জোনাকির রঙ – ১৮

(অষ্টাদশ অধ্যায়)

“এই জায়গাটা চেনো তুমি?” বিনয়ের সামনে নিজের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় তোলা একটা ছবি তুলে ধরে নীহারিকা। বিনয় ভালো করে দেখে বলে, “এটা তো ওই খাদটা। জায়গাটা চেনা লাগছে, কিন্তু অনেকদিন যাইনি ওদিকটায়…”

“গাড়ি বের করো, কুইক….

বিনয় একটু থতোমতো খায়। ক্যাসেটটা এখনও শোনা শেষ করেনি নীহারিকা। তার আগেই টেপরেকর্ডারটা সরিয়ে রেখে উঠে এসে নির্দেশ দিয়েছে ওকে। সমস্ত শরীরে একটা উত্তেজনা ছুটে খেলা করছে নীহারিকার। যেন এক্ষুনি ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে চলেছে…

“ওখানে গাড়ি তো যায় না, ম্যাম। একটা রাস্তা আছে কিন্তু সেটা দিয়ে চালানো একটু রিস্ক হয়ে যাবে…

“হোক, কিছু যায় আসে না…” কথাটা বলে প্রায় ছুটেই বাইরে বেরিয়ে আসে নীহারিকা। বিনয়ের একটু খটকা লাগে। টেপরেকর্ডারে এমন কী শুনল ম্যাম যে এত তাড়া পড়ে গেল? সে আর প্রশ্ন না করে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল। জংলুও উঠে বসল ওদের সঙ্গে। গাড়ি চলতে শুরু করতেই ড্যাশবোর্ডের উপর একটা চাপড় মারল নীহারিকা, “তাড়াতাড়ি চালাও প্লিজ। তাড়াতাড়ি পৌঁছোতে না পারলে….” দু-পাশে রাস্তা ছুটতে শুরু করেছে ইতস্তত। বৃষ্টির তোড়ে সামনের পথটার বেশির ভাগটাই দেখা যাচ্ছে না। অদ্ভুত একটা ধোঁয়াশা উঠছে রাস্তার উপর।

নিজের ফোনটা নীহারিকার দিকে এগিয়ে দেয় জংলু, “স্যার আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাইছেন….”

নীহারিকা ফোনটা নিয়ে দ্যাখে, ভিডিয়ো কলে আশিস দত্তর মুখ ফুটে আছে। সেদিকে চেয়ে বলে, “আপনি আগে থেকেই সব জানতেন, তা-ই না?”

“আমি কী জানব! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ, শুধু এটুকু জানতাম, বিনির কোনও মেমোরি লস হয়নি। তা ছাড়া…”

কপালে হাত রাখে নীহারিকা। আশিস দত্ত আগের মতোই উদবিগ্ন গলায় বলেন, “আপনি কী বলছেন, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। একটু পরিষ্কার করে বলবেন প্লিজ?”

ঝিমঝিমে গতিতে ছুটে চলেছে গাড়িটা। বাইরেটা একবার ভালো করে লক্ষ করে বড় শ্বাস নেয় নীহারিকা, তারপর বলে, “বিনি ওর ডায়েরিতে বারবার এক অন্ধ বুড়োবুড়ির কথা বলত। যারা এক বাড়িতে থাকে, একে অপরকে দেখতে পায় না, কেবল কে কী করছে সব জানতে পারে… এই বুড়োবুড়ি আর কেউ না, ওদের নিজেদের ছোটবেলা। ওরা ছেলেবেলায় একে অপরের গল্প শুনত, দুঃখকষ্টের হদিস জানত, কিন্তু কেউ চিনত না কাউকে। মুখ দেখতে পেত না…”

“মানে? গল্প জানত কেমন করে?”

“মন দিয়ে শুনুন, আজ যা কিছু ঘটেছে বা ঘটতে চলেছে, তার সমস্ত কিছুর পেছনে আছে আপনার মেয়ের সাংঘাতিক কল্পনাপ্রবণতা, কারও ওকে বোঝার চেষ্টা না-করা, উপরন্তু ওর প্রতি হিংস্র আচরণ। আপনিও যদি পয়সাকড়ি দিয়ে লোকের হাতে ছেড়ে না দিয়ে একটু নজর দিতেন ওর উপর, তাহলে হয়তো এইদিন দেখতে হত না আমাদের…

বিনি ছোট থেকে টরমেন্টেড চাইল্ড। কারও কাছে ভালোবাসা পায়নি; ওর এক দাদু, আই মিন অমর ঘোষ ছাড়া। আপনার দাদা অমর ঘোষকে তাড়িয়ে দেওয়ার পরও উনি আপনাদের বাড়ির আশপাশেই লুকিয়ে দেখা করতেন বিনির সঙ্গে। সম্ভবত রাতের এক বিশেষ সময় ঘোড়াপোড়া গাছের কাছে। ওকে গান শোনাতেন, গল্প বলতেন, তার ফাঁকেই ওকে বলতেন একটি ছেলের কথা, যার সঙ্গে জুড়ে আছে ওর জন্মবৃত্তান্ত।

মিস্টার দত্ত, মানুষ সারাজীবন শিকড় খুঁজে চলে। একান্ত আপন কোনও সম্পর্কের খোঁজ করে, যা কোনওদিন তাকে ছেড়ে যায়নি; তাকে ঘৃণা করেনি, বিনির ক্ষেত্রে সেই খোঁজটা আরও কয়েকগুণ বেশি ছিল। ছোট থেকেই ভালোবাসা আর যত্নের জন্য হাহাকার ওর। ফলে সেই ছেলেটির সঙ্গেই নিজেকে জুড়ে নেয় বিনি। বলা বাহুল্য, এই ছেলেটিই রূপ। এভাবে কয়েক বছর চলে। একসময় দাদুর আসা বন্ধ হয়ে যায়, বিনির কাছে রূপের খবর আসাও থেমে যায়। অথচ তার মনের ভেতরে তার শিকড় হিসেবে সেই ছেলেটি রয়েই যায়। তার নাম বা চেহারা কোনওটাই তখনও জানত না বিনি। অমর ঘোষ বিনিকে বলে গিয়েছিলেন, তিনি চলে গেলে পুনা নামে কেউ একজন আসবে ওর জীবনে। সে চলে গেলে আবার অন্য একজন। এবার একটা সাইকোলজি ভালো করে বুঝুন—’পুনা’ কোনও একজন ব্যক্তি নয়। পুনা একটা পোস্ট। বিনির সব থেকে কাছের মানুষের ডাকনাম। দাদু মারা যাওয়ার পর বিনির আর কেউ ছিল না। ফলে ও মনে মনে একটা পুনা কল্পনা করে নেয়। ওর অলটার ইগো। যে বিপদে-আপদে ওকে রক্ষা করে, ওকে লড়াই করতে শেখায়, যে রেডিয়ো থেকে ওর সঙ্গে কথা বলে…. হঠাৎ রেডিয়ো কেন? কারণ অতি সহজ। যে সময় বিনি বড় হয়, তখন ক্যাসেটের চল কমে আসছে। ওর বাড়ির লোক থেকে শুরু করে ডাক্তার, কেউই ও কী কী ক্যাসেট শোনে, সেদিকে মন দেয়নি। দাদুর রেখে যাওয়া জিনিসপত্রের মধ্যে এমনই একটা ক্যাসেট খুঁজে পায় বিনি। খুঁজে পায় বললে ভুল হবে, ‘পুনা’ ওকে খুঁজে দেয়। বিনির কল্পনাপ্রবণ মন ভেবে নেয়, ঘোড়াপোড়া গাছের নীচে ওর জন্য রূপের হদিস রেখে গিয়েছিল কেউ। সেই ক্যাসেট থেকেই রূপের গলার আওয়াজ শোনে ও। রূপের নাম, ওর বলা গল্প, সব রেকর্ড করা ছিল সেখানে…”

“কী ছিল ম্যাম, সেই ক্যাসেটে?” জংলু জিজ্ঞেস করে।

“রূপের গলায় বলা গল্প। সম্ভবত অমর ঘোষ নিজেই রেকর্ড করেছিলেন সেটা। ক্যাসেটে ওর ডাকনামটাও বলা আছে, রূপ। রেডিয়োতে কাজ করার সময় ওর নাম ছিল আরজে রূপ। ডাকনাম, গলার আওয়াজ, গল্প বলার ধরন মিলে যেতেই বিনি বুঝতে পারে, এই ছেলেটার গল্পই দাদু বলত তাকে…

“কী অদ্ভুত!” আশিস দত্ত নিচু গলাতেই বলেন।

“দাদুর কাছে গল্প বলা শিখেছে বলে রূপের গল্পের সঙ্গে ওর দাদুর বলা গল্পের অদ্ভুত মিল। রূপ বিনিকে না চিনলেও বিনি রূপকে চিনতে পারে। এবার আবার ফিরে চলুন অমর ঘোষের গল্পে। বিনির দাদু ওকে বলেছিল, ওরা দুজনেই এসেছে অন্য জগৎ থেকে। একদিন আবার ফিরে যাবে সেখানে। দাদুর গল্প এতটুকু মিথ্যে মনে করে না বিনি। কারণ সেই গল্পেই একমাত্র ওর সুখের হদিস আছে, সেই গল্পেই ও একমাত্র সুখী রাজকন্যা… ওরা এ জগতে যত দুঃখ পায়, তত জোনাকি এসে একটা জার ভরতি করতে থাকে। ওরা আবার নিজেদের সেই জগতে ফিরে যেতে পারবে একটা জার ভরতি হলে…. বিনি অপেক্ষা করতে থাকে জোনাকি দিয়ে সেই জার ভরতি হবার….”

“কিন্তু অমর ঘোষ এসব কথা ওদের মাথায় ঢুকিয়েছিল কেন?”

“জানি না। ভদ্রলোক নিজেও মানসিকভাবে খুব একটা সুস্থ ছিলেন না মনে হয়। উনি নিজেই যদি বিনির বায়োলজিক্যাল ফাদার হয়ে থাকেন, তবে বিনি আর রূপ বায়োলজিক্যালি রিলেটেড। তবে সম্ভবত সেটা নয়। অমর ঘোষের সঙ্গে বিনির চেহারার কোনও মিল নেই। বিনির প্রকৃত বাবা কে তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। ওর মায়ের তত্ত্ব আমি বিশ্বাস করি না… কেবল…

নীহারিকা হঠাৎ থেমে যেতেই বিনয় প্রশ্ন করে, “কেবল কী?”

“বিনির এই অদ্ভুত ক্ষমতাগুলো—আই মিন ক্লেয়ারভয়েন্স, আই সাইট হিপ্নোটিজম, ওর শরীরের অদ্ভুত হিলিং ফ্যাক্টর, এগুলো আমাকেও কেমন ধাঁধায় ফেলে দেয়। একটা মানুষকে ঘিরে এতগুলো রহস্য থাকে কী করে?

যা-ই হোক, আমি খবর নিয়ে জেনেছি, অমর ঘোষ নিজেও আত্মহত্যা করেছিলেন। যা থেকে ওদের আরও বেশি করে মনে হয়, ওদের দাদুও কোনও চিরসুখের জগৎ ইউটোপিয়ায় চলে গেছেন। আত্মহত্যাই সেখানে যাওয়ার একমাত্র পথ…”

“তারপর?”

আবার বড় করে দম নেয় নীহারিকা–”মহাকালদেবের মন্দিরের কথা দাদুর থেকেই শোনে বিনি। দাদু ওকে বলে, সে মন্দিরে নাকি লুকিয়ে আছে এক আত্মহত্যার দেবতা, ইক্সট্যাব। সে-ই একদিন মুক্তি দেবে ওদেরকে। দাদু চলে যাওয়ার পর বিনি বহুবার বাড়ি থেকে পালিয়ে ওই মন্দিরে যায় বা ‘পুনা’ তাকে নিয়ে যায়। বলা বাহুল্য, সে মন্দিরে ইক্সট্যাব থাকার দূরদূরান্ত অবধি কোনও সম্ভাবনা ছিল না। ইন্সট্যাব মায়ানদের দেবতা। আদৌ মায়ানদের মধ্যেও সে দেবতা সত্যি ছিল কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু বিনির কাছে ওর দাদুর গল্প মিথ্যে হতে পারে না। অতএব পুনা, বিনির অলটার ইগো, নিজেই সে মন্দিরে ইক্সট্যাব কল্পনা করে নেয়। মন্দিরের ভেতর ইন্সট্যাবের নাম আর ছবি খোদাই করা তারই কীর্তি…” নীহারিকার ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে— “মানুষই দেবতা গড়ে/ তাহারই কৃপার ’পরে করে দেবমহিমা নির্ভর।”

কিছুক্ষণ কেউ কোনও কথা বলে না। গাড়ির বনেটের উপর বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ার শব্দ আসছে। কী যেন একটা সুর মিশে আছে সেই আওয়াজে। নেশা ধরে যায়।

“এবার উলটোদিক থেকে শুনুন। ছোটবেলায় বিনির গল্প রূপও শুনত। সে-ও একই রকম কল্পনাপ্রবণ ছোট থেকে। তার কাছেও ধীরে ধীরে বাস্তব হয়ে উঠছিল গল্পগুলো। কেবল তার ছোটবেলাটা বিনির মতো অভিশপ্ত ছিল না। সে প্রথম আঘাত পায় তার দাদুর মৃত্যুতে। নিজের চোখে দাদুর দেহ ঝুলতে দেখে তার স্থির বিশ্বাস জন্মায়, দাদু সেই অজানা জগতে চলে গেছে। তখন থেকেই মাথায় কিছু গোলমাল দেখা দেয় তার…. কল্পনার জগতে আশ্রয় নিতে চায় বারবার… রূপের বাবা-মা ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে ট্রিটমেন্টের ফলে ওর দাদুর কথা মনে থাকলেও সেই গল্পগুলোর উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফ্যালে। বা সোজা কথায়, ভুলে যায়। কেবল ভোলে না একটা জিনিস, সব সমস্যা থেকে পালানোর একমাত্র উপায় আত্মহত্যা। দুঃখ জমতে জমতে একসময় চিরসুখের দরজা খুলে যায়। এইটুকু কোনওভাবে মনে থেকে যায় তার…. ক্রমশ রূপ বড় হতে থাকে। ওর জীবনটাও একটু একটু করে কঠিন হয়ে পড়ে। বাবা-মা মারা যায়। এতগুলো মৃত্যু একসঙ্গে দেখা, মানুষের চলে যাওয়ার সঙ্গে যোগ হয় ওর ব্যক্তিগত জীবনের একাকিত্ব… এখানে আসার দিন একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখতে পায় রূপ। ছেলেটা কখনও গাড়ির নীচে চাপা পড়ছে, কখনও জলে ডুবে মরছে। বাচ্চাটা আর কেউ নয়, রূপের নিজের ছেলেবেলা। অন্য জগতে চলে যাওয়ার ভাবনাটা ওর মন থেকে মুছে গেলেও রয়ে গিয়েছিল অবচেতনে। এখানে এসে থেকে সেটা উত্তরোত্তর আরও বাড়তে শুরু করে…” কথাগুলো শেষ করে পেছনে হেলান দিয়ে বসে নীহারিকা – “আমার ধারণা, ওদের দুজনের এখন একটাই লক্ষ্য। যেভাবে ওরা এসেছিল, সেভাবে একসঙ্গে পৃথিবী ছেড়ে, ওদের ব্যথার জগৎ ছেড়ে চলে যাওয়া…”

কথা বলতে একটু সময় লাগে আশিস দত্তর, “বছর তিনেক আগে ও আমাকে বলেছিল রূপের কথা। ওর খোঁজখবর রাখতে বলেছিল। আমি সব কথাই ওকে জানাতাম। ওর মাথায় মাঝেমধ্যেই এমন বেয়াড়া খেয়াল চাপত। আমি আলাদা করে কিছু ভেবে দেখিনি। মাসখানেক আগে ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার পর হসপিটালে জ্ঞান ফেরে। আমি দেখতে যেতেই অদ্ভুত একটা অনুরোধ করে আমাকে। বলে, ও নিজের গল্পগুলো শুনতে চায়, মিস্টার ঘোষের মুখে। বাকি যা কিছু হয়েছে, ওর নির্দেশ মতোই হয়েছে। মনে সবই ছিল ওর…”

“কী অদ্ভুত মানুষ, তা-ই না? কেবল গল্প শুনবে বলে…”

বিনয়ের কথা শেষ হবার আগেই তাকে বাধা দেয় নীহারিকা, “কী আর করবে বলো? জীবনের এক-একটা মুহূর্ত একবারই আসে আমাদের জীবনে। ওর ছোট থেকে এমন কোনও মুহূর্ত নেই, যেটা মনে করে মৃত্যুর আগের মুহূর্তে নিজের জীবনটা সার্থক মনে হবে ওর। তুমি-আমি হয়তো এই ডেসপারেশনটা বুঝতে পারব না। লোকে বলে, মরার আগে আমরা নাকি চোখের সামনে নিজেদের জীবনটা সিনেমার মতো দেখতে চাই… ও হয়তো তেমন করেই দেখতে চেয়েছিল…”

আশিস দত্ত বলেন, “আপনি যে একসময় মিস্টার ঘোষের সব থেকে কাছের বন্ধু ছিলেন, সেটা আমি জানতে পারি মাসখানেকের মধ্যেই। ওকে জানাতেই ও একটা নতুন দাবি করে বসে। আপনাকে দিয়েই ওর চিকিৎসা করাতে হবে। আপনি বিয়ে করেছিলেন এদিকে। তাতে আমাদের সুবিধেই হয়েছিল। আসলে ও চেয়েছিল…”

“আমার থেকেই রূপের ছেলেবেলার খবর নিত, যেগুলো ওর দাদু ওকে বলে যেতে পারেনি। আজ বুঝতে পারছি, কেন আমার অতীত নিয়ে এত আগ্রহ ছিল ওর… আসলে ও আমার থেকেও গল্পই শুনতে চেয়েছিল…”

“দুটো মানুষ সারাজীবন শুধু গল্প দিয়ে জুড়ে রইল। কখনও ডায়েরি, কখনও অন্যের মুখে শোনা গল্প…”

“কিন্তু ওরা এখন গেছে কোথায়?” অস্থির হয়ে প্রশ্ন করলেন আশিস দত্ত। নীহারিকা ওর ফোনে একটা ক্যামেরায় তোলা ছবি তুলে ধরে সামনে— “এই জায়গাটায়…. এবং সম্ভবত ফিরবে বলে যায়নি….

আশিস দত্ত তাকিয়ে দেখেন, একটা হাতে আঁকা ছবি দেখা যাচ্ছে সেখানে। পাহাড়ের ফাঁকে একটা ছোট খাদ। তার একদিকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সেই সূর্যের বুকে একটা চৌকো খোপ, অন্ধকার হয়ে রয়েছে সেখানটা।

“এ ছবিটা আমি আগেও দেখেছিলাম বিনির ডায়েরিতে। কিন্তু মানে বুঝতে পারিনি। আজ বুঝতে পারছি, ওর কল্পনায় এই দরজাটাই ওদের নিয়ে যাবে অন্য জগতে।”

একটু চুপ করে থাকে নীহারিকা। গাড়ির ভেতরের বাতাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। বাইরে এতক্ষণে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। বিনয় ক্রমাগত ঘড়ি দেখছে। সামনে রাস্তা জনশূন্য। সমস্ত চরাচর ফিরে গেছে সৃষ্টির প্রথম যুগে।

“বিনি প্রায় কোনওদিনই কিছু লুকোতে চায়নি। ও যা বিশ্বাস করত, যা কল্পনা করত, আর যা চাইত তা সবই খোলা পড়ে ছিল সকলের চোখের সামনে। কিছু কেউ গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। বাবা ঘৃণা করত ওকে। মায়ের সঙ্গে কোনওদিনই বনিবনা হয়নি। আপনিও ওকে টাকাপয়সা আর দেখাশোনার লোক দিয়ে খুশি রাখতে চেয়েছিলেন। আসলে এর কোনও কিছুই কোনওদিন চায়নি ও। চেয়েছিল শুধু কিছু মুহূর্ত, যে মুহূর্তগুলোর জন্য ওর থেকে যেতে ইচ্ছা করবে, ভালো থাকতে ইচ্ছা করবে…”

চোখ বুজে ফ্যালে নীহারিকা। শতরূপও কাউকে বুঝতে দেয়নি কিছু। ও কতবার পাগলের মতো গিয়ে কড়া নেড়েছে ওর দরজায়। কিন্তু কখনও খুঁজে পায়নি ওকে। কোথায় যেন একটা একাকিত্ব ছিল ছেলেটার মধ্যে। হয়তো ওর অবচেতন মনই ওকে বলত, ও একা নয়। কেউ একটা আছে, কোথাও না কোথাও আছে, ভেঙে যেতে গিয়েও ভেঙে যেত না… অজান্তেই হয়তো কারও জন্য অপেক্ষা করছিল ও… একটা পুরোনো সুখের ঢেউ ঝাঁপিয়ে পড়ে নীহারিকার শরীর জুড়ে। আজ থেকে কয়েক বছর আগে, প্রিয় বন্ধুকে শেষবার ছেড়ে আসার আগে ঠিক যে চাওয়াটা তার জন্যে রেখে গিয়েছিল ও, সেটা কবে যেন ওর অজান্তেই পূরণ হয়ে গেছে… ওর বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে জল নেমে আসে…. মিনিট দশেক পর একটা বাঁকের মুখে গাড়ি থামায় বিনয়। দরজা খুলতে খুলতে বলে, “এখান থেকে দশ মিনিট হাঁটলেই খাদের ধারটায় পৌঁছে যাব…

“দৌড়োতে হবে, এসো আমার সঙ্গে…”

বিনয় যেদিকে দেখিয়েছিল, সেদিকে উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়োতে থাকে নীহারিকা। জংলু আর বিনয় অনুসরণ করে তাকে। গাছপালার সার ভেদ করে কিছুটা দৌড়োতেই ঝিলটার ধারে এসে পড়ে। বেঞ্চের উপরে ভায়োলিনটা বৃষ্টির জলে ভিজছে এখনও। সাইকেলটা একটা গাছের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখা। সেটার দিকে আঙুল তুলে দেখায় জংলু, “ওই যে সাইকেলটা… ওরা তার মানে এখানেই এসেছে…”

“এবং এখান থেকে আর কোথাও যায়নি…” থমথমে গলায় বলে নীহারিকা। খাদের দিকটায় দৌড়োতে শুরু করে ওরা তিনজন। দূর প্রান্তে এখন সূর্যটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। ঘন অন্ধকার নামতে শুরু করেছে এর মধ্যে। বৃষ্টির জল জমেছে ঘাসের ডগায়। তার উপরে তিনজোড়া পায়ের ছপছপ আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।

“রূপ… বিনি….” দুজনের নাম ধরে চিৎকার করতে শুরু করে ওরা। পাহাড়ি অন্ধকারের ভেতর থেকে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসতে থাকে সেই শব্দ। কোনও উত্তর আসে না। খাদের ধারটায় এসে দাঁড়ায় নীহারিকা। এখান থেকে নীচের ঘন অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে-থাকা বিরাটাকার মহিরুহগুলোকে দেখা যায় কেবল। কয়েক হাজার মিটার খাড়াই নেমে গেছে নীচে। সেদিকে তাকালেই গা-টা ছমছম করে ওঠে। পকেট থেকে ফোন বের করে তিনজনে। সেটা চতুর্দিকে বুলিয়ে দেখতে থাকে। অসংখ্য জোনাকি উড়ছে সমস্ত জায়গাটায়। আর কোনও জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই। একটা উত্তরহীন প্রাচীন প্রশ্নের মতো শূন্য হয়ে গেছে জায়গাটা। খাদের ধারেই মাটির উপরে বসে পড়ে নীহারিকা। ক্রমশ ক্লান্তিতে অবশ হয়ে আসছে ওর শরীর। পিঠটা এলিয়ে পড়ে নরম ঘাসের উপরে। বিনয় আর জংলু এগিয়ে আসে ওর দিকে, “কোথাও খুঁজে পেলাম না ওদের, ম্যাম। এদিকে নেই ওরা। মনে হয়…” কথাটা শেষ করতে পারে না বিনয়। নীহারিকার সমস্ত মুখের উপরে বৃষ্টির জলের আস্তরণ বইতে শুরু করেছে। মাথার উপরে চাপ চাপ মেঘে ঢাকা আকাশ। তাতে সমস্ত তারা লুকিয়ে পড়েছে। দু-হাতে মুখ ঢেকে নেয় সে। “বিনিদিদিকে নিয়ে এই ভয়টা সব সময় হত, কিন্তু দাদা…” জংলুর গলা জড়িয়ে যায়। ওরও চোখ বেয়ে জল নামতে শুরু করেছে।

“তোর তারাটা আমায় চিনিয়ে দিলি না রূপ, চিরকাল একই রকম স্বার্থপর রয়ে গেলি তুই….” নীহারিকা বিড়বিড় করে বলে। ওর চোখ দুটো হারিয়ে গেছে আকাশের কোন প্রান্তে। মিনিটখানেক পরে বৃষ্টির তীব্রতা কমে আসে। আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসে খানিক। দূরে বৃষ্টি-ভেজা পাহাড়ের বুকে আবার জ্বলে ওঠে হলদে আলো। একটু একটু করে উঠে বসে নীহারিকা। জোনাকিগুলো আবার জ্বলতে শুরু করেছে। শান্ত স্বরে ঝিঁঝি ডাকছে ঝোপের আড়াল থেকে। খাদের অন্ধকারের দিকে শেষ একবার তাকিয়ে নিয়ে ফেরার পথ ধরে তিনজন। একটা একটা করে তারা ফুটছে আকাশে। সেই সঙ্গে ওদের ঘিরে জ্বলতে শুরু করেছে অসংখ্য জোনাকি…

*

“গল্প!”

দূরে আকাশের প্রান্তের দিকে আঙুল দেখায় শতরূপ, “দেখ, সূর্য ডুবতে আর একটু দেরি আছে। তা ছাড়া একটা জোনাকিও বাকি আছে আসতে…. শুনবি?”

“বেশ, বল…” ঐন্দ্রিলা ওর মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। ওর ডাগর চোখ দুটো এখন অসীম জিজ্ঞাসা নিয়ে চেয়ে আছে শতরূপের দিকে। ভারী নিষ্পাপ লাগছে চোখ দুটোকে।

“এক দেশে এক দুঃখী রাজকন্যা ছিল….”

“দুঃখী! আগের বার যে সুখী বলেছিলি…..”

“এটা অন্য একজনের গল্প। এর গল্প তুই জানিস না… শুধু আমি জানি। সেই দুঃখী রাজকন্যা একদিন দুঃখের থেকে অনেক দূরে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল….”

“তারপর? পেরেছিল পালিয়ে যেতে?”

শতরূপ দুটো হাত ওর দু-গালে রাখে, স্থিরদৃষ্টিতে তাকায় চোখের দিকে— “না, কারণ সে একসময় বুঝতে পারে, সে আদৌ দুঃখের থেকে পালাচ্ছিল না। কেউ দুঃখের থেকে পালায় না…

“তাহলে কীসের থেকে পালায়?”

“মিথ্যে সুখের থেকে। সেইসব সুখ, যা ভুলিয়ে রাখে আমাদের। সেইসব মানুষের থেকে, যারা কেবল কাছে থাকার ভান করে, একসময় ঠিক চলে যায়, কিংবা যেতে দেয়। সেইসব মানুষ, যারা আসলে কিছু চায় না, যারা কাছের কেউ চলে গেলে কাঁদে না, কাছের কিছু হারিয়ে ফেলে তাদের ভেতর হাহাকার হয় না, যারা হেরে যেতে যেতে হারটাকেই স্বাভাবিক মনে করে বাকি সবাইকেও হারিয়ে দিয়েছে… দুঃখ আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, বিনি, আমাদের বারবার বলে যায়, আমরা এখনও কিছু চাই, এখনও কিছু ভালোবাসি, এখনও কাউকে আঁকড়ে ধরতে চাই। আমরা কেউ দুঃখের থেকে পালাই না রে বিনি, আমরা পালাই নকল সুখ থেকে… আমাদের এই গোটা পৃথিবীটা কেবল মিথ্যে সুখে ভরে গেছে। শুধু দুঃখটুকুনি খাঁটি এখনও…”

“তারপর রাজকন্যা কী করল?”

“রাজকন্যা বুঝল ওর কাছে দুঃখ আছে। অনেক অনেক দুঃখ, ও কোথাও পালিয়ে যাবে কেন? এতটুকু মিথ্যে নেই, এতটুকু দেওয়াল নেই…. সব কিছু নষ্ট হয়ে গেছে, ছোটবেলা, কৈশোর, যৌবন…. সারা শরীরে অত্যাচারের দাগ, সারা পৃথিবীর মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, এতগুলো মানুষের ছেড়ে চলে যাওয়া… কিন্তু মিথ্যে তো নেই… যারা চলে গেছে, তারা সত্যি চলে গেছে, যা কিছু নষ্ট হবার, সব সত্যি নষ্ট হয়ে গেছে… পৃথিবীতে আর কারও কাছে এত সত্যিকারের কিছু নেই… কারও কাছে এত দুঃখ নেই…

“আমরা আর কোনওদিন ওই পৃথিবীটায় ফিরে যাব না, কেমন?” হাত দিয়ে শতরূপের মাথার পেছনের চুল খামচে ধরে বিনি।

“না, কোনওদিন না। আমি আর ওখানে ফিরতে চাই না…”

