(নবম অধ্যায়)
“মিস্টার ঘোষ, শুনতে পাচ্ছেন?”
আওয়াজটা যেন দূর থেকে ভেসে আসছে। অচেনা গলার আওয়াজ। মাথার কাছে একটা ঝিনঝিনে ব্যথা। সেই সঙ্গে কোমর আর পায়ের বেশির ভাগ অংশ আদৌ আছে বলে মনে হচ্ছে না। ধীরে কাঁপা-কাঁপা চোখের পাতা সরে গেল। চোখ মেলে একটা অচেনা মুখ চোখে পড়ল শতরূপের। ওকে চোখ মেলতে দেখে লোকটার মুখে একটা স্বস্তির রেখা খেলে গেল— “সামান্য ব্রেন ইনজুরি আছে, আজকের দিনটা বিছানা থেকে না উঠলেই ভালো।”
কোমরে ভর দিয়ে বসার চেষ্টা করল শতরূপ, কিন্তু তীব্র যন্ত্রণায় আবার নুয়ে পড়ল শরীরটা।
“উঁহু, নিজে থেকে একদম উঠতে যাবেন না…”
মাথার কাছে ঘড়িটার দিকে চোখ পড়ল। সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে। মানে রাত থেকে এভাবেই পড়ে ছিল বিছানায়।
“আমি ডাক্তার মুখার্জি, জংলুর কাছে শুনেছেন মনে হয় আমার কথা… বিনিদের…”
“ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান…” বিছানায় সুবিধাজনক একটা অবস্থান খুঁজতে খুঁজতে বলে রূপ।
“আপনি পড়ে গেলেন কী করে বলুন তো?” লোকটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে ওর মুখের দিকে চায়।
ও মনে করার চেষ্টা করে। ঢোঁক গিলে বলে, “কী যেন দেখতে পেয়েছিলাম মন্দিরের ছাদ থেকে। তারপর পা পিছলে…”
“সে কী! ফেব্রুয়ারি মাস! শীতের দিনে খটখটে শুকনো ছাদ থেকে পা পিছলে গেল!”
“একটা আলগা ইটের উপর পা দিয়েছিলাম।”
“বেশ…” ডাক্তার মুখার্জি এবার সোজা হয়ে বসেন— “মাথাব্যথা নেই তো তেমন?”
দু-দিকে মাথা নাড়ায় রূপ- “হালকা চিনচিনে একটা ব্যথা আছে।
ঘাবড়ানোর মতো কিছু নয়। বিনি ঘুমোচ্ছে?”
“আপনি পড়ে যাওয়ার পর বিনয় আর ও মিলে এখানে নিয়ে আসে আপনাকে। সারারাত জ্ঞান ছিল না। ঘুমের ঘোরে কী সব যেন….”
সোমাকে ঘরে ঢুকতে দেখা গেল। তার মুখেও দুশ্চিন্তার ছাপ। পাশের চেয়ারটায় বসতে বসতে বললেন, “বাড়িতে আপনার সঙ্গে কে থাকে, মিস্টার ঘোষ? একটু খবর দিলে ভালো হত…”
“কাউকে খবর দিতে হবে না, আমি একাই থাকি…”
“কোনও আত্মীয়স্বজন?”
দু-দিকে মাথা নাড়ে রূপ। ডাক্তার মুখার্জির দিকে চেয়ে বলে, “কাল রাতে কী বলছিলাম?”
ডাক্তারের মুখ থেকে কথা কেড়ে নেয় সোমা, “ঠিক বুঝতে পারলাম না, তবে শুনে মনে হল, কারা যেন তাড়া করেছে আপনাকে। আপনি ছুটে একটা ঘরে ঢুকে বাঁচতে চাইছেন। কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না। ভালো কথা…” প্রসঙ্গটা দ্রুত বদলে নেয় সোমা, “স্যার বলেছিলেন, জ্ঞান ফিরলে একবার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমি তাহলে…”
“এখন না…” হাত তুলে বাধা দেয় রূপ, “ভালো লাগছে না। একটু পরে করবেন…”
ডাক্তার মুখার্জি এতক্ষণ পাল্স দেখছিলেন। এবার মুখ তুলে বললেন, “বিনয়ের মুখ থেকে কেউ পড়ে গেছে শুনে আমি প্রথমে বিনির কথাই ভেবেছিলাম। তারপর শুনলাম যখন আপনি পড়ে গেছেন….
“আপনি ছোট থেকেই দেখছেন বিনিকে?”
“হ্যাঁ, তা একরকম বলা যায়। এ তল্লাটে তেমন ডাক্তারপাতি তো নেই বলতে গেলে….”
“তখন থেকেই ঐন্দ্রিলা চুপচাপ?”
কিছুক্ষণ কী যেন ভাবেন ডাক্তার মুখার্জি, তারপর বলেন, “হ্যাঁ, ওর নিজস্ব একটা কল্পনার জগৎ আছে। সেটা নিয়ে থাকতেই ভালোবাসে। ছোট থেকে তেমন ভালো বাপ-মা পেয়ে মানুষ হয়নি তো। বাপ-মায়ের সঙ্গে থাকতে ওদের বাড়িতে মাঝেমধ্যেই ডাক পড়ত আমার…”
“কেন? কোন রোগজাতীয় কিছু?”
