জোনাকির রঙ – ১১

(একাদশ অধ্যায়)

বিনি চোখ খুলতেই দেখল, সমস্ত ঘরটা একটা লালচে আলোয় ভরে আছে। এই ঘরটা ওর চেনা নয়। ওর বাড়িতে এমন কোনও ঘর নেই। উঠে বসে চারদিকটা দেখার চেষ্টা করতেই শরীরে একটা অদ্ভুত শিরশিরানি লাগল। ঠান্ডা পাথরের মেঝের সঙ্গে শরীর স্পর্শ লাগছে। এর আগে কখনও হয়নি এমনটা…

হাতটা পায়ের কাছে স্পর্শ করতেই একটু চমকে উঠল বিনি। পরমুহূর্তে একটা অদ্ভুত অনুভূতি গ্রাস করে ফেলল ওকে। সমস্ত শরীরের কোথাও কোনও কাপড় নেই। কেবল বুক আর থাইয়ের উপর একটা পাতলা গামছাজাতীয় চাদর পড়ে আছে। একটু দূরে সিঁদুর দিয়ে একটা বৃত্ত আঁকা। তার পাশে ওর দিকে পেছন ফিরে বসে আছে একটা লোক। বিড়বিড় করে কী যেন মন্ত্র পড়ছে লোকটা।

হাত দিয়ে নিজের শরীর ঢাকার চেষ্টা করল বিনি, কিন্তু হাত দুটো বাঁধা। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না।

“মা-বাবা…” আওয়াজের বদলে গোঙানি বেরিয়ে এল।

কোনও উত্তর এল না। তার বদলে কয়েক সেকেন্ড পরে লাল কাপড়-পরা লোকটা ফিরে তাকাল ওর দিকে। লোকটার মাথায় জটাজুট, অবিন্যস্ত দাড়ি, হলদে চোখ দুটো ফুলে রয়েছে। বিশ্রী মদের গন্ধ ভাসছে বাতাসে।

“এই যে মা… তোমার ঘুম ভেঙেছে….”

বিনির প্রায় উলঙ্গ শরীরে চোখ বোলাতে লাগল লোকটা। ও শত চেষ্টাতেও বাঁধা হাত দুটো ছাড়াতে পারল না। চেয়ে দেখল, ওর ঠিক পাশেই একটা ছোট পাত্র পড়ে আছে।

বুকের সমস্ত শক্তি একত্র করে একটু জোরে চিৎকার করে উঠল বিনি। লোকটার তেমন হেলদোল হল না, শান্ত স্বরেই বলল, “ওঁরা পাশের ঘরে আছেন, তুমি একটু অপেক্ষা করো। চলে আসবেন….”

“শুয়োরের বাচ্চা, আমাকে ছেড়ে দে একবার, তারপর…”

“ছি, নোংরা কথা বলতে নেই, মা…” লোকটা ভারী নরম একটা হাসি হাসে। তারপর এসে বসে পড়ে ওর পাশে— “মাথার উপরে ভগবান আছেন, সব দেখছেন কিন্তু…”

“আমার হাতটা একবার খুলে দে খানকির ছেলে, তারপর তোর সঙ্গে তোর ভগবানেরও চোখ উপড়ে নেব…

“তোমাকে এই কথাগুলো কে শিখিয়েছে, মা?” লোকটা ভুরু কুঁচকে ওর মুখের উপরে ঝুঁকে পড়ে। একটা কাঠিজাতীয় জিনিস বুলোতে থাকে বুকের উপর।

“পুনা, তা-ই না? আমি জানি তোমার একটুও দোষ নেই। শয়তান তোমার দেহের সঙ্গে জুড়ে আছে…” লোকটা এবার ওর পেটের উপর হাত রাখে। ওর সমস্ত দেহ চোখ দিয়ে চাটতে চাটতে বলে, “ভগবান তোমাকে রক্ষা করবেন….”

“আমি ভগবানে বিশ্বাস করি না…”

“আজকের পর থেকে করবে…”

বিনির চিৎকার আস্তে আস্তে বদলে যায়। রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে ওর সমস্ত মুখ। চিৎকার করে কাকে যেন ডাকার চেষ্টা করে ও, “পুনা… পুনা, তুই কোথায়?”

“আছি, তোর পাশেই…” মাথার দিকে তাকিয়ে পুনাকে দেখতে পায় বিনি। “তুই দেখছিস, লোকটা কী করছে আমাকে? আমাকে বাঁচা পুনা…”

পুনার মুখটা গম্ভীর দেখায়— “এ পৃথিবীতে কাউকে বাঁচানো যায় না। কেবল যে মারতে আসছে, তাকে মেরে ফেলা যায়…”

“তাহলে মেরে ফেল…”

“না…” তেমন গম্ভীর মুখেই মাথা নাড়ে পুনা।

“কেন? তুই আমার বন্ধু না? তুই তো সব কিছু পারিস” এতক্ষণে পুনা ওর মুখের দিকে তাকায়, “অনেকটা অন্ধকার না জমলে দৈত্য জন্মায় না, বিনি। তুই তাকিয়ে থাক। দেখ… একটু পরে আরও ঘন অন্ধকার নামবে… তুই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবি, কী করে অন্ধকার নামে তোর গোটা জীবনে… তুই তোর মা-কে, বাবাকে খুন করতে পারবি না, এই লোকটাকে খুন করতে পারবি না… শুধু শুয়ে শুয়ে দেখবি শরীর জুড়ে অন্ধকার…”

“আমি খুন করতে চাই…”

“কাকে?”

“সবাইকে… আগে এই লোকটাকে….

পুনা এবার মুখ নামিয়ে আনে ওর মাথার কাছে, বলে, “তোর পাশে রাখা বাটিটায় জলের মতো একটা জিনিস আছে। ওটা একটু পরে তোকে জোর করে খাইয়ে দেবে লোকটা। খেলে মরেও যেতে পারিস, বেঁচেও থাকতে পারিস….”

“আমি কিছুতেই খাব না।”

“উঁহু, খাবি… তবে একসঙ্গে পুরোটা না, একটু একটু করে, তোর শরীর ঝিমিয়ে পড়বে, তারপর লোকটা হাত আর পায়ের বাঁধন খুলে ঘরের আলো নিবিয়ে দেবে….”

“কেন?”

পুনা একটা চাপা হাসি হাসে— “তোর শরীর থেকে শয়তান তাড়াতে গেলে শরীরটাকে একটু চিনতে হবে না?”

“তারপর কী করব?”

“ওই যে বললাম, অন্ধকার বাঁচিয়ে নেবে তোকে…”

বিনির শরীর ঝিমিয়ে পড়তে লোকটা আলো নিবিয়ে এগিয়ে যায় ওর দিকে। মুখে এখনও বিড়বিড় করে কী যেন মন্ত্র পড়ে চলেছে। হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেয় একটা একটা করে। বুকের উপর থেকে চাদর সরিয়ে ফ্যালে।

ঠিক এই সময়ে হঠাৎ সচল হয়ে ওঠে বিনির শরীরটা। পায়ের কাছে একটা কাঠ তোলার সাঁড়াশি পড়ে ছিল। হাত-পা বাঁধা ছিল বলে সেটা সরিয়ে ফেলার কথা মাথায় আসেনি লোকটার। বিনির উলঙ্গ দেহটা দ্রুত তুলে নেয় সেটা। ফিকে চাঁদের আলোয় ঝাঁপিয়ে পড়ে খামচে ধরে লোকটার চুলগুলো। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটাকে মাটির উপর ফেলে গলায় পা তুলে শ্বাস আটকে দেয়। তারপর সাঁড়াশির সরু প্রান্তটা একটু ফাক করে ঢুকিয়ে দেয় লোকটার চোখে। খচ করে একটা শব্দ হয় তাতে। শব্দটা সুরের মূর্ছনার মতো মন ভরিয়ে দেয় বিনির।

পাশবিক চিৎকারে ভরে ওঠে সমস্ত হলঘর। পায়ের চাপ বাড়িয়ে দেয় বিনি। চিৎকার গোঙানিতে পরিণত হয়।

“বলেছিলাম না, একবার হাত খুলে দিলে তোর আর তোর ভগবান দুজনেরই চোখ….”

“ভগবান বা শয়তান বলে কিছু হয় না, বিনি। যার হাতে সাঁড়াশি, সে-ই অন্যের কাছে ভগবান। যার চোখে সাঁড়াশিটা ঢুকে যায়, তার কাছে শয়তান….”

চোখের ভেতর থেকে মাংস আর রক্ত-মাখা একটা পিণ্ড তুলে এনে ছুড়ে ফেলে দেয় বিনি। তারপর লুটিয়ে পড়ে মেঝেয়। সেই তরলটা এতক্ষণে কাজ শুরু করেছে। একটু একটু করে মাটির উপর খসে পড়ে ওর নগ্ন দেহটা …

জ্ঞান হারানোর আগে ও চেয়ে দ্যাখে, পুনার দেহটা আস্তে আস্তে পালটে যাচ্ছে। আকারে অনেকটা বড় হয়ে যাচ্ছে ও। কুচকুচে কালো হয়ে যাচ্ছে দেহটা। ধীরে ধীরে একটা ভয়ংকর দৈত্যে পরিণত হচ্ছে পুনা।

*

ছাদের দরজা খুলে খোলা হাওয়ায় বেরিয়ে এল শতরূপ। সকালেই জংলুর কাছ থেকে জোগাড় করেছে ছাদের চাবি। আপাতত একটু খুঁড়িয়ে হলেও হাঁটতে পারছে রূপ।

ছাদ থেকে সামনের লাল পাথুরে রাস্তাটা ভারী সুন্দর দেখায়। তার থেকে একটু দূরে জংলুর সাইকেলটা ঠেস দিয়ে রাখা।

ছাদে আসতেই শতরূপের দিকে এগিয়ে এল নীহারিকা। এ বাড়িতে ওদের দুজনের কথা বলার জন্য এর থেকে নিরিবিলি জায়গা আর নেই।

কেমন যেন জড়োসড়ো ভাব ওর মধ্যে। দুটো হাত প্যান্টের পকেটে পোরা। পিঠের পেছনে ক্লিপ দিয়ে বাঁধা চুলগুলো ছড়িয়ে রয়েছে।

“ভেবেছিলাম, তোর সঙ্গে আর দেখা হবে না কখনও…” শান্ত গলাতেই বলে নীহারিকা।

একদিকের রেলিং-এর পাশে গিয়ে দাঁড়ায় শতরূপ। কথা বলে না। “কাকু-কাকিমা মারা যাওয়ার পর থেকেই তুই কেমন যেন একটা হয়ে গেলি। আগের থেকে আরও বেশি গুটিয়ে নিলি নিজেকে… আমি নিজের দিক থেকে আর কত চেষ্টা করব বল? ভেবেছিলাম, নিজের মতো আছিস। চাকরি পাওয়ার পর থেকে মনে হল, তুই অহংকারী হয়ে গেছিস।”

রেলিং-এর দিক থেকে ইস্পাতের মতো কঠিন কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, “আমি এখানে তোর এই যাত্রাপালার ডায়ালগ শুনতে আসিনি…. ঐন্দ্রিলার ব্যাপারে কী জানিস তুই?”

নীহারিকা সামলে নেয় নিজেকে। ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, দূরের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বলে, “আমি তিন বছর ধরে দেখছি ওকে। কী জানতে চাস বল….

“ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে তোর?”

“হয়েছে, ভিডিয়ো কলে…”

“কী বলছে তারা?”

“তেমন কিছু না। ওকে নিয়ে ওরা খুব একটা বদার্ড না। মেয়ের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে খুশিই হয়েছে।”

“বদার্ড না মানে? একটা বাচ্চা মেয়েকে বিষ দিয়ে মেরে ফেলতে চায় যারা…”

“ওদের মনে হয়েছিল, বিনির শরীরে অন্য কেউ বাসা বেঁধেছে।”

“কে বাসা বেঁধেছে?”

“বিনির সেই ইম্যাজিনারি ফ্রেন্ড…. ডেভিল।”

“এইসব শিক্ষিত জানোয়ার কেন যে ছেলেমেয়ে পয়দা করে কে জানে…” পাঁচিলের উপরেই একটা ঘুসি মারে রূপ।

“এগারো বছর হল বাবা-মায়ের সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই ওর। তা-ও

ছেলেবেলাটা ওকে তাড়া করে বেড়াত।”

“পুনার সঙ্গে শেষ কবে অবধি কথা বলেছে?”

নীহারিকা পাঁচিলে কোমর রেখে ঘুরে দাঁড়ায়— “তিন বছর আগে আমার কাছে আসে। তখন অলরেডি পুনার সঙ্গে যোগাযোগ কমে এসেছে। অবসেশনটা একটু অন্য রকমের হয়ে গেছে…”

“ঠিক কবে থেকে কমেছে?”

একটু ভাবে নীহারিকা, “দেখ, আমার মনে হয় পুনা ওর অলটার ইগো। বাবা-মায়ের অত্যাচারটা কমে আসতেই সেটার দরকার কমে আসে। তারপর থেকে সেটার রিমিনিসেন্স রয়ে গেছে কেবল। মানে আবার কখনও দরকার পড়লে ফিরে আসতে পারে পুনা। আপাতত ওর অবসেশন অন্য কিছু…

“কী?”

“তুই…”

“মানে?” চমকে ওঠে শতরূপ।

“শি ওয়াজ অবসেড অ্যাবাউট ইউ। ব্যাপারটা একেবারেই স্বাভাবিক নয়। কারও ফ্যান-ট্যান হওয়া আলাদা জিনিস। কিন্তু…”

“আমি রেডিয়ো জয়েন করি ষোলোতে। মিস্টার দত্তর কাছে ও থাকতে শুরু করে দু-হাজার দশ নাগাদ। মানে তার আগে ছ-বছর কেটেছে। এই সময়টায় কেমন ছিল ও?”

“জানি না।” ঘাড় নাড়ে নীহারিকা, “তোর অ্যানালিসিস কী?”

“কিছু বুঝতে পারছি না। পুনা নাকি মাটি খুঁড়ে কী একটা খুঁজে নিতে বলেছিল ওকে। আমার যতদূর মনে হয় ‘মাটি খুঁড়ে’ খুঁজে নেওয়ার ব্যাপারটা একটা কল্পনা। আসলে বাবা-মায়ের কাছে থাকতেই বাড়ি থেকে অন্য কিছু খুঁজে পেয়েছিল। সে জিনিসটা খুঁজে পেলেই অনেকটা বোঝা যাবে…”

“ডায়েরিগুলো পড়েছিস তুই?”

“হুম… তেমন কিছু হেল্প হয়নি অবশ্য। খালি একটা ছবি….”

“ওই সূর্যের সামনে দরজা? আমারও খটকা লেগেছিল ওতে। যদিও মানে উদ্ধার করতে পারিনি। তা ছাড়া অনেক জায়গায় এক অন্ধ বুড়োবুড়ির কথা লিখেছে। যারা নিজেদের দৃষ্টি ফিরে পেতে চাইছে। এটার মানে কী বল তো?”

কাঁধ ঝাঁকায় রূপ, “অনেক প্রশ্নের উত্তর নেই। একটা মেয়ের এতগুলো অতিলৌকিক ক্ষমতা… কাল্পনিক বন্ধুর আগমন এবং প্রস্থান… ভালো কথা, তোকে একটা কথা…”

“বল, হেজিটেট করিস না।”

“আমার নিজের কিছু প্রবলেম হচ্ছে।”

“কী প্রবলেম?”

“আমি একটা ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি। আই মিন, হ্যালুসিনেট করছি। কখনও গাড়ির সামনে এসে পড়ছে, কখনও ডুবে মরছে…”

“কিন্তু বাস্তবে সেখানে কেউ থাকছে না?”

“হুম…”

একটু চিন্তায় পড়ে নীহারিকা, “তোর আগে হয়েছে এরকম?” উত্তরটা দিতে একটু সময় লাগে শতরূপের— “ভেবেছিলাম, হয়নি। এখন মনে হচ্ছে, ঘটনাটা আগেও ঘটেছে। কিন্তু এতদিন আগে যে মনে পড়ছে না।”

“ঠিক কী ঘটেছিল বল তো?”

ঘাড় চুলকোয় রূপ। মুখটা ভারী অবসন্ন দেখায় ওর— “কাইন্ড অব আ রিকারিং ড্রিম। আমি বুঝি জিনিসটা বাস্তব নয়। তা-ও দেখার সময় মনে হয়, সত্যি দেখছি। কোনও অ্যাক্সিডেন্ট বা ওই জাতীয় কিছু ঘটার হলেই তার আগে একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখতে পেতাম আমি। বার দুয়েক ঘটেছে আগে। এখানে এসে থেকেও কয়েকবার ঘটেছে। কেন জানি না…”

“তাহলে তো বিনির সঙ্গে এর সম্পর্ক…”

“আছে…” পাঁচিলের উপরে চাপড় মারে শতরূপ— “এখানে এসে থেকে যে কবার ওকে দেখতে পেয়েছি আমি, তার মধ্যে দুবার অ্যাক্সিডেন্টের ধারেকাছে ছিলাম না। শেষবার…” কথাটা বলতে গিয়ে থমকায় শতরূপ, “শেষবার মনে হল, বিনি ইচ্ছা করে আমাকে দেখাল…”

“ক্লেয়ারভয়েন্ট! আর ইউ কিডিং…”

“আমি জানি না অন্য কারও উপর জিনিসটা কাজ করে কি না। কিন্তু আমার উপর….”

নীহারিকা উত্তর খুঁজে পায় না। বুকের ভেতরটা গরম হয়ে উঠেছে ওর, নিচু গলায় বলে, “আর-একটা ব্যাপার কিছুতেই বুঝতে পারছি না আমি।”

“কী?”

“তোর আর আমার এতদিন পরে হঠাৎ এভাবে দেখা হয়ে গেল, ব্যাপারটা কাকতালীয়?”

“নয় বলছিস?”

“জানি না, তবে আশিস দত্ত ঘাগু লোক। কিছু একটা লুকোচ্ছে আমাদের থেকে। হি ইজ আপ টু সামথিং …”

“হুম….”

“আর তুইও কিছু একটা লুকোচ্ছিস!”

“আমি কী লুকোলাম?” বিরক্ত হয়ে ফিরে তাকায় শতরূপ। “কাল রাতে মন্দিরের ছাদ থেকে তোর পড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল না। বিনয় সবই দেখেছে…”

এক সেকেন্ডের জন্য থমকে যায় শতরূপ। ছাদের উলটোদিকে হাঁটতে থাকে, “জানি। দেখ, আমি এইটুকুনি বুঝতে পেরেছি, বিনির স্মৃতির অন্তত কিছুটা ফিরে এসেছে। তবে সেটা আমি ছাড়া এখনই কেউ জেনে যাক তা আমি চাই না….”

“এমন কী স্মৃতি হতে পারে, যাতে একটা মানুষকে হঠাৎ ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিতে ইচ্ছা করল ওর? বিশেষ করে যাকে নিয়ে এত অবসেশন ছিল!”

“তোর কী মনে হয়?”

“দেখ, ঐন্দ্রিলার মতো পেশেন্ট মনোবিজ্ঞানীদের কাছে নতুন কিছু নয়। ছোটবেলায় অ্যাবিউসিভ প্যারেন্টিং-এর শিকার হয়ে ক্রমশ নিজের একটা জগৎ তৈরি করেছিল ও। পুনা ওকে সোশ্যাল ডিলেমাগুলো থেকে ডিফেন্ড করত। তুই আসার পর থেকেই পুনাকে একেবারে ভুলে গেছে ও। হয়তো সেই জেলাসি থেকেই পুনার রিমিনিসেন্সটা তোকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল।”

শতরূপ কিছু উত্তর দেয় না। কপালের ভাঁজগুলো চওড়া হয়। “ওকে এত বছর ধরে দেখে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি, জানিস, যদিও তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়…” নীহারিকা শতরূপের পেছনে হাঁটতে থাকে।

“কী ব্যাপার?”

“শি ওয়াজ অবসেড অ্যাবাউট ডেথ। মানুষ মারা যাওয়ার সমস্ত উপায় নিয়ে ভীষণ আগ্রহ ছিল ওর। নিজে বহুবার সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছে। কিন্তু মোস্ট পপুলার ফর্ম অব সুইসাইড—গলায় দড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেনি কখনও। আমার কেমন যেন মনে হয় ওর কাছে সুইসাইডটা রিচুয়ালের মতো…”

শতরূপ হঠাৎ থমকে যায়। ঠোঁট কামড়ে বলে, “রিচুয়াল!”

“তুই তো জানিস, পৃথিবীর বহু দেশে সুইসাইড রিচুয়ালস চালু আছে। সেসব থেকে ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে যদি….”

‘রিচুয়াল’ শব্দটা কিছুক্ষণ মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করে ওর। বিড়বিড় করে বলে, “যদি সত্যিই জিনিসটা রিচুয়াল হয় তাহলে সেই রিচুয়ালটা কোন ধর্মস্থানে করা হয়ে থাকে। এবং ধর্মস্থান বলতে….

“ওই মন্দিরটা তো? ওখানে আগেও গেছি আমি। কিন্তু ওখানে আদৌ কিছু আছে বলে মনে হয় না।”

“মন্দিরের একটা গর্ভগৃহে একবার আটকে পড়েছিল ও। সেখানে নাকি দেখতে পেয়েছিল কাকে। তা ছাড়া মন্দিরে গিয়ে ‘নয়’ সংখ্যাটার কথা মনে পড়ছিল ওর। মনে হয়, তখনও ওর চেতনাটা পুরোপুরি আসেনি। সংখ্যাটার সঙ্গে মন্দিরের কিছু একটা যোগাযোগ আছে…” আচমকা নীহারিকার দিকে ফেরে শতরূপ— “তই একটা কাজ করতে পারবি? অন্তত একটা রাতের জন্য ওকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হবে…”

নীহারিকা একটু ঘাবড়ে যায়, তারপর বলে, “সেটা এমন কোনও বড় কথা নয়। রাতে সিডেটিভ দিয়ে দিলেই সকাল অবধি ঘুমিয়ে থাকবে। কিন্তু ওকে ঘুম পাড়িয়ে তুই করবিটা কী?”

“ওই মন্দিরটায় যাব একবার, আজ রাতে….”

“মন্দিরে! খেপেছিস নাকি? শরীরের এই অবস্থা নিয়ে।”

“দেরি করা উচিত হবে না। আমার মনে হয়, বিনির কল্পনাগুলোর একটা বড় অংশ লুকিয়ে আছে ওই মন্দিরে।”

শতরূপের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। নীহারিকা বোঝে তাকে নিরস্ত করা অসম্ভব— “বেশ। তুই যাবি, তাতে আপত্তি করব না। কিন্তু তুই একা যেতে পারবি না। আমি যাব তোর সঙ্গে…”

*

টর্চটা মন্দিরের ভাঙা দেয়ালের উপর গিয়ে পড়তেই একটা অদ্ভুত গা-ছমছমে ভাব ঘিরে ধরল শতরূপকে। আগের দিন ঐন্দ্রিলা সঙ্গে ছিল বলে এতটা ভয় করছিল না ওর। আজ কীসের একটা ভয় ঘিরে ধরল ওকে। পায়ের ব্যথাটা এখনও পুরোপুরি সারেনি।

মনের ভেতর থেকে কে বলে উঠল এই জায়গাটায় ওর আসার কথা নয়। নীহারিকার মুখের দিকে একবার দেখল। ওর মনে কী চলছে কে জানে?

আকাশে চাঁদের আলো আছে আজ। ঝিমঝিমে হাওয়া বইছে জঙ্গলের ভেতরটায়। চাতালে দাঁড়িয়ে গর্ভগৃহটাকে অন্ধকূপের মতো দেখাচ্ছে।

নীহারিকা সাবধানে হেঁটে শতরূপের দিকে এগিয়ে এল, একটু হেসে বলল, “কখনও ভেবেছিলাম, এত বছর পর রাতে নর্থ বেঙ্গলের জঙ্গলে পোড়ো মন্দিরে হামলা করব তোর সঙ্গে?”

দুজনে হেঁটে এগিয়ে যায় সামনে। শতরূপ বলে, “ভূতপ্রেতে তো বিশেষ আগ্রহ ছিল না তোর…”

“তাতে কী? তোর গল্পগুলো শুনতাম প্রথমদিকে। তারপর… বিবাহিত মানুষের জ্বালা তুই আর কী বুঝবি? কাকিমা বলত…” কথা থামিয়ে অন্য এ প্রসঙ্গে চলে যায় নীহারিকা, “কাকিমার কথা খুব মনে পড়ে, জানিস? তোর বাড়িতে গেলেই আমাকে ডেকে যা রান্না হয়েছে তা-ই খাওয়াত। মাঝে মাঝে আবার তোকে দিয়ে পাঠিয়ে দিত আমাদের বাড়িতে। একবার মায়ের সঙ্গে খুব রাগারাগি হয়েছিল। বাড়িতে খাইনি। তুই যখন বাড়িতে ছিলিস না, কাকিমা ডেকে সারাদিন বুঝিয়ে সুঝিয়ে রেখেছিল আমাকে….”

“জানি ভাই, আমার মা আমার চেয়ে তোকে অনেক বেশি ভালোবাসত।”

“আজ্ঞে না, তোর থেকে আমার ভালোবাসা বোঝার ক্ষমতা বেশি ছিল…” নিজের মনেই যেন বলতে থাকে নীহারিকা।

শতরূপ বড় করে শ্বাস নেয়, “এই পাঁচ বছরে একটা কথা ভীষণ মনে হত। এত ভালো বন্ধুত্বটা কেমন হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল, না? তোর থেকে ছশো টাকা পেতাম আমি। সেটা একদিন দিলি, তারপর থেকে আমাকে অ্যাভয়েড করা শুরু করলি। আমার ফোনটা পর্যন্ত রিসিভ করতিস না। জীবনের এতগুলো সময় কাটালাম একটা মানুষের সঙ্গে, এতগুলো গল্পের চরিত্র ছিলাম আমরা। ভালোমতো কান্নাকাটি করে, চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করে সব কিছু শেষ হত… তা না করে….”

“যাদের যাওয়ার আগে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি হয়, কান্নাকাটি হয়, তাদের যাওয়া হয় না। যারা চিরকালের মতো চলে যায়, তারা এরকম পাংশু মুখে চলে যায়…” কথাটা বলে গর্ভগৃহের সামনে এসে দাঁড়ায় নীহারিকা— “মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি এইসব কিছু না ঘটত, যদি কাকু-কাকিমা সেই সময় মারা না যেত, যদি আজও মন খারাপ হলে তোর বাড়ির ছাদে ওই শতরঞ্চিটার উপর গিয়ে শুয়ে পড়তে পারতাম…”

“তাহলে এখানে এই মন্দিরে আসা হত না, ঐন্দ্রিলাকে চিনতাম না। তা ছাড়া…”

“তা ছাড়া কী?”

“আমাদের সবার মনের ভেতরে ওরকম একটা ফাঁকা শতরঞ্চি আছে। যেখানে কারও শুয়ে থাকার কথা ছিল, কিন্তু কেউ শোবে না। যাদের সেখানে থাকার কথা, তারা অন্য কোথাও জ্যোৎস্না মাখবে। ঠিক যেমন এই মন্দিরটা কারা তৈরি করেছিল কেউ জানে না… মনে হয় এখনও যেন কারও পূজা পাওয়ার অপেক্ষা করে আছে…”

আজ হালকা মেঘ আছে আকাশে। মেঘ ফুঁড়ে রুপালি আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে জঙ্গলটা।

ছোট একটা সিঁড়ি নেমে গেছে গর্ভগৃহের ভেতর। টর্চের আলোয় ধীরে ধীরে সেটার উপরে নেমে আসে ওরা দুজন। ভেতরটা খুব একটা বড় নয়। বেশির ভাগটাই ঝুল আর ধুলোতে ভরে আছে। ভালো করে লক্ষ করলে ঘরের একদিকের কোণে পুরোনো বেদির চিহ্ন দেখা যায়। একটা ইঁদুরজাতীয় প্রাণী আরাম করে শুয়ে ছিল সেটার উপর। টর্চের আলো পড়তেই বিরক্ত হয়ে সরে পড়ল সে।

“আচ্ছা ধর, যদি আমরাও আটকা পড়ে যাই এখানে?” নীহারিকা গলায় রহস্য এনে জিজ্ঞেস করে।

“আমার মনে হয় না ও নিজে আদৌ আটকা পড়েছিল এখানে। ওটা সম্ভবত অভিনয়।”

“কিন্তু কেন?”

শতরূপ আলো ঘুরিয়ে চারদিকটা দেখতে থাকে, “বিনি যেসব জিনিসে ভয় পায়, সেগুলোর প্রতি ওর একটা বিশেষ আচরণ আছে। মন্দিরটা নিয়ে ভয়ের বদলে আগ্রহ আছে মনে হয়। এখানে কিছু দেখার অভিনয়টা করেছিল অন্য কারও এখানে আসা আটকাতে।”

“কেউ এখানে এলে ওর কী ক্ষতি?”

“ক্ষতি কিছু নেই। কিন্তু মন্দিরে ভগবান আছে বলে ও যদি বিশ্বাস করে থাকে তাহলে হুটহাট লোকজন সেই ভগবানের বেদিতে এসে তাকে বিরক্ত করে গেলে ওর অস্বস্তি হবে বই-কি। আমার কৌতূহল হচ্ছে ওই নয় সংখ্যাটা নিয়ে…”

হাত দিয়ে সামনের ঝুল সরিয়ে দেওয়ালটা দেখার চেষ্টা করল নীহারিকা— “এখানে আদৌ নয়-টয় বলে তো কিছু দেখছি না। নয় দিয়ে কী বোঝাতে চাইল বিনি? ন-টা দেবতা? ঘড়ির নয়ের কাঁটা?”

“উহ… চুপ কর। একটু দেখতে দে…”

দেওয়ালটা ভালো করে দেখে শতরূপ। নানারকম সিমেন্ট-খসা দাগ আর সময়ের আঁকিবুকি আছে তার উপর। বেদির ঠিক পেছনের দেওয়ালের উপর চোখ রাখে। সেদিকে ঝুঁকে পড়ে বলে, “এখানে কিছু একটা আঁকা আছে…”

শতরূপের থেকে টর্চটা নিয়ে আলোটা সেদিকে করে ঝুঁকে পড়ে নীহারিকা। মন দিয়ে খেয়াল করে দ্যাখে, সত্যি দেওয়ালের আঁকিবুকির জটাজালের মধ্যে ছোট একটা ছবি আঁকা আছে সেখানে। এতই ছোট আর ক্ষীণ যে ভালো করে লক্ষ না করলে মনেই হবে না আদৌ কিছু আঁকা আছে বলে।

নীহারিকা বিড়বিড় করে, “একটা লোক মনে হচ্ছে। নাকটা যেভাবে খোদাই করা হয়েছে, তাতে আঁকার স্টাইলটা…..”

“মায়ান এম্পায়ারে দেবতাদের এভাবে আঁকা হত।” নিচুস্বরেই বলে শতরূপ।

“কিন্তু এই খোদাইটা তো ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে করা হয়েছে…. খুব একটা পুরোনো বলে মনে হচ্ছে না…”

“হুম… কোনও মায়ান দেবতাকে আঁকতে চেয়েছে কেউ। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। দেবতার গলায় কিছু একটা বাঁধা আছে, দেখতে পাচ্ছিস?”

ভালো করে দ্যাখে নীহারিকা— “একটা দড়ি মনে হচ্ছে। উপর থেকে সাপের মতো…. ওঃ! লোকটা গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে…

শতরূপের পা কেঁপে ওঠে। এই শীতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে ওর, “ইক্সট্যাব। মায়ান গড অব সুইসাইড!”

“মায়ান গড অব সুইসাইড! কিন্তু সে এখানে কী করে… আর সব থেকে বড় কথা, এর সঙ্গে নয়-এর কী সম্পর্ক!”

ওর দিকে ফেরে শতরূপ— “সম্পর্কটা বানানের। ইক্সট্যাবের বানানটা খেয়াল কর। আই-এক্স, টি-এ-বি। দেবতার নামের প্রথম দুটো অক্ষর রোমান নিউমারিক্যালে ‘নাইন’। ঐন্দ্রিলার বিক্ষিপ্ত মনে গোটাটা গুলিয়ে গিয়ে…”

“কিন্তু এই দেবতার সঙ্গে ঐন্দ্রিলা…”

“শশশশ…” ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নীহারিকাকে থামিয়ে দেয় শতরূপ। একটা আঙুল উঠে আসে গর্ভগৃহের দরজার দিকে— “কে যেন ডাকছে আমাদের শুনতে পাচ্ছিস?”

ভালো করে শোনে নীহারিকা। একটা খসখসে আওয়াজ আসছে বটে, কিন্তু… চিনতে পারে নীহারিকা। হাতির পাল বেরিয়েছে। মন্দিরের দিকেই আসছে।

“কেউ ডাকছে না রূপ, ওটা…” কথা শেষ হওয়ার আগেই অবাক হয়ে নীহারিকা চেয়ে দ্যাখে, শতরূপ বাইরের সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে। মুখে বিড়বিড় করে চলেছে, “ওই দেখ, দাঁড়িয়ে আছে বাইরে, ডাকছে আমাকে…”

“কে ডাকছে?” নীহারিকা চিৎকার করে ওঠে।

“ওই যে… রূপ। ও ডাকছে আমাকে…. ওই তো দেখতে পাচ্ছিস না ওর মুখে….

নীহারিকা প্রমাদ গোনে। আবার হ্যালুসিনেট করতে শুরু করেছে শতরূপ। সিঁড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে কার দিকে এগিয়ে চলেছে ও… নাকি কারও সঙ্গে…

“রূপ! ওদিকে যাস না…” বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে নীহারিকা, “হাতির পাল আসছে ওদিকে…”

“আমি সব ভুলে গিয়েছিলাম রে… আমাদের একসঙ্গে চলে যাওয়ার কথা ছিল। রূপ বারবার ডাকছিল আমাকে। আমি সব ভুলে গিয়েছিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস রূপ…” চিৎকার করে কথাগুলো বলতে বলতে উন্মত্ত হাতির পালের দিকে হাঁটতে থাকে শতরূপ।

নীহারিকা কী করবে, বুঝতে পারে না। রূপকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *