্রতিদিনের মতো আজও তাকে গিলে খাচ্ছে ধীরে।
আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর সূর্য উঠবে, ইথানহীন জীবনের প্রথম সকাল নিয়ে। গতকাল ছিল তার শেষ বিদায়ের দিন, ইথানের স্মৃতিতে শান্তি খোঁজার চেষ্টা করার দিন। ওর বন্ধুরা এসেছিল, কেঁদেছিল, দোয়া করেছিল, তারপর সবাই ফিরে গেছে নিজ নিজ জীবনে। একদিন হয়তো ওদের কারো মনে থাকবে না ইথানের নামটাও।
কিন্তু থেরেসা জানে তার জীবনে আর কোনো ‘আগে’ নেই, আর কোনো ‘পরে’ও নেই।
শুধু এই দুঃখ।
এই ভালোবাসা।
এই না-পাওয়া বেদনা।
সবই এখন তার একার।
এক মুহূর্তের জন্য যেন মাথা ঘুরে গেল তার। সিঁড়ির রেলিং ধরে নিজেকে সামলে নিল। বুক ভরে শ্বাস নিল ধীরে ধীরে।
এমন সময় টোকা পড়ল দরজায়। শব্দটা এত হঠাৎ, এত অপ্রত্যাশিত যে থেরেসার হৃদপিণ্ড যেন এক লাফে উঠে এলো গলার কাছে। বাতাস থেমে গেল চারপাশে।
থেরেসা ঘুরে তাকাল দরজাটার দিকে। সে কি কানে ভুল শুনল? ভোর ৪:৫০ বাজে। এই বেলায় কার কী প্রয়োজন হতে পারে—
আরেকটা নক। এবার আগেরটার চেয়ে জোরে।
ফয়ার পার হয়ে দরজার সামনে চলে এলো। চোখ রাখল পিপহোলে। পোর্চ লাইটের আলোয় ছাতা মাথায় একজন মানুষকে দেখা গেল। বেটেখাটো, মাথা সম্পূর্ণ টাক। ছাতার কারণে মুখটা ছাঁয়ায় ঢাকা পড়েছে। পরনে কালো স্যুট। লোকটা কি কোনো ফেডারেল এজেন্ট? ইথানের খবর নিয়ে এসেছে? নয়তো এমন উদ্ভট সময়ে কেউ কেন কারো দরজায় নক করবে?
কিন্তু টাইটা ঠিক নেই। নীল-হলুদ ডোরাকাটা—একজন ফেডারেল এজেন্টের পক্ষে খুব বেশি স্টাইলিশ আর উজ্জ্বল।
পিপহোলের মধ্য দিয়ে, সে লোকটার হাত এগিয়ে এসে আরেকবার নক করতে দেখল।
“মিসেস বার্ক,” সে বলল। “আমি জানি আপনি জেগে আছেন। কয়েক মিনিট আগেই আপনাকে কিচেন সিঙ্কে দেখেছি।”
“কী চান আপনি?” থেরেসা বলল দরজার এপাশ থেকে।
“আপনার সঙ্গে কথা বলতে।”
“কী ব্যাপারে?”
“আপনার স্বামীর ব্যাপারে।”
থেরেসা চোখ বন্ধ করে আবার খুলল। লোকটা এখনও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, আর সেও সম্পূর্ণ জাগ্রত।
“ওর ব্যাপারে কী বলবেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
“সেটা মুখোমুখি বসে বললেই ভালো হবে।”
“এখন কটা বাজে আপনার হুশ আছে? আমি জানি না আপনি কে। কোনোভাবেই আপনাকে আমার বাড়িতে ঢুকতে দেব না।”
“আপনি যা বলতে এসেছি আপনি তা শুনতে চাইবেন।”
“দরজার ওপাশ থেকে বলুন।”
“সেটা সম্ভব না।”
“তাহলে সকালে ফিরে আসুন। তখন কথা বলবো।”
“আমি যদি চলে যাই, মিসেস বার্ক, আপনি আমাকে আর কখন দেখবেন না, এবং বিশ্বাস করুন, সেটা আপনার আর বেনের জন্য দুঃখজনক হবে। আমি আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না, শপথ করছি।”
“আপনি চলে যান, নতুবা আমি পুলিশের কাছে ফোন করব।”
লোকটা কোটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা পোলারয়েড বের করল। ছবিটা পিপহোলের সামনে তুলে ধরতেই, কিছু একটা যেন ভেঙে পড়ল থেরেসার ভেতরে।
ছবিতে ইথানকে দেখা যাচ্ছে। একটা ইস্পাতের অপারেশন টেবিলের ওপর পড়ে আছে, নগ্ন, নীল ক্লিনিক্যাল আলোর নিচে। মুখের বাঁ পাশে একটা গভীর ক্ষত। জীবিত নাকি মৃত সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। অজান্তেই তার হাত এগিয়ে গেল চেইনের দিকে, ডেড বোল্ট খুলে ফেলল।
থেরেসা দরজা টেনে খুলতেই লোকটা হাতের ছাতাটা ভাঁজ করে ঠেস দিয়ে রাখল ইটের দেওয়ালে। তার পেছনে ঠাণ্ডা বৃষ্টির নিরবচ্ছিন্ন ঝুমঝুম, আর ঘুমন্ত শহরের আবছা গুঞ্জনধ্বনি ছড়িয়ে আছে। কয়েক বাড়ি পর রাস্তার পাশে একটা গাঢ় রঙের মার্সিডিজ স্প্রিন্টার পার্ক করা। ওটা এই রাস্তার কারো গাড়ি নয়। সম্ভবত লোকটারই গাড়ি ওটা।
“ডেভিড পিলচার,” লোকটা বলল, হাত বাড়িয়ে।
“আপনি কী করেছেন ওর সঙ্গে?” থেরেসা জিজ্ঞেস করল, হাত বাড়াল না। “ও কি মারা গেছে?”
