পাইনস – ১৫

অধ্যায় ১৫

ইথান এয়ারডাক্টের ভেতর তাকিয়ে রইল।

ভেতরটা বেশ সংকীর্ণ, হুডি পরে ঢোকা হয়তো অসম্ভবই হবে।

টান দিয়ে হুডিটা খুলে ছুড়ে ফেলল নিচের দিকে। ঠাণ্ডা বাতাসে কাঁটা দিল গায়ে। ডাক্টের ভেতর পা দিয়ে ঠেলে এগোতে হবে বলে মোজাও খুলে ফেলল, নয়তো পা পিছলে যেতে পারে।

মাথাটা ঢোকাল প্রথমে, কিন্তু কাঁধ আটকে গেল। কয়েক মিনিট ধস্তাধস্তির পর অবশ্য শরীরের অর্ধেকটাই ভেতরে গুঁজে দিতে পারল। হাত দুটো সামনের দিকে প্রসারিত, অস্থিরভাবে পা নেড়ে শরীরের বাকি অংশটুকুও ঢুকিয়ে দিতে চাইছে। ধাতব ডাক্টের পৃষ্ঠতল বরফের মতো ঠাণ্ডা।

পুরোটা ঢুকে যেতেই আতঙ্কের ঢেউ খেলে গেল বুকের ভেতর। মনে হলো যেন শ্বাস নিতে পারছে না। কাঁধের দু’পাশ থেকে চেপে ধরেছে ধাতব দেয়াল। হঠাৎই অনুধাবন করল, পেছনে ফেরার আর উপায় নেই, অন্তত কাঁধ দুটো সকেট থেকে খুলে না এলে তো কোনোভাবেই সম্ভব না।

নড়াচড়ার একমাত্র উপায় হলো পায়ের আঙুল দিয়ে ক্ষীণ ঠেলা দেওয়া, যার আবার কোনো রিভার্স গিয়ার নেই।

ধীরে ধীরে, আক্ষরিক অর্থেই ইঞ্চি ইঞ্চি করে, ডাক্টের মসৃণ ধাতব গা বেয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। এখনো রক্ত পড়ছে। একে তো পাহাড় চড়ার পরিশ্রমে শরীর শ্রান্ত ছিল, আর এখন পেশিগুলো যেন বিদ্রোহে ফেটে পড়ছে। স্নায়ুগুলো টানটান উত্তেজিত।

সামনে শুধুই অন্ধকার। তার নড়াচড়ার শব্দ টানেলের ধাতব দেয়াল প্রতিধ্বনি হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে গভীরে। আর যখন সে থামছে, অটুট নিস্তব্ধতা। মাঝে মধ্যে অবশ্য বিকট একটা শব্দ হচ্ছে, লাফিয়ে উঠছে সে। বুঝতে সময় লেগে গেল যে এটা তাপমাত্রার ওঠানামার কারণে ধাতব ডাক্টের সংকোচন-প্রসারণের শব্দ। পাঁচ মিনিট পর, ঘাড় ঘুরিয়ে ডাক্টের মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল ইথান। শেষবারের মতো দিনের আলো দেখতে ইচ্ছা করছে তার। কিন্তু ঘাড় অতদূর ঘোরানো গেল না। ইচ্ছা অপূর্ণই রয়ে গেল।

***

বুক ঘষটে এগিয়ে চলল সে। পথ আর শেষ হয় না। দুই পাশ থেকে ধাতব ডাক্ট চেপে ধরে আছে, গাঢ় অন্ধকারে বন্দি সে। কোনো এক সময়ে, হয়তো তিরিশ মিনিট, হয়তো পাঁচ ঘণ্টা, কিংবা হয়তো পুরো দিন পার হয়ে যাওয়ার পর, থামতে বাধ্য হলো সে। তার পায়ের আঙুলে খিল লেগে গেছে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে শরীর। ধাতব মেঝেতে ঢলে পড়ল সে। থরথর করে কাঁপছে। তৃষ্ণায় পাগলপ্রায়। ক্ষুধায় মাথা ঘুরছে, অথচ পকেটে থাকা খাবারের কাছে পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই, জায়গাই নেই হাত নড়ানোর। ধাতব পৃষ্ঠতলে ঠেসে থাকা বুকের ভিতর হৃদস্পন্দন চলছে, আর কোনো শব্দ নেই। শুধু ভারী, মরিয়া ধকধক।

***

ঘুমিয়ে গিয়েছিল সে।

অথবা হয়তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।

অথবা এক মিনিটের জন্য সত্যিই মরে গিয়েছিল।

জ্ঞান ফেরার সাথে সাথে হাত-পা ছুড়ল সে, কিন্তু ডাক্টের দেয়ালের কারণে পারল না। কোনো ধারণা নেই সে কোথায় আছে বা এখন ক’টা বাজে। তার চোখ পুরো খোলা, কিন্তু সামনে শুধু ঘোর অন্ধকার।