“উহু… মেইনলি দুটো কারণে। ওর বাবা মাঝে মাঝে মেরে ওকে আর ওর মা-কে রক্তাক্ত করে দিত। কোনওদিন অত্যাচার বেশি হলে ডাক্তার ডাকতে হত। তা ছাড়া বিনি মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে পালিয়ে যেত। ফিরে এসে এক ধরনের জ্বর হত ওর… সম্ভবত জঙ্গলে ঘুরে পোকামাকড়ের কামড় খেয়ে…”
“পালিয়ে যেত কোথায়?”
কাঁধ ঝাঁকান ডাক্তার মুখার্জি, “ছোট থেকেই ওরকম স্বভাব। আমি মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করতাম, বলত ওর নাকি জঙ্গলে অনেকগুলো বন্ধু আছে…. একটা দৈত্য…”
“দৈত্য! কেমন দৈত্য?”
ছেলেমানুষের খেয়াল। অত মন দিয়ে কি শুনতাম আর? তবে কী জানেন মিস্টার ঘোষ, আমাদের এই একাকিত্ব, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া—এ-ও জমতে জমতে একসময় দৈত্য হয়ে যায়। কখনো কখনো সেই দৈত্যটার সঙ্গে বন্ধুত্বও হয়ে যায়… একটা দিনের কথা মনে পড়ছে, সেদিন কেমন একটা সন্দেহ হয়েছিল, জানেন?”
“কোনদিন?”
ডাক্তার মুখার্জি স্মৃতি হাতড়ানোর চেষ্টা করলেন, “তখন ওর বয়স আট কি নয় হবে। একদিন ওর মা ফোন করে বলল, মেয়ে নাকি আবার না বলে বেরিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে। ওর বাবা ফিরিয়ে এনে উত্তম-মধ্যম দিয়েছে। মার খেয়ে একরকম অজ্ঞান হয়ে পড়েছে বিনি। আমি গিয়ে ওষুধপত্র দিলাম। দিতে দিতেই একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলাম।”
“কী জিনিস?”
“বিনির হাতে সেদিন রক্ত লেগে ছিল। অথচ ওর শরীরের কোথাও রক্ত বেরোনোর মতো ক্ষত হয়নি। মানে রক্তটা ওর নিজের নয়। মা-কে জিজ্ঞেস করে জানলাম, বাবার শরীরেও রক্ত ছিল না। মানে রক্তটা বাইরে বেরিয়েই লেগেছিল কোনওভাবে। বিনি যদি একাই ঘুরে বেড়ায় তাহলে রক্তটা কার?” শতরূপ হাত ভাঁজ করে কপালের উপরে রাখে, মুখে কিছু বলে না। কোথায় একটা ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে ওর মনের ভেতর।
“বিনির শরীরে এমন কোনও জায়গা নেই, যেখানে মারের দাগ নেই। ওইটুক একটা মেয়েকে জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে ছ্যাঁকা দিত ওর বাবা। যে জিনিসটা ওর ভালো লাগত, সেটা আঁকার খাতা হোক কি কুকুরছানা, সেটাকেই ওর সামনে হয় মেরে ফেলত না হয় …”
“ওর বাবা এসব কেন করত বলুন তো? মানে এত রাগের কারণটা কী?”
“সেটা বলা মুশকিল, ভদ্রলোকের সঙ্গে তেমন কথাবার্তা কোনওদিনই হয়নি আমার। তবে ওর মায়ের সঙ্গে হত। তিনি আবার একটা অদ্ভুত দাবি করতেন।”
“কীরকম দাবি?”
“বলতেন বিনি নাকি সাধারণ মেয়ে নয়। ওর জন্মের পেছনে নাকি কী সব তন্ত্রমন্ত্র আছে…
“বুলশিট, আপনি বিশ্বাস করতেন এসব!”
“সার্টেনলি নট। মহিলা এমনিতেই একটু সুপারস্টিশাস ছিলেন। তার উপরে বিনির ওই চোখের ক্ষমতাটা…” থেমে যেতে গিয়েও থামলেন না ডাক্তার মুখার্জি, “ছোট থেকে বিনিকে দেখতে গিয়ে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করেছি, জানেন, ওর মনের মতো শরীরেও কিছু জটিলতা আছে।”
“কেমন জটিলতা?”
“বলে বোঝানো মুশকিল। ওর একটা ন্যাচারাল হিলিং প্রপার্টি আছে। মানে কোথাও কেটে বা ছড়ে গেলে সেগুলো সারতে অন্য পাঁচটা মানুষের থেকে কম সময় লাগে ওর। শেষবার যতটা উঁচু থেকে লাফ দিয়ে নীচে পড়েছিল, তাতে ওর বেঁচে থাকার কথা নয়। তা-ও মেজর ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও বেঁচে গেল। ও এতবার সুইসাইড করার চেষ্টা করেছে—ঘুমের ওষুধ খেয়ে, ছাদ থেকে লাফ দিয়ে, শিরা কেটে। হয়তো এই হিলিং প্রপার্টির জন্যেই তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি….”
ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল শতরূপ, বিড়বিড় করে বলে, “যেন কেউ ওকে মরতে দিতে চাইছে না, তা-ই না? আচ্ছা, এই ব্যাপারটা কতটা স্বাভাবিক? এই হিলিং প্রপার্টির ব্যাপারটা?”
