জোনাকির রঙ – ১৬

(ষোড়শ অধ্যায়)

হায় কোন্ সুদূর, সেই স্বপ্নপুর।
মোর মন যে গায় ঘরে ফেরার সুর।
মোর পথ চেয়ে আজও সেই মেয়ে
বুঝি স্বপ্নজাল বোনে গান গেয়ে।

গানটা শুনতে শুনতে কেমন যেন ঘোর লেগে এসেছিল বিনির। বৃদ্ধের গলায় বাজতে-থাকা সুরটা ছড়িয়ে পড়ছে রাতের বাতাসে। ওর ঘুম পায়। গানটা থেমে যেতেই চকিতে ঘুমের ঘোর কেটে যায়। চোখ খুলতেই মাথার উপরে ঝাঁকড়া একটা গাছ চোখে পড়ল বিনির। চতুর্দিকটা অন্ধকার কুপকুপ করছে। পাশেই কাঁটাঝোপ থেকে ঝিঁঝির ডাক ভেসে আসছে। সেইসঙ্গে একটা চেনা মানুষের গন্ধ। বাড়ি থেকে অনেক দূরে এই জঙ্গলের গভীরে ভীষণ শান্ত লাগছে ওর। ওদের ঠিক সামনে ফাঁকা রাস্তাটা মৃতের মতো পড়ে আছে। তার উপর এসে পড়েছে চাঁদের আলো। বিনি জানে এই জায়গাটার নাম ঘোড়াপোড়ার গাছ। কিন্তু কেন এমন নাম তা জানে না। ও দিনের বেলা কখনও আসেনি এখানে। এখন শীতকাল। বিনির গায়ে একটা মোটা সোয়েটার, তা-ও গা-টা শিরশির করছে। পাশে বসে-থাকা মানুষটার শরীরের ভেতর আরেকটু ঢুকে এল। লোকটা চাপাস্বরে বলল, “অনেক রাত হয়েছে, চল তোকে বাড়ি দিয়ে আসি….”

“বাড়ি যেতে ভালো লাগে না আমার।”

“তা তো বুঝতেই পারি। কিন্তু বেটি, সারাদিন আমরা যেখানেই যাই-না কেন আর বাড়ি যেমনই হোক-না কেন, বাড়ি আমাদের ফিরতেই হয়, ইচ্ছা করুক-না করুক…”

“তোমার মন কেমন করে না? বাড়ি যেতে ইচ্ছা করে না?”

“করে তো। এই যে আমরা বেঁচে আছি। হাত-পা নাড়ছি, কথা বলছি; এ-ও একরকম বাড়ি থেকে পালানো। একদিন ক্লান্ত হয়ে আবার আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে। সবাইকে বাড়ি ফিরতে হয়…”

“তুমি বাড়ি চলে গেলে আমাকে গল্প শোনাবে কে? আমার দুঃখ হলে কাকে শোনাব আমি?”

“আমরা সারাজীবন একজনকে দুঃখের কথা বলতে পারি না, বিনি। একজন চলে গেলে আর-একজন ঠিক চলে আসে। একজনের গল্প বলা শেষ হলে আর একজন এসে গল্প বলতে শুরু করে।”

“আমাকে কে বলবে গল্প?”

“আচ্ছা বেশ, আমি যদি না থাকি তাহলে আমার জায়গায় আর-একজনকে রেখে যাব আমি।”

“তা-ই! তার নাম কী?”

“ধরে নে তার নাম ‘পুনা’। আমি চলে গেলে দেখবি, একদিন সে ঠিক আসবে তোর কাছে। ঠিক আমার মতো করেই গল্প শোনাবে তোকে। তোর সব দুঃখের কথা শুনবে।”

