(দশম অধ্যায়)
প্রিয় বাবু,
তোকে ছোটবেলা থেকে গল্প শোনাইনি আমি কখনও, ওসব তোর মা আর দাদু শোনাত। আমি বাড়িতেই বা থাকতাম কতটুকুনি? আজ যাওয়ার আগে তাই ভাবলাম, তোকে একটা গল্প শোনাই। গল্পের শেষে একটা অনুরোধ আছে, বা উপদেশও বলতে পারিস। আগে গল্পটা শুনে নে, কেমন?
মায়ের কাছে গল্প শুনলেও ছোটবেলা থেকে আমাকেই বেশি ভালোবাসতিস তুই। আমাদের সেই এক কামরার ভাড়াবাড়িটার কথা মনে আছে তোর? তখন টাকাপয়সার খুব টানাটানি ছিল আমাদের। ভারী কষ্ট করে মানুষ করেছি তোকে।
মনে আছে, রাতে রুটি খেতে গিয়ে তোর পাতে তরকারি বেঁচে গেলে সেই তরকারিটা আমার পাতে ঢেলে দিতিস তুই। তখন থেকেই বুঝতিস,
ওটুকু নিজে খেয়ে নিলে বাবার কম পড়তে পারে। মায়ের কাছ থেকে নেতাজির গল্প শুনে হঠাৎ একদিন “আমাকে নেতাজি এনে দাও” বলে সে কী কান্না তোর! কিছুতেই থামাতে পারি না। শেষে আমি নিজেই গোল চশমা আর লম্বা টুপি পরে নেতাজি সেজে তোকে ঠান্ডা করলাম।
প্রথম যেদিন আমার মাথায় সাদা চুল দেখতে পেলি, সেদিনও ভয়ংকর কান্না জুড়েছিলি বাবা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে ভেবে। কার কাছ থেকে যেন জেনেছিলি, বাবা-মা চিরদিন বাঁচবে না, সেদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে তোর সে কী কান্না! এখন বললে লোকে বিশ্বাস করবে না কিন্তু ছোট থেকে তুই ভীষণ ছিঁচকাঁদুনে ছিলিস।
ছোট থেকে বড় হতে আমার সেই অসহায় ছিঁচকাঁদুনে ছেলেটা যে কোথায় হারিয়ে গেল, কবে হারিয়ে গেল, বুঝতে পারিনি। তাতে অবশ্য খুশি হয়েছিলাম। সারাজীবন কান্না থামানোর জন্য তো বাবা-মা থাকে না। নিজেকেও শিখে নিতে হয়। প্রকৃতি হয়তো নিজের নিয়মে সন্তানকে কান্না লুকোতে শিখিয়ে দেয়, আর বাবা-মা-কে কান্না না-শোনার অভ্যাসটা তৈরি করে দেয়…
আজ শুধু মনে হচ্ছে, যে প্রকৃতি আমাকে দিয়ে আজকের এই অসম্ভব কাজটা করিয়ে নিচ্ছে, সে তোকে এই যন্ত্রণাটাও সহ্য করার মতো শক্তি দেবে।
যা-ই হোক, তারপর আমরা গরিব থেকে মধ্যবিত্ত হলাম। তুই বড় স্কুলে পড়াশোনা করলি, নিজের ইচ্ছামতো কেরিয়ার তৈরি করলি, তোকে যখন শার্ট আর জিন্স পরে কলেজে যেতে দেখতাম, তখন মনে মনে ভাবতাম, সত্যিই আমাদের ছোট্ট ছেলেটা বড় হয়ে গেছে, নিজেরটা বুঝে নিতে শিখে গেছে, তুই আর আগের মতো কাঁদিস না। নিজের চারপাশে একটা জগৎ তৈরি করে নিয়েছিস, একটা কল্পনার জগৎ। গল্প, কবিতা, উপন্যাসের জগৎ।
মাঝে মাঝে মনে হত, না, ছেলেটা সত্যি বড় হয়নি। আজ চলে যাওয়ার আগে হঠাৎ খুব ছোট মনে হচ্ছে তোকে। আচ্ছা রূপ, তুই কি সত্যিই বড় হোসনি?
আমি জানি, পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ থাকে, যারা বড় হয়েও হয় না। ভেতরটা কাঁচামাটির থেকে যায়। আমার এখন ভীষণ ইচ্ছা করছে, তুই আমার কাছে এসে ছোটবেলার মতো নির্দ্বিধায় কাঁদতে কাঁদতে বল, “আমার ছোটবেলার বাবা চাই….. আমি জানি না কোথায় হারিয়ে গেছে লোকটা। কোন সময়ের গর্ভে তলিয়ে গেছে… আমার শুধু ফেরত চাই, ব্যাস…”
আমি আবার আমার পুরোনো শার্টটা পরে মাথায় কলপ করে তোকে বোঝানোর চেষ্টা করব যে তোর বাবা কোথাও হারিয়ে যায়নি। যেমন তুই বলতে পারলি না, তেমন আমিও হতে পারলাম না। আমরা কেউ কারও কাছে যেতে পারলাম না কেন, বাবু? জানি না।
তুই এই চিঠি তখন পড়বি, যখন আমি থাকব না, এটা ভেবেই এতগুলো কথা লিখে ফেলছি হয়তো। জানিস, কোথায় একটা যেন পড়েছিলাম, এই পৃথিবীতে যতগুলো আত্মহত্যা হয়েছে, তার কয়েক হাজারগুণ বেশি এই চিঠিটা…
সুইসাইড নোট লেখা হয়েছে। তা-ই যদি হয় তাহলে হয়তো লুকিয়ে ফেলব রূপ, আমি জানি, তুই ভগবানে বিশ্বাস করিসনি কোনদিন। তোর মা মন্দিরে পুজো দিতে গেলে বাইরে সিঁড়িতে বসে থাকতিস। পুজো হয়ে গেলে ফিরে আসতিস মায়ের সঙ্গে। তোকে হয়তো বোঝাতে পারব না মানুষ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে উপস্থিত হলে ঠিক কতটা ভয় পায়। একাকিত্ব কী ভীষণরকম ভয় দেখাতে পারে… ঠিক কতটা অবসাদ গ্রাস করতে পারে….
আজ এই ঘরে বসে তোর মা চলে যাওয়ার পর আমি আমার বাকি জীবনে সীমাহীন আতঙ্ক ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। হয়তো একদিন তুইও বাবা হবি, হয়তো সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হবে, সেদিন হয়তো বুঝতে পারবি, আজ আমার, তোর, তোর মায়ের কারও কোনও দোষ ছিল না।
আমরা সেই আমাদের এক কামরার ভাঁড়ারঘর থেকে যেদিন বেরিয়ে এসেছিলাম, যেদিন প্রথমবার তোর কান্না শান্ত হয়ে গিয়েছিল, আমরা প্রশ্ন করিনি এখনও কোথাও কিছু বাকি আছে কি না, এখনও তোর আমাদের প্রয়োজন আছে কি না, যেদিন তোর প্রথম মনে হয়েছিল, জীবনে এমন কিছু দুঃখ থাকে, যার ওষুধ বাবা-মায়ের কাছে নেই, সেদিন থেকে একটার পর একটা ভুল জমতে জমতে আজ এই চিঠিটা লেখা হচ্ছে। এতে আমাদের কারও দোষ নেই, বাবু, কিংবা সবারই দোষ আছে…
বলেছিলাম না চিঠি শেষে একটা অনুরোধ করব? এই চিঠিটা কাউকে দেখাতে হবে না। তোর বন্ধুবান্ধবদেরও না। শুধু কোনওদিন ফেলে দিস না চিঠিটা। এটা রেখে দিস। আমার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে নয়। যদি জীবনে কখনও মনে হয় আজ আমার চলে যাওয়ার জন্য একটুখানি হলেও তুই দায়ী, তাহলে এই চিঠিটা খুলে পড়িস। জীবনের শেষদিন অবধি পড়িস। বুঝতে পারবি, তোর কোনও দোষ ছিল না।
খুব ভালো থাকিস বাবু, জীবনটা খুব আনন্দে কাটাস। আমাদের সুখের খোঁজ ঠিক কোনও না কোনও মানুষের কাছে থাকে। সে মানুষটাকে খুঁজে নিস। যদি নিজের জন্য না-ও হয়, অন্তত আমার জন্য, আমাদের তিনজনের জন্য…
ইতি,
তোর বাবা
.
আহিরিটোলায় নেমে কুমোরটুলির রাস্তা ধরে বাগবাজার ঘাটে পৌঁছোল শতরূপ। এই ঘাটটা ওর বহুদিনের চেনা। পুজোর মরশুম শুরু হতে এখন প্রচুর দেরি আছে। ফলে ঠাকুর তৈরির তেমন তাড়া নেই। গঙ্গার ধারে বেশ কয়েকটা খড়ের মূর্তি দাঁড় করান। ছোটবেলায় মূর্তিগুলোকে দেখে শতরূপ খুব ভয় পেত। এখন আর পায় না।
একটা ফাঁকা ঘাট খুঁজে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে এল রূপ। গঙ্গার ধারে আসলে মনটা হালকা হয়ে যায়। অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল, গঙ্গার ধারে একটা বাড়ি কিনে থাকবে। কিন্তু এখনও সেভাবে বড়সড়ো চাকরি করে না। টাকাপয়সা নিয়েও টানাটানি চলছে। ফলেও স্বপ্নগুলো আপাতত গঙ্গার জলেই বইয়ে দিয়েছে।
তবে আজ স্বপ্ন দেখতে আসেনি। একাকী ঘাটে একটা ভাঙা সিঁড়ি খুঁজে নিয়ে তার উপর বসে পড়ে ও। একটু দূরে পুজোর ফুল আর বেলপাতা পড়ে আছে। একটা গামছা-পরা লোক ঘাট থেকে উঠে কোথায় যেন চলে গেল। একবার চারদিকটা ভালো করে দেখল শতরূপ। তারপর পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে আনল। ওর বাবার সুইসাইড নোটটা।
আরেকবার ভালো করে পড়ল চিঠিটা, তারপর আরেকবার, একসময় ওর ঠোঁটে একটা মিহি হাসি ফুটে উঠল। হাসিটা জীবনে অনেকবার হেসেছে ও। বিজয়ীর হাসি।
সেইভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা ইরেজার বার করে আনল। ইরেজারটাকে রাখল কাগজের ঠিক উপর। চিঠিটা পেনে লেখা। ফলে ইরেজার দিয়ে মোছা যাবে না।
কাগজটা দিয়ে ঢেকে বেশ কয়েকবার মুড়িয়ে ইরেজারটা দলা পাকিয়ে ফেলল রূপ। ছোট্ট বলটা হাতে চেপে ধরে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর আচমকাই সেটা ছুড়ে ফেলে দিল গঙ্গার জলে।
‘চুপ’ শব্দ করে ডুবে গেল ইরেজার সমেত কাগজটা। একসঙ্গে হারিয়ে গেল গঙ্গার জলের তলায়।
রূপ বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। জলের ছোঁয়া-লাগা একটা নরম হাওয়া ঝিরঝির করে মুখে লাগছে। অনেকটা আকাশ দেখা যায় এখান থেকে। আকাশের এক-এক প্রান্তে এক-এক রকমের রং ধরেছে। উশকোখুশকো চুলগুলো আরও অবিন্যস্ত হয়ে যাচ্ছে সেই হাওয়ায়।
অনেকক্ষণ কেটে যেতে ওর মনে হল, এতক্ষণ ঘাটে কোনও লোক আসেনি, কিংবা হয়তো এসেছিল, ও খেয়াল করেনি। কী যেন একটা ভাবনায় ডুবে ছিল এতক্ষণ।
উঠে পড়ল রূপ। বাড়ি ফিরতে হবে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যাবে এমন সময় ওর পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। পকেটে একটা ফোন আছে, সেটা এতক্ষণ খেয়াল ছিল না ওর।
ফোনটা বের করে স্ক্রিনের উপর নজর রাখল। আননোন নাম্বার। রিসিভ করে “হ্যালো” বলতে ওপাশ থেকে একটা উচ্ছ্বসিত গলা শোনা গেল, “হ্যালো, ইজ দিস মিস্টার ঘোষ স্পিকিং?”
“হ্যাঁ বলছি। আর বাংলায় বলুন, আমি ইংরেজি আর হিন্দি বলতে পারি না…”
“ও.কে. মিস্টার ঘোষ, আমরা বাংলা এফএম থেকে বলছি। আপনি একটা অডিশন দিয়ে গিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ, মাসখানেক আগে দিয়েছিলাম। কেন বলুন তো?”
“কনগ্র্যাচুলেশনস, আপনি আমাদের অডিশনে সিলেক্টেড হয়েছেন। যদিও এখন কোনও পার্মানেন্ট জব অফার আপনাকে করতে পারছি না। কিন্তু কনট্র্যাক্ট বেসিসে…”
আরও দু-চার কথা বলার পর ফোনটা রেখে দিল শতরূপ। একটা অদ্ভুত অনুভূতি গ্রাস করছে ওর মনটাকে। এই ছোট্ট কাজটার জন্য মাস ছয়েক ধরে টানা প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এভাবে হঠাৎ করে পেয়ে যাবে, সেটা কাল রাত অবধি ভাবতে পারেনি।
কীসের যেন একটা ধুকপুকানি হচ্ছে ওর মধ্যে, দুঃখ হোক বা আনন্দ, যে-কোনও অনুভূতিতে এত ছটফট করে কেন কে জানে?
কলটা কেটে গিয়েছিল। ফোনের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত ইচ্ছা হল ওর। ইচ্ছা হল এরকম কাউকে খবরটা দিতে, যে খবরটা শুনে ওর থেকেও বেশি খুশি হবে। এরকম কেউ, যে ওর লড়াইটা দেখেছে, এমন কেউ, যে ওর সঙ্গে অপেক্ষা করছিল এই ফোন কলটার। হোয়াট্সঅ্যাপে গেল শতরূপ। খুঁজে পেল না কাউকে। তারপর কনট্যাক্ট লিস্টে, সেখানেও খুঁজে পেল না কাউকে। ফোনটা লক করে আবার ঢুকিয়ে রাখল পকেটে….
ঘাট থেকে উঠে আসতেই একটা ঘটিগরমওয়ালা সামনে পড়ল। ওকে দেখে ফিক করে একগাল হেসে লোকটা বলল, “ঘটিগরম দেব নাকি দাদা? গঙ্গার হাওয়ায় বসে খাবেন মুচমুচে ঘটিগরম?”
“দিন, দশ টাকার দিন…” হেসে বলল শতরূপ।
ঘটিগরমের ঠোঙা নিয়ে ঘাট থেকে বেরিয়ে আসতেই একটা হইচই ভেসে এল পাশ থেকে। কিছুই নয়, একটা বয়স্ক লোক তার নাতিজাতীয় কাউকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল গঙ্গায় পুজো দিতে। ঘাটের কাছাকাছি আসতেই ছেলেটা বায়না ধরেছে, সে গঙ্গায় স্নান করবে। বুড়ো কিছুতেই তা হতে দেবেন না। ছেলেটাও প্রায় গায়ের জোরে দাদুকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে জলের দিকে। বুড়ো কিছুতেই তাকে সামলাতে পারছেন না। নানারকম ভয় দেখাচ্ছেন, কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। সামান্য একটা লাঠি দিয়ে সিঁড়িতে ঠেকনা রেখেছেন। আরেকটু হলেই সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়বেন।
প্রায় কাতর চোখে শতরূপের দিকে তাকালেন ভদ্রলোক, “বলছি ভাই, তুমি ওকে একটু ধরতে পারবে? আমি পুজোটা দিয়েই বেরিয়ে আসব…”
“আচ্ছা বেশ তো, রেখে যান, আমি ম্যানেজ করে দেব…”
বুড়ো কিন্তু আশ্বস্ত হতে পারেন না, “ও কিন্তু মহাবিচ্ছু ছেলে, ভাই। সুযোগ পেলেই জলে নেমে যাবে, কেন যে মরতে ওর মায়ের কথা শুনে নিয়ে এলাম?”
শতরূপ একটা ভরসার হাসি হাসে-”চিন্তা করবেন না। নিশ্চিন্তে পুজো দিয়ে আসুন।”
“তুমি শুধু দশ মিনিট ওকে আটকে রাখো, কেমন?” নাতির দিকে চেয়ে বলেন, “এই যে, এই দাদা জলে নিয়ে যাবে তোমাকে, আমি ততক্ষণ পুজো দিয়ে আসি?”
ছেলেটা এগিয়ে এসে বসে পড়ে রূপের পাশে। ওর দিকে সন্দেহের দৃষ্টি হেনে বলে, “তুমি সাঁতার জানো?”
“ডুবসাঁতার, চিতসাঁতার, বাটারফ্লাই, সব জানি। শিখবে নাকি?” ছেলেটা আর কিছু বলে না। গম্ভীর মুখ নিয়েই জলের দিকে চেয়ে থাকে। গঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না ভেবে গোমড়া হয়ে গেছে সে। শতরূপ ওর কাঁধে একটা টোকা দিয়ে বলে, “কী বস, জলে নামবে নাকি?”
“কত নিয়ে যাবে, সব জানি…” মুখ বেঁকায় ছেলেটা।
“ও মা, নিয়ে যাব না কেন?” শতরূপ ফিশফিশে গলায় বলে, “চাইলেই নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু জলের ভেতর কী আছে, সেটা তো শুনে নাও আগে…”
“কী আছে?”
শতরূপ একটা বাঁকা হাসি হাসে। তারপর কাঁধে হাত রেখে বলে, “আগে সেই গল্পটা শোনো তাহলে… একটা দৈত্যের গল্প…”
“কোন দৈত্য?”
“সেই যে দৈত্যটা যুদ্ধের নেশায় নিজের মা-বাবাকে খুন করে ফেলেছিল… তারপর….”
“তারপর?”
ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে গঙ্গার দিকে তাকায় শতরূপ…
*
ঘরের ভেতর কেবল খচখচ করে এগিয়ে চলা ঘড়ির আওয়াজ আসছে। চারদিকের জানালা দিয়ে আসা রোদ খেলা করছে ঘরের মেঝেতে। দেওয়ালের শোকেস জুড়ে অসংখ্য বই। বেশির ভাগই রংচঙে।
দেওয়ালে কয়েকটা ইতস্তত ছবি রয়েছে। এই ছবিগুলোর মধ্যেও নরম রঙের খেলা। একবার দেখলেই চোখ জুড়িয়ে আসে। সামনে বসা মেয়েটার বয়স নীহারিকার থেকে বছর সাতেক কম হবে। দেখে মনে হয়, সে কথাবার্তা বিশেষ বলে না। কেবল চোখ দুটো ভারী উজ্জ্বল। একটানা বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে বুকের ভেতরটা কেমন খালি হয়ে যায়।
নীহারিকা আজ প্রথম দেখছে মেয়েটাকে, তা-ও মেয়েটার ওর দিকে কোনও আগ্রহ নেই। যেন বাইরে দরকারি কিছু একটা হচ্ছে। ওর এক্ষুনি সেখানে ছুটে যাওয়া দরকার।
“আমার ছোট থেকে খুব শখ ছিল তোমার মতো ডাগর ডাগর চোখের…” আলাপ জমানোর চেষ্টা করে নীহারিকা।
মেয়েটা হাসে। কিছু বলে না।
“তোমার এরকম কোনও শখ ছিল না?”
“ছিল। না-জন্মানোর…”
নীহারিকার ভুরুতে ছোট একটা দাগ দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়। প্রসঙ্গটা খানিকটা নরম করতে সে বলে, “কেন? তুমি তোমার জীবন নিয়ে খুশি না? তোমাকে দেখতে এত মিষ্টি, এত গুণ আছে তোমার… কাকামশাই তোমায় এতটা ভালোবাসেন…”
মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে বলে, “কী করে বলি? আপনাকে তো আমি ভালো করে চিনি না। আপনি আমার সম্পর্কে এত কিছু জানেন, অথচ আমি আপনার সম্পর্কে কিছুই জানি না…”
“বেশ তো, বলো কী জানতে চাও?”
এইবার যেন মেয়েটার চোখে-মুখে একটা উদ্দীপনা ফুটে ওঠে। নীহারিকার গল্প জানতে ভারী আগ্রহ তার। দুটো হাত সামনে জড়ো করে বলে, “আপনাকে কে ভালোবাসে বা ভালোবাসত?”,
“আমার হাজব্যান্ড আছে, আমার বন্ধুবান্ধবরা আছে, আমার মা-বাবা আছে…”
মেয়েটা একটা অদ্ভুত বাঁকা হাসি হাসে-”কে ভালোবাসে জানতে চাইলে যারা এতগুলো নাম বলে, তাদের আসলে কেউ ভালোবাসে না…”
নীহারিকা এবার খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে, বলে, “তুমি বেশ বুদ্ধি করে কথা বলতে পারো তো। আচ্ছা বলো তো, বাড়িতে থাকলে কী করতে ভালো লাগে তোমার?”
“গল্পের বই পড়তে। আর গল্প শুনতে রেডিয়োতে…
রেডিয়োতে! তোমার কাকামশাই বলছিল বটে রেডিয়োতে কার সঙ্গে কথা বলো তুমি… রেডিয়ো শুনতে ভালো লাগে?”
“হুম, আরজে রূপের গলা…”
একটু থমকে যায় নীহারিকা। একবার ঘড়ির দিকে তাকায়। টেবিল থেকে রুমাল নিয়ে মুখটা মুছে আবার নামিয়ে রাখে।
“বেশ, কীসের গল্প শোনো?”
“ভূতের, দৈত্যের…”
“দৈত্যের!” নীহারিকা চোখ কুঁচকে তাকায়— “তোমার সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছিল তুমি ভারী প্র্যাকটিক্যাল মেয়ে…
“দৈত্যের থেকে বেশি প্র্যাকটিক্যাল কী আছে, মিসেস গাঙ্গুলি? আমাদের সবার ভেতরেই একটা দৈত্য আছে। আপনি কখনও অনেকক্ষণ কারও সঙ্গে কথা না বলে থেকেছেন? একটা অন্ধকার ঘরে দিনের পর দিন কারও সঙ্গে যোগাযোগ না করে যদি কাটান, বুঝতে পারবেন সবার মধ্যে একটা দৈত্য আছে… কখনও সে একটু বেশি জেগে ওঠে, কখনও ঘুমিয়ে পড়ে….
“তোমার দৈত্যটা কবে জেগেছিল?”
চোখ তুলে তাকায় বিনি— “অনেকবার। আজ, এখন আপনার চেম্বারে ঢোকার ঠিক পরেও…”
“কেন? এখানে কী হল?”
“আমার দৈত্যটা আরেকটা দৈত্যের গন্ধ পেল। আপনার মধ্যে।”
“আমার মধ্যে! স্ট্রেঞ্জ!”
“হুম… আসলে একটা দৈত্য আরেকটা দৈত্যকে চিনতে পারে…”
হঠাৎ নীহারিকার মনে হয়, ও বেশ কিছুক্ষণ ধরে চেয়ে আছে ঐন্দ্রিলার চোখের দিকে। যেন চাইলেও সে চোখ সরাতে পারবে না। নীহারিকা শুনেছে, কিছু মানুষ কেবলমাত্র চোখের দৃষ্টিতে সম্মোহিত করতে পারে। তেমন কিছু ক্ষমতা আছে নাকি ঐন্দ্রিলার? সে বহু চেষ্টা সত্ত্বেও নিজের অবচেতনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়।
“আপনার কীসের দুঃখ হয়, মিসেস গাঙ্গুলি? রোজ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার পর, ঘুম থেকে ওঠার পর আপনি কী ভাবেন?”
“জানি না কেন ছোট হয়ে যেতে ইচ্ছা করে আমার…”
“কেন?”
“ছোটবেলায় একটা ছেলেকে আমি ভালোবাসতাম….”
“তারপর?”
“তারপর জানি না কেন ও কোথায় যেন…”
ওর চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় বিনি। মুহূর্তে ঘোরটা কেটে যায়। এক ঝটকায় ঘর থেকে বেরিয়ে আসে নীহারিকা। বাইরে রিসেপশনিস্টের কাছে বসেছিলেন আশিস দত্ত। বিজনেস ম্যাগাজিন জাতীয় কিছু একটা নিয়ে পাতা ওলটাচ্ছিলেন। তাঁকে প্রায় হিড়হিড় করে টেনে বাইরে নিয়ে আসে।
নিজের ছোট্ট অফিস রুমে ঢুকেই গনগনে লোহার মতো প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, “আপনি সব জানেন, তা-ই না?”
“আমি!” ভদ্রলোক অবাক হয়ে যান, “আমি কী জানলাম?”
“আপনার ভাইঝি সারাদিন রূপের গল্প শোনে, সেটা আপনি জানতেন….”
“আমি! মানে….” কী যেন ভাবে লোকটা। তারপর চোখ থেকে চশমাটা খুলে বলে, “উনি আপনার পরিচিত নাকি?”
একটু ধাতস্থ হয় নীহারিকা – “ছোটবেলার বন্ধু। একসময়কার বেস্ট ফ্রেন্ড। অনেকদিন হল যোগাযোগ নেই…
“তো এতসব আমি কী করে বলব? আপনার কবে কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল…..”
“দেখুন মিস্টার দত্ত, ন্যাকা সাজবেন না। আপনার ট্যাঁকের যা জোর, তাতে এই গোটা দেশের সব থেকে বড় সাইকোলজিস্টকে আপনি কনসাল্ট করতে পারতেন। কিন্তু সেসব ছেড়ে আমাকে কেন হায়ার করলেন?”
“ওটা আমার কোম্পানি পলিসি, মিসেস গাঙ্গুলি। আমরা নতুনদের উপর ভরসা করে থাকি…”
“কোম্পানি পলিসি মাই ফুট। শুধু আপনি নয়, আপনার মেয়েও সমস্ত ব্যাপারটা জানে।”
“খেপেছেন নাকি! ও কী করে জানবে? বিনি কারও সঙ্গে মেশেই না। নিজের হাজারটা সমস্যা আছে ওর…”
“জানি না, কিন্তু বারবার আমার পেট থেকে কথাগুলো বের করতে চাইছে…”
“আগেই বলেছিলাম আমার ভাইঝি আপনার পাঁচটা পেশেন্টের মতো নয়। কিছু অস্বাভাবিক ক্ষমতা আছে ওর। সাধারণ মানুষের থেকে ওর মাথা অনেক দ্রুত চলে। মানুষের মনের ভেতরের কথা পড়ে ফেলতে…”
“আপনার এই কেস আমি হ্যান্ডেল করতে পারব না, আপনি অন্য কাউকে খুঁজে নিন….”
“আচ্ছা, আপনাকে এভাবে বিব্রত করে আমার লাভ কী বলুন তো?”
“সেটা আমার জানার দরকার নেই। আই অ্যাম স্ট্রেট আউট অব দিস…. “মিসেস গাঙ্গুলি,” গলাটা ভারী হয়ে আছে আশিস দত্তর— “আপনি কলেজ থেকে বেরোনোর সময় গোল্ড মেডালিস্ট ছিলেন, জীবনে চ্যালেঞ্জ নিতে পিছিয়ে আসেননি, আজ আমার মেয়ে মাত্র আধ ঘণ্টায় আপনাকে এভাবে হারিয়ে দেবে, সেটা আমি ভাবতে পারিনি। ঠিক আছে, আপনি যদি চান…”
কথার মাঝখানে গটগট করে আবার ঘরের ভেতর ঢুকে আসে নীহারিকা। আবার গিয়ে বসে নিজের চেয়ারে। একটা পেন তুলে নিয়ে আনমনে ক্রমাগত ঘষতে থাকে কাগজের উপর।
কয়েক সেকেন্ড পরে ওর মাথা শান্ত হয়ে আসে। মুখ তুলে তাকায় ঐন্দ্রিলার দিকে— “বেশ, করো আমাকে কী জিজ্ঞেস করবে…”
চোখ বন্ধ করে চেয়ারে মাথা এলিয়ে দেয় নীহারিকা। ওপাশ থেকে শান্ত কন্ঠস্বর ভেসে আসে। নীহারিকা বুঝতে পারে, ঐন্দ্রিলা চেয়ার থেকে উঠে পড়েছে, ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ওর দিকে— “আপনার মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছা করে, তা-ই না মিসেস গাঙ্গুলি?”
“করে… সবার করে…. অস্বাভাবিক কিছু না…” চোখ বুজেই উত্তর দেয় নীহারিকা।
“তখন কী ভাবেন? এক্ষুনি মরে গেলে ভালো হত? না আজ থেকে কয়েক বছর আগে, কি কয়েক মাস আগে…”
“কয়েক বছর আগে।”
“বুঝেছি। এমন একটা সময় যখন মরে যাওয়ার কোনও কারণ ছিল না, মনে হয়, তারপর থেকে সমস্ত কিছু খারাপ হয়েছে, তা-ই না?”
“হ্যাঁ…..”
“কোন সময়?”
“আমার বন্ধুকে ছেড়ে এসেছিলাম যেদিন, ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে আসার সময় যেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, আর ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখব না। সেদিন সেই মুহূর্তে যখন ফিরে আসছিলাম, তখন একটা গাড়ির অ্যাক্সিডেন্ট…” ঢোঁক গেলে নীহারিকা, “আমি চাইছিলাম, সেদিন আমার রক্ত-মাখা দেহটা পড়ে থাক মাটির উপরে, আমার মাথাটা ও কোলে তুলে নিক, একদৃষ্টে চেয়ে দেখুক আমার দিকে… ভয় পাক, একটা গোটা জীবন আমাকে ছেড়ে কাটানোর ভয়… তারপর অসহায় মুখের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে একটু একটু করে…”
“চোখ খুলুন মিসেস গাঙ্গুলি, ভয় নেই। আমি আর আপনার সামনে বসে নেই…”
এক ঝটকায় চোখ খোলে নীহারিকা। সামনে আয়নাটা চোখে পড়ে। ওর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ঐন্দ্রিলা। নিজের মুখটা লালচে দেখাচ্ছে। একটা অদ্ভূত অস্বস্তি ঘিরে ধরে ওকে। নগ্ন মনে হয় নিজেকে।
“আপনার অস্বস্তি হচ্ছে, তা-ই না? মিসেস গাঙ্গুলি, আমরা সব কথা বলতে চাই, কিন্তু যাকে-তাকে নয়…..”
কথাটা বলে আবার সামনের চেয়ারটায় বসে ঐন্দ্রিলা। কয়েক সেকেন্ড মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা পায়ের উপর আরেকটা পা তুলে বসে— “চলুন, অন্য কিছু খেলা যাক… আপনি আমাকে যা জিজ্ঞেস করবেন, আমি চেষ্টা করব তার উত্তর দিতে। বদলে আমি আপনাকে যা জিজ্ঞেস করব, সেগুলোও আমাকে বলবেন আপনি, রাজি?”
ঘণ্টাখানেক পরে ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে নীহারিকার চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসেন আশিস দত্ত। বাইরের ডার্ক-ব্লু সিডানটা দাঁড়িয়ে ছিল। সেটায় উঠে ড্রাইভারকে নির্দেশ দেন। ঐন্দ্রিলা গাড়িতে উঠে বসে।
আশিস দত্ত হেঁটে খানিকটা এগিয়ে এসে পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে একটা নাম্বার ডায়াল করেন। উনি হ্যালো বলার আগেই ওপাশ থেকে কথা শোনা যায়, “হ্যাঁ স্যার, ওই ছেলেটার খবর নিয়েছি। রেডিয়োর চাকরি তো, তবে…”
“তবে কী?”
“ইদানীং রেপুটেশন একটু ডাউন যাচ্ছে। মেজাজ ঠিক থাকছে না, একদিন নাকি মাল খেয়ে বাথরুমে কী সব ভাঙচুর করেছে শুনলাম…”
“ব্যাস, ওটাকে কাজে লাগাও। টাকাপয়সার টানাটানি যাতে হয়, সেটা এনশিয়োর করে…” সিগারেটটা মুখে পুরে কঠিন গলায় বলেন আশিস দত্ত। “ছেলেটাকে নিয়ে আপনি কী করতে চান, স্যার?” লোকটা একটা ফচকে হাসি হেসে জিজ্ঞেস করে।
“সেটা তোমার না জানলেও চলবে। তুমি জাস্ট এমন একটা সিচুয়েশন করবে, যাতে আমাদের প্রোপোজালটা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় না থাকে….”
ফোনটা কেটে যেতে গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে একগাল মুচকি হাসেন আশিস দত্ত।
দাবার বোর্ডের সব খুঁটি ছোট্ট একটা খোপের মধ্যে জড়ো হয়েছে। কতকগুলো অদ্ভুত সরলরেখা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে এক জটিল নকশা তৈরি করছে। নকশাটা মাথার ভেতর ফুটে ওঠে। সেটার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকেন তিনি…..
*
“আচ্ছা, এই গোটা উপন্যাসটায় তোর সব থেকে খারাপ লাগে কাকে?” ঐন্দ্রিলা জিজ্ঞেস করে।
“ব্যান্ডারস্ন্যাচ।”
“কেন? ও মনস্টার বলে?”
“ধুর, মনস্টার তো ভালো লাগে। কিন্তু ভালো লেখকরা সব সময় সাহস করে মনস্টারদের একটা সুন্দর ব্যাকস্টোরি দেয়। ব্যান্ডারস্ন্যাচের কোনও ব্যাকস্টোরি নেই।”
“ব্যাকস্টোরি!”
“মানে ধর, হুট করে একটা দৈত্য এল কী করে? এমনি এমনি তো আর কেউ দৈত্য হয়ে যায় না…”
“উঁহু, এমনি এমনি হয় না। দৈত্যকে জাগাতে হয়। সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি দিয়ে যেমন রাজকন্যা জাগাতে হয়, তেমনি দৈত্যকেও কিছু একটা দিয়ে জাগাতে হয়…”
“তুই একবার একটা দৈত্যকে জাগিয়েছিলি।”
“তা-ই নাকি! কী দিয়ে?”
“একটা সাঁড়াশি…”