হঠাৎ পেছন থেকে ইলোরা এগিয়ে আসে বিনির সামনে। হাতের কাচের জারটা তুলে ধরে ওর মুখের কাছে। তার সবজে আলোয় ভরে আছে চারপাশ। শতরূপ এখনও আঁকড়ে ধরে আছে ওকে, ওর মুখ থেকে চাপা কিন্তু দৃঢ়স্বরে একটাই কথা বেরিয়ে আসছে। এ কথাটা কাউকে কখনও বলেনি শতরূপ। ছোট থেকে বড় হওয়া অবধি কখনও না। আজ প্রথমবার ওর চেনা খেলাটায় হেরে যাচ্ছে ও, বিড়বিড় করে বলে চলেছে, “আমি কোথাও যেতে দেব না তোকে। তুই চলে যেতে চাইলেও না…. কোনওদিন না, কোথাও না… কোথাও যেতে দেব না…

“আমি জানি, বিশ্বাস করি তোকে….” কথাটা বলে বিনি অবাক হয়ে তাকায় ইলোরার হাতে ধরা জারটার দিকে। ইলোরার মুখে হাসি। যেন জারের ভেতরে কিছু একটা ইশারায় দেখাতে চাইছে। বিনি চেয়ে দ্যাখে, সত্যি একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটছে সেখানে… জারের ভেতরের একটা জোনাকি হঠাৎই উড়তে উড়তে বেরিয়ে আসে বাইরে। যেন পথ ভুল করে খোলা হাওয়ায় বেরিয়ে এসেছে। তারপর কী খেয়ালে আরও একটু উড়ে যায় আকাশের দিকে তারপর আরও একটু পথ ভুল করে দিব্যি মজা লেগেছে তার…

“দেখ রূপ, জোনাকিগুলো কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে, বল তো ওরা?” বিনি হতবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে। শতরূপও ফিরে তাকায় ইলোরার দিকে। ইলোরার মুখের দিকে চেয়ে চিৎকার করে ওঠে সে, “জারটা আবার খালি হতে পারে, তুই বলিসনি কেন?”

ইলোরা অবজ্ঞাভরে জবাব দেয়, “এতদিন ধরে এত মানুষকে পারাপার করি, অত মনে থাকে নাকি?” কথাটা বলেই সে ফুঁসে ওঠে, “তুই এক্ষুনি যেটা বললি, সেটা আদৌ বলতে পারিস, আগে বুঝতে দিয়েছিলি আমাকে?”

পরক্ষণেই হেসে ফ্যালে ইলোরা। জারটা নামিয়ে রাখে মাটিতে— “তোরা একসঙ্গে থাকলে জারটা আর ভরতি হবে না…” বিনির দিকে ফেরে শতরূপ— “চল, আমরা আর কারও কাছে ফিরে যাব না…”

“সত্যি তো?”

“একদম সত্যি, আমিও চাই না ফিরে যেতে। সেই যে তুই চাইতিস জঙ্গলের ভেতর দুটো বুড়োবুড়ির বাড়ি আছে, যেখানে তুই ছোট থেকে থাকতে চাইতিস, সেটা খুঁজে বের করব। কারও সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখব না আমরা… সন্ধে হলে একটা ল্যাম্প জ্বালিয়ে বারান্দায় এসে বসব….”

“রোজ ভাবব, কালই মরে যাব… রোজ এক-একটা জীবনের গল্প করব আমরা…”

“রোজ একসঙ্গে সূর্যাস্ত দেখব…”

‘রোজ গান গাইব সারা সন্ধে ধরে…”

একটা একটা করে জোনাকি উড়ে যাচ্ছে জারের ভেতর থেকে জমাট-বাঁধা মেঘ সরে যাচ্ছে আকাশ থেকে। উজ্জ্বল কতকগুলো তারা বেরিয়ে আসছে তার বদলে।

“চলে আয় আমার সঙ্গে…” বিনির হাত ধরে টান মারে শতরূপ।

“চল…”

দুজনে পেছনদিকে ছুটতে থাকে। এতক্ষণ যে রাস্তাটা পেরিয়ে ওরা এসেছিল, সেই রাস্তা ধরে ছুটে যায় জঙ্গলের দিকে।

ইলোরা পেছন থেকে চিৎকার করে ওঠে, “আমার কী হবে তাহলে? তোদের দুজনকে ফিরিয়ে না নিয়ে যেতে পারলে আমার চাকরিটা যে…” বলতে বলতেই হেসে ফ্যালে খিলখিলিয়ে। হাসতে হাসতেই বলে, “যা শালারা… আমি তো থেকেই যাব চিরকাল। কারও না কারও মাথা খাব ঠিক….”

দূরে জঙ্গলের কোন অজানা প্রান্তে হারিয়ে যায় ওদের পায়ের আওয়াজ…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *