উপসংহার
নিজ অফিসের নীরবতায় বসে আছে সে, বুট জোড়া টেবিলের ওপর তুলে। পিতলের তারাটা হাতে ধরা। তাকিয়ে আছে পূর্ণ মনোযোগে। মাঝে মধ্যে আঙুল বুলাচ্ছে মাঝখানে বসানো “ডাব্লিউ পি’ অক্ষর দুটোর ওপর। কালো কোনো পাথর দিয়ে খোদাই করা, হয়তো অবসিডিয়ান। তার পরনে গাঢ় বাদামি ক্যানভাস প্যান্ট আর হান্টার-সবুজ লম্বা হাতার বোতামওয়ালা শার্ট, ঠিক তার পূর্বসূরীর মতোই। কাপড়টা এখনও নতুন, বেশি করে স্টার্চ দেওয়া, শরীরে একটু কড়কড়া লাগছে।
আগামীকাল পিলচার আর তার টিমের সঙ্গে দীর্ঘ ব্রিফিং হওয়ার কথা, কিন্তু আজকের দিনটা ছিল একেবারেই ঘটনাহীন।
আর অদ্ভুত।
আট ঘণ্টা ধরে অফিসের নীরবতায় বসে আছে সে। হারিয়ে আছে নিজ চিন্তায়। কেবল একবার চিন্তায় বাঁধা পড়েছিল ফোনের রিংয়ে। দুপুরের দিকে রিসেপশনিস্ট বেলিন্ডা ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিল ইথান লাঞ্চে কিছু খেতে চায় কি না, তাহলে সে আনানোর ব্যবস্থা করবে।
কবজি ঘুরিয়ে ঘড়ির ডায়ালের দিকে তাকাল। মিনিটের কাঁটাটা বারো ছুঁয়ে ফেলেছে।
বিকাল পাঁচটা বাজে।
টেবিল থেকে বুট নামিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। মাথায় স্টেটসন হ্যাট চাপিয়ে পিতলের তারাটাকে গুঁজে নিল পকেটে। হয়তো কাল নিজেকে রাজি করাতে পারবে, ওটা বুকের ওপর পিন করে লাগাতে।
অথবা হয়তো পারবে না।
যেকোনো নতুন কাজে প্রথম দিনের মতো আজকের দিনটাও ছিল দীর্ঘ। স্বস্তির বিষয় যে অবশেষে শেষ হয়েছে।
তিনটে পুরনো বন্দুকের ক্যাবিনেটের দিকে এক ঝলক লালসাময়, ক্ষণস্থায়ী দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ল অফিস রুম ছেড়ে। রিসেপশনের দিকে এগিয়ে চলল অলস পায়ে।
বেলিন্ডার পুরো ডেস্কে তাস ছড়ানো।
“আমি বের হচ্ছি,” ইথান বলল।
সাদা চুলের মহিলা স্পেডের টেক্কাটা নামিয়ে রেখে মাথা তুলে তাকাল। উষ্ণ একটা হাসি দিল ইথানের উদ্দেশ্যে, যদিও সেই হাসি তার চোখ স্পর্শ করল না, বোঝা গেল না ও দু’টোর পেছনে ধূসর মগজটায় কী চলছে। “প্রথম দিন কেমন গেল?”
“ভালোই।”
“শুভরাত্রি, শেরিফ। সকালে দেখা হবে।”
***
সন্ধ্যাটা ঠাণ্ডা আর পরিষ্কার।
সূর্যটা ইতোমধ্যে পাহাড়ের আড়ালে নেমে পড়েছে। বাতাসে হিম ভাব, মৌসুমের প্রথম তুষারের আগমনী বার্তা জানাচ্ছে নীরবে।
ইথান নিস্তব্ধ এক পাড়ার ফুটপাত ধরে হাঁটছে।
নিজ বাড়ির বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে দোল খেতে থাকা এক বৃদ্ধ ডেকে উঠল, “শুভ সন্ধ্যা, শেরিফ!”
ইথান হাত উঠিয়ে আলতো করে টুপি স্পর্শ করল। প্রত্যুত্তরে লোকটাও হাতের ধোঁয়া ওঠা মগটা তুলে দেখাল।
যেন টোস্ট করছে।
কাছাকাছি কোথাও এক নারী কণ্ঠ ডেকে উঠল, “ম্যাথিউ! ডিনারের সময়!”
“আর পাঁচ মিনিট, মা!”
“না, এখনই!”
ওদের কণ্ঠস্বর উপত্যকা জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে মিলিয়ে গেল।
হাঁটতে হাঁটতে পরের রাস্তায় চলে এলো সে। এই গোটা ব্লকটাই কমিউনিটি গার্ডেন। ডজনখানেক মানুষ ব্যস্ত ভঙ্গিতে কাজ করে যাচ্ছে, ফল আর সবজি ভরে নিচ্ছে বড় বড় ঝুড়িতে।
পাকা আপেলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।
ইথান যেদিকেই তাকাচ্ছে, ঘরের ভেতর আলো জ্বলে উঠছে, বাতাস ভরে উঠছে রাতের খাবার রান্না হওয়ার গন্ধে।
আধখোলা জানালা দিয়ে ভেসে আসছে বাসনকোসনের শব্দ, অস্পষ্ট কথাবার্তা, ওভেন খোলা-বন্ধের আওয়াজ।
যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, সবাই হাসছে, সম্ভাষণ জানাচ্ছে।
যেন নরম্যান রকওয়েলের কোনো ছবিই জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
***
সে মেইন স্ট্রিট পার হয়ে সিক্সথ স্ট্রিট ধরে আরও কয়েক ব্লক হাঁটল। অবশেষে পৌঁছে গেল পিলচারের দেয়া ঠিকানায়।
তিনতলা ভিক্টোরিয়ান বাড়ি। ক্যানারি হলুদ রং, সাদা ট্রিম। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য হলো টিনের ছাদের ঢালের ঠিক নিচে অশ্রুবিন্দুর মতো আকৃতির একটা জানালা।
নিচতলার বড় জানালা দিয়ে একজন মহিলাকে দেখতে পায় সে, রান্নাঘরের সিঙ্কে দাঁড়িয়ে আছে। ফুটন্ত পাস্তার হাঁড়িটা ঢেলে দিচ্ছে ঝাঁঝরিতে। গরম ভাপ উঠে ঢেকে দিচ্ছে তার মুখ।
ইথান তাকিয়ে রইলো তার দিকে। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে।
ওই নারী তার স্ত্রী। থেরেসা।
পাথুরে পথ ধরে সামনের উঠোন পেরিয়ে, তিন ধাপ ইটের সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠল সে।
স্ক্রিন দরজায় টোকা দিল।
এক মুহূর্ত পর আলো জ্বলে উঠল ভেতরে।
থেরেসা দরজা খুলে দিল, কাঁদছে সে। স্ক্রিনের ওপার থেকে তাকিয়ে ইথানের দিকে। হুড়মুড় সিড়ি ভেঙে এগিয়ে আসছে আরেক জোড়া পায়ের আওয়াজ।
ইথানের ছেলে তার মায়ের পেছনে এসে দাঁড়াল, দু’হাত রাখল মায়ের কাঁধে।
“হাই, ড্যাড।”
কণ্ঠটা কোনো ছোট বাচ্চার নয়।
“জিসাস, তুই তো তোর মায়ের থেকেও লম্বা হয়ে গেছিস!”
এখনও তাদের মাঝে স্ক্রিন দরজাটা আছে। তবু তারের জালের ভেতর দিয়ে থেরেসাকে প্রায় আগের মতোই লাগছে, শুধু সোনালি চুলটা অনেক লম্বা রেখেছে আগের চেয়ে।
“শুনেছি ওরা তোমাকে শেরিফ বানিয়ে দিয়েছে,” বেন বলল।
“হ্যাঁ।” আবেগে ঠাসা একটা দীর্ঘ মুহূর্ত কেটে গেল।
“থেরেসা।” তার স্ত্রী দু’হাত দিয়ে চোখ মুছতে থাকে।
“দারুণ গন্ধ ছড়াচ্ছে,” ইথান বলল।
“স্প্যাগেটি রান্না করছি।”
“তোমার স্প্যাগেটি আমার খুব পছন্দ।”
“আমি জানি।” তার গলা ভেঙে এলো। “ওরা কি তোমাকে বলেছিল যে আমি আসছি?”
সে মাথা নাড়ল। “তুমি সত্যিই এসেছ, ইথান?”
“হ্যাঁ।”
“এবার থেকে থাকছ?”
“আমি আর কখনও তোমাদের ছেড়ে যাব না।”
“আমরা কতদিন অপেক্ষা করেছি।” সে আবার চোখ মুছতে লাগল। “বেন, গিয়ে সসটা নেড়ে দিয়ে আয় তো, বাবা।”
ছেলেটা দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
“আমি কি ভেতরে আসতে পারি?” ইথান জিজ্ঞেস করল।
“আমরা তোমাকে সিয়াটলে হারিয়েছিলাম। তারপর এখানেও হারালাম। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। ও-ও পারছে না।”
“থেরেসা, আমার দিকে তাকাও।” সে তাকাল। “আমি আর কখনও তোমাদের ছেড়ে যাব না।”
ইথানের ভয় হচ্ছিল যে থেরেসা প্রশ্ন করবে কী হয়েছিল তার সাথে, কেন সে মরেনি। সারাদিন ধরে নিজেকে প্রস্তুত করেছে প্রশ্নটার জন্য।
কিন্তু প্রশ্নটা এলো না।
তার বদলে, সে দরজা খুলে দিল।
ইথানের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল যে স্ত্রীর চেহারায় রাগ দেখবে। কিন্তু বারান্দার আলোয় তেমন কিছুই দেখল না। বয়সের সাথে ভাঁজ পড়েছে চামড়ায়। ঠোঁটের কোণে বলিরেখা জমেছে। জমেছে দুই চোখের কোণেও, যে উজ্জ্বল সবুজ চোখ জোড়া একসময় তাকে মুগ্ধ করেছিল। আজ সেই চোখে অনেক কান্না। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে ভালোবাসা।
অনেক অনেক ভালোবাসা।
ইথানের হাত ধরে টেনে চৌকাঠ পার করে ভেতর নিয়ে এলো থেরেসা।
স্ক্রিন দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল আপনাতেই।
ঘরের ভেতর একটা ছেলে কাঁদছে।
একজন পুরুষ কান্না চেপে রাখতে চেয়েও পারছে না।
তিনজন মানুষ এক ভয়ংকর শক্ত আলিঙ্গনে জড়িয়ে আছে, ছাড়ার কোনো ইচ্ছে নেই।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, বাইরে রাস্তায় বাতিগুলো জ্বলে উঠল। বারান্দার ধারে ঝোপের ভেতর কোথাও একটা শব্দ শুরু হলো; সমান তালে, নিখুঁত বিরতিতে।
একটা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
***