“খুব একটা অস্বাভাবিক নয়, লাখে একটা উদাহরণ খুঁজলে পাওয়া যাবে…”
প্রেসক্রিপশনটা সোমার হাতে দিয়ে উঠে পড়েন ডাক্তার মুখার্জি। শতরূপ আবার মাথাটা এলিয়ে দেয় বিছানায়।
বাকি দিনটা সেইভাবেই পড়ে থাকে। মনের ভেতর অনেকগুলো ঝড় একসঙ্গে উঠেছে। বারবার কার সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে যেত বিনি? শুধুই কি কাল্পনিক কেউ?
কীসের একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙে যায় শতরূপের। কিছু স্বপ্ন দেখছিল কি? হুড়মুড় করে উঠে বসে বিছানার উপর। ঘরটা নিকষ অন্ধকারে ভরে আছে। খেয়াল করে, ওর সমস্ত গা ঘামে ভিজে গেছে। পাশে পড়ে থাকা জামাটা দিয়ে কোনওরকমে গা-টা মুছে নেয়। তারপর হাত বাড়ায় আলোর সুইচের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে একটা গলার আওয়াজ শুনে থমকে যায়, “আলো জ্বালাস না। আমার চোখে লাগে।”
“তুই!”
ছিটকে পেছনে ফেরে শতরূপ। অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না মানুষটাকে। কেবল চাঁদের আলোয় চেহারার আউটলাইন চোখে পড়ে। ঐন্দ্রিলা বসে আছে ওর মাথার পাশের চেয়ারটায়।
“তুই কখন এলি এখানে?”
“সময় তো দেখে রাখিনি। ঘণ্টাখানেক হবে…”
“কী করছিলি এতক্ষণ বসে বসে?”
“শুনছিলাম।”
“কী শুনছিলিস?”
“ঘুমের সময় মানুষ সব থেকে বেশি সৎ, জানিস? মুখ কী বলছে-না বলছে, কিছুই মাথায় থাকে না…”
“আমি স্বপ্ন দেখছিলাম?” বলতে বলতে মুখ ফিরিয়ে নেয় শতরূপ। এই মুহূর্তে কোনও জামা নেই ওর গায়ে। লজ্জা লাগে। চাদরটা আরও ভালো। করে টেনে নেয় গায়ে। লজ্জাটা কাটাতেই বলে, “আজ তো বারান্দায় যেতে পারব না… রাতে ঘুমিয়ে নিতে পারতিস।”
“যেতে পারব না! কে বলেছে যেতে পারব না?”
“বেশ, তাহলে যা।”
“ও মা! আমি একা নই, তুইও যাবি… না হলে আমাকে গল্প বলবে কে?” অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয় শতরূপের। এর আগে বহু মানুষকে গল্প শুনিয়েছে ও, কয়েকটা লাইভ স্টোরি রিডিং সেশনে অতিথি হয়েও গিয়েছিল। এমন অদ্ভুত শ্রোতা কোথাও পায়নি।
গল্প শোনার একটা নেশা আছে ঐন্দ্রিলার। বানানো গল্প, যার মধ্যে কোনও সত্যি নেই, সেটা এত যে কেন শুনতে ভালো লাগে ওর কে জানে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “গল্প শুনতে এত ভালো লাগে কেন বল তো তোর? খামোখা কয়েকটা সাজানো মিথ্যে কথা…”
‘গল্প মানে তো মিথ্যে নয়। আসল মিথ্যে কথা হল চুপ করে থাকাটা। কাউকে সত্যিকারের চিনতে গেলে তার গল্পগুলো জানতে হয় আগে…
“আমাকে চিনে কী হবে তোর?”
“তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু না? তোকে চিনলে হয়তো নিজেকেই চিনতে পারব।”
শতরূপ কোমরে ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করে আবার। তারপর বলে, “বাইরে বেশ ভরা চাঁদের আলো আছে, না রে? আমি আর-একটু সুস্থ হলে আমাকে তোর পছন্দের কোনও জায়গায় নিয়ে যাবি?”
“কোন্ জায়গায়?”
“কী জানি, তুই ছেলেবেলায় কোথায় কোথায় যেন পালিয়ে যেতিস রাতের বেলা। যদি মনে পড়ে…”
ঠোঁটে আঙুল রেখে কয়েক সেকেন্ড ভাবে ঐন্দ্রিলা –“কয়েকটা জায়গার কথা মনে পড়েছে।”
“কোন জায়গা?”
“রংপুরের মাঠে। মাঠের পাশে একটা বড় দিঘি আছে, জানিস? এরকম জ্যোৎস্নায় দিঘির ধারে ঘাসের উপর পা ঝুলিয়ে বসলে চারটে করে ছায়া পড়ে।”
“সে কী! একটা চাঁদে চারটে করে ছায়া পড়বে কী করে?”