এক আতঙ্কজনক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, কেউ বুঝি তাকে জীবন্ত কবর দিয়েছে। এমনকি নিজের হাঁপানোর শব্দটাও এমন লাগছে যেন কেউ ঠিক তার কান ঘেঁষে চিৎকার করছে।

***

ইথানের মনে হচ্ছিল বহুদিন ধরে সে বুক ঘষটে চলেছে।

দীর্ঘ সময় পার করে ফেলল নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে। আলোর বিভ্রম দেখাচ্ছে চোখ। কখনো ঝলমলে রঙের বিস্ফোরণ, কখনো মেরুপ্রভা, কখনো ভৌতিক আলোর বিচ্ছুরণ।

এই সংকীর্ণ অন্ধকারের যত গভীরে সে এগোচ্ছে, ততই একটা নির্মম চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে—এসবের কিছুই সত্যি না। ওয়েওয়ার্ড পাইনস না, ক্যানিয়ন না, ওই জন্তুগুলো না, এমনকি তুমি নিজেও না।

তাহলে এটা কী? কোথায় আমি?

একটা লম্বা, অন্ধকার সুড়ঙ্গে। কিন্তু তুমি যাচ্ছ কোথায়?

জানি না।

তুমি কে?

ইথান বার্ক।

না, তুমি আসলে কে?

আমি বেনের বাবা। থেরেসার স্বামী। সিয়াটলের কুইন অ্যান এলাকায় থাকি। দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার পাইলট ছিলাম। তারপর সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট। সাত দিন আগে ওয়েওয়ার্ড পাইনসে এসেছি।

ওগুলো শুধু তথ্য। তোমার পরিচয় নয়, তোমার ভেতরের মানুষটা কে তা বলে না।

আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি, কিন্তু তাকে ঠকিয়েছি।

ভালো, আরও বলো।

আমি আমার ছেলেকে ভালোবাসি, কিন্তু কখনও ওর কাছে থাকিনি, ওর সাথে সময় কাটায়নি। সবসময় শুধু আকাশের তারার মতো দূরে দূরে থেকেছি।

ভালো বলছ। চালিয়ে যাও।

আমার উদ্দেশ্য ভালো। কিন্তু…

কিন্তু কী?

কিন্তু বারবার ব্যর্থ হই। যাদের ভালোবাসি তাদেরই আঘাত করি।

কেন?

জানি না।

তোমার কি মনে হচ্ছে তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছ?

মাঝে মাঝে মনে হয় আমি এখনো সেই টর্চার সেলে আছি। কখনো বেরই হতে পারিনি।

তুমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছ?

তুমি বলো।

আমার পক্ষে বলা সম্ভব না।

কেন?

কারণ আমিই তুমি।

***

প্রথমে ইথান ভেবেছিল ওটা স্রেফ আরেকটা ভুতুড়ে আলোর খেলা। কিন্তু এবার কোনো ঝলমলে রঙের বিস্ফোরণ নেই। কোনো চোখ-ধাঁধানো আতশবাজিও নেই।

শুধু একটা নীল বিন্দু, দূরে, খুব দূরে, মৃতপ্রায় তারার মতো ক্ষীণ আলো।

চোখ বন্ধ করলে সেটা মিলিয়ে যাচ্ছে।

চোখ খুললে আবার ফিরে আসছে। তার গাঢ় অন্ধকারে ভরা দমবন্ধ করা দুনিয়ায় শেষ আশার চিহ্ন হয়ে উঠেছে ওটা। একটা ছোট্ট আলোকবিন্দু, যেটা ইথান নিজে অদৃশ্য করতে পারছে, আবার ফিরিয়েও আনতে পারছে। এই সামান্য নিয়ন্ত্রণই তার ভরসা জিইয়ে রেখেছে।

ওই বিন্দুটাই দুনিয়ার শেষ নোঙর। ডুবন্ত নাবিকের শেষ আশ্রয়।

ইথানের মনে শুধু একটাই প্রার্থনা, দয়া করে… সত্যি হোস।

***

সেই ক্ষীণ নীল তারাটা ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল, সাথে যুক্ত হলো একটা মৃদু গুঞ্জন।

ইথান বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একটু থামল। গুঞ্জনটা এখন মৃদু কম্পনে পরিণত হয়ে পুরো সুড়ঙ্গ এবং তার শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাঢ় অন্ধকারে থাকার পর এই নতুন অনুভূতিটা যেন মায়ের হৃদস্পন্দনের মতোই সান্ত্বনা দিচ্ছে।

***

কিছুক্ষণ পর সেই নীল তারাটা ছোট একটা চতুর্ভুজে পরিণত হলো।

বড় হতে হতে সেটা ইথানের দৃষ্টিকে পুরোপুরি দখল করে নিল, অদ্ভুত উত্তেজনা পাক খেতে লাগল তার পেটে।

তারপর সেটা দশ ফুট দূরে চলে এল।

তারপর পাঁচ ফুট।

তারপর তার ঊর্ধ্বাংশ ডাক্টের বাইরে বেরিয়ে গেল, হাত আর কাঁধের পেশিগুলো স্বাধীনভাবে নাড়াতে পারছে এখন। নতুন মুক্তির মিষ্টি স্বাদে খুশি হয়ে উঠল সে। ডাক্টের বাইরে মুখ ঝুলিয়ে নিচে তাকাল সে। আরেকটা খাড়া ডাক্টের সাথে মিশেছে তার ডাক্ট। চওড়ায় এটা তারটার দ্বিগুণ। তারটার মতো আরও অনেকগুলো ডাক্ট এসে মিশেছে এটার সাথে। নরম একটা নীলচে আলোয় ভরে আছে পুরো এয়ারশ্যাফট। অনেক নিচে কোনো একটা বাল্ব থেকে আসছে আলোটা। আর একেবারে তলায় একটা বড় ফ্যান ঘুরছে। এয়ার-ইনটেক। ইথান যেখানে আছে সেখান থেকে অন্তত একশো ফুট নিচে ওটা।

দশ ফুট অন্তর অন্তর আরও ডাক্ট এসে মিশেছে মূল শ্যাফটে। যার মধ্যে কয়েকটা তো বেশ বড়।

ইথান মাথা ঘুরিয়ে উপর দিকে তাকাল। সিলিং মোটে দুই ফুট দূরে।

শিট…

সে জানে এরপর তাকে কী করতে হবে, এছাড়া কোনো উপায়ও নেই, কিন্তু কাজটা তার একদমই পছন্দ হচ্ছে না।

***

ইথান মূল এয়ারশ্যাফটে বেরিয়ে এল, ফাটল বেয়ে যেভাবে উঠেছিল এখানে ঠিক সেভাবে নামতে লাগল। দুই বিপরীত দেয়ালে দুই পায়ের চাপ দিয়ে। খালি পায়ে ধাতব দেয়ালে মোটামুটি ভালোভাবেই গ্রিপ পাওয়া গেল। নিচে বিশাল ফ্যান ঘুরছে, সামান্যতম ভুল মানে ওখানে পড়ে মৃত্যু, তবু বুকের মধ্যে এক ধরনের উল্লাস টের পাচ্ছে সে। ওই সরু ডাক্ট থেকে মুক্তির আনন্দ।

***

ইঞ্চি ইঞ্চি করে নামতে লাগল সে। দুই পাশের দেয়াল দুই হাতে ঠেস দিয়ে এক পা নামাচ্ছে, এভাবে দুই পা নামিয়ে পা দিয়ে ঠেস দিচ্ছে, তারপর হাত নামাচ্ছে।

চল্লিশ ফুট নামার পর প্রথম বড় অনুভূমিক শ্যাফটের মুখে এসে বিশ্রাম নিতে বসল সে। পা ঝুলিয়ে বসে শেষ গাজর আর রুটির টুকরো খেতে খেতে নিচের দিকে তাকাল। বিশাল ফ্যানটা ঘুরে যাচ্ছে ক্রমাগত।

এতক্ষণ ধরে বাঁচার চিন্তায় এত বিভোর ছিল যে এই বিশাল এই অবকাঠামো বানানো হয়েছে কীসের জন্য সেটাই ভাবার সময় পায়নি।

এবার নিচ থেকে চোখ ফিরিয়ে পেছনের দিকে তাকাল। এই শ্যাফটটা পুরোপুরি অন্ধকার নয়। নিয়মিত বিরতিতে কিছু প্যানেল লাইট জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। যতদূর চোখ যায় ততদূর এমন আলো।

চার হাত-পায়ে ভর করে শরীর ঘুরিয়ে নিল ইথান। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চলল সে। বিশ ফুট যাওয়ার পর প্রথম আলোর নিচে পৌঁছাল। ভয় আর উত্তেজনার মিশ্র একটা শিহরণ বয়ে গেল শরীর বেয়ে।

ওটা কোনো প্যানেল লাইট নয়। ওটা একটা ভেন্ট। রডের জালির তৈরি ঢাকনাটা দিয়ে নিচের দিকে তাকাল সে। চেকার্ড টাইলসের ফ্লোর দেখা যাচ্ছে। ভেন্ট বেয়ে আসা বাতাসটা উষ্ণ নরম, একদম মধ্য জুলাইয়ে সমুদ্র থেকে ভেসে আসা বাতাসের মতো মোলায়েম।

অনেকক্ষণ চুপচাপ অপেক্ষা করল সে। দেখল। কিছুই ঘটছে না নিচে। শুধু হাওয়ার সোঁ সোঁ শব্দ, তার নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস, আর ধাতব দেয়ালের প্রসারণ-সংকোচনের টুকটুক। আর কোনো শব্দ নেই। ইথান ভেন্টের জালিটা ধরে টান দিল। সহজেই উঠে এল। আটকে রাখার জন্য কোনো স্ক্রু নেই, পেরেক নেই, এমনকি ওয়েল্ডিংও নয়। সেটা পাশে রেখে সে ভেন্টের কিনারা শক্ত করে ধরল। এবার নামার জন্য সাহস জোগাড় করল মনে মনে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *