পাইনস – ১০

অধ্যায় ১০

অ্যাটিকে দাঁড়িয়ে আছে সে। এখানেই বাড়ির সবচেয়ে উঁচু জানালাটা। অশ্রুবিন্দু আকারের। উপরে ছোট্ট ছাউনি, যাতে বৃষ্টির পানি কাচে না লাগে।

রাত গভীর। চারদিক অন্ধকার। মাথার ওপরে টিনের ছাদে বৃষ্টির মৃদু টুপটাপ শব্দ। অন্য যেকোনো রাত হলে তার মনে শান্তি থাকত। এমন রাত আরামে ঘুমিয়ে পড়ার মতো।

স্বপ্ন দেখার মতো।

অন্যদের ফোনের মতো তার ফোনটা আজ রাতে বেজে ওঠেনি, আর এতেই সে কৃতজ্ঞ।

সে প্রার্থনা করেছিল তার যেন এই কাজে ডাক না পড়ে। তার প্রার্থনা সত্যি হয়েছে, এই দুঃস্বপ্নের মাঝে এটুকুই স্বস্তি।

তৃতীয় তলায় তার জানালা থেকে উপত্যকার অনেকখানি দেখা যায়। শত শত টর্চ জ্বলছে সেখানে। হঠাৎ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে শহরটা।

বৃষ্টি এখনো পুরোদমে চলছে। দূরের আলোক বিন্দুগুলো ঝিকিমিকি ধূসর কণিকা। অবশ্য কাছাকাছি আলোগুলোর নড়াচড়া খুব ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছে। ইথানকে দেখে তার বুকটা ধক করে উঠল—

নগ্ন।

ফ্যাকাশে।

রাস্তার মাঝখান দিয়ে ভূতের মতো দৌড়াচ্ছে, এবং পিছনে তিনজন কালো পোশাকধারী, হাতে মাচেতে, তার পিছে লেগে আছে।

সে জানত এমনটা ঘটবেই, নিজেকে যতটুকু সম্ভব প্রস্তুতও করেছিল সেজন্য, কিন্তু ওকে এভাবে রক্তমাংসের শরীরে দেখে ওর ভয়, উত্তেজনা, আর হতাশা অনুভব করে—নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল সে, নয়তো কখন যেন গলা চিড়ে চিৎকার বের হয়ে যায়।

চোখের সামনে ওকে খুন হতে দেখছি আমি।

ইথান দৌড়ে প্রধান সড়কের ভবনগুলোর আড়ালে চলে গেল।

আর তার মনে হলো কেউ যেন খুব কাছ থেকে তার বুকে ডাবল-ব্যারেল শটগান ফাঁকা করেছে। আর কোনোদিন তাকে দেখবে না সে। ওর করুণ পরিণতি দেখতে ফার্স্ট অ্যাভিনিউর ওই বাড়িটায় কখনোই যাবে না সে। তার স্বামী, তার ছেলের বাবার জীবিত ছবিটাই শেষ স্মৃতি হিসেবে থাকুক।

রাস্তায় আরও মানুষ এসে জড়ো হয়েছে, সবাই প্রধান সড়কের দিকে দৌড়াচ্ছে। ভারী বৃষ্টি সত্ত্বেও সবার মধ্যে উৎসবের আমেজ। অনেকেই কস্টিউম পরে চলে এসেছে, কোনো সন্দেহ নেই তারা আগে থেকেই প্রস্তুত।

কেউ কখনো এই উৎসবের কথা প্রত্যক্ষভাবে বলে না, কিন্তু সে জানে এমন অনেক মানুষ আছে যারা এই টেলিফোনের অপেক্ষায় থাকে।

গভীর রাতে এভাবে অস্ত্র নিয়ে ছুটোছুটি করার জন্য।

রক্ত ঝরানোর জন্য।

গতবার সে আর বেনও সেই উন্মত্ত জনতার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল, কারণ না দিয়ে উপায় ছিল না। যদিও তারা ঘটনার কেন্দ্রে যায়নি, তবু যেখানে বিল ইভান্সকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল, তার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

বিলের আর্তচিৎকার, প্রাণভিক্ষা, আর তার বিপরীতে উন্মাদ জনতা হাসি আর বিকৃত উল্লাস, সব শুনেছিল তারা।

পরে পুরো শহরটাই যেন পাগল হয়ে উঠেছিল। প্রধান সড়কে ভোর পর্যন্ত চলেছিল উৎসব—মদ, আতশবাজি, নাচ, গান, ভোজ। থেরেসা যতই ঘৃণা করুক, উপস্থিত বাকি সবার মধ্যে এক অদ্ভুত ঐক্যবোধ ছিল, এমনকি বাতাসও যেন বিদ্যুতায়িত হয়ে গিয়েছিল।

সবাই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরছিল। উল্লসিত, উচ্ছ্বসিত।

মানুষের নিষ্ঠুরতা উদযাপনের এক নারকীয় উৎসব চলেছিল সেই রাতে। ওয়েওয়ার্ড পাইনসে পাঁচ বছর হলো থেরেসার। এর মধ্যে চারবার এমন ‘উৎসব’ হয়েছে। আজ রাতেরটা পঞ্চম।

চোখ মুছল সে, মুখ ফিরিয়ে নিল জানালা থেকে। তারপর নিঃশব্দে অ্যাটিক পার হলো, ক্যাঁচক্যাঁচে তক্তাগুলো এড়িয়ে গেল সাবধানে। বেনের ঘুম ভাঙাতে চায় না সে। ছেলেটা যদি ঘুম থেকে জেগে দেখে বাইরে উৎসব হচ্ছে, ও বেরিয়ে পড়তে চাইবে, অংশ নিতে চাইবে।

ড্রপ-ডাউন মই বেয়ে নেমে এলো সে, মইটা ভাঁজ করে উঠিয়ে দিল, তারপর অ্যাটিকের দরজাটা তুলে দিল সিলিংয়ের সাথে।

কেমন অদ্ভুত লাগে তার। বাইরে এমন তাণ্ডব চলছে, অথচ ঘরটা নিঃশব্দ, শান্ত।

সে করিডোর পেরিয়ে বেনের ঘরের খোলা দরজায় এসে দাঁড়াল। ঘুমোচ্ছে ও।

বারো বছর বয়স, এখনই দিন দিন বাবার মতো হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা।

ওর দিকে তাকিয়ে থেরেসার মনে প্রশ্ন জাগে, ক্রুদ্ধ জনতা যখন ইথানকে ধরে ফেলবে, সে কি চিৎকার করবে? থেরেসা কি শুনতে পাবে তার স্বামীর চিৎকার? আর যদি শোনে, সহ্য করতে পারবে তো?

মাঝে মাঝে সবকিছু এত স্বাভাবিক মনে হয়, যেন চিরদিন এমনই ছিল সব, কিন্তু তারপর হঠাৎ এমন মুহূর্ত আসে, যখন বুকের ভেতর চাপা প্রশ্নগুলো ফেটে বেরিয়ে আসতে চায়, তাকে টুকরো টুকরো করে দিতে পুরনো ভঙ্গুর কাচের মতো।

খুব শিগগিরই প্রধান সড়কে বাজনা বাজতে শুরু করবে, তাতে বেনের ঘুম ভেঙে যাওয়ারই কথা। ও তখন জানতে চাইবে, কী হচ্ছে বাইরে। এবার ওকে মিথ্যা বলা যাবে না। মিষ্টি করে রাখঢাক করে বলেও লাভ হবে না। ও এখন যথেষ্ট বুদ্ধিমান। মিথ্যে বলে ওর বুদ্ধিমত্তাকে অসম্মান করতে পারবে না থেরেসা।

তাহলে কী বলবে ওকে?

আর তার চেয়েও কঠিন প্রশ্ন হলো, এক সপ্তাহ পর, যখন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে সে একা বিছানায় শুয়ে থাকবে, পাশে আর কোনোদিন ইথান থাকবে না…

তখন সে নিজেকেই বা কী বলবে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *