(চতুর্দশ অধ্যায়)
“ও দাদু, দাদু… তুমি ঘুমিয়ে পড়লে?” বৃদ্ধের গায়ে হাত দিয়ে ডেকে ওঠে ছেলেটা। তার অস্থির হাত দুটো কিছুতেই মানুষটাকে শান্তিতে ঘুমোতে দেবে না।
ঘুম ভেঙে চোখ মেলে তাকান বৃদ্ধ। স্মিত হেসে ওর মাথায় হাত রাখেন— “আমি তো আজই এতটা ট্রেনে করে এসেছি রে ব্যাটা, আজ না হয় একটু কমই গল্প শুনলি….”
“ধুর, তুমি তো এখন আর আসতেই চাও না। কতদিন শুনিনি বল তো। কতদিন হয়ে গেল আর আসোইনি…”
“আসিনি কি আর সাধে? গল্প জোগাড় করতে কি সময় লাগে না? সব কিছু নিজের চোখে দেখতে হয়, জানতে হয়, তারপরে তো মালমশলা মিশে গল্প তৈরি হয়….” নাতির মুখের দিকে চেয়ে মায়া হয় বৃদ্ধের, কত হাপিত্যেশ করে বসে ছিল ছেলেটা, “আচ্ছা বেশ….” বুড়ো চোখ রগড়ে ছেলেটার দিকে ফেরেন— “বল, আজ কীসের গল্প শুনবি? সাত ভূতের গল্প? নাকি প্যাঁচা-পেঁচির গল্প?”
সজোরে দু-দিকে মাথা নাড়ে ছেলেটা –”না, সেই দুঃখী রাজকন্যার গল্প….” বুড়োর মুখে কীসের জন্য একটা ছায়া পড়ে, চুপটি করে অনেকক্ষণ ভাবেন কী সব, তারপর গম্ভীর গলায় বলেন, “তোর ওই দুঃখী রাজকন্যার গল্প শুনতে খুব ভালো লাগে, না রে?”
উপরে-নীচে মাথা নাড়ে ছেলেটা।
“দুঃখের গল্প শুনতে এত ভালো লাগে কেন? হাসির গল্প, মজার গল্প, ভয়ের গল্প… এসব শুনতে ভালো লাগে না?”
“সব গল্পই তো দুঃখের হয়, দাদু, দুঃখ ছাড়া গল্প হয় নাকি?”
“সে কী রে! সে আবার কী কথা! সব গল্পে দুঃখ হবে কেন?”
“সব গল্পই তো শেষ হয়ে যায়। দুঃখ হবে না? শুধু যে গল্পগুলো দুঃখের হয়, সেগুলো শেষ হয়ে গেলে কষ্ট হয় না। দুঃখ কমে যায়…”
ওর গালে একটা হাত রাখেন বৃদ্ধ। নরম গলায় বলেন, “তুই কত বড় হয়ে গেছিস রে ব্যাটা। এই সেদিন এইটুকু দেখলাম … তোকে আর সেই মেয়েটাকে….”
“কোন মেয়েটা?”
“তোর থেকে বছর পাঁচেকের ছোটই হবে, তোরা দুজনে পড়েছিলি সেই আলোয় ভরা মাঠটায়…..”
এই গল্পটা আগেও বহুবার শুনেছে ছেলেটা, তা-ও বারবার শুনতে ইচ্ছা করে। বারবার প্রথমবার শোনার ভান করে। ভারী শান্তি পায় ও। ওর সঙ্গে আরও একটা না-দেখা মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে! দুটো বিচ্ছিন্ন গাছের শিকড় দুটো বিচ্ছিন্ন মহাদেশের মাটি ফুঁড়ে একে অপরকে স্পর্শ করেছে। তাদের কেউ দেখতে পায় না, কেবল কোথাও তাদের শিকড় জড়িয়ে থাকে। বৃদ্ধ দম নিয়ে বলে চলেন, “তারপর সেই মাঠ দিয়ে সেই যে আমি ফিরছিলাম…. ভীষণ দেরি হয়ে গিয়েছিল সেদিন। তোর ঠাকুমা আবার আমার জন্য বসে থাকত কিনা, আমি বাড়ি ফিরে নারকেল আর চিনি দিয়ে মুড়ি মেখে খেতাম। সঙ্গে দুটো কাঁচালংকা। সারাদিন খেতখামারে কাজ করার পর সেইটুকু খাওয়ার জন্য আমার প্রাণটা ছটফট করত রে ব্যাটা।
“তো আমি ফিরছি, ফিরছি, এমন সময় দেখি, দুটো ফুটফুটে ছেলেমেয়ে পড়ে আছে খেতের উপর। যেখানে ওরা পড়ে আছে, তার চারপাশটায় একটা পোড়া দাগ, আর কুঁইকুঁই করে কাঁদছে দুটিতে। বড় ছেলেটা হলি তুই। তোর বয়স তখন কত হবে? এই ধর পাঁচ কি ছয়, আর সেই মেয়েটা তখন হামাগুড়ি দিচ্ছে সবে।
“তুই কোনওরকম করে ধরে রেখেছিস মেয়েটাকে। মেয়েটা বুঝি ঘুমোচ্ছিল। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, বেশিক্ষণ ঠান্ডায় পড়ে থেকে বুঝি মরেই গেছে বাচ্চাটা। আমি এগোতে যেতেই তুই ওকে পেছনে রেখে আগলে দাঁড়ালি। চিৎকার করে উঠলি জোরে! সে কী চিৎকার তোর…”
“আমি হাত তুলে বললাম, ‘ভয় পাসনি রে বাছারা, আমি তোদের কোনও ক্ষতি করব না…” তুই তখন কথা বুঝতে পেরেছিলি কি না জানি না। হাঁপাতে হাঁপাতে মাটির উপর বসে পড়লি। তারপর হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলি বোকার মতো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোরা কারা? কোথা থেকে এসেছিস?’
“তুই কিছুই বলতে পারলি না। কেবল মেয়েটাকে কোলের উপর নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলি আগের মতো।
“আমি ভাবলাম, কাদের ছেলেমেয়ে বুঝি ফেলে রেখে গেছে। বেশিক্ষণ এভাবে পড়ে থাকলে ঠান্ডাতেই মরে যাবে। ভাবলাম, আপাতত বাড়ি নিয়ে যাই, কেউ নিশ্চয়ই খোঁজ করতে আসবে। তখন মা বাপের হাতে তুলে দেব। কিন্তু ও হরি! একদিন গেল, দু-দিন গেল, কেউ আসে না। কেবল তুই সারাদিন মেয়েটাকে আগলে বসে থাকিস। তোর ঠাকুমা মেয়েটাকে দুধ খাইয়ে দেয়, সেই সময়টুকু ছাড়া সব সময় তোর কাছে থাকে। কিছুতেই কাছছাড়া করতে চাস না। তারপর…
“এমনি করে সাত-আট মাস কাটল, বুঝলি। মেয়েটা ততদিনে সবে টলমল পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। কিন্তু তার চোখ দুটো ভারী অদ্ভুত! সে চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন নেশা লাগে। মাঝে মাঝে ভয়ও লাগত। এ কাদের মেয়ে নিয়ে এলাম বাড়িতে? তোর ঠাকুমা বড় ভালোবাসত তাকে। তারপর একদিন একটা কাণ্ড ঘটল…”
“কী কাণ্ড, দাদু?”
