(ত্রয়োদশ অধ্যায়)
ফোনের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল শতরূপের। জানলা দিয়ে আসা আলো চোখে পড়ছে। অর্থাৎ সকাল হয়েছে। কাল রাতের কথা আবছা মনে পড়ল। ঘুম-চোখে হাত বাড়িয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে লাগাতে ওপাশ থেকে একটা পরিচিত গলা শোনা গেল, “হ্যালো রূপ, আমার মনে হয় তোমার এবার কলকাতা ফিরে আসা উচিত। তোমার টাকাপয়সা যা বাকি আছে, এখানে এলেই পেয়ে যাবে….”
প্রস্তাবটা শুনে একটু থতোমতো খেল রূপ। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। অবিন্যস্ত চুলগুলো হাত দিয়ে ঠেলে দিল মাথার উপরে, “কিন্তু আপনার সঙ্গে তো আরও কয়েকদিনের কথা হয়েছিল।”
“হ্যাঁ, সে হয়েছিল আমিও জানি। কিন্তু মিসেস গাঙ্গুলির মুখে শুনলাম, ঐন্দ্রিলা নাকি অনেকটা ইমপ্রুভ করেছে। এখন সারাদিন হাসিখুশি থাকছে…” একটু থেমে আবার যোগ করলেন আশিস দত্ত, “তা ছাড়া উনি বলছিলেন….
“কী বলছিলেন?”
“আজ সকালে ফোন করে বললেন, ওর বদলে তোমার নাকি কিছু মানসিক সমস্যা হচ্ছে। আমি তো প্রথমে বিশ্বাস করছিলাম না। তারপর বললেন কাল রাতে…”
“দেখুন, উনি আপনাকে কী বলেছেন, আমি জানি না। ওটা আমার পার্সনাল প্রবলেম…”
“তা হতে পারে। কিন্তু তোমার আবার কিছু একটা ক্ষতি হয়ে গেলে তার দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে। আগেই বলেছিলাম ঐন্দ্রিলা ভারী সুবিধের মেয়ে নয়। শি হ্যাজ আ নেগেটিভ ইনফ্লুয়েন্স অন পিল। তুমি ভাই এক কাজ করো… যত তাড়াতাড়ি হয় কলকাতা চলে এসো। তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি…”
“আপনি বুঝতে পারছেন না…” বিরক্ত হয় শতরূপ। তার গলা অসহায় শোনায়, “ঐন্দ্রিলা ওপর ওপর এমন একটা ভাব করছে, যে কেউ বুঝতে পারছে না ওর ভেতরে কী চলছে। আমার মনে হচ্ছে, ওর অতীতের কিছু কথা মনে পড়ছে। ঠিক কী মনে পড়েছে তা বুঝতে পারছি না। ও কাউকে ব্যাপারটা জানতে দিতে চায় না। এমনকি আমাকেও নয়।”
“ওর কী মনে পড়েছে-না পড়েছে, আই ডোন্ট কেয়ার। যেটুকু নিজের অতীত সম্পর্কে জেনেছে, তাতে ও খুশি আছে, এটা আমার জন্য এনাফ। তুমি আর নতুন করে কিছু করতে যেয়ো না। যদি সত্যি আগের ঘটনা মনে পড়তে শুরু করে তাহলে তুমি ওখানে থাকলে নতুন করে একটা ক্ল্যাশ হতে পারে… তুমি যত তাড়াতাড়ি হয় এখানে চলে এসো।”
কিছুক্ষণ ফোনটা কানে রেখে চুপ করে বসে থাকে শতরূপ। তারপর মুখ তুলে বলে, “আচ্ছা বেশ। আমি আজ রাতে ভেবে কিছু একটা আপনাকে জানাচ্ছি।”
ফোন রেখে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে সে। তারপর উঠে জামাটা গায়ে গলিয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। প্যাসেজের বাঁদিকে একেবারে শেষ প্রান্তে নয়নতারা গাছটার উপর রোদ এসে পড়েছে। দেখে বোঝা যায়, একটু আগেই কেউ জল দিয়ে পাতা ছেঁটে দিয়ে গেছে। অর্থাৎ ঐন্দ্রিলা উঠে পড়েছে সকালে।
কাল রাতের কথা এতক্ষণে স্পষ্ট মনে পড়ে তার। কী একটা যেন হয়ে গিয়েছিল কাল। কে যেন ডাকছিল বারবার ওকে। দু-হাতে চোখ রগড়ে বাইরে এসে প্যাসেজে বিনয়কে দেখতে পেল সে। গলা তুলে জিজ্ঞেস করল, “মিসেস গাঙ্গুলি চলে গেছেন নাকি?”
বিনয় হনহন করে নীচে নামতে যাচ্ছিল, ওকে দেখে একটু উঠে এসে বলল, “হ্যাঁ, আজ সকালে একবার আপনার ঘরে এসেছিলেন। আপনি ঘুমোচ্ছেন দেখে চলে গেলেন। বললেন আবার দরকার পড়লে ফোন করতে।”
শতরূপ নিজের গালে একবার হাত বুলোয়। এই ক-দিনে দাড়িটা বেড়ে উঠেছে। কাটার কথা খেয়াল থাকে না ওর। আবার ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল, বিনয় নিজেই আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, “আমাকে বলে গেলেন দু-একটা দিন আপনার উপর নজর রাখতে। আপনি নাকি চলে যাবেন এখান থেকে?”
শতরূপ কাঁধ ঝাঁকায়, “কী জানি, যেতেও পারি।” তারপর ওর কাঁধে একটা হাত রেখে বলে, “কলকাতা ছেড়ে বেশি দিন থাকতে ভালো লাগে না, জানো?”
“কে কে আছে আপনার কলকাতায়?”
শতরূপ হাসে, তারপর ওর কাঁধে হাত রেখেই হাঁটতে হাঁটতে বলে, “কলকাতায় আর কী থাকবে? একটা নদী আছে, একটা কবরস্থান আছে, একটা পুরোনো স্কুল আছে, আর কিছু লম্বা লম্বা রাস্তা আছে….”
“একটা স্কুল কেন দাদা? কলকাতায় তো অনেক স্কুল আছে।” শতরূপের গলাটা একটু ভাবুক শোনায়, “জানো বিনয়, এই স্কুল জিনিসটা ভারী অদ্ভুত। স্কুল বিল্ডিংটা ছেড়ে এসেছি প্রায় বছর পনেরো হতে চলল অথচ আজও যে-কোনও স্কুলের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হয় এইটাই বুঝি আমার স্কুল। এর ভেতরের ক্লাসরুমগুলোতেই আমিই বসতাম। ওর ভেতরেই আমার শৈশবটা পড়ে আছে…”
“আপনার স্কুলে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে?”
শতরূপ ঠোঁট ওলটায়, কী যেন মনে পড়ে তার। অল্প হেসে বলে, একবার স্কুল থেকে পিকনিকে গিয়েছিলাম, বুঝলে? কল্যাণীর কাছে একটা পার্কে। তো সেই পার্কটায় গাছপালার ফাঁকে একটা ডাইনোসর লুকিয়ে ছিল। আমরা তখন ছোট। জানতামই না ওখানে কিছু আছে বলে। হুট করে তাগড়া একটা ডাইনোসর দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম সবাই।
“তিনটে বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল আমার। তিন বন্ধু মিলে স্কুল ড্রেস পরে সেই রাস্তার উপর দিয়ে হাঁটছিলাম। আমাদের গায়ে নেভি ব্লু সোয়েটার। জলের ধারে শুকনো পাতা পড়ে… কত কী গল্প করছিলাম, হাঁটতে হাঁটতে কখনও পাশে পুকুর পড়ছিল…. তার উপর ইট ছুড়ে ব্যাঙ নাচাচ্ছিলাম… তারপর আর কখনও যাওয়া হয়নি জানো ওখানটায়… এখন মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানো?”
“কী?”
“আমরা সেদিন তিনজন নয়, চারজন ছিলাম। আমাদের ক্লাসের আরও একটা ছেলে পিকনিকে গিয়েছিল আমাদের সঙ্গে। সে ফিরে আসার বাসে উঠতে পারেনি। সে চিরকাল ওই পার্কেই থেকে যাবে… কেবল তিনটে ছেলেকে বয়ে নিয়ে রাস্তাটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আর ওখানে গেলে খুঁজে পাব না রাস্তাটাকে। ওই ডাইনোসরটা বোধহয় আর চিনতে পারবে না আমাদের… সে কেবল ওই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে চেনে। কী লাভ বলো তো ফিরে গিয়ে?”
বিনয় কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল। এমন সময় জংলুকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখা গেল। হন্তদন্ত হয়ে এদিকেই আসছিল সে। শতরূপকে দেখতে পেয়ে বলল, “স্যার, দিদি বলেছিল ঘুম থেকে উঠলে আপনাকে নীচে ডেকে দিতে।”
“কেন?”
“কোথায় নাকি নিয়ে যাবে আপনাকে। নীচে দাঁড়িয়ে আছে। চলে আসুন….”
মিনিটখানেক পর নীচে এসে শতরূপ দ্যাখে, বাইরের বারান্দার একটা চেয়ারে বসে আছে ঐন্দ্রিলা। মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। ওর ফরসা মুখে সোনালি রোদ এসে পড়েছে। গোলাপি আভা খেলা করছে শরীর জুড়ে। হালকা সেজেছে কী মেয়েটা?
ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ায় শতরূপ। ঐন্দ্রিলা ওর দিকে না চেয়েই বলে, “আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হল যে? কাল রাতে একটু বেশি ঘুম হয়েছে নাকি? আমি জ্বালানোর জন্য ছিলাম না।”
“তুইও তো উঠিসনি ঘুম থেকে।”
“তা-ই নাকি! কে বলেছে?” অভিমানী চোখে তাকায় ঐন্দ্রিলা – “উঠেছিলাম মাঝরাতে। তোর ঘরে গিয়ে দেখলাম, ঘুমোচ্ছিস। তাই আর ডাকলাম না।”
একটু খটকা লাগে শতরূপের। কী যেন ভেবে তার মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে, “উঠেছিলি যখন, ডাকলি না কেন?”
ঐন্দ্রিলার রোদ-মাখা মুখে একটা অভিমান-ফোড়া হাসি ঝিলিক দিয়ে যায়— “মাঝে মাঝে এমন একটা রাত আসে জানিস, কোনও ঘুমন্ত মানুষকে ডাকতে ইচ্ছা করে না। কেবল একা একা গোটা রাতটার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। এই জানিস, কাল মনে হয়, একটা ধূমকেতু দেখলাম।”
“ধূমকেতু! ধুর। তারা খসতে দেখেছিস….”
ঐন্দ্রিলার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়— “যাহ্, আগে জানলে কিছু একটা চেয়ে নিতাম। তুই কেন ছিলি না বল তো?”
শতরূপ ওর পাশের চেয়ারে বসে পড়ে, “জানলে কী চাইতিস?”
“চাইতাম, আর কখনও কোনও তারা যেন না খসে…”
“সে কী! তাহলে আর কারও ইচ্ছাই পূরণ হত না।”
আকাশের দিকে চায় ঐন্দ্রিলা, ওর মুখে একটা অচেনা হাসির রেখা ফুটে ওঠে, “তারা খসলে কারও ইচ্ছাপূরণ হয় না। ওসব ছেলে-ভোলানো গল্প উলটে কেউ তার ইচ্ছাপূরণ হবে বলে আশা করে থাকে। সেটা আর পূরণ হয় না… তা ছাড়া…”
“কী?”
“তারা খসলে আকাশ থেকে একটু আলো কমে যায়…”
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে শতরূপ। আড়মোড়া ভাঙে। আড়চোখে একবার তাকায় ঐন্দ্রিলার মুখের দিকে, তারপর ইতস্তত গলায় বলে, “দু-একদিনের মধ্যে এখান থেকে চলে যেতে হবে মনে হয়…”
ঐন্দ্রিলা উপর-নীচে ঘাড় নাড়ে। তারপর বলে, “জানি। মিসেস গাঙ্গুলি বলছিলেন।”
গুনগুন করে কী একটা সুর ভাঁজছে ঐন্দ্রিলা। ওর ফিনফিনে আঙুলগুলো খেলে বেড়াচ্ছে টেবিলের উপরে। মাঝে মাঝে হাওয়ায় উড়ে কয়েক গোছা চুল এসে পড়ছে মুখের উপরে। সেগুলো আবার সরিয়ে রাখছে কানের পাশে। একটা অদ্ভুত কষ্ট ক্রমশ ঘিরে ধরছে শতরূপকে। একটু অপেক্ষা করে বলে, “তোর খারাপ লাগছে না?”
“খারাপ লাগবে কেন?”
“কী জানি। তোকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে না আমার।” ঐন্দ্রিলার নীচের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে, “কী আর হবে। আকাশ থেকে একটা তারা খসে যাবে। একটু আলো কমবে। ওতে কিছু যাবে আসবে না।”
“সবার আকাশে অনেক তারা থাকে না, বিনি।”
“থাকে। শুধু মেঘের আড়ালে ঢাকা থাকে বলে দেখা যায় না। একটু অপেক্ষা করলেই বেরিয়ে আসবে ওরা….”
শতরূপের চোখ জ্বলে ওঠে, কী যেন মনে করে বলে, “মাঝে মাঝে কেবল একটা তারাই দেখতে ইচ্ছা করে… এই জানিস, একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে…
“কী ঘটনা?”
শতরূপ ওর দিকে ফিরে বসে, “ছেলেবেলায় আমি তো বাবার কাছে শুতাম। তো মাঝে মাঝে বাবা রাতে বাড়ি না ফিরলে আমাকে একাই শুতে হত। এদিকে ভূতের ভয়ও করত। মা-কে গিয়ে তো আর বলতে পারি না যে ভূতের ভয় করে তাই তোমার কাছে শোব। আমি যেখানে শুতাম, তার মাথার কাছে একটা জানলা ছিল। সেটার দিকে ভয়ে তাকাতেই পারতাম না। গোটা রাত ঘরের এককোণে বালিশ রেখে তার উপর পিঠ রেখে বসে বসেই কাটিয়ে দিতাম। অপেক্ষা করতাম, কখন ভোরের আলো ফুটবে…
“কী ভিতু রে বাবা! তারপর?”
“তারপর একসময় একটা কাক ডাকত। একটাই কাক। আর ওই কাকের ডাকটাতেই আমার সব ভয় কেটে যেত। মনে হত, নাহ্, এবার শুয়ে পড়াই যায়। আর জানলাটাকে ভয় লাগবে না। ওই না-দেখা কাকটার সঙ্গে কেমন একটা বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল আমার। তুই অনেকটা সেই কাকটার মতো…”
ঐন্দ্রিলা খেপে ওঠে, “শত, তুই শেষে কাক বললি আমাকে!”
“আঃ, ঠিক কাক বলিনি….” শতরূপ কোনওরকমে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে, “আসলে….”
“দু-দিন পরে কেন, তুই আজই চলে যা… দূর হ…” অন্যদিকে ঘুরে বসে ঐন্দ্রিলা।
“তুই আমাকে চলে যেতে বললি, ঠিক আছে ভাই, মনে থাকবে… এবার ওর দিকে ঘুরে বসে ঐন্দ্রিলা–”আঃ, বাচ্চা ছেলের মতো রাগ করিস কেন বল তো?” ওর পিঠে হাত রেখে বলে, “আচ্ছা, ওঠ এখন। তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”
“কোথায়?”
“ওই যে সেদিন জিজ্ঞেস করছিলি সেই সূর্যের মধ্যে দরজা, সেই জায়গাটা কোথায়? আমার মনে পড়েছে জায়গাটা কোথায় আছে…. চল, তোকে নিয়ে যাই…”
“এখন!” কথাটা বলেই শতরূপের মনে হয়, আজ সকাল থেকেই কোথাও একটা ঘুরে আসতে ইচ্ছা করছিল ওর। উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলে, “তাহলে বিনয়কে বলি গাড়ি বের করতে?”
“ধুর। গাড়ি নিয়ে সব জায়গায় যাওয়া যায় না। তুই সাইকেল চালাতে পারিস তো?”
শতরূপের মাথা বুকের উপরে ঝুঁকে আসে— “না।”
“ঢ্যাঁড়শ কোথাকার। আচ্ছা, ক্যারিয়ারে বসবি। আয় আমার সঙ্গে।”
“কিন্তু যাবটা কোথায়?”
ঐন্দ্রিলা আর উত্তর দেয় না। একদিকের রেলিং-এর গায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা জংলুর সাইকেলটার দিকে দৌড় দেয় সে।
সাইকেলটায় উঠে বসতে একটু ভয়ই লাগল শতরূপের। ক্যারিয়ারটার অবস্থা খুব একটা ভালো না। বহুদিন হয়ে গেল সে কারও সাইকেলের পেছনে বসেনি। বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, “তুই ডাবল ক্যারি করেছিস এর আগে?”