“আমি কি ভেতরে আসতে পারি?”
থেরেসা একটু সরে দাঁড়াল। পিলচার দোরগোড়া পেরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল, কালো উইংটিপ জুতোয় বৃষ্টির ফোঁটা চকচক করছে।
“আপনি চাইলে আমি জুতোগুলো খুলে রাখতে পারি,” সে বলল।
“তার দরকার নেই,” থেরেসা উত্তর দিল।
সে লোকটাকে নিয়ে লিভিংরুমে এল, দু’জন মুখোমুখি বসল—থেরেসা সোফায়, আর পিলচার ডাইনিং টেবিল থেকে টেনে আনা একটা কাঠের চেয়ারে।
“আজ রাতে এখানে পার্টি ছিল?” পিলচার জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ। আমার স্বামীর জীবনের উদ্যাপন।”
“চমৎকার ব্যাপার।”
হঠাৎ থেরেসার মনে হল, সে যেন আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। মাথার ওপরের বাতিটা চোখে বিধছে, সহ্য করতে পারছে না।
“আমার স্বামীর ছবি আপনার কাছে কেন, মি. পিলচার?”
“ওটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।”
“কিন্তু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
“যদি আমি বলি, আপনার স্বামী এখনো বেঁচে আছে?”
প্রায় দশ সেকেন্ড থেরেসা শ্বাসই নিল না। শুধু ডিশওয়াশারের ঘরঘর, ছাদের ওপর বৃষ্টির ঝুমঝুম, আর তার হৃদস্পন্দনের ধকধক ছাড়া কোনো শব্দ নেই।
“আপনি কে?” সে জিজ্ঞেস করল।
“ওটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।”
“তাহলে আমি কীভাবে আপনার ওপর ভরসা করব—”
পিলচার হাত তুলল, ছোট হয়ে এলো তার কালো চোখ দুটো। “আপাতত শুধু আমার কথা শুনুন।”
“আপনি কি সরকারের কেউ?”
“না, কিন্তু আগেও বলেছি, আমি কে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি আপনাকে কী অফার করছি সেটাই আসল।”
“ইথান বেঁচে আছে?”
“হ্যাঁ।”
থেরেসার গলা বুজে এলো, কিন্তু নিজেকে সামলে রাখল সে।
“ও কোথায়?” কোনোমতে ফিসফিস করে বলল সে।
পিলচার মাথা নাড়ল। “আমি এখানে বসেই সব কিছু বলতে পারি, কিন্তু আপনি বিশ্বাস করবেন না।”
“আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
“অভিজ্ঞতা।”
“আপনি আমাকে বলবেন না আমার স্বামী কোথায়?”
“না, এবং আবার যদি জিজ্ঞেস করেন, আমি উঠে চলে যাব। আর কখনো দেখবেন না আমাকে। যার অর্থ ইথানকেও আর কখনো দেখতে পাবেন না।”
“ও কি আহত?” তার বুকের ভেতর অনুভূতির দলাটা কান্না হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
“সে ভালো আছে।”
“আপনি কি টাকা চান? আমি—”
“ইথানকে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হয়নি, থেরেসা। এর সঙ্গে টাকার কোনো সম্পর্ক নেই।” পিলচার সামনে এগিয়ে এলো। চেয়ারের প্রান্তে বসে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ল তার দিকে। তার কালো চোখ দুটোয় তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার ঝিলিক। “আমি আপনার আর আপনার ছেলের জন্য একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। ওয়ান-টাইম অফার।”
পিলচার কোটের ভেতরের পকেট থেকে দুটি আধা-ইঞ্চি কাঁচের শিশি বের করল। ভেতরে স্বচ্ছ তরল, মুখে ছোট কর্কের ঢাকনা। সাবধানে সেই দুটো কফি টেবিলের ওপর রাখল।
“ওটা কী?” থেরেসা জিজ্ঞেস করল।
“পুনর্মিলন।”
“পুনর্মিলন?”
“আপনার স্বামীর সঙ্গে।”
“আপনি মজা করছেন, তাই না—”
“না, একদমই না।”
“আপনি আসলে কে?”
“আমি শুধু আমার নামটাই আপনাকে বলতে পারি।”
“আপনার নাম দিয়ে আমি কী বুঝব? আর আপনি আশা করছেন—কী?—আপনাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে ওগুলো খেয়ে ফেলব? তারপর কী হবে?”
“সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনার, থেরেসা। আপনি চাইলে না করতেই পারেন।”
“শিশির ভেতরে কী আছে?”
“স্বল্পস্থায়ী কিন্তু শক্তিশালী সিডেটিভ।”
“তারপর আমি ঘুম থেকে উঠে দেখব, জাদুর মতো ইথানের কাছে ফিরে গেছি?”
“তারচেয়ে একটু জটিল, কিন্তু মোটামুটি তাই।”
পিলচার জানালার দিকে তাকাল, তারপর আবার চোখ ফিরিয়ে আনল থেরেসার দিকে।
“শিগগিরই ভোর হয়ে যাবে,” সে বলল। “আপনার সিদ্ধান্ত এখনই দরকার।”
থেরেসা চশমা খুলে চোখ ডলল।
“আমি এখন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় নেই।”
“তবু নিতে হবে।”
থেরেসা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“ওটা বিষও হতে পারে,” সে বলল, টেবিলের দিকে আঙুল তুলে।
“আপনার কেন মনে হচ্ছে আমি আপনার ক্ষতি করতে চাই?”
“আমি জানি না। হয়তো ইথান কোনো কিছুর মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল।”
“যদি আমি সত্যিই আপনাকে মেরে ফেলতে চাইতাম, থেরেসা…” পিলচার থেমে গেল। “আপনাকে বুদ্ধিমান বলে মনে হয়, মানুষের মুখ দেখেই অনেক কিছু বুঝে নিতে পারেন। আমাকে দেখে আপনার মন কী বলছে? আমি মিথ্যে বলছি?”
থেরেসা গিয়ে ম্যান্টেলের সামনে দাঁড়াল, চোখ পড়ল দেয়ালে টাঙানো পারিবারিক ছবিটার দিকে—গত বছর তোলা। ইথান আর বেন সাদা পোলো শার্টে, থেরেসা হালকা গ্রীষ্মকালীন পোশাকে। ফটোশপের কল্যানে সবার স্কিন একেবারে নিখুঁত করা, স্টুডিয়োর আলোতে তোলা খুঁতহীন একটা ছবি। তখন ওরা খুব হেসেছিল ছবিটার মেকিভাব নিয়ে, কিন্তু এখন, ভোররাতের এই নিস্তব্ধ ঘরে, আবার যখন ইথানের দেখা পাওয়ার সুযোগ এসেছে, ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেরেসার গলায় অনুভূতির দলা বেঁধে গেল।
“আপনি যা বলছেন,” থেরেসা বলল, চোখ এখনো ছবিটার ওপর, “তা যদি মিথ্যে হয়… তাহলে এটা হবে প্রচণ্ড নির্মম একটা কাজ। আপনি নিশ্চয়ই একজন শোকাহত বিধবাকে তার স্বামীর সাথে দেখা করানোর মিথ্যে আশা দেখাচ্ছেন না, তাই না?”
সে ঘুরে তাকাল পিলচারের দিকে। “আপনি কি সত্যি বলছেন?”
“হ্যাঁ।”
“আমি বিশ্বাস করতে চাই,” থেরেসা বলল।
“আমি জানি।”
“খুব করে চাই।”
“আমি বুঝতে পারছি যে এটা এক ধরনের লিপ অব ফেইথ।”
“আজ রাতেই আপনি এলেন,” থেরেসা বলল, “এই রাতে। যখন আমি ক্লান্ত, খানিকটা মাতাল, আর মন ইথানের স্মৃতিতে কাতর। আমি ধরে নিচ্ছি এটা কাকতাল নয়।”
পিলচার টেবিল থেকে এক শিশি তুলে নিল। তরলটা আলোয় ঝলমল করছে। থেরেসা তাকিয়ে রইল। গভীর নিঃশ্বাস নিল, ছাড়ল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল।
“কোথায় যাচ্ছেন?” পিলচার জিজ্ঞেস করল।
“আমার ছেলেকে আনতে।”
“তাহলে আপনি রাজি? আমার সঙ্গে যাবেন?”
সিঁড়ির গোড়ায় থেমে থেরেসা পেছনে তাকাল, লিভিংরুম পেরিয়ে পিলচারের দিকে।
“আমি যদি আপনার সঙ্গে যাই,” সে ধীরে বলল, “তাহলে কি আমরা আমাদের আগের জীবন ফিরে পাব?”
পিলচার বলল, “’আগের জীবন’ বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন? এই বাড়ি? এই শহর? আপনার বন্ধুরা?”
থেরেসা মাথা দোলাল।
পিলচার বলল, “আপনি আর বেন যদি আমার সঙ্গে আসেন, তাহলে আর কিছুই আগের মতো থাকবে না। এই বাড়ি আর কখনো দেখবেন না আপনি। সেদিক থেকে বললে, ‘না’।”
“কিন্তু আমরা ইথানের সঙ্গে থাকব? আমাদের পরিবার আবার এক হবে?”
“হ্যাঁ।”
থেরেসা সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগল, ছেলেকে জাগাতে। হয়তো ক্লান্তি, হয়তো তীব্র আবেগের কারণেই, সবকিছু অবাস্তব মনে হচ্ছে। বাতাস যেন কাঁপছে কোনো অদৃশ্য বিদ্যুতের স্রোতে। মনের ভেতর এক অংশ চিৎকার করছে, পাগলামি করছো তুমি। কোনো সুস্থ বুদ্ধির মানুষ এমন প্রস্তাবে রাজি হবে না।
কিন্তু দ্বিতীয় তলায় পৌঁছে বেনের ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের কাছেই স্বীকার করল, সে আর ‘সুস্থ’ বুদ্ধির নেই। যুক্তি, বিবেচনা—সব ভেঙে গেছে। সে ভেঙে পড়েছে, নিঃসঙ্গ, আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো সে তার স্বামীকে ভীষণ মিস করছে। তাদের পরিবারের আবার একত্রিত হবার ক্ষীণ সম্ভাবনাও যদি থাকে, সেজন্য এই বর্তমান জীবনের সবকিছু ছেড়েছুড়ে অনিশ্চিতের পথে যাত্রা করতেও সে রাজি আছে।
থেরেসা বেনের বিছানার ধারে বসে তার কাঁধে হাত রাখল। ছেলেটা নড়ে উঠল।
“বেন,” সে আস্তে বলল, “ওঠ, বাবা।”
বেন হাই তুলে চোখ ডলল। থেরেসা সাহায্য করল তাকে উঠে বসতে।
“মা, এখনও তো অন্ধকার,” বেন বলল।
“জানি। তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
“সত্যি?”
“নিচে একজন মানুষ এসেছে। নাম মিস্টার পিলচার। সে আমাদের তোর বাবার কাছে নিয়ে যাবে।”
বিছানার পাশে ছোট নাইটলাইটের নরম আলোয় বেনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। থেরেসার কথাগুলো যেন সূর্যালোকের মতো স্পর্শ করল তাকে, ঘুমের কুয়াশা সরিয়ে দিল মুহূর্তেই। চোখে জেগে উঠল উত্তেজনা, বিশ্বাস আর এক ঝলক আনন্দ।
“বাবা বেঁচে আছে?” সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
থেরেসা নিজেও নিশ্চিত না লোকটার কথা কতটা বিশ্বাস করা যায়। কী যেন বলেছিল পিলচার? বিশ্বাসের ঝাঁপ—লিপ অব ফেইথ।
“হ্যাঁ,” সে বলল ধীরে। “বাবা বেঁচে আছে। আয়, পোশাক পরে নে।”
***
থেরেসা আর বেন বসেছে পিলচারের ঠিক বিপরীতে। লোকটা বেনের দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসি হেসে হাত বাড়িয়ে দিল।
“আমার নাম ডেভিড। আর তোমার?”
“বেন।”
দু’জনের হাত মিলল।
“তোমার বয়স কত, বেন?”
“সাত।”
“ওহ, বেশ! তোমার মা নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলেছেন আমি কেন এসেছি?”
“মা বলেছে আপনি আমাদের বাবার কাছে নিয়ে যাবেন।”
“মা একদম ঠিক বলেছে।” পিলচার টেবিল থেকে কাচের শিশি দুটো তুলে থেরেসার হাতে দিল। “সময় হয়ে গেছে,” সে বলল। “ঢাকনাগুলো খুলে ফেলুন। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আপনাদের কিছু হবে না। এটা গেলার পর পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যে কাজ করবে। হঠাৎই ঘুমিয়ে পড়বেন, কিন্তু অস্বস্তিকর বা ব্যথার অনুভূতি হবে না। আগে বেনকে ছোট ডোজের শিশিটা দিন, তারপর নিজেরটা খান।”
থেরেসা নখ চিমটি মেরে ধরে কর্ক খুলে ফেলল। একটা অচেনা রাসায়নিকের তীব্র গন্ধে ভরে গেল বাতাস। গন্ধটা যেন ঝাঁকুনি দিয়ে তার ঘুম ভাঙাল, বাস্তবে নিয়ে এলো তাকে। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে সে যে ঘোরে আছে সেটা যেন কেটে গেল হঠাৎ করেই।
“দাঁড়ান,” সে বলল।
“কী হয়েছে?” পিলচার জিজ্ঞেস করল।
থেরেসার মনে ভয় চেপে বসল। আমি কী করতে যাচ্ছি? ইথান জানলে আমাকে মেরে ফেলবে। আমি একা হলে একটা কথা, কিন্তু নিজের ছেলেকে নিয়ে এভাবে ঝুঁকি?
“কী হয়েছে, মা?”
“আমাদের পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব না,” সে বলল, শিশিগুলোর ঢাকনা আবার লাগিয়ে টেবিলে রেখে।
পিলচার টেবিলের ওপাশ থেকে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। “আপনি পুরোপুরি নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ… আমি পারব না।”
“বুঝতে পারছি।” পিলচার শিশিগুলো জড়ো করে তুলে নিল।
থেরেসা তাকাল বেনের দিকে। ছেলেটার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে। “তুই উপরে গিয়ে শুয়ে পড়।”
“কিন্তু আমি বাবাকে দেখতে চাই।”
“আমরা পরে এ নিয়ে কথা বলব। যা।”
থেরেসা মুখ ফেরাল পিলচারের দিকে, “আমি দুঃখিত—”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই গলা আটকে গেল।
পিলচার ইতিমধ্যে মুখে অক্সিজেন মাস্ক চেপে ধরেছে, টিউব নেমে গেছে জ্যাকেটের ভেতর। অন্য হাতে একটা ছোট স্প্রে ক্যান।
থেরেসা শুধু বলতে পারল, “প্লিজ, না।”
ক্যান থেকে ছিটকে বেরোল এক ঝলক সূক্ষ্ম ধোঁয়া। ঘিরে ধরল থেরেসাকে। সে শ্বাস বন্ধ করে রাখতে চাইল, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। জিহ্বায় টের পাচ্ছে ঠাণ্ডা, মিষ্টি মিশ্রিত ধাতব স্বাদ। ধোঁয়াটা ত্বকে লেগে গেছে, যেন রোমকূপের ছিদ্রপথে ঢুকে পড়ছে শরীরে। তরল নাইট্রোজেনের মতো ঠাণ্ডা বরফের রেখা নেমে যাচ্ছে গলা বেয়ে।
সে বেনকে জড়িয়ে ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তার যেন পা নেই। ডিশওয়াশারের শব্দ থেমে গেছে, ঘরে সম্পূর্ণ নীরবতা, শুধু ছাদের ওপর বৃষ্টির শব্দ।
পিলচার বলল, “আপনি এমন এক কাজে অংশ নিতে যাচ্ছেন, যার গুরুত্ব আপনি কল্পনাও করতে পারছেন না।”
থেরেসা জিজ্ঞেস করতে চাইল তার কথার অর্থ কী, কিন্তু মুখ আর নড়ল না। রঙ হারাতে লাগল চারপাশ, ধূসর ছায়া হয়ে গলে যাচ্ছে সব। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে, নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে শরীর। তার কোলে বেনের ছোট্ট দেহ নিস্তেজ হয়ে পড়েছে ইতিমধ্যেই। অক্সিজেন মাস্কের আড়ালে পিলচারের মুখে একটা অস্বস্তিকর হাসি। সবকিছু মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে।
পিলচার কোটের পকেট থেকে একটা ওয়াকিটকি বের করে বলল, “আর্নল্ড, প্যাম, আমি তৈরি।”
