(অষ্টম অধ্যায়)
ওর ইন করা শার্টের খানিকটা বেল্টের আগল থেকে বেরিয়ে ঝুলছে। কনকনে হাওয়া জামার খোলা বোতাম দিয়ে ভেতর ঢুকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। শরীর। কিন্তু কোনওদিকেই ভ্রূক্ষেপ নেই ওর। একমনে হেঁটে চলেছে সামনের দিকে…
গাড়ি থেকে একটা মেয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর রূপের দিকে দৌড়ে এসে পেছন থেকে ওর দু-কাঁধে হালকা ধাক্কা দেয়।
“গাড়িতে ওঠ রূপ, ইউ কান্ট ডু দিস নাউ….”
শান্ত গলায় উত্তর দেয় রূপ, “একটু পরে। এখন ভালো লাগছে না।”
“তুই সব কিছু ফেলে এভাবে পালিয়ে আসতে পারিস না। সবাই তোর খোঁজ করছে। দুশ্চিন্তা করছে তোর জন্য…
“মিথ্যা কথা বলিস না তো, আমার মিথ্যে কথা শুনতে এখন একদম ভালো লাগছে না…”
ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ায় নীহারিকা— “তুই এভাবে ভেঙে পড়লে কী করে হবে বল তো? সব কাজ তো তোকেই করতে হবে।”
“বললাম তো করব। এখন একটু হাঁটতে দে আমাকে…”
একধারে একটা বাস স্ট্যান্ড ফাঁকা পড়ে আছে। রূপকে ধরে ধরে সেটার দিকে নিয়ে আসে নীহারিকা। তারপর একটা চেয়ারে বসিয়ে পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ে নিজে। দুটো হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হাত সরিয়ে বলে, “ফোনটা গাড়িতে পড়ে আছে। তোর বন্ধুরা তোকে না পেয়ে আমাকে ফোন করে যাচ্ছে। তুই একটু বস….”
“আমার কোনও বন্ধু নেই।” ওর দিকে না তাকিয়ে শতরূপ বলে। উঠতে গিয়েও থমকে যায় নীহারিকা, ওর ক্লান্ত মুখের শিরাগুলো ফুলে ওঠে— “থাকার কথাও নয়। ইউ নো হোয়াই? তুই স্বার্থপর। তোর কাছে নিজের ফিলিংসের থেকে বেশি আর কিছুর দাম নেই। যারা প্রতিবছর তোর জন্মদিনে বাড়ি এসে উইশ করে যায়, তাদের কার জন্মদিনটা মনে আছে তোর? কার বাবা-মা মারা যেতে তুই গিয়ে দাঁড়িয়েছিলি? কার সঙ্গে ছ-মাসের বেশি বন্ধুত্ব টিকেছিল তোর? ছোটখাটো ইগো ক্ল্যাশের জন্য কতগুলো সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছিস, তোর নিজের খেয়াল আছে?”
গলার স্বর কঠিন হয়ে ওঠে ওর, “দেখ ভাই, বুঝতে পারছি মায়ের মৃত্যুসংবাদ শোনাটা সহজ কথা নয়, বাট মায়ের সঙ্গে তোর সম্পর্ক এমন কিছু ভালোও ছিল না। বরং আজকে কাকুর তোকে সব থেকে বেশি দরকার, সেই মানুষটার জন্য আজকেও কিছুই করতে ইচ্ছা করছে না তোর?”
মুখের উপর এসে পড়া চুল এক ঝটকায় সরিয়ে নেয় নীহারিকা, “মানুষটা হার্টের পেশেন্ট, রূপ, বয়স হয়েছে। তোর কাজ তাকে সামলানো। তার বদলে তুই অফিস ছেড়ে, বাড়ি ছেড়ে এই মাঝরাস্তায় হাঁটছিস শুধু নিজের দুঃখটার সঙ্গে লড়াই করতে?”
“আমি কোনও লড়াই করছি না, আমি বহুদিন আগে লড়াই করা ছেড়ে দিয়েছি…”
“লড়াই করতে হবে, রূপ। তুই ভালোবাসা পেতে পেতে ভালোবাসা জিনিসটাকেই সস্তা ভেবে নিয়েছিস। আমি লড়াই করি, যারা আমাদের ভালোবাসে, তাদের ভালোবাসাটা পেতে গেলে লড়াই করতে হয়। সবাই তোর মতো সব কিছু ফেলে পালিয়ে যেতে পারে না…
রূপের মুখে বিরক্তির রেখা ফুটে ওঠে, হাত দিয়ে ঠেলে নীহারিকাকে সরিয়ে দিতে চায়— “তুই চলে যা এখান থেকে। আমার ভালো লাগছে না। ঘণ্টাখানেক পরে আমি গিয়ে সব ব্যবস্থা করব। আপাতত বডি ওইভাবেই থাক। চিন্তা করিস না।”
শতরূপের দিকে সরে আসে নীহারিকা, ওর গলার স্বর নরম হয়ে আসে, “আমার চিন্তা অন্য কিছু নিয়ে হয় না, রূপ। তোকে নিয়ে হয়। তুই যতই স্বার্থপর হোস, যতই তোর কাছে অন্যের অনুভূতির দাম না থাক, আমি তোকে ছেড়ে যেতে পারি না…”
“দেখ, আজ আমার মা মারা গেছে। তারপরে রাতবিরেতে তোর এই বালের ন্যাকা-কান্না আমার একদম পোষাচ্ছে না। প্লিজ, তোর দামি গাড়ি, দামি মোবাইল, দামি হাজব্যান্ডকে নিয়ে দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে…” বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ে নীহারিকা। বাঁ হাত দিয়ে একটা হালকা ধাক্কা মারে ওর বুকে, “এত কীসের অহংকার বল তো তোর? এত জেদ কীসের? আজ এক বছর হয়ে গেল বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখিস না, আমি ফোন করলে ধরিস না, হোয়াট্সঅ্যাপ করলে আনসিন করে রেখে দিস। আমি জানি, তুই নিজেকে বোঝাতে চাস সবাই তোকে ছেড়ে চলে গেছে, কিন্তু সত্যিটা কী জানিস রূপ? কেউ তোকে ছেড়ে যেতে চায় না। বরঞ্চ তুই যে সবাইকে ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে পারিস, কাউকে ছেড়ে চলে আসার যুদ্ধটায় হাসতে হাসতে জিতে যেতে পারিস—সেটা তোর ভেতরে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি দেয়, একটা সেডিস্টিক আনন্দ হয় তোর। আজ যেমন হচ্ছে…”
“বেশ করি…” পশুর মতো গর্জন করে ওঠে রূপ, “আমার জীবন আমি বুঝে নেব। কোনও শালা বাঞ্চত সিম্প্যাথাইজারকে দরকার নেই আমার।”
“এভাবে মানুষ বাঁচতে পারে না….”
শতরূপ আর কিছু বলে না। নীহারিকার হঠাৎ করেই ক্লান্ত লাগে ভীষণ। মনে হয় যেন রাস্তার ধারের এই বাস স্ট্যান্ডে বসে এই একই কথোপকথন হয়ে চলেছে বহুকাল ধরে, ঘড়ি দ্যাখে ও।
“কেন এভাবে নিজেকে একা করে দিচ্ছিস বল তো? তোর সত্যি মনে পড়ে না কারও কথা?”
শতরূপের স্থির ঠোঁট দুটো নড়ে ওঠে, “একটা ইরেজারের কথা মনে পড়ে…” গলার স্বর নরম হয়ে আসে ওর। নিশ্চুপ হয়ে-থাকা রাস্তার দিকে চেয়ে সে বলতে থাকে, “মা দিয়েছিল।”
“আচ্ছা, সেটার কথাই বল এখন…”
“ক্লাস টু-তে পড়ি তখন। সবে আঁকা শিখতে শুরু করেছি। রাবারটা হাতে দেওয়ার সময় মা বলেছিল, মা ওটায় ম্যাজিক করে দিয়েছে। জীবনে যা ভুল হবে, যা কিছুতে কষ্ট পাব, ওই রাবারটা হাতে ঘষলে সব ধুয়ে-মুছে যাবে। আমি কখনও খুব বেশি ব্যবহার করিনি রাবারটা। কাছে রেখে দিয়েছিলাম।
প্রথম প্রথম কাজ করত ইরেজারটা। যখন মা সামনে থাকত না, তখনও ইরেজারটাকে শক্ত করে হাতের মধ্যে চেপে ধরলে কষ্ট কমে যেত। তারপর একসময়…” ওর গলার স্বর বুজে আসে, “আস্তে আস্তে কাজ করল না আর ওটা। আমি খুব চাইতাম, গায়ে যত জোর ছিল, সবটুকু দিয়ে চেপে ধরতাম ওটা, কিন্তু লাভ হত না। একদিন কোথায় যেন হারিয়ে গেল, জানিস? আমার পুরোনো মায়ের মতো। কিন্তু আমার কষ্টগুলোর কী হল বল তো? আমি তো আর কোনও উপায় জানতাম না ওগুলোর সঙ্গে লড়াই করার…. “মায়েরা চিরকাল একরকম থাকে না রে, কিন্তু তোকে তো ভালোইবাসত, বল?”
শতরূপের মুখের কোণে আলতো হাসি খেলে যায়— “ভালোবাসা খুব ফ্যান্সি জিনিস, নীহারিকা। পায়াভারী একটা ওয়ার্ড। আমার শালা কোনওদিন ইচ্ছাই ছিল না ভালোবাসা পাওয়ার, আমি স্বার্থপর তো, ছোট থেকে শুধু দরকার বুঝতাম। আমি খুঁজতাম, দুঃখের সময়ে জড়িয়ে ধরা যায় এরকম একটা মানুষ … এরকম একটা কোল, যেখানে আমার চোখের জল শুকোবে, যে আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে দিলে আমার আর ঘুরন্ত পাখার ব্লেড চোখে পড়বে না… আমার সেই মা-টা অনেকদিন হল হারিয়ে গেছে…”
“আমি তো ছিলাম। আমাকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়নি তোর?”
“হয়েছিল। এখনও হয়, ওই একটা লড়াই আমি জিততে পারিনি এখনও…. ওর কাঁধে একটা হাত রেখে আবার ওর পাশে বসে পড়ে নীহারিকা। উপরের দিকে মুখ তুলে বলে, “তোর সেই তারাটার কথা মনে আছে? যেটার মধ্যে সব দুঃখ লুকিয়ে রাখতিস। যদি জীবনে কখনও মনে হয় তাহলে কাউকে সন্ধান দিস তারাটার, কেমন? একটা তারা অনেক বড় জায়গা… দুঃখরা আর-একটা দুঃখকে খোঁজে। ওদের একা থাকতে দিস না চিরকাল….” চোখের জল মুছে প্রসঙ্গটা পালটে ফেলে নীহারিকা, “এখন ওঠ রূপ। কাকু কেমন একটা হয়ে গেছে। কারও সঙ্গে কথা বলছে না…. প্লিজ।”
“তোরা সামলা। আমি পরে যাব।”
এবার বিরক্ত লাগে নীহারিকার। ছেলেটা যেন জেদ ধরে বসে আছে, “কী করবি এখানে বসে? চাসটা কী বল তো, বল তুই। যা চাস তা-ই হবে। শুধু একবার বল…”
এই প্রথম নীহারিকার দিকে তাকায় রূপ— “আমাকে একটা গল্প শোনাবি
নীহারিকা? আমি গল্প বলতে বলতে খুব ক্লান্ত হয়ে গেছি….”
নীহারিকার ঠোঁটের কোণে একটা করুণ হাসি খেলে যায়, ওর মাথার চুলে হাত রেখে বলে, “কোন গল্পটা শুনবি বল?”
“যে গল্পটায় আমার বন্ধুরা দূরে চলে যায়নি। যে গল্পটায় আমি আমার বাবার মনের মতো একটা চাকরি করি। যে গল্পটায় তোকে ছেড়ে যেতে দিইনি আমি। যে গল্পটায় এই রাস্তাটা ধরে সোজা যেতে যেতে মায়ের কাছে পৌঁছে গেছি। মা-কে বলতে পেরেছি যে মা-র থেকে বেশি দরকার কখনও কাউকে ছিল না…”
“আচ্ছা বেশ, শান্ত হ। আমি বলছি…” শতরূপের মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নেয় নীহারিকা।
গাড়ির ভেতর বসে থাকতে থাকতে কখন রূপ ঘুমিয়ে পড়েছে, বুঝতে পারেনি নীহারিকা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভরে আছে ওদের সামনের রাস্তাটা। যতদূর দেখা যায় অন্য কোনও গাড়ির চিহ্ন নেই।
রূপের মুখটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নীহারিকা। এই মুখ ওর কতদিনের চেনা। দেখতে দেখতে দশটা বছর কেটে গেল একসঙ্গে। কতদিন কত দুঃখে ছুটে গেছে এই ছেলেটার কাছে। হয়তো কিছুই বলতে পারেনি, চুপ করে বসে থেকেছে একটা বেঞ্চের দুই প্রান্তে, একটা খাটের দুটো বালিশকে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু রূপের কখনও সেভাবে দরকার হয়নি ওকে। কখনও নীহারিকার কাছে ভেঙে পড়েনি ও। ছেলেটার ভেতর এতটা সহ্যশক্তি কী করে আসে কে জানে।