রোজকার মতো এতক্ষণ ধরে মেয়েটাকে বয়ে এনে গাছের তলায় বসেছেন বৃদ্ধ। শিরশির করে হাওয়া দিচ্ছে ওদেরকে ঘিরে। গাছের নরম পাতা বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে ওদের শরীর। এ জায়গাটায় এসে বসে থাকতে ভালো লাগে ওদের। এখানে বসলে আকাশের একটা বিশেষ জায়গা দেখা যায়। সেখানে একটামাত্র তারা ফুটে থাকে। আকাশ পরিষ্কার থাকলেও আর অন্য কোনও তারা দেখা যায় না এখান থেকে। গাছের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। ওই তারাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দাদুর কাছে এক দুঃখী রাজপুত্রের গল্প শোনে বিনি। আজও দাদু গল্প বলছে। কিন্তু গল্পের মধ্যে কেমন যেন বিষাদের সুর। মন বলছে, দাদু আর গল্প বলতে আসবে না। বিনি আবার উতলা হয়ে ওঠে, “ও দাদু, বলো-না, পুনা কোথায় থাকে?” বৃদ্ধ একটুও না ভেবে বলেন, “ও থাকে একটা মন্দিরের ভেতর। জঙ্গলের ভেতর সেই মন্দির।”

“তুমি কী করে চিনলে?”

“তাকে কী করে চিনলাম, সেটা বলতে গেলে একটা গল্প বলতে হয়… কিন্তু রাত হয়েছে যে…”

“কিচ্ছু রাত হয়নি। বলো গল্প, শুনব…”

“আচ্ছা তবে শোন…” বুড়ো ফিরে তাকান বিনির মুখের দিকে। তারপর গলা খাদে দিয়ে নামিয়ে কোনও গোপন কথা বলছেন এমন করে বলেন, “অনেকদিন আগে একটা দেবতা ছিল…”

“দেবতা মানে ঠাকুর?”

“হ্যাঁ, ঠাকুরই বটে। যেমন টাকাপয়সার ঠাকুর হয়, ব্যাবসাবাণিজ্যের ঠাকুর হয়, পড়াশোনার ঠাকুর হয়, তুই ভায়োলিন শিখিস, তার যেমন ঠাকুর হয়, তেমনই আর-একটা ঠাকুর আছে, কিন্তু সেই ঠাকুরের কথা সবাই ভুলে গেছে… কেউ মনে রাখেনি, তাকে কারও পছন্দ ছিল না…”

“পছন্দ ছিল না কেন?”

“কারণ সে মানুষকে নিয়ে চলে যেত।”

“কোথায় নিয়ে চলে যেত?”

“অন্য জগতে। ওই যে সেই জগৎ, যেখানে কারও মনে কোনও কষ্ট নেই, সেই জগতের ঠাকুর…”

“আচ্ছা তা-ই! কিন্তু তার উপর তাহলে সবাই রেগেছিল কেন? “ “ও মা! মানুষের জীবনে এত দুঃখকষ্ট, সেখানে কিছু মানুষ ওই জগতে চলে গেলে দেবতার উপরে বাকিরা রেগে যাবে না?”

“আচ্ছা!” চোখ বড় বড় করে তাকায় বিনি— “তারপর কী হল?”

“তো সবাই মিলে তো হিংসা করে তাকে স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দিল। তার আর একটাও মন্দির রইল না কোথাও। তারপর আর সে কী করে… একসময় খুঁজতে খুঁজতে এসে হাজির হল এইখানে….”

“এইখানে!”

“হ্যাঁ রে, ঠাকুর কি আর মন্দির ছাড়া থাকতে পারে? তো সে খুঁজতে লাগল এমন একটা মন্দির, যেটার হদিস কেউ জানে না।”

“তারপর কী হল? খুঁজে পেল মন্দির?”

“হ্যাঁ, একটা মন্দির পেল। এই যে জঙ্গলটা দেখছিস, এর ভেতরে একটা মন্দির আছে। অনেককাল আগে ওখানে শিব ঠাকুরের পুজো হত। কিন্তু এখন আর হয় না… ওই ফাঁকা মন্দির দেখে সেই দেবতা সেখানেই ঘাঁটি গেড়ে বসল।”

“তারপর?”

“তারপর আর কী? সে তো আর ফুল-বেলপাতা দিয়ে পুজো হওয়ার ঠাকুর নয়। সবাই এর পুজো করতেও পারে না। এই ঠাকুর নিজের ইচ্ছামতো ভক্ত বেছে নেয়। যাদের বেছে নেয়, তাদেরকে মন্ত্রবলে ডেকে নেয় নিজের কাছে। সেই যে ইলোরার কথা বলেছিলাম মনে আছে? তার সঙ্গে ওইখানেই দেখা হবে তোর….”

“পুনাও সেখানেই থাকে। সেই তো ডেকে নিয়ে যায়…. আমাকেও নিয়ে যাবে…”

“আমাকেও নিয়ে যাবে?”

“উঁহু, বলেছি না, একা নয়? তোদের দুজনের জার একসঙ্গে ভরতি হবে। তোদের দুজনকে ডেকে নিয়ে যাবে ইলোরা। একজন গেলে হবে না কিন্তু…”

“সেই ছেলেটাকে আমি খুঁজে বার করব কী করে? তুমি তো তার নাম-ঠিকানা কিছুই বলোনি আমাকে…”

“সব কিছু কি আর আমি বলে দেব? তুই এত বড় হবি, নিজে খুঁজে বের করতে পারবি না?”

মেয়েটার গালে হাত রাখেন বৃদ্ধ। অনেকক্ষণ চেয়ে থাকতে থাকতে আপন মনে বলেন, “তোকে বড় বয়সে খুব দেখতে ইচ্ছা করে, জানিস? বড় হলে তোকে কেমন দেখতে হবে, তুই কীভাবে কথা বলবি, কীভাবে হাসবি…”

“তুমি না থাকলে আমি একটুও হাসব না…”

বৃদ্ধ কিছু উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় দূরের দিকে কী যেন চোখে পড়ে তাঁর। চোখ দুটো ছোট হয়ে আসে। একটা হাতে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে বলেন, “বিনি মা, আমাদের পালাতে হবে।”

“কেন? পালাতে হবে কেন?”

“কেউ ধরতে আসছে আমাদের। ওই দেখ…”

বিনি তাকিয়ে দ্যাখে, সত্যিই দূরে রাস্তার উপরে একটা গাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। এতদূর থেকেও গাড়িটা চিনতে পারে সে।

“ওটা তো বাবার গাড়ি! আমি এখানে আছি, জানল কী করে?”

ঝট করে উঠে পড়ে দুজন। সামনেই জঙ্গল, লুকোনোর পক্ষে আদর্শ জায়গা। কিন্তু এতক্ষণ মেয়েটাকে বইতে বইতে পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধ। শরীরে জোর পান না তিনি। কোনওরকমে ওঠার চেষ্টা করেন। বিনি তাঁর হাত ধরে টান দেয়।

“তোমার সঙ্গে দেখলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, দাদু… তাড়াতাড়ি চলো….”

কোনরকমে ঘাস থেকে উঠে জঙ্গলের ভেতরদিকে লুকোনোর জন্য এগিয়ে যায় ওরা। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। রাতের রাস্তা ফাঁকা ছিল। হেডলাইট এসে পড়ে ওদের উপর। দূর থেকে গাড়ির ভেতরের মানুষগুলো দেখে ফেলেছে দুটো পলায়মান শরীরকে। আরও দ্রুতবেগে এগিয়ে আসতে থাকে। ওদের কাছাকাছি এসেই বিকট একটা শব্দ করে একটা ব্রেক কষে গাড়িটা। চার-পাঁচজন লোক নেমে আসে সেটা থেকে। তাদের মধ্যে একজন প্রায় দৌড়ে এসে একটা লাথিতে বৃদ্ধকে শুইয়ে দেয় ঘাসের উপর। বুড়ো ককিয়ে ওঠেন। আর-একজন লোক এসে পেছন থেকে বিনির জামা খামচে ধরে।

গাড়ি থেকে নেমে আসে বিনির বাবা। তার হাতে একটা লম্বা লোহার রড। প্রায় দৌড়ে বুড়োর কাছে এসে সজোরে পেটে একটা লাথি কষায় লোকটা— “শুয়োরের বাচ্চা! এখনও সুড়সুড়ি যায়নি না তোর? আজ তোকে বাঁচিয়ে রাখব না…” দু-তিনজন লোক মিলে ক্রমাগত লাথিতে লাথিতে রক্তাক্ত করতে থাকে বুড়ো মানুষটাকে। তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে বিচিত্র হিংস্র সব শব্দ। বিনি চিৎকার করে না, স্থির হয়ে দেখতে থাকে নারকীয় দৃশ্যটা….”

“হারামির বাচ্চা, এখানে পুঁতে রেখে যাব তোকে, কেউ জানতে পারবে না।”

ওর বাবার সঙ্গের একটা লোক মুখ তুলে তাকায়— “মেরে দিই স্যার একদম?”

“এখানে মেরে কী হবে? ফালতু একটা বডি সামলাতে হবে। ও শালা এমনিতেই আর ক-দিন বাঁচবে?”

বিনির দিকে এগিয়ে যায় লোকটা। তারপর সপাটে একটা চড় মারে ওর গালে। চুলগুলো মুঠো করে ধরে বলে, “আর এই কারণেই মাগি তোর বাড়ি থেকে এত পালানো, তা-ই না? শরীর গজানোর আগেই সুড়সুড়ি গজিয়েছে? দাঁড়া, তুই বাড়ি চল…”

মেয়েটার গলা টিপে ধরে ওকে একটা লোকের দিকে ঠেলে দেয় ওর বাবা। তারপর বুড়োর কাছে এগিয়ে আসে। একটা হাত বাড়িয়ে মাটির উপর ঘুমোতে-থাকা লোকটার মাথার চুল খামচে ধরে— “শোন পাগলাচোদা, তোকে এর আগে বলেছিলাম, এ তল্লাটে যেন তোকে আর না দেখতে পাই। তোর মেয়েকে আমি বাড়িতে রাখি না বেশ্যাখানায় বেচে দিই, সেটা তোর দেখার দরকার নেই… ফের যদি তোকে এই এলাকার ধারেপাশে দেখতে পাই তাহলে তুই তো মরবিই, তারপর মেয়েরও আমি কী হাল করি….”

গোঙানি বেরিয়ে আসে লোকটার মুখ থেকে। সে মুখে সজোরে রডের বাড়ি এসে পড়ে, “আমার এই লোকগুলো দেখেছিস? এরা একজন একজন করে তোর মেয়েকে কীভাবে আদর করে, সেটাও দেখে যেতে হবে তোকে।” কথাটা বলে একদলা থুতু বৃদ্ধের মুখে ছিটিয়ে দেয় লোকটা। উঠে পড়ে আবার সজোরে কয়েকটা লাথি মারে বৃদ্ধের পেটে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে-আসা গোঙানির শব্দ থেকে যায়। বিনিকে ঘাড় ধরে গাড়ির দিকে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে যায় লোকটা।

বিনি চিৎকার করতে থাকে, “ছেড়ে দাও, আমাকে ছেড়ে দাও… তোমরা ওকে মারছ কেন? ছেড়ে দাও… তোমরা জানো না আমি বেশি দুঃখ পেলে কিন্তু তোমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে যাব…”

“তুই যত তাড়াতাড়ি যাস, ততই ভালো…” ওর বাবা হাসে। আস্তে আস্তে হাতটা আলগা করে দেয়, “যা, যেখানে যাবি চলে যা, দেখি কতদূর যেতে পারিস…”

হাত আলগা পেয়ে একছুটে আবার বৃদ্ধের কাছে চলে আসে বিনি। ঝাঁপিয়ে পড়ে বৃদ্ধের রক্তাক্ত দেহের উপরে— “তুমি আবার কবে আসবে, দাদু? আবার কবে দেখতে পাব তোমাকে?”

বৃদ্ধের মুখ থেকে কোনও কথা বেরোয় না। কেবল একটু আগের সেই গোঙানির শব্দটা আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তাঁর মুখ। কোনওরকমে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আবার দেহটা খসে পড়ে যায় মাটির উপর— “আর দেখা হবে না রে বেটি, আর দেখা হবে না… আমার গল্পগুলো মনে রাখবি তো? আমি কিন্তু মিথ্যা মিথ্যা বানিয়ে বলিনি….” কোনওরকমে উচ্চারণ করেন বৃদ্ধ।

“সব সময় মনে রাখব, দাদু। তুমি দেখো, যেখানেই চলে যাও, আমাদের আবার দেখা হবে… আমাদের তিনজনের আবার দেখা হবে, বলো?” অবাক হয়ে উপরে তাকায় বিনি। রাস্তার উপর পড়ে আছে মানুষটার দেহ। আর কী এক অজানা কারণে চতুর্দিকের ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য জোনাকি। তারা উড়ে বেড়াচ্ছে ওদেরকে ঘিরে। যেন কত কথা বলতে চাইছে ওদের। দু-হাত দু-দিকে বাড়িয়ে জোনাকিগুলো স্পর্শ করার চেষ্টা করে বিনি। ওর আঙুল ছুঁয়ে যায় তারা। এসে বসে বৃদ্ধের রক্ত-মাখা শরীরের উপরে। কখন যেন আবার হাওয়ায় ভেসে উড়ে যায় ওপরের দিকে।

একটা লোক এসে খামচে ধরে বিনির পিঠের কাছটা। তারপর ওকে টানতে টানতে টেনে নিয়ে চলে গাড়ির দিকে। আর পেছনে ফিরে তাকায় না বিনি, বিড়বিড় করে কী যেন বলতে থাকে, “আমাদের আবার দেখা হবে, দাদু। আমি জানি, গল্পগুলো তুমি মিথ্যা বলোনি, আমাদের আবার দেখা হবে…”

“দেখুন, আমার সিমটম শুনে যা মনে হচ্ছে, তাতে আপনার ছেলে সম্ভবত পেডিয়াট্রিক স্কিৎজোফ্রেনিয়ার শিকার….”

ডাক্তার সমীরণ বাচস্পতির চেম্বারে বসে ছিলেন মিস্টার আর মিসেস ঘোষ। দাদুর মৃত্যুর পর থেকেই অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করেছে শতরূপ। সর্বক্ষণ কী যেন একটা খুঁজে চলেছে। একটা বাচ্চা মেয়েকে নাকি মাঝেমধ্যেই দেখতে পাচ্ছে। বাচস্পতি টেবিলের উপরে হাত রেখে বললেন, “ছোটবেলা থেকে প্রচণ্ড কল্পনাপ্রবণ রূপ। এবং সেই কল্পনাগুলোর উৎস ছিল ওর দাদু। মোটামুটি দশ বছর বয়স অবধি আমরা যা শুনি বা দেখি, সেগুলো নিয়েই আমাদের চরিত্রের বেশির ভাগটা তৈরি হয়। যেহেতু ওর ভেতরের বাস্তবটা এখনও পরিণত নয় তাই বাস্তব-অবাস্তবের ধারণাটা ওর মাথার ভেতর গুলিয়ে গেছে। ওর দাদু ওকে যা বলেছিল, সেগুলোকেই সত্যি বলে মনে করে ও। নাথিং আউট অব দি অর্ডিনারি! প্রায় সব বাচ্চার মধ্যেই অল্পবিস্তর এটা হয়ে থাকে। কিন্তু যেহেতু দাদুর ঝুলন্ত দেহটার ওর কাছে ব্যাখ্যা নেই তাই ওর মন নিজের মতো একটা ব্যাখ্যা খুঁজে নিয়েছে। এই মুহূর্তে ও একটা স্বপ্নের জগতে বাস করছে। একেই বলে পেডিয়াট্রিক স্কিৎজোফ্রেনিয়া….”

“কিন্তু এতে ওর কোনও ক্ষতি হবে না তো ডাক্তারবাবু?”

“ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কতটা আছে, সেটা নির্ভর করছে, কীসে বিশ্বাস করছে-না করছে, তার উপর। তবে এই ধরনের প্রবণতা সাধারণত বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কমে যায়। ওর ক্ষেত্রেও সেটাই যাবে। তবে হ্যাঁ, ওর ভাবনাচিন্তার কয়েকটা দিক ক্ষতিকর। ওর মনে হয়, আমরা যত দুঃখ পাই, যত একাকিত্ব আমাদের গ্রাস করে, তত আমরা একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাই। এবং বেঁচে থাকার সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় হল আত্মহত্যা। আত্মহত্যা আমাদের এক ইউটোপিয়াতে নিয়ে যায়… এ ধারণাটা ওর মাথা থেকে মুছে ফেলা দরকার। না হলে ভবিষ্যতে গিয়ে…”

মিস্টার ঘোষের চোখে-মুখে চিন্তার রেখা দেখা যায়— “আপনি প্লিজ ওকে ঠিক করে দিন….”

“একটু সময় লাগবে। কিছু ট্রিটমেন্ট আছে। তবে হ্যাঁ, সমস্তটা ভুলে যাবে, সে কথা দিতে পারছি না। মাথা তো আর কম্পিউটার নয় যে সুইচ টিপলেই চিরকালের মতো ডিলিট হয়ে যাবে… যদি আবার কোনও সিভিয়ার ট্রমা এই সেম স্মৃতিগুলোতে নতুন করে জল-বাতাস দেয়, তবে আবার ও হ্যালুসিনেট করতে পারে…”

“মানে বড় হয়ে আবার এইসব ধারণা ফিরে আসতে পারে?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন সমীরণ বাচস্পতি, “এখন যেভাবে আছে, ঠিক সেভাবে নয়। ততদিনে ওর ভিউ বদলাবে, এক্সপিরিয়েন্স বদলাবে, কিন্তু মূল ব্যাপারটা একই। আত্মহত্যা করে জীবনের দুঃখ-দুর্দশা থেকে পালানো। আমাদের যা কিছু অনুভূতি, এক্সপিরিয়েন্স, আমরা সব জমা করতে থাকি। যেমন ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে আমাদের নিজেদের ছেড়ে দেওয়ার মতো একটা বিছানা থাকে, মন খুব আহত হলেও আমরা মনের জন্য কমফোর্ট জোন বানিয়ে নিই। সেটা ছোটবেলার কোনও খেলনা হতে পারে, কোনও মানুষ হতে পারে, কিংবা একটা জগৎ। আপনার ছেলের কাছে এই প্যারালাল জগৎটা হল একটা কমফোর্ট জোন। ভবিষ্যতে তেমন কোনও আঘাত পেলে হয়তো আবার কমফোর্ট জোনে ফিরে আসতে চাইবে ও …”

“আমরা তাহলে কী করব এখন?”

“কল্পনাপ্রবণতাটা বের করার একটা রাস্তা করে দিলেই আর অসুবিধা হবে না। ওর লেখালেখি করার শখ আছে দেখলাম। সেটা পারসিউ করতে পারেন। ভালো কথা, ওর দাদুর আত্মহত্যার কারণটা আপনারা জানেন?” দু-দিকে মাথা নাড়েন মিসেস ঘোষ, “উনি কিছুই লিখে যাননি, তা ছাড়া ওঁর সঙ্গে শেষদিকে আমাদের ততটা যোগাযোগ ছিল না। গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন। ন-মাসে ছ-মাসে একবার আসতেন বাড়িতে। যে দিন পাঁচেক থাকতেন, তার মধ্যে ওর সঙ্গেই বেশির ভাগ সময় কাটাতেন। আমাদের সঙ্গে ওই নামমাত্র কথাবার্তা হত…”

“বেশ, ইলোরা বলে কাউকে চেনেন আপনারা?”

“ইলোরা! কই না তো…”

“হুম! বারবার ওই নামটা উচ্চারণ করছে। কিন্তু খুলে কিছুতেই বলতে চায় না। সম্ভবত দাদুর কাছে শুনে থাকবে নামটা…”

.

মা-বাবা আর ডাক্তারবাবুর কথা কানে আসছিল রূপের। ঠিক পাশের ঘরেই বসে আছে ওরা। ভেসে আসা কথায় কান দিচ্ছে না রূপ। ওর মনোযোগ গেছে বাইরের বারান্দার দিকে। সেখান থেকে একটা মিহি গলার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। কে যেন কাঁদছে ওখানে। ধীরপায়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে বারান্দার দরজা খুলে রূপ অবাক হয়ে যায়। একটা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাইরের দিকে মুখ করে। তার হাতে একটা কাচের জার। দেখে বোঝা যায়, জারটা ধরে থাকতে অসুবিধা হচ্ছে মেয়েটার।

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে রূপ, “এই! তুই কে রে?”

“আমি, আমি ইলোরা…” কান্না-ভেজা গলাতেই বলে মেয়েটা।

নামটা চেনা লাগে রূপের। কাচের জারটা দেখে নিশ্চিত হয়, “ও আচ্ছা! তোর কথা বলেছিল বটে দাদু। কিন্তু তুই এখানে এলি কী করে?”

“তুই যেখানে যাবি, আমিও সেখানে যাব…. শুধু সব সময় তুই আমাকে দেখতে পাবি না…”

“কিন্তু দাদু বলেছিল তোর অনেক বয়স, তুই এত ছোট হয়ে গেলি কী করে?”

“তোর যা বয়স, আমারও তা-ই বয়স হবে।”

ইতস্তত কয়েকটা জোনাকি উড়ে বেড়াচ্ছে সেই জারের ভেতর। ও এগিয়ে এসে ইলোরাকে ভালো করে দ্যাখে, কী সুন্দর সবুজ চোখ মেয়েটার! জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, দাদু কি আমাদের জগতে চলে গেছে?”

“হ্যাঁ, তোর দাদুর জারটা ভরতি হয়ে গিয়েছিল, তাই চলে গেছে…”

ইলোরা আর রূপ বেশ কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে থাকে। একমনে তাকিয়ে থাকে দূরে অন্ধকারে ঢেকে-থাকা শহরটার দিকে। রূপের মনটা খারাপ হয় না, আবার ভালোও হয় না খুব একটা। কেমন যেন মাঝামাঝি এসে থমকে থাকে সব কিছু।

“তুই এখানে এলি কেন?” ও-ই প্রথম প্রশ্ন করে।

“তোকে কয়েকটা কথা বলতে এলাম….”

“কী কথা?”

“ওই যে পাশের ঘরে যারা আছে, তোর মা, বাবা, ওই লোকটা… ওরা তোকে সব ভুলিয়ে দেবে।”

“কী ভুলিয়ে দেবে?”

“তোর দাদুর কথা, দাদুর বলা গল্পের কথা, আস্তে আস্তে তুই ভুলে যাবি সব… শুধু আমাকে ভুলতে পারবি না…”

“কেন পারব না?”

“কারণ আমি তো শুধু গল্প নয়। আমি একটা প্রতিজ্ঞা।”

“কীসের প্রতিজ্ঞা?”

“ওই যে…” ইলোরা এবার চোখের জল মুছে হাসে— “কষ্ট জমতে জমতে একসময় আর জমার জায়গা থাকে না। আমাদের ছেড়ে একজন একজন করে চলে যেতে থাকলে একসময় আর কেউ যেতে পারে না, সব কিছু খারাপ হতে থাকলে একসময় আর কিছু খারাপ হওয়ার জায়গা থাকে না… আমি সেই প্রতিজ্ঞাটা… তোর জীবনের সব খারাপ সময়ে আমি তোর কাছে আসব। এই জারটা দেখাব তোকে। দেখাব আর কতটা জোনাকি আসা বাকি আছে এর মধ্যে…”

ভারী আমোদ লাগে রূপের। কী যেন একটা আছে ইলোরার মধ্যে। ওর মন ঠান্ডা হয়ে আসে।

“আমার বন্ধু হবি তুই?” ও হাত বাড়িয়ে দেয়।

“তুই না চাইলেও আমি চিরকাল তোর বন্ধু ছিলাম। আরও অনেক মানুষের বন্ধু ছিলাম…”

ইলোরার কাছে সরে আসে রূপ। ওর কাঁধে একটা হাত রাখে। তারপর বলে, “তুই খুব ভালো, জানিস?”

“না, আমি ভালো নই। আমার হাতে অনেক মানুষের প্রাণ গেছে। অনেকের কাছ থেকে তাদের প্রিয়জনকে আমি ছিনিয়ে নিয়েছি। আমি ভালো নই…”

“তাহলে তুই খারাপ?” ভুরু কোঁচকায় রূপ।

“আমি ভালোও নই, আমি খারাপও নই, আমি… নিশ্চিত। এই পৃথিবীতে আমি সব থেকে বেশি নিশ্চিত… অনেক মিথ্যের মধ্যে আমি একমাত্র সত্যি…”

কাঁধে রাখা হাতটা দিয়ে ওর গলাটা জড়িয়ে ধরে রূপ। মাথাটা পেছনদিকে এলিয়ে দেয়। ওর কানে আসে, পাশের ঘর থেকে কে যেন ডাকছে ওকে…

“রূপ… এই রূপ… ঠান্ডার মধ্যে আবার বারান্দায় গিয়ে বসে আছিস তুই!” কথাটা কানে নেয় না। রূপের ভারী ভালো লাগে ইলোরার সঙ্গে কাটানো সময়টুকু। ওদের মাঝখানে রাখা আছে জারটা। তার ভেতর স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়াচ্ছে কয়েকটা জোনাকি। যেন অজানা ছন্দে, অজানা নাচে মেতে উঠেছে তারা…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *