(পঞ্চদশ অধ্যায়)
নীহারিকা হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকতেই জংলু আর সোমা চমকে উঠল। ওর চোখে-মুখে একটা উদ্ভ্রান্ত ভাব। যেন এইমাত্র ঝড়ের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে আসছে। সোমাকে সোফায় বসে থাকতে দেখে কোনওদিকে না তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “মিস্টার ঘোষ আর বিনি কোথায়?”
সোমা একটু থতোমতো খেয়ে গিয়েছিল, সেটা কাটিয়ে বলল, “ওরা তো বোধহয় একটু আগেই সাইকেলে করে বের হল….”
“বেরোল মানে? কোথায় গেছে?”
“জানি না, বলল, মিস্টার ঘোষ দু-দিন পরেই চলে যাবেন। তাই কী যেন দেখাতে নিয়ে গেছে…”
কপালে হাত দিয়ে একবার ঝাঁজিয়ে ওঠে নীহারিকা, তারপর এগিয়ে এসে সোফাটার উপর বসে পড়ে। নিজেকে শান্ত করতে করতে বলে, “কাল রাত থেকে আমার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে… কতকগুলো প্রশ্ন…”
“কেন? কী হয়েছে কাল রাতে?”
“শতরূপ…” কথাটা বলতে গিয়ে একবার থমকায় নীহারিকা, “আচ্ছা, এই ক-দিনে মিস্টার ঘোষের আচরণে আপনার কিছু পরিবর্তন চোখে পড়েনি? মানে যখন এখানে এসেছিল, তারপর থেকে ওঁর মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে মনে হয়নি?”
প্রশ্নটা শুনে খুশিই হয় সোমা–”আমারও মনে হচ্ছিল, জানেন। অনেকটা অন্যরকম হয়ে গেছেন। প্রথমে এটা-সেটা জিজ্ঞেস করতেন, কিন্তু ইদানীং মনে হয়, সব সময়ই কী যেন লুকোচ্ছেন। আগে বেশ হাসিখুশি ছিলেন। এখন কেমন মনমরা লাগে সব সময়। কী যেন ভাবছেন সর্বক্ষণ। আমি ভাবলাম লেখক মানুষ….
“কাল রাতে হি ওয়াজ অ্যাবাউট টু কমিট সুইসাইড…”
“সে কী! তাহলে সেদিন ছাদ থেকে….”
“আমি জানি না, আর কিছু বুঝতে পারছি না। সব গুলিয়ে গেছে…”
কপালের রগ টিপে ধরে নীহারিকা— “তবে একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি—মিস্টার দত্ত ইজ অন টু সামথিং। ইচ্ছা করেই বেছে বেছে। শতরূপকে এখানে এনেছেন। ওর সঙ্গে বিনির কিছু একটা কানেকশন আছে…”
“কানেকশন!” একবার মাথা চুলকে ইতস্তত করে সোমা, “একটা কানেকশন কিন্তু আমি প্রথম দিন বুঝতে পেরেছিলাম। বলেওছিলাম আপনাকে, হয়তো ভুলে গেছেন। ইলোরা নামটা…” গলা তুলে বিনয়কে ডাক দিল সোমা। মিনিটখানেকের মধ্যেই এসে উপস্থিত হল সে।
“আসার দিন কী একটা হয়েছিল না? বলছিল সেদিন…” বিনয়ের মুখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করে সোমা।
বিনয় উপর-নীচে মাথা নাড়ে, “একটা অ্যাক্সিডেন্ট হতে হতে বেঁচে যায় আমাদের গাড়িটা। দাদা মাথায় চোট পেয়েছিলেন, জ্ঞান আসতে বললেন, সামনে নাকি একটা বাচ্চা ছেলে এসে পড়েছিল। কিন্তু সেদিন রাস্তায় কোনও বাচ্চা ছেলে ছিল না…. তা ছাড়া যেদিন প্রথম মন্দিরে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেদিনও একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখে চেঁচিয়ে ওঠে। আমি কিন্তু কাউকে দেখিনি, ব্রেক কষেও দেখলাম আশপাশে কেউ নেই….”
“হ্যালুসিনেট করছে….” বিড়বিড় করে নীহারিকা, “কিন্তু বারবার একই হ্যালুসিনেশন দুজনের মধ্যে…”
জংলু এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল, সে মুখ খুলল এবার, “দাদা আসার আগে স্যার বিনিদিদির সমস্ত পুরোনো ফোটো সরিয়ে ফেলতে বলেছিলেন। তখনই আমার খটকা লেগেছিল। বিশেষ করে বিনিদিদি জন্মানোরও আগের কিছু ছবি। সেগুলো বিনিদিদি দেখলে কী ক্ষতি হবে, আমি বুঝতে পারিনি…”
“ছবিগুলো আছে তোমার কাছে?” নীহারিকা তার দিকে ঘুরে প্রশ্ন করে। “হ্যাঁ, ফেলে দিতে বলেছিল। কিন্তু অত পুরোনো ছবি আমার ফেলতে ইচ্ছা করেনি। আমার কাছেই রাখা আছে…”
জংলু নিজেই উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে ছবি আনতে যায়। মিনিটখানেকের মধ্যেই ড্রয়ার থেকে বের করে খামবন্দি একগোছা ছবি এনে দেয় নীহারিকাকে। নীহারিকা খামটা হাতে নিয়ে উলটেপালটে একটার পর একটা ছবি দেখতে থাকে। ঐন্দ্রিলার ছোট থেকে বড় হওয়ার বিভিন্ন সময়ের ছবি সেগুলো, সব ক-টাতেই ঐন্দ্রিলা গম্ভীর। বোঝা যায়, ছবি তুলতে বিশেষ পছন্দ করত না সে। কোনওটা বাড়ির ছাদে তোলা, কোনওটা নদীর ধারে গিয়ে। কোনওটা মা-বাবার সঙ্গে, আশিস দত্তর সঙ্গে, কোনওটা ঘুরতে আবার অচেনা কারও পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিগুলো সময়ে পিছিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। একটা ছবিতে এসে হঠাৎ করে থমকে যায় নীহারিকা। এই ছবিটা সম্ভবত ঐন্দ্রিলা জন্মানোর আগের। ঐন্দ্রিলার বাবা-মা এবং মিষ্টার দত্ত ছাড়া আরও একজন দাঁড়িয়ে আছে সেই ছবিতে। এই চতুর্থ ব্যক্তিকে চেনা লাগে নীহারিকার। কোথায় যেন একে আগে দেখেছে সে। কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে ভাবতেই মনে পড়ে যায়, হ্যাঁ, ছোটবেলায় দেখেছে। যখন শতরূপের বাড়ি যেত, তখন মাঝেমধ্যে ওর ঘরের দেওয়ালে চোখ পড়লে এই ছবিটা দেখতে পেত। এই লোকটারই একটা ছবি টাঙানো থাকত ঘরে—শতরূপের দাদু। কিন্তু তিনি এখানে কী করছেন? এদের সঙ্গে কি যোগাযোগ ছিল?
ছবিটা সোমার দিকে তুলে ধরে নীহারিকা— “এই লোকটা কে?”
সোমার মুখে কিছু বিস্ময়ের রেখা খেলে যায়, সেই সঙ্গে একটা ছায়া নামে— “ওঁর নাম স্যার একবার বলেছিলেন। অমরবাবু। এ বাড়িতে আরও কিছু ছবি আছে ওঁর। একসময় ওঁদের ফ্যামিলি বিজনেস দেখাশোনা করতেন। এখানেই থাকতেন। পরে নাকি তাড়িয়ে দেওয়া হয়…”
“তাড়িয়ে দেওয়া হয় কেন?”
সোমা মাথা নাড়ে, “তা তো জানি না, স্যারকে আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি ঠিকঠাক উত্তর দিতে চাননি…”
অপেক্ষা না করে পকেট থেকে ফোনটা টেনে বার করে নীহারিকা। তারপর একটা নাম্বার ডায়াল করতে থাকে। তার কপালের শিরাগুলো এখন উত্তেজনায় ফুলে ফুলে উঠছে। কী একটা খটকা বারবার মনের ভেতর উঁকি দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে।
ওপাশ থেকে কয়েকবার রিং হওয়ার পরে আশিসবাবুর গলা শোনা যায়, “হ্যাঁ, মিসেস গাঙ্গুলি, আমি এখন একটা মিটিং-এ আছি, আপনাকে আমি একটু পরে…”
“না, একটু পরে কিছু হবার নয়। আমি যা বলছি, সেটা এখনই আপনাকে শুনতে হবে, অ্যান্ড ইউ হ্যাভ টু আনসার মি নাউ। না হলে…”
কথাটা শেষ করতে পারে না নীহারিকা। আশিস দত্তর গলা শোনা যায়, “মহামুশকিল তো! আপনি আমায় চমক-ধমক দিচ্ছেন কেন?”