কিছু কিছু মানুষের ভালোবাসা আজন্মকাল শিশুর মতো থেকে যায়। তারা ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে না, দেখাতে পারে না। স্বার্থপরতার মোড়ক ঢেকে রাখে তাদের। কেবল ভালোবাসা না পেলে তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে তারা। তাদের প্রেমের প্রকাশ ওই যন্ত্রণাময় চিৎকারেই মিশে থাকে কেবল। তারপর সে বড় হতে থাকলে ঘা শুকিয়ে নিতে শিখে যায়, আর্তনাদ আড়াল করতে শিখে যায়, তারপর আর তাদের ভালোবাসার শেষ চিহ্নটুকুও পড়ে থাকে না।
নীহারিকা জানে, ওই বন্ধ চোখের ভেতর কয়েকশো চিৎকার ডুবে রয়েছে। কেবল ওর চোখ দুটো সে চিৎকার প্রকাশ করতে ভুলে গেছে, ওর শব্দ সেই চিৎকারের পেছনে অন্য অর্থ বসাতে শিখে গেছে।
ছেলেটার গালে একটা হাত রাখে ও, তারপর বিড়বিড় করে বলে, “আবার একবার ছোট থেকে শুরু করবি রূপ? এবার সবার আগে তোকে ভালোবাসতে শেখাব। তারপর ভালোবাসব…”
ওর চোখ থেকে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে আসে। গাল থেকে হাতটা সরিয়ে নিতে যাচ্ছিল, এমন সময় বুকের কাছে হাত ছুঁয়ে যায়। বুকপকেটে কিছু একটা রাখা রয়েছে। পকেটে হাত গলিয়ে জিনিসটা বের করে আনে নীহারিকা। একটা ইরেজার। বহুদিনের পুরোনো ইরেজারটা আবার ওর শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে গাড়িটা চালাতে শুরু করে নীহারিকা।
পরদিন সকালে শতরূপ যখন বাড়ি ফেরে, তখন সকাল সাড়ে দশটা বাজছে। নিমতলা শ্মশান আর হসপিটালে দৌড়োদৌড়ি করতেই গেছে সমস্ত রাত। আর বাড়ি ফেরা হয়নি। সকালবেলা কয়েকজন মিলে বাবাকে শুইয়ে দিয়ে গেছে নিজের ঘরে। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ। সে ঘরের কাছে গিয়ে টোকা দিতে গিয়েও দেয় না রূপ। ওষুধ খেয়ে ঘুমোচ্ছে যখন ঘুমোক। বাবার মুখটা এখন দেখতে ইচ্ছা করছে না। মাথাটা ধরে ছিল। সকালে বাড়ি আসার সময় নীহারিকা পইপই করে বলে দিয়েছে বাবার খেয়াল রাখতে।
বেশ কয়েকটা ওষুধ খেয়েছে, সেগুলোর প্রভাবেই হয়তো মাথাটা ভারী হয়ে ঘুম পাচ্ছে ওর। মায়ের ঘরে ঢুকতেই মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেল শতরূপের। দরজার উপরে বিয়ের পরের একটা ছবি। প্রথমবার এ বাড়িতে ঢুকেছিল আলতা পায়ে, মাথায় মুকুট, গায়ে লাল বেনারসি পরে। ি বছর পরে একেবারে বেরোল বাড়ি থেকে, চিরকালের মতো।
মায়ের বিছানার উপর এসে শুয়ে থাকে রূপ। স্থির হয়ে সিলিং-এর দিকে চেয়ে থাকে। এই বিছানাতেই মায়ের কোলের উপর শুয়ে গল্প শুনত ও। কী যেন একটা গান গাইত, মা। গানের সুরটা মনে পড়লেই আজকাল কান্না পায়। একটু বড় হতে বিছানাতে শুনেছিল সেলফিশ জায়ান্টের গল্প, সুজন হরবোলার গল্প, বিছানাটা জুড়ে যেন ছড়িয়ে আছে সেসব। কেবল কথক আর ফিরবে না কোনওদিন। নিজের শরীরটা ভীষণ ভারী লাগে শতরূপের। বুক ঠেলে একটা কান্না আসতে চেয়েও আসতে পারে না। উলটো হয়ে শুয়ে মুখে একটা বালিশ চাপা দিয়ে দেয়। তারপর একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘণ্টা তিনেক পরে ঘুম ভাঙে রূপের। মোবাইলে অনেকগুলো মেসেজ ঢুকেছে। অফিসের কয়েকজন বন্ধুর ফোন এসেছিল। মেসেজ করে দুঃখ প্রকাশ করেছে কেউ কেউ, সব ক-টা মেসেজ একসঙ্গে এড়িয়ে যায়। নীহারিকা বলেছে, “কাকুর কাছে একটু বসিস। দরকার হলে ফোন করবি। আমি যে-কোনও সময় চলে যাব বাড়িতে।”
ফোনটা রেখে উঠে পড়ে রূপ। বাইরের প্যাসেজ বেরিয়ে হেঁটে বাবার ঘরের কাছে চলে আসে। হাত বাড়িয়ে দরজায় টোকা মারে। ওপাশ থেকে আওয়াজ আসে না।
“বাবা, ঘুমোচ্ছ?”
