(সপ্তদশ অধ্যায়)
হায় কোন্ সুদূর, সেই স্বপ্নপুর।
মোর মন যে গায় ঘরে ফেরার সুর।
মোর পথ চেয়ে আজও সেই মেয়ে
বুঝি স্বপ্নজাল বোনে গান গেয়ে।
শতরূপের গলার স্বর কেঁপে যায় ঠান্ডায়। কয়েকবার অস্পষ্ট কথাগুলো শোনা যায় না। আজ ওর গান আর কেউ শুনছে না বিনি ছাড়া। দূরে আদিম ক্লান্ত সূর্যটা একটু একটু করে ঢলে পড়ছে দিগন্তরেখার দিকে। ওদের সামনে লম্বা রাস্তাটা ছেয়ে আছে রংবেরঙের ফুলে। সেইসব ফুলের উপরে লালচে আলো এসে একটামাত্র রঙে ভিজিয়ে দিয়েছে ফুলগুলোকে। ঝিরিঝিরি হাওয়া বয়ে আসছে। সেই হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে ফুলগুলো। বিনির একটা হাত আশ্রয় নিয়েছে শতরূপের হাতের ভেতর। শতরূপের মাথাটা ঐন্দ্রিলার কাঁধে। কোন নিবিড় বন্ধনে যেন ওরাও দুটো আলাদা রঙের মানুষ এই ফুলগুলোর মতোই একটিমাত্র রঙের হয়ে গেছে। একসময় ধীরে ধীরে মাথা তোলে শতরূপ। ঐন্দ্রিলা ওর মুখের দিকে চেয়ে বলে, “আয় একটু হাঁটি…”
“কোথায় যাব হেঁটে? আমার তো এখানেই ভালো লাগছে…
“এর থেকে আরও সুন্দর জায়গা আছে।”
“কোথায়?”
“না এলে দেখতে পাবি কী করে? আমার হাতটা ধর। আমি নিয়ে যাব তোকে।”
শতরূপ ওর হাত ধরে। দুজনে উঠে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ একে অপরের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। বিকেলের আলো গলে গলে মিশে ওদের মাঝখানের দূরত্বটাকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ভায়োলিনটা পড়ে থাকে বেঞ্চের উপর। ওরা দুজনেই একে অপরের হাত ধরে হাঁটতে থাকে ডুবন্ত সূর্যের দিকে— “আমার সব কথা মনে পড়ছে, জানিস? দাদুর বলা সব ক-টা গল্প… সব ক-টা গান, এতদিন পাগলের মতো একটা শিকড় খুঁজছিলাম। এমন একটা কিছু আঁকড়ে ধরতে চাইছিলাম, যেটা ছোটবেলা থেকে ছেড়ে যায়নি আমাকে, আমি বুঝতেই পারিনি যে থাকার, সে ছিল। কেবল আমি ভুলে গিয়েছিলাম তার কথা…”
ঐন্দ্রিলা তাকিয়ে ছিল সামনের দিকে। সেদিক থেকে মুখ না ফিরিয়েই বলে, “জানিস রূপ, আমাদের সবারই কোথাও না কোথাও একটা শিকড় থাকে। সেটাকে কেউ কেড়ে নিতে পারে না। ছিনিয়ে নিতে পারে না। কেবল ভুলিয়ে দিতে পারে। আর ভুলে গেলে সেগুলো মনে করার উপায় কী বল তো?”
“দুঃখ?”
“হ্যাঁ, আমাদের দুঃখগুলো সত্যিই এক-একটা জোনাকির মতো। যেগুলো রাতের অন্ধকারে একটা একটা করে ফুটে উঠে এটা মনে করিয়ে দেয় যে রাতটাও সুন্দর হতে পারে… দেখবি, একটু পরে একটা অদ্ভুত সুন্দর রাত নামবে…”
ঘাসের উপর ওদের পায়ের পাতা পড়ে। খসখস আওয়াজ হয়। মনে হয়, এই পাহাড়ি পথে এর আগে কেউ আসেনি। হয়তো কিছুক্ষণ আগে এই পথে হেঁটে গেছে অ্যালিস, কিংবা সিন্ডারেলা, কিংবা কোনও ছ-টা শিংওয়ালা অদ্ভুত প্রাণী, যাকে আগে কেউ কখনও দেখেনি। আড়াল থেকে লুকিয়ে থেকে ওরা সবাই লক্ষ করছে এই দুটো মানুষকে। কোথায় এগিয়ে চলেছে ওরা কে জানে, কেবল খাড়া পাহাড়ি পথে উপরদিকে উঠছে। যেমন করে মানুষ ওঠে তার জীবনের রেখাচিত্র বেয়ে। ঠিক যতটা উপরে ওঠে, তত তার দুঃখের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ঠিক পাহাড়ি পথের মতো।
“তোর আর ফিরতে ইচ্ছা করে?”
“কোথায়?”
“কলকাতায়। তোর ঘরে।”
“আমার কোনও ঘর নেই।”
“তাহলে স্টুডিয়োতে? রেস্তোরাঁতে? হাজার হাজার হাততালির মাঝে? বহু হাতের স্পর্শের মাঝে? এসি গাড়িতে কিংবা সমুদ্রের ধারে? তোর পছন্দের বইগুলোর কাছে?”
“তাহলে কী ইচ্ছা করে?”
“এইখানে থেকে যেতে। এই মুহূর্তটা, জীবনে অন্তত একবার সময়কে হারিয়ে দিতে ইচ্ছা করে। দাদু যেমন হারিয়ে দিয়েছিল।” হঠাৎ হাতের টানে শতরূপকে নিজের শরীরের কাছে টেনে নেয় বিনি, আজ এতটুকু লজ্জা লাগে না ওর। দু-গালে হাত রেখে কপালে ঠোঁট স্পর্শ করে। তারপর বলে, “জানিস, কত অপেক্ষা করেছি তোর জন্য? কতদিন তোকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি… এই, তোকে তো বলাই হয়নি, সেই ঘোড়াপোড়া গাছটার নীচে কী ছিল জানিস?”
“না তো। কী?”
“তুই!”
“আমি! মানে?”
“দাদু আমাকে তোর সব গল্প করত। কিন্তু তোর নাম বলেনি কোনওদিন। তুই কেমন দেখতে, গলার আওয়াজ কেমন, কিছু জানতাম না। তারপর একদিন পুনার সঙ্গে আলাপ হল। দাদুই বলেছিল, একদিন পুনা আসবে। সেদিন ওর কথা শুনে গাছের নীচটায় খুঁড়ে পেয়েছিলাম একটা কাঠের বাক্স।”
“কেমন বাক্স?”
“একটা পুরোনো বাক্স। তাতে তোর সব কিছু রাখা ছিল। তোর সব গল্প। তোর ছবি, তোর নাম, তোর গলার আওয়াজ রেকর্ড করা ছিল একটা ক্যাসেটে….”
রূপ সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পারে না, কিন্তু প্রশ্ন করতেও ইচ্ছা করে না ওর। বিনি বলে চলে, “পুনা আমাকে মিথ্যা কথা বলেনি। ও বলেছিল, একটা লোক এই জঙ্গলে এসেছিল। আসবার পর বুঝেছিল যে আর কখনও ফেরত যেতে পারবে না। তাই সে খুব গোপনে একটা জিনিস রেখে গিয়েছিল ওই জঙ্গলে। আমি বুঝতে পারিনি ওই লোকটা আসলে ছিল আমার দাদু। দাদু আর কখনও আমার কাছে ফিরতে পারবে না ভেবে আমার জন্য রেখে গিয়েছিল ক্যাসেটটা…”
“তুই কী করলি ক্যাসেটটা নিয়ে?”
“আমার টেপরেকর্ডারের ভেতরে ওই ক্যাসেটটা ঢুকিয়ে কতবার চালাতাম! হাজার হাজারবার শুনেছি তোর গলার আওয়াজ। সারাদিন ধরে দেখেছি তোর ছবি। তুই জানিস, আমি কত অপেক্ষা করেছি তোর জন্য?”
হঠাৎ ওর দিকে ফিরে তাকায় ঐন্দ্রিলা। ওর চোখ দুটো ছলছল করছে সমস্ত মুখ ভরে গেছে একটা লালচে আভায়। অবিন্যস্ত চুলের রাশি চোখের পাশ দিয়ে নেমে এসেছে।
“তুই আর কখনও আমায় ছেড়ে যাবি না তো, বল রূপ?”
“কোনওদিন যাব না, আমার যাওয়ার মতো কিছু নেই…”
বুকের উপর ঐন্দ্রিলার মাথাটা টেনে নিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রূপ। মেয়েটার চোখ থেকে বেরিয়ে আসা জল গলা, বুক ভিজিয়ে দেয়। শরীরটা কেঁপে ওঠে কয়েকবার। একটা অচেনা হাওয়া খেলা করে ওদের ঘিরে। মনে হয়, অন্য কোনও জগৎ থেকে আসছে হাওয়াটা। ওদের টেনে নিয়ে যেতে চাইছে…..
“আমি তোকে কোথাও যেতে দেব না আর…. কোনওদিন না…” ফুঁপিয়ে ওঠে বিনি।
“তাহলে বারবার একা একা চলে যেতে চাইতিস কেন?”
ঐন্দ্রিলা অবাক হয়ে তাকায় ওর মুখের দিকে— “আমি কোনওদিন একা যেতে চাইনি… এতদিন অপেক্ষা করলাম তোর জন্য…”
“তাহলে এতবার আত্মহত্যার চেষ্টা… “
কান্না চেপে ঐন্দ্রিলা এবার জোরে হেসে ওঠে, “ধুর, তুই কী বোকা রে! তুই জানিস না আমার শরীরে সহজে ক্ষতি হয় না?”
ওর চুলে হাত বুলিয়ে দেয় বিনি, “বোকা রে, আমি কখনও আত্মহত্যা করতে চাইনি। আমি ছোট থেকে অনেক কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু তোকে ফেলে রেখে একা একা কোথাও চলে যেতে চাইনি। শুধু মাঝে মাঝে যখন আর জীবনটাকে সহ্য করতে পারতাম না, তখন ওই জগৎটার কাছে যেতে চাইতাম…”
“কীভাবে?”
“ওই যে… শরীর থেকে রক্ত বেরোতে থাকলে একটা সময় যখন মনে হয়, ভেতরের সব রক্ত শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখন ওই জগৎটা কাছে চলে আসে। দাদু কাছে চলে আসে, গল্পগুলো কাছে চলে আসে, ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলে মাটিতে পড়ার আগে মনে হত না, সত্যি এমন কোনও জায়গা আছে, যেখানে কোনও দুঃখ নেই? কেউ কাউকে ঘেন্না করে না? মৃত্যু একটা প্রতিজ্ঞার মতো, রূপ। আমি বারবার তার কাছে গিয়ে নিজের যন্ত্রণাটা ভোলার চেষ্টা করতাম। আমার কাছে তো আর কেউ ছিল না। আমি ঠিক ততটাই হাত কেটেছি, যতটা কাটলে মানুষ মরে না। ততটা উপর থেকে ঝাঁপ দিয়েছি, যতটা ঝাঁপ দিলে মাথাটা আগে মাটিতে পড়ে না। ঠিক ততগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়েছি, যতগুলো খেলে মৃত্যু হয় না। তোকে ছেড়ে একা কোথাও যেতে চাইনি। তোকে সেদিন যখন ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছিলাম, মাটিতে পড়ার আগে তোর মনে হয়নি তোর সব কষ্ট দূরে চলে যাচ্ছে?”
“সেইজন্যেই ফেলে দিয়েছিলি আমাকে?”
“নইলে তোর বিশ্বাস হত কী করে বল তো? তুই তো সব ভুলে গেছিস… ওরা সব কথা কেউ ভুলিয়ে দিয়েছে তোকে… কতবার, কতবার তোকে মনে করানোর চেষ্টা করেছি। তোকে অর্ফিয়াসের গল্প বলিয়ে, মরে গিয়ে আবার যে ইউরিডাইসের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ওর, সেই অন্ধ বুড়োবুড়ির গল্প বলে, আমাদের ছোটবেলার গান শুনিয়ে, ছড়া বলিয়ে, তোকে স্পর্শ করে, তোর ছোটবেলার সেই ছেলেটাকে বারবার দেখিয়ে, আমার ডায়েরির আঁকাগুলো দেখিয়ে, পুনার কথা বলে, ইক্সট্যাবের খোঁজ দিয়ে, দাদুর কথা বলে…. শুধু সরাসরি বলিনি তোকে। জানি, ওরা তোকে এমনভাবে সব ভুলিয়ে দিয়েছে যে আমার মুখ থেকে শুনে শুধুই আমাকে অবিশ্বাস করতিস তুই…”
দু-হাতে বিনিকে জড়িয়ে ধরে রূপ, কাঁপা-কাঁপা ঠোঁটে প্রশ্ন করে, “তুই সত্যি করে বল, তুই কিচ্ছু ভুলিসনি, তা-ই না?”
বিনির চোখে কৌতুকের রং লাগে, “কিচ্ছু ভুলিনি আমি। কখনও কিচ্ছু ভুলিনি।”
“তাহলে আমাকে এখানে ডেকে…”
“আমার শুধু তোর মুখ থেকে আমার গল্পগুলো শোনার ছিল। মিথ্যে মিথ্যে করে। যদি ছোটবেলায় আমরা আলাদা না হয়ে যেতাম, যদি একসঙ্গে থাকতে পারতাম, আমার জীবনটা ঠিক কীভাবে সাজিয়ে দিতিস তুই, সেটা শুনতে ইচ্ছা করছিল। এমন একটা ছেলেবেলা, কৈশোর, বড় হওয়া- যেখানে তুই আছিস… যেখানে আমাদের সেই জারটা ভরতি হতে হতে আমরা বুড়ো হয়ে যেতাম… তুই যা বলিস, সব সত্যি মনে হয় আমার…”
সূর্যটা এখন আরও খানিকটা ঢলে পড়েছে দিগন্তরেখার দিকে। তার বৃত্তের একটা বিন্দু ছুঁয়েছে দূরের জঙ্গলগুলোর মাথা। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই অন্তর্হিত হবে সূর্যটা। ওদের দুজনের একসঙ্গে দেখা সূর্যাস্ত। শেষ সূর্যাস্ত।
“কোনও কিছু শেষবার দেখার সময় এত মায়াময় দেখায় কেন বল তো? শেষের থেকে বেশি সুন্দর আর কিছু হয় না, না?” বিনির গলার স্বর দূরে হারিয়ে যায়। সূর্যাস্তের রঙে কী যেন এক অদ্ভুত মোহ! অসংখ্য রঙিন প্রজাপতির খেলা ওদের ঘিরে। রূপকথার জঙ্গল ওদের শেষ বিদায়ের মঞ্চ সাজিয়ে দিয়েছে উপহার হিসেবে। ঐন্দ্রিলার ঘন নিশ্বাস ছুঁয়ে যায় শতরূপের বুক। অবিন্যস্ত চুলগুলো শুয়ে থাকে শরীরে। পিঠের উপর হাত রেখে নিবিড় হয়ে লেপটে আছে দুটো শরীর। যেন শরীরের বাধা পেরিয়ে আরও কাছে হয়ে আসতে চাইছে দুটো মানুষ। কিংবা মিশে যেতে চাইছে আরও গভীর কোনও অস্তিত্বে…
পেছনদিকে ফিরে তাকায় ঐন্দ্রিলা – “আমরা আর কখনও ফিরব না ওদের মধ্যে। ওরা আবার সব কিছু খারাপ করে দেবে। এই সন্ধ্যাটাকে কেড়ে নেবে, এই রংগুলোকে কেড়ে নেবে, ওই সূর্যটাকে কেড়ে নেবে, তোকে আমার থেকে আলাদা করে দেবে। ওরা শুধু আলাদা করতে পারে। চল রূপ, সবাইকে ছেড়ে চলে যাই আমরা…. আমরা তো ওদের কেউ নই….”
ঐন্দ্রিলা এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে শতরূপের দিকে। রূপ জানে ওই চোখ দুটোর বিশেষ ক্ষমতার কথা। চোখ দুটো কুহকের মতো মানুষের মনকে গ্রাস করে ফেলতে পারে। কিন্তু আজ সে চোখে কোনও মোহ নেই, কোনও সম্মোহন নেই, কোনও রহস্যও নেই। আজ কেবল এক আকুল অন্তহীন অপেক্ষা… যেন বহু পথ ধরে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত পথিক অবশেষে খুঁজে পেয়েছে তার বাড়ি। একটিমাত্র রাত ঘুমোনোর আবদার করছে সে…
শতরূপের হঠাৎ মনে পড়ে যায় ওর পরিচিত জীবনের কথা। উপন্যাসটা কি সত্যি শেষ করতে ইচ্ছা করছে ওর? স্টুডিয়োর ঠান্ডা ধাতব দেওয়াল, নৈঃশব্দ্য, ওই বইমেলা, চিৎকার, সই, ওই স্কুলের জন্য মন কেমন, মা-বাবার জন্য মন কেমন, কী হবে আর এসবের কাছে ফিরে গিয়ে? এসব কিছুই তো চায়নি সে। যা চেয়েছিল, তার সব কিছুই হারিয়ে গেছে একটা একটা করে। এমনকি ওর আটকে রাখার ইচ্ছাটাও… একটা অচেনা পথে এতদূর হেঁটে এসেছে। ওর সমস্ত চাওয়া এসে মিলে গেছে ঐন্দ্রিলার দুটো ডাগর চোখের মোহে। আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। বরঞ্চ আজ যে মেয়েটা ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, টেনে নিয়ে যেতে চাইছে কোন অচিন স্বপ্নপুরে, সে পথে চলে গেলেই তো হয়…. ঐন্দ্রিলার দু-গালে দুটো হাত রাখে রূপ— “যাব, তুই যেখানে নিয়ে যাবি, সেখানেই আমি যাব…”
“তাহলে চলে আয়…”
হঠাৎ ওর একটা হাত ধরে সামনের দিকে দৌড়োতে থাকে ঐন্দ্রিলা। যেন অনন্ত নক্ষত্রপথের মাঝে বিস্তৃত ছায়াপথের উপর দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে দুটো মানুষ। কী ভীষণ তাড়া তাদের! একটু পরেই সূর্যটা ডুবে যাবে, ডুবে যাবে সব কিছু। চরাচর ঢেকে যাবে অন্ধকারে। তার আগেই এই আলোর রেশটুকুনি মাখতে মাখতে অন্ধকারে ডুবে যেতে চায় ওরা। একটু একটু করে অন্ধকার নয়, একেবারে অন্ধকার। অন্ধকারের ভয় পেতে পেতে তলিয়ে যাওয়া নয়, অন্ধকারকে ভালোবেসে ফেলা। দুজনেই হেসে ফ্যালে। ওদের খিলখিল হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে বিকেলের বাতাসে। এবার টিপটিপ নামে বৃষ্টির ফোঁটা। তিরের মতো আঘাত করতে থাকে ওদের চোখে, কপালে, বুকে। শরীরে লেগে থাকা সমস্ত রক্তমাংস আর ক্ষতচিহ্ন ধুয়ে দিতে চায়। হঠাৎ মাটির উপর কীসে যেন ধাক্কা খেয়ে আছড়ে পড়ে ঐন্দ্রিলা। ওর হাতটা ধরে ছিল বলে শতরূপও পড়ে যায় ঘাসের উপর। মাথাটা ঠুকে যায়। যন্ত্রণায় কাতর দুজন দুজনের দিকে তাকায়। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে এতক্ষণে। আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে জল ঢুকে মিশিয়ে দিতে চাইছে হাত দুটোকে। ঐন্দ্রিলা আকাশের এক জায়গায় চোখ রেখে বলে, “ওইখানটায় তোর তারাটা আছে, তা-ই না?”
শতরূপ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায়, “তুই জানিস, কোথায় আছে ওটা?”
“জানি, তুই ছাড়া এই পৃথিবীতে আর একজনই জানে। সেই কবে থেকে জানে।”
শতরূপ হাসে— “আর আমি ভাবতাম, কেউ জানে না ওটার খবব…”
“আমি রোজ রাতে তাকিয়ে থাকতাম। যেদিন রাতে তুই আসতিস না, সেদিনও। আমি জানতাম, কোনও না কোনও একদিন তুই আর আমি দুজনে একসঙ্গেই তাকিয়েছিলাম ওটার দিকে। তুই ছাড়া আর কিচ্ছু নেই আমার, ছিলও না কোনওদিন….”
সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়।
আমাদের চোখ সারাটি রাত্রি মাটির বুকের পরে।।
শতরূপের ছড়িয়ে-থাকা হাতের উপর মাথা রেখে শোয় ঐন্দ্রিলা। হাত রাখে ওর গালে। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। ঘাসের উপর একটা পায়ের আওয়াজ শুনে চমকে তাকায় শতরূপ। আস্তে আস্তে একটা অবয়ব তৈরি হয়ছে বৃষ্টির মধ্যে। কে যেন এগিয়ে আসছে ওর দিকে। মুখ তুলে তাকিয়ে চিনতে পারে, ইলোরা। ওর হাতে সেই জারটা। অসংখ্য জোনাকিতে ভরে গেছে।
মাটির উপর সেটা নামিয়ে রেখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে ইলোরা…
পৃথিবীর সব রং মুছে গেলে / পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে / জোনাকির রঙে ঝিলমিল।
বিড়বিড় করে শতরূপ, “আয়, তোরই অপেক্ষা করছিলাম আমরা…
“এখনও একটা জোনাকি বাকি আছে….” ইলোরা মোহময়ী চোখে তাকায় ওর দিকে।
“আচ্ছা, ওপারে আর তোর সঙ্গে দেখা হবে না, তা-ই না?”
“না। বলেছিলাম না, আমি তো স্কোরবোর্ড। আউট হয়ে-যাওয়া প্লেয়ারের আর স্কোরবোর্ড দেখার দরকার হয় না।”
“এতদিন তোর মতো বন্ধু আর কেউ ছিল না আমার। তোকে আর না দেখতে পেলে খুব কষ্ট হবে…”
ওর পাশে বসে ওর মাথায় একটা হাত রাখে ইলোরা। খুব শান্ত গলায় বলে, “ভালো থাকিস রূপ…”
বৃষ্টির জল সমস্ত মুখ ধুয়ে দেয় ওর। গুমগুম করে অতিকায় পায়ের শব্দ আসছে জঙ্গলের দিক থেকে। বিরাট কয়েকটা দৈত্য সেদিক থেকে ধেয়ে আসছে ওদের দিকে। শতরূপ মুখ তুলে চায়। আজ এত বছর ধরে দৈত্যগুলো ভয় দেখিয়ে আসছে ওকে। আজ আর ভয় দেখাতে পারবে না। আজ ইলোরা দরজা খুলে দিয়েছে ওর জন্য… আর-একটা পায়ের আওয়াজ মিশে যায় তাতে। একটা বাচ্চা মেয়ে, সে এসে দাঁড়িয়েছে ঐন্দ্রিলার মুখের সামনে। চিনতে পারে ঐন্দ্রিলা, পুনা। সেই অন্ধকার পিশাচের মতো দেহ নয়। ওর সেই কিশোরী বয়সের পুনা। সজল চোখে সে-ও তাকিয়ে আছে বিনির দিকে। বিনি চলে যাবে বলে কি কষ্ট হচ্ছে ওর? একটাও শব্দ উচ্চারণ করে না সে। কেবল সেইভাবেই চেয়ে থাকে…. সেই বাচ্চা ছেলেটা। আজ সে-ও খাদের ধারে দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে শতরূপের দিকে। এতগুলো মানুষ অদ্ভুত অস্তিত্ব দিয়ে ঘিরে আছে ওদের। ওরা সবাই মিলে কাঁদছে। যেন বিদায় জানাতে এসে কিছুতেই চলে-যাওয়া মানুষটার হাত ছাড়তে চাইছে না… ধীরে ধীরে খাদের ধারে গিয়ে দাঁড়ায় ওরা দুজন। ঐন্দ্রিলার সমস্ত মুখ ভরে গেছে উজ্জ্বল হাসিতে। শতরূপ অনুভব করে, ওর হাতের উপর আঙুলের চাপ বেড়ে চলেছে ক্রমশ। নীচের দিকে তাকায় ঐন্দ্রিলা— “ভয় করছে তোর?”
“একটুও না।”
“আবার দেখা হবে, বল?”
পেছনের দৈত্যগুলো, বাচ্চা ছেলেটা, পুনা আর ইলোরা স্থিরনেত্রে চেয়ে আছে ওদের দিকে… বৃষ্টির জলে একটু একটু করে ঝাপসা হয়ে আসছে তাদের দেহগুলো…
“আমার একটা গল্প বলার আছে তোকে…” ঐন্দ্রিলার কানের কাছে মুখ এনে বলে শতরূপ…
