(প্রথম অধ্যায়)
“হ্যাঁ, এখানে সই করে দিন, নাম আর টেলিফোন নম্বর… আর পারপাসটা…”
মুখ তুলে তাকায় শতরূপ, “আপনাদের এখানে লোকে জেনারেলি কীরকম পারপাসে আসে?”
“কেউ ঘুত্তে, কেউ ছবি তুলতে… ছেলেছোকরারা মাঝেমধ্যে ওই চুম্মাচাটি করতেও আসে…” লোকটা দাঁতের ফাঁকে হেসে চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দেয়। শতরূপ খসখস করে কিছু লিখে পেনটা নামিয়ে রাখে টেবিলের উপর। বড় করে একটা শ্বাস নেয়। তারপর ঢুকে আসে ভিতরের দিকে।
বাইরে থেকে এখনও বড়রাস্তার হইচই, হর্ন আর ছুটে-যাওয়া গাড়ির শব্দ আসছে। এর মাঝে এই সারি সারি সমাধির স্তূপ ভারী বেমানান। যেন সেমেট্রিটাকে লন্ডনের পুরোনো রাস্তার ধার থেকে তুলে এনে এই ব্যস্ত কলকাতার বুকে ফেলে দিয়েছে কেউ। অথচ সত্যিটা হল, কলকাতা শহরটাই গুটিগুটি পায়ে ঘিরে ধরেছে সেমেট্রিটাকে। খচমচ করে হেঁটে লম্বা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসে শতরূপ। কী মনে হতে পকেট থেকে বের করে চিরকুটটা দেখে নেয় একবার। স্পষ্ট গোটা গোটা অক্ষরে তাতে লেখা আছে—
“মোটা টাকা রোজগার আছে! কাল বিকেল চারটে, সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রি।”
এমন বেয়াড়া অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আগে পায়নি শতরূপ। বইমেলায় কাগজটা হাতে পেয়ে কিছুক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আশপাশে তখন অচেনা মানুষের ভিড়ভাট্টা। ঘ্যানঘেনে স্বামী-স্ত্রী-র অ্যানিভার্সারি পালনের মতো আনকোরা পাত্তা না-পাওয়া লেখকদের এই একটা রগরগে দিন। বইমেলার বিকেল। মাঝেমধ্যে দু-একজন অল্পবয়সি পাঠক ওকে চিনতে পেরে এসে হাত মিলিয়ে যাচ্ছে।
“দাদা, ইয়ে…. একটা সেলফি….”
কেউ কেউ মোবাইল বাগিয়ে ছবি তুলে নিয়ে একবার মুখের দিকে হাসিমুখে চেয়ে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। হাত মেলানোর ফাঁকেই কেউ হাতে গুঁজে দিয়েছে কাগজটা। কখন যে দিয়েছে, সেটা নিজেই বুঝতে পারেনি।
আজও থতোমতো খেয়েই চারপাশে মুখ ফেরায়। ঘড়ির কাঁটা একটু আগেই চারটের ঘর পেরিয়ে গেছে। ও চেয়ে দেখল, সেমেট্রির ভেতরেটা এখন প্রায় খালি হয়ে এসেছে। শেষ প্রান্তের ফাঁকা জায়গাটায় বসে কিছু অল্পবয়সি কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়ে সিগারেট নইলে গাঁজা ফুঁকছে। সঙ্গে ব্লু-টুথ স্পিকারে গান চলছে মৃদুস্বরে, And you run – and you run to catch up with the sun but it’s sinking. কেউ আবার কোনও সমাধির সঙ্গে লেপটে ছবি তুলছে বেঁকেচুরে।
নিজের উপরেই রাগ হল শতরূপের। কে একটা এসে ওর হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিল আর ও সেই কাগজকে বেদবাক্য মনে করে ঠেঙিয়ে এতদূর চলে এল।
শীতের দুপুরের নরম রোদ ধীরে ধীরে মিলিয়ে আসছে। খসখসে পাতার উপর দিয়ে হাঁটলে মনে হয়, পেছনে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। বারবার পেছনে ফিরে তাকায় শতরূপ। কিছুক্ষণ সেভাবেই ঘুরেফিরে শেষে ক্লান্ত হয়ে কবরস্থানেরই মাঝামাঝি একটা সিমেন্টের বেঞ্চে এসে বসে পড়ে। বেঞ্চটা প্রায় ভেঙে পড়েছে। উঁচু স্তম্ভ আর গাছপালার মধ্যে এমন করে ঢাকা পড়ে আছে বেঞ্চটা, যে সেটার অস্তিত্ব বাইরে থেকে বোঝা যায় না। কতকটা সেই কারণেই হয়তো বহুদিন কেউ এসে বসে না এখানে।
“দাদা, ওই দেখুন, আপনার পেছনে সায়েব ভূত…” একটা বেয়াড়া ছোকরা দাঁত বের করে শতরূপের দিকে চেয়ে কথাটা বলতে বলতে পার হয়ে গেল।
“ভাগ, আবাল শালা…” চাপাস্বরে খিস্তি করে সরে আসে শতরূপ।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভাঙা বেঞ্চের উপরে বসেই বড় করে নিশ্বাস নিয়ে একটা সিগারেট ধরায়।
কিছুক্ষণ পরে ওর পেছনে পাতার উপর খসখসে পায়ের আওয়াজ শোনা যায়, “মিস্টার ঘোষ, এখানে ধূমপান নিষেধ কিন্তু…”
পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে মেয় শতরূপ। একটা বছর পঞ্চাশেকের লোক এসে দাঁড়িয়েছে ওর ঠিক পেছনে। হাসিমুখে চেয়ে আছে ওর মুখের দিকে। লোকটার গায়ে দামি শার্টের উপরে ব্র্যান্ডেড কোট। মুখে দাড়িগোঁফের লেশমাত্র নেই। একঝলক দেখেই বোঝা যায় লোকটা হয় কর্পোরেট হঞ্চো, নয় দুদে ব্যবসায়ী। এই ভাঙাচোরা কবরস্থানে ভীষণ বেমানান।
সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে শতরূপ বলে, “এখানে যারা শুয়ে আছে, তাদের মেজরিটিই আপনার-আমার বাপ-ঠাকুরদাকে নিগার-টিগার বলে খিস্তি করত, ওদের এত সম্মান না দিলেও চলবে…”
“নট টু দেম, বাট দেয়ার মেমোরিজ। মানুষ মরে গেলে তার পাপ-টাপ সব ধুয়ে যায়, অল দ্যাট রিমেইনস ইজ…” শতরূপের পাশে এসে বসে পড়ে লোকটা— “তাদের স্মৃতি…. তাদের গল্প…”
শতরূপ কী যেন বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই লোকটা ওর কথা কেড়ে নেয়, “ভারী অদ্ভুত ব্যাপার না, কত গল্প অজানা থেকে যায়। এই সেমেট্রিতে আমাদের চারপাশে কত হাজার গল্প লক্ড হয়ে পড়ে আছে, শত চেষ্টা করেও আর কোনওদিন…” হাত বাড়িয়ে শতরূপের মুখ থেকে সিগারেটটা নিয়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে দেয় লোকটা, “লেট’স রেসপেক্ট দেয়ার স্টোরিজ, হুম?”
“আপনার দাবিটা কী বলুন তো?” একটু রেগেই জিজ্ঞেস করে শতরূপ। এ লোকটা, বা এরই কোনও স্যাঙাত যে কাল একফাঁকে ওর হাতে চিরকুটটা গুঁজে দিয়েছিল, সেটা এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে ও।
লোকটা মুচকি হাসে—“সেটা তো লেখাই ছিল। আমার কাছে একটা পার্ট টাইম জব আছে আপনার জন্য।”
“বেশ, সেটা স্বাভাবিকভাবেও বলা যেত। খামোখা এখানে টেনে আনলেন কেন?”
লোকটা একটা হাত তুলে ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে বলে, “ইউ সি, আমি ব্যবসায়ী লোক। সকাল থেকে রাত অবধি ডেবিট-ক্রেডিট, মার্কেটিং, প্রোমোশন, কাস্টমার স্যাটিসফ্যাকশন, হেনাতেনা এইসবের মধ্যে দিন কাটে আমার। এখন ভেবে দেখুন, এই টোটাল শহরটা আমাদের মতো খচ্চর লোকেদের খপ্পরে চলে গেছে। আপনি দামি রেস্টরেন্টে ডেটে যান, সেখানেও কেউ লাভের কড়ি গোনে, বন্ধুদের নিয়ে মাঠে বসে মাল খান, সেখানেও মদের দোকানের লাভ থাকে, কর্পোরেট মিটিং-এর কথা তো ছেড়েই দিন। এখন চেয়ে দেখুন, এখানে পান-বিড়ির দোকান নেই, খাবারের দোকান নেই, চানাচুরওয়ালা ঘণ্টী নেড়ে যাচ্ছে না, ভিখারি এসে হাত পাতছে না। আপনি যে এখানে এসে বসে আছেন, সেটা এক আপনি ছাড়া আর কেউ জানে না। কলকাতা শহরে একটা এমন পাবলিক প্লেস দেখান দেখি…”
শতরূপ কপাল থেকে ঘাম মোছে। লোকটার কথাবার্তা কেমন অগোছালো গোছের। মাথাতেও সামান্য ছিট আছে কি?
“আপনার কাজটা কী?” সে গম্ভীর গলায় বলে।
“সেটাও খানিকটা কারণ, বুঝলেন? এখানে না এলে আপনাকে কাজটা আমি ঠিক খোলসা করে বোঝাতে পারতাম না।”
“মানে?”
লোকটা কয়েক সেকেন্ড ঠোঁটের উপরে হাত দিয়ে বসে থাকে, কী যেন ভেবে নিয়ে আচমকাই বলে ওঠে, “আমরা কলেজে পড়ার সময় খুব আসতাম এখানে। তখন ছোকরা বয়স। একটা খেলা খেলতাম, জানেন?”
“খেলা? এখানে?”
“ইয়েস। বন্ধুদের মধ্যে যে-কোনও একজনের চোখে কালো কাপড় বেঁধে দেওয়া হত। তারপর তাকে একটা কবরের সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হত। কবরটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে তাকে গেস করতে হত, কবরের নীচে শুয়ে-থাকা মানুষটা কত বছর বয়সে মারা গেছে…”
“যাঃ শাল্লা! চোখ বাঁধা থাকলে গেস করবে কী করে? হেডস্টোন ছুঁয়ে মরা সাহেবের বয়স আন্দাজ করা যায় নাকি?”
“যায় না!” অবাক হয় লোকটা — “যেখানে একটা মানুষ মারা যায়, যেখানে তাকে কবর দেওয়া হয়, সেখানে একটা বিষণ্নতার মেঘ ঘিরে থাকে না? একটা আশি-পার-করা বুড়োর কবর আর একটা বারো বছরের শিশুর কবরে একই বিষণ্ণতা থাকবে বলে মনে হয় আপনার?”
“বিষণ্ণতার মেঘ!” চওড়া হাসি ফোটে শতরূপের মুখে, “শালা সূর্যের তাপে ওজোন লেয়ারটা অবধি ফুটো হয়ে যাচ্ছে আর আপনি বলছেন, দুশো বছর আগের কবরের পাশে বিষণ্ণতার মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে! এসব ফালতু ফ্যাচফ্যাচ রেখে দরকারটা বলুন দেখি….”
লোকটা নিজের দু-পায়ের থাইয়ের উপরে আলতো হাত ঘষে— “আপনি লেখক মানুষ, ঘোষবাবু, প্লাস স্টোরিটেলার। আপনাকে গল্প বলতে হবে। ব্যাস…
“গল্প বলব! কাকে?”
“আমার মেয়েকে…. ‘
“ধুর মড়া।” আর-একটা সিগারেট ধরিয়েছিল শতরূপ, এবার নিজেই সেটা মাটির উপরে ছুড়ে ফেলে উঠে পড়ে— “বালের ন্যানি পেয়েছেন নাকি আমাকে?”
লোকটা কিছু বলে না। তার চোখ মাটির দিকে স্থির। যেন শতরূপের আচরণটা দেখতেই পাননি তিনি।
“ভরদুপুরে ছেনালি করতে ইচ্ছা হয়েছে তো হাড়কাটা গলি যান না, শালা বেকার আমার আজকের দিনটা মাটি করে দিলেন…”
“কী কাজ ছিল আজ আপনার?” ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করে লোকটা।
“সেটা আপনি জেনে কী করবেন?”
ব্যঙ্গের হাসি হাসে লোকটা—“গত ছ-মাস হল আপনার কোনও কাজ নেই। নতুন কিছু লেখা শুরু করেননি। দুটো মিডিয়া রাইটস কোম্পানি কনট্র্যাক্ট দেবে বলেছিল, সেই আশাতে বসে আছেন। তাদের রিপ্রেজেন্টেটিভকে রোজ ফোন করে আপডেট চান, কয়েকটা জায়গায় অডিশন দিয়েছেন। অবশ্য…”
“এ শালা, আপনি এসব জানলেন কী করে?” শতরূপ হিংস্র শ্বাপদের মতো এগিয়ে যায় তার দিকে।
“আমার কোম্পানির গ্রস টার্নওভার ফরটি-টু সিআর, মিস্টার ঘোষ। ব্যাকগ্রাউন্ড চেক না করে আমি জব অফার করি না…”
পকেট থেকে একটা চেক বের করে পাশে ফেলে দেয় লোকটা— “আপনি যদি রাজি থাকেন, ডিজিটগুলো বলবেন?”
“হাউ ডেয়ার ইউ…” এবার লোকটার প্রায় টুটি টিপে ধরতে যায় শতরূপ— “আপনি জানেন, আমি কত বড় চাকরিকে লাথি মেরে এসেছি? আপনার মতো মাওড়াদের পোঁদ-চাটা কর্পোরেটদের সাহস কী করে হয় আমাকে এসব আলফাল জব অফার করার…”
লোকটা থতোমতো খেয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, শতরূপ তার আগেই খিঁচিয়ে ওঠে, “শুনুন, আপনার ওই ব্ল্যাংক চেক আপনি আপাতত নিজের পশ্চাতে গুঁজে রাখুন, দেখবেন, দু-দিন পরে আপনার কর্পোরেট বস কোন ফাঁকে যেন টিপসই দিয়ে গেছে। তখন ভাঙিয়ে নেবেন, কেমন?”
“আমার কোনও বস নেই, আমিই আমার কোম্পানির…”
কপাল থেকে ঘাম মুছে মুখ ফিরিয়ে উলটোদিকে হাঁটতে যাচ্ছিল ও। পেছন থেকে একটা শান্ত গলা শোনা যায়, “আমার মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে মিস্টার ঘোষ। আপনি ছাড়া কাজটা আর কেউ পারবে না।”
কী যেন একটা পালটে গেছে লোকটার গলায়। কেঁপে গেল কি একবার? শতরূপ ঘুরে তাকায়। লোকটার চোখ ছলছল করছে।
“বাঁচাব মানে? কোনও রোগ হয়েছে? তো ডাক্তারের কাছে যান…”
চশমাটা খুলে চোখ দুটো একবার রগড়ে নেয় লোকটা। শতরূপ গিয়ে তার পাশে বসে। লোকটার দিকে তাকিয়ে মায়াই লাগে তার। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করে না।
“আজ থেকে এক মাস আগে অবধি আমি বিনির সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারতাম না। মনে হত, একটা মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ঠিক এখানে, এই কবরগুলোর মধ্যে দাঁড়ালে যেমন মনে হয়…”
“কী হয়েছে ওর?”
“গত এক বছরে চারবার সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছে। আমি জানি, আবার করবে। শেষবার ছাদ থেকে ঝাঁপ মেরেছিল। উপর থেকে নীচে পড়ে মাথায় চোট লাগে…”
“কিন্তু কেন?”
বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ে হাঁটতে থাকে লোকটা, বোধহয় নিজের মুখ দেখাতে চাইছেন না বলেই, “ওর জীবন অনেকটা ঘেঁটে আছে, মিস্টার ঘোষ… টু মেনি চাইল্ডহুড ট্রমা। সেগুলোই এখনও হার্ট করে চলেছে ওকে কোনওভাবে… সমস্ত ব্যাপারটা আমার কাছেও ক্লিয়ার নয়, শুধু… ও কিছুতেই বাঁচতে চায় না…”
“সাইকায়াট্রিস্ট দেখাননি?”
“দেখিয়েছি। ফল হয়নি কিছু। ছোটবেলায় একজন দেখত। বছর তিনেক আগে থেকে অন্য একজন দেখছেন। এক-একজন এক-একটা রোগের নাম বলেছে। ট্রিটমেন্ট চলেছে। কিন্তু সুযোগ পেলেই…
শতরূপ মাথা নামিয়ে নেয়। হঠাৎ করেই যেন বিকেল ঘন হয়ে এসেছে। বাইরে যানবাহনের চিৎকার অনেকটা কমে এসেছে। ঝিঁঝির ডাক আর খসখসে পাতার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
“কিন্তু আমি কী করতে পারি এতে?”
লোকটা এবার সটান ফিরে তাকায় শতরূপের দিকে, “যে কাজটা আপনি পারেন… গল্প বলতে হবে আপনাকে…”
“কীসের গল্প?”
“শেষবার সুইসাইড অ্যাটেম্পট করার পর ওর মাথায় চোট লাগে। সিভিয়ার ব্রেন ইনজুরি। বেশির ভাগ স্মৃতিই নষ্ট হয়ে গেছে। আপনাকে গল্প বলে ওর স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে….”
“আপনার মেয়ের সব স্মৃতি চলে গেছে যখন তাহলে তো ভালোই। চাইল্ডহুড ট্রমাগুলো মনে না পড়লেই হল….”
গলায় একটা বিচিত্র শব্দ করে লোকটা, আর বড় করে দম নিয়ে বলে, “দ্যাট’স দ্য পয়েন্ট, মিস্টার ঘোষ। ও এখন একটা ব্ল্যাংক স্লেটের মতো। ওর অতীত আপনি যেমন করে আঁকবেন, ঠিক তেমনটাই আঁকা হবে। আমি শুধু চাই, ছবিগুলো রংচঙে হোক। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের যেমন হয়…
চিন্তায় পড়ে শতরূপ। লোকটা যা দাবি করছে, তার খানিকটা ও বুঝতে পেরেছে, কিছুটা এখনও ধোঁয়াশা।
“কিন্তু আমি যা বলব, ও বিশ্বাস করবে কেন?”
“বললাম না, শি ইজ লাইক আ ব্ল্যাংক পিস অব পেপার। আপনি ওর ছোটবেলার বন্ধু। লুক, আপনাকে বেশি কিছু করতে হবে না। আপনি শুধু ওর লাইফের স্টোরিগুলো জেনে সেগুলো নিজের ইচ্ছামতো বদলে দেবেন। যে ছবিগুলো ডার্ক আর গ্রে কালারে আছে, সেগুলোতে প্যালেটের যে-কোনও ব্রাইট কালার লাগিয়ে দেবেন… আপনি লেখক কাম স্টোরিটেলার, ফলে কাজটা এমন কিছু ডিফিকাল্ট হবে না আপনার কাছে….”
পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটতে থাকে শতরূপ, একসময় প্রশ্ন করে, “কিন্তু আসল গল্পগুলো আমি জানব কেমন করে?”
“আমার মেয়ে ডায়েরি লিখত ছোট থেকে। সেসব ডায়েরি আমি দেব আপনাকে। আপনি সেগুলো পড়বেন আর গল্পের মতো করে শোনাবেন ওকে…”
“কিন্তু লাভ কী হবে এতে?”
লোকটা মৃদু হাসে-”দেখুন, ইভেনচুয়ালি ওর পাস্ট মেমোরিজ ও রিকভার করবে। সো উই শুগার কোট ইট। আপনার চিন্তার কিছু নেই, আমার কাছে টাকাপয়সা কিংবা মেশিনারির অভাব নেই। আপনার কাজ কেবল গল্প বলা, বাকি আমি সামলে নেব। বুঝতেই পারছেন, ওর পাস্ট ওকে বারবার সুইসাইডের দিকে ঠেলে দেয়। আমি চাই না সেটা ও ডিসকভার করুক….”
“তা-ই যদি হয় তাহলে অতীতের গল্প বলে কী লাভ?” শতরূপ অবাক চোখে তাকায় লোকটার মুখে।
“আমাদের গল্প ছাড়া আর কী আছে, মিস্টার ঘোষ? আমরা কোন পথে যাব, কী করব—সব ঠিক করে দেয় আমাদের অতীতের গল্প। আমার মেয়ের মাথার মধ্যে গল্প বুনে দেবেন আপনি… ছোটবেলায় আমরা উত্তর দেখে অঙ্ক মেলাতাম, মনে আছে? আপনিও জানেন উত্তরটা, আমার মেয়েকে যে করেই হোক বাঁচাতে হবে আপনাকে, খুশি রাখতে হবে…”
“মানে মিথ্যে বলতে হবে?”
“উঁহু, মিথ্যে নয়, গল্প… ওর জীবনের গল্পগুলোকে বদলে দেবেন আপনি, যতটা প্রয়োজন, যতটা আপনার মনে হয়… ভেবে নিন, এক ফার্স্ট ক্লাস পাবলিশার আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছে এমন একটা গল্প লেখার, যার শেষে হ্যাপি এন্ডিং থাকবেই। বাকি গল্প আপনি ছকে ফেলুন, আমি মাথা ঘামাতে যাব না…”
সিমেন্টের রাস্তার জায়গায় জায়গায় শ্যাওলা জমে আছে। কোথাও বা স্থির চোখে উঁকি মেরে আছে কাঠবেড়ালি। এক জায়গায় বেদি ভেঙে শত বছরের পুরোনো পাথর এগিয়ে রয়েছে রাস্তার উপরেই। এগুলো এতক্ষণ দৃষ্টি কাড়ছিল শতরূপের। এবার আর খেয়াল হচ্ছে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে এবার মুখ খোলে সে, “কিন্তু এসব কাজের জন্য আমি কেন…”
“লেখার পাশাপাশি বছরখানেক আগে অবধি একটা রেডিয়ো শো হোস্ট করতেন আপনি, স্টোরিটেলিং শো। যদিও আচমকাই কোনও আননোন কারণে সেই শো বন্ধ হয়ে যায়। গাড়িতে বসে আপনার একটা এপিসোড শুনছিলাম। গলার মধ্যে একটা ন্যাচারাল জয়ফুলনেস আছে….”
শতরূপ হাসে— “গলা চেঞ্জ করা যায়, টোন চেঞ্জ করা যায়, ইট’স অল পার্ট অব দি অ্যাক্ট… টাকার জন্য ওসব…”
“সে যা-ই হোক, আমার মনে হয়েছে, এই কাজের জন্য আপনার থেকে উপযুক্ত লোক আর হয় না। ভেবে দ্যাখো ভাই…” হঠাৎ করেই লোকটার গলার আওয়াজ বদলে যায়, “তুমি টাকার জন্য আগে যা করতে, আজও টাকার জন্যেই তা-ই করবে। কেবল আজ একটা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারবে তুমি। হ্যাঁ, তোমার অডিয়েন্স হবে কেবল একজন। তার জন্য…”
দলা-পাকানো চেকটা আবার এগিয়ে দেয় লোকটা। ও ইতস্তত করে সেটা হাতে নেয়, “তবে আমাকে দিয়ে কাজ হবে, তার গ্যারান্টি আমি দিতে পারছি না….
“গ্যারান্টি আমি চাইছিও না…”
চেকের উপর সদ্য লেখা মোটা অঙ্কটা খুঁটিয়ে দেখতে থাকে শতরূপ— “আপনার মেয়ে এখন আছে কোথায়?”
“নর্থ বেঙ্গলে তিনচুলেতে আমাদের আদি বাড়ি…”
“সে তো হিল স্টেশন! যদিও যাওয়া হয়নি কখনও….”
“বিনি ওখানেই মানুষ। ওখানকার স্কুলেই পড়াশোনা করেছে এতদিন। কয়েক বছর হল ডাক্তার মুখার্জি ওকে ও বাড়িতে রাখতে বারণ করেছে। ফলে আপাতত বাড়ির কাছেই একটা কটেজে রেখেছি। কটেজটাও আমাদেরই। তিনজন লোক আছে ওকে দেখাশোনা করার জন্য। ইউ উইল বি দ্য ফোর্থ ওয়ান।”
“নেহাত বাপের অত টাকা ছিল না, নইলে একটা কটেজ আর তিনজন আয়ার জন্য আমিও বারকয়েক সুইসাইড করেই নিতাম…” ব্যঙ্গের স্বরে বলে শতরূপ।
ভদ্রলোক কথাটায় খুব একটা পাত্তা দিল না, গম্ভীর স্বরে বলল, “ভালো কথা, ডায়েরিগুলোর কথা কিন্তু ওর মনে নেই। সেগুলো যে তোমার কাছে আছে, ওকে বলার দরকার নেই….”
“তাহলে এসব আমি জানছি কী করে?”
“ওই যে বললাম তুমি ওর ছোটবেলার বন্ধু। এক বাড়িতেই মানুষ হয়েছ। ওর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে শুনে এক সপ্তাহখানেকের জন্য থাকতে এসেছ কটেজে, ব্যাস।”
বেশ কিছুটা হেঁটে এসেছে ওরা। সেমেট্রির গেটের কাছে আসতে শতরূপের খেয়াল হয়, কয়েকটা জঙ্গুলে মশা কামড়ে দিয়েছে ওর সমস্ত হাতে। ফুলে গেছে জায়গাগুলো। সেখানে হাত বুলোতে থাকে ও।
লোকটা একটা কার্ড বের করে ওর দিকে এগিয়ে দেয়— “আমার ফোন নম্বর দেওয়া আছে এতে। বাড়ি গিয়ে একটু ভাবনাচিন্তা করো। কী সিদ্ধান্ত নাও, আমাকে জানিয়ে….”
কার্ডের উপরে বেশ বড় অক্ষরে লেখা—আশিসকুমার দত্ত। পাশে একটা হাউজিং কোম্পানির নাম। ওনার অ্যান্ড সিইও।
মনের ভিতরে চিন্তাগুলো দ্রুত উলটে-পালটে নেয় শতরূপ। কাজটা কঠিন কিছু নয়। খানিকটা উপন্যাস লেখার মতোই। কেবল তফাত হল যে উপন্যাসটা সে লিখবে, সেটা কেউ সত্যি বলে বিশ্বাস করবে। কারও জীবনের গল্প লিখবে সে। নিজের ইচ্ছামতো কারও অতীত সাজাতে পারবে। উঁহু, মন্দ নয়।
“বেশ, আমি এক সপ্তা সময় দিতেই পারি…”
শতরূপের পিঠে হাত রেখে একটা চাপড় মারে লোকটা— “ওখানে পৌঁছে থেকে তোমার সমস্ত খরচের দায়িত্ব আমার। অল অ্যাই নিড ইজ আ হ্যাপি ডটার…”
“একটা প্রশ্ন ছিল কেবল।” শতরূপ একটু ইতস্তত করে বলে, “হোয়াট অ্যাবাউট হার মাদার? আমি যতদূর জানি, এই ধরনের মানসিক সমস্যায় মায়ের একটা মেজর ভূমিকা থাকে। তিনি…”
আশিসবাবুর মাথা ঝুঁকে আছে। শ্বাস ভারী হয় তার— “ওর মা-বাবা কেউ ওর সঙ্গে থাকে না… দে লিভ অ্যাব্রড। বিনি আমার নিজের মেয়ে নয়। আমার দাদার মেয়ে। ওর যখন তেরো বছর বয়স, তখন থেকে আমার কাছে থাকে। নাও সি ইজ টোয়েন্টি ফাইভ।”
“আপনার কাছে থাকে কেন?”
“কোর্ট অর্ডার। ওর বাবা-মা ওর কাস্টডি নিতে পারবে না।”
“কেন?”
আশিস দত্ত একটু থমকে যায়। কোটের দুটো দিক টেনে এনে বুকের উপর ফেলেন, তারপর একটু থেমে বলে, “ওই তেরো বছর বয়সে, আই মিন টু থাউজ্যান্ড নাইনে ওর বাবা-মা ওকে বিষ দিয়ে খুন করার চেষ্টা করে। ব্যাপারটা জানাজানি হতে কেলেঙ্কারি হয়। পুলিশ রিপোর্ট হয়। তখন জানা যায়, সে চেষ্টা সেই প্রথম ছিল না। বাপ-মা-কে পুলিশ নিয়ে টানাটানি করে। কিছুদিন পরে ছাড়াও পেয়ে যায়, তবে মেয়ের কাস্টডি পায় না আর। আমি ওর লিগাল গার্জেন হই…”
“বিষ দিয়ে খুন করার চেষ্টা! নিজের মেয়েকে?” শতরূপ অবাক হয়ে তাকায় লোকটার দিকে— “ওর বাপ-মা পাগল নাকি?”
“দে হ্যাড দেয়ার রিজনস…”
“কীসের রিজন?”
“তোমার কাজ ওর বাবা-মা-কে নিয়ে নয়। ইভন আমি সাজেস্ট করব ওর প্যারেন্টসের ব্যাপারে বেশি কথা ওকে না বলতে। থিংস ক্যান গো রং দ্যাট ওয়ে…”
সেমেট্রি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে দুজনে। একটা ডার্ক-ব্লু রঙের সিডান এসে দাঁড়ায় খানিকটা দূরে। এই কবরস্থানের ভাঙা ইট, কাঠ আর পুরোনো গাছেদের ভিড় ঠেলে বেরিয়ে আসা ঝাঁ-চকচকে চেহারার লোকটাকে ভারী বেমানান দেখায়।
আশিস দত্ত হাত দিয়ে ইশারা করে শতরূপকে, “এসো, ছেড়ে দিই তোমাকে…”
গাড়ির ভিতরে উঠে বসে শতরূপ। কলকাতার গরম, ফুটপাথে শুয়ে থাকা নোংরা ভিখারি, পান আর কোল্ড ড্রিংকের দোকান ফেলে ওর আশপাশের জগৎটা দ্রুত ঠান্ডা, আরামদায়ক হতে থাকে। কপাল বেয়ে নেমে আসা নোনতা ঘাম ভুরু ছোঁবার আগে কপালেই মিলিয়ে যায়।
ওর ঠিক পাশেই উঠে এসে বসে আশিস দত্ত। ড্রাইভারের দিকে না তাকিয়েই বলে, “ওকে একটু বাগবাজারের কাছে নামিয়ে দিয়ো তাজু…” শতরূপ মন দিয়ে বাইরে তাকিয়ে পার্ক স্ট্রিটের দোকানগুলোর ভিতরে কী যেন খোঁজার চেষ্টা করছিল। আশিস দত্ত সেদিকে তাকিয়ে বললেন, “বাইরে কী এত দেখছ বলো তো?”
“এই শহরটা…” শতরূপ সেদিকে তাকিয়ে জবাব দেয়, “সপ্তাখানেক দেখতে পাব না তো…”
“কেন? এমন কী আছে কলকাতায়?”
“কিচ্ছু নেই,” কাঁধ ঝাঁকায় শতরূপ, “আপনার নর্থ বেঙ্গলের মতো বড় বড় গাছপালা নেই, জঙ্গল নেই, বৃষ্টিতে ভেজা বিরাট ফাঁকা রাস্তা নেই, সন্ধের ঠান্ডা বাতাস নেই, শহরের বুক ফুঁড়ে বয়ে যাওয়া নীলচে একচিলতে নদী নেই…”
“তাহলে?”
শতরূপ হাসে— “আসলে আমরা, আই মিন, এ শহরের মানুষগুলোর ভিতরেও তেমন আহামরি কিছু নেই। রাজনীতি আছে, দুর্নীতি আছে, ঘুস খাওয়া আছে, আলসেমো আছে, কিপটেমো আছে। আমরা স্কুলে লাস্ট বেঞ্চে বসা দুটো ওঁচা স্টুডেন্টের মতো…. নেই নেই মিলে গিয়ে বেশ একটা কমফোর্ট জোন তৈরি হয়ে যায়। একজনকে হঠাৎ করে ফার্স্ট বেঞ্চে গিয়ে বসতে হলে একটু অস্বস্তি হবে বই-কি…”
আশিস দত্ত আর কথা বাড়ায় না। চড়া এসি-র হাওয়ায় এতক্ষণে তার মুখটা আরও ফরসা আর চকচকে দেখাচ্ছে। চশমাটা যেন চামড়ার সঙ্গে গেঁথে গেছে। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কাজটা যতটা ভাবছ, ততটা সহজ হবে না। বিনিকে দেখলেই বুঝতে পারবে। ভীষণ চাপা স্বভাবের, মারাত্মক জেদি। ওকে কিছু বোঝাতে গেলে ও তোমাকে উলটোটা বুঝিয়ে ছেড়ে দেবে। যেভাবে মানুষকে ইনফ্লুয়েন্স করতে পারে, তাতে মধ্যযুগে জন্মালে একটা ধর্মগুরু-টর্মগুরু কিছু হয়ে যেত…”
“যাক, তা-ও বিষ দিয়ে মারার একটা ভ্যালিড কারণ পাওয়া গেল, এই পৃথিবীর অর্ধেক বাওয়াল ধর্মগুরুদের ছোটবেলায় মেরে দিলেই মিটে যেত…”
একটু ইতস্তত করে আশিস দত্ত, না বলতে গিয়েও যেন বলে ফেলে কথাটা, “আর-একটা কথা তোমায় বলে রাখা ভালো। ওর সামনে থাকলে একটা ব্যাপার খেয়াল রেখো…”
“কী ব্যাপার?”
“বিনি কোনও অছিলায় যেন তোমার চোখের দিকে একটানা বেশিক্ষণ তাকিয়ে না থাকে…”
“সে আবার কী! কেন?”
“ওর সাইকায়াট্রিস্ট দুজনই বলেছিলেন, ওর চোখে একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে। হিপ্নোটিক পাওয়ারস। যদিও সেটা কতটা কাজ করে জানি না। তা-ও মুহূর্তের দুর্বলতায় তোমার পেট থেকে কোনও কথা বের করে ফেললে মুশকিল হবে….”
শতরূপ মনে মনে বিড়বিড় করে, “ইনফ্লুয়েন্সার উইথ হিপ্নোটিক পাওয়ারস, সুইসাইডাল… আপনার গল্পের যা ক্যারেকটার, তাতে হ্যাপি এন্ডিং আনা বেজায় মুশকিল দেখছি, আশিসবাবু…”
লোকটা একটা নরম হাসি হাসে-”তোমারও তো পাওয়ারস কম নয়। দেখতে-শুনতে ভালো, দেন ভালো গল্প বলতে পারো। বিনিকে ছোট থেকে শান্ত রাখার ওই এক উপায় ছিল, জানো? ভালো করে গল্প বলতে পারলেই বিনি একেবারে জল। তা ছাড়া…” বাকি কথাটা একরকম যেন ঝোঁকের মাথাতেই বলেন আশিস দত্ত, “আই থিংক, তোমার মধ্যে একটা পজিটিভ ভাইভস আছে, ইউ নো…”
“পজিটিভ ভাইভস!” শতরূপ হাসে। তারপর মুখ ফিরিয়ে নেয়।
*
ফ্ল্যাটে ঢুকে ঠেলে দরজাটা বন্ধ করে দেয় শতরূপ। শার্টটা খুলে ছুড়ে ফেলে দেয় আলনার উপরে। সমস্ত ঘরের পরিবেশের সঙ্গে এবড়োখেবড়ো হয়ে পড়ে থাকা জামাটা মানিয়েও যায়। কোথাও দড়ি থেকে পুরোনো গামছা ঝুলছে, কোথাও মাটির উপরে বাসন উলটে পড়ে আছে। একপাশে একটা ছোট অ্যাটাচ্ড কিচেন, তাতে অজস্র ঝুলকালির দাগ। এ ঘরে বহুদিন কোনও অতিথি আসেনি। শতরূপেরও ঘরটা গোছানোর প্রয়োজন মনে হয়নি কখনও।
অগোছালো বিছানার উপরে বসে পড়ে শতরূপ। বড় করে কয়েকটা নিশ্বাস নেয়। পকেট থেকে বের করে আনা চেকটার উপরে একবার চোখ বুলিয়ে বিছানার চাদরের নীচে ঢুকিয়ে রাখে সেটা। তারপর এলিয়ে পড়ে বিছানার উপরে।
কিছুক্ষণ একটানা তাকিয়ে থাকে সিলিং-এর দিকে। একটা বিরক্তিকর গানের সুর ভেসে আসছে—
‘সমুন্দর মে নহাকে অউর ভি নমকিন হো গয়ি হো’
পাশের ফ্ল্যাটের লোকগুলো সারাদিন আর ডি বর্মনের গান শোনে। ওদের ছোট ছেলেটা প্রথম দিন চিনতে পেরেছিল শতরূপকে। লিফটে ওঠার মুখে ওকে দেখতে পেয়ে ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করেছিল, “আচ্ছা, আপনি আরজে রূপ না?”
শতরূপ মাথা নেড়ে মিষ্টি করে হেসেছিল। এ হাসিটা পথেঘাটে কেউ ওকে চিনতে পারলে তার জন্য তোলা থাকে। ছেলেটাকে পছন্দ করে না শতরূপ, এই শহরের আরও বাকি লোকগুলোর মতোই।
কিছুক্ষণ সেভাবেই শুয়ে থেকে শতরূপ উঠে পড়ে। ততক্ষণে গানের সুরে বদলে এসেছে—
‘পহলে থি বেহতর অব তো
বেহতরিন হো গয়ি হো’
এ ঘরের লাগোয়া দরজা খুলে ছোট একটা ঘরে ঢুকে আসে সে। মাত্র আট-ফুট বাই আট-ফুটের ঘর। মনে হয়, ঠাকুরঘর গোছের কিছু একটা হিসেবে বানানো হয়েছিল।
উলটোদিকের দেওয়ালে একটা খোলা জানলা, তার উপরে ছোট একটা ঘড়ি। এ ঘরে পাখা নেই বলে ঘড়ির কাঁটার খচখচ আওয়াজটা স্পষ্ট শোনা যায়।
ঘরের সিলিং-এর মাঝখান থেকে ঝুলছে একটা দড়ি। তার ডগায় ফাঁস লাগানো। রোজ ঝোলে ওই দড়িটা। শতরূপ রোজ এসে দাঁড়ায় দড়িটার সামনে। রোজকার মতো আজও টুলের উপর উঠে গলায় নেয় দড়িটা। চোখ বুজে কী যেন ভাবে….
নিস্পন্দ মুহূর্ত কাটতে থাকে। ঘড়ির কাঁটার শব্দে কোনও বদল আসে না। জানলা দিয়ে আসা মৃদু হাওয়ায় ওর পিঠে জমা ঘাম শুকিয়ে যায়। শতরূপের পা টুলের উপর কেঁপে ওঠে। কী যেন একটা মাপছে সে। নিজের গোটা জীবনটা চোখের সামনে এনে লাভক্ষতির হিসেব করছে এঁদে ব্যবসায়ীর মতো।
কয়েক সেকেন্ড পরে সে নেমে আসে। টুলটা সরিয়ে রেখে মেঝের উপরেই চিত হয়ে শুয়ে পড়ে।
ওর বুকের সোজাসুজি উপরে দুলতে থাকে দড়িটা। উপরে চোখ তুলে দ্যাখে, জানলা দিয়ে বাইরের অনেকটা আকাশ দেখা যাচ্ছে। নক্ষত্রের খেলা চলছে সেখানে এখন। আলোর রোশনাই জ্বলছে। আকাশ আর ঝুলন্ত দড়ি—দুটোই ডাকছে ওকে। ও কী যেন খুঁজতে থাকে আকাশে। নাঃ, দেখা যাচ্ছে না….
হঠাৎ ওর মনে হয়, দড়িটাও ওই আকাশেরই অংশ নয় তো? ওই যে আকাশ থেকে আসা মৃদু হাওয়াটা ঢেউ খেলাচ্ছে দড়িতে। যে আঙুলের মতো ইশারায় দড়িটা টানছে ওকে, সে ইশারাটা ওই আকাশ থেকেই আসছে না তো?
চোখ বুজে ফ্যালে শতরূপ। দড়িটা আর আকাশটা থেকে যাবে চিরকাল। নিজে থেকে কোথাও চলে যেতে পারে না ওরা।
ওর বুকের উপরে পুরোনো নির্জীব দড়িটা দুলতে থাকে… দুলতে থাকে…
*
“তো তার ছেলেবেলাটা কেমন ছিল?”
“কার?”
“সেই সুখী রাজকন্যার?”
“সুখী ছিল…”
“ধুর….” বিনি বিরক্ত হয়, “এমন দায়সারা করে লিখলে একটাও বই বিক্রি হবে না।”
শতরূপ হাসে, থুতনিতে হাত রেখে বলে, “দায়সারা না হলে আমাদের কোনও অনুভূতির কোনও নামই থাকত না।”
“মানে!”
“মানে সুখ, দুঃখ, আনন্দ, যন্ত্রণা—এগুলো উপর থেকে দেখলেই চেনা যায়। তুই যদি মাইক্রোস্কোপের তলায় ফেলে দেখিস, দেখবি, অনেক কিছু মিলে একটা বিচিত্র অচেনা রূপ নিয়েছে। তখন সমস্তটা গুলিয়ে যাবে….
হঠাৎ হাত বাড়িয়ে শতরূপের একটা চোখ চেপে ধরে বিনি। শতরূপ ঘাবড়ে যায়, “এঃ, এ কী করছিস!”
“মাইক্রোস্কোপে দেখছিস তো, তাই একটা চোখ চেপে ধরলাম। বল, এবার কী দেখতে পাচ্ছিস?”
ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবে শতরূপ— “তোর বাবা-মা খুব ভালোবাসত তোকে… একমাত্র মেয়ে কিনা… বড়লোকের মেয়ে…. ছোট থেকে কোনও কিছুর অভাব হয়নি…”
“আর বন্ধুবান্ধব?”
“তা-ও ছিল ছেলেবেলায়। তবে তাদের সঙ্গে কী যেন কারণে খুব ঝামেলা হয়। এই দাঁড়া দাঁড়া…. একজনকে দেখতে পাচ্ছি, তোর বেস্ট ফ্রেন্ড…”
“তুই নিজে…”
“উহু, নাম মৃণালিনী… তোর খুব ইচ্ছা হত তাকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু পারতিস না…”
“কেন পারতাম না?”
শতরূপ ঠোঁট ওলটায়, “তা ঠিক বুঝতে পারছি না, তবে শেষে গিয়ে একদিন পেরেছিলিস… সেদিন খুব খুশি হয়েছিলি তুই…”
ওর চোখ থেকে হাত সরিয়ে নেয় বিনি। ওর মুখে ছায়া নামে। শতরূপ জিজ্ঞেস করে, “কী হল তোর?”
“কেউ ছোটবেলায় ছিল আর এখন নেই মানে কখন তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, তা-ই না?”
“এতে মন খারাপ হল তোর?”
“হবে না?”
শতরূপ ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়— “উঁহু, কখনও থাকা আর না-থাকার মাঝখানে ছাড়াছাড়িটা থাকে না। তখন হতে পারে মন খারাপ। কেউ বলে-কয়ে অনুষ্ঠান করে চলে গেলে অত মন খারাপ হয় না আমাদের…”
“কী আজব ব্যাপার বল তো, মন খারাপ হয়েছিল কি না তা-ও ভুলে গেছি… আচ্ছা, আর কে কে ছেড়ে গিয়েছিল আমাকে?”
“তা তো জানি না, কে যায়নি, সেটা বলতে পারি…”
“কে?”
“আমি।”
বিনি খুশি হয় এবার— “যাক, তোর সঙ্গে কখনও পার্মানেন্ট ছাড়াছাড়ি হয়নি তার মানে আমার…”
বিনি এবার হাত দিয়ে নিজের একটা চোখ ঢেকে নেয়, তারপর আবার ভুরু কুঁচকে বলে, “হুম… এই যে মাইক্রোস্কোপেও একটা খাঁটি সুখ দেখতে পাচ্ছি, কী বল?”
