(পরিশিষ্ট)
পাঁচটা বছর কেটে গেছে। বহু খোঁজখবর করার পরেও শতরূপ ঘোষ কিংবা ঐন্দ্রিলা দত্ত, কারও কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। আশিস দত্ত এখনও মেয়ের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দেহ উদ্ধার হয়নি বলে এখনও তাদের মৃত বলে ঘোষণা করা যায়নি। জঙ্গলের ভেতরে সত্যি এমন কোনও কটেজ আছে কি না, তাতে শহর থেকে পালিয়ে আসা এক হতাশাগ্রস্ত আরজে এবং এক সুইসাইডাল তরুণী একসঙ্গে থাকে কি না, তা-ও জানা যাচ্ছে না। হয়তো মরেই গেছে তারা। খাদ থেকে ঝাঁপিয়ে, কোনও বন্য পশুর কামড়ে কিংবা জঙ্গলেরই কোনও গাছে একসঙ্গে গলায় দড়ি দিয়েছে। কে বলতে পারে? তাদের গল্প আর কেউ জানে না… তবে হ্যাঁ, একজনের খুব খোঁজ চলছে এখন। ডক্টর নীহারিকা বসু। রয়াল সোসাইটির কনফারেন্স হলে একগাদা স্যুট-টাই-পরা লোক জড়ো হয়েছে। তারা হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে ডক্টর বসুকে। আজ এখানেই সাইকোথেরাপি নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেওয়ার কথা আছে। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ তাঁর দেখা নেই! ডক্টর নীহারিকা বসু সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন। সেমি-ফিকশন। তাঁর নিজের আন্ডারে থাকা একটি বিচিত্র কেসের বিবরণ, সঙ্গে কিছুটা কল্পনার রং মিশিয়ে লেখা। কল্পনাপ্রবণতা এবং চাইল্ডহুড ট্রমা একসঙ্গে মিলে যে মানুষের সাবকনশাসকে কোন অন্ধকারে টেনে নিয়ে যেতে পারে তা নিয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে সেখানে। প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছে বইটা। কেউ কেউ বিশ্বাস করছেন, কেউ আবার বিষয়বস্তু শুনেই ফুৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছে… বইটা লেখার পর থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হতে শুরু করে ডক্টর বসুর। হাজব্যান্ডের সঙ্গেও ডিভোর্স হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যেই নাকি বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় চলে যান তিনি। আবার ফিরে আসেন। কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলেন না। কিন্তু এবার ডক্টর বসু গেলেন কোথায়? অযাচিত খ্যাতির ঢেউ কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলল তাঁকে?
*
খাদের ধারে অন্ধকার নামছে ধীরে। এ জায়গাটায় বড় বড় ঘাস গজিয়েছে এখন। বেঞ্চটা ভেঙে পড়ে গেছে বহুকাল আগে। প্রজাপতিগুলোও কোথায় উধাও হয়েছে। কুটিল আদিম অরণ্য শাখা বিস্তার করে এই পাহাড়ি জায়গাটার দখল নিয়েছে।
হঠাৎ নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। কে এসে দাঁড়ায় খাদের ধারে। প্রায় মাঝবয়সি এক মহিলা। তাঁর জামাকাপড় বিধ্বস্ত। চুল উশকোখুশকো। সমস্ত শরীরটাকে ক্লান্তি গ্রাস করেছে। চোখের কোণে ভরাট কালি। হাতে একটা ব্রিফকেস। সেটা ছুড়ে ফেলে দেন পাশে। মাটির আঘাতে সেটা খুলে গিয়ে ভেতর থেকে কিছু টাইপ-করা কাগজ বেরিয়ে আসে।
খাদের গভীরে একটানা চেয়ে থাকেন ডক্টর নীহারিকা বসু। মুখে পাগলের মতো কী যেন বিড়বিড় করেন। তারপর একটা পা বাড়িয়ে দেন খাদের ভেতর…
“বলছি ও ম্যাডাম, আপনার কোনও হেল্প লাগবে?”
পেছন থেকে একটা ডাক ভেসে এসেছে। গলার স্বরটা চেনা লাগে না ডক্টর বসুর। শুধু অন্ধকারের মধ্যেও একটা কাচের জার ভেদ করে আসা সবজে আলো ছড়িয়ে পড়ে জায়গাটায়….
***