“পুনা বসত হয়তো, যদিও সেটাকে ডাবল ক্যারি বলা যায় কি না জানি না…”
শতরূপ চুপ করে বসতে পিচের রাস্তার উপর দিয়ে প্যাল করতে লাগল ঐন্দ্রিলা। রূপের চেহারাটা বড়সড়ো। মাঝেমধ্যেই ওর মাথাটা ঐন্দ্রিলার পিঠে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে। রাস্তার উপর গাছপালার সার ঝুঁকে রয়েছে। তাদের ফাঁক দিয়ে আসা ছেঁড়া ছেঁড়া আলো ঢেউয়ের মতো সরে যাচ্ছে। ওদের শরীরের উপর দিয়ে।
“এখান থেকে তো না হয় চলে গেলি, তারপর কলকাতায় গিয়ে আবার কী করবি?”
“কী আর করব? আগে যা করতাম। কাজকর্ম, অফিস….”
“আমাকে নিয়ে যাবি না?”
“কোথায়?”
“আমিও চাকরি করব তোর মতো। কলকাতায় তো শুনেছি, অনেক মেয়ে মেসে থাকে, আমি থাকতে পারব না?”
“তুই এত বড়লোকের মেয়ে, খামোখা মেসে থাকতে যাবি কেন? কাকামশাই বলেছে, সব ঠিকঠাক চললে তোকে কলকাতায় একটা ভায়োলিন শেখানোর স্কুল খুলে দেবে… আর তা ছাড়া…”
“তা ছাড়া কী?”
কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবে শতরূপ, তারপর বলে, “কেন জানি না আমার মনে হয়, তোকে অন্য কোথাও গেলে ঠিক মানাবে না… এখানকার এই গাছপালা, সারাবছর নীল আকাশ, আর শীত-শীত আমেজ ছাড়া জানি না তোকে কেমন লাগবে…”
“এসব ভালো লাগে তোর?”
“ভীষণ।”
“তাহলে চলে যাচ্ছিস কেন?”
“এখানে আমার ঘর বলে কিছু নেই তাই। পৃথিবীতে সুন্দর জায়গার শেষ নেই, ঘর একটাই পায় মানুষ….”
“কিন্তু ঘরেও তো মানুষ থাকা চাই, কে আছে তোর ঘরে?”
শতরূপের চোখের সামনে একটা ছবি ভেসে ওঠে। একটা চারকোনা ছোট্ট ঘর, তার ছাদ থেকে ঝুলন্ত একটা দড়ি, তার সামনে গিয়ে রোজ দাঁড়ানো। বুকের ভেতর কীসের যেন নিশ্চয়তা। কখন যেন এটাই ওর ঘর হয়ে গেছে…
ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল ওরা, এমন সময় আকাশ কাঁপিয়ে ঘড়ঘড় করে। একটা আওয়াজ হতেই চমক ভাঙল। হঠাৎই হাওয়ার বেগ বেড়ে উঠেছে। উপরে তাকিয়ে দেখল, আকাশের গায়ে সেদ্ধ ডিমের কুসুমের মতো রং লেগেছে। ঝড় উঠেছে। মনে হয়, একটু পরেই আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামবে।
দু-পাশের জঙ্গলের ভেতর পড়ে-থাকা পাতা হাওয়া উড়িয়ে এনে ফেলছে রাস্তার উপরে। সেইসঙ্গে উড়ছে ধুলো। চোখ বন্ধ করে নিল শতরূপ। কখন যেন ওর মাথাটা গিয়ে আশ্রয় নিল ঐন্দ্রিলার পিঠে। হাওয়ার ধাক্কায় মাঝে মাঝে কেঁপে উঠতে লাগল সাইকেলটা। শতরূপ গলা তুলে বলল, “ঝড় উঠেছে তো?”
“তো কী হয়েছে? তুই এতটা রোগা নয় যে উড়ে যাবি….”
“সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু মাথার উপর গাছ-টাছ ভেঙে পড়লে?”
“আগেকার সব স্মৃতি ভুলে যাবি, তারপর আমি সব মনে করিয়ে দেব তোকে, এখানেই থেকে যাবি….”
হঠাৎ একটা অদ্ভুত অনুভূতি ঘিরে ধরে শতরূপকে। এই শনশনে ঝোড়ো হাওয়া, নির্জন ফাঁকা রাস্তা, অচেনা পৃথিবীতে ঐন্দ্রিলার পিঠে মাথা রেখে একরাশ নিরাপত্তা আষ্টেপৃষ্ঠে ঢেকে দেয় ওকে। যেন জীবনের যা কিছু জমাট-বাঁধা ক্ষোভ, অভিমান, চলে যাওয়া, একাকিত্ব, সব কিছুকে আগলে রেখে নিজের যন্ত্রণাক্লিষ্ট ক্লান্ত শরীরে তাকে আশ্রয় দিতে চাইছে মেয়েটা। এই প্রবল ঝড়ের মধ্যে দিয়ে ওকে নিয়ে কোনও এক অদৃশ্য প্রতিশ্রুতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
এই মুহূর্তে ঐন্দ্রিলার চোখ দুটোর দিকে দেখতে ইচ্ছা করে ওর। জানে ওই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা নিরাপদ নয়, তা-ও একটা প্রবল ডুবে যাওয়ার ইচ্ছা ওর ভেতরটাকে মাতিয়ে তোলে। শান্তিতে ওর পিঠে মুখ রাখল শতরূপ, ঝড়ের শব্দে কোনও কথাই শোনা যাচ্ছে না। সে বিড়বিড় করে বলল, “আমি কোথাও যেতে চাই না তোকে ছেড়ে… কখনও কোথাও যেতে চাই না….”
মিনিট দশেক সেভাবেই সাইকেল চালানোর পরে ওর মনে হল, সাইকেলটা একটা স্লোপের উপর দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। অর্থাৎ একটা উঁচু টিলাজাতীয় পাহাড়ে উঠছে ঐন্দ্রিলা। এদিকে এরকম ছোটখাটো পাহাড় প্রচুর আছে। মনটা ভালো হয়ে গেল ওর, এমন ঝড়ের মধ্যে জঙ্গুলে পাহাড়ে আগে ওঠেনি ও।
চারপাশে গাছপালার সার এখন আরও উঁচু হয়ে গেছে। সামনের জমি ক্রমশ উঠে গেছে উপরের দিকে। এ জায়গায় গাছপালার মাথার দিক থেকে সরু ঝুড়ি নেমে মিশেছে মাটিতে। একঝলক দেখলে মনে হয় যেন কোনও রূপকথার অরণ্যের ভেতর প্রবেশ করছে ওরা। ঝড়ের বেগে দুলন্ত গাছপালাগুলো অস্থির হয়ে কাঁপছে।
প্রায় আধ ঘণ্টা পরে একটা জায়গায় এসে তীব্র ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে থেমে গেল সাইকেলটা। শতরূপ মুখ তুলে চারপাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। ঐন্দ্রিলা সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। উড়ে আসা ধুলো বিছিয়ে আছে ওর সমস্ত শরীরে। হাত বুলিয়ে শরীর থেকে ধুলো ঝেড়ে নিল ঐন্দ্রিলা, তারপর শতরূপের দিকে তাকিয়ে বলল, “বল এবার, কেমন লাগছে জায়গাটা?”
ওদের ঠিক সামনে একটা ছোট্ট ঝিল। তার উপর দু-পাশ থেকে এগিয়ে-আসা গাছের হলদে পাতা টুপটাপ এসে পড়ছে। ঝিলের ধারে একটা কাঠের ছোট্ট বসার মতো জায়গা করা আছে। দেখে বোঝা যায় বেঞ্চটা কাঁচা হাতে তৈরি। তার উপর অনেকগুলো গাছ ভিড় করে আছে। গোটা জায়গাটা ভরে আছে রংবেরঙের জংলি গাছ আর ফুলে। একটা বিশেষ সূর্যের রঙের ফুল চোখে পড়ল। ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি উড়ছে ফুলগুলোকে ঘিরে। যেন ভরা বসন্তে সেলফিশ জায়ান্টের বাগানে এসে পড়েছে ওরা।
শতরূপ সার-বাঁধা ফুলের উপর প্রজাপতির নাচ দেখতে দেখতে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল সেদিকে। পাহাড়ের মাথায় এমন নির্জন একটা ঝিল আছে, বাইরে থেকে বোঝাই যায় না। ঝিলের এক প্রান্তে ছোট্ট একটা সাঁকো। তা দিয়ে ঝিলটাকে পারাপার করে যায়। সেই সাঁকোর রেলিং-এর উপরে বসে আছে কয়েকটা নাম-না-জানা পাখি। তাদের গায়েও বিচিত্র রং….. এবড়োখেবড়ো লালচে নুড়িপাথর দিয়ে ভরে আছে জায়গাটা
রঙের খেলায় চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল, মুখে কথা ফুটছিল না। ঐন্দ্রিলা ওর পিঠে দুটো হাত রেখে একটু ঠেলা দিয়ে বলল, “চল, গিয়ে বসি বেঞ্চটা আমিই বানিয়েছিলাম কাঠ দিয়ে, আমার আর পুনার বসার জন্য…” “তোর এত কথা সত্যি মনে পড়েছে?” ওর দিকে ফিরে প্রশ্ন করে শতরূপ।
“ওসব পরে হবে, আগে হাঁ করে না তাকিয়ে থেকে গিয়ে বসি ওটায়? তারপর বলছি সব….”
ওকে একরকম টানতে টানতে বেঞ্চটার কাছে নিয়ে আসে ঐন্দ্রিলা। তারপর নিজেও বসে পড়ে ওর পাশে। এতগুলো গাছ দিয়ে ঘেরা বলে এই জায়গাটায় ঝোড়ো হাওয়ার দাপট কম। বাকি সমস্ত জায়গাটায় শুকনো পাতা উড়ছে। গাছের পাতায় পাতায় ঘষা লেগে একটা সড়সড় আওয়াজ ভেসে আসছে। শতরূপের হাতটা নিজের কোলের উপর তুলে নেয় ঐন্দ্রিলা। তারপর মাথাটা এলিয়ে দেয় পেছনদিকে— “পুনা ছাড়া আর কাউকে এই জায়গাটা দেখাতে ইচ্ছে করেনি জানিস?”
ওদের ঠিক সামনে একটা পথ উঠে গেছে পাহাড়ের চড়াই খাদের দিকে। সেই পথের একেবারে উপরে আকাশের বুকে সূর্যের একটা প্রান্ত দেখা যাচ্ছে। একটু পরে ওই পথের শেষে জমে থাকা ঘাসের চাদরেই মুখ লুকোবে সূর্যটা।
সেদিকে চেয়ে একটা অদ্ভুত খেয়াল আসে শতরূপের। ঐন্দ্রিলা বলে, “যতক্ষণ না সূর্য ডোবে, আমার সঙ্গে বসে থাকবি এখানে? একসঙ্গে বসে সূর্য ডোবা দেখব…”
ও কোনও উত্তর দেয় না। হাওয়ার ঝাপটা ওর শরীরের ভেতর ঢুকে পড়তে থাকে। একটানা চেয়ে থাকে ঐন্দ্রিলার অস্থির চোখ দুটোর দিকে। একসময় ঠোঁট নড়ে ওঠে, “বিনি…..
“বল…”
“জানিস, একটা সময় জীবনে সব কিছু খুব মিনিংলেস লাগত। মনে হত কোনও কিছুর কোনও দাম নেই। খুব ভয় লাগত সারাদিন। রোজ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে খুব ভয় লাগত। কত লোকে জিজ্ঞেস করেছে কী দরকার, কী হলে খুশি হব সত্যিকারের? বুঝতে পারতাম না কী বলব। এখন বুঝতে পারছি, কী দরকার ছিল….”
“কী?”
“একটা সূর্যাস্ত দেখা… একটা দিন শেষ হয়ে অন্ধকার নামতে দেখা। একটা মানুষের হাত ধরে…” কথাটা শেষ করার আগেই হঠাৎ কী যেন মনে পড়ে শতরূপের। ঐন্দ্রিলার দিকে ঘুরে বসে বলে, “এই জানিস, ছোটবেলায় আমার বন্ধুরা আমায় খেলতে ডাকতে আসত। আর মা আমায় দুপুরে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দিত। আমি দুপুরে ঘুমিয়ে দেখতাম, সন্ধেবেলা ঘুম ভেঙেছে। বন্ধুরা কখন যেন ডেকে ডেকে ফিরে গেছে…. তখন খুব মন খারাপ হত… তারপর থেকে বিকেল হলেই আমার খুব ভয় লাগে… আসলে…”
“বল? আসলে কী?”
“আমি কোনওদিন বুঝতে পারিনি, বন্ধুদের সঙ্গে সূর্য ডুবতে দেখিনি বলেই ভয় লাগত আমার… আমরা একা একা রাত নামতে দেখতে চাই না…”
ঐন্দ্রিলার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয় রূপ, “আজ আর একটুও ভয় করছে না আমার… তোর এরকম ভয় করেনি কখনও?”
“করেছে, এখনও করে…”
“কী করিস তখন?”
“তোর কথা ভাবি…”
“আমি!” অবাক হয় শতরূপ, “আমাকে তো এই ক-দিন হল চিনেছিস তুই…”
“কে বলেছে তোকে?”
ভায়োলিনটা হাতে তুলে নেয় শতরূপ, ওর কোলের উপরে রেখে বলে, “এটা আর একবার বাজিয়ে শোনাবি আমাকে? শুধু আমাকে।”
“এখানে তো আর কেউ নেই। তুই তারপর গল্প বলবি আমাকে। ঠিক আছে?”
বাক্স থেকে ভায়োলিনটা বের করে সেটা কাঁধের উপর নেয় বিনি। তারপর ছড়ের আলতো স্পর্শ বোলায় তারগুলোর উপর। একটা অদ্ভুত সুর বাজতে থাকে ভায়োলিনে। সেই সুর উড়ন্ত হাওয়ার দাপটে কেটে যেতে থাকে বারবার। সুরটাকে কোথায় যেন উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায় হাওয়াটা। কোনও ফেলে-আসা পরিচিত জগতে। জঙ্গলের বিরাট গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে কারা যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকে সেই সুর… অসংখ্য মুখের সারি… প্রজাপতিগুলো ভিড় করে আসে ওদের ঘিরে। অদ্ভুত মুগ্ধতায় ভরে ওঠে শতরূপের মনটা। এই খোলা হাওয়া, নির্জন পাহাড়ি ঝিল, তার মাঝে এক অলৌকিক মানবী যেন ওর ভেতরটাকে একটা সদ্যোজাত শিশুর মতো আঁকড়ে ধরে। আবেশে ওর চোখ বন্ধ হয়ে আসে। কোথায় ভেসে যায় মনটা।
চোখ মেলে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে ঐন্দ্রিলার দিকে। ওর হাতের ছড় বারবার আঘাত করে যায় রূপের বুকের ভেতর। কী যেন মনে করাতে চায়, কোনও ভুলে-যাওয়া গল্প…
একটা সময় থেমে যায় সুরটা। ছড়টা নামিয়ে রেখে শতরূপের চোখের দিকে তাকায় ঐন্দ্রিলা, গালে একটা হাত রাখে আলতো করে— “তুই ভুলে গেছিস না সব কিছু?”
কী উষ্ণ অনুভূতি ঐন্দ্রিলার হাতে! কী ভীষণ নিরাপত্তা!
“কী ভুলে গেছি?” বোকার মতো বলে রূপ।
“যা কিছু আমাদের মনে রাখার ছিল… কেবল আমাদের দুজনের… সেই ছোটবেলার কথা….”
“আমাদের দেখা হয়েছিল ছোটবেলায়?”
“না…”
শতরূপ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায়, “তোকে কী ভীষণ চেনা লাগে আমার, অথচ…”
“আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না, শুধু একে অপরের গল্পগুলো চিনতাম…”
“তুই কী বলছিস, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না…”
হঠাৎই দু-হাতে ওকে আঁকড়ে ধরে ঐন্দ্রিলা। ওর বুকে মাথা গুঁজে দেয়। তারপর বিড়বিড় করে বলে, “এর থেকে ভালো সময় আর আমাদের জীবনে আসবে না, রূপ। চল, ওই সূর্যটার মতো আমরাও ডুবে যাই। আবার নতুন করে উঠব কোথাও… একসঙ্গে… আর কখনও আলাদা হব না… “আমি কোথাও যাব না তোকে ছেড়ে, বিনি…. যেতে পারব না…”
ঐন্দ্রিলার চোখের জল, সেই মেয়েটার চোখের জল, যে শত অত্যাচারে, শত যন্ত্রণার সামনে দাঁড়িয়েও কাঁদেনি, তার চোখের জলে ভিজে যেতে থাকে শতরূপের বুকটা।
হয়তো কোনও অদৃশ্য ম্যাজিক লুকিয়ে ছিল সেই জলে। কিছু আবছা স্মৃতি হঠাৎ রূপ নিতে থাকে শতরূপের চোখের সামনে। ওর মনে পড়তে থাকে ছোটবেলার কথা…
হ্যাঁ, একটু একটু করে অবয়ব স্পষ্ট হতে থাকে চোখের সামনে। একটা চাঁদ, শতরঞ্চি আর আকাশভরা অনেকগুলো তারা…
*