চেয়ার থেকে উঠে ওর পাশে এসে বসে পড়ে বিনি, ওর গায়ের উপর একটা হাত রেখে বলে, “কত কিছু দেখানোর আছে তোকে। এক-জীবনে শেষ হবে না… চল, বারান্দায় গিয়ে বসি।”
“না না, ডাক্তার একা উঠতে বারণ করেছে…”
“একা বারণ করেছে, আমি আছি তো। ভয়ের কিছু নেই…”
ওর একটা হাত নিজের কাঁধে তুলে নেয় ঐন্দ্রিলা। তারপর পেটের পাশে হাত দিয়ে বলে, “শক্ত করে ধর আমাকে।”
কোনওরকমে উঠে পা দুটো মাটিতে ফেলতেই চিনচিনে একটা ব্যথা সাপের মতো পা বেয়ে উঠে আসে। হাড় ভেঙেছে কি না কে জানে। বিছানা থেকে উঠতেই একটু আগের মাথার ব্যথাটা ফিরে এল আবার। সমস্ত শরীর শুয়ে পড়তে চাইছে।
ঐন্দ্রিলার কাঁধটা আরও শক্ত করে ধরে। একরকম তার কাঁধের উপর ভর দিয়েই বারান্দায় এসে উপস্থিত হয় দুজনে। বেতের চেয়ারে রূপকে শুইয়ে দেয় ঐন্দ্রিলা। রোজকার মতোই একটা একটা করে জ্বালিয়ে দেয় হলদে ল্যাম্পগুলো। তার বৃত্তাকার আলো ছড়িয়ে পড়ে কিছু দূরে। বাইরের খোলা হাওয়া শনশনিয়ে ঝাপটা মেরে যায় মুখে।
আজও দূরে দেখা যাচ্ছে ভুটান পাহাড়। আজও পাহাড়ের ঘন জঙ্গলের গায়ে গুপ্তধনের সংকেতের মতো আলো জ্বলছে। এই হলদে আলোর ছটায় কেমন মায়াময় লাগছে ঐন্দ্রিলাকে। শুধু মায়াময় নয়, কোথায় যেন তার মধ্যে একটা চোরাদৃষ্টি লুকিয়ে আছে। ছুরির ফলার মতো ধারালো।
“এই বেশ ভালো হয়েছে, কী বল? আর এদিক-ওদিক যেতে পারবি না তুই, সারাদিন বসে বসে গল্প শোনাবি আমায়। নে, শুরু কর এবার…” একটা সিগারেট জ্বেলে তাতে অগ্নিসংযোগ করে ওর ঠোঁটের কাছে এগিয়ে দেয় ঐন্দ্রিলা। তাতে লম্বা একটা টান দিয়ে রূপ বলে, “বেশ, শুরু করছি। আগে বল, কোন ধরনের গল্প সব থেকে ভালো লাগে তোর?”
“সেই গল্পগুলো, যাতে কথককে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না…. “আনরিলায়েবল ন্যারেটর! কেন?”
“ওই যে সবসময় একটা মিথ্যের ভয়, মানুষ বাস্তবে যতটা সব কিছু নিশ্চিত করতে চায়, গল্পে ততটাই ভালোবাসে ধাক্কা খেতে। একটা ঠিকঠাক ধাক্কা না হলে গল্প বড্ড ম্যাড়মেড়ে হয়ে যায়। এই যেমন ধর… আগের দিন তুই পড়ে গেলি ছাদ থেকে; তোর জীবনে একটা গল্প তৈরি হল। যে গল্পটা তুই ছাড়া অন্য কেউ জানে না…”
“বটে! কীরকম গল্প?”
“উপর থেকে নীচে পড়ার ঠিক আগের কয়েক সেকেন্ডের অভিজ্ঞতা সবার হয় না। তুই জানিস না পরের মুহূর্তে বাঁচবি না মরবি, তোর মাথাটা আগে পড়বে না পা? ওই একটা মুহূর্তের অনিশ্চয়তা কতকগুলো দরজা খুলে দিয়েছিল, তা-ই না?”
“কী বলতে চাইছিস তুই?”
“সেদিন ছাদের উপর দাঁড়িয়ে তুই হয়েছিলি অ্যালিস, যাকে দেখে তুই পাঁচিলের ধারে গিয়েছিলিস, সে সেই খরগোশটা…”
“আর তুই?”
“আমি পাঠক। যে প্রতিমুহূর্তে একটা ধাক্কা ভালোবাসে।”
কিছুক্ষণ আর কোনও কথা বলে না রূপ। চুপ করে বসে দূর প্রান্তের দিকে চেয়ে থাকে। মাথার ঝিমঝিম ব্যথাটা কমে আসছে। একসময় বলে, “আমি জানি, আগের থেকে অনেক বেশি কিছু মনে পড়েছে তোর…. ঠিক করে বলবি আমাকে?”
“বলে লাভ?”
“তাহলে সেগুলো আর বলব না…”
“আচ্ছা বেশ, বলব। কিন্তু তার আগে একটা শর্ত আছে।”
“কী?”
“তোকেও নিজের সম্পর্কে কিছু বলতে হবে। আমার এক বান্ধবী বলত ভালো বন্ধু হওয়ার ওই নিয়ম। সিক্রেট আদানপ্রদান…”
“বেশ, কিন্তু আমার সম্পর্কে কী বলি?”
“কাল রাতে যা বলছিলি, তার উলটো কিছু… কোন জিনিসটা তোকে সব থেকে বেশি কষ্ট দেয়? কাল ছাদ থেকে পড়ার আগে যখন মনে হচ্ছিল জীবনের শেষ কয়েকটা মুহূর্ত উপস্থিত, নিজেকে সান্ত্বনা দিতে কোন ঘটনার কথা মনে করছিলি?”