আলগা হাতের ছোট ধাক্কায় দরজা খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকে আসে শতরূপ। চোখ পড়ে সিলিং-এর দিকে। সেখানে পাখার সঙ্গে ঝুলছে একটা দড়ি, দড়ির ডগায় একটা মানুষ। জিব বেরিয়ে আছে বাইরে। মুখের চামড়া শুকিয়ে কয়লার মতো কালো হয়ে গেছে। শতরূপ পিঠ দিয়ে দাঁড়ায় দেওয়ালে। তারপর আস্তে আস্তে বসে পড়ে মেঝেতে।
*
দৌড়োতে দৌড়োতে হাঁপিয়ে গিয়েছিল বিনি। ঠিক যখন মনে হল, পা দুটো পাথর হয়ে গেঁথে যাবে মাটিতে, তখনই কিছুতে পা আটকে রাস্তার উপরেই ছিটকে পড়ল। জঙ্গল এদিকটায় ঘন হয়েছে। অন্ধকার জমে আছে বলে মাটির . দিকটা দেখতে পায়নি বিনি। পেছন ফিরে তাকাতেই একটা চেনা মুখ চোখে পড়ল। বুকের ভেতর ভয়টা সঙ্গে সঙ্গে কমে এল। যার পায়ে লেগে ছিটকে পড়েছে, তার মুখে একটা মৃদু হাসি লেগে আছে। চোখের কোণে অভিযোগ।
“আবার পালিয়েছিস বাড়ি থেকে!” পুনা মাটি থেকে একটা কাঠি তুলে নিয়ে বলে।
“আমাকে কেউ আটকায় না পালাতে, ওটাকে পালানো বলে না।” ওর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে বিনি।
“আজ সারাদিন তোকে ডেকেছি। উত্তর দিসনি কেন?”
‘রেডিয়োটা কাছে ছিল না। ভালোও লাগছিল না, মন খারাপ করছিল।”
“তুই উত্তর না দিলে আমারও মন খারাপ করে। তুই ছাড়া আর কোনও বন্ধু নেই আমার…” হাত দিয়ে ওর পাশের গাছের গুঁড়িটা দেখায় পুনা, “বোস এখানে।”
“না বসব না। আমার দৌড়োতে ইচ্ছা করছে এখন।”
“বেশ তো, দুজন মিলে দৌড়োব। তার আগে বোস একটু।”
কথা না বাড়িয়ে বসে পড়ে বিনি। ওর বুকের ধুকপুকানিটা এখন একটু কমে এসেছে। গুঁড়ির উপর বসে কপাল থেকে ঘাম মুছে বলে, “তুই আমার বাড়িতে আসিস না কেন?”
“তোকে আমার সঙ্গে কেউ কথা বলতে দেখলে তোকে পাগল ভাববে, ভাববে, হাওয়ার সঙ্গে কথা বলছিস। তাই আসি না।”
“ভাবতে আর বাকি কী আছে? কাকামশাইয়ের সঙ্গে বাবা কথা বলেছে। ওরা আমাকে মাথার ডাক্তার দেখাবে।”
“আর মাথার ডাক্তার তোকে বোঝাবে পুনা বলে আসলে কেউ নেই। তোর কোনও বন্ধু নেই, তাই একাকিত্ব থেকে আমাকে কল্পনা করে নিয়েছিস।”
“নিইনি?” পুনার দিকে ঘুরে তাকায় বিনি।
“এইজন্যই পা-টা বাড়িয়ে রেখেছিলাম। জানতাম, হোঁচট খাবি। শালা ভালো করে খুঁজে দেখ কোনও ডাল পড়ে আছে কি না…
বিনি চেয়ে দ্যাখে, সেখানে সত্যি কোনও ডাল পড়ে নেই। ও আছাড়টা খেল কীসে?
“এত লোক থাকতে তোকে শুধু আমি দেখতে পাই কেন?”
পুনা কোনও উত্তর দেয় না। একটা লাঠি তুলে নিয়ে গাছের গুঁড়ির ওপর চাপড় মারতে থাকে। গুনগুন করে কী যেন একটা সুর ওঠে পুনার ঠোঁটে। এই অদ্ভুত স্বভাব ওর। মাঝেমধ্যেই অদ্ভুত কিছু সুর ভাঁজতে থাকে পুনা। চেনা লাগে সেগুলো। কেবল কোথায় শুনেছে, মনে পড়ে না।
পুনার সঙ্গে বছরখানেক কথা হয় ওর। কত কথা বলে ও। বোন চুপ করে বসে শুনে যায়। মাঝে মাঝে ভীষণ চেনা লাগে মেয়েটাকে, কখনও আবার মনে হয় একেবারে অচেনা।
গাছের গুঁড়িতে কাঠি ঘষতে ঘষতে হঠাৎ থমকে যায় পুনা, বলে, “তা দৌড়োচ্ছিস কেন? বাড়িতে কিছু হয়েছে?”
“বাবা আবার ক্যালাচ্ছে মা-কে।”
“তোর বাপটা একটা খানকির ছেলে, নিজের দাঁড়ায় না, তাই বউকে ক্যালায়…”
“কী দাঁড়ায় না?”
হাওয়ায় কাঠি চালায় পুনা— “কিছু না, তুই বুঝবি না। তোর জায়গায় আমি থাকলে কবে খুন করে ফেলতাম শুয়োরের বাচ্চাটাকে।”
“আমিও চেষ্টা করেছিলাম, হয়নি।”
কথাটা শুনে মজা পায় পুনা। একটা ব্যঙ্গের হাসি হাসে— “শোন ভাই, মৃত্যু একটা ইন্সটিটিউশন, একটা সাধনা। টুক করে বিষ কিনলাম আর মুখে গুঁজে দিলাম, ওতে দেবতা খুশি হন না। ভেতরে রাগ, ঘৃণা, যন্ত্রণা এগুলোকে নিয়ে মেলা ছেনালি করতে হয় আগে….” কথাটা বলতে গিয়ে থেমে যায় পুনা, হঠাৎ কী যেন মনে পড়েছে তার, “দেবতার কথায় মনে পড়ল, চল, তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাব…”
“কোথায়?”
“জঙ্গলের মধ্যে একটা মন্দির আছে। নাম শুনেছিস?”
“মহাকালদেবের মন্দির?”
“এঃ, মহাকাল দেব না ছাই। ওখানে ওসব পুজো-টুজো নেওয়া দেবতা ছিল না কোনওদিন।”
“তাহলে কী হত ওখানে?”
পুনা প্রশ্নটার উত্তর দেয় না, “চল, তোকে দেখিয়ে আনি।”
“তুই চিনিস!”
“না-চেনার কী আছে? মন্দিরটা যখন আবিষ্কার হয়, তখন দুটো কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল ওখানে। তাদেরকেও চিনি।”
“মন্দিরের ভেতর কঙ্কাল এল কী করে?”
“যেমন করে আসে। হেঁটে হেঁটে এসেছিল।”
“তাহলে মরে গেল কেন?”
“মরতে এসেছিল বলে।”
“মরতে এসেছিল!” অবাক হয়ে বিনি তাকায় পুনার দিকে— “মন্দিরের ভেতর মানুষ মরতে আসে নাকি!”
“মেলা জ্বালা তো….” বিরক্ত হয় পুনা— “আর কতবার বলব তোকে ওটা আদৌ মন্দির-টন্দির নয়। লোক দুটো ওর ভেতর গলায় দড়ি দিয়েছিল অনেকদিন আগে। বহুদিন ধরে ঝুলছিল দড়ি থেকে। তারপর দড়ি খসে বডিগুলো নীচে পড়ে যায়। এত বছরে বডি গলে পচে শেষ হয়ে গেছে। কঙ্কাল পড়ে আছে।”
“কিন্তু এই জঙ্গলে এসে গলায় দড়ি দিয়েছিল কেন?”
“যে কারণে আজ তুই জঙ্গলের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছিস। ওদেরও আর থাকতে ইচ্ছা করছিল না বাড়িতে।”
“বাড়ি কোথায় ছিল ওদের?”
পুনার মুখটা নরম হয়ে আসে, “এরকম একটা জঙ্গলের ভেতর একটা দোতলা বাড়ি ছিল ওদের। দুই অন্ধ বুড়োবুড়িতে থাকত সে বাড়িতে। রোজ ভাবত, কাল বুঝি ওদের দৃষ্টি ফিরে আসবে, আর একে অপরকে দেখতে পাবে। সন্ধে হলে একটা লণ্ঠন জ্বেলে বারান্দায় এসে…”
“এই পুনা!” চমকে উঠে বলে বিনি, “এই স্বপ্নটা আমি অনেকদিন থেকে দেখি। কিন্তু মানে বুঝতে পারি না…
“তারপর একদিন ওদের বাড়িটায় কারা যেন আগুন লাগিয়ে দিয়ে গেল। কাঠের বাড়ি তো, জ্বলে শেষ হয়ে গেল। প্রাণ বাঁচাতে ওরা দুজনেই জঙ্গলে যেদিকে পারল পালিয়ে গেল। অনেকদিন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াল ওরা। একে অপরকে খুঁজল। ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে গেল। শেষে বুঝতে পারল, এই মন্দিরে না আসতে পারলে ওদের আর একসঙ্গে থাকা হবে না…”
“তুই এত কথা জানলি কেমন করে?”
“ও মা! আমি জানব না! আমিই ওদের ডেকে আনলাম এখানে।”
“তুই!”
“হ্যাঁ, শোন। তোর কোনওদিন যদি মরে যেতে ইচ্ছা করে, তোকেও নিয়ে যাব। বল, ইচ্ছা করে না তোর মরে যেতে? যখন তোর বাবা বেল্টের বাড়ি মারে তোকে? যখন কেবল তোর জন্য তোর পোষা কুকুরটাকে স্ক্রু ডাইভার দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে দিয়েছিল? ইচ্ছা করেনি মরে যেতে? যখন মনে হয় পৃথিবীতে আর একটাও মানুষ বেঁচে নেই, যখন মনে হয়, সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেছে?”
পুনা এক-পা এক-পা করে এগিয়ে আসে বিনির দিকে, ওর চোখ দুটো জ্বলছে। বিনি চোখ নামিয়ে নেয়— “তুই… তুই কী চাস, পুনা?”
“এই, আমি একটু মজা করছিলাম, তুই ভয় পেলি, না রে?” খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে পুনা। তারপর ডান হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে বিনির বাঁ হাতটা। সজোরে টান মারে– “আমার সঙ্গে আয়। তোকে একটা জিনিস দেখাব।”
“কী দেখাবি?”
“গেলেই দেখতে পাবি, আয়-না…”
“না, কোথাও যাব না। ছেড়ে দে আমাকে, বাড়ি ফিরতে হবে।”
“তোর ফেরার মতো কোনও বাড়ি নেই, বিনি, তোর বাবা তোকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এই পৃথিবীর কেউ তোকে চায় না। তোর জন্য তোর পোষা কুকুরটা…”
আর আপত্তি করে না বিনি। পুনার হাতের টানের কাছে ও অসহায়। ও জানে, পুনা জোর করে ওকে দিয়ে সব কিছু করাতে পারে। ওর চোখ দুটো ভারী আচ্ছন্ন করে ফ্যালে বিনিকে। ভেতরের সব শক্তি ফুরিয়ে যায় ও সামনে এসে দাঁড়ালে। দুঃখ যখন বেশি হয়, তখন আরও বেশি জোর বেড়ে যায় পুনার।
পুনা কে ও জানে না, তবে ওর পা দুটো ব্যথা করছে। ও জানে মনে মনে। পুনা কল্পনা নয়, রেডিয়ো থেকে বেরিয়ে আসা কিছু শব্দ নয়। ওর হাতের কাছে আত্মসমর্পণ করে জঙ্গলের রাস্তা ধরে চলতে থাকে বিনি।
নিঝুম জঙ্গল স্থির হয়ে আছে। কোথাও কারও ডাক শোনা যাচ্ছে না। কেবল দুটো বছর তেরোর মেয়ের পায়ের আওয়াজ উঠছে ঘাসের উপর। বিনির মনে হয়, জঙ্গলের গাছের ফাঁক দিয়ে কেউ নজর রাখছে ওদের দিকে। ওদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে হাওয়ায় ভেসে।
অলৌকিক পরিবেশ, তা-ও ভয় করে না ওর। একটু আগে ভয় করছিল ওর। বাবার লাল মুখ, হাতের উপর স্টিলের ঘড়ির ক্রমাগত যন্ত্রণা… দুটো বন্য মতো খেলায় মেতে উঠেছিল বাবা-মা—তখন ভয় করছিল, এখন করছে না।
পুনা আবার সেই গানটা গুনগুন করছে। হাওয়ায় ভেসে গানটা ছড়িয়ে পড়ছে জঙ্গলের গাছের ফাঁকে ফাঁকে।
“পুনা, তুই কোনওদিন ছেড়ে চলে যাবি না তো আমাকে? তুই ছাড়া আর কেউ নেই আমার।”
“আমি যাদের কাছে থাকি, তাদের আমি ছাড়া আর কেউ থাকেও না।”
“চলে যাবি তুই?” বিনি আগের প্রশ্নটায় ফিরে যায়।
“যেদিন আর দরকার থাকবে না, সেদিন কী করব থেকে?”
“তুই কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস বল তো আমাকে?”
তোর সেই ঘোড়াপোড়া গাছটার কথা মনে আছে, বিনি? যেখানে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল?”
“হ্যাঁ মনে আছে।”
“তোকে বলেছিলাম, একবার একটা লোক এসেছিল ওই গাছটার কাছে, কিন্তু সে একা আসেনি। সঙ্গে আরেকজনকে নিয়ে এসেছিল। সে রয়ে গেছে এখানেই…”
কখন সেই মন্দিরটার কাছে এসে পৌঁছেছে, খেয়াল করেনি বিনি। এতটা পথ হেঁটে এসেছে অথচ এতটুকুও ক্লান্ত লাগছে না। জঙ্গল পোকামাকড়ে ভরতি কিন্তু একটা মশাও কামড়ায়নি ওকে। বিনি খেয়াল করেছে, পুনা ধারেকাছে থাকলে ওর শরীরে ব্যথা, যন্ত্রণা, কষ্ট কিছু অনুভব হয় না। মন্দিরের কাছে এসে হাতটা ছেড়ে দেয় পুনা। নিজে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বলে, “আমার সঙ্গে আয়। ভয় নেই…”
বিনি অবাক হয়েছে দ্যাখে, গোটা মন্দিরটা একটা কালচে ধোঁয়ায় ঢেকে আছে। মন্দিরের ভেতরে অবধি আলো জ্বলছে ইতস্তত। খানিক খেয়াল করলে বোঝা যায় আলোগুলো আসলে জোনাকি।
একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছে মন্দিরের ভেতর থেকে। তবে ঠিক কোথা থেকে আসছে, সে বুঝতে পারে না। মিষ্টি গন্ধ খেলা করছে বাতাসে। পুনার হাতের টান অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকে আসে বিনি।
চারদিকে তাকিয়ে ওর মনে হয় দেয়ালগুলোতে যেন বিশেষ কিছু নকশা কাটা আছে। এরকম নকশা আগেও দেখেছে, তবে কোনও মন্দিরে নয়, স্কুলের পড়ার বই কিংবা কোনও গল্পের বইয়ের পাতায়। ভেতরে ঢুকতে একটু আগের সেই ঝিমঝিমে গন্ধটা বেড়ে ওঠে।
“ভয় পাস না, তোর জন্য অপেক্ষা করে আছে একজন।”
“কে? আমি চিনি তাকে?” থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করে বিনি।
পুনা যেন উত্তরটা দিতে গিয়েও দেয় না, “চিনতিস, হয়তো এখন আর মনে নেই। অনেকদিন দেখা হয়নি তোদের…”
“নাম কী ওর?”
পুনা একটা অদ্ভুত বাঁকা হাসি হাসে, বিনির দিকে ফিরে ওর কাঁধে দুটো হাত রাখে। মুখ থেকে একটামাত্র শব্দ বেরিয়ে আসে পুনার, শব্দটা ছড়িয়ে পড়ে মন্দিরের গর্ভগৃহের ভেতরের দেওয়ালে— “ইলোরা…”