“কারণ আপনি আমার থেকে বেশ কিছু কথা লুকিয়েছেন, একটা মানুষের লাইফ নিয়ে খেলা করেছেন….”
নীহারিকার গলার ঝাঁজটা অনুভব করতে পেরে গলাটা একটু নরম করেন ভদ্রলোক, “আচ্ছা বেশ, বলুন, আপনি কী জানতে চান। আমার পক্ষে যদি সম্ভব হয়, আমি উত্তর দেব…”
“আপনাদের পুরোনো ছবিতে আপনার এবং ঐন্দ্রিলার বাবা-মা-র সঙ্গে চতুর্থ একজন ব্যক্তির ছবি আছে… অমরবাবু। এঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় কেন?”
উত্তর আসতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে। ভারী গম্ভীর গলা শোনা যায়, “ওঃ, উনি আমাদের টি-এস্টেট আর হাউজিং দেখাশোনা করতেন। টাকাপয়সা ডিলিং-এর একটা দায়িত্ব ছিল ওঁর উপর। একবার কী সব চুরিচামারি করে ধরা পড়েন, তারপর দাদা ওঁকে কাজ থেকে তাড়িয়ে দেয়…
“কেন মিথ্যে বলছেন বলুন তো? আমি জানি এই ভদ্রলোকই মিস্টার ঘোষের দাদু, আপনি যে ওঁকে এখানে ডেকে এনেছেন, তার সঙ্গে এঁর কিছু যোগ আছে, সেটাই জানতে চাইছি। এতদিন পর নিশ্চয়ই চুরির মাল উদ্ধার করতে ডেকে আনেননি? আপনি যদি এক্ষুনি পুরোটা আমাকে না খুলে বলেন তাহলে বাধ্য হয়ে আমাকে ঐন্দ্রিলাকে সমস্ত কথা…”
“আরে থামুন থামুন। আপনি ব্ল্যাকমেইল করছেন কাকে? শুনুন, এতদিন পেরিয়ে গেছে, এখন ওসব ঘটনার আর তেমন কোনও ভ্যালু নেই….” কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন আশিস দত্ত, “আচ্ছা বেশ, আমি বলছি সবটা। যদিও তাতে আপনার কী সাহায্য হবে জানি না…”
নীহারিকা উদ্গ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে পরবর্তী কথাগুলোর জন্য। “আপনাকে আমি ভুল কিছু বলিনি। অমর ঘোষ সত্যি আমাদের টি-এস্টেট দেখাশোনা করতেন। তখন তাঁর বয়স বছর পঞ্চাশেক হবে। তবে চুরিচামারি করার জন্য তাঁকে তাড়ানো হয়নি। হয়েছিল অন্য কারণে… আই মিন, পারিবারিক কারণে…”
“কী কারণ?”
“বিনির মা, মানে আমার বউদির বিয়ের আগে একটা গোপন সম্পর্ক ছিল। বিয়ের বছর চারেক পরে বউদি প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়তেই আমার দাদা তার উপর অত্যাচার শুরু করে। কারণ দাদার পক্ষে বাবা হওয়া সম্ভব ছিল না। হি ওয়াজ ইমপোটেন্ট… দাদা বুঝতে পারে সেই গোপন প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কের ফলেই আসন্ন সন্তান। বউদিকে মারধর করেও বিশেষ লাভ হয়নি। তার দাবি, গোপন সম্পর্ক তার একটা ছিল বটে, কিন্তু এই সন্তানের বাবা নাকি সে নয়। বউদি কোনও গোপন পদ্ধতিতে শয়তানের সাধনা করে এই সন্তান লাভ করেছে…. আপনি জিশুখ্রিস্টের গল্প জানেন তো? সেই যে হোলি ভার্জিন….”
“জানি, তারপর?”