“সেদিন খুব ঝড়জলের রাত। দুমদুম করে বাজ পড়ছে। মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা বুঝি এইবার ফট করে হাঁড়ির মতো ফেটে যাবে। অমন আকাশ-ভাঙা বৃষ্টি জীবনে দেখিনি। আমাদের তো মাটির বাড়ি। যে-কোনও সময় পড়বে ভেঙে।
আমরা দুজনে তোকে আর সেই মেয়েটাকে নিয়ে ভয়ে ঠকঠক করে বসে কাঁপছি। তো এমন সময় দরজায় খুব জোরে জোরে টোকা পড়ল। এত জোরে যে মনে হল, এই বুঝি দরজা ভেঙে ফেলবে কেউ।
“আমি ভেতর থেকে প্রশ্ন করে কারও হাঁক শুনতে পেলাম না। উঠে দরজা খুলে দিতে একটা ভারী সুন্দরী অল্পবয়সি মেয়ে ঘরে ঢুকে এল। ভারী অদ্ভুত দেখতে সেই মেয়েটাকে! সবজে চোখের মণি, এই একমাথা কোঁকড়ানো চুল, আর তেমন টিকোলো চোখ-মুখ। ঠিক যেন ভিনদেশি রূপকথার বই থেকে জেগে উঠে এই ঝড়জলের রাতে ছুটতে ছুটতে আমার ভাঙা বাড়িতে এসে পড়েছে।
“আমি তো তাকে দেখে অবাক! সে কিন্তু আমাদেরকে দেখে এতটুকুও ঘাবড়াল না। খেয়াল করে দেখলাম তার হাতে একটা বড় কাঠের বাক্স। তার ভেতরে কী যেন আছে… সেটা টেবিলের উপর রেখে ধাতস্থ হয়ে বসতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কে?’ সে বলল তার নাম নাকি ইলোরা। সে আসছে তোদেরকে খুঁজতে….”
“কেন? আমাদেরকে খুঁজছে কেন?”
“বলল, তোরা নাকি এক অন্য জগৎ থেকে কী এক গণ্ডগোল হয়ে এই পৃথিবীতে এসে পড়েছিস…”
“কেমন জগৎ, দাদু?”
“এক অদ্ভুত জগৎ! সেখানে সবাই খুব ভালো, সেখানে সব মানুষ খুব ভালো থাকে, কারও জীবনে কোনও দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, যারা যারা আমাদেরকে ছেড়ে চলে যায়, সেখানে গেলে তাদের সবাইকে খুঁজে পাওয়া যায়…”
“সত্যিই এমন জায়গা আছে, দাদু?”
“কী করে জানব বল ব্যাটা? আমিও তো খুঁজে পাইনি। তবে খুঁজছি, একদিন নিশ্চয়ই পেয়ে যাব…”
“তারপর সেই মেয়েটা কী বলল?”
“মেয়েটা বলল, সে-ও নাকি ওই জগৎ থেকেই আসছে। ও এসেছে তোদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। সে কথা শুনে তো তোর ঠাকুমার সে কী কান্না! আমি কিছু বলার আগে সেই মেয়েটাই শান্ত করল তাকে। বলল, একবার যখন চলে এসেছিস, তখন এক্ষুনি আর ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। নিয়ে একসময় যাবে, কিন্তু তার আবার এক নিয়ম আছে…
“আমরা একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। মেয়েটা ততক্ষণে সেই কাঠের বাক্সটা খুলে ফেলেছে। দেখলাম তার ভেতরে আছে একটা মস্ত কাচের জার।”
“কাচের জারে কী ছিল?”
“দেখলাম, দু-তিনটে সবজে জোনাকি উড়ে বেড়াচ্ছে সেই জারের ভেতর। কীভাবে জানি জারের ভেতর ঢুকে পড়েছে তারা। সেটা দেখিয়ে মেয়েটা আমাকে বলল, তোরা যতবার দুঃখ পাবি, কষ্ট পাবি, ততবার ওই কাচের জারের ভেতর একটা করে জোনাকি ঢুকে আসবে… এমন করে ভরতি হতে হতে যখন আর জোনাকি ঢোকার জায়গা থাকবে না, জারটা পুরোপুরি ভরে যাবে, তখন তোরা সেই অন্য জগতে চলে যেতে পারবি…. তার আগে যেতে পারবি না…”
“তারপর কী হল, দাদু?”
“মেয়েটা আরও বলল, তোরা দুজন একসঙ্গে থাকলে কাচের জারটা কোনওদিনই ভরবে না। ফলে সে আর তোদের নিয়েও যেতে পারবে না। তা তো হতে দেওয়া যায় না, হাজার হোক তার দায়িত্ব বলে কথা… সে শর্ত দিল, যতদিন না জারটা ভরছে, ততদিন তোদেরকে আমি রাখতে পারি। কিন্তু একসঙ্গে রাখলে চলবে না। আমি ভেবে দেখলাম এ ছাড়া তো উপায় নেই আর। ওর সঙ্গে আমার একটা চুক্তি হল…”
“কেমন চুক্তি, দাদু?”
“ওর সঙ্গে চুক্তি হল যে আমি তোদের দুজনকে দুটো আলাদা জায়গায় রাখব। এতটাই দূরে যে তোদের কোনওদিনও দেখা হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। তোদেরকে একে অপরের গল্প বলব আমি, কিন্তু নাম বলব না, মুখ চিনবি না তোরা…”
“তারপর?”
“তো আমার সঙ্গে চুক্তি করে মেয়েটা তো চলে যাচ্ছিল, এমন সময় হঠাৎ করে সে ফিরে এল। বলল, এই যে এতদিন আমি তোদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছি, তার বদলে ও আমাকে কিছু দিতে চায়…”
“কী দিয়েছিল, দাদু?”
“তোদের সেই জগত্টা, সেখানে তো সবাই চাইলেই যেতে পারে না… তো সেই মেয়েটা আমাকেও একটা কাচের জার দিয়ে গেল। তোদের মতো অত বড় নয়, ছোট। বলেছিল, আমার জারটাও যেদিন ভরে যাবে, সেদিন আমি ওই জগতে চলে যেতে পারব… ওখানে কোনও দুঃখ নেই, কারও কোনও অভাব নেই, কেউ বড় হয়ে যায় না, কারও বাবা-মা বুড়ো হয়ে যায় না, কারও বাবা-মা মরেও যায় না… বরঞ্চ যারা মরে গেছে, তাদেরকে আবার দেখতে পাওয়া যায়…
“সেই মেয়েটা এখন কোথায় আছে, দাদু? সেই যে সেই দুঃখী রাজকন্যা?”
বৃদ্ধ হাসে, বলে, “সে কথা তোকে বলি কী করে বল? তোদের যদি আবার কখনও দেখা হয়ে যায়? তাহলে তো আর সেই কাচের জার ভরবে না। আমারও কথার খেলাপ হয়ে যাবে…”
ছেলেটা বেশ কিছুক্ষণ মন দিয়ে ভেবে দ্যাখে সত্যিই কথাটার মধ্যে যুক্তি আছে। সে প্রশ্নটা পালটে ফেলে বলে, “আচ্ছা, কোথায় আছে না-ই বা বললে, শুধু বলো কেমন আছে?”
বৃদ্ধ চোখ বুজে চুপ করে থাকেন। কিছুক্ষণ হু হু করে রাতের হাওয়া বইতে থাকে। কী যেন একটা সুর মিশে যায় সেই হাওয়ায়। দূরে আকাশের গায়ে অসংখ্য নক্ষত্র ঝিকমিক করছে।
“ভালো নেই রে, অনেক কষ্ট তার…”
“আমারও কষ্ট হয় জানো, মাঝে মাঝে ভালো লাগে না কিছু…”
“তোর সব কথা বলতে ইচ্ছা করে ওকে, তা-ই না?”
“হ্যাঁ…” উত্তরটা দিয়ে আবার মেঝের উপরে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে ছেলেটা। বৃদ্ধ বোঝে, ওর মন খারাপ হচ্ছে। ছেলেটার মুখের উপরে ঝুঁকে পড়ে বলেন, “দেখ, তোরা দুজন যেখানেই থাকিস-না কেন, একটা জিনিস কিন্তু একই থাকে…”
“কী?”
আকাশের দিকে আঙুল দেখান বৃদ্ধ, “ওই আকাশটা, আর ওর ভেতরে জ্বলতে-থাকা তারাগুলো। আচ্ছা, আকাশের এতগুলো তারার মধ্যে তোর কোন তারাটা সব থেকে ভালো লাগছে?”
মন দিয়ে আকাশের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে ছেলেটা। তারপর একটা বিশেষ তারার দিকে আঙুল দেখায়। বৃদ্ধ হেসে বলেন, “আচ্ছা বেশ, তুই মন খারাপ হলে ওই তারাটার দিকে তাকিয়ে থাকিস, কেমন? আমার যখন ওই মেয়েটার সঙ্গে দেখা হবে, ওকেও বলব ওই তারাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে…. তাহলেই দুজনের দুঃখ মিলে যাবে। দুজনে একই জিনিস দেখলে দূরত্বটা খুব কম মনে হয়, তা-ই না?”
শতরূপ একমনে চেয়ে থাকে উজ্জ্বল তারাটার দিকে। বৃদ্ধ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, “ওর দুঃখের কথা তোর খুব শুনতে ইচ্ছা করে, তা-ই না?”
“হ্যাঁ…”
“আচ্ছা বেশ, আমি যতবার এখানে আসব, ওর সব দুঃখের কথা বলব তোকে, কেমন?”
দু-দিকে ঘাড় নেড়ে দেয় শতরূপ। তারপর বলে, “আচ্ছা দাদু, সেই মেয়েটার কী হল? সেই যে যার সবুজ চোখ? সে আর আসেনি তোমার কাছে?”
“আসবে, সময় হলেই সে আসবে। সে তো নিয়ে যেতে আসবে…”
“পৃথিবীতে এত মানুষ, সবাইকে সে-ই নিয়ে যায়?”
“না, সবাইকে নয়। যারা নিজের ইচ্ছায় চলে যেতে চায়, তাদেরকে কেবল নিয়ে যায় সে…”
“নিজের ইচ্ছায় মানুষ চলে যেতে চায় কেন?”
বৃদ্ধ আর কোনও কথা বলেন না। চুপ করে চেয়ে থাকেন ছেলেটার মুখের দিকে। ওর দিকে পাশ ফিরে ওকে জড়িয়ে ধরে গলার কাছে মাথাটা গুঁজে দেন।
একটা অদ্ভুত গন্ধ পায় শতরূপ। এ গন্ধ আর কোথাও পায়নি সে। রাতের হাওয়া ঝিরঝির করে বয়ে চলে, ঝিঁঝির ডাক, বুড়ো মানুষটার ঘামের গন্ধ আর গল্প মিলে অদ্ভুত নেশা-ধরা আবেশে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যায়।
উত্তর না পেয়ে অস্থির হয়ে ওঠে শতরূপ, আবার বৃদ্ধকে ঠেলা দেয়, “ও দাদু, বলো। মানুষ নিজে থেকে চলে যেতে চায় কেন?”
আর কোনও উত্তর আসে না। নরম হাওয়া গায়ে মাখতে মাখতে কখন যেন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন বৃদ্ধ।
*
“তারপর কী হল, দাদু?”
পাহাড়ি রাস্তায় সন্ধ্যা নেমেছে একটু আগে। পথঘাট জনশূন্য। তারই মাঝে হেঁটে আসছেন এক বছর ষাটেকের বৃদ্ধ। তাঁর কাঁধে একটা গামছা বাঁধা। সে গামছায় আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা আছে একটা বছর পাঁচেকের মেয়ে। তার থুতনিটা রাখা বৃদ্ধের কাঁধে, বৃদ্ধ গল্প বলে চলেছেন তাকে। সে চোখ বড় করে মন দিয়ে শুনছে। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছে। তারপর আবার চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকছে মাটির দিকে।
বুনো গন্ধে ভরে আছে জায়গাটা। পাশের জঙ্গলের ভেতর থেকে মাঝেমধ্যে পশু-জন্তুর ডাক ভেসে আসছে। চাঁদের আলোয় ভেজা সেই অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশের দিকে মন নেই মেয়েটার। বৃদ্ধ যতক্ষণ গল্প বলেন, সে মন দিয়ে শোনে। কোনওদিকে তাকায় না।
“তারপর? তারপর ওরা নিজেদের মতো বড় হতে লাগল…. কেউ কাউকে চিনল না। ওরা নিজেরাই জানতে পারল না ওরা রোজ একে অপরের কথা ভাবে, একজনের দুঃখের কথা আর-একজন শোনে, তবে সত্যি ঘটনার মতো করে নয়, গল্পের মতো করে… একজনের দুঃখগুলো আরেকজনের কাছে জমা থাকল… কিন্তু কার কাছে জমা থাকল তা কেউ জানতে পারল না…”
“মানে সত্যি সত্যি কথা মিথ্যে মিথ্যে করে জানল?”
বৃদ্ধ বাচ্চা মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তারপর বলেন, “ওইজন্যই তো গল্প রে বেটি। একজনের দুঃখ অনেকজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া…” বৃদ্ধের হাতের উপর হাত রাখতে গিয়ে একবার ককিয়ে ওঠে মেয়েটা। বৃদ্ধ হাতটা তুলে চোখের সামনে ধরেন— “কী হয়েছে তোর হাতে?”
“কিছু না, তুমি বলো-না গল্পটা…”
“কোন গল্পটা শুনবি বল?”
“সেই যে সেই মেয়েটা, যার হাতে একটা জোনাকিভরা কাচের জার ছিল…”
“বলব, আগে বল, তুই বিশ্বাস করিস এই গল্পগুলো?”
“খুব বিশ্বাস করি।”
একটু হিসেব কষে একটা প্রশ্ন করেন বৃদ্ধ, “যদি আমি আর না আসি, তখন কী হবে? কী বিশ্বাস করবি?”
“তুমি আসবে না কেন?”
“ওই যে … সেই জারটা ভরতি হয়ে গেলে তো আমি আর আসব না… তখন কী করবি?”
“তুমি আমাকে ফেলে চলে যাবে, দাদু?” মেয়েটা এবার চিন্তায় পড়ে, “তাহলে কী হবে?”
বৃদ্ধ এতক্ষণ সোজা রাস্তায় হাঁটছিলেন, এবার একটা সরু পথের বাঁকে ঢুকে আসেন, “এই যে আমি তোকে এত গল্প বলি, তুই নিজে নিজেকে গল্প বলা শিখে নিতে পারবি না?”
“ধুর, নিজেকে গল্প শুনিয়ে কোনও মজা আছে নাকি?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ কী যেন ভাবেন, হঠাৎ তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেছে, এইভাবে বলেন, “আচ্ছা বেশ, তাহলে আমি অন্য একজনকে গল্প বলা শিখিয়ে দিয়ে যাব। তুই তার কাছ থেকে শুনে নিস। আমার কাছে গল্প শুনতে যেমন লাগে, তার কাছেও গল্প শুনতে তেমনই লাগবে, দেখিস…”
“সত্যি তো?”
“আমি কি মিথ্যে বলেছি কখনও তোকে?”
“কী জানি। মা বলে, তুমি নাকি বানিয়ে বানিয়ে সব মিথ্যে গল্প বলো… বাবাকেও বলতে, বাবা বিশ্বাস করত না…”
“ধুর, তোকে না বলেছি ও তোর বাবা নয়। তুই তো এখানে জন্মাসইনি…”
“তাহলে কে আমার বাবা? আমি কী করে জন্মেছি?”
“তা তো জানি না। সেই যে বলেছিলাম না, অন্য একটা জগৎ থেকে এসেছিলি তুই। আমি যতদিন না সেখানে যাচ্ছি, সেখানকার রকমসকম তো বলতে পারব না।”
মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে কী ভেবে বলে, “আচ্ছা, তুমি তাহলে সেই ছেলেটার কথা বলো, যে আমায় আগলে রেখেছিল ছোটবেলায়, ঠান্ডায় মরে যেতে দেয়নি…..”
ভুরুর নীচে একটা হাসি খেলে যায় লোকটার, “সে আপাতত ভালো আছে। কিন্তু আমার কেমন যেন চিন্তা হয়ে ওকে নিয়ে। বড় হলে কেউ ওকে বুঝতে পারবে কি না কে জানে। ওর ধাতটা আমি চিনি….”
“যদি বড় হয়ে ভালো না থাকে, তখন কী হবে?”
“তখন তুই গিয়ে গল্প করিস না হয় ওর সঙ্গে… তখন তো আমি আর থাকব না, সেই সবুজ চোখের মেয়েটাও কারও উপর রেগে যেতে পারবে না…”
মেয়েটা খুশি হতে গিয়েও হয় না, “ধুর। তুমি থাকবে না ভাবলেই কষ্ট হচ্ছে আমার…”
“মানুষ তো চিরকাল থাকে না, বিনি। কেবল তাদের গল্পগুলো রয়ে যায়। ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত তুই যত জায়গায় যাবি, যত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবে, যতবার কাঁদবি, হাসবি, তার সব কিছু শুধু গল্প হয়ে রয়ে যাবে। যেমন আজ তুই একই গল্প বারবার শুনতে চাস, তেমন যতবার সেই গল্পগুলো শুনতে চাইবি, ততবার তারা তোর কাছেই রয়ে যাবে… আচ্ছা শোন, তোকে সেই ছেলেটার গল্প বলি…”
একটা একটা করে গল্প বলতে শুরু করেন বৃদ্ধ। ওরা কেবল গল্প দিয়েই জুড়ে থাকবে একে অপরের সঙ্গে। একজনের দুঃখ রাখা থাকবে অপরজনের কাছে। অন্তত যতদিন তিনি বেঁচে আছেন। ওরা একজন আরেকজনকে চিনবে না, চিনবে কেবল গল্পের চরিত্র হিসেবে।
“আচ্ছা, সেই মেয়েটার কাচের জার ভরে গেলে সে যদি আমাকে নিতে আসে, তাহলে আমি একাই চলে যাব?”
“দুজনে একসঙ্গে এসেছিস যখন, একা একা কী করে যাবি?” কিছু হিসেব করে বৃদ্ধ বলেন, “তবে তোদের যেতে ঢের দেরি আছে। আমি যতদিন থাকব, তেমন দুঃখকষ্ট হতে দেব না তোদের। তাহলেই জার আর ভরতি হবে না…”
“আচ্ছা দাদু” নিজের নাকের উপরে হাত বুলিয়ে মেয়েটা বলে, “আমরা তিনজনেই যদি ওখানে চলে যাই? তুমি, আমি আর সেই ছেলেটা?”
“কেন? তোর বাবা-মা-র কাছে থাকতে ইচ্ছা করে না?”
“একদম না, আমাকে কেউ ভালোবাসে না। আমিও কাউকে ভালোবাসি না।”
বৃদ্ধের মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফোটে, “জানিস, সেই ছেলেটা মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে, মানুষ কেন এই জগৎ ছেড়ে চলে যেতে চায়? আর তুই প্রশ্ন করিস, মানুষ কেন যেতে চায় না? আমি কাকে কী উত্তর দিই বল তো?”
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন বৃদ্ধ। পাশেই একটা ছোট জংলি গাছ। তার গোড়াতে গামছাটা পেতে বসে পড়েন দুজনে। মেয়েটার বয়স কম হলেও চেহারাটা বেশ গোলগাল। ফলে তাকে পিঠে নিয়ে এতদূর হাঁটতে বেশ কষ্ট হয়। কিছুক্ষণ সেখানে বসে জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটতে থাকে দুজনে। আবার গল্প বলতে শুরু করেন বৃদ্ধ। সেই ছেলেটার গল্প, যার গল্প শুনতে ভালোবাসে মেয়েটা, যার সঙ্গে জন্ম ও শৈশব জুড়ে আছে ওর… “শোন বিনি, আমি যদি কোনওদিন না থাকি, তাহলে মাঝে মাঝে ওই তারাটার দিকে তাকাবি, ঠিক আছে?” আঙুল দিয়ে একটা নির্দিষ্ট তারা দেখিয়ে বলেন বৃদ্ধ।
“তুমি কি তারায় থাকবে?”
“না, মানুষ মরে গেলে তারায় থাকে না। ওই তারাটার দিকে চেয়ে নিজের সব দুঃখ বলে যাবি পরপর…. মনে করবি, তারাটায় তোর সব দুঃখ রাখা আছে… মনে থাকবে?”
“হ্যাঁ দাদু …” মেয়েটার গলা ঝিমিয়ে আসে। কথাগুলো সে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে কি না বুঝতে পারেন না বৃদ্ধ।
“বিনি, বিনি, শুনতে পাচ্ছিস?” ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটাকে দেখার চেষ্টা করেন বৃদ্ধ। চোখ দুটো বন্ধ করে নিবিড় ঘুমে ঢলে পড়েছে মেয়েটা। নিরাপত্তা আলিঙ্গনে…