শতরূপের মুখে একটা হাসি ফুটে ওঠে— “মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেছি। আমাকে সবাই খুঁজতে এসেছে। আমি চিৎকার করছি, ‘আমি এইদিকে’, বারবার ওই একই কথা বলে চেঁচিয়ে যাচ্ছি… ওরা লোকজন নিয়ে টর্চ জ্বেলে খুঁজছে আমাকে। এমন সময় হঠাৎ দেখি, আমার মতো কাকে যেন খুঁজে পেয়ে গেছে ওরা… আমারই মতো দেখতে, আমার যা আছে, তারও সব কিছু আছে, আমার থেকে আরও বেটার একজন, অবিকল আর-একটা রূপ…. খুব খুশি হয়েছে তাকে পেয়ে…. ওকে সঙ্গে নিয়ে ওরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে… আমি ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। তারপর একসময় আর ডাকছি না ওদেরকে… ওদের আওয়াজ দূরে হারিয়ে যাচ্ছে… আমি সরে আসছি আরও গভীর জঙ্গলে…”
ঐন্দ্রিলা সরে আসে ওর দিকে— “কী যায় আসে তাতে? পৃথিবীতে উপভোগ করার মতো কত কিছু আছে; টাকাপয়সা আছে, সেক্স আছে, ঘুরতে যাওয়ার মতো জায়গা আছে, কয়েকটা মানুষের না-চেনাতে কী যায় আসে?”
সিগারেটটা ছুড়ে রেলিং-এর বাইরে ফেলে দেয় শতরূপ— “মানুষ আসলে কী চায় বল তো?”
“কী?”
“ভয় পেতে….”
“কীসের ভয়?”
“মানুষ চায়, তার জীবনে এমন কিছু থাকুক, যেটা সে হারিয়ে ফেলার ভয় পায়। স্পর্শ করার মতো একটা শরীর, পাসবই খুলে চেক করার মতো ব্যাংক ব্যালেন্স, ঘুম থেকে উঠে পাশের বালিশে একটা মুখ… এসব সে ভালোবাসে, কারণ এগুলো হারিয়ে ফেলার ভয় পায়… যদি ভয় না থাকত তাহলে চাইত না…”
“তোর হারিয়ে ফেলার মতো কিছু নেই?”
“আমার হারিয়ে ফেলার ভয় নেই।”
“তা-ই? এই সন্ধ্যাটা হারিয়ে ফেলার ভয় নেই?”
“কেন? ভয় পাব কেন? কী আছে এই সন্ধ্যায়?”
“আমি, তুই, ওই হলদে আলোগুলো? আমি তোর এতদিনের বন্ধু! আর কিছু না হোক, মন খুলে এই কথাগুলো তো বলতে পারিস আমাকে…” শতরূপের বিষণ্ণ মুখে হাসি ফোটে— “তোর আর আমার ছোটবেলাটা খুব সুন্দর ছিল, জানিস? আমি ছোট থেকে একটু চাপা স্বভাবের। দুঃখ হলে সহজে কাউকে কিছু বলতে পারতাম না। কেবল তোকে ছাড়া…”
“আমাকে বলতিস?”
“নির্দ্বিধায়। তোর কাছে রাখা থাকত আমার দুঃখগুলো। আমার মায়ের থেকে দূরে চলে যাওয়ার দুঃখ, আমার বাবার মরে যাওয়ার দুঃখ, যেদিন বাবা মারা গিয়েছিল, সেদিন বাড়ি ফিরে তোকে জড়িয়ে ধরে খুব করে কেঁদেছিলাম, কাঁদতে কাঁদতে তোর কাছে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম… রেডিয়ো স্টেশনে প্রথম দিন প্রথমবার সারা কলকাতা জুড়ে শোনা যাবে আমার গলা… প্রচণ্ড নার্ভাস লাগছে… আমি চোখ বন্ধ করে তোর কথা ভাবছিলাম… জানতাম, এই পৃথিবীতে আর কিছু থাক-না থাক, তুই থাকবি… কখনও ছেড়ে যাবি না আমাকে…”
“আর আমি? আমি কী ভাবতাম?”
“তুইও তা-ই, তোর একটা পোষা কুকুর কীভাবে জানি মারা গিয়েছিল, ছুটে এসেছিলি আমার কাছে—’রূপ, আমি ওকে ছেড়ে থাকতে পারব, রূপ?’ আমি মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করেছিলাম তোকে। একটা ছাদ ছিল আমাদের, সে ছাদের বেঞ্চে সারারাত বসে থাকতাম আমরা… কান্না শেষ হলে চোখের জল মুছে দিতাম… তখন চাঁদের আলো এসে পড়ত তোর মুখে, ভারী মিষ্টি দেখাত….”
“সত্যিই খুব সুন্দর ছিল না আমাদের ছোটবেলাটা? কজন পায় বল তো এরকম?”
হঠাৎ একটা অদ্ভুত কাজ করে ঐন্দ্রিলা। সে নিজের হাতটা আলতো করে রাখে শতরূপের হাতের উপর। তারপর চাপা গলায় বলে, “লোকে বলে, স্পর্শের একটা স্মৃতি থাকে। হয়তো তোর গলার আওয়াজ ভুলে গেছি, ঘটনাগুলো ভুলে গেছি, স্পর্শটা মনে আছে হয়তো…. আমাদের ছেলেবেলাটা খুব স্পর্শ করতে ইচ্ছে করছে….”
শতরূপ কিছু বলে না। খোলা চোখে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। কী যেন খুঁজতে থাকে। একসময় চোখ স্থির হয়ে যায়। ঐন্দ্রিলা সেদিকে তাকিয়ে বলে, “রোজ রাতে ওই তারাটার দিকে তাকিয়ে থাকিস কেন বল তো?”
“হ্যাঁ?” চমক ভেঙে ঐন্দ্রিলার দিকে তাকায় শতরূপ।
“যে ক-দিন এখানে এসে বসছি, খেয়াল করেছি, তুই ওইদিকেই তাকিয়ে থাকিস। কী আছে ওই তারাটায়?”
“আমার দাদু বলত, আমাদের সব ভালো ভালো স্মৃতি নাকি তারায় জমা থাকে। কে জানে, এখন রকেট নিয়ে ওই তারাটায় গেলে হয়তো সব স্মৃতিকে দেখতে পাব নাটকের মতো ঘটে চলেছে…” কথাটা বলেই প্রসঙ্গটা পালটে নেয় শতরূপ, “আমার সিক্রেট বললাম, এবার শর্তের উলটোদিকটা?”
“কোনদিক?”
“তুই বল, তোর কী মনে পড়েছে?”
“ও হরি! তুমি ভোলোনি দেখছি!”
“লেখক মানুষ, গল্পের শেষে পাওনা বুঝে নিতে ভুলি না।”
ঐন্দ্রিলা ঠোঁট কামড়ায়, “আমার মনে পড়েছে… তোর কথা… “আমার কথা! মানে?” অবাক চোখে তাকায় শতরূপ। “কেন? আমার ছোটবেলায় এতটা সময় জুড়ে তুই ছিলি… তোর কথা মনে পড়বে না কেন?”
“না, সে ঠিক আছে। কিন্তু …”
ওর হাতটা এখন প্রায় সাপের মতো আঁকড়ে ধরেছে ঐন্দ্রিলা –“তোর দুঃখ হলে এভাবেই তোর হাতটা চেপে ধরতাম আমি… তা-ই না? বল…”
“হ্যাঁ এভাবেই, তারপর একটা সুর গুনগুন করতাম তোর কানের কাছে। সুরটা শুনলেই ঘুমিয়ে পড়তিস। তুই ঘুমিয়ে পড়লে তোকে অনেক কথা বলতাম আমি। একটা কথাও তোর কানে যেত না। যখন কেউ চিনত না তোকে, তখন আমি চিনতাম খালি…..”
“তোর সত্যি মনে পড়েছে এত কথা?”
“সেদিন যখন জঙ্গলে তোর বুকে মাথা রাখলাম, তারপর থেকেই মনে পড়েছে আস্তে আস্তে…. বলেছিলাম না, আমাদের স্পর্শের মধ্যে একটা স্মৃতি….”
হঠাৎ করেই শতরূপ অনুভব করে, ঐন্দ্রিলার হাতটা ভারী নরম স্পর্শ বুলিয়ে যাচ্ছে ওর হাতে। লোমগুলো খাড়া হয়ে যাচ্ছে। মনে হয় এই স্পর্শ সত্যিই যেন দীর্ঘদিনের চেনা, ছোটবেলার কোন ডিসেম্বরের শীতে লেপের তলায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে যখন প্রোফেসর শঙ্কু পড়তে পড়তে শিরশিরানি খেলত ওর বুকে… তখন লেপের উষ্ণ ছোঁয়া ঠিক এই স্পর্শ দিয়েছে শরীরে। কিংবা ফিজিক্স কোচিং-এ পাশে বাবু হয়ে-বসা কিশোরীর হাঁটুর সঙ্গে যখন ওর হাঁটু লেগে যেত, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সরিয়ে নিত পা-টা… তার আগে ঠিক এমনই একটা স্পর্শ ওকে কাঁপিয়ে দিয়েছে… আজ এতদিন পরে সেই সমস্ত স্পর্শ ফিরে এসে এখন মোহে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে ওকে…
কে এই মেয়েটা? কেন ওর দিকে তাকালে কিছু একটা খুঁজে পাওয়ার অনুভূতি হয় শতরূপের? এত কিছুর যে খোঁজ ছিল তা তো এতদিন মনেও হয়নি।
“আমার শরীরে অনেকগুলো কাটা দাগ আছে, ব্লেড দিয়ে কাটার মতো….. ওগুলো কী করে হয়েছিল জানিস?”
“ছোটবেলায় পাগলামি করতিস মাঝে মাঝে…”
হাতটা উলটে দেখায় ঐন্দ্রিলা, অসংখ্য শুকিয়ে-যাওয়া কাটাকুটি দাগ খেলা করছে সেখানে। একটার উপর একটা কালচে দাগ উঠে গিয়ে এক বিচিত্র নকশা তৈরি হয়েছে হাতে।
ঐন্দ্রিলা সেগুলোর উপর হাত বুলোতে বুলোতে বলে, “আমাদের শরীরও একটা গল্প বলে, তা-ই না? আর শরীরের গল্পগুলো মিথ্যে হয় না। শরীর আনরিলায়েবল ন্যারেটর নয়…”
“তুই সত্যি করে বল, তোর কী মনে পড়েছে? সত্যি করে…” উত্তেজিত গলায় প্রশ্ন করে শতরূপ।
ঐন্দ্রিলা একটা অদ্ভুত হাসি হাসে। যেন দূরে ঘনায়মান অন্ধকারে ঢাকা পাহাড়চূড়ার মতোই শীতল। তারপর নিজের চেয়ারটা শতরূপের চেয়ারের পাশে টেনে আনে। ওর চাদরটা টেনে নেয় নিজের গায়ে। বলে, “চল, আজ এখানে ঘুমিয়ে পড়ি। তোর ওই তারাটা দেখুক, অন্তত একটা দিন ওর দিকে তাকিয়ে নেই তুই। আজকের রাতটা স্মৃতিগুলোর দিকে তাকিয়ে নেই তুই…. অন্তত একটা রাতের জন্য…”
কী যেন মিশে ছিল ঐন্দ্রিলার গলায়। সত্যিই ঘুম পেয়ে যায় রূপের। মনে হয়, অনেকদিন পরে ও ঘুমোচ্ছে। কী একটা আছে এই মেয়েটার মধ্যে। বুঝতে পারে না সে। কেবল তারাদের টিমটিমে শরীর দেখতে দেখতে এই বারান্দার হলদে আলোয় মিশে যায় শতরূপ। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে…
সকালে ফোনের ভাইব্রেশনে ঘুমটা ভেঙে যায় নীহারিকার। প্রদ্যোৎ ঘুমিয়ে রয়েছে পাশে। স্ক্রিনে সেভ করা নামটা ফুটে রয়েছে, সোমাদি।
ফোনটা রিসিভ করে ঘুম-জড়ানো গলায় নীহারিকা বলে, “ধুর বাবা! ফোন করার সময় পাও না! কতদিন বলেছি, আর্লি মর্নিং ফোন করবে না আমাকে, সারারাত কাজ করে…”
“একটা ঘটনা ঘটেছে, ম্যাম…”
সোমার গলাটা ওর রাতের আলস্য কাটিয়ে দেয়, উঠে বসে বলে, “কী ঘটনা?’
“বিনয় আজ রাতে নতুনদাদা আর বিনিকে নিয়ে ওই মন্দিরে গিয়েছিল…..”
“হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে? ওর কিছু মনে পড়েছে নাকি?”
“তা জানি না…”
“তাহলে?”
“একটু আগেই নতুনদাদা মন্দিরের ছাদ থেকে পা পিছলে পড়ে গেছে নীচে…”
“বেশ তো, তা আমি কী করতে পারি? হসপিটালে নিয়ে যাও….”
একটু ইতস্তত করে সোমা, “ম্যাম, দাদা যখন নীচে পড়েছিল, তখন বিনয় সামনে বসে ছিল। চিৎকার শুনে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখতে পায়, দাদা নীচে এসে পড়েছে। তো বিনয় আমাকে বলেছে…”
“কী বলেছে?”
“দাদা নিজে নিজে পা পিছলে পড়ে যাননি। কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে।”
“কেউ!”
“বিনিদিদি…. ছাদে আর কেউ ছিল না…”
“সে কী! ফেলে দিয়েছে মানে?”
“কেন তা তো বলতে পারব না। বাড়ি এসে এমন ভাব করছে যেন সত্যিই পা পিছলে পড়ে গেছে…”
“অদ্ভুত তো, এর আগে এরকম করেনি ও, তাহলে হঠাৎ…”
“আরও একটা তাজ্জব ব্যাপার আছে, ম্যাম…”
“কী?”
“দাদার একটু আগে জ্ঞান ফিরেছে, উনিও স্বীকার করছেন না যে দিদি ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে। বলছেন, সত্যি পা পিছলে পড়ে গেছেন।” নীহারিকা কিছুক্ষণ কোনও কথা বলতে পারে না। ফোনটা ধরে থাকে চুপ করে। ওপাশ থেকে আবার সোমার গলা ভেসে আসে, “আমার কিন্তু মনে হচ্ছে ম্যাম, এদের দুজনের মধ্যে কিছু একটা ব্যাপার আছে। আপনার আমার থেকে বেশি কিছু একটা জানে ওরা। আপনি পারলে কালকেই এখানে চলে আসুন।”
সকালে জংলুর ডাকে ঘুম ভাঙে শতরূপের। সোমাদিরও গলা শোনা যায়। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে এখনও বারান্দায় শুয়ে আছে ও। একটার বদলে দুটো চাদর ফেলা আছে গায়ে। ঐন্দ্রিলা উঠে যাওয়ার সময় ওর গায়ে দিয়ে গেছে নিজের চাদরটা।
সোমাদি দাঁড়িয়ে আছে সামনে। ওকে চোখ মেলতে দেখে বলে, “আপনি এখানে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন দাদা!”
“বারান্দায় এসে ঘুম পেয়ে গেল। আর উঠতে পারিনি।”
“আসলে একজন দেখা করতে এসেছেন আপনার সঙ্গে…”
“আমার সঙ্গে! কে?”
“ওই দিদিকে দেখছিলেন যে সাইকোলজিস্ট, মিসেস গাঙ্গুলি….”
“ওঃ, আচ্ছা! আমি কি উঠব?”
“না না, আপনি আবার উঠতে যাবেন কেন? উনি দোতলাতেই আছেন। ডেকে দিচ্ছি।”
শতরূপ কোনওরকমে মুখের উপর একটু হাত বুলিয়ে নেয়। চুলগুলো বিশ্রীরকম ঘেঁটে আছে। বেশ কয়েকদিনের না-কাটা দাড়ি গালে। এ সময় বাইরে থেকে আসা কারও সঙ্গে দেখা করতে একটু অপ্রস্তুত লাগে ওর। সোমাদি চলে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেছন থেকে একটা উৎফুল্ল গলার স্বর শোনা যায়, “গুড মর্নিং, মিস্টার ঘোষ…”
“তুই রেডিয়োর কাজ ছেড়ে দিলি, কিন্তু লেখালিখি ছাড়লি না কেন?” বিনির গলাটা আজ একটু ভারী শোনাচ্ছে। মনে হয়, রাতবিরেতে জলে পা ডুবিয়ে বসে খানিক ঠান্ডা লেগেছে ওর।
“একটা বিড়ালের জন্য…”
অবিশ্বাসের অভিব্যক্তি ফোটে বিনির গলায়, “বিড়াল! কেন?” রূপ উঠে গিয়ে রেলিং-এ হাত রেখে দাঁড়ায়। বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলে, “তখন কুড়ি কি একুশ বছর বয়স আমার। ছোট থেকে লেখালিখির শখ। গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে কয়েকটা ম্যাগাজিনে লেখা পাঠাই। তার মধ্যে ভাগ্য সহায় হলে বছরে দু-একটা সংখ্যায় সেসব ছেপে বেরোয়। আমি মাসের পাঁচ তারিখ হলেই ছুটে চলে যাই উলটোডাঙা। সব ক-টা ম্যাগাজিন উলটেপালটে দেখি, কেউ আমার গল্প ছাপিয়েছে কি না।”
“তারপর?”
“দোকানটায় তখন বিছোনো ম্যাগাজিনগুলোর উপরে একটা মোটা বিড়াল শুয়ে থাকত। ছাই-ছাই রঙের। ভারী বনেদি হাবভাব ছিল তার। গুঁতো মারলেও নড়ত না। ঘুমোত পড়ে পড়ে। এতদিন গেছি, অথচ একদিনও শালার মুখ দেখতে পাইনি। আমার লেখা বেশির ভাগ মাসেই ছাপা হত না। পাতা উলটে হতাশ হতাম। কী আর করি? ওই বেড়ালটার গায়ে হাত বুলিয়ে আবার চলে আসতাম। কেমন জানি মনে হত, আমার সঙ্গে সঙ্গে বিড়ালটাও ম্যাগাজিনে মুখ গুঁজে অপেক্ষা করত আমার নামটা ছাপা হবার…”
“তারপর বিড়ালটার কী হল?”
“আগের বছর এমনিই গিয়েছিলাম দোকানটায়। আমার লেখা এখন কোথায় কোথায় ছাপা হয়, নিজেই হিসেব রাখি না। গিয়েছিলাম ক-টা পূজাবার্ষিকী কিনতে। খুব বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন। কয়েকটা ম্যাগাজিন কিনে খেয়াল করলাম বিড়ালটা নেই। দোকানের লোকটাও পালটে গেছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে একটা বিড়াল শুয়ে থাকত না? ব্যাটা গেল কোথায়?’ লোকটা জানাল, ‘সে তো কবে মরে গেছে…”
“আমার দুঃখ হল খুব। ওকে শেষবারের মতো দোকান থেকে যখন বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সেই দৃশ্যটা কেন জানি না ফুটে উঠল মাথায়। কবে যে অমন নধরকান্তি দেহটা ফেলে, ওই নরম ম্যাগাজিনের আদুরে বিছানা ফেলে ওকে চলে যেতে হয়েছে, কে জানে? যেতে নিশ্চয়ই কষ্ট হয়েছে ওর… আচ্ছা, যাওয়ার আগে খুঁজেছিল আমাকে? নাঃ, আমাকে তো চিনতই না।”
“তারপর হঠাৎ শালা মনে হল, জানিস। ও আমার অনেক পুরোনো একটা বন্ধু। দুজনে একসঙ্গে একটা লড়াই শুরু করেছিলাম। অনেক হতাশা পেরিয়ে, অনেক অপেক্ষার পর আমাকে জিতিয়ে দিয়ে কোথায় যেন চলে গেল আমার বন্ধুটা। আমি যতদিন লিখব, ততদিন ওর লড়াইটাও থেকে যাবে… আমার অজান্তেই ও কোথাও খুশি হবে…
মুখ নামিয়ে হাসে শতরূপ — “জানি বোকা বোকা চিন্তাভাবনা। কিন্তু ওইজন্যেই লেখাটা ছাড়তে পারিনি কখনও।”
বিনি থুতনিতে হাত রেখে ভাবুক গলায় বলে, “আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, ও এখনও কোথাও তোর সব লেখা এক জায়গায় করে তার উপর উঠে আরামে ঘুম দিচ্ছে। তুই গিয়ে গুঁতো দিলে এখনও নড়বে না।”
রেলিং-এর ধার থেকে আবার চেয়ারে এসে বসে পড়ে শতরূপ— “সবাই ইচ্ছা করে আমাদের ছেড়ে চলে যায় না। কেউ কেউ থাকতে চেয়েও থাকতে পারে না…”
“মরে যাওয়ার আগে মানুষ কী বলতে চায় বল তো? মানে যখন জানে যে আর কখনও কিছু বলতে পারবে না, তখন শেষ কথাটা কী বলতে চায়?” বিনি জিজ্ঞেস করে।
কাঁধ ঝাঁকায় রূপ, “কী জানি? যারা ভগবানে বিশ্বাস করে, তারা বোধহয় সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়, আর যারা করে না…”
“আচ্ছা বাদ দে, লেখকরা কী বলে মরার আগে?”
ওর মুখ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় শতরূপ – “বলে…” একটু হাসে ও-”আমার সব গল্প মিথ্যে ছিল না…”