“যথারীতি দাদা এসব ভুজুংভাজুং বিশ্বাস করেননি। তিনি একরকম উন্মাদ হয়ে ওঠেন। আমাদের এত বড় ব্যাবসা, মানসম্মান সব ডুবতে বসেছে, সেই সঙ্গে দাদার ইগো। তবে বাচ্চাটাকে অ্যাবর্ট করতে দেননি বউদি। একরকম জবরদস্তি করেই পৃথিবীতে আনেন তাকে। বুঝতেই পারছেন আমাদের পরিবার ওদিকে একটা লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গোছের। সেই গোপন প্রেমিককে হাতের সামনে পেলে দাদা খুনই করে ফেলবেন। অগত্যা বউদি পিঠ বাঁচাতে আমাদের ম্যানেজার অমর ঘোষকে দায়ী করেন। ওর সঙ্গেই নাকি প্রেম ছিল বউদির…”
“সে কী! উনি মেনে নিলেন?”
“সোজা পথে কি আর মানে? ভদ্রলোকের কিছু করার ছিল না। যা-ই হোক, জিনিসটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি হয়নি। বউদি নাম বলার আগে দাদাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল যে অমরবাবুকে আর যা-ই করা হোক, প্রাণে মারা হবে না। সেটা করতে না পেরে দাদা কুকুরের মতো মারধর করেন অমরবাবুকে। তারপর এস্টেট থেকে তাড়িয়ে দেন… এরপর আর ভদ্রলোককে স্বচক্ষে দেখিনি আমি…”
নীহারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “আপনার বউদির সেই গোপন প্রেমিকটি কে, সেটা বুঝতে পারছি। উনি আপনাকেই বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, তা-ই না?”
আবার কিছুক্ষণের নীরবতা। তারপর কাটা কাটা উত্তর ভেসে আসে, “দাদা বউদির কাছ থেকে কিছু প্রেমপত্র পান। সেগুলো আমার লেখা ছিল। সমস্তটাই বিয়ের আগে লেখা…”
“কী অদ্ভূত স্বার্থপর মানুষ আপনি!” ভর্ৎসনা করে ওঠে নীহারিকা, “নিজের পাপ একটা বাপের বয়সি লোকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে লজ্জা করল না?”
“পাপ আমি চাপিয়ে দিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু মিসেস গাঙ্গুলি, সে পাপটা আমার ছিল না…”
“তার মানে?”
“তার মানে বিয়ের পর থেকে আমার বউদির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক ছিল না। আমি ওর সঙ্গে কখনোই ঘনিষ্ঠ হইনি। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটার কথা দাদাকে বিশ্বাস করানো অসম্ভব ছিল। এমনকি বিনির জন্মানোর পর বছরখানেক আমি ওদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় রাখিইনি….”
থতোমতো খেয়ে যায় নীহারিকা, “তাহলে ঐন্দ্রিলার বাবা কে?” আশিস দত্তর গলা এবার খাদে নেমে আসে, “শয়তান, তন্ত্রসাধনা এইসব আলবাল জিনিসে বিশ্বাস হয় না আমার। মাঝে মাঝে মনে হয় অমর ঘোষ নিজেই বিনির বাবা। ওর মা কখনও খুলে বলেনি আমাকে। আমিও এই ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা বেশি ঘাঁটাইনি। ওর বাড়ির লোক কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল…”
সমস্ত ব্যাপারটা মাথার মধ্যে গুছিয়ে নেয় নীহারিকা। তারপর বলে, “অমর ঘোষকে আপনাদের এখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর তিনি আর এদিকে আসেননি?”
“শুনেছিলাম, আসতেন। লুকিয়েচুরিয়ে। বিনিকে নাকি খুব ভালোওবাসতেন। এস্টেটের ভেতর লুকিয়েচুরিয়ে দেখা করত ওর সঙ্গে। ও ছোটবেলায় মাঝেমধ্যে পালিয়ে যেত না? পালানোটা র্যান্ডাম হত না। অমর ঘোষ ওকে বলে যেত, ঠিক কবে নাগাদ কোনখানে তিনি দাঁড়িয়ে থাকবেন। সেই সময় বুঝে ঐন্দ্রিলা বাড়ি থেকে পালাত। ওর বাবা-মা-র খুব একটা নজর ছিল না ওর দিকে। বাবার তো একেবারেই নয়। অন্যের সন্তানের দায় আর কে নিতে চায় বলুন? ফলে ওর পালানোটা আটকাতও না। অমর ঘোষের খুব গল্প বলার বাতিক ছিল। বানিয়ে বানিয়ে আজগুবি গল্প শোনাতেন…. তা ছাড়া ভালো গানও গাইতে পারতেন। সেসব শুনতেই বোধহয় বিনি….”
“এসব কথা ও আমাকে বলেনি কেন?”
“অমর ঘোষের কথা ও কাউকেই বলত না। ওটা ওর নিজের জগৎ ছিল। এমনকি ডায়েরিতেও লেখেনি। বাবা কিংবা মায়ের হাতে ডায়েরিটা পড়লে সর্বনাশ হয়ে যেত।”
“তারপর? অমর ঘোষের সঙ্গে ওর দেখা হওয়া বন্ধ হয় কবে?”
“তা তো জানি না। সেই পয়জনিং-এর কেসটা যখন হয়, তখন ওর তেরো বছর বয়স। তারপর থেকেই ও আমার কাছে থাকে। প্রথম বছরখানেক আগের মতোই ছিল। বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করত, মাঝেমধ্যে ভায়োলেন্ট হয়ে যেত…. তারপর হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে যায়…. বছর তিনেক হল একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেছে, কেবল ওই সুইসাইড অ্যাটেম্পটগুলো ছাড়া…”
“মানে ধরুন, ষোলো কি সতেরো বছর বয়স থেকে ও শান্ত হয়ে গেছে, তা-ও আবার হঠাৎ করেই?” মনে মনে হিসেব করে নীহারিকা। শতরূপ রেডিয়োতে কাজ করা শুরু করেছে বছর তিনেক আগে। তখন থেকেই সে শতরূপের গল্প শোনে। এবং তারপর থেকেই পুনার উল্লেখ প্রায় নেই ডায়েরিতে। বাড়ি থেকেও পালায়ওনি।
কিছুক্ষণ থম মেরে থাকার পর মুখ খোলে নীহারিকা, “একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না, মিস্টার দত্ত, গোটা ঘটনার মাস্টারমাইন্ড আপনি। এতদিন। পর অমর ঘোষের নাতিকে এখানে এনে ওকে গল্প বলানোর কাজটা আপনি হঠাৎ করতে গেলেন কেন? এর পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল?”
“দেখুন মিসেস গাঙ্গুলি, আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই। তা ছাড়া এই মুহূর্তে বিনির দরকারও নেই আপনাকে। আমার মিটিং আছে, আমাকে অযথা দাঁড় করিয়ে রাখবেন না….
“উত্তরগুলো জানাটা আমার প্রয়োজন…”
“যতটা জানানোর প্রয়োজন মনে করেছি, জানিয়েছি। তা ছাড়া মিস্টার ঘোষকে আমি আজ সকালেই বলেছি কলকাতায় ফিরে আসতে। তাহলে আমাকে এত প্রশ্ন করার মানেই তো বুঝতে পারছি না…”
“ও রাজি হয়েছে কলকাতায় ফিরে যেতে?”
“আশা তো করছি হয়েছে, না-হওয়ার তো কারণ দেখছি না… বিনিও হাসিখুশি, ওর টাকাপয়সাও সমস্তটা মিটিয়ে দেব…
ফোনটা রেখে কিছুক্ষণ সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকে নীহারিকা। সোমা, জংলু আর বিনয় বসে আছে ঘরের ভেতর। সবার মুখ থমথমে। তাদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে নীহারিকা বলে, “ওরা ফিরলে ওদের একটু চোখে চোখে রাখবে। আমার মনে হয়, এই বাড়িতে কিছু একটা গণ্ডগোল ঘটতে চলেছে। দুঃসংবাদ আসতে তো বেশি সময় লাগে না।”
“বিনিদিদি তো আগের থেকে বেশি হাসিখুশি আছে ম্যাডাম, তাহলে…”
“আমি ওকে এতদিন ধরে দেখে আসছি। কেমন যেন মনে হচ্ছে, ওর ভেতরে এখন অন্য কিছু চলছে। হয়তো সমস্তটাই…”
“আপনি মিস্টার ঘোষকে আগে থেকে চেনেন, তা-ই না?”
সোমা করেছে প্রশ্নটা। চোখ নামিয়ে নেয় নীহারিকা, “ছোটবেলা থেকে। ক্লাস ফাইভ থেকে একই স্কুলে পড়েছি আমরা। অথচ আজও চিনতে পারলাম না ছেলেটাকে। ও কখন কীভাবে চিন্তা করে, আজও বুঝি না। তবে…” একটু থেমে আবার বলে নীহারিকা, “ওর ছোটবেলায় কিছু একটা ঘটেছিল। ওর মা মাঝে একবার বলেছিলেন আমাকে, কিন্তু আমি অত মন দিয়ে শুনিনি। সম্ভবত মাথার চিকিৎসা চলেছিল কিছু। কোনও ট্রমাটিক এক্সপিরিয়েন্স…” মাথায় হাত ঘষে স্মৃতি ওলটানোর চেষ্টা করে নীহারিকা। চোখটা ইতস্তত ঘরের ভেতর কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল ওর। টেবিলের উপরে ছবিগুলো এখনও ছড়িয়ে আছে, তার উপরে দৃষ্টি পড়তেই চোখ আটকে যায়। একটা ছবিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিনি। গায়ে একটা ফ্রক। ফ্রকের থাইয়ের কাছে একটা পকেট। পকেটটা ফুলে আছে। বোঝা যায়, সিগারেটের কেস সাইজের কিছু একটা ঢোকানো আছে সেখানে। অন্য একখানা ছবির দিকে তাকায় নীহারিকা, এখানেও দাঁড়িয়ে আছে বিনি, ছাদে তোলা ছবি। এখানেও ফুলে আছে তার পকেটের কাছটা। আর-একটা ছবি হাতে নেয় নীহারিকা। এই ছবিতে বিনি যে জামাটা পরে আছে, তাতে কোনও পকেট নেই। কেবল হাত দিয়ে কালোমতো কিছু একটা ধরে আছে। প্রায় সব ছবিতেই বিনির আশপাশে কোথাও আছে জিনিসটা…
“এটা কী বলো তো?” ছবির উপর আঙুল তুলে দেখায় নীহারিকা। জংলু ঝুঁকে পড়ে ছবিতে, ভালো করে দেখে নিয়ে বলে, “এটা মনে হয় সেই ক্যাসেটটা!”
“ক্যাসেট! কোন ক্যাসেট?”
“বিনিদিদি ছোট থেকে গান শুনত তো, অনেকগুলো ক্যাসেট ছিল দিদির কাছে। কিন্তু এই ক্যাসেটটা কিছুতেই কাছছাড়া করত না। ওইটাই মনে হয়…”
ভালো করে দ্যাখে নীহারিকা। ক্যাসেটের গায়ে কোনও লেবেল নেই। অর্থাৎ সেটা কোনও কোম্পানির ক্যাসেট নয়। ব্যাংক ক্যাসেটে কিছু রেকর্ড করে রেখেছে কেউ…
‘এই ক্যাসেটটা কোথায়?”
“বিনিদিদি এখন আর শোনে না এটা। আগের বাড়িতে রাখা আছে মনে হয়…”
“নিয়ে আসতে হবে। কুইক….
*
“রূপ, এই রূপ, খেলতে যাবি না? তোকে ছাড়া খেলতে ভালো লাগে না আমার…”
রূপ বলার চেষ্টা করে, “তুই তো চিনিস না আমাকে….
“তোর যত বাজে কথা, তুইও তো চিনিসই না আমাকে…” মেয়েটা যেন ওর কথাটা নিজে থেকেই বুঝে নিয়ে বলে, “চিনি না তো কী হয়েছে? তোর সব কথা আমি জানি। শুধু তোকে দেখিনি কোনওদিন। তুই মুখ ঘুরিয়ে থাকিস, তাই তো দেখতে পাই না। একদিন দেখতে পাব, বল? সেদিনটা সারাজীবন মনে রাখব। সেই কখন থেকে ডাকছি তোকে…” মেয়েটার গলার মধ্যে কোথায় যেন একটা কান্না মিশে আছে। যেন কেউ এইমাত্র মেরেছে কিংবা বকে দিয়েছে। ও কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে এসেছে রূপের জানলায়। ওকে ডাকছে। যতবার কান্না পায়, ঠিক এই জানলাটার কাছে ছুটে আসে মেয়েটা। রূপের সঙ্গে একা একাই গল্প করে। যতক্ষণ মেয়েটা জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে, ততক্ষণ চাইলেও রূপ পেছন ঘুরতে পারে না। মেয়েটা একাই নিজের মতো বকে যায়। এই যে এখন ডাকছে ওকে, “আজ সকাল থেকে কিছু ভালো লাগছে না রে। মা-বাবা কেউ কথা বলে না আমার সঙ্গে। ওরা সব সময় আমার উপর রেগে থাকে। আমি কী করেছি বল তো? আমার শুধু তোর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে। কিন্তু তুই উত্তর দিস না।” রূপ কিছুতেই বলতে পারে না উত্তর শোনার জন্য যতটা উতলা মেয়েটা; উত্তর দিতে, নিজের কথা বলতে ওরও ঠিক ততটাই ইচ্ছা করে। কিন্তু কিছুতেই বলতে পারে না।
“এই রূপ, একটা সিক্রেট কথা শুনবি?” মেয়েটা এবার ফিশফিশ করে কী যেন বলতে শুরু করে… হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যায় রূপের। ধড়ফড় করে উঠে বসে বিছানায়। সবটাই স্বপ্ন! ওর মনটা বিষাদে ভরে যায়। দাদুর মুখে গল্প শুনে শুনে এখন গল্পগুলো মাথার ভেতর জীবন্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। রোজ ভোররাতে এমন অদ্ভুত সব স্বপ্ন দ্যাখে ও। আর সব স্বপ্নের মধ্যে মিশে থাকে ওই মেয়েটা। ওর রোজকার রুটিন জানে শতরূপ। দাদুই বলে সেসব গল্প—রাজকন্যার গল্প। মাস দুয়েক পরপর দাদু আসে, আর সেইসব গল্প সংগ্রহ করে আনে। অধীর আগ্রহে বসে থাকে রূপ সেই গল্প শুনবে বলে। দাদু ওকে শিখিয়েছে, কী করে গল্প বলতে হয়। একটু একটু করে বানিয়ে বানিয়ে পরের লাইন সাজাতে হয়, কেমন করে বললে ভয় লাগে, কেমন করে বললে মজা হয়, কেমন করে বললে দুঃখ হয়। শতরূপ জানে দুঃখ, মজা, আনন্দ, ভয় এইসব ওর নতুন খেলনা। আগের খেলনাগুলো ভালো লাগে না। এই খেলনাগুলো সাজিয়ে খেলতে ওর ভারী ভালো লাগে। শব্দ দিয়ে খেলনা সাজিয়ে ও খাতার উপর লিখে রাখে। মাঝে মাঝে পড়ে শোনায় দাদুকে।
আজ সকালে দাদুর কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ। কাল রাতেই তো এসেছিল দাদু। ওকে গল্প বলেছে সারারাত। তারপর কখন যেন ঘুমিয়ে গেছে। সকাল হতে দ্যাখে, ছাদে একা শুয়ে আছে। কারও সঙ্গে ঘুমোতে গিয়ে তারপর ঘুম থেকে উঠে সে নেই দেখলে কেমন যেন কষ্ট হয় শতরূপের। তাই ও নিজেই আগে উঠে চলে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ দাদু আগে উঠে গেছে। রোজ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ঠাকুরের ছবির দিকে তাকিয়ে প্রণাম করে শতরূপ। ঘুমোতে যাওয়ার আগে ঠাকুরের কাছ থেকে যা চাওয়া হয় তা-ই নাকি পাওয়া যায়। শতরূপ চেয়েছে, ওর বাড়ির লোকেরা সবাই যেন একদিন একসঙ্গে মরে যায়। ও তো সব থেকে ছোট, তাই ও বেঁচে থাকতে থাকতে অন্য কেউ মরে গেলে ওর খুব কষ্ট হবে। ঘুম থেকে উঠেই দাদুর জন্য মনটা ছটফট করে ওঠে শতরূপের। দেখতে ইচ্ছা করে দাদুকে। মুখে-চোখে একটু জল দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ও।
একতলায় নেমে আসতেই একটা কান্নার শব্দ শোনা যায়। চিৎকার করে কাঁদছে কেউ। মা-ও কাঁদছে। কেন? ও পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় দাদুর ঘরের দিকে। সেদিক থেকেই আসছে কান্নার শব্দটা। ঘরের কাছে পৌঁছে দ্যাখে ওর বাবার মুখ লাল। যেন এইমাত্র ভয়ংকর কিছু একটা ঘটে গেছে। কেউ খেয়াল করে না পায়ে পায়ে ও এসে দাঁড়িয়েছে ঘরের দরজার সামনে। মা আছাড়িপিছাড়ি খেয়ে কাঁদছে, কোনওদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তার। ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই উপরদিকে দৃষ্টি চলে যায় রূপের। সেখানে সিলিং থেকে ঝুলছে ওর দাদু। পা-টা মাটির দিকে নামিয়ে কী যেন দেখার চেষ্টা করছেন ঘুরে ঘুরে। একবার দেখলে মনে হয়, কোনও অলৌকিক উপায়ে ভেসে রয়েছেন ঘরের একেবারে মাঝখানটায়, যাতে বাইরে থেকে কেউ ঢুকলে সবার আগে চোখে পড়ে। শতরূপ অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ঝুলন্ত দেহটার দিকে, দাদুর হল কী? ওরকম দড়ি থেকে ঝুলছে কেন? এভাবে কাউকে আগে ঝুলতে দেখেনি ও। দাদু কি অন্য কিছু করতে চাইছিল? ও মন দিয়ে ভাবে। হ্যাঁ, দাদু অনেকবার বলত বটে কোথায় একটা যেন যেতে চায়—যেখানে মানুষ কখনও কষ্ট পায় না, কখনও কেউ কাউকে ছেড়ে যায় না, সবাই সব সময় সুখে-শান্তিতে বসবাস করে। দাদু কি তবে সেই জায়গাটায় যাওয়ার জন্য এত তোড়জোড় করল? হঠাৎ ওর দিকে চোখ পড়ে বাবার। দৌড়ে এসে একটানে ছেলেকে ঘর থেকে বার করে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
“দাদুর কী হয়েছে, বাবা?”
“তোর দাদু আর নেই রে…” চোখের জল আটকাতে আটকাতে বলেন বাবা।
“কোথায় গেছে?”
“চলে গেছে আমাদের ছেড়ে। তোকে ছেড়ে। ভগবানের কাছে চলে গেছে…”
“কিন্তু দাদু তো বলত ভগবান বলে কেউ নেই… তোমরা কিছু জানো না…” বাবা রূপকে কোলে তুলে বেশ খানিকটা দূরে নিয়ে আসতে চান। ছটফটিয়ে কোল থেকে নেমে আসে রূপ। চিৎকার করে তারপর আবার ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর। এবার কিন্তু দেহটার দিকে তাকায় না সে। বরঞ্চ আঁতিপাঁতি করে কী যেন খুঁজতে থাকে।
“কী করছিস তুই, রূপ?” ভদ্রলোক ধাওয়া করে ধরার চেষ্টা করেন ওকে। বাইরে লোকজনের হাঁকডাক শোনা যায়। পুলিশ ঢুকছে বাড়িতে।
“সেই জারটা? যার ভেতর জোনাকি থাকত? জোনাকিগুলো ভরে গিয়েছিল, বলো?”
.
সাদা কাপড়ে মোড়া মৃতদেহটার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল পরিবারের সকলে। সবার মুখে শোকের ছায়া। পোস্টমর্টেমের পর শরীরের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কেবল মুখটুকু থেকে একটুখানি চাদর সরানো আছে। শববাহী গাড়ির ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল রূপ। হঠাৎ তার একটা হাত উঠে এল গাড়ির কাচের উপর। ভেতরে চাদরের ফাঁক থেকে বেরিয়ে-থাকা অচেনা মুখের দিকে কিছুক্ষণ একটানা তাকিয়ে রইল সে। তারপর কাচের কাছে নিয়ে এল মুখটা। চাপাস্বরে বৃদ্ধকে কিছু বলতে চাইছে রূপ। কেউ শুনতে পেল না, ফিশফিশ করে সে বলল, “তুমি চিন্তা কোরো না দাদু। আমাদের জারটাও ভরতি হচ্ছে। খুব তাড়াতাড়ি আবার দেখা হবে, কেমন?” কথাটা বলে আর সেখানে দাঁড়াল না রূপ। মিষ্টি করে একগাল হেসে একদৌড়ে ঢুকে এল বাড়ির ভেতর।
